মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিবারাত্রির কাব্য উপন্যাস

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিবারাত্রির কাব্য উপন্যাস । যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিবারাত্রির কাব্য উপন্যাস

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিবারাত্রির কাব্য উপন্যাস

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় গ্রন্থিত উপন্যাস ‘দিবারাত্রির কাব্য’ (১৯৩৫)। এটি একটি প্রেমের উপন্যাস। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে ইংরেজির অধ্যাপক হেরম্ভের জীবনের বিভিন্ন প্রেম নিয়ে উপন্যাসটি লেখা। উপন্যাসটি তিনভাগে বিভক্ত দিনের কবিতা, রাতের কবিতা, দিবারাত্রির কাব্য।

উপন্যাসের শুরু হয়েছে সুপ্রিয়ার বাড়িতে হেরনের বেড়াতে যাওয়া এবং শেষ হয়েছে হেরম্বের সামনে আনন্দের স্বেচ্ছামরণে। বার বছর বয়সে সত্যবাবুর ষোল বছরের মেয়ে মালতীকে বিয়ে করতে চেয়েছিলো হেরম্ব। আবার সুপ্রিয়া তাকে ভালোবাসে কিন্তু এ ভালোবাসাকে তার ছেলেমানুষি মনে হয়। তাই বুঝিয়ে পুলিশের দারোগা অশোকের সাথে বিয়ে দেয় সুপ্রিয়াকে।

বিয়ের পাঁচ বছর পর হেরম্ব সুপ্রিয়ার বাড়ি গেলে সুপ্রিয়া তার সাথে নতুন করে ঘর বাঁধতে চায়, যদিও হেরম্বের একটি মেয়ে আছে আর বউ আত্মহত্যা করেছে। হেরম্ব সুপ্রিয়ার কাছ থেকে ছয় মাসের সময় নিয়ে বেড়াতে আসে পুরীতে। সমুদ্রের পারে একদিন দেখা হয় অনাথের সাথে। অনাথ মালতীর স্বামী। সকলের অমতে একদিন তারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল। হেরম্ব মালতীর সাথে দেখা করার জন্য তাদের বাড়ি আসে। মালতীর মেয়ে আনন্দের মধ্যে সে আবিষ্কার করে ষোল বছর বয়সী মালতীকে।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিবারাত্রির কাব্য উপন্যাস

 

জ্যোৎস্না রাতে আনন্দের চন্দ্রকলা নৃত্য দেখে হেরম্ব মুগ্ধ হয়। বসবাস শুরু করে মালতীদের বাড়ি। হেরম্ব আনন্দের সাথে প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। হেরম্ব আর মালতীর কন্ঠি বদল করতে চায় মালতী। কিন্তু সুপ্রিয়াকে দেয়া সেই ছয় মাস তখনও শেষ হয়নি। তাই কোথায় আছে সুপ্রিয়াকে জানায় হেরম্ব। সুপ্রিয়া অসুস্থ অশোককে নিয়ে পুরীতে আসে। সমুদ্রের কাছাকাছি বাড়ি ভাড়া নেয়। তারপর উপস্থিত হয় আনন্দদের বাড়ি। আনন্দকে দেখে সুপ্রিয়া সর্বাস্থিত হয়।

সুপ্রিয়াকে দেখে মালতী শঙ্কিত হয়। এই দিনই অনাথ আনন্দের মাধ্যমে হেরত্বের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে চলে যায় মালতীকে কিছু না বলে। হেরম্ব সুপ্রিয়াকে পৌঁছে দিতে গেলে মালতী জানতে পারে অনাথের চলে যাওয়ার কথা। সে আনন্দকে অনেক মারে। হেরম্ব এসে আনন্দের অবস্থা দেখে শহর থেকে বরফ এনে পিঠে ঘসে দেয়। মালতী হেরম্বকে আবার কন্ঠি বদলের কথা বলে।

হেরম্ব মনে মনে ভাবে সুপ্রিয়া পুরীতে থাকাকালীন তা সম্ভব নয়। মালতী রাতে ঘুমন্ত আনন্দকে হেরম্বের কাছে রেখে চলে যায়। হেরম্ব মালতীকে কথা দেয় সে আনন্দকে বিয়ে করবে। কিন্তু আনন্দ মালতী ও হেরঘের কথা শুনে ফেলে। আনন্দের মনের শাস্তি নষ্ট হয়ে গেছে। সে নাচ দেখানোর জন্য হেরম্বকে রান্নাঘরের সব কাঠ আর এক টিন ঘি দিয়ে আগুন জ্বালতে বলে। তারপর সেই আগুনের চারপাশে নাচতে থাকে। হেরম্ব মন্দিরের সিঁড়িতে বসে সেই নাচ দেখে।

 

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিবারাত্রির কাব্য উপন্যাস

 

এক সময় নাচ থামায়, তারপর আগুনে ঢলে পরে আনন্দ। এখানে কোমলমতি আনন্দ জটিল জীবনের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেছে। লেখক এ উপন্যাসে খেয়ালি হেরম্বকে আত্মশোধনের দিকে নিয়ে গেছেন একটি মৃত্যুর মাধ্যমে

“সর্বোপরি হেরম্ভের স্ত্রীর আত্মহত্যা, অশোক ও সুপ্রিয়ার ভীতিব্যঞ্জনাপূর্ণ দাম্পত্যজীবন, পুরীতে অপ্রকৃতস্থ উচ্ছ্বাসের মাত্রাধিক্যে অশোকের সুপ্রিয়াকে ছাদ হইতে ঠেলিয়া ফেলার চেষ্টা— এই সমস্ত দৃশ্যে স্বাস্থ্য ও বিকার, জীবন ও মৃত্যু, প্রণয় ও ঈর্ষা – ইহাদের নিবিড় আলিঙ্গনবদ্ধতার চিত্র আমাদের উত্তেজিত কল্পনার সম্মুখে উজ্জ্বল হইয়া ওঠে। ২
উপন্যাসে লেখক মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির অন্তঃসারশূন্যতাকে দেখিয়েছেন।

Leave a Comment