জসীম উদ্দীনের কাহিনীকাব্যের বিষয় ও প্রকরণগত বৈশিষ্ট্যের সূচি

আজকে আমরা জসীম উদ্দীনের কাহিনীকাব্যের বিষয় ও প্রকরণগত বৈশিষ্ট্যের সূচি আলোচনা করবো।

 

জসীম উদ্দীনের কাহিনীকাব্যের বিষয় ও প্রকরণগত বৈশিষ্ট্যের সূচি

 

জসীম উদ্দীনের কাহিনীকাব্যের বিষয় ও প্রকরণগত বৈশিষ্ট্যের সূচি

এম. এ. পাশ করার পর বাংলা সাহিত্যের কোন একটি অনালোচিত দিক নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করার জন্য আমার আগ্রহ জন্মে। বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ-এর কাছে পরামর্শ নিতে গেলে তিনি জসীম উদ্দীনের কাহিনী কাব্যের বিষয় ও প্রকরণগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করতে বলেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে গবেষণা করতে চাইলে তিনি সম্মত হন। সে অনুযায়ী তাঁরই প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এম. ফিল কোর্সের দ্বিতীয় বছর এই গবেষণাপত্রটি রচনা করা হয়েছে।

জসীম উদ্দীনের কাহিনী কাব্যের বিষয় ও প্রকরণগত বৈশিষ্ট্য, কাহিনী কাব্যগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই বিষয়টি যথাসম্ভব বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি এখানে। জসীম উদ্দীনের কাহিনী কাব্য নিয়ে কাজ করার আগ্রহ থাকলেও আমার ক্ষমতা অত্যন্ত কম। তদুপরি নির্ধারিত এক বছরের মধ্যে আমাকে কাজ সম্পন্ন করতে হয়েছে। এই গবেষণা কাজে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় আমাকে ফেলোশীপ প্রদান করে গবেষণা করার সুযোগ করে দিয়েছেন।

 

কবি সম্পর্কে আমার ধারনা সীমিত। তবুও কাজ করতে পেরেছি ড. আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ স্যারের উদার সহযোগিতায়। তাঁর পরামর্শ এবং উপদেশ পেয়েছি সর্বক্ষণ। তাঁর কাছে আমার ঋণ অপরিশোধ্য। বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সাঈদ-উর রহমান আমার গবেষণার কাজে নানাভাবে সহযোগিতা করে আমাকে ঋণী করেছেন। আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। যিনি আমার গবেষণা কর্মের নেপথ্যে থেকে নিরন্তর উৎসাহ যুগিয়েছেন তিনি ড. নাসিমা চৌধুরী।

বিভিন্ন সময় আমার লেখাপড়ার খোঁজ-খবর নিয়েছেন এবং আর্থিক সহযোগিতা করেছেন আমার বন্ধুপ্রতিম সহোদর জনাব আলীমূল রাজী।

অভিসন্দর্ভ রচনা করতে গিয়ে আমি প্রধানত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার ব্যবহার করেছি। এ সূত্রে গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীবৃন্দকে ধন্যবাদ জানাই।

 

জসীম উদ্দীনের কাহিনীকাব্যের বিষয় ও প্রকরণগত বৈশিষ্ট্যের সূচি

 

সূচি

প্রথম অধ্যায় : অবতরণিকা

জসীম উদ্দীনের কাহিনীকাব্যের অবতরণিকা

দ্বিতীয় অধ্যায় :

জসীম উদ্দীনের কাহিনীকাব্যের বিষয়বস্তুর তুলনামূলক আলোচনা

  • নকশী কাঁথার মাঠ
  • সোজন বাদিয়ার ঘাট
  • জসীম উদ্দীনের সকিনা
  • মা যে জননী কান্দে

তৃতীয় অধ্যায় :

জসীম উদ্দীনের কাহিনীকাব্যের কাহিনী গ্রন্থনের বৈশিষ্ট্য

চতুর্থ অধ্যায় :

জসীম উদ্দীনের কাহিনীকাব্যের প্রকরণগত বৈশিষ্ট্য

উপসংহার

জসীম উদ্দীন বাংলা সাহিত্যের এক সংকটাপন্ন অবস্থায় হাল ধরেছিলেন। বাঙালি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তিনি লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে দেননি। তাই ঠুনকো নাগরিক বৈভবে যারা নিমজ্জিত হতে চলেছিল, তাদেরকে তিনি পল্লীর সবুজ শ্যামলিমার দিকে আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন তাঁর সাহিত্যিক দক্ষতার গুণে। পল্লী গ্রামের প্রতি কবির ছিল অপরিসীম মমত্ববোধ।

জসীম উদ্দীনই সর্বপ্রথম পরীর সহজ-সরল নর-নারীর জীবনের বাস্তব অনুভূতিগুলো দরদ দিয়ে এঁকেছেন। তাঁর আগে এই ধারায় অন্যান্য কবিগণের বিচরণ থাকলেও তা সীমিত পর্যায়ে। এ ক্ষেত্রে জসীম উদ্দীন একচ্ছত্র সার্থকতার দাবিদার।জসীম উদ্‌দীন পল্লী নিয়ে কাব্য রচনা করতে গিয়ে কোথাও হোঁচট খাননি। তিনি তাঁর কাব্য মধ্যে পল্লীর উপাদান নিয়ে অবলীলায় উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন।

 

জসীম উদ্দীনের কাহিনীকাব্যের বিষয় ও প্রকরণগত বৈশিষ্ট্যের সূচি

 

তাঁর উপমাগুলো একেবারে জীবন্ত। তা পল্লীর মাঠ-ঘাট, পথ-প্রান্তর থেকে সংগৃহীত। তাঁর চারপাশে বিস্তৃত ছিল পল্লী গ্রামের বিশাল উপাদান। যার ফলে সেখান থেকে ইচ্ছেমত উপাদান সংগ্রহ করে নিজের কবিত্ব শক্তির প্রখর দীপ্তির ছটায় তাকে বর্ণিল করে তুলেছেন।

বিশেষ করে তাঁর কাহিনীকাব্যগুলোর বিষয়বস্তু ও প্রকরণ নির্মাণে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর কাহিনীকাব্যের বিষয়বস্তুর তুলনামূলক আলোচনা, কাহিনী গ্রন্থন এবং প্রকরণগত দিক বিশ্লেষণে দেখা যায় তিনি পল্লী উপাদান নিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে ও সুশৃঙ্খল বাণী বিন্যাসে তাঁর কাব্য দেহ গঠন করেছেন। মূলত কাহিনীকাব্যের পটভূমি বিনির্মাণে তিনি বরাবর সমসাময়িক কালের বাস্তব চিত্র তুলে এনেছেন।

১) তাঁর নক্সী-কাঁথার মাঠ কাব্যে চর দখল নিয়ে যে দুই গ্রামের ভেতর ব্য দেখিয়েছেন তা বাস্তবে সংঘটিত হত এবং এই দাঙ্গায় প্রচুর ক্ষয়-ক্ষতি হত। জসীম উদ্দীন পল্লীর এই দাঙ্গার চিত্র বাস্তবে অবলোকন করেছিলেন যার ফলে এর নিখুঁত বর্ণনা তিনি দিতে পেরেছেন। যেমন-

মার মার মার, হাকল রূপা, মার মার মার ঘুরায় পাঠি

ঘুরায় যেন তারি সাথে পায়ের তলে মাঠের মাটি।

[নক্সী-কাঁথার মাঠ’ পূঃ ৬০]

আবার কিছু লোকবিশ্বাসের বর্ণনা দিয়েছেন যা পল্লীর সাধারণ মানুষ দীর্ঘকাল মেনে এসেছে। এই লোক বিশ্বাসেরও বাস্তব চিত্র কবি তুলে ধরেছেন। যেমন-

কালো মেঘা নামো নামো, ফুল-তোলা মেঘ নামো,

ধুলট মেঘা, তুলট মেঘা, তোমরা সবে ঘামো।

কানা মেঘা, চলমল বারো মেঘার ভাই,

আরও ফুটিক ডলক দিলে চিনার ভাত খাই।

[নক্সী-কাঁথার মাঠ’ পৃ: 20]

প্রচন্ত খরায় বৃষ্টি না নামলে গ্রামের মেয়েরা বদনা বিয়ে দিয়ে মেঘ রাজার গান করে। তাদের বিশ্বাস এর ফলে আর বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকে। পল্লীর লোকাচারও তার কাব্যে স্থান পেয়েছে। বাড়িতে অতিথী আসলে মোরগ ধরে খাওয়ানো, শীলত পাটি বিছিয়ে তাকে সমাদর করা। নিচের চরণে তা বেশ পরিস্ফুট-

যাহোক রূপাই বাঁশ কাটিয়া এল খালার বাড়ি,

বসতে তারে দিলেন খালা শীতল পাটি পাড়ি।

বদনা ভরা জল নিয়ে আর খড়ম দিল মেলে,

পাও দুখানি ধুয়ে রূপাই বসল বামে হেলে।

[নক্সী-কাঁথার মাঠ’ পৃ: ২৮]

জসীম উদ্দীন পল্লীর নর-নারীর হৃদয়ের আর্তি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। যার জন্য তার নক্সী-কাঁথার মাঠ’ কাব্যে দেখা যায় এক গ্রামের কিশোর ছেলের বাঁশির সুর অন্য গ্রামের কিশোরী মেয়ের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। যেমন-

এ-গাঁয় চাষী নির্ঘুম রাতে বাঁশের বাঁশির সুরে,

ওইনা গাঁয়ের মেয়ের সাথে গহন ব্যথায় ঝুরে।

[নক্সী-কাঁথার মাঠ’ পৃ: ১০]

পল্লীর তরুণ-তরুণী প্রেমে পড়লে গ্রামে যে কানা-ঘুষা হয় তারও সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন কবি। আবার বিভিন্ন কুৎসা রটানো বন্ধ করার জন্য তরুণ- তরুণীর বিয়ের নিখুঁত ছবি তিনি এঁকেছেন। পল্লী নারীর বিয়ের পর স্বামী একমাত্র অবলম্বন কিন্তু স্বামী ফেরারী হলে অপেক্ষারত নারীর যে ট্রাজিক পরিণতি ঘটেছে তার চিত্র কবি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী করে অঙ্কন করেছেন। উপমা অলংকার ব্যবহারে জসীম উদ্দীনের ছিল যাদুকরী শক্তি। তিনি পল্লীর কিশোর-কিশোরীকে নানা উপমা অলংকারে সজ্জিত করেছেন। যেমন কাবে। নায়িকা সাজুর রূপ বর্ণনায় কবি বলেছেন-

কচি কচি হাত পা সাজুর, সোনায়, সোনায় খেলা,

তুলসী তলায় প্রদীপ যেন জ্বলছে সাঁঝের বেলা ।

[নক্সী-কাঁথার মাঠ’ পৃ: ১৮ ]

 

জসীম উদ্দীনের কাহিনীকাব্যের বিষয় ও প্রকরণগত বৈশিষ্ট্যের সূচি

 

২) কবি পল্লীর নর-নারীর কৈশোর বয়সের নির্ভেজাল প্রেমের সাথে সাথে হিন্দু- মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বটিও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাঁর ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট” কাব্যে দেখিয়েছেন। এই দ্বন্দ্বে যে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাত থাকে তা স্পষ্ট। অসবর্ণ বিয়ে সমাজ সমর্থিত নয়, যার ফলে তার কাব্যের নর-নারীকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে তাদের জীবন দিয়ে।

আবার কুচক্রি মহলের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ নমু ও মুসলমান সম্প্রদায় নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে, পুনরায় সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে এবং অত্যাচারিত মানুষগুলি যে এক সময় কুচক্রি মহলের উপর চরম প্রতিশোধ নিতে পারে তারও বাস্তবরূপ জসীম উদ্দীন তাঁর সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাব্যে তুলে ধরেছেন।

৩) সময়ের সাথে সাথে জসীম উদ্দীন তাঁর কাব্যের পটভূমিও পরিবর্তন করেছেন। তার সকিনা’ কাব্যে নির্ভেজাল প্রেমের পরিবর্তে প্রেমে এসেছে দ্বান্দ্বিকতা। এখানে অসহায় এক নারী সমাজের লম্পটদের ভোগের সামগ্রী হয়ে অন্তর্জালায় মরেছে। একজন নারী সমাজের বিভিন্ন দিক থেকে কীভাবে প্রতারিত হয় এবং শেষে তাঁর ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে তা দেখিয়েছেন কবি। তিনি শুধু পল্লীর নর-নারীর সহজ-সরল রূপই তুলে ধরেন নি সমাজের হাতে নিগৃহীত এক নারীর উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বও পাঠককে উপহার দিয়েছেন।

৪) সকিনা’ কাব্যে নারীর প্রথম ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটানোর মধ্য দিয়ে তিনি নারীর অধিকার আদায়ের বিষয়টি স্পষ্টভাবে মা যে জননী কালে’ কাব্যে আমিনা চরিত্রের মাধ্যমে ঘটিয়েছেন। আমিনা জননী সত্তার বিকাশ ঘটানোর জন্য জমিদার গৃহ থেকে পালিয়ে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে মাতৃত্বের গৌরব অর্জন করে। যদিও এই কাঙ্ক্ষিত সন্তানকে সে বুকে আগলে রাখতে পারেনি।

দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাস থেকে বাঁচানোর জন্য সন্তানকে চিরদিনের জন্য পর করে দিতে হয়। জসীম উদ্দীন মানব দরদী কবি। তাই আমিনা চরিত্রের ভেতর যে সমাজবিরোধী কর্মকান্ড পরিলক্ষিত হয় তাকে তিনি ঢেকে ফেলেছেন জননী সত্তার বিকাশ ঘটিয়ে। যার ফলে আমিনাকে আর কুলটা মনে হয় না তা এক দুঃখিনী নারী হৃদয়ের করুণ হাহাকারে পর্যবসিত যা পাঠককে বেদনাঘন করে তোলে।

জসীম উদ্দীন অত্যন্ত শিল্পসম্মতভাবে তাঁর কাহিনী কাব্যগুলো রচনা করেছেন। বাল্য থেকে কৈশোর পর্যন্ত তিনি ছিলেন পল্লীর স্নেহে লালিত সন্তান। তাই শিক্ষা- দীক্ষার জন্য শহরের সংস্পর্শে থাকলেও তার মানসলোকে প্রতিনিয়ত আনাগোনা ছিল, পল্লীর মেঠোপথ-ঘাট, কলমিলতা, পাকা ধান, বেথুলবন এসব কিছু। এছাড়া একজন গ্রাম্য গীতির সংগ্রাহকের জন্যও তিনি পল্লীর কাছাকাছি হতে পেরেছিলেন।

পল্লীর এই সাধারণ বস্তুগুলো তাঁর কাব্যে হয়ে উঠেছে অসাধারণ। জসীম উদ্দীন ছিলেন আধুনিক পল্লী কবি। তিনি পল্লী নিয়ে কাব্য রচনা করলেও, তাঁর কাব্য পাঠে যে পরিমিতি জ্ঞান ও রুচিবোধ ধরা পড়ে তা গ্রাম্য কবি থেকে স্বতন্ত্র।

তাঁর কাহিনী কাব্যগুলোর ভেতর যে সজাগ শিল্পীর পদচারণা ঘটেছে তা তাঁর কাব্যের ভাষা, ছন্দ, অলংকার, বাণীভঙ্গীমার কলা-নৈপুণ্য দেখেই বোঝা যায়। ফলে তিনি তাঁর কবিত্ব শক্তির বলে যে কাহিনী কাব্যগুলো রচনা করলেন তা পাঠকুলকে মন্ত্র মুগ্ধ করে।

Leave a Comment