আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ পূর্বকাল : দূরবীক্ষণে ঐতিহ্য অনুসন্ধান। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর বাংলা উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত রূপরেখার অন্তর্ভুক্ত।
পূর্বকাল : দূরবীক্ষণে ঐতিহ্য অনুসন্ধান
গল্পের প্রতি আকর্ষণ মানুষের চিরন্তন। প্রাগৈতিহাসিক গুহাবাসীরা গুহায় যে চিত্র অঙ্কন করেছেন, সেখানে গল্পের সন্ধান মেলে। অরণ্যচারী মানুষেরা দিন শেষে একত্রে মিলিত হয়ে নিজেদের শিকারের কাহিনী বা স্ত্রী হরণের কাহিনী নৃত্য-গীত-অভিনয়ে অন্যদের কাছে বলত, এখানেও গল্পের সন্ধান পাওয়া যায়। সেই আদিকাল থেকেই নিজেদের জীবনকে অবলম্বন করে গল্প বলার প্রবণতা চালু হয়েছে।
চর্যাপদের পদগুলিতে রূপকভাবে মানুষের সুখ- দুঃখ বর্ণিত হয়েছে। মধ্যযুগের কাহিনীকাব্যে দেবতার আড়ালে মানুষের কথাই ফুটে উঠেছে। এই কাহিনীকাব্যগুলিতে উপন্যাসের গুণাবলিও পাওয়া যায়। মধ্যযুগে রেনেশাঁসের পূর্বে ইউরোপে কিছু উপন্যাসধর্মী রচনা পাওয়া যায়। বোকাচিও প্রণীত Decameron তারও আগে পুরাতন গ্রিক ও লাতিন ভাষায় The Ass, Sahynicon, Metamorphos ইত্যাদি গদ্যকাহিনী রচিত হয়েছিল।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে সার্থক উপন্যাসের উদ্ভব ঘটে। এর প্রভাবে বাংলাসাহিত্যে উপন্যাসের উদ্ভব। উপন্যাস শিল্পের উদ্ভবের পূর্বে গদ্যভাষার গাঁথুনি শক্ত করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১)। বাংলাসাহিত্যে সার্থক উপন্যাসের উদ্ভব হয়েছে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে। সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন:
“উনিশের শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যখন থেকে ‘বাবু’ আর ‘ভদ্রলোক’ এই দুটি শব্দের শ্রেণীগত তাৎপর্য এবং সামাজিক ভূমিকা ক্রমশ স্পষ্টতা পেতে শুরু করল, যখন থেকে সামাজিক নেতৃত্ব ভূস্বামীদের অধিকার থেকে ধীরে ধীরে ভদ্রলোক শ্রেণীর হাতে চলে আসতে লাগল, তখনই ঠিক তখনই উপন্যাস সাহিত্যে আবির্ভাবের প্রাথমিক শর্তটি পালিত হল; ১
বাংলাসাহিত্যে প্রথম উপন্যাস জাতীয় রচনা করেন ক্রিশ্চিয়ান বিদেশিনী হানা ক্যাথেরিন ম্যুলেন্স। তিনি বাংলা শিখে দেশী খ্রিষ্টানদের জন্য তাদের সমাজের ঘটনা অবলম্বনে ১৮৫২ সালে ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ রচনা করেন। এই নিরস দীর্ঘ কাহিনী কোনো দিক থেকেই চিত্তাকর্ষক হতে পারে নি।
এইটি পূর্ণাঙ্গ কাহিনীর স্ফুরণ হলেও শিল্পমান সম্পন্ন নয়। এরপর রেভারেন্ড লালবিহারী দে’র সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিকপত্র ‘অরুণোদয়ে’ (১৮৫৬) লালবিহারীর রচিত ‘চন্দ্রমুখীর উপাখ্যান’ নামে একটি ধারাবাহিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়। এতেও খ্রিস্টান ধর্মের জয়গান করা হয়েছে। ১৮৫৯ সালে উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হয়, তবে এর কোনা কপি দেশে পাওয়া যায় নি, লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে মাত্র একখানি কপি সংরক্ষিত আছে। এ উপন্যাসও শিল্পগুণ সমৃদ্ধ নয় ।
উপন্যাসের শিল্পগুণ সর্বপ্রথম অনেকাংশে পূরণ করে প্যারীচাঁদ মিত্রের (১৮১৪-১৮৮৩) ‘আলালের ঘরের দুলাল’ (১৮৫৮)। এই গ্রন্থেই সর্বপ্রথম ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি মধ্যবিত্তের সামাজিক অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। প্যারীচাদ সরস কৌতুকের ভাষায় এবং তীব্র পর্যবেক্ষণ শক্তির সাহায্যে বাঙালির সমসাময়িক বাস্তব জীবনকে অঙ্কন করেছেন। তাঁর বাক পদ্ধতিও আলাদা। তিনি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের পথ বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর ভাষা আলালী ভাষা নামে পরিচিত। তাঁর সম্পর্কে সমালোচক মন্তব্য করেছেন:
“প্যারীচাঁদ সর্বপ্রথম সহজ মানুষের দুষ্ট, খল চরিত্রের, প্রতিদিনের জীবন যাত্রার পরিচয় দিয়ে উপন্যাসের বাস্তবতার পথ তৈরী করেছিলেন।
প্যারীচাঁনের মাধ্যমে সাহিত্যে বাস্তবজীবন এলো। এরপর ভূদেব মুখোপাধ্যায় (১৮২৭-৯৪) ইতিহাসের বিষয়বস্তু নিয়ে ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’ লেখেন। তবে এতে ঔপন্যাসিক গুণ নেই। এরপর আমরা সাহিত্যের আরেকটি দিক পাই কালী প্রসন্ন সিংহের (১৮৪০-১৮৭০) রচনায়। তিনি তাবৎ বাঙালির চোখে আঙুল দিয়ে চোখ খুলে দেবার জন্য কলম শাণিয়ে নিয়ে বসেছিলেন। তাঁর ‘হুতোম প্যাচার নকশা (১৮৬২) উপন্যাস নয়, নকশা জাতীয় রচনা।
সে যুগের কলকাতার ধনী মধ্যবিত্ত ও সাধারণ সমাজের হুজুকপ্রিয়তা, হুল্লোড়ের ধুলোট উৎসব, উৎস-অনুষ্ঠানে অবলীলাক্রমে ঘটে যাওয়া জঘন্য ব্যাপার, শিক্ষিত যুবক, ঘোর ব্রাহ্ম, বৈষ্ণব, অলিন্দবিহারিণী মূলাঙ্গিনী বারবধূ, চড়ক, গাজন, দুর্গোৎসব, মাহেশের রথ, চাকরে বাবু, মোসাহেবপরিবৃত জমিদার, পথের ভিখারি, কেরানি, দোকানি, হাটুরে, পুরুতঠাকুর ইত্যাদি কলকাতার নানা রকম রংসার ব্যাপার লেখক এই নকশায় দেখিয়েছেন। এ সকল ব্যাপার এখনও বিদ্যমান:
“হুতোম কলকাতার আকাশে শ’ খানেক বছর আগে যে সমস্ত নকশা উড়িয়েছিলেন, সেগুলি এখনও আধুনিক অব্যসভ্য কলকাতার আকাশে মহানন্দে উড্ডীয়মান।”৪
বিষয় এবং আঙ্গিকগত দিক থেকে সার্থক উপন্যাস লিখলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮- ৯৪)। সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতা, স্বদেশী আন্দোলন, সমাজ বিকাশ, শিক্ষা-ঐতিহ্য সকল বিষয়ই তাঁর উপন্যাসের বিষয় হিসেবে গৃহীত হল। স্বদেশী আন্দোলনের সময় তাঁর ‘আনন্দমঠ’ ইংরেজি ও অন্যান্য প্রাদেশিক ভাষায় অনুদিত হয়ে সারা ভারতবর্ষে স্বদেশী ও বিপ্লবী আন্দোলনে প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর ‘বন্দেমাতরম্’ আধুনিক কালের দেশমাতৃকা।
ঊনবিংশ শতাব্দীর নব যুগ চেতনা তাঁর হাতেই মূর্ত হয়ে উঠেছে। পাঠকের বিশিষ্ট জীবনাগ্রহের প্রভাব উপন্যাসের প্রধান বিষয়। পাঠক নিজের জীবনের নানা জটিল বিষয়ের অবতারণা উপন্যাসে দেখতে চান। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সময়ই তা মূর্ত হতে শুরু করে।
“বঙ্কিমচন্দ্রের কালেই ধীরে ধীরে অসাধারণ মানুষদের অসাধারণ ঘটনা সমন্বিত ঐতিহাসিক উপন্যাস এবং সামাজিক ঘটনাবহুল উপন্যাস সম্বন্ধে প্রতিক্রিয়া পাঠকমণ্ডলীতে জেগে উঠেছিল। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন:
“বাঙালীর জীবনকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য আদর্শের মিলনভূমিতে স্থাপন করে মননশীল সাহিত্য, কথাসাহিত্য, দেশ ও দশের কথা প্রভৃতির মধ্য দিয়ে তিনি বাঙালীকে ঊনবিংশ শতাব্দীর জীবনরস ও প্রাণবাণীতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মোট ১৪টি উপন্যাস লিখেছেন। এই উপন্যাসগুলিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়—ইতিহাস ও রোমাল, তত্ত্ব ও দেশাত্মবোধক, সমাজ ও গার্হস্থ্যধর্মী। বঙ্কিমই প্রথম মানব জীবনের উপর প্রকৃতির প্রভাবকে যথার্থ রোমান্টিক দৃষ্টিতে উপলব্ধি করেন। অবশ্য বৈষ্ণবপদাবলীতে আমরা দেখেছি।
“এ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর।
তবে বঙ্কিমই প্রথম দেখালেন মানবজীবন ব্যাখ্যার অগম্য। মানুষের সাধ এবং সাধ্যের মধ্যে, প্রার্থনা এবং প্রাপ্তির মধ্যে, স্বপ্ন এবং বাস্তবায়নের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান বঙ্কিম গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন এবং তাঁর সাহিত্যে তা প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি যে উপলব্ধি করেছেন তা হলো- আমাদের প্রাচীন সমাজের এবং সংসারের আচরণ বিধি বা ধর্মীয় ব্যত্যয় ঘটলে ব্যক্তির জীবনে পাপ যন্ত্রণা নেমে আসে।
ডঃ সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত দেখিয়েছেন বঙ্কিমের বিশ্বাস ছিল সুখ- সন্ধানী মানুষ যখন সুখস্পৃহার মূলে কল্যাণকে বিসর্জন দেয় তখনই যন্ত্রণারম্ভ। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের নৈতিক সমস্যা হলো- মানবজীবনের স্থিতাবস্থা যখন ব্যহত হয়, তখন তার কল্পনালোকে আলোড়ন শুরু হয়। বঙ্কিমের নায়ক-নায়িকা এই অবস্থার শিকার। সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন:
“বঙ্কিমের কোনো নায়ক বা নায়িকা ভাবাতিরেক-দুষ্ট নয়। যদিও প্রবল ঝঞ্ঝাবার মত প্রচণ্ড বাসনাবেগে তারা আন্দোলিত হতে পারে-তথাপি শান্ত বা স্বাভাবিক অবস্থায় তারা প্রশান্ত সমুদ্রের মতই সুস্থির।
তিনি সচেতনভাবে তাঁর নায়ক-নায়িকার স্বাভাবিক আচরণ বজায় রেখেছেন। নাগরিক তরুণী পদ্মাবর্তী আর সমুদ্র অরণ্যের কপালকুণ্ডলা দুই-ই স্বস্থানে স্বাভাবিক। ফুল ফুটিলে লোকের দেখে সুখ, কিন্তু ফুলের কী!’-এ তত্ত্ব কপালকুণ্ডলাকে মানায়, আয়েষাকে নয়। বঙ্কিম এ সত্য উপলব্ধি করেছিলেন। বঙ্কিমের যে সকল উপন্যাস থেকে রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেগুলি হলো- ‘বিষবৃক্ষ’ (১৮৭৩), ‘রজনী’ (১৮৭৭), ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ (১৮৭৮)।
নর-নারীর আদিম সম্পর্কের জটিলতা উপন্যাস তিনটির মূলকথা। চিত্ত-সংযমে অনিচ্ছা বা অক্ষমতা থেকে স্ত্রী-পুরুষের শোচনীয় পরিণাম বঙ্কিম তাঁর সমসাময়িক পারিবারিক জীবনের উপর ভিত্তি করে কাহিনী গড়ে তুলেছেন।
‘বিষবৃক্ষে’ ধনাঢ্য ভূস্বামী নগেন্দ্ৰনাথ বালবিধবা কুন্দনন্দিনীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সাধবী পত্নী সূর্যমুখীর প্রতি উদাসীন হয়। অভিমানিনী সূর্যমুখী গৃহত্যাগী হয়। পরে নগেন্দ্রনাথ অনুতপ্ত হলে সূর্যসূখী তার কাছে আসে। অন্যদিকে কুন্দনন্দিনী বিষপানে আত্মহত্যা করে। সে বলে যায়- ‘আমার সাধ মিটিল না’। এই বাক্যের মধ্য দিয়ে জীবনের প্রতি দুর্ণিবার আকর্ষণ ফুটে উঠেছে।
‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ও এরূপ গোবিন্দলালের অসংযমের কাহিনী। স্ত্রী ভ্রমরকে ফেলে বালবিধবা রোহিনীকে নিয়ে সে গৃহত্যাগী হয়। পরে তাদের সম্পর্কে ক্লান্তি আসে। সে অবিশ্বাসী রোহিনীকে পিস্তলের গুলিতে খুন করে। পরে সে ভ্রমরের মৃত্যুসজ্জায় উপস্থিত হয়। অমর স্বামীর পায়ের ধুলো নিয়ে দেহত্যাগ করে, কিন্তু দুষ্কৃতকারী, নারীঘাতক স্বামীকে পরজন্মে স্বামী হিসেবে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে না।
এ উপন্যাসগুলিতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একটি নীতিবোধের অবতারণা করেছেন। কিন্তু কুল বা রোহিনীর মানসিক দিককে মমতাময়ী দৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধি করেন নি। তবে শৈবলিনী বঙ্কিমচন্দ্রের অনবদ্য সৃষ্টি, যা ভেঙে দিয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের ঊনবিংশ শতকীয় নানা বহিরাবরণ।
সে কায়মনোবাক্যে পতিসেবা করবে বলেছে, কিন্তু প্রতাপকে বলেছে, প্রতাপ থাকতে তার সুখ নেই। আবার বলেছে, ‘স্ত্রীলোকের চিত্ত অভি অসার। কত দিন বশে থাকিবে জানি না।’ বঙ্কিমচন্দ্রের নারী চরিত্র সম্পর্কে বলা হয়ঃ
“আজও যে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে অনতিক্রান্ত, তা তাঁর নারী চরিত্রের জন্য। এমনই জীবনসম্ভবা তাঁর নায়িকাকুল যে, তারা তাদের স্রষ্টাকেও বিমুঢ় করে দিয়েছে।
বঙ্কিমের নায়িকাদের নামকরণও উপভোগ্য পৃথিবীর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি ভারতীয়। পুরাণ বা দেবীর নাম খুব ব্যবহার করেন নি, সাগর, শৈবলিনী, ভ্রমর, সূর্যমুখী, রোহিনী, কুম্প, রজনী, লবঙ্গলতা, কপালকুণ্ডলা, মৃন্ময়ী, শ্যামা সবই বর্ণবাদী নাম। পরবর্তীকালে তাঁর উপন্যাসের এমনই বিভিন্ন বিষয় অনুসরণীয় হয়েছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৪-৮৯) বিরল প্রতিভাধর ব্যক্তি ছিলেন। নিঃস্পৃহতা ও সৌন্দর্যবোধ তাঁর মনের স্বাভাবিক ধর্ম। তিনি কয়েকটি উপন্যাস লিখেছিলেন। কিন্তু প্রথম শ্রেণির প্রতিভা নিয়ে জন্মালেও তৎপরতা, একাগ্রতা এবং নিষ্ঠার অভাবে তিনি শিল্পগুণসমৃদ্ধ উপন্যাস লিখতে পারেন নি।
রমেশচন্দ্র দত্ত (১৮৪৮-১৯০৯) ৬টি উপন্যাস লিখেছিলেন। অনেকে তাঁকে বঙ্কিমচন্দ্রের চেয়ে শক্তিশালী ঔপন্যাসিক বলেন। তবে তাঁর সম্পর্কে এ কথা ঠিক যে তিনি সূক্ষ্মভাবে ইতিহাস এবং চরিত্র সাজিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু প্রথম শ্রেণির উপন্যাস লিখতে পারেন নি। মানবজীবনের গভীরতর সমস্যা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান খুব কাঁচা ছিল। তবে তিনি সামাজিক পরিবর্তনের বিষয়ে প্রগতিশীল ছিলেন। বিধবা-বিবাহ এবং অসবর্ণ বিবাহের যৌক্তিকতা স্বীকার করতেন, পক্ষান্তরে বঙ্কিমচন্দ্র এ সকল বিষয়ে রক্ষণশীল ছিলেন:
“সমগ্রভাবে বিচার করলে উনবিংশ শতাব্দির ঔপন্যাসিকদের মধ্যে তাঁকেই বঙ্কিমচন্দ্রের পরে স্থান দিতে হবে। ১
বঙ্কিমচন্দ্রের সমতুল্য লেখক তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৪৩-৯১)। তিনি ‘স্বর্ণলতা’ উপন্যাস লিখে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর জীবিতকালেই এর সাতটি সংস্করণ বেরিয়েছিল। তবে এর পর যে উপন্যাসগুলি লিখেছিলেন তা শিল্পগুণসম্পন্ন হয় নি। ঊনবিংশ শতাব্দীর একান্নবর্তী পরিবারের স্বার্তপরতা এবং কলহের কাহিনী তিনি অঙ্কন করেছেন:
“জীবনের কোন উৎকট প্রশ্ন নয়, সমাজের কোন মস্তিষ্কজীবী সমস্যা নয়- প্রতিদিনের চোখে দেখা জীবনই তাঁকে সাহিত্যকর্মে উদ্বুদ্ধ করেছে। ১১
‘বঙ্গাধিপ-পরাজয়’ (১৮৮৪) নামে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় আকারের উপন্যাস লিখেছেন প্রতাপচন্দ্র ঘোষ। বঙ্কিমযুগে জন্মে তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের বাইরে নতুনভাবে ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু উপন্যাসটি সুখপাঠ্য হয় নি। রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠা ভগিনী স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫-১৯৩২) কয়েকটি উপন্যাস লিখেছেন। কাহিনী গ্রন্থনে ও চরিত্র নির্মাণে তিনি শক্তিশালী ছিলেন। তবে তাঁর রচনা কৃত্রিম মনে হয়।
উপন্যাসের নতুন বাঁক তৈরি হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) হাতে। রবীন্দ্রসাহিত্যে মানুষের অন্তরাত্মার প্রতিফলন ঘটে:
“মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ইত্যাদির কাছে পৌঁছাতে গেলে রবীন্দ্রনাথকেই যাত্রারম্ভের চিহ্ন হিসেবে ধরে নিতে হয় । ১২
রবীন্দ্রনাথ নিজের লেখার মধ্য দিয়েই উপন্যাস সাহিত্যের বিবর্তন ঘটান। তাঁর প্রথম উপন্যাস থেকে শেষ উপন্যাসে বিস্তর ব্যবধান। তিনি বঙ্কিমের আদর্শে ‘রাজর্ষি’, ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’ লেখেন। তারপর বঙ্কিমের ঘটনাপ্রধান উপন্যাস থেকে সরে রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিপ্রধান উপন্যাস লিখতে শুরু করেন। ‘রাজর্ষির’ জগৎ ছেড়ে তিনি এলেন ‘যোগাযোগের’ জগতে। ‘চোখের বালি’ থেকেই তাঁর যথার্থ যাত্রারম্ভ।
শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকের জগৎবিষয়ক চেতনায় যে সমগ্রতা অপরিহার্য রবীন্দ্রনাথে তা বিদ্যমান। তিনি অখণ্ড মানুষকে উপন্যাসে ধারণ করার পক্ষপাতী ছিলেন। বঙ্কিম ঘটনা ও চরিত্রের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া মেনে চলেছেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ পুরো ব্যক্তির কথা ভেবেছেন। তাই রবীন্দ্রনাথের নায়িকা বিনোদিনী, যার প্রেম-ছলনা, প্রলোভন, চাতুরি, মুক্ত আত্মনিবেদন, আত্মসমর্পণ, পূজা, আরতির মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বিনোদিনীর প্রেম বিহারীকে আত্মআবিষ্কারে প্রবৃত্ত করেছে এবং বিহারী তা মেনে নিয়েছে। বাংলা উপন্যাসের মোড় ঘুরেছে এখানেই। রবীন্দ্রনাথ রিয়ালিজমের পথে যাত্রা করেছেন। অরুপকুমার মুখোপাধ্যায় বলেছেন:
“বিহারী ও বিনোদিনীর বাস্তবতার পথে আত্ম-উদ্ঘাটন ও আত্ম-আবিষ্কারে বাংলা উপন্যাসের মোড় ফেরার ঘণ্টা বেজে উঠেছে। ১০
সমাজের নীতিবোধের বিরুদ্ধে নারীর বিদ্রোহই আধুনিকতার একটি লক্ষণ। বিনোদিনী আত্মসচেতন। মহেন্দ্র তাকে উপেক্ষা করে হীনবুদ্ধি, দীন প্রকৃতি বালিকা আশাকে পত্নীরূপে বরণ করেছে। তাই অন্তরের জ্বালায় বিনোদিনী দগ্ধ হয়েছে- সে মহেন্দ্রকেও দক্ষ করতে চায়। হিংসা আর প্রতিশোধপরায়ণতায় উন্মাদ হয়ে ওঠে।
“নিজের জীবনের শূন্যতার যে ব্যর্থতার জ্বালায় সে জর্জরিত হয় সেই জ্বালাপ্রসুত হিংসা, নীতি বা সমাজ-নীতির চোখে গর্হিত কিনা ‘চোখের বালি’তে সে প্রশ্ন প্রশ্নই নয়। রূপগুণের পরিপূর্ণ অধিকারিণী, পাওয়ায় যার স্বাভাবিক অধিকার, নিতান্ত বৈধব্যের দুর্ঘটনায় প্রবঞ্চিত সেই নারীর এই হিংসা, যা তার প্রাণের প্রতি জীবনের প্রতি আসক্তির নামান্তর, সেই হিংসা স্বাভাবিক কিনা সত্য কিনা তাই এখানে প্রশ্ন। সেই প্রশ্নই মাত্র এখানে ঔপন্যাসিকের বিবেচনার বিষয়।
রবীন্দ্রনাথের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এখানেই। কুন্দনন্দিনী আত্মবিলোপে উৎসুক, কিন্তু বিনোদিনী আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামরত। কুন্দুর প্রেম বঙ্কিম মেনে নেন নি, তাঁর কাছে এটা অপরাধ। বিনোদিনীর প্রেমের ন্যায়-অন্যায়বোধ রবীন্দ্রনাথের কাছে অবাস্তর, তার কাছে প্রেমের অস্তিত্বই বড় কথা।
রবীন্দ্রনাথ বাংলা উপন্যাসকে শুধুমাত্র রিয়ালিজমের পথে চালনা করেই ক্ষান্ত হন নি, এরপর তিনি লিখলেন ‘গোরা’। ‘গোরা’ উগ্রহিন্দু জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী, তার প্রচণ্ড উত্তাপে চারপাশের হিন্দু-ব্রাহ্ম সকলেই সংকুচিত। পরবর্তীতে সে অভিজ্ঞতায় জেনেছে রোমান্টিক স্বদেশপ্রেম ও রোমান্টিক ব্যক্তিপ্রেম দুরের বিরোধ নেই। তাই সে শেষ পর্যন্ত মানব ধর্মকে গ্রহণ করেছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে:
“যে আমারই তাহাকে আমি লইব। নহিলে পৃথিবীতে আমি অসম্পূর্ণ-আমি ব্যর্থ হইয়া যাইব।”১৫
সুচরিতার প্রেম গ্রহণ করে সে দেশপ্রেম স্বার্থক করতে চেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে বাস্ত বতার সঙ্গে আদর্শবাদের মিলন ঘটিয়েছেন। এরপর রবীন্দ্রনাথ এগিয়েছেন ইনার রিয়ালিটির দিকে। ‘চতুরঙ্গের’ শচীশ এর উদাহরণ। শচীশের অন্তরাত্ম দেখিয়েছেন লেখক। এ উপন্যাসে ফর্ম এবং কন্টেন্ট দুইয়েরই নতুনত্ব এনেছেন তিনি। মানুষের চরিত্রে জন্মান্তর ঘটে, একজীবনে সে অনেক জন্ম এবং অনেক মৃত্যুর সম্মুখীন হয়।
‘চতুষ্কোপে’ শচীশ ও দামিনী দুজনই বারবার এক ছক ভেঙে অন্য ছকের দিকে এগিয়েছে। এই চরিত্র দুটি আধুনিক মননে আবির্ভূত হয়েছে। উপন্যাসে শচীশ আর দামিনীর মিলন ঘটে নি। শচীশ দামিনীকে বলেছে তাকে ত্যাগ করে যেতে, দামিনীও বুঝেছে শচীশকে নিয়ে ঘরকন্না চলে না, সে শ্রীবিলাসকে বিয়ে করেছে। রবীন্দ্রনাথের শেষজীবনে রচিত ‘শেষের কবিতায় ও এরকম পরিণতি ঘটিয়েছেন লেখক।
দৈনন্দিন বিবাহিত জীবনের কর্তব্যপীড়িত গতানুগতিকতা এবং অপার্থিব রোমান্টিক প্রেমের স্বপ্ন-এ দুয়ের মিলন ঘটানো দুঃসাধ্য। তাই অমিত-লাবণ্য তাদের প্রেমকে প্রয়োজনের উর্ধ্বে তুলে মলিন করে নি। অমিত কেটি মিত্রকে এবং লাবণ্য শোভনলালকে বিয়ে করে। ঘড়ার জলে তারা প্রয়োজন মেটালো, কিন্তু সমুদ্রের জলের আস্বাদ তাদের অন্তরে জেগে রইল। ‘চতুরঙ্গ’ সম্পর্ক অরুম্পকুমার মুখোপাধ্যায় বলেছেন:
“চেতনাপ্রবাহী উপন্যাসে ‘ইনাররিয়ালিটি’র সন্ধান, আত্ম-আবিষ্কারের পথে চরিত্রের উত্তরপ, চরিত্রের নিঃশর্ত, স্বাধীন বিবর্তন, চরিত্রের ব্যক্তিবিশেষত্বের প্রতিষ্ঠা, প্রতিদিনের নির্মিত ও নির্মীয়মাণ চরিত্রের উপর অন্ধকার অবচেতনার প্রভাব, অ- সম্পূর্ণ অ-নির্ধারিত চরিত্রের নিরন্তর পূর্ণতার অন্বেষণ-সবকিছুরই ইঙ্গিত ‘চতুরঙ্গে’ আছে। বাংলা উপন্যাসে পূর্ণতার অন্বেষণ ও ব্যক্তি চরিত্রের সর্বময় প্রতিষ্ঠার সূচনা রবীন্দ্রনাথের ‘চতুরঙ্গে’ ।”
‘চতুরঙ্গে’ রবীন্দ্রনাথ কার্যকারণপরম্পরা ছেড়ে দিয়েছিলেন ‘ঘরে বাইরে’তে তিনি সময়ের পরম্পরাগত বিন্যাসও ত্যাগ করলেন। নারী স্বাধীনতা, প্রেমের স্বাধীকারের সমস্যার পাশাপাশি তিনি জাতীয় স্বাধীনতাকে সম্পৃক্ত করেছেন। দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েনে দেশের মুক্তির সমস্যাকে দেখেছেন তিনি। সন্ত্রাসবাদ ও নর-নারীর সম্পর্ক নিয়ে নিখিলেশ ও সন্দীপের তর্ক- বিতর্কে নর-নারীর এবং সমাজের জীবন-সংকট চিত্রিত হয়েছে। তাঁর আরো একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘যোগাযোগ”। এতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেখিয়েছেন সামস্ততন্ত্র থেকে মুক্তিই শেষ কথা নয়, মুক্তির অর্থ আরো বড় ব্যাপার। তাই কুমু স্বীকার করেছে:
“দেবতার চেয়ে দাদার বিচারের উপর ভর করলে এত বিপদ ঘটত না। ১ অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ এখানে যুক্তিবাদকে সমর্থন করেছেন। কুমুর প্রখর ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরে সমসাময়িক মানুষের ব্যক্তিত্বের সমস্যা তুলে ধরেছেন:
“এমন কিছু আছে যা ছেলের জন্যও খোয়ানো যায় না।’
রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বোন’ও আধুনিকতার অনন্য উদাহরণ। ‘মা’ জাতের মেয়ে শর্মিলা এবং প্রিয়া জাতের মেয়ে উর্মিমালার মাঝখানে শশাঙ্ককে এনে উর্মিমালার ভেতরে একটি আধুনিক বোধকে জাগ্রত করেন। ‘চোখের বালি’র বিনোদিনী কাশীবাসী হয়েছে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও অন্তঃসত্ত্বা কুমুদিনী ফিরে গেছে স্বামীর সংসারে। ঊর্মি এগিয়ে গেছে অনেক দূর। সে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়, ডাক্তারি পড়তে বিলেত যায়। নারী আর পরনির্ভরশীল নয়, সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে:
“প্রতিকূল বাস্তবের সঙ্গে যুদ্ধ করে করে নারীর এই যে আত্মপ্রতিষ্ঠা আদায়ের সংগ্রাম, তার ইতিহাসকে সহানুভূতির সঙ্গে চিত্রিত করেও রবীন্দ্রনাথ প্রমাণ করেছেন, ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি আধুনিক মনের অধিকারী ।”১৯
বাংলা উপন্যাস সাহিত্যের আরেকটি দিকউম্মোচন করলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬- ১৯৩৮)। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সম্পর্কে বলেছেন:
“শরৎচন্দ্রের কাহিনীতে পতিতা ও অসতীরা চরিত্রে বড় হয়ে উঠেছে তাদের মনুষ্যত্ব, অনুচিত প্রেমও হয়েছে প্রেম। তখনকার অন্য কোন লেখক এটা পারেন নি। ২০ শরৎচন্দ্রে চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথের ছায়া আছে, কিন্তু তাঁর রচনা আরো সরল, সর্বসাধারণের মনের স্বাভাবিক গতিকে আকৃষ্ট করে। তাঁর নায়করাও সাধারণ। কোনো বড় চাকুরে নয়। আবার, যে সকল নারী ক্ষণিক ভুলের বশে অথবা পেটের দায়ে, কিংবা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পরপুরুষকে দেহ সমর্পণ করে তাদের প্রতি সমাজের কটাক্ষ থাকলেও শরৎচন্দ্রের ছিল অসাধারণ মমত্ববোধ
“সমাজের হৃদয়হীন কঠোরতাকে নির্মমভাবে আক্রমণ করলেও শরৎচন্দ্র সমাজের মর্যাদাকে কখনো ক্ষপ্ন করেন নাই। তাঁহার লেখায় হয়ত চাণক্যশ্লোকের নীতিসূত্র উন্নঙ্খিত হইয়াছে, কিন্তু যাহা প্রকৃত নীতিবোধ, যাহার প্রেরণা বাইরের শুষ্কপত্র হইতে নয়, মানুষের জীবন্ত হৃদয় হইতে তাহার উপরেই তাঁহার নির্ভর । ২১
বাঙালির আন্তরিক, কালোপযোগী, ঘরোয়া এবং ভাবালুরূপে শরৎচন্দ্র তাঁর উপন্যাস উপস্থাপন করেন, তাঁর কাহিনী পরিকল্পনা ও বর্ণনা স্বতঃস্ফূর্ত, কিন্তু তিনি আঙ্গিকের দিকে একেবারেই দৃষ্টি দেন নি। রবীন্দ্রনাথ থেকে তাঁর প্রণালী সম্পূর্ণ পৃথক। রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপন্যাস কাব্য- সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তুলেছেন, মনস্তত্ত্ব ও কল্পনা সমৃদ্ধি উভয় দিক দিয়েই মনোজ্ঞ। শরৎচন্দ্রের কাহিনীতে বাস্তবতার দিকটি তীক্ষ্ণ।
শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের বিষয়কে দুই ভাগে ভাগ করা যায় একটি সাংসারিক জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাস, অন্যটি প্রেমকেন্দ্রিক উপন্যাস।
শরৎচন্দ্রের পূর্বের লেখকরা সংসারকেন্দ্রিক উপন্যাসে একপক্ষের ওপর দোষ চাপিয়ে তাকে প্রবল অত্যাচারী এবং অন্য পক্ষকে নিরীহ অসহায় রূপে অঙ্কন করেছেন। অন্যদিকে শরৎচন্দ্র ন্যায় ও ধর্ম যে পক্ষে, যার হৃদয় সরল ও অবিকৃত, তার মধ্যে কর্কশতা বা অসহিষ্ণুতা আরোপ করে বিরোধকে জটিল করে তুলেছেন। প্রেমবিষয়ক উপন্যাসে তিনি মানুষের সহজ মহিমা ও অন্তরের সুকুমারবৃত্তিকে পাঠকের সামনে করুণরস ও মাধুর্যপূর্ণ করে উপস্থাপন করেছেন।
শরৎচন্দ্র তাঁর পাত্রপাত্রীদের অবৈধ প্রেম এমন নিপুণভাবে উপস্থাপন করেছেন যে পাঠকের স্বাধীন বিচারের ক্ষেত্র থাকে। তিনি সাধারণ পাঠকের লেখক। সাধারণ মানুষের মনের সাধারণ কথা তিনি নিপুণভাবে ব্যক্ত করেছেন। বঙ্কিম উপন্যাসের যে পথ তৈরি করেন, সে পথ ধরে পরবর্তী ঔপন্যাসিকরা এগিয়ে না গিয়ে অন্য পথের সন্ধান করে, রবীন্দ্রনাথ সেই অবরুদ্ধ পথ কিছুটা মুক্ত করেন। কিন্তু তাঁর প্রণালী কাব্যিক।
সে পথ অনুসরণের চেষ্টা পরবর্তী ঔপন্যাসিকরা করেন নি। তাই উপন্যাসের ধারায় তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন ঠিকই কিন্তু পরিধি ও প্রসার ঘটাতে পারেন নি। এই সময় শরৎচন্দ্র উপন্যাসের সমৃদ্ধির জন্য এগিয়ে এসেছেন। তাঁর সম্পর্কে সমালোচকের মন্তব্য:
“তিনি কবিত্বশক্তির অধিকারী না হইয়াও কেবলমাত্র সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণশক্তি, চিন্তাশীলতা ও করুণরস সৃজনে সিদ্ধহস্ততার গুণে বঙ্গ সমাজের কঠিন, অনুর্বর মৃত্তিকা হইতে নুতন রসের উৎস বাহির করিয়াছেন ও উপন্যাসের ভবিষ্যৎ গতির পথরেখা বহুদুর পর্যন্ত প্রসারিত করিয়াছেন। ২২
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আমাদের পারিবারিক জীবনের অভ্যন্তরীপ ও বাহ্য জীবনযাত্রাকে সাহিত্যে তুলে ধরেছেন, আমাদের নারী-চরিত্রের জড়তা ও নির্জীবতা ঘুচিয়ে তাদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও তেজস্বিতা দেখিয়েছেন। সমাজ ব্যবস্থার বৈষম্য ও অত্যাচারের প্রতিবাদ করে স্বাধীন চিন্তার যার খুলে দিয়েছেন, এমন কি তিনি প্রেম বিশ্লেষণ করে প্রেমের রহস্যময় প্রকৃতির ওপর নতুন বোধ নির্দেশ করেছেন। শরৎচন্দ্রের এই পথ ধরে ‘কল্লোল’ পন্থীরা আরো নিচুতলার মানুষের দিকে এগিয়ে গিয়েছেন। তাঁদের সম্পর্কে শরৎচন্দ্র মুন্সীগঞ্জ সাহিত্য সম্মেলনে ভাষণে বলেছেন:
“পূর্বের মতে রাজ-রাজড়া জমিদারের দুঃখদ্বন্দ্বহীন জীবনেতিহাস নিয়ে আধুনিক মাহিত্যসেবীর মন আর ভরে না। তারা নিচের স্তরে নেমে গেছে। এটা আফসোসের কথা নয়। বরঞ্চ এই অভিশপ্ত অশেষ দুঃখের দেশে নিজের অভিমান বিসর্জন দিয়ে রুশ সাহিত্যের মতো যেদিন সে আরো সমাজের নিচের স্তরে নেমে গিয়ে তাদের সুখ-দুঃখ-বেদনার মাঝখানে দাঁড়াতে পারবে, সে দিন এই সাহিত্যসাধনা কেবল স্বদেশ নয়, বিশ্বসাহিত্যেও আপনার স্থান করে নিতে পারবে। ২৩
শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে সমাজ-অস্বীকৃত প্রেমের মহিমা পাওয়া যায়, কিন্তু দৈহিক শুচিতার গতি ভেঙে সেই প্রেমকে শরীরে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার সাহস করেন নি-এখানে শরৎচন্দ্রের সীমাবদ্ধতা। এই সীমাবদ্ধতা ভেঙেছেন জগদীশ গুপ্ত, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসুসহ কল্লোলপন্থীরা।
ইউরোপে পোস্ট-রেনেশাঁস অ-মানবীতন্ত্রী সাহিত্যের পত্তন ডস্টয়েভস্কি এবং বোদলেয়ারের রচনায়। বাংলা সাহিত্যে এর প্রবর্তক জগদীশ গুপ্ত। তিনি সকল অবস্থাতেই তিক্ত, রুক্ষ এবং নৈরাশ্যবাদী। তিনি মানুষের ভেতরের কদর্যতা, নোংরামি দেখিয়েছেন। সমালোচকের মন্তব্য:
“মানুষ সম্বন্ধে এক গভীর অশ্রদ্ধাই তাঁর রচনার প্রধান লক্ষণ। মানুষের মহিমা নয়, মানুষের মহিমাহীনতাই তাঁর বিষয়। ২৪
জগদীশ গুপ্ত (১৮৮৬-১৯৫৭) রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র বলয়ের বাইরের লেখক। শরৎ-রচনার হৃদয়বত্তা জগদীশচন্দ্রের রচনায় নেই। জগদীশচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গি নির্লিপ্ত, তিনি অমোঘ নিয়তিকে বিশ্বাস করেছেন। তিনি উপলব্ধি করেছেন -দুঃখ মানুষের অস্তিত্বের অনিবার্য অঙ্গ। তাঁর অন্ত দৃষ্টি অখণ্ডঃ
“রবীন্দ্র-প্রভাতকুমার, শরৎচন্দ্রের যৌথ প্রয়াসে যে সাহিত্যরুচি গড়ে উঠেছিল, সেই আবহাওয়ার বিরুদ্ধে প্রথম সার্থক শিল্পী-প্রতিবাদ জগদীশ গুপ্তের। জগদীশ গুপ্তের বিভিন্ন সৃষ্টি একটা গোটা সাহিত্যিক যুগের প্রতিক্রিয়া-সঞ্জাত। সেই গভীর তাৎপর্যেই এই লেখক বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে স্মরণীয়।
অন্যদের ক্ষেত্রে যেখানে প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারটা ছিল বুদ্ধিসম্ভব উপলব্ধি, জগদীশবাবুর ক্ষেত্রে সেখানে উপলব্ধিটা জীবনবোধের ফল। জীবনের গূঢ় সমস্যা হিসেবেই তিনি বিষয়গুলিকে শিল্পী হিসাবে ধারণ করেছিলেন। যে-সমস্ত পূর্বতন শিল্প-সৃষ্টি তাঁর স্রষ্টা মানসে বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল, সেগুলো তাঁর কাছে শিল্পরীতির বিচ্ছিন্ন প্রশ্ন নয়। জীবনকে তাঁর নিজের দৃষ্টিতে বুঝতে চাওয়ার প্রেরণা পেয়েছিলেন সেখান থেকে। ২৫
শরৎচন্দ্রের মতো জগদীশচন্দ্রের কাহিনীর পটভূমি গ্রাম্যসমাজ। শরৎচন্দ্রের মতো তাঁর পঙ্কিলতালিপ্ত নর-নারীরাও পবিত্রতার জন্য ব্যাকুল হয়। তাঁদের দুজনের সূচনা এক, কিন্তু পরিণতি এক নয়। নিয়তি জগদীশচন্দ্রের চরিত্রে নিষ্ঠুর পরিণতি ঘটায়। তবে তিনি কখনো জীবনের প্রচেষ্টাকে ছোট করে দেখেন নি। তাঁর উপন্যাসের বিষয় যে মানুষের অমানুষিক মনুষ্যত্বহীনতা, ইতরতা ও নীচতা তা ‘লঘুগুরু’, ‘অসাধু সিদ্ধার্থ’ এবং ‘গতিহারা জাহ্নবী’ সে সাক্ষ্য দেয়।
‘লঘুগুরু’ উপন্যাসে বেশ্যা কিন্তু শুদ্ধান্তকরণ উত্তমের সঙ্গে স্কুল রুচি বিশ্বস্তরের কোনো মানসিক যোগ ছিল না। টুকিকে সে নিজের মেয়ের মতো করে গড়ে তোলে। মায়ের শিক্ষায় কায়মনে পবিত্র টুকি বিয়ের পর পরিতোষ ও সুন্দরীর কদর্য সঙ্গে পীড়িত হয়।
সুন্দরীর কারসাজিতে লম্পট অচিন্ত্যবাবু তার ঘরে ঢুকলে মরিয়া টুকী বলে, “এ কাজ যদি করতে হয়, তবে আপনাকে দেব দেহ, আপনি আমাকে দেবেন টাকা। মাঝখানে ওরা কে?” ব্যর্থ সুন্দরী টুকীকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। টুকী ‘ব্রহ্মাণ্ডব্যাপী অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়ায়। জগদীশগুপ্ত দেখিয়েছেন কলুষবাহিনীর আক্রমণে পবিত্র মানুষকে বারবার অন্ধকারে একা দাঁড়াতে হয়।
‘অসাধু সিদ্ধার্থ’-এ বৈষ্ণবীর গর্ভে ব্রাহ্মণের জারজপুত্র নটবর। সে ধারাবাহিকভাবে মুদির দোকানের চাকর, শখের থিয়েটারে অভিনেতা, অর্থলোভে বৃদ্ধা বেশ্যার শয্যাসহচর হয়। এরপর একটি পবিত্র স্বপ্ন দেখে অজয়াকে ভালোবাসা। সে সিদ্ধার্থের ছদ্মবেশে অজয়ার মন জয় করে। জগদীশগুপ্ত উপলব্ধি করেছেন, ছদ্ম আচরণে নিজেকে নিজের স্বপ্নের কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়া প্রত্যেকের জীবনেরই চরম চাওয়া। নটবরের আত্মচিন্তা ব্যর্থ মানুষদের মনের গোপন অভিপ্রায়:
“শুনতে পাই, জীবন-যুদ্ধে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবার চেষ্টা কীট-পতঙ্গে আছে, উদ্ভিদেও আছে-সেটা বিধিদত্ত প্রেরণা। তবে আমি মানুষ হয়ে কেন ঠিকে থাকতে চাইব না? ………… কীট পতঙ্গ উদ্ভিদ রং বদলায়, আমি একটু নাম বদলেছি, কিন্তু মানুষ তো আমি সেই আছি। [… ….. ধরনী সব সুখ কৃপণের মত লুকিয়ে রেখেছিল এতদিন পরে তার এক অগুলি তপস্যার ফলের মত আমার সম্মুখে ছড়িয়ে দিয়েছে; কেন আমি তা দু-মুঠো ভরে কুড়িয়ে নেব না?” ‘গতিহারা জাহ্নবী’ তে কিশোরীর মন্তব্য:
“এই সন্তান কি স্বামীর স্বামীর আত্মন? স্বামী যাহা অকাতরে দান করিয়া করিয়া ইহকাল ও পরকালব্যাপী কলুষ মর্মে আত্মায় পুঞ্জীভূত করিয়াছিল এই সন্তান সেই অশেষ কলুষজাত ইহা শুভ নহে, ইঙ্গিত নহে, ইহা অবাঞ্ছিত এবং বর্জনীয় কলুষ। সর্পের যেমন বিষনাত থাকে, ঐ পুরুষটির অন্তরে তেমনি একটি জ্বালাময় প্রবৃত্তি আছে- এই সন্তান তাহার সেই প্রবৃত্তির পরিতৃপ্তির চিহ্নমাত্র। বিবাহিতা পত্নীর গর্ভের সন্তানের যে মূল্য লোকে দিয়া থাকে ইহার সে মূল্য নাই ….. ….. তার মুখ দেখিয়া কি সে সকল যন্ত্রণা ভুলিতে পারিবে? যেমন সকল মা পারে? সে তা পারিবে না।
রবীন্দ্রনাথের কুমুর চেয়ে সে চিন্তায় অনেকাংশে অগ্রগামী। তবে কুমুর ক্ষেত্রে কুমুর লাঞ্ছনা তার ব্যক্তিত্বের লাঞ্ছনা, কিশোরীর লাঞ্ছনা তার অদৃষ্টের। ‘কল্লোলের মূল বৈশিষ্ট্য জগদীশ গুপ্তের রচনায়-ই অভিব্যক্ত হয়েছে। অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে বলেছেন,
“তাঁর পূর্বসূরী বলতে গেলে একমাত্র জগদীশ গুপ্তের নাম করা যায় যিনি লিখেছিলেন। ‘লঘুগুরু’, ‘অসাধু সিদ্ধার্থ’। জগদীশ গুপ্তের নির্মোহ নিরাবেগ নৈর্ব্যক্তিক বিজ্ঞজ্ঞানদৃষ্টির প্রয়োগ লক্ষ্য করা গেল মানিকের প্রথম উপন্যাসেই।”২৮
উপন্যাস-সাহিত্যের নবরূপ প্রবর্তনে নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের অবদান অনস্বীকার্য। সংখ্যার দিক দিয়ে তাঁর উপন্যাস প্রথম স্থান অধিকারের দাবি রাখে। যে সকল উপন্যাস উদ্দেশ্যমূলক আদর্শে অনুসৃত হয় নি, সে গুলি অধিক সাফল্যপূর্ণ। ‘লুপ্তশিখা’ উপন্যাসে পতিতা নারী মালতীর চরিত্র অক্ষনে লেখক আদর্শবাদের খাতিরে বাস্তবতাকে ক্ষুণ্ন করেন নি। অনাথ বালক বটুর প্রতি সহানুভূতি ও ভ্রাতৃস্নেহ মালতীর চরিত্রের সুকুমার দিকের অভিব্যক্তি।
অন্যদিকে গণিকাবৃত্তি ও মদ্যাসক্তিও সে বাদ দিতে পারে না। বটুর সামনে পাপ কাজে তার সংকোচও আছে। বটু তাই বলেছে, “মালতীদিদি আমার সত্যিকারের দিদি-জন্মজা দিদি। ” নরেশচন্দ্রের উপন্যাসগুলিতে তাঁর তীক্ষ্ণ মানসিকতা এবং চিন্তাশীল বিশ্লেষণ-নৈপুণ্যের পরিচয় পাওয়া যায়।
তবে তাঁর রচনায় রসানুভূতি ও ভাব-সঞ্চারের তীব্রতার অভাব রয়েছে। অন্তর্ধশ্বের চিত্রতে যেরূপ জটিলতা আছে সেরূপ ভাবগভীরতা নেই। তবে তিনি নতুন ইঙ্গিত ও পথনির্দেশের যারা উপন্যাস শিল্পকে এগিয়ে নিয়েছেন।

