ক্রীতদাসের হাসি । বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়: ক্রীতদাসের হাসি । এটি বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার এর রূপক প্রতীকী শিল্পশৈলীর উপন্যাস এর অন্তর্গত।

 

ক্রীতদাসের হাসি

 

ক্রীতদাসের হাসি

‘ক্রীতদাসের হাসি’ শওকত ওসমানের প্রতীকাশ্রয়ী রূপকশেনীর শিল্পসার্থক উপন্যাস। এর গঠনকাঠামো প্রায় নিচ্ছিদ্র, ঘটনাগুলো পরিণামমুখী, চরিত্র ঔপন্যাসিক-উদ্দেশ্য সাধনে সফল এবং সংলাপময় নাট্যশৈলী (dramatric manner ) পরিচর্যার কারণে কাহিনীর দ্বন্দ চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে।

বাগদাদ নগরী এবং বাদশা হারুন-অর রশীদের রূপককাহিনীর আশ্রয়ে মূলত পরিবেশন করা হয়েছে পাকিস্তানির ঔপনিবেশিক সামুদ্রিক শক্তির নিপীড়িত ও ষাটের মাধ্যমে বাঙালির গৌরবোজ্জল সংগ্রামের কথা। ঔপন্যাসিক রূপবন্ধ নির্মাণে হারুন-অর-রশীদের বাগদারের কাহিনী- কে নাট্যরীতিতে পরিচর্যা করেছেন। চরিত্রগুলি এক একটি চেতনার প্রতীক। খলিফা ও মশরুর, তাতারী এবং কবি নওয়াস-যথাক্রমে ক্ষমতা-অন্ধ অত্যাচারী, উৎপীড়িত মানবতার এবং শাশ্বত সৌন্দর্য ধারণার ভাষারীতি বিষয় প্রকাশে যথাযথ।”

উপন্যাসের মূল কাহিনী শুরু করার আগে ঔপন্যাসিক ভূমিকা স্বরূপ ‘ক্রীতদাসের হাসি’ পুস্তকের পাণ্ডুলিপি আবিষ্কারের বৃত্তান্ত সংযোজিত করেছেন। এই বৃত্তান্ত অপ্রসঙ্গিক নয়, উপন্যাসের প্লট বিন্যাসের ক্ষেত্রে এই বৃত্তান্তের ইঙ্গিতময় তাৎপর্য রয়েছে। ঔপন্যাসিক বলেছেন ‘ক্রীতদাসের হাসি’ পুস্তকের পান্ডুলিপি আবিষ্কার এক দৈবী ব্যাপার।’ এটা বলে তিনি উপন্যাসের মূল কাহিনীর প্রতি পাঠকদের মনে একধরণের কৌতূহল উদ্দীপ্ত করেছেন।

লেখক, মৌলানা জালাল, এবং মাসুদ তিন বন্ধু একছুটির অবকাশে বেড়াতে বের হন। নানা দুর্বিপাকে মধ্য দিয়ে তাঁরা উপস্থিত হন এক অখ্যাত পাড়াগাঁয়ে। সেপাড়াগারে ছিল লেখকের সহপাঠিনী রউফননেসার বাড়ি। রউফননেসা খুব ভালোছাত্রী ছিলেন কিন্তু ইংরেজি বিভাগের এক মেধাবি ছাত্র তাকে প্রত্যাখ্যান করায়, সে গ্রামের বাড়ি গিয়ে একটি স্কুল । প্রতিষ্ঠা করে সে স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী হিসেবে কাজ করছেন। সংসারে তার একমাত্র অবলম্বন পিতামহ শাহ ফরিদ উদ্দিন জৌনপুরী।

বয়স নব্বই, চোখে দেখেন না, কানেও ভালো শোনেন না। আলাপ প্রসঙ্গে আলেফ লায়লা ওয়া লায়লা’ গল্প নিয়ে হাসাহাসি হচ্ছিল। দাদু ফরিদউদ্দিন জৌনপুরী বললেন- ‘বন্ধুগণ, ওটা আলেফ লায়লা ওয়া লায়লা (সহস্র ও একরাত্রি) নয়। ও কেতাবের নাম “আলেফ লায়লা ওয়া লায়লানে’ অর্থাৎ সহস্র দুই রাত্রি। মাসুদ দাদুর উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন।

মাসুদ ইংরেজির ছাত্র হিসেবে দাবি করে বলেন- ‘আমি ত শুনেছি’ thousand and one night’ সহস্র এক রাত্রি। দাদু বললেন, ‘ভুল শুনেছ।’.. হ্যাঁ হ্যাঁ। ভুল। তোমরা ও পড়ো বেঈমান ইংরজের কেতাব। যাদের গোলাম ছিলে দেড়শ বছর। আসল বই ত দ্যাখো নি। তারপর দাদু তার সংগ্রহ শালা থেকে নাস্তালিখ অক্ষরে লেখা বিশাল পান্ডুলিপি বের করে দেখান।

দাদু শাহ ফরিদ উদ্দিন জৌনপুরী “আলেফ লায়লা ও লায়লানের আসল পান্ডুলিপি তাঁর হাতে কিভাবে এলো এর ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন- হালাকু খানের বাগদাদ আক্রমণের সময় এ পান্ডুলিপি হিন্দুস্থানে আসে এবং বহু হাত ফেরির পর পৌঁছে শাহসুজার কাছে। শাহ সুজা আরাকানে পালানের সময় এ পান্ডুলিপি মুর্শিদাবাদের এক ওমরাহের কাছে রেখে যান, সেখান থেকে জৌনপুর এবং জৌনপুর থেকে শাহ ফরিদ উদ্দিন তা উদ্ধার করেন।

প্রচলিতি ‘আলেফ লায়লা ওয়া লায়লা (সহস্র এক রাত্রি ) গ্রন্থের শেষ গল্পটা হচ্ছে শাহজাদা হাবিবের কাহিনী। কিন্তু নব আবিষ্কৃত পান্ডুলিপির মধ্যে শাহজাদা হাবিবের কাহিনীর পরে যে কাহিনী সংযোজিত তা হচ্ছে জাহাকুল আরদ’ অর্থাৎ গোলামের হাসি। এজন্য পাণ্ডুলিপিটি নাম হয়। “আলেফ লায়লা ওয়া লায়লানে’ অর্থাৎ ‘সহস্র দুই রাত্রি। ‘

 

ক্রীতদাসের হাসি

 

বিশ্বের বিস্ময় এই পান্ডুলিপি দেখে সবাই অবাক। লেখক কপি করার জন্য জৌনপুরীর কাছ থেকে এ পান্ডুলিপি চেয়ে আনেন এবং শহরে ফিরে মৌলানা জালালের সহায়তায় ‘আলেফ লায়লা ওয়া লায়লানের শেষ গল্পটা অর্থাৎ ‘জাহাকুল আব্দ’ বা ‘ক্রীতদাসের হাসি’ তরজমা করেন।

পান্ডুলিপি সম্পর্কে লেখকের এই উপকাহিনী অবতারণার তাৎপর্য আছে। রূপকশৈলীর উপন্যাসের শিল্পী সাধারণত যে
কাহিনী বর্ণনা করেন সে কাহিনীর প্রতি বিশ্বাসযোগ্য ভ্রান্তি অর্জনের জন্য এক ধরণের কাহিনীর অবতারণা করেন যাতে পাঠকের কাছে নিকটস্ত ইঙ্গিতের আড়ালটা অক্ষুণ্ণ থাকে। এদিক থেকে শওকত ওসমান সার্থক।

“ক্রীতদাসের হাসি’র এই শিরোনামহীন ভূমিকা সম্পর্কে বলতে গিয়ে শওকত ওসমান বলেন- ‘ক্রীতদাসের হাসি’- সবই কল্পনা। কাব্যের ঘরের আসবাবের মত। সবই নানা মাত্রায় বিস্তারিত। আরব্য উপন্যাসের কথা ত ছুতো হিসেবে ব্যবহৃত। তদানীন্তন পাকিস্তানের কথা স্মরণ রেখে। আইয়ুব শাহীর দাপট-এর স্বৈরাচারী ব্যারাকে জন্ম জান্তদের ধর্মক-চমক-দত্ত-আসফালনে গোটা দেশ রুদ্ধশ্বাস। তখনই লেখা ওই বই।

তাই আর্তনাদেই কাহিনীর সমাপ্তি ঘটে। তবে আমি (তখনকার সংখ্যায়) পূর্ব পাকিস্তানের আট কোটি বাঙালির পক্ষ থেকে ওই রাজত্বের মুখে থুথু দিতে বদ্ধ পরিকর হয়েছিলুম। আমি আজো মাঝে মাঝে দুষ্টুমির হাসি হাসি পুরাতন দিন স্মরণ রেখে। একদা আমি শাসকদের আহাম্মক বানাতে পেরেছিলাম। ‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসের আঙ্গিক বিবেচনায় ঔপন্যাসিকের এই স্বীকারোক্তি প্রনিধানযোগ্য।

উপন্যাসটি সে বছর অর্থাৎ ১৯৬২ সালের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে পুরস্কার লাভ করে, আইয়ুব খান নিজ হাতে এ পুরস্কার বিতরণ করেন, পরে যখন বুঝতে পারলো, এটি আসলে তার বিরুদ্ধেই লেখা, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। বইটি বাজেয়াপ্ত করাও যায়না, তাহলে প্রেসিডেন্টের মুখ থাকে কোথায়। রূপকধর্মী উপন্যাসের আচ্ছাদন আসলে এমনই, পোষাকের আড়ালে ঢাকা থাকে ইঙ্গিতময় রূপ কে হঠাৎ দেখে চেনা যায়।

না। সমকালের প্রত্যক্ষ চেহারা ধীরে ধীরে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে থাকে। ‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসেও আইয়ুবী শাসন নিপীড়নের চেহারা বাগদাদের অত্যাচারী শাসক হারুন-আর রশীদের রূপক কাহিনীতে সার্থকভাৰৰ অভিব্যঞ্জিত হয়েছে। ‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসে কাহিনী দীর্ঘ নয় কিন্তু চমকপ্রদ বরং যথেষ্ট নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ। মোট বাইশটি পরিচ্ছেদে বিন্যাস্ত।

নাটকের দৃশ্যের মত করে ঔপন্যাসিক কাহিনীকে সাজিয়েছেন। প্রত্যেকটি পরিচ্ছেদের শুরুতে নাটকের মত সংক্ষিপ্তভাবে দৃশ্যপরিকল্পনার বর্ণনা দিয়েছেন এবং এ্যারিস্টেটেলীয় ত্রিনীতি অনুসারে সময়ের ঐক্য (unity of time) স্থানের ঐক্য (unity of place) এবং ঘটনার ঐক্য (unity of action) উপন্যাসের কাহিনীকে বিনা স্ত করেছেন। প্লটগঠনের এশৈলী ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসের শিল্পায়নতনকে ত্রুটিহীন স্বচ্ছতা দিয়েছে।

খলিফা হারুন আর রশীদের প্রাসাদের এক অংশে সহধর্মিনী বেগম জুবায়দা ও বাদী মেহেরজাবের কথোপকথন-দিয়ে উপন্যাসের শুরু। মধ্যরাত্রির নিদ্রামগ্ন নগরীতে তন্দ্রাচ্ছন্ন প্রহরীদের অগোচরে বেগম, বাঁদী মেহেরজানকে তার প্রেমিক তাতারীর সঙ্গে মিলানাভিসারে যাওয়ার জন্য সহায়তা করে। বাঁদী মেহেরজান এবং হাবসী গোলাম তাতারীর প্রেমময় মিলনে বেগম নিজেই পুলকিত। তাই বেগম সাহেবা বলেন-

‘দুই সীনা একত্র দেখলে আমার কি যে খুশী

প্রেমিক তাতারী ও প্রেমিক/ মেহেরজানের সুখ ডগমগ হৃদয়ের হাসির শব্দে বাগদাদ নগরীর নিরব, নিদ্রামগ্ন রাতের আকাশেরও উচ্চকিত। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে দেখা যায় বাদশা হারুন আর রশীদ গভীর শূন্যতায় নিমজ্জিত, অনুশোচনায় দগ্ধ,সুখ, ভিক্ষুক, স্মৃতি ভারাতুর যন্ত্রণায় কাতর। যন্ত্রণা লাঘবের জন্য বন্ধু মাসরুরকে সঙ্গে নিয়ে হারুন আর রশীদ নৈশ ভ্রমণে বের হলে এক গোলাম কুটিরে নির্মল হাসির শব্দশুনে থমকে দাঁড়ায় ।

 

ক্রীতদাসের হাসি

 

‘মাশরুর’ শুনেছো এমন হাসি কে হাসছে আমার মহলের দেওয়ালের ওদিকে এ হাসি ঠোঁট থেকে উৎসারিত হয় না। এর উৎস সুখ-ডগমগ হৃদয়ের নিভৃত প্রদেশ। ঝর্ণা যেমন নির্জন পাহাড়ের উৎসঙ্গ দেশ থেকে বেরিয়ে আসে উপল বিনুনী পাশে ঠেলে ঠেলে বিজন পথ ভ্রষ্ট তৃষ্ণার্ত পথিককে সঙ্গীতে আমন্ত্রণ দিতে এই হাসি তেমনই বক্তৃর্ণা-উৎসারিত। কি কে এই সুখীজন- আমার হিংসা হয়, মাশরুর। আমি বাগদাদ-অধীশ্বর, সুখ-ভিক্ষুক। ও আমার তুলনার বাগদাদের ভিক্ষুক তবু সুখের অধীশ্বর।

প্রথম পরিচ্ছদে তাতারী ও মেহেরজানের মিলনমধুর হাসির দৃশ্য দ্বিতীয় পরিচ্ছদে সুখ ভিক্ষুক বাদশা হারুন-আর রশীদের যন্ত্রণাভারাক্রান্ত শূন্যতা হাসির শব্দ শ্রবণ ও হাসির শব্দশুনে উর্ষিত হওয়া, এবং হাসির উৎস অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে ঘটনা পরিণাম অভিমুখী। কাহিনীর এই পারম্পর্য ‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসের গঠনকাঠামোকে শৈল্পিক সংহতি দিয়েছে। প্রথম পরিচ্ছেদে ঘটনার কার্যকারণ সূত্র তৈরি-অর্থাৎ সুখ-ডগমগ হৃদয়ের হাসি; দ্বিতীয় পরিচ্ছদে সেই হাসির শব্দ শুনে বাদশার হৃদয় যন্ত্রণা, শূন্যতা আরো তীব্রতর হয় :

“ওরা হাসবে, আর আমি হাসতে পারবো না ? না তা হয়না।”

বাদশার এই অনুশোচনা- কারণ উজিরে আজম জাফর বার্মেকীকে নিমর্মভাবে হত্যা করা, আপন বোন আব্বাসাকে অন্যায়ভাবে কতল করা এবং ঈর্ষা-সামান্য গোলাম আর বাদী হয়েও তাতারী এবং মেহেরজান এমন আনন্দের হাসি হাসতে পারে অথচ বাগদাদের বাদশা হয়ে তার মনে কোনো আনন্দ নেই, তার জীবনে মুক্তচিত্তের হাসি নেই। এই দ্বন্দ্ব উপন্যাসের কাহিনীবৃত্ত তৈরি করে। হারুন আর রশীদ হয়ে ওঠে অত্যাচারী প্রজানিপীড়ক পাপাত্মার প্রতীক এবং তাতারী ও মেহেরজান স্বাধীন মুক্তচিত্তের প্রতীক।

তৃতীয় পরিচ্ছদে এই হাসির উৎস সন্ধান করতে গিয়ে বাদশা হারুন-আর রশীদ তাতারী ও মেহেরজানের প্রেমময় মিলনের অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করেন। তাদের হাসিকে ঝর্ণাধারার মতই মনে হয়েছে বাদশার কাছে। বাদশা তারপর ক্রীতদাস তাতারীকে মুক্তি দিয়ে রাজ্যের প্রান্তে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করে দেন। উদ্দেশ্য ক্রীতদাস তাতারীর নির্মল হাসি বাদশা উপভোগ করবেন।

অর্থাৎ হাসির বিনিময়ে তাতারীকে গোলামী থেকে মুক্তি দেিয় মহলে স্থান দেয়া হয়। মেহেরজান রাজার এ ব্যবস্থা মেনে নিলেও প্রেমিক তাতারী রাজার ব্যবস্থা সানন্দচিত্তে মেনে নিতে পারেনি। বরং তাতারীর জীবন ভরে ওঠে নিরানন্দে, হাসি মিলিয়ে যায় তার জীবন থেকে। বাদশা কোনো প্রকারে তার মুখে হাসি ফোটাতে না পেরে নির্যাতনের পথ বেচে নেয়। তবু তার তাতারীর মুখে হাসি ফোটে না।

বাইশতম পরিচ্ছদে আমরা দেখতে পাই কয়েদখানায় তাতারী ও মেহেরজানকে মুখোমুখি করা হয়, মেহেরজনা প্রথমে তাতারীকে চিনতে না পালেও পরে চিনতে পারে এবং প্রেমময় স্মৃতি রোমন্থনে সহাস্যে এগিয়ে যায়। কিন্তু পারে না, প্রহরী তাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। সুখ ডগমগ হৃদয়ের কলকল হাসি ধ্বনির জন্য তাতারীর উপর নির্যাতন চালানো হয়। তাতারী তখন বলে

“শোন, হারুনর রশীদ। নীরহাম দৌলত দিয়ে ক্রীতদাস গোলাম কেনা চলে। বান্দী কেনা সম্ভব কিন্তু কিন্তু ক্রীতদাসের হাসি -না না না-

কবি আবু নওয়াস তখন বলে- ‘আমীরুল মুমেনীন, হাসি মানুষের আত্মারই প্রতিধ্বনি।’ উপন্যাসের এই সফল পরিসমাপ্তি থেকে একটি দার্শনিক মীমাংসায় উপনীত হওয়া যায় ক্ষমতা, অর্থ বা শক্তি দিয়ে মানুষের স্বাধীনচিত্তালোককে কখনো অধিকার করা যায় না। হাসি মানুষের আত্মার ধ্বনি’-উপন্যাসের শেষ সংলাপে কবি নওয়াস খলিফার উদ্দেশ্যে এই নিগূঢ় সত্য উচ্চারণ করে। এখানে মানুষের ব্যক্তিসত্তার স্বাধীনতাই ব্যঞ্জিত হয়েছে। বস্তুত, ক্রীতদাস তাতারীর হাসিকে জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছেন শওকত ওসমান এবং প্রতিবাদী তাতারী হয়ে উঠেছে বাঙালির মুক্তিচেতনার প্রতীক-পুরুষ।

‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসে প্লট বিন্যাস ও চরিত্রায়ণে শওকত ওসমানের এই প্রতীকাশ্রয়ী রূপকশৈলীর দৃষ্টিকোণ সর্বদা সক্রিয় ছিল। প্রতীক ও রূপকের স্বভাবলক্ষণকে চিহ্নিত করতে গিয়ে C.S. Lewis বলেছেন- ‘Symboliom is a mode of thaught, but allegory is a mode expression. ” অর্থাৎ প্রতীক হচ্ছে চিন্তার পদ্ধতি কিন্তু রূপক হচ্ছে অভিব্যক্তি।

W.W.Yeats এর মতে Symbolism said thing which could not be seid soperfectly in any other way, and needed but a right instinct its understanding, which allegory siad things which could be said as well or better, in another way and needed or right knowledge off its understanding.” শওকত ওসমান সচেতন শিল্পীর সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে সমকালের শৃঙ্খলিত সামরিক শাসনে নিপীড়িত জাতীয় বিবেকের প্রতিবাদ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তৎপর্যময় ইঙ্গিতে রূপকাশ্রয়ী করেছেন।

 

ক্রীতদাসের হাসি

 

ক্রীতদাসের হাসি নিয়ে বাদশার সঙ্গে দু’টি শক্তির অবস্থান দেখা যায়। একদল কবি, শিল্পী, সংস্কৃতিসেবী- যাদের বিবেক অর্থলোভের কাছে পরজিত হয় নি। অন্যদল আলেম আব্দুল কুদ্দুস এবং খলিফার উজীর-নাজির ও জন্মাদসহ অন্যা সভাসদরা। যারা অর্থ ও সুবিধার কাছে বিবেক বিক্রয় করে দিয়েছে- খলিফার অন্যায় দেখেও প্রতিবাদ করেনা। ‘প্রথমোক্ত দলের কবি ইসহাক, আবু নওয়াস প্রমুখ পরোক্ষভাবে একটি জীবনসত্য ব্যক্ত করেছিল।

যে মেহেরজানের অবর্তমানে তাতারী কোনোদিন হাসবে না। এবং তাতারী কে মিথ্যা অভিযোগে দত দেওয়ার বিরুদ্ধাচরণ করেছিল আবু নওয়াস। খলিফার ভুল বিচার তার সভাসদরা কেন দেখতে পায় না, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন আবু নওয়াসঃ

“জাঁহাপনা, তারা যখন আপনার চোখ দিয়েই দেখে তখন নিজেদের চোখ ব্যবহার করেনা। আর যখন নিজেদের চোখও দেখার কাজে লাগায়, তখন আপনার চোখের ঝিলিক তারা আগেই দেখে নেয়।

তৎকালীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে আবু নাওয়াদের এই বক্তব্যের তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়। স্বৈরশাসকদের সর্বকালে সবদেশে একশ্রেণীর স্তাবক দল থাকে। তারা সার্থান্ত শ্রেণী। নগদ প্রাপ্তি মোহে বিবেক বিকিয়ে দিয়ে শাসক শ্রেণীর চোখ দিয়ে সব কিছু দেখতে থাকে। ফলে শাসক শ্রেণীর জঘন্য অন্যায়ও তাদের চোখে পড়ে না। ষাটের দশকের বাংলাদেশে আইয়ুবের শাসনের সময়ও এরকম একশ্রেণীর স্তাবক দল ছিল।

শওকত ওসমান সূক্ষ্ণকৌশলে তার ইঙ্গিত দিয়েছেন। উপন্যাসে ক্রীতদাসের হাসি’ হয়ে উঠেছে জনগণের অধিকার ও স্বাধীনাতর রূপক, তাতারী যেন প্রতিবাদী বাঙালি জনগণেরই প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে এখানে। অত্যাচারী খলিফার শাসনাধীন বাগদাদকে এই কাহিনীতে অভিশপ্ত নগর হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সারা পাকিস্তানই তখন স্বৈরশাসনের নিষ্পেষণে অভিশপ্ত।

উপন্যাসে বাগদাদ নগরী যেন সমগ্র পাকিস্তানের রূপক হিসেবে ব্যবহৃত। খলিফা, মাশরুপ্ত, জন্মাদ, কাজী ক্ষমতায়, অত্যাচারী, উৎপীড়ক পাপাত্মার প্রতীক এবং তাতারী, মেহেরজান, কবি আবু নাওয়াস শাশ্বত সৌন্দর্য ও মুক্ত মানবতার প্রতীক হিসেবে চিত্রায়িত হয়েছে। চরিত্রায়নে এইশৈলী এবং প্রতীকায়ন উপন্যাসের নাট্যপরিচর্যায় শিল্পীত হয়ে ওঠেছে।

উপন্যাসের ভাষা বিষয় ও পটভূমির অনুগামী। আরবী, ফারসি শব্দের তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবহার কাহিনীর আবহকে পূর্ণমাত্রায় স্পন্দিত করেছে। চরিত্রের ভাব ও বক্তব্য প্রকাশের অনুগামী শব্দ এবং বাক্যের রূপবন্ধনে ভাষাশৈলী নির্মিত। যেমন :

‘মেহেরজনা : তবে আত্মা যা নসীবে রেখেছেন, আমি বোরখা পরে নিই, তুমি দরজা খুলে দাও ।

নেপথ্যে : এই জলদি কর। দরজা খোল।

তাতারী : দিচ্ছি জনাব। বোরখা পরেছ ?

মেহেরজান : পরেছি।

তাতারী : আসুন জনাব ; (নতজানু) আহলান ওয়া সাহলান ইয়া মাওলানা একি । স্বয়ং আমিরুল মুমেনীন। লা-হাওলা ওল

কুয়াতা : আলম্পনা, বান্দার গোস্তাখি মাফ করবেন। এই নির ঝুঁকালাম। গোস্তাখির জন্য কঠোর সাজা দিন, জাঁহাপনা।

হারুন : তুই ঘরের প্রদীপ জ্বালিয়েছিস্, আরো আলো আরো রোশনাই চাই। ১

এখানে আরবী, ফারসি শব্দের ব্যবহারের মাত্রা লক্ষণীয়।

ফারসি শব্দ : নসীব, বোরখা, দরজা, জলদি, বান্দা, গোস্তাখি, রোশনাই, শির, মাফ, জনাব, সংখ্যা ১০

আরিব শব্দ : আল্লা, আহলান ওয়া সাহলান, ইয়া মাওলানা, আমিরুল মুমেনীন, লা-হাওলা,ওয়া, কুয়াতা, সংখ্যা ১২

বাংলা শব্দ : ক্রিয়া-কর, খোল্, দিচ্ছি, পরেছি, রেখেছেন, বলে দাও, করবেন, ঝুঁকালাম, আসুন সংখ্যা-১০

 

ক্রীতদাসের হাসি

 

ক্রীতদাসের হাসি, উপন্যাসের চরিত্র অনুসারে ভাষা বিচারের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত ছকটি লক্ষ্য করা যায় :

চরিত্র

স্ত্রী/পুরুষ

পেশা

বয়স

ব্যবহৃত শব্দের গড়

হারুন আর রশীদ

পুরুষ

শাসক

৪০-৪৫

আরবি ১০%

মানারুর

পুরুষ

ফারসি ১২%,

তাতারী

পুরুষ

শোষিত/দাস

২৩-৩২

আরবি ৮%

মেহেরজান

স্ত্রী

ফারসি ১৫%

বুসায়না

স্ত্রী

আরবি ৬%

কবি নাওয়াস

পুরুষ

বুদ্ধিজীবী

২৫-৩০

ফারসি ৮%

ফারসি শব্দ :

আক্কেল মন্দ (বুদ্ধিমান), আকদ (মন্ত্রপুত বিবাহ), আলিশান ( ঝলমলে ), ইসসান (মানুষ), ইনাম (পুরস্কার), উমদা (ভালো), উমেদার (প্রত্যাশা), কাফতান (আস্তিন), খোদকসী (আত্মহত্যা), খোশবু ( সুগন্ধ), খামুস (চুপ), গোস্ত (মাংস), জেন্দা (জীবীত), দোস্ত (বন্ধু), নসীব (ভাগ্য), নফর (ভৃত্য), ফরজন্দ (ছেলে) ফেরেশতা(দেবদূত), মারহাবা (সাবাস ), নেকাব (ঘোমটা) দস্তর (নিয়ম), নাফরমান (অবাধ্য)।

আরবি শব্দ :

আমিরুল মুমেনীন (মুসলামানদের শাসক), কৌম (গোষ্ঠী) মোহাফেজ (রক্ষক), মাওলা (প্রভু) মুজরানা(নর্তকী), দারখাৎ (বৃক্ষ) জাহেল (অজ্ঞান), মোজেজা (অলৌকিক), মাহবুবা (প্রিয়তমা) লেবাস (পোষাক), সাফফাহ (রক্ত পিপাসু), আবে হায়াৎ (যে পানি পান করলে অমরত্ব লাভ করা যায়) ইত্যাদি।

Leave a Comment