আজকের আলোচনার বিষয়ঃ নতুন চীন নতুন দেশ । যা চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্যের চীন ভ্রমণ কাহিনী এর অন্তর্গত।

নতুন চীন নতুন দেশ । আবুল কালাম শামসুদ্দীন
আবুল কালাম শামসুদ্দীন (১৮৯৭-১৯৭৮) ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার ধানীখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ধানীখোলা স্কুল, ময়মনসিংহ জিলা স্কুল, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল এবং ঢাকা কলেজে লেখাপড়া করেন। ১৯১৯ সালে তিনি কলকাতার রিপন কলেজে বি.এ. ক্লাসে ভর্তি হন। তবে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন (১৯২১) এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বি.এ. পরীক্ষা বর্জন করেন এবং “জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়” গৌড়ীয় সর্ববিদ্যায়তন থেকে ‘উপাধি’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ (১৮৭০-১৯৬৮) সম্পাদিত দৈনিক মোহাম্মদীর’ সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দিয়ে ১৯২২ সালে তাঁর সাংবাদিক জীবনের সূচনা হয়। পরবর্তী অর্ধশতাব্দী ধরে তিনি ‘মোহাম্মদী’, “সেবক’, ‘মোসলেম জগৎ’, ‘দি মুসলমান’, ‘সওগাত’, ‘ছোলতান’, ‘দৈনিক আজাদ’, ‘জেহাদ’, ‘দৈনিক পাকিস্তান’, ‘দৈনিক বাংলা’ প্রভৃতি পত্রিকায় দায়িত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন।
তিনি রাজনীতির সংগেও জড়িত ছিলেন। ১৯৪৬-এর মার্চে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক আইন সভার সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান ইস্যুতে মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থীরূপে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশী হামলায় ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে তিনি আইন সভার সদস্যপদ ত্যাগ করেন।
সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তিনি ১৯৬১ সালে সিতারা -এ-খিদমত’ ও ১৯৬৭ সালে সিতারা-ই- ইমতিয়াজ’ খেতাব লাভ করেন। ১৯৬৯ এ ছাত্র-গণ আন্দোলনের সময় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে তিনি উভয় খেতাব বর্জন করেন। সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ১৯৭০ সালে ‘বাংলা একাডেমী পুরুস্কার ও ১৯৭৬ এ ‘একুশে পদক’ লাভ করেন।
তাঁর রচিত বইগুলো হচ্ছে- কচিপাতা’ (শিশুদের জন্যে লেখা ১৯৩২), ‘পোড়োজামি’ (২য় খন্ড ১৯৩৪), ‘অনাবাদী জমি’ (১৩৬১), ‘ত্রিস্রোতা’ (১৯৪০), ‘খরতরঙ্গ’, ‘দৃষ্টিকোণ’ (১৯৫৯), ‘পুঁথি সাহিত্য’, ‘নতুন চীন নতুন দেশ’ (১৯৬৫), ‘ইলিয়াড়’ (১৯৬৭), অতীত দিনের স্মৃতি(১৯৬৮), ‘চীনা উপকথা’ (১৯৭৬) প্রভৃতি। ১
১৯৬৫ সালের ২রা মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান চীন সফরে যান। ৪০ জন উচ্চপদস্থ অফিসার ওসাংবাদিক নিয়ে কত প্রেসিডেন্টের সহযাত্রীদলে পূর্ব-পাকিস্তানের সাংবাদিক হিসেবে তালিকাভূক্ত হয়েছিলেন- দি পাকিস্তান অবজার্ভারে’র মিঃ মুসা, ‘সংবাদের শহীদুল্লা কায়সার, ‘জঙ্গে’র মিঃ নদভী এবং আবুল কালাম শামসুদ্দীন।
২রা মার্চ থেকে ৯ই মার্চ আটদিনের সফরে প্রতিনিধিদল পাঁচদিন রাজধানী পিকিং, একদিন হ্যাংচাও এবং বাকী দু’দিন সাংহাই এ কাটিয়ে ৯ই মার্চ সন্ধ্যায় ঢাকা ফিরে আসেন।
দেশে ফিরে আবুল কালাম শামসুদ্দীন তাঁর চীন সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন ‘নতুন চীন নতুন দেশ’ বইতে। চীন সফরের নাতিদীর্ঘ বিবরণ বই আকারে প্রকাশিত হওয়ার আগে “দৈনিক পাকিস্তান” পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।
সময়ের স্বল্পতায় লেখক চীনের যেটুকু দেখতে পেয়েছিলেন তাতে চীন সম্পর্কে যে একটি স্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করা সম্ভব নয়, একথা তিনি গ্রন্থের শুরুতেই স্বীকার করেছেন। চীন সম্পর্কে একটা সাধারণ ধারণার আলোকেই তাঁর ‘নতুন চীন নতুন দেশ’ গ্রন্থখানি লেখা। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালে।

দুই
পি কিং বিমান-বন্দরে প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন চেয়ারম্যান লিউ-শাশু-চি, প্রধানমন্ত্রী চৌ-এন-লাই, পররাষ্ট্র সচিব মার্শাল চেন-ই এবং চীনের অন্য নেতৃবৃন্দ। অভ্যর্থনা শেষে চীনা জাতীয় বাহিনীর একটি সজ্জিত দল আইয়ুব খানকে গার্ড অব অনার দেয়। একুশবার তোপধ্বনিসহ অসংখ্য ফেষ্টুন উড়িয়ে, ফুল ছিটিয়ে, দু’দেশের জাতীয় পতাকা দুলিয়ে চীনা তরুণ-তরুণীর এক বিশাল বাহিনী পাক-দলকে স্বাগত জানায়। এসময় তাদের কন্ঠে শ্লোগান ছিল ‘পাক-চীন মৈত্রী জিন্দাবাদ’। ‘প্রেসিডেন্ট আইয়ুব জিন্দাবাদ’।
অভ্যর্থনা শেষে গেষ্ট-হাউজে যাবার পথে, রাস্তার বাঁকে বাঁকে আইয়ুব খানের বড় বড় তৈলচিত্র এবং ‘পাক-চীন-মৈত্রী’ ও ‘আইয়ুব জিন্দাবাদের অসংখ্য দেয়ালচিত্র প্রতিনিধি দলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। লেখক রাস্তার দু’ধারে বহু পাতাবিহীন গাছ দেখতে পেয়েছিলেন। চীনে শীতের শুরুতেই গাছের সব পাতা ঝরে যায়। গ্রীস্মের শুরুতে আবার সব গাছেই নতুন পাতা গজায়।
চীনের ইতিহাস বিখ্যাত রাজধানী পিকিং। হাজার হাজার বছরের পুরোনো পিকিংকে দেখলে মনে হয় চির নতুন। বিপ্লবোত্তর চীনে সমগ্র জনতা জেগে উঠেছে সর্বত্র নতুন উদ্যমে। পিকিং এর বুকে দীর্ঘ তিনহাজার বছর ধরে চীনের বহু রাজবংশের উত্থান-পতন হয়েছে। এর সঠিক ইতিহাস বের করা কঠিন কাজ। তবে যেটুকু সম্ভব হয়েছে তাতে দেখা যায় খ্রীষ্ট্রের জন্মের আগে ইয়েন বংশ, সীন বংশ, হান বংশ পিকিং এ রাজধানী স্থাপন করে দেশ শাসন করেন।
পরবর্তীকালে পঞ্চম শতাব্দীতে ট্যাং বংশ, দশম শতাব্দীতে খিতান উপজাতির রাজবংশ, সুং রাজবংশ দ্বাদশ শতাব্দীতে সোনালী তাতার জাতি, এয়োদশ শতাব্দীতে মুঙ্গল রাজবংশ, চতুৰ্দশ শতকে মিং রাজবংশ চীন শাসন করেন।
১৬৪৪ সালে মাঞ্চু রাজবংশ, ১৯১১ সালে সাধারণতন্ত্র, ১৯৪৫ সালে চিয়াংকাইশেকের কো-মিন-ট্যাং সরকার চীন শাসনে নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীকালে ১৯৪৯ সালে মাও সে-তুঙ এর গণবিপ্লবের ভেতর দিয়ে চীনের প্রকৃত মুক্তি আসে।
২রা মার্চ সন্ধ্যায় পিকিং এর গ্রেট পিপলস্ হলে পাক প্রেসিডেন্টের সম্মানার্থে চেয়ারম্যান লিউ- শাউ-চি এক সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে প্রতিনিধিদল চীনের বিখ্যাত টিয়েন-আন-যেন স্কোয়ার, ইম্পিরিয়াল প্যালেস (মিংরাজাদের প্রতিষ্ঠিত রাজপুরী) ফরবিডেন সিটি প্রভৃতি দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে পেয়েছিলেন ।
শীত সিজনে পিকিং এ প্রচন্ড শীত অনুভূত হয়। মার্চ মাসেও সেখানকার রাস্তায় বেড়িয়ে হাড়ে কাঁপুনি ধরে গিয়েছিল পাকিস্তানীদের। তবে পার্টিপ্লেসে হিটার থাকায় কোন অসুবিধা হয়নি। সম্বর্ধনায় চেয়ারম্যান লিউ-শাও-চি এবং প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান উভয়েই পাক-চীন মৈত্রীর সাফল্য কামনা করেন।
সম্বর্ধনা শেষে রাজকীয় ভোজে ২৫ থেকে ৩০ প্রকার খাদ্যদ্রব্য পরিবেশন করা হয়েছিল। খাবার গ্রহণের সাথে সাথে পাকিস্তানীরা যাতে চীনাদের সাথে পরিচিত হতে পারে সেভাবে তাঁদের বসবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আইয়ুব খানের আগে আর কাউকে এত বড় সম্বর্ধনা দেয়া হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে চীনারা জানিয়েছিল তাদের অভ্যর্থনার ধরণটাই এরকম।
ভোজ শেষে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও চীনা চেয়ারম্যান একে অপরের স্বাস্থ্যপান উপলক্ষে বক্তৃতা দিয়ে সভার সমাপ্তি টেনেছিলেন। রাত প্রায় ১০টায় প্রতিনিধিদল গেষ্ট হাউজে ফিরে যান।
পরদিন সকালে পাক-দল গিয়েছিলেন বিপ্লবের মিউজিয়াম দেখতে। মিউজিয়ামে রাখা বিভিন্ন চিত্রে মূলত চীনের বিপ্লবকেই ধরে রাখা হয়েছে। চীনা জমিদারদের অত্যাচার, ইউরোপীয়দের আধিপত্য থেকে শুরু করে জাপানী আক্রমনের চিত্র, কৃষক বিদ্রোহ, ছাত্র আন্দোলন, বিপ্লবীদের গেরিলা যুদ্ধ, হাসিমুখে সংগ্রামী মানুষের আত্মদান, গণনেতা মাও সে-তুঙ, লিউ-শাউ-চি, চৌ এন-লাই প্রমুখের বীরত্বপূর্ণ অভিযান পরিচালনার দৃশ্যাবলী, শেষপর্যন্ত বিপ্লবীদের জয় ও গণচীন সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিরাট জন-সমাবেশ, মাও এর ঐতিহাসিক ঘোষণা- সব কাহিনী রং তুলির মাধ্যমে জীবন্ত করে রাখা হয়েছে।
মিউজিয়াম ঘুরে দেখার পর মিউজিয়াম কিউরেটর প্রেসিডেন্টকে ভিজিটর বুকে মন্তব্য লিখতে অনুরোধ জানালে তিনি লিখেছিলেন-
“চীনা জনসাধারণের স্বাধীনতা সংগ্রামের সুস্পষ্ট প্রতীকসমৃদ্ধ যাদুঘর পরিদর্শন আমার এক মহান অভিজ্ঞতা। বিচক্ষণ ও আত্মত্যাগী নেতাদের পরিচালনায় স্বাধীনতার জন্য জনসাধারণের আত্মত্যাগের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে আমি অভিভূত হয়েছি। এই ধরণের মানসিক শক্তিসম্পন্ন জাতি একটা নয়া ইতিহাস রচনা করবে, এই তো স্বাভাবিক।
মিউজিয়াম দেখে পিকিং এর বিরাট রেলওয়ে ষ্টেশন ঘুরে পাক-দল গিয়েছিলেন সেখানকার এক কাপড়ের দোকানে। দোকানটির নাম ফ্রেন্ডশীপ ষ্টোর। প্রায় সব শহরেই চীনারা বিদেশী অতিথিদের সস্তায় কাপড় সরবরাহ করার জন্য ফ্রেন্ডশীপ ষ্টোর খুলে রেখেছে। এসব ষ্টোরে নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেকেরও কম দামে কাপড় পাওয়া যায়।
বিকেলে প্রতিনিধিদল গেলেন ইম্পিরিয়াল প্যালেস দেখতে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে এটি নির্মিত হয়। মিং বংশের রাজারাই এসব প্রাসাদের নির্মাতা। প্রাসাদটির দুটো ভাগ আছে। একটি আউটার সিটি’ অপরটি ‘ইনার সিটি’। মিং রাজাদের এই প্যালেস নতুন চীনে যাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রাচীন শিল্প সম্পদ ছাড়াও ঐতিহাসিক বিচিত্র সম্পদও এখানে রাখা হয়েছে।
৪ঠা মার্চ প্রেসিডেন্ট ও তাঁর দল মাও সে-তুঙ এর সাথে দেখা করবার সুযোগ পান। গ্রেট পিপল্স হলে মাও সে-তুঙ প্রতিনিধিদলের সংগে সাক্ষাৎ করেছিলেন। পিপলস্ হলেই আইয়ুব খান চেয়ারম্যান মাও এর সংগে একান্ত বৈঠকে মিলিত হন।
প্রেসিডেন্ট বাদে প্রতিনিধিদল পিকিং এর বিখ্যাত কটন মিলটি ঘুরে দেখেন। মিলে বস্ত্র উৎপাদনে স্থানীয় তুলা ব্যবহার করা হয়। সেখানকার কিছু কিছু ডিজাইন তাদের মুগ্ধ করেছিল।
দুপুরে সাংবাদিক সমিতির ভোজে লেখক সাংবাদিকদের অবস্থা সম্বন্ধে জানতে চাইলে চীনারা জানিয়েছিলেন তারা আনন্দের সাথে এই পেশায় কাজ করেন। তারা সচ্ছল কারণ তারা বিলাসিতার কথা চিন্তা করেন না।
সন্ধ্যায় পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূত ভবনে প্রতিনিধিদল আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। রাষ্ট্রদূত মিঃ রাজা পাক দলের সম্মানে এক ডিনার পার্টির আয়োজন করেন। সেখানে দেশীয় ভোজ্যদ্রব্য পেয়ে তাঁরা সবাই আনন্দিত হয়েছিলেন।
৫ই মার্চ তাঁরা সামার প্যালেস দেখতে যান। লেখক ইম্পিরিয়াল প্যালেসের সাথে এর সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন। বড় হ্রদ, রাজৈশ্বর্য, বুদ্ধের বড় বড় মূর্তি এগুলো সামার প্যালেসের আকর্ষণ। চিত্র শিল্প ও ভাস্কর্য শিল্পে চীনারা অনেক উন্নত। কাঠের কারুকাজে তারা দক্ষ শিল্পী। সামার প্যালেসে প্রতিনিধিদল ঘড়ির প্রদর্শনীও দেখতে পেয়েছিলেন।
বিকেল ৩টায় প্রতিনিধিদলকে গ্রেট পিপলস্ হলে নাগরিকদের পক্ষ থেকে আবারও জন-সম্বর্ধনা দেয়া হয়। ৫ই মার্চ চৌ এন-লাই প্রদত্ত সান্ধ্য ভোজের বিশেষ আইটেম ছিল পিকিং ডাক। পিকিং ডাকের বিশেষত্ব হলো এটি শুধু খেতেই সুস্বাদু নয়, সুগন্ধযুক্তও। খাবার টেবিলে জ্বলন্ত চুলা এনে চীনারা অতিথিদের খাবার পরিবেশন করেছিল।
এটা চীনাদের বড় ভোজের একটা রেওয়াজ। ভোজপর্ব শেষে বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে পিকক ড্যান্স, লোটাস ড্যান্স, চীনা সঙ্গীত উল্লেখযোগ্য ছিল। জনৈক চীনা গায়ক একটি বাংলা গান গেয়ে শুনিয়েছিলেন। তাদের প্রদর্শিত গীতিনাট্যটি বাস্তব দৃশ্যের মতো মনে হয়েছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত । গীতিনাট্যটি দর্শক হৃদয়ে বিপুল জাতীয় উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল।
৬ই মার্চ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা চীনের মহাপ্রাচীর দেখতে যান। এ প্রাচীর সম্ভবত খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত হয়। হুন আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যই এ প্রাচীরের সৃষ্টি। এটাকে সাধারণভাবে মিং রাজাদের কাজ বলেই অভিহিত করা হয়। প্রাচীরটির উচ্চতা সর্বত্র সমান নয়। সফরকারীরা যেখান থেকে প্রাচীর- আরোহন শুরু করেন সেখানে প্রাচীরের উচ্চতা ১৯ থেকে ৩৯ ফিট। আর চওড়া ১৮ থেকে ৩২ ফিট। এর ভিত্তিভূমি প্রস্তরনির্মিত এবং উপরটা ইটের তৈরী। পিকিং থেকে মহাপ্রাচীরের দুরত্ব প্রায় ২৫ মাইল ।
প্রাচীর পরিদর্শন শেষে আন্ডার গ্রাউন্ড প্যালেস (মিং রাজাদের সমাধিভূমি) দেখতে যান তাঁরা। প্রাচীর থেকে প্যালেসের দূরত্বও প্রায় ২৫ মাইল। প্যালেসের পথে যেতে যেতে চারদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য লেখককে মুগ্ধ করেছিল সমাধিভূমিতে যাবার পথে প্রতিনিধিদল বিখ্যাত মার্কোপোলো ব্রীজটি দেখতে পেয়েছিলেন। মোঙ্গল সম্রাট কুবলাই খানের রাজত্বকালে (সময়কাল সম্ভবত দ্বাদশ শতাব্দী) ভেনিসের বিখ্যাত পরিব্রাজক মার্কোপোলো চীনে এসেছিলেন। তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে এই ব্রীজটি নির্মাণ করা হয়। পুলটির দৈর্ঘ্য ৮২০ ফিট এবং প্রস্থ ২৬ ফিট।

আন্ডার গ্রাউন্ড প্যালেস যে স্থানে অবস্থিত তাকে বলা হয় টিয়েন-শাও-শান। এর পেছনে রয়েছে পাহাড়। পঁচিশ মাইল জায়গা জুড়ে এই সমাধিভূমি বিস্তৃত। চৌদ্দজন মিং সম্রাটকে এখানে সমাহিত করা হয়েছে। ভেতরের ছোট বড় প্রাসাদগুলি মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব মিউজিয়ামে বহু শিল্প নিদর্শন রাখা হয়েছে। বিভিন্ন চিত্রকর্মের একটিতে লেখক দেখতে পেয়েছিলেন রাজা-রানী এবং তাদের সাথে বহু অনুচর-অনুচরীদের। গাইড লেখককে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন রাজা-রাণীর মৃত্যুর পর তাদের সাথে এইসব অনুচরদের জীবন্ত সমাহিত করা হয়েছে। এটাই ছিল রাজমহিমা প্রকাশের একটি বৈশিষ্ট্য।
সন্ধ্যা ৭টায় পিপলস হলে আইয়ুব খানের দেয়া বাঙ্কোয়েট অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন দেশের কয়েক হাজার অতিথিদের সাথে পাকিস্তানী ছাত্ররাও এসেছিল। তারা জানিয়েছিল চীনা ভাষা বেশ কঠিন। চীন- বাসের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তারা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিল। তাদের মাধ্যমে প্রতিনিধিদল জানতে পেরেছিলেন চীনা মুসলমানরা যারা বৃদ্ধ তাঁরাই ধর্মকর্ম পালন করেন। যুবকদের মধ্যে অনেকেই কম্যুনিজমের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। পাকিস্তানীদের প্রতি চীনের মনোভাব আগে তেমন সুবিধার ছিলনা তবে বর্তমানে তা পরিবর্তিত হয়েছে।
ভোজ সভায় প্রদত্ত ভাষণে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান চীনা আতিথেয়তা ও আন্তরিকতার প্রশংসা করেন। তিনি আরও বলেন চীনাজাতির মত পাকিস্তানীরাও সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরোধী এবং তাঁরাও এর উচ্ছেদ চায়।
৭ই মার্চ পাক-দল পিকিং ছেড়ে রওনা দেন হ্যাংচাও এর উদ্দেশ্যে। বিমানবন্দরে লিউ-শাও-চি সহ চীনা নেতৃবৃন্দ দলের প্রত্যেককেই কিছু কিছু উপহার দিয়ে বিদায় সম্বর্ধনা জানান। মিঃ ও মিসেস চৌ এন-লাই প্রতিনিধিদলের সহযাত্রী হয়েছিলেন।
চেকিয়ান প্রদেশের রাজধানী হ্যাংচাওকে চীনের কাশ্মীর বলা হয়। চীনে একটা প্রবাদ আছে : উপরে রয়েছে বেহেশত – স্বর্গ, আর নিচে আছে হ্যাংচাও আর সুচো। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও হ্যাংচাও এর রয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব। বহু প্যাগোডা, জাতীয় বীর ও কবিদের সমাধিস্তম্ভ, ঐতিহাসিক অট্টালিকা ঘিরে রেখেছে হ্যাংচাও নগরীকে। হ্যাংচাও এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হচ্ছে ওয়েষ্টলেক। ১২২৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত হ্যাংচাও সুং রাজবংশের রাজধানী ছিল। চীনের ‘রেশম রাজধানী’ নামেও হ্যাংচাও পরিচিত। এখানকার ‘গ্রীন-টি’র স্বাদ পৃথিবী খ্যাত ।
বিমান বন্দরে চেকিয়ান প্রদেশের গভর্ণর চৌ-চীয়েন সহ বহু গণ্যমান্য লোক এবং চীনা শিশুরা প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানিয়েছিল। সেখান থেকে তাঁরা এক সিল্ক কারখানায় যান। কারখানায় সূতা তৈরী থেকে শুরু করে সূতা নলীতে ও সানায় ভরা এবং কাপড় বুনানোর প্রক্রিয়া সবই তাঁরা দেখতে পেয়েছিলেন। রেশমের ওপর সূক্ষ কারুকাজ লেখককে মুগ্ধ করেছিল। প্রতিনিধিদলের অনেকেই এই রেশম বস্ত্র কিছু কিছু সংগ্রহ করেছিলেন।
হ্যাংচাও এসে লেখক চীনে প্রথম সবুজ দেখেছিলেন। এখানকার গাছপালাগুলো শুধু সবুজ নয় ফুলফল ভারাবনত। ওয়েষ্টলেকের সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছিল। সন্ধ্যায় চেকিয়ান প্রদেশের গভর্ণর প্রতিনিধিদলের সম্মানে এক ডিনার পার্টির আয়োজন করেন।
হ্যাংচাও থেকে বিদায় নিয়ে পাক-দল সাংহাই যান। সাংহাই চীনের বৃহৎনগরী এবং বাণিজ্যকেন্দ্র। রাজনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকেও চীনে পিকিং এর পরেই এর স্থান। ১৯৪৯ এর আগে সাংহাই ছিল সাম্রাজ্যবাদীদের চারণক্ষেত্র। গণচীন প্রতিষ্ঠার পর বিরুদ্ধশক্তির পদচারণা বন্ধ হয়ে যায় এবং সাংহাই হয়ে ওঠে চীনা জনসাধারণের একটি উন্নত কর্মক্ষেত্র। ভারী যন্ত্রপাতি নির্মাণ, এন্টিবায়োটিক ঔষধালয় তৈরী, বিভিন্ন দেশের সংগে বাণিজ্যিক সম্বন্ধ স্থাপন এবং উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায় সাংহাই।
শিল্প প্রদর্শনীতে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন ভারী মেশিন নির্মাণে চীনের স্থান বিশ্বে পঞ্চম। যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, পশ্চিম জার্মানী ও চেকোশ্লোভাকিয়ার পরেই এখন চীন। ক্ষুদ্র যন্ত্র শিল্প যেমন- রেডিও, টিভি, রিষ্টওয়াচ, এগুলোর মানও ভালো। বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি নির্মাণে চীনের অগ্রগতি ১৯৪৯ সালের বিপ্লবের পরেই শুরু হয়েছে। এক সময় যে সাংহাই কুখ্যাত জুয়ারীদের আন্তর্জাতিক আখড়ায় পরিণত হয়েছিল আজ তা বিশ্বের অন্যতম প্রমোদকেন্দ্র ; এখানে ১৬০টি সিনেমা হল ও ৫৪টি পার্ক আছে।
সাংহাই এর ফ্রেন্ডশীপ ষ্টোরে গিয়েছিলেন লেখক। বিরাট এই ফ্রেন্ডশীপ ষ্টোরটিতে সব ধরণের জিনিস পাওয়া যায়। বিদেশী মুদ্রা ভাঙ্গানোর জন্য সেখানে একটি ব্যাংক রয়েছে।
রাতে ডেপুটি মেয়রের ভোজ সভায় ভোজপর্ব শেষে যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি পরিবেশিত হয়েছিল তাতে দু’একটি বাংলাদেশী আইটেম ছিল।
৯ই মার্চ সন্ধ্যায় চীন থেকে বিদায় নিয়ে দেশে ফেরার পালা। বিদায়ের আগমুহূর্তে পাক দল সাংহাই এর একটি কমিউন দেখতে যান। চীনের অর্থনীতি মূলত কমিউনকে কেন্দ্র করেই উন্নত হয়েছে। পাঁচ হাজার পরিবার অধ্যুষিত গ্রাম নিয়ে এক একটি কমিউন গঠিত হয়েছে। কমিউনগুলোতে নারী-পুরুষসহ প্রতিটি অধিবাসীকে নিয়মিত কাজ করতে হয়।
চীনের শতকরা ৯৫ভাগ আবাদযোগ্য জমি রাষ্ট্রায়ত্ত বাকী পাঁচভাগ দেশের সবাইকে সমানভাগে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থায় সংগত কারণেই সেখানে ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ নেই। রাষ্ট্র প্রধান থেকে শুরু করে কৃষক পর্যন্ত সকলকেই পরিশ্রম করে বেঁচে থাকতে হয়। তবে কাজের শ্রেণীভেদ আছে। কিন্তু সে তারতম্য এমন কিছু নয় যার জন্য কেউ বেশী সম্পদের অধিকারী হতে পারেন আবার কেউ ভিখিরি বনে যেতে পারেন।
প্রতিনিধিদল কমিউনের এক সদস্যের বাড়ীতে গিয়েছিলেন। ছিমছাম পরিপাটি তিন কামরার একটি বাড়ী, বাড়ীটির সর্বত্রই পরিচ্ছন্নতার ছাপ তাঁদের ভালো লেগেছিল। তবে বিলাসবহুল আসবাব পত্র ঘরের কোথাও তাঁরা দেখতে পাননি।
সন্ধ্যার কিছু আগে এ্যায়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান প্রতিনিধিদল। স্বাগত জানানোর মত করেই বিদায় জানিয়েছিল চীনারা। দুপাশে সারিবদ্ধ জনতার বিদায় অভিবাদন গ্রহণ করতে গিয়ে মন একটু খারাপ হলো সবারই।
বিমান বন্দরে পৌঁছেও একই দৃশ্য। ফুল, ফেষ্টুন পতাকা নিয়ে ছোট বড় চীনা সমাবেশ; তারাও বিদায় ব্যাথায় আক্রান্ত।
প্লেনে ওঠার আগ মুহূর্তে চৌ এন-লাই পাক নেতৃবৃন্দের সাথে গ্রুপ ছবি তোলেন। ছবি তোলার পর প্রেসিডেন্টের গার্ড-অব-অনার শেষে ‘চীন পাকিস্তান বন্ধুত্ব স্থায়ী হোক’, ‘বিদায় প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান’ এই ধ্বনির মধ্যে দিয়ে প্রতিনিধিদল বিমানে আরোহন করেন। ৯ই মার্চ পাকিস্তান সময় রাত ৯টায় তাঁরা ঢাকায় এসে পৌঁছেন।

তিন
দেশে দেশে ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক। প্রত্যেকটি দেশেরই কিছু না কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে যা এক দেশকে অপর দেশ থেকে পৃথক করে দেয়। আবার সাদৃশ্যও থাকে অনেক দিক থেকে। সমাজতান্ত্রিক চীন ঘুরে লেখক সে দেশের কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এবং স্বদেশের সাথে তুলনায় চীনের মিল-অমিলের বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন।
প্রথমেই তাঁর চোখে পড়েছিল সে দেশের মানুষের কঠোর শৃঙ্খলার ব্যাপারটি। চীনের মাটিতে পা দিয়ে তিনি সেদেশের জনগণের দৃষ্টান্তমূলক শৃঙ্খলা ও ঐক্যবদ্ধতার চিত্র দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। লক্ষ লক্ষ জনতার ভীড়েও যে এরকম শান্তিপূর্ণ সুশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করতে পারে চীনে না এলে এ ধারণা তাঁর অজানাই থেকে যেতো। সেদেশের শৃঙ্খলা ও ঐক্যবদ্ধতার সাথে তিনি স্বদেশের বহু তফাৎ লক্ষ্য করেছেন।
অন্যত্র, এমনকি আমাদের দেশেও দেখেছি, বিদেশ থেকে কোন সুপ্রসিদ্ধ ব্যক্তি বা দল এলে তাঁর সম্বর্ধনার জন্য সমবেত জন-সমবায়ে যে দারুন বিশৃংখলার সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে অতিথিদের পথ করতে পুলিশের লাঠিবাজীর দরকার হয়েছে। কিন্তু চীনের কোনো শহরেই এই বিশৃংখলার চিহ্নমাত্রও আমাদের নজরে পড়ে নাই। আমাদের মনে হয়েছে, যে-জাতি শৃংখলা রক্ষায় এত যত্নশীল সে- জাতীর লৌহ কঠিন ঐক্যবদ্ধতা বাইরের কোন হামলায়ই ভাঙবার নয়- সে জাতির উন্নতি অবশ্যম্ভাবী।২
চীনারা বিদেশ থেকে আগত অতিথিদের যাবতীয় সুবিধার্থে কার্ড ব্যবহার করেন। কার্ডগুলোতে অতিথিদের নামের পাশে নির্ধারিত স্থানের নাম্বার; যেমন গাড়ীর নাম্বার, গেষ্ট হাউজের রুম নাম্বার, পার্টিপ্লেসের টেবিল নাম্বার ইত্যাদির নির্দেশ দেয়া থাকে। এতে মেহমানদের বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় না এবং কোন হৈ চৈ বা শৃংখলাভঙ্গের কোন ঘটনা ঘটেনা। নিজ দেশে এমন কোন সুব্যবস্থা লেখকের চোখে পড়েনি। যার ফলে কোন সভা সমিতি বা অনুষ্ঠানে ব্যাপক বিশৃংখল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
চীনের তিনটি শহর ঘুরে দেখবার সময় লক্ষ লক্ষ লোকের ভীড়ে কোথাও একটি ভিখারী তাঁর নজরে পড়েনি। চীন দেশ দারিদ্র্যমুক্ত দেশ। সেদেশের কর্তৃপক্ষ দেশের মানুষের খাওয়া পরা এবং স্বাস্থ্যরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অথচ পাকিস্তানে দারিদ্র্য জর্জরিত অনাহারক্লিষ্ট মানুষের চেহারা যত্রতত্র চোখে পড়ে।
অন্যত্র, এমনকি আমাদের দেশেও এ শ্রেণীর জন-সমবায়ে বহু কঙ্কালসার চেহারা ও মলিন মুখ অহরহই দেখতে পাওয়া যায়। ভিখারী ও রুগ্নব্যক্তিদেরকে দূরে সরিয়ে রাখবার সরকারী চেষ্টা সত্ত্বেও এই শ্রেণীর ব্যাপারে কঙ্কালসার রুগ্নব্যক্তিদের অস্তিত্ব একেবারে বিলুপ্ত করে দেয়া কোন অবস্থায় সম্ভবপর হয় না- রাস্তার এক জায়গায় না-এক জায়গায় তাদের অস্তিত্ব অনুভব করা যাবেই। ৩
বিপ্লবোত্তর চীনে কোন দুর্নীতি লেখকের চোখে পড়েনি। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন সেদেশের মানুষ এতটাই দুর্নীতি মুক্ত যে তারা দরজায় কোন ছিটকিনি ব্যবহার করেন না। দেশের সার্বিক উন্নতির সাথে সাথে মানুষগুলোর চরিত্রও বদলেছে আশ্চর্যজনকভাবে।
চীনের জনসাধারণের নৈতিক চরিত্র সম্পর্কে আমরা যতটা খোঁজ-খবর নিয়েছি তাতে জানতে পেরেছি, এদিক দিয়েও তাদের উন্নতি বিস্ময়কর। প্রথমতঃ চুরি একদম এদেশ থেকে উঠে গেছে বললেও চলে। অন্ততঃপক্ষে গত পাঁচ বৎসরের মধ্যে নাকি চীনের কোন স্থান থেকে কোনরূপ চুরির খবর পাওয়া যায় নাই।
দ্বিতীয়তঃ সাধারণ হত্যাকান্ডও নাকি চীনে একটা অতীতের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃতীয়তঃ অন্যান্য শ্রেণীর দুর্নীতির ব্যাপারও নাকি চীনে বিস্ময়কররূপে কমে গেছে। এই শ্রেণীর কোনরূপ দুর্নীতির ব্যাপার সংঘটিত হলে কমিউনের উপর তার বিচার ভার অর্পিত হয়। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই কমিউনের সালিশীতেই ব্যাপারটা মিটে যায়।
কুচিৎ কদাচিৎ তা কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। নারীঘটিত দুর্নীতির সংখ্যাও নাকি প্রায় শূন্যের কোঠায় গিয়ে পৌঁছেছে। ঘুষ খাওয়া-নেওয়ার দুর্নীতি সেখানে এখন এক অকল্পনীয় ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। এসব কথা পুরোপুরিভাবে সত্য কিনা, তা অবশ্যি আমাদের পক্ষে যাচাই করে দেখার উপায় ছিল না। তবে সেখানকার আবহাওয়া লক্ষ্য করে তা একেবারে অসত্য বলে উড়িয়ে দিতেও আমাদের ইচ্ছা হয় নাই। ৪
লেখক লক্ষ্য করেছিলেন চীনা নেতৃত্বে মাও সে-তুঙ এর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বেই চীন দেশ আজ সাফল্যের উচ্চ শিখরে পৌঁছতে পেরেছে। কমরেড মাও সে-তুঙ শুধু ত্যাগী পুরুষ নন, কর্মী পুরুষও বটে। সাধারণের সাথে মিলেমিশে সবসময় কাজ করেছেন তিনি। চীনা জনসাধারণের ওপর তাঁর প্রভাব সর্বব্যাপী। এজন্যই সর্বসাধারণ থেকে শুরু করে নেতামহলেও তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। চীনে নেতৃত্বের বিরোধ তাঁর চোখে পড়েনি কোথাও। সেদেশের নেতৃত্বের ঐক্যবন্ধতা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল।
চীনে নেতায় নেতায় মতান্তর হয়ত আছে। কিন্তু মনান্তর আছে বলে মনে হয় না। এই কারণেই সেখানে এযাবত নেতৃত্ব-বিরোধের আত্মপ্রকাশ দেখা যায় নাই। অন্য সব দেশে মিশর, সিরিয়া, কঙ্গো, আলজিরিয়া, এমনকি সোভিয়েট রাশিয়ায় পর্যন্ত এই নেতৃত্ব-বিরোধ দেশের রাজনীতিকে কলুষিত করতে পেরেছে- এমনকি এজন্য কত নেতাকে অসময়ে আত্মাহুতি পর্যন্ত দিতে হয়েছে ৫
চীন ঘুরে তিনি দেখেছেন প্রত্যেকটি চীনা নাগরিক ভদ্র ও বিনয়ী। তারা একে অপরের সাথে বিনয়ের সংগে কথা বলে। রাষ্ট্রপ্রধান থেকে সামান্য কৃষকও সেখানে সমমর্যাদা সম্পন্ন। শ্রেণী বৈষম্য চীনের কোথাও লেখকের নজরে পড়েনি। কাজের বিচারে বেতনের যা পার্থক্য তাতে কেউ রাজা বা কেউ ভিখারী বনে যেতে পারেনা। স্বদেশের কথায় তিনি বলেছেন ধনী দরিদ্র বৈষম্য পাকিস্তানে প্রকট।

চীনের আর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য; সে দেশের বিপ্লবোত্তর শাসন ব্যবস্থার চিত্র তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। ১৯৪৯ সালের বিপ্লব চীন দেশকে এক নতুন জীবন দান করেছে। চীনারা বিশ্বাস করে তাদের এই নতুন উদ্যমের মৃত্যু নেই। কারণ সেখানে রাখা হয়েছে উৎসাহপ্রদ শাসন। সেদেশের সমস্ত আবাদযোগ্য জমি রাষ্ট্রায়ত্ত না করে সরকার দেশের শতকরা পাঁচভাগ জমি জনসাধারণের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দিয়েছেন। এবং এটাই হচ্ছে চীনা জনজীবনে ইনসেনটিভ। নতুন শাসন ব্যবস্থায় বিগত দিনের অনাচার, অবিচার, কুসংস্কার সহ সমস্ত অন্ধকার দূর হয়ে সেখানে জন্ম নিয়েছে এক নতুন জীবনধারা।
চীনে অতিথিদের কেনাকাটার সুবিধার্থে যে ফ্রেন্ডশীপ স্টোর রয়েছে তা লেখকের মুগ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এ ধরনের ষ্টোরের ব্যবস্থা চীন ছাড়া আর কোথাও নেই। সে দেশের প্রায় সব শহরেই ফ্রেন্ডশীপ ষ্টোর খুলে রাখা হয়েছে। এতে বিদেশীদের পক্ষে আসলের চেয়ে অর্ধেকেরও কম দামে জিনিসপত্র কেনা সম্ভব হচ্ছে।
লেখক বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিলেন চীনারা প্রত্যেকেই তাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে, রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে বিলাসিতাকে বর্জন করেছেন। দেশের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্যে, দেশের প্রতিটি মানুষের আহার, কাপড়, বাসস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চীনা জনগণ নিজেদের সমস্ত শক্তি নিয়োগ করেন। কমিউন ব্যবস্থা তাদের উন্নয়নের একটি প্রধান ভিত্তি। কমিউন সম্পর্কে তিনি বলেছেন :
চীনের বাণিজ্য-কেন্দ্র ‘সাংহাই’ এর সাথে তিনি পাকিস্তানের করাচীর’ সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন :
করাচী যেমন সিন্ধুনদের তীরে, সাংহাই তেমনি ইয়াংসী নদীর তীরে অবস্থিত। করাচীর মতো সাংহাই ও শুধু বাণিজ্য কেন্দ্র নয়। এ একাধারে শিল্প ও সংস্কৃতি- কেন্দ্র এবং করাচীর মতো আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিমান-বন্দরও বটে। করাচী থেকে সাংহাই পর্যন্ত বিমানপথ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে পাকিস্তানের সাথে চীনের ঘনিষ্ঠতর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের পথ খোলাসা হয়েছে।
ভ্রমণকারীরা সবাই সরকারী দলের সদস্য ছিলেন; ফলে তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রিত ছিল। সময়ের স্বল্পতা এবং সার্বক্ষণিক পাহারার চোখ এড়িয়ে চীনের দেখা বিষয়গুলো সম্পর্কে একটা সাধারণ ধারণার বাইরে যাওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না।
তবে চীনাদের আন্তরিক আতিথেয়তা ও সেদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিশেষত্ব লেখকের মুগ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। প্রতিনিধিদল যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই তাদের আন্তরিক আতিথেয়তার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ তাদের চোখে পড়েছিল। এমনকি রাস্তায় কৌতূহলী জনতার ভীড়েও লেখক সবার চোখে মুখে একটা শ্রদ্ধা, প্রীতি ও সমীহের ভাব লক্ষ্য করেছিলেন। পিকিং এর সামার প্যালেস, আন্ডার গ্রাউন্ড প্যালেস, হ্যাংচাও, ওয়েষ্টলেক প্রভৃতির সৌন্দর্য লেখকের অন্তরপূর্ণ করেছিল।
চার
‘নতুন চীন নতুন দেশ ভ্রমণ কাহিনীতে লেখক চীন সম্পর্কে তাঁর মনোভাব সরল ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। সংক্ষিপ্ত সফরের টুকরো অভিজ্ঞতাগুলো তিনি ধারাবাহিকভাবে গেঁথে দিয়েছেন তাঁর রচনায়। চীনের যেটুকুই তিনি দেখতে পেয়েছিলেন সহজভাবে তার সম্ভব বিবরণ দিয়েছেন।
বলা বাহুল্য দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটি তাঁর নিজস্ব। যেখানে যেমন দেখেছেন, দৃশ্যপটগুলোকে সেভাবেই সাজাতে চেষ্টা করেছেন। ঘটনার পারম্পর্যের কারণে কিছু ইতিহাসের কথা কিছু তত্ত্বালোচনাও এসেছে। তবে সেসব কিছুকে কখনই কাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়নি ৷ নতুন চীনকে জানা ও বোঝার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এসব আলোচনা প্রাসঙ্গিকভাবেই এসেছে।
বর্ণনার বাস্তবতায় তিনি কল্পনার আশ্রয় নেননি বললেই চলে। বস্তুনিষ্ঠ বিশ্বস্ত বর্ণনা দেবার প্রয়াস তাঁর রচনাশৈলীর বৈশিষ্ট্য। তবে তাঁর রচনাসৈৗষ্ঠব নিরাভরণ নয়। অলংকারবহুল না হলেও তা অলংকার সমৃদ্ধ । ছোট ছোট বাক্যে তাঁর প্রকাশের ব্যাপ্তি প্রায়শই বহু বিস্তৃত। মাত্র আট দিনের সফরে চীনের মতো বিশাল ভূখন্ড পরিদর্শন যে একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার তা তিনি একটি সুন্দর উপমার সাহায্যে সহজ করে বুঝিয়েছেন।
মাত্র এই আটদিনে মহাচীনের মতো বিশাল ভূখন্ড পরিদর্শন অন্ধের হস্তিদর্শনের মতোই হাস্যকর ব্যাপার। ৮
এই একটিমাত্র বাক্যে তিনি অনেকটাই বলে ফেলেছেন চীন সফরের সীমাবদ্ধতার কথা।
সফর অভিজ্ঞতার শুরুতেই তিনি চীনের বৈশিষ্ট্যগুলোর একটা সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিয়েছেন এবং এই গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোকে ছোট ছোট শিরোনামের আওতায় এনে পাঠকের চোখে বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। “শৃঙ্খলা”, “সন্তোষ’, নৈতিক চরিত্র’, ‘চীনা নেতৃত্ব’, ‘শাসন ব্যবস্থা’, ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য চীন সম্পর্কে একটা সামগ্রিক ধারণার জন্ম দিয়েছে; যা শুধু প্রয়োজনীয় নয় জরুরীও বটে। চীনাদের বিপুল সম্বর্ধনা দেবার চিত্রগুলোকে তিনি জীবন্ত করে তুলেছেন কাহিনীতে।
দৃষ্টিনন্দন চীনা সম্বর্ধনার বর্ণনায় তাঁর লেখনী হয়ে উঠেছে হৃদয়গ্রাহী। আর সে চিত্র একই সংগে সেদেশের মানুষ এবং তাদের শৈল্পিক বোধকে যেমন ধারণ করে তেমনি তা লেখকের শিল্প জ্ঞান ও কলা নৈপুন্য বিচারের ক্ষমতাকেও অনাবৃত করে। তাঁর বর্ণনা যেমন স্বাভাবিক ভঙ্গির সারল্যে স্বতোৎসারিত তেমনি চীনা জনগণের আনন্দ অভিব্যক্তিগুলোও লৌকিকতা বিবর্জিত।

সম্বর্ধনার সে কি বিচিত্র মনোরম দৃশ্য। সুশৃঙ্খল জনতার লাইন থেকে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর দলবলের উপর এবং তাঁদের চলার পথে পুষ্পবৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। পাক-চীন যুক্ত পতাকা দুলিয়ে চীনা ভাষায় পাক-চীন মৈত্রী জিন্দাবাদ’, ‘প্রেসিডেন্ট আইয়ুব জিন্দাবাদ’ ধ্বনি উচ্চারণ করে বিমান বন্দরের বিরাট প্রাঙ্গন তারা মুখরিত করে তুলল। এমন হর্ষোৎফুর আনন্দমুখর সম্বর্ধনারত স্বাস্থ্যসুন্দর তরুণ তরুনীর জনতা আর কোথাও প্রত্যক্ষ করা গেছে বলে আমার জানা নাই ।৯
কোথাও কোথাও লেখকের রচনাশৈলী কিছুটা দুর্বল মনে হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বর্ণনার ব্যবহার গ্রন্থের সাহিত্যমূল্য কমিয়েছে। “বাথরুমে ঢোকা”, “দাড়ি কামানো” স্নানাদির মতো মামুলী ব্যাপারগুলো বারবার এসেছে তাঁর রচনায়- যা ক্লান্তিকর মনে হয়েছে। তবে চীনের স্থাপত্য সৌন্দর্যের বর্ণনায় লেখকের মুগ্ধতার প্রকাশ পাঠক হৃদয়কে আকৃষ্ট করে। সামার প্যালেসের বর্ণনায় তিনি বলেছেন-
সামার প্যালেসকে সৌন্দর্যের লীলাভূমি বলে অভিহিত করলে অত্যুক্তি করা হয় না। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে মানুষের তৈরী সৌন্দর্যের সমন্বয়ের ফল সামার প্যালেস। বিশাল হ্রদের কথা আগেই বলা হয়েছে। প্রাসাদ থেকে সেই হ্রদ পর্যন্ত যে বাঁধানো করিডোর নির্মাণ করা হয়েছে, তার দৈর্ঘ্য কয়েক হাজার গজের কম হবে না। দেখতে সত্যিই ছবির মতো। প্যালেসের পেছন দিকটা এক পাহাড় দিয়ে ঘেরা।
একস্থানে পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে চারিদিকে প্রাসাদ ঘেরা এক সরোবর। সরোবরটির পানি জমে গিয়ে বরফ হয়ে গেছে। মনে হয়, সরোবরের চারদিক ঘেরা খোলা প্রাসাদগুলিতে বসে রাজপরিবারের লোকেরা বিকেলের দিকে হাওয়া খেতেন এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতেন। এ দেখে দিল্লীর লালদুর্গের (Red Fort) মা’ই শাওন ও ভাদরে’র কথা মনে পড়ল।১০
সামার প্যালেস ছাড়াও হ্যাংচাও, ওয়েষ্ট লেক, আন্ডার গ্রাউন্ড প্যালেস, ইম্পিরিয়াল প্যালেস প্রভৃতির সৌন্দর্য বর্ণনায় লেখকের সৌন্দর্য সচেতন হৃদয়ের প্রকাশ ঘটেছে। চীনের বিভিন্ন স্থানের নৈসর্গিক সৌন্দর্য বর্ণনায় তার হৃদয় হয়ে উঠেছে উচ্ছ্বসিত।
চলার পথে হ্যাংচাও এর প্রাকৃতিক দৃশ্য আমাদের মুগ্ধ করল। চীনে এসে এই প্রথম আমরা সবুজের দেখা পেলাম। এর গাছ-গাছড়া পাতা শুধু সবুজ নয়, ফুল ফলভারাবনত। তাছাড়া যে বিশাল হ্রদের পাশ দিয়ে রাস্তাটা গেষ্টহাউজ পর্যন্ত চলে গেছে, তার নাম ওয়েষ্ট লেক এবং তার সৌন্দর্য সত্যই নয়নাভিরাম। এর সৌন্দর্য আরো বেড়েছে এই কারণে যে, হ্রদবেষ্টনকরা রাস্তাটির পাশে সর্বত্র সবুজের সমারোহই শুধু নয়, গাছপালার ওপাশে আবার ক্ষুদ্র পাহাড়শ্রেণীও একটা নীল দাগের মতো প্রলম্বিত হয়ে রয়েছে। ফলে সবটা মিলিয়ে এক অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়েছে। ১১
অন্যান্য বর্ণনায় আর্থ-সামাজিক কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে পুরো চীনের একটি সামগ্রিক রূপ তিনি তাঁর রচনাশৈলীর নৈপুণ্যে তাঁর বইতে তুলে ধরেছেন। তাঁর সজাগবোধের স্বকীয়তায় পুরোনো চীন সহ নতুন চীনের নানা ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন, চীনের সাথে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনামূলক আলোচনা ও পৃথিবীর শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদের শোচনীয় পরাজয়ের নেপথ্যকথা এ ভ্রমণ কাহিনীতে স্থান পেয়েছে।
এ উপাত্তগুলো পাঠককূলকে দিয়েছে বহু অজানা তত্ত্বের সন্ধান। এছাড়াও চীনের সম্পূর্ণ ইতিহাস বর্ণনায় ও তাঁর নির্ভুল নির্দেশনায় লেখকের বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বের পরিচয় মেলে।
দীর্ঘ তিন হাজার বছর ধরে এই নগরীর বুকে চীনের কত রাজবংশের যে উত্থান ও পতন ঘটেছে, তার সঠিক ইতিহাস উদ্ধার করা এক দুরূহ কাজ। তবে যতটুকু ইতিহাস এ পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তাতে দেখা যায়, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ইয়েন বংশের রাজারাই সর্বপ্রথমে এখানে তাঁদের রাজধানী স্থাপন করেন। পরে ক্রমে সীন বংশ, হান বংশ এবং আবার ইয়েন রাজবংশ পিকিংয়ে রাজধানী স্থাপন করে দেশ শাসন করেন। এসব রাজবংশের কাল, মনে হয়, খ্রীষ্টজন্মের আগেই। ১২
খ্রীষ্টজন্মের আগে থেকে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজবংশের উত্থান পতন, ১৬৪৪ সনে চীনের কৃষক বিদ্রোহ, ১৯১১ সালে চীনে সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সর্বোপরী ১৯৪৯ সালে চীনের বিপ্লব ও চীনের মুক্তি সংক্রান্ত গোছানো তথ্য গ্রন্থটিতে রয়েছে যা চীনের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটা সম্পূর্ণ ও সাধারণ ধারণার জন্ম দিতে পারে।
‘নতুন চীন নতুন দেশ’ ভ্রমণ কাহিনী না হয়ে অনেকটাই ভ্রাম্যমানের রোজনামচা হয়েছে। এতে বিদেশের তথ্যগুলো ডাইরী আকারে প্রকাশ পেয়েছে। আট দিনের সফর অভিজ্ঞতাকে তিনি সরাসরি ধারাবাহিকভাবে দিনপঞ্জী আকারে প্রকাশ করেছেন। এখানে লেখক তাঁর অভিজ্ঞতাগুলোকে শুধু বর্ণনাকারে বুঝিয়ে বলেছেন তবে সৃষ্টি করে তুলতে পারেননি। সুতরাং এ বিচারে তাঁর এই ভ্রমণ কাহিনী যথার্থ সাহিত্য হয়ে উঠতে পারেনি।

তবে ভ্রমণবৃত্তান্তটির কোন কোন জায়গায় যেমন চীনাদের সম্বর্ধনার কথা বলতে গিয়ে, আবার সে দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনায় তাঁর মুগ্ধতার ভেতর যে ভাবের সঞ্চার হয়েছে তা সাহিত্যের লক্ষণাক্রান্ত ।
সিঁড়ি গিয়ে ঠেকেছে এক পাহাড় চূড়ায়; সেখানে রয়েছে একটি মন্দির নাম : জ্ঞানসাগর মন্দির। সেখানে উঠে চারদিকে চাইলে দর্শকের চোখে এক অপরূপ দৃশ্য ফুটে ওঠে। এর সামনের দিকে নজরে পড়ে বায়ুভরে মৃদু-আন্দোলিত হ্রদের সুবিস্তীর্ণ বারিরাশি; বামদিকে সমতল ভূমি ও পিকিং নগরীর বিচিত্র দৃশ্যাবলী এবং ডানদিকে দেখা যায় কুহেলিকাচ্ছন্ন পশ্চিম পাহাড়শ্রেণী। ১৩
শেষ কথায় সফরকালের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও লেখক আবুল কালাম শামসুদ্দীনের চীনকে জানবার আন্তরিক প্রচেষ্টার যে কোন অভাব ছিল না তা এ রচনায় স্পষ্ট। তাঁর এই সহৃদয় আন্তরিকতা তাঁর রচনাশৈলীকে অনেকটাই প্রাণবস্তু করেছে।