আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ চম্পাবতী কাব্যনাটক । যা সৈয়দ শামসুল হকের সামাজিক কাব্যনাটক এর অন্তর্গত।

চম্পাবতী কাব্যনাটক
কবি জসীমউদ্দীনের (১৯০৩-১৯৭৬) বিখ্যাত লোকনাট্য বেদের মেয়ে (১৯৫১) অবলম্বনে সৈয়দ শামসুল হক রচনা করেছেন চম্পাবতী (২০০৮) কাব্যনাটক। মূল লোককাহিনির মধ্যে সৈয়দ হক আধুনিক জীবনোপযোগী অনেক উপাদান লক্ষ করে চম্পাবতী নাটক রচনায় আগ্রহী হন। অগ্রজ কবি জসীম উদ্দীনও অপত্যস্নেহে তাঁকে এ কাজের অনুমতি ও উৎসাহ যুগিয়েছেন। চম্পাবতী কাব্যনাট্যের ভূমিকায় এ বিষয়টি বিস্তারিত উল্লেখ করে সৈয়দ হক লিখেছেন :
জসীমউদ্দীনের বেদের মেয়ে আর আমার চম্পাবতী-র মিল যতটা না তার অধিক অমিল। লোকজ ঐতিহ্য থেকে নেয়া গল্প ও গীতের সমাহারে আমার অগ্রজ কবি যে নাটকটি রচনা করেছিলেন, বহুদিন থেকেই আমি তার গঠন শরীরে কিছু পঙ্গুতা লক্ষ করে উঠি, বিশেষ করে চরিত্র নির্মাণে ঘটনা রচনে ও এর নাট্যগমনে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার কিছু পরেই জসীমউদ্দীন লন্ডনে এসেছিলেন, আর আমিও তখন লন্ডনে, যেন বিদেশ বিভূঁইয়ে বড়ভাইকে পেয়েছি – কয়েকটা দিন বড় আনন্দে কেটেছিলো তাঁর সঙ্গে, আর তখন অনেক কথা – প্রসঙ্গে তাঁকে আমি বলেছিলাম তাঁর ওই নাটক বিষয়ে আমার পর্যবেক্ষণের কথা। জসীমভাই বড় বিষণ্ণ হয়েছিলেন শুনে, আর বলেছিলেন তাঁর সেই অনুপম বাচনভঙ্গিতে, এই কথা! ওই নাটকের গীত আর বাক্য তো আমার বাংলার গেরাম থিকা পাওয়া, তার হুকনার আমি একা না, তুমিও! তবে তুমি এই মশলা নিয়া নিজেই রচনা করো না ক্যান! […]
তারপর বহু বছর পার হয়ে যায়; তারপর একদিন আমাদের দেশের অগ্রগণ্য এক নৃত্যশিল্পী লুবনা মরিয়ম আমাকে বলেন বেদের মেয়ে নিয়ে আমি ভাবতে পারি কিনা। সেই তাঁরই কথায় নতুন করে মেজাজ এলো, লেখার ব্যাগে রাখতে শুরু করলাম বেদের মেয়ে নাটকটি, বয়ে নিয়ে যেতে থাকলাম যেখানেই যাচ্ছি। অবশেষে একদিন ওই লন্ডনে বেড়াতে গিয়ে কন্যা বিদিতা সৈয়দ হকের ফ্ল্যাটে চমৎকার নির্জনতা পেয়ে এই রচনাটি দাঁড় করিয়ে ফেললাম।
হলো সে নতুন একটি সার্বভৌম রচনা, তবে তার শরীরে রইলো বীজ নাটকের অনেক কিছুই, বিশেষ করে গান। জসীমউদ্দীন বাংলার সবুজ থেকে উত্থিত কবি এবং নাট্য নির্মাণের অধিক তিনি বাংলার বক্ষবিস্তারী আবেগ-প্লাবনে ভাসমান। তাই চম্পাবতী রচনা করে উঠে বলতে আমার লোভ হচ্ছে, জসীম উদ্দীন যদি প্রকৃতই নাট্যকার হতেন, তবে হয়তো চম্পাবতী তাঁরই কলম থেকে আমরা পেয়ে যেতে পারতাম।
অধিক কী, এই রচনাটি যেন বাংলার নিসর্গে জসীম ভাইয়ের জন্যে আমারই ভালোবাসার একটি শাপলা কুসুম হয়ে রইলো।’
সৈয়দ শামসুল হকের এই বক্তব্য থেকে আমরা অবগত হই যে, মূল বেদের মেয়ে রচনার প্রধানত তিনটি দিকের অপূর্ণতা বা সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করেছিলেন তিনি। এগুলো হলো :
ক. চরিত্র নির্মাণে অসম্পূর্ণতা,
খ. শিখিল প্লট,
গ. নাট্যগুণ সৃষ্টির সীমাবদ্ধতা।
তবে গবেষণাকালে উভয় রচনার নিবিড়পাঠসূত্রে এবং সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনাকরে সৈয়দ শামসুল হকের এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হওয়া কষ্টকর। কেননা, ১৯৫১ সালে জসীমউদ্দীন কর্তৃক রচিত বেদের মেয়ে আর ২০০৮ সালে রচিত চম্পাবতী নাটকের সময়-সমাজ-পরিপ্রেক্ষিত এক নয়। জসীমউদদীন তাঁর কালের গ্রামীণ সমাজপরিবেশে লালিত দর্শকমনের রুচির কথা বিবেচনা করে লিখেছিলেন বেদের মেয়ে।

তিরিশের কবিদের ইউরোপীয় ধাচের নগরভাবনাকে পরিত্যাগ করে তিনি বাংলার লোকগাথা, গীত, ছড়া, অলঙ্কার, উপমা, প্রবাদ-প্রবচনকে সাহিত্যের অংশ হিসেবে আধুনিক পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। যেটি সেসময়ের প্রেক্ষাপটে একধরনের বিপ্লবী চিন্তাই বলা যেতে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় জসীমউদ্দীন যেসকল নাটক রচনা করেছেন তাতে তিনি শহুরে আধুনিক মঞ্চনাটকের তুলনায় গ্রাম্য পালানাটক বা যাত্রানাটকের বৈশিষ্ট্য দিতেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন।
কবি জসীমউদ্দীনের, বেদের মেয়ে রচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ যাত্রাপালা রূপবানের ঢঙে এক ধরনের পালার মতো করে নাট্যরচনা। তবে তিনি এ নাটকের আধুনিক মঞ্চ উপস্থাপনের ব্যাপারেও সচেতন ছিলেন। বেদের মেয়ে নাটকের তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকায় তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন :
বেদের মেয়ে নাটকের তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকায় তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন : “এবার বই খানাকে গ্রাম্য-যাত্রার ঢঙে নুতন করিয়া লিখিলাম। তাই পাত্র-পাত্রীদের মুখে কতগুলি নূতন গান জুড়িয়া দিতে হইল। […] যাঁহারা থিয়েটার রূপে এই নাটক অভিনয় করিবেন তাঁহারা ইচ্ছা করিলে ঐ নতুন গানগুলি বাদ দিতে পারেন।
কোন গ্রাম্য যাত্রার দল যদি এই নাটক অভিনয় করেন, তাঁহারা ইচ্ছা করিলে পাত্র-পাত্রীদের মুখে প্রয়োজন অনুসারে আরও নতুন গান জুড়িয়া দিতে পারেন। কেহ কেহ এই কাহিনীকে নৃত্যনাট্যে রূপ দিতে চাহিয়াছেন। সেই জন্য ইহার বহুস্থানে নৃত্যের ইঙ্গিত দেওয়া হইয়াছে। […] এই নাটককে গ্রাম্য নাটকে রূপান্তরিত করিতে আমি কোন কোন স্থানে প্রচলিত লোক-নাট্যের অংশ বিশেষ গ্রহণ করিয়া এই নাটকের পারিপার্শ্বিকতা সৃষ্টি করিতে চেষ্টা করিয়াছি।
কয়েকটি গ্রাম্য গানেরও প্রথম পদ লইয়া তাহার সঙ্গে নতুন পান জুড়িয়া দিয়াছি। গ্রামদেশে বহু নাটুকে-দল রূপবান যাত্রা অভিনয় করিয়া অপূর্ব নাট্য কৌশলের পরিচয় দিয়াছেন। তাঁহারা যদি এই নাটকের অভিনয় করেন আমি সব চাইতে গৌরব বোধ করিব। ১/৬/৬৩, কমলাপুর, ঢাকা।
স্পষ্টত, এ-নাটকের যে কোনো ধরনের সংযোজন-বিয়োজন কিংবা পরিমার্জনে তাঁর সায় ছিল। তাই অনেক বছর পরে, সৈয়দ শামসুল হক যখন তাঁকে নাটকের ত্রুটি সম্পর্কে জানিয়েছিলেন, তখন কবি বিষণ্নবোধ সত্ত্বেও তাঁর নাটকের গল্পে সৈয়দ হকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অপরিসীম ঔদার্যে। অপরিসীম ঔদার্য নিয়ে তিনি বলতে পেরেছিলেন ‘ওই নাটকের গীত আর বাক্য তো আমার বাংলার গেরাম থিকা পাওয়া, তার হকদার আমি একা না, তুমিও!’
জসীমউদ্দীন বস্তুত বাংলা লোকগান ও লোককাহিনিকে বাঙালির গ্রামীণ সমাজের উপভোগ্য করে রচনা করেছেন। গ্রামীণ মানুষ শীতের রাতে একটু আয়েশ করে দীর্ঘ পরিসরের নৃত্য-গীতসম্পন্ন অভিনয় দেখতে বেশি পছন্দ করে; যেখানে একই সঙ্গে উপস্থাপিত হবে গ্রামীণ সমাজের রীতিনীতি, নারীপুরুষের দাম্পত্যকলহ, সুখ-দুঃখ-ঘরকন্নার জীবনছবি।
সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে বেদের মেয়ে নাটকে তাঁর প্লট নির্বাচন, ঘটনামুহূর্ত নির্মাণ ঠিক আছে। কিন্তু এ রচনাকে আধুনিক কাব্যনাটকের বিচারে বিবেচনা করলে গীতরসের প্রাবল্যে তার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে। চম্পাবতী নাটকে সৈয়দ শামসুল হক ঠিক এ-স্থানেই কাজ করেছেন।
তিনি জসীমউদ্দীনের নাটকের প্লট অক্ষুণ্ণ রেখে, কাহিনিটিকে আরও সুসংহত করে আধুনিক নাগরিক মানসের উপযুক্ত করে নির্মাণ করেছেন। যার ফলে সৈয়দ হক রচিত চম্পাবতী কাব্যনাটকটি হয়ে উঠেছে আধুনিক সার্থক কাব্যনাটক ।
বেদের মেয়ে নাটকের কাহিনি রচনা করতে গিয়ে জসীমউদ্দীন বেদেসমাজ সম্পর্কিত বাস্তব অভিজ্ঞতা ‘কাজে লাগিয়েছিলেন, এবং এর সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন উত্তরবঙ্গে প্রচলিত জনপ্রিয় লোকনাট্য হুমরা বাইদ্যার কাহিনির প্রভাব। এ বিষয়ে জসীমউদ্দীন গবেষক সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়ের একটি মন্তব্য প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে :
এ-নাটক রচনার ব্যাপারে তিনি উত্তরবঙ্গ অঞ্চলে প্রচলিত হুমরা বাইদ্যা নামক লোকনাট্যের কাছে অনেকটা ঋণী। বিশেষত হুমৱা বাইদ্যা নাটকের চরিত্রের আদলেই যে তিনি বেদের মেয়ে নাটকের মোড়ল চরিত্র সৃষ্টি করেছেন, এমন আভাস জসীমউদ্দীন স্বয়ং লোকনাট্য সম্পর্কিত স্বরচিত একটি প্রবন্ধে দিয়েছেন।
বেদের মেয়ে নাটক রচনার ব্যাপারে জসীমউদ্দীন যে লোকনাট্য ও গ্রাম্য গানের কাছে বিশেষ ভাবে ঋণী তা তিনি নাটকটির দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় অকপটে ব্যক্ত করেছেন। […] মোটকথা একজন সচেতন শিল্পীর মন নিয়েই জসীমউদ্দীন লোকনাট্য ও গ্রাম্যগানের উপাদান সমীকৃত করে, গ্রহণ বর্জন, পরিমার্জন ও সংযোজন ব্যাপারে ব্যাপক স্বাধীনতা গ্রহণ করে বেদের মেয়ে লোকনাট্যটি রচনা করেছেন।

এ নাটকে চম্পাবতী নামক এক বেদে-নারীর করুণ জীবনালেখ্য উপস্থাপিত হয়েছে। চম্পাবতী বেদেসর্দার গয়ার সুন্দরী, তন্বী স্ত্রী। জীবিকার তাগিদে গ্রামে গ্রামে নিজদলের সঙ্গে মিশে সে সাপের খেলা দেখিয়ে অর্থ উপার্জন করে। এমন সময় তার প্রতি চোখ পড়ে গ্রামীণ মোড়লের।
এখান থেকেই শুরু হয় মূল নাট্যদ্বন্দ্ব। মোড়লের অত্যাচার থেকে বেদেবহরকে রক্ষার্থে মোড়লের নিকট সে নিজেকে সমর্পণ করে। এরপর নানান ঘাত- প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে নাটকের শেষ দৃশ্যে স্বামী গয়াকে বিষাক্ত সাপের বিষ থেকে রক্ষা করে নিজে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সে। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর কাব্যনাটকে বেদের মেয়ে নাটকের কাহিনির বীজ গ্রহণ করলেও সেটিকে নিজস্ব সৃষ্টিশীল মনন দিয়ে করে তুলেছেন সার্বভৌম ও মৌলিক ।
তবে নাট্যকাহিনি, নাট্যগুণ, চরিত্র, সংলাপ সবকিছু ছাপিয়ে উভয় নাটকে যে বিষয়টি অধিক প্রস্ফুটিত হয়েছে, তা হলো আবহমান কালের বাংলার নিম্নবিত্ত ভাসমান বেদেশ্রেণির জীবনবাস্তবতা। সেইসঙ্গে উপস্থাপিত হয়েছে মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে চলে আসা নিগ্রহের রূপ, রাজনীতির মূলসুত্র – দুর্বলের ওপর সবলের নির্যাতন- নিপীড়নের বাস্তব চিত্র।
জসীমউদ্দীন পুরোপুরি সমাজবাস্তবতা তুলে ধরার মানসিকতা নিয়ে নাটকটি রচনা করেছেন, কিন্তু সৈয়দ শামসুল হকের উদ্দেশ্য ছিল লোককাহিনিকে আধুনিক কাব্যনাটকের মর্যাদাদান। তবে তাঁর চম্পাবতী নাটকের পক্তি জুড়ে ছড়িয়ে আছে আবহমান গ্রামবাংলার অর্থনীতি-সমাজ ও সংস্কৃতির চালচিত্র।
আলোচ্য নাটকে মোড়ল প্রসঙ্গে জানা যায় মাইনক্যা নামক চরিত্রের মুখনিঃসৃত সংলাপে। বেদে নারীরা যখন সাপের খেলা দেখানোর বিনিময়ে মাইনক্যার কাছে অর্থ দাবী করে, তখন সে বলে যে, এত টাকা দিয়ে এ গ্রামে মোড়লই কেবল সাপের খেলা দেখতে পারে। কেননা তার ‘ভরন্ত সংসার’ এবং তার ‘টাকাও আছে, হাউসও আছে’।
তবে মাইনক্যার উদ্দেশ্য কেবল বেদে নারীদের সাপখেলানোর জন্যে নিয়ে যাওয়া নয়, মাইনক্যা মোড়লের চারিত্রিক অসততা, বহুগামিতা সম্পর্কে পূর্বেই অবগত। তাই সে ভেবেছে ভাসমান বেদে নারীদের ভুলিয়ে ভালিয়ে মোড়লের কাছে নিতে পারলে মোড়ল খুশি হয়ে তাকে অনুগ্রহ করতে পারে, আবার কোনো অর্থ ব্যয় না করে সেও বেদেদের সাপ খেলা দেখে নিতে পারে। বেদেনারীদের মন ভোলাতে সে বলেছে :
খবর যদি দেই তারে আর মনে যদি তার ধরে
তোমার ঝুলি ভইরা দিবো সোনার মোহরে । (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৪৫ ) ১
মোড়ল তার এই অর্থবিত্ত আর সম্পদের জোরে গ্রামে যথেচ্ছাচারের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। নীতি-নৈতিকতা, ধর্ম-অধর্মের পরোয়া সে করে না। ফলে নাটকে মোড়লের প্রথম উপস্থিতির দৃশ্যে দেখা যায়, ধানভানারত গ্রামীণ নারীদের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে। এসব নারী মোড়লের কুপ্রবৃত্তির শিকার হয়েও তার অর্থবিত্ত আর ক্ষমতার দাপটে কিছু বলতে পারে না। এমন কি স্বয়ং মোড়লের বউও সে সাহস করতে পারে না।
মোড়লের অনৈতিক আচরণে যখনই মোড়লপত্নী বাধা দিতে গেছে, মোড়ল তখনই তাকে তালাক দিয়ে বের করে দেবার হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছে। গ্রামীণ সমাজে ধনবান মোড়ল শ্রেণির একাধিক নারীসঙ্গ কিংবা স্ত্রীগ্রহণ যে একটি সামাজিক রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল তা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (১৯২২-১৯৭১) লালসালু (১৯৪৮) উপন্যাসেও দেখা যায়।
বস্তুত গ্রামীণ সমাজে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নয়, ফলে পুরুষের অন্যায় মেনেও সেখানে টিকে থাকার সাধনা করতে তাদের। পুরুষেরা অর্থ, সামাজিক রীতিনীতি এবং সর্বোপরি ধর্মের ধ্বজা তুলে নারীদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এরকম একটি চিত্র রয়েছে আলোচ্য নাটকে, যেখানে অন্যনারীদের সঙ্গে লাম্পট্যের প্রতিবাদ করতে গেলে মোড়ল তার স্ত্রীকে শাসিয়েছে।
এমতাবস্থায় মোড়লের স্ত্রী পুরুষ নির্ধারিত ধর্মীয় অনুশাসনের দিকেও প্রতিবাদের আঙুল তুলেছে। যেমনটা দেখা গেছে সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম কাব্যনাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এর মাতবরের মেয়ে চরিত্রের মধ্যে। চম্পাবতী কাব্যনাটকের মোড়ল ও মোড়ল বউয়ের কথোপকথনের প্রাসঙ্গিক অংশ নিম্নে উপস্থাপন করা যেতে পারে :
মোড়ল ।
তেড়িবেড়ি করলে তোরে তালাক দিমু নি । […]
বয়স গেছে তোর সাথে আর আমার দরকার কি? […]
চোপ, হারামজানী।
স্বামীর সুখে বাধা দেয় যে বউ সে দোজখে যায়।
মোড়ল বউ ।
আর, আকাম কুকাম কইরাও বুঝি স্বামী বেহেস্ত যায় ?
মোড়ল ।
কথার পিঠে কইতে কথা শরম নাই রে শুয়ার ?
যা যেখানে বেহেস্ত আছে, খোলাই আছে দুয়ার। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৪৮)

এরপর মোড়লের নজর পড়েছে বেদেবহরের নারীদের দিকে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত বেদে সম্প্রদায় পেটের দায়ে গ্রামে গ্রামে সাপ ধরে, সাপের খেলা দেখায়। নিজেদের কোনো স্থায়ী আবাস নেই তাদের। ভাসমান নৌকাই তাদের সংসার। ফলে তাদের সমাজের নারীরা আরও বেশি অরক্ষিত। মোড়ল এই অসহায়ত্ব ও দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে গয়াবেদের স্ত্রী চম্পাবতীকে তার কাছে রেখে যাবার জন্য সম্পদের লোভ দেখিয়েছে। গয়ার উদ্দেশে রূপকার্থে নৌকার উদাহরণ টেনে সে বলেছে :
মোড়ল ।
এই নাও রাইখা যদি যাও,
নায়ের অভাব কি তোমার, পাইবা কত নাও।
আমার বিলাস হইছে তোমার এই নাওখান রাখি।
বড়ই চঞ্চল হইছে অন্তরের পাখি। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৫৩)
গয়া বাইদ্যা যখন বলেছে- অর্থ দিয়ে সব কেনা গেলেও মানসম্মান-ইজ্জত কেনা সম্ভব নয়, এবং চম্পা যেহেতু তার বিবাহিত স্ত্রী, সেহেতু সে কিছুতেই কোনো কিছুর বিনিময়ে চম্পাকে এখানে রেখে যেতে পারে না। কিন্তু অর্থ, ক্ষমতা আর সম্পদের দন্তে মোড়ল উন্মাদ। সে গয়া বেদেকে ব্যঙ্গ করে বলেছে :
হা হা কত যে দেখলাম আর কত শুনলাম –
নারীর সতীত্ব তার কিবা আছে দাম!
যখন ইচ্ছাই হইছে সেই ইচ্ছা ঠেকাবার চাও ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৫৩)
তার এই অনমনীয় জেদ দেখে অসহায় গয়া শেষপর্যন্ত তাকে সত্যনাশের ভয় দেখিয়ে নিবৃত্ত করতে চেয়েছে। কিন্তু মোড়ল তার ইচ্ছাপূরণে কৃতসংকল্প, অনড়। একদিকে নারীসান্নিধ্য-স্পৃহা, অন্যদিকে অসহায়ের ওপর ক্ষমতা প্রদর্শনের পাশবিক উল্লাসে নৃশংস হয়ে উঠেছে সে।
দম্ভ ভরে গয়ার উদ্দেশ্যে বলেছে- সে মোড়ল, মহাশক্তিধর! ফলে তাকে নিবৃত্ত করার শক্তি এ সমাজে নেই। এসময়ে তার চ্যালা মাইনক্যা ও মোড়লের কথোপকথনে উঠে এসেছে গ্রামীণ সমাজে মোড়ল শ্রেণির অত্যাচারের চিত্র; প্রশাসনের সহযোগিতায় দুর্বল ও অসহায়ের প্রতি নির্যাতনের আবহমান বাস্তবতা। প্রাসঙ্গিক এলাকা উল্লেখ করা হলো :
মোড়ল।
আমারে দেখাস ভয় ? আরে রে পাগল,
আমি যে মোড়ল ! তুই দ্যাখ শক্তিবল –
দ্যাখ আমি কি না করতে পারি –
আপোষে না দিবি যদি কাইড়া নেবো নারী ।
[…] এই মোড়ল কী পারে ! […] লাঠি দিয়া মাথা ভাঙতে পারে। / […] বাইদ্যার নায়ের বহর ডুবায়া নিতে পারে।
[…] বাইদ্যার নারীদের বেশ কাইটা দিতে পারে। […] তাগো সব পোলাপান আছড়ায়া মারতে পারে।
[…] যায় যদি থানায় বিচারে –
টাকা নিয়া কেনা আছে সব দারোগারে। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৫৪ )
মোড়লের এহেন আচরণ দেখে যখন চম্পাবতী অবাক হয়ে বলেছে যে, এত অত্যাচারের পরও এদেশে বিচার কি নেই, তখন মোড়ল বলেছে – যুবতীতে মন মজে গেলে তার কোনো বিচার নেই, এবং সে পুরাণ থেকে – রাবণের সীতাহরণের উদাহরণ দিয়ে নিজেকে অত্যাচারী শাসক রাবণের সঙ্গে তুলনা করেছে।
তবে মোড়লের উপর্যুপরি হুমকির মুখেও গয়া বাইদ্যা এতটুকু বিচলিত হয়নি। সে সাহসের সঙ্গে জানিয়েছে – বেদেরা ভাসমান ও উন্মুল হলেও তাদের মান-সম্মান রয়েছে। হতে পারে তারা ছোট জাতের; কিন্তু মনে রাখা উচিত বিষাক্ত সাপ নিয়েই তাদের নিত্যকার খেলা। ফলে বেদে নারীদের দিকে দৃষ্টি দেবার আগে মোড়লের সাবধান হওয়া উচিত। গয়ার এই দৃঢ় মানসিকতা সম্পর্কে সমালোচকের একটি মন্তব্য প্রসঙ্গত স্মরণ করা যেতে পারে :
এখানে বেদে সর্দার গয়া নিজেকে নীচু জাতের মানুষ বলে পরিচয় দিলেও নিজের আত্মসম্মানের কথা ভোলেনি। যা একজন মর্যাদাবান মানুষের চৈতন্যের বহিঃপ্রকাশ। বেদে সম্প্রদায়ের মানুষের ভেতর যে জাত্যভিমান এবং যে সংস্কৃতি ক্রিয়াশীল তা গেরস্থ সমাজের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। দুই সমাজের সংস্কৃতি ভিন্ন। গয়া খেলে গ্রাম্য মোড়লের কাছে শিতের স্ত্রী চম্পাকে দেখে যেতে যখন বাধ্য হলো – এই ঘটনাতে সামন্তবাদী সমাজের এক নির্মম দিক ফুটে উঠেছে।
কিন্তু গয়ার মুখে এমন সংলাপ মোড়লের অহমবোধে প্রচণ্ড আঘাত করে। ফলে সে অচিরেই নিজ লাঠিয়াল
বাহিনীকে বেদেদের উপর হামলা করার হুকুম দেয় :
এক্ষণ নদীর পাড়ে লাঠিয়াল পাঠা
বাইদ্যার বহরে চাই মরণের ঠাঠা। […]
বাইদ্যারা একজনও য্যান বাঁচতে না পারে –
পোলাপান একটাও না রক্ষা পাইতে পারে।
আগুন জ্বালায়া তোরা গাঙেতে ডুবায়া দে রে বাইদ্যার বছর।
বাইদ্যার বাহাদুরি! আইজ তার এইখানে কব্বর। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৫৫)
ফলে মাতবরের অত্যাচারের হাত থেকে নিজ সম্প্রদায়কে রক্ষার জন্য চম্পাবতী মাতবরের নিকট অসহায় আত্মসমর্পণ করে । চম্পার এহেন সিদ্ধান্তে অত্যন্ত আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন গয়াবেদে মনোক্ষুণ্ণ ও ক্রুদ্ধ হয়ে নিজ বহর নিয়ে অন্যত্র চলে যায়। এরপর একান্ত পারিবারিক পরিসরে চম্পাকে মাতবর প্রথমে নানা উপায়ে ভোলানোর চেষ্টা করে। মিষ্টি আলাপ, অলঙ্কার উপহার প্রদানসহ নানান চেষ্টার পরও যখন চম্পা তার সতীত্ব থেকে বিচ্যুত হয় না, ঠিক তখনি দেখা যায় মাতবরের অন্য আরেক রূপ। সে তখন পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার দম্ভে অসহায় চম্পাকে অত্যন্ত ক্রুদ্ধস্বরে বলে ওঠে :
সর্প নিয়া খেলাস রে তুই, চম্পা বাইদ্যানি।
আমিও কিন্তু কয়া দিলাম সর্প হইতে জানি।
সহজে বশ না মানিলে, ছোবল দিমু ছোবল !
বাঘ ছাগলে পানি খাওয়াই আমি সেই মোড়ল। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৫৮)

চম্পা তবু তার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। এরপর মোড়ল অতি নিষ্ঠুরতার সঙ্গে প্রথমা স্ত্রীকে গিয়ে হুকুম করে বেদে-নারী চম্পাকে সাজিয়ে-গুজিয়ে বশে এনে যেন তার ঘরে পাঠায়। নিজ স্ত্রীকে অন্য নারীকে ঘরে পাঠাতে বলতে তার এতটুকু বিবেকে বাধে না। অন্যদিকে চম্পা অনড়, তার দিন-রাত অতিবাহিত হয় বেদে-স্বামী গয়ার চিন্তায়। ফলে প্রতিশোধপরায়ণ মোড়ল চম্পার ওপর সমস্ত বাড়ির রান্নার কাজ অর্পণ করে, মাথার চুল কেটে দেয়। বোষ্টমীর সঙ্গে চম্পার সংলাপে পরিস্ফুট হয়েছে তার দুর্দশাগ্রস্ত জীবনযাপনের চিত্র :
চম্পা।
দুঃখের কথা কবো কি আর, বোষ্টুমি ঠাকরুণ।
মোড়ল সাবে পারলে আমায় কইরা ফালায় খুন।
তার পালংকে যাই না বইলা কেশ কাইট্যা দিছে। পুরা বাড়ির রান্ধনের কাম আমার হাতে দিছে।
কর বেটি তুই জঙ্গ ছবি গতরে পাড় পরলে –
তখন লাথি খাবি আমার পায়ের উপর পড়লে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৬৭)
এরপর বোষ্টমীর সঙ্গে আলাপরত চম্পাবতীকে দেখে মোড়ল আরও ক্ষেপে যায়; এবং তাকে শারীরিকভাবে নিগৃহীত করে :
এখনো হুস নাই সিধা, গোলামের বেটি।
এই তোর ধরলাম যেটি । […]
ক’ তোরে বুদ্ধি কী দিছে বোটুম ঠাকরুণ।
ক’ জলদি, আইজ তোরে আমি করছি খুন।
হারামজাদী, বেজম্মার মাইয়া ! (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৬৮)
নিজের শত অপমান নারীকুল সহ্য করতে পারে, কিন্তু নিজ পরিবার, বিশেষত পিতা-মাতা, বংশপরিচয় নিয়ে অপমানসূচক বক্তব্যে নারী হয়ে ওঠে প্রতিবাদী। আলোচ্য কাব্যনাট্যে চম্পাও তার ব্যতিক্রম নয়। মোড়ল যখন চম্পার বাবা-মা নিয়ে অপমানসূচক কথা বলেছে, তখন সে আর নীরব থাকেনি, বরং প্রতিবাদী সত্ত্বায় জেগে উঠেছে। তাকে প্রতিহত করতে গিয়ে মোড়ল বলেছে :
মোড়ল ।
কী! আমারে শাসাস তুই ? আমারে ? আমারে ?
লাঠিয়াল পুথি আমি হাজারে হাজারে।
গেরাম বিরাণ করি চক্ষের পলকে
আমারে সেলাম দিয়া কূল পায় না লোকে।
বাঘের গরুর মতো খাওয়াই আমি ঘাস।
আর কি না আমারেই কোপাইতে চাস? (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৬৯)
জসীমউদ্দীনের বেদের মেয়ে নাটকে গ্রামবাংলার সমাজজীবনে সমাজপতিদের দর্পিত উপস্থিতি এবং সাধারণ জনগোষ্ঠীর অসহায়তা যেমন প্রত্যক্ষ করা যায় ঠিক তেমনি কৃষিভিত্তিক সমাজবাস্তবতার চালচিত্র সম্পর্কেও অবগত হওয়া যায়। একজন সমালোচক এ-প্রসঙ্গে বলেছেন :
বেদের মেয়ে-তেই আমরা সর্বপ্রথম প্রত্যক্ষ করি আমাদের পল্লীবাংলার নর-নারীর স্নেহ-ভালবাসা-সিক্ত অথচ বিয়োগব্যথা-কণ্টকিত জীবনকে। আমাদের বেদে সমাজের একটি বলিষ্ঠ চিত্র হিসেবে এই লোকনাট্যটি বিশেষ মূল্য বহন করছে বললে নিশ্চয়ই অত্যুক্তি হবে না। যদিও এ নাটকে ‘চম্পা’ নাম্নী এক বেদের মেয়ের ট্র্যাজেডিই মুখ্য বিষয়, তবু ঐ ট্র্যাজেডিকে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে নাট্যকার আমাদের বেদে সমাজের একটি বাস্তবানুগ ছবিও উপহার দিয়েছেন। ঐ উপলক্ষ্যে আমাদের সামনে বৃহত্তর বাংলার কৃষিনির্ভর গ্রামীণ সমাজের চেহারার সুস্পষ্ট আভাসও উপস্থাপিত করেছেন লেখক।

সৈয়দ শামসুল হক যেহেতু জসীমউদদীন কর্তৃক অনুপ্রাণিত, সেহেতু বেদের মেয়ের মতো চম্পাবতী কাব্যনাটকেও কৃষিজীবী সমাজের বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষযোগ্য। এখানেও বেদেদের জীবনাচারের পাশাপাশি ফুটে উঠেছে কৃষিনির্ভর গ্রামবাংলার সাধারণ জীবনধারা, সংস্কৃতি, দুঃখ-সুখের জীবনকথা। এমনকি উপমা, অলঙ্কার প্রয়োগেও নাট্যকার গ্রামীণ সংস্কৃতি বজায় রেখেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় মাতবরের চ্যালা মাইনক্যা চরিত্রটি যখন বেদে নারীদের প্রতি অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেছে তখনও তাতেও মিশে আছে কৃষিভিত্তিক গ্রামবাংলার বাস্তব উদাহরণ :
কই কি আমি, ও বাইদানি,
তোমাগো দেখি রসে চোবানি –
পউস মাসে খাজুর গাছের রস ! (কাব্যনাট্যসমগ্র 888 )
গ্রামবাংলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে, বিশেষত নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তের অন্যতম বিনোদনের উৎস বেদে নারীদের সাপের খেলা, নৃত্যকলাদর্শন। সাধারণত ধান-চাল বা অন্যান্য ফসলের বিনিময়ে এই নৃত্যকলা তারা উপভোগ করে। কিন্তু সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে মানুষের বিনোদনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বিত্তবান শ্রেণি বেদেদের সাপ খেলা দেখার পরিবর্তে আধুনিক সিনেমার প্রতি প্রলুব্ধ হচ্ছে। কিন্তু যাদের পয়সা নেই তারা এই আধুনিক বিনোদন উপভোগ করতে পারছে না।
বিনোদনের ক্ষেত্রে বিবর্তনের এমন একটি ইঙ্গিত রয়েছে আলোচ্য নাটকে। মাইনক্যার কাছে যখন বেদে নারীরা সাপ খেলার পারিশ্রমিক নিয়ে দর-কশাকশি করছে, তখন তারা ১০০ টাকা থেকে নামতে নামতে যখন পঁচিশ টাকা প্রাপ্তির আশা করেছে, তখন মাইনক্যা চরিত্রের দীর্ঘশ্বাস মিশ্রিত সংলাপে অভিব্যক্ত হয়েছে শহুরে সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের ইঙ্গিত :
চম্পা। পঁচিশ! আছে পঁচিশ?
মাইনক্যা। ইসস!
থাকলে পঁচিশ টাউনেই যাইতাম !
সাপের খেলার অধিক মজা সিনামা দ্যাখতাম ! (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৪৪ )
নাটকে মোড়ল চরিত্রের প্রথম আগমনের দৃশ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে সম্পন্ন কৃষিজীবী এক গৃহস্থঘরের জীবন- ছবি; যেখানে দেখা যাচ্ছে নারীরা ঢেঁকিতে ধান ভানছে আর আনন্দে গান গাইছে। ঢেঁকিতে ধানভানার সময় একধরনের ছন্দ তৈরি হয়।
গ্রামীণ নারীরা এই ছন্দের তালে কায়িক পরিশ্রম লাঘবের জন্য নিত্যকার ঘরকন্না, হাসি-আনন্দ, ব্যথা-বেদনা, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের কথামালা নিয়ে চমৎকার গান পরিবেশন করে, যা ধান ভানার গীত’ হিসেবে গ্রামীণ সমাজে বহুকালধরে প্রচলিত রয়েছে। আলোচ্য নাটকেও এমন ধান ভানার গীতের উপস্থিতি রয়েছে, যেখানে কৃষিজীবী সমাজ প্রদর্শিত হয়েছে অত্যন্ত বাস্তবতার নিরিখে। যেমন :
রাঙা বউ ঢেঁকি পারায় আলতা পরা পায়,
সোহাগে কাঠের ঢেঁকি নাইচা না কুল পায়।
কালা বউ ঢেঁকি পারায় মাথায় ঠেকে চাল,
কাতলা দুইটা নড়বড় করে দিতে দিতে ফাল।
নানীবিবি যখন আইসা ঢেঁকির উপর চড়ে,
হাসতে হাসতে ঢেঁকি তখন নোটে আছড়ে পড়ে।
মেঝো বউ বারা বানে গুনগুনায়ে গায়,
কাতলা দু’টার পাখা মেলে ঢেঁকি উড়ে যায়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৪৭)
আবহমান গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার প্রতিভূ সম্পন্ন মোড়লশ্রেণি। এই নাটকেও মোড়ল প্রবল ক্ষমতাধর। সে নিজেই নিজের পরিচয় দিয়েছে এই বলে যে- ‘আমি মোড়ল গেরাম কাঁপে আমার তরাসে-‘ (কাব্যনাট্যসমগ্র – ৪৪৯); অর্থাৎ সাধারণ গ্রামবাসীর মধ্যে মোড়লের অবস্থান ভিন্নতর।
সাধারণের তুলনায় তাদের সাজসজ্জায়ও রয়েছে ভিন্নতা। নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সে বিষয়টিও কাব্যনাটক চম্পাবতীতে উল্লেখ করতে ভোলেননি। বেদে নারীদের কাছে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলে ধরার জন্য মোড়লের যে- সাজসজ্জা, তা মোড়ল ও মাইনক্যার কথোপকথনসূত্রে উল্লেখ্য :
(মোড়ল পকেট থেকে রঙিন ঝালরদার টুপি মাথায় দেয়।)
মাইনক্যা। হ, হ, এখন বড় সোন্দর শোভা হইছে মোড়ল সাব।
মোড়ল। আন্তর, আত্তর, সে বাপ (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৫০)
তবে আলোচ্য নাটকে বেদেদের ভাসমান জীবন-কথন ও সমাজচিত্র সবথেকে বেশি উপস্থাপিত হয়েছে। বেদেদের জীবনযাপন, দারিদ্র্য, পেশা, দৈনন্দিন সমস্যা, তাদের দাম্পত্যজীবনচিত্র, কলহ, সুখ-দুঃখ, জীবন- মরণ, হাসি-আনন্দ চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে আলোচ্য নাটকে।

এক্ষেত্রে বেদে-জীবন উপস্থাপনে নাট্যকার সংগীতের আশ্রয় নিয়েছেন কখনো, কখনো আবার নাট্যদৃশ্যে সংলাপের মাধ্যমে বেদেদের সমাজ- সংসারের চিত্র উপস্থাপন করেছেন। যেমন, মোড়লের জলসায় বেদেদের, বিশেষত, গয়া বেদের পরিচিতিমূলক সংগীতের মাধ্যমে বেদেদের ঠিকানা, পেশা, যাপিত জীবনের ছবি অনেকটাই ফুটে উঠেছে। গয়াবেদে ও তার দল মোড়লের সম্মুখে নিজেদের পরিচয় দিয়েছে গানে গানে :
মোৱা পঙ্খী মারি পঙ্খী ধরি, পঙ্খী বেইচা খাই,
মোদের আরাম বিরাম নাই।
সাপের মাথার মণি কাইড়া করি যে কারবার ।
মোৱা এক ঘাটেতে রান্দি বাড়ি,
আরেক ঘাটে খাই।
মোদের ঘরবাড়ি নাই, সব দুনিয়া বাড়ি মোদের
সকল মানুষ ভাই। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৫১)
বস্তুত, বেদে মানেই নৌকাবাস, যাযাবর জীবন। সেখান থেকে চম্পাবতী মোড়লগৃহে আবদ্ধ হয়ে গৃহীজীবনের জটিল আবর্তে নিক্ষিপ্ত হয়। একজন বেদের মেয়েকে গৃহপরিসরে নিয়ে এলে কী বিয়োগাত্মক পরিণতি ঘটতে পারে, নাট্যকার তা আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন আলোচ্য নাটকে।