আজকের আলোচনার বিষয়ঃ তারাশঙ্করের কাহার কৌম । যা তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ এর অন্তর্ভুক্ত।

তারাশঙ্করের কাহার কৌম
আদিম গোষ্ঠীভিত্তিক সমাজব্যবস্থার ক্রমবিবর্তিত রূপ বর্তমান মানবসভ্যতা। প্রজ্ঞা ও মেধাজাত শিক্ষা, প্রযুক্তি ও দর্শনকে স্ব-নৃতাত্ত্বিক অন্তঃস্রোতে বাহিত করে পৃথিবীর উন্নত জাতিগোষ্ঠী নিজস্ব আর্থ-সামাজিক ও মানবিক বৃত্তটিকে বিকেন্দ্রীকৃত ও প্রসারিত করছে যুগ যুগ ধরে।
অপরদিকে তথাকথিত পশ্চাৎপদ জাতিসত্তার ধারক তথা আদিবাসীরূপে পরিগণিত জনগোষ্ঠী পার্থিব আধিপত্য বিস্তারের অসম প্রতিযোগিতায় আত্মসমর্পণ করেছে বাধ্য হয়ে। ফলত নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক-সমাজতাত্ত্বিক-ঐতিহাসিক স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে আধুনিক সভ্যতার পৌনঃপুনিক সংঘাত তাদেরকে করেছে গোষ্ঠীগতভাবে আত্মকেন্দ্রিক, তারা হয়ে উঠেছে আদিম সংস্কৃতির ঘেরাটোপে স্বেচ্ছাবন্দি।
একদিকে নৃতাত্ত্বিক বিশুদ্ধতা রক্ষার একান্ত বাস্তব দায়বদ্ধতা, অপরদিকে স্বাজাত্য অস্তি ত্ব-ধ্বংসের আশঙ্কা এই কৌম গোষ্ঠীসমূহের এক চিরায়ত নিয়তি। যে কোনো আদিবাসী সম্প্রদায়ের সার্বিক পরিচয় অনুধাবনের ক্ষেত্রেই এ দৃষ্টিকোণটি বিবেচনাযোগ্য। অর্থাৎ পূর্ব-ভারতের সাঁওতালদের ন্যায় বৃহৎ আদিবাসী গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে যেমন এই বিবেচনাটি প্রযোজ্য, তেমনি পূর্ব-ভারতীয় কাহার কিংবা বিষবেদে সদৃশ ক্ষুদ্রতর আদিবাসী গোষ্ঠীসমূহও এই বাস্তবতার ঊর্ধ্বে নয়।
এ কারণে উপর্যুক্ত দ্বান্দ্বিক প্রেক্ষাপট থেকেই বর্তমান অভিসন্দর্ভে পূর্বভারতের ‘কাহার’ নামে পরিচিত ক্ষুদ্র কৌম জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক সমাজতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে।
অসংখ্য ভারতীয় আদিবাসীর ক্ষুদ্র একটি শাখা কাহার নৃ-গোষ্ঠী। এরা স্বতন্ত্র কোনো বৃহৎ আদিবাসী সম্প্রদায় নয় বলেই এদের সম্পর্কে বিস্তারিত নৃতাত্ত্বিক বিবরণ তেমন পাওয়া যায়না। তারাশঙ্কর তাঁর আমার কালের কথা গ্রন্থে লিখেছেন, ‘কাহার বলে কোনো নির্দিষ্ট জাত বাংলাদেশে নেই। হরিজন যাদের বলি আমরা এদের মধ্যে যারা পালকি বয়ে থাকে তারাই বাংলাদেশে কাহার। ধরা যাক বাগদী সম্প্রদায়।
বাগদীদের মধ্যে যারা পালকী বয় তারা বাগদী কাহার, যারা বয়না তারা শুধুই কাহার। ‘তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রাঢ়ের আদিবাসীদের সম্বন্ধে এত অনুসন্ধিৎসু ছিলেন যে তিনি তাদের নৃ-তাত্ত্বিক, সমাজতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। এ কারণেই আদিবাসী সংক্রান্ত তাঁর প্রদত্ত তথ্য এবং তত্ত্ব গ্রহণীয়।
বাংলা ভাষায় রচিত সমাজবিদ্যার নানা শাখার গ্রন্থে আকর-উৎস বিবেচনা করে উপাত্ত হিসাবে তাঁর রচনাংশ উদ্ধৃতির দৃষ্টান্ত সুলভ। কাহারদের সম্পর্কেও তাঁর মতামত, পর্যবেক্ষণ ও বর্ণনা বিশ্বস্ত ও বস্তুনিষ্ঠ। তারাশঙ্কর স্বীকার করেছেন যে, কাহার সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত যোজনায় ও সামাজিক রীতিনীতির বর্ণনায় তিনি কোথাও অতিরঞ্জন করেননি। কাহার নামে ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী বিহার ও তৎসংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বীরভূম, বাঁকুড়ায় বাস করে।
এরা পালকী বহন, ভার বহন, চাষ-বাস ও ভৃত্যের কাজে পারদর্শী। ১৯১১ সালে অভিভক্ত বাংলায় এদের সংখ্যা ছিল ৮৯,৬৯৪; ‘ শাখা গোষ্ঠী হলেও স্বতন্ত্র নামে চেনা যায়, কাহার নামে এমন একটি গোষ্ঠীর অস্তিত্ব পরিষ্কারভাবেই বিদ্যমান। The Tribes and Castes of Central Provinces of India গ্রন্থেও কাহারদের সম্পর্কে তারাশঙ্করের মতের সমর্থন পাওয়া যায়।
এই গ্রন্থে কাহারদের বৃহৎ কোনো আদিবাসী গোষ্ঠীর বিচ্ছিন্ন শাখাগোষ্ঠী হিসেবে দেখানো হয়েছে— ‘No scientific distinction can be made between the Kahars and Dhimars, both names being applied to the same people. In northern India the term Kahar is generally used. ”

উত্তর ভারতে যাদের কাহার বলা হয় অন্যত্র হয়তো তাদের ধীমার বলা হয়। হাঁসুলী বাকের উপকথা উপন্যাসে হাঁসুলী বাঁক সংলগ্ন মস্তলী ও কাঁদপুর গ্রামে তিনশত জন বাগদী কাহারের বসবাসের কথা তারাশঙ্কর উল্লেখ করেছেন। এ-সকল উপাত্ত থেকে নিঃসন্দিগ্ধ হওয়া যায় যে, কাহার নামে একটি আদিবাসী কৌম জনগোষ্ঠী ভারতের নানা স্থানে বিদ্যমান ছিল।
আবয়বিক নৃতত্ত্বের (structural anthropology) বিচারে দেখা যায় যে, ভারতে বিচিত্র মানবগোষ্ঠীর সমাগম ঘটেছে। যুগে যুগে ভিন্ন রক্তের মিশ্রণজনিত কারণে তাদের পরিবর্তনও ঘটেছে। ফলে আধুনিক কালে বিভিন্ন কৌমে বিভক্ত ওইসব গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় নিরূপণ করা সহজসাধ্য নয়। তথাপি নৃতাত্ত্বিকগণ দৈহিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখেই জ্ঞাতিত্ব বিচারে ব্রতী হন।
নৃতাত্ত্বিকগণ গায়ের রং, মাথার চুল, চোখের রং ও বৈশিষ্ট্য, দেহের উচ্চতা, মুখের গঠন, মাথার আকার, নাকের গড়ন ও রক্তের বিভাজন দ্বারা মানুষের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় অনুধাবন করেন।” তবে গাত্রবর্ণের ওপরই তাঁরা বেশি জোর দিয়ে থাকেন। আবয়বিক বৈশিষ্ট্য বিচারে কাহার সম্প্রদায় প্রোটো-অস্ট্রালয়েড বা আদি অস্ট্রাল। কাহারদের গায়ের রং কালো, উচ্চতা মাঝারি, এরা দীর্ঘ শিরক্ষ, সুঠাম দেহের অধিকারী এবং প্রচণ্ড পরিশ্রমী। আদি অস্ট্রালদের সঙ্গে এদের যথেষ্ট সাযুজ্য রয়েছে।
বলা হয়ে থাকে ভারতের আদি অধিবাসী যারা তারাই আদি অস্ট্রাল। সমতলে আর্যদের এবং পরে পেশাগত কারণে সভ্য মানুষের সংস্পর্শে বসবাসের ফলে বিভিন্ন রক্তসম্পর্কের মিশ্রণজনিত কারণে এদের মধ্যে আবয়বিক পরিবর্তন হয়েছে অপেক্ষাকৃত দ্রুতগতিতে। তথাপি গোষ্ঠীগতভাবে নিরীক্ষণ করে কাহারদের পৃথকভাবে চিনতে কষ্ট হয় না।
দুই
সাঁওতালদের মতো কাহারদের ক্ষেত্রেও আগমনের উৎসস্থল চিহ্নিত করা সম্ভব হয়না। তবে তারাও অন্যান্য আদিবাসীর মতো ভারতে খুব প্রাচীন। প্রধানত উত্তর ভারতের বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় কাহারদের বসবাস। এসব অঞ্চলে এখনো এদের অস্তিত্ব বিদ্যমান। সাঁওতালদের মতো এরা অরণ্যচারী কিংবা পাহাড়ী- ছিল না। পেশাগত কারণেই তারা উর্বর সমতলভূমিতে বসবাস করত। পেশাগত স্বার্থেই কাহাররা বহু পূর্ব থেকে আর্যদের সংস্পর্শে এসেছিল।
ভারতের পাঁচটি ভিন্ন নরগোষ্ঠীর লোক মোট ১০৫৮ টি মাতৃভাষায় কথা বলে। এর মধ্যে যারা আদি-অস্ট্রাল গোষ্ঠীভুক্ত তারা ‘অস্ট্রিক ভাষা শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। কাহার সম্প্রদায়সহ ভারতীয় প্রাচীন অধিবাসীদের প্রায় সবার ভাষাই অস্ট্রিক শ্রেণীভুক্ত। কিন্তু কালপরম্পরায় কাহাররা তাদের ভাষার স্বকীয়তা রক্ষা করতে পারেনি। বিভিন্ন জাতির সঙ্গে সংমিশ্রণের ফলে বর্তমানে বাংলা ভাষার এক অপভ্রংশ রূপ পরিগ্রহ করেছে কাহার ভাষা।
উত্তর ও পূর্ব ভারতের কাহার জনগোষ্ঠী হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তবে তারা খুব নিচু জাতের, হিন্দু হয়েও সকল দেবতার পূজা করবার অধিকার থেকে বঞ্চিত। উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের কাছে তারা অস্পৃশ্য। কাহারদের ধর্মবিশ্বাস এক অতিলৌকিক জগতের ভয় ও অন্ধ-বিশ্বাস দ্বারা আচ্ছন্ন। হিন্দু ধর্মানুসারী হলেও হিন্দু ধর্মের দেবতাদের পাশাপাশি তাদের রয়েছে নিজস্ব গোষ্ঠী-দেবতা। আর কাহারদের কাছে সেই গোষ্ঠী-দেবতাই অধিক জাগ্রত।
শিব ‘কালারুদ্র’ নামে সর্বশক্তিধর দেবতা হিসেবে কাহার সমাজে পূজিত হন। মনসা ও লক্ষ্মীর প্রতিও তাদের যথেষ্ট ভক্তি। চারপাশের কল্পিত অতিপ্রাকৃত জগৎ সম্পর্কে কাহারদের রয়েছে প্রচণ্ড ভয়কম্পিত শ্রদ্ধা। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, দুর্ঘটনা, সর্পদর্শন, অকাল মৃত্যু ও ফসল না হওয়াকে কাহাররা তাদের সমাজের পাপ হেতু দেবরোষ বলেই মনে করে। কৃতকর্মের পারলৌকিক ফলাফলে তারা গভীরভাবে বিশ্বাসী।
পূর্বজন্মের আচরিত কর্মের ফল হিসেবেই নিচু কুলে তাদের জন্ম— এ তাদের অনড় বিশ্বাস। পরলোকের প্রতি আস্থাই কাহারদের যাবতীয় কর্তব্য কর্মে প্রেরণা যোগায়। এ কারণে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কিংবা কোনো মঙ্গল সাধনের লক্ষ্যে তারা গোষ্ঠীদেবতার পূজা-পার্বণ পালন করে। কালারুদ্র কাহারকৌমের প্রধান দেবতা।
এই কালারুদ্রই “বুড়ো শিব’ অভিধায় কাহার সমাজে সম্ভাষিত। তিনি জন্ম-মৃত্যু ও যাবতীয় ভাল-মন্দের নিয়ন্তা। আর কালারুদ্রের অনুচর হিসেবে কাহারদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্থানীয় দেবতা’ বা গোষ্ঠী-দেবতা হচ্ছেন বাবা ঠাকুর। বাবা ঠাকুরকে কাহাররা যথেষ্ট ভয় করে। তাঁর সন্তুষ্টির জন্য অব্যহত থাকে তাদের আপ্রাণ প্রয়াস। কাহারদের ধর্ম-বিশ্বাস মূলত অন্ধ বিশ্বাস আর ভীতি নির্ভর। তাদের ধারণা অপঘাতে মৃত্যু হলে মৃত ব্যক্তির আত্মা ভূত-প্রেত হয়ে আশেপাশে বিরাজ করে এবং অনেক সময় ক্ষতি সাধনও করে।
মৃত্যুর পরে কাহারেরা মৃতদেহ দাহ করে। দাহের পদ্ধতি হিন্দুর ধর্মাচারের অনুরূপ। কাহার সম্প্রদায় তাদের চারপাশের বিশেষ গাছ, সাপ, মেঘ, বস্ত্র, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদিকে দেবমাহাত্ম্য-যুক্ত বিবেচনায় ভয়মিশ্রিত শ্ৰদ্ধা পোষণ করে। মোট কথা পারিবেশিক প্রকৃতি এবং অতিলৌকিক জগৎকে অবলম্বন করেই কাহারদের জীবন ও ধর্মবিশ্বাস আবর্তিত।
প্রাচীনকাল থেকেই কাহার জনগোষ্ঠী তাদের দৈহিক শক্তিমত্তার জন্য পালকি বা ভার বহনের মতো কাজে পারদর্শিতা অর্জন করেছিল। নবাবি আমলে নবাবদের অন্তঃপুরের মহিলাদের একমাত্র বাহন ছিল পালকি। কাহাররা নবাবদের বাঁধা বাহক হিসেবে কাজ করত। ইংরেজ আমলেও তাদের প্রাচীন পেশা বজায় ছিল। দৈহিক সামর্থ্যের জন্য ইংরেজ কুঠি পাহারা, ও নীল চাষীদের শায়েস্তা করার জন্য কাহাররা লাঠিয়ালরূপেও নিযুক্ত ছিল।

এছাড়া কাহার সম্প্রদায় আবর্জনা পরিষ্কার ও মৃতের সৎকার কাজেও সহায়তা করত। নিচু কুলে জন্ম হওয়ার কারণে এসব কাজ তাদের জন্যই নির্ধারিত বলে তাদের বিশ্বাস। এসব কাজের পাশাপাশি কাহাররা চাষাবাদের কাজেও জড়িত ছিল প্রাচীনকাল থেকেই। নিচু কুলের কৌম জনগোষ্ঠী হওয়ার দরুণ সমাজের উঁচু শ্রেণীর মানুষের সেবা করাকেই পুণ্য কর্ম বলে গণ্য করত তারা।
প্রাচীনকালের মতো বর্তমান কালেও কাহারদের মধ্যে গোষ্ঠীগত শ্রম ও আর বেহারা কাহাররা ভার ও পালকি বহনকারী। জমিদারি প্রথা চালু থাকাকালে কাহাররা তাদের কাজের বিনিময়ে জমিদার বা মালিকের কাছে পেত চাষের জন্য সামান্য ভূমি। পরিশ্রমী বলে তারা কৃষিকাজেও যথেষ্ট ভাল ছিল। কাহার সমাজে শ্রমবিভাজনের রীতি বিদ্যমান। যেমন আটপৌরে কাহাররা জমিদার বা কুঠিয়ালদের বাড়িতে নানা কাজে বাঁধা কর্মী হিসেবে খাটে। তাদের নিজেদের ভূমি নেই।
জমিদারদের দেওয়া অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট জমি অধিকারে নিয়ে তারা চাষ করে। প্রয়োজনীয় কৃষিজমির অভাবের কারণেই তারা চুরি, ডাকাতি, লুণ্ঠনের মতো অপরাধপ্রবণ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে নানা সময়। কাহার নারী-পুরুষ একত্র কৃষিক্ষেত্রে কাজ করতে অভ্যস্ত। কাহার মেয়েরা খুব পরিশ্রমী এবং কৃষিকাজেও দক্ষ।
মেয়েরা ভদ্রজনের বাড়িতে ঝিয়ের কাজও করে কখনো কখনো। অর্থের বিনিময়ে কাহাররা লাঠিখেলা দেখায়, নাচে, গান করে। এ- সব কাজে তাদের কদরও যথেষ্ট। কাহার জনগোষ্ঠী তাদের পিতৃপুরুষের প্রতিও পরম শ্রদ্ধাশীল। পালকি বহন ও কৃষিকাজ ছাড়া কাহার পল্লির বাইরে অন্য কাজ করাকে তারা জাত-ধর্ম বিসর্জনের সমার্থক বলে মনে করে। কারো বিয়ে বা ‘জ্ঞান গঙ্গা যাত্রার” জন্য ডাক এলে কাহাররা উপেক্ষা করে না।
পিতৃপুরুষের পেশা হিসেবে এই দুটো কাজকে তারা কৃষির পাশাপাশি চিরকালই সম্মানের সঙ্গে বহন করে চলতে চেষ্টা করেছে। কৃষিকাজ ছাড়াও কাহার মেয়েরা গরু-বাছুরের জন্য ঘাট-কাটা, ঘুঁটে কুড়ানো এবং দুধ বিক্রির মতো কাজে স্বচ্ছন্দ। মেয়েরা নিজেদের সাজগোজ ও শখ পূরণের জন্য খরচের পয়সা নিজেরাই জোগাতে সক্ষম, এর জন্য পুরুষের মুখাপেক্ষী থাকা তাদের অপছন্দ।
তিন
আর্যরা ভারতবর্ষে আসার পরও বহুকাল পর্যন্ত ভারতের আদিবাসী কৌম সম্প্রদায় আর্য-সংস্কৃতির স্পর্শমুক্ত ছিল। ফলে তাদের সাংস্কৃতিক নিজস্বতা টিকে ছিল দীর্ঘদিন। আর ভারতীয় প্রতিটি আদিবাসী গোষ্ঠীরই ছিল বিচিত্র সংস্কৃতি। প্রতিটি কৌমে ভিন্ন ভিন্ন পূজা-পার্বণ, খেলাধুলা, উৎসব, সংস্কার, নৃত্য-গীত, বিশ্বাস, বিনোদন ‘ও নানা প্রকার বিধি-নিষেধ ছিল প্রচলিত। কাহার জনগোষ্ঠী নিজেদেরকে হিন্দুদেরই নিম্ন একটি জাত বলে মনে করে।
সৎজাতের লোকের সেবার জন্যই তাদের জন্ম হয়েছে বলে তাদের বিশ্বাস। হিন্দুদের জীবন-ধারা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের জীবনবৈশিষ্ট্যের যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। তবে অভিজাত হিন্দু পল্লির পূজা-পার্বণে তারা দূর থেকে কেবল প্রত্যক্ষণের আনন্দই পায়। বর্ণ-হিন্দুর পূজা উৎসবে তাদের স্পর্শ, চলাচল ও অংশগ্রহণ নিয়ন্ত্রিত। তবে নিজস্ব কিছু পূজা-পার্বণ ও অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করে তারা।
কাহাররা শৈব : সর্বশক্তিমান কালারুদ্র তথা বুড়া শিবের পূজা কাহার কুলে গাঁজন নামে পরিচিত। চৈত্র সংক্রান্তিতে আয়োজিত হয় এই গাজন উৎসব। হাড়ি, বাগদি, ডোম, কর্মকার, তন্তুবায়, কাহার ইত্যাদি ব্রাত্যশ্রেণীর মানুষের প্রবল শ্রদ্ধামিশ্রিত এই গাঁজন উৎসব। চৈত্রের শেষ দিনে কাহার সম্প্রদায়ের গাঁজনের ভক্তা বা সন্ন্যাসীরা ‘বান গোসাই ১২ নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ভিক্ষা সংগ্রহ করে।
চৈত্র সংক্রান্তির দিনে তারা দীর্ঘ সংযমের পর ভিক্ষালব্ধ খাদ্য-উপকরণ ভোজন করে আনন্দের সঙ্গে। কালারুদের শিষ্য ও অনুচর কর্তা ঠাকুর। কাহারদের সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণে ইনি সদানিয়োজিত। এই কর্তাঠাকুর কাহার সম্প্রদায়ে অত্যন্ত গুরুত্ব ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পূজিত হন। যে-কোনো বিপদের আশঙ্কায় কিংবা শুভ সংবাদ প্রাপ্তির আনন্দে তারা কর্তাঠাকুরের আসনে পূজা দেয়।
কাহারদের এসব পূজা-পার্বণের মূল ভিত্তি হল তাদের অতিলৌকিক ধর্মবিশ্বাস উদ্ভূত জীবনধারা। কর্তাঠাকুরকে কেন্দ্র করেই অনুিষ্ঠিত হয় তাদের অধিকাংশ পূজা-পার্বণ ও উৎসব। এছাড়া কাহার সম্প্রদায় মনসার পূজাতেও অভ্যস্ত। সাপকে তারা কর্তাঠাকুরের বাহন মনে করে। আশ্বিন মাসে কাহাররা ইঁদ পূজা বা ইন্দ্র পূজা করে। তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব নবান্ন উৎসব। ফসল ওঠার পর তারা গোষ্ঠীর সমৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষায় জমকালোভাবে এ উৎসব উদ্যাপন করে।
এই উৎসবেই পরের বছর ভাল ফসলের জন্য তারা গোষ্ঠীবদ্ধভাবে প্রার্থনা জানায়। গাজনের উৎসবের একটা বড় অঙ্গ হল চড়ক পূজা। এই পূজায় চড়ক পাঠা নামক লোহার কাঁটাযুক্ত কাঠে শিবভক্ত কোনো কাহার শুয়ে থেকে সমগ্র কৌমের জন্য প্রার্থনা জানায়। গ্রামপ্রধানই এক্ষেত্রে চড়কের পাঠায় ওঠার অধিকারী। এছাড়া কাহার সংস্কৃতির বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে সেটু পূজার স্থান।

ঘেটুকেও তারা গাঁজনের অঙ্গরূপে বিবেচনা করে। ঘেটু পূজায় ১৩ কাহারেরা ঘেটু গানের আসর বসিয়ে নাচ, গান ও নৃত্য করে। এসব গানে তাদের সমসাময়িক জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। ঘেটু গান কাহার সংস্কৃতির ভিন্ন একটি রূপকে অভিব্যক্ত করে।
কাহারদের উদ্দাম-উল্লাসময় আরেকটি পর্ব হল ‘ভাঁজো পরব’ । লতা পাতা ফুল দিয়ে ভাঁজো দেবীর আদল 38 তৈরি করে জোত্স্না রাতে মেয়ে-পুরুষ মিলে মদ্যপান করে নাচ-গানে মেতে ওঠা ভাঁজো পর্বের প্রধান আকর্ষণ । ওই দিনটিতে নারী-পুরুষের জন্য সামাজিক অনুশাসনের রক্তচক্ষু অনেকটা শিথিল থাকে। ভাঁজো পূজায় মেয়ে- পুরুষের কিছু ব্রত পালনের রেওয়াজও আছে।
ভাঁজো পর্বের পরের দিন পালের গরু-বাছুরগুলোকে তারা মুক্ত রাখে। পর্বের রাতে পূর্ণবয়স্ক কাহারদের ঘুমানো বারণ । পরের দিন মেয়েরা শালুক ফুলের মালা আর সিঁদুরের টিপে সাজিয়ে ভাঁজো সুন্দরীকে নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে স্নান করে ঘরে ফিরে আসে। এ ছাড়াও কাহার সমাজে ষষ্ঠীপূজা, মঙ্গলচণ্ডী ও জলশয়ান পূজা প্রচলিত। বার্ষিক নিয়মিত পূজা-পার্বণ ও উৎসবানুষ্ঠানের বাইরেও কাহার গোষ্ঠীর নানা অনুষ্ঠান লেগেই থাকে।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়, সামাজিক অন্যায় অপরাধের প্রায়শ্চিত্তের জন্য ও পূজার প্রচলন রয়েছে কাহার সমাজে। তাদের বিশ্বাস অপঘাতে মৃত ব্যক্তির আত্মা ভূত-প্রেত হয়। এদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কাহাররা পূজা করে। এমনকী ভাল ফসলের প্রত্যাশায় এবং কুলের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষায় বাবা ঠাকুরের উদ্দেশে কাহারেরা পূজা দেয়। ওই পূজা অনুষ্ঠিত হয় বাবা ঠাকুরের আসনে হাঁস বা পাঁঠা বলির মাধ্যমে।
চার
সামাজিক বন্ধন ও শৃঙ্খলা কঠোর হলেও কাহার নারী-পুরুষের যৌন জীবন কিছুটা শিথিল। তবে কাহার নারীরা সাধারণত সতীনের ঘর করে না। পূর্বের স্ত্রীই প্রযোজ্য ক্ষেত্রে স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে যায়। কাহার মেয়েরা সৌন্দর্যপ্রিয়। সাজগোজের প্রতি তাদের ঝোঁক প্রবল। নিজেদের ঘর দোর পরিচ্ছন্ন রাখতে তারা অত্যন্ত আন্ত রিক। কাহারদের বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতেও বেশ আনন্দ হয়ে থাকে। কাহার মেয়েরা নৃত্য-গীত ও মদ্যপানের মাধ্যমে আনন্দ যাপন করে।
সারাদিন পরিশ্রমের পরে রাতে নাচ গান ও মদ্যপানের মাধ্যমে আনন্দ যাপন কাহারদের প্রাত্যহিক জীবনের অঙ্গ। অল্প বয়সের ছেলেরা অবসরে শিকার বা ডাংগুলি খেলায় মেতে ওঠে। লাঠি খেলার মাধ্যমে শারীরিক কসরৎ প্রদর্শনেও আগ্রহ আছে কাহার পুরুষদের। তাদের মধ্যে বহু কুসংস্কারও প্রচলিত।
অন্ধবিশ্বাসের এক অন্ধকার জগতে সর্বক্ষণ তাদের বিচরণ। বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই তাদের সব আচার-উপচার পরিচালিত ও ব্যবহৃত হয়। কাহারদের সমাজে অনেক বাধা নিষেধও বিদ্যমান। তাদের সমাজের বাইরে নিজস্ব পেশা ছাড়া অন্য কোনা কাজ করা নিষিদ্ধ। এতে জাত ধর্ম নষ্ট হয় বলে তাদের গোষ্ঠীগত বিশ্বাস। পূর্বপুরুষ যা করেনি, এমন কাজ কাহাররা সাধারণত করে না। কাহার পাড়ায় পাকা ঘর নির্মাণ করা নিষিদ্ধ। তাদের ধারণা এতে গ্রামে অমঙ্গল নেমে আসে।

পাঁচ
অন্যান্য আদিবাসী কৌমের মতো কাহারদের সমাজেও গ্রাম প্রধান বা গোত্র-প্রধান প্রথা প্রচলিত। গোত্র প্রধানকে ঘিরেই কাহারদের যাবতীয় জাগতিক কর্ম আবর্তিত হয়। গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সবকিছু নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গোত্র প্রধানের। কৌমের জাগতিক ভালমন্দ দেখার দায়িত্বও তার। পূজা-পার্বণ উৎসব থেকে শুরু করে আনুশাসনিক কর্মধারা গোত্রপ্রধানের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়।
প্রাচীনকাল থেকেই কৃষিজীবী কাহার জনগোষ্ঠী ক্ষুদ্র পরিসরে চাষাবাস নিয়েই নিস্তরঙ্গ জীবন যাপন করে। বাইরের সমাজের কোনো ঘটনা তাদের সমাজজীবনে আলোড়ন তোলে না। রাঢ়ের রুক্ষ কাঁকড় মিশ্রিত লাল মাটি যেমন গ্রীষ্মে শুকিয়ে যায়, আবার সামান্য জলধারায় ফসলের প্রাচুর্য আনে, তেমনি এ রুক্ষ মাটির সাথে নিয়ত সংগ্রাম করে যুগ যুগ ধরে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে কাহার জনগোষ্ঠী।
কাহারেরা নিজস্ব জগতের বাইরে কিছু ভাবতে অভ্যস্ত নয়। তাদের সীমায়িত বিচরণক্ষেত্রই তাদের পৃথিবী। কাহাররা স্বীয় সমাজ বহির্ভূত বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। অর্থনীতি, রাজনীতি, স্ব-অধিকার সম্পর্কিত যৌক্তিক কার্যকারণ বিষয়ে তারা উদাসীন। এসব বিষয় তাদের জীবনধারায় প্রভাব ফেললেও তারা এ-সবের কারণ অনুসন্ধানে উৎসাহ দেখায় না। তবু বৈশ্বিক ও দৈশিক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ক্রমে তাদের জীবনধারাকে পর্যুদস্ত করেছে।
সরল এ জনগোষ্ঠীর জীবনধারণের চাহিদাও সামান্য। খেয়ে-পড়ে কোনো প্রকারে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারলেই তারা সন্তুষ্ট। অপেক্ষাকৃত ভদ্র জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে তাদের স্বীয় স্বার্থ ও বিলাসের জন্য কাহারদের ব্যবহার করেছে। পালকি বাহক হিসেবে বাঁধা রাখার জন্য ভদ্রশ্রেণীর মানুষ নিম্নমানের সামান্য জমি দিত তাদের। মোঘল ও ইংরেজ শাসনের প্রথম দিকে ওই জমিটুকুর ওপর নির্ভর করেই কাহাররা কোনো ক্রমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল।
১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তন হলে নব্য জমিদাররা তাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তায় পরিণত হয়। ওই সময় থেকেই মূলত আদিবাসীরা এ-সব জমিদারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও খেয়াল খুশির শিকারে পরিণত হয়। তবে বীরভূমের জমিদারির একটা ভিন্নতা ছিল। জমিদারের সংখ্যা ছিল অধিক কিন্তু জমিদারির আয়তন ও আয় ছিল ক্ষুদ্র। তবে আয়ের স্বল্পতা থাকলেও পরাক্রম ও সমারোহ ছিল প্রবল।
পুঁজিবাদী নব্য ধনিকশ্রেণীর উত্থানের ফলে রাঢ়ের আদিবাসী অঞ্চলেও জমিদার বনাম ধনিক শ্রেণীর সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। এতে জমিদারির বৃহদংশ বণিক শ্রেণীর করায়ত্ত হয়। ভূমির মালিকানা পরিবর্তনের ফলে কৃষিজীবী কাহাররাও কর্ষণযোগ্য জমি হারায়।
কেননা, নতুন প্রভূরা ওইসব ভূমিকে কৃষিকাজে ব্যবহারে উৎসাহী ছিল না। ফলে অধিকার সচেতন না হওয়ার কারণে সংখ্যালঘু কাহার গোষ্ঠী ভূমিচ্যুত হতে থাকে। নব্য ধনিকশ্রেণী ভূস্বামী হয়ে তাদের ভূমিতে শিল্প ব্যবসায় ও কলকারখানা তৈরিতে অধিক আগ্রহী হয়। ফলে কাহারদের চাষের জমিতে কলকারখানা স্থাপিত হতে থাকে।
কৃষিজমি বন্দোবস্ত প্রাপ্তির প্রতিযোগিতায় কাহাররা ভদ্র হিন্দুদের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারে না। ফলত ত্রুটিপূর্ণ ভূমি ব্যবস্থায় কাহাররা কৃষিজীবী হয়েও ভূমির স্বত্ত্ব লাভে বঞ্চিত হতে থাকে। একই কারণে কৃষি উৎপাদনেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। বিভিন্ন সময়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগ” রাঢ়ের কৃষি অর্থনীতি তথা কাহারদের জীবনে বিপর্যয় নিয়ে আসে। স্ব-পেশা ও স্ব-ভূমির ওপর নির্ভরতা হারিয়ে কাহাররা অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হয়।

ছয়
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পুঁজিবাদী শ্রেণীর উদ্ভব ও যুদ্ধজনিত রাজনৈতিক ও অর্থিৈনতিক সংকটে কাহারদের জীবনেও হতাশা ও যন্ত্রণা নেমে আসে। তারা জমিদার ও পুঁজিবাদী শ্রেণীর শোষণের শিকার হয়। আর্থনীতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন জড়িত। রাঢ় বাংলার স্থানে স্থানে কৃষির পরিবর্তে শিল্পের প্রসারজনিত ভূমির মালিকানা পরিবর্তনের সূত্রে কাহারদের মনিব পরিবর্তন হয়েছে ঘন ঘন।
নতুন পুঁজিবাদী মনিবের অধিকাংশই কৃষিভূমিতে শিল্প ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান স্থাপনে আগ্রহী ছিল। ফলে কৃষিজীবী
কাহাররা কৃষিভূমি থেকে উৎখাত হতে থাকে। এভাবেই স্বীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্যে লালিত কৃষিজীবী কাহারদের
জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে কাহারদের জীবনে যে সামাজিক ও আর্থনীতিক পরিবর্তন সূচিত হয়, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের করাল গ্রাসে তা চূড়ান্ত রূপ পায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ কাহারদের অস্তিত্বে সরাসরি আঘাত হানে এবং তারা স্ব-স্থান থেকে উন্মূলিত হতে থাকে। এই মহাযুদ্ধের ভয়াল তরঙ্গাভিঘাতে কৃষিজীবী কাহাররা নির্বাসিত হয় স্বপ্নভূমি ও স্ব- সংস্কৃতি থেকে। যুদ্ধের ভয়াবহ সংকটকালীন সময়ে সবাই অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে লিপ্ত হয়।
এ-সময় দেশ- পরিব্যাপ্ত নৈতিকতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় কাহারকুলকেও গ্রাস করে। ধনিক-বণিক সুদখোর মহাজন শ্রেণীর শোষণে কাহাররা হৃত-সর্বস্ব হয় ইতিহাসের এই কাল পর্বেই। ফলে বাঁচার তাগিদে গণ্ডিবদ্ধ জীবনের বাইরে পা বাড়াতে বাধ্য হয় তারা। কৃষিজীবী কাহাররা বাধ্য হয়ে ভিন্ন জীবনে প্রবেশ করে স্বীয় জীবনধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলত শিল্প কারখানার শ্রমদাসে পরিণত হয় তারা। হাঁসুলী বাঁকের উপকথা উপন্যাসে কাহারদের জাতিগত এই ট্রাজেডির জীবনচিত্র শিল্পিত হয়েছে।
রাঢ়ের আদিবাসী অঞ্চলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রসদ সংগ্রহের জন্য ব্যাপক হারে বাঁশ ও বৃক্ষ নিধনের ফলে কাহাদের গ্রাম উজাড় হয়ে পড়ে। যুদ্ধের প্রয়োজনেই নতুন রাস্তা নির্মাণ এবং যুদ্ধ-বিমানের ঘাঁটি তৈরির জন্য জমি অধিগ্রহণের শিকার হয় কাহার পল্লি। আর এভাবেই সম্পূর্ণ অনিকেত আদিম মানুষে পরিণত হয় কাহার জনগোষ্ঠী।
এভাবেই উপকথা-সংসক্ত কাহার জীবন ভূমি-উৎকেন্দ্রিক হয়ে সমাজগতি-ইতিহাসের বড় নদী বা মূল ধারায় সমর্পিত হয়েছে। পিতৃপুরুষের উত্তরাধিকারবাহী প্রত্নপ্রতিমাতুল্য কাহারদের জীবনবেদ-এর এই বিপর্যয়, তাদের স্বসমাজের জন্য আত্মঘাতী স্বরূপ হলেও, সামাজিক রূপান্তরের সর্বমানবিক সদর্থকতায় এটি ইতিহাসেরই অনিবার্য উত্তরণ’ । আদি পেশা পালকি বহন, লাঠিখেলা ছেড়ে এরা চাষাবাদে পুরোদস্তুর মনোনিবেশ করেছিল তাদের জীবন-ইতিহাসের মধ্যস্তরে এসে। কিন্তু পুঁজিবাদী বিশ্বের আগ্রাসনের শিকার হয়ে কাহার জনগোষ্ঠী ভূমিচ্যুত হয়।
হাজার বছর ধরে আঁকড়ে থাকা পেশা কৃষিকে পরিত্যাগে বাধ্য হয়ে কাহার সম্প্রদায় শিল্প-শ্রমিকের আত্ম-পরিচয়ে এখনো বেঁচে আছে। নিতান্ত বেঁচে থাকার জন্যই ক্ষুদ্র এই আদিবাসী জনগোষ্ঠী জাতিগত ঐতিহ্য ও প্রথা ত্যাগ করে স্ব-ভূমি ও স্ব-ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এভাবেই স্বতন্ত্র একটি কৃষিজীবী কৌমসমাজ স্বীয় পেশা ও সমাজ থেকে ছিটকে পড়ে এবং হারিয়ে ফেলে নিজস্ব সংস্কৃতি।
কালিক বিবর্তন ধারায় পুঁজিবাদী সমাজের কৃষিবিমুখতা এবং শিল্পের প্রতি আগ্রহই কাহারদের জীবিকা পরিবর্তনে বাধ্য করেছে। এই গতিধারাকেই ত্বরান্বিত করেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ফলত একটি আদিবাসী গোষ্ঠী সভ্যতার যান্ত্রিক স্পর্শে আজ বিচ্ছিন্ন, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত।
পূর্ব-ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও যে-সব কাহার বা যে-সব কাহার পল্লি খুঁজে পাওয়া যায়, সে-সব পল্লির জনতা গাত্রবর্ণে কাহার হলেও আর্থনীতিক ও বৈরীসংস্কৃতির আগ্রাসনে স্বকীয়তা বিবর্জিত, বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্ন শ্রমদাস মাত্র।