জাতি, জাতিরাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদের সাথে আল্লামা ইকবালের বিরোধ

ড. মুহাম্মদ ইকবাল আধুনিক মুসলিম জাগরণের এক প্রাজ্ঞ চিন্তক ও কবি, যিনি একদিকে যেমন ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন, তেমনি জাতীয়তাবাদকে এক ভয়াবহ বিভক্তিমূলক শক্তি হিসেবে দেখেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে, জাতীয়তাবাদ মানবজাতির ঐক্য ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি এক সরাসরি হুমকি।

 

ইকবাল লিখেছেন:

“In taza khudaon mein bara sub se watan hai

Jo pairhan is ka hai, woh mazhab ka kafan hai”

👉 অর্থ: এই নতুন দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ‘জাতি’ বা ‘দেশ’, যার পোষাক (গর্ব) আসলে ধর্মের কাফন।

 

এর মাধ্যমে ইকবাল জাতীয়তাবাদকে নতুন ধর্ম বা মূর্তি পূজা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলছেন, ‘দেশ’ বা ‘জাতি’ যে গর্বের চিহ্ন, তা আসলে ‘ধর্মের কবরের কাপড়’ — অর্থাৎ ধর্মের চেতনাকে গ্রাসকারী একটি মোহ।

 

ইকবালের আরও কিছু লেখাতে একই বিষয়ের প্রতিধ্বনি শোনা যায়:

 

১. “وطنیّت” (Wataniyat) — بانگِ درا (Bang-e-Dra)

 

এই কবিতায় ইকবাল বলছেন:

ان تازہ خداؤں میں سب سے بڑا وطن ہے

جو پیرہن اس کا ہے، وہ مذہب کا کفن ہے

 

এই একই পঙ্‌ক্তি Bang-e-Dra কাব্যগ্রন্থে আসে এবং সে প্রেক্ষিতেই তিনি দেখাচ্ছেন কিভাবে জাতি বা দেশভিত্তিক বিভাজন মুসলিম উম্মাহ্‌র ঐক্য বিনষ্ট করছে।

২. “خضر راہ” (Khizr-e-Rah)

এই কবিতায় ইকবাল প্রশ্ন তুলেছেন জাতিরাষ্ট্রে বিভক্ত হওয়া মুসলিমদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তিনি বলেন:

تمہاری تہذیب اپنے خنجر سے آپ ہی خودکشی کرے گی

جو شاخِ نازک پہ آشیانہ بنے گا ناپائدار ہوگا

 

👉 অর্থ: তোমাদের সভ্যতা নিজ হাতে নিজের ধ্বংস ডেকে আনছে। যা দুর্বল শাখায় গড়ে ওঠে, তা স্থায়ী হয় না। এখানে তিনি ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ-নির্ভর সভ্যতাকে স্বল্পস্থায়ী ও আত্মঘাতী বলে চিহ্নিত করেছেন।

 

৩. “اسلام اور قومیت” — বক্তৃতা ও রচনায়

ইকবাল তাঁর বক্তৃতায় (যেমন: ১৯৩০ সালের আল্লাবাদ ভাষণ) পরিষ্কার বলেন:

> “Islam recognises neither territorial boundaries nor racial distinctions. Its ultimate aim is a spiritual unity of the entire human race.”

👉 অর্থ: ইসলাম কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা বা জাতিগত পার্থক্যকে স্বীকৃতি দেয় না। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য মানবজাতির আত্মিক ঐক্য।

এখানে জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামিক বিশ্বদর্শনের মধ্যে মৌলিক দ্বন্দ্ব ইকবাল স্পষ্ট করেছেন।

 

🛑 ইকবালের জাতীয়তাবাদ-বিরোধিতার মূল কারণগুলো

১/. জাতীয়তাবাদ ধর্মীয় ঐক্য নষ্ট করে

> ইসলামে মুসলিম উম্মাহ বিশ্বজনীন। জাতি, ভাষা, অঞ্চল—এসব বিভাজন ইসলাম সমর্থন করে না।

 

২/. ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদকে তিনি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছেন

> বিশেষত ১ম বিশ্বযুদ্ধের পর মুসলিম বিশ্বে ইউরোপীয় কৃত্রিম সীমা-রেখা সৃষ্টি হয়েছিল, যেমন সাইক্স-পিকো চুক্তি ইত্যাদি।

 

৩/. একই ধর্মের মানুষকে আলাদা আলাদা ‘দেশপ্রেমে’ বন্দী করা ইসলামের দর্শনের বিরুদ্ধে

> এক মুসলমান যদি আফগান, তুর্কি, মিশরীয় বা বাঙালি হয়ে আলাদা আলাদা রাজনৈতিক পরিচয়ে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে, তবে উম্মাহর ধারণা ধ্বংস হয়।

ইকবাল শুধুমাত্র ধর্মীয় ভাবনাতেই নয়, রাজনৈতিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণেও দেখিয়েছেন—জাতীয়তাবাদ একধরনের আধুনিক মূর্তি-পূজা, যা মানুষকে বিভক্ত করে, আত্মপরিচয়কে সংকুচিত করে এবং ধর্মীয় আদর্শকে বিলীন করে।

তাঁর মতে, “জাতীয়তাবাদ নয়—ঐক্যবদ্ধ আত্মিক চেতনা”-ই হোক মানবজাতির ভবিষ্যৎ।

 

📌 দায়মুক্তি (Disclaimer):

এই লেখায় উপস্থাপিত মতাদর্শ, মন্তব্য, তথ্য ও ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট লেখক, রেফারেন্স বা উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। সাহিত্য গুরুকুল উক্ত মতাদর্শ বা বক্তব্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এবং এর জন্য প্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই দায়ী নয়। পাঠকের বিবেচনাবোধ ও গবেষণাই চূড়ান্ত নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হবে।

Leave a Comment