মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তেইশ বছর আগে পরে উপন্যাস

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তেইশ বছর আগে পরে উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

 

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তেইশ বছর আগে পরে উপন্যাস

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তেইশ বছর আগে পরে উপন্যাস

‘তেইশ বছর আগে পরে’ (১৯৫৩) উপন্যাসটি জগদীশ নামের এক যুবকের তেইশ বছর আগের এবং তেইশ বছর পরের কাহিনী। লেখক এ উপন্যাসের মাধ্যমে মানুষের দেহের রোগের মতো মনের রোগটিও যে প্রকট তা দেখিয়েছেন।

প্রমথের বন্ধু জগদীশ। সে জমিদারের ছেলে। এম. এ. পাস করে পড়তে যাওয়ার ছুতোয় বিলেতের উদ্দেশ্যে জাহাজে ওঠে জগদীশ, তার চার বছর পর বাবার অসুখের সংবাদে দেশে ফেরে সে, কিন্তু তার পাঁচ দিন আগে বাবা মারা গেছে। শ্রাদ্ধের পর তিন মাস বাড়ি থেকে জগদীশ কলকাতা চলে যায়। সেখানে গিয়ে সে অদ্ভুত দান করে:

“বাড়িঘর বিষয় সম্পত্তি যা ছিল সব বিক্রি করে একটা ফান্ড করে দিয়েছে বাংলা থেকে প্রতি বছর দুটি মেয়েকে মিউজিক শিখবার জন্য বিলাতে পাঠাতে। “(৯খ, পৃ- 232)

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তেইশ বছর আগে পরে উপন্যাস

 

দশ বছর জগদীশের আর কোনো খোঁজ জানে না প্রমথ। তারও কিছুদিন পর রাঁচির এক গ্রাম থেকে জগদীশ টাকা চেয়ে একটি পোস্টকার্ড পাঠিয়েছে প্রমথকে। পরদিনই প্রমথ রওনা হয় জগদীশের উদ্দেশ্যে। এই প্রমথ জগদীশের কাহিনীটি বলেছে। উপন্যাসের শুরু হয়েছে এভাবে:

“বন্ধুর জীবনের কাহিনী। যে বয়সে যৌবন বিদায় নেয় না সেই বয়সে বন্ধু পৃথিবী হতে চিরতরে বিদায় নিয়েছে।” (৯খ, পৃ-২৩১)

রাঁচি থেকে চব্বিশ মাইল দূরে হুডু ফলস। সেখানে বুনো মানুষদের সঙ্গে খড়ে ছাওয়া মাটির ঘরে জগদীশ থাকে। তার অনিচ্ছায় আদিবাসীদের পাল্লায় পরে জগদীশ সাধু বাবা হয়ে উঠেছে, দ্রুত নামও ছড়িয়ে পরেছে। শহর থেকেও লোক আসে, ছাত্ররাও আসে জগদীশের কাছে। জগদীশের এই অবস্থা দেখে প্রমথ অবাক হয়ে যায়, আরো অবাক হয় গভীর রাতে ঘুম ভেঙে দেখে জগদীশ রমনীর রক্তমাখা শাড়ি চুম্বন করছে। প্রমথ চিন্তা করে:

“মনে হলো শাড়িটির ভাঁজে ভাঁজে প্রত্যেকটি সুতার পাকে পাকে সুধা সঞ্চিত হয়ে আছে, অধরের স্পর্শ দিয়ে অনন্তকাল জগদীশ সে সুধা পান করে যাবে।” (৯খ, পৃ- ২৩৫)

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তেইশ বছর আগে পরে উপন্যাস

 

পরদিন বেলা তিনটায় ফলস দেখতে গেলো তারা। জলপ্রপাতের পাথরে বসে জগদীশ বললো তার কাহিনী। বিলেত থেকে ফেরার পথে জাহাজে পরিচয় হয়েছিলো চিত্রাদের পরিবারের সঙ্গে। বিদেশে অনেক নারী সুধা পান করেও জগদীশ ঘর বাঁধার কথা ভাবেনি। কিন্তু চিত্রাকে তার ভালো লাগলো।

চিত্রা বিলেতে মিউজিকের ওপর পড়া শেষ করে কলকাতা ফিরছে। তারপর জগদীশ নিজ বাড়ি ঢাকা এসে তিন মাস পর কলকাতা গিয়ে চিত্রাদের সঙ্গে দেখা করলো। পরিচয় হলো জলধি রায়ের সঙ্গে। সেও বিলেত ফেরত। জলধি চিত্রাকে ভালোবাসে। কিন্তু চিত্রা মনে মনে ভালোবাসে জগদীশকে, অথচ, জানায় না। জলধি চিত্রাকে জগদীশের বিদেশ জীবনের উচ্ছৃঙ্খলতার কথা শোনায়, চিত্রা তখন বলে জগদীশ একদিন তার রূপকে নয়, তাকেই ভালোবাসবে। জগদীশ সত্যিই চিত্রাকে ভালোবাসে, কিন্তু ছোট্ট একটি ভুলে চিত্রা জগদীশকে ভুল বোঝে।

চিত্রারা হুজ্জু ফলসে, বেড়াতে যায়। এ কথা শুনে জগদীশও সেখানে যায়। জগদীশকে দেখে চিত্রা পিছিয়ে যেতেই পাথরে স্লিপ কেটে জলপ্রপাতের মধ্যে প্রাণ হারায়। তারপর থেকে জগদীশ এখানেই রয়ে গেছে। গভীর রাতে সে একা জলপ্রপাতের ওই পাথরে বসে থাকে। বিভিন্ন রকম মদ খায়। এসব দেখে লোকে তাকে সাধু পুরুষ ভাবে। জগদীশ যতই বলে সে সাধু নয়, ততই তার জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তেইশ বছর আগে পরে উপন্যাস

 

প্রবোধ নামে এক ধনী জগদীশের কাছে আসে। সে কুঁড়ের পাশে পাকা চালা তুলে দেয়। ভক্তদের টাকা জগদীশ গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়। সব ভক্তদের ক্ষেত্রেই দেখা যায় মনের অসুখ। জগদীশ তখন একটা মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্র খুলতে চায়। তার কাছে আসে জোড়া খুনের আসামি রত্নাকর।

প্রবোধের পুত্রবধূ ললনা আর তার বন্ধু সুদর্শনা আসে জগদীশের কাছে। রত্নাকর আর সুদর্শনা ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে। তারা চিকিৎসা কেন্দ্রে কাজ করে। এ সময় জলধি রায় আসে আদিবাসীদের বিদ্রোহ দমনের ভার নিয়ে। তার উদ্দেশ্য জগদীশকে জড়ানো। কিন্তু জলধির মনস্কামনা ব্যর্থ হয়ে যায়। শহরের কাছাকাছি নির্জন স্থানে হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। জগদীশ জলপ্রপাতের মায়া ছেড়ে সেখানে চলে যায়।

হঠাৎ উগ্র মদের নেশা বন্ধ করায় তার ডিলিরিয়াম ট্রেসনেস রোগ হয়। রোগ সারাতে সে হাসপাতালে ভর্তি হয়। এভাবে একটি সুস্থ জীবন বোধের প্রত্যাশায় উপন্যাসটি শেষ করেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ।

Leave a Comment