মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চিহ্ন’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টিকর্ম, যা সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবন, দুঃখ-কষ্ট, আর্থ-সামাজিক টানাপোড়েন এবং মানবিক টানাপোড়েনকে গভীর মানবিকতায় তুলে ধরেছে। এই উপন্যাসে তিনি গ্রামবাংলার সহজ-সরল, অথচ সংগ্রামী জীবনধারার নিখুঁত চিত্র এঁকেছেন।
‘চিহ্ন’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর জীবনসংগ্রাম, স্বপ্নভঙ্গ, আশা-নিরাশা, প্রেম ও বঞ্চনার চিহ্ন নিয়ে এগিয়ে চলে। এটি শুধু একটি কাহিনি নয়, বরং সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতার চিত্রায়ণ, যেখানে প্রতিটি চরিত্র তাদের নিজস্ব চিহ্ন বহন করে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমাজমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি এবং গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এই উপন্যাসকে বাংলা সাহিত্যে একটি স্থায়ী আসন দিয়েছে। তাঁর শক্তিশালী লেখনী সমাজের অবহেলিত, অবদমিত, এবং নিপীড়িত মানুষের জীবনযন্ত্রণা, সংগ্রাম এবং জীবনের ক্ষুদ্র আনন্দগুলোকে অত্যন্ত বাস্তবধর্মী ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছে। ‘চিহ্ন’ তাই শুধুমাত্র একটি উপন্যাস নয়, বরং মানুষের জীবনের অনন্ত সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিহ্ন উপন্যাস
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশে তুমুল বিক্ষোভ হয়। কলকাতার রাস্তার বিক্ষোভ, শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘চিহ্ন’ (১৯৪৭) উপন্যাসটি লিখেছেন। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন পেশার কিছু মানুষ এবং তাদের ব্যক্তিগত জীবন উপন্যাসে লেখক দেখিয়েছেন। কৃষক, মঞ্জুর, বাসের কন্ডাক্টর, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, নেতা, ছাত্র সবার স্বরূপ উদ্ঘাটন করেছেন লেখক।
“একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বহু মানুষের মধ্যে যে বিচিত্র আলোড়ন দেখা দিয়েছিল মানিক অপূর্ব কৌশলে তাকে প্রকাশ করে তুলেছেন।
উপন্যাসের শুরু হয়েছে বিক্ষোভ মিছিল দেখে মঞ্জুর গণেশের বিস্ময়ের মাধ্যমে। সে বিদ্যুৎ লিমিটেডে’র মালিক দাশগুপ্তের মাল ডেলিভারি দিতে যাচ্ছে, পথে দেখতে পায় মানুষের প্রতিবাদ বিক্ষোভ। গণেশ এখান থেকে সরতে পারে না, তার মনেও তীব্র আক্রোশ, অসন্তোষ। পুলিশ গুলি চালিয়েছে। গণেশের গুলি লেগেছে, তবু গণেশ দাঁড়িয়ে আছে।

ওসমানকে পেয়ে জিজ্ঞাসা করে এরা এগুবে না বাবু ওসমান রক্তভেজা গণেশকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। গনেশ বাঁচে না। আপনজনের অভাবে লাশ মর্গে লড়ে থাকে। পরে আসবে মনে করে ওসমান হাসপাতাল থেকে বের হয়। হাসপাতালের গেটে দেখা হয় রসুল আর শিবনাথের সঙ্গে। ওরা ওসমানের ছেলের বন্ধু। রসুলের ডান হাতে গুলি লেগেছে। হাতটা হয়তো কেটে বাদ দিতে হবে।
রসুল এখন চিন্তা করছে বাম হাত দিয়ে কীভাবে সব কাজ চালিয়ে নেওয়া চলবে। ওসমানের রসুলকে ছেলের মতো মনে হয়। নেতারা এসে বিক্ষোভ থামাতে বলছে। বসন্তরায়ের নির্দেশনামা অমৃতবাবু পড়ে শোনাচ্ছে। কিন্তু বিক্ষোভ থামে না। ভালো ছাত্র হেমন্ত, মায়ের কষ্টের টাকায় লেখাপড়া করে। মা রাজনীতি পছন্দ করে না বলে হেমন্ত কখনো মিছিল-মিটিং এ আসে না। কিন্তু আজকে না এসে সে থাকতে পারেনি।
মা অনুরূপা চিন্তা করে এক সময় হেমন্তর বন্ধু সীতার কাছে যায়, সীতাকে অভিযোগ করে। সীতা খোঁজ নিয়ে জানতে পারে হেমন্ত সামান্য আহত হয়ে হাসপাতালে গেছে। অনুরূপা ক্ষোভে-দুঃখে বাড়ি চলে আসে। হেমন্তের ছোট ভাইও পরদিন নোভা যাত্রায় গিয়ে গুলি খেয়ে মারা যায়। অফিস থেকে বেরিয়ে নেশাখোর অক্ষয় মদ খেতে অতৃপ্ত হয়। তার মনে হয়, মদ খেলে সে অপবিত্র হয়ে যাবে।

অক্ষয় শুদ্ধ জীবনে প্রত্যাবর্তন করে। রসুল পালিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসে। ওসমান পরদিন রসুলের মায়ের সঙ্গে দেখা করে নিজের মেয়ের সঙ্গে রসুলের বিয়ের কথা পাকা করে আসে কারখানার শ্রমিক অভায় ধর্মঘটের কারণে কারখানায় না গিয়ে শোভাযাত্রায় অংশ দেয়। দেখা হয় গ্রাম থেকে আসা গণেশের মা, বাবা, বোনের সঙ্গে। বোন রানীকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গিয়েছিল।
তাই তারা গ্রামের লোকের সহায়তায় শহরে গণেশের আশ্রয়ে আসছে। অজয় তাদের দাশগুপ্তের বাড়ি পৌঁছে দেয়। দাশগুপ্ত গণেশের মৃত্যুর খবর গোপন করে রানীর দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, তাদের বাড়িতে থাকতে বলে। কিন্তু রাণী বুঝতে পেরে মা বাবাকে নিয়ে আবার পথে নামে। দেখে শোভাযাত্রায় অজয়। অজয়কে তারা ডাকে, কিন্তু সে শোনে না। অজয় বলে:
“আমরা এগিয়েছি। ঠেকাতে পারে নি, আমরা এগিয়েছি।” (৫খ, পৃ.-৪৩৯)
উপন্যাসে লেখক আন্দোলনের মাধ্যমে অন্ধকার থেকে স্বাধীনতায় উত্তরণের আশা ব্যক্ত করেছেন।