চম্পাবতীর শৈলিবিচার রচনাটি সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক : ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও শিল্প [পিএইচডি অভিসন্দর্ভ] এর অংশ। গবেষনাটির অথোর জান্নাত আরাসোহেলী। এই অভিসন্দর্ভের (পিএইচডি) বিষয় বাংলা নাটক – ইতিহাস ও সমালোচনা। প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাবর্ষ: ২০১৭-২০১৮। গবেষণাকর্মটি সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় আমরা সাহিত্য গুরুকুলে পুন-প্রকাশ করলাম।

চম্পাবতীর শৈলিবিচার
সৈয়দ শামসুল হক পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের লোকনাট্য বেদের মেয়ে অবলম্বনে তাঁর চম্পাবতী কাব্যনাটক রচনা করেছেন। তিনি মনে করেছিলেন জসীমউদ্দীন বাংলাসাহিত্যে প্রায় অনালোচিত এক লোকায়ত বেদেসমাজকে পাঠক-দর্শকের সম্মুখে বাস্তবতার নিরিখে তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষায় তাঁর রচনার নাট্যগুণ ক্ষুণ্ণ করেছেন।
এক ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে তিনি জসীমউদ্দীনকে এ রচনার সীমাবদ্ধতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কবি নিজেই তখন স্বপ্রণোদিত হয়ে তাঁকে বেদের মেয়ের লোকায়ত সুর অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক কাব্যনাটক রচনার উপদেশ দিয়েছেন। জসীমউদ্দীনের বেদের মেয়ে নাটকের সৌন্দর্য ও উপযোগিতা সম্পর্কে নাট্যকার সেলিম আল দীন এক লেখনীতে মন্তব্য করেছিলেন :
এতে মোড়ল কর্তৃক গয়া বেদের স্ত্রী সুন্দরী চম্পাকে হরণ, বিবাহ ও পরিত্যাগের করুণ কাহিনি বিবৃত হয়েছে । বেদের মেয়ে অঙ্ক বিভাজিত হলেও যে যাত্রাপালারূপে অভিনীত হবার যোগ্য তা এতে লভ্য গানের সংখ্যা থেকে ধারণা করা যায়। কিন্তু প্রসেনিয়াম থিয়েটারের লক্ষণ এতে প্রকট। […] তথাপি এর মধ্যে গীতিকা-র গন্ধ আছে। […] উপরন্তু বেদের মেয়ের নাট্যকৌশলও অতিশয় সরল। এবং এর গদ্য সংলাপ সম্পূর্ণ আঞ্চলিক ভাষার মনোহারীত্বকে প্রকাশ করে।’
সেলিম আল দীন বেদের মেয়ের মধ্যে নাট্যগুণ ও ভাষার মনোহারিত্ব অনুভব করলেও সৈয়দ শামসুল হক এটিকে সীমাবদ্ধতা হিসেবে বিবেচনা করে নবাঙ্গিকে চম্পাবতী কাব্যনাটক সাজিয়েছেন। একদিকে তিনি যেমন ভাষাগত পরিবর্তন এনেছেন, কাহিনির ভাব বজায় রেখে নাট্যপ্লটের বদল করেছেন, তেমনি অঙ্ক-দৃশ্য বিভাজনেও জসীম উদ্দীনকে অনুসরণ না করে নতুনত্ব প্রদর্শন করেছেন।
জসীমউদ্দীনের বেদের মেয়ের মূল নাট্যকাহিনি তিন অঙ্কে বিভাজিত হলেও সৈয়দ শামসুল হক কোনো রকম অঙ্ক বিভাজনে না গিয়ে সমগ্র নাট্যকাহিনিকে কেবল দশটি দৃশ্যে বিভাজিত করে উপস্থাপন করেছেন। ফলে চম্পাবতীর নাট্যকাহিনি আরও সুসংহত ও বাহুল্যবর্জিত হয়েছে।
কবি জসীমউদ্দীনের বেদের মেয়ে নাটকের অঙ্ক ও দৃশ্যবিভাজন প্রত্যক্ষ করলে দেখা যাবে নাটকটির ১ম অঙ্কে ২টি দৃশ্য রয়েছে; যেখানে বেদেদের নৌকার বহর গ্রামে আসার ঘটনা থেকে শুরু করে প্রতাপশালী গ্রাম্য মোড়লকর্তৃক বেদে নারী চম্পাকে নিজগৃহে জোরপূর্বক নিয়ে আসা পর্যন্ত কাহিনি বর্ণিত হয়েছে।
নাটকটির ২য় অঙ্কে রয়েছে মোট ৪টি দৃশ্য। এ অঙ্কের ১ম দৃশ্যে ‘কৃষকের গান’ নামক একটি গীত রচনা করেছেন জসীম উদ্দীন; কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক তাঁর চম্পাবতী কাব্যনাটকে বেদেজাতির কাহিনির ভেতর হঠাৎ করে কৃষকদের নিয়ে গান সংযোজন প্রক্ষিপ্ত বিবেচনায় ছেঁটে ফেলেছেন।
অন্যদিকে, ২য় দৃশ্যে মোড়লের স্ত্রী মালেকার সঙ্গে তাঁর দুই পরিচারিকার স্বামী বশীকরণ বিষয়ক দীর্ঘ আলাপচারিতা ছেঁটে সৈয়দ শামসুল হক তাঁর চম্পাবতী কাব্যনাটকে সে আলাপের মূলসার গ্রহণ করে সুসংহত সংলাপ বিন্যাস করেছেন।
একইভাবে, বেদের মেয়ে নাটক থেকে ৩য় দৃশ্যে বৈষ্ণবীর সাথে চম্পার আলাপ, ৪র্থ দৃশ্যে গয়া বেদে ও তার নতুন স্ত্রী আসমানির দাম্পত্যকলহ সংক্রান্ত দীর্ঘ সংলাপের মূলসার গ্রহণ করে সৈয়দ হক চম্পাবতী কাব্যনাটকটিকে জমাট করে তুলেছেন। এসব ক্ষেত্রে চরিত্রের মুখের কিছু কিছু সংলাপ কখনো হুবুহু রেখেছেন, আবার কিছু কিছু সংলাপ বদলে নিজস্ব চিন্তন ও ভাষার বাক্য জুড়েছেন।

যেমন বেদের মেয়ে ৩য় দৃশ্যের প্রারম্ভে চম্পার মুখের ‘ও নিঠুর কথারে’ গানটি কিছুটা কেটে ছেঁটে নতুন আঙ্গিকে সৈয়দ শামসুল হক তাঁর চম্পাবতী কাব্যনাটকে ব্যবহার করেছেন। আবার, বেদের মেয়ে নাটকে এ দৃশ্যের শেষে দেখা গেছে গয়া বেদের আবার নতুন করে বিয়ে করার সংবাদে চম্পা অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে সুহৃদ বৈষ্ণবীর পরামর্শে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে মাতবরের কাছে সমর্পণ করেছে; এবং মোড়লের সোহাগপূর্ণ কথার জবাবে বলেছে :
কও — মোড়ল ! কও ! […] যত সোন্দর কথা আছে আল্লার দুনিয়ায় সগল তুমি আমারে কও, তাই হুইনা আমি আইজ নিজেরে ডুবাইয়া রাখুম। (বেদের মেয়ে : 8)
কিন্তু চম্পাবতী নাটকে সৈয়দ শামসুল হক চম্পাকে আধুনিক কাব্যনাট্যের নায়িকা চরিত্র করে তোলার প্রয়োজনে এ কাহিনিটুকু পুরোপুরি বদলে দিয়েছেন। ফলত, চম্পাবতী নাটকে দেখা গেছে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন চম্পা ভোগী মোড়লের ভালোবাসা, মিষ্ট আলাপ, দামি উপহারগ্রহণ দূরের কথা, মোড়লের শত অত্যাচারের চাপেও আত্মসমর্পণ করেনি, সতীত্ব বিনষ্ট হতে দেয়নি। বরং স্বামী গয়া বেদের তাকে ভুলে নতুন করে বিবাহ সংবাদে সে মূর্ছিত হয়ে পড়েছে।
বেদের মেয়ে নাটকের ৪র্থ দৃশ্যে গয়া বেদে ও আসমানির দাম্পত্যকলহ, ভালোবাসার আবেগ ঠিক রেখে কিছুটা সংক্ষিপ্ত করে নাট্যকার চম্পাবতী কাব্যনাটকে দৃশ্য সাজিয়েছেন। কবি জসীমউদ্দীনের বেদের মেয়ে নাটকে দেখা যায়, গয়া চম্পাকে অতীতে ভালবাসলেও বর্তমানে আসমানিকে নিয়ে সে সুখী।
এ পর্যায়ে প্রাক্তন স্ত্রী চম্পার অকৃত্রিম ভালোবাসার জন্য স্মৃতিকাতরতা নয়, বরং বর্তমান স্ত্রী আসমানির গ্রামে গ্রামে লোক ঠকিয়ে পয়সা নিয়ে আসার নানা কাহিনি শুনে গয়া আহ্লাদিত। কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক তাঁর চম্পাবতী কাব্যনাটকে গয়াকে একজন সনিষ্ঠ আধুনিক প্রেমিক পুরুষের মর্যাদা দিতে চেয়েছেন।
ফলে তাঁর নাটকে তিনি বেদে নারীর লোক ঠকানোর কাহিনিতে গয়ার আনন্দ অংশটুকু বাহুল্য বিবেচনায় সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়েছেন। এবং নাটকে এ দৃশ্যটি শেষ করেছেন চম্পার প্রতি গয়ার গোপন ভালোবাসা, এবং নতুন করে তাকে ফিরে পাবার প্রত্যাশামিশ্রিত গান দিয়ে
ক্লান্তি কি জীবনে আছে ? মানবের জন্ম একবার!
তারে যে হারাই আমি, পাইতাম যদি আরেকবার। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৬৬)
জসীমউদ্দীনের বেদের মেয়ে নাটকের ৩য় অঙ্কে ৪টি দৃশ্য রয়েছে। এ-অঙ্কের ২য় দৃশ্যে দেখা যায়, মোড়লস্ত্রী মালেকা স্বামীর কল্যাণ কামনায় স্থানীয় ফকিরের সহায়তা নিচ্ছে এবং বেদেদের মন্ত্রসিদ্ধ উপকরণ গ্রহণ করছে। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর চম্পাবতী নাটকে বাহুল্য বিবেচনায় এটি গ্রহণ করেননি।
আবার, এ দৃশ্যে বেদের মেয়ে নাটকে দেখা গেছে মোমিন ও আরমান নামক দুই ভণ্ডফকিরের চ্যালা কীভাবে মিথ্যে ভয় দেখিয়ে গ্রামীণ নারীদের ঠকিয়ে অর্থ আদায় করেছে। তারা বেদের সর্দার মোড়লের ওপর মন্ত্র করেছে – এই ভয় দেখিয়ে মোড়লের পতিব্রতা স্ত্রী মালেকার নিকট থেকে অর্থ ও পোশাক সংগ্রহ করেছে। বস্তুত, এ দৃশ্যটি জসীম উদ্দীন দুটি কারণে তাঁর নাটকে ব্যবহার করেছেন।
প্রথমত, তিনি সে সময়ের কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ ও গ্রামীণ বাস্তবতার চিত্র দেখাতে চেয়েছেন, দ্বিতীয়ত এ দৃশ্যের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীর স্বামীনিষ্ঠা তথা মালেকার পাতিব্ৰত্য দেখিয়েছেন। কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক নাটকের মূলঘটনার গতি ও আকর্ষণ ধরে রাখার প্রয়োজনে এ দৃশ্যটি বাহুল্যবিবেচনায় ছেঁটে ফেলেছেন।
তিনি তাঁর নাটকে যে মালেকা চরিত্র নির্মাণ করেছেন সে সাহসী, সত্যবাদী, নির্ভীক এক নারী; লম্পট স্বামীর কল্যাণে ফকির ডেকে তন্ত্র মন্ত্র করা তার ধাতে নেই; সে কিছুতেই অন্যায়কে নীরবে নিয়তির বিধান ভেবে মেনে নিতে রাজি নয়। ফলে লম্পট স্বামীর কল্যাণের জন্য ফকিরদের ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নেবার প্রয়োজনও তার নেই।
৩য় ও ৪র্থ দৃশ্যে বেদের মেয়ে নাটকে দেখা যায়, চম্পা মোড়লগৃহ থেকে বিতাড়িত হয়ে পুনরায় ফিরে এসেছে বেদেবহরের নৌকায়; এবং এসে পরিবর্তিত পরিস্থিতির বাস্তবতা বিবেচনায় স্বামী গয়া বেদের কাছে স্ত্রীর পরিপূর্ণ মর্যাদা নয়, বরং সামান্য ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা পেতে ও দাসির অধিকারে থাকতে চেয়েছে। কিন্তু গয়ার বর্তমান স্ত্রী আসমানি তাতেও রাজি না হওয়ায় গয়া বেদে আসমানির গৃহকর্মের সুবিধার্থে চম্পাবতীকে বাড়তি কাজের মেয়ে পরিচয় দিয়ে লোভ দেখিয়ে রাজি করিয়েছে।
এ দৃশ্যে দেখা গেছে চম্পাবতী দীর্ঘকাল মোড়লগৃহের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার অভ্যস্ততায় বেদেদের জীবনের সাথে আর আগের মতো একাত্ম হতে পারছে না। মূলত এটি তার দীর্ঘকাল বেদে-জীবনাচার থেকে বিচ্ছিন্নতার ফল। ফলত, এখন তার নৌকা বেয়ে পথ চলতে হাত ব্যথা করে, বেদেদের দারিদ্র্যের সঙ্গে মানিয়ে বাসি-পচা খাবার খেতে তার অস্বস্তিবোধ হয়, এমনকি বেদেদের প্রধান জীবিকানির্বাহের উপায় হিসেবে সাপ নিয়ে গ্রামে গ্রামে খেলা দেখাতেও তার গা ঘিন ঘিন করে।

তবে সৈয়দ হক চম্পাবতী নাটকে চম্পাকে আধুনিক কাব্যনাটকের নায়িকা করে তুলবার প্রয়োজনে গয়া-আসমানির দাম্পত্যজীবনে প্রবেশ করাননি। বরং গয়া তীব্রবিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হলে ত্রাতা হিসেবে সেখানে সরাসরি চম্পাকে উপস্থিত করেছেন। অর্থাৎ সৈয়দ শামসুল হক কাহিনির প্রক্ষিপ্ততা এড়িয়ে ঘটনার একমুখী গতি বাড়িয়েছেন।
জসীমউদ্দীন যেখানে কাহিনি ও সংলাপ বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করে নাট্যমুহূর্ত ক্ষুণ্ণ করেছেন, সেখানে সৈয়দ শামসুল হক বর্ণনা সংক্ষিপ্তকরণের মাধ্যমে নাট্যমূহূর্ত সৃষ্টি করেছেন। চম্পাবতী নাটকে চম্পার বিরহে স্মৃতিকাতর গয়ার চরম বিপদের মুহূর্তে আকস্মিকভাবে চম্পার ঘটনাস্থলে আগমন এবং নিজের জীবন তুচ্ছ করে গয়াকে বাঁচিয়ে তোলার নাটকীয় দৃশ্য নাটকের নাট্যরস যেমন বজায় রেখেছে, তেমনি আধুনিক কাব্যনাটকের নায়ক-নায়িকা হিসেবে গয়া-চম্পাকে মহত্তম সত্তায় উন্নীত করেছে। এখানে নাট্যকার সৈয়দ হক তাঁর আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় প্রদান করেছেন।
চম্পাবর্তী নাটকে প্রধান পুরুষ চরিত্র তিনটি – দশ গ্রামের মোড়ল, সাপুড়েদের নেতা গয়া বেদে ও মাতবরের – চ্যালা মাইনক্যা। এছাড়া দলগত আরও কিছু চরিত্র রয়েছে। যেমন সাপুড়ের দল, লাঠিয়াল বাহিনী প্রভৃতি। অন্যদিকে প্রধান নারী চরিত্রও তিনটি। মোড়লের স্ত্রী মালেকা, পয়ার প্রথম স্ত্রী চম্পাবর্তী ও গয়ার দ্বিতীয় স্ত্রী আসমানি। এছাড়া পার্শ্বচরিত্র হিসেবে রয়েছে মোড়ল পরিবারের দাসি, অন্যান্য বেদে নারী, বিশেষ চরিত্রে বৈষ্ণবী।
জসীমউদ্দীন তাঁর বেদের মেয়ে নাটকে যেভাবে চরিত্রের গতি-প্রকৃতি, বিকাশ-পরিণতি নির্মাণ করেছেন, চম্পাবতী নাটক রচনার সময় সৈয়দ হক তার অনেক কিছুই বদলে দিয়েছেন। আধুনিক কাব্যনাটকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নায়ক-নায়িকা বাহ্যত চারিত্রশক্তিতে দৃঢ় ও অটল থাকলেও হৃদয়িক রক্তক্ষরণে সিক্ত হবে। বেদের মেয়ে নাটকে জসীমউদ্দীন এই ক্ষরণের ইঙ্গিত প্রদান করলেও, পুরোপুরি তা চিত্রিত করতে পারেননি; তিনি সামাজিক বাস্তবতাকে স্বীকার করে নায়ক-নায়িকাকে নিম্নবিত্তশ্রেণির মানসিকতা অনুসারে চিত্রিত করেছেন।
গয়া বেদে ও চম্পাবতী মোড়লের অত্যাচারের শিকার হয়ে আলাদা হয়ে গেলেও অচিরেই গয়া আসমানিকে বিয়ে করে তাকে নিয়ে সংসার পেতে জীবনবাদিতার পরিচয় দিয়েছে। সেখানে আধুনিক নর- নারীর বিরহকাতরতা, রোমান্টিসিজম অনুপস্থিত ছিল। পেটের দায় বা অস্তিত্বরক্ষাই সেখানে বড় কথা।
আসমানির পতিসেবায় গয়া পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে না পারলেও জীবনধর্ম মেনে জীবিকার তাগিদে আসমানির গ্রামে গ্রামে, হাটে-বাজারে লোকঠকিয়ে পয়সা আনাকে সাধুবাদ দিয়েছে। আবার, চম্পাবতী যখন মোড়লগৃহ থেকে ফিরে বেদেবহরে পূর্বের মতো কর্মনিষ্ঠা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন গয়া তাকে ভৎসনা করে বলেছে :
গয়া দেখ্ চাপাই। তুই যদি আমাগো কুনু কাম না করবি, ক্যাবল লবাবের মতন হয়া থাকপি, তয় তোরে কেমন কইরা রাখপ ? কে তোরে গরে বসায়া খাওন দিবে। (বেদের মেয়ে : ৮৫)
কিন্তু চম্পাবতী নাটকে সৈয়দ শামসুল হক গয়া বেদের এই অতিনিরেট অস্তিত্ববাদী মানসিকতাকে এড়িয়ে গিয়ে তাকে পরিপূর্ণভাবে আধুনিক কাব্যনাটকের রোমান্টিক নায়ক তথা প্রেমিকপুরুষ করে তুলেছেন, এবং দেখিয়েছেন, সেখানে গয়া মোড়লের অত্যাচারের শিকার হয়েও নিজ স্ত্রীকে অনায়াসে ছেড়ে যায়নি। একজন আত্মমর্যাদাবান প্রেমিকের মতো, দায়িত্ববান স্বামীর মতো প্রতিবাদ করে বলেছে :
ল্যাজে টান দিয়া আমরা গোক্ষুর গর্ত থিকা বাইর কইরা আনি,
তাই নিবেদন –
বাইদ্যার নারীর দিকে দৃষ্টি দিবার আগে সাবধান! সাবধান হন! (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৫৫ )
কিন্তু এরপর মোড়লের অত্যাচার থেকে নিজ জাতিকে রক্ষার স্বার্থে যখন চম্পাবতী মোড়লের নিকট আত্মসমর্পণ করেছে, তখন একজন প্রেমিক স্বামীর মতোই চম্পার প্রতি গয়া ক্ষিপ্ত ও ক্রুদ্ধ হয়েছে। কেননা গয়া গরিব হলেও সে জানে – টাকা দিয়ে সব কেনা যায় না, এবং ‘ইজ্জত অমূল্য মণি সাপের মাথায়। চম্পার সিদ্ধান্তের সূত্রে অভিমানী প্রেমিকের মতোই সে বলেছে :
কী কস? কী কইলি রে! নটি হারমাজাদী!
তোর সাথে আর যদি আমি ঘরে থাকি। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৫৬)
এবং এই অভিমানের জেরেই সে অন্য বেদে-নারী আসমানিকে বিয়ে করে ঘরে তুলেছে; এবং চম্পাকে ভুলে সে আসমানিকে নিয়ে সুখে ঘরকরার যারপরনাই অভিনয় করে গেছে। কিন্তু দর্শক সহজেই অনুমান করতে পেরেছে যে, আসমানিকে নিয়ে গয়া যাপিত জীবনে সুখে থাকার চেষ্টা করে গেলেও, তার হৃদয় পুরোপুরি এখনো চম্পার স্মৃতিতে আচ্ছন্ন ও অমলিন। ৮ম পরিচ্ছেদে পয়ার সঙ্গে আসমানির আলাপে ও অনুযোগেই তা স্পষ্ট। আসমানি দৃঢ়কণ্ঠে বলেছে – গয়া এখনো চম্পার স্মৃতি বুকে ধারণ করে আছে বলেই আসমানির ভালোবাসা – পুরোপুরি উপভোগ করতে পারছে না। তাদের কথোপকথন উল্লেখ করা যেতে পারে :
গয়া ।
মন কেন গো পাইনা নূতন বাইদ্যানিগো, বউ ।
পদ্মা নদীর বুক ভরিয়া ক্যান বা কালা ঢেউ ?
আসমানি ।
চম্পারে কি ভুলছো তুমি ? সেই ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৬৩)
আসমানির এই কটাক্ষে গয়ার জীবনসত্যে আঘাত লাগলেও ভালোবাসার স্ত্রী চম্পার প্রতি গভীর অভিমান বুকে নিয়ে সে আসমানির সঙ্গে দাম্পত্যজীবনে সুখী হবার চেষ্টা করে গেছে। কিন্তু আসমানী গ্রামে কাজে চলে যাবার পর বারে বারে নিভৃতে গয়া চম্পাকে স্মরণ করেছে। একজন আধুনিক প্রেমিক পুরুষের মতোই তার হৃদয় দ্বন্দ্বে-দোটানায় ক্ষতবিক্ষত হয়েছে।

একদিকে চম্পার সঙ্গে যাপিত জীবনের স্মৃতি, চম্পার সনিষ্ঠ ভালোবাসা, অকৃত্রিম সেবা, স্বামীর প্রতি আত্মনিবেদনের স্মৃতি তাকে কুরে কুরে খেয়েছে, অন্যদিকে যখনি মনে পড়েছে চম্পা তাকে ছেড়ে অন্য ধনী গৃহস্থের ঘর বেছে নিয়েছে, তখনই প্রচণ্ড অভিমানে সে তাকে ভুলতে চেয়েছে। কিন্তু মনে-প্রাণে সে তার বঞ্চিত জীবনে আবার চম্পাকে পেতে চেয়েছে। এ পর্যায়ে গয়ার বক্তব্য উল্লেখ্য :
মাঝে মাঝে ঝড় ওঠে, ঝড় ।
খলখল করে পদ্মা বুকের ভিতর, গাছ ভাঙে মড়মড়,
গর্তে ভিতরে সাপ মাথা তোলে। চম্পা মনে পড়ে! [ … ]
তারপর যেই চিন্তা ছোঁ দিয়া নাইমা আসে, চিল তীক্ষ্ণ ঠোঁটে –
অতীতের সোহাগের লাশ ছিঁড়া যায় আর শান্তি নাই মোটে।
শাস্তি কি জীবনে আছে ? মানবের জন্ম একবার!
তারে যে হারাই আমি, পাইতাম যদি আরেকবার। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৬৬)
এরপর গয়ার এই ইচ্ছেপূরণ হয়েছে একেবারে তাঁর জীবন সায়াহ্নে। সৈয়দ শামসুল হক গয়া ও চম্পার আপাত বিচ্ছেদ ঘটালেও পরস্পরের প্রতি তাদের নিষ্ঠা ও হৃদয়জাত পবিত্রতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। গয়া আসমানির সঙ্গে সংসার সাজালেও তার হৃদয় চম্পার ভালোবাসায় স্মৃতিকাতর হয়েছে। আর চম্পা মোড়লগৃহে শত অত্যাচার সহ্য করেও তার দেহমনের পবিত্রতা ধরে রেখেছে। শেষপর্যন্ত গয়ার প্রতি সে তার ভালোবাসার একনিষ্ঠতা দেখিয়ে গেছে নিজজীবন উৎসর্গ করে। অন্যদিকে গয়া বেঁচে উঠলেও তাঁর হৃদয় আজীবন বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় রক্তাক্ত হয়েছে। চম্পার মৃত্যুর পর যা প্রকাশিত হয়েছে সমবেত বিলাপের সুরে
মাটির দেহ শুইয়া আছে মাটির বিছানায়।
পঙ্খী উইড়া গেলে পঙ্খী পালক থুয়া যায়।
নারীর জীবন জলের লিখন জলে মুইছা যায়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৭৮)
গয়া ছিল নিজপেশায় অত্যন্ত সৎ ও দক্ষ। বেদেবহর নিয়ে তার সফর, সাপধরার কৌশল ও দক্ষতা তার প্রমাণ। এমনকি নিজের আত্মমর্যাদাবোধ রক্ষার্থেই গ্রামবাসীর কথায় সে বিষাক্ত সাপ নিয়ে সাহসের সঙ্গে খেলা দেখাতে গেছে। গ্রামবাসী যখন তাঁর অহমবোধে আঘাত দিয়ে বলেছে :
গ্রামবাসী। বোঝা গেছে কেরামতি! বাহাদুরি করো!
কালনাগ ধরো! […]
বুঝতাম, বুঝতাম যদি এই সাপ লয়া
খেলাটা দেখাইতে পারো আইজ তুমি গয়া –
তবে বুঝি তুমি ৰাইদ্যা
গয়া বাইদ্যা বড় বাইদ্যা
দ্যাশের ভিতরে।
কইলা না গুণ আছে তোমার শিকড়ে!
বিষে করো ভয় ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৭2)
তখনই গয়াবেদে একদিকে আত্মঅহমবোধের তাড়নায়, অন্যদিকে বেদেসম্প্রদায়ের অস্তিত্বরক্ষা ও সম্মানরক্ষায় নিজের জীবনসংশয় জেনেও বিষাক্ত সাপ নিয়ে খেলার সাহস করেছে। বেদের মেয়ে নাটকেও চাষির কথায় উত্তেজিত হয়ে গয়া বিষাক্ত সাপ নিয়ে খেলা করতে চেয়েছে। তবে সে কারণ ছিল একান্তই ব্যক্তিগত। সে আসমানিকে জানিয়েছিল বেদে সর্দার হিসেবে তার বেদেসমাজে মান থাকবে না যদি না সে বিষাক্ত সাপ নিয়ে খেলা দেখাতে না পারে। সে বলেছিল :
গয়া ॥
হাসাইলি তুই আমারে চাপাই। আমি বাইদ্যার সর্দার। এই সাপ দেইখা যদি ডরাই ভয় কি বাইদ্যার দলে আমার মান থাকপি ? ( বেদের মেয়ে : ৮৯)
কিন্তু চম্পাবতী নাটকে গয়ার বিষাক্ত সাপ নিয়ে খেলার কারণ নাট্যকার একান্তই ব্যক্তিগত করে দেখাননি। গয়াকে একজন পরিপূর্ণ নায়ক করে তুলবার প্রয়োজনে সাপধরার প্রয়োজনটিও করে তুলেছেন সর্বজনীন।
নিতান্ত ব্যক্তিগত মানমর্যাদা বৃদ্ধি নয়, বরং গয়া সমগ্র বেদেবহরের অস্তিত্বের প্রয়োজনে, অভাব মেটানোর তাগিদেই সাপ ধরতে চেয়েছে। নাট্যকার এখানেই গয়াকে জীবনবাদী করে তুলেছেন। বেদের মেয়ে নাটকে গয়ার বর্তমান স্ত্রী আসমানির লোকঠকিয়ে অর্থোপার্জনকে খুশিমনে গ্রহণ করেছে।

প্রতারণার খেলায় আসমানির দক্ষতাকে প্রশংসা করে বলেছে : ‘বেশ বাইদ্যানী – বেশ। […] বাইদ্যানী! তোর এতগুণ আছে আগে জানতাম – না।'( বেদের মেয়ে: ৬২) কিন্তু চম্পাবতী কাব্যনাট্যের গয়া অসৎ পথে নয়, লোক ঠকিয়ে নয় বরং সবার সম্মুখে বীরত্বের সঙ্গে সদুপায়ে অর্থোপার্জন করতে চেয়েছে। এখানেও নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক গয়া চরিত্রটিকে মহত্তম সত্তায় উত্তরণ ঘটিয়েছেন।চম্পাবতীর গয়া বেদের এতৎসংক্রান্ত সংলাপ নিম্নে উল্লেখ করা যেতে পারে :
যদি না দেখাই খেলা পেট ভরবো কীসে?
অভাবের যত বিষ, তত বিষ নাই সৰ্প বিষে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৭৩) একজন স্বামী হিসেবে গয়া কর্তব্যপরায়ণ, দায়িত্বশীল। প্রথম স্ত্রী চম্পার প্রতি সে যেমন দায়িত্বশীল ও কর্তব্যনিষ্ঠ ছিল; তেমনি চম্পাকে হারিয়ে সে যখন আসমানিকে বিয়ে করেছে, তখনও হৃদয়জাত আকর্ষণ না থাকা সত্ত্বেও সে আসমানিকে ঠকাতে চায়নি। বরং আসমানির নানান আবদার মিটিয়ে তার সঙ্গে মানিয়ে-গুছিয়ে সংসার করতে চেয়েছে।
শ্রেণিবিভক্ত সমাজের একজন নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ হয়েও সে নারীর প্রতি নিষ্ঠাবান, শ্রদ্ধাশীল পুরুষসত্তা। চম্পা যখন তার জীবনে ছিল তখন চম্পার সতীত্ব রক্ষায় সে মোড়লের সঙ্গে লড়াই করেছে। আবার আসমানি যখন রেগে অভিমানে বাপের বাড়ি চলে যেতে চেয়েছে, তখন সে গ্রামীণ সাধারণ প্রেমিক পুরুষের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে তাকে নানান কথায় ভুলিয়ে মান ভাঙিয়েছে :
আসমানি।
বাড়ির কাঞ্চি বাঁশের ঝাড়ে বাঁশ মড়মড় করে,
সেই না বাঁশের মারবো লাঠি বাইদ্যারে আজ ধরে।
গয়া।
সেই না বাঁশ বাজায়ে বাঁশী শুনাবো তোরে গান,
আসমানি তুই আসমানিরে আমার আসমান। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৬৬)
অর্থাৎ, সৈয়দ শামসুল হক তাঁর চম্পাবতী নাটকে গয়া বেদেকে পুরোপুরি আধুনিক কাব্যনাটকের নায়ক চরিত্র হিসেবে নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
চম্পাবতী কাব্যনাট্যের নামচরিত্র গয়া বেদের স্ত্রী চম্পাবতী। বস্তুত, সে-ই আলোচ্য কাব্যনাট্যের প্রধান নারী চরিত্র; তাকে ঘিরেই নাটকের সমস্ত ঘাত-প্রতিঘাত, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। নাটকের সমগ্র কাহিনিই তার জীবনব্যাপী আত্মত্যাগের কাহিনি। প্রথমত, মোড়লের লালসার শিকার সে। নিজ জাতি, সম্প্রদায়কে মোড়লের অত্যাচার থেকে বাঁচাতে সে নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়েছে।
আবার শেষদিকে স্বামীর জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনটাই উৎসর্গ করে দিয়েছে। তাঁর মতো এমন উদার, এমন প্রেমসিক্ত, এমন কোমল, মহৎ চরিত্র আলোচ্য নাটকে আর একটিও নেই। তবে এখানেও সৈয়দ শামসুল হক বেদের মেয়ের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়ে নিজস্ব সৃজনশীলতাগুণে চম্পাবতীর চরিত্র নির্মাণে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।
জসীমউদ্দীনের বেদের মেয়ে নাটকের চম্পাবতী বা চাপাইয়ের সাথে সৈয়দ শামসুল হক নির্মিত চম্পাবতী কাব্যনাটকের চম্পাবতী চরিত্রটির সাদৃশ্য যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি তাদের বৈশাদৃশ্যও অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে। কবি জসীমউদ্দীন তাঁর বেদের মেয়ে নাটকে চাপাই চরিত্রটিকে নিতান্ত বেদে সমাজের এক ত্যাগী নায়িকারূপে চিত্রিত করেছেন।
তার অপার দৈহিক সৌন্দর্যই জীবনের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। চম্পা যেমন রূপের আধার, তেমনি বেদেনি হিসেবে সাপের খেলা দেখাতে, নৃত্য গীত পরিবেশনেও অত্যন্ত দক্ষ। আর এটিই লোভী, লম্পট মোড়লকে তার দিকে আকৃষ্ট করেছে। এ যেন সেই চর্যাপদের ‘অপণা মাংসে হরিণা বৈরী’ নামক প্রবাদপ্রতিম কথারই প্রতিফলন। যেটিকে সৈয়দ শামসুল হক বর্ণনা করেছেন ‘নারীর রূপ যে সর্বনাশী, নারীকেই সে খায়’ (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৪১) নামক চরণাংশের মাধ্যমে।
মোড়লের অত্যাচার থেকে নিজ জাতিকে বিনাশ থেকে রক্ষাকল্পে চম্পার আত্মত্যাগ, তার পতিভক্তি – চরিত্রের – এসব বৈশিষ্ট সৈয়দ শামসুল হক তাঁর চম্পাবতী নাটকে বজায় রেখেছেন। তবে চম্পা চরিত্রটিকে তিনি পতিভক্ত সাপুড়ে নারী থেকে আধুনিক নারীতে উত্তীর্ণ করেছেন। ফলে আলোচ্য কাব্যনাটকে চম্পাবতী চরিত্রটি সামান্য বেদে নারী থেকে আরও শিক্ষশ্রী আরও তীক্ষ্ণ আত্মমর্যাদাপূর্ণ নারী হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
নাটকের প্রথম দৃশ্যে মেয়েদের বর্ণনা থেকেই চম্পাবতীর ভুবনভোলানো রূপের পরিচয় পাওয়া যায়। এরপর গ্রামীণ কিশোর-কিশোরী, বিশেষ করে মাইনক্যার সাথে সাপখেলা দেখানো নিয়ে তার দরাদরি – তাকে একজন দক্ষ বেদে নারী হিসেবে আমাদের সামনে পরিচয় করিয়ে দেয়।
তবে এর মধ্যেই আমরা তার আরেকটি কোমল, উদার, সচেতন দিকের সঙ্গে পরিচিত হই, যা দলের অন্য বেদে নারীদের মধ্যে নেই, এবং তা হলো নিজ দলের কল্যাণভাবনা। মাইনক্যা যখন সাপখেলার পারিশ্রমিক নিয়ে দর-কষাকষি করছে, তখন তার প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে অন্য বেদে মেয়েরা অন্যত্র চলে যেতে চেয়েছে, তখন চম্পা অত্যন্ত বিজ্ঞের মতো তাদের থামিয়ে দিয়ে বলেছে :
থামলো তোরা থাম!
এই গেরামে নৌকা যদি ঘাটেই বাঁধলাম –
খালি হাতেই ফিরা যাবো! সাপ না খেলায়া?
আমরা তবে বাইদ্যার দল বাঁচবো কী খায়া? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৪৫)
তবে, জসীমউদ্দীনের বেদের মেয়ে নাটকের চম্পা চরিত্রটি বেশি চটুল, বেশি চপল। তার মুখের ভাষা জুড়ে রয়েছে গ্রামীণ প্রবাদের ছড়াছড়ি। যথার্থ বেদে নারীদের মতোই খিস্তিখেউড় মিশ্রিত সংলাপে অভ্যস্ত সে। সাপের খেলা নিয়ে মাইনক্যা চরিত্রটির দরদামের বিপরীতে তার উত্তর প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে :
চম্পা ॥
দূর মুখপোড়ার বেটা মুখপোড়া! যা পাঁচ টেহা অ্যানগ্যা।
মাইনক্যা ॥ বাইদানি ! আরো কিছু রিয়াইত মুরিত কর ।
চম্পা।
ওরে আমার আবা জাবা
ওই মুখে বাতাসা খাৰা ! [ … ]
আরে আটকুড়ার নাতি। তোর সাথে আর পারা গেল না। যা এক পয়সা অ্যানগ্যা। তোরে আমি
খেলা দেখাইমু। (বেদের মেয়ে: ৪-৫)
বস্তুত, বেদের মেয়ের চম্পা বেদেসম্প্রদায়ের উত্তম প্রতিনিধি; আর সৈয়দ শামসুল হকের চম্পাবতী নাটকের চম্পাবতী যতটা না বেদে নারী, তার চেয়ে বেশি আধুনিক কাব্যনাট্যের রোমান্টিক প্রেমিকা চরিত্র। এখানেই দুই লেখকের চরিত্র নির্মাণের মূল পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। তবে উভয় নাটকের চম্পাবতীই অত্যন্ত সংবেদনশীল মনের অধিকারী; অপরের কল্যাণ কামনায় যে নিজের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করতে পারে।
চম্পাবতী নাটকের চম্পা মোড়লের লাঠিয়ালের অত্যাচারের ভয়াবহতা দেখে শিউরে উঠেছে; নিজেকে দায়ী করেছে এই অত্যাচারের নেপথ্য কারণ হিসেবে। কেননা তাকে দখলে নিতেই বেদেজাতির ওপর মোড়লের এই নির্মম অত্যাচার।
ফলে তার মানবিক হৃদয় ভেবেছে – তার সম্মান যদি বিনষ্ট হয়ও, যদি সমাজে তার অসতী হিসেবে পরিচিতিও হয়, এমনকি এহেন কর্ম ধর্মে যদিবা নিষিদ্ধ থাকে, তবু তার একটি সিদ্ধান্তে তার গোটাসম্প্রদায় রক্ষা পাবে। তার আত্মগ্লানি ও স্বজাতির কল্যাণভাবনার এই দ্বন্দ্ব চমৎকার একটি সংলাপে নাট্যকার উপস্থাপন করেছেন :
আমারই কারণে যদি এত অত্যাচার –
তবে এ যৈবন রাইখা কি হবে আমার ?
নিজের ইজ্জত দিয়া বাঁচে যদি বাইদ্যা বংশ তবে –
অসতী আমারে লোকে কয় যদি কবে,
তবু জাতি রক্ষা পাবে, আমি রাজি হই –
মাথার উপরে আল্লা, মাফ করবেন নিশ্চই। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৫৬)
এরপরের ঘটনায় মোড়লের ভালোবাসা ও উপহার সে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। সদর্পে জানিয়েছে – তারা – বেদে নারী। গৃহস্থ নারীর মতো প্রচলিত সাজ, পোশাক, অলঙ্কারে তাদের মন নেই। বরং সাপ-ই তাদের ভূষণ। বিষাক্ত সর্প নিয়েই তাদের খেলা। উভয় নাটকেই দেখা গেছে চম্পাবতী বৈষ্টমী চরিত্রের মাধ্যমে তাদের প্রাক্তন স্বামী ও বেদে বহরের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জানতে চেয়েছে।
দুজনেরই অপরিসীম কৌতূহল ছিল যে, তাদের স্বামীরা তাদের মনে রেখেছে কি না! কিংবা নিজ সম্প্রদায়ের জন্য তাদের এই আত্মত্যাগ বেদেসমাজ কতটা গুরুত্ব দিয়ে উপলব্ধি করেছে। জসীমউদ্দীন বিরচিত বেদের মেয়ে নাটকে চম্পা বৈষ্ণবীকে উদ্দেশ্য করে অতি আগ্রহভরে বলেছে :
চম্পা।
খবর পাইছ? তারা সগলে ভাল আছে? আমার গয়া বাইদ্যা ভাল আছে? […] তার চেহারা বুঝি আমার জন্যি ভাইবা ভাইবা কাহিল হয়া গ্যাছে? […] আমি অভাগিনী জীবনের সর্বস্ব ধন সপ্যা দিয়া তাগো বাঁচাইলাম। এ কথা লয়া সে কোন গান বানায় নাই ? আর সেই দুস্কের গান দ্যাশে দ্যাশে সগল মানুষগো শিখায়া দ্যায় নাই? (বেদের মেয়ে : ৪৫)
অর্থাৎ বেদের মেয়ে নাটকের চম্পা চরিত্রটি স্বামী পয়ার ভালোবাসা আশা করার সঙ্গে সঙ্গে নিজেও বিখ্যাত হবার আশা পোষণ করেছে। ভেবেছে তার এই আত্মত্যাগ একেবারেই ফেলনা নয়। বরং এ কার্যে বেদে সমাজে তার খ্যাতি, সম্মান আরও উঁচু হবে। কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক বিরচিত চম্পাবতী কাব্যনাট্যের চম্পার বিখ্যাত হবার কোনো আশা নেই; সে কেবলই নিতান্ত বিরহী প্রেমিকা।

সেও ব্যাকুল হয়ে বৈষ্ণবীর নিকট নিজ সম্প্রদায়ের খোঁজখবর জানতে উদগ্রীব হয়েছে; এবং সেখানেও তার তাবৎ জিজ্ঞাসা কেবল ব্যক্তি গয়া বেদে আর তার ভালোবাসাকেন্দ্রিক। তাকে নিয়ে কেউ গান বেধে সমাজে প্রচার করল কি না, তার আত্মত্যাগ বিখ্যাত গীত বা গল্প হয়ে দেশে দেশে শ্রুত হল কি না, তা নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই। এখানেই কবি জসীমউদ্দীনের বেদের মেয়ের চাপাই চরিত্র থেকে সৈয়দ শামসুল হক রচিত চম্পাবতী কাব্যনাট্যের চম্পা চরিত্রটি পৃথক হয়ে উঠেছে।
আলোচ্য কাব্যনাট্যে সে সামান্য বেদেনারী উত্তীর্ণ হয়েছে আধুনিক রোমান্টিক নারীসত্তায়। বৈষ্ণবীর নিকট তার প্রশ্নকাতর আকুতি প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে :
চম্পা।
কোন্ দ্যাশে যে বাইদ্যা আছে আমি কি তার জানি?
পাইছে বুঝি খুইজ্যা কোনো নূতন বাইদ্যানি ।
তার খবর আইনা দেও ।
জাতিধরম দিয়া জাতি বাঁচাইলাম বাইদ্যার।
ভুইলা গেছে? ভাইঙ্গা পড়ে নদীর দুইপাড় ।
তার খবর আইনা দেও। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৬৩)
আবার, বৈষ্ণবীর মুখে গয়া বাইদ্যার পুনরায় বিয়ে করে সংসারী হবার খবর শুনে চম্পাবতীর প্রতিক্রিয়া দুই নাটকে দুজন নাট্যকার পৃথকরূপে উপস্থাপন করেছেন। জসীমউদ্দীন যেহেতু তাঁর নাটকে বেদে নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়ে চম্পাবতীর চরিত্র রূপায়ণ করেছেন, ফলে চম্পাবতী গয়া বেদের নতুন বিয়ে করার সংবাদে এবং নিজ জাতিকর্তৃক তার আত্মত্যাগের ইতিহাস ভুলে যাওয়ার কথা শুনে প্রচণ্ড অভিমানী ও ক্রুদ্ধ হয়ে পড়ে।
তার আত্মগ্লানি হয়, সে কেন অহেতুক তাদের কথা স্মরণ করে জীবন অতিবাহিত করেছে, মোড়ল গৃহের সুখ সমৃদ্ধি উপেক্ষা করেছে! এ পর্যায়ে প্রচণ্ড হতাশা, রাগ ও অভিমান থেকে বৈষ্ণবীর পরামর্শে সে মোড়লের মধ্যেই নতুন করে গয়া বেদের ভালোবাসা খুঁজে নিতে উদ্যোগী হয়েছে। বৈষ্ণবী যখন বলে – কৃষ্ণের লীলায় নিজেকে ডুবিয়ে দিতে, মোড়লের মধ্যে গয়াকে খুঁজে নিতে, তখন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে মোড়লের ভালোবাসা সাদরে গ্রহণ করে মোড়লকে জানিয়েছে
কও মোড়ল! কও! – এমনি কইরা তোমার যত আদর যত্তনের কথা আছে আমারে কও আমার দুই কানে যদি না ধরে, আমি সমস্ত বুক পাইতা দিব তা হুননের লাইগ্যা। যত সোন্দর কথা আছে আল্লার দুনিয়ায় সগল তুমি আমারে কও, তাই হুইনা আমি আইজ নিজেরে ডুবাইয়া রাখুম। । … তুমি আমার সামনে বয়া বয়া যাগি সোন্দর সোন্দর কথা কও। […] না না মোড়ল তুমি আমারে ছাইড়া যাইও না। (বেদের মেয়ে ৫০)
এবং এরপর থেকে সে তার যথাসর্বস্ব দিয়েই মোড়লের সংসারে নিজেকে প্রতিস্থাপন করে সুখী জীবনযাপনের চেষ্টা করে গেছে; যা একজন নিম্নবিত্ত অভাবী নারীর জন্য সামাজিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। অন্যদিকে সৈয়দ শামসুল হক তাঁর চম্পাবতীকে ভালোবাসার একনিষ্ঠতা ও ত্যাগের মাহাত্ম্যে অনন্যতা দান করেছেন। তিনি মোড়লের প্রতি চম্পার নিঃশত আত্মনিবেদনের তথ্য উপস্থাপন করে তার ঔদার্য্য ক্ষুণ্ণ করতে চাননি। ফলে তিনি গয়ার নতুন করে বিবাহ করার সংবাদে চম্পাবতীর প্রতিক্রিয়া অঙ্কন করেছেন নাট্যনির্দেশে একটি বাক্যে
বৈষ্ণবীর এ কথায় মূর্ছিত হয়ে পড়ে চম্পা (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৬৩)
এই একটি প্রতিক্রিয়াতেই দর্শক চম্পার বক্ষপিঞ্জরে জমে থাকা ক্ষোভ, অভিমান, কষ্ট এবং স্বামীর প্রতি নিঃস্বার্থ ভালবাসার প্রমাণ পেয়ে যায়। ফলে নাট্যকার সৈয়দ হক আর এ পরিচ্ছেদ সংলাপের মাধ্যমে দীর্ঘ না করে সরাসরি বেদেবহারে গয়া-আসমানির দাম্পত্যদৃশ্যে চলে গেছেন অত্যন্ত নাট্যসংযমের পরিচয় দিয়ে।
এরপর উভয় নাট্যকারের নাটকে আবার চম্পাবতী চরিত্রটির উপস্থিতি ঘটেছে বৈষ্ণবীর সঙ্গে আলাপরত অবস্থায়। এ-পর্যায়েও সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তিত্বের দুজন চম্পাবতীর উপস্থিতি পাওয়া যায়। উভয় নাটকেই দেখা যায়, চম্পাবতীর প্রতি মোড়লের প্রাথমিক মোহ ও ভালোবাসা উবে গেছে। বিনিময়ে তাদের ওপর নেমে এসেছে অত্যাচার, নির্যাতন।
তবে জসীম উদ্দীনের বেদের মেয়ে নাটকের চরিত্র চম্পাবতীর জীবনে নেমে আসা দুঃখের কারণ এবং সৈয়দ হকের চম্পাবতী কাব্যনাট্যের চম্পার জীবনে নেমে আসা দুঃখের কারণ ভিন্ন। প্রথম চম্পাবর্তী বৈষ্ণবীকে জানিয়েছে যে, মোড়লের কাছে সে নিজের শরীর মন সঁপে দিয়ে সুখী হবার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে, কিন্তু মোড়ল আর এখন তাতে তৃপ্ত নয়, এমনকি তার প্রতি আর আসক্তও নয়। বরং তার প্রতি মোড়লের মোহ কেটে গেছে।
সংসারে তার অবস্থান এখন দাসির মতোই। এ পর্যায়ে সে অতি দুঃখের সঙ্গে জানিয়েছে যে, মোড়ল একদিন তার রূপে আকৃষ্ট হয়ে তার পেছনে ভ্রমরের মতো গুনগুন করতো নানান উপহারের থালি সাজিয়ে, তার আজ এমন দশা হয়েছে যে, সংসারে কাজ করলে পেটে আহার জোটে, আর কাজে একটু ভুল হলেই নেমে আসে মোড়লের নির্যাতনের খড়গ। মোড়লের এই আচরণগত পরিবর্তন সম্পর্কে সে সমাজে বিদ্যমান ভোগবাদী পুরুষতন্ত্রের এক চিরন্তন সত্য উপস্থাপন করে বৈষ্ণবীকে জানিয়েছে :
পুরুষের মন ত জান তুমি; ফুলটারে গাছের খনে ছিড়া গন্ধ শুইকা ফেলায়া দেয়। […] আমার নছিবের কথা আর কি কইমু তোমারে? মোড়ল আমার দিকে আর ফিরাও চায়া দেখে না। (বেদের মেয়ে : ৬৫)
সৈয়দ শামসুল হক বেদের মেয়ের নায়িকা চম্পাবতীর এমন করুণ পরিণতি দেখেই হয়তো এ চরিত্রটির মূলভাব বজায় রেখে নবনির্মাণের কথা ভেবেছেন। যে চম্পাবতী নিজ জাতি সম্প্রদায়ের কল্যাণের কথা ভেবে নিজেকে উৎসর্গ করে মহত্ত্ব দেখিয়েছে; সে-ই আবার অভিমানবশত স্বামীকে ভুলে মোড়লের সংসারে থিতু হবার চেষ্টাা করছে – এটি সৈয়দ শামসুল হকের আধুনিক যুক্তিবাদী মনন ও রোমান্টিক সৃষ্টিশীল সত্তা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। ফলে তিনি এ পর্যায়ে চম্পাবতীর ওপর মোড়লের নির্যাতনের চিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে তার কারণ হিসেবে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় উপস্থাপন করেছেন।
চম্পাবতী কাব্যনাট্যে চম্পাবতী মোড়লের অনুকম্পা ও অনুগ্রহপ্রার্থী নয়; সে বরং গয়ার স্মৃতি বুকে নিয়ে মোড়লের সঙ্গে লড়াই করে গেছে নিজ সম্ভ্রম রক্ষার । শত অত্যাচার নিপীড়নেও সে তার ভালোবাসা থেকে বিচ্যুত হয়ে মোড়লের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেনি; আত্মসম্মানবোধ ও নারীত্ব বিসর্জন দেয়নি।
সে গানে গানে জানিয়েছে যে, দুঃখের সায়রে সে স্বেচ্ছায় জীবন ভাসিয়েছে, শত অত্যাচার ও অনাহারে থাকলেও নিজ সম্মান, একনিষ্ঠতা বজায় রেখে তার মধ্যেই সে প্রকৃত সুখ খুঁজে নেবে। এই অজেয় সঙ্কল্পের কারণে তার প্রতি মোড়লের জেল ও অত্যাচার আরও বেড়ে গেছে। চম্পা বৈষ্ণবীকে জানিয়েছে :
দুঃখের কথা কবো কি আর, বোষ্টুমি ঠাকরুন।
মোড়ল সাবে পারলে আমায় কইরা ফালায় খুন।
তার পালংকে যাই নাই বইলা কেশ কাইটা দিছে।
পুরা বাড়ির রান্ধনের কাম আমার হাতে দিছে। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৬৭)
ফলে উভয় নাটকেই চম্পাবতী তাদের প্রাক্তন আবাসস্থল বেদে বহরে ফিরে যাবার প্রত্যাশা করেছে। কিন্তু দুজনের মধ্যে এখানেও রয়েছে সূক্ষ্ম পার্থক্য। বেদের মেয়ের চম্পাবতী মোড়লের অত্যাচার থেকে বাঁচতে মূলত বেদের দলে ফিরতে চেয়েছে । সে প্রত্যাশা করেছে – ‘আবার যদি ছাড়া পাইতাম, আবার যদি সেই বাইদ্যার দলে যাইবার পারতাম,'(বেদের মেয়ে : ৬৫)। অন্যদিকে চম্পাবতীর চম্পা মোড়লের অত্যাচার থেকে হতে রক্ষা পেতে বেদে বহরে ফেরত যাবার প্রত্যাশা কেবল নয়, স্বামী গয়াকেও ফিরে পেতে চেয়েছে অদম্য ব্যাকুলতায়। পাব্ৰিত্য নারীর নিষ্ঠা নিয়েই সে বলেছে :
মনের সকল নালিশ আমি উঠায়া লইতাম।
আমার বাইদ্যার দেখা যদি আবার পাইতাম! (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৬৭)
এরপর, উভয় নাটকের চম্পাবতীই মোড়লের গৃহ ত্যাগ করতে সক্ষম হয়েছে মোড়লের স্ত্রী মালেকার প্রতিবাদ এবং প্রত্যক্ষ সহায়তায়। তবে এখানেও রয়েছে পার্থক্য। বেদের মেয়ের চম্পাবতীকে মোড়ল নিজেই তাড়িয়ে দিতে চেয়েছে গৃহকাজে, বিশেষত রান্নার সামান্য ত্রুটি বিচ্যুতির অজুহাতে। অন্যদিকে চম্পাবতীর চম্পা নিজেই প্রতিনিয়ত মোড়লগৃহ থেকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে, এবং পরিশেষে মোড়লের স্ত্রী মালেকার সহায়তায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
এ পর্যায়ে বেদের মেয়ে নাটকে পৃথক একটি দৃশ্য যুক্ত করে জসীমউদ্দীন দেখিয়েছেন, দীর্ঘকাল গৃহস্থঘরে থেকে বেদে নারীর অভ্যাস ও স্বভাব বিস্মৃত হয়ে চাপাই বেদে বহরে ফিরে আর আগের মতো স্বচ্ছন্দ ও স্বাভাবিক হতে পারেনি। অন্যদিকে তার স্বামীও তার জন্য অপেক্ষা করেনি । ফলে প্রাক্তন স্বামীর ঘরে তার শুরু হয় দাসিবাস। এবং সেইসূত্রে গ্রামে সাপ ধরার কাজে গেলে, সে সেখানেই গয়াকে জীবন দিয়ে বাঁচিয়ে মূলত নিজের ইহজীবনের যন্ত্রণা, গ্লানিও অপ্রাপ্তি দূর করেছে।
কিন্তু চম্পাবতী নাটকে নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক চম্পার ব্যক্তিত্বময় সত্তা ধরে রাখার প্রয়োজনে এখানে আর বাড়তি কোনো দৃশ্য যুক্ত করেননি। মোড়লের গৃহ থেকে ফিরে গয়ার সংসারে দাসি হিসেবে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের জীবন তাকে কাটাতে হয়নি। শুনতে হয়নি পয়ার নতুন স্ত্রী আসমানীর ব্যঙ্গাত্মক বিদ্রূপ ও শ্লেষাত্মক মন্তব্য।
বরং নাট্যকার চেয়েছেন চম্পার আত্মত্যাগের মহিমা, ভালোবাসার নিষ্ঠা ও সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকুক। কাব্যনাট্যের বৈশিষ্ট্যানুসারে নায়ক-নায়িকা উভয়ের জীবনেই আপাত সুখের আড়ালে থাকে হৃদয়ের ক্ষরণ। ফলে চম্পাকে নাট্যকার একেবারে গয়ার তীব্র বিপদের মুহূর্তে উপস্থিত করিয়েছেন।
বিষাক্ত সাপ যখন গয়াকে দংশন করেছে, তখন স্ত্রী হিসেবে আসমানী যারপরনাই তাকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু, তাতেও যখন কাজ হয়নি, তখন গয়ার মুখ থেকে যাবতীয় আড়াল ও সংযমের বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে পড়েছে প্রথমা স্ত্রী চম্পার প্রতি অনিঃশেষ প্রেম। স্ত্রী আসমানীর সম্মুখেই সে চম্পার ভালোবাসাকে স্মরণ করে বলেছে :
বিষহরী মন্তর সেই জানতো একজন।
আইজ সে থাকিলে বিষ করিত শোষণ।
আইজ সে থাকিলে গয়া উঠতো খাড়া হয়া।
তারে ত্যাগ করছিলাম কত মন্দ কয়া ।
জাতি রক্ষা করছিলো। সেইদিন বুঝি নাই তারে।
মাফ চাই। মাফ চাই । আল্লারে –
সেই মহাদোষে আমি আইজ চলিলাম।
অন্তিম কালেতে লয়া মুখে চম্পা নাম।
চম্পা! চম্পাবতী! পঙ্খী আমার! (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৭৫)
গয়ার এই অনুশোচনার মুহূর্তে নাটকীয় চমক সৃষ্টি করে চম্পাবতী গয়ার সম্মুখে হাজির হয়েছে। সে সাধ্যমতো মন্ত্র পড়ে চেষ্টা করেছে গয়াকে সুস্থ করে তোলার; এবং জানিয়ে দিয়েছে – মোড়লের সংসারে এতদিন বন্দি – জীবন যাপন করলেও তার সতীত্ব অক্ষুণ্ণ রয়েছে; গয়ার প্রতি প্রেম-ভালোবাসায় সে থেকেছে একনিষ্ঠ। মুমূর্ষু স্বামী গয়াকে উদ্দেশ্য করে সে বলেছে :
পঙ্খী যে কইতা তুমি সেই পঙ্খী নাম,
সোহাগের সেই নাম –
যদি আইজ কানে শুনলাম – বুঝলাম
তুমি ভোলো নাই বাইদ্যা, আমি ভুলি নাই । […]
মোড়ল আমার কিছু করতে পারে নাই।
আইজও সে চম্পাই আছে – চম্পা মরে নাই। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৭৫ )
আবার, বেদের মেয়ে নাটকে জসীমউদ্দীন নিম্নবিত্ত সমাজের সামাজিক আচরণসূত্র মেনে চম্পাবতী আর আসমানির সতীন-সুলভ বিবাদ দেখিয়েছেন। সেখানে চম্পাবতী স্বামীর অধিকার নিয়ৌ চতুরা আসমানির কাছে বারবার পরাস্ত হয়েছে। তাদের সে সম্পর্কের মধ্যে শত্রুতা ছিল; সম্মান ছিল না। কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক দেখিয়েছেন, দ্বিতীয় স্ত্রী আসমানি গয়া বেদের সংসারে থিতু হবার চেষ্টা করলেও, সে ভালো করেই জানতো স্বামী গয়া মুখে স্বীকার না করলেও তার মন পড়ে আছে প্রথমা স্ত্রী চম্পাবতীর কাছে।

ফলত, লোকমুখে চম্পার আত্মত্যাগের গল্প শুনে চম্পাবতীর প্রতি আসমানিরও শ্রদ্ধা, ভক্তি ছিল। যে কারণে পয়ার অন্তিম মুহূর্তে প্রথমা স্ত্রী চম্পাকে স্মরণ করা এবং গয়াকে বাঁচাতে চম্পার ছুটে আসা তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি। বরং চম্পাকে এ-পর্যায়ে সে বোন ডেকে অনুরোধ করেছে – যেন তার সিঁথির সিদুর রক্ষা পায়।
চম্পা ও আসমানির মধ্যে এই সৌহার্দ্য, প্রীতি, আসমানির চম্পার প্রতি শ্রদ্ধা, চম্পাবতীর মাহাত্ম্য বাড়িয়ে তাকে যথার্থই কাব্যনাটকের নায়িকা করে তুলেছে। ফলে, চম্পা যখন সর্বপ্রকার মন্ত্রপ্রয়োগে গয়াকে বাঁচাতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখনই নিরুপায় হয়ে বিষ শুষে নিয়ে গয়াকে বাঁচিয়েছে, এবং নিজে সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।। তার এই মৃত্যু নিঃসন্দেহে গৌরবের।
নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক গয়া ও চম্পাবতী ছাড়াও মোড়লের স্ত্রী মালেকা চরিত্রটিতে অধিক রূপান্তর ঘটিয়েছেন। জসীমউদ্দীনের বেদের মেয়ের মালেকা সৈয়দ শামসুল হকের চম্পাবতী নাটকের মালেকার তুলনায় চিন্তা-চেতনায় পুরোপুরি আলাদা।
এক্ষেত্রে অবশ্য বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হবে যে, জসীমউদ্দীন তাঁর নাটকের মালেকা চরিত্রটি নির্মাণ করেছেন বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে বাংলার গ্রামীণ মুসলিম সমাজের প্রেক্ষাপটে। আর সৈয়দ শামসুল হক তাঁর নাটকের মালেকা চরিত্রটি নির্মাণ করেছেন একুশ শতকের প্রথম দশকের সময় ও সমাজের প্রেক্ষাপটে। ফলে জসীম উদ্দীনের মালেকার তুলনায় সৈয়দ শামসুল হকের মালেকার ভাবনা-চিন্তাগত ব্যবধান অত্যন্ত স্বাভাবিক।
বেদের মেয়ের মালেকা অত্যন্ত পতিব্রতা, সংসারী এবং কর্মনিপুণ নারী। স্বামী ও সংসারের যত্ন ও কল্যাণভাবনাতেই অতিবহিত হয় তার জীবন। নিজের প্রতি সামান্য খেয়াল রাখার প্রয়োজনও সে মনে করে না। এমনকি তার সামাজিক মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনে দাসিরা যখন তাকে একটু সংসারের কাজ থেকে বিশ্রাম নিয়ে বেশভূষা করতে অনুরোধ জানায় তখন সে গর্বভরে বলে :
বড়লোক কী? আমার থইনে কোন মোড়লের বউ বড়লোকী করবার পারছে ক’ত দেহি ? ঢেঁকির চুরুণের মাথায় সোনার আংটি লাগাইছি। সুন্দরী কাষ্ঠের ঢেঁকি বানাইছি। রান্দনের চৌকোর ঝিকে রূপা লাগাইছি। (বেদের মেয়ে : ১৭)
অর্থাৎ তার কাছে নিজের শারীরিক সাজসজ্জা নয়, বরং সংসারে সমৃদ্ধি, জৌলুশই বেশভূষা হিসেবে বিবেচিত। সে গ্রামীণ সামাজিক প্রথা অনুসারে জেনে এসেছে – সংসারের পুরুষকর্তা ইশ্বরসম পূজিত; তার যেকোনো স্বেচ্ছাচার নারীকর্তৃক অবনতমস্তকে গ্রহণযোগ্য। ফলত, স্বামীর লাম্পট্যে সে স্বামীকে অপরাধী না ভেবে নিজেকেই অপরাধী ভেবেছে। এমনকি বেদেনারীর প্রেমে মজে মোড়ল যখন তাকে ত্যাগ করেছে, তখন তার দাসিরা লম্পট মোড়লের সামান্য নিন্দা করলেও সে মেনে নিতে পারেনি। বরং বলেছে :
দেখ টুনার মা, তোর ত সাহসড়া কম না যে তুই আমার সোয়ামীর নিন্দা করতি লাগছস্ […] তুই আমারে একটু বাতায়া দিবি, কেমন কইর্যা আমার স্বামীডারে বশ করবার পারি। তা না, তোরা আমার স্বামীর নিন্দা করবার লাগলি। (বেদের মেয়ে : ৩৪-৩৬)
কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক তাঁর কাব্যনাটক চম্পাবতীতে মোড়ল গিন্নি মালেকার যে ছবি এঁকেছেন সে নারী সংসারকর্মে যেমন নিপুণা, তেমনি আত্মসচেতন। স্বামীর অন্যায় সে দৈবনির্ধারিত ভেবে নীরবে মেনে নেয়নি বরং স্বামীর লাম্পট্যকে সাধ্যমতো প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে।
যে কারণে দেখা গেছে তৃতীয় দৃশ্যে মোড়ল যখন ঢেঁকিতে ধানভানারত দাসিদের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়েছে, তখন সচেতন মালেকা সেটি লক্ষ করে ঢেঁকি থেকে দাসিদের নামিয়ে নিজেই ধানভানা শুরু করেছে। কিন্তু গ্রামীণ নারী যেহেতু আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী নয়, সেহেতু পুরুষের ক্ষমতা আর দম্ভের কাছে তাকে হার মানতে হয়েছে।
স্বামীর কটুবাক্য, পরনারী আসক্তি দেখে চোখের জল ফেলেছে, কিন্তু প্রতিবাদ করেছে সাধ্যমতো; জসীমউদদীনের মালেকার মধ্যে যা ছিল না। সৈয়দ শামসুল হকের চম্পাবতী কাব্যনাট্য থেকে মালেকা ও মোড়লের মধ্যকার প্রাসঙ্গিক সংলাপ উল্লেখ করা যেতে পারে :
মোড়ল ।
বয়স গেছে তোর সাথে আর আমার দরকার কী ?
মোড়ল বউ ।
নজর বুঝি দিছেন তাই জুয়ান বান্দী ঝি ?
মোড়ল ।
চোপ, হারামজাদী।
স্বামীর সুখে বাধা দেয় যে বউ সে দোজখে যায়।
মোড়ল বউ ।
আর, আকাম কুকাম কইরাও বুঝি স্বামী বেহেস্ত যায় ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৪৮)
তবে চম্পাবতী নাটকেও একজন নারীর স্বভাবধর্ম মেনে মোড়ল বউ উপযুক্ত সাজসজ্জা করে তার স্বামীকে ভোলাতে চেষ্টা করেছে। দাসিদের কথায় প্রভাবিত হয়ে নিজে নানান বাহারি শাড়ি পরেছে। কিন্তু এরপরেও সে স্বামীর অন্যায় আন্সার কিছুতেই মেনে নেয়নি। মোড়ল যখন তাকে অনুরোধ করেছে – বেদেনারী চম্পাকে সাজিয়ে গুছিয়ে বশে এনে তার বিছানায় পাঠাতে, তখন মোড়ল বউ এই অন্যায় আব্দার স্বামী-আদেশ ভেবে নীরবে মেনে নেয়নি। বরং চম্পার প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করে স্বামীর প্রতি ক্রোধে ফেটে পড়েছে। বলেছে :
আমি শুনছি, তুমি কোন্ অত্যাচার কইরা
অবলা যুবতী নারী আইনাছো ধইরা ।
বাইদ্যানির দোষ তো দেখি না! বুঝি – সেও এক নারী !
মোড়ল, তোমার কিন্তু নাই ছাড়াছাড়ি ! (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৬১)
বেদের মেয়ের মালেকা একেবারেই গ্রামীণ বধূ, সরলা নারী। গৃহকর্ম, পতিসেবা নিয়েই যার দিন অতিবাহিত হয়। লম্পট স্বামীর আচরণের প্রতিবাদ তো দূরের কথা, সে মোড়লের কল্যাণ কামনায়, বেদের জাদুমন্ত্রের ভয়ে ফকির ডেকে তাবিজ কবজ করায়। আত্মোন্নতি ও মর্যাদাবোধের ছিটেফোঁটাও তার মধ্যে নেই। ফলে দাসিদের সঙ্গে শহুরে নারীদের নিয়ে নিন্দামন্দ করতেও তার অপার আনন্দ হয়। তবে নাটকের শেষ দিকে যখন মোড়ল সামান্য কারণে চম্পাবতীর গায়ে হাত তুলেছে, তাকে প্রহারের পর প্রহার করতে উদ্যত হয়েছে, তখন সরলা মালেকা তার প্রতিবাদ করেছে।
এ প্রতিবাদের পেছনে ছিল কেবল মালেকার মানবিকবোধ। একজন অসহায় নারীর ওপর মোড়ল যে অন্যায় করছে, তা সে মেনে নিতে পারেনি। তবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দম্ভ সে ভালো করেই জানে। ফলে তার প্রতিবাদের ভাষা অতটা উচ্চকিত ছিল না। বরং সে প্রতিবাদের ভাষায় নিজের অসহায়ত্ব, অপরাধবোধ ও মোড়লের প্রতি কিছুটা আনুগত্যও মিশে ছিল। কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক তাঁর কাব্যনাটকে মোড়লবউ চরিত্রটি একেবারেই অন্যরকম ব্যক্তিত্বময়ী করে তুলেছেন।
এখানে মোড়লগিন্নির আচার, বিচার, সংলাপে একটি অহমবোধ, আত্মবিশ্বাস সবসময়ই পরিলক্ষিত হয়েছে। মোড়লের লাম্পট্য তাকে ব্যথিত করেছে বটে কিন্তু সে কখনোই হাল ছেড়ে দেয়নি কিংবা নিজের দায়িত্ব, কর্তব্য ও নিত্যকর্ম থেকে বিচ্যুত হয়নি। মোড়লের পরনারী আসক্তিতে নিজেকে অপরাধী ভাবেনি, বরং মোড়লের কুস্বভাবকে তিরস্কার করেছে।
চম্পাবতী কাব্যনাট্যে যখন মোড়ল চম্পাকে প্রহার করেছে, তখনই মোড়লগিন্নি প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে। এখানে একদিকে যেমন তার মনুষ্যত্ববোধের প্রমাণ মিলেছে, তেমনি প্রকাশ পেয়েছে নারী হয়ে নারীর প্রতি মমতা, শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি। মোড়লের প্রতি তীব্র ক্রোধে সে বলেছে :
নারীর গায়ে হাত তুইলাছো, টান দিছো তার কেশ?
বনের পঙ্খী ধইরা আইনা বন্দী করছো খাঁচায়?
লাথি মারি এমন স্বামীর মাজায় !
ছাইড়া দিলাম পঙ্খী। — উইড়া যাবে বইন। […]
তারপরে এই কাঁঠাল আমি পাকামু কিলাইয়া। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৬৯)
অর্থাৎ সৈয়দ শামসুল হক বেদের মেয়ের মালেকা চরিত্রটির মূলভাব ঠিক রেখে পরিমার্জন, পরিবর্ধন করে আধুনিক নারী হিসেবে তাঁর নাটকে উপস্থাপন করেছেন। তবে আলোচ্য নাটকে অপর চরিত্রগুলি যেমন মোড়ল, মাইনক্যা, আসমানি বা দলগতচরিত্রগুলি নির্মাণে তিনি জসীমউদ্দীনের মূল রচনাকেই অনুসরণ করেছেন। ফলে নাটকে এ চরিত্রগুলি হয়ে উঠেছে গতানুগতিক।
জসীমউদ্দীন বেদের মেয়ে নামক লোকনাটক রচনা করে প্রত্যাশা করেছিলেন – এটি গ্রামীণ যাত্রাপালার মতোই দিকে দিকে অভিনীত হোক, এবং এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ুক। ফলে তাঁর নাটকের মঞ্চনির্দেশ ও কলাকৌশলে, গীতের আধিক্য রয়েছে। অপরদিকে সৈয়দ শামসুল হক বেদের মেয়ে লোকনাটকটিকে সম্পূর্ণ আধুনিক কাব্যনাটকের মর্যাদা দিতে চেয়েছেন । নৃত্যশিল্পী লুবনা মরিয়ম যে বেদের মেয়েকে নৃত্যনাট্যে রূপান্তরের বিশেষ অনুরোধ তাঁকে করেছিলেন, তা স্মরণে রেখে চম্পাবর্তীতে আধুনিক কাব্যনাটকের কলাকৌশল ও নৃত্যনাট্যের বৈশিষ্ট্য সংযোজন করেছেন তিনি।
নাটকটি রচিত হবার পর সর্বপ্রথম এটিকে ঢাকার মঞ্চে নিয়ে আসেন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী লুবনা মরিয়মের সংগঠন ‘সাধনা’। ২০১৩ সালের ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে এ নাটকটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়। এর নাট্য নির্দেশনা দিয়েছিলেন শামিম হাসান।
নৃত্য নির্দেশনায় ছিলেন সাব্বির আহমেদ খান। অপরদিকে সংগীত পরিচালনায় ছিলেন জাহিদুল কবির লিটন এবং সংগীতায়োজনে থেকেছেন দূর্বাদল চট্টোপাধ্যায় ও নির্ঝর চৌধুরী। বলাবাহুল্য ‘সাধনা’ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আলোচ্য নাটকটি মঞ্চে আনতে সক্ষম হয়েছিল। ফলত, সে সময়ে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় এটি নিয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়। যেমন দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলো নিম্নরূপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে :
বেদে সম্প্রদায়ের জীবনের নানা টানপোড়েনকে উপজীব্য করে আবর্তিত হয়েছে নৃত্য-নাট্য চম্পাবতীর কাহিনি। উঠে আসে তাদের জীবনাচারণ, পেশা ও জীবনদর্শন। জীবনের তাগিদে নদীর এক তীর থেকে অন্য নদীর তীরে প্রতিনিয়ত নোঙর করে বেদে সম্প্রদায়। নদীর পানির মতোই যেন ভেসে বেড়ায় তাদের জীবন প্রবাহ।
বেদে সম্প্রদায়ের কাহিনি নিয়ে পল্লীকবি জসীমউদ্দীন লিখেছিলেন নাটক বেদের মেয়ে। এই নাটকটি অবলম্বনে চম্পাবতী নামে নৃত্যনাট্য লিখেছেন সৈয়দ শামসুল হক। গতকাল সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর পরীক্ষণ থিয়েটার মিলনাতয়নে নৃত্যনাট্যটি পরিবেশন করে সাধনা। নৃত্যনাট্যটিতে দেখা যায়, জীবিকার তাগিদে এক বেদে দল নাচ ও সাপের খেলা দেখাতে এসেছে কোনো এক গ্রামে। ঘটনাক্রমে বেদে দলের নেতা গয়ার স্ত্রী চম্পাবতীর ওপর কুদৃষ্টি পড়ে ওই গ্রামের মোড়লের। মোড়লের মন্দ প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয় চম্পাবতী। বেদেদের ওপর চলতে থাকে নির্যাতন। এগিয়ে যায় ঘটনাপ্রবাহ। প্রযোজনাটির নৃত্য পরিচালনা করেছেন সাব্বির আহমদ খান। নাট্যপরিচালনায় ছিলেন শামীম হাসান। সার্বিক শৈল্পিক নির্দেশনা দিয়েছেন লুবনা মারিয়াম।
এছাড়াও একটি অনলাইন সংস্করণে এ নাটকটির মঞ্চ অভিজ্ঞতা নিয়ে নিম্নরূপ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় :
কবি জসিমউদ্দীনের লেখা জনপ্রিয় তিন চরিত্রকে নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক লিখেছেন নাটক চম্পাবতী । নাটকটি মঞ্চে পরিবেশনার জন্য প্রযোজনা করছে দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র ‘সাধনা’। নাটকটির উদ্বোধনী মঞ্চায়ন হতে যাচ্ছে শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে শুক্রবার, ২৫ অক্টোবর। নারী প্রধান নাটকটি বেদেকন্যা চম্পা, নির্যাতিত গৃহবধূ মালেকা ও কিশোরী আসমানিকে নিয়ে সাজানো হয়েছে। এর নাট্য নির্দেশনা দিয়েছেন শামিম হাসান। নৃত্য নির্দেশনায় সাব্বির আহমেদ খান, সংগীত পরিচালনায় জাহিদুল কবির লিটন এবং সংগীতায়োজনে দূর্বাদল চট্টোপাধ্যায় ও নির্ঝর চৌধুরী। জীবনের দুর্দশার সঙ্গে লড়াই করার শক্তি এবং সাহসের গল্প চম্পাবতী। গল্পের মাধ্যমে আরও তুলে ধরা হয়েছে বাংলার গ্রামীণ জীবন ও নারীর প্রতি বঞ্চনার কথা।

দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র ‘সাধনা’ ছাড়াও এ নাটকটি পরবর্তীকালে মঞ্চে এনেছে ‘শব্দ নাট্যচর্চা কেন্দ্র’; যার নির্দেশনা দিয়েছেন খোরশেদুল আলম। ২১ নভেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার আই ডি এল সি নাট্যউৎসব ২০১৯- এ এটি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালার মূল হলে প্রদর্শিত হয়। পরবর্তীকালে তারা চট্টগ্রামেও এ নাটকটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে। এ সম্পর্কে দৈনিক পত্রিকায় এক প্রতিবেদনে বলা হয় :
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের নাট্যগ্রন্থ বেদের মেয়ে অবলম্বনে সব্যসাচী কথাসাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক রচিত নাটক চম্পাবতী মঞ্চে এনছে থিয়েটার দল শব্দ নাট্যচর্চা কেন্দ্র। এরই মধ্যে নাটকটি দর্শক-সমালোচকদের মূল্যায়নে প্রশংসিত হয়েছে। বেদে সমাজের জীবনকাহিনি নির্ভর এ নৃত্যনাট্যটি নির্দেশনা দিয়েছেন দলপ্রধান খোরশেদুল আলম। নিয়মিত প্রদর্শনীর ধারাবাহিকতায় সাড়া জাগানো এ নাটকটি এবার আলো জ্বালাবে চট্টগ্রামের মঞ্চে। […] আগামী ১২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হবে আলোচিত এ নাটকটি।
[…] নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন মাহিন, মোস্তাক, চন্দনা, আলী নূর, হৃদি, নাছরিন, আনোয়ার, নাদিয়া, লিন্ডা, তাহা, শুভ, আলিফ, রুশনী, নাইসা, জামান প্রমুখ। চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে প্রদর্শনীর মধ্যদিয়ে মঞ্চে যাত্রা করে নাটকটি। আইরিন পারভীর লোপার পোশাক পরিকল্পনায় চম্পাবতী নাটকের আলোক নির্দেশনা দিয়েছেন ঠান্ডু রায়হান। সামিউন নাহার দোলার কোরিওগ্রাফিতে নাটকের আবহ সংগীতসহ সবগুলো গানের সুর সম্পাদনা করেছেন শিশির রহমান। ‘
আলোচ্য কাব্যনাট্যের ভাষাগত সৌন্দর্য বিশেষভাবে উল্লেখ্য। তদুপরি ‘চম্পাবতী কাব্যনাট্যে কিছু গান সংযোজন করেছেন তিনি যা আমাদের আঞ্চলিক টানকেও অতিক্রম করে অন্য অঞ্চলে প্রেরণযোগ্য।” কবি জসীমউদ্দীনের বেদের মেয়ের সঙ্গে সৈয়দ শামসুল হকের চম্পাবতীর ভাষাগত পার্থক্য হলো – – জসীমউদ্দীন নাটকের গানগুলো ছাড়া সমস্ত সংলাপ গদ্যভাষায় রচনা করেছেন। কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক তাঁর রচিত নাটক চম্পাবতীকে আধুনিক কাব্যনাটকের বৈশিষ্ট্য দিতে সংলাপগুলোর মধ্যেও অসাধারণ কাব্যিক দ্যোতনা, অন্ত্যানুপ্রাস, মধ্যানুপ্রাস আদ্যানুপ্রাসের সার্থক ব্যাবহার করেছেন।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায় বেদের মেয়ে নাটকে বেদের বহর যখন গ্রামে এসে উপস্থিত হয় তখন তাদের প্রদর্শিত সাপখেলা দেখতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা উতলা হয়ে ওঠে এবং প্রত্যেকেই বেদেদের নিজেদের আঙিনায় নিতে চায় সাপখেলা দেখার জন্য। এসময়ের সংলাপ উল্লেখ্য :
প্রথম ॥ ও বাইদানি ! আমাগো বাড়ি আইস, আমাগো বাড়ি আইস।
দ্বিতীয় ॥ আরে’ আমাগো বাড়ি চল বাইদানি !
তৃতীয় ॥ আরে বাইদানি, আমাগো বাড়ি চল। (বেদের মেয়ে : ৩)
একই মুহূর্তের সংলাপ সৈয়দ শামসুল হক তাঁর চম্পাবতী নাটকে কাব্যভাষায় রচনা করেছেন নিম্নোক্তভাবে :
কিশোরী ১। বাইদানি গো বাইদানি,
আমাগো বাড়ি যাইবানি ?
কিশোরী ২ । না, না, আমাগো বাড়ি,
বাইদানি গো, তাড়াতাড়ি।
কিশোরী ৩।
আমাগো বাড়ি, বাইদানি ।
অনেক টাকা দেবানি। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৪৩)
আবার, সৈয়দ শামসুল হক জসীমউদ্দীনের মূল বেদের মেয়ে নাটক থেকে কখনো কখনো হুবহু গানের কথা গ্রহণ করেছেন। যেমন : বেদের মেয়ে নাটকের গয়ার মুখের একটি গানের কথা হলো :
চম্পাবতী মোদের নারী চাঁপাই বলে ডাকে,
হেলতে দুলতে চলতে পথে বিজলী যেন মাখে।
চেকন- ঢোকন গঠনখানি লম্বা মাথার ক্যাশ,
রাঙা মুখের হাসি দিয়া পাগল করল দ্যাশ রে
পাগল করল দ্যাশ। (বেদের মেয়ে : ২)
সৈয়দ শামসুল হক এ গানটির কথা তাঁর চম্পাবতী নাটকে হুবহু গ্রহণ করেছেন নাটকের প্রারম্ভে, পুরুষ বেদে নামক চরিত্রের সংলাপে। আবার অন্যত্র দেখা গেছে, সৈয়দ হক জসীমউদ্দীনের সংলাপ বা গীত আংশিক পরিবর্তন করে নিজের পছন্দমতো শব্দালংকার যুক্ত করে নাটকের চরিত্রের মুখে দিয়েছেন। যেমন : বেদের মেয়ে নাটকের প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে গয়া বেদের একটি সংলাপ রয়েছে এমন :
গয়া বেদে।
দুই হাতে তার কালো অজগর ফোঁস ফোঁসায়ে চায়,
গলার সাথে কাল কেউটে দুলছে শাড়ীর বায় ।
মাজা ঘুরি জড়িয়ে আছে হলুদ বরণ সাপ,
সোনা মুখের রূপ দেখে তার ভুলছে বিষের তাপ
কে দেখবে সাপের সাপের ফণার পরে,
নাচবে নারী চম্পাবতী বেদের বাঁশীর স্বরে।
নাচবে সাথে কাল-কেউটে, নাচবে সূতানলী,
মামা-ভাগ্নে সাপ দুইটি নাচবে গলাগলি ।
বন্ধরাজ আজ আসবে নেচে, নাচবে যে দুধরাজ,
মেঘনালী মেঘের মত আসবে করি সাজ।
মহাদেবের আসন ছেড়ে আসবে আলি কালি।
কালিয়া নাগ আসবে তাহার কালিয়া বিষ ঢালি। (বেদের মেয়ে : ৩)
সৈয়দ শামসুল হক এই সংলাপটি তাঁর চম্পাবতী কাব্য নাটকে সমবেত বেদে মেয়েদের মুখের গীত হিসেবে ব্যবহার করেছেন, এবং জসীমউদ্দীনের মূল সংলাপ থেকে আংশিক গ্রহণ করেছেন। কখনো প্রয়োজনীয় শব্দ পাল্টেছেন, আবার কখনো নতুন বাক্য সংযোজন করেছেন সংলাপের মূলভাব ঠিক রেখেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় :
মেয়েরা।
কে দেখবে সাপের খেলা, সাপের ফণার পরে
নাচবে নারী চম্পাবতী বেদের বাশীর স্বরে।
আয় রে আয়।
নাচবে সাথে কালকেউটে নাচবে সুতানলী।
নারী পুরুষ সাপ দুইটি নাচবে গলাগলি ।
আয় রে আয়।
বন্ধরাজ আসবে নেচে, নাচবে রে দুধরাজ,
মেঘনালী সে মেঘের মতো আসবে করি সাজ।
আয় রে আয়।
নীলকন্ঠের জটায় আছে সৰ্প আলি কালি,
রূপের পাগল নষ্ট বুকে দিবে রে বিষ ঢালি।
আয় আয় আয় রে আয়। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৪২ )
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, জসীমউদ্দীনের মূল সংলাপ থেকে প্রথম চারটি লাইন বাদ দিয়ে সৈয়দ শামসুল হক সংলাপ শুরু করেছেন। এবং তিনি সংলাপে ধুয়োর মতো একটি বাক্য সংযোজন করেছেন ‘আয় রে আয়। সৈয়দ শামসুল হক নিজেও একজন বড় মাপের কবি ও গীতিকার। বাংলা অনেকগুলো জনপ্রিয় আধুনিক গানের স্রষ্টা তিনি। বস্তুত সৈয়দ শামসুল হকের সেই অসাধারণ সুর, লয় ও তালবোধ তিনি এখানে কাজে লাগিয়েছেন। যেহেতু তিনি সমবেত মেয়েদের মুখে গান হিসেবে এটি ব্যবহার করেছেন, তাই কোরাস সংগীতের তাল, সুর বজায় রেখে ধুয়োর মতো পঙক্তি ‘আয় রে আয়’ সংযোজন করেছেন।
আবার জসীমউদ্দীন যেখানে ব্যবহার করেছেন ‘মামা-ভাগ্নে সাপ’, সেখানে সৈয়দ শামসুল হকের আধুনিক মনন যুক্ত করেছে ‘নারী পুরুষ সাপ’। অন্যদিকে, শিবের উদাহরণ দিতে গিয়ে জসীমউদ্দীন সরাসরি মহাদেবের নাম নিয়েছেন। সৈয়দ শামসুল হক রূপকী অর্থে ব্যবহার করেছেন ‘নীলকন্ঠের জটা’। অর্থাৎ সৈয়দ শামসুল হক অগ্রজ কবি জসীমউদ্দীনের গ্রামীণ নাটকটিকে আধুনিক কাব্যনাটকের মর্যাদা দিতে যথেষ্ঠ পরিমার্জন, পরিশোধনে সচেষ্ট থেকেছেন।

এছাড়াও চম্পাবতী কাব্যনাট্যে প্রতিফলিত সৈয়দ শামসুল হকের অসাধারণ ভাষাবোধের পরিচয় পাওয়া যায়
তাঁর নির্মিত কিছু উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক অলঙ্কারে :
উপমা :
১. সাজিয়া পরিয়া কন্যা বসলো বড় ঠাটে।
পুন্নিমার রাইতে যেমন চন্দ্র বসলো পাটে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৬০ )
২. ধৈর্য ধরো গো কন্যা, ধৈরয তো ধরো ।
সত্য যে ছুরির মতো – সত্য খরতর। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৬৩)
৩. গয়া বাইদ্যার কথা যেমন মধুর মাছির ঝাঁক।
দলে দলে আইসা বুকে হুল ফুটায়া যাক। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৬৪)
উৎপ্রেক্ষা :
১. চম্পাবতী মোদের নারী চাঁপাই বলে ডাকে।
হেলতে দুলতে চলতে পথে বিজলি যেন মাখে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৪১)
২. সোনার বরণী কন্যা সাজে নানা রঙ্গে-
কালো মেঘ যেন সাজিল রে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৬০ )
রূপক/প্রতীক :
১. বনের পঙ্খী ধইরা আইনা বন্দী করছো খাঁচায়? লাথি মারি এমন স্বামীর মাজায় ! (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৬৯)
২. দুঃখের সায়রে আমি ভাসাইছি যে নাও। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৬৬)
৩. অভাগীরে ধইরা খাইছে কালীদহের সাপেরে। (কাব্যনাট্যসমগ্র ৪৫৬ )
৪. নারীর রূপ যে বিজলি ঠাঠা, যাইবা ছারেখারে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৪২ )
৫. আমার বিলাস হইছে তোমার এই নাওখান রাখি।
বড়ই চঞ্চল হইছে অন্তরের পাখি। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৫৩)
৬. পায়ের নুপুর হইলো সর্প সুতানল। ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৫৫)
অতিশয়োক্তি
১. যখন নাকি ঢেঁকির থনে পা তুইলা নিলো,
মনের দুঃখে ঢেঁকি তখন পাতালে পসিলো। (কাব্যনাট্যনমগ্র : ৪৪৭ )
২. তারপরে পরিলো শাড়ি নামে হাসাসি,
কাড়ির মধ্যে নাইচা বেড়ায় চন্দ্রসূর্য আসি । […]
তারপর পরিলো শাড়ি কৃষ্ণ নীলাম্বরী,
তারাগুলি ঝিলমিল করে শাড়ির আঁচল ধরি। […]
সেই শাড়িখান বিবির মনের মতো হইলো,
অঙ্গের বিজলি আভা শাড়িতে জড়াইলো।
শাড়ির মধ্যে লেখা আছে হাঁস জোড়া জোড়া,
শাড়ির সাগরে তারা করে ঘোরাফেরা।
সাজিয়া পরিয়া কন্যা মুখে দিলো পান,
আকাশের চন্দ্রসূর্য দেইখা লজ্জা পান। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৬০ )
সমাসোক্তি :
১. পুরুষ আছো পুরুষ থাকো দৃষ্টি দিও না রে। নারীর কেশ যে সর্প হইয়া দংশিবে তোমারে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৪২ )
২. রাঙা বউ ঢেঁকি পারায় আলতা পরা পায়,
সোহাগে কাঠের ঢেঁকি নাইচা না কুল পায় । […]
নানীবিবি যখন আইসা ঢেঁকির উপর চড়ে,
হাসতে হাসতে ঢেঁকি তখন নোটে আছড়ে পড়ে। […]
মেঝো বউ বারা বানে গুনগুনায়ে গায়,
কাতলা দুটার পাখা মেলে ঢেঁকি উড়ে যায়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৪৭ )
বাগধারা প্রবাদ / প্রবাদপ্রতিম বাক্য :
১. পিদিম নিভিলে আর জ্বলে না রে, মা।
সত্য যে কঠিন হয়, সত্যে নাই ক্ষমা। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৬৭)
২. বাঘ ছাগলে এক ঘাটে খায় এনার দাপটেই। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৫০)
৩. ইজ্জত অমূল্য মণি সাপের মাথায়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৫৩)
পুরাণ / লোকপুরাণ
১. কেবল বিচার নাই যুবতীতে মজে যদি মন।
রামের যে সীতা, সেই সীতারেও কইরাছিলো রাবণ হরণ ! (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৫৪ )
২. চান্দের বেটা লখাইরে বেনে মারলো মোরে লাখি রে।
জাগো জাগো বেউলা রে রাণী, আজিঙ্খ মেইলা চাও,
বিয়ার রাইতে সিস্তার সিন্দুর মুছিয়া ফেলাও রে। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৭১ )
৩. কাইন্দো না কাইন্দো না তুমি নিদারুণ তাপে।
অভাগীরে ধইরা খাইছে কালীদহের সাপেরে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৫৬)
অতএব বলা যায়, বিষয়বস্তুর সাযুজ্য থাকা সত্ত্বেও, প্লট গঠনের চমৎকারিত্বে, চরিত্রের নব বিন্যাসে, শিল্পিত ভাষা-মাধুর্যে সৈয়দ হকের চম্পাবতী জসীমউদ্দীনের বেদের মেয়ের তুলনায় স্বতন্ত্র ও নান্দনিক হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে।