আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দর্পণ উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দর্পণ উপন্যাস
উপন্যাসটি ঝুমুরিয়া নামের একটি গ্রাম এবং কলকাতা শহর দু জায়গাকে কেন্দ্র করে লেখা। গ্রামের কৃষিজীবী, শহরের শ্রমজীবী, গ্রাম এবং শহরের শাসক গোষ্ঠী আর শোষিতের পক্ষে কাজ করে এমন কিছু মানুষ দর্পণ উপন্যাসে এসেছে। লেখক শ্রেণিবিভক্ত সমাজের চিত্র এ উপন্যাসে দেখিয়েছেন। ড. সরোজ মোহন মিত্র লিখেছেন:
“মানিকবাবু যে পথের সন্ধান করে বেড়াচ্ছিলেন এই উপন্যাসে যেন তার সন্ধান পেয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে মানিকবাবু নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন বিষয়বস্তু আনয়ন করে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছেন, নতুন জীবনের আশ্বাস দিয়েছেন।”
উপন্যাসের শুরু হয়েছে ঝুমুরিয়া গ্রামের বীরেশ্বর মাইতির মেয়ে রম্ভার পরিচয় দিয়ে। বীরেশ্বর অন্যায় সহ্য করতে পারে না, স্বদেশী করে দু-এক বার জেলেও গেছে, দাঙ্গা করে মানুষ খুনের দায়ে দুবছর জেল খেটেছে। রম্ভা বাবার মতো তেজি আর জেদি, চেহারায়ও বাড়ত – জবরদস্ত। বয়স হলেও কোনো ছেলেকে বিয়ে করতে রাজি হয় নি। রম্ভা জেদ করে বাবা আর পিসির সাথে কলকাতা দেখতে লোকনাথের বাড়ি গেলো।

লোকনাথ কলকাতায় থাকে, ঝুমুরিয়া গ্রামের ধনী লোক। কলকাতায় তার কয়েকটি কারখানা আছে, বড় ব্যবসায়ী। তার বাড়িতে আত্মীয়- অনাত্মীয় অনেকেই থাকে। লোকনাথের কাঠের গোলা ও আসবাব তৈরির কারখানায় লোকনাথের ভাগ্নে ম্যানেজার উমাপদের সঙ্গে শ্রমিকদের গণ্ডগোল হলে রামপাল নামের শ্রমিক মধ্যস্থতা করে। উমাপদ তাকে অন্যায়ভাবে জেলে দেয়। লোকনাথ তাকে ছাড়িয়ে আনে।
রামপাল শ্রমিকদের দাবি দাওয়া নিয়ে লোকনাথের সঙ্গে কথা বলে। রম্ভার রামপালকে ভালো লাগে। লোকনাথের ছেলে হীরেন এক অধ্যাপক ও বৈজ্ঞানিকের মেয়ে মমতাকে পছন্দ করে। মমতা আর তার ছেলেবেলার বন্ধু আরিফ কৃষ্ণেন্দুর নেতৃত্বে শ্রমিকদের জন্য কাজ করে। বাধ্য হয়ে হীরেনও তাদের সঙ্গে থাকে। কৃষ্ণেন্দুর মধ্যস্থতায় রম্ভা আর রামপালের বিয়ে হয়। রামপালের সঙ্গে রম্ভা বস্তিতে গিয়ে ওঠে। বিয়ের পর রম্ভা বুঝতে পারে রামপাল কুঁড়ে প্রকৃতির মানুষ, তার মধ্যে কোনো আদর্শ নেই। রম্ভা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
অন্যদিকে হীরেন আর মমতার বিয়ে হয়। মমতাও বুঝতে পারে হীরেন অন্তর থেকে শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে একাত্ম হতে পারেনি। হীরেন আর মমতার দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। এক সময় মমতা অধৈর্য হয়ে হীরেনের কাছে থেকে চলে আসে। কৃষ্ণেন্দুর কাছে অনুমতি নিয়ে মমতা বস্তিতে বসবাস শুরু করে। কিন্তু বস্তির লোকরা তাকে আপন ভাবতে পারে না বরং সন্দেহের চোখে দেখে, মেয়েরা মনে করে যে সে শ্রমিক পুরুষদের স্বাদ নিতে এসেছে।

বস্তির বিভিন্ন অনিয়ম শুধরাতে গিয়ে আরো গোলমাল বাধিয়ে ফেলে। অবশেষে কৃষ্ণেন্দু তাকে নিয়ে যায় আবার হীরেনের কাছে। ঝুমুরিয়া গ্রামে দাঙ্গা শুরু হয়। হেরম্ব নামের এক কন্ডাক্টর জমির ধান কাটতে না দিয়ে কৃষকদের দিয়ে গাছ কাটানোর কাজ করাতে চায়, বীরেশ্বর তাতে বাধা দিলে হেরম্ব পুলিশ আনে, বীরেশ্বরকে ধরে নিয়ে যায়। বীরেশ্বর বেড়িয়ে এসে কলকাতায় কৃষ্ণেন্দুর সঙ্গে দেখা করে। কৃষ্ণেন্দু গ্রামে পৌঁছানোর আগেই হেরম্ব বীরেশ্বরকে খুন করে।
কৃষ্ণেন্দুর কাছে সংবাদ শুনে রম্ভা রামপালকে নিয়ে গ্রামে আসে। তারপর দিন কৃষ্ণেন্দু হীরেন আর নরেনকে নিয়ে ঝুমুরিয়া আসে। হীরেনের এই দাঙ্গা-হাঙ্গামা ভালো লাগে না। সে রামপালকে নিয়ে বিলেতি মদের খোঁজে হেরম্বের বাড়ি যায়। আর এদিকে হেরম্বের আদেশে পুলিশ কৃষ্ণেন্দু আর রম্ভার ছোট ভাই মোহনলালকে ধরে নিয়ে যায়। পরদিন রস্তার নেতৃত্বে মিছিল হয় বিকেলে বটতলার বিশাল জনসমাবেশে গুলি চলে- রামপালসহ দুজন পুলিশ এবং গ্রামের আরো কয়েকজন মারা যায়।
হেরম্বকে পুড়িয়ে মারে গ্রামের লোক, গর্ভবর্তী রম্ভাকে পুলিশ ধরে। দু দিন পর মমতা আর আরিফ আসে গ্রামে। এ উপন্যাসের মাধ্যমে লেখক শ্রেণিবিভক্ত সমাজের মানুষগুলোর স্বরূপ দেখিয়েছেন । মেহনতি মানুষের মধ্যে বিভেদের চিত্র এখানে আছে। তবে তারা ঐক্যবদ্ধ হলে যে সব কিছু পাল্টাতে পারে, সেটাই উপন্যাসের মূলসুর।