তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাসের ভূমিকা

আজকের আলোচনার বিষয়ঃ তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাসের ভূমিকা । যা তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাসের ভূমিকা

 

তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাসের ভূমিকা

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী। তাঁর রচিত বেশ কয়েকটি উপন্যাস বাংলা চিরায়ত কথাসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তারাশঙ্করের উপন্যাসে প্রধানত বাংলার সামাজিক বিবর্তন এবং সমকালীন রাজনৈতিক জীবন শিল্পিত হলেও সমাজের নানা শ্রেণি-পেশা-গোত্র ও বর্ণের মানুষের জীবন-বাস্তবতার রূপায়ণেও তিনি সমানভাবে দক্ষ। অবক্ষয়িত সামন্ত সমাজের সমাজপতি এবং উন্মেষিত প্রাক্-ধনতান্ত্রিক সমাজের নব্য-ধনিকের দ্বন্দ্ব তারাশঙ্করের উপন্যাসের আকর্ষণীয় বিষয়।

তবে অবক্ষয়িত সমাজের ক্রান্তিকালের সংকটই কেবল তাঁর রচনাকে অমর করে রাখেনি, তাঁর রচনায় বিধৃত সমাজের প্রান্তবাসী মানুষ, বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশের আদিবাসী নানা নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের জীবনের অনুপুঙ্খ রূপায়ণও তাঁর অসামান্য সাফল্যের স্মারক। তিনি সমাজবিজ্ঞানী কিংবা নৃতত্ত্ববিদ ছিলেন না। কিন্তু তাঁর ছিল এক অন্তর্ভেদী সমাজদৃষ্টি ও জীবনবীক্ষা।

স্বকীয় এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তিনি তাঁর উপন্যাসে বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের সউৎস নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে রূপ দিতে সমর্থ হয়েছেন। আদিবাসী মানুষের জীবন নিয়ে রচিত তারাশঙ্করের উপন্যাসসমূহ আজ কেবল সাহিত্যেরই গৌরব নয়; জ্ঞানের আন্তঃশাখার, বিশেষত নৃবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাসবিদ্যা ও ভূগোলশাস্ত্রের বিদ্যার্থী ও গবেষকদের কাছেও আকরগ্রন্থের মর্যাদায় ভূষিত।

তারাশঙ্কর যে-সব উপন্যাসে আদি নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও আর্থনীতিক বাস্তবতার স্বরূপ অঙ্কন করেছেন তার মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য উপন্যাসসমূহ হল হাঁসুলী বাঁকের উপকথা (১৯৪৬), নাগিনী কন্যার কাহিনী (১৯৫২) ও অরণ্য-বহ্নি (১৯৬৬)।

 

তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাসের ভূমিকা

 

এই তিনটি উপন্যাসকে অবলম্বন করেই তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ শীর্ষক বর্তমান অভিসন্দর্ভ প্রণয়ন করা হয়েছে। বক্ষ্যমাণ অভিসন্দর্ভে তিনটি আদি নৃ-গোষ্ঠী তথা কাহার কৌম, বিষবেদে কৌম এবং সাঁওতাল কৌমের মানুষের জীবনের রূপ, লক্ষণ, বৈচিত্র্য এবং নিয়তি ও সম্ভাবনা তারাশঙ্করের উপন্যাসে কীভাবে রূপায়িত হয়েছে তার স্বরূপ ও প্রকৃতি বিশেষিত হয়েছে। এই বিশেষণের ক্ষেত্রে বর্তমান অভিসন্দর্ভে গ্রহণ করা হয়েছে বর্ণনামূলক গবেষণা-পদ্ধতি ।

ভারতীয় উপমহাদেশে যে-সব আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে তার মধ্যে নানা কারণে উল্লিখিত তিনটি নৃ- গোষ্ঠী বিশিষ্ট। মানব সভ্যতার বিবর্তনের যে ইতিহাস, তার সুষম সুফল বঞ্চিত এইসব জনগোষ্ঠী তথাকথিত সভ্য নাগরিক মানুষের অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে যুগে যুগে।

আদিবাসী হয়েও এদের কোনোটি ‘নিজ বাসভূমে’ উপেক্ষিত ‘পরবাসীর’ জীবননিয়তির দুর্ভোগ বহন করে চলেছে আজো। তথাকথিত সভ্য ও স্বার্থান্বেষী মানুষ, বিশেষত ঔপনিবেশিক আমলের বহিরাগত শক্তি ও তাদের ক্ষমতাবলয় ভুক্ত জমিদার-মহাজন এবং উপনিবেশ-উত্তর কালের স্বাধীন রাষ্ট্রের সরকারসমূহ নিজেদের স্বার্থে ও প্রয়োজনে এইসব গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষকে ব্যবহার করেছে।

বাস্তু ও খাদ্যের প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে তারা কৃষিজমি ও গ্রাম প্রতিষ্ঠায় তাদের শ্রমকে কখনো স্বল্পমূল্যে, কখনো-বা বিনামূল্যে ক্রয় করে নিয়েছে। তবু এইসব কৌমজনতা বারবার পরাভূত হয়েও পুনরায় নিজেদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। কোনো গোষ্ঠী বহিরারোপিত শক্তি ও চেতনার আক্রমণে স্বভূমি থেকে উলিত হয়ে হয়েছে সংস্কৃতি-হারা, কোনো গোষ্ঠী স্বস্থান থেকে উৎখাত হয়ে যাযাবর জীবনের দুর্ভাগ্যকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে ।

কিন্তু এ কথাও সত্য যে, সংস্কৃতির স্বকীয়তা এবং ওই সংস্কৃতির বলয়ের মধ্যে নিজেদের টিকিয়ে রাখার প্রেরণাই তাদের জীবনের অমোঘ নিয়তি, তাদের বর্তমান অস্তিত্বেরও স্মারক। সভ্যতাগর্বী মানুষের অবহেলা আর গোষ্ঠীগত সাংস্কৃতিক প্রেরণার পরস্পরবিরোধী টানাপোড়েনই মূলত আদিবাসী সংস্কৃতির রক্ষাকবচ গড়ে তুলেছে।

যে আঞ্চলিক ভূগোল তারাশঙ্করের শৈশব-কৈশোর ও যৌবনের লালনক্ষেত্র, বিভিন্ন আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠীর পদচারণা ও জীবন-যাপনায় তা ছিল ঋদ্ধ। রাঢ় বাংলার ওই বিশিষ্ট ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা তারাশঙ্কর শৈশবকাল থেকেই নিবিড়ভাবে মিশেছেন বিভিন্ন গোষ্ঠীর আদিবাসী মানুষের সঙ্গে, দেখেছেন তাদের স্বকীয় জীবন-যাপন পদ্ধতি, স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি।

 

তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাসের ভূমিকা

 

তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন তাদের আর্থনীতিক জীবন, জাতিগত উৎস ও স্বরূপ এবং উত্থান-পতন ও সম্ভাবনা। আর স্বোপার্জিত এই অভিজ্ঞতাকেই তিনি রূপায়িত করেছেন কয়েকটি বিখ্যাত উপন্যাসে। আদিবাসী জীবনের প্রসঙ্গকথা ছড়িয়ে আছে তাঁর নানা উপন্যাসে। কিন্তু আমাদের আলোচ্য তিনটি উপন্যাসে অথগুরূপে তিনি তিনটি আদি নৃ-গোষ্ঠীর জীবনকেই অবলম্বন করেছেন।

ওই তিনটি উপন্যাসে বিধৃত কৌমজীবনের অর্থাৎ তিনটি স্বতন্ত্র কৌমের জীবনধারা তথা সমাজ সংস্কৃতি ধর্ম অর্থনীতি এবং জাতিগত উৎসের যে পরিচয় তারাশঙ্কর উপস্থাপন করেছেন তার স্বরূপ ও প্রকৃতি বিশেষণের উদ্দেশ্যেই বর্তমান অভিসন্দর্ভ প্রণীত হয়েছে।

এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ শীর্ষক বর্তমান অভিসন্দর্ভ “ভূমিকা” ও “উপসংহার”সহ স্বতন্ত্র দুটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত হয়েছে। অভিসন্দর্ভের প্রথম অধ্যায়কে আমরা চিহ্নিত করেছি “পরিপ্রেক্ষিত” নামে এ অধ্যায়ে বিভিন্ন কৌম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তারাশঙ্করের সম্পৃক্তি, তাদের সম্পর্কে ঔপন্যাসিকের মনোভাব এবং উপন্যাসোক্ত তিনটি নৃ-গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য ও স্বরূপ বিশেষণ করা হয়েছে।

আলোচনার সুবিধার জন্য এ অধ্যায়কে আমরা চারটি স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদে বিন্যাস করেছি। যথাক্রমে এই পরিচ্ছেন চারটি হল : প্রথম পরিচ্ছেদ : তারাশঙ্করের দৃষ্টিতে আদিবাসী মানুষ; দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : ‘কাহার কৌম’; তৃতীয় পরিচ্ছেদ ‘বেদে কৌম’; চতুর্থ পরিচ্ছেদ : ‘সাঁওতাল কৌম’। অভিসন্দর্ভের দ্বিতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম “তারাশঙ্করের উপন্যাসে কৌমজীবনের রূপায়ণ”।

 

তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাসের ভূমিকা

 

আলোচনার সুবিধার্থে এ অধ্যায় বিন্যস্ত হয়েছে তিনটি পরিচ্ছেদে। এ অধ্যায়ে অবলম্বিত তিনটি উপন্যাসে বিধৃত কৌমজীবনের স্বরূপ বিশেষিত ও মূল্যায়িত হয়েছে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ের অন্তর্গত পরিচ্ছেদ তিনটি হল যথাক্রমে : প্রথম পরিচ্ছেদ : হাঁসুলীবাঁকের উপকথা উপন্যাসে কাহার জীবনের রূপায়ণ’; দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে বিষবেদে জীবনের রূপায়ণ’ ।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ : অরণ্য-বহ্নি উপন্যাসে সাঁওতাল জীবনের রূপায়ণ’। সবশেষে দুটি আলোচিত অধ্যায় সূত্রে প্রতিপাদিত প্রত্যয়কে শিদ্ধান্তের আকারে “উপসংহার” অংশে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিসন্দর্ভে আলোচিত ও প্রতিপাদিত বিষয়াদির সম্পূরক সংযোজন হিসেবে “উপসংহার” অংশের পরে একটি পরিশিষ্ট’ সংযোজিত হয়েছে।

এতে সংকলন করা হয়েছে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনপঞ্জি ও গ্রন্থপঞ্জি’, ‘তারাশঙ্কর-বিষয়ক গ্রন্থপঞ্জি’, ‘তারাশঙ্কর-বিষয়ক উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধপঞ্জি’ এবং ‘সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি’।

Leave a Comment