আজকের আলোচনার বিষয়ঃ গণচীনে চব্বিশ দিন । যা চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্যের চীন ভ্রমণ কাহিনী এর অন্তর্গত।

গণচীনে চব্বিশ দিন । আবদুল আহাদ
১৯২০ সালে ফরিদপুরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে আবদুল আহাদের জন্ম। শৈশব ও বাল্যকাল কেটেছে জলপাইগুড়ি, রাজশাহী ও পাবনা শহরে। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর অনুরাগ পরিলক্ষিত হয়। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি কলকাতায় সিটি কলেজে ভর্তি হন।
এসময় তিনি নিয়মিত প্রশিক্ষণ গ্রহণ শুরু করেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের উপর। ১৯৩৬ সালে ‘অল বেঙ্গল মিউজিক কমপিটিশনে’ তিনি ঠুংরী, গজল ও ভজন-এ প্রথম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের পরিচয় দেন। এসময় অল ইন্ডিয়া রেডিওর কোলকাতা কেন্দ্র থেকে তাঁর গান নিয়মিত প্রচার করা হত। ১৯৩৮ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের বৃত্তি পেয়ে সংগীত বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য বিশ্বভারতী শান্তিনিকেতনে যান।
বস্তুত আবদুল আহাদই প্রথম বাংগালী মুসলমান যিনি রবীন্দ্রনাথের জীবিত কালে শান্তিনিকেতনে প্রশিক্ষণ লাভ করে রবীন্দ্র সংগীতের একজন বিশেষজ্ঞ হিসাবে পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
ভারত-বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা বেতার কেন্দ্রের মিউজিক কম্পোজার এবং প্রডিউসার হিসাবে যোগদান করেন। এই সময় পূর্ব বাংলার সংগীত ক্ষেত্রে প্রায় শূন্যতা বিরাজ করছিল বলা যায়। প্রতিষ্ঠিত হিন্দু শিল্পীরা দেশ ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গে চলে গেছেন, মুসলমান শিল্পী ছিলেন মাত্র গুটি কয়েক নতুন শিল্পীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নতুন গান সংগ্রহ করে সুর দেওয়ার দায়িত্ব আবদুল আহাদকে নিতে হয়।
১৯৫৬ সালে তিনি স্পেন সরকারের বৃত্তি নিয়ে স্পেনে যান পাশ্চাত্য সংগীত বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য। তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং একাধিক আন্তর্জাতিক সংগীত সম্মেলনে স্বদেশের প্রতিনিধি হিসাবে যোগদান করেছেন।
১৯৮২ সালে আবদুল আহাদ হিজ মাষ্টারস ভয়েজ গ্রামোফোন কোম্পানীতে একজন প্রশিক্ষণ পাতা বা ট্রেইনার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮৬ সালে কোলকাতায় থাকাকালীন তিনি ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া’ নামক পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা কথাচিত্রের সংগীত পরিচালনা করেন। তাঁর সুর ও স্বরলিপি সম্বলিত একটি বই ‘নবগিদন্তের গান’ নামে প্রকাশিত হয়।
তাঁর চীন ভ্রমণ কাহিনী ‘গণচীনে চব্বিশদিন’ প্রকাশিত হয় ১৩৭৩ বাং। আসা যাওয়ার পথের ধারে আবদুল আহাদ রচিত আত্মজীবনী প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে বাংলা একাডেমী থেকে। পাকিস্তান আমলে তিনি সংগীত ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের জন্য যথাক্রমে ‘তামঘায়ে ইমতিয়াজ’ ও ‘সিতারা-য়ে ইমতিয়াজ পদকে ভূষিত হন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয়।
তাছাড়া তিনি ১৯৮৩ সালে মাহবুবউল্লা ও বেগম মাহবুবউল্লা পদক এবং ১৯৮৪ সালে নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৮৬ সালে আবদুল আহাদকে বাংলা একাডেমীর সম্মানসূচক ফেলো হিসাবে নির্বাচিত করা হয়।
১৯৬৫ সালের ২০শে মার্চ অবদুল আহাদ ৪৭ সদস্যের এক সাংস্কৃতিক দলের সহনেতা হিসেবে চীন- এর পথে ঢাকা ত্যাগ করেন। পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বহু গণ্যমান্য নৃত্যশিল্পী এই সাংস্কৃতিক দলের সদস্য ছিলেন। দলনেতার দায়িত্বে ছিলেন শামসুল হুদা চৌধুরী। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের চীন সফরের দশদিন পরই এই সাংস্কৃতিক দল চীনে শুভেচ্ছা সফরে যায়।
চব্বিশ দিনের সফরে লেখক ও তাঁর দল চীনের পিকিং, তেনজিন, সাংহাই ও ক্যান্টনের বিভিন্ন জায়গায় কালচারাল প্রোগাম শেষে ১০ই এপ্রিল দেশে ফিরে আসেন।
আবদুল আহাদ সংগীত জগতের মানুষ। পেশাদারী লেখক তিনি নন। চীন ঘুরে তাঁর মুগ্ধতাই তাঁকে এ বই লিখতে সাহায্য করেছে। বই আকারে প্রকাশিত হবার আগে তাঁর অভিজ্ঞাতার বিবরণ সাপ্তাহিক ‘চিত্রালীতে’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।
‘গণচীনে চব্বিশ দিন’ গ্রন্থে লেখক সেদেশের সাংস্কৃতিক দিকটি ছাড়াও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। চীনের বিপ্লব, চীনের উন্নয়ন, চীনের সাফল্য সর্বোপরি বিপ্লবোত্তর চীনের নতুন চেহারা তাঁর রচনায় স্থান পেয়েছে। বইটিতে তিনি চীন সফরের কিছু দুর্লভ ছবি ছেপে ভ্রমণকাহিনীর আকর্ষণকে বাড়িয়ে তুলেছেন।
এর মধ্যে চীনের মহাপ্রাচীর ও চীনা মিউজিয়ামের ছবি উল্লেখযোগ্য। গ্রন্থটি প্রাকাশনার দায়িত্ব পালন করেছেন নাসিম বানু। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৭৩ সালে।

দুই
লেখক বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তবে চীন সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ ছিল বেশী। ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো যেভাবে দেশটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল, সেই অবস্থা থেকে চীনের মুক্তি লেখককে চীন ভ্রমণে বেশী উৎসাহী করে তোলে।
২০শে মার্চ সাংস্কৃতিক দলসহ লেখক ঢাকা থেকে ক্যান্টন যান। ক্যান্টনের দূরত্ব ঢাকা থেকে খুব বেশী নয়। মাত্র ৬ ঘন্টার পথ। পি,আই, এ, বিমান ক্যান্টন পৌঁছলে চীনা ডিরেক্টর অব কালচারাল এ্যাফেয়ার্স পাক-সাংস্কৃতিক দলকে অভ্যর্থনা জানায়। সেখানকার শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ লেখকের ভালোলেগেছিল। এখানেই তিনি প্রথম ‘গ্রীন-টি’ পান করেন। ক্যান্টনে ঘন্টাখানেক বিরতি শেষে তিনি তাঁর দলসহ রাত ১১টায় পিকিং পৌঁছান।
হাজার হাজার বছরের পুরোনো শহর চীনের পিকিং বিমান বন্দরে নেমেই লেখক সেখানকার ঠান্ডা হাওয়ার তীব্রতা অনুভব করেছিলেন। শীতের শেষে সেখানে সম্পূর্ণ ইউরোপের দৃশ্য দেখা যায়। কোন গাছেই পাতা থাকেনা। পিকিং এ প্রথম রাত কাটানোর পর সকালে পাকিস্তান দূতাবাসে যাবার পথে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন এত বড় রাজধানী শহরের পথে কোথাও কোন ভীড় নেই। আর চীনারা সবাই একইরকম নীল রং এর পোশাক পরে।
পিকিং এ ‘বিপ্লবের মিউজিয়াম’ এবং ‘গ্রেট হল অব দি পিপলস’ দেখে লেখক অবাক হয়েছিলেন। দূর থেকে এ হল দুটিকে বিরাট প্রাসাদ বলে মনে হয়। মাঝখানের খালি জায়গায় পিপলস্ স্কোয়ারটিকে মস্কোর রেডস্কোয়ার থেকেও বড় বলে মনে হয়েছে তাঁর। কালচারাল প্যালেসের উন্নত অঙ্গসজ্জা তাঁর ভালোলেগেছিল।
এ প্যালেসেই পাক সাংস্কৃতিক দলের প্রথম অনুষ্ঠান হয়। সন্ধায় সাংস্কৃতিক দলের সম্মানে নৈশ ভোজের আয়োজন করেছিলেন চীন সরকার। সিকিয়াং হলে চীনের ভাইস চেয়ারম্যান ও সাংস্কৃতিক দলের নেতা শামসুল হুদা চৌধুরীর শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে ভোজপর্ব শুরু হয়েছিল। বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন এ নৈশ ভোজে ।
পিকিং এ দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায় পাক চায়না সোসাইটি অতিথিদের সম্মানার্থে এক সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। অনুষ্ঠানে পিকিং এর অনেক শিল্পী উপস্থিত ছিলেন। নৈশ ভোজ শেষে দুটি ডকুমেন্টারী ছবি দেখানো হয়। এর মধ্যে একটি ছিল পাক প্রেসিডেন্টের চীন সফর’ অপরটি চায়না রিপাবলিক-ডে উৎসবের ছবি। উৎসবের ছবিটি সাংস্কৃতিক দলকে মুগ্ধ করেছিল।
২৩শে মার্চ পাকিস্তান দিবস উপলক্ষে চীনে প্রথম অনুষ্ঠান করেন পাক-সাংস্কৃতিক দল। অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল দুতাবাসের তরফ থেকে। প্রথম নাচটি পূর্ব পাকিস্তানের বসন্ত নৃত্য দিয়ে শুরু হয়। এটি চীনাদের প্রচুর করতালি কুড়িয়েছিল। পুরো অনুষ্ঠানটি তাঁরা স্বতঃস্ফুর্ত আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করেন। ২৪শে মার্চ ছিল পিকিংবাসীর জন্যে প্রতিনিধিদলের প্রথম শো। এটিও খুব ভালো করেছিল দলের সদস্যরা।
২৫শে মার্চ সংগীত-নৃত্য একাডেমী দেখতে যান তাঁরা। লেখক লক্ষ্য করেছিলেন চীনারা পাশ্চাত্য যন্ত্রের ব্যবহার জানে তবুও তারা দেশী যন্ত্রই ব্যবহার করে। সংগীতকে তাঁরা শুধু বিনোদনের জন্য নয় দেশ গঠনের কাজেও লাগিয়েছে। এদের সংস্কৃতি যুগোপযোগী। দুপুরে The Museum of the china Revolution (বিপ্লবের মিউজিয়াম) দেখতে যান লেখক ও তাঁর দল। এ মিউজিয়ামের বিশেষত্ব হলো গত ১শ বছরের চীন বিপ্লবের ইতিহাস তৈলচিত্রের মাধ্যমে এখানে এঁকে রাখা হয়েছে।
মিউজিয়ামে রাখা বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো দু’ভাগে বিভক্ত। প্রথমটি হলো পুরোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন (১৮৪০-১৯১৯) দ্বিতীয়টি নতুন গণতান্ত্রিক আন্দোলন (১৯১৯-১৯৪৯) পর্যন্ত। পুরোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আফিম যুদ্ধের ছবি, আফিম পোড়ানোর ছবি, ইত্যাদি বিষয়গুলো বিশ্লেষণাত্মক।
পুরোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শেষের দিকে ডঃ সানইয়াসেন এর ভূমিকা গুরুত্ব পেয়েছে। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ডঃ সান-ইয়াৎ সেন ছিলেন চীনের প্রথম প্রেসিডেন্ট। চীনের সমাজসংস্কারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
নতুন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ২য় পর্যায়ে লেখক ঐতিহাসিক লংমার্চ এর অবশিষ্ট একমাত্র বেস্টটি দেখতে পেয়েছিলেন। ১৯২১ সালে চীনে কমিউনিষ্ট পার্টির জন্ম হয়। কমিউনিষ্ট নেতৃত্বে শুরু হয় বিপ্লবের জয়যাত্রা। মিউজিয়ামের শেষ ছবিটি মাও সে-তুঙ -এর। উল্লেখ্য তিনিই ঘোষণা করেছিলেন “পিপলস্ রিপাবলিক অফচায়না’ গণচীন প্রজাতন্ত্র। মিউজিয়ামটি পাক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকেও দেখানো হয়েছিল। পরিদর্শন শেষে তিনি নিম্নরূপ মন্তব্য লিপিবদ্ধ করেন।

It was a great experience to visit the museum depicting the chinese struggle for emancipation and liberation and illustrated in a most vivid from. It did my soul a lot of good to see how dedicated people struggled under the wise and dedicated leadership to find salvation. Such people with such a spirit can not help making history.
৭ম দিনে চীনের আর একটি সংগীত-নৃত্য একাডেমীতে যান প্রতিনিধিদল। সেখান থেকে লাঞ্চের আমন্ত্রণ পান তাঁরা রাষ্ট্রদূতের বাড়ী। লাঞ্চে পাকিস্তানী খাবার পেয়ে দলের সবাই খুব খুশী হয়েছিলেন। দুপুরের পর পিকিং এর ইম্পিরিয়াল প্যালেসে যান তাঁরা। প্রাসাদের সামনের যে তোরণ ঐটিকেই বলা হয় তিয়েন-আন- মেন স্কোয়ার।
চীনের ইম্পিরিয়াল প্যালেসকে নিষিদ্ধ নগরও বলা হয়। কারণ এক সময় এই প্রাসাদে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। স্থাপত্য শিল্পের এক দৃষ্টান্ত হয়ে আছে এ রাজ প্রাসাদ। প্রাসাদটিতে কক্ষের সংখ্যা ন’হাজার ন’শত। পৃথিবীর অন্য কোন প্রাসাদের সাথে এর মিল খুঁজে পাননি লেখক।
প্রাচীন সভ্যতার দেশ চীন। এ সভ্যতা পৃথিবীতে অনেক অবদান রেখেছে। চীনের সভ্যতা ও অবদানের কথা পৃথিবী মনে রাখবে, যতদিন এ বিশ্ব টিকে থাকবে। ছবি আঁকার পদ্ধতি চীনারাই প্রথম আবিষ্কার করেছিল। বিপ্লবের মিউজিয়ামটিতে দেড় হাজার বছরের ছবি আঁকার ইতিহাস ধরে রাখা হয়েছে। চীনা মাটির পোর্সেলিন চীনেই প্রথম আবিষ্কৃত হয়।
সাতাশে মার্চ দিনটি লেখক বিশেষভাবে মনে রেখেছেন। ঐদিন তিনি ও তাঁর দল গিয়েছিলেন চীনের মহাপ্রাচীর দেখতে। পিকিং শহর থেকে প্রাচীরের দূরত্ব প্রায় চল্লিশ মাইল। হাজার হাজার মাইল দীর্ঘ চীনের এই প্রাচীর সমতল নয়। তিন হাজার বছর আগে উত্তর চীনের রাজারা হুন আক্রমণ প্রতিহত করার লক্ষ্যে বিচ্ছিন্নভাবে এই প্রাচীর নির্মাণ করেন। পরে চিন রাজবংশ বিচ্ছিন্ন প্রাচীরগুলোকে যুক্ত করে দেয়।
চীনের সার্বিক বিকাশে এই মহাপ্রাচীরের গুরুত্ব উল্লেখযোগ্য। প্রাচীরের প্রস্থ ১৫ হাত। ‘গ্রেট ওয়াল চীনের জাতীয় শক্তি। চীনা জাতীয় সংগীতে একটি লাইন আছে- ‘এসো আজ আমরা গড়ে তুলি আমাদের রক্ত মাংস দিয়ে আর একটি নতুন মহাপ্রাচীর’।
গ্রেট ওয়াল দেখে প্রতিনিধিদল গেলেন মিং রাজাদের সমাধিক্ষেত্রে। সাইপ্রাস আর পাইনঘেরা পাহাড়ের নীচে রয়েছে মিং রাজবংশের তেরটি সমাধি। এখানকার রাস্তার দুপাশে সার বেঁধে মানুষ আর জীবজন্তুর প্রতিমূর্তি লেখকের চোখে পড়েছিল। মাটির নীচে অবস্থিত সমাধিক্ষেত্রটি নির্মাণে প্রচুর টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
মিং সম্রাটরা বেঁচে থাকতেই মাটির নীচে প্রাসাদ বানিয়ে রাখতেন। মৃত্যুর পর তাদের মৃতদেহ সেই প্রাসাদে আনা হতো। সেই সাথে তাদের সমস্ত ঐশ্বর্যও সেখানে নিয়ে আসা হতো। মিং রাজবংশের শেষ রাজা ছিলেন ‘ওয়ান লি’। মাটি থেকে চুয়াল্লিশ হাত নীচে এই সমাধিগৃহে আধুনিকতার ছাপ সর্বত্রই চোখে পড়ে।
দুপুরে দূতাবাসের পক্ষ থেকে লাঞ্চের আয়োজন করা হয় চীনের বিখ্যাত পিকিং ডাক রেস্টুরেন্টে। পিকিং এর হাঁস ফ্রান্স, ইংল্যান্ডের কাছে খুব প্রিয় খাবার। চীনারা বিশেষ পদ্ধতিতে হাসগুলোকে বড় করে এবং বিশেষ পদ্ধতিতে রোস্ট করে। পিকিং ডাক’ লেখক ও তাঁর দলকে তৃপ্তি দিয়েছিল।
লাঞ্চ শেষে পাক-দল পিকিং এর গ্রীস্ম প্রাসাদ দেখতে যান। বিরাট হ্রদের ধারে পাহাড়ের গা ঘেঁষে প্রাসাদটি নির্মাণ করা হয়েছে। গ্রীস্মাবাসের মোহনীয় সৌন্দর্য উপভোগ করবার জন্য প্রতিদিনই এখানে বহু দর্শক এসে ভীড় করে। হ্রদের জলে নৌকা করে ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক দলের সম্মানে ছিল এক বিদায় ভোজ। চীনের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ভোজ শেষে পিকিং এর দিনগুলোকে মনে রাখবার জন্য তাঁরা দলের প্রত্যেককে উপহার দিয়েছিলেন।
২৭শে মার্চের রাত্রিই ছিল প্রতিনিধিদলের পিকিং এর শেষ রাত। আটাশে মার্চ সকালে পিকিং রেলওয়ে ষ্টেশনে বিদায় সম্বর্ধনা শেষে লেখক ও তাঁর দল ট্রেনে তেনজিন এর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। সংগে দোভাসীসহ ছিলেন কমিশন ফর কালচারাল রিলেশন এর ডিরেক্টর মিঃ কোয়ান পি। পিকিং থেকে ১০০ মাইল দূরে তেনজিন শহর।
তেনজিনের পথে যেতে যেতে লেখক দেখতে পেয়েছিলেন রেললাইনের দুধারে বিস্তৃত ফসলের ক্ষেত। মেয়ে পুরুষ মিলে ক্ষেতে কাজ করছে সবাই। সেখানকার একটি বৈশিষ্ট্য তাঁর ভালো লেগেছিল ; যেখানেই কাজ হচ্ছে সেখানেই সেই ক্ষেতের পাশে তারা লাল পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে শক্তি ও একতা।
তেনজিন এসে পৌঁছলে ঢোল, কাসর ইত্যাদি বাজিয়ে স্বাগত জানানোর পালা শেষে লেখক তাঁর দল নিয়ে গাড়ীতে উঠে যান হোটেলের উদ্দেশ্যে। তেনজিন শহর পিকিং এর মত নয়। এটিকে ইউরোপের কোন শহর বলে ভুল হয়। পিকিং থেকে নদীপথে বের হবার মুখে এই শহরটিতে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন শক্তি স্থায়ী হয়ে বসেছিল। বাণিজ্যঘাটি স্থাপন করেছিল এরা প্রত্যেকেই। ইউরোপের শক্তিগুলো ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইটালী, জার্মানী, হল্যান্ড, বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া নিজেদের সুবিধামত তেনজিন শহরকে সাজিয়েছিল।

পাক-দলকে নিয়ে গাড়ী এসে যে হোটেলে থামল সেটির নাম এসটর হোটেল। হোটেলটির সামনেই রয়েছে পার্ক। এক সময় এ পার্কে নোটিশ ঝোলান ছিল চীনা এবং কুকুরের প্রবেশ নিষেধ।
তেনজিন শহরে পাক সাংস্কৃতিক দলের প্রোগ্রাম ছিল দু’দিন। সন্ধ্যায় অতিথিদের সম্মানার্থে সম্বৰ্ধনা ভোজ ছিল গভর্ণরের পক্ষ থেকে। যে বাড়ীটিতে ভোজের আয়োজন করা হয়েছিল এটি এক সময় শেতাঙ্গদের ক্লাব ছিল। গভর্ণর সাংস্কৃতিক দলকে অভিনন্দন জানিয়ে ভোজ পর্ব শুরু করেছিলেন। সভা শেষে শ্বেত ভালুক নামে একটি অপেরা দেখান তারা প্রতিনিধিদলকে। কোরিয়া যুদ্ধের কাহিনী ভিত্তিক ছিল অপেরাটি। যারা অভিনয় করেছিল তারা সবাই ছিল কৃষক মঞ্জুর শ্রেণীর। আধুনিক সাঁচে ঢেলে অপেরাটি সাজানো হয়েছিল।
তেনজিন শহরে রয়েছে বড় বড় কলকারখানা। কার্পেট তৈরীতে চীনাদের সুনাম রয়েছে। কার্পেট কারখানা ঘুরে লেখক দেখতে পেয়েছিলেন চীনারা মেয়ে-পুরুষ সবাই মিলে কারখানায় কাজ করে। তারা কার্পেটের ওপর বড় বড় প্রাকৃতিক দৃশ্য বোনে। এটাই চীনা কার্পেটের বৈশিষ্ট্য। লেখক তাদের বেতন সম্পর্কে জানতে চাইলে ফ্যাক্টরী প্রদর্শক জানিয়েছিলেন কোন কোন কারিগরের বেতন প্রায় ম্যানেজারের সমান।
জেড় পাথর চীনাদের মূল্যবান সম্পদ। পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো জেড় পাথর চীনে পাওয়া যায়। ে ফ্যাক্টরী ঘুরে লেখক দেখেন সেখানে কর্মরত প্রত্যেকেই নিপুন হাতে খোদাই করছে বিভিন্ন রং এর মূর্তি।
৩০শে মার্চ রাতে তেনজিনে সাংস্কৃতিক দলের প্রথম অনুষ্ঠান হয়। পিকিং এর মত এখানেও আছে বড় অডিটোরিয়াম, স্টেজ। পাক-দল পরিবেশিত পুরো অনুষ্ঠানটিই চীনা টেলিভিশনে দেখানো হয়েছিল।
চীনের প্রত্যেকটি বড় বড় শহরে বিদেশীদের কেনাকাটার সুবিধার্থে রয়েছে ফ্রেন্ডশীপ ষ্টোর। ব্যাংক থেকে ডলার ভাঙ্গিয়ে নেবার সময় বিদেশীদের একটি করে কার্ড দেয়া হয়। এই কার্ড দেখিয়ে ক্রেতারা যে কোন ফ্রেন্ডশীপ ষ্টোর থেকে অর্ধেক দামে জিনিসপত্র কিনতে পারেন। বিদেশীদের জন্য এ ধরনের সুবিধা শুধুমাত্র চীনেই আছে।
তেনজিনে সাংস্কৃতিক দলের ৩১শে মার্চই শেষ অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠান শেষে পিকিং এর মতো এখানেও বিদায় ভোজের আয়োজন ছিল। ডিনার শেষে তেনজিনের দিনগুলোকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য তাঁরা দলের সবাইকে উপহার দিয়েছিলেন। নৈশ ভোজের আকর্ষণীয় বিষয় হোটেলের মেড, খানসামা বাবুর্চি সবাই মিলে গান শুনিয়ে প্রতিনিধিদলকে মুগ্ধ করেছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ম্যাজিকও দেখাতে পেরেছিল। পরদিন দুপুরে সাংস্কৃতিক দল তেনজিন থেকে সাংহাই এর পথে রওনা হয়ে যান।
তেনজিন থেকে সাংহাই পৌঁছতে ছাব্বিশ ঘন্টারও বেশী ট্রেনযাত্রা করেন প্রতিনিধিগদল। যেতে যেতে লেখক দেখতে পান রেললাইনের পাশে সবুজ ধানের ক্ষেত। সেখানে নীল পোশাক পরে কাজ করছে চীনা ছেলে মেয়েরা। সবুজ ধানের ক্ষেত লেখককে স্বদেশের দৃশ্য মনে করিয়ে দিয়েছিল। এছাড়াও পথে তিনি পীত নদী, ইয়াংসি নদী দেখতে পান। একসময় পীত নদীর বন্যা ছিল চীনের আতঙ্ক। বিপ্লবোত্তর চীনে এখন আর তা নেই। কঠোর পরিশ্রমের ফলে এ নদীকে তাঁরা আয়ত্তে এনে ফেলেছে।
পথে নানকিং শহরে নেমে লেখক ও তাঁর দল ডঃ সান-ইয়াৎ সেনের সমাধিক্ষেত্র ঘুরে আসেন। ১৯১১ সালের “সিন হাই” বিপ্লব সংঘটিত হয় ডঃ সান ইয়াৎ সেনের নেতৃত্বে। এ বিপ্লবের ফলে দু’হাজার বছরের পুরোনো রাজতন্ত্রের অবসান হয়েছিল। বিপ্লবের সময় তিনি নানকিং-এ প্রাদেশিক গভর্ণমেন্ট স্থাপন করেন এবং নিজে প্রাদেশিক প্রেসিডেন্ট হন। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে পার্পল পাহাড়ের পাদদেশে সমাধিস্থ করা হয়।
সমাধিক্ষেত্র থেকে তাঁরা যান চীনের অনেক পুরোনো লেক ‘হুসুয়ান হু’ দেখতে। প্রবাদ আছে, প্রায় দেড় হাজার বছর আগে লিউ সুং সম্রাটদের রাজত্বকালে এই লেকে দেখা গিয়েছিল একটি ‘কালো ড্রাগন’। ‘হুসুয়ান হু’ যার অর্থ হচ্ছে কালো ড্রাগন এই নামেই লেকের নামকরণ করা হয়। লেকের পাড়ে জনসাধারণের জন্য রয়েছে পার্ক। অসংখ্য ফুলে ছেয়ে ছিল পার্কটি।
চীনের সবচেয়ে বড় নগর সাংহাই। সন্ধ্যা ছ’টায় সাংহাই পৌঁছলে সেখানকার কিশোর কিশোরীরা মুঠি মুঠি ফুল দিয়ে তাঁদের অভ্যর্থনা জানায়। রাস্তার দু’পাশে সারবেঁধে ছেলেমেয়েরা ঢোল, কাসর বাজিয়ে সাংস্কৃতিক দলের আগমনে আনন্দ প্রকাশ করেছিল। রাতে অতিথিদের সম্মানার্থে নৈশ ভোজের আয়োজন করেন। সাংহাই এর ভাইস মেয়র।
৩রা এপ্রিল সাংহাই এ অনুষ্ঠিত হয় প্রতিনিধিদলের প্রথম অনুষ্ঠান। ভিলেজ ফেয়ার’ নামে একটি নৃত্যনাট্য তাঁরা পরিবেশন করেছিলেন। সাংহাইবাসীর প্রচুর প্রশংসা পেয়েছিল প্রদর্শিত নৃত্য নাট্যটি। তরা এপ্রিল থেকে পর পর তিনদিন তাঁরা একই হলে অনুষ্ঠান করেন।
৫ই এপ্রিল সাংস্কৃতিক দল যান সেখানকার একটি সংগীত-নৃত্য একাডেমী দেখতে। কদিনেই তাঁরা চীনের বহু একাডেমী ঘুরে দেখেছেন। দেশীয় এবং পাশ্চাত্য সংগীত দুটোতেই চীনারা সমান পারদর্শী। বিপ্লবের পূর্বে চীনের সংগীতের মান ছিল অনেক নীচে। বিপ্লবোত্তর দেশে দেয়া-নেয়ার রীতি অনুসরণ করে তাঁরা শিল্পকে করেছে অনেক উন্নত। পাশ্চাত্য টাইল নিয়ে অনেক দেশই হারিয়ে ফেলেছে তাদের স্বকীয়তা। শুধু চীনারাই পেরেছে অপরের ধরনটির ভেতরও নিজস্বতা বজায় রাখতে। তারা জাতীয় প্রেরণার জন্য কোরাস গানকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। লেখক কিছু গানের ইংরেজী অনুবাদ সংগ্রহ করেছিলেন।
The sun rises in the East, The commune is the Red sun. March on motherland, The East is in Red glow, Unity is strength ইত্যাদি।
চীন সম্পর্কে লেখক দোভাষী মিঃ কোয়ান এর কাছে কিছু জানতে চাইলে তিনি জানিয়েছিলেন চীনের পয়ষট্টি কোটি লোক দুবেলা খেতে পায়, পরনের কাপড় পায়। পায়ে জুতোও রয়েছে সবার। চিকিৎসা ও লেখাপড়ার জন্য কোন খরচের প্রয়োজন হয়না। চীনে মটর কার নেই কেন ? এই প্রশ্নের জবাবে কোয়ান পি জানিয়েছিলেন মোটর তৈরীর কারখানা তাদের আছে ইচ্ছে করলেই তারা হাজার হাজার গাড়ী সাংহাই এর রাস্তায় নামিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তাতে চীনের সব মানুষ যে আজ খেতে পরতে পারছে তাতে টান পড়বে ।
বিলাসিতা করবার মত পর্যায়ে তারা তখনও পৌঁছাননি বলে তিনি জানান। লেখক লক্ষ্য করেছিলেন চীনে সুন্দর সিল্ক পাওয়া যায় বটে, তবে চীনারা কেউ সিল্ক পরেনা।

সাংহাই এর এক মিউজিয়ামে গিয়েছিলেন সাংস্কৃতিক দল। মিউজিয়ামটির বিশেষত্ব হলো চীনের সামাজিক উন্নতির ক্রমবিকাশের ধাপগুলো আলাদা করে দেখানো হয়েছে এখানে। তিনহাজার বছরের পুরোনো মৃৎপাত্র থেকে শুরু করে ৮৭৮ খৃষ্টপূর্ব পর্যন্ত চাউ বংশের জিনিসপত্র সংরক্ষণ করা হয়েছে এ মিউজিয়ামে। এছাড়াও রয়েছে সমকালীন চারুকলা ও বিভিন্ন হস্তশিল্প। শিল্পী সান উই চাও চি, এবং ওয়াং সেং প্রভৃতি হাজার বছরের পুরোনো শিল্পীদের আঁকা ছবি দর্শকদের মুগ্ধ করে।
সাংহাই এ সাংস্কৃতিক দলের শেষ অনুষ্ঠানের দিন লেখককে তাঁরা পিকিং অপেরা দেখাতে নিয়ে যান। অপেরা সম্পর্কে লেখকের মনে যে ধারনাটি ছিল পিকিং অপেরা ‘লাল লণ্ঠন দেখে তা দূর হয়ে যায়। চীনের বিপ্লবের সাথে সাথে এদের সবই বদলেছে। পুরোনো যা কিছু সবই নতুনত্বের ছোঁয়ায় ঝলমল করছে। তবে পুরোনো ঐতিহ্যের উপর ভর করেই তারা নতুনের দিকে এগিয়েছে। তাদের কথা হলো-
“The correct way to develop peaking opera is to make innovation on the caking basis of our heritage”. শিল্পের সব ক্ষেত্রেই লেখক চীনাদের বলতে শুনেছেন “Tradition canot be used blindly without change. ” লাল লণ্ঠন’ অপেরার চরিত্রগুলো অনেক জায়গাই ট্রাডিশনকে ভেঙ্গে দিয়েছে।
চীনারা বিশ্বাস করে উন্নতির লক্ষ্যে সবসময়ই পরিবর্তন আনা যায়। তাঁরা বলে “To carry on tradition and at the same time make creative changes in them” সেদেশের নেতা মাও সে- তুঙ শিল্পীদের আহ্বান জানিয়েছিলেন “Weed through the old to let the new emerge
শেষদিন লেখক ও তাঁর দল গিয়েছিলেন সাংহাই এর শিল্প প্রদর্শনী দেখতে। প্রদর্শনী ঘুরে বোঝা যাচ্ছিল গত পনের বছরে এদের শিল্পোন্নতির উল্লেখযোগ্য অগ্রযাত্রা হয়েছে। চীনের পুরোনো চিকিৎসা আকুপাংচার-নতুন চীনে নতুন পদ্ধতিতে চলছে। কংক্রিটের তৈরী জাহাজের খোল বানাচ্ছে তারা। এমনি সব কিছুতেই এসেছে নতুন ধারা।
দুপুরে বিদায় ভোজ শেষে পিকিং এবং তেনজিনের মতো এখানেও দলের প্রত্যেককে তারা উপহার সামগ্রী দিয়েছিলেন। ঢোল-কাঁসর বাজিয়ে অতিথিদের বিদায় জানাতে এসেছিল সাংহাই এর ছোট ছোট ছেলে- মেয়েরা। সাংহাই থেকে বিদায় নিয়ে ৩৬ ঘণ্টার ট্রেন জার্নি করে পাক-সাংস্কৃতিকদল ক্যান্টন এসে পৌঁছান ।
ক্যান্টনে এসে লেখক প্রথম চীনের কমিউন দেখবার সুযোগ পেয়েছিলেন। অনেকগুলি গ্রামকে একত্রিত করে এক একটি কমিউন গঠন করা হয়। সমগ্র চীন জুড়ে রয়েছে এই কমিউন ব্যবস্থা। কমিউনে জমির মালিক হন সাধারণ কৃষক সম্প্রদায়। কৃষি ছাড়াও সেখানে রয়েছে নানা ধরনের কলকারখানা। পাক-দল কমিউন দেখে ক্যান্টনের হাসপাতাল, বাজার ইত্যাদি ঘুরে দেখেন। চীনের কোথাও এতটুকু ময়লা তাদের নজরে পড়েনি। পরিষ্কার ঝকঝকে পরিবেশ সেদেশের সর্বত্রই বিরাজমান।
ক্যান্টনেই সাংস্কৃতিক দলের শেষ অনুষ্ঠান ছিল। পাক-শিল্পীরা চীন-দেশের শেষ অনুষ্ঠানে একটি চীনা নাচ দেখিয়েছিলেন। মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান পরিবেশনার জন্য প্রচুর প্রশংসা অর্জন করেছিলেন প্রতিনিধিদল আর চীনারা পেয়েছিল অনেক আনন্দ ।
তিন
আবদুল আহাদ মূলত সংগীত শিল্পী। একজন সংস্কৃতিবান মানুষ হিসেবে তিনি যে শুধু চীনের গণজীবনের সাংস্কৃতিক দিকটাই দেখে এসেছেন তা নয়। সংস্কৃতি ছাড়াও সেদেশের বিভিন্ন দিক তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। চীন দেশের যেখানেই তিনি গিয়েছেন সর্বত্রই তাঁর আগ্রহী ও অনুসন্ধিৎসু মন ক্রিয়াশীল থেকেছে। পিকিং, তেনজিন, সাংহাই ও ক্যান্টনের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে তিনি সে দেশের স্বাতন্ত্র্য, উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এবং স্বদেশের সাথে তুলনায় চীনের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ব্যাপারটি স্পষ্ট করেছেন।
চীনের হাজার বছরের পুরোনো রাজধানী পিকিং এর রাস্তায় বেরিয়ে সমাজতান্ত্রিক দেশের স্বাতন্ত্র্য্য লেখকের চোখে পড়েছিল। বিরাট রাজধানী পিকিং এর কোথাও ভীড় নেই। কোলাহলহীন সুশৃংঙ্খল সমাজব্যবস্থা কমিউনিষ্ট রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। তিনি বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিলেন সে দেশের সব মানুষই একরকম পোশাক পরে যার রং নীল। পোশাকের রংটি যেমন মেঘমুক্ত জীবনের প্রতীক তেমনি তাদের অনাবিল অন্তরের স্বচ্ছতাটুকুও তাতে প্রতিফলিত হয়।
নীতিগত আদর্শের দিক থেকেও চীনারা আশ্চর্য সাফল্য অর্জন করেছে। নৈতিক আদর্শের গুণে চীনে কোথাও কারো কিছু হারানো যায় না। কারউ কিছু হারিয়ে গেলেও সেই জিনিস তার মালিককে ফেরৎ দেবার ব্যবস্থা সেদেশের সর্বত্রই দেখেছেন লেখক।
আমাদের প্রথম সেক্রেটারী জিনিস হারাবার একটি গল্প বলল, এ্যামবেসির বিশেষ পদস্থ এক অফিসারের স্ত্রীর হাত থেকে একটি সোনার চেন রাস্তার খুলে পড়ে যায়। জিনিসটা বেশ দামী ছিল। ক’দিন পরে অনেক ভেবে-চিন্তে যখন পুলিশকে জানাতে গেলেন-যে পুলিশ অফিসারটি ডিউটিতে ছিলেন তিনি বললেন, “আপনার সোনার চেনটি ওখানে রাখা হয়েছে, নিয়ে যান”।
পিকিং-এর এক চীনা নাগরিক কুড়িয়ে নিয়ে জমা দিয়ে গেছে। বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় না কিন্তু অনেক অসম্ভবই এই চীনে সম্ভব হয়েছে আজ। ৬৫ কোটী লোকের চরিত্র গেছে একেবারে বদলে। পুরোনো গ্লানিকে এরা মুছে ফেলেছে জাতীয় জীবন থেকে। ২
চিকিৎসার ক্ষেত্রে লেখক লক্ষ্য করেছিলেন চীনাদের ইনজেকশন দেবার পদ্ধতিটিও আলাদা। এই পদ্ধতিতে ইনজেকশন দেবার সময় কোন ব্যাথা অনুভূত হয়না। পাকিস্তানে এ ধরনের ব্যাথাবিহীন ইনজেকশন পদ্ধতি নেই। তিনি আরও লক্ষ্য করেছিলেন চীনে আকুপাংচার নামক এক ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে যা ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও অন্যান্য দেশে জনপ্রিয়।
লেখক সেদেশে যেসব রাজবাড়ী দেখেছিলেন তার সাথে দেশীয় রাজবাড়ীর কোন মিল তিনি খুঁজে পাননি। চীনের স্থাপত্য শিল্পের সংগে তিনি স্বদেশের শিল্পের বিস্তর পার্থক্য লক্ষ্য করেছিলেন।
কমিউনিষ্ট রাষ্ট্রে সাংস্কৃতিক দিকটার উপরই যে বিশেষ নজর দেয়া হয় এ বৈশিষ্ট্যটি লেখকের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। চীনা সংগীতের বিশেষত্ব এবং তাদের বাদ্যযন্ত্রগুলোর ব্যবহারিক নৈপুণ্য তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। লেখক লক্ষ্য করেছিলেন চীনারা পাশ্চাত্য যন্ত্রগুলো খুব ভালোভাবে বাজাতে পারে। সাংস্কৃতিক দিক থেকে তারা নিজস্ব ভাবধারার ভেতর পাশ্চাত্য সংগীতের মিশ্রণ ঘটিয়ে শিল্পকে করেছে আরও উন্নত।
নিজেদের অভাবটুকু তারা পূরণ করেছে পশ্চিমা উপাদানের মৌলিক বিষয়গুলোর প্রয়োজনীয় দিকগুলো নিয়ে। এতে তারা কিছুমাত্র লজ্জিত নয়। তারা ভাবে নিজের যা কিছু অপ্রয়োজনীয় তা বাদ দিয়ে অন্যের যা ভালো তা গ্রহণ করার ভেতর কোন দীনতা নেই। এটা বরং সম্পূরকনীতি। প্রগতিশীল বিশ্বে টিকে থাকতে হলে এ নীতি মেনে চলা উচিৎ। পাকিস্তানও পাশ্চাত্য রীতিকে গ্রহণ করেছে তবে সেখানে রয়েছে দ্বিধা। তাই সেই সংগীত শিল্প না হয়ে হয়েছে বিকৃতরূপ।
তিনি দেখেছিলেন চীনা সংস্কৃতিতে রয়েছে সেদেশের জাতীয় জীবনের বিভিন্ন চিত্রের রূপায়ণ। প্রত্যেকটি সংগীত, নৃত্যে, অভিনয়ে রয়েছে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা ও আদর্শের ইংগিত। শুধুই আনন্দ দেবার জন্য তাদের কোন নৃত্য-গীত নেই। সেদেশে রাষ্ট্রীয় আয়ের একটা বিরাট অংশ ব্যয় হয় শিল্প এবং শিল্পীর জানো। চীনের শিল্পীরা সবচেয়ে বেশী বেতন পেয়ে থাকে এবং তাদের মর্যাদা সবার উচ্চে। রাষ্ট্রের অমূল্য সম্পদ হিসেবে শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখবার এবং তাদের শিল্প বিকাশের পরিপূর্ণ সুযোগ দেয়ার দায়িত্ব সরকারই পালন করে থাকেন। লেখক গণচীনের সংস্কৃতির ধারার এক সম্পূর্ণ নতুন সৃষ্টির প্রয়াস লক্ষ্য করেছিলেন।

স্বদেশের কথায় লেখক বলেছেন পাকিস্তানীরা মনে করে পাশ্চাত্য রীতিতে কণ্ঠশীলন করলে দেশী গান গাওয়া যায় না। এ ভুল ধরণা নিয়ে তারা ক্রমশই পিছিয়ে পড়ছে। অথচ চীনারা সমস্ত ভুল এবং ভ্রান্ত ধারণার উর্ধ্বে উঠে তাদের সংগীত শিল্পকে দৃষ্টান্তমূলকভাবে উন্নত করেছে।
চীনারা প্রত্যেকেই একযোগে বিলাসিতাকে বর্জন করেছে। তারা ইচ্ছে করলেই সৌখিন জীবন যাপন করতে পারে কিন্তু দেশের প্রতিটি মানুষের সুখের কথা ভেবে তারা জাতীয় জীবন থেকে বিলাসিতাকে নির্বাসন দিয়েছে। বিরাট সাংহাই নগরীর রাস্তায় তেমন সংখ্যক মোটর কার নেই। অথচ তাদের গাড়ী তৈরীর কারখানা রয়েছে এবং তারা চাইলেই হাজার হাজার মটর কার সাংহাই নগরীর রাস্তায় নামিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তাতে নাগরিক সুখ অর্থাৎ ৬৫ কোটি মানুষ যে দু’বেলা পেট ভরে খেতে পারছে তাতে টান পড়বে।
তবে তারা বিদেশীদের কেনাকাটার সুবিধার্থে খুলে রেখেছে ফ্রেন্ডশীপ ষ্টোর। দেশের সর্বত্রই এ ধরণের স্টোর রয়েছে। এ ধরণের ষ্টোর থেকে অতিথিরা আসলের চেয়ে কম দামে পণ্য সামগ্রী কিনতে পারে। লেখক ফ্রেন্ডশীপ ষ্টোর থেকে সুন্দর সিল্ক সার্ট কিনেছিলেন। অথচ চীনারা কেউ সেই সিল্ক ব্যবহার করে না। তিনি আরও লক্ষ্য করেছিলেন তারা অপচয় একদম পছন্দ করে না। সেখানকার একটুকরো জমি কোথাও অনাবাদী পড়ে থাকতে দেখেন নি তিনি। সময়ের প্রতিটি মুহূর্তকে তারা উন্নয়নের কাজে লাগায়।
চীনা শৃঙ্খলা, কর্তব্যবোধ, অবিচলতা ও সহনশীলতা লেখককে মুগ্ধ করেছে। সাংস্কৃতিক দল বহু প্রোগ্রাম করেছে চীনে। কোথাও কোন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তাঁর নজরে পড়েনি। স্বদেশে এমনটি তিনি দেখেননি কোথাও।
দু’ঘন্টার অনুষ্ঠানের ফাঁকে একটা দৃশ্য বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। উইংসের পাশে যে প্রশস্ত জায়গা রয়েছে তারই এক কোণে টেবিলের উপর সাজানো চা, কফি, অরেঞ্জ, স্কোয়াস হঠাৎ করে যদি কোন শিল্পীর প্রয়োজন হয়। টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের হোটেলেরই একটি মেইড। যতক্ষণ অনুষ্ঠান চলেছে মেয়েটিকে টেবিলের কাছ থেকে এক পাও নড়তে দেখিনি। কি কর্তব্যবোধ! ইচ্ছা করলেই তো কয়েক পা এগিয়ে এসে উইংসের পাশে থেকে ভাল করে নাচ দেখতে পারত। কিন্তু তার যে ডিউটি টেবিলের কাছে, কেন সে নড়বে। তিনদিন এখানে আমাদের অনুষ্ঠান হলো এই তিন দিন মেয়েটিকে একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।
চীনের প্রত্যেকটি মানুষের সমঅধিকারের ব্যাপারটি তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। সাম্যের দেশে রয়েছে প্রত্যেকটি মানুষেরই সমান অধিকার। সেখানে কৃষক শ্রমিক থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত সকলেই সমমর্যাদাসম্পন্ন। সেখানে কে কি কাজ করে সেটা বড় কথা নয়, সে যে মানুষ সেটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় পরিচয়। সে দেশে একজন উচ্চপদস্থ অফিসারের সাথে একজন সাধারণ শ্রমিক দ্বিধাহীনভাবে ওঠা বসা করতে পারে।
লেখক চীনাদের আতিথেয়তার প্রশংসা করেছেন। তিনি লক্ষ্য করেছেন তারা যে কোন বিষয়ে আন্তরিক এবং হাসোজ্জ্বল। চীনের বহু জায়গায় সাংস্কৃতিক দলকে অনুষ্ঠান করতে হয়েছে। সবখানেই তিনি দেখতে পেয়েছেন আন্তরিকতায় ভরা এক ঘরোরা পরিবেশ। তারা প্রত্যেকেই ব্যাবহারে অমায়িক। কোন বাঁধাই যেন তাদের এতটুকু বিচলিত করে না।
কালচারাল টিমের দু’জনের জল বসন্ত বেরিয়েছিল তারা অসুস্থ অতিথিদের সেবায় বিন্দুও ত্রুটি করেননি। মিঃ কোয়ান এবং মিঃ ওয়াং সহ চিকিৎসকরা সবসময়ই তাদের পাশে পাশে ছিলেন কিছুমাত্র বিরক্তি প্রকাশ না করেই। আবার সাংস্কৃতিক দলের ২৪ দিনের প্রোগ্রাম তৈরী হয়ে যাবার পর যখন আকস্মিকভাবে সেটা ২১ দিনে ফিরিয়ে আনতে হলো তখনও তারা ছিলেন ধীর এবং শাস্ত। কোন হৈ চৈ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনেন। চীনা চরিত্রের এসব বৈশিষ্ট্যগুলি সত্যিই গর্ব করার মত বিষয় বলে মনে হয়েছে তাঁর।
সেদেশের আর একটি বৈশিষ্ট্য লেখককে মুগ্ধ করেছিল; সেটি তাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা। তিনি চীনের যেখানেই গিয়েছেন সর্বত্রই পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তাঁর নজরে পড়েছিল। ঝকঝকে উজ্জ্বল পরিপাটি পরিবেশ চীনাদের পছন্দ যা স্বাস্থ্যরক্ষায় ও পরিবেশগত ভারসাম্যরক্ষার উপযোগী। তিনি দেখেছিলেন রাস্তার ধারে একটু পর পর পোরসেলিনের তৈরী নীল এবং সাদা রং মেশানো ডাস্টবিন বসানো রয়েছে। অনেকটা চিঠির বাক্সের মত দেখতে, উপরটা বন্ধ। ময়লা ফেলতে হয় এর মধ্যে ফেলে দিলেই সব ঝামেলা ঢুকে যায়।
চীনের কিছু কিছু প্রাকৃতিক দৃশ্যের সাথে পাকিস্তানের প্রকৃতির সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন লেখক। সেখানে তিনি পাকিস্তানের মতই ধানক্ষেত দেখতে দেয়েছিলেন। তবে সেদেশে নারী-পুরুষকে যেমন একসাথে কাজ করতে দেখেছেন পাকিস্তানে তেমনটি দেখা যায় না।
রেল লাইনের নীচে ক্ষেতের পাশে কোথাও কোথাও পানি জমে রয়েছে। এ যেন ঠিক আমার দেশের দৃশ্য। পানিতে ভরা ক্ষেতগুলির মধ্যে সবুজ ধানের চারা মাথা তুলে রয়েছে। সারি বেঁধে নীল জামা, নীল প্যান্ট, মাথায় মাথাল দেওয়া মেয়েরা ধানের চারা তুলে তুলে লাগাচ্ছে। প্রাণ ভরে যায় এ দৃশ্য দেখে। 8
চীন যদিও সুপ্রাচীন কাল থেকে পাকিস্তানের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বিরাজিত কিন্তু নানা প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতায় এ দু’দেশের মধ্যে মৈত্রী বন্ধন তেমন শক্ত হতে পারেনি। উত্তরের সুউচ্চ হিমালয় ও পামির মালভূমি এবং পূর্ব-দক্ষিণের সমুদ্ররাজী উভয় দেশকে বহুকাল যাবৎ পৃথক করে রাখলেও সাংস্কৃতিক ভাবধারার আদান-প্রদান প্রাচীনকাল থেকেই দু’দেশকে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ করেছে।
চীনের পরিব্রাজক ফাহিয়েন, হিউয়েন সাং ও সু ইয়ান এরা শত বাঁধা বিপত্তি এড়িয়ে এদেশে এসেছিলেন ও এদেশের কয়েকজন পরিব্রাজক চীনে যান। কাশা মাতঙ্গ প্রথম বৌদ্ধের বানী প্রচারের উদ্দেশ্যে চীনে গিয়েছিলেন সম্রাট লি টিং এর রাজত্বকালে। তিনি এবং তার অনেক শিষা চীনেই স্থায়ীভাবে রয়ে গিয়েছেন। এভাবে দু’দেশের সভ্যতা ও কৃষ্টির মধ্যে একটা সাদৃশ্যের ভাব বজায় রয়েছে।
মাঝখানে অবশ্য দু’টি দেশেরই ভাগ্য বিপর্যয় ঘটেছিল পরে এ দু’দেশই তাদের হারানো স্বকীয়তা স্বাধীনতা ফিরে পায় এবং দু’দেশের মধ্যে যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। লেখক সবিস্ময়ে লক্ষ্য করেছিলেন একসময় চীন বলতে যে একটি কঙ্কারসার চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠত নতুন চীনে তার অস্তিত্বটুকু কোথাও নেই। সমগ্র চীন দেশ ও জাতি আজ এক দৃপ্ত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে নতুন উদ্যমে।

চার
‘গণচীনে চব্বিশ দিন’ একটি প্রাণবন্ত ভ্রমণ কাহিনী। এর ভাষা এবং বাচনভঙ্গী এত সহজ ও ঝরঝরে যে গ্রন্থটি পাঠ করলে মনে হয় পাঠক নিজেই উক্ত সাংস্কৃতিক দলের সদস্যরূপে চীন সফরে ব্যাপৃত আছেন। একজন সঙ্গীত শিল্পীর পক্ষে সাহিত্যের অলিগলির ধাঁধায় পা না ফেলে মুক্ত মন ও মুক্ত চিন্তা নিয়ে লিখেছেন তিনি। লেখকের এই প্রথম সাহিত্যকীর্তি – সেই হিসেবে প্রথম প্রয়াসেই যে তিনি এতটা কৃতিত্বের দাবিদার হতে পেরেছেন তা সত্যিই উল্লেখের বিষয় ।
প্রথম রচনা হিসেবে তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে ত্রুটি কম। গল্প বলার ঢং এ লিখেছেন তিনি। কাহিনীর গতিময়তাও একঘেঁয়ে নয়। একজন সংস্কৃতিবান মানুষ হিসেবে লেখক যে শুধু চীনের গণজীবনের সাংস্কৃতিক দিকটাই দেখে এসেছেন তা নয়। তিনি নব্য চীনের জীবনধারার বিভিন্ন দিক নানা তথ্যবহুল আলোচনার আলোকপাত করেছেন তাঁর রচনায়।
পিপলস রিপাবলিক অব চায়না অর্থাৎ গণচীন প্রজাতন্ত্র নামকরণের নেপথ্য কাহিনী, পুরোনো চীনের ইতিহাস- রাজনীতি, চীনের সাফল্য, চীনের সামগ্রিক উন্নতি, চীনের সাহিত্য, কাব্য, কলা, বিজ্ঞান তথা সভ্যতা সংস্কৃতি, শিল্প, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভৃতি বিষয় সহ নতুন চীনের সামগ্রিক রূপ প্রকৃত চেহারা নিয়ে ধরা দিয়েছে তাঁর রচনায়। এ কাহিনী পড়তে গিয়ে লেখকের সজাগবোধের স্বকীয়তার পরিচয় পাওয়া যায়।
তবে আজকের চীনকে দেখতে হ’লে জানতে হ’লে এর বিপ্লবের কথা স্মরণ না করে উপায় নেই। ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো এবং আমেরিকা ও জাপান শিকড় গেড়ে বসেছিল চীনের বুকে। ছিড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে সারা দেশকে। পোকা ধরা গাছের পাতার মত চীনের তখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা। এরই এক কোনে মাও সে-তুঙ আপন মনে কাজ করে চলেছেন। মুক্ত করতে হবে এ দেশকে বিদেশীর হাত থেকে। চীনের প্রাচীরের মত বহু বাধা তাঁর সামনে এসেছে।
অত্যাচার-উৎপীড়নের মধ্যে দিয়ে তিনি এগিয়ে নিয়ে চলেছিলেন তাঁর বিপ্লবের অভিযান। তাঁর সে অভিযান সফল হ’ল ।
মুক্ত হল সারা দেশ বিদেশীর হাত থেকে উনিশ শো ঊনপঞ্চাশ সালে। চীনের নতুন নামের অভিষেক হল “পিপলস্ রিপাব্লিক অব চায়না’ গণচীন প্রজাতন্ত্র। দুর্ভিক্ষ, মহামারী, অনাহারক্লিষ্ট এই দেশ যেন রাতারাতি পালটে গেল আলাদীনের প্রদীপের ছোঁয়ায়। নতুন জীবন পেল এই দেশ এই জাতি। ৫
রচনার মধ্যে যদিও পেশাদারী লেখকের লিপিকুশলতার অভাব স্পষ্ট তবুও এই সরল কাহিনীর মধ্যে একটা স্নিগ্ধ রসের মৃদু অনুরণন অনুভূত হয়। এখানে কি বলা হলো সেটাই মুখ্য অর্থাৎ ফর্মের চেয়ে বিষয়ের প্রতি তাঁর মনোযোগ বেশী। তিনি যে আলংকারিক সৌন্দর্যে কখনই সমর্পিত নন এমন নয়।
দৃশ্যমান ঘটনার সংগে প্রাসঙ্গিক ঘটনার উপস্থিতি বিষয়বস্তুকে শিল্পসঙ্গত রূপ দিয়েছে। সাহিত্যিক প্রয়োজন মিটিয়েও তাঁর রচনায় অতিবর্ণনা চোখে পড়ে না। নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি মেলে যেমন দেখেছেন হুবহু তাই লিখেছেন। তবে বিস্ময়বোধ ও মুগ্ধতা তাঁর রচনারীতির বৈশিষ্ট্য। পিকিং এর বর্ণনায় তিনি যা বলেছেন তাতে সত্যভাষণের পাশাপাশি রয়েছে বিস্ময়বোধ।
আজ ছ’দিন হল পিকিং শহরে আছি। যতটুকু দেখলাম তাতে শুধু একটি কথাই বারবার মনে হচ্ছে পনেরো বছরে কি করে সম্ভব হ’ল একটা জাতির পক্ষে এতদূর এগিয়ে যাওয়া। পরিপূর্ণ একটি জাতির জীবনে যা কিছু দরকার তার কোন দিকই এখানে অবহেলিত নয়। এই জাতিই একদিন ঘুমিয়ে ছিল। আফিম-এর নেশায়। সেদিন তো সারা পৃথিবী ভাবতে পারেনি এ জাতির মধ্যে সুপ্ত হয়ে আছে এক বিরাট সম্ভাবনা (৩
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনায় তাঁর রচনাশৈলী দৃশ্যমান ছবিগুলোকে জীবন্ত করেছে। সৌন্দর্যের বর্ণনাগুলো গড়তে গিয়ে পাঠককূল বর্ণিত সুন্দরকে চোখের সামনে দেখবার তৃপ্তিটুকু লাভ করেছেন। শব্দ সংযোজনেও লেখকের দক্ষতা প্রশংসনীয়। তাঁর শব্দচয়ন ও বাক্য বিন্যাস শিক্ষিত, মার্জিত; যা পাঠক অন্তরকে স্পর্শ করে।
কোথাও বা লেকের কিনারে পানির উপরে ঝুঁকে আছে উইপিং উইলো। শীতে ঝরে যাওয়া পদ্ম পাতাগুলি লেকের পানির মধ্যে চেষ্টা করছে আস্তে আস্তে মাথা তোলার। শুনলাম, গ্রীষ্মকালে লেকটি ভরে যায় লাল আর সাদা পদ্ম ফুলে। তখন দূর থেকে দেখে মনে হয় ছোট ছোট আলোর শিখা জ্বলে আছে সবুজ ব্রকেটের মাঝে। ৭
সমগ্র বর্ণনার ভেতর চীনের বিপ্লব, চীনের সাফল্য প্রভৃতির পাশাপাশি সে দেশের মানুষের অমল অন্তরের যে ছবি তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তা তাঁর শিল্প পদ্ধতিকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা। চীনের মানুষের সুন্দর ব্যবহার, আন্তরিকতা ও আতিথেয়তা, তাদের সহনশীলতা ও অবিচলিতভাব এবং সততার চিত্রগুলো গ্রন্থের সর্বত্রই মণি-মুক্তার মত ছড়িয়ে আছে। আর তা থেকে যে মূল্যবান আলো ঠিকরে পড়ছে তাতে সহজেই অনুমিত হয় চীনের মানুষেরা অন্তরের ঐশ্বর্যে ও আভিজাত্যে ধনী।
সেদেশের সভ্যতা-সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি মানুষগুলোও উন্নত হয়েছে অন্তরে-বাইরে। চীনের বৈষ্যম্যহীন সমাজ ব্যবস্থার চিত্রও তাঁর রচনায় সাবলীল ও নির্ভেজালভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। শ্রেণীহীন সমাজের বিস্মিত চিত্র তাঁর লেখনীর গুণে অদেখা সত্য হয়ে পাঠক হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

এয়ারপোর্ট প্রায় ফাঁকা। একটি মেয়ে রিসেপশনে, মাঝে মাঝে ফোন ধরছে। হঠাৎ দেখি মেয়েটি রিসেপশন ডেক্স থেকে বেরিয়ে এসে অন্য দিকে চলে গেলো। একটু পরেই আবার ফিরে এলো হাতে লম্বা একটি লাঠি যার আগায় লাগান রয়েছে ঘর মোছা ব্রাস। ব্রাসটি দিয়ে সে লাউঞ্জের মেঝে পরিষ্কার করতে আরম্ভ করল।
লাউঞ্জ পরিষ্কার করা হয়ে গেলে আমার সামনে দিয়ে মেয়েটি চলে গেল টয়লেটের ভিতর টয়লেট পরিষ্কার করতে। আমি তো হতভম্ভ, এতটুকু লজ্জা পেলোনা মেয়েটি। কাজের কোন স্তর ভেদ নেই এদেশে। সবাই সব কাজ করে হাসিমুখে উপলব্ধি এবং প্রকাশের ভেতর তিনি অভিন্ন বলেই তার লেখায় কোন অস্পষ্টতা বা দুর্বোধ্যতা চোখে পড়ে না। চীন ভ্রমণের কাহিনীকে তিনি আদ্যপান্ত ধারাবাহিকভাবে সাজিয়েছেন তাঁর বর্ণনায়।
সেখানে কোন পুনরাবৃত্তি নেই। চীনা শিল্পের দিকটি যদিও তার রচনায় বারবার এসেছে তবে সেটি বিভিন্ন আঙ্গিকে। তাঁর খোলামেলা রচনারীতিতে রাখঢাকের কোন ব্যাপার নেই। যা সত্যি তা-ই তিনি অকপটে বলেছেন। সত্য আড়ালের কোন প্রয়াস নেই এ কাহিনীতে। এ সংক্রান্ত বহু দৃষ্টান্ত গ্রন্থের সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে।
চীনের কমিউনের কথা অনেকেই লিখেছেন তবে তাদের লেখায় এ সম্পর্কে জটিলতা ও অসম্পূর্নতা রয়েছে। আবদুল আহাদ কমিউনের প্রকৃত সংজ্ঞা দিয়ে পাঠককে জানা-অজানার গোলক ধাঁধা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। কমিউন সম্পর্কে সমস্ত জড়তা ও অস্পষ্টতা দূর হয়েছে তাঁর রচনায়।
কমিউন দেখতে চলেছি। কমিউন যে কি, তা হয়তো অনেকেই ভালো করে জানেন না। এই কমিউন গঠনই ছিল মাও সে তুঙ এর স্বপ্ন। অনেকগুলি গ্রামকে একত্রিত করে এক একটি কমিউন গঠিত হয়েছে। এমনি ধারা কমিউন আজ সারা চীন জুড়ে। কমিউনে জমির মালিক হ’ল কৃষক সম্প্রদায়। শুধু কৃষিকার্য নয়- অনেক কমিউনে কল কারখানাও রয়েছে। এর যাবতীয় উন্নতি, অগ্রগতি; কমিউনের অন্তর্ভূক্ত সমস্ত জনগণের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দায়িত্ব রয়েছে কমিউনের উপর। ৯
তবে তাঁর লেখা পড়তে গিয়ে কোথাও যে হোঁচট খেতে হয়নি তা নয়। তিনি বারবার ‘গিয়ে’ কথাটির স্থলে ‘মেয়ে’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন; যা বর্তমান ভাষারীতিতে একটু শ্রুতিকটু। তাছাড়া আঙ্গিকের আধুনিকতায় তিনি ভাবিত নন। দৃশ্যটপটগুলোকে নতুনত্বহীন খুব সাধারণ বর্ণনায় সাজিয়েছেন তিনি। এসব ছোট খাট ত্রুটি তার রচনারীতিকে কোথাও কোথাও কিছুটা স্নান করেছে।
এসব ছোট খাট ত্রুটি বিচ্যুতি বাদ দিয়েও চীনের জাতীয় ও সমাজ জীবনের যেসব চিত্র অঙ্কিত হয়েছে সেগুলো মূল্যবান। এ ছাড়া পাকিস্তান ও চীনের জনগণের মধ্যে মৈত্রীর প্রাচীন ঐতিহ্যের ইতিহাস গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি করেছে। সাহিত্যিক বিচারে নানা দিক থেকে এ ভ্রমণ-কাহিনী সার্থক এবং এটি সকল শ্রেণীর পাঠকের কাছে চীন সম্পর্কে জানবার জন্য ভালো একটি বই।