তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ সূচীপত্র

আজকে আমরা তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ সূচীপত্র আলোচনা করবো।

 

তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ সূচীপত্র

 

তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ সূচীপত্র

১৯৯৭-৯৮ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধীন ‘তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ’ শীর্ষক অভিসন্দর্ত প্রণয়নের জন্য এম ফিল গবেষণা কর্মে ব্রতী হই। নানা সাংসারিক সমস্যার কারণে গবেষণা কর্ম সমাপ্ত করতে দীর্ঘ বিলম্ব হয়। আমার এই গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী। তাঁর প্রেরণা নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে এই অভিসন্দর্ভ পূর্ণাঙ্গরূপ পেয়েছে। তাঁর ঋণ অপরিশোধ্য।

এছাড়া বাংলা বিভাগের অন্যান্য শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের উপদেশনাও আমার গবেষণা কাজকে ত্বরান্বিত করেছে। আমি বিশেষভাবে স্মরণ করছি এম ফিল প্রথম পর্বে আমার দুই শ্রদ্ধেয় কোর্স শিক্ষক বিভাগের সর্বপ্রবীণ অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন এবং অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষকে।

গবেষণার শেষ পর্যায়ে নানা বিষয়ে আমাকে প্রভূত সাহায্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষাতত্ত্ব বিভাগের লেকচারার অনুজ প্রতিম সৈয়দ শাহরিয়ার রহমান। অভিসন্দর্ভের মুদ্রণসৌকর্যের কাজটি তিনি সানন্দে সম্পাদন করে দিয়েছেন। তাঁর সান্নিধ্যলাভ আমার এক আনন্দময় অভিজ্ঞতা। তাঁর কাছে আমার ঋণ অশেষ।

 

তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ সূচীপত্র

 

আমার সহপাঠীবৃন্দ গবেষণাকাজ সম্পাদন করতে আমাকে সর্বদা উৎসাহ যুগিয়েছে। তাদের মধ্যে এ- মুহূর্তে বিশেষ ভাবে স্মরণ করছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বায়তুল্লাহ কাদেরী, মোখলেসুর রহমান সাগর এবং এস. আলমগীর আহমেদ শান্তনু-র কথা। আমার আবাল্য বন্ধু বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী আবুল কালাম আজাদ আমার চিরকালের শুভাকাঙ্ক্ষী। এ-মুহূর্তে তার কথা বিশেষভাবে স্মরণ করছি।

গবেষণাকর্মের জন্য আমি প্রধানত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ব্যবহার করেছি। গ্রন্থাগারের বিভিন্ন কর্মীকে এই সুযোগে আমার বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই। এছাড়া আমার গবেষণা তত্ত্বাবধায়কের ব্যক্তিগত পাঠাগার থেকেও আমি প্রভূত উপকৃত হয়েছি।

অভিসন্দর্ভ রচনাকালে সাংসারিক অনেক জটিলতা থেকে আমাকে মুক্ত রাখতে সচেষ্ট ছিলেন আমার স্ত্রী হাছিনা আক্তার লিলি। গবেষণাকর্ম সম্পাদনে আমাকে নিরন্তর প্রেরণা যুগিয়েছেন তিনি।

গবেষণাকর্ম সম্পাদনের মধ্যবর্তী সময়ে আমি পিতৃমাতৃ-হারা হই। বিদ্যাশিক্ষার প্রতি তাঁদের ছিল প্রবল অনুরাগ। আমাকেও বিদ্যানুরাগী হিসেবে দেখতেই তাঁরা প্রত্যাশী ছিলেন। আজ অভিসন্দর্ভ উপস্থাপনাকালে আমি সম্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি আমার পরলোকগত জনক-জননীকে।

 

তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ সূচীপত্র

 

সূচীপত্র

তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাসের ভূমিকা

প্রথম অধ্যায় ॥ পরিপ্রেক্ষিত

প্রথম পরিচ্ছেদ : তারাশঙ্করের দৃষ্টিতে আদিবাসী মানুষ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : কাহার কৌম

তৃতীয় পরিচ্ছেদ : বেদে কৌম

চতুর্থ পরিচ্ছেদ: সাঁওতাল কৌম

দ্বিতীয় অধ্যায় ॥ তারাশঙ্করের উপন্যাসে কৌমজীবনের রূপায়ণ

প্রথম পরিচ্ছেদ : হাঁসুলীবাঁকের উপকথা উপন্যাসে কাহার জীবনের রূপায়ণ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে বিষবেদে জীবনের রূপায়ণ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ : অরণ্য-বহ্নি উপন্যাসে সাঁওতাল জীবনের রূপায়ণ

উপসংহার

ভারতবর্ষীয় কৌমসমাজ ও সংস্কৃতি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস-সাহিত্যের অন্যতম বিশিষ্ট। প্রসঙ্গ। রাঢ় অঞ্চলের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিবর্তনশীল জীবনপ্রবাহের সঙ্গে যে সখ্য ও নিবিড়তা তিনি আশৈশব লালন করে এসেছিলেন, ওই সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতার জগৎ বারবার তাঁর কথাসাহিত্যে নানাভাবে শিল্পিত হয়েছে। বর্তমান অভিসন্দর্ভে আলোচিত তিনটি উপন্যাস হাঁসুলী বাঁকের উপকথা, নাগিনী কন্যার কাহিনী এবং অরণ্য-বহ্নি এই অভিজ্ঞতা-লালিত অনুভবের উল্লেখযোগ্য স্মারক।

 

তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ সূচীপত্র

 

বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক-সত্তা সচেতনভাবে সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের প্রায়োগিক দর্শনকে আয়ত্ত না করেও সৃষ্টিশীল প্রেরণা ও স্বোপার্জিত অভিজ্ঞতার বলে সমাজসত্য ও সমাজরূপকে এমনভাবে শিল্পের সামগ্রী করে তুলতে সক্ষম হন যে, মনে হয় তিনি বুঝি ওই জ্ঞানশাখারই বিশেষজ্ঞ কিংবা গবেষক। তারাশঙ্করের উল্লিখিত তিনটি উপন্যাসে ভারতীয় উপমহাদেশের তিনটি আদিবাসী কৌম জনগোষ্ঠীর জীবন এমন বিশ্বস্তরূপে চিত্রিত ও উপস্থাপিত হয়েছে যে, সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানীরাই আজ আকর-উৎসরূপে গ্রন্থত্রয়কে বিবেচনা করছেন।

ফলে, গোষ্ঠীজীবন নির্ভর সাহিত্য রচনায় তারাশঙ্করের সৃজনকৌশলটি সাহিত্যগবেষণার ক্ষেত্রে আরও নিগূঢ়ভাবে অনুশীলন করবার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বর্তমান অভিসন্দর্ভে দেখনো হয়েছে যে, সমাজ-নৃবিজ্ঞান আর জীবনসত্যের সংযোগ ঘটায় আলোচ্য তিনটি উপন্যাস আদিবাসী মানুষের বিশ্বস্ত দর্পণ হয়ে উঠেছে। আদিবাসী মানুষকে তারাশঙ্কর অবলোকন করেছেন গভীর মমতায়, তাদের জীবনচর্যার নিয়ত পালাবদলকে তিনি উপলব্ধি করেছেন পূর্ণ নিরাসক্তিতে।

ফলে, তাঁর উপন্যাসে আদিবাসী কৌম জনগোষ্ঠীর জীবনের রূপায়ণ হয়ে উঠেছে সমাজ ও সময়গতির অকপট ভাষ্য।
বর্তমান অভিসন্দর্ভে ভারতবর্ষীয় কৌম মানবগোষ্ঠী সম্পর্কে তারাশঙ্করের দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব তুলে ধরা হয়েছে। তারাশঙ্কর তাঁর স্বোপার্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বৈভব দিয়ে তিনটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী— কাহার, বেদে এবং সাঁওতাল জাতিসত্তার উৎস, বিকাশ ও পরিণতির ঐতিহাসিক ধারক্রমকে চিহ্নিত করেছেন।

বিশেষত, উল্লিখিত কৌম গোষ্ঠীসমূহের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিবর্তনধারা উপস্থাপনে অভিজ্ঞ তারাশঙ্কর অনেক বেশি নিবিড়, সূক্ষ্ম এবং আন্তরিক। ফলে, ভারতবর্ষীয় কৌমসমাজের অসম্পূর্ণ ইতিহাসের সম্পূরক সংযোজন হিসেবেও তারাশঙ্করের অভিজ্ঞতাঋদ্ধ কাহার, বেদে কিংবা সাঁওতালদের জীবনচর্যার রূপায়ণ গুরুত্ববহ।

অভিসন্দর্ভে আলোচিত প্রথম উপন্যাস হাঁসুলী বাকের উপকথা-য় উপস্থাপিত হয়েছে ভারতবর্ষের অন্যতম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কাহারদের সভ্যতার আলোকবঞ্চিত জীবনপ্রবাহ, দৈবনির্ভর জীবনবোধ আর এরই সমান্তরালে বৈশ্বিক টানাপোড়েন। এই জটিল সমাজ-বাস্তবতাকে তারাশঙ্কর কোন দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন তা বিশ্লেষণ করে অভিসন্দর্ভে দেখানো হয়েছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ঙ্কর বাস্তবতা, বহিরারোপিত আগ্রাসন এবং নগদ অর্থের প্রলোভন প্রাচীন এই উপকথা-নিয়ন্ত্রিত কৌমগোষ্ঠীর বিলয়কে কীভাবে অনিবার্য করে তুলেছে।

দ্বিতীয় উপন্যাস নাগিনী কন্যার কাহিনী-তে তারাশঙ্কর ভারতবর্ষের আরেক অবলুপ্তপ্রায় জনগোষ্ঠী বিষবেদেদের সমাজ উৎকেন্দ্রিক জীবনপ্রবাহের গতি, প্রকৃতি ও স্বরূপ নিরূপণ করেছেন। স্বকীয় লোকপুরাণ, লোককথা ও উপকথা নিয়ন্ত্রিত এই স্বাধীনচেতা গোষ্ঠীর যাযাবর জীবনই চূড়ান্ত নিয়তি। বিপদজনক জীবন ও পেশায় নিয়োজিত এই কৌমের জীবনকথার রূপায়ণে তারাশঙ্কর যে দক্ষতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা তুলনাতীত।

 

তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ সূচীপত্র

 

নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে বিষবেদে কৌমের জীবন ও সমাজমূলে প্রবেশ করে ওই গোষ্ঠীর জীবনসত্যকে তারাশঙ্কর আবিষ্কার করেছেন এবং তাদের অনুপুঙ্খ ও অকৃত্রিম জীবনপট নির্মাণ করেছেন। তৃতীয় উপন্যাস অরণ্য- বহ্নি-তে ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ বা গণসংগ্রামের কথা ও কাহিনী, ঔপনিবেশিক শাসনামলের নির্মম প্রতিক্রিয়া এবং তার প্রভাবে গোষ্ঠীমানসে জেগে ওঠা দ্রোহ ও দেশচেতনার মধ্যে এক অবিনাশী আশাবাদ ব্যক্ত করতে চেয়েছিলেন তারাশঙ্কর।

কিন্তু দলীয় রাজনৈতিক আদর্শের কারণেই অরণ্য-বহ্নি শেষপর্যন্ত সংগ্রামী কৌমজনতার মুক্তির শিল্প না হয়ে, ইতিহাস রাজনীতি কল্পনা ও পুরাণের মিশ্রণে একটি আকর্ষণীয় রোমান্সে পরিণত হয়েছে। তবে এই উপন্যাসেও তারাশঙ্কর আদি সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠীর জীবনের অণুপুঙ্খ বিবরণ, বিশেষত তাদের নৃতাত্ত্বিক উৎস-পরিচয়, স্বকীয় জীবনচর্যা, ধর্ম, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং প্রাতিস্বিক দেশচেতনাকে অসামান্য নৈপুণ্যে রূপায়ণ করেছেন। সাঁওতালদের জীবনের রূপায়ণ-সূত্রে তারাশঙ্কর দেখাতে চেয়েছেন এই আদিম নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের অদম্য সংগ্রামী মানসিকতা, স্ব-সংস্কৃতি ও স্বাধিকার রক্ষায় তাদের আপসহীন প্রত্যয়ের কথা।

সভ্যতাগর্বী নাগরিক মানুষই ভারতবর্ষীয় আধুনিক রাষ্ট্রসমূহের কর্ণধার। উপমহাদেশীয় আদিবাসী কৌম জনগোষ্ঠী সভ্যতার সুষম আলোকবঞ্চিত হয়ে উপজাতি নামক বৈষম্যমূলক অভিধাতেও আজ অনেক ক্ষেত্রে চিহ্নিত হচ্ছে। যারা প্রকৃত আদিবাসী, স্বভূমে কিংবা স্বদেশে তারাই আজ ‘পরবাসী’। কথাশিল্পী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় আলোচ্য তিনটি উপন্যাসে অকৃত্রিম দরদ ও মমতা দিয়ে ভারতবর্ষীয় তিন কৌম জনগোষ্ঠীর যে জীবনরূপ অঙ্কন করেছেন তা অকৃত্রিম এবং ক্ষেত্রবিশেষে আদি জাতিগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ মুক্তির সংকেতেও ঋদ্ধ।

Leave a Comment