কাব্যনাট্যের সংজ্ঞার্থ ও স্বরূপ

সৈয়দ শামসুল হক, বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য স্রষ্টা, তাঁর রচনায় কাব্যনাট্যের প্রতি এক গভীর অনুরাগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর “কাব্যনাট্যের সংজ্ঞার্থ ও স্বরূপ” প্রবন্ধটি এই ধারার নাট্যকলার মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও তাৎপর্য তুলে ধরতে এক অসামান্য প্রয়াস। এতে তিনি কাব্যনাট্যের সংজ্ঞা, রূপ, গঠন, ভাষার ব্যবহার, নাটকীয় প্রবাহ এবং মানবিক অনুভূতির গভীরতাকে বিশ্লেষণ করেছেন।

কাব্যনাট্যকে তিনি এক ধরনের উচ্চাঙ্গ নাট্যধারা হিসেবে দেখেছেন, যেখানে কবিতার রূপক, প্রতীক, ছন্দ এবং নাটকের নাটকীয়তা একত্রে মিশে যায়। তাঁর মতে, কাব্যনাট্য কেবল সংলাপের বিন্যাস নয়, বরং এটি মানুষের মনের গভীরতম সংকট, দ্বন্দ্ব এবং আনন্দ-বেদনার মিশ্র রসায়নকে মঞ্চে রূপায়িত করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এটি কাব্যিক উৎকর্ষতার সাথে নাটকীয় উত্তেজনার মেলবন্ধন, যা দর্শক ও পাঠকের মননে স্থায়ী ছাপ ফেলে।

সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যে নায়ক-নায়িকার মনোজগতের টানাপোড়েন, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সমাজ ও সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব, এবং মানবিকতার বহুমাত্রিক প্রকাশ পাওয়া যায়। তাঁর লেখনীতে প্রাচীন ও আধুনিক জীবনের মেলবন্ধন যেমন স্পষ্ট, তেমনি রয়েছে মানবিক চেতনার গভীর আবেগ। ফলে, তাঁর কাব্যনাট্য বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ব সাহিত্যের মর্যাদাপূর্ণ আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে এক বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।

 

কাব্যনাট্যের সংজ্ঞার্থ ও স্বরূপ

 

কাব্যনাট্যের সংজ্ঞার্থ ও স্বরূপ

যে-রূপকল্পে দৃশ্যাত্মক পরিচর্যায় কাহিনি উপস্থাপিত হয় তা-ই নাটক। এটি ‘জীবনের বহুবিচিত্র রূপের এক শক্তিশালী দর্পণ।` সংলাপ ও দৃশ্যকে অবলম্বন করে রঙ্গমঞ্চে গতিশীল মানবজীবনের রূপায়ণ এবং জনচিত্তে তার শিল্পিত সঞ্চারণই নাটকের অন্বিষ্ট। সংস্কৃত আলঙ্কারিকদের মতে নাটক একপ্রকার দৃশ্যকাব্য।

অর্থাৎ নাটক হচ্ছে সেই কাব্য যাতে লোকবৃত্তকে দৃশ্যরীতিতে উপস্থাপন করা হয়। আবার পাশ্চাত্যরীতিতে নাটক সম্পর্কে বলা হয়েছে : ‘Drama is creation and representation of life in terms of the theatre.” অর্থাৎ দৃশ্য ও শ্রব্যকাব্যের সমন্বয়ে, অভিনেতাদের সাহায্যে রঙ্গমঞ্চে বহমান মানবজীবনের ছবিকে মূর্ত করে তোলাই নাটকের উদ্দেশ্য।

অন্যদিকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের কাব্যময় বলিষ্ঠ উচ্চারণই কাব্যনাটক। আধুনিক কাব্যনাটকে সাধারণত যেসব বৈশিষ্ট্যের ওপর আলোকসম্পাত করা হয় সেগুলো হচ্ছে – নাটকটিকে কবিতারীতিতে রচিত হতে হবে, বহির্বাস্তবতার তুলনায় সেখানে অন্তর্বাস্তবতার উপস্থাপনই মুখ্য হবে, ইতিহাস ও পুরাণের সমান্তরালে আধুনিক মানুষের যাপিত জীবনসংকট ও মানসিক দ্বন্দ্ব উপস্থাপিত হবে, কাহিনি বা ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে সৃষ্ট পরিণামের তুলনায় চরিত্রের অন্তর্দহন, ব্যক্তিক চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন মুখ্য হয়ে উঠবে। কবিতা ও নাটক কোনোটিই পরস্পরের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে না। অর্থাৎ এখানে কাব্যগুণ ও নাট্যগুণের সুষমবিন্যাস থাকতে হবে।

বস্তুত, সাহিত্যের ধারায় কাব্যনাটক আধুনিক যুগের সাহিত্যকর্মরূপে বিবেচিত হলেও, কাব্যনাট্যের মাতৃরূপ ‘নাটক’ সাহিত্যের আদিতম শাখা। বিশ্বের প্রাচীনতম ও সমৃদ্ধ দুটি ভাষা গ্রিক ও সংস্কৃতে নাটক রচিত হয়েছে খ্রিস্টের জন্মের বহুবছর আগে।

গবেষকদের মতে, খ্রিস্টের আবির্ভাবের তিন থেকে পাঁচ-ছয় শতাব্দী পূর্বেই গ্রিসে নাট্যশাস্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে। কিন্তু সেকালে আধুনিক রঙ্গমঞ্চের মতো সুপরিকল্পিত কোনো মঞ্চব্যবস্থা ছিল না ; বরং উন্মুক্ত প্রান্তরে বা পর্বতের পাদদেশে অনেকটা যাত্রার আসরের মতো করে নাটক অভিনীত হতো।

 

কাব্যনাট্যের সংজ্ঞার্থ ও স্বরূপ

 

এথেন্স শহরে প্রাচীন ডাইওনিয়সের মন্দিরে এপিডাউরাস নামক স্থানে যে থিয়েটার অবস্থিত ছিল, সেখানে চারপাশের গ্যালারিতে অবস্থিত হাজার হাজার দর্শকের সম্মুখে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তব্যাপী একই দিনে তিনটি নাটক অভিনীত হতো। মানবজীবনের গতিময় অবস্থা নিয়ে স্বতন্ত্র অথচ ধারাবাহিক এ নাটকগুলোর থেকেই আধুনিক ট্রিলজি বা ত্রিস্তরী সাহিত্যের উদ্ভব হয়েছে।

মানবসভ্যতার বিবর্তনের একটি মৌল বিষয় হলো, জীবনধারণের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার পর, মানুষমাত্রেই তার আত্মিক প্রয়োজন মেটানোর দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আবার মানুষের অন্য আরেকটি মৌল প্রবণতা হলো যূথবদ্ধতা। একমাত্র নাট্যকর্মের মাধ্যমেই মানুষ তার এ দুটি বৈশিষ্ট্য একইসঙ্গে উপস্থাপন উপভোগ করতে পারে। কেননা, ‘নাচ-গান অঙ্গভঙ্গির জটিল সমবেত মিশ্ৰণ পাওয়া যায় নাট্যাভিনয়ের মধ্যে।

কয়েকজন মিলে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে একটি কাহিনী যা নিদেনপক্ষে একটি পরিস্থিতির মায়াময় রূপ প্রকাশ করা হয় দর্শক শ্রোতার সামনে। একক আনন্দ মিলেমিশে যায় সামাজিক আনন্দের সঙ্গে। এক হয়ে যায় অনেক, অনেক হয়ে যায় এক, প্রত্যক্ষ জগতের মধ্যে আমরা পাই কল্পজগতের বৈচিত্র্য।’ সংস্কৃত, গ্রিক উভয় ভাষার সমালোচনা-সাহিত্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় সকল শাস্ত্রকারই নাটককে কাব্যশাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত করেছেন ; কেননা সেকালে নাটকের ভাষাই ছিলো কবিতা। তবে প্রাচীনকালে নাটক রচনায় কবিতার গুরুত্ব সর্বাধিক হলেও প্রতীয়মান হয় যে, সেকালে জীবন ও সমাজের প্রত্যক্ষ বাস্তবতা প্রকাশে প্রায় সর্বক্ষেত্রেই কবিতার চর্চা ও প্রয়োগ ছিল।

আদিকাল থেকেই মানবসমাজের সঙ্গে কবিতার ছন্দ ও অভ্যন্তরীণ সুরের সম্পর্ক নিবিড়। মানুষ জাদুবিদ্যা থেকে শুরু করে শিকার করা, ধর্মীয় উৎসব, নিজস্ব পরিসরে আনন্দ উদযাপন প্রতিটি পর্যায়ে মন্ত্রোচ্চারণের মতো করে কবিতার সুর, তাল, লয়, ছন্দকে আত্তীকৃত করে নিয়েছে। নাট্যগবেষকগণ গবেষণা করে দেখেছেন যে, আদিপর্যায়ে নাট্যসাহিত্য উদ্ভাবনের পশ্চাতে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, রীতি-পদ্ধতি, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

বস্তুত, ‘নাট্য- সাহিত্যের এবং নাট্যপ্রয়োগের ক্রমবিকাশের ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলেও দেখা যাবে নাটক এবং নাটকের প্রয়োগ অর্থাৎ উপস্থাপনা-রীতি, অভিনয়-রীতি প্রভৃতি বিশেষ বিশেষ সমাজের অগ্রগতির ইতিহাসের সঙ্গে বিশেষ বিশেষ যুগের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক, নৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অবস্থার সঙ্গে নিগূঢ় যোগে যুক্ত।১

যে-কারণে, সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিকশিত হয়েছে মানুষের বহুমুখী চিন্তন, সেই সঙ্গে বিচিত্র ভাষাগত বিকাশমাধ্যম।ফলে কবিতার পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, অনুগল্প, প্রবন্ধসাহিত্য, ভ্রমণসাহিত্যের মতো জীবনবাদী গদ্যসাহিত্য।

বলা যায়, মানুষের জীবনধারণের সঙ্গে সমীকৃত হয়ে কবিতার সমান্তরালে একটা বিশাল স্থান করে নিয়েছে আধুনিক এই কথাসাহিত্য। তদুপরি মানব সভ্যতার বিকাশ- বিবর্তনের পথ-পরিক্রমা ধরে আধুনিক এই যান্ত্রিক যুগে এসেও কবিসাহিত্যিকগণ কবিতার সঙ্গে নাটকের নিবিড় সম্পর্ক অস্বীকার করতে পারেননি। যার ফলস্বরূপ গদ্যের আদল এবং কবিতার শিল্পিত সমন্বয়ে রচিত হয়েছে আধুনিক কাব্যনাটক।

প্রাচীনকাল থেকে মানুষ যা কিছু রচনা করেছে, তার ভাষামাধ্যম ছিল কবিতা। এর একটি কারণ হলো মানুষ স্বভাবতই সুরপ্রিয় ও ছন্দপ্রিয়। এর আরেকটি সমাজতাত্ত্বিক কারণ হলো লিখন ও মুদ্রণ যন্ত্রের অপ্রতুলতা। মানুষ তার ভাবনা, দর্শন, চিন্তনকে অবিস্মরণীয় করে রাখতে আশ্রয় নিয়েছে স্মৃতিশক্তি ও মুখস্থবিদ্যার। কেউ কেউ অবশ্য পশুর চামড়া, বৃক্ষবাকল ও শিলাখণ্ডে তাঁদের লেখনীকে অমর করে রেখেছেন।

বস্তুত, গদ্যভাষার তুলনায় কবিতার পক্তি স্মৃতিতে দীর্ঘস্থায়ীভাবে থেকে যায়, একারণেই প্রাচীন দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক- সাহিত্যিকগণ তাঁদের অমরগ্রন্থগুলো রচনা করেছেন কবিতার ভাষায়। এমনকি একারণেই সব প্রধান প্রধান ধর্মগ্রন্থগুলো কবিতার পঙ্ক্তিতে রচিত হয়েছে। বস্তুত, ‘বিশ্বের প্রাচীন সব সাহিত্যই মৌখিক ঐতিহ্য ও ধারার মধ্যদিয়েই বিকশিত হয়। […] মৌখিক ঐতিহ্যের ফলে সাহিত্যের অন্যতম প্রধান শাখা নাট্যকলাও স্মৃতি ও শ্রুতির উপর নির্ভর করে বিকশিত হয়। এর ফলে ঐ আঙ্গিক ছন্দ নির্ভর হয়ে ওঠে।

 

কাব্যনাট্যের সংজ্ঞার্থ ও স্বরূপ

 

প্রাচীন গ্রিক নাট্যকলায় মূলত মানবসভ্যতার এই চিরন্তন ছন্দপ্রিয়তার প্রভাব পড়েছে। বস্তুত, বিশ্বের প্রাচীন সব সভ্যতারই সাহিত্য-সমাজ-দর্শন বিকশিত হয়েছে কাব্যরূপে। গ্রিক, জাপানি, স্কান্ডেনেভীয়, রোমান, চীনা, মিশরীয়, অ্যাংলো-স্যাক্সনসহ সব সভ্যতাতেই জীবনচর্চার প্রাথমিক ভাষারূপ হিসেবে কাব্যকে বেছে নিয়েছেন লেখকগণ। কেবল সাহিত্যের প্রধান ভাষা হিসেবেই কাব্য ব্যবহৃত হয়নি, সাহিত্যবহির্ভূত জীবনাচরণ বিষয়ক প্রায় সব রচনাতেই ভাষামাধ্যম হিসেবে ছন্দলালিত্যপূর্ণ কবিতার ভাষাকে চয়ন করা হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক হেসিয়াদকে (Hesiod, ৭৫০-৬৫০ খ্রিপূ); যিনি ঈশ্বরতত্ত্ব প্রচার কিংবা ভূস্বামী, জোতদারদের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনাবলিবিষয়ক রচনাতেও ব্যবহার করেছেন কবিতার ভাষা। আবার সোলেন ( Solon, ৬৩০-৫৬০ খ্রিপূ) নামক একজন প্রাচীন গ্রিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাজনীতি বিষয়ক প্রবাদ রচনার ক্ষেত্রে কবিতার ভাষা ব্যবহার করেছেন।

এভাবে আর্যজাতির তত্ত্ববিদ্যা বিষয়ক ভাবনা-চিন্তা, মিশরীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান ও সৃষ্টিতত্ত্ব, গণিতচর্চার সূত্র ও নিয়মাবলি, প্রকৃতি, আবহাওয়া, ফসল- বিন্যাসসংক্রান্ত প্রায় সর্বপ্রকার গ্রন্থই কবিতায় রচিত হয়েছে। ভারতবর্ষে খনার বচন (আনু. ৮ম-১২শ শতাব্দী), মেয়েলি ব্রতকথা; পাশ্চাত্যের ওভিদের (Publius Ovidius Naso, ৪৩-১৮ খ্রিপূ) প্রণয়কৌশল, ভার্জিলের (Publius Vergilius Maro, ৭০-১৯ খ্রিপূ) কৃষিবিষয়ক রচনা, প্রভৃতিতেও কবিতার ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে।

‘এমনকি যে প্লেটো রিপাবলিকের দশম খণ্ডে তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রে কবিদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন তিনিও ছিলেন কাব্যানুরাগী। ঐ গ্রন্থেই তিনি হোমারের প্রতি তাঁর আশৈশব অনুরাগ ও শ্রদ্ধার কথা উল্লেখ করেছেন। শেলি এ ডিফেন্স অব পোয়েট্রিতে প্লেটোকে বলেছেন ছদ্মবেশি কবি। দর্শন ও আধুনিক যুগে যখন নাট্যকারগণ নাটকের ভাষা হিসেবে কবিতার প্রয়োগ করেছেন তখন তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন।

এই সময়ে ঐতিহ্যবাহী নাট্যাঙ্গিকের বাইরে নাট্যকারগণ যখনই নতুন সৃজনশীল কোনোকিছু চিন্তা করেছেন, তখনই ভেবেছেন নাট্যসংলাপে চমকসৃষ্টি বা আকস্মিকতা সৃষ্টিতে কবিতার বিকল্প হতে পারে না; তাঁরা কাব্যভাষার মাধুর্য ও চমক, উপমা-রূপক-চিত্রকল্পের সম্মিলিত নান্দনিকতাকে নাট্যসংলাপে যুক্ত করে নাটককে উত্তীর্ণ করতে চেয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। এসময় থেকে নাটকে উপস্থাপিত চরিত্রের অন্তর্ভাবনা প্রকাশের ক্ষেত্রে কিংবা চরিত্রের সঙ্গে দর্শকের সরাসরি সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে কবিতা একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যাবহৃত হয়ে আসছে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাতে এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে নিম্নরূপে :

Play wright can exercise better control both over speech and movement of his actors and over the responses of his audience by using the more subtle tones and rhythms of good poetry.

বস্তুত, প্রাচীন নাটকের ভাষামাধ্যম ছিল কেবলই কবিতা; আধুনিক কাব্যনাটকের যে আঙ্গিক বিদ্যমান সেটি প্রাচীন কালের নাটকে অনুপস্থিত ছিল। যদিও কবিতায় রচিত বিশ্বের প্রধান প্রধান মহাকাব্য যেমন, পাশ্চাত্যের ইলিয়ড, ওডিসি; প্রাচ্যের রামায়ণ, মহাভারত, মধ্যযুগের বাংলা কাব্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলি, মঙ্গলকাব্য, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানে উচ্চাঙ্গ নাট্যগুণ চোখে পড়ে। তবুও এগুলোকে বিশুদ্ধ কাব্যনাট্য বলা যায় না। তবে আধুনিক কাব্যনাট্যের প্রাকসূচনা ধরলে গ্রিকনাট্যকার এস্কিলাস (Aeschylus, ৫২৩-৪২৬ খ্রিপূ), সফোক্লিস (Sophocles, ৪৯৭/৪৯৬-৪০৬/৪০৫ খ্রিপূ), ইউরিপিডিস (Euripides, ৪৮০ -৪০৬ খ্রিপূ), এরিস্টোফানিসের (Aristophanes, ৪৪৬-৩৮৬ খ্রিপূ) নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।

তাঁদের সূচিত নাট্যপ্যাটার্ন পরবর্তীকালে এলিজাবেথীয় যুগে উইলিয়াম শেকসপিয়রের (১৫৫৪-১৬১৬) নাট্যকলার মধ্যদিয়ে আংশিক বিকশিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমানকালে কাব্যনাটকের যে রূপাঙ্গিক আমরা প্রত্যক্ষ করি সেটির জন্ম বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভকালে ইয়োরোপীয় কবি টি.এস. এলিয়টের (১৮৮৮-১৯৬৫) হাত ধরে। নাটকে কবিতার ভাষা প্রয়োগের উপযোগিতা নিয়ে আধুনিক কাব্যনাটকের জনক টি. এস. এলিয়ট নিম্নরূপ মন্তব্য করেছেন :

poetry is essentially dramatic and the greatest poetry always moves towards drama, drama is essentially poetic and the greatest drama always moves towards poetry.

প্রকৃতপ্রস্তাবে, কাব্যনাট্যকারগণ নাটক ও কবিতার ভাষার মধ্যে অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক অনুধাবন করেছেন। আর তাঁদের সেই অভিজ্ঞানের শিল্পসম্মত প্রতিফলন ঘটেছে জগৎবিখ্যাত কাব্যনাটকগুলোতে। সাধারণ পাঠক- দর্শকদের মধ্যে সহজ সরল একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, কবিতার ভাষায় রচিত নাটকই বুঝি কাব্যনাটক ।

কিন্তু বাস্তবতা হলো বিশেষ ছন্দে শব্দ গ্রন্থিত হলেই যেমন কবিতা হয় না, তেমনি পদ্যছন্দে রচিত নাট্যবৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সাহিত্যকর্ম মানেই কাব্যনাটক নয়; বরং কাব্যনাটকের ক্ষেত্রে কবিতার ভাষা ও নাটকের নাট্যগুণ যখন সর্বপ্রকার বাহুল্যবর্জিত হয়ে পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠতে পারবে, তখনই রচিত  হবে সার্থক কাব্যনাটক; ইংরেজি ভাষায় যার নামকরণ করা হয়েছে ‘verse play’ বা ‘poetic drama |

‘কাব্যনাটক’ শব্দবন্ধটি এ-ইংরেজি শব্দের পারিভাষিক প্রপঞ্চরূপে বাংলাসাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে। নাট্যাঙ্গিকে সুললিত কোন কবিতা উপস্থাপিত হলেই তাকে কাব্যনাট্য বলা যায় না। কাব্যনাট্য আরও বেশিকিছুকে ধারণ করে রচিত হয়। সমালোচকের মতে :

নাটকের আঙ্গিকে কবিতা এ কথা সত্য, কিন্তু কবিতা ও নাটক এখানে পরস্পরে সম্পৃক্ত। নাটক এখানে তীব্র নাটকীয়তাকে দমন করেছে, কবিতাও শুধু আবৃত্তিযোগ্য না হয়ে দৃশ্যরূপে উদ্ভাসিত।’

 

কাব্যনাট্যের সংজ্ঞার্থ ও স্বরূপ

 

কাব্যনাট্যে কবিতা ও নাটকের সুষমবিন্যাসের কথা প্রায় সকল নাট্যবোদ্ধা ও সমালোচক স্বীকার করে নিলেও স্বয়ং এলিয়টই তাঁর কাব্যনাট্যে এই অন্বয় সবসময় ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। এলিয়ট তাঁর একাধিক রচনায় এই সীমাবদ্ধতার কথা সারল্যের সঙ্গে স্বীকার করে নিয়ে বলেছেন, তাঁর রচিত সার্থক কাব্যনাটকগুলোতে কবিতার তুলনায় নাট্যগুণের প্রাধান্য অনেকটাই বেশি। অন্যদিকে কাব্যনাটকের স্বরূপ উপস্থাপন প্রসঙ্গে সমালোচক মাহবুব সাদিক বলেছেন :

নাটক ও কাব্য এখানে পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে অন্বিত। সাধারণভাবে কবিতা নিজের প্রাধান্য পরিহার করে নাটকের অন্তর্দেশে সমন্বিত হলেই তাকে কাব্যনাট্য বলা যেতে পারে। […] কাব্যনাটকে নাটক ও কবিতা একই সৃষ্টিশীল রূপকল্পের দুটি ভিন্ন উপাদান যারা পরস্পরের সহযোগী। এখানে কবিতা ও নাটকের – সামগ্রিক মিলনের মধ্যদিয়ে সৃষ্টি হয় কাব্যনাটকের সুগঠিত রূপকল্প। আত্মচেতনাময় মানবসত্তা অন্যের মনোচৈতন্যে নিজের জীবনপ্রত্যয় সঞ্চারিত করার জন্যেই আধুনিক কালে কাব্যনাটকের নতুন শিল্পপ্রকরণ গড়ে তুলেছে। ২

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে কাব্যনাট্য অপেক্ষাকৃত আধুনিক যুগের সাহিত্যকর্ম; যেটি সময়ের বিবর্তমান ধারায় ধাপে ধাপে ধীরে ধীরে নিজস্ব পথ করে নিয়েছে। যদিও এর পূর্ণতা ঘটেছে আমেরিকান বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ কবি টি এস এলিয়টের অনবদ্য প্রতিভাসূত্রে, তবু পাশ্চাত্য সাহিত্যসমাজে উনিশ শতকের অনেক কবি-সাহিত্যিক যেমন, ব্রিটিশ কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ (১৭৭০-১৮৫০), স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ (১৭৭২-১৮৩৪), জন কীটস (১৭৯৫-১৮২১), লর্ড বায়রন (১৭৮৮-১৮২৪), আলফেড টেনিসন (১৮০৯-১৮৯২), রবার্ট ব্রাউনিং (১৮১২-৮৯), ম্যাথিউ আর্নল্ড (১৮২২-১৮৮৮), চার্লস সুইনবার্ন (১৮৩৭-১৯০৯), ইটালির কবি প্রিসি শেলি (১৭৯২-১৮২২), আইরিশ কবি ম্যানলে হপকিন্স (১৮৪৪-৮৯) প্রমুখ কবিতার ভাষায় নাটক রচনার প্রয়াস নিয়েছিলেন।

এরা প্রত্যেকেই এ সাহিত্যকর্ম রচনার ক্ষেত্রে আদর্শ হিসেবে গ্রিক নাট্যকলার ধ্রুপদী ফর্ম অথবা শেকসপিয়রীয় নাট্যকলার নিজস্ব ফরমেটকে অনুসরণ করেছেন; কিন্তু তাঁদের কেউই একজন সফল কাব্যনাট্যরচয়িতা হিসেবে সেভাবে সার্থক হয়ে ওঠেননি। অপরদিকে, বিংশ শতাব্দীতে এসেও যুগের চাহিদায় সমাজবিবর্তনের ধারাক্রমে সমকালীন স্বনামখ্যাত কবিগণ কাব্যের ভাষায় নাটক লিখতে সচেষ্ট হন।

তবে এগুলোর অধিকাংশই ছিলো পরীক্ষামূলক সৃষ্টিকর্ম। নিতান্তই পরীক্ষামূলকভাবে তাঁরা এসব রচনা ঘরোয়া জীবনে একান্ত বন্ধুবাৎসল পরিবেশে কিংবা লিটল থিয়েটারে নির্বাচিত উচ্চশ্রেণির সুশিক্ষিত দর্শকের সামনেই মঞ্চস্থ করতেন।

মূলত, এমন পারিবারিক ঘরোয়া পরিবেশে মঞ্চস্থ করার উদ্দেশ্যেই টি এস এলিয়টও তাঁর আধুনিক কাব্যনাট্যের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত প্রথম নাটক সুইনি এগোনিস্টিস (Sweeny Agonistes, ১৯৩২) রচনা করেন। এলিয়ট এ নাটকটির রচনা শুরু করেছিলেন ১৯২৬ সালে। কিন্তু দুটি দৃশ্য রচনার পর তিনি আর এটিকে সম্পূর্ণ করেননি। ফলে ১৯৩২ সালে ছোট একটি পুস্তিকা আকারে অসমাপ্ত এ নাটকটি খণ্ড নাটক হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।

টি এস এলিয়ট এরপর লন্ডনের একটি গির্জার পর্যাপ্ত ফান্ড গঠনের প্রয়োজনে দ্য রক (The Rock, ১৯৩৪) নামক নাটকের কোরাস লিখে আধুনিক কাব্যনাট্যের শুভসূচনা করেন। নাটকটি ছিল অনেক বিখ্যাত মানুষের একটি সম্মিলিত উদ্যোগ; এবং এটির প্রথম মঞ্চায়ন হয়েছিল লন্ডনের বিখ্যাত Sadler’s Wells Theatre – ২৮ মে ১৯৩৪ সালে। নাটকটিতে সঙ্গীতের আয়োজন করেছিলেন বিখ্যাত সুরকার মার্টিন শ (Martin Edward Fallas Shaw, ১৮৭৫-১৯৫৮)।

উল্লেখ্য যে, টি. এস. এলিয়ট কাব্যনাটক রচনার প্রারম্ভ থেকেই কবিতার চমৎকারিত্বের পাশাপাশি নাট্যক্রিয়া নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। কাব্যনাট্য রচনায় তিনি সর্বদা সতর্ক থেকেছেন এ কারণে যে, যেন কবিতার ভাবাবেগ নাট্যক্রিয়াকে গ্রাস করে না ফেলে। ‘The Four Elizabethan Dramatistis’, ‘A Dialogue On Dramatic Poetry’, ‘Rhetoric and Poetic Drama’, ‘Poetry and drama’ প্রভৃতি প্রবন্ধে তিনি কাব্যনাট্যের তাত্ত্বিকরূপ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

আবার, তিনি কেবল এই তাত্ত্বিকরূপেই নিবদ্ধ থাকেননি; বাস্তবে কাব্যনাট্য রচনা করে তার প্রমাণ দেখিয়েছেন। The Rock লেখার পরে তিনি Murder in the Cathedral (১৯৩৫), The Family Reunion (১৯৩৯), The Confidential Clark (১৯৫৩) ও The Elder Statesman (১৯৫৮) নামক চারটি সফল ও সার্থক কাব্যনাটক রচনা করেন ।

এলিয়টের মতে গদ্যনাটক মূলত অস্থায়ী ও বহিবিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। অন্যদিকে কবিতায় চিত্রিত হয় স্থায়ী ও অন্তর্গত বিষয়। এ-কারণেই তিনি তাঁর কাব্যনাটকগুলোতে নাট্যক্রিয়া স্পষ্ট করেছেন প্রধান প্রধান চরিত্রের মানসিক দ্বন্দ্ব ও আভ্যন্তরীণ সংকটের মাধ্যমে। যেমন মার্ডার ইন ক্যাথিড্রালের প্রধান চরিত্র চার্চের সেবক বেকেটের হৃদয়জাত অন্তর্দ্বন্দ্ব, দ্য ফ্যামিলি রিইউনিয়নের প্রধান চরিত্র হ্যারির নিজস্ব অপরাধবোধ ও অনুশোচনাজাত মানসিক দ্বন্দ্ব, দ্য এলডার স্টেটসম্যানের প্রধান চরিত্র লর্ড ক্লেভারটনের মানসজাত অভ্যন্তরীণ শূন্যতা ও আতঙ্কের মাধ্যমেই নাট্যিক দ্বন্দ্ব রূপায়িত হয়েছে।

তবে বিশ শতকের প্রারম্ভে কেবল টি এস এলিয়টই নন, সমসাময়িক আরো অনেক সাহিত্যিকই নাটকের আঙ্গিক হিসেবে কাব্যনাটককে নির্বাচন করেছেন। এদের মধ্যে ডব্লিউ বি ইয়েটসের (William Butler Yeats, ১৮৬৫-১৯৩৯) নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য। আইরিশ এ কবি-নাট্যকার কাব্যনাটকের আঙ্গিককে ভালবেসে কাব্যনাট্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আরেক বিখ্যাত আইরিশ নাট্যকার লেডি গ্রেগরির (Isabella Augusta Lady Gregory, ১৮৫২-১৯৩২) সঙ্গে যুক্তপ্রয়াসে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরে ২৭ ডিসেম্বর ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অ্যাবি থিয়েটার’ (Abbey Theatre)।

তাঁদের প্রতিষ্ঠত এই নাট্যমঞ্চ বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের জাতীয় নাট্যমঞ্চরূপে স্বীকৃতি পেয়েছে; এবং আইরিশ শিল্প-সংস্কৃতি বিকাশে যুগ যুগ ধরে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। বলা যেতে পারে, নাট্যসৃজনে ইয়েটসের দক্ষ ও সৃজনক্ষম প্রজ্ঞার ফলেই কাব্যনাটকে পুনর্জন্ম ঘটেছে পুরাণ ও কিংবদন্তির। তবে ইয়েটস, লেডি গ্রেগরি ছাড়াও আইরিশ কবি-নাট্যকার সিঙ (Edmund John Millington Synge, ১৮৭১-১৯০৯), সিন ও কেসি (Sean O Case, ১৮৮০-১৯৬৪) প্রমুখ বিশ্বজুড়ে আধুনিক কাব্যনাট্য বিকাশের ক্ষেত্রে প্রচুর অবদান রেখেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই অ্যাবি থিয়েটারে নাট্য প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তবে এঁদের ছাপিয়ে কাব্যনাটকে টি এস এলিয়টই হয়ে ওঠেন একক ও অনন্য ব্যক্তিত্ব। কাব্যনাটকের রচনা ও বিকাশের ক্ষেত্রে তাঁর যে চিন্তনক্রিয়া ও ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে মূলত সেটিকে অনুসরণ করেই বিশ্বের অন্যান্য ভাষা-ভাষী সাহিত্যিকগণ পরবর্তীকালে কাব্যনাটক রচনা করেছেন। তিনি প্রচলিত নাটকের আঙ্গিকে বেশকিছু নাট্যফর্ম সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে আধুনিক কাব্যনাট্যের নিজস্ব একটি কাঠামো দাঁড় করান।

 

কাব্যনাট্যের সংজ্ঞার্থ ও স্বরূপ

 

গ্রিক নাট্যকলার যে ‘ত্রয়ী ঐক্য’ (The Three Unites unity of action, unity of time, unity of place) গ্রিক দার্শনিক ও কাব্যতাত্ত্বিক এরিস্টটল (Aristotle, ৩৮৫-৩২২ খ্রিপূ) প্রদান করেছিলেন, তার সাথে টি এস এলিয়ট যুক্ত করেছেন ‘আবেগের ঐক্য (emotional unity)। এর যৌক্তিকতা ব্যাখায় তিনি বলেন :

The poetic drama must have an emotional unity, let the emotion be whatever you like. It must have a dominant tone, and if this be strong enough, the most heterogeneous emotions maybe made to re- inforce it.’
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত কবিদের কাব্যনাটক রচনার ব্যর্থতার কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে যে, কবিতার রূপকল্প ও ভাষা সৃষ্টিতে অনন্য হলেও মঞ্চ বিষয়ে তাঁরা অনভিজ্ঞ ছিল এবং নাটক সম্পর্কেও তাঁদের সম্যক ধারণা ছিল না। আবার যাঁদের মঞ্চ ও নাটক সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান ছিল তাঁরা হয়তো কবিতার রূপমাধুরীকে পরিপূর্ণ মেলে ধরতে পারেননি। একারণে তাঁরাও হয়েছেন ব্যর্থ। মূলত কবিতা ও নাটকের সুসমন্বয় ছাড়া কাব্যনাট্য অসম্ভব।

বস্তুত, ঐতিহ্যবাহী নাটক এবং আধুনিক কাব্যনাট্যের একটি মৌল পার্থক্য হলো – কাব্যনাট্যে নাট্যসংঘাত সৃষ্টির ক্ষেত্রে বর্হির্ঘটনার চেয়ে চরিত্রের অভ্যন্তরীণ সংকট বা দ্বন্দ্বকে প্রাধান্য দেয়া হয় বেশি; এবং এই অন্তর্দ্বন্দ্বে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে চরিত্রেরই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, বেদনা-বিক্ষোভ।

এলিয়টের কাব্যনাটক পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তিনি কাব্যনাটকের দ্বন্দ্ব সৃষ্টিতে বহির্বাস্তবতার তুলনায় অন্তর্বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন অধিক। যেহেতু মানব চরিত্রের হৃদায়াবেগ প্রকাশে কবিতার বিকল্প নেই, সেহেতু কাব্যনাটকের চরিত্রগুলোর মানসিক দ্বন্দ্ব, আবেগ, যাতনা দহন প্রভৃতি প্রকাশে নাট্যকার কবিতার ভাষাকেই প্রধান মাধ্যম করে তুলেছেন। এতপ্রসঙ্গে টি এস এলিয়টের বিশ্বখ্যাত নাটক Murder in the cathedral কাব্যনাট্যটি আলোচনা করা যেতে পারে।

এ নাটকের কাহিনি যদিও আবর্তিত হয়েছে রাজার সঙ্গে প্রধান ধর্মযাজক বেকেটের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং তারই প্রতিক্রিয়াস্বরূপ রাজাদেশে যাজক বেকেটকে হত্যা করার ঘটনা অবলম্বনে; তবু দেখা যাবে যে, এ নাটকের নাট্যরসসৃষ্টিকে মূল অনুঘটক হিসেবে ক্রিয়াশীল থেকেছে ধর্মযাজক টমাস বেকেটের অভ্যন্তরীণ সংকট, মানসদ্বন্দ্ব। নাটকে এলিয়টের মূল উদ্দেশ্য ছিলো রাজ-কাহিনি বর্ণনা নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে বীজ সংগ্রহ করে প্রধান চরিত্রের মানসলোকে শিল্পের আলোক প্ৰক্ষেপণ ।

এলিয়ট মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, মানুষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আবেগ প্রকাশে কবিতার ভাষার বিকল্প নেই। এটি কেবল তাঁর নিজের মতামত নয়, তিনি এক প্রবন্ধে বলেন যে, মানুষের আবেগ কিংবা হৃদয়জাত সুখ- দুঃখের অনুভূতি প্রকাশে কবিতাময় ভাষাব্যবহার স্নায়ুবিশেষজ্ঞ দ্বারাও স্বীকৃত। এ প্রসঙ্গে এলিয়টের লেখা থেকে প্রাসঙ্গিক এলাকা উল্লেখ করা যেতে পারে :

The human soul, in intense emotion, strives to express itself in verse. It is not for me, but for the neurologist to discover why this is so the tendency, at any rate of porse drama is to emphasise the ephemeral and superficial; if we want to get at the permanent and universal we tend to express ourselves in verse.’

মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের (১৮৫৬-১৯৩৯) মতে মানুষ মাত্রেই দ্বৈতসত্তার অধিকারী। একই সঙ্গে একই সময়ে সে বিচিত্র ভাবনা লালন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোনো ব্যক্তি যখন অন্যের সাথে বাক্যালাপে নিমগ্ন হয়, তখন ব্যক্তি তার ব্যক্তিত্বের সামাজিক দিকটিই প্রকাশ করে থাকে। ফলে একই সময়ে তার হৃদয়ের অভ্যন্তরে চলতে থাকা তার অন্য আর একটি সত্তা আড়ালেই থেকে যায়।

অর্থাৎ একই সঙ্গে একই সময়ে একই মানুষ দুটি সংকট মোকাবেলা করে বাঁচে। এক. ব্যক্তির সামাজিক সংকট, দুই. ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ সংকট; এ দুটির সমন্বয়ে সর্বদা চলতে থাকে ব্যক্তির নিজের সঙ্গে নিজের দ্বন্দ্ব। ব্যক্তির অভ্যন্তরে লুকায়িত এই আত্মদ্বন্দ্ব এবং জনসম্মুখে প্রকাশিত সামাজিক দ্বন্দ্বকে একই সঙ্গে মঞ্চে উপস্থাপনের উদ্দেশ্য থেকেই টি এস এলিয়ট রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত কাব্যনাটক Murder in the Cathedral। সমালোচকের মতে :

একদিকে এই বাইরের সামাজিক জগৎ ও অন্যদিকে এই অন্তর্জগৎ – এ দুয়ের মেল-বন্ধন রচনা থেকেই এই নূতন নাট্যপ্রকার ‘কাব্যনাটক’ (Poetic Drama)-কে নিয়ে এলেন টি. এস. এলিয়ট। […] এলিয়ট চেয়েছিলেন নাটক আর কবিতার পুনর্মিলন হোক। […] এলিয়ট ভাবতেন পদ্যে লেখা নাটক এমন হবে যাতে নাটকের action টাই প্রধান হয়। ১

বস্তুত, প্রচলিত গদ্যাঙ্গিকের নাটকের ক্লাইমেক্স, টান টান উত্তেজনা, ঘটনার ধারাবাহিকতা, সুস্পষ্ট পরিণতি প্রভৃতি দেখে যেমন সাধারণ দর্শক আনন্দলাভ করেন, কাব্যনাটকে এমনটা আশা করা যায় না। এখানে কাহিনি বর্ণনা কিংবা কবিতার মাধুর্য উপভোগ করানো নাট্যকারের মূল উদ্দেশ্য নয়; বরং নাট্যকার নাটকের বিষয়বস্তু, তাঁর সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বোধ প্রকাশ করেন কবিতার লালিত্যকে আশ্রয় করে। এখানে একটি বিশেষ বাণী এবং আনুভূতিক বিশেষ দ্যোতনা প্রকাশই কাব্যনাট্যকারের উদ্দেশ্য।

সুতরাং, কবিতার ভাষায় লিখিত নাটকমাত্রেই কাব্যনাটক হয়ে ওঠে না, বরং ‘কাব্যনাটক মূলত নাটক, তবে এখানে প্রচলিত নাটকের ঘটনা প্লট-সংঘাত একটু আলাদা রকমের। ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে কতগুলো চরিত্র নির্মাণ করা নাটকের উদ্দেশ্য, অন্যদিকে ঘটনা ও সংঘাতকে ম্রিয়মান রেখে ব্যক্তির অন্তর রহস্যকে সূক্ষভাবে তুলে ধরা হয় কাব্যনাটকে। জীবনের দ্বন্দ্ব, মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে কবিতার পেলবরসে একটু ঘটনার ছোঁয়া দিয়ে উপস্থাপন করাই কাব্যনাটকের উদ্দেশ্য।” “কাব্যনাট্য আগেকার কবিতার লেখা নাটক নয় – এ এক নতুন ধারা।

 

কাব্যনাট্যের সংজ্ঞার্থ ও স্বরূপ

 

টি. এস. এলিয়টের মতে মানব চরিত্রের চূড়ান্ত আবেগানুভূতির সঠিক ও সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটে কবিতার ভাষায় । তবে তিনি মনে করতেন চূড়ান্ত আবেগীয় মুহূর্ত এবং মানব চরিত্রের হৃদয়জাত ভাবনা যদি গদ্যভাষাতেও প্রকাশ করা হয় তবে গদ্যভাষায় রচিত হলেও সে সাহিত্যকর্মকে কাব্যনাটক বলা যেতে পারে।

তিনি মূলত কাব্যনাটকের ভাষার তুলনায় নাট্যগুণের ক্ষেত্রে অধিক মনোযোগ দিয়েছেন। কেননা, তিনি চেয়েছেন নাটকের ভাষা গদ্য বা পদ্য যাই হোক দর্শক যেন নাটকের ভাষাকে ছাপিয়ে নাট্যগুণের দিকে অধিক মনযোগী হয়। দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে তিনি ষোড়শ শতাব্দীর কিংবদন্তিতুল্য ইংরেজ নাট্যকার-কবি উইলিয়াম শেকসপিয়রের হ্যামলেট (Hamlet, প্রথম মঞ্চায়ন: ১৬০৯) নাটকের প্রারম্ভিক দৃশ্যের ভাষাশৈলীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন।

তাঁর মতে, দর্শক হ্যামলেট নাটকের ভাষাশৈলীর চমক থেকে নাট্যক্রিয়ার প্রতি অধিক মনোযোগী। টি এস এলিয়ট তাঁর রচিত একাধিক নাট্যবিষয়ক প্রবন্ধে কাব্যনাট্যের বিচিত্রদিক নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।

কাব্যনাট্যের ভাষাগত দিক যেমন এসব প্রবন্ধে উপস্থাপিত হয়েছে তেমনি কাব্যনাট্যের বিষয় নিয়েও তাঁর মূল্যবান মতামতের প্রকাশ ঘটেছে। কাব্যনাট্যের বিষয় আলোচনায় একটি প্রবন্ধে তিনি বলেন :

verse plays, it has been generally held. Should eithter take their subject matter from some mythology, or else should be about some remote historical period, far enough away from the present for the characters.’

এলিয়টের বিবেচনায় মানবজীবনের অন্তর্বাস্তব ও বহির্বাস্তব দ্বন্দ্ব-সংকটের রূপায়ণই কাব্যনাট্যের মূল উদ্দেশ্য; কী বিষয়বস্তু নিয়ে কাব্যনাট্য রচিত হবে সেটি মুখ্য নয়। সেকারণে ঐতিহাসিক, পৌরাণিক, ক্লাসিক কিংবা আধুনিক জীবনের যেকোনো দ্বন্দ্বাত্মক বিষয়ই কাব্যনাট্যের বিষয়বস্তু হয়ে উঠতে পারে; আর সেই সঙ্গে যে কোনো চরিত্রই হয়ে উঠতে পারে কাব্যনাট্যের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কাব্যনাটকের ক্ষেত্রে গল্প মূলত একটি খোলস, এই খোলসের আড়ালে কাহিনির নির্যাস উপস্থাপনই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কাব্যনাট্যে কাহিনি অধিক গুরুত্ব পেলে কাব্যনাট্যরস বাধাগ্রস্ত হয়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গ্রিক ও শেকপিয়রিয়ান – উভয়শ্রেণির নাটক প্রধানত লিখিত হয়েছে ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে, যার সঙ্গে অধিকাংশ দর্শক পূর্ব থেকেই পরিচিত থাকতো। কিন্তু এই পরিচিত নাট্যকাহিনির মঞ্চ-উপস্থাপনের মধ্যে এমন কিছু চমক থকতো, যাতে নাটক কখনো তাদের কাছে শিথিলগ্রন্থির মনে হতো না। নাট্যকাররা তাঁদের দক্ষতা ও নৈপুণ্যে ওই কাহিনির মধ্যে নিয়ে আসতেন নতুন নতুন তাৎপর্য ও বিন্যাস। যার পরিপ্রেক্ষিতে এসব নাটক দর্শকচিত্তে কালজয়ী আবেদনসৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে।

কাব্যনাট্য রচনার ক্ষেত্রে এলিয়ট আঙ্গিককলা নির্মাণ ও ভাষাশৈলীর উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। কাব্যনাটকের ভাষা যতই কবিত্বপূর্ণ হোক, যতই কবিতা হিসেবে সার্থক হোক, তা যদি কাহিনি ও চরিত্রের উপযোগী না হয়, তবে সে-ভাষা ব্যর্থ ও রসাবেদনে বোঝাস্বরূপ। এলিয়ট মনে করতেন গদ্যেও যদি চরিত্রের অভ্যন্তরীণ সংকট উপস্থাপন করা যায়, তবে সেটি কাব্যনাটক হতে পারে। কিন্তু আধুনিক কাব্যনাট্যে গদ্য-পদ্য মিশ্ররীতিতে নাটক রচনা করলে দেখা যাবে তখন দর্শকগণ পৃথকভাবে কবিতার ভাষা নিয়ে সচেতন হয়ে উঠবে। তাই কবিতার ভাষাকে এমন করে নাটকে প্রয়োগ করা উচিত, যেন ভাষাগত দিক ছাপিয়ে নাটকের দ্বন্দ্ব ও নাট্যক্রিয়ায় লোকের মনোযোগ অধিক আকৰ্ষিত হয়।

কাব্যনাট্যের ভাষাপ্রয়োগ নিয়ে এলিয়ট স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দিয়েছেন। ঐতিহাসিক কিংবা পৌরাণিক – যে- কোনো নাট্যকাহিনিতে তিনি চরিত্রের সংলাপে সমকালীন ভাষা ব্যবহার করেছেন। অথচ এলিজাবেথীয় যুগে নাট্যকারগণ ভাষার ক্ষেত্রে দুটি নিয়ম মানতেন। তাঁরা অভিজাত চরিত্রের মুখে বসিয়েছেন পদ্য সংলাপ এবং অনভিজাত চরিত্রের মুখে বসিয়েছেন গদ্যসংলাপ। এলিয়ট তাঁর নাটকে এসব নিয়ম মেনে চলেননি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন :

আমার লক্ষ্য ছিলো দর্শক-বৃন্দকে অতীতের এক প্রকৃত ঐতিহাসিক ঘটনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়া। ভাষায় অতীতের অনুসরণ করে কোনো লাভ হতো না। হয়তো ভুল সময়ের ধারণা দিয়ে ফেলতাম। দ্বিতীয়ত, আমার উদ্দেশ্যই ছিলো সমকালীন জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে নাটকের মূল প্রতিপাদ্যকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলা।

এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কাব্যনাটকের ভাষায় সমকালীন সুর ও ছন্দ প্রয়োগে এলিয়ট সচেতন থেকেছেন মূলত অতীতের সার্থক কবিদের ব্যর্থ কাব্যনাট্য রচনার দৃষ্টান্তকে স্মরণে রেখে। ঊনবিংশ শতাব্দীর অধিকাংশ কবিই গ্রিক অথবা শেকপিয়রীয় নাট্য আদলে কাব্যনাটক রচনা করতে গিয়ে অমিত্রাক্ষর বা পঞ্চপার্বিক আয়াম্বিক ছন্দ প্রয়োগ করেছেন। অলংকারের প্রাচুর্যে তাঁদের ভাষা হয়ে পড়েছে সাধারণের মুখের ভাষার অনুপযুক্ত ও বাস্তবতাবর্জিত কৃত্রিম ভাষা ।

একারণেই এলিয়ট কাব্যনাটকে ছন্দ ও অলংকারের পরিমিত প্রয়োগে ভাষাকে ঊনবিংশ শতাব্দীর কাব্যরীতি থেকে পৃথক করে তুলতে পেরেছেন। বলা যায়, মার্ডার ইন ক্যাথিড্রাল কাব্যনাটক রচনাকালে তিনি ছিলেন কিছুটা নঞর্থক মানসিকতাসম্পন্ন। অর্থাৎ, পূর্বতন কবিদের রচনার কী কী বাহুল্য বর্জন করলে তাঁর নাটক বিংশ শতাব্দীর সময় ও সমাজকে ধারণ করে সার্থক হয়ে উঠবে – সে-বিষয়ে তিনি ছিলেন সদা সচেতন। এ-প্রসঙ্গে নবনাট্যকারগণকে পরামর্শ দিতে গিয়ে তিনি বলেন :

যে কবি মঞ্চের জন্যে লিখতে চান তাঁকে দীর্ঘকাল সাধনার দ্বারা কাব্যশক্তিকে সম্পূর্ণভাবে নিজের বশে রাখতে হবে। অর্থাৎ কবিতাকে স্বাস্থ্যকর স্বল্পহারে রেখে তাকে নাট্যমঞ্চের উপযোগিতা দান করতে হবে। যখন এই কুশলতা সম্পূর্ণ অর্জিত হবে, কবির তা দ্বিতীয় স্বভাবে পরিণত হবে, তখন কবিও মঞ্চের ওপর আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হবেন। কাব্য নির্মাণে নিত্যকার মুখের বুলিকে আরো অসঙ্কোচে ব্যবহার করতে সক্ষম হবেন।

কাব্যনাটকে নাটক ও কবিতার প্রয়োগ ঘটে সম্পূর্ণ পৃথক দ্যোতনায়। সফল কাব্যনাট্যকার তিনিই হবেন, যিনি তাঁর লেখনীতে নাট্যগুণ ও কবিতার প্রয়োগ করবেন পরিমিতিবোধ রক্ষা করে এবং সর্বদা নৈর্বক্তিক ও নিরাসক্ত থেকে। কেননা, কোনো নাটকে নাট্যগুণের তুলনায় কাব্যগুণ অধিক পরিলক্ষিত হলে সেটি কাব্যনাট্য না হয়ে নাট্যকাব্য হয়ে যাবার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়। একারণেই টি এস এলিয়ট কবিতার তুলনায় নাট্যগুণকে প্রাধান্য দিয়েছেন বেশি। কিন্তু নাটকে ভাষা হিসেবে কবিতার প্রয়োগে তিনি নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।

ভাষায় ছন্দবৈচিত্র্য ও অলঙ্কার নিয়ে প্রচুর নিরীক্ষার পাশাপাশি নাটকে সংগীতের ব্যবহারও তিনি করেছেন উপযুক্ততা বিচার করে; এমনকি ব্যালে ডান্সের মতো নাচের ফরমেটকেও তিনি নাটকের অংশ করেছেন। বাংলাদশের প্রখ্যাত কবি-নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) এ ধারা অনুসরণ করে তাঁর নিরীক্ষামূলক কাব্যনাটক অপেক্ষমাণ (২০০৯)-এ কোরাস চরিত্রের মাধ্যমে ব্রেকডান্সের প্রয়োগ করেছেন।

তবে সবকিছু ছাপিয়ে এলিয়টের বিবেচনায় দর্শকের কাছাকাছি পৌঁছানোই যেহেতু নাট্যকারের মূল উদ্দেশ্য, তাই তিনি তাঁর নাটকের ভাষাকে সরল করে উপস্থাপন করেছেন। নাটকের ভাষাকে তিনি কখনোই অলংকারের প্রাচুর্যে ভারাক্রান্ত করে তোলেননি। যে কারণে এলিয়টের কাব্যনাটকের সংলাপের ভাষা কবিতার ভাষা হলেও তা ছিলো। গদ্যের কাছাকাছি।

বস্তুত, এলিয়ট আনুষ্ঠানিকভাবে কাব্যনাট্যচর্চার বহুপূর্ব থেকেই আঞ্চলিক ভাষা ও কবিতার সহজ প্রয়োগে বেশ কিছু খণ্ডনাটক লেখার মাধ্যমে হাত পাকিয়ে নিয়েছিলেন । বস্তুত, ‘নাটকের একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে কাব্য নাটকের ভাষা কতো তীব্র, কতো গভীর হৃদয় ভাবব্যঞ্জক ও নাটকীয় হয়ে উঠেছে- এ বিচারই যথেষ্ঠ নয়। দেখতে হবে আদ্যন্ত নাটকটির মধ্যে কাব্যের ছন্দ তার অন্তর্নিহিত লাবণ্যের মতো অবস্থান করে মূল নাট্যরসের পরিপোষক হয়েছে কি না।’ ১

প্রকৃতপক্ষে, কাব্যনাট্যের ভাষা হতে হবে সর্বসাধারণের বোধগম্য ও সহজ-সরল। এর ফলে নাটকের মূলরস দর্শক সহজেই আস্বাদন করতে পারে। এ-কারণে প্রাচীন গ্রিক নাটকের ভাষায় দেখা যায় আঞ্চলিকতার ছাপ। এমনকি আধুনিক কাব্যনাট্যের জনক টি এস এলিয়ট থেকে শুরু করে বাংলাকাব্যনাট্যের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪), সৈয়দ শামসুল হক প্রত্যেকেই প্রয়োজনানুসারে তাঁদের কাব্যনাট্যে চরিত্রের সংলাপে আঞ্চলিক ভাষা, শব্দ, অলঙ্কার, লোকজ প্রবাদ-প্রবচন ব্যবহার করেছেন ।

সৈয়দ শামসুল হক পেশাগত কারণে ইংল্যান্ডে থাকার সময় প্রচুর মঞ্চনাটক প্রত্যক্ষ করেন। এ সময় তিনি গভীরভাবে লক্ষ্য করেন শেকপ্রিয়রিয়ান, এলিজাবেথিয়ান কিংবা গ্রিক নাটকের ভাষায় ব্যবহৃত হয়েছে কবিতার অনন্য লালিত্যময় আবেগ। এমনকি টি এস এলিয়টের কাব্যভাবনা, ইবসেন (Henrik Johan Ibsen, ১৮২৮-১৯০৬) রচিত নাটকের রচনারীতি সৈয়দ হককে দারুণভাবে প্রভাবিত ও আকৃষ্ট করে।

আবার এদেশীয় লোকসমাজ, লোকসংস্কৃতি, লোকগাঁথা, বিশেষত মৈমনসিংহ গীতিকা, এমনকি মধ্যযুগের পদাবলি সাহিত্যের মাটিগন্ধী মাধুর্যে সৈয়দ শামসুল হক বরাবরই ছিলেন মুগ্ধ। ফলে তিনি কবিতার ভাষায় কাব্যনাটক রচনার পূর্বে আঞ্চলিক ভাষার সার্থক প্রয়োগে ‘নবী মুনশী’ ছদ্মনামে মৌলিক সনেট রচনা করেছেন। বাংলা কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর এই অনন্য বিপ্লবী রচনা পরবর্তীকালে ঢাকার ‘সব্যসাচী’ প্রকাশনী থেকে পরানের গহীন ভিতর নামে ১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয়েছে। মূলত এই আঞ্চলিক ভাষার সনেটগুলোই আঞ্চলিক ভাষায় কাব্যনাটক রচনায় তাঁকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। ।

যেহেতু কাব্যনাটকে নাট্যকার চরিত্রসমূহের হৃদয়জাত ভাবনা-চিন্তাকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, সেহেতু নাট্যঘটনার বিকাশ ও পরিণামী চিত্রাঙ্কনে বিঘ্ন ঘটতে পারে। অনেকসময় দেখা যায় লেখক নাট্যরসের পরিণামের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে বরং কাব্যের মায়াজালে আবেগময় নানান উপকাহিনি তৈরি করেন। একারণেই মূলত অধিকাংশ কাব্যনাট্যকারের লেখনীতে গীতিকবিতার আবেগ-উচ্ছ্বাসজনিত দুর্বলতা থেকে যায়, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাব্যনাট্যের পরিসমাপ্তি সন্তোষজনক হয়না। কেননা লেখক কাহিনি-কাঠামোকে উপজীব্য করে পরিসমাপ্তির কথা না ভেবে বরং চরিত্রের মনোজগতে অধিক আলো ফেলতে সচেষ্ট থাকেন।

কাব্যনাটকে নাট্যিক উৎকণ্ঠা, ক্লাইমেক্স, ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাত, তীব্রতার নিয়ন্ত্রিত উপস্থাপনই প্রত্যাশিত। আবার, নাট্যিক সংলাপের ক্ষেত্রেও ছন্দের উৎকর্ষের তুলনায় অধিকতর বিবেচনার প্রয়োজন যে, এটি কাব্যগুণসম্পন্ন কিনা। কেননা, সুললিত ছন্দে রচিত হলেই যেমন সব সাহিত্য কবিতা হয়ে ওঠে না, তেমনি পদ্যসংলাপ মানেই পূর্ণাঙ্গ কাব্যনাটক নয়; এখানে অবশ্যই বিশেষভাবে বিচার্য এর কাব্যগুণ কতটা নিঁখুত।

 

কাব্যনাট্যের সংজ্ঞার্থ ও স্বরূপ

 

প্রকৃতপক্ষে, কাব্যনাটক হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি স্বতন্ত্র সাহিত্যগুণের অপূর্ব সম্মিলন। এক্ষেত্রে এলিয়টের মন্তব্য হলো কাব্যময়তা যখন নাট্যকলায় সার্থকভাবে সংস্থাপিত হয়, তখনি কেবল সার্থক কাব্যনাটকের সৃষ্টি হতে পারে; এবং সর্বদা কাব্যগুণের নাট্যগুণের অনুসারী হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন :

It must justify itself dramatically, and not morely be fine poetry shaped into a dramatic form. ‘

আবার কাব্যগুণ যদি নাট্যঘটনায় অনিবার্য না হয়ে ওঠে, সেক্ষেত্রে কবিতা যতই মাধুর্যপূর্ণ হোক সেটি নিরর্থক বিবেচিত হবে। প্রচলিত নাট্যরীতিতে কাহিনি অধিক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কাব্যনাটকে বাচ্যার্থ থেকে অনুভববেদ্য ব্যঞ্জনাকে বেশি মূল্যায়ন করা হয়। ‘কাব্যনাট্যে কবিতা ভাবের শরীরকে জড়িয়ে রাখে, নাটক সেখানে সহায়, দুটি সত্তা সেখানে একদেহে লীন। নাটকে কাহিনি বা চরিত্রকে প্রত্যক্ষ করে তোলা লেখকের কৃত্য, কবিতা সেখানে শুধু সহায়ক, কাব্যনাট্যে ভাবের শরীরেই কবিতা ব্যক্ত, কাহিনী কেবল তাকে ছুঁয়ে যায়।”

কাব্যনাট্য মূলত একধরনের অন্তর্নাটক, কেননা এখানে বহির্বাস্তবতাকে অতিক্রম করে আলোর সর্বময় প্রক্ষেপণ ঘটে চরিত্রের অন্তর্সত্যে। অন্যদিকে, চরিত্রের মনোকথন, হৃদয়জাত রক্তক্ষরণ, অন্তর্লোকের রূপ-স্বরূপ প্রকাশে কবিতার মায়াজাল, আবেগীয় ভাষাশৈলী ব্যবহারের বিকল্প নেই। তবে নাটকে যখন কাব্যসংলাপের সার্থক প্রয়োগ ঘটে, তখন সেই ভাষা নিছক কবিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তৃতীয় কোনো মায়ার জগৎ বিনির্মাণ করে। আর তখনি রচিত হয় সার্থক কাব্যনাটক।

সুতরাং, কাব্যনাট্য বলতে আমরা কবিতায় লেখা প্রাচীন গ্রিক বা এলিজাবেথীয় নাটককে না বুঝিয়ে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকের এক বিশেষ নাটককে বুঝি। বস্তুত, বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ থেকে নাট্যজগতে যে বন্ধ্যাত্ব দানা বেঁধেছিল এবং পরবর্তীকালে যা আরও প্রবল হয়ে উঠেছিল তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া থেকে যে সচেতন নাট্যআঙ্গিকের উদ্ভব ঘটেছে, তা-ই কাব্যনাট্য। কাব্যনাট্য মূলত সময়ের সৃষ্টি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, কাব্যনাট্য ও নাট্যকাব্য দুটোর উপাদানই নাটক ও কবিতা। কিন্তু, কিছু মৌলিক পার্থক্যের কারণে এদুটো সাহিত্য-আঙ্গিক স্বতন্ত্র। নাট্যকাব্যের প্রধান কারিগর কবিসত্তা; নাট্যসত্তার ভূমিকা এখানে গৌণ। বলা যেতে পারে, কবিতাকে দীর্ঘতর একঘেয়েমির হাত থেকে মুক্তি দেবার নিমিত্তে নাট্যকাব্যের জন্ম।

নাট্যকাব্যে কবিতাকে কাহিনির কাঠামোতে ফেলে পাত্র-পাত্রীর মুখ দিয়ে প্রকাশ করে থাকেন কবি। ‘সেখানে পাত্রপাত্রীর উল্লেখ থাকে, কাহিনি থাকে, তবে নাটকীয় উৎকণ্ঠা কিংবা নাটকের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য অনুপস্থিত থাকে। সাদা অর্থে নাট্যকাব্য কবিতা, শুধু নাটকের কাঠামো সেখানে নাম মাত্র ব্যবহার করা হয়। প্রকৃতপক্ষে সেখানে নাটকের কিছু নেই। ২৩ যেমন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রোমান্টিক মানসজাত কাব্য কথা ও কাহিনী (১৯০০) একটি সার্থক নাট্যকাব্য ; অন্যদিকে বিসর্জন (১৮৯০) একটি সার্থক কাব্যনাট্য।

মূলত, একজন সংবেদনশীল কবি যদি কাব্যনাট্য লিখতে গিয়ে কবিতার সৌন্দর্য-মাধুর্যের দিকে অধিক মনোযোগী হন, এবং সেখানে যদি নাটকীয় আবেগ-উৎকণ্ঠা, জটিলতা, গ্রন্থিমোচন প্রভৃতি অনুপস্থিত থাকে, তবে তা কাব্যনাট্য না হয়ে নাট্যকাব্য হবে। সমালোচকের মতে :

কাব্যনাটক জীবনের আবিশ্ব সার্বিকতার সন্ধান, তাই কাব্যনাটক কি নাট্যকাব্য এই তর্ক অর্থহীন। কাব্যনাটক জৈবিক ঐক্য — অর্গানিক হোল’। এলিয়ট ন্যাচারিলিস্ট নাট্যপদ্ধতিতে বিশ্বাসী হয়েও স্বীকার করেছেন কাব্যনাটকে কবিতা ও নাটক জৈবিক ঐক্যে একটি অনন্য। ১

কাব্যনাট্য রচনার ক্ষেত্রে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কবির অন্তরজাত আবেগের শিল্পিত নিয়ন্ত্রণ । আবেগের আতিশয্য ও ভাবের উন্মত্ততা উভয়ই এখানে মারাত্মক ক্ষতিকর। মূলত, ‘আবেগী অথবা সামাজিক মানুষের পক্ষে কাব্যনাটক রচনা করা দুরূহতম প্রতিজ্ঞা। […] কাব্যনাটকে তার অস্তিত্ব চেতনাময়, সামাজিক চেতনার ঊর্ধ্বে হৃদয়ের গাঢ়তম প্রদেশের অনির্বচনীয় অনুভূতির বিচ্যুতি রেখায় জ্যোতির্ময় । […] রোমান্টিক মন কাব্যনাটক রচনা করতে অক্ষম। দ্বন্দ্ব বিক্ষুব্ধ উপলব্ধি কাব্যনাটক রচনার প্রাথমিক পটভূমি।”

তবে কাব্যনাট্যের তাত্ত্বিক দিক সাহিত্যসমাজে যতটা আলোচিত হয়েছে, ততটা ব্যাপকহারে রচিত হয়নি পূর্ণাঙ্গ- মৌলিক, সফল কাব্যনাটক। কাব্যনাট্যের জনক এলিয়ট স্বয়ং কাব্যনাট্য রচনার ক্ষেত্রে বিশুদ্ধবাদী ছিলেন। কাব্যনাটকের তাত্ত্বিক দিকের প্রতি অধিকতর মনঃসংযোগের কারণে অনেক কবির পক্ষেই সার্থক কাব্যনাট্য রচনা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এজন্য বিশ্ব নাট্যসাহিত্যে কাব্যনাটকের সংখ্যা সীমিত।

 

কাব্যনাট্যের সংজ্ঞার্থ ও স্বরূপ

 

Poetry and Drama (১৯৫১) গ্রন্থের ‘Selected prose’ প্রবন্ধে এলিয়টের কাব্যনাট্য বিষয়ক মন্তব্য, এবং An Essay Towards a Theory of Art (১৯২২) গ্রন্থে ব্রিটিশ কবি-নাট্যকার ল্যাসেল অ্যাবারক্রম্বির (Lascelles অলোক সরকার, অগ্রজ কবিরা ও কাব্যনাটক, কবিপত্র,  Abercrombie, ১৮৮১-১৯৩৮) কাব্যনাট্য বিষয়ক মতামতের সারবস্তুর আলোকে সমালোচক-গবেষক ড. দুর্গাশংকর মুখোপাধ্যায় কাব্যনাট্যের সংজ্ঞার্থ ও স্বরূপ নির্ণয় করেছেন নিম্নরূপে :

১. নাটকে আমরা যে ভাষাই ব্যবহার করি না কেন, তা নাটকের লক্ষ্য বা উপেয় নয়, তা উপায় মাত্র। নাটকের পদ্যসংলাপে তার গৌরব কিছুমাত্র হ্রাস পায় না – এ কথা বলেছেন অ্যাবারক্রম্বি।

২. নাটকে তিন রকম ভাষা ব্যবহৃত হতে পারে। গদ্য, পদ্য ও এ দুয়ের নিকটবর্তী দৈনন্দিন জীবনের মুখের ভাষা। এর মধ্যে কাব্যনাট্যে পদ্যসংলাপই ব্যবহৃত হবে গদ্য ও পদ্যের মিশ্রণ চলবে না। দর্শক সচেতন ভাবেই এ দুয়ের পার্থক্য বুঝতে পারবেন এবং পীড়িত হবেন ।

৩. নাটকে পদ্যের প্রয়োগ প্রথাগত ব্যাপার নয় বা কিছু অতিরিক্ত অলংকরণ নয় – পদ্যসংলাপ নাট্যরসকে ঘনীভূত করে। গদ্যেলেখা নাটক জীবন-ঘটনার বাইরের দিকটি অনুকরণ করে। কিন্তু, কাব্যনাটক ঘটনার অন্তর্বস্তুকে অনুসরণের ফলে নাট্যরস আরো ঘনীভূত হয়।

এলিয়ট এবং অ্যাবারক্রম্বি দুজনেই মন্তব্য করেছেন কাব্যনাটকের বিষয়বস্তু অতীত, পুরাণ এবং ইতিহাসের পাশাপাশি সমকালীন বিষয়বস্তু থেকেও হতে পারে। এলিয়ট নিজেই তাঁর Family Re-union নাটকে সমকালীন বিষয়বস্তু সংযোজন করে এর প্রাসঙ্গিকতা দেখিয়েছেন।

৪. কাব্যনাটকে মানবজীবনের ঘটনা ও কথাকে এমন শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপন করতে হবে যাতে নাটকীয় লক্ষণ ও সাংগীতিক সুর যুগপৎ ফুটে ওঠে।

৫. আধুনিক কালের দর্শক জীবনের অতি ঘনিষ্ঠ এক রূপ নাটকে দেখতে চান। আর তা দেখাতে গেলে কাব্যনাটকে যে জীবন উপস্থাপিত হচ্ছে, তার বিশ্বাসযোগ্যতা চাই ।

৬. গদ্যেও খুব সীমিত ক্ষেত্রে কাব্যনাটক রচনা করা চলে বলে এলিয়ট মন্তব্য করেছেন, যদিও সে রচনা আয়াসসাধ্য নয়। এ ক্ষেত্রে গদ্য নাট্যকারের হাতে এমনই কবিত্বমণ্ডিত হবে যে গদ্যই হয়ে উঠবে কাব্য ।

৭. এলিয়ট স্নায়ুতত্ত্ববিদ চিকিৎসকের উল্লেখ করে বলেছেন যে মানুষের অন্তরে যখন তীব্রতম ভাবের আলোড়ন তখন তার আত্মা পদ্যেই আত্মপ্রকাশ করে। গদ্যে রচিত নাটক গুরুত্ব দেয় ভাসা ভাসা ভাবে ক্ষণিকতার ওপরে। এলিয়ট টমাস বেকেট চরিত্রে একই সঙ্গে সামাজিক মানুষের ত্রি-স্তরের আচরণ এবং সেই সূত্রে ধর্মযাজক বেকেটের অন্তর ও বাহিরকে পরিস্ফুট করেছেন।’

বস্তুত, আধুনিক কাব্যনাটকের ধারাবাহিক ইতিহাসে সফল কাব্যনাটক রচনায় সাধারণ নাট্যকারদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত মেধাবী ও সফল কবিরাই সার্থকতা প্রদর্শন করেছেন। কেননা কাব্যকৌশল সম্পর্কে পরিপক্ব ধারণা না থাকলে নাটকে তার সফল প্রয়োগ সম্ভব নয়। তবে শুধু কবিদৃষ্টি নয়, নাট্যলক্ষণ ও নাটকীয়তা সম্পর্কে তাঁর বোধ স্পষ্ট ও প্রগাঢ় হওয়া প্রয়োজন।

মূলত, একটি সফল শিল্পসার্থক কাব্যনাটক রচনার ক্ষেত্রে ‘একদিকে থাকবে কাব্যনাট্যকারের সৃষ্টিশীল কবিকল্পনার ঐশ্বর্য, দর্শক-মাতানোর কলাকৌশল এবং তাদের অন্তরকে নাড়া দেবার শক্তি, এবং অন্যদিকে নাট্যঘটনাকে বিশেষ একটি লক্ষ্যের অভিমুখে যতটা সম্ভব দ্বন্দ্বময় পথে চরিত্রগুলির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় গতিশীল ও উৎকণ্ঠাযুক্ত করে রাখা। দুয়ের আত্মিক মিলনে এবং আধুনিক জীবনেরও যথোচিত রূপায়ণে তাঁকে নৈপুণ্য দেখাতে হবে।’

‘ কাব্যনাট্য যদিও কবিতা ও নাটকের সমন্বয়ে একটি সাংগীতিক রূপাবহ সৃষ্টি করে, তবু প্রতীকী রচনার সঙ্গে কাব্যনাট্যের সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। প্রতীকী রচনায় প্রতীকের ব্যঞ্জনায় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবকে অনেক সময় লুপ্ত করে ফেলা হয়। কিন্তু টি এস এলিয়টের মতে কাব্যনাট্য ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তব পৃথিবীর বাইরে অন্যকোনো মায়ার জগৎ সৃষ্টি করে না।

বস্তুত, মানবসমাজের বিবর্তিত ইতিহাস নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানবজীবন হয়ে পড়েছে ক্রমশ দুর্বোধ্য, জটিল ও যান্ত্রিক। আর এই যুগচেতনা, যুগযন্ত্রণাকে ধারণ করে লিখিত কবিদের কবিতাও কালের বিবর্তনে ক্রমাগত দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে। ফলে বেড়ে গেছে লেখক-পাঠক দূরত্ব। অথচ একজন সফল লেখকের লেখনীর প্রধান উদ্দেশ্যই থাকে পাঠক-দর্শকের বোধির জগতে অবাধ যাতায়াত। পাঠক- দর্শকের সঙ্গে লেখক-সাহিত্যিকের প্রত্যাশা ও বোঝাপড়ার সু-সমন্বয় না ঘটলে শিল্পসাহিত্যসাধনা অর্থহীন হয়ে পরে।

মূলত, পাঠক-দর্শকদের সঙ্গে এই ছিন্নসম্পর্ক আত্মিকবন্ধনে আবদ্ধ করতেই নাট্যকারগণ সাহিত্যকে দুর্বোধ্য কবিতার মায়াজাল থেকে ছিন্ন করে নাটক ও কবিতার সার্থক অন্বয় ঘটিয়ে রচনা করেছেন কাব্যনাটক। এলিয়টের হাতে কাব্যনাটকের সুসংহত বিকাশ ও পরিণতির প্রারম্ভকালেই পাশ্চাত্য সাহিত্যের কবি-নাট্যকারগণ কাব্যনাট্যরচনায় প্রভূত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।

এর কারণ হিসেবে বলা যায়, আধুনিক জড়বাদী দর্শনের প্রভাবে সেকালের মানুষ হয়ে পড়েছিল ক্রমাগত সমাজবিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ, নির্লিপ্ত। কবি-সাহিত্যিকগণ তখন তাঁদের সমাজসংলগ্ন মানসিকতা দিয়ে উপলব্ধি করলেন – মানবসভ্যতাকে এই স্থূল জড়সত্তা থেকে মুক্তি দিতে পারে দৃশ্যাত্মক কবিতা; এবং বিচ্ছিন্ন মানুষের ব্যক্তিক চিন্তা-চেতনার দৃশ্যমান উপস্থাপনায় নবতর আঙ্গিকের প্রকাশ অতীব প্রয়োজন; যেখানে সমাজের বহির্বাস্তবতার তুলনায় অধিক গুরুত্ব পাবে ব্যক্তির অন্তর্বাস্তবতা; তার সমস্যা-সংকট, প্রত্যাশা-প্রাপ্তি, বেদনা-বিপর্যয়-অচরিতার্থতা প্রভৃতি।

প্রকৃতপক্ষে এই ভাবনা-চেতনা থেকে কবি-নাট্যকাররা নির্মাণ করেছেন কাব্যনাটক।

সমকালীন নাট্যকারগণ যখন কাব্যনাট্য রচনা শুরু করেন, তখন মূলত তাঁরা প্রাচীন কাব্যনির্ভর সাহিত্যকে পরিমার্জনা করে আধুনিকরূপ দানে সচেষ্ট হন; পাশাপাশি কাব্যনাটকের বিষয়বস্তু, আঙ্গিক ও ভাষাবিন্যাসের সার্থক পরিণতি প্রদানের প্রয়োজনে নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন।

বলা যায়, এরই ধারাবাহিকতায় জীবনের গূঢ়ার্থ প্রকাশের নিমিত্তে এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে কাব্যনাটকের উৎপত্তি। এমনিতে মানুষের অন্তস্তলের রূপপ্রকৃতি প্রকাশে কাব্যভাষার বিকল্প নেই। গদ্যভাষায় বহির্বাস্তবতা প্রকাশ করা যেতেই পারে, কিন্তু জীবনের গূঢ়ার্থ প্রকাশে প্রয়োজন কাব্যের সুললিত আবেগময় মাধুর্য। এই বোধ থেকেই সমকালীন ইয়োরোপীয় কবিগণ কাব্যনাট্য রচনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।

যান্ত্রিকতা আর জড়বাদী দর্শনে ক্লান্ত মানুষের প্রয়োজন ছিলো ব্যক্তিক হৃদয় অবলোকন, এবং নিজের ভেতরটা পরিপূর্ণভাবে আবিষ্কার করার। কাব্যনাটকে মানুষ যখন নিজের ভেতরকার লুকায়িত আমিত্বের সন্ধান পেয়েছে তখনই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সাহিত্যের এই মননশীল ও মেধাবী ধারা।

Leave a Comment