Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

ক্ষুধা ও আশা । বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার

ক্ষুধা ও আশা

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়: ক্ষুধা ও আশা। এটি বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার এর মহাকাব্য শিল্পশৈলীর উপন্যাস এর অন্তর্গত।

 

 

ক্ষুধা ও আশা

শিল্প বিপ্লবের পর পণ্যের উৎপাদন বিপণন-বাণিজ্যেক কেন্দ্র করে গড়ে উঠে শহর, ভেঙ্গে পড়ে কৃষি নির্ভর গ্রামীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এপ্রক্রিয়া আরো তীব্রতর হয় এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উনিশ’শ তেতাল্লিশের মন্বন্তরের পটভূমিতে বেঁচে থাকার ন্যূনতম আশায় ব্যাপকভাবে গ্রামীন মানুষ শহরের দিকে যাত্রা করে। বিচিত্র পেশা আর বিপুল সমারোহ নিয়ে স্ফীতকায় হয়ে উঠে নগর।

বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব না পড়লেও যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাবে এদেশের জনজীবনে নেমে আসে অকস্মাৎ বিপর্যয়। কারণ উপমহাদেশ তখনো ছিলো ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন উনিশ’শ তেতাল্লিশে খরায় ব্যাপক ফসলহানীতে দেখা দেয় প্রচন্ড খাদ্যাভাব, সংগঠিত হয় শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ মন্বন্তর। মন্বন্তরে মারা যায় লাখ লাখ মানুষ। সমকালের এই অভিজ্ঞতাকে অঙ্গীকার করে আলাউদ্দিন আল আজাদ (জন্ম-১৯২২) রচনা করে। তাঁর মহাকাব্যিক

উপন্যাস ‘ক্ষুধা ও আশা’ উপন্যাসের পটভূমি বর্ণনা করতে গিয়ে আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেন- “আমরা যুদ্ধ দেখেছি। দেখেছি ধ্বংস, সকল নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অপমৃত্যু, দুর্ভিক্ষ। তারপর তথাকথিত স্বাধীনতা। আর চক্রান্তের রাজনীতি বহুরূপি চরিত্র; ফলে আশা ভঙ্গ, হতাশা, নৈরাশ্য। এমন প্রাচুর্যের দেশেও দুর্ভিক্ষে লাখে লাখে মানুষ প্রাণ দিয়েছে কিন্তু পরাধীনতার কবল থেকে মুক্তি পেয়েও সে দুর্ভিক্ষকে জয় করতে পারিনি। মন্বন্তরকে উপন্যাসের কেন্দ্রে স্থাপন করে আলাউদ্দিন আল আজাদ ‘ক্ষুধা ও আশা’ উপন্যাস ব্যক্তি ও সমষ্টির জীবনকে অবলোকন করেছেন।

প্রচলিত মহাকাব্যশৈলীর উপন্যাস হলেও ‘ক্ষুধা ও আশা’ উপন্যাস আলাদা মনোযোগ দাবী করে। ‘এপিক এর সাথে এর সামঞ্জস্যের ক্ষেত্রেও ব্যবধান আছে- যেমন ব্যবধান ইলিযাস্ত’ এবং ‘ওডিসি’র মধ্যে। ইলিয়াডে’ বিষয় ঘটনা এবং চরিত্রের ব্যাপ্তি, ওডেসিতে ব্যক্তির অভিজ্ঞতার প্রসারতা ও গভীরতা। ক্ষুধা ও আশা ব্যক্তির গভীরতর অন্তর্জীবনের এপিক। এই ক্ষুধা ও আশা’ তাই দুর্ভিক্ষ-লাঞ্ছিত গ্রাম থেকে শহরে বাঁচার অভিপ্রায়ে আসা কেবল হানিফ পরিবারের কাহিনী নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রভাবিত, ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষ পীড়িত বাংলাদেশের সমাজজীবনের কথকতাও।

‘ক্ষুধা ও আশা’ প্রথাগত এপিক কর্মের উপন্যাস হলেও এর প্লট বিন্যাস, চরিত্রায়ন, ঘটনার কার্যকরণ শৃঙ্খলা নির্মাণে ঔপন্যাসিক নির্মন্দ্র ছিলেন না। উপন্যাসের চরিত্রগুলো সময়শাসিত, ঘটনানিয়ন্ত্রিত। ক্ষুধা তাদেরকে তাড়া করেছে, ঘটনা যেন চরিত্রকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।

ঔপন্যাসিক সময়ের বাস্তবতাকে অধিক গুরুত্ব দিতে গিয়ে, চরিত্রের প্রতি যত্নশীল হতে পারেননি। অথচ উপন্যাসকে জীবন বাস্তাবতার শিল্পরূপ হতে গেলে চরিত্রকে গুরুত্ব দিতে হয়, উপন্যাস কাহিনীতে বিধৃত চরিত্রের মাধ্যমে ঔপন্যাসিকের জীবনসংক্রান্ত বোধ ও অভিজ্ঞতা প্রকাশ পায় এবং ঔপন্যাসিক তার সৃজনীশক্তি দিয়ে চরিত্রের উপর ব্যক্তিত্ব আরোপ করেন

“The term character refers to one of the persons in the story the end product of the writer’s effort to create a distinct personality, charectarization, on the other hand refers to the means of author employs to creat the the sum of traits and actions which constitute character.”

ঔপন্যাসিকের জীবনার্থ সন্ধান ও রূপকল্প নির্মাণের প্রধান উপাদান চরিত্র। ঘটনার তাৎপর্যময় শৃঙ্খলা নির্মাণের ক্ষেত্রও চরিত্রের ভূমিকাই মূখ্য। ‘ক্ষুধা ও আশা’ উপন্যাসের কোনো চরিত্র ঔপন্যাসিকের হাতে তেমন পরিচর্যা পায় নি। ঔপন্যাসিকের একমাত্র লক্ষ্য সময়-বাস্তবতার স্বরূপ উন্মোচন। তাই ক্ষুধাতাড়িত হানিফ পরিবারের পাশে স্থাপন করেছেন চৌধুরী পরিবারের জীবনপ্যাটার্ন। হানিফ পরিবারের রয়েছে পেটের ক্ষুধা সঙ্গতিপূর্ণ চৌধুরী পরিবারের ছেলে বাদশার রয়েছে যৌনক্ষুধা। তাই জহু কাজের সন্ধানে চৌধুরী বাড়িতে গেলে বাদশা বলে

‘আমার লগে ওপরে যাইবে তুই ?

ট্যাহা দিমু।

এবং মায়ের মার খেয়ে জহু বাদশার ঘরে আশ্রয় নিলে বাদশা তাকে ধর্ষণ করে এবং শেষবার ধর্ষণে সময় জহু অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করে। উপন্যাসের কাহিনী বিন্যাসে এ ঘটনা তাৎপর্যপূর্ন। দুর্ভিক্ষ পীড়িত, সংকটদীর্ণ সময়ের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি ও সমষ্টির জীবন কিভাবে বিপর্যন্ত হয়, তার স্বরূপ অবলোকনের শিল্প বিন্দুকে আলাউদ্দিন আল আজাদ ‘ক্ষুধা ও আশা’ উপন্যাসের কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন।

 

 

প্রথাগত আঙ্গিকের অনুসরণ সত্ত্বের “ক্ষুধা ও আশা’য় ঔপন্যাসিকের অঙ্গীকারের পরিধি যুদ্ধোত্তর শিল্পরীতি পর্যন্ত প্রসারিত। দৃষ্টিকোণ ও পরিচর্যা, প্রটবিন্যাস, চরিত্রায়ণ, সময়ের ব্যবহার এমন কি ভাষারীতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই যুদ্ধোত্তর নব আঙ্গিকের অনুসরনের পরিচয় সুস্পষ্ট।” কল্লোল (১৯২৩) এর সাহিত্য’ রুচি ও মার্ক্সীয় জীবন দৃষ্টি আলাউদ্দিন আল আজাদ ‘ক্ষুধা ওআশা’ উপন্যাসের বিষয়ভাবনা ও জীবন ঘনিষ্ট রূপ নির্মাণে সাহায্য করেছে। উপন্যাসটির শুরু হয়েছে এভাবে :

“ভোরের আলো ফোটার আগে, শেষ রাতের অন্ধকারে বেরুবার সময়

ছিল এক পরিবার, কিন্তু সূর্য ওঠার পর করগ্রাম পিছনে ফেলে ভেরাস্তার

বটগাছের তলায় এলে রীতিমতো এক জনতা। বটগাছটা যেন সাত

গাঁয়ের সীমারেখা; এখান থেকেই শুরু হয়েছে ডিম্ব্রিকই বোর্ডের সড়ক ।২৬

অভাবের তাড়নায় অনাহার ক্লিষ্ট মানুষ বেঁচে থাকার অনিবার্য প্রয়োজনে শহরের দিকে যাচ্ছে। গ্রাম তাদের কাছে মন্বন্তর,ক্ষুধা;শহর তাদের কাছে স্বপ্ন, বাঁচার একমাত্র আশা। ক্ষুধা থেকে বাঁচার জন্য স্বপ্নময় আশা নিয়ে গ্রাম থেকে শহর অভিমুখি একটি পরিবার বাবা: হানিফ, মা ফাতেমা, পুত্র: জোহা, কন্যা জোছ-কে নিয়ে উপন্যাসের প্লট বিন্যস্ত। ঔপন্যাসিক কাহিনীর পটভূমিতে রেয়েছেন মন্বন্তর এবং কৃষিভিত্তিক গ্রামীন পরিবেশ থেকে বৃন্তচ্যুত নিরন্ন জীবন।

ক্ষুধাকে পেছনে ফেলে যন্ত্রণাক্লিষ্ট গ্রামের স্মৃতিকে অতিক্রম করে অনেক কষ্টে হানিফ পরিবার ট্রেনে চরেডু শহরে পৌঁছে। প্রথমে ফুটপাতে, পরে বস্তিতে মাসিক দু’টাকায় ভাড়ায় একটা হোগলার বেড়া দেয়া ঘরে তারা ওঠে। জোহা কাজের সন্ধানে, খাদ্যের সংস্থানে বের হয়। ফাতেমা ও মেয়ে জোছ কাজ নেয় চৌধুরী মঞ্জিলে। একদিন বুড়ো হানিফ ঘর থেকে বের হয় কিন্তু আর ঘরে ফেরার পথ খুঁজে পায় না।

নগর পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য সরকারী লোকেরা বুড়ো হানিফকে ট্রাকে তুলে নগরের বাইরে নিয়ে যায়। বিকেলে বস্তিতে ফিরে স্বামী হানিফকে না দেখে ফাতেমা মেয়ে জোহুকে মারধর করে। জোহু ঝড় বৃষ্টির মধ্যে দৌড়ে গিয়ে ওঠে বাদশার বাড়িতে। সে রাতে বাদশা তাকে দু’বার ধর্ষণ করে। সঙ্গাহীন অবস্থায় বাদশার নির্দেশে হোসেন, জোছকে ছোরার ভয় দেখিয়ে নিয়ে যায় অন্য ঠিকানায়। জ্ঞান ফিরলে জোহু দেখতে পায় অনেক বিছানা পাতা। রাতের বেলায় কতগুলো মেয়েকে সাজিয়ে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং ভোর রাতে আবার নিয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত জোহুকেও এই কাজে বাধ্য করে।

এদিকে বাবা হানিফকে খোঁজার জন্য জোহা তিন সঙ্গীকে নিয়ে বের হয়। কিন্তু সেও হানিফের মত সরকারী পরিচ্ছন্ন অভিযানের শিকার হয়ে ট্রাকে ওঠে, পরে নারায়নগঞ্জের পথে ছাড়া পায় এবং ফেরার পথে দুর্ঘটনায় নিহত পিতার ছিন্নভিন্ন লাশ দেখতে পায়। পিতার মৃত্যুর খবর প্রথমে মাকে জানাতে ভরসা পায় না জোহা, পরে চৌধুরী কন্যা লীনার পরামর্শে পিতার নিহত হওয়ার খবর মাকে জানায়। হানিফ পরিবারের কাহিনীর আরো হৃদয়গ্রাহী করার জন্য লেখক শাখা কাহিনী হিসেবে চৌধুরী পরিবারকে এনেছেন।

লেখক সম্ভবত একটানা ক্ষুধা-দারিদ্র | মৃত্যু, নিপীড়ন ইত্যাদির বর্ণনায় সস্তি পাচ্ছিলেন না, তাই চৌধুরী কন্যা লীনা, সেলিনা এবং মোহাম্মদ আলীর প্রেমের উপাখ্যান যুক্ত করেন। অবশ্য এ পরিবারটির মাধ্যমে লেখক সমকালীন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্খলন, পতন, রাজনৈতিক অবস্থান ও চিন্তা চেতনাকে স্পর্শ করেছেন। কলেজের ছাত্রী লীনা ভালোবাসে মোহাম্মদ আলীকে কিন্তু আলী অরুণের বোন সুজাতার প্রেমে পড়ে তাকে পাওয়ার জন্য আকুল। রাজনীতিতে লীনার বড় ভাই রেজা, আলীকে সহ্য করতে পারে না।

কারণ, সে মুসলিম লীগ করলেও দলের সব সিদ্ধান্ত প্রশ্নহীনভাবে মেনে নিতে পারে না। রেজা ভবিষ্যতে পাকিস্তানের মন্ত্রী হবার আশায় রাজনীতি নিয়ে যেতে থাকে। এদিকে আলীকে ডেকে সুজাতার বাবা উকিল অঘোরবাবু সুজাতার সঙ্গে তাকে মিশতে নিষেধ করে।

অপর দিকে লীনার বাবা একরাতে মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব করে এবং যথারীতি পিতার নির্বাচিত পাত্রকে লীনা বিয়ে করে কিন্তু বাসর রাতে লীনা আলীর দেয়া মালা গলায় পরে ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যা করে। এদিকে ফাতেমা শহরে আসার সময় গর্ভে যে সন্তান নিয়ে এসেছিল, তার ভূমিষ্ট হতে আর বিলম্ব নেই। সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে জোহাকে নিয়ে সে গ্রামের বাড়ি ফিরে যেতে চায়-

“দেশে হয়ত তখন নতুন ধান উঠেছে।

গ্রামে ফেরার আগে জোহাকে খুঁজে বের করা দরকার। জোহকে খুঁজতে জোহা চট্টগ্রামে যায় এবং পতীতা পল্লীতে সে অনেকটা জোহুর মত একটা মেয়েকে দেখতে পেয়ে, তার সঙ্গে কথা বলে। মেয়েটির দেয়া তথ্য অনুসারে যে পথে ট্রাকে মিলিটারি ছাউনিতে মেয়েদের নিয়ে যাওয়া হয় সে পথের পাশে দাঁড়ায়। অন্ধকার রাত্রিতে পাহাড়ি পথে হাঁটতে গিয়ে সে প্রসব বেদনায় অস্থির এক রমনীকে দেখে এবং তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে যায়। জোহা তাকে নিয়ে শহরের হাসপাতালের উদ্দেশ্যে হাঁটতে থাকে কিন্তু পথেই ঐরমনীর সন্তান ভূমিষ্ট হয়ে যায়।

 

 

 

জোহা দেশলাই জ্বেলে শুকনো পাতা দিয়ে আগুন জ্বেলে উত্তাপ দেয় নবজাতককে। একসময় জোহা বুঝতে পারে সদ্য প্রসবিনীর এই সন্তান বৈধ নয়, তবু সে প্রসবিনীকে নিজের গায়ের কম্বল দেয়, কমলের একটি অংশ দিয়ে সদ্যজাত শিশুকে গরম রাখে। উপন্যাসের এ পরিণতিতে দেখা যায় কিশোর নায়ক জোহা নতুনের প্রতি আগ্রহে মানবতার মহান আদর্শের আলো সঞ্চার করে, সে প্রভাতের আলোর প্রতীক্ষা করে।

কৃষিজীবন থেকে উম্মলিত হানিফ পরিবারের সন্তান, কিশোর জোহার জীবন অভিজ্ঞতার দর্পনে প্রতিবিম্বিত হয়েছে সময়ের ক্ষতবিক্ষত ছবি, তবু সে নতুন জীবনের সহযাত্রী, নতুন আলোর প্রত্যাশী। ঔপন্যাসিকের সর্বর্স্ক দৃষ্টিকোণের সঙ্গে জোহার অবলোকন ও উপলব্ধির সমন্বয় ‘ক্ষুধা ও আশা’র শিল্পীশৈলীকে করেছে অভিনব ও স্বতন্ত্র। দুর্ভিক্ষের আগ্রাসী টানে হানিফ, ফাতেমা এবং তাদের দুই সন্তান জহু এবং জোহা গ্রাম জীবনমূল ছিন্ন হয়ে শহরের দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু একমাত্র জোহা ছাড়া পরিবারের অন্য সবাইকে গ্রাস করে কংক্রিকেটর শহর। ২৭

তুলনায় শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’ সময় ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিশাল আয়তনের বহির্বাস্তবতার মহাকাব্যিক উপন্যাস, অন্যদিকে ‘ক্ষুধা ও আশা’ মন্বন্তরের পটভূমিতে সময়ের সংকট দীর্ণ ব্যক্তির অন্তর্বাস্তবতার এপিক উপন্যাস। চরিত্রের উপলব্ধি ও অন্তঃভাষ্য প্রয়োগে ঔপন্যাসিক চিত্রশৈলীর (pictorial) সঙ্গে প্রতীকশৈলীর (Symbolic treatment) পরিচর্যা করেছেন। উপন্যাসের তৃতীয় পরিচ্ছদে জোহুর ধর্ষিত হওয়ার মুহূর্তে প্রকৃতির চিত্রকে প্রতীকী ব্যঞ্জনায় উপস্থিত করেছেন

‘কড়কড়াৎ করে আবার বাজ পড়ে কাছেই, আসমানটা যেন আচমকা ফেটে চৌচির হয়ে যায়। এবং মাটি বিদ্ধ হয়ে পরপর কাঁপতে থাকে।… সঙ্গে কান্নার মতো শোঁ শোঁ শব্দ, প্রকৃতির অন্তনুল থেকে বেরিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কতক্ষণ পর জানে না, এই আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকায় তাকিয়ে শুধু শোনে এই শব্দ হু হু কান্নার মতো বাতাসের শব্দ।

এই পরিচর্যা ‘ক্ষুধা ও আশা’ উপন্যাসের শিল্পরূপকে প্রগাঢ় করেছে। ঔপন্যাসিক বিবরণ কিংবা বিশ্লেষণে সমর্পিত না। করে উদ্ভাসিত করেছেন প্রগাঢ় অনুভূতি সংহত চিত্রময়তায়। সময় লাঞ্ছিত, পরিবেশধৃত মানুষের জীবন তরঙ্গ এভাবে পুষ্পিত হয়েছে অসীম আকাঙ্ক্ষার চিত্রকল্পে।

‘ক্ষুধা ও আশা’ উপন্যাসের চরিত্র চিত্রণে দুর্বলতা উপন্যাসের গঠনকাঠামোকে অনেকাংশে বিপর্যন্ত করেছে। ক্ষুধা থেকে বাঁচার আশায় শহরে এসে বুড়ো হানিফ দুর্ঘটনায় মৃত্যু বরণ করেন। মেয়ে জহু পেটের ক্ষুধা থেকে বাঁচতে এসে যৌনক্ষুধার শিকারে পরিণত হয় বাদশার হাতে এবং বাদশার নির্দেশে হোসেন হোৱার ভয় দেখিয়ে নিয়ে যায়। পতিতা পল্লীতে, জহু চরিত্রের কোনো বিকাশ, পরিনতি লক্ষ করা যায় না।

ফাতেমা তার গর্ভের অনাগত সন্তানের আশায়, নতুন ফসলের স্বপ্ন দেখে আবার গ্রামে ফিরে যেতে চায়। বেঁচে থাকার তীব্র আশা নিয়ে শহরে এলেও সে তার নতুন সন্তানের আশ্রয় হিসেবে শহরকে নিরাপদ ভাবতে পারেনা। মূলত জোহা চরিত্র ও তার দৃষ্টি দিয়ে ঔপন্যাসিক ক্ষুধা ও আশা’ উপন্যাসের জীবন উপলব্ধি এবং সময়ের বাস্তবতা প্রকাশ করতে চেয়েছেন। কিন্তু সে প্রচেষ্টা সর্বাংশে সফল হয়নি।

জোহার শ্রেণীগত অবস্থান, বয়স অনুযায়ী মানসগড়ন সঙ্গতিপূর্ণ নয়। উপন্যাসের শেষে জোহা যে জীবনবোধ ও আত্ম-উপলব্ধিতে পিতৃপরিমহীন নবজাত শিশু ও তার জননী পাশে দাঁড়ায় এবং ভোরের প্রতীক্ষা করে, তা মোটেই তার কৈশোরক চরিত্রের কাজ নয়। ঔপন্যাসিকের ভাষায়

‘জীবন্ত মাংসের গন্ধেই বুঝি শৃগালের ডাকে হিংস্র উল্লাস করে,

কিন্তু আশ্চার্য কোন না হলে নে না, যে এখন যেন বাঘের

চেয়ে সাহসী জননীর গায়ে গা চেপে এবং শিশুটিকে পরম যত্নে

আগলে নারুন শীতে অন্ধকারে বসে থাকে ভোরের প্রতীক্ষায়

বস্তুত উপন্যাসের শেষে জোহা যেন বালক নয়, কিশোর নয়, মানবীয় গুণের অধিকারী দায়িত্বশীল এক নাগরিক, যে সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবনের পক্ষে, মানবিকতায় দীপ্ত। বয়সের তুলনায় ও শ্রেণীগত অবস্থানের দিক থেকে বিবেচনা করলে জোহার এই চেতনা অগ্রগামী বৈ কি? অন্য চরিত্রগুলোর মধ্যে আলী, রেজা, লীমা, সুজাতা, তাদের প্রেম রাজনীতি, দ্বন্দ্ব সবই স্বশ্রেণীর চরিত্রানুসারেই রূপায়িত ।

 

 

বিস্তৃত পটভূমি ও বাস্তব সমাজ’ পরিপ্রেক্ষিতে রচিত হলেও ‘ক্ষুধা ও আশা’ উপন্যাসের অনেক চরিত্রের আচরণই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি। যেমন, পাগলা মাস্টার ও বাদশা গুন্ডার চরিত্রের বিকাশ ঘটাতে ঔপন্যাসিক সফল হননি, এদুটো চরিত্র অনেকটাই রিপোর্টধর্মী বলে মনে হয়। মন্বন্তরের পটভূমিতে রচিত বলে ক্ষুধা থেকে বাঁচার আশায় শহরে এসে হানিফ দুর্ঘটনায় ক্ষত বিক্ষত হয়ে যাওয়ার মধ্যে ‘ক্ষুধা ও আশা” উপন্যাস একটি প্রতীকী ব্যঞ্জনা লাভ করেছে।

ভাষাকে যারা শৈলীবিজ্ঞানের একমাত্র বিষয় মনে করেন, তাদের সঙ্গে সাংগঠনিক শৈলীবিজ্ঞানীদের মত পার্থক্য রয়েছে। ‘উপন্যাসের বর্হিগঠন ঔপন্যাসিকের শিল্পকলার নির্মাণ স্বরূপ স্পষ্ট করে। আবার ভাষা হলো মনের বিশেষন্ত্রের সেই প্রকাশ, যা বলার কথাকে সুষ্ঠু করে। গঠন যদি হয় মনের বাইরের ফটক, তবে অন্দরমহলের প্রকাশরূপ হলো ভাষা। “ক্ষুধা ও আশা’ উপন্যাসে ভাষা ব্যবহারে ঔপন্যাসিক চিত্রশৈলী (pictorial manner) এবং বিশ্লেষণশৈলী (analytical manner) প্রয়োগ করেছেন।

ক. চিত্রশৈলী (pictorial manner) :

কড়কড়াৎ করে আবার বাজ পড়ে কাছেই, আসমানটা যেন আচমকা ফেটে চৌচির হয়ে যায়। এবং মাটি বিদ্ধ হয়ে পরপর কাঁপতে থাকে। আর বিজ্ঞলির পরে বিজলি, হাওয়ার পরে হাওয়া, বিজলি জেগে উঠে মিলিয়ে যায়, হাওয়া দমকে দমকে অদৃশ্য সমুদ্রের তরঙ্গের মতো উচ্ছ্বসিত উদ্ভান্ত। সঙ্গে কান্নার মতো শোঁ শোঁ শব্দ, প্রকৃতির অন্তমূল থেকে বেরিয়ে চারদিকে ছাড়িয়ে পড়েছে।

উদ্ধৃতাংশে চিত্রানুগ শব্দকে কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। যেমন :

কড়কড়াৎ, শোঁ শোঁ ধরঘর, দমকে দমকে (ধ্বন্যাত্মক বা ধ্বনিব্যঞ্জক শব্দ)

মাটি বিদ্ধ ফেটে চৌচির (দৃশ্য জ্ঞাপক শব্দ)

সমুদ্রের তরঙ্গের মতো (তুলনা বাচক শব্দ)

বাক্য ছোট বড়-অসমান। চরিত্রের অন্তর্জীবনের সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশকে সমন্বিত করে ভাষাশৈলী গঠন করেছেন। ঔপন্যাসিক। ফলে আঞ্চলিক শব্দ (কড়কড়াং, আচমকা, আসমানটা) স্বল্পপ্রচলিত শব্দ “দমকে দমকে এবং চলিত শব্দের মিশ্রণে বাক্য গঠন করা হয়েছে। তৎসম শব্দের চেয়ে তদ্ভব শব্দের প্রয়োগ অধিক ।

খ. বিশ্লেষণশৈলী (analytical manner) :

‘ক্ষুধা ও আশা’ উপন্যাসে ভাষাশৈলীর ক্ষেত্রে বিশ্লেষণশৈলী প্রয়োগ অধিক। চরিত্রের অন্তঃ উপলব্ধির প্রকাশে এ শৈলীর সাফল্য প্রশ্নাতীত। চরিত্রের আত্মকথনেও এ বিশ্লেষণীশেলীর প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। যেমন:

ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আমরা বাস করছি। আমাদের জন্মটা হয়তো আকস্মিক, তবু অস্তিত্বটা তো সত্যি। তার মাঝে, যুগচক্রের মধ্যে নিজেদের অজ্ঞাতেই সভাভন্ত্রর মতো আমরা জড়িয়ে পড়েছি। প্রাচীনকালে মহাবাহু নৃপতিদের রাজালিনার দরুন বহু নগর জনপদ দেশ রাজ্য জাতি ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু এখন আমরা যা দেখছি তার তুলনা নেই। এ এক প্রচন্ড অগ্নুৎপাত, খন্ড প্রলয়।

আমাদের বিবেচনায় ‘ক্ষুধা ও আশা’ উপন্যাসের প্লটগঠন নিম্নোক্ত রূপে কল্পিত ।

 

 

‘ক’=জোহা পরিবার দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে বাঁচার আশায় শহরে দিকে যাত্রা কাহিনীর উৎস।

‘খ’=ঢাকা শহর, কাহিনীর কেন্দ্রভূমি ।

‘গ’=জোহার বোন জহুকে চট্টগ্রামে স্থানান্তর এবং নায়ক জোহা এক নবজাতকের পাশে আগুন জ্বেলে ভোরের প্রতীক্ষা ।

Exit mobile version