আজকে আমরা চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্য সূচীপত্র আলোচনা করবো।

চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্য সূচীপত্র
বিশ শতকে রাশিয়া ও চীনে সমাজতন্ত্রের অভ্যুদয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। অতীতের সকল সভ্যতা থেকে স্বতন্ত্র ও মৌলিক তাৎপর্যে ভরপুর এই নতুন সমাজব্যবস্থার প্রতি স্বভাবতই বিশ্বমানবের কৌতূহল ছিল বেশী। একটি বিশেষ সময়ে পূর্ববাংলার দশ জন লেখক-শিল্পী-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী চীন ও রাশিয়া সফর করে এসে ভ্রমণ কাহিনী রচনা করেছেন।
তাঁদের চোখে সমাজতান্ত্রিক দেশ দু’টির যেসব বৈশিষ্ট্য ধরা পড়েছিল, তা পর্যালোচনা করাই বর্তমান অভিসন্দর্ভের অন্বিষ্ট বিষয়। বিষয়টি নিয়ে এর আগে কোন গবেষণা হয়নি। সেই অভাববোধই আমাকে এই অনালোচিত বিষয়টি নিয়ে গবেষণাকর্মে উৎসাহিত করে।

আজকের পরিস্থিতিতে এ সংক্রান্ত আলোচনার গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এম.ফিল. ডিগ্রীর জন্য প্রস্তুত এই অভিসন্দর্ভের শিরোনামা হচ্ছে- “চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্য : ১৯৪৭-৭১। ”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডঃ সাঈদ-উর রহমানের তত্ত্বাবধানে আমি গবেষণা করেছি। তিনি সব সময় জোর দিয়েছেন আমার নিজস্ব মতামত সৃষ্টি ও প্রকাশের উপর।
আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক আহমদ কবির ও ডঃ বিশ্বজিৎ ঘোষ গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন।
আমার মা শোভা দেব, বাবা অধ্যাপক মনীন্দ্র চন্দ্র দেব আমার গবেষণাকর্মের পেছনে নিরন্তর উৎসাহ ও শক্তি যুগিয়েছেন। গবেষণাপত্রের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করেছেন আমার সহোদর ডঃ সৌমিত্র দেব।

গবেষণার প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করবার জন্য আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, বাংলা একাডেমী গ্রন্থাগার, বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সেমিনার ব্যবহার করেছি। এইসব গ্রন্থাগারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ আমাকে বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেছেন। আরও যারা বিভিন্ন সময় সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাঁদের সবার জন্য রইল আমার শুভকামনা ।
সূচীপত্র
চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্যের উপক্রমণিকা

প্রথম অধ্যায় : রাশিয়া ভ্রমণ কাহিনী
- দেখে এলাম রাশিয়া
- লেনিনের দেশে লালনের মেয়ে
- পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ
- সোভিয়েটের দিনগুলি
- যে দেশে মানুষ বড়
দ্বিতীয় অধ্যায় : চীন ভ্রমণ কাহিনী
- নতুন চীন নতুন দেশ
- গণচীনে চব্বিশ দিন
- নয়াচীনে এক চক্কর
- মাও সে তুঙ এর দেশে
- পদ্মা থেকে ইয়াংসি
তৃতীয় অধ্যায়
- পশ্চিম বাংলায় রচিত ভ্রমণ কাহিনীর সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা
উপসংহার
ভ্রমণ সাহিত্যের একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। মূলত উনিশ শতকে বাংলা গদ্যের সমৃদ্ধির কালেই গল্প-উপন্যাসের মতো ভ্রমণ কাহিনীও বিস্তৃতি লাভ করেছিল। আমাদের গবেষণার লক্ষ্য ছিল একটি বিশেষ সময়ে সমাজতান্ত্রিক দুই দেশ চীন ও রাশিয়া সফর করে পূর্ববাংলার বৃদ্ধি জীবীদের চোখে যেসব বৈশিষ্ট্য ধরা পড়েছিল, তা পর্যালোচনা করা।
এ পর্যন্ত আলোচনায় স্পষ্টতই দেখা যায় যে পুঁজিবাদী শক্তিগুলোর খপ্পর থেকে মুক্তিলাভের পরও তাদের চক্রান্ত বিশ্বলোকের কাছে চীন ও রাশিয়ার উন্নত ভাবমূর্তিকে আড়াল করে রেখেছিল। পশ্চিমী অপপ্রচারে এই দুই সমাজতান্ত্রিক দেশ যেভাবে বিশ্বমেলায় প্রতিভাত হয়েছিল তেমন আর কোন দেশের বেলায় হয়নি।
এই দেশ দুটির বিস্ময়কর উন্নতি অগ্রগতি সহ প্রকৃত ব্যাপার তাই বেশ কিছুকাল ধরে রহস্যাবৃতই থেকে গেছে। সে কারণেই এই দু’দেশের প্রতি বিশ্বমানবের কৌতূহল ইউরোপ আমেরিকা বা অন্যান্য দেশের তুলনায় ছিল অনেক বেশী। সময়ের দাবিতে বিশ্বমৈত্রীর সেতুপথ ধরে অনেকেই সে কৌতূহল নিবৃত্তির সুযোগ পেয়েছেন।
পাকিস্তান আমলে যারা সমাজতান্ত্রিক চীন ও রাশিয়া ঘুরে এসে ভ্রমণ কাহিনী রচনা করেছেন তাঁরা সংখ্যায় দশ জন। রাশিয়া সফরকারীদের মধ্যে রয়েছেন মাওলানা এম. এ. ওয়াহ্হার বশিকপুরী, রোকাইয়া জাফরী, শহীদুল্লা কায়সার, সুফিয়া কামাল ও জসীম উদ্দীন। চীন সফরকারীদের মধ্যে রয়েছেন আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আবদুল আহাদ, ইব্রাহীম খাঁ, মওলানা ভাসানী ও আবদুল খালেক ।
এই দশ জন লেখকের প্রত্যেকেই সরকারী উদ্যোগে চীন ও রাশিয়া ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছিলেন। এদের মধ্যে রোকাইয়া জাফরী, জসীম উদ্দীন, মওলানা ভাসানী ও আবদুল খালেক ছাড়া বাকীরা গিয়েছেন প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে। দলবদ্ধ ভ্রমণ পরিকল্পিত রুটিন মাফিক নিয়ন্ত্রিত হওয়ার ফলে ভ্রমণকারীরা তাঁদের ইচ্ছেমত ঘুরে দেখতে পারেন নি।

আর সে কারণেই নিয়ন্ত্রণ ভ্রমণে পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গীগুলো গভীর অভিনিবেশের সুযোগ থেকে হয়েছে বঞ্চিত। এর বাইরে যারা গিয়েছেন তাঁরাও পুরোপুরি স্বাধীনতা পাননি বলে অতৃপ্তি ছুঁয়েছে প্রত্যেককেই। সময় সংক্ষিপ্ততাও ছিল একটি বড় অন্তরায়। একমাত্র আবদুল খালেক ছাড়া বাকীরা সবাই ছিলেন সময়ের ব্যাপারে অভাবগ্রস্থ।
বাঁধা সময়ের নির্দিষ্টতায় চোখের দেখা মেলে ঠিকই তবে মনের দেখার যোগ ঘটেনা কিছুতেই। আর তাই এ নিয়ে আক্ষেপ করতে দেখা গেছে প্রত্যেককেই। সে কারণেই গভর্ণমেন্টের পক্ষ থেকে প্রেরিত প্রতিনিধিদলের সফর-আতিথ্য, অভ্যর্থনা, ভুরিভোজ, উপহার, চাকচিক্য সর্বস্ব লৌকিকতার ভেতরই বেশী আবর্তিত হয়েছে।
যদিও সমাজতান্ত্রিক চীন ও রাশিয়ার উন্নত সমাজ ব্যবস্থায় সত্য আড়ালের প্রয়াস কম তবুও মোটরের ভেতর ছাড়া তাঁদের যাওয়া চলেনি বলে দেশবাসীর সংগে তাঁদের যোগাযোগ ঘটেনি। চোখে পড়েনি কোন দৈন্য, কোন অসুন্দর ও দৃষ্টিকটু উদাহরণ।
অতিথি সেবকদের সৌজন্য আচরণের ফলে নিখাদ প্রীতিময় হয়ে উঠেছে তাদের সফর। এরই মধ্যে ব্যতিক্রম যে কিছু ঘটেনি তা নয় । এসব লৌকিকতার আতিশয্যে নিজেদের স্বকীয়তা বিসর্জন না দিয়ে যাঁরা আপন অন্তর্দৃষ্টি মেলে ধরেছেন অজানা রহস্যের গভীরে তাঁদের মনোভাব অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা।
দুই
মাওলানা এম.এ. ওয়াহ্হাব বশীকপুরী ১৯৫৭ সালের ২৭শে জুন, রোকাইয়া জাফরী ১৯৬৩ সালের ১৬ই নভেম্বর, শহীদুল্লা কায়সার ১৯৬৬ সালের ৩রা জানুয়ারী, সুফিয়া কামাল ১৯৬৭ সালের ৭ই মার্চ এবং জসীম উদ্দীন ১৯৬৭ সালের আগষ্ট মাসে রাশিয়া সফর করেন।
রাশিয়া ঘুরে এসে আবদুল ওয়াহ্হার বশিকপুরী যে মন্তব্য রেখেছেন অন্যান্যদের বক্তব্যে তা নেই। সফরকারী বাকী চারজন সবাই যেখানে বলেছেন সাম্যে, ঐক্যে, ভ্রাতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েট ইউনিয়ন অতুলনীয় এবং সেদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে পুরোপুরিভাবে সেখানে আবদুল ওয়াহ্হাবের দৃষ্টিভঙ্গি স্বতন্ত্র। তিনি বলেছেন অন্তর্গত বৈষম্য সেখানে প্রকট। সাম্যনীতির আড়ালে অসাম্য মাথা তুলে আছে সর্বত্রই এবং রাশিয়ার ক্ষয়িষ্ণু মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতার ব্যাপারে যে অভ্রান্ত প্রচারণা রয়েছে তা বাস্তব বিবর্জিত এক কল্পকাহিনী মাত্র।
মসজিদের পাশে তালি দেয়া জীর্ণ বস্ত্র পরিহিত ৪০/৫০ বছর বয়স্ক একটা লোককে দেখেছি। দয়ার পাত্র। কোন কথা জিজ্ঞেস করবার সুযোগ হয়নি। সাম্যের দেশে এক খাপছাড়া দৃশ্য দেখে আফছোছ করেছি মনে মনে।
তবে সেদেশের নতুন সমাজ-রাষ্ট্রের ও ব্যক্তিমানসের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ও উন্নতি সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন তা অন্যদের সাথে মেলে। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েট রাষ্ট্রের দৃষ্টান্তমূলক উন্নয়ন সাফল্য, তাঁদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিজ্ঞান, শিল্প, অর্থনীতি ও পরিবেশের অভূতপূর্ব উন্নতি এবং সেদেশের ব্যক্তিমানসের উদার নীতিবোধ, শৃঙ্খলা, একতা, নিষ্ঠা, সততা, সচেতনতা, একাগ্রতা, সাধনা ও সৃজনশীলতার মুগ্ধ বর্ণনায় এই পাঁচ লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় অভিন্ন।
রাশিয়ার নয়াবিধানে সমাজের সর্বত্র শিক্ষার বিস্তার দেখে সফরকারীরা বিস্মিত হয়েছেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে ধর্ম অপরিহার্য নয় বলে মার্কসীয় আদর্শে পরিচালিত শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মকে শিক্ষার আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। সোভিয়েট দেশে ধর্ম শিক্ষার সুযোগ যেমন নেই, তেমনি নেই ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কোন কপট ভন্ডামী বা ধর্মব্যবসার সুযোগ। ধর্ম সেখানে নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার।
সোভিয়েট দেশে শিশুদের কদর সবচেয়ে বেশী। এ বিষয়টি প্রত্যেকেরই মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকটি শিশুকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার দায়িত্ব সেদেশের সরকার বহন করে। পাইওনিয়ার হাউসগুলোতে শত শত শিশুর স্বাস্থোজ্জ্বল মুখের হাসি প্রতিনিধিদের মুগ্ধ করেছিল। মুখস্থ বিদ্যা নয় ব্যবহারিক জ্ঞানকেই তারা বেশী প্রাধান্য দেয়।
নার্সারীগুলোতে শিশুরা হেসে খেলে প্রকৃতির নানা রকম ছবি দেখে শিক্ষালাভ করে। ৭ বছর বয়সে তারা স্কুলে আসে। ৭-১৭ বছর বয়স পর্যন্ত চলে তাদের শিক্ষা জীবন। স্কুলগুলোতেও ব্যবহারিক শিক্ষার উপরই বেশী জোর দেয়া হয়। এই স্কুলগুলো থেকেই বেরিয়ে আসে দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সেদেশে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। স্কুল থেকে বেরোবার পর যে যার কর্মক্ষেত্রে চলে যেতে পারে। আর যারা উচ্চশিক্ষার জন্য নির্বাচিত হন আপন যোগ্যতায় তাঁরা ও নির্বিঘ্নে উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারে। শিক্ষায় অধিকারে মর্যাদায় নারীর সম্মানজনক অবস্থানের কথা এরা প্রত্যেকেই বলেছেন।
রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। ডাক্তারদের মধ্যে শতকরা ৯০ জন মেয়ে। শিক্ষয়িত্রীর অনুপাতও তেমনি। সোভিয়েটের প্রতিটি নাগরিক যে বই পাগল এ খবরটি পর্যন্ত দিতে ভোলেননি পর্যবেক্ষকরা।

বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় সেদেশের সকল ক্ষেত্রই হয়ে উঠেছে চোখে পড়বার মত সমৃদ্ধ। বিজ্ঞানের বলে গাছপালা থেেেক শুরু করে মানুষ পশুপাখি সবারই মধ্যে রয়েছে একটা সতেজ ভাব। বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রার একটি বিস্ময়কর ঘটনা যেমন একটি দিনকে দু’দিনের মত করে দেখিয়ে একটি মুরগীকে দিনে দু’বার ডিম দেবার মত অসাধ্য সাধন তারা করেছে। বিজ্ঞানের নতুন উদ্ভাবন তাদের মেট্রো, পাতাল ট্রেন। সফরকারীরা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ করেছেন লেখক ও বৈজ্ঞানিকদের কদর সেদেশে সবচেয়ে বেশী।
কৃষিক্ষেত্রে তাঁরা দেখেছেন রাশিয়ায় প্রচুর জমি থাকা সত্ত্বেও সেদেশে একটুকরো জমিও কোথাও অনাবাদী ফেলে রাখা হয়না। প্রতি ইঞ্চি জমি তারা চাষের উপযোগী করে তোলে। আধুনিক যন্ত্রচাষের মাধ্যমে কৃষিকে তাঁরা এগিয়ে নিয়ে গেছে উন্নতির শিখর চূড়ায় ।
শিল্প ক্ষেত্রেও সে দেশ বহুগুণে উন্নত। সফরকারীরা প্রত্যেকেই তাদের উল্লেখযোগ্য শিল্প কারখানাগুলো ঘুরে দেখেছেন এবং প্রশংসা করেছেন। পুরো দেশটাই হয়ে উঠিছে মেশিেেনর দেশ। নয়া সোভিয়েটের যাবতীয় কর্ম মেশিনে সম্পন্ন হয়। নতুন সোভিয়েটের সব রাস্তাগুলো তারা প্রশস্ত করেছে খুব কম সময়ে কোন বাড়ী ঘর না ভেঙ্গেই যান্ত্রিক উপায়ে এগুলো তারা সম্ভব করেছে।
পরিবেশ ও স্বাস্থ্য রক্ষায় সোভিয়েট ইউনিয়ন অধিক মনোযোগী। সেদেশের সর্বত্রই সুস্থ সুন্দর পরিচছন্ন পরিবেশ পর্যবেক্ষকদের মনে প্রশান্তি এনে দিয়েছিল। সেদেশের খাদ্য কারখানাগুলো ঘুরে দেখেছেন সফরকারীরা। সর্বত্রই তাঁদের চোখে পড়েছে বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে কঠোর সচেতনতার দিকটি। খাদ্যসামগ্রী বাজারে ছাড়বার আগে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখা হয়। কেউ কারখানা পরিদর্শনে এলে তাদের বিশেষ এ্যাপ্রন পরিয়ে প্রবেশাধিকার দেয়া হয়। তাই রাশিয়ার নয়া সমাজে রোগক্লিষ্ট জীর্ণ চেহারার বদলে সর্বত্রই চোখে পড়ে স্বাস্থ্যে শোভায় কান্তিতে ভরপুর সুখী চেহারার মানুষ।
কমিউনিষ্ট সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য যে প্রাচুর্য সেই লক্ষ্য অর্জনেও সোভিয়েটরা সাফল্যের শিখরে এগিয়ে গেছে। অর্থনৈতিক কাঠামো অনুযায়ী সেদেশের আয় যেমন বেশী ব্যয়ও ঠিক তেমনি। সঞ্চয়ের উপায় নেই কারোরই। কেননা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তি মালিকানা না থাকায় সেভিংসের প্রয়োজন পড়ে না কারোরই। সেদেশে সর্বত্রই জিনিসপত্রের এক দর। রাষ্ট্রীয় সুবন্দোবস্তের ফলে দারিদ্র্য্য অদৃশ্য হয়েছে সাম্যের দেশ থেকে। সোভিয়েটের প্রত্যেকটি নাগরিকই সুখী এবং সচ্ছল।
রাষ্ট্রীয় উন্নতির সাথে সাথে সেদেশের মানুষগুলোও উন্নত হয়েছে অস্তরে বাইরে। প্রতিনিধিরা তােেদর উন্নত জাতীয় চরিত্রের সংস্পর্শে এসে প্রীত হয়েছেন। চারিত্রিক শুদ্ধতা, উদার নীতিবোধ, শৃঙ্খলা, একতা, নিষ্ঠা, সততা, সচেতনতা, একাগ্রতা, সাধনা ও সৃজনশীলতার মত বৈশিষ্ট্যগুলোর যোগফলের সমষ্টিতে তারা প্রত্যেকেই হয়ে উঠেছেন এক একটি আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। আর তাদের এই আত্মিক উন্নয়নের খবরগুলো উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় জনসাধারনকে অবহিত করেছেন পর্যবেক্ষকগণ ।
রাশিয়ায় শৃঙ্খলা ও কর্তব্যবোধের নিয়মতান্ত্রিক দিকগুলো পর্যবেক্ষকদের বিস্মিত করেছিল। এঁরা প্রত্যেকেই বলেছেন সেদেশে প্রচুর ভীড়ের চাপেও কোথাও কোন শৃঙ্খলাভঙ্গের মত ঘটনা তাঁরা ঘটতে দেখেননি। বিরাট শহরের জনারণ্যে কোথাও কোন কোলাহল তাঁদের কানে আসেনি। সবাই যে যার কাজ করে চলে শব্দহীন গতিতে। কর্তব্যের ক্ষেত্রে তাঁরা একচুলও অবহেলা করে না। দায়িত্ব পালনে প্রতিটি নাগরিক আন্তরিক।
কঠোর সাধনা ও অনুশীলনের মাধ্যমে তারা স্বদেশ ও জাতিকে তুলে ধরেছে বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশ হিসেবে। নিরন্তর ত্যাগে ও শ্রমে, স্বকীয়তায়, স্বাতন্ত্র্যে নতুন সোভিয়েট নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে গৌরবের আসনে। সততা সে জাতির বড় অহংকার। নয়া সোভিয়েটে কোথাও কারও কিছু খোয়া যায় না। চুরি, ডাকাতি, মিথ্যা, রাহাজানি, উচ্ছৃঙ্খলতার মত নোংরা কিছু পর্যবেক্ষকদের নজরে পড়েনি সেদেশে। রাষ্ট্রের সুপরিকল্পিত ব্যবস্থায় জনগণের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত হওয়ায় সেখানে কেউ অন্যায় অনাচারের পথে পা বাড়ায় না। নয়া সোভিয়েটের কোথাও কোন দলাদলি তাঁদের চোখে পড়েনি। তাঁরা প্রত্যেকেই লেনিনভক্ত।
প্রতিনিধিরা উপলব্ধি করেছিলেন জানবার আগ্রহ রুশদের প্রবল। প্রতিটি বিষয়ের গভীরে যাবার প্রয়াস তাদের সৃজনশীলতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রুশরা সহনশীল, বিনয়ী ও নম্র। আতিথেয়তায় তাদের জুড়ি নেই।
রুশদের সংগ্রহবোধ, সৌন্দর্যবোধ ও সাধনায় এক ভিন্নধর্মী স্বাতন্ত্র্য লক্ষিত হয়। সেদেশের সর্বত্রই তাদের রুচিবোধের ধ্রুপদী রূপটি স্পষ্ট। চিত্রকলায়, সংগীতে, সাহিত্যে, নৃত্যে, অভিনয়ে অর্থাৎ সুকুমার কলার প্রতিটি শাখায় তাদের দক্ষতা প্রশংসনীয়। ব্যালে নৃত্যে সেদেশ পৃথিবীবিখ্যাত। পুরাতন ঐতিহ্যকে তারা কখনই বিসর্জন দেয় না। পুরাতনের সাথে নতুনের সংমিশ্রন ঘটিয়ে নব সৃষ্টিকে করে তোলে তারা আরও গ্রহনীয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিপ্লবের মাত্র ১৩ বছর পর ১৯৩০ সালে রাশিয়া সফরে যান এবং তার বহুদিনের লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত হতে দেখে আনন্দে উত্তেজনায় অভিভূত হয়ে পড়েন। তাঁর এই সফরকে তিনি তীর্থ দর্শনের সংগে তুলনা করেছেন। নবীন রাশিয়ার সামগ্রিক আয়োজনের অভাবনীয় সাফল্যে তিনি এতটা মোহিত হবার পরও সমাজতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি সন্দিহান হয়েছেন।
সেদেশের রাষ্ট্রীয় দর্শন, অর্থনীতি ও সমষ্টি বাষ্টির সীমারেখা নিয়ে তিনি সমালোচনামূলক মন্তব্য রেখেছেন। তারপরেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামগ্রিকবোধে তাদের উন্নয়ন সাফল্যের দিকটিই বড় হয়ে উঠেছে। তিনি অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন তাদের অভাবনীয় উন্নতি অগ্রগতির পাশাপাশি নিজের দেশের অবস্থা আলোচনায় এনে আপন মর্মবেদনা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মনে হয়েছে স্বদেশের সমস্যাও অনুরূপভাবে সমাধান সম্ভব।
প্রবোধকুমার সান্যাল ১৯৫৮ এবং ১৯৫৯ সালে পর পর দুবার রাশিয়া ভ্রমণ করেন। তাঁর বক্তব্যও রবীন্দ্রানুরূপ। রচনাশৈলী যদিও ভিন্ন তবে দৃষ্টিতে, উপলব্ধিতে মুগ্ধতা এবং দ্বিধা দুই-ই ছিল। এই ভালো- মন্দের যোগ-বিয়োগ করে শেষপর্যন্ত তাঁর বোধেও বড় হয়ে উঠেছে তাঁদের উন্নয়ন সাফল্যের দিকটি।
একটি ব্যাপার লক্ষ্য করা গেছে যে, সফরকারীরা প্রত্যেকেই সোভিয়েট দেশের সাফল্যে মুগ্ধ। তাঁদের রচনা শৈলীতে বিভিন্নতা রয়েছে তবে উপলব্ধি যেন এক। আবদুল ওয়াহহাব কমিউনিষ্ট সোভিয়েটের কিছু কিছু অসঙ্গতির চিত্র তুলে ধরলেও তাঁর বক্তব্য সার্থক সমালোচনায় পূর্ণ। তিনি সেদেশের ভাল-মন্দ দুটো দিক নিয়েই কথা বলেছেন।
সমাজতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থার সুফলগুলোর অকুণ্ঠিত প্রশংসা করেছেন তিনি। সাথে সাথে নিজের দেশের প্রসঙ্গ আলোচনায় এনে আপন মর্মপীড়া প্রকাশ করেছেন। গল্পের মেজাজে বলা রোকাইয়া জাফরীর বক্তব্যেও রয়েছে সেদেশের অভাবনীয় উন্নতি অগ্রগতির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা এবং বিস্ময়। তিনি পৃথিবীর নির্যাতিত বঞ্চিতদের তীর্থস্থান হিসেবে সেদেশকে চিহ্নিত করেছেন।

স্বদেশের আলোচনা এসেছে প্রসঙ্গক্রমে এবং সমস্যাজড়িত দেশের জন্য তাঁর অন্তর্বেদনার প্রকাশ ঘটেছে। রোকাইয়া জাফরী বিস্মিত হয়েছেন নব সোভিয়েটের উন্নয়ন সাফল্যে, তবে তিনি এই উন্নয়নের পেছনে কমিউনিজমের ভূমিকাকে সরাসরিভাবে উল্লেখ করেননি। শহীদুল্লা কায়সার সোভিয়েটের উন্নত সমাজ ও সেদেশের মানুষের উদার মূল্যবোধের প্রশংসা করেছেন। তিনি রাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে খুব একটা কথা বলতে চাননি। বিতর্ক যথাসম্ভব এড়িয়ে গেছেন।
কমিউনিষ্ট সোভিয়েটের উন্নত দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে স্বদেশের দৃষ্টিভঙ্গীগত পার্থক্য তাঁকে পীড়া দিয়েছিল। সুফিয়া কামাল নয়া সোভিয়েটের অভূতপূর্ব উন্নতি অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং সেই সাথে স্বদেশের অবস্থা আলোচনায় এনে নিজের মর্মবেদনা প্রকাশ করেছেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন সোভিয়েট আদর্শের পথ অনুসরণে পূর্ববাংলায় বিরাজমান নানামুখী সমস্যার সমাধান সম্ভব। তাঁর রচনাশৈলী প্রায়শই কথন প্রণালীর কাছাকাছি গেছে।
নিতান্ত সাধারণ বর্ণনার ভেতর দিয়েই মূর্ত হয়েছে তাঁর মুগ্ধতার উদ্ভাস। জসীম উদ্দীন কাব্যিক বর্ণনার ভেতর দিয়ে নবীন সোভিয়েটের মহান প্রয়াসকে স্বাগত জানিয়েছেন। সেদেশের সামগ্রিক আয়োজনের সাফল্যের গুণমুগ্ধতার পাশাপাশি নিজের দেশের অবস্থা আলোচনায় এনে পূর্ববাংলার জন্যও অনুরূপ রাষ্ট্র ব্যবস্থা আশা করেছেন।
এ যাবৎ আলোচনায় দেখা গেছে যে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েট দেশ দর্শনে কারো কারো বর্ণনায় কিছুটা দ্বিধার ভাব থাকলেও সেদেশের সভ্যতা, স্বাতন্ত্র্য, স্বকীয়তা আর তার সামগ্রিক আয়োজনের অভিনব সাফল্যের বর্ননায় এরা সবাই উচ্ছ্বসিত ।
সোভিয়েট ইউনিয়নে সবকিছুই বিরাট বিশাল। যেমন এর বাড়ীঘর, রাস্তা, তুষারমন্ডিত প্রান্তর, তেমনি এদেশের লোকের কর্মশক্তি! বিজ্ঞানকে এরা নিজের সহচর করে নিয়েছে। মানুষের প্রয়োজনে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে এরা প্রকৃতিকে কাজে লাগাবার উপায় উদ্ভাবন করেছে। সাম্য এবং শান্তির জন্য এরা প্রাণপণ করেছে। সেই দেশে গিয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করেছি। ২
তিন
মওলানা ভাসানী ১৯৬৩ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর, আবুল কালাম শামসুদ্দীন ১৯৬৫ সালের ২রা মার্চ, আবদুল আহাদ ১৯৬৫ সালের ২০শে মার্চ, আবদুল খালেক ১৯৬৫ সালের ৮ই ডিসেম্বর এবং ইব্ররাহীম খাঁ ১৯৬৬ সালের ২০ শে এপ্রিল চীনে গমন করেন।
এঁদের মধ্যে আবদুল খালেক চীনে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের নির্বাচিত শিক্ষার্থী হিসেবে। তিনি দশমাস সেদেশে অবস্থান করেছিলেন। তুলনামূলকভাবে অন্যান্যদের চেয়ে সময় বেশী পাওয়ায় চীনকে খুব কাছ থেকে দেখবার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। সে কারণেই নয়া চীনের সমাজ ব্যবস্থা, আদর্শ ও মতবাদ সম্পকে তিনি যে মন্তব্য রেখেছেন অন্যদের সাথে সেসবের বেশ কিছু পার্থক্য লক্ষিত হয়েছে।
অন্যেরা যেখানে বলেছেন সাম্যের দেশ চীনে কোন বৈষম্য এবং অপরিচ্ছন্ন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তাঁদের নজরে পড়েনি সেখানে তাঁর বর্ণনা একটু ভিন্ন। তিনি দেখেছেন কোন কোন কমিউনের দারিদ্র্যপূর্ণ জীবনযাত্রা, বাসগৃহের ব্যাপারে গ্রাম ও শহরের মধ্যে অসমতা, এবং গ্রামের মানুষের জীবন প্রণালীতে কষ্টের ছাপ।
সেদেশের ঝকঝকে উজ্জ্বল পরিচ্ছন্নতার আড়ালে নোংরা অস্বাস্থ্যকর কিছু পরিবেশের দৃশ্য তাঁর নজরে পড়েছে। তাঁর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি আরও আবিষ্কার করেছে সেদেশের যানবাহনগুলোর মান অনুন্নত এবং বাসগুলোতে প্রচন্ড ভীড় থাকায় চলাফেরা সুখকর নয়। সেখানে প্রয়োজনের তুলনায় বাড়ী-ঘরের সংখ্যাও কম। এবং সেগুলো আকৃতিতে এত ছোট যে খোলামেলা পরিবেশ সেসব বাসগৃহে মেলে না। সেদেশের মানুষের মধ্যে মায়া মমতার বন্ধন শিথিল। শিল্প সাহিত্য চর্চায় তারা যুক্ত বুদ্ধির অধিকারী নয়।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টি সহর থেকে অনেক দূরে গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি কয়েকটি কমিউন আছে। বিকেলে সেখানে আমরা মাঝে মাঝে বেড়াতে যাই। কমিউনে জনসাধারণের বাসগৃহগুলো অত্যন্ত দারিদ্র্যপূর্ণ। ছোট ছোট আধা ভাঙ্গা ঘরে বহু কষ্টে মাথা গুঁজে তারা বসবাস করছে। বাসগৃহের ব্যাপারে সহর এবং গ্রামের মধ্যে এখনও তেমন সমতা আসে নি। ৩
তবে সামগ্রিকভাবে, নয়া চীনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা, কার্যপদ্ধতি, আদর্শ, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ধ্যান-ধারণা, সামাজিক চেতনা ও ব্যক্তি মানসের উন্নতির প্রশংসায় এই পাঁচ লেখকের দৃষ্টিভঙ্গী গিয়ে মিলেছে একটি বিন্দুতে।
সেদেশের সামগ্রিক উন্নতি ও অগ্রগতি প্রত্যেককেই মুগ্ধ করেছিল। বিভেদহীন সমাজব্যবস্থায় সেদেশে সব মানুষই সম মর্যাদাসম্পন্ন। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে রিক্সাচালক পর্যন্ত সেখানে সবাই সমান এবং সেদেশে প্রত্যেককেই মাঠে কাজ করতে হয় পর্যায়ক্রমে ।
সমস্ত চীন জুড়ে প্রতিটি মানুষকে শিক্ষিত করে তুলবার বিরাট আয়োজন দেখে প্রতিনিধিরা প্রত্যেকেই বিস্মিত হয়েছেন। সেদেশে কোন নিরক্ষর তাঁদের চোখে পড়েনি। প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারী এবং সেদেশের সকল ছাত্র-ছাত্রী বিনাবেতনে অধ্যয়ন করে। নারী পুরুষের ভেদাভেদ সেখানে নেই। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নারীর সম্মানজনক অবস্থান।
কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর সংখ্যাধিকাই চোখে পড়ে। খেলাধূলা থেকে শুরু করে পোশাক পরিচ্ছেদেও ছেলেতে মেয়েতে কোন পার্থক্য তাঁরা করেনা। সবার জন্যই রয়েছে এক ব্যবস্থা।
স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় চীনারা অত্যন্ত সচেতন। পরিচ্ছন্নতার কাজগুলোতে তারা প্রত্যেকেই পালাক্রমে অংশগ্রহণ করে। সেখানকার বাজারগুলোর পরিবেশও উল্লেখযোগ্য ভাবে ভালো। চীনে কোন রোগক্লিষ্ট মলিন চেহারার মানুষ তাঁদের নজরে পড়েনি। সেখানকার প্রতিটি মানুষই সবল সুস্থ এবং তাঁরা প্রত্যেকেই নিরোগ হাসোজ্জ্বল। সেদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাও বহুগুণে উন্নত। ব্যাথাবিহীন ইনজেকশন দেবার পদ্ধতি ছাড়াও চীনের আকুপাংচার চিকিৎসা পদ্ধতি ইংল্যান্ড, ফ্রান্সসহ বহু দেশে জনপ্রিয়।
কৃষিক্ষেত্রে তাঁরা প্রত্যেকেই দেখেছেন চীনারা এক টুকরো জমিও অনাবাদী ফেলে রাখে না। প্রতি ইঞ্চি জমি তারা সদব্যবহার করে। ফলে নিজের দেশের সমস্যা মোকাবেলা করেও পৃথিবীর যে কোন দু’চারটি দেশের দুর্ভিক্ষের মোকাবেলা তারা করতে পারে। সেদেশে রাস্তার দু’ধারে তাকালেই লক্ষ লক্ষ ফলবান বৃক্ষের সারি দেখতে পাওয়া যায়।
এক সারিতে নয়, সাত সারিতে এসব গাছের চারা লাগানো হয়েছে এবং প্রত্যেকটি গাছের নীচে যে খালি জায়গাটুকু রয়েছে তাতেও তারা বিভিন্ন ধরনের শাকসবৃজির চাষ করেছে। বিপ্লবোত্তর চীনে চৌদ্দ বছরে সত্তর কোটি মানুষ দু’শ কোটি নতুন গাছের চারা লাগিয়েছে। এগুলো সৌন্দর্য বৃদ্ধির সাথে সাথে অর্থনীতিকেও করেছে সমৃদ্ধ।
অর্থনৈতিক কাঠামো অনুযায়ী নতুন চীনে প্রত্যেকটি মানুষের আয় প্রায় সমান। যা কিছু তারতম্য আছে তা চোখে পড়ে না। সঞ্চয়ের প্রবৃত্তি নেই তাদের। গণচীন সরকার সেদেশের প্রতিটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান নিশ্চিত করেছে। জনগণের মৌলিক চাহিদা থেকে শুরু করে প্রতিটি মানুষের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সরকারী দায়িত্বে সমভাবে পরিচালিত হয়। চীনের প্রতিটি মানুষ বিলাসিতার মোহমুক্ত।
নারীরাও সেদেশে কোন বিলাস সামগ্রী ব্যবহার করেন না। সিল্কের দেশ হিসেবে খ্যাত চীনে কোন মানুষ সিল্ক পরেন না। সবাই সুতি কাপড় ব্যবহার করে এবং তাদের প্রত্যেকের পোশাকের রং নীল। চীনের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনে বড় ভূমিকা পালনকারী কমিউন ব্যবস্থার মোটামুটি প্রশংসা করেছেন সবাই।
কমিউন ব্যবস্থার গুনে পাল্টে গেছে সেখানকার সামগ্রিক চিন্তাধারা। কমিউনের আদর্শ হলো ব্যক্তি নয় সমষ্টির ভাবনা। কমিউন ব্যবস্থা দুর্ভিক্ষ আক্রান্ত নিঃশেষিত চীনকে দিয়েছে নতুন জীবনের দিকনির্দেশনা যেখানে প্রতিটি মানুষই সুখী সচ্ছল।
শিল্প ক্ষেত্রেও তারা অনেক উন্নত। নতুন চীনের ইস্পাত শহর আনসান পৃথিবী খ্যাত। সাংহাই চীনের উল্লেখ্যযোগ্য শিল্প বাণিজ্য কেন্দ্র। অথচ সাংহাই এর রাস্তায় তেমন সংখ্যক মোটর কার নেই। গাড়ী তৈরীর কারখানা রয়েছে তাদের। ইচ্ছে করলেই তারা সাংহাই এর রাস্তায় হাজার হাজার গাড়ী নামিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এতে নাগরিক সুখ দু’বেলা পেট ভরে খাবার নিশ্চয়তা ব্যাহত হতে পারে এই বোধ তাদের সকল রকম কৃচ্ছতা সাধনে সহায়তা করে।
দেশের সামগ্রিক উন্নতির সাথে সাথে আত্মিক দিক থেকেও সেদেশের প্রতিটি মানুষ উন্নত। আদর্শে, নৈতিকতায়, সভতায়, মহানুভবতায়, নম্রতা, ভদ্রতায়, শৃঙ্খলা ও কর্তব্যবোধে, অবিচলতায়, সহনশীলতায়, সৃজনশীলতায়, নিষ্ঠায় তারা প্রত্যেকেই দৃষ্টান্ত দেবার মত উজ্জ্বল।

কোলাহলহীন সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থা কমিউনিষ্ট রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। বিরাট চীনের কোথাও কোন শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনা তাঁদের চোখে পড়েনি। প্রতিনিধিরা সেখানে কোনরকম দলাদলি দেখতে পাননি। চীনারা প্রত্যেকেই তাদের প্রিয় নেতা মাও সে তুঙ এর ভক্ত।
নৈতিক আদর্শের দিক থেকেও তারা অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। আত্মিক শুদ্ধিতে প্রতিটি চীনা নাগরিক শুদ্ধ। সেদেশে কখনই কারো কিছু হারানো যায় না। সেদেশের মানুষ এতটাই দুর্নীতিমুক্ত যে তারা দরজায় কোন ছিটকিনি ব্যবহার করে না। চুরি, ডাকাতি, শঠতা, প্রবঞ্চনা প্রভৃতি শব্দগুলো মুছে গেছে নয়া চীনের বুক থেকে।
শিল্পীর মর্যাদা সেদেশে সবার উচ্চে। চীনা সংস্কৃতিতে রয়েছে সেদেশের জাতীয় জীবনের বিভিন্ন চিত্রের রূপায়ণ। প্রত্যেকটি সংগীত নৃত্যে ও অভিনয়ে রয়েছে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা ও আদর্শের ইংগিত। সাংস্কৃতিক দিক থেকে তারা নিজস্ব ভাবধারার সাথে পাশ্চাত্য সংগীতের মিশ্রণ ঘটিয়ে শিল্পকে করেছে আরও উন্নত।
চীনারা কাব্যপ্রাণ, শিল্পপ্রাণ ও সৌন্দর্যপ্রিয়। চীনের সর্বত্রই দেশীয় সমৃদ্ধির পক্ষে তাদের শিক্ষণীয় প্রচারের ব্যাপকতা চোখে পড়ে। নন্দনতত্ত্বের সাথে শিক্ষায় যোগ ঘটিয়ে তারা বিষয়কে করে তোলে অধিক আকর্ষণীয়, গ্রহণীয়। চীনা ব্যালাড পৃথিবীখ্যাত ।
নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধে চীনারা অতুলনীয়। ফাঁকির প্রবণতা নেই তাদের। চীন দেশ ও জাতি যেন এক অভিন্ন আত্মা। দেশের প্রত্যেকটি জিনিসকে তারা নিজের মনে করে এবং জীবন দিয়ে তা আগলে রাখে। দেশের সমৃদ্ধির লক্ষ্যে তারা প্রত্যেকেই অনলস কর্মী।
তাদের আতিথেয়তার প্রশংসা করেছেন প্রতিনিধিরা প্রত্যেকেই। চীনারা প্রতিটি বিষয়েই আন্তরিক এবং হাস্যেজ্জ্বল। ব্যবহারে তারা প্রত্যেকেই অমায়িক। কোন বাঁধাই যেন তাদের এতটুকু বিচলিত করে না। যে কোন সংকটের মোকাবেলায় তারা স্থির অবিচল।
পশ্চিম বাংলার বিশিষ্ট সাহিত্যিক মনোজ বসু ১৯৫২ সালে স্বাধীনতার তৃতীয় বর্ষ পূর্তি ও ২৫শে সেপ্টেম্বর সেদেশের শাস্তি সম্মেলন উপলক্ষে ভারতীয় দলের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে চীনে গিয়েছিলেন। তিনি আপন অন্তরে গণতন্ত্রের ও আদর্শ সমাজের যে ছবিটি দীর্ঘকাল ধরে লালন করে এসেছেন বিপ্লবোত্তর চীনের সামগ্রিক কর্মকান্ডে সেই রূপই দেখতে পেয়েছেন। তিনি মুগ্ধ হয়েছেন নয়া চীনের বিস্ময়কর উন্নয়ন সাফল্যে।
হালকা মেজাজে আনন্দ উজ্জ্বল বর্ণনার ভেতর দিয়ে তিনি চীনের ভৌগোলিক বিবরণ থেকে শুরু করে পুরোনো চীন সহ বিপ্লবোত্তর চীনের ইতিহাস সেই সাথে ভারতবর্ষ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রসঙ্গ এবং নতুন চীনের সমাজ ব্যবস্থা, কার্যপদ্ধতি, আদর্শ, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, মতবাদ, তাদের শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির প্রসঙ্গ আলোচনা করেছেন।
এসব আলোচনার ভেতর দিয়ে বড় হয়ে উঠেছে চীনা জাতির বৈশিষ্ট্যগুলো। তিনি নয়া চীনের সামগ্রিক কর্মকান্ডের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন পাশাপাশি ভারতবর্ষের অসঙ্গতিগুলো আলোচনায় এনে তীব্র কটাক্ষ হেনেছেন। কমিউনিষ্ট রাষ্ট্রনীতির প্রচার বিবর্জিত বিশ্বশান্তির লক্ষ্যে সমগ্র চীন জাতির অগ্রসরমান জীবনের চিত্রই এতে প্রধান।
আবুল কালাম শামসুদ্দীন ডাইরী আকারে তাঁর চীন সফরের অভিজ্ঞতাগুলো ব্যক্ত করলেও শৈল্পিক মানদন্ডের বিচারে তাঁর এ রচনা সার্থক। চীনের অভাবনীয় উন্নয়ন সাফল্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন তিনি। পাশাপাশি নিজ দেশের দুরবস্থা আলোচনায় এনে বেদনার্ত হয়েছেন।
আবদুল আহাদ চীনের বিপুল অগ্রযাত্রার অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন। তাদের যে বিষয়গুলো তাঁকে সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ করেছিল সেসবের প্রশংসনীয় আলোচনার পাশাপাশি স্বদেশের ভুল আক্রান্ত মতবাদগুলো টেনে এনে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। গল্পের ঢং এ বলা তাঁর এ কাহিনীতে চীনের সাংস্কৃতিক দিকটি ছাড়াও অন্যান্য দিকের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ।
ইব্ররাহীম খাঁ হালকা চটুল অথচ তাত্ত্বিক পরিহাসের ভিতর দিয়ে চীনের বিরাট আয়োজনের দৃষ্টান্তমূলক উন্নতির তারিফ করেছেন। স্বদেশের আলোচনা এসেছে প্রসঙ্গক্রমে। চীনের উন্নত কার্যপদ্ধতি, আদর্শ, মতবাদ, প্রভৃতির সাথে যেখানেই তিনি স্বদেশের অমিল দেখেছেন সেখানেই তাঁর অন্তর বেদনায় হাহাকার করে উঠেছে।
মওলানা ভাসানী চীন দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, চীন সম্পর্কে সবটুকু উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেও তিনি অন্তরের উপলব্ধিগুলোর হুবহু রূপ ফুটিয়ে তুলতে না পারার বেদনায় আহত হয়েছেন। চীনের অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাফল্যের প্রশংসার পাশাপাশি নিজের দেশের অবস্থা আলোচনায় এনে গভীর মর্মবেদনা প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন চীনা আদর্শ অনুসরণে তাঁর দেশের সমস্যাও সমাধান সম্ভব। তিনি পাকিস্তান থেকে প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে তাদের চীন থেকে শিক্ষা নেবার পরামর্শ দিয়েছেন।
আবদুল খালেক চীনের নানাবিধ অসঙ্গতির চিত্র তুলে ধরলেও তাদের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকান্ডের প্রশংসায় তিনিও উচ্ছ্বসিত। দৃষ্টিতে উপলব্ধিতে মুগ্ধতা ও দ্বিধা দুই-ই ছিল। তারপরেও তাঁর সামগ্রিক বোধে চীনের উন্নয়ন সাফল্যের দিকটিই প্রধান হয়ে উঠেছে। তিনি এই অভিনব সাফল্যের প্রশংসার পাশাপাশি নিজের দেশের অবস্থা আলোচনায় এনে ব্যাথিত হয়েছেন। তিনি চীনা আদর্শ অনুসরণে স্বদেশের সমস্যা সমাধানকে জরুরী মনে করেছেন। তাঁর বক্তব্য বুদ্ধিগ্রাহ্য সার্থক সমালোচনায় পূর্ণ।
সমাজতান্ত্রিক চীন দেশ ঘুরে কারো কারো বক্তব্যে কিছুটা দ্বিধার ভাব প্রকাশ পেলেও সেদেশের সমাজ-রাষ্ট্র ও ব্যক্তিমানসের অভাবনীয় উন্নয়ন সাফল্যের বর্ণনায় এরা সবাই উচ্ছ্বাসমুখর ।
আজিকার সংঘাতক্ষুব্ধ বিশ্বে চীন এক মহাবিস্ময়। চীন আজ এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাতিন আমেরিকার লুষ্ঠিত জনসমষ্টির মুক্তি সংগ্রামের নেতা। চীন এই তিন মহাদেশের সদ্যোথিত জনগণের মুক্তিতীর্থ। আমি সেই তীর্থ দর্শনে গিয়াছিলাম। ৪