“দেখে এলাম রাশিয়া” মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহ্হাবের রচিত একটি উল্লেখযোগ্য ভ্রমণকাহিনী, যা বাংলা সাহিত্যে রাশিয়া ভ্রমণের বিবরণকে সমৃদ্ধ করেছে। এই বইটিতে লেখক তার রাশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত প্রাণবন্তভাবে তুলে ধরেছেন, যেখানে তিনি সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার জীবন, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, শিল্প এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার নানা দিক অত্যন্ত মনোগ্রাহী ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। ওয়াহ্হাবের লেখনীতে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে সোভিয়েত সমাজের প্রগতিশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, যা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বইটি শুধু ভ্রমণ নয়, বরং এক সমাজতান্ত্রিক সমাজের মানুষের জীবনধারা ও আদর্শের এক জাগ্রত চিত্র, যা পাঠকদের মনে নতুন চিন্তার খোরাক যোগায়।

দেখে এলাম রাশিয়া । মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহ্হাব
সোভিয়েত সরকারের আমন্ত্রণে মাওলানা এম. এ. ওয়াহ্হাব বশিকপুরী ১৯৫৭ সালে পাকিস্তান ওলামা ডেলিগেশনের সদস্য হিসেবে রাশিয়া সফরে যান। সাত সদস্যের ডেলিগেশনে লেখক ছিলেন একমাত্র বাঙালী সদস্য। ডেপুটি লিডার ছিলেন মাওলানা রাগেব আহ্ছান। মুখ্যত সেদেশে মুসলমানদের প্রকৃত অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্যই পাকিস্তান থেকে এই প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
একমাসের সরকারী সফরে ওলামাদল সোভিয়েত রাশিয়ার বিভিন্ন জায়গাসহ ছয়টি মুসলিম প্রজাতন্ত্রের প্রায় সব কটিই ঘুরে দেখেন। সফর শেষে তাঁরা লন্ডনে যান। লন্ডন ঘুরে লেখক ইটালী ও বাগদাদ হয়ে দেশে ফিরে আসেন।
সোভিয়েত দেশেই তিনি তাঁর সফর অভিজ্ঞতাগুলোর রোজনামচা লিখে রেখেছিলেন। দেশে ফিরলে বন্ধুজন ও সুধীজনের পরামর্শে বিশেষত ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রফেসার জনাব নূরুল ইসলাম সাহেবের আগ্রহে তিনি বই লেখার কাজ শুরু করেন।
সোভিয়েত সরকারের নিমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে নিয়ন্ত্রিত গতিবিধির ভেতরও তাঁর সজাগ বোধের সাহসী প্রকাশ গ্রন্থটির মূল আকর্ষণ। রাশিয়ার মুসলিম সম্প্রদায় সহ সেদেশের যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয়ের সম্ভব ও সত্য বিবরণ লেখক তাঁর গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন। বইটির প্রকাশক ছাখাওয়াত হোসেন খান। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে ১৯৬১ সালে। ১৯৬৪ সালে এর দ্বিতীয় সংস্করণ হয়েছিল। পূর্বপাকিস্তানে রাশিয়া সম্পর্কে এটি প্রথম বই।
দুই
২৪শে জুন লেখক এসে নামেন করাচীর মাটিতে। সেখানে তিনদিন কাটিয়ে ২৭শে জুন ওলামাগ্রুপ রাশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাঁরা বিমান যোগে লাহোর ও রাওয়ালপিন্ডি হয়ে পেশোয়ারে নামেন। সেখানে স্থানীয় এডিশনাল কমিশনারের লাঞ্চ পার্টিতে যোগ দিয়ে বিকেলে মোটরযোগে জালালাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান।
রাত ১০টায় জালালাবাদ পৌঁছলে সেখানকার পাকিস্তানী ফরেন অফিসার মিঃ শের মোহাম্মদ খান এবং ডাইরেক্টার মোহাম্মদ আমান খান পাক দলকে অভ্যর্থনা জানান। ডিনার শেষে কিছুটা বিশ্রামের পর ভোর রাতের দিকে তাঁরা যাত্রা করেন কাবুলের পথে।
কাবুলের বন্ধুর পথে মোটরযোগে চলা দুঃসাধ্য না হলেও যে সহজ নয় এ ব্যাপারটি টের পেয়েছিলেন ওলামাদল। পথে যেতে যেতে সেখানকার রাস্তা তৈরীর কাজে পরিশ্রমী আগানদের দরিদ্র মুখ লেখকের চোখে পড়েছিল। পাথর কেটে কেটে তারা রাস্তা বানায়। কাবুল দরিয়া ছাড়া অন্যান্য পথ আরও দুর্গম।
দুপুরে কাবুল পৌঁছলে পাকিস্তান দূতাবাসের কর্মচারীরা প্রতিনিধিদলকে অভ্যর্থনা জানায়। তারা আফগানিস্তানে শহরের বাইরে বাদশা আমানউল্লার তৈরী দারুল আমান মেহমান থানায় অতিথিদের থাকবার ব্যবস্থা করেন। আগান অতিথিশালায় রাগের আহছান সহ লেখক জ্বর আক্রান্ত হয়ে পড়েন। রাগেব সাহেব মুক্তি পেলেও লেখককে অসুস্থতার জন্য বেশ কিছু প্রোগ্রাম বাতিল করতে হয়েছিল।
৩০শে জুন ওলামাদল এসে পৌঁছান তিরমীজ শরীফে। লেখকের গায়ে তখন ১০২ ডিগ্রী জ্বর। তিরমীজ বিমান বন্দরে অভ্যর্থনা জানাতে এসেছিলেন মাওলানা কাজী জিয়াউদ্দিন ও মাওলানা ইছমাইল মাখদুম। তিরমীজে বিশ্রাম নিয়ে বিমানে করে বেলা ১টার তাঁরা তাসখন্দ এসে পৌঁছান। বিমানবন্দরে সম্বর্ধনার দৃশ্যটি লেখকের ভালো লেগেছিল। মুসলিম ভ্রাতৃত্বের হৃদয় মিশ্রিত ভালোবাসা স্পর্শ করেছিল প্রতিনিধিদলের অন্তর।
কাজের দেশ রাশিয়ায় অলস জীবন যাপনের কোন অবকাশ নেই। কর্মমুখরতা সেদেশের সর্বত্রই চোখে পড়ে। প্রতিনিধিদল পহেলা জুলাই উজবেকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী আমিনজান এবনে আবদুল কাদের সাহেবের সংগে দেখা করেন এবং এ বৈঠকে সোভিয়েত দেশের ধর্ম বিষয়ক আলোচনাই বেশী প্রাধান্য পায়। শিক্ষামন্ত্রী সেদেশের শিক্ষা বিস্তারের ধারাগুলোও তাঁদের কাছে সবিস্তারে বর্ণনা করেন।
তাসখন্দ শহরের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল দেখতে গিয়েছিলেন ওলামাদল। শিশুদের শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ ও উন্নত পদ্ধতিগুলো তাদের মুগ্ধ করেছিল। সোভিয়েত দেশের প্রত্যেকটি শিশুই প্রকৃতির অবাধ মুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠে। শিশু মনের বিকাশ ও তাদের সকল চাহিদা পূরণে সেদেশের সরকার খুব মনোযোগী।

মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে প্রাকটিক্যালকেই সেদেশে বেশী প্রাধান্য দেয়া হয়। সমস্ত তথ্যাদি তারা ফিল্মে ভরে রাখে প্রয়োজনমত সুইচ টিপে পর্দায় দেখে ঝটপট শিখে ফিলে। বই এর পাশাপাশি তারা বর্ণিত বিষয়ের স্বরূপটিও দেখতে পায় বলে শিখতে পারার ব্যাপারটি শিক্ষার্থীদের কাছে সহজ হয়ে ওঠে, তবে সমাজতান্ত্রিক দেশের বৈশিষ্ট্য বস্তুবাদ ও নাস্তিকতা স্বীকার্য সত্য। শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ধর্ম শিক্ষার কোন ব্যবস্থা সেখানে নেই। ধর্মকে সেদেশে ব্যক্তিগত ব্যাপার হিসেবে রাখা হয়েছে।
সোভিয়েত দেশের ১৮টি প্রজাতন্ত্রে যার যার মাতৃভাষার মাধ্যমে একই বই পড়ানো হয়। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও পরীক্ষা পদ্ধতি সর্বত্রই এক। ছুটির দিনগুলো তারা বিশেষ বিশেষ জায়গা ঘুরে তাদের প্রয়োজনীয় এবং প্রকৃত শিক্ষা লাভ করে। কেবলি ঘুরে ফিরে নয়।
তাসখন্দের সাথে জড়িয়ে আছে বহু মুসলিম বাদশাহ্ আমির ওমরাহ, দরবেশ আউলিয়ার নাম। সেখানকার আল্লান মসজিদ দেখতে গিয়েছিলেন পাকদল। তাসখন্দ হোটেল থেকে ঐ মসজিদের দূরত্ব তিন মাইল। তাসখন্দকে খুব ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় শহর দুটো। একটি পুরোনো আমলের অপরটি আধুনিক। রুশরা প্রত্যেকেই কাজের মানুষ। আগামীকে সুন্দর করার স্বপ্ন তাদের সবার চোখে।
উজবেকিস্তানের মরুময় রুক্ষতা আর পাথর বালির শুষ্কতাকে তারা শ্রম দিয়ে ভরে তুলেছে সম্ভারে। রুশরা বিজ্ঞানকে সবচেয়ে বেশী প্রাধান্য দেয় তারপর কলা। তাসখন্দের চিরচিক শহর রসায়ন বিদ্যুৎ ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যায় উজবেকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে। কাঁচ, কৃষি যন্ত্রপাতি সহ নানারকমের শিল্প প্রতিষ্ঠান ও জলবিদ্যুৎ কারখানা চিরচিক শহরের সম্পদ ।
উজবেকিস্তানের মালিক শহরে রয়েছে বড় লোহার কারখানা। ভারী কৃষিজ যন্ত্রপাতি তৈরী হয় এখানে। এছাড়া উজবেকিস্তান প্রসিদ্ধি পেয়েছে ফল আর তুলোর দেশ হিসেবে। বিপ্লবের আগে শিল্প প্রযুক্তির দিক থেকে এই প্রজাতন্ত্র পিছিয়ে থাকলেও শিক্ষার ক্ষেত্রে মুসলিম ভাবধারার শিক্ষায় তারা শিক্ষিত ছিল। বহু মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠান ছিল। বিপ্লবের আগে উজবেকিস্তানে যেখানে কোন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না সেখানে আধুনিক উজবেকিস্তানে ৩৬টি উচ্চ শিক্ষায়তন তৈরী হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বিনোদনমূলক প্রতিষ্ঠান উজবেক প্রজাতন্ত্রকে অত্যাধুনিক করে তুলেছে।
আল্লান মসজিদে ঢুকে প্রতিনিধিদল বুঝতে পারেন ইসলামের প্রভাব পুষ্ট পাঁচশত বছরের পুরোনো তাসখন্দ থেকে এখনও ইসলামের আদর্শ একেবারেই মুছে যায়নি। বয়স্ক মুসলমানরা ইসলামী আদর্শে অনঢ়। উল্লেখ্য ‘আল্লান’ উজবেকিস্তানের সবচেয়ে বড় মসজিদ এবং ঐ মসজিদটিতে প্রচুর মুছল্লির ভীড় তাঁদের চোখে পড়েছিল। প্রতিনিধিদল উজবেক অধিবাসীদের সাথে পাঞ্জাবীদের চেহারায় সামঞ্জস্য খুঁজে পেয়েছিলেন।
সন্ধ্যায় তাঁরা তুর্কী কবি দার্শনিক আলাশীর নাভোইয়ের নামে নির্মিত আলীশীর নাভোই রোড, রঙ্গমঞ্চ, পাঠাগার প্রভৃতি দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শন করেন। আলীশী নাভোই পাঠাগার পূর্ব তুর্কীস্তানের সবচেয়ে বড় পাঠাগার। বহু দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ এই পাঠাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। খলিফা ওসমান (রাঃ) এর হাতে লেখা এক কপি কোর-আন শরীফ পাঠাগারের মূল্যবান সম্পদ। রাতে লেনিন রোড, কালমার্কস রোড প্রভৃতি ঘুরে তাঁরা হোটেলে ফিরে যান ।
কাজাকিস্তান ও মধ্য এশিয়ার ধর্মীয় বোর্ডের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট কাজী জিয়াউদ্দীন সাহেবের মা ওলামাদলকে তার বাসভবনে আমন্ত্রণ জানান। প্রচুর আয়োজন করেছিলেন তিনি। ভোজ শেষে দলের প্রত্যেককে উপহারও দিয়েছিলেন।
মির্জা মোহাম্মদ ইউসুফ সাহেবের মসজিদ নামে পরিচিত তাসখন্দের অপর একটি মসজিদে পাকদল যান এবং তাঁদের শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন। মসজিদ পরিদর্শন শেষে তাঁরা তাসখন্দ মিউজিয়াম ঘুরে দেখেন। খলিফা ওসমান (রাঃ) এর রক্তমাখা কোরান শরীফ এ মিউজিয়ামে রাখা হয়েছে।
এছাড়াও মিউজিয়ামে রয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর সাক্ষ্য বহনকারী দুষ্প্রাপ্য সব নিদর্শন। গাছের পাতায় লেখা পান্ডুলিপি থেকে শুরু করে অষ্টম ও নবম শতাব্দীর আরবী গ্রন্থ, তুর্কী, তাজিক ভাষার গ্রন্থ, আরব বীরদের বর্ম, তরবারী, শিরস্ত্রাণ, লৌহ নির্মিত দেহাচ্ছাদন, তীর, বর্শা, বিভিন্ন যুদ্ধের সাজ, অলঙ্কার, মুল্যবান পাথর, ছবি যা মিউজিয়ামের উপযোগিতা বৃদ্ধি করেছে।
পুরো একটি সপ্তাহ তাসখন্দ ঘুরে তাঁরা এশিয়ার স্থাপত্য শিল্পের মিউজিয়াম সমরকান্দ এ আসেন। এরোড্রামে হাজার হাজার মুসলমান আগত অতিথিদের শুভেচ্ছা জানান। সমরকান্দের পরিবেশ লেখকের ভালো লেগেছিল। মুসলিম গৌরবের ইতিহাস প্রসিদ্ধ সমরকান্দে এসে ইমাম বোখারীকে প্রথমেই মনে পড়ে। সেই সংগে মনে পড়ে বিগত ইতিহাস। তৈমুরলঙ্গের পৃথিবী জয়ের স্বপ্নসহ বিশ্ব শক্তির প্রকৃত রূপ। সমরকান্দে প্রতিনিধিদল তৈমুরের সমাধিসহ ওবায়দুল্লা আরার মাজার, মসজিদ, খাজা জুদ মোরাদ মোহাম্মদ ইবনে মিরজা কোলান,মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লা হিল কোরায়শী এবং আরও অনেকের কবর জেয়ারত করেন।
৮ই জুলাই তাঁরা যান তৈমুরলঙ্গের তৈরী মাদ্রাসা শেরদরে। ১৭শ শতাব্দীর স্থাপত্যশিল্প এটি। মূল ফটকের সাথে তাজমহলের সাদৃশ্য দেখতে পান লেখক। কারুশিল্পের নিদর্শন এই মাদ্রাসাটির অনেকখানি ভেঙ্গে যেটুকু দাঁড়িয়ে আছে সেখানেও লেখাপড়া হয় না। ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ সেদেশে নেই। স্বর্ণের তৈরী মাদ্রাসা জাবিয়া দেখেছিলেন প্রতিনিধিদল। জাহবিয়ার সোনাগুলো তুলে সরকারী হেফাজতে রাখা হয়েছে। মাদ্রাসা দেখে তাঁরা তৈমুর পুত্র শাহরুখ ও ওস্তাদ মীর তাবাররকের কবর জেয়ারত করেন।
ইমাম বোখারীর মাজার সমরকান্দের গৌরব। বোখারীর একনিষ্ঠতা ইসলামের ইতিহাসকে করেছে উন্নত। ধর্ম প্রচারে এই নির্ভীক ইমাম বোখারার আমির কর্তৃক নির্বাসিত হয়েছিলেন। তবে তাঁর মরদেহ সমরকান্দের মাটিতে ফিরিয়ে আনা হয়। নিতান্ত সাধারণ এই মাজারটি প্রতিনিধিদল পরিদর্শন করেন। সমরকান্দ শহরকে খুব ভালভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় সেখানকার মসজিদ মাদ্রাসাগুলো প্রায় সবই ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। এগুলো সংস্কারে সেদেশের সরকারের খুব একটা আগ্রহ নেই।

সোভিয়েত ইউনিয়নের মুসলিম সম্প্রদায় চারটি ধর্মসংস্থার মাধ্যমে তাদের ধর্মীয় কার্যকলাপগুলো চালিয়ে নেয়। রাশিয়ায় বস্তুবাদীদের প্রাধান্য সর্বত্রই চোখে পড়ে। মুসলমানদের অবস্থা আফ্রিকার কালো মানুষদের মতোই।
তাসখন্দের মাটিতে প্রতিনিধিদল ঈদ উদযাপন করেন অনেক আনন্দ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে। ঈদের জামায়েতে প্রায় ২৭/২৮ হাজার মুছল্লির উপস্থিতি ওলামাদলকে অবাক করেছিল। ঈদের দিনে পার্লামেন্ট হাউজে এক ভোজ সভায় তাঁরা আমন্ত্রিত হন। সেখানে পার্টি লিডার মাওলানা বদাউনি সাহেব তাঁর বক্তব্যে সোভিয়েত দেশের উল্লেখযোগ্য উন্নতির সাথে সাথে ইসলামী ভাবধারার চরম অবনতির দিকটি স্পষ্ট করেন।
সোভিয়েত দেশে ঈদের দিনে কোন সরকারী ছুটি নেই। তবে কাজে হাজিরা দেবার জন্যও কোন বাধ্যবাধকতা নেই। সেদেশে মুসলিম কৃষ্টিগুলো প্রায় সবই বিলুপ্তির পথে গেছে। মুসলমানদের সংখ্যাও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। জারের পক্ষ হয়ে বিপ্লবীদের বিপক্ষে দাঁড়ানোর অপরাধে মুসলিম সম্প্রদায়ের এই সংকটাপন্ন অবস্থা। বিপ্লবের পরে মুসলিমরা নানাভাবে কমিউনিষ্টদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে এবং ধর্মত্যাগ করেছে। আর সে কারণেই রাশিয়ার ইসলামী অনুষ্ঠানগুলোতে এবং ইসলাম ধর্ম অনুরাগীদের মধ্যে বৃদ্ধদের সংখ্যাই চোখে পড়ে বেশী। কমিউনিষ্ট ছাড়া বাকীরা প্রায় সবাই অবহেলিত সেখানে।
পার্লামেন্ট হাউজ থেকে ফিরে তাজিকিস্তান সফরে যান প্রতিনিধিদল। ফুলে ফুলে ভরা সবুজ তাজিকিস্তানেও মুসলিম সম্প্রদায়ের ঐ একই অবস্থা দেখতে পাওয়া যায়। কমিউনিষ্টদের ধর্ম বিরোধী মনোভাবে ইসলামী আদর্শ কক্ষচ্যুত হয়েছে। তবে সেখানকার মুসলিম মেয়েরা পর্দা প্রথা না মানলেও চালচলনে অনেকটাই সংযত। তাজিকিস্তানে মসজিদের অস্তিত্বও কিছুটা চোখে পড়ে।
ঐদিনই তাঁরা পার্লামেন্ট ভবনে নামকরা ব্যক্তিত্ব জনাব নাজের শাহ্ দাদ খোদাইউবের সংগে দেখা করেন। সেখানে কাশ্মীর ইস্যু থেকে শুরু করে সোভিয়েত সরকারের মৌলিক নীতি, আফ্রো-এশিয়ান বান্দুং সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। প্রতিনিধিদল উপস্থিত মন্ত্রীদের কাশ্মীরের আজাদীর জন্য তাদের সরকারের কাছে জোর দাবী জানানোর পরামর্শ দেন। তাঁরা স্বতন্ত্র রাষ্ট্র উজবেকিস্তানে দূতাবাস অফিস প্রতিষ্ঠাসহ মুসলমানদের অবস্থার উন্নতির আহ্বান জানান।
১০ই জুলাই ওলামাদল বিখ্যাত লেখক ছদরউদ্দিন আইনি সহ কবি ফেরদৌসির নামে প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরী পরিদর্শন করেন। সময়ের সীমাবদ্ধতার জন্য তাঁরা লাইব্রেরীর প্রতিটি বিভাগ ঘুরে দেখবার সুযোগ না পাওয়ায় অতৃপ্ত মন নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ষ্টালিনবাদের দর্শনীয় স্থান লেনিন ফারমের উদ্দেশ্যে।
১৯৩০ সালে ফারমটি স্থাপিত হয়। কৃষিজ ফলন প্রক্রিয়ার এটি একটি উন্নত মিউজিয়াম। ৬১৫ হেক্টর জমি নিয়ে লেনিন ফারম স্থাপিত হলেও পরে এটা বেড়ে ৯৮৮০ হেক্টরে এসে দাঁড়ায়। বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে পুরো দেশটাই সবুজ সচেতনতায় ভরেছে। হয়ে উঠেছে চোখে পড়বার মত সমৃদ্ধ। লেনিন ফারমে মসজিদও রয়েছে। এছাড়া স্টালিনবাদে ঈদের ছুটিরও রেওয়াজ আছে। ‘করিয়া কুকতাস’ নামের এক গ্রামে গিয়ে তাঁরা দেখেছেন অন্য ছবি।
বিবর্ণ রাস্তাঘাট, পানির অভাব, দারিদ্র্য আক্রান্ত অসুখী মানুষ যারা জীবন ধারণের সুস্থতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তবে সেখানকার অধিবাসীরা গোঁড়া মুসলমান এবং তারা পর্দা করে। এরপর তাঁরা ষ্টালিনবাদের কাজী আবদুল মজিদ খানের বাড়ীতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করে তাসখন্দ ছেড়ে বিকেলে মস্কোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান।
তাসখন্দ ছেড়ে মস্কো যাবার পথে দু’সপ্তাহের কিছু বেশী সময়ের সফরের অভিজ্ঞতাগুলো লেখকের মনের আয়নায় ছায়া ফেলছিল। তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, সমরকান্দ, তাসখন্দ, বোখারা প্রভৃতির যেখানেই তিনি গিয়েছেন চোখে পড়েছে অগ্রগতির পাশাপাশি দীনতার ছবি। বিশেষ করে মুসলিম সংস্কৃতি ও কৃষ্টিগুলোর অবনতি তাঁকে আহত করেছে।
বস্তুবাদীদের মৌলিকনীতি সমস্ত দেশ ও জাতির স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য; এই মূল কথার মধ্যে তিনি বহু ফাঁক লক্ষ্য করেছেন। কাশ্মীর জটিলতা তার মধ্যে একটি। তাছাড়া উজবেকিস্তান রিপাবলিক স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও সেখানে কোন পাকিস্তানী দূতাবাস নেই এবং যে রাষ্ট্র জাতিসংঘের সদস্য হবার ক্ষমতা রাখে তা বাস্তবায়নের কোন ব্যবস্থাও সেখানে রাখা হয়নি। গ্রামীন মুসলমানদের অবস্থা খুবই খারাপ।
বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার এ চিত্র প্রকারান্তরে বৈষম্যেরই নামান্তর। শহুরে জীবনের সাথে গ্রামীন জীবনের চিত্র মেলে না কিছুতেই। অথচ সাম্যবাদের দেশে এমনটি হবার কথা নয়। সময়ের সীমাবদ্ধতা ও সরকারী নিয়ন্ত্রণের সাবধানী চোখ এড়িয়ে আরও গভীরে যাওয়া সম্ভব ছিল না বলে প্রতিনিধিদলকে অনেককিছুই অজানা ও অদেখা অবস্থায় ফেলে আসতে হয়। তাই স্বল্প সময়, পাহাড়ার চোখ, নানা প্রতিবন্ধকতা ডিঙ্গিয়ে যেটুকু ধরা পড়েছে তাতে লেখকের মনে হয়েছে রাশিয়ান সাম্যবাদ শুধুই প্রপাগাণ্ডা মাত্র। সরকার নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রয়েছে কৌশলের শাসন।
বিভিন্ন কলা-কৌশল প্রয়োগ করে তারা সেদেশ থেকে মুসলমানদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ প্রক্রিয়াগত এই শাসন ব্যবস্থায় শুধু মাত্র ধর্মপ্রাণ মুসলিম সম্প্রদায় জীবনধারণের ন্যূনতম চাহিদা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের সর্বস্ব বাজেয়াপ্ত করেছে সরকার। যারা প্রতিবাদ করছে তাদের সরাসরি প্রাণদণ্ড দেয়া হচ্ছে। তাই মুসলিম সম্প্রদায় বাধ্য হচ্ছে ধর্মত্যাগে এবং বিপথে চলতে। কিন্তু ধর্মত্যাগী হয়েও কোরান-মসজিদ বাদ দিয়েও তারা কমিউনিষ্টদের পায়ের নিচেই থেকে যাচ্ছে। এ যেন বর্গী শাসনের চেয়েও কোন ভয়াবহ শাসন মুসলমানদের পক্ষে।
মস্কোর নুকোভা বিমান বন্দরে পাক-ওলামাদলকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন রাশিয়ার বিশিষ্ট আলেমগণ। নুকোভা থেকে মস্কো আরও বিশ মাইল। যেতে যেতে লেখক দেখতে পেয়েছিলেন অনেকটা বাংলাদেশের দৃশ্য। ছোট ছোট গ্রাম, চাষী, খামার, টিনের ঘরবাড়ী, উঁচু-নিচু রাস্তা, পাথরকুচি বিছানো পথে একটানা গাড়ির চাকার খসখসে আওয়াজ, এগুলো তাঁকে দেশের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলো। ক্রমেই মস্কোর ইউনিভার্সিটি, গীর্জার উঁচু উঁচু চূড়া এবং পরেই দেখা গেল রেড স্কোয়ারের উঁচু মিনার এবং তার পরেই ক্রেমলিন। পথের দু’পাশের আকাশ ছোঁয়া দালান কোঠা পেরিয়ে গাড়ি এসে থামল ২৭তলা বিশিষ্ট লেনিন হোটেলে।
হোটেলের সুবন্দোবস্ত প্রাচুর্য ও আভিজাত্য লেখককে অবাক করেছিল। ঐ দিনই তাঁরা পাকিস্তা দূতাবাস অফিস দেখতে যান। সেখানে বিভিন্ন আলোচনায় অর্থনৈতিক আলোচনা প্রাধান্য পায়। লক্ষ্য করবার মত বিষয় হল সেদেশে আয় যেমন বেশী ব্যয়ও ঠিক তেমনি। সেভিংসের কোন উপায় নেই আর দরকারও নেই তাদের ।

মস্কো শহর মিউজিয়ামের শহর। এছাড়া এখানে রয়েছে অগুণতি গীর্জা। মস্কো নদীর তীরে রয়েছে গোকী রোড। গোর্কী রোড ঘিরে রয়েছে মস্কোর সব ঐতিহাসিক ইমারত – সেন্ট বেসিল ক্যাথেড্রাল, আই ওয়ানই আজমের গীর্জা, রেড স্কোয়ার, গোর্কী পার্ক, বোরকী স্কোয়ার।
১২ই জুলাই তাঁরা রাশিয়ার ধর্মীয় দপ্তরের চেয়ারম্যান ফরিখোদকার সাথে দেখা করেন। সেখানে ধর্মীয় পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। ধর্মীয় বিষয়ের আলোচনায় অনেকটাই রাখঢাকের ব্যাপার লক্ষিত হয়েছে। লাঞ্চ শেষে তাঁরা যান মস্কোর তাতারী মসজিদে। সেখানে মুসল্লীদের উপস্থিতি মোটেই সন্তোষজনক নয়। তবু উপস্থিত নামাজিরা পাকিস্তানী বন্ধুদের কাছে পেয়ে খুবই কৃতজ্ঞ হয়েছিলেন ।
১৩ই জুলাই তাঁরা মস্কোর ইউনিভার্সিটি দেখতে যান। শহর থেকে দুরে এটি অবস্থিত। সেদেশের ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যাচেলর টেক্স দিতে হয় শুনে প্রতিনিধিদল প্রথমে অবাক এবং পরে বেশ মজা পেয়েছিলেন। পঁয়তাল্লিশ হাজার কমরা বিশিষ্ট ইউনিভার্সিটি ভবন তাঁরা ঘুরে ঘুরে দেখেন এবং ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে মত বিনিময় করেন। প্রতিটি বিভাগের প্রয়োজনীয় বিন্যাস পাক-দলকে মুগ্ধ করেছিল। ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, শিক্ষাদান পদ্ধতি, ছাত্র-ছাত্রী, পরিবেশ সব মিলিয়ে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ লেখকের ভালো লেগেছিল ।
বিশ্ববিদ্যালয় দেখে তাঁরা আসেন রেড স্কোয়ারে। রুশ ভাষায় ‘রেড’ অর্থ সুন্দর রং জাতীয় কিছু নয়। সারা মস্কোতে রেড স্কোয়ারের মতো সুন্দর জায়গা কোথাও নেই। এখানে এসে ডেলিগেটরা শহীদদের গণকবর, লেনিন, ষ্ট্যালিনের সমাধি দেখে মস্কোর এক দোকানে যান। সোভিয়েত দেশের দোকানগুলিতে কিউ দিয়ে দাঁড়াতে হয়। তবে অতিথিদের তা থেকে রেহাই দেয়া হয়েছে বিশেষ সম্মানার্থে। কর্মচারীদের মধ্যে বেশীর ভাগই মেয়ে।
পরদিন ইউরিদ আল গোর্কীর তৈরী দুর্গ ক্রেমলিনে যাবার সুযোগ পান পাক ডেলিগেট। কালের সাক্ষী হয়ে ক্রেমলিন বহু ইতিহাস ধরে আছে বুকে। ক্রেমলিন ব্যবহৃত হচ্ছে সোভিয়েত সরকারের সদর দপ্তর হিসেবে। স্থাপত্য শিল্পের দিক থেকেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। ক্রেমলিনের ভেতরই রয়েছে পিটার দি গ্রেট এর নির্মিত ঐতিহাসিক যাদুঘর। যাতে রয়েছে পুরোনো আমল থেকে শুরু করে হাল আমলের নানা দুষ্প্রাপ্য নিদর্শন ।
পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম ‘মস্কোর ঘন্টা’ দেখতে গিয়েছিলেন প্রতিনিধিদল। সাড়ে ছয় মিটার ব্যাস এবং দু’শ টন ওজনের এই ঘন্টাটি ১৭৩৩ অব্দে তৈরী হয়েছিল। নির্মাতা ছিলেন আইভান ও তার ছেলে মিকাইল ।
লেনিন লাইব্রেরী দেখতে যান তাঁরা ১৪ই জুলাই। ১৮৬২ সালে এই লাইব্রেরীর গোড়াপত্তন হয়। বিপ্লবের আগে এটির তেমন গুরুত্ব ছিলনা। পরে এটা প্রসার লাভ করে। সোভিয়েত দেশে প্রতিটি মানুষই বই পাগল। শুধুমাত্র মস্কো শহরেই রয়েছে চার হাজার লাইব্রেরী। বিরাট বড় লেনিন লাইব্রেরীর পুরোটাই ঘুরে দেখেছিলেন তাঁরা। কোথাও এতটুকু টু শব্দ নেই সেখানে। সবাই পড়া শুনা করছে মনোযোগ দিয়ে। লাইব্রেরীটি আঠারো তলা বিশিষ্ট।
এখানে দুই কোটি চল্লিশ লক্ষের মত বই রাখা হয়েছে। এছাড়া বিরাট ভলিউমগুলোকে তারা মাইক্রোফিলে ভরে রেখেছে। ফলে জায়গা সংকটে পড়তে হয় না তাদের। এভাবে বহু দুষ্প্রাপ্য বই এর কপি তারা লাইব্রেরীতে সংরক্ষণ করে রেখেছে। বইপত্র সংরক্ষণের কাজে নিয়োজিত অফিসাররা প্রত্যেকেই রসায়নে গ্রাজুয়েট। সাধারণ কর্মচারীরাও ট্রেনিং প্রাপ্ত। লাইব্রেরী দেখে তাঁরা গোর্কী রোড ধরে আসবার সময় গোর্কী পার্ক (১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত) বিপ্লবের মিউজিয়াম (যাতে জাতীয় নেতা লেনিনের জীবনের ধারাবাহিক ইতিহাস ধরে রাখা হয়েছে) প্রভৃতি দেখে হোটেলে ফেরেন।
মস্কোর তেরাগোপ ষ্ট্রীটে রয়েছে বৈজ্ঞানিকদের ক্লাব। সেখানে বিজ্ঞান বিষয়ে নানা রকম আলোচনা করা হয়। ক্লাব দেখে ডেলিগেটরা যান কৃষিশিল্প ও কৃষি প্রদর্শনী দেখতে। দেখবার মত প্রদর্শনী তারা করেছে। ৩০ বছরের ইতিহাসকে রুশরা পর্যায়ক্রমে সাজিয়েছে সেখানে। দরজায় ঢুকতেই চোখে পড়ে হাতুড়ীও কাস্তে হাতে তরুণ-তরুণীর যুগল মূর্তি। প্রদর্শনীটি তৈরী করা হয়েছিল ১৯৫৪ সালে।
কৃষি প্রদর্শনীর দু’বছর পর তৈরী হয়েছে শিল্প প্রদর্শনী। পুরো প্রদর্শনীটিকে সোভিয়েত দেশের ১৬টি রিপাবলিকের নামে ১৬টি পেভেলিয়ানে ভাগ করা হয়েছে এবং প্রত্যেকটি পেভেলিয়ানকে তারা সাজিয়েছে স্ব-স্ব দেশের নমুনা দিয়ে। এদের প্রত্যেকটিতে ঢুকলেই মনে হয় ঐ বড় বড় প্রজাতন্ত্রগুলোকে তারা আস্ত তুলে এনে প্রদর্শনীতে বসিয়ে দিয়েছে। সেদেশের উন্নত যন্ত্রকৌশলও অতিথিদের মুগ্ধ করেছিল।
প্রতিনিধিদল মস্কোর ইলিচা যৌথ খামার ও পশু প্রজনন বিভাগ দেখতে যান। খামারের প্রেসিডেন্ট তাদের চলতি বছরের বাৎসরিক হিসাব খুলে দেখিয়েছিলেন। যাতে ছিল প্রশংসা করবার মতো উন্নতি ও অগ্রগতি। খামারে এক একটি মুরগী দিনে দু’বার ডিম দেয় শুনে ওলামাদল প্রথমটায় অবাক হয়েছিলেন। পরে তাঁরা জানতে পারেন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে একটি দিনকে দু’দিনের মতো করে দেখিয়ে এটি করা সম্ভব।
তারীদের গায়ে ঘুরে দেখেছিলেন বেতন আর কাজ মিলিয়ে তারা যা পায় তাতে কেউ কেউ কুলিয়ে উঠতে না পারলেও সবমিলিয়ে তারা ভালো আছে। খামারে স্কুল, ক্লাব, সিনেমা, নাট্যশালা, লাইব্রেরীসহ সব কিছুর সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সন্ধ্যা ৬টায় অতিথিদের দাওয়াত ছিল পাকিস্তান দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মিঃ আখতার হোসেনের বাড়ীতে। হোটেলের খাবার খেয়ে তাঁদের অরুচি ধরে গিয়েছিল। দূতাবাসে বহুদিন পর পাকিস্তানী খাবার পেয়ে দলের প্রত্যেকেই খুব খুশী হয়েছিলেন। তাছাড়াও বহু দেশের রাষ্ট্রদূতদের উপস্থিতি তাঁদের আনন্দ দিয়েছিল। তবে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের অনুপস্থিতি ছিল পীড়াদায়ক।
১৫ই জুলাই রাত দশটায় ট্রেনযোগে লেনিনগ্রাড়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন ওলামাগ্রুপ। বহুদিন বিমান ভ্রমণের পর হঠাৎই ট্রেন ভ্রমণ ছিল তাঁদের পক্ষে আরামপ্রদ। কামরাগুলোর রুচিশীল ও পরিচ্ছন্ন এবং বিলাসবহুল ব্যবস্থা তাঁদের মুগ্ধ করেছিল। তবে শৌচাগারের সংখ্যা এতই কম ছিল যে এ ব্যাপারে রুশদের কিপটেমীই স্পষ্ট হয়েছে। পথের প্রাকৃতিক দৃশ্য, ঘরবাড়ী, গ্রাম প্রত্যেককেই বাংলাদেশের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল।
ষ্টেশনে পৌঁছলে বহু সরকারী বেসরকারী কর্মকর্তা তাঁদের স্বাগত জানিয়েছিলেন। যুদ্ধের সময় এখানকার প্রায় সব কিছুই বোমার আঘাতে উড়ে যায়। নতুন সৃষ্টিতে এখনও সে ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে। সোভিয়েত দেশের সর্বত্রই মেয়ের সংখ্যাধিক্য চোখে পড়ে। এর কারণ যুদ্ধে সেদেশের বহু পুরুষ প্রাণ হারিয়েছিল।

লেনিনগ্রাড়ে রাস্তার দু’পাশে পাথরের তৈরী কারুকার্যময় দালান বাড়ী, আইজাক ক্যাথেড্রাল পার্ক, নিকোলাসের মূর্তি, অসংখ্য পাথরের ইমারত, পিটার দি গ্রেটের মূর্তি প্রভৃতি দেখে এবং এগুলোর জানা-অজানা ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা নিয়ে তাঁরা হোটেলে ফিরে যান।
১৮ই জুলাই অতিথিরা লেনিনগ্রাড মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে যান। ১৯শতকের শুরুতে আমীর বোখারা এই বিরাট মসজিদটি তৈরী করেছিলেন। দুপুরে ইমাম সাহেবের বাড়ীতে খাবারের পর ঘরোয়া আলোচনায় মুসলমানদের সার্বিক অবস্থার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। লেনিনগ্রাডের ৩ লক্ষ লোকসংখ্যার ভেতর মুসলমানদের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। একটিমাত্র মসজিদ তাদের জন্য খোলা রাখা হয়েছে।
১৫টি সোভিয়েত জেলা নিয়ে লেনিনগ্রাড প্রদেশ গঠিত। প্রত্যেক জেলা সোভিয়েডের জন্য এক একজন মেম্বর রয়েছেন। ৫০০ মেম্বর নিয়ে কেন্দ্রীয় লেনিনগ্রাড সোভিয়েত গঠন করা হয়েছে। প্রতি তিনবছর পর পর সাধারণ নির্বাচনে মেম্বারগণ নির্বাচিত হন। মেম্বারদের ভোটে নির্বাচিত হন মেয়র। লেনিনগ্রাড প্রদেশটি কেন্দ্রীয় রাশিয়ান রিপাবলিকের অন্তর্ভুক্ত। রাশিয়ায় কয়েকটি স্বায়ত্তশাসিত রিপাবলিকও রয়েছে।
বালটিক রাষ্ট্রের মধ্যে ফিনল্যান্ড পুরোপুরি স্বাধীন। এছাড়াও লিখোয়ানীয়া, লাটভিয়া, এস্তোনিয়া এই প্রত্যেকটিই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল।
লেনিনগ্রাড়ের মাটি শস্য উৎপাদনের জন্য উপযোগী নয়। আলু, বীট, কপি ছাড়া এ মাটিতে তেমন কিছুই জন্মে না। তবে মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলোতে খাদ্য শস্য ও খনিজ সম্পদ দুই-ই রয়েছে পর্যাপ্ত। রাশিয়ায় বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থার যে চিত্র বহির্বিশ্বে তুলে ধরা হয়েছে তা সর্বাংশে সত্য নয়। অসাম্য মাথা তুলে আছে। অনেক স্থানে।
লাঞ্চ শেষে বালটিক সাগরে লঞ্চে চেপে চারঘণ্টা আনন্দ ভ্রমণ করেছিলেন প্রতিনিধিদল। সাগরের খোলা হাওয়ায় এ ভ্রমণ তাঁদের প্রচুর আনন্দ দিয়েছিল।
১৯শে জুলাই সকালটা কুয়াশা ঘেরা থাকায় হোটেলে বসেই তাঁরা নানা বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করেন। বিয়ে সংক্রান্ত আলোচনায় স্পষ্ট হয় সোভিয়েত দেশে বিয়ে যতটা সহজ, বিচ্ছেদ ততটা নয়। ১০ হাজারেও একটা বিবাহ বিচ্ছেদ হয় না সেখানে।

বেলা ১০টার দিকে আবহাওয়া ভালো হয়ে গেলে তাঁরা যান ডিসেমত্রিষ্ট স্কোয়ারে। স্কোয়ার ঘুরে ওলামাগ্রুপ রুটির কারখানা দেখতে যান। প্রতিদিন ৩০০টন রুটি প্রস্তুত হয় এ কারখানায় এবং প্রতিটি রুটিই ল্যাবরেটরীতে নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করে বাজারে ছাড়া হয়। রুটি প্রস্তুতের সব কাজই মেশিনে হয়। হাত দিয়ে ছোঁয়ার কোন ব্যাপার নেই সেখানে। শ্রমিকদের মধ্যে বারো আনাই মেয়ে চোখে পড়ে। তাদের মাসিক বেতন ৭০০ থেকে ১২০০ রুবল। বোনাস ও আছে। এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিনোদনের খরচ সরকার বহন করেন।
পরে নেভা নদীর তীরে জারের উইন্টার প্যালেসে আসেন তাঁরা। এটা বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে আর্ট প্যালেস হিসেবে। বিরাট এই মিউজিয়ামটি রাশিয়ার সবচেয়ে বড় মিউজিয়াম। দুষ্প্রাপ্য সব শিল্পসম্ভারে ভরা মিউজিয়ামের প্রতিটি কামরা। পাথরের মূর্তি, নানা ধরনের ছবি, মহাভারতের ছবি, যিশুর ছেলেবেলার ছবি, বিশিষ্ট শিল্পীদের আঁকা শিল্পকর্ম, পিটারের গাড়ী, শাহী আসবাব, ঘড়ি ঘর, নাইটদের বর্ম, রূপার গাছে সোনার ফুল, পুরোনো আমলের পতাকা, জারের খাস কামরা, সোনার তৈরী ঘোড়া, হীরার তৈরি লাঠি, আংটি প্রভৃতি দর্শনীয় বস্তু মিউজিয়ামের ৩০০টি বড় বড় হল ঘর জুড়ে শোভা বর্ধন করছে।
পিটারের বাড়ীটি খুব সাধারণ। একতলা দালান বাড়ী। আঠারো শতকে এটি নির্মিত হয়। বাহুল্যবর্জিত পাথরের তৈরী ঘরগুলোর সামনে রকমারী ফোয়ারা। অসংখ্য ফোয়ারা থেকে পানি ছিটকে পড়ার দৃশ্যটি চোখে পড়ার মত সুন্দর। মস্কোতে ফুলের বাগান খুব বেশী নেই। তবে লেনিনগ্রাডে ফল, ফুল দুটোরই প্রাচুর্য রয়েছে।
রাশিয়ার জনগণ প্রত্যেকেই লেনিন ভক্ত। প্রত্যেকটি জায়গাই তারা দরজার সামনে লেনিনের মূর্তি গড়ে রেখেছে। ২০শে জুলাই সকাল ৭টায় প্রতিনিধিদল লেনিনগ্রাড থেকে মস্কো রওনা হন। মস্কোতে বহু দেখবার মতো জিনিস রয়েছে। কিন্তু সময়ের অভাব ছিল প্রধান অন্তরায়। তার ওপর লেখকের শরীর কিছুটা খারাপ থাকায় মস্কোর বড় হাসপাতালটি তিনি দেখতে যেতে পারেননি।
রুশরা প্রায় সারা মস্কো শহরের নীচে সুড়ঙ্গ কেটে অসংখ্য রেল লাইন বসিয়েছে। এগুলোকে মেট্রো বলা হয়। প্রায় পঞ্চাশটা ষ্টেশন রয়েছে মাটি নিচে এবং এগুলো প্রত্যেকটাই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বিদ্যুৎচালিত গাড়ীগুলোর দরজা খোলা ও বন্ধ করার ব্যাপারটি আপনা থেকেই সম্পন্ন হয়। মাত্র ৫০ কোপেক দিয়ে সারাদিন সারা মস্কো শহরের নিচে মেট্রো করে ঘুরে বেড়ানো যায়। দেশের বিভিন্ন রিপাবলিকের জীবন যাত্রার ধারা, নানারকম শিল্প ও কৃষিকর্মের ছবি ষ্টেশনগুলোতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। দিন ও রাত্রির স্বাভাবিকতা বজায় রাখার জন্য প্রচুর খরচে উন্নত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এছাড়াও ষ্টেশনগুলোতে রাখা হয়েছে পাথরের তৈরী অসংখ্য বিপ্লবী বীরের ছবি, লেনিন ষ্টালিনের ছবি। কোটি কোটি রুবল খরচ করে তারা বানিয়েছে এই পাতাল ষ্টেশন। মেট্রোকে না দেখলে মস্কোকে দেখা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়।
২১শে জুলাই ওলামাদল মস্কোর নুকোভা বিমানবন্দর থেকে শেষ বিদায় নিয়ে লন্ডন চলে যান। বিদায়ের আগে রুশরা পাকিস্তানীদের বক্তব্য এবং অসংখ্য ছবি রেকর্ড করে রাখেন। বিমানবন্দরে মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষের করুণ আর্তি প্রতিনিধিদলকে ব্যাথাক্রান্ত করেছিল ।
তিন
লেখক আবদুল ওয়াহ্হাব তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে রাশিয়ার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এবং পাকিস্তান ও রাশিয়ার তুলনামূলক আলোচনায় দু’দেশের মধ্যে মিল ও অমিলের বিষয়গুলো স্পষ্ট করেছেন।
রাশিয়ায় ঢুকে প্রথমেই তাঁর চোখে পড়েছিল সেদেশের মানুষের কর্মতৎপরতা ও তাদের নিয়মতান্ত্রিক আদর্শের দিকটি। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন সেখানকার প্রত্যেকটি মানুষই কর্মচঞ্চল। কর্মকে তারা ধর্ম বলে জানে। পথে-ঘাটে শিল্প কারখানায় সর্বত্রই লেখকের চোখে পড়েছে মেহনতি মানুষের ভীড় অথচ কোন হৈ চৈ তাঁর কানে আসেনি কখনও। কর্মক্ষেত্রের সর্বত্রই রুশদের একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও নীরবতা লেখকের অনভ্যস্ত চোখকে মুগ্ধ করেছিল। এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ না দিলে বিষয়টি অস্পষ্ট থেকে যাবে।
সেদিন দুপুরবেলা হোটেলে একা বসে বসে আপন মনে চিন্তা করছি। শহরটার মেজাজ যেন বিগড়ে গেছে। ভারী গরম পড়ছে। পথে ঘাটে অসংখ্য লোক। শিল্প-কারখানার মেহনতি মজদুর, শহরে কর্মমুরখরতা আছে, কোলাহল নেই মোটেই। নিয়মতান্ত্রিক জীবন তাঁদের আদর্শ। হৈ চৈ, শোরগোল করবার অবকাশ নেই। শুধু কাজ।
সোভিয়েত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা বিস্তারের প্রশংসনীয় ধারাগুলো তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। তবে তাদের
যাবতীয় শিক্ষা ও সভ্যতার পুরোটাই তিনি মার্কসীয় আদর্শে পরিচালিত হতে দেখেছেন। শিক্ষা পদ্ধতিতে ধর্মশিক্ষার কোন সুযোগ সেখানে নেই। ধর্মটাকে রুশরা নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার মনে করেন। তারা মনে করেন শিক্ষা ক্ষেত্রে ধর্ম অপরিহার্য নয়।
তিনি অবশেষে বলে ফেল্লেন যে তাদের রাজনৈতিক ধর্মনৈতিক ও অর্থনৈতিক শিক্ষা ও সভ্যতা সবটাই মার্কস আদর্শবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। এজন্য সরকারী স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অসম্ভব। প্রখর বস্তুবাদ ঈশ্বরবাদের পরিপন্থী। আস্তিক মনোভাব গঠন করার মতো পলিমাটি নাস্তিক দেশে নেই। ঈমান যে নিতান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার সেটা সোভিয়েত দেশে ভাল করে দেখা যায়। “মোমেনের দিল আল্লার সিংহাসন”- যার ইচ্ছা হীরা জহরত দিয়ে সাজিয়ে রাখুক আর যার ইচ্ছা ধূলোয় দলিত করুক, কোন নালিশ নেই।
সোভিয়েত ইউনিয়নে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারী। পাকিস্তানের মতো কোন বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেখানে নেই। প্রাইমারী শিক্ষা বলতে পাকিস্তানে যে চিত্র লক্ষিত হয় সোভিয়েত দেশে তা অনুপস্থিত। তিন বছর বয়স পর্যন্ত নার্সারীতে শিশুরা হেসে খেলে প্রকৃতির নানা রকম ছবি দেখে তা থেকে তাদের উপযোগী শিক্ষা গ্রহণ করে।
কিন্ডারগার্টেনেও কোন লেখাপড়া নেই। শুধু ছবিই তাদের একমাত্র শিক্ষার বাহন। আর তা কেবল দেয়ালে আঁকা ছবিই নয় পর্দায় ইচ্ছেমত রকমারী ছবি, অক্ষর প্রভৃতি দেখিয়ে শিশুদের স্বাধীনভাবে শিক্ষিত করে তোলা হয়। সাত বছর বয়সে তারা স্কুলে চলে আসে এবং সেখানে ৭-১৭ বছর বয়স পর্যন্ত চলে তাদের শিক্ষা জীবন এবং এই স্কুলগুলো থেকেই বেরিয়ে আসে দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক। স্কুলেও শিক্ষার্থীরা বইয়ের পাশাপাশি ছবি ও ব্যবহারিক শিক্ষার দ্বারাই বেশী উপকৃত হয়।
উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে কোন বাধ্যবাধকতা সেখানে নেই। স্কুল থেকে বেরিয়ে কেউ ক্ষেতখামারে, কেউ শিল্প কেন্দ্রে, কেউবা ব্যবসা বাণিজ্যে চলে যায়। আর যারা উচ্চ শিক্ষার জন্য নির্বাচিত হন তারাও চলে যান যার যার নির্ধারিত স্কুল ও কলেজে। কোন শৃংখলা ভঙ্গের ঘটনা বা কোন পক্ষপাতিত্বের ব্যাপার সেখানে নেই। এ প্রসঙ্গে স্বভাবতই তাঁর স্বদেশের কথা মনে পড়েছে এবং পাকিস্তানের শিক্ষব্যবস্থার সাথে সোভিয়েত দেশের তুলনায় তিনি বলেছেন :
উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য ভগ্নিপতি বা মামার মন্ত্রীত্বের প্রয়োজন হয়না- নিজের যোগ্যতা থাকলেই চলে, কেবিনেট সদস্যদের সুপারিশপত্রের চেয়ে প্রাইমারী স্কুলের মাষ্টারদের সার্টিফিকেটের মূল্য বেশী। কোন ছেলেকে কোন বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা দিতে হবে তা শিক্ষাবিদগণই ঠিক করবে। ধনী পিতামাতা বা শ্বশুরের মতামত এখানে অচল ।
সোভিয়েত শিক্ষাপদ্ধতির সাথে স্বদেশের তুলনামূলক আলোচনায় লেখক আরও বলেছেন বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থায় রুশ দেশে সবাই সমান। সেখানে স্কুল পর্যায়ে প্রত্যেককেই এক শিক্ষা গ্রহণ করতে হয় এবং প্রত্যেককে নিখুঁতভাবে যাচাই করে পরীক্ষা করে যার যার উপযুক্ত কাজ করবার সুযোগ দেয়া হয়।

আগেই বলেছি সোভিয়েত দেশে প্রথমিক স্কুলে ৪০ মিনিটের বেশী ছাত্রদের আটকিয়ে রাখা হয় না। প্রাইমারী স্কুলে প্রথম তিন বছর ছেলেদের কোন পরীক্ষাই হয় না। পরীক্ষা না হলেও তাদের একটা রেকর্ড আছে। সেটা বের হবে দশ বছর পর স্কুল থেকে বেরুবার সাথে। এ তিন বছর এমনি প্রমোশন পেয়েছে। তারপর হাতে কলমে সব কিছুই করতে হবে। লেখাপড়াতো আছেই তদুপরি নিজ হাতে রাস্তা সাফাই করা, বাগান করা, রান্না-বান্না করা, ঘর ঝাট দেয়া, মাটি কেটে সমতল করাও এই মাধ্যমিক শিক্ষার সামিল। এখানে চৌধুরী সাহেবের হাতে ফোস্কা পড়বে বলে রেহাই নেই।
সোভিয়েত দেশের ১৮টা প্রজাতন্ত্রেই একই বই পড়ানো হয়, অবশ্য যার যার মাতৃভাষার মাধ্যমে, নিজের মাতৃভাষার প্রতি সবারই একটা টান রয়েছে। পরীক্ষার প্রশ্ন-পত্র একই রকম। পরীক্ষার সময় ও ধারা একই। এ ব্যবস্থার ফলে সারা সোভিয়েত দেশের কোটি কোটি ছেলেমেয়েদের মধ্যে কোন্টা সবচেয়ে ভাল তা যাচাই করতে বেগ পেতে হয় না।
রাশিয়ার সর্বত্রই লেখক দেখেছেন সেখানে প্রত্যেকটি কাজই মেশিনের মাধ্যমে করা হয়। মেশিনের সাহায্য না নিলে সেদেশের ঐ কম সংখ্যক লোকসংখ্যা কিছুতেই এত দ্রুত উন্নতি ও অগ্রগতির পথ সুগম করতে পারত না। তবে শ্রমিক সংকট রয়েছে সেখানে। এ ব্যাপারে স্বদেশের সাথে তুলনায় লেখক বলেছেনঃ
আমাদের দেশের কথা আলাদা। মেশিনে ধান ভানতে যাও তো হাজার হাজার মেয়ে পুরুষ বেকার হয়ে গেলো। একটা কাপড়ের কল খুলে দাও তো হাজারটা তাঁতী উপোস করবার যোগাড় হবে। সিগারেটের মেশিন একটা চালাও তো লাখ লাখ বিড়ি শ্রমিক হবে অকর্মণা। ও দেশে কিন্তু কারখানার মেশিনগুলোর জোগাড় দেবার মতো লোকও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শ্রমিক চাই আরও অনেক। আমাদের দেশে বেকার সমস্যা, আর ও দেশে শ্রমিক সমস্যা- একেবারেই উল্টো। দেশের জমির তুলনায় শ্রমিক বড় কম। আমরা ভাবছি জনসংখ্যা নিয়ে, আর ওরা ভাবছে কর্ম সমস্যা নিয়ে। ৫
সমাজতান্ত্রিক দেশ রাশিয়ার ধর্ম নয় বিজ্ঞানকে তারা পূজো করে। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা ও আদর্শ সেদেশের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এনে দিয়েছে আধুনিক আভিজাত্য। কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, সংস্কৃতি, খামারে উৎপাদনে, বিলাসিতায় সোভিয়েত দেশ পাকিস্তানের চেয়ে বহুগুনে উন্নত। লেখক লক্ষ্য করেছিলেন ধর্মীয় সংস্থাগুলো সেখানে রয়েছে ধর্ম নিয়ন্ত্রণের কাজে প্রচারের কাজে নয়। কমিউনিষ্টদের প্রভাবে সে দেশ থেকে আরবী হরফ উঠে গিয়ে তার জায়গা নিয়েছে রাশান হরফ। ফলে ধর্মশিক্ষার পথ একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে সেখানে।
গত চল্লিশ বছরের মধ্যে এদেরকে কোন রকম ধর্মীয় পুস্তক ছাপতে দেয়া হয়নি। কোরআন এবং হাদীস গ্রন্থের কোন কপি ছাপবার অনুমতিও দেয়া হয়নি। বহুদিন পর যাও কোরআন ছাপার সুযোগ পেয়েছিল, তাও অনেক জায়গায় ভূল পাওয়া গিয়েছে। ঐ ভুল ছাপান কোরআন শরীফ আমাদের প্রত্যেককে উপহার বা হাদিয়াস্বরূপ দেয়া হয়েছিলো।
ইসলাম এবং ইসলামী কালচারকে গলা টিপে যারবার এমনি হীন অপচেষ্টা দুনিয়ার বুকে আর কোথায়ও হয়েছে কিনা ইতিহাসে তেমন কোন নজির সোভিয়েত দেশে দ্রব্যমূল্যের বিষয়টি লেখকের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। গোটা দেশ জুড়ে সেখানে জিনিসপত্রের এক দর। কোথাও এ নিয়মের ব্যতিক্রম নেই, জিনিসপত্রের দাম বেশী হলেও আয় অনুপাতে তা সঙ্গতিপূর্ণ। পয়সা বাঁচাবার সুযোগ নেই কারোরই, কারণ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তিগত মালিকানা যেখানে তুলে দেয়া হয়েছে সেখানে সঞ্চয়ের কোন প্রয়োজন নেই ।
জিনিসপত্রের দর দাম প্রসঙ্গে লেখক স্বদেশের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের তুলনামূলক আলোচনায় বলেছেনঃ
আমাদের দেশে চাউলের দাম এক টাকায় উঠলে হৈ চৈ উঠে দেশ জুড়ে, আর এদেশে এক পয়সা কমতে গেলেই মস্ত বড় ফ্যাসাদ। সবদিক থেকে গভর্নমেন্টের কাছে ফরিয়াদ। তবে প্রতিবাদ করবার শক্তি কারো নেই।
আর একটি বিষয় তিনি অনুসন্ধান করে দেখেছেন, কমিউনিষ্ট শাসনব্যবস্থায় অর্থনৈতিক কাঠামো অনুযায়ী সেদেশের চাষীরা বেতন আর ফসল বাবদ যা পায় তাতে কারো কারো হয়ত কুলিয়ে ওঠে না। আবার কারো উদ্বৃত্ত থেকে যায়। তবে প্রত্যেকটি চাষী ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে একটি দুধের গাভী, দু’টো বাছুর, একটি শুকরসহ দশটি বাচ্চা পর্যন্ত রাখতে পারে এবং প্রত্যেক দশটি বাচ্চার মধ্যে ছয়টি নিজের গরজে বিক্রি করে দিতে পারে। দশটি ভেড়া পর্যন্ত নিজেরা পালতে পারে। দশটি মৌচাকও রাখতে পারে তারা । এছাড়াও হাঁস, মুরগী, কবুতর যা ইচ্ছা তারা পালতে পারে।
তিনি বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিলেন বস্ত্রবাদীদের দেশে ধর্মকে চিরতরে সরিয়ে ফেলার যে কৌশলগত প্রক্রিয়া তারা অবলম্বন করেছে তা সত্যি ভয়াবহ। প্রতিবাদ করার শক্তি কারোর নেই। প্রতিবাদী হলে মৃত্যু অবধারিত। এ প্রসঙ্গে স্বদেশের সাথে তুলনায় লেখক সেই ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করেছেন।
বাংলার মায়েরা চারশত বছর পরও “বর্গী এলো” বলে ‘ছেলে ঘুমানোর ছড়া বলে। কিন্তু মধ্য- এশিয়ার মায়েরা কমিউনিষ্টদের নামে নিজেরাই বেহুশ হয়ে যায়। ছড়া গাঁথার মতো মনের বল তাঁদের নেই।
খাবারের ব্যাপারেও রুশদের সাথে বাঙ্গালীদের যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ভাত-মাছ বাঙ্গালীর প্রিয় খাবার আর রুশদের প্রিয় খাবার মাংস রুটি এবং নানারকম ফলমূল। মাছ সেখানে খুব কম পাওয়া যায়। টিনজাত মাছই চোখে পড়ে বেশী।
সোভিয়েত ইউনিয়নের আর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লেখকের চোখে পড়েছিল; সেখানে ব্যাচেলরদের টেক্স দিতে হয়। এমনকি বিয়ের পরও সন্তান না হওয়া অবধি তাদের এ টেক্স দিয়ে যেতে হয়। যুদ্ধে যুদ্ধে সেদেশের পুরুষকুল অনেকেই প্রাণ হারিয়েছে। যার ফলে সেখানে উপযুক্ত ছেলে পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়েছে।
সোভিয়েত দেশে যে দম্পতির ৩টার বেশী ছেলে হয় তারা প্রতিমাসে ৮০ রুবল করে বৃত্তি পেয়ে থাকে। সাত ছেলে হলে বৃত্তি বেড়ে একশ রুবলে দাঁড়ায়। চাকুরীর প্রমোশনের মত মাতৃত্বের ব্যাপারেও সেদেশে প্রমোশনের ব্যবস্থা আছে। বারো ছেলের মা হতে পারলে একই সংগে ২০ হাজার রুবল পুরস্কার এবং “বীর মাতা” পদবী দেয়া হয়।
সোভিয়েতের সংগে বাংলাদেশের তুলনামূলক আলোচনায় লেখক বলেছেন এ ব্যাপারে বাংলাদেশের কথা একদম আলাদা। বাংলাদেশে শিশুর জন্মের হার মৃত্যুর হার দুই-ই বেশী। তারপরেও রয়েছে জনসংখ্যার আধিক্য। বাংলাদেশে কুড়ি ছেলের মাও দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু শিশু মৃত্যুর হার বেশী হওয়ায় সব ছেলেরা বেঁচে থাকতে পারে না। সোভিয়েত দেশে সন্তান কম হয় তবে শিশু মৃত্যুর হার নেই বললেই চলে।
সেদেশের আর একটি বৈশিষ্ট্য তাঁর নজরে পড়েছিল; সোভিয়েত ইউনিয়নে কারো কবরে ফুল ছড়িয়ে দেবার রেওয়াজ নেই। বাংলাদেশে নেতৃস্থানীয় ছাড়াও দরবেশ আউলিয়ার কবরে ফুল দেবার রীতি আছে। সেদেশে লেনিন ষ্টালিনের কবরেও ফুল দেবার নিয়ম নেই। তবে কেউ ফুল নিয়ে এলে তা বাইরের দেয়ালের সংগে রাখা হয়।
লেখক চাক্ষুস দেখেছেন রুশরা স্বদেশের সার্বিক কল্যাণে একনিষ্ঠ ও দেশঅন্তপ্রাণ। দ্রুত উন্নতি ও অগ্রগতির লক্ষ্যে তারা প্রত্যেকেই ক্রিয়াশীল। কলে কারখানায়, ক্ষেতে খামারে, শিক্ষা বিস্তারে, সৃজনশীলতায়, নম্রতায়, ভদ্রতায়, সততায়, সচেতনতায়, পরিচ্ছন্নতায় প্রত্যেকটি মানুষই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত দেবার মতো উজ্জ্বল। তবে বৈষম্য যে সেখানে চোখে পড়ে না তা নয়। মানুষে মানুষে পার্থক্য তারা করেনা ঠিকই তারপরও শ্রেণীদ্বন্দ্ব রয়েই গেছে। কমিউনিষ্টরা সে দেশে সবচেয়ে বেশী সুবিধা ভোগ করে থাকেন এবং এ সত্যি রুশ দেশের সর্বত্রই প্রকট।
দুনিয়ার বাজারে এদের প্রপাগান্ডা যে গন্ডিতে সীমাবদ্ধ তার বাইরেরটা দেখবার কারো সাধ্যি নেই। হাজার হাজার বিদেশী পর্যটক ওদেশে যায়, কিন্তু তাদের প্রদর্শনী সেই একই বস্তু-শিয়াল পন্ডিতের কুমীর ছানার হিসাব।৯

সোভিয়েত রাশিয়ার ছয়টি মুসলিম প্রজাতন্ত্র সহ লেখক সেখানকার বহু জায়গা ঘুরে দেখেন। রাশিয়ার কিছু কিছু জায়গার সংগে তিনি স্বদেশের প্রকৃতিগত ও পরিবেশগত সাদৃশ্য লক্ষ্য করেছিলেন। গ্রাম্য রাস্তা, টিনের ঘরবাড়ী, সবুজ মাঠ, গেঁয়ো চাষী, উঁচু-নীচু পথ, ঘনবন, নদীর পার এমনকি শহরতলির কোথাও কোথাও বস্তির দৃশ্য ও অস্বাস্থ্যকর আবহাওয়া তাঁকে বাংলাদেশের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। ট্রেনে চেপে লেনিনগ্রাড যাবার পথে লেখক লক্ষ্য করেছিলেন খাঁটি গ্রাম বাংলার দৃশ্য ঃ
রাত পোহালো আস্ত গাঁয়ের ভিতর। বাংলাদেশের ঝোঁপ জঙ্গলে ভরা গাঁও। জলা মাঠ। এখানে ওখানে জলে ঘাসের উপর বকেরা ওঁত পেতে রয়েছে; মাছ, বেঙ্গ ধরে ধরে খাচ্ছে। কেয়াবনের মতো জঙ্গল। পানিতে ভেসে রয়েছে হেলেঞ্চা ঘাস। লোকালয় খুব কম। দেশকে দেশ অনাবাদী পতিত পড়ে রয়েছে। পাটক্ষেত থাকলে মানাতো ভালো। বাচবন আছে। কোথাও দু’একটা আছে বড় বড় গাছ পাইন জাতীয় গাছই হবে। সবুজ পাতায় ভরা। হিজল গাছের মতো কয়টা গাছ ছোট একটা নালার পাশে উপুড় হয়ে যেন জল পান করছে। ফুল ফুটে আছে ঘাসের মাথায় । ১০
সোভিয়েত দেশে মানুষের সততা ও সচেতনতার দিকটি লক্ষণীয়। সততায় সে দেশের প্রত্যেকটি মানুষই প্রশংসার দাবী রাখে। চুরি শব্দটির ব্যবহার সেখানে নেই। দেশের উন্নতি অগ্রগতির পাশাপাশি মানুষগুলোও উন্নত হয়েছে তাদের অন্তরে বাইরে। লেখক একবার ভুলবশত তাঁর মাফলারটি ফেলে রেখে আসেন এক ইমাম সাহেবের বাড়ীতে। ইমাম সাহেব নিজে এসে সে মাফলারখানা ফিরিয়ে দিয়ে যান। হারানো জিনিসটি ফিরে পাবার চেয়েও সেদেশের লোকের সততা তাঁকে বেশী আনন্দ দিয়েছিল।
লেখক বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিলেন রুশরা নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। কোন কাজেই তারা ফাঁকি দেয়না। কাজকে তারা ধ্যান বলে জানে। কাজের সময় তারা আর কিছুই খেয়াল করেনা। এই একাগ্রতা ও নিষ্ঠার গুণেই রুশ দেশ ও জাতি উন্নতি ও অগ্রগতির শীর্ষে পৌঁছতে পেরেছে।
বাইরে সরকারী বেসরকারী লোকের ভীড় জমেছে সামনে পেছনে। শুধু মালিনী ঝাড়ু হাতে তার নিজের কাজে ব্যস্ত। আমাদের দিকে এক নজর চেয়েও দেখলো না। নিজের কাজেই মশগুল। এভাবে ছোটখাট জিনিস থেকেও আমার চোখ এড়ায়নি। বলতে কি, নিজের দায়িত্ব সম্বন্ধে এরা বড় সচেতন। ১১
তিনি আরও লক্ষ্য করেছিলেন বিশ্বের উন্নত দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন পাকিস্তানের চেয়ে সাদৃশ্যে বৈশাদৃশ্যে অনেক উন্নত হলেও অন্তর্গত বৈষম্য সেখানে প্রকট। বাংলাদেশে অসাম্যের চিত্র যেমন খোলামেলা ব্যাপার সেখানে সেটি খুব গোপন এবং কৌশলগত দিক থেকে তা ভয়ংকর। তাদের রীতি-নীতি ও আচার- ব্যবহারে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন রুশরা জানতে চায় বেশী, জানাতে চায় খুব কম।
চার
‘দেখে এলাম রাশিয়া’ শুধুমাত্র একটি সুখপাঠ্য ভ্রমণ-কাহিনীই নয়, এতে রয়েছে মানব জীবন অনুসন্ধানের একটি পর্যবেক্ষণ এবং সেই সাথে জড়িত পৃথিবীর নানা ইতিহাস ও দর্শনতত্ত্বের তুলনামূলক আলোচনা। প্রখর বস্তুবাদের দেশে ঈশ্বরবাদীদের প্রকৃত অবস্থা এবং সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার প্রকৃত রহস্য ও উৎস সন্ধানের জন্য যে পান্ডিত্য, বোধ ও ইতিহাস সম্পর্কিত ধারণা এবং আধুনিক শিক্ষার প্রয়োজন ছিল মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহ্হাব সেসব বিষয়ে জ্ঞানী ছিলেন।
সমাজতান্ত্রিক দেশের স্বরূপ বিশ্লেষণ করতে যেয়ে তিনি সেসব জ্ঞান প্রয়োগ করেছিলেন সূক্ষ্ম সচেতনতায়। উদ্দেশ্য ছিল কমিউনিষ্ট সোভিয়েত সম্পর্কে নানা গাল-গল্প এবং আলো আঁধারীর একটা অস্পষ্ট ধারণা থেকে জনগণকে মুক্তি দিয়ে সেদেশের আসল চেহারাটি তাদের কাছে স্পষ্ট করা। এ এক ধরণের সত্যানুসন্ধিৎসা। এখানে তিনি কোন ভিত্তিহীন তথ্য বা নিজস্ব মতবাদ বা বিদ্বেষের একপেশে মনোভাব কোথাও উগড়ে দেননি। বরং একটি বিজ্ঞানসম্মত এবং বুদ্ধিগ্রাহ্য দৃষ্টিভঙ্গির আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করেছেন প্রকৃত সত্য।
প্রাচুর্যের রাজ্যে বিপুল ঐশ্বর্য আলোয় ঝলমল করে ওঠে যে সভ্যতা সেই সাম্যবাদী ডামাডোলের নীচে কঁকিয়ে ওঠা সভ্যতার আর্তনাদ ক্ষীণ হলেও ঐ গভীর ক্রন্দন প্রকৃত মানব হৃদয়কে স্পর্শ করে। লেখকের অন্তর্দৃষ্টির তীর্যক লেন্সে ধরা পড়েছে সমগ্র রাশিয়ার এপিঠ-ওপিঠ। একদিকে যেমন ইসলামী আদর্শের দৈন্যদশায় তিনি আর্তনাদ করে উঠেছেন অপরদিকে তেমনি বিজ্ঞানের জয়যাত্রাকেও অভিনন্দন জানিয়েছেন সংগ্রহ চিত্তে। চমৎকৃত হয়েছেন আধুনিকীকরণের নব প্রয়াসে। অর্থাৎ বিচিত্র জীবনের জটিল পরিক্রমায় পথ হেঁটেছেন তিনি জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে। তাই আনন্দ বেদনার মিশ্র অনুভূতিতে আবর্তিত হয়েছে তাঁর সমগ্র বোধ।
১. করিয়া কৃতাস গাঁও দেখেছি- অর্থাৎ কুত্তাস গ্রাম নিছক পাড়া গাঁ। শহর থেকে দশ মাইল দূরে। এখানে এসে পট পরিবর্তন। পলকে যেন পর্দার ছবি উল্টে গেলো। শুষ্ক মরুময় পাথর কাঁকর। দূরে কুহুবাদ পাহাড়ের কিনার ঘেসে চলছে ছোট্ট পাহাড়ী ঝরণা। ওটাকে আশ্রয় করে কোন রকমে এদের জীবন যাপন পানীয় জল নেই বল্লেই চলে। রাস্তা ঘাট, হাট বাজার নেই। গাছপালার সজীবতা নেই। স্কুল কথা এই যে মানুষের জীবনধারণের সুবন্দোবস্ত নেই।
সেই যেন বহু যুগ যুগান্তের দারিদ্র্যের করাল ছায়া-মূর্তি। কর্কশ চামড়ায় ঢাকা হাড় নিয়ে তাদের দেহের কাঠামো। নব যুগের আবাহওয়া যেন এদের কাছে এখনো অজানা। সুখী নয় মোটেই। তবে এরা পাকা মুসলমান। এখানকার মেয়েরা আর দশটা ইসলামী রাষ্ট্রের মেয়েদের মতই পর্দা করে। বোরখা পরে কাজকর্ম করে। আমাদের দেখে তারা বুঝতে পারলো যে আমরা পাকিস্তানী মুসলমান। আগে ভাগেই বোধ হয় খবর দেয়া হয়েছে।
প্রাণখোলা সাদর সম্ভাষণ জানালো। চায়ের ব্যবস্থা করবার জন্য চেষ্টা করলো কিন্তু আমাদের সময় ছিলোনা। তাদের এই আবদার রক্ষা করতে পারলেই বরং সুখী হতাম। এদের জীবন যাপনের মান যে এত নীচুতে রয়ে গেছে তা দেখে পাকিস্তানীদের মনেও দয়ার উদ্রেক হয়। ময়লা কাপড়, জীর্ণ শীর্ণ ঘর বাড়ী। সেই মুছাই আমলের যাযাবরী মার্কা হাল চাল। কপালে চিন্তার রেখা, গায়ে দারিদ্র্যের ছাপ। সাম্যবাদ এখান পর্যন্ত এসে পৌঁছেনি।
শহুরে জীবনের সঙ্গে এদের জীবনের আকাশ পাতাল প্রভেদ। রাশিয়ান সাম্যবাদী প্রপাগান্ডা বিভাগ শুধু শহর আর শহরতলির কয়েকটা কুলখোজ নিয়েই প্রচারণা চালায় কিনা জানিনা। যদি সত্যি তাই হয় তবে বিরাট সাম্রাজ্যের অতি নগণ্য একটা অংশের খবরই আমরা পাই। বাকীটা এই কুকতাস গায়েরই মতো লৌহ যবনিকার অন্তরালে। ১২
২. নানাদেশে রকমারি গাছপালা অবলীলাক্রমে বেড়ে উঠছে। আবহাওয়ার অজুহাতে কোনটাই গোঁ ধরে থাকবে না। বিজ্ঞানের বলে সবাই সবুজ সতেজ। গরু বাছুর, ছাগল, ভেড়া সবাই যেন পাল্লা দিয়ে তাজা হয়ে হয়ে উঠছে। সবগুলোই সবল, হৃষ্ট-পুষ্ট। পশু চারণের ভূমি রয়েছে আলাদা। গরুগুলো দেখলে হাতী বলেই ভুল হওয়ার কথা। ভাগ্যিস শুঁড় নেই। পাহাড়ের মতো গাভীগুলো আপন মনে গোয়ালে দাঁড়িয়ে তাজা ঘাস চিবিয়ে খায়। এক একটা দুধের বাঁট যেন আধ সেরা বোতল।
কয়েক বছর আগে যেসব গাভী ১০০ পাউন্ড দুধ দিতো এখন তাঁরা দিচ্ছে ২৫০ পাউন্ড। মরুময় পাথুরে দেশে ফুল ফুটছে। লেনিন ফারমে এমনি হাতী মার্কা গাভী আছে ৪১৫টি। ২৮০টি আছে ঘোড়া। ভেড়ার সংখা হলো ৭৫০০। ছাগলের হিসাব পাইনি। গোয়ালে গাভী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘাস খাচ্ছে। বাঁটের তলায় রাবারের টিউব আঁটা, অবলীলাক্রমে দুধ বেরিয়ে আসছে নলের ভিতর দিয়ে। হাতে ধরা ছোঁয়ার বালাই নেই। ট্রাক্টার দিয়ে জমি চাষ করছে, কলে বীজ বুনাচ্ছে। কলের সাহায্যে আবার তৃলো উঠাচ্ছে। গাইট বেঁধে বেঁধে বিদেশে চালান দিচ্ছে। হাতে ধরবার প্রয়োজন নেই। সারা দেশটাই যেন মেশিনের দেশ। মেশিনের সাহায্য না হলে এদের উপায় হতো না। ১৩
গ্রন্থটির সর্বত্রই একটি বৈশিষ্ট্য চোখে পড়েছে লেখকের নিজস্বতা কোথাও খর্ব নয়। আপোষে তিনি উদগ্রীব নন, অন্ধকারে স্বাচ্ছন্দ নন এবং প্রতিবাদে ভীত নন। রুশ সরকারের প্রাণহীন আতিথেয়তার বহর, সেদেশের চোখ ধাঁধানো উন্নতি-অগ্রগতি আর অত্যাধুনিকতার চক্চকে মায়াফাঁদে তিনি তাঁর আপন সত্তা থেকে কখনও ছিটকে পড়েননি। বরং রাশিয়ানদের সাম্যবাদী প্রপাগান্ডার সুস্বাস্থ্যের অন্তরালে যে ক্ষতস্থান রয়েছে সেই চিত্রই তিনি তুলে ধরেছেন নিরপেক্ষভাবে।
তিনি বলেছেন রাশিয়ার ক্ষয়িষ্ণু মুসলিম জনগণের ধর্মীয় স্বাধীনতার ব্যাপারে যে অভ্রান্ত প্রচারণা রয়েছে তা বাস্তব বিবর্জিত কল্পিত সুখস্বাচ্ছন্দ্যের এক সাজানো রূপকথা মাত্র। বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার ঝকঝকে মলাটের আড়ালে যে অন্তসারশূন্যতা রয়েছে সেই সত্য উচ্চারণে তিনি নির্ভীক চিত্ত। নাস্তিক দেশে মুসলামানদের নাজুক অবস্থার কথা যখনই তিনি উচ্চারণ করেছেন তাতে তাঁর মুসলিম পরিচয় ছাপিয়ে সত্যদ্রষ্টা মনের পরিচয়ই অধিক প্রকাশ পেয়েছে।
বড় বড় টাইটেলধারী, বৃত্তিধারী সবাই রাশিয়ার কমিউনিষ্ট, আফ্রিকার কালা আদমী আর রাশিয়ার মুসলমানের অবস্থার কোন তারতম্য আছে বলে মনে হলো না।
সাম্যবলে যারা নীতির বড়াই করে তাদের নমুনা দেখে খুশী হবার মত কিছু পাইনি। বস্তুতান্ত্রিকতা যতটা অগ্রসর হয়েছে আধ্যাত্মিকতা ততটাই অবহেলিত। ১৪
লেখক মুসলমান সমাজের অন্তরঙ্গ চিত্র এঁকেছেন। সেখানেই তিনি থামেননি ব্যক্তির বিদ্রোহ ও সমাজের পীড়নকে বিশ্লেষণ করেছেন। সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে সামাজিক আদর্শ নিয়ে যুগে যুগে বেঁধেছে যে সংঘাত সেই বিরোধের কাহিনী এবং সমাজ বাস্তবতার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য তুলে ধরাই তাঁর রচনার বৈশিষ্ট্য ।
এই তাৎপর্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে কিছু কিছু মন্তব্যে। আর এই মস্তবা প্রায়শই তীর্যক হয়ে উঠেছে এবং কমিউনিষ্ট সমাজ ব্যবস্থার বৈষম্যটুকু তিনি পাঠকের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন । অনুশীলন, অনুসন্ধান এবং সিদ্ধান্তের সম্মিলন ঘটেছে তাঁর রচনায়।
তিনি কমিউনিষ্ট দেশে ইসলামী ভাবধারা ও মুসলমানদের ক্রমবিলুপ্তির কারণ অনুসন্ধান করেছেন ব্যাপক অনুশীলনের মাধ্যমে। নানা সীমাবদ্ধতার ভেতর দিয়েই তিনি এই সন্ধান কার্য সমাধা করেন এবং একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হন।
কমিউনিষ্ট মতবাদের গোড়াতেই রয়েছে যে ইসলাম বিরোধী প্রচারণা, ধর্ম বিরোধী প্রপাগান্ডা এই বাস্তব সত্য উন্মোচনে তিনি মুক্তকণ্ঠ ।
১৯১৭ আর ১৯৫৭ সালের ৪০ বছরের ফাঁকে মুসলিম রাশিয়ার জনসংখ্যা ৫ কোটি থেকে প্রায় ১ কোটিতে নেমে এসেছে। অথচ রাশিয়ান কমিউনিষ্টদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি থেকে ১৯ কোটিতে। জার আমলে শুধু তুর্কীস্তানে ছিল ২৭০০০ হাজার মসজিদ। এখন বড় বড় শহরগুলোতে যে সব মসজিদ আছে তা আঙ্গুলে গোনা যায়। এ কয় দিন ধরে উজবেকিস্তানের সে জায়াগগুলোতে ঘুরে ঘুরে আনুমানিক ১০/১২ খানা দেখেছি মসজিদ আর ৭টা মাকুবরা (গোরস্থান); প্রায় সবগুলোই ধ্বংসের মুখে। ১৫

গঠন পারিপাট্যে ও বাক্যবিন্যাসে তাঁর শৈলী ঋজু ও আকর্ষণীয়। চিন্তা ও কর্মের মধ্যে সমন্বয় সাধনের প্রয়াসে তিনি আগাগোড়া সচেতন। ছোট ছোট বাক্যে কখনও কখনও মৃদু পরিহাস মিশ্রিত রসধারায় স্নাত হয়ে উঠেছে তাঁর বর্ণনা। একজন মাওলানা হিসেবে তাঁর বর্ণনার ধরণ কিছুটা গোঁড়ামীর প্রলেপযুক্ত হলেও হতে পারত কিন্তু ভালো লাগে তখনই যখন দেখা যায় তিনি লিখতে যেয়ে ধর্মীয় গোঁড়ামীকে এড়িয়ে গেছেন সযতনে। যেমন যুবক-যুবতীর কাজের অবসরে একত্রে আনন্দ করার দৃশ্যটি তাঁর অনভ্যস্ত চোখে নিন্দার কারণ হতে পারত অথচ তিনি সেই বোধে আক্রান্ত না হয়ে এর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছেন আধুনিক মানবীয় চেতনায় ।
বস্তুবাদী কমিউনিষ্টদের ব্যবহারে তিনি কোথাও কিছুটা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছেন ঠিকই কিন্তু এর প্রকোপ খুব বেশী নয়। আর তা ঐ পরিস্থিতিতে অনেকটাই স্বাভাবিক ছিল।
রুশ সরকার পাকিস্তান হতে ওলামাদল আমদানী করেছেন, বেদেরেগ মেহেমানদারী করেছেন। পরিত্যক্ত মসজিদ আর বিরানা কবরগাহে আমাদেরকে নিয়ে আওয়াব রেছানীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। পূর্বপুরুষদের রূহের মাগফেরাত কামনা করে এরা দারাজদেলির পরিচয় দেয়নি। পরবর্তীকালের ভাবীবংশধরদের পথ-পরিষ্কার করবার ইচ্ছা করেই এই দাওয়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আজ বিদায়। তা’ বলে মোনাজাত করে নাজাত কামনা করলে চলবে না, রেডিওর সামনে দাঁড়িয়ে এতদিনের খাতিরদারির মূল্য বাবত পাকিস্তানী ওলামাদের মুখে একটা সার্টিফিকেট আদায় করবার মতলব। ১৬
আরবী ও ফারসী শব্দের ব্যবহার তাঁর রচনায় রয়েছে। বাংলায় অভ্যস্ত আমাদের কাছে কিছু ভিনদেশী শব্দের সংযোজন কিছুটা বেখাপ্পা ঠেকলেও তা বিসদৃশ্য নয়। সমগ্র বইটি পড়ে বোঝা যায় সৌখিন ভ্রমণে তিনি যাননি। গভীর পর্যবেক্ষণের বাস্তব চিত্র এতে বিধৃত।
সেখানে যা দেখেছেন তা রোজনামচার মত করে লিখে রেখেছেন। কিন্তু শুধুমাত্র বাস্তব ঘটনাগুলো একটির পর একটি সাজিয়ে গেলেই তো সেটি সাহিত্য হয়ে ওঠে না। সাহিত্যের জন্য প্রয়োজন যে রসবোধ সেটিও তাঁর ছিল। আর তা ছিল বলেই বিচিত্র তথ্যে ভরপুর এ কাহিনী শব্দচয়নে, বাক্যবিন্যাসে, গঠন পরিপাট্যে ও শিল্পনৈপুণ্যে সাহিত্য পদবাচ্য হয়ে উঠেছে।