Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

চেতনাপ্রবাহ শিল্পশৈলীর উপন্যাস । বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার

চেতনাপ্রবাহ শিল্পশৈলীর উপন্যাস

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়: চেতনাপ্রবাহ শিল্পশৈলীর উপন্যাস। এটি বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার এর চেতনাপ্রবাহ শিল্পশৈলীর উপন্যাস এর অন্তর্গত।

 

 

চেতনাপ্রবাহ শিল্পশৈলীর উপন্যাস

পরিবর্তনশীল সমাজ ও প্রবহমান সময় স্রোতের প্রেক্ষাপটে সৃষ্টিশীল ব্যক্তিচৈতন্যের রূপান্তরও অনিবার্য। যেহেতু বহমান বর্হিবস্তুজগত এবং স্রষ্টার অনুভবসংবেদন মন-এ দুয়ের জটিল বাস্তবতা একাত্ম হয়ে প্রকাশ ঘটায় রূপের; সে কারণে উপন্যাসের ফর্ম নির্মাণের ক্ষেত্রে সাধিত হল জটিলতর রূপান্তর।”

উপন্যাসের প্রথাগত ধারণা-প্লট, চরিত্র, সময়, বিষয়, ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সাধিত হয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। নিরীক্ষাপ্রবণ ঔপন্যাসিকগণ রচনা করলেন anti-plot, anti hero, anti-time উপন্যাস। কারণ সমাজকাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গের স্রষ্টার মনোজাগতিক ইতিহাসও জড়িত। সমাজের দ্বন্দ্বজটিল পরিস্থিতি স্রষ্টার মনোলোকে যে প্রতিবিঘ্নন তৈরি করে, সেই বাস্তব ভাৰসত্য প্রকাশের অন্তর্গরজে তাকে আবিষ্কার করতে নিয়ে হয় প্রয়োজনানুগ শিল্পশৈলী।

বিশশতকের প্রথমার্ধে সংগঠিত দুই বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, নানা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, ফ্রয়েডের The interpretation of Dreams (1913). The Psychology of Everyday life (1914 ) এবং on Dream (1914 ) হ্যাভলক এলিস-এর Studies in the psychology of sex (1897-1928) ইত্যাদি মনোসমীক্ষণতত্ত্ব বিশ্বব্যাপী মানব মনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

ফ্রয়েড প্রথম সন্ধান দিলেন যে, চেতন এবং অচেতনের মাঝখানে মানব মস্তিষ্কে অবচেতন মনেরও একটি ব্যাপার আছে। অবচেতন মনের এই স্তরটি চরম বিশৃঙ্খল ও অরাজগতার লীলাভূমি। শুধু তাই নয়, অবচেতনের এই স্তরটির মূল উৎস হচ্ছে Sex যৌনানুভূতি Sex is the main spring of our unconsious life. কয়েডের এই আবিষ্কারের ফলে মানুষের ব্যক্তিত্বের রূপটি পাল্টে যায় ।

 

 

‘মানুষের বহিরঙ্গের অনুপুঙ্খ বিবরণধর্মী বাস্তবতার পরিবর্তে অন্তর্জীবনের গভীরতর বাস্তবতার (inner reality) সন্ধান, অবচেতন আকাঙ্ক্ষার রূপায়ণ, চরিত্র অঙ্কনের পরিবর্তে ব্যক্তির আত্মান্বেষণ (Search of indentity), চেতনাপ্রবাহ ( Stream of consciousneses) কিংবা অন্তঃসংলাপ (interior monologue) রীতির ব্যবহার প্রচলিত সময় ধারণার পরিবর্তে সময়ের ভগ্ন ক্রম বিন্যাস, সূক্ষ্ম সংকেত প্রতীক ও নিগুঢ় চিত্রকল্পের ব্যবহার এই সব কুললক্ষণে যুদ্ধপরবর্তী বাংলা কথাসাহিত্য সুচিহ্নিত ” জাঁ পল সার্ত্রের (১৯০৫-১৯৮০) অস্তিত্ববাদী দর্শন নতুন শিল্পসূত্রের জন্ম দেয়। লেখা হয় চেতনা প্রবাহশৈলীর উপন্যাস।

জেমস জয়েস (১৮৮২-১৯৪১) | ভার্জিনিয়া উলফ (১৮৮২-১৯৪১) এবং ডরোথি রিচার্ডসন বিশশতকের প্রথম ও দ্বিতীয় দশকে চেতনাপ্রবাহ ধারার প্রথম সফল প্রয়োগ করেন। চেতনাপ্রবাহ পদ্ধতিটি একটি বিস্তৃত কর্মকান্ডের পরিচায়ক। পূর্ববর্তী উপন্যাসের সরলরৈখিক প্লট ও আনুপূর্বিক সময় ব্যবহারের বিরুদ্ধে গিয়ে চরিত্রকে প্লটের নিয়ন্ত্রক করে তার মনের ভুবনকে উন্মোচিত বা ব্যাখ্যা করার পদ্ধতিকেই চেতনা প্রবাহশৈলী বলা হয়।

এই পদ্ধতিতে চরিত্রের সময় হয়ে দাঁড়াল ঘটমান ও চলমান। বাহিরের বস্তু জগতে চলমান ঘটনা মানুষের সতত সঞ্চরণশীল মননক্রিয়ার উপর প্রকৃত প্রভাব ফেলে। কারণ মানুষের মন কোনো স্থির নির্দিষ্ট বস্তু নয়, তা নিয়ত পরিবর্তনশীল।

 

 

প্রতিটি মুহূর্ত মানুষের চেতনাকে একটি নতুন বিন্যাসে স্থাপন করে, এই মুহুর্মুহু ভেঙে পড়া চেতনাস্রোতকে বাইরের বস্তু জগতের চলমান ঘটনার সঙ্গে সমান্তরাল করে একই সূত্রে প্রথিত করার বিশেষ শৈলীকেই চেতনাপ্রবাহশৈলী বলা হয়। ডরোথি রিচার্ডসনের একটি উপন্যাসের আলোচনা প্রসঙ্গে মে সিনক্লেয়ার ১৯১৮ সালে প্রথম Stream of conciousness বা চেতনাপ্রবাহ কথাটি ব্যবহার করেন।

রিচার্ডসন যে উপায়ে মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে চরিত্রের চেতনাবোধ উপলব্ধি-অভিজ্ঞতা-অনুধাবনকে গড়িয়ে যেতে দেন, তা বর্ণনা করতে গিয়ে সিনক্লেয়ার Stream of conciousness এর সংজ্ঞাটি দেন। এই শৈলীতে লেখা উপন্যাস প্রথমে ভেঙ্গে দেয় প্লট ধারণা এবং চরিত্রের একরৈখিক বিন্যাস।

জেমস্ জয়েসের ‘ইউলিসিস’ মাত্র চব্বিশ ঘন্টার কাহিনী। তাতে তিনটি চরিত্র বিভিন্নভাবে পরস্পরের কাছে আসে, দূরে যায়, আবার কাছে আসে। প্লট বলতে ঐ তিন চরিত্রের প্রধানত দু’জনের মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে গড়িয়ে যাবার বিবরণ । ভার্জনিয়া উলফ-এর ‘টু দি লাইট হাউস’-এ প্রথাগত প্লট বলতে কিছু নেই। একটি পরিবার ছুটি কাটাতে এসে এক স্থান থেকে নৌকা করে আরেক স্থানে যাবে কি যাবে না এভাবনা হচ্ছে গল্প। এর মধ্যে মিসেস র্যামজে ও তার স্বামী ও পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা এবং খুটিনাটি যে চিত্র তৈরি করে, তাতে ঐ গল্পহীন গল্পের মানুষগুলো বেড়ে ওঠে।

আমরা একটি প্রধান চরিত্রের চেতনাধারার বিকাশকে দেখি, তার অনুভূতির আলোকে বিশ্বকে প্রত্যক্ষ করি। অর্থাৎ চেতনাপ্রবাহশৈলীর উপন্যাসে পুটকাঠামো ভেঙ্গে যায় এবং এশৈলীর উপন্যাসে সময় একবারে খন্ডিত, আনুপূর্বিক বলতে কিছু নেই, কারণ সময়ের পরম্পরা নির্ধারিত হয় চরিত্রের চেতনাপোলব্ধি থেকে। এজন্য সময় অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের সীমারেখায় বন্ধি না থেকে সময় চরিত্রের চেতনায় একাকার হয়ে যায়; সময় বিন্যস্ত হয় ভগ্নক্রম শৈলীতে।

 

 

উইলিয়াম জেমস্ (১৮৪২-১৯১০) তার প্রিন্সিপলস অফ সাইকোলজি’ (১৮৯০) গ্রন্থে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যক্তির ক্রমপরিবর্তনশীল মনের অবস্থা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে Stream of consciousness শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের চেতন অবচেতন মনের সূত্র। ফরাসী দার্শনিক বের্গস এর বিখ্যাত তত্ত্ব duration বা স্থিতিকাল এবং চেতন হচ্ছে মানুষের মনোজাগতিক চলিষ্ণুতা।

চেতনা প্রবাহশৈলীর উপন্যাসে ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণই প্রধান; ব্যক্তির চেতনা অবচেতন মনের ধূসর অঞ্চলের জটিল গ্রন্থি আবিষ্কারই এশিল্পশৈলীর উপন্যাসের লক্ষ্য। তাই এর ভাষা হয় আত্মকথন মূলক interior monologue)। ব্যক্তি মনেজগতের দ্রুত বিলিয়মান দিগন্ত রেখা আবিষ্কার যেহেতু চেতনা প্রবাহশৈলীর উপন্যাসের অন্যতম লক্ষ্য তাই চরিত্রের আত্মকথনে অনেক সময় বহির্বাস্তবের কার্যকারণসূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না।

Exit mobile version