Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান

ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ এর অন্তর্গত।

 

 

ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান

“জননী’তে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানের উল্লেখ আছে। বড়দিনের ছুটিতে রাখাল আর মন্দা শ্যামার বাড়িতে বেড়াতে আসে। উপন্যাসে দুর্গাপূজার উল্লেখ আছে। মোহিনী যষ্ঠীর দিন শ্বশুরবাড়ি আসে। সকলের অনুরোধে সে দশমীর দিন পর্যন্ত থাকে। আরো উল্লেখ আছে, এ সময় সুপ্রভার মেয়ের জামাই আসে নি, সে লক্ষ্মীপূজার পর আসবে।

উপন্যাসে পূজায় সকলে মিলে আনন্দ করার একটা রীতি চোখে পরে। এ উপন্যাসে সামাজিক অনুষ্ঠানেরও উল্লেখ আছে। বিধানের বিয়ে উপলক্ষে মন্দা বকুল কলকাতায় শ্যামার বাড়িতে আসে। বিয়েতে হইচই হয়, সে পরিচয়ও পাওয়া যায়। ‘জীবনের জটিলতা’য় শাস্তার শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান হয়।

শান্তা অপঘাতে মারা গেছে বলে শ্রাদ্ধটা বড় করে হয়। আবার নগেন আর লাবণ্যর বিয়ের অনুষ্ঠানের কার্ড আসে অনাথের নামে। এখানেও একটা সামাজিক অনুষ্ঠানের ইঙ্গিত আছে। ‘শহরতলী’তে জ্যোতির্ময়ের বউভাত একটি সামাজিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানটি অনেক আড়ম্বরের সঙ্গে হয়। অফিসের, পাড়ার, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন অনেক লোক নিমন্ত্রিত হয়ে আসে। উপন্যাসে আছে:

“জ্যোতির্ময়ের বাড়িতে লোক গিজগিজ করিতেছিল।” ( ৩খ, পৃ.-১২৬)

সত্যপ্রিয়র বাড়িতে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান লেগেই আছে। সত্যপ্রিয়র বাবার মাসিক ও বাৎসরিক শ্রাদ্ধ, মেয়ের বিয়ে ইত্যাদি। সত্যপ্রিয়র বাড়িতে নিমন্ত্রিতের সংখ্যাও বেশি, হইচইও বেশি। বাৎসরিক শ্রাদ্ধের সময় একদল দুপুরে আরেক দল রাত্রে নিমন্ত্রিত হয়। অফিসের লোকরা রাত্রে, খেতে আসে:

“সত্যপ্রিয়র প্রকাণ্ড বাড়ির প্রকাণ্ড হল, বড়ো বড়ো তিনটি ঘর আর উপর ও নীচের লম্বাচওড়া বারান্দায় নিমন্ত্রিতেরা সারি সারি বসিয়া গিয়াছে, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা ঝুলাইয়া স্ফটিকের জপমালা হাতে করিয়া খড়ম পায়ে সত্যপ্রিয় একে একটু হাসি, ওকে দুটি কথা দিয়া কৃতার্থ করিয়া বিনয় ও ভদ্রতা রক্ষা করিয়া বেড়াইতেছে।” (৩খ, পৃ.০১৫৬)

 

 

সত্যপ্রিয়র বাড়িতে কারখানার শ্রমিকদের নিমন্ত্রণ সম্পর্কে সুজিত ঘোষ বলেছেন:

“গ্রামীণ জীবনের ধারাবাহিকতার সঙ্গে সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতাও লুপ্ত হয় না বলে, সদ্য-সৃষ্ট শিল্পপতি দ্রুত অর্থবান হয়ে উঠলেও, তার বাড়ির উৎসব প্রভৃতিতে শ্রমিকদের নিমন্ত্রণও করে। ২৫

এই অনুষ্ঠানেও সত্যপ্রিয়র নিষ্ঠুরতা দেখা যায়। সে যশোদার ভাই হওয়ার অপরাধে নন্দকে অপমান-অপদস্থ করে। সে জ্যোতির্যয়ের পাশে থেকে নন্দকে তুলে নিয়ে একপাশে লাল ঘাসের মধ্যে সবুজ বাঘ আঁকা কার্পেটের আসনে বসানো হয়, সামনে রুপার ঝকঝকে রুপোর থালা দেওয়া হয়, সাধারণ থালার তিন গুণ তার আকার। সেই পরিস্থিতি সম্পর্কে লেখক বলেছেন:

ঘরের শ দেড়েক মানুষের কারও মুখে কথা নাই। জ্যোতির্ময়ের মুখ বিবর্ণ হইয়া গিয়াছে। বিহ্বল নন্দ এদিক-ওদিক তাকায়, মনে হয় বুঝি কাঁদিয়াই ফেলিবে।  (৩খ, পৃ.-১৫৭)

সত্যপ্রিয় তার সামনে কোনো প্রতিবন্ধকতা সহ্য করে না। যে কোনো বাধাকে অতিক্রম করতে সে বদ্ধপরিকর। তার মিলে ধর্মঘটের সঙ্গে যশোদা জড়িত বলে যশোদার ভাইয়ের ওপর সে প্রতিশোধ নেয়। তার খেয়ালেরও শেষ নেই। তাই শ্রাদ্ধের সময় সে মাঝে মাঝে কীর্তনের আয়োজন করে। নন্দকে অপমান করলেও একদিন শ্রাদ্ধে সে নন্দকে নিমন্ত্রণ করে কীর্তন গাওয়ার জন্য। তার বাড়িতে সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান হয় মেয়ের বিয়েতে।

মেয়ের বিয়ের সময় নানা অবস্থার নানা বয়সের লোকসমাগম ঘটে। বাঙালি বেশি অবাঙালিও আছে। ক্রমাগত গাড়ি এসে নিমন্ত্রিতদের নামিয়ে দিয়ে যায়। জমিদার, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, উকিল, ব্যারিস্টার, ডাক্তার। তিনজন মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীর পরে দুজন মন্ত্রী-তার একজন আবার অন্য প্রদেশের। তারপর কয়েকজন বোম্বাইওয়ালা, পাঞ্জাবি ও য়ুরোপীয় ব্যবসায়ী, তারপর দুজন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী।

 

 

বিয়ের জন্য মণ্ডপ তোলা হয় বাড়ির বাইরে, হোগলা দিয়ে, থামগুলো রঙিন কাগজ আর দেবদারু পাতায় ঢাকা, বাহিরের গাছগুলো লাল নীল আলোয় সাজানো, অনেকগুলো জোরালো আলোয় চারদিক ঝলমল করে, পান, সিগারেট আর শরবত বিতরণ করা হচ্ছে হরদম, মাঝে মাঝে গোলাপজলের পিচকারি দেওয়া হচ্ছে।

সত্যপ্রিয়র বাড়ির বিয়ের চিত্র এ রকম। এ উপন্যাসে আর যে সকল উৎসবের কথা পাওয়া যায় তা হলো, পাড়ার ছেলেরা “মডার্ন ক্লাব ও লাইব্রেরিতে উৎসব করে। যশোদার বাড়িতে দুটি বিয়ে হয়। সুধীর-কালো আর জগৎ-চাঁপার বিয়ে। উৎসব যদিও একটু অভদ্র রকমের, তবে খুব জমজমাট হয়:

“রাত বারোটার পর মতির তো জ্ঞানই রহিল না। যশোদাকে একাধারে কন্যাকর্তা ও বরকর্তার নারী-সংস্করণ হইয়া সমস্ত দায়িত্ব ঘাড়ে নিতে হইল বটে, আমোদ-আহ্লাদ সেও করিল না কম।” ( ৩খ, পৃ.-১৮৭)

আনন্দের কমতি নেই। নেশা জমে গেলে মতি একবার যশোদাকে জড়িয়ে ধরেছিল। হাঁক ছেড়ে যশোদা অন্যদিকে চলে গেলো, খানিক পরে একবাটি দুধ আর একটা চামচ এনে সকলের সামনে মতিকে শিশুর মতো কোলে শুইয়ে তিন চামচ দুধ খাইয়ে দিলো। বিয়েতে এক সন্ধ্যা সানাই বাজলো।

‘অহিংসার’ দুটি অনুষ্ঠানের উল্লেখ আছে। একটি বিভূতি আর মাধবীর বিয়ে, অন্যটি মহেশের আশ্রম উদ্বোধন। বিয়ের অনুষ্ঠানের বিষয়ে লেখক কোনো মন্তব্য করেন নি, তবে বিয়েতে বিপিন এসেছিল, সে উল্লেখ আছে। আশ্রমের উদ্বোধন উৎসবটা হলো খুব জমকালো

“শহর হইতে দু-চারজন নামকরা লোক আসিল, খবরের কাগজে বিস্তারিত বিবরণও বাহির হইল। বিপিনের আশ্রমে যারা সদানন্দের উপদেশ শুনিতে যাইত তারা সকলে তো আসিলই, কাছে ও দুরের আরো অনেক গ্রামের নারী-পুরুষ, ছেলেমেয়ের আবির্ভাবও ঘটিল। ভিড় হইল ছোটখাটো একটি মেলার মতো। তার উপর আবার ছিল কাঙালী ভোজের ব্যবস্থা। ” ( তখ, পৃ.-৩৫৫)

‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে রাজকুমারের বন্ধু ধীরেনের বিয়ের উল্লেখ আছে। অগ্রহায়ণ মাসে বিয়ের মৌসুম। রাজকুমার রাস্তায় চলতে গিয়ে দেখে:

“আলো আর দেবদারু পাতায় সাজানো তিনটি বাড়ি। হাতে শামিয়ানা, শানাই বাজিতেছে।” ( ৪খ, পৃ.-৫৩)

 

 

বিয়ের কনে সম্পর্কে সমাজে সাধারণ ধারণা হলো রং খুব ফর্সা হলে তাকে সুন্দরী বলে। ধীরেনের বউয়ের রং খুব ফর্স–ক্রিম, পাউডার, চন্দন আর ঘামে তার মুখ স্নিগ্ধ ও কোমল হয়েছে। বিয়েবাড়িতে অনেক লোকের ভিড়। আত্মীয়-বন্ধু সকলের উপস্থিতি।

বিয়েতে নতুন বউয়ের মুখ দেখে উপহার দেওয়া সামাজিক রীতি। জ্যোতির্ময়ের স্ত্রী অপরাজিতার মুখ দেখে সকলে উপহার দেয়। কেউ একটা বই, কেউ সিঁদুরের কৌটা। যশোদা একটা সস্তা শাড়ি বউয়ের হাতে দিলে অনেকে মনে করে বউকে যেন অপমান করলো। সত্যপ্রিয় বউয়ের মুখ দেখে মখমলে মোড়া নেকলেস দিয়ে।

গ্রামে দৈনন্দিন সামাজিক অনুষ্ঠানের মধ্যে সাধারণত গ্রামে সন্ধ্যার পর বৈঠক বসে। সারা দিনের কার্য সম্পন্ন করে মানুষ নিজেদের কথাবার্তা সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিতে এই রকম বৈঠকের আয়োজন করে। এবং এটা কারো না কারো বাড়ি আপনিই গড়ে ওঠে।

এ সকল বৈঠকে অনেক সময় পুঁথি পড়া হয়, অনেক সময় ধর্মগ্রন্থ পড়া হয়। ‘অহিংসা’ উপন্যাসে এরূপ বৈঠকের উল্লেখ আছে। সাতুনায় শ্রীধরের সম্পন্ন গৃহস্থলী, তার মস্ত সংসার। শ্রীধরের বয়স ষাটের কাছে। রামায়ণ-মহাভারত পাঠ করতে সে অদ্বিতীয়:

“ সুতাবাঁধা চশমা আঁটিয়া প্রতিদিন সন্ধ্যার পর বাড়িতে সে রামায়ণ মহাভারতের বাছা বাছা অংশ পাঠ করে, মাঝে মাঝে থামিয়া অতি সরল ও সহজবোধ্য কাহিনীর রসালো ব্যাখ্যা করিয়া শোনায়।” ( ৩খ, পৃ. ২৭৯)

এ সভায় ভদ্রলোক আসে না, চাষি-মজুর, তেলি-তাঁতি, কামার-কুমোর আসে। মানিক জীবনবাদী লেখক। বাস্তব জীবনই তিনি সাহিত্যে তুলে এনেছেন। বিভিন্ন উৎসব-পূজা- পার্বণ সমাজজীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। মানিক বিভিন্ন উপন্যাসে বিভিন্ন উৎসবের অবতারণা করে জীবনের অনুপুঙ্খ বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন।

Exit mobile version