Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

চাঁদের অমাবস্যা – সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার

চাঁদের অমাবস্যা

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘চাঁদের অমাবস্যা’ বাংলা সাহিত্যের এক গভীরতর উপন্যাস, যা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, সামাজিক বৈষম্য, এবং ধর্মীয় ভণ্ডামিকে কেন্দ্র করে রচিত। এটি একটি অন্তর্মুখী, গভীর জীবনবোধসম্পন্ন রচনা, যেখানে লেখক মানুষের অসহায়ত্ব, নিঃসঙ্গতা এবং অস্তিত্বের সংকটকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন।

উপন্যাসটির নাম ‘চাঁদের অমাবস্যা’ নিজেই এক শক্তিশালী রূপক, যা অন্ধকার, বিচ্ছিন্নতা, এবং অন্তর্লীন ভয়কে প্রকাশ করে। এখানে চাঁদ মানুষের আশা, স্বপ্ন, এবং মুক্তির প্রতীক, আর অমাবস্যা হলো হতাশা, অন্তর্দ্বন্দ্ব, এবং সমাজের অমানবিকতার প্রতিচ্ছবি।

ওয়ালীউল্লাহ এই উপন্যাসে গ্রামীণ বাংলার সরল জীবনের মধ্যেও মানুষের গভীর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, আত্মপ্রতারণা, এবং নিঃসঙ্গতার চিত্র নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষার সরলতা, প্রতীকী উপস্থাপনা, এবং জীবনের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ‘চাঁদের অমাবস্যা’কে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটি বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার বইএর চেতনাপ্রবাহ শিল্পশৈলীর উপন্যাস এর অন্তর্গত।

 

 

চাঁদের অমাবস্যা

বাংলাদেশের উপন্যাস-সাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১) প্রথম পাশ্চাত্য জীবনদৃষ্টি ও শিল্পবোধকে আত্ম করে চেতনাপ্রবাহশৈলীর শিল্পসফল উপন্যাস রচনা করেন। ‘চাঁদের অমাবস্যা’ (১৯৬৪) এবং ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ (১৯৬৮) উপন্যাসে তিনি প্রয়োগ করেছেন অস্তিত্ববাদী জীবনদর্শন কিন্তু ব্যবহার করেছেন চেতনাপ্রবাহ শিল্পশৈলী ।

আঙ্গিক চেতনায় এই নতুনত্ব এবং জীবনদর্শনে আন্তর্জাতিকতা তাঁকে সমকালীন অন্য লেখকদের থেকে আলাদা করেছে। বিরুদ্ধ সমাজ সময়ে পীড়িত, আত্মবন্ধি ব্যক্তিমানসের যন্ত্রণা, উৎকণ্ঠা, শঙ্কা, মনস্তাপের আত্মবিবরে নিমজ্জিত ব্যক্তি মনের গহন গোপন প্রতিক্রিয়া আবিষ্কারের ঐকান্তিকতায় এই আঙ্গিক, বাংলাদেশের উপন্যাস-সাহিত্যে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস আমাদের নিয়ে যায় অস্তিত্বের প্রগাঢ় অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বিমিশ্র সত্তা থেকে শুদ্ধসত্তার অভিমুখে। তাঁর প্রত্যেকটি উপন্যাসই একজন প্রতিবাবান শিল্পীর প্রযত্ন প্রয়াস সহজে চোখে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর ইউরোপীয় উপন্যাসের শিল্পশৈলীর দৃষ্টিকোণ থেকে “চাঁদের অমবস্যা উপন্যাসের আঙ্গিক বিবেচনা করা যায়। ‘দৃষ্টিকোণ, পরিচর্যা, চরিত্রায়ণ, সময়ের বিন্যাস, ভাষাশৈলী প্রতিটি ক্ষেত্রেই “চাঁদের অমাবস্যা প্রথাগত উপন্যাস থেকে আলাদা।”

উপন্যাসের ঘটনাস্রোত সর্বত্রই উর্ধ্বমুখী, বর্ণাঢ্য, উচ্চগ্রামে বাঁধা, চরিত্রের আত্মজিজ্ঞাসা প্রশ্ন-প্রতিউত্তর, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও বিবরণের মধ্য দিয়ে কাহিনী পরিণামমুখী হয়েছে। ঔপন্যাসিকের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, অভিজ্ঞতা- পরিমণ্ডলের ঐশ্বর্য, উদ্ভাবনী স্বাচ্ছন্দ্য, মানসিক সর্তকতা ও একাগ্র নিষ্ঠা সুস্পষ্ট ! যুবক শিক্ষক আরেফ আলীর আত্মখননময়, উদ্বেগাকুল পরিস্থিতির সঙ্গে যে কোনো পাঠক সহমর্মী ও সহযাত্রী হয়ে ওঠে।

আপাতভাবে লেখকের সর্বাঙ্গ দৃষ্টিকোণ ব্যবহৃত হলেও, এ-উপন্যাসে, মূলত শিল্পপ্রক্রিয়ায় কার্যকর থেকেছে ভীতসন্ত্রস্ত, আতক্ষশিহরিত আরেক আলীর আতসংবেদনশীল প্রেক্ষণবিন্দু। অস্তিত্বগত প্রান্তিক পরিস্থিতির তীক্ষ্ণমুখ আঘাতে আরেফ আলী আত্ম-যন্ত্রণাকাতর, চেতন-অবচেতনায় রক্তাক্ত, সত্যানুসন্ধানে আত্মখননকারী, জটিল ও স্তরবছল; অভিজ্ঞতায় ক্রমসংকুচিত।

তার অস্তিত্বসংকটের এই অন্তর্ময় তীব্র তীক্ষ্ণ, প্রগাঢ় সংরাগ ও সংক্ষোভময় দৃষ্টিকোণের জনাই সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ চাঁদের অমাবস্যা’য় অনেকাংশে এক্সপ্রেশনিষ্ট। “ কেন্দ্রীয় চরিত্রের প্রজাপবিন্দু দ্বারাই উপন্যাসের ফর্ম নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। উচ্চারিত, অনুচ্চারিত প্রশ্নমালায় আরেফ আলীর আত্ম সমগ্র উদ্ভাসিত।

বড় বাড়িতে আশ্রিত যুবক-শিক্ষক আরেফ আলী এক জ্যোস্নপ্লাবিত রাতে বাঁশ ঝাড়ে এক যুবতী নারীর অর্ধ উলঙ্গ মৃতদেহ প্রত্যক্ষ করে । সে যে বাড়ির আশ্রিত সে বাড়ির দরবেশ নামে খ্যাত কাদের ঐ যুবতী নারীর ধর্ষণকারী এবং হন্তারক। হত্যাকারীকে শনাক্ত করার পর সত্যপ্রকাশের প্রশ্নে যে দ্বিমুখী সংকটের সম্মুখীন হয় যদি সে বিবেকের তাড়নায় সত্য প্রকাশ করে, তবে তার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। কারণ পরিণামে তাকে বড়বাড়ির আশ্রয়, স্কুলের চাকুরী সবই হারাতে হবে। এমন কি তার জীবনও বিপন্ন হবার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে সে যদি এ হত্যাকান্ডের কথা গোপন রাখে তবে তার মানবিক চেতনা, দায়িত্ববোধ অবহেলিত হয়ে এবং বিবেকের আত্ম যন্ত্রণা থেকেও সে মুক্তি পাচেছ না। এই অস্তিত্ব সংকট ও বিবেকী দংশনের দ্বিবিধ দ্বন্দ্বজটিল পরিস্থিতির পরিণামে তার সত্য প্রকাশের দায়ই জয়ী হয়। ‘চাঁদের অমাবস্যা’র যুবক-শিক্ষক আরেফ আলীর এই প্রান্তিক পরিস্থিতিকে সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ চেতনাপ্রবাহের পথে ব্যক্তিমনের জটিল অন্ধিসন্ধির কুশলী উদ্ঘাটন প্রশ্ন ও যুক্তির অসাধারণ বিন্যাস লক্ষ্য করা যায় :

“অকস্মাৎ তার মনে নানা প্রকার প্রশ্ন জাগতে শুরু করে। এই ফোটার মত, একটির পর একটি।…. প্রথম রাতে কাদের কেন মাঠে ঘাটে একাকী ঘুরে বেড়াচ্ছিল, সে কথাই তাকে প্রথম জিজ্ঞাসা করতে হবে। প্রত্যুত্তরে কাদেরও তাকে জিজ্ঞাসা করতে পারে, সে-ই বা কেন শীতের গভীর রাতে বাইরে ঘুরাঘুরি করছিলো। কিন্তু প্রশ্নটির উত্তর দিতে সে প্রস্তুত। সে দ্বিধা না করে স্বীকার করবে। কাদেরকেই সে অনুসরণ করেছিলো ।…

একটা কথার যুবক শিক্ষকের মনে শীঘ্র খটকা লাগে। কেন সে কাদেরকে তার ভ্রমণের কথাটি জিজ্ঞাসা করতে চায়? একটি বিষয়ে সে নিঃসন্দেহ; যুবতী নারীর মৃত্যুর সঙ্গে কাদেরের কোন সম্বন্ধ নাই। সে- বিষয়ে নিঃসন্দেহ না হলে তার সঙ্গে সাক্ষাতের কোন প্রয়োজনীয়তা সে বোধ করতো না, তার মনে হঠাৎ মেঘ কেটে আলোও প্রাকশ পেত না।

বস্তুত, ডাকে কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজনও সে দেখতো না। তবে কেন সে প্রশ্নটি তার প্রত্নতালিকার শীর্ষে বসিয়েছে? অবিশ্বাস সত্ত্বের সে কী বিশ্বাস করে কাদের দরবেশ? সে-কথাই কী সে প্রথম যাচাই করে নিতে চায় উপন্যাসের ‘পাঁচ’ অংশে এভাবে আরেফ আলীর ভয়-বিহবল চিত্তে পাঁচটি প্রশ্ন জাগে এবং তার এই আত্মজিজ্ঞাসার মধ্যে ব্যক্তিমনের নানা দ্বন্দ্ব, শঙ্কা, একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতা, অনিশ্চয়তা, অপরাধবোধ ও সত্য অন্বিষ্ঠা লক্ষ করা যায়।

 

 

চন্দ্রালোকিত রাতে বাঁশঝাড়ে যুবতী নারীর মৃতদেহ প্রত্যক্ষ করেছে, যে অভিজ্ঞতার সঙ্গের জড়িতবোধ করলেও সে আসলে জড়িত নয়। তবু সে নিজের অভিজ্ঞতার অর্থ বোঝার চেয়ে কাদেরের সঙ্গে একটা সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। অনেক ভেবেও তার মনের খটকা যায় না। তার কাছে এই প্রথম প্রশ্নটি বিশেষ প্রয়োজনীয় মনে হয়, কারণ প্রশ্নের উত্তর তার মনের অশান্তি, বিশৃঙ্খলতা এবং মনের অন্ধকার দূর করতে পারে।

শুধু এ প্রশ্ন নয়, অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর কাদেরের মনের পরিচয়ও দেবে। কাদেরকে বুঝতে না পারলে বিচিত্র অভিজ্ঞতাটির রহস্যউরেচন হবে না। তাই অন্যান্য প্রশ্নও তার মনে জেগে ওঠে এবং তাকে অস্থির করে তোলে।

দ্বিতীয় প্রশ্নঃ কাদের কী যুবক শিক্ষককে হত্যাকারী বলে সন্দেহ করেছিলো। ঘটনাটি সে কাদেরের দৃষ্টিতে ভেবে দেখে। প্রথম রাতে কাদের তাকে বাঁশঝাড় থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে। দু-জনে মুখোমুখি হলে যুবক শিক্ষক হঠাৎ উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালিয়ে যায়। তখন কৌতুহলী হয়ে কাদের বাঁশঝাড়ে প্রবেশ করলে মৃতদেহটি দেখতে পায়। তারপর যুবক শিক্ষককে হত্যাকারী বলে সন্দেহ করাই তার জন্য স্বাভাবিক নয় কী? এখানে যুবক শিক্ষক একটু ইতস্তত করে। সে বুঝতে পারে না, ভূমিকা না দিয়ে প্রশ্নটি করা সমীচীন হবে কি না।

আরেফ আলী নিজেই মনে মনে উত্তর তৈরি করে- কাদের যদি তাকেই হত্যাকারী সন্দেহ করে, তবে সে পুলিশকে খবর দেয়নি কেন বা অন্য কারো কাছে হত্যার কথা প্রকাশ করেনি কেন? এভাবে যুক্তির শৃঙ্খল বিশৃঙ্খলতা আরেফ আলীকে বিবরবাসী, আতগ্রস্ত করে তোলে। কাদের যে হত্যাকারী এ-কথাটা সে পুলিশের কাছে কীভাবে প্রকাশ করবে? সে যে বাড়ির আশ্রিত, কাদের সে বাড়িরই লোক। কথাটা তার পক্ষে প্রকাশ করা সহজ হবেনা।

পশ্চাতে আশ্রয়হীন অস্তিত্ব বিপন্নের আশঙ্কা তাকে বিহবল করে তোলে। আত্মবিবরে ডুব দিতে যুবক শিক্ষক ভাবে, বাঁশঝাড়ের কথাটি কারো কাছে প্রকাশ করা যায় না। ‘সে-টি কাদের আর তার মনের গোপন কথা। শরীরের গোপন স্থানে তপ্তক্ষতের মত। এমন কথা কাউকে বলা যায় না। মনের গহিন গুহা থেকে আবার ভেসে ওঠে প্রশ্ন :

‘কাদের যে হত্যাকারী সে-ধারণা কী করে যায়? যে ধারণা পরদিন দুপুরবেলা পর্যন্ত তাকে ভীত-নিপীড়িত করেছে, সে-ধারণা থেকে কোন যুক্তি সাক্ষ্য-প্রমাণের সাহায্যে সে মুক্তিলাভ করে।

এপ্রশ্নও যুবক শিক্ষক ঠক্কর খায়। কি এ প্রশ্নে কী কোন বোধগম্য উত্তর আছে। সবই বিশ্বাস। দোষী, সেটাও বিশ্বাস, নির্দোষ, সেটাও বিশ্বাস। বিশ্বাসের উপরই কী সমগ্র মানবজীবন নির্ভর করে নাই?… এ উত্তরই কী যথেষ্ট। সব বিশ্বাসেরই কোন-না-কোন হেতু থাকে । জীবনের একমাত্র অবলম্বন হোক, তবু তার মধ্যে একটা যুক্তির কাঠামো থাকে। না, তার এ বিশ্বাসের কোনই যুক্তি নাই।

“তৃতীয় প্রশ্ন: সে-রাতে কাদের তার ঘরে কেন এসেছিলো। যুবক শিক্ষকই হত্যাকারী কিনা সে-কথা নিশ্চয় করে দেখার উদ্দেশ্যে কী? বা গভীর রাতে একটি অসহায় মৃতদেহ দেখে মনে পরম নিঃসঙ্গতা বোধ করলে সঙ্গলিপ্সা সান্ত্বনা আশ্বাসের জন্যে ‘কাদের সাব্যস্ত করে, যুবতী নারীর মৃতদেহটি গুম করে দেবে। কেন? … … যুবতী নারীর যে প্রাণ নিয়েছে তার শান্তির কথা কি কাদের ভাবে নাই? দেহ তম করে দিয়ে সে খুনীর অপরাধও নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। তার শাস্তির চেয়ে যুবতী নারীর মান-মর্যাদাই কি তার কাছে বড় ঠেকেছে। ….. যুবক শিক্ষক ঠিক করে এ বিষয়ের কাদেরকে প্রশ্ন করতে হবে। ১০

অতএব পঞ্চম প্রশ্নঃ সাহায্যের জন্যে কাদের তারই কাছে কেন আসে?…. প্রান্তভাবে যুবক শিক্ষক আপন মনে স্বীকার করে, তার চারধারে ঘোর অন্ধকার, যে অন্ধকারের মধ্যে অন্ধের মতই সে প্রশ্নগুলি তৈরি করেছে।’
আরেফ আলীর অন্তর্মুখী চেতনাস্রোত, সন্তা-আতঙ্কিত জিজ্ঞাসা তার অস্তিত্বমূলকে প্রবলভাবে প্রকম্পিত করে। তার অন্তর্দ্বন্দ্বময়, রক্তাক্ত মননক্রিয়াকে ঔপন্যাসিক এক্সপ্রেশনিস্ট চিত্রশিল্পীর মত মেধাবী চিত্রকল্পে বিন্যস্ত করেছেন। চরিত্রের আত্মকথনে (interior monlogue) ভাষা হয়ে উঠেছে চিতকল্পময়

(ক) ওপরে ঝলমলে জ্যোত্স্না, কিন্তু সামনে নদী থেকে কুয়াশা উঠে আসছে। কুয়াশা না আর কিছু হয়তো সে ঠিক বোঝে না। হয়তো একা সাদা কবরী দেখে, যার শিং-দাঁত-চোখ কিছুই না। হয়তো মনে হয় রাত্রি গা-মোড়ামুড়ি দিয়ে উঠে বসেছে, চোখ- ধাঁধানো অধুহীন জ্যোত্স্নালোকে জীবনের আভাস দেখা দিয়েছে।

(খ) যুবক শিক্ষক ব্র্যান্ড মুরগি-মুখে হাল্কা তামাটে রঙের শেয়াল দেখেছে, বুনো বেড়ালের রক্তাক্ত মুখ দেখেছে, মানুষের দুঃখ-কষ্ট মহামারি-হাহাকার দেখেছে, কিন্তু কখনো বিজন রাতে বাশঝাড়ের মধ্যে যুবতী নারীর মৃতদেহ দেখে নাই। হত্যাকারী দেখে নাই ।

 

 

বহির্বাস্তবতা রূপায়ণে ঔপন্যাসিকের এই চিত্রকল্পময় পরিচর্যা চরিত্রের মনোবিশ্লেষণের সঙ্গে সমীকৃত। জীবনে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আরেফ আলী হয়নি- “বিজন রাতে বাঁশঝাড়ের মধ্যে যুবতী নারীর মৃতদেহ দেখে নাই । হত্যাকারী দেখে নাই।’ অপ্রত্যাশিতভাবে সেই দৃশ্যের মুখোমুখি হয়ে আরেফ আলীর ‘মহাভয়’ ‘প্রাণভয়’ হতে থাকে। ‘জয়’ ক্রমাগত ভিন্ন চেহারায় রূপ নেয়- ‘সাদা বকরী’ ‘যার শিং- দাঁত-চোখ কিছুই নাই।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাসত্রয়ের পক্তিপ্রবাহে ভয় এবং ভীতিঅনুষঙ্গস্পর্শী শব্দ পুঞ্জের ব্যবহার যেমন মননে আবেগে জাগ্রত ও সুচিন্তিত, তেমনি নির্মিত ও নির্মীয়মান মানবসত্তা উন্মোচনে সচকিত ও আগ্রহী। ভয় এবং ভীতিঅনুষঙ্গবাহী শব্দ ‘লালসালু’তে ব্যবহৃত হয়েছে ৭০ বার; চাঁদের অমাবস্যা’য় ১৫০ বার এবং ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসে ১৭৫ বার।

তুলনাসূত্র ও আভ্যন্তর উপাদান-সাক্ষ্য অনুসারে এ তথ্য স্পষ্ট যে, ‘লালসালু’র ভয় ও ভীতি শিহরণ অস্থির অন্তর্জালাময় ও অস্তিত্ব জিজ্ঞাসা ‘চাঁদের অমাবস্যা’য় ঘনিভূত বলয়িত ও তত্ত্বগ্ন । ভীতি বিহবল, শঙ্কাগ্রস্ত আরেফ আলীর অস্তিত্বের স্বরূপ-নির্ণয়ে ঔপন্যাসিক পতঙ্গের উদাহরণ ব্যবহার করেছেন। দ্বিতীয় রাতে যুবতী নারীর মৃতদেহ সরানোর কাজে সে কাদেরকে প্রশ্নহীনভাবে সাহায্য করার পর আরেফ আলী আপন অস্তিত্বের স্বরূপ প্রত্যক্ষ করে এভাবে

ক. ‘কাদেরের পায়ের তলে সে যেন ঘৃণা বন্ধ, শিড়দাঁড়হীন নপুংসক কীটপতক কিছু ।ক

খ. যুবক শিক্ষক যেন কৃচ্ছ কীটপত

আতঙ্ক শিহরিত ব্যক্তি অস্তিত্বের এস্বরূপ উন্মোচনের অন্তর্যাত্রা আবিষ্কারে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ অসাধারণ শিল্পনৈপূণ্যের পরিচয় দিয়েছেন। বহির্বাস্তবতা ও অস্তিত্বকাঠামোর আনুভূমিক বৈশিষ্ট্য রূপায়ণে তিনি ব্যবহার করেছেন অভিব্যক্তিবাদী (expressionistic) পরিচর্যা কৌশল। ব্যক্তির একক অস্তিত্ব তখনই প্রতীয়মান হয়, যখন তা অপর সত্তায় প্রতিবিম্বিত হয়।

আরেফ আলীর আতগ্রস্ত অস্তিত্ব আলোকিত হয়েছে কাদেরের ব্যক্তিসত্তার প্রতিস্মরণে। সত্তা ও অপরতার এই বাময় সমীকরণে উন্মোচিত হয়েছে আরেফ আলীর অস্তিত্ব। মোট ষোল’ অংশে বিন্যন্ত আরেক আলীর আত্ম-অনুসন্ধান ও সংকটদীর্ণ অস্তিত্বের মননক্রিয়া প্রতিফলিত কাদেরের সঙ্গে উচ্চারিত অনুচ্চারিত সংলাপে।

মূল ঘটনাস্থল হয়ে ওঠে আরেফ আলীর চেতনালো ক, তাই বহিবাত্তরের আপাত্ত পারম্পর্যহীন শৃঙ্খলা তার মস্তিষ্কের বিভ্রম বাস্তবতার চেতনাপ্রবাহে বিন্যাস্ত হয়। ঘটনার এই অন্তঃপ্রবাহসূত চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসকে প্রথাগত পুটবিন্যাসরীতি থেকে স্বতন্ত্র করেছে।

ঔপন্যাসিক হিসেবে সৈবন ওয়ালা উল্লাহ তত্ত্ব আশ্রয়ী নন ফর্ম আশ্রয়ী। তত্ত্ব বা দর্শনশাসিত মনের কাছে চরিত্রচেতনা কিংবা পূর্বনির্ধারিত চিন্তাই মুখ্য মূল্য পায়। কিন্তু উপন্যাসের শিল্পগত সাফল্যের মূলে রয়েছে চেতনা ও কর্মের অন্তবায়ন। অবশেষে যুবক শিক্ষক অস্তিত্বের মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে আত্মমীমাংসায় উপনীত হয়। কাদের যে হত্যাকারী কথাটা প্রকাশ না করে তার নিস্তার থাকে না।

“কথাটা প্রকাশ না করে তার উপায় নাই। উপায় থাকলে যে বলতো না। বাঁশঝাড়ে একটি নারী অর্থহীনভাবে জীবন দিয়েছে। তার বিশ্বাস, মানুষের জীবন এত মূল্যহীন নয়।

সর্বজনীন মানবিক বোধ থেকে যে হত্যাকান্ডের নেপথ্য কাহিনী প্রথমে দাদাসাহেবের কাছে ও পরে পুলিশের কাছে প্রকাশ করে। হত্যাকান্ডের কথা প্রকাশের মধ্য দিয়ে আরেফ আলীর আত্মজিজ্ঞাসা ও ক্রমমুক্তির তপস্যা হয়েছে পরিণামমুখী। মনে মনে যে-সব সম্ভাবনা সে দেখেছিলো, তা সত্যে পরিণত হয়ে তার সিদ্ধান্তকে অর্থপূর্ণ করেছে। .. সে সংগ্রাম পরের বিরুদ্ধে মনে হলেও আসলে নিজেরই বিরুদ্ধে ছিলো, সে-সংগ্রামে সে জয়লাভ করেছে। এভাবেই “চাঁদের অমাবস্যা’ হয়ে উঠেছে অস্তিত্ববাদী উপন্যাস।

অস্তিত্ববাদেরমূল কথা হচ্ছে, ব্যক্তি চৈতন্যে যা সত্য বলে উপলব্ধি করবে, তার দায় তাকে অবশ্যই বহন করতে হবে। আরেফ আলী নিজের নিরাপদ আশ্রয়, চাকরি, বিপন্ন আস্তিত্বের কথা পরিত্যাগ করে সত্য প্রকাশের দায়ে দাদা সাহেব ও পুলিশের শরণাপন্ন হয়েছে।

সে হয়ত ভেবেছিল, তার কথা কেউ বিশ্বাসই করবেনা কিংবা বিশ্বাস করলেও গ্রহণ করবে না অথবা সে চক্রান্তের শিকার হতে পারে, এমন কি বিচারের তার ফাঁসী পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। সত্য প্রকাশের পর আরেফ আলীর পরিণতি আমাদের সমাজের গূঢ় সত্য উন্মোচনে আরো ইঙ্গিতবাহী :

“পুলিশ-কর্মচারীর চোখ একবার ক্রোধে সঙ্কুচিত হয়ে ওঠে।…… সোজা হয়ে বসে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে যুবক শিক্ষককে প্রশ্ন করে আপনার আর কিছু বলার নাই ?”

যুবক শিক্ষক উত্তর দেয় না।

“শুনছেন?” সাব ইন্সপেক্টর বলে। কনস্টেবদের বুটের আওয়াজ হয়

পুলিশের ‘ক্রোধ সঙ্কুচিকত চোখ’ এবং ‘বুটের আওয়াজ’ থেকেই আরেফ আলীর পরিণতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হত্যাকারী কাদেরের পেছনে রয়েছে দরবেশ’ অভিধা এবং অভিজাত পারিবারিক পটভূমি। তাছাড়া ‘দাদাসাহেব’ ধর্মপ্রাণ মানুষ।

চাকুরি জীবনে ‘বিধর্মী’ মনিবের প্রতি বিতৃষ্ণার রেশ ধরে গ্রামের বাড়িতে অবসর জীবনযাপন করতে এসে তিনি কঠোর হাতে তাঁর পরিবারে ধর্মীয় বিধিনিষেধ আরোপ করেন এবং গড়ে তোলেন একটি ধর্মীয় পরিমন্ডল। বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষাদানে তিনি সদা-সর্তক।

কাদেরের মধ্যে একটা দরবেশি ভাব আছে সে-কথা তিনিই প্রচার করেন। কাদেরের পরিবারের এই সামাজিক ও ধর্মীয় মর্যাদার কাছে দরিদ্র স্কুল শিক্ষক আরেফ আলীর কথা যে মিথ্যা প্রমাণিত হবে এতো স্বাভাবিক ।

“চাঁদের অমাবস্যা” উপন্যাসটি যে শিল্পশৈলীর জন্য বিশিষ্ট, তা হচ্ছে Stream of coniousness বা চেতনাপ্রবাহশৈলী। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ জীবনদর্শন ও শিল্পাভিপ্রায়ে সন্দেহাতীতভাবে ছিলেন পাশ্চাত্য অনুসারি। — ঔপন্যাসিকের বক্তব্য থেকে জানা যায়- উপন্যাসটির বেশির ভাগ ফ্রান্সের আলপস্ পর্বত অঞ্চলে পাইন-ফার-এলম গাছ পরিবেষ্টিত ইউরিয়াজ নামক একটি ক্ষুদ্র গ্রামে বসে লেখা।

একজন নিরাসক্ত সত্য দ্রষ্টা শিল্পীর দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের সমজসত্যের অন্তর্মূলে প্রবেশ করতে গিয়ে তিনি এই শিল্পশৈলীর আশ্রয় গ্রহণ করা খুব স্বাভাবিক। যুদ্ধোত্তর পাশ্চাত্য ঔপন্যাসিক-ফ্রানৃত্য কাকা (১৮৮৩-১৯২৪), আলবেয়ার ক্যামু ( ১৯১৩-৬০), ভার্জিনিয়া উলফ (১৮৮২-১৯৮১), উইলিয়াম ফকনার (১৮৯৭-১৯৬২), জেমস জয়েস (১৮৮২-১৯৪১) প্রমুখ চেতনাপ্রবাহ, ধারায় উপন্যাস রচনা করেন। পাশ্চাত্য শিল্পাদর্শ-স্নাত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ বাংলা উপন্যাসে এই শৈলী প্রয়োগ করতে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন আমেজ সৃষ্টি করেছেন।

 

 

জয়েসের ‘ulysses’ (১৯২২) -এর Stephen To The Lighthouse এর Mrs. Ramsay-র মনন বিন্যাসের সঙ্গে আরেফ আলীর মানস ক্রিয়ার কোনো মিল নেই। জয়েসের ulysses এর মত ‘চাঁদের অমাবস্যা’-তেও কোনো নাটকীয়তা নেই। হত্যা এবং হত্যাকারীকে আমরা প্রথম অধ্যায়ে জেনে ফেলি, তারপর কাহিনীর যে অগ্রগতি তা হত্যাকারী নয় হত্যার দৃশ্য অবলোকনকারী বা একমাত্র সাক্ষী আরেফ আলীর মনন ক্রিয়াতেই বিন্যস্ত।

সাক্ষী হিসেবে তার দায়ই বেশি, কারণ হত্যার দৃশ্যটি তার সমস্ত জীবনের নির্মল অভিজ্ঞতাকে আঘাত করেছে এবং তার স্বাভাবিক জীবনের সমস্ত শান্তি নষ্ট করে দিয়েছে।

প্রথামাফিক প্রাত্যহিক কাজগুলো করতে গিয়ে হঠাৎ তার বিচ্যুতি ঘটে। শ্রেণী কক্ষে ভূগোল পড়াতে গিয়ে সে অন্যমস্ক হয়ে পড়ে

ক. আরেফ আলী অনেকক্ষণ অন্যমত্ত হয়ে থাকে। একসময়ে হঠাৎ সচেতন হয়ে সে লক্ষ্য করে, ছাত্রদের কোলাহল ঝড়ের বেগ ধারণ করেছে।…… অন্যদিন তীক্ষ্ণ পলায় তবু হৃদাতার সঙ্গে শিক্ষক আরেফ আলী আঙ্গুল নেড়ে শাসন করতো। আজ কেমন প্রান্ত গলায় বলে, “না না, গোলমাল করো না।

খ. “একটি দৃশ্যই কেবল তার চোখে ভাসে। সে দৃশ্য থেকে তার নিস্তার নাই, তার মনে প্রাণে ও দেহের রক্তে রক্তে বিভীষিকাময় ছায়া।

(গ) হঠাৎ সচেতন হয়ে যুবক শিক্ষক লক্ষ্য করে, ক্লাসঘরে অখন্ড নীরবতা। ……. এধার ওধার তাকিয়ে অবশেষে আমজাদকে জিজ্ঞাসা করে কী ? বলেছ উপদ্বীপের নাম আমজাদ প্রতিবাদ করার আগেই সজোরে মাথা নেড়ে বলে, ‘কী বলছি উপদ্বীপ নয়, নদীর নাম।

আমজান নিরুত্তর হয়ে থাকলে পেন্সিল নিয়ে টেবিলে আওয়াজ করে কৃত্রিম বিস্ময়ের সঙ্গের আরেফ আলী বলে কী? ভুলে গেছ সব কে মুহূর্ত নীরবতার পর আমজান শিক্ষকের দিকে সোজা তাকিয়ে গভীরভাবে প্রশ্ন করে, “স্যার, আপনার আজ শরীর ভালো নয় ?

বহির্বাস্তবতার সঙ্গে এভাবে আরেক আলী অসংলগ্ন হয়ে ওঠে। ক্রমশ সে পরিপার্শ্ব বিচ্যুত হয়ে মনন অভিযাত্রায় অগ্রসর হয়। আরেফ আলীর এই চেতন-অবচেতন সচেতন মনের দ্বন্দ্ব জটিল পরিস্থিতিকে ঔপন্যাসিক চেতনাপ্রবাহশৈলীতে বিন্যাস্ত করেছেন। চেতনাপ্রবাহশৈলীর উপন্যাসের দুই শিল্পকৌশল- অন্তবিশ্লেষণ (internal analysis) এবং অনুচ্চারিত মনোকথন (interior monologue), চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসে এই উভয় শৈলীই ব্যবহৃত হয়েছে। এই দুই শৈলীর পরিচর্যার আরেফ আলীর সংকটদীর্ণ, ভীত-বিহবল মনের আত্ম-অন্বেষণ, ক্রমমুক্তির তপস্যা ও জাগ্রত বিবেকের রক্তাক্ত চেতনা বিম্বিত।

ক। অন্তর্বিশ্লেষণ (internal analysis)

‘ঘটনাটি প্রকাশ না করার পক্ষে যে সব যুক্তি সে পরিষ্কারভাবে ভাবতে সাহস পায় নাই, এবার সে-সব বুদ্ধি বিশ্লেষণ করে দেখতে তার আর বাধে না। চারপাশে খোলা মাঠ, আর বাধা কোথায়? প্রথমত, সে নিজের কথা ভাবে। কে সে? একজন দারিদ্র . কার জন্যই বা সে নিজের সর্বনাশ করবো যুবতী নারী তার আত্মীয় বন্ধু নয়, তার মৃত্যুতে সে ব্যক্তিগতভাবে কোন প্রকারে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাই।

এই হতবাগা দেশে কত কত যুবতী নারীর জীবন অর্থহীনভাবে এবং অকারণে শেষ হয়। কে প্রতিবাদ করে, কে একবার ফিরে তাকায়। সেখানে জীবন মূল্যহীন সেখানে আরেকটি জীবন শেষ হয়েছে। কিভাবে হয়েছে, তাতে কোন অন্যায় অবিচার হয়েছে কি না, সে বিষয়ে মাথা ঘামিয়ে সে নিজের উপর বিপদ ডেকে আনবে কেন ? তারপর কাদেরের কথা। হোক তার অপরাধ অতি গুরুতর বা যুবতী নারীর সঙ্গে তার সম্পর্কের কারণ পশুবৎ বাসনা, হোক সে নির্মম-নির্দয় মানুষ। তবু সে যুবক শিক্ষকের কোন ক্ষতি করে নাই।

তাছাড়া, কাদের তার বন্ধু না হোক, সে তার শত্রুর নয়; তার প্রতি সে হিংসারের বা প্রতিহিংসার ভাব বোধ করেনা। কাদেরের সঙ্গে লড়াই করে তার কি লাভ হবে, কারইবা সে মঙ্গল করবে?”

আরেফ আলীর এই অন্তবিশ্লেষণ চেতনাপ্রবাহশৈলীর একটি উল্লেখযোগ্য পদ্ধতি। চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসে আরেফ আলীর আত্মার এবং আতঙ্ক শিহরিত মনের যুক্তিকে এই অন্তর্বিশ্লেষণের সাহায্যে উপস্থিত করেছেন লেখক। আরেক আলী কখনো হত্যার ঘটনা প্রাকশের পক্ষে আত্মযুক্তির বাঁধাহীন পথের সন্ধান পায় আবার অকস্মাৎ তার মনে সামাজিক বাঁধার শঙ্কাময় যুক্তি সে পথকে রুদ্ধ করে ফেলে।

খ। অনুচ্চারিত মনোকথন (interior monologue)

পদ্ধতিতের ঔপন্যাসিক আরেফ আলীর সংকটদীর্ণ মনের এই পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন ‘যুবক শিক্ষক একটি বিচিত্র কথা লক্ষ্য করে। …. না বলার পক্ষে করা অতি আগ্রহের সঙ্গে সে-সব যক্তি জুগিয়ে দিয়েছে জীবিত মানুষেরা। জীবিত মানুষরা তাদেরই কথা বলছে, মৃতমানুষের কথা বলছেনা। তারপর আরেকটি কথা সে বুঝতে পারে, জীবিত মানুষের পক্ষে জীবিত থাকার জন্যে আকুল আকাঙ্ক্ষা, বা জীবন থেকে যতটুকু পারা যায় লাভ-সুবিধা আদায় করার তীব্র বাসনা আপত্তিজনক নয়, কিন্তু যারা যুক্তিগুলি পেশ করছে তারা যেন নামেই শুধু জীবিত।

আসলে তারা মৃত, তাদের জীবনও ধার-করা জীবন। তা না হলে তারা মৃত নারীর প্রতি কোনো সমবেদনা বোধ করবে না কেন, যে মানুষ তার মৃত্যু ঘটিয়েছে তার প্রতি ঘৃণাবোধ করবেনা কেন? জীবনের ব্যাপারে তারা প্রতারক বলেই তাদের মনে এত ভীতি সরা ঘটনাটি লুকাবার জন্যে এত অধীরতা, এত শঠতা।

এই অনুচ্চারিত মনোকথনের মধ্যে আরেক আলীর আত্মদ্বন্দ্ব কাটিয়ে তার বিবেকী জাগরণ ও আত্মমুক্তির প্রত্যাশা যেমন লক্ষ্য করা যায়, তেমনি, সামাজিক বাধার দিকও প্রতিফলিত হয়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ অসাধারণ শিল্পকৌশলে তা বিন্যস্ত করেছেন। ইউরোপীয় দুই ঔপন্যাসিক, আলবেয়ার কামার “দ্য আউট সাইডার’ এবং ফ্রানত্য কাফকার ‘দা ট্রায়াল’-এর সঙ্গে কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

ক. কখন সে মৃতদেহ প্রথম দেখে একঘন্টা, দু ঘন্টা আগে হয়তো ইতিমধ্যে এক প্রহর কেটে গেছে, কিন্তু যুবক শিক্ষক সে কথা বলতে পারবেনা।”

খ. সেখানে আলো-অন্ধকারের মধ্যে বুবক শিক্ষক একটি যুবতী নারীর অর্থ-উপগ মৃতদেহ দেখতে পায়। অবশ্য কথাটা বুঝতে তার একটু দেরি লেগেছে, কারণ তা ঝট করে বোঝা সহজ নয়। তারপর বাঁশির আওয়াজ সুতীব্র হয়ে ওঠে। অবশ্য বাঁশির আওয়াজ সে শোনে নাই ।

আলবেয়ার কামার “দ্য আউট সাইডার’-এর চরিত্রের কাছেও এই বিভ্রম চেতনার বিন্যাস লক্ষ করা যায়:

“আমার মা মারা গিয়েছেন। আজ না বিগতকাল আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারব না।

শিল্পশৈলীর প্রশ্নে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর এই অনুস্মরণ ‘চাঁদের অমাবস্যা’র উপন্যাসের গঠন কাঠামো ও বক্তব্য প্রকাশে অধিক সাহায্য করেছে। সর্বোপরি যুক্তির শৃঙ্খলা ও আরেক আলীর বিধাদীর্ণ মনোজাগতিক রহস্য উন্মোচনে এই শৈলীর প্রয়োগ ছিলো অবিকল্প, অনিবার্য। ঘটনা কিংবা চরিত্র নয়, ঘটনা-উত্তর ঘটনার প্রতিক্রিয়া আবিষ্কারে চেতনাপ্রবাহ শৈলীর তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আরেফ আলীর দ্বিধামুক্তি তথা হত্যার ঘটনা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তার বিবেকী জাগরণে একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, অমাবস্যার অন্ধকার ক্ষণস্থায়ী, আলোই একমাত্র সত্য, স্থায়ী এবং উপন্যাসের নামার্থ ব্যঞ্জিত হয়েছে এভাবে।

৩.

উপন্যাসের ভাষা, তার শিল্পকাঠামোরই একটি অংশ। চাঁদের অমাবস্যা’ চেতনাপ্রবাহ শিল্পশৈলীর উপন্যাস, এর ভাষা অনুসৃত শিল্পশৈলী অনুসারেই বিদ্যাপ্ত। দু’জন সমালোচক বলেছেন, এ উপন্যাসের যে ভাষার ব্যবহার লেখক করেছেন তাতে ফরসি আঙ্গিকে বাংলায় তার একটি নিজস্ব লেখাভঙ্গি তৈরি হয়েছে চেতনাপ্রবাহশৈলী ব্যবহারের ফলে এ উপন্যাসের ভাষা পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হারিয়ে ফেলেছে। ”

 

 

 

দুটি অভিমতের কোনটিই গ্রহণযোগ্য নয়। বস্তুত বিষয় ও শিল্পশৈলীর অনিবার্য প্রয়োজনে ঔপন্যাসিক বিশেষ ভাষাশৈলী গ্রহণ করেছেন। এসম্পর্কে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বলেছেন- ‘এই বইয়ের ভাষা আমি ইচ্ছাকৃতভাবেই ‘ফলটরিং’ (faltering) করেছি। দ্বিধাগ্রস্ত যুবক শিক্ষকের বিলম্বিত চৈতন্যকে ফুটিয়ে তোলার জন্য কিছুটা হোঁচট খাওয়ার ভঙ্গি তৈরি করতে হয়েছে। আমি অবশ্য আরো জটিল করতে পারতাম ফকনারের ‘দি সাউন্ড অব ফিউরী’-র মত। কিন্তু ইংরেজী ভাষা, বিশেষ করে গদ্য ভাষা যে সমস্ত শিল্পগত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, বাংলা তো তা নয়; বাংলা লিখিত গদ্যের চলাচলও দীর্ঘ নয়।

তাই একটা সীমাবদ্ধতার মধ্যে আমাকে কাজ করতে হয়েছে। একবার ভেবেছিলাম, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের গদ্যভঙ্গির সঙ্গের আধুনিক গদ্যভঙ্গির মিশ্রণ ঘটিয়ে চরিত্রের দ্বিধা-দ্বন্দ্বকে স্পষ্ট করব, কিন্তু গল্পের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হবার ভয়ে সে দিকে অগ্রসর হইনি। ঔপন্যাসিকের এই স্বীকারোক্তি থেকে বোঝা যায়, উপন্যাসের শিল্পশৈলীর উপযোগী একটি ভাষার কথা সচেতনভাবে চিন্তা করেছেন। বলেছেন, ‘ইচ্ছাকৃতভাবে ফলটারিং (faltering) করেছি।’ অর্থাৎ ভয়ে বা বিধ্যস্ত হয়ে ভগ্নস্বরে বলা- ভাষাভঙ্গিকে তিনি ‘চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন।

উপন্যাসের কাহিনীকেন্দ্রে চরিত্রের সংখ্যা মাত্র তিন- যুবক শিক্ষক আরেফ আলী, কাদের এবং দাদাসাহেব। তিনটি চরিত্রের মধ্যে দাদাসাহেবের চরিত্রটির তেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেই- পারিবারিক আভিজাত্য ও ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টির নেপথ্য ছায়া হিসেবে তাকে কাহিনীর পটভূেিত স্থাপন করা হয়েছে। কাদেরকে দরবেশ বলে প্রচার করা এবং তার দরবেশি লাভের বৃত্তান্ত সবই দাদাসাহেব কথিত।

কাদেরের বিকৃত স্বভাব ও অসামাজিক আচরণকে দাদাসাহেব এমন এক ধর্মীয় মাহাত্ম্য আরোপ করেছেন যে, তার প্রতি কোনো মন্দ ধারণা পোষণ করা যায় না। ঔপন্যাসিক, দাদাসাহেব প্রতিষ্ঠিত ধর্মমূল্যাশ্রয়ী সামাজিক ধারণার কেন্দ্রমূলে আঘাত করেছেন, কারণ সে ধারণা মিথ্যা, আরোপিত। দাদাসাহেব প্রসঙ্গে বর্ণিত ঔপন্যাসিকের ভাষা যথার্থই তার চিন্তা ও চরিত্রের অনুগামী। তৎকালীন বাঙ্গালি মুসলমান সমাজের উদ্ভট ঐতিহ্যবোধ ও অলিক জাত্যাভিমানী মনোভাবের প্রতিনিধি :

আজ সে ধন-সম্পদ বা মানই নাই, কিন্তু এককালে চারধারে তাঁদের বড় নাম-ডাক ছিলো। তখন তারা বিশাল জমিদার মালিক ছিলেন। তাদের ঘোড়াশালে তখন ঘোড়াছিল, হাতিশালে হাতি। খিরাত পরিধান করে রেশমের খরিতায় পত্রাদি বাধতেন; বাশমহল, আতর বাইদমস্কের সুগন্ধিতে ভরপুর করতো এবং বিশেষ উৎসবের দিনে বাদশাহি কায়দায় পথে-ঘাটে মোহর ছড়াতেন। তখন আবাদর-চোবনার রাগতেন গণ্ডায় গড়ায় সবের সেবন্দিও পুষতেন। আজ সেদিন আর নাই।

আরবি-ফারসি শব্দের বহুল ব্যবহার- ‘মানইজ্জত (সম্মান, সম্ভ্রম, সতীত্ব, আবরু মালিক (অধিকারি, প্রভৃ) খিল্লাত (রাজদত্ত সম্মানসূচক পোষাক) খরিতায় (রেশম কাপড়ের তৈরি গুলি বিশেষ) বাদশাহি কায়দায় (রাজকীয় নিয়মে ) মোহর (স্বর্ণের তৈরি মুদ্রা বিশেষ) আবাদার (বায়না) চোবদার (ভারি অস্ত্রের বাহক) সবের সেবন্দি (শুশ্রূষাকারী, পরিচারক, ভূতা, ভক্ত ইত্যাদি) উদ্ধৃতির মোট তেষুট্টিটি শব্দের ছয়টি বাক্যের মধ্যে ভেরিটি শব্দ ফারসি এবং দুইটি শব্দ (জমিদার, মালিক) আরবি শব্দ ব্যবহারের এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ চরিত্রের আবহ অনুযায়ী ভাষা তৈরিতে কতটা সর্তক ছিলেন। ঔপন্যাসিকের বর্ণনায় কাদের সম্পূর্ণভাবে নিষ্কর্মা।

অত্যন্ত স্বল্পভাষী এবং অসামাজিক বলে তার মনের পরিচয় পাওয়া দুষ্কর, কিন্তু তার বাইরের চেহারা স্বভাবত নিদ্রালস। নিদ্রালস ভাব কাটলে চরম উদাসীনতা নামে তার মুখে।

কাদেরের এই পরিচয় থেকে তার চরিত্রের স্বরূপ বোঝা যায়। উপন্যাসে তার সংলাপও শঙ্ক, দূরাগত, কখনো প্রসঙ্গহীন, রহস্যময় এবং খনখনে গলার

-কী বললেন ”

কাদের দৃষ্টি পূর্ববৎ লণ্ঠনের ওপর নিবন্ধ। একটু চুপ থেকে সে কেমন খনখনে গলায় বলে, “ডোকারী কিংখাবের কথা বলছিলাম।”

আরেকটি বিসদৃশ জিনিশ: খনখনে গলা। মুখের সঙ্গে মানায় না।

“তোতারী কিংখাব।”

“শোনেন নাই”।

গলা আরো নম্র করে যুবক শিক্ষা উত্তর দেয় না।”

“পুরানো আমলের জিনিস। সিন্ধুকে তালা বন্ধ থাকে।

যুবক শিক্ষক বোঝে, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত কোন মূল্যবান বস্তুর কথা কাদের বলছে, কিন্তু সে-কথার আকস্মিক উত্থাপনের অর্থ

সে বোঝে না।

‘তোসভারী কিংখাব’ আসলে সামস্ত মূল্যবোধ ও নানা বিধি-নিষেধের ক্ষয়িষ্ণু প্রতীক। বড় বাড়ি দরবেশ নামে। পরিচিত স্বল্পভাষী, অমিশুক কাদের জ্যোৎস্নারাতে বাঁশ ঝাড়ে একটি হত্যাকার ঘটানোর পর দ্বিতীয় রাতে আরেক  আলীর কাছে আসে এবং প্রায় প্রসঙ্গহীনভাবে ‘তোসভারী কিংখাব’-এর কথা বলে, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, কাদের তার পরিবারের সম্ভান্ত ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দাতে চায় যুবক শিক্ষককে। পুরো উপন্যাসে তার ভাষা প্রায় প্রসঙ্গহীন, ছেঁড়া, ছেঁড়া, ইঙ্গিতময়। আরেফ আলীর আত্মদ্বন্দ্বময়, আতঙ্ক শিহরিত মনন অভিযাত্রার বিপরীতে কাদেরের ছেঁড়া ছেঁড়া, ইঙ্গিতময় সংলাপের বিন্যাস উপন্যাসের শিল্পশৈলীকে বাঙ্ময় করে তুলেছে :

“মেয়েলোকটাকে চিনতেন ”

…… সে বলে, ”

“সে বেঁচে না বা কীভাবে মরেছে, তাতে আপনার কি

…….. কাদের থেমে আবার বলে, “কিন্তু দুর্ঘটনার কথা কাউকে

বললে আমার কি হবে জানেন ?”

“ফাঁসী। থেমে আবার বলে, “তাতে আপনার লাভ কি হবে ”

 

 

আরেফ আলী এবং কাদেরের এ সংলাপের ভাষা সাবলীল কিন্তু শানিত। ‘চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসে আরেফ আলীর মনের চেতন-অবচেতন লোকের ভাবনাধারা প্রকাশে যে ভাষাশৈলী ব্যবহার করেছেন, ঔপন্যাসিকের স্বীকারোক্তি মতে তো ‘ফলটারিং (falterting অর্থাৎ বিধা বা আতগ্রস্ত মনের ভাষা :

ক. তারপর বাঁশীর আওয়াজ সুতীব্র হয়ে ওঠে। অবশ্য বাঁশীর আওয়াজ সে শোনেনি।

খ. কখন সে মৃতদেহ প্রথম দেখে ? একঘন্ট, দুঘন্টা আগে হয়তো ইতিমধ্যে একপ্রহর কেটে গেছে, কিন্তু যুবক শিক্ষক সে কথা বলতে পারবে না।

আরেফ আলীর দ্বন্দ্বময় মনের পরিস্থিতি উদ্ঘাটনে এই ‘হাঁ’ এবং ‘না’ বোধক বাক্যবন্ধ যথার্থ। আত্মজিজ্ঞাসায় ক্রম- অগ্রসরমান যুবক শিক্ষকের মনোকথনের ভাষা :

‘বাড়ি ফেরবার পথে যুবক শিক্ষকের তৃপ্ত মনে হঠাৎ অপ্রীতিকর একটি সন্দেহের ছায়া উপস্থিত হয়। যুবতী নারীর হত্যাকারী কে, সে নিজেই নয় ? সে যদি কাদেরকে অনুসরণ না করতো, অপ্রত্যাশিতভাবে এবং অকারণে বাঁশঝাড়ের সামনে উপস্থিত না হতো, তবে দুর্ঘটনাটি ঘটতে? না ।

একটু ভেবে সে নিজেকে দোষমুক্ত করে। একথা সত্য যে বাঁশঝাড়ে সে উপস্থিত না হলে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটতো না, কিন্তু অন্যদিন অন্যখানে অন্য কোন প্রকারে হয়তো এমন একটি অবার সৃষ্টি হতো। আসল হত্যাকারী সে নয়, কাদেরের মনের গভীর ভীতি। সে ভীতির মূলে সিন্দুকে লুকানো তোতারী কিংখাব হতে শুরু করে নানাবিধ নিষেধাজ্ঞা।

‘সে নিজেই নয়’ ‘না করতো’ ‘না হতো’ তবে দুর্ঘটনাটি ঘটতো না’- এভাবে না-অব্যয় ক্রিয়াপদের পূর্বে বসিয়ে যুবক শিক্ষক আত্মনিরীক্ষা ও আত্মজিজ্ঞাসায় নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করা এবং মুহূর্তে আবার দোষমুক্ত ভাবার মধ্যে ভাষার তীর্যকতা প্রকাশ পেয়েছে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গদ্যের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বর্ণনা নয় বিশ্লেষণ।

আরেফ আলীর ভাষা হয়ে উঠেছে বিশ্লেষণাত্মক, তাই বাক্যের গঠন কখনো দীর্ঘ কখনো ছোট, কখনো সাধুক্রিয়া (তখনো কুয়াশা নাবে। নাই, সে শোনে নাই) কখনো আঞ্চলিক শব্দের পাশে চলতি শব্দের মিশ্র প্রয়োগ (সাধারণ জীবনের নকসার সঙ্গের তার জীবনের মিল্লুক নাই, শিয়াল কিংবা মাঠালী ইঁদুর, মাটির দলায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে) লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ‘চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসের ভাষাশৈলীর ক্ষেত্রেও চেতনাপ্রবাহ শিল্পশৈলী উপযোগী এ স্বতন্ত্র গদ্যভাষা উদ্ভাবন করেন।

প্রকৃতপক্ষে উপযুক্ত দৃষ্টিকোণ, প্রকরণ পরিচর্যা, পরিমার্জিত জীবনবোধ ও হৃদয়ধর্মের বিচিত্র জাগরণক্তি হিসেবে মানুষকে চিহ্নিত করেছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ‘চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসে। মানুষের হৃদয়ধর্মের অপার শক্তি অনুধাবনে সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ পাশ্চাত্য শিল্পশৈলী ও অস্তিত্ববাদী, জীবনবোধাশ্রয়ী।

এক্ষেত্রে তিনি সমকালীন অন্য ঔপন্যাসিকদের থেকে স্বতন্ত্র পথচারী, বিবেককেন্দ্রিক আত্মজাগরণের পক্ষপাতী। তাঁর উপন্যাসের গঠনকাঠামো সুত্রিপুন, ভাষাশৈলী নির্মাণে প্রযত্ন প্রয়াসী, জীবনার্থ সন্ধানে ভাবাবেগমুক্ত, মনোবিশ্লেষণে প্রোজ্জ্বল। ‘চাঁদের অমাবস্যা’ একই সঙ্গে অস্তিত্বাশ্রয়ী, চেতনাপ্রবাহশিল্পশৈলীর উজ্জ্বল শিল্পকর্ম ।

Exit mobile version