তৃতীয় পর্যায়ের গল্প (সত্তরের দশক ও অন্যান্য)

আজকের আলোচনার বিষয়ঃ তৃতীয় পর্যায়ের গল্প (সত্তরের দশক ও অন্যান্য)। যা আলাউদ্দিন আল আজাদের ছোটগল্পে জীবনবোধের রূপ রূপান্তরের অন্তর্গত।

 

তৃতীয় পর্যায়ের গল্প (সত্তরের দশক ও অন্যান্য)

 

তৃতীয় পর্যায়ের গল্প (সত্তরের দশক ও অন্যান্য)

আলাউদ্দিন আল আজাদের পঞ্চাশের দশকের গল্পে গ্রাম বাংলার মাটি ও সংগ্রামী মানুষের উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করা যায়। এ পর্বে তাঁর প্রতিবাদী চেতনা খুব উজ্জ্বল। ষাটের দশকে তিনি রাজনৈতিক দলের নেতা, বিশ্ববিদ্যায়ের ছাত্র। এ দশকে তাঁর কালের নানা সমস্যা উপস্থাপনে প্রতিবাদী ধারায় লিখেছেন। তবে ষাটের দশকের গল্পে মানুষের লিবিডোতাড়িত কার্যকলাপ নিয়ে সফল বিশ্লেষণ করেছেন।

পঞ্চাশের দশকের গল্পে কৃষকদের প্রতিরোধ ছিল মহাজন শ্রেণীর বিরুদ্ধে। আর ষাটের দশকে প্রতিবাদী চেতনা নব্য পাকিস্তানি শাসক ও শোষকবর্গের বিরুদ্ধে। আলাউদ্দিন আল আজাদের সেই প্রতিবাদী চেতনার প্রদীপ সত্তরের দশকেও সমানভাবে প্রজ্জ্বলিত। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এদেশের মানুষের রুখে দাঁড়াবার মধ্যেই সেই প্রতিবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। দীর্ঘ নয় মাস এদেশের মানুষ দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।

আলাউদ্দিন আল আজাদ মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তাই শুধু শিল্পীর কল্পনায় নয় বাস্তবের কঠিন মরণপণ লড়াই, হত্যাকাণ্ড প্রভৃতি বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তিনি তুলে ধরেছেন। তাঁর যে সকল গল্পে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তী নানা কাহিনীর রূপায়ণ দেখা যায় তাহল ‘রূপান্তর’, ‘নীরবতা’, ‘দূরযাত্রা’, ‘মুক্তিযোদ্ধা’, ‘সংক্ষিপ্ত শব্দ’, ‘যুদ্ধ নয়’, বিস্ফোরণ’, ‘আগন্তক’, ‘আমার রক্ত’, ‘ফারখত’, ‘আমাকে একটি ফুল দাও’, ‘নাকফুল’, স্বপ্ন আমার’, ‘চাষাভূষা’, ‘জলনাঙ্ক’, ‘কাক’প্রভৃতি ।

“যুদ্ধ নয়’ গল্পটি মূলত ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের গণহত্যার কাহিনী নিয়ে রচিত। একটি কুকুরের জবানীতে গল্পের কাহিনী বর্ণিত। এখানে ২৫ শে মার্চের ভয়াবহতা ছাড়া আরও যে সব প্রসঙ্গ ব্যক্ত হয়েছে তাহল ১৯৭০ সালের নির্বাচন উত্তর ক্ষমতা হস্তান্তর না করা, ষড়যন্ত্র ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যার প্রক্রিয়া প্রভৃতি। ‘বিস্ফোরণ’ গল্পেও লেখক মূলত ধারণ করেছেন মার্চ মাসের কাহিনী।

সত্তরের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের নেতা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলেও ক্ষমতালোভী পশ্চিম পাকিস্তানিরা এই এলাকার প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। তাদের এই কুচক্রী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ সোচ্চার হয়ে ওঠে। উত্তাল জনতার চাপা বিক্ষোভ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ব্যাপক আকার ধারণ করে। মূলত জনতার সে বিস্ফোরণই এখানে শিল্পরূপ লাভ করেছে। যেমন :

“বিস্ফোরণ ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই এখন এবং শেষ মুহুর্তে ঘটলোও তাই। আলোচনায় বসা ভাওতামাত্র। সময় ক্ষেপণের ভাওতা, সমর প্রস্তুতির জন্য। ফিলসফির ছাত্র কেমন করে হল এমন গাণিতিক। কিন্তু চিবুকটা ক্রমে কঠিন হয়ে উঠেছিল, সে বিড়বিড় করল, অস্ত্র কিনেছে আমাদেরই ঘামের পয়সায় এবং সেই অস্ত্র আমাদেরই বুকে মারছে ওরা।

 

তৃতীয় পর্যায়ের গল্প (সত্তরের দশক ও অন্যান্য)

 

‘আগন্তুক’ গল্পটি মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে রচিত হলেও এর তাৎপর্য ব্যাপক। একজন মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিচারণে পুরো নয় মাসের ঘটনা ব্যক্ত হয়েছে। পাক বাহিনীর লুন্ঠন, অগ্নিকাণ্ড এবং ধর্ষণসহ নারকীয় ঘটনাবলি এখানে ফুটে উঠেছে। ফরহাদ নামের এক শিল্পী মামার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তারই বর্ণনায় কাহিনী মুখরিত। আগন্তুক চরিত্র এখানে একটি চেতনা। সে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে মুক্তির বাসনা জাগিয়ে তোলে। তাইতো গল্পের সমাপ্তিতে আগন্তক যখন শহীদ হয় তখন সে ফরহাদকে উদ্দেশ্য করে বলে যায়

“তোমার জন্যই এতক্ষণ ছিলাম আমি। তোমরাই পারবে এখন, আমি আসি । যাবেন ? পাতা ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়ালো মনে হোলো অনেক উপরে তার মাথা। মধ্য আকাশে, রাহুগ্রস্থ সূর্য দেখার মতো ঘাড় বেকিয়ে মুখ উঁচু করে তার স্বরে শুধোলাম, কোথায় যাবেন ? তার রক্তাক্ত বিশাল কাঁধ শুধু একটু ঝাকুনি খেল, দুঢ়মুষ্টিবদ্ধ বাম হাত। মুখে সিগ্ধ হাসির রেখা চলে যেতে যেতে জলদগম্ভীর স্বরে বলল, ভিয়েতনাম, জেরুজালেম যাবো। প্রয়োজনে আবার আসবো।

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাই ‘ফারখত’ গল্পটিতে পাওয়া যায়। উক্ত গল্পে মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা বর্ণিত হয়েছে।

“একটু একটু কাঁপছিল, নিজেকে সংযত করে সুফিয়া বলল, কই কিছু করছি নাতো? হঠাৎ বজ্রপাত ঘটেছে, এই যা, গোপন সূত্রে খবর, আলোচনাটা একটা আইওয়াশ মাত্র, সৈন্য সাজাবার সময়ের জন্য। আজ রাত্রেই ওদের আক্রমণ। এখন আর পেছনে তাকাবার সময় নেই। আমরা এক গ্রুপ যাচ্ছি। প্রথমে বাসে করে দেশে তারপর ইডেন ছাত্রী সংসদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদিকা সুফিয়া নাসির। সবারই প্রিয়। নিজে গান করত, নাচতেও পারত। এখন সংগঠনের কাজে বেশী তৎপর। ডাকসোর নেতৃত্বে ছাত্ররা প্যারেড ও অস্ত্র মহড়া শুরু করলে, ওর নেতৃত্বে একটি ছাত্রীদল গিয়ে যোগ দিয়েছিল।

কথাশিল্পী আলাউদ্দিন আল আজাদ ‘রূপান্তর’ গল্পে একটি পরিবারের কাহিনীর মধ্যে সমগ্র বাংলাদেশের অবস্থা তুলে ধরেছেন। জয় গল্পের প্রধান চরিত্র। সে শহরের ছেলে এবং যুদ্ধ করার জন্য গ্রামে চলে যায়। তরুণ যোদ্ধারা ট্রেনিং নেয়ার জন্য ভারতের আগরতলা যায়। দেশের মানুষেরা জীবন বাঁচাতে ভূখণ্ড ছেড়ে সীমান্তের ওপারে চলে যায়। তারই চিত্র এই গল্পে পাওয়া যায়। যেমন

“সূর্য অস্ত যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে ছটা নৌকা ছাড়লো শরণার্থী বোঝাই করে, যাদের সঙ্গে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সংগ্রামী তরুণেরা দেখা যাচ্ছে বৃহদাকার ব্রীজ এবং আশুগঞ্জ, পূর্বাঞ্চলের শক্তিশালী মিলিটারী ঘাঁটি আমরা ঘাড় নিচু জড়াজড়ি করে বসে আছি, বুকের ভিতরটা ঢিবঢিব করে, বুঝি অকারণ।

আরেকটু এগুলে লালপুর যেখানে মাঝিরা গাও ছেড়ে পাটক্ষেতের কাছ দিয়ে চলতে লাগলো যার অর্ধ গোলাগুলি শুরু হলে আত্মরক্ষার সুযোগ লাভ। লালপুরে আরেক ঘাঁটি, তারপাশ কাটিয়ে রসুলপুর যখন, তখন রাত দশটা; এখানে আরো উঠলো শরণার্থী, গাদাগাদি গাঁটরি বোচকা; কেউ কেউ কাঁদছে, যারা রয়ে গেলো পেছনে কান্নায় বলছে বিদায় এবং বুড়ো একজন হাউমাউ শব্দে দোয়া করছিলো।

প্রকৃতপক্ষে ‘রূপান্তরে মুক্তিযোদ্ধার অভিজ্ঞতা খুবই বাস্তবধর্মী, কিন্তু যখন যে অল্প সময়ের জন্যে সকলে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসে জানতে পারে, তার বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে, তখন মায়ের আদেশে দলবিচ্ছিন্ন হয়ে রয়ে যায় মায়ের সঙ্গে।

‘নীরবতা’ গল্পে আছে স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকবাহিনীর নারী নির্যাতনের কথা। ‘নীরবতা’ গল্পটি কথিত হয়েছে নদীর জবানিতে। তুফানী নামক এক তরুণী দখলদার বাহিনীর লালসার শিকার হয়। তুফানীর ভাইকে পাকবাহিনীরা ধরে নিয়ে যায় এবং তাকে পেতে হলে তুফানীকে যেতে হবে।

নুরা নামক এক দালাল এসে খবর দিলে তুফানী মেজরের নৌকায় যায়। তার পর তাকে জড়িয়ে রয়ে পানিতে পড়ার চেষ্টা করে; তার পিতাও সাহায্য করে নৌকা উল্টে দিতে এবং তারা হারিয়ে যায় নদীর খরস্রোতে। তুফানীর মত নাম নাজানা হাজারো নারীর আত্মাহুতির বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আমাদের স্বাধীনতা। সেইসকল আত্মত্যাগী নারীর চির অম্লান হয়েছে এভাবেই ঃ

“আমি জানি কেউ বলবেনা তুফানীর কথা, উচ্চারণ করবেনা নাম ওর, ছবি ছাপা হবে না তরুণ সাংবাদিকের রোমাঞ্চকর গল্পের সংবাদপত্রের শেষের পাতায়। স্মরণ করবে না জিভে জিভে প্রশংসিত আধুনিক কবি, কিন্তু তার জন্য থোড়াই কেয়ার, সভ্যতার থেকে বহুদূরে শস্য গাছ গাছালি পাখির ডানার হলুদে সবুজে এবং সাগরের টানে অনিঃশেষ নিরিবিলি স্রোতে যে নীরবতা, তাই ওর অমর জীবনচরিত্র।

 

তৃতীয় পর্যায়ের গল্প (সত্তরের দশক ও অন্যান্য)

 

‘আমার রক্ত’ গল্পটিতে আছে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার নির্মমভাবে জীবনদানের কাহিনী। অসীম সাহসের সাথে যুদ্ধ করে সে বেঁচে যায়। কিন্তু শহীদদের তালিকায় তার নাম লেখা ছিল বিধায় কেউ বিশ্বাস করেনি যে, সে বেঁচে আছে। যুদ্ধের পরে ফিরে এসে দেখে তারই প্রিয়তমার অন্যত্র বিয়ে হয়ে যাচ্ছে এমন সময় ছিনতাইকারী হিসেবে জনতার হাতে প্রাণ দেয়।

আমাকে একটি ফুল দাও’ গল্পটিও একই ধারার। মৃত বলে ঘোষিত ওমর ফারুক ফিরে আসায় বিস্মিত হয়েছে সহযোদ্ধা বন্ধু হায়দার। কেননা সে পেয়েছে মরণোত্তর খেতাব ‘বীর প্রতীক’। অন্যদিকে তার স্ত্রী স্বপ্নার বিয়ে হয় দেবরের সঙ্গে। ওমর ফারুকের সন্তান সোনিয়া দাদুর কাছে বলেছে, দাদু আমি বাবার কাছে যাব। এমন সময় শিশুটির কাছ থেকে একটা ফুল উপহার নিয়ে হারিয়ে গেল মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক।

‘মুক্তিযোদ্ধা’ গল্পটিতে রয়েছে স্বাধীনতা পরবর্তী দেশের বিশৃঙ্খলার কাহিনী। যে স্বপ্ন নিয়ে এদেশের মানুষ যুদ্ধ করেছিল মূলত তার বাস্তবায়ন না দেখে পঙ্গু মোজাহার বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছে। তারই বর্ণনার দেশময় নৈরাজ্যের চিত্র ফুটে উঠেছে।

“যে অবস্থা আজরাইল যে কোনো মুহুর্তে জানটা করচ করে নিতে পারেন। এক শত্রু পরাজিত হয়ে চলে গেছে, কিন্তু এখন চতুর্দিকে শত্রু। একটু সুযোগ পেলেও ছাড়বে না। এর মধ্যে যেটুকু সুযোগ পাওয়া যায়, জীবনটাকে একটু ভোগ করে নেয়াই উত্তম বৈকি। ৬

`সংক্ষিপ্ত শব্দ’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ভ্রাতার উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও আসলে তা স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের সন্ত্রাসের কাহিনী। স্বাধীনতার পর এদেশে গুপ্তহত্যা হয়েছে, অবৈধ অস্ত্রের দ্বারা এক শ্রেণীর লোক জাতির অবশিষ্ট শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করেছে। তখন নিখোঁজ হয়েছেন বহু সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং নাম না জানা অনেক তরুণ।

‘নাকফুল’ গল্প যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে রচিত হলেও এতে আছে এক বীরাঙ্গনার কাহিনী। ফুলজান যুদ্ধের সময় বন্দী শিবিরে ছিল। ১৯৭১ সালে দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে সেই বীরাঙ্গনাদের একজন ফুলজান ফুলজানের মত হাজারো নারীর স্বপ্ন যুদ্ধের কারণে তছনছ হয়ে গেছে। রিলিফ চোর সবুজ মিঞা ফুলজানকে বিক্রি করে দেয়। অবশেষে নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে সে তার স্বামী রুছমতের সাক্ষাৎ পায়। সমাজ তাকে ঘৃণা করলেও স্বামী রুছমত তাকে সাদরে গ্রহণ করে।

‘চাষাভূষা’ ও ‘পল্লীগ্রাম’ গল্পটিতে যুদ্ধের পরবর্তী বাংলাদেশের সমাজে বিরাজমান স্বাধীনতাবিরোধী কুচক্রীদের প্রসঙ্গ উঠে আসছে। ‘চাষাভূষা’ গল্পে লক্ষ্য করা যায় যুদ্ধের সময়ে দেয়া গণকবরের হাড় নিতে আসা দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে গ্রামের অশিক্ষিত লোকগুলো রুখে দাঁড়ায়।

তাই দেখা যায় শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে রমিজ ও তার সঙ্গীরা কবর খুঁড়ে হাড় তোলেনি বরং দালালদের হত্যা করেছে। ‘পল্লীগ্রাম’ গল্পটি রয়েছে মিথ্যাবাদী সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে এক মুক্তিযোদ্ধার রুখে দাঁড়াবার কথা। মুক্তিযোদ্ধা আজহারের ছোটবোন কমলাকে গ্রামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে সে প্রাণ হারায়।

‘স্বপ্ন আমার’ গল্পটিতে এক বিমানবাহিনীর ক্যাপ্টেনের বীরত্ব গাথা। মূলত এখানে এক বীর শ্রেষ্ঠের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে যে নিজ দেশ মাতৃকার জন্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়।

‘দূরযাত্রা’ গল্পটি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা না হলেও যুদ্ধের নানা স্মৃতিচিহ্ন এখানে পাওয়া যায়। ‘নীরবতা’ গল্পের মত দূরযাত্রা গল্পেও নারীর অস্তিত্ব ও সম্ভ্রম রক্ষার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। গ্রামের এক কৃষকের স্ত্রী নূরবানু। সহজ-সরল নূরবানকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে শহরের উদ্দেশ্যে নিয়ে আসে দালাল মান্নান ।

কিন্তু মান্নানকে নৌকার মধ্যে মেরে অজ্ঞান করে স্বামীর কাছে ফিরে আসে সে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঘোষিত হয় ন্যায়ের জয়।

‘কাক’ গল্পে আছে যুদ্ধের পরবর্তী সময়ের এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর নিঃসঙ্গ যন্ত্রণার চিত্র। অবশেষে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জিনাতমহলের একাকিত্বের অবসান হয়। মূলত এখানে যুদ্ধের নানা কথা কাজের লোক গুলজারের মাধ্যমে জানা যায়। ‘জলনাঙ্ক’ গল্পেও আছে যুদ্ধের পরবর্তী সময়ের এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর দুঃখ বেদনা, নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বের চিত্র।

মিলির স্বামী মাহফুজ যুদ্ধে গিয়ে প্রাণ হারায়, স্ত্রী তারই স্মৃতিচারণ করে। স্বামীর চেতনাকে বুকে ধরে স্ত্রী দেশের অরাজক পরিস্থিতিতে মুক্তিকামীদের সঙ্গে একাত্ম হয়। আলাউদ্দিন আল আজাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত গল্পে যেমন যুদ্ধের নয় মাসের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে তেমনি যুদ্ধপরবর্তী দেশের পরিস্থিতির কথাও রয়েছে। তাঁর মুক্তিযুদ্ধের গল্পগুলো আমাদের সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তাঁর এসব গল্প আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস। কাহিনী বর্ণনার অসাধারণ দক্ষতা এবং শিল্পশৈলীতে সমৃদ্ধ তাঁর এসব গল্প নতুন চেতনায় উদ্দীপ্ত।

আলাউদ্দিন আল আজাদ মানুষের লিবিডোতাড়িত কার্যকলাপের চমৎকার বিশ্লেষণ করে যে সব গল্প লিখেছেন তাহলে ‘যখন সৈকত’, ‘ধোঁয়া’, “জীবনজমিন’, ‘ফেরেশতা’ প্রভৃতি।

 

তৃতীয় পর্যায়ের গল্প (সত্তরের দশক ও অন্যান্য)

 

‘যখন সৈকত’ একটি ট্রাজেডির গল্প। এ গল্পে রয়েছে দরিদ্র এক সাংবাদিকের স্ত্রীর অসুস্থ স্বামীকে বাঁচানোর প্রাণান্তর প্রচেষ্টা। ক্যান্সারে আক্রান্ত কলিমকে বাঁচানোর জন্য স্ত্রী মর্জিনা নিরুপায় হয়ে সহযোগিতা নেয় স্বামীর বন্ধুর। একটি শর্তে বন্ধুর চিকিৎসার খরচ দেবে তালিব। মর্জিনাকে দেহদান করতে হবে। স্ত্রীর এই ঘটনা জানে না স্বামী। তাকে বন্ধুর সঙ্গে মেলামেশা করতে দেখে সমুদ্র সৈকতে স্ত্রীকে হত্যা পরিকল্পনা করে স্বামী। ব্যভিচারিণী স্ত্রীর মুখে সব ঘটনা জানতে পারলেও শেষ রক্ষা হয়নি। সমুদ্রের জলস্রোতে স্ত্রী ভেসে যায় এবং তাকে রক্ষা করতে গিয়ে স্বামীও ডুবে মারা যায়।

‘জীবনজমিন’ গল্পের শুরু হয়েছিল চমৎকারভাবে। পদ্মানদীর তীরবর্তী চর এলাকার মানুষেরা মহাজন শ্রেণীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ গল্পের প্রধান চরিত্র হানিফ শেখ। গল্পের শেষে দেখা যায় প্রতিবাদী চেতনা নয়, বরং অবাস্তব জৈবিক বাসনার উদ্রেক ঘটে হানিফ শেখের মধ্যে।

সে নিজ বিধবা পুত্রবধূর সঙ্গে মিলিত হয়। শ্বশুরের সন্তান গর্ভে ধারণ করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পের ভিখু ও পাচীর মত ‘জীবনজমিন’ গল্পের হানিফ শেখ ও তুফানী অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। সমাজের সকল নিয়ম কানুন শাসন বারণের উর্ধ্বে তাদের মানব প্রবৃত্তি। এই প্রবৃত্তির বিশ্লেষণ আলাউদ্দিন আল আজাদ এ পর্বে অধিক আগ্রহী ছিলেন। যেমন ঃ

“ভোর হয়ে এলো; ওপর দিয়ে ধুপধাপ দ্রুত ডানা জাপটিয়ে দলে দলে উড়ে যাচ্ছে সাগর পাখিরা যখন একটি ছোট নৌকো অবিশ্বাস দাঁড়ের টানে ছপছপ পানি কেটে এগিয়ে চলছে পূর্বদিকে। কেউ জানবে না ওরা কোথায় চলে গেছে। ওরা নিজেরাও জানে না। হতে পারে সে অচেনা লোকালয়ে নতুন কোন দ্বীপ, যেখানে এখনো কোন নর-নারীর পায়ের ছাপ পড়েনি, সারবেঁধে কিংবা পাশাপাশি কেবল জেগে রয়েছে নরম পেলব পলিমাটি।

কথাসাহিত্যিক জগদীশ গুপ্তের মত আলাউদ্দিন আল আজাদের এ পর্বের গল্পে বৃদ্ধের রতিক্রিয়ার অতিরিক্ত বিবরণ লক্ষ্য করা যায়। ‘জীবনজমিন’ গল্পের মত ‘ফেরেশতা’ গল্পেও রয়েছে এক বৃদ্ধের তীব্র জৈবিক বাসনার চিত্র। গল্পের মাহমুদ সাহেব একজন খ্যাতিমান ইঞ্জিনিয়ার। বাইরের চেহারায় তিনি ধার্মিক ও নীতিবান মানুষ। তার বাহ্যিক এই সত্তার অন্তরালে রয়েছে আরেক সত্তা। সে ফেরেশতা পরিচয় দিয়ে মিলিত হয় কাজের মেয়ে তরুণী শরবর্তীর সঙ্গে। রুগ্ন স্ত্রীর হাতে ধরা পড়ে লজ্জিত হয় এবং স্ত্রী তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে আমি আপনাকে কিছুই বলবনা। আপনি ফেরেশতা হয়েই থাকেন।

‘ধোঁয়া’ ও ‘জমা খরচ’ গল্প দুটো চা- বাগানের শ্রমিকদের নিয়ে রচিত। এখানে আঞ্চলিক জীবনযাত্রার পাশাপাশি শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি লেখকের অসাধারণ মমত্ব লক্ষ্য করা যায়। তবে ‘ধোঁয়া’ ও ‘জমা খরচ’ দুটো গল্পে লিবিডো ভাবনাই – শেষ পর্যন্ত মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। ‘ধোঁয়া’ গল্পে কামিন কালী নামের একটি তরুণী চা-বাগানের ম্যানেজারের বাসায় ঝি এর কাজ করতে এসে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়।

জৈবিক সত্তার কাছে ম্যানেজার আবিদের সামাজিক সত্তার পরাজয় ঘটেছে। অসুস্থ স্ত্রীর কাছে শেষ পর্যন্ত কালী মেয়েটিকে পাগলী বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। অথচ তারই সন্তানের মা হতে যাচ্ছে কালী। কালী সেই অধিকার চাইতে এসে লাঞ্ছিত হয়।

“তুই সাচ জানিস সাহেব আমি পাগলী নই। তুই মুকে প্যার করছিলি মনে নেই সায়েব ? মুকে লিবি না সায়েব? কালীর একথায় ক্ষেপে যায় আবিদ। তখন সে ঘনশ্যামকে হান্টার আনতে আদেশ করে। কিন্তু কালী অনড়। তাকে যখন আবিদ চাবুক মারছে তখন শুধু সে বলেছে, মুকে কেনে মারবি সায়েব ? মোর পেটে তোর লেড়কা আছে, সে কুলি হইবে তাকে মারিস তোর লেড়কা কুলি হইব, তাকে মারিস্ সায়েব, হি হি হি হি।

‘জমা খরচ’ গল্পের মূলেও আছে লিবিডো ভাবনা। সুকিয়া তার স্বামীকে রেখে প্রেমিকের কাছে পালিয়ে যায়। দৈহিক সম্পর্কের অতৃপ্তির কারণে বানওয়ারী লালের স্ত্রী পরকীয়া প্রেমে লিপ্ত হয়। এখানে মূলত প্রেম মুখ্য নয়, বরং নারীর কামনা বাসনাই প্রাধান্য পেয়েছে।

আলাউদ্দিন আল আজাদ মানুষের স্বার্থপর প্রবৃত্তির বিশ্লেষণ করেছেন যেসব গল্পে তাহল ‘পুসকাট’, ‘ঠান্ডাভাত’ ও ‘জলোচ্ছ্বাস’। আভিজাত্যের মোহে মানুষ আপনজনকে ভুলে যায় এবং তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে দ্বিধা করে না। মানবতার কথা, দায়িত্ব-কর্তব্যের কথা চাপা পড়ে যায় আর লাঞ্ছিত হয় স্নেহ ভালোবাসার কোমল কোষগুলি। ‘পুসকাট’ এমনই একটি গল্প।

গ্রামের এক বৃদ্ধা অতিকষ্টে সন্তানকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। তার পুত্র শহরে আভিজাত্যের আসনে অধিষ্ঠিত। একদিন পুত্রকে দেখার বাসনা নিয়ে গরীব মা পুত্রের পছন্দ মতো কিছু পুলি পিঠা সঙ্গে নিয়ে আসে। পুত্রের বাড়ির সামনে এসে কাজের ছেলের দ্বারা অপমানিত হয়। এমন সময় পুত্রবধূকে শাশুড়ি ছেলের লেখা পোস্টকার্ডটি দেখায়। কিন্তু বিশ্বাস হয় না। এর পর ছেলে এসেও মাকে চেনে না, তখন মা পুত্রকে চিনতে পারে। ছেলের প্রিয় পুলি পিঠা নিয়ে ক্ষণিকের জন্য বাড়িতে স্থান পেলেও তার পিঠাকে ঘৃণা করে পুত্রবধূ।এসব দেখে অপমানে, লজ্জায় পোস্টকার্ডটি হাতে নিয়ে বৃদ্ধা বেরিয়ে পড়ে এবং অবশেষে রাজপথেই তার মৃত্যু ঘটে।

মানুষের এই দুর্ব্যবহার ও অমানবিকতা নিয়ে রচিত ‘ঠান্ডাভাত’ গল্পেও আছে একই বক্তব্য। বড় ভাই অতিকষ্টে ছোট ভাইকে লেখাপড়া শিখিয়েছে। ছোট ভাই বর্তমানে একটি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান পদে আসীন। অর্থ ও বিত্তের মোহে এবং আভিজাত্যের কারণে গরীব বড় ভাইকে সে পরিচয় দিতে দ্বিধা করে। রুগ্ন বড় ভাই ও তার স্ত্রী খুব আশা বুকে নিয়ে গ্রাম থেকে শহরে ছোট ভাই এর বাড়িতে আসে। কিন্তু ছোট ভাই বড় ভাই ও ভাবীকে ভিক্ষুক হিসেবে ঠান্ডাভাত খেতে দেয়। ফলে ভীষণভাবে দুঃখ পায় বড় ভাই। এ কারণে ছোট ভাই এর দেয়া পাঞ্জাবি ও শাড়ি ফেরত দিয়ে যায়।

‘জলোচ্ছ্বাস’ গল্পটি মূলত ১৯৯১ সালের দক্ষিণাঞ্চলের ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঘটনা নিয়ে রচিত হলেও লেখক এখানেও মানুষের প্রবৃত্তিকে বিশ্লেষণ করেছেন। দুর্যোগের রাতে আবু আহমদ খন্দকার দরিদ্র শ্রমিক কেয়ামতের পরিবারকে আশ্রয় দেয়নি। ফলে ঝড়ের কবলে পড়ে তাদের মৃত্যু হয়।

অপরদিকে নিজ পুত্র দুর্যোগের মধ্যে চিংড়ির ঘেরে গিয়ে আর ফেরে আসেনি। এই ঘটনা নিয়েই খন্দকার আত্মদ্বন্দ্বের দ্বারা পীড়নের শিকার হন। অবশেষে অনুশোচনায় শেষ পর্যন্ত তার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। ‘জলোচ্ছ্বাস’ গল্পে লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজের ঝি আয়শা খাতুনের আঞ্চলিক সংলাপের ব্যবহার করেছেন।

“আরিক্কিনি হন খালামা আরিক্কিনি হন নইলি বাঁচিবেন কেন গরি। এতবড় সংসার ও টিকাই নাইন পরিবো। ভাইউরে আল্লাহলই গোয়িগুই, ইবা জোয়ান আছিল ত হনকিয়ার নিক্কা চখ না লাগাইতো, বড় গম আছিল আরে হত – ভালবাইসতো, আপন বড় বইনুর মত আইনতো গত ঈদের সমত হত উগ্যা হোত্ব দিয়িলি।

আলাউদ্দিন আল আজাদ নারীকে প্রাধান্য দিয়ে বা প্রধান করে এ পর্বে বেশ কিছু গল্প লিখেছেন। যেমন শিউলিঝরা দরোজা’, ‘নবরত্নহার’, ‘দেয়াল আয়না’, ‘হেড মিসট্রেস’ প্রভৃতি। ‘শিউলিঝরা দরোজা” গল্পে রয়েছে দাম্পত্য বিচ্ছিন্নতার চিত্র। আধুনিক যুগে পারিবারিক বন্ধনের শীতল ছবিই এখানে ফুটে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক স্বামীকে অবহেলা করে স্ত্রী পরকীয়া প্রেমে আসক্ত হয়েছে এক ক্ষমতাধর ব্যক্তির সঙ্গে। কন্যা রুমির বিশ্লেষণে তাই ধরা পড়েছে :

“একুশ বছর ঘর সংসার করেছেন অথচ কত সহজভাবে ছেড়ে গেলেন ? এ মৃত্যু না জন্মান্তর ? এতকাল পরে আবার কি নতুন সার্থকতার অন্বেষণ? অনেক প্রাপ্তি, তবু কামনার শেষ নেই, এটা অবশ্য সত্য, কিন্তু আত্মত্যাগেই তো মহত্ত্ব? এই সন্তান সন্ততি, তাদের মুখ চেয়েও তিনি নিবৃত্ত হতে পারেলেন না ? এরই নাম বুঝি প্রেম ? অপরিনামদর্শী, স্বার্থপর, অবিবেচক ?

‘নবরত্নাহার’ গল্পেও রয়েছে নারীর স্বার্থপরতা, অতিরিক্ত, লোভী মানসিকতার চিত্র। সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সচিব নাজমুল হকের স্ত্রী দিলরুবা স্বামীকে ব্যবহার করে নানা মূল্যবান উপহার গ্রহণ করে। ‘নবরত্নাহার’ এ অনিন্দ্য সুন্দরী নারীর মধ্যে জেগে ওঠে সপিনী। পিতার বিত্তের গৌরব করে, সৎ কর্মকর্তা স্বামীর সাধ্যাতীত ব্যয়ের প্রত্যাশা করে এবং সেই সততাকে তুচ্ছ করে উপঢৌকন নেয় অনুগ্রহপ্রার্থী ব্যবসায়ীর কাছ থেকে।

 

তৃতীয় পর্যায়ের গল্প (সত্তরের দশক ও অন্যান্য)

 

এই যে, মানৱ প্ৰবৃত্তি, এই বৃত্তি, অন্ধ নিয়মের জটিল গল্প ‘হেড মিসট্রেস’। শিক্ষক মহান, তার দায়িত্ব মানুষগড়া। তিনি আদর্শে অটল, অন্যায়কে কখনো প্রশ্রয় দেন না। আলোচ্য গল্পের হামিদা মাবুদও তাই। চেয়ারম্যানের কন্যাকে শাসন করতে তিনি ভয় পাননি। তবে শাসনের সঙ্গে স্নেহের যে সহ অবস্থান তা যেন হামিদা মাবুদ অনেক পরে উপলব্ধি করেছেন। নিজের ছেলের ক্ষেত্রে শাসনের সঙ্গে – স্নেহের ছোঁয়া ছিল না বলে ছেলেটি বিপদগামী হয়েছে।

‘দেয়াল আয়না’ গল্পেও দাম্পত্য বিচ্ছিন্নতার চিত্র লক্ষ্য করা যায়। পিতা-মাতার বিচ্ছেদে সন্তান হয়ে পড়ে অসহায়। উচ্চবিত্তের বিলাসী জীবনযাপনের চিত্রে মূলত শিকড়হীনতাই ধরা পড়েছে। বাবা ও মায়ের স্নেহ বঞ্চিত হয়ে কন্যা হিলি নিঃসঙ্গ জীবনের সঙ্গী করেছে গৃহশিক্ষককে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে রচিত গল্পে মূলত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অর্থনৈতিক মন্দা, নারী নির্যাতন, যুব সমাজের অবক্ষয়, সন্ত্রাস, খুন, বেকারত্ব ও সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রভৃতি সমসাময়িক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ফুটে উঠেছে।

এ ধারার উল্লেখযোগ্য গল্পগুলো হল: ‘পাংগাশ’, ‘টেলিফোন’, মহামান্য আদালত’, ‘এশিয়া মেশাল’, আত্মহত্যার অনধিকার’, ‘বখশিশ’, বাতাসের চোখ’, ‘প্রস্তরযুগ অনাবিষ্কৃত ‘ ‘কুপি’, ‘পৌষ স্বপ্ন’, ‘ঈশ্বরের পলায়ন’, ‘স্থলবন্দী’, ‘পুতু’, ‘চিৎকার’, ‘চেতনার রং’ প্রভৃতি।

‘মহামান্য আদালত’ গল্পে আশির দশকের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অসাধু কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও লোভী মানসিকতার ছবি ফুটে উঠেছে। এছাড়া যুব সমাজের অবক্ষয়, বেকারত্ব ও হতাশার কথাও এখানে রয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উন্নয়ন বরাদ্দের বেশির ভাগই কর্তাব্যক্তিরা যদি লুটপাট করে খায় তবে দেশের উন্নতি আসেনা। সেই চিত্রই প্রত্যক্ষ করেছেন সৎ কর্মকর্তা এবাদত সাহেব।

“বিছানায় ধরে নিয়ে শুইয়ে দিলে চেতন অচেতনের মধ্যে একসময় তার – অস্পষ্ট স্মৃতিতে ভাসল আদিগন্ত একটা বিশাল পাংগাশ মাছ করাতের মত দাঁত বার করে ওঁচানো পুচ্ছ নেড়ে নেড়ে বঙ্গোপসাগর থেকে হুমড়ি মেরে এবড়ো খেবড়ো রুটির মতো বাংলাদেশটাকে ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে এবং সবটাই গিলে ফেলতে বেশিক্ষণ লাগবে না। ” ১১

‘থুতু’ গল্পেও রয়েছে উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তার দুশ্চরিত্র ও মিথ্যাচারের কথা। মৃত ব্যক্তির সনদ নিয়ে আজ গোলাম মুর্শেদ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তার স্ত্রী সেই মুখোশ উন্মোচন করে দেয়।

“টেলিফোন’ গল্পটি মূলত বাস্তব ঘটনার রং ফেরানো কাহিনী। একজন সৎ ক্লিয়ারিং এজেন্টকে সন্ত্রাসীরা হত্যা করে এবং টেলিফোনে তার স্ত্রীকে আর্থিক সহায়তাদানের প্রস্তাব দেয়। দুষ্কৃতিকারীরা মঞ্জুর আলমকে গুলি করেই তাদের নিষ্ঠুরতা শেষ করেনি বরং তারা পুরো পারিবারকে করেছে ভীত সন্ত্রস্ত। যেমন :

“ওরা তাকে ধরাধরি করে শুইয়ে দিল বেডরুমের বিছানায় পুরুঠোঁট, চোখ জোড়া লাল তৃতীয় ব্যক্তি রাহিজাকে একধারে ডেকে নেয় এবং গম্ভীর স্বরে বলল, ‘কোনো আওয়াজ করবেন না; টু শব্দটিও না। মঞ্জুর ভাই কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যাবেন। আপনি নিশ্চয়ই নিজের মঙ্গল চান, চান ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তা?

“ঈশ্বরের পলায়ন’ গল্প রয়েছে গ্রামের সংখ্যা লঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের চিত্র। ঈশ্বরচন্দ্র সূত্রধরের অবর্তমানে তার স্ত্রী ও বাড়িঘর দখল করে এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। সেই আনসার আলীর ভয়ে জীবন বাঁচাতে সে মিনতি করে বলেছে :

“আমারে মাইরো না আনসার দা, আমারে হত্যা কইরো না। আমারে পলাইয়া যাইতে দাও। আমি পলাইতেছি। *১৩

‘কুপি’ গল্পে আলাউদ্দিন আল আজাদ মঙ্গাপীড়িত রংপুর এলাকার চিত্রই মূলত তুলে ধরেছেন। দরিদ্র কৃষকের পরিবার সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারে না। নির্মম সেই কঠিন জীবনঘনিষ্ঠ ছবি, ‘কুপি’ গল্পে স্পষ্ট। সন্তান মায়ের কাছে খাবারের জন্য চিৎকার করছে :

“আওরা গুলির মত এগিয়ে তার কাপড় টেনে ধরল, আবার চিৎকার করে ঠ্যাং নেড়ে বলল, আমি ফ্যান খামুনা। আমারে ভাত দে মা ভাত দে। ভাত দে খামু, আমি। ১৪

‘পৌষ স্বপ্ন’ গল্পে রয়েছে আদম ব্যাপারীদের প্রতারণার কাহিনী। গ্রামের এক সহজ সরল কৃষক বিদেশে যাওয়ার আশায় ঘরবাড়ি বিক্রি করে টাকা দেয়। তার কষ্টের টাকাগুলো নিয়ে কেটে পড়ে আদম ব্যাপারী। শহরে সে দরিদ্র কৃষক সহায় সম্বল হারিয়ে রাস্তার ভিক্ষুকে পরিণত হয়।

‘স্থলবন্দী’ গল্পটি যুব সমাজের অবক্ষয়ের চিত্র। বিউটি, মাশুক ও শাহরিয়ার এই তিন জন অবক্ষয়ের প্রতিমূর্তি। যে যুব সমাজ জাতির আগামীর কর্ণধার, তারা আজ বিপথগামী, বিপর্যস্ত, হতাশাগ্রস্ত। তাদের অধঃপতিত অবস্থার জন্য এদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দায়ী।

নারী নির্যাতনের কাহিনী নিয়ে রচিত হয়েছে ‘বখশিশ’ ও ‘প্রস্তরযুগ অনাবিষ্কৃত গল্প দুটি। সমাজের কিছু মুখোশধারী ব্যক্তি নারীকে নিজ স্বার্থে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। অর্থলোভী সেই নর পিশাচদের কথাই রয়েছে ‘বখশিশ গল্পে। গ্রামের এক সরল ও সুন্দরী গৃহবধূকে তার স্বামী বিক্রি করে দেয়। প্রস্ত- রযুগ অনাবিষ্কৃত’ গল্পে আলাউদ্দিন আল আজাদ নারীর প্রতি নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্ররা প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কারের সন্ধানে বের হয়। তারা বেশ কিছু পুরানো পাথর আবিষ্কার করে। শেষ পর্যন্ত নৌকার মাঝির কাছে ছাত্ররা জানাতে পারে সেই পাথরের ইতিহাস। এগুলো কোনো প্রস্তর যুগের নয়, আধুনিক যুগের প্রমাণ। এক মাওলানা কীভাবে তার তিন নম্বর বিবি মেহেরজানকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে নৌকার মাঝি তাই বর্ণনা দিয়েছে। যেমন :

“সোনা মৌলার লোকেরা বেশ গইনতা গর্ত খুঁড়ছিল, নিচে কিছু মাড়ি চাইল্যা মেহেরজানরে কোমর ইস্তক চোহায়; উপরে কার্ডের খুডি গাইড়া তাইরে মোড়া দড়িদা বানছিল। কত কান্নাকাড়ি করলো, গলা ফাডাইয়া চেঁচাইলো। কেউ হুনলো না। মৌলার হুকুমে একদল জোয়ান আদম মারতে লাগল। মারলো মারলো মারলো। একশো একটা শক্ত শক্ত পাথর।

“আত্মহত্যার অধিকার’ গল্পে মধ্যবিত্তের সংকট ও সংগ্রামের চিত্র ফুটে উঠেছে। অর্থের জন্য ছোট ভাই ভর্তি হতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন বড় বোন নিজের সম্ভ্রম বিক্রি করে টাকার ব্যবস্থা করে দেয়।

 

তৃতীয় পর্যায়ের গল্প (সত্তরের দশক ও অন্যান্য)

 

‘চেতনার রং’ গল্পে আছে নারীর স্বাধীনসত্তার কথা। মায়ের পছন্দের পাত্রকে মনি বিয়ে করেনি। নিজ ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তায় সে অটল ছিল এবং স্বার্থবাদী মায়ের ভুল সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখান করে চাকুরিতে যোগদান করেছে।

‘চিৎকার’ গল্পে সমাজের অস্থিরতার চিত্র রয়েছে। মা রাজিয়া ফয়েজ তার কন্যার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। পঙ্কিল সমাজে নারীর প্রতি নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা দিনে দিনে বাড়ছে। তারই ছবি ‘চিৎকার’ গল্পে ফুটে উঠেছে। ‘এশিয়ামেশাল’ গল্পেও আভিজাত্যের মুখোশে নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করার দিকই স্পষ্ট হয়েছে। মূলত সমাজের বাস্তব চিত্রই এখানে প্রকাশ পেয়েছে।

Leave a Comment