Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

ধর্মের নামে ভণ্ডামি

ধর্মের নামে ভণ্ডামি

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ ধর্মের নামে ভণ্ডামি। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ এর অন্তর্গত।

 

 

ধর্মের নামে ভণ্ডামি

ভণ্ডামির ওপরেই সদানন্দ দাঁড়িয়ে থাকে। সদানন্দ আর সাধারণ মানুষের মাঝখানে আড়াল করে দাঁড়িয়ে থাকে বিপিন। এখানে ব্যবধানটা অবতার ও মানুষের। কিন্তু সদানন্দ পাকা অভিনেতা। কত তুচ্ছ মানুষের কত তুচ্ছ পারিবারিক জীবনের কত তুচ্ছ খবর সে জানতে চায়। আগ্রহ দেখায় না, দুঃসংবাদে বিচলিত হয় না, সুসংবাদে খুশিও হয় না, নির্বিকার সহিষ্ণুতায় সকল কথা শোনে। মাধবীর কাছে এলে তার এই নির্বিকার ভাব অদৃশ্য হয়ে যায়। বিশালাকার সদানন্দ মাধবীকে বুকে তুলে নেয়, মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে

[…] হাড়-পাঁজর ভেঙে দেবার মতো আলিঙ্গন। পশুর দেহপিপাসা। এই হলো স্বামী সদানন্দ। প্রকাশ্যে প্রশান্ত ভাব, প্রসন্ন হাসি, স্বল্পবাক, ধর্মীয় উপদেশ ইত্যাদি অন্দরে এবং অন্তরে কুৎসিত পশু। ২৬

ধর্মের বর্ম পরে বিপিনও কম ভণ্ডামি করে না। সে বলে ভালো উদ্দেশ্যে একটু ভড়ং করলে, মিথ্যে কথা বললে কিছু হয় না। সে আরো বলে

“নারাণবাবু একটা মেয়েকে বার করে এনেছে তো আমাদের কী? আমরা আশ্রমে উঠতে দিলেও বার করে আনত মেয়েটাকে, না দিলেও বার করে আনত। আমরা শুধু এই সুযোগে আশ্রমের একটু উন্নতি করে নিচ্ছি।” ( ৩খ, পৃ. ২৮৬)

আবার আশ্রমে যারা থাকে তাদের মধ্যে অনেকে লোকদেখানো ধর্ম-কর্ম করে। আরো আছে জনসাতেক অন্ধ ভক্ত, তাদের ভক্তির বাড়াবাড়িতে সদানন্দ মাঝে মাঝে বিব্রত হয়। মাধবীকে সদানন্দ অন্দর মহলে রাখতে গেলে কেউ কেউ তাড়াতাড়ি সাধনভজন শেষ করে ফেলে, আবার কেউ কেউ আছে গুরুদেবকে দেখানোর জন্য আসন আঁকড়ে বসে থাকে

“গুরুদেব খোঁজ করিয়া জানিবেন, সকলে ইতিমধ্যেই আসন ছাড়িয়া উঠিয়া পড়িয়াছে কিন্তু তারা ধ্যানধারণায় এখনও মশগুল, গুরুদেবের আবির্ভাব পর্যন্ত টের পায় না এমন আত্মহারা।” ( ৩খ, পৃ.-২৮৮)

এদেরই আবার সদানন্দ ডেকে পাঠালে তারা দ্রুত সদানন্দের সামনে এসে হাজির হয়। ঈশ্বরকে ডাকার চেয়ে গুরুদেবের ডাক অনেক বড়। ‘অহিংসা’ উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অনন্য:

“মানিক-সাহিত্যের অন্যতম দুর্বোধ্য এবং বিকর্কিত উদাহরণ ‘অহিংসা’। [… … … . ধর্মের আড়ালে ভণ্ডামি, ব্যবসা, বৈষয়িকতা, ক্ষমতার লড়াই, গুপ্তহত্যা, অবদমিত যৌন আকাঙ্ক্ষার বিকার, প্রতিহত লালসার বীভৎস পৈশাচিক প্রতিহিংসা এবং সর্বোপরি এসবের অস্তিত্ব জেনেও মানুষের ধর্মমাদকে আসক্তি কত প্রবল-উপন্যাসের তাই বিষয়বস্তু। ২৭

 

 

সাধু-সন্ন্যাসীদের জোর এতো বেশি যে সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি সম্পর্কে মানুষকে বিভ্রান্ত করে, তাদের বিশ্বাসকে সন্দিহান করে দেয়। মহেশ চৌধুরিকে গ্রামের সকলে শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে, কিন্তু সদানন্দসহ আশ্রমে সকলে তাকে অবজ্ঞা করে, এতে গ্রামের মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দেয়:

“সর্বস্ব ত্যাগ করিতে পারে, জীবন বিসর্জন দিতে পারে, এত বড়ো ভক্তই যদি মহেশ চৌধুরি হয়, সদানন্দ তাকে আমল দেয় না কেন, কেন তাকে শিষ্য করে না? এই সমস্যা আজ বহুদিন সকলকে পীড়া দিতেছে, এ বিষয়ে নিজেদের মধ্যে তারা অনেক আলোচনা করিয়াছে, মনে মনে অনেক মাথা ঘামাইরাছে। কারো কারো মনে এ সন্দেহও জাগিয়াছে যে মানুষটা মহেশ চৌধুরি কি আসলে তবে ভালো নয়, তার নীতি ধর্ম ভক্তি নিষ্ঠা সব লোকদেখানো ভালোমানুষি?” ( ৩খ, পৃ.-৩০২)

সদানন্দ কতটা ভালো মানুষ, কতটা সাধু পুরুষ তার হিসেব কেউ নেয় না। সমাজে সাধু একটি ফাঁকির উপর দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। সাধু-সন্ন্যাসীর জীবন নিয়ে লোকে বিশ্লেষণ করে না বলে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। সদানন্দও তেমনি সাধু। তার কোনো ধর্মীয় ভিত্তি নেই, অলৌকিক ক্ষমতা নেই।

বিপিন তার নামে কিছু কল্পনাজগতের অবাস্তব প্রমাণ দেখিয়ে লোকের কাছে তাকে মহাপুরুষ দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সে যে মহাপুরুষ নয়, এর কোনো বাস্তব প্রমাণ যেন কেউ না পায় তার জন্য বিপিন সদানন্দকে লুকিয়ে রাখে। বিপিন সদানন্দকে বলে

“সবাই টিপটিপ করে প্রণাম করে আর তুই ভাবিস তোর জন্য প্রাণ দিতে সবাই ছটফট করছে। প্রাণ পাওয়া অত সহজ নয় রে! আমি তোকে ভড়ং শিখিয়েছি, সেই ভড়ং করে লোকের মনে তুই জন্মিয়েছিস একটা ভয়। তুই থাকিস একটা ধোঁয়ার আড়ালে, তোর সম্বন্ধে কেউ কিছু জানে না, সকলের সামনে মহাপুরুষের মতো চলিস ফিরিস, সবাই তাই তোকে মহাপুরুষ ভেবে রেখেছে।” ( ৩খ, পৃ.-৩৩৯)

আশ্রম গড়ে ওঠার ইতিহাসও অনেকটা এ রকম। সদানন্দ বিপিনের আশ্রম থেকে বিতাড়িত হয়ে মহেশ চৌধুরির বাড়ি আশ্রয় নিলে বিপিনের আশ্রমে লোকের যাতায়াত কমে যায়। মহেশ চৌধুরি একটি আশ্রম গড়ে তোলে। বাড়ির পাশে বাগানে সে চালাঘর তোলে। নতুন আশ্রমে দলে দলে লোক আসতে থাকে । তারা প্রথমে মহেশ চৌধুরির সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা শোনে, তারপর সদানন্দর বানী শোনে। দলে দলে সদানন্দর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে।

যে ধর্মীয় অনুভূতিতে সাধারণ জনগণের কাছে সদানন্দ সাধুপুরুষ, সেই অনুভূতি তার মধ্যে কতটুকু বলবৎ তা খুঁজে দেখার কেউ নেই। আসলে সদানন্দ নাস্তিক প্রকৃতির লোক। সে ঈশ্বর বিশ্বাস করে না। তার নিজের মনে অস্থিরতা এলে সে নিরুপায় হয়ে আসনে বসে নিজের জন্য। সে ঈশ্বরের কাছে দয়া চায় “তুমি তো জানো আমি স্বীকার করি না তুমি আছ, তবু যদি থাক, দয়া করো।” (৩খ, পৃ.-৩৫৮)

 

 

সে এও বলে যে কেন সে আজ ঈশ্বরকে মেনে নিচ্ছে, তাও নিশ্চিয়ই ঈশ্বর বলে কেউ থাকলে সে জানবে। বাস্তব জীবন এমনই জটিল। সমাজের সকলে যখন একজনকে অবতার হিসেবে মেনে নিচ্ছে তখন অবতার নিজেই ঈশ্বরে বিশ্বাসী নয়। কিন্তু ঈশ্বর সম্পর্কে মানুষের একটি দুর্বল দিক থাকায় সে সকলের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারে:

“ধর্ম বা সাধুদের জীবনযাত্রা বা আশ্রম পরিবেশ সম্পর্কে তাঁর মনোভাব আদৌ তেমন সশ্রদ্ধ নয়। বরং তার বিপরীতই। মানিকের সহজ বিজ্ঞানবোধ স্বাভাবিক কারণেই ধর্মের নামে ভণ্ডামি, কুসংস্কার, প্রথানুগত্য ইত্যাদিকে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যঙ্গে কটাক্ষে বিদ্ধ করেছে। ”২৮

মানিকের ‘দিবারাত্রির কাব্য’ ও ‘তেইশ বছর আগে পরে’ উপন্যাসেও এরূপ ধর্মীয় আশ্রমকে কটাক্ষ করতে দেখা যায়। মহেশ চৌধুরির আশ্রমে রাখ-ঢাক কম থাকায় সদানন্দ সম্পর্কে মানুষের ভয় ভাবটা দূর হয়ে যাচ্ছিল। এতে ভণ্ড সদানন্দ নিজের অস্তিত্ব নিয়ে বিচলিত হয়ে পরে। আবার বিপিনের আশ্রমে ফিরে গিয়ে সে তার হারানো অস্তিত্ব পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। একনজর সকলের দিকে তাকিয়েই সে সকলকে অপদার্থ ভাবতে শুরু করে

“সংস্কার-নাড়া দেওয়া ভয়ের ভিত্তিতেই হয়তো দেবতার সর্বোচ্চ আসন পাতা সম্ভব।” ( ৩খ, পৃ.-৩৬৭)

সদানন্দ যদিও ভণ্ডামি করে সকলকে প্রতারণা করে, কিন্তু নিজের মনে সে সুখ পায় না। এক অস্থির বোধ সর্বদা তাকে তাড়া করে। উপন্যাসের প্রথমে রাধাই নদীতে জল এলে সে অন্যমনস্ক হয়, মানসিকভাবে বিচলিত হয়, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খায়। আবার মহেশ চৌধুরির বাড়ি আশ্রম খোলার পর তার মনে হয় আস্তে আস্তে তার সম্মান কমে যাচ্ছে। সে সভায় কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গিয়ে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে মানুষের মন বুঝতে চায়। তার বুকের মধ্যে ধড়াস করে ওঠে

“কার সঙ্গে কীসের বাধ্যবাধকতায় সে আটক পড়িয়া গিয়াছে? দেহবাদী এইসব অপদার্থ মানুষ কেন তাকে সর্বদা ইঙ্গিত করিতেছে; আমরা কাপুরুষ, কিন্তু হে মহাপুরুষ, তোমার চেয়ে কত সুখেই আমরা বাঁচিয়া আছি।” ( ৩খ, পৃ.-৩৫৯)

সদানন্দ এভাবে নিজে থেকেই ভণ্ডামির শাস্তি পায়। সমালোচকের মন্তব্য: “অহিংসায় ধর্মের পেলবতার আড়ালে মানিক এক নিরালোক সমবেদনাহীন প্রেমহীন, পুরস্কার-শাস্তিহীন জগতের ছবি দেখালেন।২৯

 

 

সমাজে একশ্রেণির মানুষ আছে যারা সুযোগ পেলে কার্য হাসিল করে। মহেশের গ্রামের এক গরিব চাষি একদিন গরুকে মারছিল, সদানন্দ ছুটে গিয়ে তাকে এক ঘা লাগিয়ে দেয়, তারপর যেখানে মেরেছে সেখানে হাত বুলিয়ে দিয়ে আশ্রমে নিয়ে এসে মহেশকে একটা টাকা দিয়ে দিতে বলে। চাষিটি সুযোগ পেয়ে বলে:

“ মোটে একটা, আড্ডে?” ( ৩খ, পৃ. ৩৫৯)

এ রকম সদানন্দও সুযোগ পেয়ে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। আশ্রমে দাঙ্গার সময় বিভূতিকে বাঁচানোর বদলে তার মনে হয় মাধবীলতার একজনই মালিক আছে, সে বিভূতি। তখন তাকে আর বাঁচায় না। সুযোগ পেয়ে বিস্তৃতিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, এবং বিস্তৃতি মারা যায় । ‘অহিংসা’ সমাজজীবনে ধর্মীয় অনুভূতির চালচিত্র:

“আমাদের জীবনে ধর্মকে কেন্দ্র করে যে অনাচার এবং ভণ্ডামি গড়ে উঠেছে অহিংসা উপন্যাসে তার একটা চমৎকার বিবরণ আছে। …. ……. দূর-দূরান্তের নিরীহ সরল গ্রামের মানুষের ভক্তিপরায়ণতার এমন পরিহাসের কথা মানিকের পূর্বে কোন লেখক প্রকাশ করেন নি।

সমাজের একেবারে কেন্দ্রে ধর্মের অবস্থান। ভারতবর্ষ ধর্মে এতোটাই উন্মাদ যে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ বিভাগ পর্যন্ত হয়। তার আগেই মানিক এই ধর্মের বাড়াবাড়িকে কটাক্ষ করেছেন। ধর্মীয় অনুভূতির অন্ধতা সম্পর্কে পাঠককে অবহিত করেছেন।

Exit mobile version