আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়: কাঁদো নদী কাঁদো। এটি বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার এর চেতনাপ্রবাহ শিল্পশৈলীর উপন্যাস এর অন্তর্গত।

কাঁদো নদী কাঁদো
‘কাঁদো নদী কাঁদো (১৯৬৮) বাংলাদেশের সাহিত্যে চেতনা প্রবাহশৈলীর অন্যতম সফল উপন্যাস এবং একাধিক অর্থে ব্যতিক্রম, স্বতন্ত্র। এ উপন্যাসের বিষয়, ভাষা, গঠনকাঠামো, শিল্পশৈলী প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রথা-অতিক্রমী, এমন কি, সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ (১৯২২-৭১) তাঁর পূর্ববর্তী উপন্যাস সমূহকেও অতিক্রম করে গেছেন এখানে।
কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের আলোচনা প্রসঙ্গের সমালোচকগণ জাঁ পল সার্ত্র (১৯০৫-৮০) ও আলবেয়ার কাম্যুর (১৯১৩- ১৯৬০) দর্শনচিন্তা ও শিল্পপ্রভাবের কথা উল্লেখ করলেও একথা অনস্বীকার্য যে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এ উপন্যাসের আঙ্গিক বিন্যাস ও শিল্পভাবনায় পরিস্রুত, স্বয়ড় চিন্তার স্বাক্ষর রেখেছেন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জীবনদর্শন ও শিল্প অবিপ্রায়ে যুদ্ধোত্তর পাশ্চাত্য প্রভাব সক্রিয়ছিল।
সৃষ্টিশীল জীবনের দীর্ঘসময় ” তিনি ফ্রান্সে অবস্থান করেন এবং সমকালীন ফরাশি শিল্প-আন্দোলন সমূহের সঙ্গে যুক্ত ও অনেক লেখক শিল্পীর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিলো। তাঁর ‘প্যারিস আগমনের কিছু পূর্বে, বর্তমান শতাব্দীর পাঁচ দশক থেকেই ফরাসি সাহিত্যে বিশেষত উপন্যাস ও নাটকে নতুন চিন্তাকে প্রাধান্য দানের প্রচেষ্টা লক্ষণীয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালের নিরীশ্বর অস্তিত্ববাদী ঔপন্যাসিক- নাট্যকারদের পাশাপাশি নাতালি সারে (জন্ম ১৯০২) ক্লদ সিম (জন্ম ১৯১৩), আল্যা রব গ্রীয়ে (জন্ম ১৯১২) মিশেল ব্যুতের (জন্ম ১৯২৬) প্রমুখ উপন্যাসিকের মাধ্যমে নুভো রমা’ বা নব্য ঔপন্যাসিক আন্দোলন বিস্তার লাভ করে।”
‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের আঙ্গিক গঠন ও শিল্পচেতনায় ঐসব অভিজ্ঞতা নিশ্চয় স্বক্রিয় ছিলো। সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহর শিল্পস্বভাবে যে ক্রম-উত্তরণ লক্ষ্য করা যায়। তার মূলে রয়েছে ইউরোপের উপন্যাসশিল্পের বিষয় ও আঙ্গিক চেতনার অঙ্গীকার। ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের আন্তঃসম্পর্কযুক্ত ঘটনাপ্রবাহের (chin of interlinked events) বিন্যাসে ঘটনা ও চরিত্রের বহিশৃঙ্খলা ও বহিরাচরনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন ঔপন্যাসিক।
চরিত্র সমূহের অঞ্চমুখ-চেতনা উন্মোচনসূত্রেই এ-উপন্যাসের ঘটনা বিধৃত হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে উদ্ভূত | চেনাপ্রবাপহ পদ্ধতিমূলক ( Stream of consciousness method) উপন্যাসের প্রকরণ-বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে কাঁদো নদী কাঁদো’র সাদৃশ্য আবিষ্কার অনায়াসসাধ্য। কিন্তু স্মরণীয় যে, চেতনাপ্রবাহ শব্দটি উনিশ শতকীয় মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম জেমসের (১৮৪২-১৯১০) উদ্ভাবনা।
ফ্রয়েডের স্বপ্নসূত্র ব্যাখ্যার বৈপ্লবিক প্রভাব এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময় স্বভাবের আন্তরক্রিয়ায় চেতনাপ্রবাহরীতির উপন্যাস শিল্পস্বীকৃতি লাভ করে। কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের কর্ম-পরিচর্যায় এই শিল্প অভিজ্ঞতার পরিচয় স্পষ্ট। অস্তিত্বের বিবিধ মাত্রা অর্থাৎ এক সত্তার দর্পণে আরেক সত্তার প্রতিবিম্মন, স্মৃতি ও চেতনার সাহায্যে অতীত-বর্তমানের অন্তর্বয়ন, সমষ্টিজীবনের সঙ্গে ব্যক্তির বিচূর্ণসত্তাকে বস্ত্রলোকের জীবনকাঠামোর সঙ্গে অন্বিত করে অভিন্ন উপন্যাসের শিল্পায়তনে বিন্যস্ত করেছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ।
“কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের কাহিনী বিন্যপ্ত হয়েছে সত্তা এবং অপরতার উপলব্ধির মাধ্যমে। সত্তা তখনই অস্তিত্ববান ও তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে, যখন সে অপর সত্তার দর্পণে বিঘ্নিত হয়। এই প্রক্রিয়াকে মিথাইল মিখাইলডিচ বাখতিন (১৮৯৫-১৯৭৫) বলেছেন দ্বিবাচনিকতা (dialogism)। The Dialogical Imagination” গ্রন্থে বাখতিন বলেছেন, মানুষের পৃথিবীতে কোনো কিছুই নিজে নিজে সম্পূর্ণ নয় উপন্যাস গড়ে ওঠে কেন্দ্র ও পরিধির টানাপোড়েনে, সত্তা ও অপরতার বিবর্তনশীল সম্পর্কের বিন্যাসে।

দ্বিবাচনিক জীবন বীক্ষণ অনুযায়ী জীবন মানে অভিব্যক্তি আর অভিব্যক্তি মানে তাৎপর্যের সন্ধান। ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসে মুহাম্মদ মুস্তফার চরিত্রটি প্রতিফলিত ও উন্মোচিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে অপর সত্তার আলো। অর্থাৎ কথক-১ ‘আমি’ (মুহাম্মদ মুস্তফার চাচাতো ভাই) কথক-২, তবারক ভূইঞার স্মৃতি ও চেতনার অন্তবায়নে (intertextuality) বিচ্ছুরিত আলো দিয়ে মুহাম্মদ মুস্তফার অন্তঃজীবন ও আপাত বিচ্ছিন্ন কুমুরডাঙ্গা নামক জন পদের স্বরূপর ব্যাখ্যা করেছেন।
জীবন যেহেতু সময় এবং পরিধির মধ্যে অবস্থান করে, তাই কোনো উচ্চারণই একবাচনিক নয়, বিবাচনিক, সত্তা এবং অপরতার দ্বিবাচনিক প্রক্রিয়া ঘটে ভাষা-বয়নে, আখ্যান গ্রন্থনায়, চরিত্র উপনআপনায় সত্তা এবং অপরতার দ্বিবাচনিক প্রক্রিয়ায় সহসা বিঘ্নিত সমাজ বা কমিউনিটি তথ্য বহির্বাস্তবতার বহুধা পরিস্থিতি। বাখতিন, উপন্যাসের এই দ্বিবাচনিকতা (dialogism) থেকে বহুবাচনিকতায় উত্তীর্ণ হওয়াকে স্বরসঙ্গতি (polyphony) বলেছেন।
এ-উপন্যাসের গঠন প্রক্রিয়া লক্ষণীয়, তবারক ভুইঞার সংলাপাশ্রয়ী স্মৃতি-অনুষঙ্গের শব্দরূপ পেয়েছে বহির্বাস্তবময় বিচ্ছিন্ন-কুমরডাঙ্গার আতঙ্কগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বতীতি ও ভীতিমুক্তি। অপর পক্ষে তবারক ভূইঞার উচ্চারিত সংলাপে ঔপন্যাসিকের অভিজ্ঞতা আন্দোলিত ও উচ্ছ্বাসিত চেতনাপ্রবারের শব্দরূপ হলো মুহাম্মদ মুস্তফার মনস্তাপ ও আত্মবিলুপ্তির ইতিকথা।”
অভিনিবেশের সঙ্গের লক্ষ করলে দেখা যাবে, এ উপন্যাসের পুরো কাহিনী বলিয়ে নেয়া হয়েছে ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত দু’জন কথকের (কথক আমি বরং তবারক ভুইঞা) মাধ্যমে অথচ দুজন কথকই উপন্যাসের বর্ণিত কাহিনীর গৌণ চরিত্র এবং তারা সক্রিয়ভাবে গল্পের মধ্যে নেই। আবার দু’জনই মূল কাহিনী ও চরিত্রের অনেক কিছুই জানে এবং অনেক ঘটনার সাক্ষী।
কথক আমি’র কথিত কুমরডাঙ্গার ঘটনালি এবং কথক তবারক ভুইঞা তাদের ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে কাহিনী বর্ণনা করলেও পর্যবেক্ষণ, দৃষ্টিকোণ গোপন থাকে না। এবং তারা লেখকের জীবন- দৃষ্টিতেই ঘটনাধারার ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ করে। এভাবে লেখকের সঙ্গে কথকদ্বয়ের দৃষ্টির সমন্বয় ঘটে, বিশেষ করে কথক ‘আমি’র সঙ্গে লেককের দৃষ্টি খুবই নিকটবর্তী।
কথক ‘আমি’ সচেষ্ট হয়েছে উপন্যাসের মূল চরিত্র মুহম্মদ মুস্তফার প্রতি পাঠকের সহানুভূতি আকর্ষণে। ‘আমি’র সীমাবদ্ধতাকে পুরণ করেছে তবারক ভুইঞার বর্ণনা। কাহিনী উপস্থাপনার এই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভঙ্গি ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসকে প্রথা অতিক্রমী ও স্বতন্ত্র করেছে।
“কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের গঠনবিন্যাসে সময়ের ব্যবহার খুব গুরুত্বপূর্ণ। উপন্যাসের বাস্তব সময়কাল-এক অপরাহ্ন থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত মাত্র কয়েক ঘন্টা কিন্তু উপন্যাসের বর্ণিত কাহিনীর সময় ( fictional time) মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বর্তমান থেকে তা সুদূর অতীত পর্যন্ত বিস্তৃত।
জেমস জয়েস (১৮৮২- ১৯৪১) এর ‘ইউলিসিস’ (১৯২২)-এর কাহিনীগত সময় মাত্র চব্বিশ ঘন্টা কিন্তু এর মধ্যে তিনটি চরিত্রের পরস্পরের কাছে আসা আবার দূরে সরে যাওয়া, মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে গড়িয়ে যাওয়া সময় বর্তমান থেকে দূর অতীত পর্যন্ত প্রসারিত। কারণ, ‘চেতনাপ্রবাহের উপন্যাসে সময় একেবারেই খন্ডিত; আনুপূর্বিক বলতে কিছু নেই, সময়ের পরম্পরা নির্ধারিত হয় চরিত্রের চেতনাপোলব্ধি থেকে।
এজন্য অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কোনো সময়গত সীমারেখায় বন্দী থাকে না, চরিত্রের চেতনায় একাকার হয়ে যায়।.. ঘটমান বর্তমানে অতীত ও ভবিষ্যৎ বিলীন হয়ে যায়। চেনাপ্রবাহের অনেক চরিত্র সময়কে উপেক্ষা করে তন্দ্রা, আচ্ছন্নতা এবং স্বপ্নের সাহায্যে অথবা তন্দ্রা বা স্বপ্নের জগৎই অনেক ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রকৃত হয়ে পড়ে।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ কাহিনী বিন্যাসে, সময় ব্যবহারে, চরিত্রের তন্ত্র-আচ্ছন্নতা, সর্বত্রই চেতনাপ্রবাহ পদ্ধতির প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন। চলন্ত স্টিমারের ঘর্মাক্ত পরিবেশ, অপরাহের তন্দ্রালস মানস : স্টিমারের ডেকের উপরে কাহিনীর সূচনা এবং সমাপ্তি কিন্তু কথক ‘আমি’ ও তবারক ভুইঞার বর্ণনায়, স্মৃতি ও চেতনার অনুষঙ্গে কাহিনী স্থান কালের গন্ডি অতিক্রম করে গেছে :
‘লোকটিকে যখন দেখতে পাই তখন অপরহ, হেলে পড়া সুর্য গাঁ-ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে থাকা অসংখ্য যাত্রীর উষ্ণ নিঃশ্বাসে দেহতাপে এমনিতে উত্তপ্ত তৃতীয় শ্রেণীকে আরো উত্তপ্ত করে তুলেছে ……
তারপর লোকটির বিষয়ে বিস্তৃত হয়ে পড়ি, আমার চোখে আবার ঘুমের আমেজ ধরে। অনেকক্ষণ পর একটি কন্ঠস্বর শুনতে পাই নিম্ন শান্ত কণ্ঠ, কিছু সঙ্কোচের আভাস তাতে। ….. লোকটির কথা মন দিয়ে শুন ছিলাম। একবার মনে হয়, তার কথা আমার স্মৃতির পর্দায় কোথায় যেন ঈষৎ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
— তারপর সহসা সে একটি শহরের নাম নেয় যে নাম শুনে প্রথমে চমকিত হই, তারপর একথা বুঝতে পারি যে তখন স্মৃতির পর্দায় অকারণে দোলা লাগেনি। তবে লোকটি কী তবারক ভূঁইঞা ? তাকে কখনো স্বচোক্ষে দেখিনি, কিন্তু সহসা কেমন নিঃসন্দেহ হয়ে পড়ি যে সে তবারক ভূইঞাই হবে। … … .উত্তেজিত হয়ে ভাবি তবে লোকটির মুখে মুহাম্মদ মুস্তাফার কথা শুনতে পাবো কী আমি জানি মুহম্মদ মুস্তফার সঙ্গে লোকটির পরিচয় হয়েছিল।
অর্থাৎ কথক ‘আমি’ প্রথমে শ্রোতা। তবারক ভূঁইঞার কথা শুনে তার ‘স্মৃতির পর্দায়’ ‘আলোড়িন সৃষ্টি’ করে। তার মুখে একটি শহরের নাম’ শুনে চমকিত’ হয়। নিঃসন্দেহ ভাবে বুঝতে পারে লোকটি আসলে তবারক ভূইঞা তারপর ‘উত্তেজিত’ হয়ে ভাবে তার মুখে মুহাম্মদ মুস্তফার কথা শুনতে পাবে কি-না, কারণ সে জানে ‘মুহাম্মদ মুস্তফার সঙ্গে লোকটির পরিচয় ছিল।

উপন্যাসে একসময় ‘আমি’ শ্রোতা থেকে বক্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। একদিকে কথক ‘আমি’ শুনছে তবারক ভুইঞা বর্ণিত কাহিনী। অন্যদিকে সে কাহিনী শুনতে শুনতে ‘আমি’র মনে জেগে উঠছে স্মৃতি । এভাবে শ্রুতি, স্মৃতি ও ভাবনানুষঙ্গে চেতনা প্রবাহশৈলীর প্রকাশ ঘটেছে। ঔপন্যাসিক শুধু মুহাম্মদ মুস্তফার ব্যক্তিজীবনের অন্তর্লোক নয়, কুমরডাঙ্গার জনগোষ্ঠীর মানস প্রতিক্রিয়াও ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন এ পদ্ধতিতে।
নদীকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এ উপন্যাসে কাঠামো মটিফ করেছেন, তিনি নিরীক্ষা করতে চেয়েছেন বহমান নদীর মৃত্যু হলে, নদী-নির্ভর জীবনের সংকট ও শঙ্কা কিরূপ হয় এবং অন্বেষণ করতে চেয়েছে নির্লিপ্ত জীবনও কীভাবে বিপর্যয়ের শিকার হয়। মৃত-অস্তিত্ব কেমন করে জীবিত অস্তিত্বে ছায়া ফেলে তাকে শঙ্কাগ্রস্ত করে তোলে।
‘কাঁদো নদী কাঁদো’-তে তিনটি কৌতূহল স-প্রধান। এক বাকাল নদী যেদিন মরতে বসল এবং স্টীমার চলাচল বন্ধ হল, কুমুরডাঙ্গা বাসীরা কেমনভাবে নিয়েছিল ঘটনাটিকে ? আশা-আকাঙ্ক্ষার মূলটিতে টান পড়লে কেমনভাবে নেয় তাকে মানুষ ? দুই. মুহাম্মদ মুস্তফার নির্লিপ্ত জীবনও কোন বিপর্যয়ের শিকার হল।
শামুকে গুটানো নিভৃত জীবনও কি ব্যাধের লক্ষ্য হয়। তিন, তবারক কি মুহাম্মদ মুস্তফার কোন উল্লেখ করবে? উপন্যাসটি যদিও সরাসরি কোন রূপক নয়, তবুও স্তরে স্তরে বিচার করলে এর মূল অর্থটি সহজেই ধরা যায়। …. উপন্যাসটিতে ভাব ও ফর্মের কোন বিচ্ছেদ নাই। উপরোল্লিখিত কৌতূহলগুলি এমনভাবে মিশে গেছে উপন্যাসটির ভাবধারার সাথে যে তারা ভিন্ন কোন বিবেচনার দাবী তোলে না।
স্বতন্ত্র ফর্ম চেতনা ছাড়াও ঔপন্যাসিকের সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ ও একাধিক চরিত্রের সকথনশৈলীর ব্যবহার, চেতনাপ্রবাহের স্বীকৃত পদ্ধতি। ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের অন্তর্ময় স্বগতকথনশৈলীর (interior monologue) অনেকান্ত (multiple) ব্যবহার অনেকাংশে স্যামুয়েল বেকেটের (১৯০৬-১৯৮৯) Malone Dies (১৯৫১) উপন্যাসের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
একাধিক দৃষ্টিকোণের ব্যবহার, অতীত ও বর্তমানের অন্তবায়নের মধ্য দিয়ে ঘটনার অগ্রগতি, চরিত্র-ভূমিকার অবস্থান বদল প্রভৃতি বিচারে ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ বেকেটের শিল্পশৈলীর সন্নিকটবর্তী। বিশেষ করে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষ মান মালোন’ চরিত্রের সঙ্গে মুহাম্মদ মুস্তফার পরিণতির সাদৃশ্য উল্লেখযোগ্য মুহম্মদ মুস্তফার অনুশোচনাজাত ভীতি ও মর্মঘাতি আতঙ্কের পেছনে রয়েছে খোদেজার আত্মহত্যার ঘটনা।
খোদেজার মৃত্যুকে সে আকস্মিক দুর্ঘটনা হিসাবে বার বার উড়িয়ে দিতে চাইলেও ক্রমশ সুতীব্র এক দায়িত্বচেতনায় সে সমর্পিত হতে থাকে। সে ভাবতে থাকে, খোদেজার প্রতি তার কর্তব্য এড়ানোই খোদেজার আত্মত্যার কারণ। তার বাবা এসময় কিছু না ভেবেই খোদোজের সঙ্গে তার বিয়ে দেবেন বলেছিলেন। বড় হয়ে মুহম্মদ মুস্তফা ছোট হাকিমের চাকরী পেলে খোদেজাকে বিয়ে করা তার সম্ভব হয়ে ওঠে না।
বাড়ির লেখকেরাও সে প্রতিশ্রুতির কথা প্রায় ভুলে যায়। পিতার প্রতিশ্রুতির উপেক্ষা করে বিয়ে করতে গিয়ে বার বার ব্যর্থ হয়ে মুহম্মদ মুস্তফা ভীত হয়ে পড়ে। এক ছুটিতে বাড়ি এলে, বাড়ির লোকজন প্রকাশ্যে কিছু না বললেও নানা আচরণ দিয়ে বুঝিয়ে দেয় যে, মুহম্মদ মুস্তফার জন্য খোদেজা শ্যাওলা আবৃত পুকুরে ডুবে আত্মহত্যা করেছে।
খোদেজার মৃত্যুর নায় নিজের উপর আরোপ করার পর মুহম্মদ মুস্তফার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। মনোত্তাপ ও অনুশোচনাজনিত আতঙ্ক তার অস্তিত্বকে গ্রাস করে ফেলে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ নানাভাবে মুহম্মদ মুস্তফার চরিত্রের মধ্যে অস্তিত্ববাদী দর্শনকে মূর্ত করে তুলেছেন। অস্তিত্ববাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে :
ক. আত্মতা-শরীরে ও মনে প্রত্যেকটি মানুষ স্বতন্ত্র একক ও আলাদা। প্রত্যেকের সমস্যা সমাধান করতে হবে নিজস্ব পথে। প্রত্যেক মানুষ ব্যক্তিগত অঙ্গীকারে আবদ্ধ
খ. কর্ম অস্তিত্ববাদ নিষ্ক্রিয়তার দর্শন নয়, কর্মের দর্শন। মানুষ তখনই অস্তিত্ববান, যখন সে নিজেকে তার সিদ্ধান্ত অনুসারে নির্মাণ করে।
গ. দায়িত্ব- কর্মপন্থা নির্বাচন করতে গিয়ে মানুষ একটি দায়িত্ববোধে জড়িত হয়ে পড়ে। এ দায়িত্ববোধ প্রত্যেকের স্বতন্ত্র ও ব্যক্তিগত। প্রচলিত সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রথার বাইরেও মানুষ যেতে পারে ঐ ব্যক্তিগত দায়িত্বের কারণে।
ঘ. আত্মমুক্তি নিজের অস্তিত্বকে অর্জন করতে গিয়ে মানুষ নিজের গন্ডি অতিক্রম করে এবং তার মধ্য দিয়েই অন্য সকলের সঙ্গে যুক্ত হয় । আমাদের ব্যক্তিসত্তার দায়িত্ব থেকে সমগ্র মানবজাতির দায়িত্ব এসে পড়ে। অস্তিত্ববাদী ব্যক্তি মানুষ সমগ্র মানবজাতির সঙ্গে যুক্ত।
মুহাম্মদ মুস্তফার চরিত্রের মধ্যে উপর্যুক্ত অস্তিত্ববাদের বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ করা যায়। মুহাম্মদ মুস্তফা নির্লিপ্ত, নির্বিবাদী চরিত্র হলেও তার মধ্যে আত্ম-উপলব্ধির একটা সচেতন মন রয়েছে। অস্তিত্ববাদী দর্শন অনুযায়ী সে খোদেজার মৃত্যু দায় নিজের উপর টেনে নেয়, ক্রমশ সে গভীর দায়িত্ববোধের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে ফেলে। মুহাম্মদ মুস্তফা ক্রমাগত অস্তিত্ব উপলব্ধির যন্ত্রণা ও মর্যদাহের উত্তাপে, অস্তিত্ববোধের অসহনীয় দায়িত্বের পরভূত হতে শুরু করে।
উত্তপ্ত ও বিভ্রান্ত-মস্তিষ্ক মুহাম্মদ মুস্তফার মনে এই বিশ্বাস জন্মে যে, ‘খোদেজা একটি প্রতিহিংসা পরায়ণ আত্মায় পরিণত হয়েছে, যে আত্মা সারাজীবন তাকে পদে পদে অনুসরণ করবে, অদৃশ্যভাবে ছায়ার মধ্যে মিশে থেকে হয়তো বা তাকে এক সময় ধ্বংসও করবে।
অনুতাপ, অনুশোচনা-ভীতিরও পরিণতি থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাঁকাল নদীতে চর পড়ায় বিচ্ছিন্ন-কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীদের অস্তিত্ব সংকট ও ভয়সঙ্কুল পরিস্থিতি। মুহাম্মদ মুস্তফার অস্তিত্বশীল ব্যক্তিত্বের (Existent of individual) সঙ্গে কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীদের সমষ্টিগত অস্তিত্বকে (Existent of community) পরিণমস্পর্শী করে সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ সৃষ্টিশীলতার প্রজ্ঞাময় দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন।
মুহাম্মদ মুস্তফার অস্তিত্বগত উপলব্ধিতে খোদেজার আত্মহত্যার দায় অনুভব করার পর সে দায়িত্ববোধে জড়িয়ে পড়ে, কর্মচঞ্চল হয়ে উঠে, ক্রমশ সে আত্ম-বিযুক্ত, মানব বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিবক্ত নিঃসঙ্গ একাকী মুহাম্মদ মুস্তফা তীব্র ও ক্ষীপ্রভাবে আরতীত হয়েছে প্রেম এবং ঘুণা-এই দুই মৌল অনুভূতিতে। * অস্তিত্ববাদের দর্শন অনুযায়ী সে দায়িত্ববোধে জড়িয়ে যাওয়ার পর আপন সিদ্ধান্তে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয় এবং আত্মমুক্তি অর্জনের জন্য সচেষ্ট হয়ে ওঠে। মুহাম্মদ মুস্তফা আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় আত্মহত্যার জন্য একটা উপযুক্ত জায়গা খুঁজতে থাকে।
নিচের কোনো ঘর পছন্দ হওয়ায় সে চিলেকোঠায় যায়। সেখানে খোদেজার উপস্থিতি ও তার চুড়ির অস্পষ্ট ঝঙ্কার অনুভব করে তার শিরদাঁড়া শীতল হয়ে উঠে। সিদ্ধান্তটি সেসময় কার্যকর করা সম্ভব হয় না। তবারক ভূঁইঞার আসার শব্দ পেয়ে সে দড়িটা ঢুকিয়ে ফেলে। খোদেজার মৃত আত্মার উপস্থিতির আতঙ্ক থেকে সাময়িকভাবে সুস্থির হলেও সর্বগ্রাসী আতঙ্ক থেকে সে মুক্তি পায় না। অপ্রত্যাশিতভাবে তার কলিজার কথা মনে পড়ে
‘সুটকেসের দিকে তাকিয়ে রয়েছে এমন সময় সেটি অকস্মাৎ কাঁপতে শুরু করে সুটকেসটি যেন একটি শুভরও গাঢ় রঙের কলিজায় পরিণত হয়েছে। সে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। হয়তো একবার দরজার নিকটে স্থাপিত লণ্ঠনের দিকে তাকায়। তবে কলিজাটি তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সেখানেও হাজির হয় এবং আকারে সহসা ছোট হয়ে গঠনের গায়ে পতদের মত ডানা ঝাপটাপতে শুরু করে।
মুহাম্মদ মুস্তফা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে এই আশায় যে, পতঙ্গটি, পুড়ে মারা যাবে, তার চঞ্চল ক্ষুধার্ত ডানা শুরু হবে, কিন্তু পতঙ্গ স্তব্ধ হয় না। এবার মেঝের দিকে তাকালে সেখানেও কলিজাটি দেখতে পায় মেঝের ওপর সেটি ভাষা তোলা মাছের মত ধড়ফড় করছে যেন। সে আশা করে পানির অভাবে শীঘ্র মাছটির ধড়পড়ানি শেষ হবে, তার দেহ স্থির হয়ে পড়বে, কিন্তু তাও হয় না, পতঙ্গের মত মাঠটিও ধড়ফড় করতে থাকে। বিচিত্র কলিজাটি সত্যই অমর আগুনে দগ্ধ হয় না, দম বন্ধ হলেও তার সনকার্য থামে না।”
পরবাস্তবাদী শিল্পমাত্রায় বিন্যাস্ত সুকেসটি গাঢ় রক্তের ‘কলিজায় পরিণত হয় এবং তার দৃষ্টিকে অনুসরণ করে সহসা ছোট হয়ে লণ্ঠনের গায়ে পতঙ্গের মত ডানা ঝাপটাতে শুরু করার মধ্যে মুহাম্মদ মুস্তফার অস্তিত্ব প্রতীকায়িত হয়েছে। যেখানেই সে দৃষ্টিপাত করে সেখানেই দেখে এজোড়া চোখ, না হয় ঘরথর করে কাঁপা একটি কলিজা। সে অনুভব করে যে, খোদেজা আত্মহত্যা করে একটি প্রতিহিংসা পরায়ণ আত্মায় পরিণত হয়েছে।
তাঁর নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে না, নিজের কার্যকলাপ আর তার ক্ষমতা অধীন নয়, মেয়েটির আত্মা তার মন দখল করে তার ইচ্ছাশক্তিকে কাবু করে ফেলেছে, তাকে পরিচালিত করেছে নির্দয় ধ্বংসকারিণীর রূপ নিয়ে। ** মানব-বিযুক্ত, বিভ্রান্ত-মস্তিষ্ক মুহাম্মদ মুস্তফা মনস্তাপজনিত ভীতিতে সন্ত্রস্ত হয়ে পরিণামে অস্তিত্ব বিলুপ্তর পথে অগ্রসর হয়:
“ইতিমধ্যে মুহাম্মদ মুস্তফা একটি অতল গহবরের প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে তারা তেমন একটি গহবর থেকে বহুদুরে তারা তার অস্তিত্বের কথা ভাবতেও পারে না। পরদিন তখনো সূর্য ওঠেনি, এমন সময় মুহাম্মদ মুস্তফার মা আমেনা খাতুনের মর্মান্তিক আর্তনাদ করে উঠেছিলো আর্তনাদ শোনামাত্র বুঝতে পারি।

তবে তখন আর করার কিছু ছিলো না; কেউ আর কিছু করতে পারতো না। যখন বাড়ির পশ্চাতে উপস্থিত হই তখন দেখতে পাই, যে তেঁতুলগাছের তলে বামাবরণে একটি অদৃশ্য সীমারেখা পেরিয়ে গিয়েছিলো সে গাছ থেকে মুহাম্মদ মুস্তফার নিষ্প্রাণ দেহ ঝুলছে, চোখ খোলা। সে চোখ শ্যাওলা আবৃত ডোবার মত ক্ষুদ্র পুকুরে কী যেন সন্ধান করছে।
অনুশোচনায় তাড়িত মুহাম্মদ মুস্তফার আত্মহত্যার মধ্যদিয়ে অস্তিত্ব বিলুপ্তি তথা উপন্যাসের পরিসমাপ্তি দেখালেও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ জীবন বিমুখ বা নৈরাশ্যবাদী শিল্পী নন। বরং তিনি জীবনমুখী, অস্তিত্ববাদী, মানব-প্রেমী এক অসাধারণ শিল্পী।
উপন্যাসের শিল্প-পরিসরে তিনি মৃত্যুকে একটি শিল্পমাত্রা হিসেবে ব্যবহার করেছেন, কারণ মৃত্যু মানে জীবনের সমাপ্তি নয়। চাঁদের অমাসব্যা’র আরেফ আলী এবং কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের মুহাম্মদ মুস্তফার চরিত্রের চেতনাপ্রবাহ ও মনোবীক্ষণের মধ্য দিয়ে তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে, মৃতমানুষের আত্মা, জীবিত মানুষের অস্তিত্বকে আতঙ্কিত, ভীত ও সংকটময় করে তুলতে পারে, তাকে আত্মবিলুপ্তির পথের নিয়ে যায়।
অস্তিত্বর সংকট ও শঙ্কামুক্তির কথা তাঁর উপন্যাসের নানা জায়গায় উচ্চারিত হয়েছে। ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসে খতিব মিঞার উপলব্ধিতে এই শঙ্কামুক্ত অস্তিত্বের জীবনমুখীতার পরিচয় স্পষ্ট :
‘এ শহরে তার জন্ম হয়নি, ঘরবাড়ি নেই, আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধব বলেও কেউ নেই, তবু এক নাগাড়ে পাঁচ-পাঁচটি বছর। কাটিয়েছে। এ শহরে থেকে গেলাম কুমুরডাঙ্গায় পা দিয়েই বুঝেছিলাম এ মাটিতে ভয় নেই। …… কুমুরডাঙ্গা সম্বন্ধে এমন সব কথা কেউ কখনো বলেনি। সহসা সেদিন থেকে সকলের মধ্যে নুতনভাবে জীবনসঞ্চার হয়, নৈরাশ্য নিরানন্দভাব দূর হয়।
খতিব মিঞার এই ভয়হীন জীবন অনুভবের মধ্য দিয়ে সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহর মৃত্যু অধিক জীবননাদী শিল্পীর পরিচয় পাওয়া যায়। ‘ভয়-আশঙ্কা-মনস্তাপ-নৈরাশ্য ইত্যাদি অনুভূতির মাঝ দিয়ে কুমুরডাঙ্গার মানবপরিস্থিতি যে হয়ে ওঠে সুস্থির, বিশ্বস্ত ও ভবিষ্যৎ সঞ্চারী তার উৎস দ্বিবিধ, যেমন{১} মানব প্রেমানুভূতি এবং (২) জনমানব সংযুক্তি। ভয়, আতর ও একাকিত্ব প্রভৃতি border line situation এর মাঝ দিয়েই ব্যক্তি তার অস্তিত্বকে অনুধাবন ও উপলব্ধি করে।
এভাবে পরিস্রুত হয়েই উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে প্রাতিস্বিক অস্তিত্ব (personal existace)। সমগ্র মানব অভিযাত্রা, সভ্যতার দায়ত্বি, মানবতন্ত্র ও কল্যাণবোধ- এসবের সুক্ষ্মতর দায়িত্ব ও স্বাধীন মুক্তচৈতন্যে সুস্থিত হয়েই ‘অস্তিত্ববাদ’ মানবতাবাদী দর্শনে উত্তীর্ণ। ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের আঙ্গিক বিন্যাসে, অন্তর্বয়নে ও শিল্প অভিপ্রায়ে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এই বোধ সর্বদা জাগরুক ছিলো।
‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের কাহিনী গ্রন্থনে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ দুইজন কথকের (narratorial voice) সাহায্য নিয়েছেন। কথক ‘আমি’ এবং কথক “তবারক ভূইঞা”- এদু’টি চরিত্রকে Fantional character বা বর্ণনাকারী চরিত্র বলা যায়। উভয় কথকের বর্ণিত প্রতিবেদনে (narratorial discourse) বিচ্ছিন্ন জনপদ কুমুরডাঙ্গা, চাঁদবরণঘাট এবং কেন্দ্রীয় চরিত্র মুহাম্মদ মুস্তফার অন্তর্বাস্তবতা, বর্ণিবাস্ততা বিধৃত হয়।
কথক ‘আমি’ প্রথমে দর্শক এবং শ্রোতা। তার বর্ণনা অনুসারে ‘লোকটিকে যখন দেখতে পাই, তখন অপরহ, হেলে পড়া সূর্য, এবং ‘লোকটির কথা মন দিয়ে কুছিলাম। এই লোকটি তবারক ভুইঞা। তার চরিত্র সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেখক বলেছেন ‘ছোটবেলায় নাম পড়েছিল পেঁচা।….. না, চোখের জন্যে নয়, স্বভাবের জন্যে।’ কারণ :
ক. ছোটবেলাতেই লোকটির মধ্যে কৌতূহলটা দেখা দিয়েছিলো। তার সমবয়সী ছেলেরা যখন মাঠে মাঠে খেল করে গৃহস্থের বাড়ির ফলমূল চুরি করে নদী পুকুরে সাঁতার কেটে সময় কাঠাতো তখন সে সবকিছু ভুলে ঘন্টার পর ঘন্টা মানুষের জীবনযাত্রা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতো।
সে সময়ে কত দেউড়ি-খিড়কির পথ দিয়ে সে যে ছায়ার মতো আসা-যাওয়া করেছে এ বাড়ি সে বাড়ি গিয়ে কত নরনারীর দৈনন্দিন জীবননাটকে মশগুল হয়ে সময় কাটিয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। সে জন্যেই চক্ষু-সর্বস্ব নিশাচর পাখির নাম পেয়েছিলো।
বাল্যকালের কৌতূহলী দৃষ্টি (তার পেঁচা-চোখে আর পলক পড়েনি) বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে না গিয়ে দিনে দিনে বেড়েই যায়। তবারক ভূঁইঞার পেঁচা-স্বভাবের পর্যবেক্ষণ শক্তি যেমন অসাধারণ, তেমনি তার কাহিনী বর্ণনার শক্তি শ্রোতাদের সম্মোহিত করে। উপন্যাসের বিশেষ কাঠামোর প্রয়োজনে ঔপন্যাসিক এই চরিত্রটি সৃষ্টি করেছেন তাই তবারক ভূঁইঞার চরিত্রের বিকাশে কিংবা পরিণতির কোনো সুযোগ ছিলনা। কিন্তু ঔপন্যাসিকের বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের অর্থাৎ ফাংশনাল (Fantional) চরিত্র হিসেবে সে অনিবার্য ভূমিকা পালন করে।
তবারক ভূইঞার মধ্যে একজন অভিজ্ঞ জীবন স্রষ্টাকে খুঁজে পাওয়া যায়। কথক ‘আমি’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মুহাম্মদ মুস্তফার চাচাতো ভাই। সে প্রথমে দর্শক এবং শ্রোতা, পরে নিজেই কথক হয়ে ওঠে। কথক তবারক ভূইঞার মুখে কুমুরডাঙ্গার নাম শুনে সে উৎকর্ণ হয় এবং উত্তেজিত হয়ে ভাবে তবে লোকটির মুখে মুহাম্মদ মুস্তফার কথা শুনতে পাবো কি? কারণ আমি জানি মুহাম্মদ মুস্তফার সঙ্গে লোকটির পরিচয় হয়ে ছিলো। তবারক ভুইঞার মুখ দিয়ে যে সব কথা বলা সম্ভব হয়নি কিংবা যেসব কথা তবারক ভুইঞার বর্ণনায় বাদ পড়েছে, সেসব কথাকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ কথক ‘আমি’র মুখে স্থাপন করেছেন।
বিশেষত, চাদরণঘাট ও মুহাম্মদ মুস্তফার শৈশব কৈশোর, পারিবারিক এবং অন্তর্জীবনের কথা। তবারক ভুইঞা মূল কাহিনী বর্ণনা করলেও মুহাম্মদ মুস্তফার নাম উচ্চারণ করে না শেষ পর্যন্ত। খোদেজার আত্মহত্যা ও আত্মহত্যার দায়জিনত মনোন্তাপ, মুহাম্মদ মুস্তফার শেষ পরিণতি বর্ণিত হয় কথক ‘আমি’র কন্ঠে। ঔপন্যাসিক কথক ‘আমি’র কোন নাম উল্লেখ করেন নি।

উত্তম পুরুষ বর্ণিত এই কাহিনীতে মুহাম্মদ মুস্তফার চরিত্রে অন্তর্বাস্তবতা অক্ষনে এই ফাংশনাল চরিত্রের সাহায্য নিয়েছেন। ঔপন্যাসিকের উদ্দেশ্য বাহনে এই চরিত্র যথার্থ ভূমিকা পালন করে। যদিও দেখা যায়, কাহিনীর একটি সূত্রে সে নিজেও জড়িত। তার মতে খোদেজা মুহাম্মদ মুস্তফাকে নয়, তাকেই ভালোবাসতো। একদিন অগ্রহায়ণ মাসের নির্জন সন্ধ্যায় খোদেজা ভীরু ভীরু কণ্ঠে ‘আমি’কে জানায়
মুস্তফা ভাইকে বড় ভয় করে..
আমাকে করে না ?
সজোরে মাথা নেড়ে সে উত্তর দেয় না।
স্পষ্ট বোঝা যায়, মুস্তফার প্রতি তার ডয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা থাকলেও ভালোবেসে ছিল ‘আমি’কে। আত্মহত্যার আগে মুহাম্মদ মুস্তফা শেষবারের মত উদ্ভ্রান্ত হয়ে গ্রামের বাড়িতে এসেছিল শুধু একটি কথা জানতে। সবাই খোদেজার মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী ভাবলেও তার চাচাতো ভাই আমি এসম্পর্কে কি ভাবে ? খোদেজা আত্মহত্যা করেছে, নাকি তার মৃত্যু একটা দুর্ঘটনা :
সত্য উত্তর মুখে এসেও দুখেই থেমে গিয়েছিলো।
কেবল বলেছিলাম,
“কি করে বলি? আমি তখন বাড়ি ছিলাম না ।
কথক ‘আমি’ সত্য উত্তরটি জনাতো। কিন্তু সত্য উত্তরটি তার মুখে আসেনি, কারণ মুহাম্মদ মুস্তফার প্রতি সে ক্রোধান্বিত ছিলো।
সত্য কথাটি সে মুহাম্মদ মুস্তফাকে না বলার দরুনই মুস্তফা আত্মহত্যা করেছে। তার আত্মকথন থেকে জানা যায়, ম্যাট্রিক ফেল করার পর সে আর লেখাপড়া করেনি। বক্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেও সে দ্রুত চিন্তাশীল ও স্মৃতিচারণে অভ্যন্ত এবং মানুষের জীবনের বাইরে-ভেতরে প্রবেশ করার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে তার। তবু কথক ‘আমি’ শেষ পর্যন্ত এক রহস্যময় ব্যক্তি।
“কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মুহাম্মদ মুস্তফা, তাকে ঘিরেই সমস্ত ঘটনা ও চরিত্রের আয়োজন, কুমুরডাঙ্গার সমাজ-পরিবেশ, বিচিত্র পেশার মানুষ, খোদেজার মৃত্যু এবং মৃত্যুকে নিয়ে মুস্তফার বিপন্ন অস্তিত্বের অন্তবয়ন।
ছোট বেলা থেকেই মুহাম্মাদ মুস্তফা ছিলো শান্ত, নির্লিপ্ত, নির্বিকার। শৈশবে পিতা খেদমত উল্লাহর কাছ থেকে স্নেহ-মমতার বদলে পাওয়া নির্মম নিষ্ঠুরতা তার মনকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল। পিতার হত্যাকান্ড ও হত্যাকারীর নাম শুনতে পেলেও সে সম্পর্কে তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় না। ঝড় বৃষ্টিতে পথ ভুলে সে অন্ধাকরে পিতার হত্যাকারী কালু মিঞার বাড়ির সামনে উপস্থিত হলে সবাই আশা করেছিল এবারসে একটা কিছু করবে।
এমন কি কালু মিঞা মসজিদে গিয়ে পিতা খেদমত উল্লাহর হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার সময় ক্ষুদ্ধ চাচা চিৎকার করে বলেছিল- ‘সে মানুষ খোদার বান্দাকে খুন করতে ভয় পায় না, সে মানুষ খোদার ঘরে মিথ্যা বলতে ভয় পাবে কেন?’ তবু মুহাম্মদ মুস্তফার মনে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না।
মুহাম্মদ মুস্তফা ব্যক্তি পরিচয়ে কুমুরডাঙ্গার ছোট হাকিম বা বিচারক। হাকিম সাধারণত বিবেক তাড়িত হয়, কিন্তু তার চরিত্র যুক্তিশীল বিবেকের কোনো উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না। খোদেজার মৃত্যু আত্মহত্যা না দুর্ঘটনা-এ ব্যাপারটি সে যুক্তি দিয়ে বিচার করতে উদ্যোগী হয় না। খোদেজা তার কারণে আত্মহত্যা করেছে বাড়ির লোকদের অমূলক ধারণাকেও উন্মোচিত করে না। যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে মৃত্যুর ঘটনা বিশ্লেষণ না করে বরং আবেগ আর কল্পনার আশ্রয় নেয়। তার ধারণা হয় ‘খোদেজা একটি প্রতিহিংসাপরায়ণ আত্মায় পরিণত হয়েছে।’
বস্তুত, খোদেজার মৃত্যুকে সত্যগ্রাহ্য যুক্তি সাহায্যে বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধান করাই তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হওয়া সঙ্গত ও প্রত্যাশিত ছিলো কিন্তু খোদেজার মৃত্যু সম্পর্কে সে তার কল্পনার বাইরে উত্তর খোজেনি। খোদেজার মৃত্যু তার অন্তর্জগতে নানা উদ্ভট কল্পনার জন্ম দিলেও, রহস্য উদ্ঘাটনে উদ্যোগী ভূমিকা না নিয়ে হত্যার দায় নিজের উপর আরোপ করে অনুশোচনা, মনোস্তাপ, আত্মযন্ত্রণায় বিভ্রান্ত হওয়ার মধ্যে মুহাম্মদ মুস্তফার নিষ্কর্মক (possive) চরিত্রের বৈশিষ্ট্যই ফুটে উঠেছে।
মুহাম্মদ মুস্তফা ছোট হাকিম। সে যে যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে খোদেজার মৃত্যুকে বিচার করে না ; আবেগ দিয়ে বিচার-এটি তার আচরণগত অসঙ্গতি। সত্যকে আবিষ্কারের উদ্যোগ তার নেই, বরং বাড়ির লোকেরা তার সম্পর্কে কীভাবে, তবারক ভুইঞা বাড়ির লোকদের মত সমর্থন করে কি-না, খোদেজার মৃত্যুর জন্য তার চাচাতো ভাই কথক ‘আমি’ তাকে দায়ী করে কি-না এসবের উপর সে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দেয় এবং এ সবের ফলে তার চারিত্রের আচরণগত অসঙ্গতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৫০
মুহাম্মদ মুস্তফার চরিত্রে এই অসঙ্গতি থাকলেও তার অর্ন্তলোক, অনুভব সচেতন মনের পরিচয় স্পষ্ট। সাধারণভাবে সে নির্লিপ্ত, নির্বিকার হলেও হত্যার দায় নিজের আরোপ করার পর, সে দায়িত্ববোধ থেকে আত্মমুক্তি অর্জনের জন্য আত্মহত্যা করতে সচেষ্ট হতে দেখা যায় এবং আত্মহত্যা করেও।
মোদ্দাকথা, মুহাম্মদ মুস্তফা ছোট হাকিম হলেও তার জীবনে কোনো সুস্থ তা ছিলোনা। তার জীবন যেন নিয়তি নির্ধারিত, ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত, কোনো ঘটনার গূঢ় অর্থ আবিষ্কারে সে যুক্তিশীল পথে অগ্রসর না হয়ে স্বকল্পিত পথে পরিচালিত হয়। বিয়ে করার জন্য ঢাকা যাওয়ার সময় স্টিমার চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া, তারপর জ্বর আসা, তসলিমের চিঠির উত্তর না দেওয়া এসবের মধ্যে সে খোদেজার প্রতিহিংসা পরায়ণ দুষ্ট আত্মার অবিমিশ্র জিঘাংসার ও অশুভ তৎপরতা দেখতে পায়।
তার দৃষ্টিবিভ্রমও ঘটে, যেদিকে ডাকায় এক জোড়া চোখ অথবা ঘরথর করে কাঁপা গাঢ় রঙের কলিজা দেখতে পায় এবং একসময় সে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। আত্মহত্যার আগে সে শেষবারের মত উদভ্রান্ত হয়ে গ্রামের বাড়ি এসেছিল শুধু একটি কথা জানতে। সবাই খোদেজার আত্মহত্যার তাকেই দায়ী করলেও তার চাচাতো ভাই কথক ‘আমি’র এ বিষয়ে অভিমত কি ? সেও বিশ্বাস করে খোদেজা আত্মহত্যা করেছিল ? কথক ‘আমি’র সত্য উত্তরটি জানা ছিলো, কিন্তু সে মুস্তফাকে সত্য কথাটি বলেনি। কী করে বলি ? তখন আমি বাড়ি ছিলাম না ।
এ উত্তরে মুহাম্মদ মুস্তফার স্পষ্ট ধারণা হয়েছিল, খোদেজা তার জন্যই আত্মহত্যা করেছে। চরিত্র বিন্যাসে মুহাম্মদ মুস্তফার স্বকল্পিত ধারণার প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ। ফলে মুহাম্মদ মুস্তফার চরিত্রের অস্বাভাবিকত্ব ও অসঙ্গতিজনিত ত্রুটি দৃষ্টি এড়ায় না। ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত না থেকেও যে চরিত্রটি সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে, তার নাম খোদেজা।
নিভৃতচারিনী, মাতৃহারা এই নারী মামা খেদমত উল্লাহ বাড়িতে আশ্রিতা ছিলো। শ্যামলা, ক্ষীণদেহী, দীর্ঘাঙ্গী মেয়েটি সম্পর্কে মুহাম্মদ মুস্তফার ফুফাতো বোন ছিলো। মামা খেদমত উল্লাহর প্রতিশ্রুতির কথা সে জনতো, তবে নির্লিপ্ত, নির্বিকার স্বভাবের জন্য হোক বা ভয় মিশ্রিত প্রহ্মার কারণে হোক মুহাম্মদ মুক্তকার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। মুহাম্মদ মুস্তফার বিয়ের সংবাদে বাড়ির পেছনে শ্যাওল আবৃত পুকুরে ডুবে সে আত্মহত্যা করেছে নাকি তার মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা-এটি অজ্ঞাত থেকে যায়।
রন্ধন এবং গৃহকাজে অধিক নিপুণ খোদেজা সাঁতার জানতো কিনা, একথা উপন্যাসে জানা যায় না। খোদেজার মৃত্যু খবর মুহাম্মদ মুস্তফার মধ্যে প্রথমে প্রতিক্রিয়া না হলেও ক্রমশ তার মধ্যে গভীর অনুশোচনা ও মনোত্তাপজনিত প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় এবং একসময় স্বকল্পিত ধারণার উপনীত হয় যে, খোদেজা তার জন্যই আত্মহত্যা করেছে।

অন্য যে সব চরিত্রে উল্লেখ “কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসে পাওয়া যায় তাদের মধ্যে, স্টেশন মাস্টার খতিব মিঞা, উকিল কফিল উদ্দিন, ডাক্তার বোরহান উদ্দিন, থানার দারোগা, খেদমত উল্লাহ, মুস্তফার মা আমেনা খাতুন, কালু মিঞা মোক্তার মোছলেহ উদ্দিনের মেয়ে, সকিনা খাতুন থাকে মুস্তফা খোদেজা বলে ভুল করে এবং নদীর কান্না প্রথম শুনেছিল। এই চরিত্রগুলো জীবনবাস্তবার্তা নিয়ে স্ব স্ব স্থানে অনিবর্য ভূমিকা পালন করে।
বিশেষত, তবারক ভূঁইঞার শেষ উক্তি- “নদী কী তার নিজের দুঃখে কেঁদেছিলো । নদী কেঁদেছিলো তাদের দুঃখেই। এবং কথক ‘আমি’ ও আত্মবিশ্লেষণ আমার মনে হয় নদী যেন নিষ্ফল ক্রোধেই কাঁদছে। হয়তো নদী সর্বদা কাঁপে, বিভিন্ন কণ্ঠে, বিভিন্ন সুরে, কাঁদে সকলের জন্যেই। মনে মনে বলি কাঁদো নদী কাঁদো এই অভিব্যক্তি উপন্যাসের নামর্থকে অভিব্যঞ্জিত করেছে।
নদী নিজের দুঃখে নয়, কেঁদেছিলো কুমুরডাঙ্গার আপাত বিচ্ছিন্ন অসহায় অধিবাসীদের দুঃখেই নদী কেঁদেছিলো মুহাম্মদ মুস্তফার অনুশোচনায় দক্ষ, মনোন্তাপজনিত, ভীত-সন্ত্রস্ত অসহায়, নিঃসঙ্গ, মানব-বিযুক্ত, অস্তিত্ব বিলুপ্তির দুঃখে। নদী জীবনের চলিষ্ণুতার প্রতীক। বাকাল নদীতে চড়া পড়ার দরুন স্টিমার চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কুমুরডাঙ্গারঅধিবাসরা প্রথমে নানা অপবিশ্বাস ও সংস্কারে পরিচালিত হলে পরে নিয়তির অশুভ চক্রান্ত ভেবে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে।
বাকাল নদীতে চড়া পড়ায় কুমুডাঙ্গার অধিবাসীর জীবনে যে বিপন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিলো, তেমনি মুহাম্মদ মুস্তফার নির্বিকার জীবনেও খোদেজার আত্মহত্যার ঘটনা সমান পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। দু’টি ঘটনাই সমান্তরাল। ঔপন্যাসিক দু’টি ঘটনাকে সমান শিল্পমাত্রায় স্থাপন করে উপন্যাসের ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ নামকে সার্থক ব্যঞ্জনা দান করেছেন।
‘কাঁদো নদী কাঁদো’ অবিমিশ্রভাবে চেতনা প্রবাহশৈলীর উপন্যাস। চেতনাপ্রবাহ শিল্পশৈলীর উপযোগী গদ্যা-ভাষা নির্মার্থের সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সচেতন প্রয়াস লক্ষণীয়। এ উপন্যাসের ভাষা উচ্ছ্বাসবর্জিত স্বচ্ছ, স্বল্প সংলাপে আত্মকথনশৈলীর বর্ণনায় একটা প্রবহমানতা রয়েছে। কখনো কখনো অপেক্ষকৃত অপ্রচলিত শব্দ এবং জটিল বাক্য প্রয়োগ করলেও তাঁর গদ্যভঙ্গির সাবলীলতা নষ্ট হয়নি।
তবে ভাষা প্রশ্নে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ধ্রুপদী রুচির অধিকারী। তাঁর উপন্যাসের চারিত্ররা মহাকাব্যের মত নারী-পুরুষ, অভিজাত-অনভিজাত, পেশা, জাত নির্বিশেষে একই ভাষায় কথ বলে । বাক্যগঠনে ঈষৎ সাধু মিশ্রিত তৎসমবহুল, সমাসবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ক্রিয়াপদে কখনো আঞ্চলিক উচ্চারণ স্পষ্ট :
ক. বজ্রাহত মানুষের যত বাপজান কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে থাকে, তারপর তার দৃষ্টি যায় মুহাম্মদ মুস্তফার দিকে। ততক্ষণে বাপজানের চোখে খুন চড়েছে। উন্মাদের মত চীৎকার করে সে বলে, “চুপ করে দাঁড়িয়ে আছো কেন? তুমি মরদ না মাগী, বুক একটু হিম্মত নাই ?”
খ. “কাল সকালের জন্যে একটি নৌকা ঠিক করে দেন?
‘বজ্রাহত’ সমাসবদ্ধ পদ, ‘বাপজান’ আঞ্চলিক ‘দৃষ্টি’ সাধু। কিন্তু বাক্যের গঠন ধ্রুপদী। পরবর্তী সংলাপে বাক্যের গঠন সাধুরীতির হলেও আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার লক্ষ্যণীয়- ‘চুপ’ ‘মরদ’ ‘মাগী’ ‘হিম্মত’ কিন্তু ক্রিয়াপাদ ‘নাই’ যথারীতি সাধু ।
উদাহরণ ‘খ’ এ মুহাম্মদ মুস্তফার সংলাপে ‘কেন’ ক্রিয়াপদটিতে আঞ্চলিক উচ্চারণের ছাপ স্পষ্ট এবং ‘একটা’ নয় “একটি” ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ আঞ্চলিক ক্রিয়াপদের রীতি অনুযায়ী হওয়ার কথা ছিল ‘একটা’।
“কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের ভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর গতিশীলতা। প্রবহমান নদী মতই এ উপন্যাসের ভাষা চলিষ্ণুতা বিদ্যমান। তবারক ভুইঞা প্রসঙ্গে কথক আমি’র অভিমত স্মরণীয় বস্তুত তার বাকা স্রোত রীতিমত একটি নদীর ধারায় পরিণত হয়। এর তাৎপর্য হচ্ছে কমা, সেমিকোলন, অসমাপিকা ক্রিয়া ব্যবহার করে বাক্যকে দীর্ঘ এবং পিন করা হয়েছে :
তারপর, মুহাম্মদ মুস্তফা যখন প্রস্থান করে, সে-সময়েও তবারক ভূঁইঞা তাকে কৌতূহল ভরে চেয়ে চেয়ে দেখে থাকবে লম্বা কিন্তু শীর্ণ- পাতলা লোক, মাথাটি শরীরের তুলনায় একটি বড় যা দেহের শীর্ণতার জন্যে অযথার্থভাবে বড় মনে হয়, নীরস মুখ, চোখে কেমন সতর্কতা, চলার ভঙ্গিতে একটু অনিশ্চিত ভাব যেন কোথায় যাচ্ছে তা ঠিক জানে না, বাঁ-হাটা ঈষৎ ঘোরানো (সে যখন চেয়ারে চৌকিতে বসে তখন সে হাতেই ভর দিয়ে দেহটা একটু হেলিয়ে বসে যেন অদৃশ্য কোন দৌরালে ঠেস দিয়ে রয়েছে), অন্তরে-অন্তরে লাজুক প্রকৃতির মানুষ যে-পাণ্ডুকতা তার জীবনে আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে সামরিকভাবে কিছু বৃদ্ধি পেয়েছিলো এই কারণে যে তখনো যে তার নূতন এবং পুরাতন অবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন করতে সক্ষম হয়নি; দুটির মধ্যে বিরোধিতা ছিলো না, কেবল দুটি তখনো পৃথক সত্তাই ছিলো।
এবাক্যের শব্দ সংখ্যা ১২২, কমা (,) ব্যবহার করা হয়েছে ৯টি, সেমিকোলন (:) ১টি, কোলন (:) ১টি, ব্রাকেট () ) ১টি হাইফেন (-)৬টি অসমাপিকা ক্রিয়া প্রস্থান করে’ ‘দেখে থাকবে’ ‘মনে হয়’ ‘চেয়ারে-চৌকিতে বসে ‘ভর দিয়ে’ ‘ঠেস দিয়ে ‘স্থাপন করতে হেলিয়ে বসে। দ্বিরুক্ত শব্দ- চেয়ে-চেয়ে’ ‘চেয়ারে-চৌকিতে’ ‘অন্তরে অন্তরে’ ইত্যাদি। বাক্য গঠন এবং শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, স্বতন্ত্র অভিজ্ঞান ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।

বিষয় ও শিল্পশৈলীর প্রয়োজনে কখনো দীর্ঘবাক্য কখনো ছোট বাক্য বন্ধ ব্যবহার করেন এবং প্রায়শ তাঁর বক্যের ধরণ হয় জটিল। অসরল, জটিল বাক্য গঠনই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গদ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে বিষয় ও বক্তব্য প্রকাশে তাঁর গদ্য অব্যর্থ, শাণিত। কখনো বিবরণের বদলে বিশ্লেষণ কখনো চরিত্রের মনোজাগতিক বন্ধ ও প্রশ্নসংকুল আত্মজিজ্ঞাসার কারণে গদ্যেভঙ্গিও হয় সে রকম :
ক. সে ভাবে চাঁদবরণঘাটে স্টীমার থেকে নেবে খালের এ পথ দিয়ে চিরদিনই কি তাকে যেতে হবে। তবে তন্দ্রাচ্ছন্ন মানুষ বিস্ময়কর কথাও বেশিক্ষণ ভাবে না, ভাবছে মনে হলেও তার ভাবনা অগাধ পানির ওপর সমীরণ আলোড়িত ঈষৎ তরঙ্গমালার মত হাস্তাভাবে খেলা করে, নিচে তন্দ্রা অগাধ পানির মতই স্থির হয়ে থাকে। কিন্তু খাল কোথায় ? একে পুকুর, শ্যাওলা-আবৃত ডোবার মত ছোট পুকুর যার পাড় অসমান, যেন বিশালাকার কোন প্রাণী নখাঘাতে পাড়টির ঐ অবস্থা করছে।
তবে পুকুরের পাড়ের দিকে বা পাড়স্থিত গাছপালার দিকে তার দৃষ্টি নেই, দৃষ্টি একটি মুখের ওপর যে-মুখ সে পুকুরের পানি থেকে ভেসে উঠে এসেছে। সম্পূর্ণভাবে নয়, কারণ ওপরে এসেও আবার কিছু ডুবে রয়েছে যে-জন্যে তা অপরিচিত মনে হয়। তবু সে মুখ অপরিচিত মনে হবে কেন? সে কি খোদেজার মুখ ইতিমধ্যে ভুলে গিয়েছে শুধু তার মুখ নয়, ভাবভঙ্গির অপরিচিত ঠেকে এমন ভাবভঙ্গি খোদেজার মুখে কখনো লক্ষ্য করেনি।
খ. সহসা মুহাম্মদ মুস্তফার মনে এই বিশ্বাস জন্যে যে খোদেজা একটি প্রতিহিংসাপরায়ণ আত্মার পরিণত হয়েছে যে আত্মা সারাজীবন তাকে পদে পদে অনুসরণ করবে, অদৃশ্যভাবে, হায়ার মধ্যে মিশে থেকে, হয়তো বা তাকে এক সময়ে ধ্বংসও করবে। সেদিন রাতে সে যখন তন্দ্রাহীন চোখে বারান্দায় বসেছিলো তখন বোনেজারই উপস্থিতি অনুভব করেছিলো। ভয়টাও তখন জেগেছিলো। এমন ভয় যা মানুষের চোখের সামনে থেকে অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সমস্ত কিছু নির্মিতে নিচিহ্ন করে দেয়।
উল্লেখিত উদ্ধৃতি দুটির প্রতি মনোনীবেশ করলে বোঝা যায়, বিবরণের বদলে তিনি বিশ্লেষণকে অধিক প্রাধান্য দিয়েছেন। কখনো প্রশ্ন পাল্টা প্রশ্ন একই বাক্যে স্থাপন করে গদ্যের মধ্যে একটা প্রবহমান স্পন্দন সৃষ্টি করেছেন। চরিত্রের আত্মদ্বন্দ্ব ও আত্মজিজ্ঞাসা, মনো জাগতিক চেতনা স্রোত প্রকাশেও তিনি একই কৌশল অবলম্বন করেছেন। তাঁর গণ্যের এই বিশ্লেষণ ভঙ্গি দেখে মনে হয়, সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহর গদ্যই গচ্ছে বিশ্লেষণী গদ্য, তাঁর ভাষাই হচ্ছে প্রবহমান চেতনাস্রোত প্রকাশের অব্যর্থ ভাষা।
বাংলাদেশের উপন্যাস-সাহিত্যে তাঁর উপন্যাস যেমন বিষয় ও শিল্পশৈলীতে নিঃসঙ্গ ব্যতিক্রম, তেমনি তাঁর উপন্যাসে গদ্যভাষাও স্বতন্ত্র ও প্রাতিশ্যিক। তাঁর উপন্যাসে সংলাপের ব্যবহার খুবই স্বল্প। সংলাপের বদলে আত্মকথন, বিবরণ বর্ণনার বদলে বিশ্লেষণ সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহর গদ্যকে স্ফটিক সংহতি দান করেছে।