আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাগপাশ উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাগপাশ উপন্যাস
‘নাগপাশ’ (১৯৫৩) উপন্যাসটি মধ্যবিত্ত পরিবারের বেকার যুবকদের কেন্দ্র করে লেখা। এ উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন চাকরি থাকলে পরিবারের কাছে, সমাজের কাছে একজন যুবকের মর্যাদা অনেক বেশি, আর চাকরি না থাকলে পরিবারের কেউ তাকে পছন্দ করে না।
উপন্যাসের শুরু হয়েছে চাকরিজীবী নরেনের বই পড়ার আগ্রহের মধ্য দিয়ে। লোকে যেমন পরীক্ষা পাসের জন্য দিন-রাত লেখাপড়া করে, সেও তেমনি পড়ার মধ্যে ডুবে থাকে । গ্রাজুয়েট হয়ে আশি টাকা বেতনে চাকরি করে সে। তাসপাশা খেলতে ভালো লাগে না, বাকি সময়টুকু তাই বই পড়ে কাটায়। বই পড়া তার নেশা। সে বই আনে মাধবের কাছে থেকে।
মাধব মহাজ্ঞানী, সংসারের জ্ঞান নয়, সে বিধান, কলেজের অধ্যাপক। মাধবের স্ত্রী মানসী সংসারে সব ঝামেলা সামলায়, মনে মনে সে মাধবকে শ্রদ্ধা করে, কিন্তু বড় চাকরী পাওয়া সত্ত্বেও নেয় না বলে রাগও পুষে রাখে। আবার মাধবকে সে স্বার্থপরও ভাবে। পড়ার সময় এবং চিন্তা করার সময় মানসী মাধবকে ডাকে না।

কোলের ছেলেটি কেঁদে মাধবের ব্যাধাত ঘটাবে বলে সে ছেলেকে একতলায় একটি মেয়ের কাছে মাঝে মাঝে রেখে আসে। উপন্যাসের শুরু হয়েছে: নরেন মাধবকে বই ফেরত দিতে যাচ্ছে। পথে দেখা হয় কাপড়ের দোকানি দিননাথের ছেলে মন্টুর সঙ্গে। মন্টুর মন খারাপ, বরাবর সে ক্লাসে ফার্স্ট হয়, এবার সে থার্ড হয়েছে। তাকে নিয়ে স্কুলের শিক্ষকদের অনেক আশা, কিন্তু কেউ তাকে নিয়মিত পড়ায় না।
নিয়মিত পড়ালে সে আবার ফার্স্ট হতে পারে। নরেন মাধবের বাড়ি যায়। মাধব তখনো রেশন তোলেনি, বাজার করেনি। নরেন মাধবের রেশন তোলার কাজটি নেয়। তারপর মাধবের সঙ্গে আলোচনা করে সে নন্দনদের বাড়ির দিকে যায়। নন্দন নরেনের বন্ধু। সে এম.এ. পাস, বেকার। পাঁচ বছর বয়সে নন্দনের বাবা মারা যায়। মৃত্যুর সময় সে তার জ্যাঠা হেমেন্দ্রের কাছে প্রচুর ধনসম্পদ, নগদ অর্থ আর নন্দনকে রেখে যায়। কিন্তু হেমেন্দ্র নন্দনকে চাকর- বাকরের মত রাখে, পুরোনো কাপড় পরায়।
নন্দনের বাবার টাকায় সে ব্যবসা শুরু করে। মুখ বুজে সব সহ্য করে নন্দন লেখাপড়া শিখেছে। নন্দনকে একটা চাকরির খবর দিতে যায় নরেন। হেমেন্ত্রের নাতনি ছবিরানী আর নরেন দুজন দুজনকে ভালোবাসে। বাড়িতে নন্দনের চা বন্ধ । নরেনের খাতিরে ছবিরানী দুজনকে চা দেয়। নন্দন না খেয়ে বাজারে চলে যায়। এ সময় থেকে আস্তে আস্তে নন্দন বিদ্রোহ শুরু করে।

অন্যদিকে দীননাথের কাতর অনুরোধে নরেন মন্টুকে বিনাপয়সায় নিয়মিত পড়ানো শুরু করে। একদিন অফিসে গিয়ে নরেন দেখে তার চাকরি নেই, সঙ্গে আরো তের জনের চাকরি নেই। অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তাদের চাকরি গেছে। বাড়িতে নরেনের অযত্ন, অবহেলা, অসম্মান শুরু হয়। ছবিরানীও তাকে জানিয়ে যায় যে সে তার মা আর দাদুর পছন্দ করা চাকুরে ছেলেকে বিয়ে করবে। যদি নরেনের তাড়াতাড়ি আরেকটা চাকরি হতো তবে সে সেই ভরসায় বিয়েটা বন্ধ করতো। ছবিরানীদের অবস্থাও খারাপ হয়ে গেছে। তার ভাই বেশি লোভ করতে গিয়ে কাপড়ের দোকানটা খোয়া দিয়েছে।
অন্যদিকে, এই কারণে দীননাথের চাকরিও গেছে। মন্টুর পরীক্ষার পর দীননাথ পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে যায়। বাড়িতে টিকতে না পেরে নরেন দীননাথের বাড়ি গিয়ে ওঠে। এক মাস সে গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। একটি গ্রাম্য হাঙ্গামায় জড়িয়ে সে দুদিন হাজতবাসও করে।
দীননাথ চাকরি খোঁজার জন্য বস্তিতে তিনজন মিলে ঘর ভাড়া নেয়। নরেনও আসে দীননাথের সঙ্গে থাকতে। নিজের বই আর মেডেল বিক্রি করে সে ঘর ভাড়া দেয়। এক বেলা খেয়ে না খেয়ে চাকরি খোঁজে নরেন। মন্টু ফেরি করে ডিমের ব্যবসা শুরু করে। একদিন একটি সভায় বক্তৃতা দিয়ে মাধবেরও চাকরি চলে যায়। মানসী রাগ করে ছোট ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তার দিদির বাড়ি গিয়ে ওঠে।
মাদব এবার ভাবের জগৎ ছেড়ে বাস্তব জগতে আসে। ছেলেমেয়েদের দেখার জন্য এবং রান্নার জন্য একটি উদ্বাস্তু মেয়ে রাখে। নিজের বই প্রকাশ করতে নরেনের সাহায্য চায়। নরেন মাধবের ওখানে অ্যাসিস্টেন্টের চাকরি নেয়, প্রেস থেকেও প্রুফ দেখার কাজ পায় সে। স্বনির্ভর হয়ে এবার নরেন বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু নিজের জন্য আলাদা রান্নার ব্যবস্থা করে। গোবিন্দ আত্মহত্যা করেছে। সেই সুবাদে ব্যবসায়ী রাধারমন নন্দনকে দুশ টাকা বেতনে চাকরি দেয়।

অন্যদিকে মানসী তার দিদির বাসায় অসুস্থ হলে মাধব নরেনের মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে আনে। ছবিরানীও ফিরে আসে নরেনের কাছে। মানসী বলে
“তোমার চাকরি বাকরি নেই বলে কোথায় আরো বেশি করে তোমায় আঁকড়ে ধরবো, তোমার হয়ে সবার সাথে লড়াই করবো, তার বদলে তোমায় বাতিল করে দিলাম। একেবারে উল্টা হিসাব নয়? কী বোকাই ছিলাম আমি।” (৮খ, পৃ-৫২১)
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একটি সুখী জীবনের ইঙ্গিত দিয়েছেন:
“ নাগপাশ’ উপন্যাসে মানিক দেখিয়েছেন মানুষের নানা পারিবারিক সম্পর্কে, স্বামী- স্ত্রীর সম্পর্কে বা প্রেমিক প্রেমিকার সম্পর্কে নানা মনোমালিন্য এবং জটিলতার মূলে অর্থনৈতিক কারণ থাকলেও মানুষের বুদ্ধি বিবেচনা এবং জ্ঞানের প্রসারের মধ্য দিয়ে অনেক জটিলতা অন্তত আংশিকভাবে দূর করা যায়। ২৩
মধ্যবিত্ত মানুষদের সংগ্রাম করে টিকে থাকার বক্তব্যে উপন্যাসটি শেষ হয়েছে।