গণনায়ক কাব্যনাটক

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ গণনায়ক কাব্যনাটক । যা সৈয়দ শামসুল হকের রাজনীতি আশ্রিত কাব্যনাটক এর অন্তর্গত।

 

গণনায়ক কাব্যনাটক

 

গণনায়ক কাব্যনাটক

সৈয়দ শামসুল হক বিশ্বাস করতেন “ঈশ্বরের পরেই সর্বাধিক স্মরণীয় মানুষ সৃষ্টি করেছেন নাট্যকার শেকসপীয়র।” শেকপিয়র (১৫৬৪-১৬১৬) সৃষ্ট জুলিয়াস সিজার (১৫৯৯) নাটকের সেই মানুষকে নবরূপে সৃষ্টি করেছেন তিনি তাঁর গণনায়ক (১৯৭৬) নাটকে। এ কারণে এ নাটকটিকে তিনি সরাসরি অনুবাদ নাটক বলতে নারাজ, এমনকি রূপান্তরিত নাটকও নয়। তাঁর ভাষায় এ নাটকটি একটি রাজনৈতিক পরীক্ষামূলক নাটক; যে রাজনীতি আদি ও মৌল; এবং যা বিশ্বের নানাপ্রান্তে নানাদেশে নানাযুগে বহুবার সংঘটিত হয়েছে।

গণনায়ক নাটকের প্লট পুরোটাই রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের রাজনীতিকে ঘিরে। সৈয়দ হক দেখিয়েছেন – হত্যা যেখানে ব্যক্তিবিশেষের জন্য পাপ, সমষ্টির কল্যাণে গোষ্ঠীবদ্ধ হত্যাকাণ্ড সেখানে বিপ্লবের নামান্তর। নাট্যকারের মতে, দেশ ও জাতির ত্রাণকর্তা যিনি, তিনিও দেশকে ভালবেসে জনগণের জন্য সিদ্ধান্ত নেন, আবার তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে যারা ক্ষমতায় বসার স্বপ্ন দেখে, তারাও জনগণের কাছে দেশপ্রেমের নামেই গুপ্ত হত্যাকে বৈধ করে তোলে।

তবে দেশপ্রেম কি মানুষভেদে পৃথক? এই প্রশ্নে উদ্বেলিত নাট্যসত্তাই নাট্যকারকে গণনায়ক কাব্যনাটক রচনায় প্রভাবিত করেছে। লেখক যাকে বলেছেন পূর্ববর্তী কবির মানসলোকের সঙ্গে একীভূত হয়ে বিষয়গুলো নতুন করে ভাবা। গণনায়ক নাটক লেখার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে নাট্যকার নাটকটির ‘সবিনয় নিবেদন’ অংশে মন্তব্য করেছেন নিম্নরূপ :

পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় কাব্যনাট্যটি লিখে ফেলবার পর গণনায়ক লেখা আমার পক্ষে অনিবার্য হয়ে পড়ে। এই রচনাগুলোতে রাজনৈতিক কিছু অভিজ্ঞতাকে আমি পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছি। […] রাজনীতির লক্ষ্য কি জীবনের লক্ষ্য থেকে ভিন্ন? ন্যায়-অন্যায়বোধ কি ব্যক্তিগত পর্যায়ে একরকম, সমষ্টিগত পর্যায়ে অন্যরকম? এবং সেটাই কি পতনের সূত্র? দেশপ্রেম কি পাত্রভেদে পরস্পরবিরোধী? […] এমন আরো কিছু প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করতে গিয়েই, প্রায় কুড়ি বছর পরে, নতুন করে আবিষ্কার করি উইলিয়াম শেকসপিয়রের ‘জুলিয়াস সীজার’ নাটকটি।

অনুসন্ধিৎসু পাঠক লক্ষ্য করবেন, অনুবাদ আমি করিনি, রূপান্তরিত রচনাও একে বলা যাবে না; আমি বরং বহুপূর্বে গত এক অগ্রজের সঙ্গে বসে সচেতনভাবে নতুন একটি রচনায় হাত দিয়েছি। শেকসপিয়র রচিত কিছু চরিত্র, কিছু দৃশ্য বর্জন করেছি, আবার নতুন কিছু অংশ রচনা করেছি, কিছু চরিত্রে নতুন লক্ষণ ও পরিণতি দিয়েছি; এবং সবই করেছি আমার অভিজ্ঞতা এবং সিদ্ধান্তগুলো স্থাপিত করবার জন্যে। আমার বিশ্বাস বহু দেশে বহু ভাষায় আজ এ পালা রচিত হতে পারত এবং তা এভাবেই। ‘

গণনায়ক নাটকের পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড় ঐক্যে সম্পর্কিত। সৈয়দ হক যখন এ নাটক রচনা শুরু করেন, তখনো এদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইতিহাসের ঘৃণ্যতম ঘটনা পঁচাত্তরের কালরাত নেমে আসেনি; তখনো জাতির জনক এদেশের আলো-হাওয়ায় প্রাণভরে নিশ্বাস নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু, সব চূড়ান্ত ঘটনার একটি আবহুকাল থাকে, থাকে পূর্বসংকেত, পূর্বাভাস।

হয়তো বিদ্যমান অস্থির রাজনৈতিক অবস্থা, থমথমে পরিবেশের কারণে নাট্যকারের সংবেদনশীল হৃদয় তেমন কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছিল। রোমের রাজনৈতিক ইতিহাসের যে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাকে উপজীব্য করে নাটক রচনায় তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন; তাঁর নিজবাসভূমে, নিজ জাতির মধ্যেই ততক্ষণে ঘটে গেছে সেই নির্মমতম ঘটনা। রোমান মহানায়ক জুলিয়াস সিজারকে ঈর্ষাবশত, ক্ষমতার মোহে নির্মমভাবে ছুরিকাঘাতে সিনেটসভা প্রাঙ্গণে হত্যা করে কিছু বিদ্রোহী সিনেটর। ঠিক তেমনিভাবে বঙ্গবন্ধুও কিছু বিপথগামী বিদ্রোহী সেনা ও বিশ্বাসঘাতক রাজনৈতিকের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে সপরিবারে নিজবাসভবনে নির্মম মৃত্যুবরণ করেন।

খ্রিস্টের জন্মের প্রায় অর্ধশত বছর আগে ইতালিতে ঘটে যাওয়া এক করুণ আখ্যান, পুনরায় মঞ্চায়িত হয় খ্রিস্টের জন্মের প্রায় দেড়-দুইহাজার বছর পরে দক্ষিণ এশিয়ার এক ঘনবসতিপূর্ণ ক্ষুদ্র দেশে। এভাবেই ঘটে যায় রাজনৈতিক ইতিহাসের পুনারাবৃত্তি।

নাট্যকার নাটকটি রচনা করেছেন ১৩ জুন ১৯৭৫ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ কালপর্বে । এসময় তিনি বিবিসি বাংলায় চাকুরিসূত্রে লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড শহরে বাস করতেন। উল্লেখ্য যে, তিনি তাঁর প্রথম কাব্যনাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এর রচনাকাল হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন – ১লা মে ১৯৭৫ থেকে ১৩ জুন ১৯৭৫ সাল। অর্থাৎ যেদিন তিনি পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটক লেখা শেষ করেন, ঠিক সেদিনই তিনি গণনায়ক নাটক রচনায় হাত দেন।

এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায় – জুলিয়াস সিজার নাটকের অনুবাদ করার কথা তিনি অনেক আগে থেকেই হয়তো ভেবে রেখেছিলেন। হতে পারে, নাটকের কিছু ঘটনাংশ তাঁর মাথার ভেতর আগে থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু নাটকটি রূপান্তর শুরুর অনতিকাল পরেই এদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনা ঘটে; লেখকের চেতনায় তখন অদ্ভুত এক বোধ কাজ করে । দুই কালের দুই দেশের ঘটনার এমন আশ্চর্য সাযুজ্য লক্ষ্য করে তিনি নাটকটি নতুন করে ঢেলে সাজান।

গণনায়ক নাটকে বঙ্গবন্ধুর ট্রাজিক ইতিহাসের ছায়া প্রসঙ্গে নাট্যগবেষক জিয়া হায়দার নিম্নরূপ মন্তব্য করেছেন :

শেক্সপীয়রের ‘জুলিয়াস সিজার’ নাটকের অনুপ্রেরণায় লিখিত এ নাটকে জুলিয়াস সিজার এবং শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মধ্যে একটা সাদৃশ্য অঙ্কন করা হয়। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এবং কাব্যময়তার সুতায় গাঁথা হয়েছে শেখ মুজিবের করুণ পরিণতি এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দ্বারা প্ররোচিত তার হত্যাকারীদের উদ্দেশ্যাবলী।

বঙ্গবন্ধুর করুণ মৃত্যুর পর তিনি হয়তো কালোপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে শেকসপিয়রের কিছু চরিত্রকে নবরূপে রূপায়িত করেন; কিছু চরিত্রের পরিণতি এদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে অন্যরকম করে নির্ধারণ করেন।

যে কারণে দেখা যায় – নাট্যকার নাটকটির শুরুর দিকে শেকস্পিয়রের মূল নাটকের অনুরূপ ঘটনাপরম্পরা এবং চরিত্রের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য বজায় রাখলেও শেষের দিকের কিছু অংশ নতুন করে বিন্যাস করেছেন। যেমন : শেকপিয়রের মূল নাটকে জুলিয়াস সিজারকে হত্যার পরের ঘটনা খুব সামান্যই বর্ণনা করেছেন নাট্যকার; সেখানে খুব দ্রুততার সঙ্গে প্রতিশোধের ঘটনা, জনগণের বিপ্লব, ব্রুটাস, ক্যাসিয়াসের হত্যা, এন্টনিওর সহায়তায় সিজারের ভ্রাতুষ্পুত্র অক্টাভিয়াসের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার ইতিবৃত্ত উল্লেখিত হয়েছে।

 

গণনায়ক কাব্যনাটক

 

কিন্তু গণনায়ক নাটকে নাট্যকার তাঁর দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন কিছু দৃশ্যের অবতারণা করেছেন। এসব দৃশ্যে ইতিহাস ও বাস্তবতার আলোকে ক্ষমতাদখলের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে দেশের সামরিক বাহিনীর সরাসরি সংযোগের কথা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।

আর এভাবেই নাটকটি অনুবাদের খোলস পরিত্যাগ করে হয়ে উঠেছে এদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের করুণ ইতিহাসের অমোঘ দলিল; মর্যাদা পেয়েছে লেখকের পরিপূর্ণ মৌলিক কাব্যনাটকের। আবার, জুলিয়াস সিজার অনুবাদকালে অনুবাদকের মাথায় যে বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি ছিল, একথা অনুবাদক নিজেই তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন :

প্রকৃতপক্ষে ইতিহাসের বিচারে সীজার-বধ-নাটক বিশ্ব রঙ্গমঞ্চের এক পৌনঃপুনিক ঘটনাবর্তের অংশ মাত্র। […] ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না। […] বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও ক্ষমতায় আসীন থাকা কালে নিহত হন। স্বভাবতই ‘জুলিয়াস সীজার’-এর প্রসঙ্গ আমার স্মরণে এসেছিল এবং সেটাই আমার অনুবাদ-কর্মের প্রেরণা।

শেকস্পিয়র রোমান সাম্রাজ্যের অবিসংবাদিত নেতা জুলিয়াস সিজারের করুণমৃত্যু এবং তৎপরবর্তী রোম সাম্রাজ্যের সংকট ও উত্তরণের ঐতিহাসিক সত্যঘটনাকে অবলম্বন করে রচনা করেছিলেন বিশ্বখ্যাত ট্রাজিক নাটক জুলিয়াস সিজার। আর বিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে পূর্বতন লেখকের অনুভূতিকে নিজ দেশ-কাল- রাজনীতির ছাঁচে ফেলে সৈয়দ শামসুল হক রচনা করেছেন তাঁর সাথর্ক রাজনৈতিক-কাব্যনাটক গণনায়ক।

গল্পের পরিণতির নতুনত্বে, ভাষার আভিজাত্যে, নান্দনিক অলঙ্করণের মাধুর্যে সৈয়দ শামসুল হকের এ নাটকটি কালোত্তীর্ণ মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে; হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের ইতিহাসগ্রন্থ। বলাবাহুল্য, ‘একটি রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন একটি রচনা কাব্যে প্রকাশ করা দুঃসাধ্য মনে হলেও সৈয়দ হক তাঁর লেখনী শক্তি দিয়ে সফলকাম হয়েছেন।

সৈয়দ শামসুল হক তাঁর গণনায়ক নাটকটি রচনার মাধ্যমে অনুবাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করতে চেয়েছেন তা নয়; বরং এর মাধ্যমে সমকালের অস্থির সমাজ ও বিপর্যন্ত রাজনীতির প্রেক্ষাপটে দেশের ক্ষমতার পালাবদলের বাস্তবিক ইতিহাস রচনা করতে চেয়েছেন। এটি সহজেই অনুমিত হয়, যখন দেখা যায়, পঁচাত্তরপূর্ব ও পঁচাত্তরপরবর্তী কালের বেশকিছু সত্য ইতিহাস তিনি শিল্পিত রূপাবয়বে আলোচ্য নাটকে উপস্থাপন করেছেন।

উইলিয়াম শেকসৃপিয়র রচিত নাটকে জুলিয়াস সিজারকে যেমন তাঁর স্ত্রী স্বপ্নসূত্রে প্রাপ্ত আসন্ন বিপদের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন, এমনকি দৈবজ্ঞ চরিত্রটি মার্চের ১৫ তারিখের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাঁকে সতর্ক করতে চেয়েছিল; বাস্তবে বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও তেমনটিই ঘটেছিল।

বঙ্গবন্ধুকেও ১৫ আগস্ট-পূর্ববর্তী সময়ে নানান সূত্র থেকে বারবার সতর্ক করা হচ্ছিল, কিন্তু তিনি এতটাই বিশ্বাস করতেন এদেশের জনগণকে যে, কখনোই মনে করেননি, তাঁরই স্বজাতি, বাঙালিরা তাঁকে হত্যা করতে পারে। বরং তিনি আত্মবিশ্বাসে ভর করে এমন সম্ভাবনা হেসে উড়িয়ে দিতেন। তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব ফখরুদ্দিন আহমেদের এক লেখায় এমনই একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় :

১৫ আগস্টের দুই সপ্তাহ আগে আমি সুইডেনের গণমাধ্যমের কিছু কাটা অংশ (ক্লিপিংস) নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। এতে ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন এবং সেনা কর্মকর্তাদের অভ্যুত্থান পরিকল্পনার বার্তা। এই বার্তার গুরুত্ব খারিজ করে দিয়ে তিনি আমাকে জানান, সেনাপ্রধান সফিউল্লাহকে ফোন করে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বলবেন।`

সৈয়দ শামসুল হক এ বিষয়টিকে উপস্থাপন করেছেন নাটকের প্রথম অঙ্কের দ্বিতীয় দৃশ্যে। এখানে দেখা গেছে বরিশালের সংসদ সদস্য নরেন্দ্রনাথ পঞ্জিকার সূত্রধরে তাঁকে সাবধান করে দিচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ওসমান তাঁকে গুরুত্ব না দিয়ে পাগল বলে হেসে উড়িয়ে দিচ্ছেন। প্রাসঙ্গিক এলাকা উপস্থাপন করা যেতে পারে :

নরেন্দ্র। রাষ্ট্রপতি, মহামান্য রাষ্ট্রপতি। গণনায়ক। […]

গতকাল বাড়ি থেকে বেরুবো, স্টিমারে ওঠার আগে

পঞ্জিকা দেখতে হলো। দেখলাম,

অঘ্রানের কৃষ্ণা দশমী, মাসদগ্ধা, আগামীকাল। […]

সর্বপ্রকার শুভকর্ম নিষিদ্ধ, শাস্ত্রে তাই বলে।

ওসমান। পাগল একটা । চলো যাই। এগিয়ে যাই। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৩৬-২৩৭)

উইলিয়াম শেকস্পিয়র তাঁর নাটকে সিজারহত্যা-পরবর্তী সময়ে এন্টনিও ও অক্টাভিয়াস কর্তৃক বিশ্বাসঘাতক শত্রুদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত যুদ্ধ ঘোষণার চিত্র এঁকেছেন। সৈয়দ শামসুল হক এক্ষেত্রে শেকস্পিয়রকে অনুসরণ করেননি। তিনি গণনায়কে বঙ্গবন্ধুহত্যা-পরবর্তীকালের রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।

এরকম একটি দৃশ্য দেখা যায় রশীদ আলী ও জেনারেল চৌধুরীর তৎপরতাসূত্রে। এখানে প্রাথমিক বিচারে মনে হতে পারে তারা উভয়েই একই দলভূক্ত; উভয়ের উদ্দেশ্যই ওসমানের হত্যাকারীদের বিনাশ করে দেশকে কলঙ্কমুক্ত করা। কিন্তু দেখ েেগছে রশীদ আলী বাস্তবিক অর্থে কাপুরুষ, সুযোগ-সন্ধানী চরিত্রমাত্র; সামরিক শাসকের চোখরাঙানি উপেক্ষা করার সাহস সে রাখে না।

রশীদ আলী যখনই জেনারেল কর্তৃক ওসমানের সদ্যবিধবা স্ত্রীকে নতুন রাষ্ট্রপতি করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে চলে যেতে চায়, তখনই দুজন অস্ত্রসজ্জিত সৈনিক তাকে বাধা দেয়। রশীদ আলীও কলের পুতুলের মতো সে আদেশ মেনে নিশ্চুপ হয়ে যায়। মঞ্চনির্দেশে ফুটে ওঠে জেনারেলের বাঁকা হাসি :

টেলিফোন বেজে ওঠে। জেনারেল অনুচ্চস্বরে কথা বলতে থাকেন পেছন ফিরে। রশীদ দরোজার কাছে যেতেই দু’জন প্রহরী উদিত হয়। রশীদ আবার নিজের আসনে ফিরে যায়। তার দিকে তাকিয়ে জেনারেল একবার অন্যমনস্ক অস্ফুট হাসেন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৯৯)

এই নাটকে রাজনীতিবিদ রশীদ আলী চরিত্রটি উইলিয়াম শেকস্পিয়রের মূল নাটকের এন্টনিও চরিত্র থেকে পৃথক হয়ে তৎকালীন সুযোগ-সন্ধানী রাজনীতিবিদ খন্দকার মোশতাকের ছায়া হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের ইতিহাসে দেখা যায় – ১৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে খন্দকার মোশতাক আইনত রাষ্ট্রপতি হলেও তিনি ছিলেন নখর-দন্তবিহীন ব্যাঘ্রশাবক; ছিলেন মূলত সেনাবাহিনীর হাতের পুতুল।

এ সংক্রান্ত বাস্তবচিত্র উপস্থাপিত হয়েছে তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের এক লেখায়। তিনি পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন :

আমাকে বলা হল বেতারকেন্দ্রে আমার উপস্থিতি জরুরী। প্রস্তুতির জন্য কয়েক মিনিট সময় চাইলাম। মাথার পেছনে বন্দুক তাক করে আমাকে জিপে তোলা হলো, আমি যেনো ভয়ঙ্কর কোনো সন্ত্রাসী। […] বেতারকেন্দ্রের ভেতরে খন্দকার মোশতাককে দেখলাম। বঙ্গবন্ধুর বিশেষ প্রিয়ভাজন তথ্যমন্ত্রী তাহেরউদ্দীন ঠাকুরকে দেখে চরমাশ্চর্য হলাম। তাদের পাশে সদ্য ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তার কয়েকজন সদস্য ছিলেন। তাদের কয়েকজনকে উদ্দেশ্য করে খন্দকার মোশতাক জানতে চাইলেন, আলাদা কক্ষে আমার সঙ্গে কথা বলতে পারেন কি না। তাঁকে ত্বরিত বলা হলো, ওই কক্ষের এক কোণায় কথা বলতে। তাদের ওপর খন্দকার মোশতাকেরও যে কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না, তা স্পষ্ট হলো।’

সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক গণনায়কের একটি দৃশ্যে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি ওসমানকে হত্যা করার পূর্বমুহূর্তে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সানাউল্লাহ নিজে উদ্যোগী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হুমায়ুনসহ অন্যান্য সংসদ সদস্যকে গণনায়ক ওসমান সম্পর্কে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপূর্ণ বিকৃত তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছে। আবার, অন্য আরেকটি দৃশ্যে ওসমানের মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী হুমায়ুন শান্তি-মুক্তি-গণতন্ত্রের নামে সকলকে উজ্জীবিত করেছে। দ্বিধাগ্রস্ত বাকি সাংসদদের ঘৃণ্য এই অপরাধে যুক্ত করে বলেছে :

বন্ধুগণ, সবল রাখো বাহু। এসো, আজ প্রত্যেকে

রঞ্জিত করি বাহু এই কালাপাহাড়ের রক্তে

যাই জনসমুদ্রে, ঊর্ধ্বে তুলি মুষ্টিবদ্ধ বাহু এবং

এক কণ্ঠে ঘোষণা করি, ‘শান্তি, মুক্তি, স্বাধীনতা।’ (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৬৬)

 

গণনায়ক কাব্যনাটক

 

ইতিহাস থেকে জানা যায় একই উপায়ে মুজিব-হত্যার অন্যতম ঘাতক মেজর ফারুক ও মেজর রশীদ তাদের অধীন সেনাদের বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে অসত্য তথ্য দিয়ে, ভুল বুঝিয়ে হত্যায় অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এ বিষয়ে ফখরুদ্দিন আহমদ তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন নিম্নরূপে :

ফারুক ও রশীদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন সেনারাই অভ্যুত্থানে অংশ নেয়, তবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের কিছুই জানানো হয়নি। বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণ করার জন্য দলে দলে ভাগ করে ছড়িয়ে দেওয়ার আগে ফারুক সেনাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতায় বলেন, শেখ মুজিবের সরকার ভারতের সঙ্গে মিলে দেশকে হিন্দু কর্তৃত্বাধীন করবে, তাই বাংলাদেশে ইসলামকে রক্ষা করতে হবে। এখন যদি তারা আক্রমণ না করে তবে বাংলাদেশ হিন্দুদের দ্বারা শাসিত হবে।

গণনায়ক নাটকে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি ওসমানকে হত্যার পূর্বে তার বাড়িতে মন্ত্রণালয়ের সদস্যরা সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। রংপুরের প্রধানমন্ত্রী হুমায়ুন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মীর্জা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সানাউল্লাহ, সাংসদ দাউদসহ অনেকেই সেদিন ওসমানের বাড়িতে জমায়েত হয়েছিলেন। মূলত, এটি ছিল রাষ্ট্রপতি ওসমানের অবস্থান ও মনোভাব জানার একটি পরিকল্পিত কৌশল। তারা চেয়েছিলেন কোনোভাবেই যেন ওসমান সংসদে যাবার সিদ্ধান্ত থেকে সরে না যেতে পারেন।প্রাসঙ্গিক এলাকা উল্লেখ করা যেতে পারে :

ওসমান। দাউদ, সংসদে তুমি বলে দিও, রাষ্ট্রপতি আজ আসছেন না । […]

দাউদ।

[…] আপনি কি জানেন, জাতীয় সংসদ

সিদ্ধান্ত নিয়েছে আপনাকে বরণ করা হবে আজ

আজীবন রাষ্ট্রপতি পদে ? প্রায় সমস্তই ঠিক হয়ে আছে।

এখন আপনি যদি বলে পাঠান যে যাবেন না, তাহলে

সদস্যদের বড় একটা আশাভঙ্গ হবে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৫৯ )

বঙ্গবন্ধু-হত্যার প্রাক্কালেও ঠিক এমন ঘটনা ঘটেছিল। ঘাতক সহযোগী খন্দকার মোশতাক এসেছিলে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে। রাষ্ট্রপতির তৎকালীন একান্ত সচিব মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের ভাষ্যে এমনই ষড়যন্ত্রের চিত্র রয়েছে। তিনি এক লেখায় লিখেছেন :

১৪ আগস্ট গণভবন […] থেকে তিনি সরাসরি গেলেন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে। পরে জেনেছি, রাতে সেখানে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ, যাকে যথার্থভাবেই বলা হয় নাটের গুরু। […] একই রাতে একটি প্রস্তুতি সভা হয়েছিল অভিজাত এলাকার এক বাড়িতে।

[…] কয়েকঘণ্টা পর যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে চলেছে তার প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্ব সেখানে পর্যালোচনা করা হয়। […] বঙ্গবন্ধুর বাসভবন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল শিথিল। ঘাতক বজলুল হুদার অনুগত সেনাদের একটি দল রাষ্ট্রপতির বাসভবনের প্রহরার দায়িত্ব নিয়ে এসেছিল। এ কারণে খুনিরা প্রায় বিনা বাধায় ভেতরে প্রবেশ
করতে পারে।’

বস্তুত, সৈয়দ শামসুল হক গণনায়ক নাটকের ভূমিকায় বলেছিলেন এটি তাঁর একটি রাজনৈতিক পরীক্ষামূলক শিল্পকর্ম। নাট্যকার নাটকটির ছত্রে ছত্রে সেই কথার প্রমাণ রেখেছেন। সমাজের প্রতিটি সেক্টরের অনাচার, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, স্বার্থান্ধতার মুখোশ উন্মোচন করে তিনি দেখিয়েছেন যে, একটি জাতির, একটি দেশের উত্থানে যেমন একজন জননেতার সুদৃঢ় নেতৃত্বগুণের প্রয়োজন হয়, তেমনি ভাবে সমাজের সামষ্টিক বিনষ্টিই সম্মিলিতভাবে একটি দেশের ধ্বংস অনিবার্য করে তোলে; এবং এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম তারা তাদের নেতাকে হত্যা করে দেশকে নেতৃত্বশূন্য করে নেয়।

পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, সামাজিক অনাচার, মৌলবাদী শক্তির হিংস্রতম উত্থান আমাদের সে কথাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। দেশের কল্যাণ, জনগণের কল্যাণের ধুয়ো তুলে যে কালোশক্তি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছিল, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে তারাই দেশকে সবথেকে বেশি অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।

সৈয়দ শামসুল হক আলোচ্য নাটকে রাষ্ট্রপতি ওসমানের হত্যার পর অস্থিতিশীল ক্ষমতাকাঠামোর প্রকৃত ছবি দেখিয়ে প্রতীকী অর্থে আমাদের পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনৈতিক চিত্র স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ফলে আলোচ্য নাটকটি কাব্যনাটকের শিল্পিত কাঠামোর ঊর্ধ্বে উঠে একটি রাজনৈতিক সময় ও সমাজের অকাট্য দলিল হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছে।

মূলত, রাজনৈতিক নাটকের বৈশিষ্ট্যানুসারে এ নাটকের প্রধান দ্বন্দ্ব আবর্তিত হয়েছে দেশের রাজনৈতিক নেতা, সাংসদ, নীতিনির্ধারকদের আদর্শের ভিন্নতা এবং রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের কুৎসিত ষড়যন্ত্র নিয়ে। রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা এখানে অধিক প্রভাব বিস্তারী শক্তি।

বিপরীতে জনমত, জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, দাবী-দাওয়া এখানে তীব্রভাবে উপেক্ষিত। বরং এই অপশক্তি নিজেদের স্বার্থে জনগণকে বিভ্রান্ত করে একটি অগ্রহণযোগ্য নির্মম হত্যাকাণ্ডকে সমাজে বৈধ করতে চেয়েছে; রক্তপাতকে জনস্বার্থে মহৎ কর্মের মর্যাদা দিতে চেয়েছে। এটিই একটি গণতান্ত্রিক দেশের দুর্বলতম রাজনীতি-চিত্রের প্রমাণ যে – যেখানে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সদস্য ক্ষমতায় বসে জনস্বার্থের কথা ভুলে একান্তই ব্যাক্তিগত ফায়দা নিয়ে ভাবেন।

জনগণের মতের ভিত্তিতে, জনগণের ভোটে যারা নির্বাচিত হয়, তারাই জনমতকে হেয় করে, তুচ্ছজ্ঞান করে, তাদের ওপর নিজেদের মতামত ও সিদ্ধান্তকে জোর করে চাপিয়ে দেয়। বস্তুত, দুর্নীতিগ্রস্ত, অসৎ রাজনীতিবিদদের ব্যবহারের শিকার হয় সাধারণ জনগণ। সৈয়দ শামসুল হক আলোচ্য নাটকে রাজনীতির এই অন্ধকার দিকটি নিপুণ বাস্তবতায় উপস্থাপন করেছেন। যেমন, এখানে তথ্যমন্ত্রী মীর্জা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিকান্দার জনভোটে নির্বাচিত সদস্য।

জনগণের কল্যাণেই যাদের কাজ করা উচিত। কিন্তু জনগণ সম্পর্কে এরা নিজেরাই যথেষ্ঠ নেতিবাচক ধারণা পোষণ করছে। তথ্যমন্ত্রী মির্জার ধারণা – জনগণ রমণীর মতো। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিকান্দার আরও নিচুতে নেমে, সংঘশক্তির সিদ্ধান্তকে বেশ্যার সিদ্ধান্তের সঙ্গে তুলনা করেছেন :

বেশ্যার মতো। যার হৃদয়ে একমুহূর্ত দাঁড়ায় না

কোনো অনুভূতি, স্থায়ী হয় না কোনো বেদনা, আচ্ছন্নতা। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৩৪)

তবে সৈয়দ শামসুল হকের কৃতিত্ব হচ্ছে, তিনি রাজনীতির সূত্র নির্ণয়ে একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেননি; এবং নাটকের প্রথম দৃশ্যেই সেটি স্পষ্ট করেছেন সিকান্দার চরিত্রের একটি সংলাপে। তিনি দেখিয়েছেন একজন রাষ্ট্রনায়ক কখনোই দেশকে ছাপিয়ে বড়ো হয়ে উঠতে পারেন না।

কোনো নেতা যদি জনসিদ্ধান্ত আমলে না নিয়ে, সহকর্মী সুহৃদদের মতামত উপেক্ষা করে রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে একক সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন, তখন অন্যদের কাছে মনে হতেই পারে, হয়তো ব্যক্তির মহিমা সেখানে রাষ্ট্রের থেকে বড়ো হয়ে উঠছে। আর তখনি জনরোষ, অসন্তোষের বিষয়টি আসে।

স্বাধীনতা-উত্তরকালের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে সেসময়ের প্রতিটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগের সঙ্গে রাজনৈতিক আদর্শের বৈপরীত্য থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সম্মিলিত মত দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধকে সফল করে তুলেছিল। তবে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশগঠনের প্রক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধুর কিছু কিছু সিদ্ধান্ত এরা মেনে নিতে পারেনি।

 

গণনায়ক কাব্যনাটক

 

এগুলোর মধ্যে ‘বাকশাল’ গঠন করার সিদ্ধান্ত ছিল অন্যতম কারণ। আলোচ্য নাটকেও এমনই একটি রাজনৈতিক অসন্তোষের ছবি পাওয়া যায়। নাটকের প্রথম দৃশ্যে তথ্যমন্ত্রী মীর্জা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিকান্দারের আলাপে এ বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। সিকান্দার আক্ষেপের সঙ্গে বলেছে :

এই হয়, প্রথমত মনে হয়, রাষ্ট্রের

কল্যাণেই করা, পরে দেখা যায়, রাষ্ট্রের চেয়ে বড় হয়েছে

ব্যক্তি, সমস্ত উদ্যমের লক্ষ্য হয়ে যাচ্ছে সেই ব্যক্তিটির

প্রতিষ্ঠা রক্ষা। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ২৩৪ )

নাটকের আরো কিছু দৃশ্যে নাট্যকার সুকৌশলে রাষ্ট্রপতি ওসমান কর্তৃক কিছুটা স্বৈরতান্ত্রিক, একপেশে সিদ্ধান্ত নেবার প্রতিক্রিয়া-স্বরূপ গণরোষের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ওসমানের প্রতি জনতার উচ্ছ্বসিত আবেগকে পুঁজি করে নেতার চারপাশে ঘিরে থাকা যুক্তি-বুদ্ধিহীন, চাটুকারশ্রেণি যখন ওসমানকে আজীবন রাষ্ট্রপতি হবার আহবান জানিয়ে স্লোগান দিতে থাকে, তখন হুমায়ুন এবং মীর্জার মনে হয় রাষ্ট্রপতি মুখে আপত্তি জানালেও হয়তো মনে মনে এটাই চান। এখানেই মূলত তাদের আপত্তি ছিল। কেননা, একটি গণতান্ত্রিক দেশে যত যাই হোক, কারও একক সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারিত হতে পারে না। ফলে প্রধানমন্ত্রী হুমায়ুন কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে জানিয়েছেন

রাস্তায় দাঁড়িয়ে সংবিধানের সংশোধন ? আগে শুনিনি। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৪৪ )

একজন জননেতাকে যে ক্ষমতার মোহ কাটিয়ে প্রকৃতপ্রস্তাবে জননেতা হয়ে উঠতে হয়, এরকম বক্তব্য নূরলদীনের সারাজীবন কাব্যনাট্যেও উচ্চারিত হয়েছে। সেখানে আব্বাস বন্ধুপ্রতিম গণনেতা নূরলদীনকে বারবার সাবধান করেছিল এই বলে যে, জনগণ যতই তাঁকে তাদের নবাব নির্ধারণ করুক, নূরলদীনের অন্তর যেন নবাবীর মোহে জনসেবার প্রকৃত লক্ষ থেকে বিচ্যুত না হয়।

গণনায়ক নাটকেও ঠিক এমনই একটি আবহ কাজ করেছে। তবে আজীবন রাষ্ট্রপতি হবার ব্যপারে ওসমানের সিদ্ধান্ত শেষপর্যন্ত কী হয়, তা পুরোপুরি জানার পূর্বেই তাঁকে নির্মমভাবে খুন হতে হয়েছে, যেটি কখনোই কাম্য ছিল না। ওসমান হত্যার পরে রশীদ আলীর জবানিতে আমরা সেটিই জানতে পারি। রশীদ আলী জনগণের উদ্দেশে স্পষ্ট করে বলেন – রাষ্ট্রপতি ওসমান – ক্ষমতাধর হয়েও এতটাই সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন যে, তাঁর মধ্যে লোভের ছিটেফোঁটাও লক্ষ করা যায় না।

আর সে নিজেই যখন রাষ্ট্রপতি হবার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, তবে তাঁকে নিয়ে এমন কুৎসা রটনা ষড়যন্ত্রকারীদের হীনচক্রান্ত ছাড়া আর কিছু নয়। নাট্যকার বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে প্রচলিত কুৎসার একটি মোক্ষম জবাব দিতে চেয়েছেন নিম্নোক্তরূপে :

রাজার ক্ষমতা হাতে পেয়েও

জীবন যাপন করেছেন সংসার বিমুখ সন্ন্যাসীর মতো ।

এই কি উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের লক্ষণ?

মানুষের ক্রন্দন যখন শুনেছেন, কেঁদে উঠেছেন নিজে।

উচ্চাকাঙ্ক্ষীর হৃদয় এতো কোমল হলে চলে না । […]

আমি তাঁকে আজীবন রাষ্ট্রপতি হবার প্রস্তাব দেই তিনবার।

তিনবারই তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। এই কি উচ্চাকাঙ্ক্ষা? […]

হায় মানুষের বিবেক, তুমি পলাতক; যুক্তি পথভ্রষ্ট। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৭৫)

অন্যদিকে, নাট্যকার অথর্ব রাজনীতিবিদদের চিত্র তুলে ধরেছেন কাশেম খাঁ প্রসঙ্গে মীর্জা চরিত্রের আরেকটি সংলাপে। রাষ্ট্রপতি ওসমানের অসুস্থতার সুযোগে জনতার উদ্দেশে কাশেম খাঁ যখন বক্তব্য রাখতে চান, তখন তিনি রাজনীতির কতিপয় প্রচলিত বুলি ছাড়া তেমন আর কিছুই বলতে পারেন না। রাজনীতির ময়দানে অধিকাংশ নেতাই এমন। জনগণকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা না থাকলেও মঞ্চে ওঠার ব্যাপারে সবাই সরব। এ প্রসঙ্গে তথ্যমন্ত্রী মীর্জার সংলাপ উল্লেখ্য :

তিনি একটা লম্বা বক্তৃতা দিলেন। মাথামুণ্ডু বোঝা গেল না ।

কেবল ‘বন্ধুগণ’ আর ‘বাংলার নিপীড়িত মানুষ’ আর

‘রাষ্ট্রপতির নেতৃত্ব” ইত্যাদিতে পরিপূর্ণ তাঁর সে ভাষণ । […]

কাশেম খাঁ যেন সদরঘাটে কোনো বিক্রেতা,

সালসার বোতল হাতে পথচারীকে চিৎকার করে ডাকছে,

‘আসুন, স্বপ্নাদ্য অমৃত সুধা, আসুন, কিনুন।’ (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৪৬)

আবার, নাট্যকার নাটকে ওসমানের রাজনৈতিক জীবনের যে সংগ্রাম ও ত্যাগের ছবি দেখিয়েছেন, তাতে একজন প্রকৃত জনদরদী নেতার বাস্তব ছবিই চিত্রিত হয়েছে। ওসমান ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির ময়দানে সক্রিয়। সানাউল্লাহর জবানিতে জানা যায় – রাজনৈতিক জনসভা শেষ করে ফেরার পথে তারা একবার মেঘনায় জীবন-বিনাশক প্রচণ্ড স্রোতের কবলে পড়েছিলেন।

অন্যত্র মীর্জার আরেকটি সংলাপে জানা গেছে – স্বাধীনতাপূর্ব-সময়ে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ওসমান নিজ-প্রাণ তুচ্ছ করে জনগণের ভোটের দাবিতে সারাবাংলা চষে বেড়িয়েছেন। এমনকি এসময় অনিদ্রা, অনাহারে তাঁর পাকস্থলীতে তীব্র অসুখ দেখা যায়। বস্তুত, এসব বর্ণনায় দেশের প্রতি গণনায়ক ওসমানের আত্মত্যাগ যেমন চোখে পড়ে, তেমনি স্মরণে আসে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অপার ত্যাগ ও শ্রমের কথা । মীর্জার সংলাপ প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় উল্লেখ্য :

আপনাদের হয়ত মনে আছে, স্বাধীনতার কিছুদিন আগে

সেই সাধারণ নির্বাচনের কথা। বাংলার গ্রামে গ্রামান্তরে

ওসমান তখন উল্কার মতো ধাবমান, দাবানলের মতো জ্বলন্ত ।

তিন মাসে এক হাজার বক্তৃতা, রাত্রি নিদ্রাহীন, দিন উপবাসে।

সেই তখন পাকস্থলীতে হয় ক্ষত, শুধু শুকনো মুড়ি খেয়ে

তিন মাস । অস্ত্রোপচার হয় পরে, কিন্তু ব্যথাটা থেকে যায়; (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৪৫)

বলাবাহুল্য, সত্তরের সাধারণ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। কেননা, এ নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়ে দেশের প্রধান দল হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। ফলে পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় বাঙালির অধিকার ন্যায্যতা পেয়েছিল। তবে এ নির্বাচনে এককভাবে বিজয়লাভের পশ্চাতে বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ-তিতিক্ষা কম ছিল না।

ওসমানের সভা সভাবেশ, মিছিল মিটিং, অনাহার অনিদ্রার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু অনায়াসেই মিশে যান। এছাড়া ‘বঙ্গবন্ধুর’ আদলে নাট্যকার ওসমানকে সম্বোধন করেছেন ‘দেশবন্ধু’ নামে; মুজিবকোটের আদলে ‘ওসমানী কোট’ নামক বিশেষ পোশাকের ইঙ্গিত রয়েছে নাটকে। সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ-দক্ষতা ভুবনখ্যাত একটি বিষয়। নাট্যকার সে বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন ওসমানের ‘যে জিহ্বার ভাষণে বাংলাদেশ ভাবাবেগে ভাসে’ সংলাপের মাধ্যমে।

অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধুর পেটের পীড়ার প্রসঙ্গটি বাস্তবিকভাবে সত্যঘটনা। উইলিয়াম শেকস্পিয়র তাঁর নাটকে এ স্থানে দেখিয়েছিলেন সিজার মৃগীরোগে ভুগছে। সৈয়দ শামসুল হক যদি নাটকটি নিছকই অনূদিত করতে চাইতেন তবে রাষ্ট্রপতি ওসমানকেও মৃগীরোগে আক্রান্ত দেখাতে পারতেন। কিন্তু সেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুর পেটের পীড়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

বস্তুত, ১৯৫২ সালে ফরিদপুর কারাগারে বঙ্গবন্ধু রাজবন্দীদের মুক্তি এবং ভাষার দাবিতে রাজনৈতিক সহকর্মী মহিউদ্দীনের সঙ্গে মিলে অনশনধর্ম পালনকালে তীব্রভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন; যার রেশ বঙ্গবন্ধুর শরীরে আমৃত্যু থেকে গিয়েছিল। এছাড়াও ১৯৬৬ সালে কারাগারে থাকাকালে বঙ্গবন্ধু অনিদ্রা ও ক্ষুধামান্দ্যে ভোগেন।

 

গণনায়ক কাব্যনাটক

 

অজীর্ণতা, গ্যাস্ট্রিক, পাইলসসহ নানা সমস্যায় ভুগতে থাকেন। এমনকি, দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালেও বঙ্গবন্ধু পেটের পীড়ায় লন্ডনের হারলে স্ট্রিটে প্রাইভেট হাসপাতাল দ্য লন্ডন ক্লিনিকে চিকিৎসাগ্রহণ করেন। গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিচালক ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর এক লেখায় জানা যায়

১৯৭২ সালের এপ্রিলে বঙ্গবন্ধু মাঝে মধ্যে বদহজম, পেটের নিম্নাংশে চিনচিনে ব্যথা ও পিত্তথলির সমস্যায় আক্রান্ত হন। […] লন্ডন ক্লিনিকে শৈল্য বিশেষজ্ঞ স্যার এডওয়ার্ড মুইর এফআরসিএস ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশকরা ডা. নজরুল ইসলাম এফআরসিএস পেট কেটে বঙ্গবন্ধুর রোগ নির্ণয় করেন ‘Cholecystitis, Inflammed Common Bile Duct but no obstruction’ .

১৯৭২ সালে সৈয়দ শামসুল হক লন্ডনে বিবিসি বাংলা অফিসে চাকুরিসূত্রে অবস্থান করছিলেন। কাজেই বঙ্গবন্ধুর অসুখ এবং চিকিৎসাগ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া তাঁর অজানা থাকার কথা নয়। ফলে রাষ্ট্রনায়কের মৃগীরোগের স্থলে পিত্তথলির পীড়ার কথা উল্লেখ করে তিনি তাঁর বাস্তবধর্মী চেতনালোকের প্রমাণ দিয়েছেন।

স্বাধীনতা উত্তরকালে যে সেনাবাহিনীকে বঙ্গবন্ধু নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন, তাদের জন্য আধুনিক সমরাস্ত্রের ব্যবস্থা করেছিলেন, নানারকম সুযোগ-সুবিধা প্রদানসহ উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে একাধিক ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করিয়েছিলেন – সেই বাহিনীরই কিছু বিপথগামী সেনাসদস্য পঁচাত্তরের পনেরো আগস্টের কালরাতে তাঁকে আক্রমণ করবে, এটি বিশ্বাস করতে পারেননি তিনি। যে কারণে প্রথম দিকে গুলির শব্দ পেয়ে তিনি বিভিন্ন স্থানে সাহায্য চেয়ে যোগাযোগ করেছিলেন; বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকেও ফোন করে বলেছিলেন :

‘শফিউল্লাহ তোমার ফোর্স আমার বাড়ি অ্যাটাক করেছে, কামালকে বোধ হয় মেরে ফেলেছে। তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও।” কিন্তু সেদিন আর সেনাবাহিনী তাঁকে সাহায্য করতে আসেনি। অতঃপর ঘাতকদলের অন্যতম সদস্য মেজর মহিউদ্দিন ও তার সঙ্গীরা যখন বঙ্গবন্ধুকে দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামিয়ে নিয়ে যেতে থাকে, তিনি তখনও অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে নিজ হাতেগড়া এই জোয়ান সেনাদের উদ্দেশে বলেন : ‘তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবি, কী করবি – বেয়াদবি করছিস কেন?’ কিন্তু শেষরক্ষা আর হয়নি। অপর দুই বিশ্বাসঘাতক খুনি – বজলুল হুদা ও নুর স্টেনগানের গুলিতে বঙ্গবন্ধুর হিমালয়সম দেহ ঝাঁঝড়া করে দেয়। সিজারের মতোই হয়তো বঙ্গবন্ধু নিকটজনের প্রতারণায় কষ্ট বেশি পেয়েছিলেন।

সৈয়দ শামসুল হক তাঁর গণনায়ক নাটকে একজন রাষ্ট্রনায়কের এমন হতবিহবল অনুভূতি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। রাষ্ট্রপতি ওসমানকে তথ্যমন্ত্রী মীর্জা প্রথম হত্যার জন্য আঘাত করে। এক এক করে অন্য সাংসদরাও তখন রাষ্ট্রপতি ওসমানকে ঘিরে ধরে আঘাতের পর আঘাত করতে থাকে। কিন্তু সবশেষে যখন প্রধানমন্ত্রী হুমায়ুন ছুরিকাঘাত করেন, তখন কাছের বন্ধুর এমন বিশ্বাসঘাতকতা মৃত্যুযন্ত্রণার থেকেও কষ্টকর মনে হয়। ফলে পরম হতাশায় মৃত্যুপথযাত্রী ওসমান বলে ওঠেন :

তুমি ? হুমায়ুন ? – তাহলে, এভাবেই ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৬৫)

আবার, রাষ্ট্রনেতা ওসমানের মৃত্যুর পর রশীদ আলীর স্বগতোক্তিতে যে আবেগাত্মক আবহ তৈরি করেছেন নাট্যকার, তাতে ওসমানের প্রতিরূপে বঙ্গবন্ধুর প্রতি নাট্যকারের অনুতাপদগ্ধ হাহাকারই ভাষারূপ পেয়েছে। রশীদ আলী যখন জনতার উদ্দেশে ওসমানের প্রতি শোক ও শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছু বলতে চেয়েছে – তখন সানাউল্লাহ, হুমায়ুন তাকে বার বার সতর্ক করেছে এই বলে যে – “বিপ্লবের বিরুদ্ধে কোনো উচ্চারণ নয়।’

পঁচাত্তর-পরর্তীকালের রাজনৈতিক ইতিহাসেও দেখা গেছে ক্ষমতাসীন সেনাশাসিত সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের হত্যার বিচার করা তো দূরের কথা, তাঁর ঘাতকদের আইন করে দায়মুক্তি দিয়েছে। এমনকি এ হত্যার বিচার চাওয়াও তখন নিষিদ্ধ ছিল।’ তবে এখানে জনগণের উদ্দেশে রশীদ আলীর যে বক্তব্য তা যেন পঁচাত্তর-উত্তর বাংলার জনগণের প্রতি নাট্যকারের অন্তরের আকুল আকুতি।

যে কারণে উপমা ও চিত্রকল্প নির্মাণে তিনি এখানে বড়ো বেশি বাস্তব, সামরিক শাসনের বাধ্যবাধকতার মধ্যে থেকেও অনেক বেশি সাহসী। স্পষ্টত শেকস্পিয়রের সিজার চরিত্রের রূপকল্প ছাপিয়ে এখানে জীবন্ত হয়ে উঠেছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এমনকি তিনি এখানে যে চিত্রকল্পের প্রয়োগ করেছেন সেটি বঙ্গবন্ধুর ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার হতে মুক্ত হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রাসঙ্গিক এলাকা নিম্নে উপস্থাপন করা হলো : –

ঢাকায় লক্ষ লক্ষ লোক

চৈত্রের উজ্জ্বল রোদে দিগন্ত পর্যন্ত একটা সমুদ্র,

তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে

বরণ করল গণনায়ক বলে । লক্ষ লক্ষ হাত

উৎক্ষিপ্ত হলো আকাশে, যেন লক্ষ লক্ষ পতাকা (কাব্যনাট্যসমগ্র : 276)

বঙ্গবন্ধুর ১৯৭২ সালের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের স্মৃতিচারণ করেছেন ব্রিটিশ লেখক রবার্ট পেইন। এ আনন্দময় দিনটির মাধুর্য প্রসঙ্গে তিনি লেখেন :

তোপধ্বনিতে ঢাকা কেঁপে কেঁপে গর্জে উঠেছিল মহাবীরের বীরোচিত সংবর্ধনায়। আবেগে অশ্রুসিক্ত মুজিবুর রহমান বিমানের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে। প্রিয় নেতাকে দেখামাত্রই এয়ারপোর্টে সমবেত লাখো জনতা অবিস্মরণীয় উল্লাসে ফেটে পড়ছিল। […] মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবর্গ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, ছাত্র নেতৃবৃন্দ, মুক্তিবাহিনীর কমান্ডারগণ, রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে লক্ষ লক্ষ মানুষের উপচে পড়া তরঙ্গাভিঘাতের মুখেও আনুষ্ঠানিকভাবে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন। […] জনতার হাতের রঙ বেরঙের পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার। শেখের বিভিন্ন সাইজের ছবি শোভা পাচ্ছে উল্লসিত জনারণ্যে। সবার কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদায়ক ধ্বনি – জয় বাংলা।’

অনায়াসেই উপলব্ধি করা যায় পাকিস্তানের কারাগারে নয় মাস অবরুদ্ধ থাকার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সদ্য স্বাধীনদেশে প্রত্যাবর্তনের আনন্দের সঙ্গে গণনায়ক নাটকে সৈয়দ শামসুল হক বর্ণিত রাষ্ট্রপতি ওসমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন-ঘটনার সাযুয্য অত্যধিক। বলাবাহুল্য এ-সাদৃশ্য নাট্যকারের একান্তই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত লেখনীর বহিঃপ্রকাশ ।

গণনায়ক নাটকে সৈয়দ শামসুল হক উইলিয়াম শেকসপিয়রের মূল কাহিনির বাইরে গিয়ে ওসমান হত্যা- পরবর্তী সময়ে দেশের তৎকালীন বিপর্যস্ত রাজনীতি, সমাজ আর ক্ষমতার নয়া মেরুকরণের যে চিত্র উপস্থাপন করেছেন, সেটি পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিত্রকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।

জুলিয়াস সিজার নাটকে শেকস্পিয়র একজন পত্রবাহক দ্বারা ভ্রাতুষ্পুত্র অক্টাভিয়াস সিজারের কাছে রাষ্ট্রনেতা জুলিয়াস সিজারের মৃত্যুর খবর প্রেরণ করে তাকে রাজধানীতে আনয়নের মাধ্যমে এ অংশের দায় মিটিয়েছেন। কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নিরিখে ওসমান হত্যা-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল চৌধুরী, এয়ার মার্শাল আমিন এবং পুলিশ প্রধানের সম্মিলিত উদ্যোগের কথা বলেছেন :

কিছুক্ষণ আগে জেনারেল চৌধুরী আর এয়ার মাশার্ল আমিন

বৈঠক করেছেন সব অফিসারদের নিয়ে।

[…] সৈন্য পাঠানো হয়েছে রাজধানীর সকল গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ।

[…] পুলিশ প্রধানও আছেন, তিনি আনুগত্য ঘোষণা করেছেন

প্রধান সেনাপতির প্রতি। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৭৯)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পরদিন – ১৬ আগস্ট দেশের প্রথম সারির পত্রিকা দৈনিক বাংলার শীর্ষখবর ছিল : ‘খন্দকার মোশতাক নয়া রাষ্ট্রপতি।’ ওই খবরের উপশিরোনামে ছোট্ট করে বলা হয় : ‘শেখ মুজিব নিহত : সামরিক আইন ও সান্ধ্য আইন জারি : সশস্ত্র বাহিনীসমূহের আনুগত্য প্রকাশ। সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস-এর বরাত দিয়ে একই খবরে বলা হয়, সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য সামরিক আইন ঘোষণা ও সান্ধ্য আইন জারি করা হয়।

সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ, নৌবাহিনী প্রধান কমোডর মোশাররফ হোসেন খান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ. কে. খন্দকার পৃথক পৃথক বেতার ভাষণে মোশতাক আহমদের নেতৃত্বাধীন নয়া সরকারের প্রতি আনুগত্য ও দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করেছেন।

এ ছাড়া বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান, রক্ষীবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সাবিউদ্দিন আহমেদ এবং আইজিপি এ. এইচ. নুরুল ইসলাম বেতার মারফত মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন মর্মে খবর প্রকাশ করা হয়। ফলে গণনায়কে বর্ণিত ওসমান হত্যা- পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর ক্ষমতার নতুন মেরুকরণের সঙ্গে বাংলাদেশের পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসের সাযুজ্য’ স্পষ্ট।

আবার, ১৯৭১ এ ‘জয় বাংলা’ ছিল মুক্তিকামী বাঙালির অন্তরমথিত শ্লোগান। বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদের অবদান মাথায় রেখেই খাঁটিবাংলা ভাষায় এই দ্বৈতশব্দের শ্লোগানটি নির্মাণ করেছিলেন। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেও মানুষ যেকোনো আনন্দ কিংবা আন্দোলনে এই শ্লোগানটিকেই ব্যবহার করতো। কিন্তু পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই চিত্রপট সম্পূর্ণরূপে বদলে গেল।

‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের স্থানে জায়গা করে নিল ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদে’র আদলে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ শ্লোগান। বস্তুত, এর মাধ্যমে উত্থান ঘটল সেই মৌলবাদী শক্তির, যারা উর্দুকে এদেশের রাষ্ট্রভাষা করার হীনষড়যন্ত্রে মদদ যুগিয়েছিল; যারা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পরিবর্তে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিসম্পন্ন দেশগঠনের স্বপ্ন দেখেছিল।

সৈয়দ শামসুল হক আলোচ্য নাটকে বাংলাদেশের রাজনীতির এই পরিবর্তনটিও অত্যন্ত চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। নাটকের প্রারম্ভিক পর্যায়ের দৃশ্যগুলোতে দেখা গেছে, যে-জনগণ ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে রাষ্ট্রপতি ওসমানকে স্বাগত জানাচ্ছে, তারাই ওসমান হত্যা-পরবর্তী সময়ে তাদের শ্লোগান বদলে ফেলেছে :

জিন্দাবাদ। জিন্দাবাদ ।

অত্যাচারের বদলা খুন। নতুন নেতা হুমায়ুন ।

এতদিনের দুঃখ শেষ। গঠন করো বাংলাদেশ। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ২৭৩)

গণনায়ক নাটকে নাট্যকারের রাজনীতি-মনস্কতার আরেকটি প্রমাণ – জেনারেল চৌধুরী চরিত্রটি নির্মাণ। দেশের কল্যাণের নামে এ-চরিত্রটি নিজক্ষমতা পোক্ত করতে নানা ষড়যন্ত্রে জড়িত। একটি পর্যায়ে সে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে অশ্রদ্ধাপূর্ণ মন্তব্য করে রাষ্ট্রের কল্যাণে রাজনীতিকের তুলনায় সেনাসদস্যদের কার্যকারিতা ও তাদের একনিষ্ঠ দেশপ্রেমের কথা উল্লেখ করে বলেন :

রক্তপাতের অস্ত্র রাজনীতিকের হাতে, তা ইতঃপূর্বে তো

চোখেই দেখা যাচ্ছে। বলা নিস্প্রোয়োজন যে একমাত্র সৈনিকেরই

দেশপ্রেমের প্রকাশ কিছু অপটু হলে চলে না। কারণ,

সৈনিকের সমুখে শুধু দু’টি পথ, জয় অথবা মৃত্যু ;

রাজনীতিকের আরো একটা পথ আছে, হয়তো সেটাই প্রথম

এবং প্রধান – পলায়ন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৮২)

মূলত, জেনারেল চৌধুরীর এই উক্তিই প্রমাণ করে – সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় তাঁর মনোভাব – কেমন। তিনি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ধীরে ধীরে সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছেন। একদিকে প্রয়াত রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ নেতাদের কাউকে হত্যা করেছেন, আবার প্রয়োজনানুসারে কাউকে করেছেন বন্দি। যেমন : প্রবীণ নেতা কাশেম আলী, সাংসদ নরেন্দ্রনাথ।

অন্যদিকে বিপক্ষের প্রধান ষড়যন্ত্রকারী সানাউল্লাহ, হুমায়ুন পালিয়ে যাবার সুযোগ পেয়েছে; সিকান্দারকে ক্রসফায়ারের নামে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এবং পুরো প্রক্রিয়া নিজের দখলে নিতে বিদ্রোহী সংসদ সদস্য দাউদ চৌধুরী ও ফজলুল হককে করা হয়েছে রাজসাক্ষী।

জাতির জনকের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে দেশ যখন সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণাধীন, তখনো রাজনীতির ময়দানে ধরপাকড় চলেছে; রাষ্ট্রনায়কের প্রত্যক্ষ মদদে চলেছে জেল হত্যা। দেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষের শক্তিকে চিরতরে বিলীন করে দিতে নানা কর্মকাণ্ড চলেছে। অন্যদিকে, বিপথগামীদের হত্যার দায় থেকে মুক্তি দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে ; কাউকে কাউকে দলে টানতে করা হয়েছে পুরস্কৃত।

 

গণনায়ক কাব্যনাটক

 

মানুষের মনে ধীরে ধীরে প্রবেশ করানো হয়েছে – দেশশাসনে রাজনীতিবিদ নয়, বরং সেনাসদস্যরাই অধিক সক্ষম। সৈয়দ শামসুল হক বাস্তবতার আলোকে এসব দেখে-শুনেই বোধ হয় নাট্যকাহিনিতে এগুলোর প্রতীকী সংযোজন ঘটিয়েছেন।

অন্যদিকে রশীদ আলী চরিত্রটি একেবারেই সুবিধাবাদী শ্রেণির প্রতিনিধি। সময় ও স্রোতের সঙ্গে গা ভাসিয়ে চলা তাঁর স্বভাব। রাষ্ট্রপতি ওসমানকে তিনি ভালবাসতেন ঠিক-ই, কিন্তু ওসমানের অবর্তমানে অতঃপর নিজেকে দেখতে চাইছেন নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকায়।

তাই চতুর জেনারেল চৌধুরী যখন ওসমানের সদ্য বিধবা স্ত্রীকে রাষ্ট্রপ্রধান করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন তার শ্লেষাত্মক মনোভাব সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রে তারা প্রতিপক্ষকে সন্দেহ করার পাশাপাশি পক্ষভুক্তদেরও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেছেন। যে কারণে প্রবীণনেতা কাশেম আলীকে পর্যন্ত সেনাছাউনির অভ্যন্তরে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন তাঁরা :

জেনারেল । আমার সন্দেহ, আজ রাতে পালাবার চেষ্টা তিনি করবেন।

প্রহরী শুধু সতর্ক নয়, দেশপ্রেমিক বাধ্য হবে গুলি ছুঁড়তে।

সৈনিক কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না, আশাকরি জানেন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৮৭)

পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম ন্যাক্কারজনক ঘটনা জেলহত্যা। বস্তুত, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তাঁর অতিঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের হত্যার উদ্দেশ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যান্তরেই ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। বঙ্গবন্ধুর সহযোদ্ধা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এইচএম কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী – রাষ্ট্রযন্ত্রের এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের অনাগ্রহে বঙ্গবন্ধু হত্যার মতো এ হত্যাকাণ্ডটিও বিচারের মুখ দেখতে পায়নি। পঁচাত্তর-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতি এভাবেই চিত্রিত হয়েছে আলোচ্য নাটকের দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে।

শেকসৃপিয়রের জুলিয়াস সিজার থেকে এখানেই গণনায়ক হয়ে উঠেছে সমকালীন রাজনৈতিক আখ্যান চিত্রণের অনন্য দলিল; হয়ে উঠতে পেরেছে নাট্যকারের স্বতন্ত্র শিল্পিত কাব্যনাটক। রাষ্ট্রনায়কের নির্মম মৃত্যুর পর জেনারেল যখন ঘোষণা দেন রশীদ আলী নন, ওসমানের বিধবা স্ত্রী-ই রাষ্ট্রপতির আসনে বসবেন তখন রশীদ আলী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন :

রাষ্ট্রপতির আসনে তাঁর বিধবা পত্নী ?

[…] রাষ্ট্রপতির গায়ের চাদর ধবধবে রাখা, তাঁর জন্যে

কই মাছের ঝোল নিয়মিত রাঁধা, এ ছাড়া

দ্বিতীয় কোনো উদ্যমে যাঁকে কখনো দেখিনি,

রাষ্ট্রের সম্মানিতা বিধবার বদলে, রাষ্ট্রের কর্ণধার তিনি ? (কাব্যনাট্যসমগ্র: ২৯৮)

তখন জেনারেল জানায়, রাষ্ট্রপতি হবার জন্য জনগণের সম্মুখে যে প্রতীক প্রয়োজন, ওসমানের বিধবাপত্নী হবেন তা-ই। তিনি রশীদ আলীকেও পুরস্কারস্বরূপ তার পূর্বপদে বহাল রাখার কথা বলেন। তখন রশীদ আলী নিশ্চিত হন, রাষ্ট্রপতির স্ত্রীকে পুতুল সরকার বানিয়ে ভেতর থেকে জেনারেলই ক্ষমতায় বসতে চান। রশীদ আলী তখন কার্যত সামরিক বাহিনীর হাতে বন্দী হয়ে পড়েন। মঞ্চ নির্দেশের মাধ্যমে যেটি সুষ্পষ্ট হয়েছে :

রশীদ দরোজার কাছে যেতেই দু’জন প্রহরী উদিত হয়। রশীদ আবার নিজের আসনে ফিরে যায়। তার দিকে তাকিয়ে জেনারেল একবার অন্যমনস্ক অস্ফুট হাসেন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৯৯)

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পঁচাত্তর-পরবর্তী ঘটনাবলিও এ-নাট্যঘটনার সঙ্গে মিলে যায়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাণিজ্য মন্ত্রী মোশতাককে প্রতীকী সরকার বানিয়ে সেনাবাহিনী প্রথমে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। এরপর স্বল্পকাল ব্যবধানে নানা নাটকীয়তা ও উপর্যুপরি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সামরিক জান্তা বহাল তবিয়তে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়।

১৯৭৫ সালেই নাট্যকার যেন বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদলের ভবিষ্যৎ দেখতে পেরেছিলেন। কেননা, একজন প্রয়াত রাষ্ট্রপতির বিধবা স্ত্রীকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসানোর বাস্তবিক ইতিহাসও এদেশের রয়েছে। অনায়াসেই তাই বলা যায় সৈয়দ শামসুল হক একজন রাজনীতিসচেতন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা লেখক ।

সৈয়দ শামসুল হক শেকসপিয়রের নাটকের রূপান্তর ঘটিয়ে এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকেই যে চিত্রিত করতে চেয়েছেন তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। কিন্তু এই রাজনীতির চিত্র উপস্থাপন করতে গিয়ে তিনি দেশের অতীত ইতিহাস, সমকাল, সমাজকে অস্বীকার করতে পারেননি। বরং একজন বিজ্ঞ সমাজমনস্ক নাগরিকের দৃষ্টিতে অতীত ইতিহাসের ছাঁচে ফেলে রাজনৈতিক চক্রের রহস্য উন্মোচনে সচেষ্ট থেকেছেন।

সৈয়দ শামসুল হক মনে করেন – যে-জাতি অতীত ইতিহাস স্মরণ করে না, সে-জাতি উন্নত ভবিষ্যৎ গঠনে অক্ষম। কিন্তু বাঙালি জাতি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ক্ষণিক স্বার্থের মোহে ইতিহাসের ঘটনাপুঞ্জকে নিমিষেই ভুলে গেছে। গণনায়ক নাটকের প্রারম্ভেই নাট্যকার সিকান্দার চরিত্রের একটি সংলাপের মাধ্যমে এই বিস্মৃতিপ্রবণ সুবিধাবাদী বাঙালি জাতিকে শ্লেষবাণ নিক্ষেপ করে বলেছেন :

‘নির্বোধ মূর্খের দল, দেহে প্রাণের বদলে পাষাণ? মাথায় ইতিহাসের বদলে মাকড়শার বাসা “(প্রথম অংক প্রথম দৃশ্য, – কাব্যনাট্যসমগ্র: ২৩৩)। আত্মঘাতী বাঙালি জাতিকে সঠিক ইতিহাসজ্ঞান দিতে তিনি শিল্পের আশ্রয় নিয়েছেন বারবার। গণনায়ক নাটকের পূর্বে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকেও আমরা পেয়েছি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।

এরপর নূরলদীনের সারাজীবন কাব্যনাটকে ইতিহাসের প্রায় অজানা পাতা থেকে খুঁজে এনে আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন নূরলদীন নামক এক মুক্তিকামী কৃষকযোদ্ধাকে। গণনায়ক নাটকের ছত্রে ছত্রেও আমরা নাট্যকারের ইতিহাসবোধের প্রমাণ পাই।

এখানে পঁচাত্তরের বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও তৎপরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস প্রধান আলেখ্যরূপে উপস্থাপিত হলেও নাট্যকার প্রাসঙ্গিকভাবে সত্তরের নির্বাচন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশপ্রত্যাবর্তন, দেশ শাসনের ইতিবৃত্ত থেকে পলাশীর ট্রাজেডি, মুঘল ইতিহাসের হুমায়ুন- ভিস্তিওয়ালার ঘটনাসহ ভিয়েতনাম যুদ্ধ, লেনিন, ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সংগ্রামের ইতিহাসও উপস্থাপন করেছেন অসামান্য দক্ষতায়’:

মুক্তির মূল্য ছাড়া প্রাপনীয় নয়। বাড়ির কাছেই ভিয়েতনাম ।

চীনও খুব বেশি দূরের উদাহরণ নয়। লেনিনকে স্বদেশ থেকে

পালাতে পর্যন্ত হয়েছিল। পর্বতে যেতে হয়েছিল ফিদেল কাস্ত্রোকে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩০৫ )

সৈয়দ শামসুল হক সুকৌশলে সানাউল্লার মুখের এই একটি সংলাপের মাধ্যমে পৃথিবীর তাবৎ বিপ্লবের ইতিহাসকে একসাথে স্মরণ করেছেন। কার্ল মার্কসের সাম্যবাদকে ভিত্তি করে রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন (১৮৭০-১৯২৪), কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো (১৯২৬-২০১৬), হো চি মিনের (১৮৯০-১৯৬৯) নেতৃত্বে আধুনিক ভিয়েতনাম প্রতিষ্ঠা, সর্বোপরি মাও সে তুং (১৮৯৩-১৯৭৬)- এর নেতৃত্বে সংঘটিত চীনা বিপ্লবের ইঙ্গিত রয়েছে এখানে।

বস্তুত, বিংশ শতাব্দীর প্রায় পুরোটা জুড়েই বিশ্বে রাজনৈতিক ক্ষমতাবদলের চিত্র দেখা গেছে। বিপ্লবের তোড়ে পুঁজিবাদ, ধনতন্ত্র, রাজতন্ত্রের বড়ো বড়ো দুর্গগুলো ধসে পড়েছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গণমানুষের শাসন; গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র। জাতির জনক যখন গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে সম্বল করে দেশের মানুষকে যুগান্তরের শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্ত করতে চেয়েছেন, তখনই ক্ষমতা-অন্ধ ভ্রষ্টাচারী রাজনীতিবিদদের ষড়যন্ত্রে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ফলে পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ।

দেশশাসনের অধিকার হারায় মানুষ। দেশে দেশে কালে কালে জননন্দিত নেতাদের হত্যা করে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র যে ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়, এবং জনস্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থকে বড়ো করে দেখে, গণনায়ক ওসমানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সে-বক্তব্যই প্রতিপাদনের প্রয়াস পেয়েছেন সৈয়দ হক। শেকসপিয়রের জুলিয়াস সিজার নাটকটিকে সমকালীন জনজীবনের সঙ্গে লগ্ন করে তিনি তাঁর অসামান্য নাট্যপ্রতিভাকেই সাড়ম্বরে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এ-নাটকে।

Leave a Comment