আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর কাব্যচিন্তার সূচিপত্র

জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর কাব্যচিন্তার সূচিপত্র
১৯৯৪-৯৫ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে বৃত্তিপ্রাপ্ত গবেষক হিসেবে আমি এম ফিল প্রথম পর্বে ভর্তি হই । প্রথম পর্বের চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর আমি আমার প্রস্তাবিত এম ফিল গবেষণার বিষয় জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর কাব্যচিন্তা’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভ রচনায় মনোনিবেশ করি।
আমার গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডক্টর রফিকউল্লাহ খান। অভিসন্দর্ভ রচনার বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর অভিমত, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা আমার গবেষণাকর্মকে সহজতর করেছে।
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাহিত্য-আন্দোলন ও কাব্যচিন্তা সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞানের সাহচর্য এবং ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার ব্যবহারের সুযোগ গবেষণা নির্বাহকালে আমার গবেষণাকর্ম দ্রুত সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিসন্দর্ভ রচনা সমাপ্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর নিরন্তর তাগিদ ও প্রেরণার ভূমিকা অপরিসীম।
গবেষণাকালে আমি মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের সহায়তা নিয়েছি। এজন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।
তিরিশের কাব্যান্দোলনের দুই পুরোধা ব্যক্তিত্ব জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে গোড়া থেকেই এ দুই কবির কবিতা ও কবিতাসংক্রান্ত তত্ত্ব আমাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। যে কারণে এ দুই কবির কাব্যচিন্তাকে আনি এম ফিল গবেষণার বিষয় হিসেবে নির্বাচন করি।
রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কবিতার নতুন ভূমিতল সৃষ্টিতে জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর অবদান অসামান্য। কেবল কবিতা নয়, কবিতার নন্দনতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণেও যে তাঁদের সূত্রসমূহ পরবর্তীকালের কবি ও বিদগ্ধ সমালোচকদের প্রভাবিত করেছে, একথা নিঃসংশয়ে বলা যায়। কিন্তু এ দুই কবির কাব্যচিন্তা বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ কোন গবেষণা এখনো হয়নি।
এই অপূর্ণতাবোধ থেকেই আমি আমার গবেষণার বিষয় হিসেব জীবননান্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর কাব্যচিন্তা’ নির্বাচন করি। এ দু’জন ছাড়াও তিরিশের দশকের প্রায় সব কবিই কবিতা সম্পর্কে তাঁদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন। সময় এবং বিষয়ের ব্যাপকতার কথা চিন্তা করে আমি তাঁদেরকে গবেষণার অন্তর্ভুক্ত করিনি। তবে তিরিশের কাব্য-আন্দোলনের মৌল প্রবণতা ও তত্ত্ব সম্পর্কে জীবনানন্দ দাশ এবং বুদ্ধদেব বসুর কাছ থেকেই যে সামগ্রিক ধারণা অর্জন সম্ভব, এ দুই কবির রচনাসমূহ থেকে এ সত্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সূচিপত্র
প্রথম অধ্যায়
তিরিশের কবিদের কাব্যচিন্তা : পরিপ্রেক্ষিত
দ্বিতীয় অধ্যায়
প্রথম পরিচ্ছেদ : জীবনানন্দ দাশের কাব্যচিন্তা
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : বুদ্ধদেব বসুর কাব্যচিন্তা।

উপসংহার
বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে বিজ্ঞান ও শিল্পের অভূতপূর্ব রূপান্তরের পরিণামে আধুনিক মননশীলতার বিজয় সূচিত হয়। মানব প্রজন্মের উপর বিজ্ঞান ও শিল্পে পরিবর্তনের অভিঘাত ছিল অনিবার্য। কারণ প্রতিটি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আধুনিক এবং সমকালীন শব্দগুলো ভিন্ন ভিন্ন অর্থ ও বাজনাসমৃদ্ধ হয়েছিল মানুষের সামনে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে আধুনিকতা এবং সমকালীনতা মানব-অভিব্যক্তি প্রকাশের রূপটিকে নির্দিষ্ট করল প্রতীকায়নের মাধ্যমে।
প্রতিটি ক্ষেত্রে বিংশ শতাব্দীর শিল্পশৈলী নির্মাতারা পূর্ববর্তী ধারণাসমূহকে শ্লেষ মিশ্রিত ও বাঙ্গাত্মক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিহার করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পূর্বপুরুষের চৈতন্য ও শিক্ষার স্থলে প্রতিস্থাপন করলেন প্রকাশভঙ্গির অফুরন্ত সম্ভাবনা। ফলে সৃষ্টি হল কাব্যচিন্তার নব দিগন্ত ।
বাংলা কাব্যাঙ্গনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর এই আন্তর্জাতিক নান্দনিক মনস্তত্ত্ব অধীগ্রহণে বুদ্ধদেব বসু ও জীবনানন্দ দাশের কাব্যচিন্তায় সৃষ্টি হয় অনন্যতা । বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে পাশ্চাত্য কাব্যজিজ্ঞাসার সারাৎসার স্বীকরণসূত্রে উভয় কবির শিল্পিচৈতন্যে যে আত্মসমীক্ষার প্রণোদনা জাত হায়েছিল তারই অনিবার্য পরিণামে আধুনিক বাংলা কাব্যচিন্তার প্রসারণ ও প্রতিষ্ঠা।
রবীন্দ্রঅঙ্গীকৃত সুনীতি ও তন্ময় সৌন্দর্যের সরল সমীকরণে আস্থাহীন বুদ্ধদেব বসু ও জীবনানন্দ দাশ। ‘তোড়া পাখির মত শুধুমাত্র জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্বর্গীয় দীপ্তিময়তা, শুচি- শুদ্ধতা-সচ্ছতা ও সরলতার সমন্বয়ে তাঁরা কাব্যসৃষ্টি করেননি বরং তাঁদের কাব্যের অন্তচৈতন্যের উপলব্ধিময়স্তর প্রগাঢ় ব্যক্তিতায় নয়, প্রকাশ মাধ্যমের বিচিত্রতায় সমীকৃত হয়েছে।
নতুন সময় সমাজ মানসিকতার যোগ্য অভিব্যক্তি প্রদানের জন্য নবতর কাব্যচিন্তার অধিগ্রহণ ছিল অনিবার্য। এক্ষেত্রে তারা “হৃদয়ের সাহচর্য’ বা ‘অভিনবত্বের গরিমা’ অনুসন্ধানে বোদলেয়ার ও ফরাসি কবিদের থেকে শুরু করে ইয়েটস, এলিয়ট, পাউন্ড, অডেন প্রমুখের কাব্য ও কারাচিন্তার করেন।

একারণে উক্ত কবিদের আভ্যন্তর স্বদেশভূমিতে একই সঙ্গে কুৎসিত, ক্লেপ, সন্তাপ, প্রশান্তি আনন্দ সংঘাত-বিচ্ছেদ, অন্তর্দ্বন্দ্ব-ধ্বংস, জন্ম-মৃত্যু সৃষ্টি মানবিক স্পর্শময়তা, রিরংসা ও অন্ধকার-আলো প্রভৃতি থেকে উৎসারিত হয়েছে কাব্যসৌন্দর্যের দীপ্তি। জীবনের এই বৈপরীত্যের আলোকে দের সু জীবনানন্দ দাশের কাব্যচিন্তা বিচার্য।
বুদ্ধদেব বসু ছিলেন ‘প্রকৃত’ ‘বিশুদ্ধতম’ কাব্যসৃষ্টির প্রত্যাশী। বাস্তবজীবন ও অনিবার্য সমাজসত্য কিংবা রাজনীতিক দ্বন্দ্ব সংঘাত ও সমকালীন মানুষের কল্যাণ চিন্তায় কবিতার দায়বদ্ধতা তিনি স্বীকার করেননি। তার অন্তর্বাহী প্রাতিস্বিক চেতনায় যে সৃষ্টিশীলতার প্রাণ-উৎস জারিত হয়েছিল তাতেই ছিল তাঁর একমাত্র আস্থা। তাঁর আত্মমুখী জীবনদর্শন শিল্পের সম্ভাবনাকে করেছে প্রসারিত, কিন্তু শিল্প বা কবিতার মাধ্যমে তিনি অন্বেষণ করেছেন ব্যক্তির সামঞ্জস্যবোধ। ব্যক্তির সঙ্গে
জীবনানন্দও মনে করতেন কবিতার উপর বাস্তবিক কোনো ভার নেই ।
সৃজা কবিতা কিংবা কবিমানসের উপর কারো নির্দেশ পালন করার রীতিও নেই। কিন্তু সৎ কবিতা ইতিহাসবেদ ও সমাজবেন্দ্রে উৎসারিত হয়। তাই বলে কবিতার চেয়ে তার উপকরণ অধিক গুরুত্বসহ উপাসা হবে এমন নয়, কারণ কবিতার উদ্দেশ্য লোকশিক্ষা নয়, লোকোত্তর সৃষ্টি, সৌন্দর্যসূজন।
জীবনানন্দর আত্ম-উচ্চারণে প্রকাশিত হয়েছে তিনি একজন লিরিক করি । লিরিক কবির ত্রয়ী বিচরণ ভূমি— যথা প্রকৃতি, সমাজ ও সময় অনুধ্যানে কবি বাস্তবকে নিজের শুদ্ধ নিঃশ্রেয়স মুকুরে ফলিয়ে দেখতে চান। অন্যদিকে বুদ্ধদের রোমান্টিকতার পরাকাষ্ঠা। তাঁর রোমান্টিকতা বোদলেয়ারের অনুরূপ, ব্যক্তি মানুষের মুক্তি অর্থাৎ নির্ভয়ে মানুষের অবিকল ও সমগ্র ব্যক্তিত্বকে প্রকাশেরই নামান্তর। অদৃশ্য, অশ্রুত, ইন্দ্রিয় পুঞ্জের বিপর্যয় সাধন, দুঃখরোগ, মত্ততার স্বতোবিরোধময় প্রকাশই রোমান্টিকতা।
এজন্য জীবনানন্দ কবিতায় যে তিমির বিলাস থেকে তিমির বিনাশীর অভীপ্সা পরিলক্ষিত হয়, তা বুদ্ধদেব বসুর কাব্যে অনুপস্থিত। বরং তিনি আদিন প্রকৃতির উৎস থেকে কবিতার সৃজনশীলতার শক্তি অর্জন করে আত্মার অন্তলীন উৎস থেকে সংগ্রহ করেছেন শিল্প অবয়ব।
অর্থাৎ জীবনানন্দ দাশ বেদনাময় আত্মকেন্দ্রিকতায় তাঁর চৈতন্যে অনুভব করতে চেয়েছেন মানব সমাজ ও সভ্যতার দ্বিধাগ্রস্ততা, ভঙ্গুরতা, ধ্বংস ও মৃত্যুর প্রতিচ্ছবি, মানবজীবনের মর্মপীড়ন সংঘাত ময়তা ও মর্মযাতনা। আধুনিক কবির সামনে ধর্ম ও দর্শনের তেমন কোনে পরিচ্ছন্ন বিশ্বাসভূমি নেই। তবু বাস্তবের সমস্ত অসঙ্গতির জট খসিয়ে কবিতা একটা সুসীম আনন্দের দিকে যাত্রা করে। কবি মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্তা লাভ করতে চেষ্টা করেন। কারণ তাঁর লক্ষ্য থাকে শুভ পরিচ্ছন্ন সমাজ প্রয়াণের দিকে।
এজন্যই জীবনানন্দর প্রকৃতি. প্রেম ও সমাজ সময়চেতনায় প্রস্তুত হয়, সঙ্গতিসাধক অপরিহার্য বলে পরিগৃহীত আবিষ্কারে কবি হয় । সময়াচেতনার নবতর মূল্য হন প্রাণিত। বুদ্ধদেব বসুর প্রেমে অধিকৃত হয়নি কোন সর্বকালিক মূল্যমান বরং তাতে আত্যন্তিক মানবিকতা ও প্রাত্যহিকতা উচ্চকিত তিনি শারীরিকতার প্রাধান্য দিলেও ভোগবাদী বিলাসে আবদ্ধ নন, শাশ্বত মহিমায় সচকিত।
যুগলক্ষণের অনিবার্য প্রতিফলন কিংবা কালিক বিনাশের প্রতিচিত্রণ কাব্যের সারসত্যের জন্য অনস্বীকার্য নয়। কারণ সৃষ্টিশীল কবি বহির্জাগতিক ঘটনার অভিঘাতে সন্দ্বীপিত হয়ে আত্মপ্রকাশের অভীপ্সার কাব্যসৃজানে উদ্যোগী হবেন এমন নয়; কবি চান আত্মোপলব্ধি, তাঁর জীবনে চলে এক অনবচ্ছিন্ন সংগ্রাম—এই সংগ্রাম প্রধানত জড়ের সঙ্গে চৈতন্যের সংগ্রাম।
এই সংগ্রামের পরিণামেই সৃজিত হয় কবিতা। সেজন্য কবিতায় কবির চেতনালোকের স্বাক্ষর মুদ্রিত থাকলেও তার সৃষ্টিক্ষমপ্রজ্ঞার প্রেরণা প্রকৃতি কিংবা বাস্তব সমাজ অথবা মহাকাল নয়। তাঁর আচম্বিতে উৎসারিত এক উজ্জ্বল মুহূর্তের প্রতিকাশই কবিতা।
বুদ্ধদেব বসু কাব্য সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় প্রেরণার আনুকূল্য স্বীকার করেছেন। আবার জড়ের সঙ্গে চৈতন্যের সংগ্রামের কথা উল্লেখ করে আনুগত্য প্রকাশ করেছেন নিরন্তর শ্রম ও একনিষ্ঠতার প্রতি। জীবনানন্দ দাশও কবিতার উৎস ও প্রেরণার পশ্চাতে দিব্যত্ব স্বীকার করেছেন।
কবিতা লিখতে হলে ইমাজিনেশন ও তার অনুশীলন আবশ্যক এবং একই সঙ্গে ইতিহাসচেতনার সংযুক্তি প্রযোজ্য কারণ কবির সম্যক কল্পনা আভা পরমেশ্বরের কাছ থেকে আসে জীবনানন্দ প্লেটোর মত ভাববাদীদের এই তত্ত্বে স্থিত হতে পারেননি। বরং কবিতা তার মতে ভারাক্রান্ততা, কল্পনা, চিন্তা, অভিজ্ঞতা, বিগত ও আধুনিক কাব্য বিকীরণের সংশ্লেষণ ও সর্বোপরি অন্তঃপ্রেরণায় সৃষ্টি হয় ।
কবি সত্যান্বেষী বলেই কাব্য শতাব্দীর ও জীবনের শৃঙ্খল পেরিয়ে শাশ্বত মহিমায় অভিষিক্ত হয়। কিন্তু জীবনানন্দ দাশ সময়ের আবর্তে লক্ষ্য করেছেন। শাশ্বত বিষয়টির অস্বীকৃতি। মহাভারত বা দান্তে অমরতায় স্বীকৃত হলেও বহুল পঠিত হচ্ছে না। অথচ এসব কাব্য উপলব্ধি প্রকাশের অনিবচনীয়তায় অদ্বিতীয় ।

বুদ্ধদেব বসুর কাব্যচিন্তায়ও শাশ্বত বা চিরন্তনতার প্রসঙ্গটি অভিপ্রেতসূত্রে অভিদ্যোতিত। সাহিত্য সর্বযুগের সাময়িকতার মর্মকথা ব্যক্ত করে বিশ্বমানবের প্রাণস্পন্দনে দীপিত দেশকাল অতিক্রমী হলেই চিরকালীনতায় ভাস্বর হয়—বুদ্ধদেব বসুর ছিল এই অতিষ্ঠা।
বুদ্ধদেব বসু ও জীবনানন্দ উভয়ই আধুনিক কাব্যতত্ত্বের অন্তঃসার উন্মোচন ও সেই কাব্যবীক্ষার বিকাশ ও প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। বুদ্ধদের বসুই সর্বপ্রথম আধুনিক কাব্যতত্ত্বের পক্ষে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লেখনি ধারণ করেন। এক্ষেত্রে ‘অতি-আধুনিক বাঙলা সাহিত্য’ (১৩৩৪ মাঘ প্রগতি এবং ১৩৩৪ চৈত্র কল্লোল-এ প্রকাশিত), ‘কবিতা’ (১৯৩৫– আশ্বিন ১৩৪২ ) পত্রিকার ভূমিকা ছিল অগ্রদূতের।
পরবর্তীতে জীবনানন্দ দাশের কাব্যচিন্তা সম্পৰ্কীয় প্রবন্ধসমূহ ( ১৩৪৫-১৩৬০ রচনাকাল) ‘কবিতা’ পত্রিকাতেই সর্বপ্রথম অলঙ্কৃত হয়। বুদ্ধদেব বসু স্রষ্টার অহংকৃত উদ্দীপনায় প্রথাগত সাহিত্য-শিল্পের পটপ্রেক্ষাকে পরিত্যাগ করেন এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্যে তিনি একজন প্রধান কবি, প্রধানদের ভিতর অন্যতম রূপে পরিগণিত হন।
অন্যদিকে জীবনানন্দ দাশও ছিলেন আধুনিক সাহিত্যের কাব্যকুঞ্জের একজন আন্তরিক ও স্বতন্ত্র ধারার করি । বুদ্ধদেব তাঁর কবিতায় সুরের আবহ আবিষ্কার করেছেন যদিও জীবনানন্দ দাশ শান্তি বা Serenityর সুরে কবিতা রচনার পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি বীঠোফেনের Symphony বা Sonata-র ভেতর লক্ষ করেছিলেন অশান্তি এবং বাঁঠোফেনের শাশ্বতে কারণ হিসেবে সত্যিকার সৃষ্টির প্রেরণা ও মর্যাদাকে গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।
এজন্য বাংলা কাব্যের প্রধান ঐতিহ্য থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন ও আধুনিকতার পরিপোষক। অন্যদিকে জীবনানন্দ দাশ বুদ্ধদেব বসুর কাব্যের চারিত্রলক্ষণ রূপে উপস্থাপন করেছেন তাঁর (বুদ্ধদেব) প্রকাশভঙ্গির আশ্চর্য মৌলিকতা। মূলত আধুনিক যুগ কয়েকজন কবির যুগ কোন কবির একচ্ছত্র প্রভাব এযুগে অকল্পনীয়।
আধুনিকদের মধ্যে পারস্পরিক বৈসাদৃশ্য বর্তমান থাকলেও তাঁরা একই আন্দোলনের অন্তর্ভূত নতুন কবিসাধারণসংঘ। রাবীন্দ্রিকবৃত্ত অতিক্রম প্রয়াসী আধুনিকদের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যতিরেকী অবস্থানের জন্য কবিরা রূপসন্ধানে নিয়োজিত হয়েছেন এবং তখন তত্ত্বের জন্য দ্বারস্থ হয়েছেন প্রতীচ্য নন্দনতত্ত্বের বিভাবনার কাছে।
ছন্দ. শব্দ তীব্র থেকে ব্যাঙ ও ব্যক্তিময় বিশুদ্ধতর ব্যক্তিত্বব্যঞ্জক ও বিশ্বজনীন হয়ে উঠেছে আধুনিক কবিতায়। উপমা-রূপক-প্রতীক-চিত্রকল্প পেল সাঙ্গীতিক সঙ্গতি। কথা বাকরীতির নিহিত রহস্য হল অনিবারিত। ফলে আধুনিক- কাব্য তার নিজস্ব স্বরায়ণে হয়ে উঠল সচকিত। জীবনানন্দ দাশ উপমাই কবিত্ব।
এ আত্মনাকো প্রাণিত করলেন বুদ্ধদেব বসুকে। न জীবনানন্দ দাশের কবিতায় খুঁজে পেলেন উপমার বৃহৎ রাজত্ব। ভাষার নিজস্ব বাজনা, অভিন বিশেষণ কিংবা পুরোনো বিশেষণের স্বকীয় ব্যবহার অথবা বিশেষ্য পদের রূপক প্রয়োগে উপমা পেল অভিনবত্ব। কিন্তু উপমা এখানে চিত্রকল্পের মহিমার সংবেদনময় অনুভবে অন্তলীন স্বাক্ষর মুদ্রিত করে।
এজন্য জীবনানন্দর প্রকাশ মাধ্যমের সিংহভাগ চিত্রকল্পের রূপবৈশিষ্ট্যে বিভামণ্ডিত। তিনি চিত্রকল্পকে শিল্পে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করার লক্ষ্যে সাদৃশ্যসূত্রের সাহায্য নিয়েছেন। তাঁর চিত্রকল্পে প্রাণময়তা, আত্যন্তিকতার বেগ এবং উদ্ভাসন ক্রিয়ার সঞ্চরণশীলতা লক্ষণীয়। অন্যদিকে বুদ্ধদেব বসু এজরা পাউন্ড প্রবর্তিত ইমেজিস্ট কাব্যান্দোলন দ্বারা কাব্যভাষার নবত্ব পরিগ্রহণে উদ্দীপ্ত হলেও চিত্রকল্পের সৃষ্টি তাঁর কাব্যে তুলনামূলক ভাবে কম ।

তিনি কাব্যপ্রকরণে প্রাধান্য আরোপ কারেছেন প্রতীক-রূপক-পুরাণের অনিবার্যতাকে। তিনি বোদলেয়ার, মালার্মে এবং রিলকে অনুসৃত গতিময়তায় 7 বিশ্বাসী ছিলেন । এজন্য তাঁর কাব্যপ্রতিমা আধুনিক সংঘাতময় যান্ত্রিক জীবনের পীড়নে নির্মিত হয়। জীবনানন্দ আধুনিক যন্ত্রজীবনে শান্তি, স্নিগ্ধতা অন্বেষণ কারন প্রকৃতির অবিনশ্বরতায়। বুদ্ধদেব বসু সেই প্রকৃতির রূপক-এ বর্ণনা করেন।
কাব্যচিন্তার উৎসার জীবনানন্দ দাশ যে আস্থাকরোজ্জ্বল আলো পৃথিবী’র সংকল্পনায় অস্তিম পর্বে সঞ্জীবিত সেই একই আস্থা ব্রহ্মদের তন্ময়ভাবে কোন কিছু রচনার ক্ষেত্রে অবশ্য স্বীকার্যরূপে অভিহিত করেছেন। কাব্যে ঐতিহ্য চেতনার অনুগ্রাহ্য উভয় কবির কাবা চিন্তায় পরিলক্ষিত হয়।
জীবনানন্দর ইতিহাসচেতনা ও সময়াচেতনার সেতুলোক সৃজন এবং বুদ্ধদেব বসুর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শ্রেষ্ঠ শিল্পবীক্ষায় স্নাত হওয়ার দৃষ্টান্ত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় তাদের ঐতিহ সংলগ্নতার কথা ।
নবযুগের প্রবর্তনায় কবিতার কলাকৌশল পরিবর্তনের অমোঘতা প্রতিপোষণ করেছেন একইসঙ্গে বুদ্ধদেব বসু ও জীবনানন্দ দাশ। বুদ্ধদের বসু পদ্যের মিথষ্ক্রিয়া এবং কথ্যভঙ্গির যেমন সমর্থক ছিলেন তেমনি জীবনানন্দর প্রত্যয় ছিল সার্থক কবিতা হয়তো মুখের ভাষায়ই ফুটে উঠবে।
কি নির্বিশেষে বিমুক্ত করে স্বযুগের ও স্বদেশের মানুষের মুখের ভাষায় সার্থক কবিতা সৃজন সম্ভব নয়। কারণ প্রতিটি সৃজন প্রক্রিয়ার পশ্চাতে থাকে নিজের যুগের স্থল সব লক্ষণ অতিরিক্ত সংবেদনা। এজন্য জীবনানন্দ গদ্যছন্দে উত্সুকা প্রকাশ করলেও কাব্যভুবনে তাঁর অভীলিত ছন্দ ছিল পয়ার।
অন্যদিকে বুদ্ধদেব বসু গদ্যছন্দের অভিব্যঞ্জনে ছিলেন অভীলু। কিন্তু অন্যান্য ছন্দ বিষয়েও তাঁর উৎসাহ কম ছিল না। বুদ্ধদেব বসু ছিলেন ভারতীয় পুরাণ বিষয়ে সবিশেষ অগ্রহান্বিত। পুরাণের অস্থিতে তিনি সমকালের শোণিত প্রবাহ করতে পেরেছেন। অন্যদিকে জীবনানন্দ দাশ ইতিহাসচেতনার অনুসূত্রে উপনীত হয়েছেন ঐতিহ্য সংশ্লিষ্টতা ও লোকপুরাণের অভিনব আত্মদর্শনে।
বুদ্ধদেব বসু সমকালীন জীবনপ্রক্রিয়া থেকে কারোর উপকরণ আহরণ করেছেন এবং তাতে মুদ্রিত করেছেন চিরন্তনতার দ্যুতিময়তা। এবং একই সঙ্গে উত্তরাধিকার সূত্রে ও পঠন-পাঠনে প্রাপ্ত ঐতিহ্য সংলগ্ন হয়েছে তাঁর কাব্যচিন্তায়। অন্যদিকে জীবনানন্দ যুগের বৈনাশিকতার আবেষ্টনীতে যে আলোকঅভীপ্সার পরিসঞ্চার, তা ইতিহাস ও সময় চেতনায় প্রাণিত করে তুলেছেন।
উভয়েই কবিতা সম্বন্ধে সত্যার্থী আলোচনা কিংবা ফলদ মন্তব্য অথবা কবিতার অনুবাদ একমাত্র কবিদের অধিকরণে বিশ্বাসী ছিলেন । এজন্য বুদ্ধদেব বসু তাঁর প্রিয় কবিদের অনুবাদে শ্রম নিষ্ঠার পরিচয় জ্ঞাপন করেছেন, জীবনানন্দর কবিতা ভালো করে লেখার তাগিদ থাকলেও নিজের অনুভূতি ও চিন্তার কবিতাত্মক প্রয়োগ মুক্ত হয়ে কবিতা সম্পর্কে তিনি আলোচনায় নিয়োজিত করেছিলেন নিজেকে।
বস্তুত যুদ্ধোত্তর লেখকরা মানব অভিজ্ঞতার স্বাপ্নিক ও রহস্যময় রূপটি আহরণের জন্য প্রতীচ্য কাব্যবীক্ষার দাক্ষিণ্য স্বীকরণ সূত্রে গ্রহণ করেন এবং সাহিত্যের উপাদান সমূহ পরিবেশন করেন তাৎপর্যময় চিত্রকল্প ও ভাষার চমৎকৃত বিন্যাসের মাধ্যমে।
ফ্রয়েড ও ইয়ুং আবিষ্কৃত অবচেতন স্তর থেকে উত্থিত মানবীয় ভাবাবেগ ও উদ্দীপনার সঙ্গে প্রতীকবাদী কবিদের সান্নিধ্য তাঁদের লেখনীকে নবত্ব অর্জনে প্রাণিত করেছিল। এজন্য কাব্যজিজ্ঞাসায় বুদ্ধদেব বসু ও জীবনানন্দ দাশের বহুমুখী জ্ঞান, অনুধ্যান, সৃজনাবেগ ও মননশীলতা পরবর্তী আধুনিক কবিদের নবতর শিল্পাদর্শের সূত্র উন্মোচনে সহায়ক হয়েছিল।