কর্ণফুলী উপন্যাস । বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়: কর্ণফুলী উপন্যাস । এটি বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার এর আঞ্চলিক উপন্যাসের শিল্পশৈলী এর অন্তর্গত।

 

কর্ণফুলী উপন্যাস

 

কর্ণফুলী উপন্যাস

কর্ণফুলী নদী ও তার তীরবর্তী বৈচিত্র্যময় জীবনপ্রবাহ, আঞ্চলিক পরিবেশধৃত শ্রমজীবি মানুষের আত্মদ্বন্দ্ব ও অস্তিত্বের স্বরূপ অঙ্কনের মানসে আলাউদ্দিন আল আজাদ (জন্ম ১৯৩২) রচনা করেন ‘কর্ণফুলী’ (১৯৬২) উপন্যাস। ঔপন্যাসিক লিখেছেন ‘চিত্রী যেমন বিভিন্ন রং দিয়ে একটি সৃষ্টি সম্পূর্ণ করেন, তেমনিভাবে আমি বিভিন্ন ভাষার রং ব্যবহার করেছি ; ‘কর্ণফুলীর জীবনধারা, সবুজ প্রকৃতি, শ্যামল পাহাড় ও সাগর সঙ্গমে বয়ে চলা প্রবাহের মতই এভাষা অবিভাজ্য।

শিল্পসিদ্ধির জন্য এর অবলম্বন আমার কাছে অপরিহার্য রূপে গণ্য হয়েছে। ঔপন্যাসিক আঞ্চলিক লোকজীবন ও ভাষার অঙ্গীকারের কথা যতই উচ্চারণ করুন না কনে, ‘কর্ণফুলী’ সর্বোতভাবে আঞ্চলিক উপন্যাস নয়। কারণ, আঞ্চলিক উপন্যাসের যে সব বৈশিষ্ট্য- ‘প্রথমত, কোন নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের নিবিড় এবং অখন্ড পরিচয় দান, দ্বিতীয়ত, ভাষা-সংলাপে, স্থানীয় প্রবাদ-প্রবচন এমনকি উচ্চারণ ভঙ্গিতেও সাধ্যমত আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য গুলি ফুটিয়ে তোলা ” ইত্যাদি।

কর্ণফুলী উপন্যাসে পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যায় না। আঞ্চলিক বৃত্তাবদ্ধ জীবনকাঠামো নগরায়ণ ও যন্ত্রায়ণের ফলে যে রূপান্তর ঘটে, তারই দৃষ্টিগ্রাহ্য বাস্তবতা শিল্পায়িত হয়েছে এ উপন্যাসে। অন্তঃপ্রবাহে রোমান্টিকতা থাকা সত্ত্বেও, বিশেষ অঞ্চলের জীবনপ্রবাহের শব্দরূপ হিসেবেই কর্ণফুলী উপন্যাসের বিশেষত্ব ।

 

কর্ণফুলী উপন্যাস

 

২.

কাহিনীগঠনে বিশেষ ভৌগোলিক আয়তনের বস্তুসমগ্রতা থাকলেও আর্থ-সামাজিক কাঠামোর অন্তর্গত নৃতাত্ত্বিক ঐতিহ্যমন্ডিত মানবসম্প্রদায়ের সুসংহত রূপবন্ধনে ঔপন্যাসিকের দৃষ্টিকোণ পরিস্রত নয়। ঔপন্যাসিকের সীমাবদ্ধ অভিজ্ঞতাই এর জন্য দায়ী। জীবনানুভাবে রোমান্টিকতার কারণে চরিত্রের ভাবনা-কল্পনা আচার-উচ্চারণে স্কুল এসেছে, যা local colour and habitation কে পূর্ণাঙ্গ শিল্পরূপ দিতে সর্বাংশে সফল হয়। উপন্যাসের শুরুতেই আঞ্চলিক জীবনপ্যাটার্নের স্বরূপ স্পষ্ট হয় :

‘সুড়ঙ্গের মতো অন্ধাকার গলি, তার ভিতরে বাঁশের ছোটেপা কাহার শালা। বাঁহাতে শেকল ধরে টাকা হাপরের গনগনে আগুন মিস্ত্রির পেশীবহুল কালো দেহটাকে মোটা রেখায় উৎকর্ণি করেছে এবং সেই রক্তিম আভায় রঙিন হয়ে থাকা তার মুখ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরছে ঘায়।

এই কামারশালায় ঠিকাদার রমজানের সঙ্গে পকেটমার ইসমাইলের কাজের কথা হয় এবং তর জন্য অগ্রিম নেয় কেশটাকা। বাড়িতে এসে মা মনুবিডিকে সেই দশটাকা হাতে দেয় এবং তার কেরামতের মেয়ে জুলিও বিয়ের কথা শুনে মনে মনে রোমান্স অনুভব করে। জুলিকে তার ভালো লাগে, তবে বিয়ে করে দায়িত্ব নেয়ার কথা কখনো ভাবেনি। তবে একবার সে জুলিকে একটি সোনার আংটি দিয়েছে।

মা মনুবিবিরি সঙ্গে ইসমাইলের যখন কথা হয় তখন আড়াল থেকে জুলি তা শুনে, হাতের আংটিটা খুলে আচমকা সে ইসমাইলের কোলের উপর ফেলে পালিয়ে যায়। যদিও রমজানের সঙ্গে কাসালং যাওয়ার পূর্বে সে একবার জুলিদের বাড়ি যায়, মানের গোপন ইচ্ছা, যদি জুলির সঙ্গে একটু কথা হয়। জুলির বাবা কুলি কেরামতের সঙ্গে কথা বলে, জুলি কাছে আসেনা।

রমজানের সঙ্গে ইসমাইল কামালং বাঁশকাটতে যায়। রমজান কর্ণফুলী পেপার মিলের বাঁশের ঠিকাদার। রমজানের কাজে কাসালং গিয়ে ইসমাইল পরিচিত হয় লালচাচার সঙ্গে। স্বভাবে লালচাচা একটু ক্ষেপাটে, বেশি আসক্তি দেশি মদের প্রতি। দ্বিতীয় রাতেই ইসমাইল বুঝতে পারে টাকা ও মদ দিয়ে রমজান লালচাচার কাছ থেকে কিনতে চায় তার মেয়ে রাঙা মিলাকে। দুপুরে কলসি জল দিতে এলে রাঙামিলার সঙ্গে পরিচয় হয় ইসমাইলের বিকেলে ঝর্ণার জলে জল আনতে গেলে ইসমাইল জুলির ফেরত দেয়া আংটি দেয় রাঙামিলার কলসিতে।

অবশ্য কয়েকদিন পর লালচাচার বাড়িতে গিয়ে সে রাঙামিলার জন্য একটা শাড়িও দিয়ে আসে। কিন্তু রাঙামিলাকে ভালোবাসে চাকমা যুবক নীলমণি । রাঙামিরঅও নীলমণির প্রেমের যোগ্য স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত। তারা রাতের আঁধারে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে।

ইসমাইল গাছের আড়ালে থেকে তাদের পালিয়ে যাওয়ার কথা শুনে ফেলে। জিঘাংসায় ইসমাইলের চোখ জ্বলে ওঠে। নির্ধারিত রাতে রাঙামিলঅ নীলমণির হত ঘরে পথে নামে। ইসমাইলও তাদের অনুসরণ করে। কিন্তু ইসমাইল জানতো না রমজান,ইতুগুন্ডা, হাবুগুণ্ডা তাকেও অনুসরণ করছে।

পথের ক্লান্তির রাঙামিলা নদীর তীরে এস বিশ্রাম নেয়, নীলমণির কোলে মাথা রাখে। হঠাৎ রাঙামিলার চোছে পড়ে ইসমাইল। নীলমণি উঠতে যাচ্ছিল, এমন সময় ইসমাইলের দুপাশ থেকে ইতুগুন্ডা ও হাবুগুণ্ডা এসে দাঁড়ায়। সুযোগ বুঝে তাদেরকে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে নীলমণি ইসমাইলের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কিন্তু নীলমণি পরাস্ত হয়। সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললে তা রাজন্য ইসমাইলের মনে সহানুভূতি জাগে।

নীলমণিকে কাঁধে নিয়ে রাঙামিলাসহ ইসমাইল এগিয়ে চলে। বাড়ি এসে ইসমাইল শুনতে পায় জুলির বিয়ের কথা। সে রাতেই জুলিকে ডেকে এসে ঘরের লাইট নিভিয়ে দেয়। পরে অবশ্য জুলিকে সে বিয়ে করে । জুলির ঘরে তার সন্তান হয়। এদিকে কুলির কাজ যেমন তার ভালো লাগে না, তেমনি সংসার চালানো তার জন্য কষ্টকর হয়ে ওঠে। একসময় দু’জন ভদ্রলোকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়, তাদের সাহায্যে ইসমাইলের ‘নলি’ হয়, তবে শর্ত থাকে যে, জাহাজে সে তাদের হয়ে কাজ করবে।

 

কর্ণফুলী উপন্যাস

 

জাহাজে যাওয়ার পূর্বে ইসমাইল জুলিকে আদর করে, সান্ত্বনা দেয়, জুলির চোখের জল কর্ণফুলীর নোনাজলে মিশে যেতে থাকে। জাহাজ দুষ্টিরবাইরে চলে গেলে জুলি ফিরে আসে বাস স্ট্যান্ডের দিকে। উপন্যাসটি শেষ হয় এভাবে-

“আসমান ওপরে থাক, দরিয়াকে ভয় করা যায় না ? আস্তে আস্তে হেঁটে বাসষ্ট্যান্ডের দিকে যেতে এ কথাটিই মনে জেগে থাকে ধ্রুবতারার মতো। তার কানে বাজে বহুবার শোনা গানের কলি, রঙ্গম রঙ্গিলা সনে মর্জি রইল মন, এ মত দেওয়ানারে হইয়া ও লি কতজন, রঙ্গম রঙিলারে ।”

এই পরিসমাপ্তিতে বোঝা যায়, কাহিনীগঠনে ও চরিত্র বিন্যাসে আলাউদ্দিন আল আজাদ সচেতন ছিলেন না। কাহিনী কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য পথে এগিয়ে যায় নি। অর্থাৎ ঔপন্যাসিক শুরু থেকে পরিণতি নিয়ে ভাবেন নি, তাই ঘটনার বিন্যাস এলোমেলো। উপন্যাসে মূল চরিত্র ইসমাইল, তার পরিচয় প্রথমে পকেটমার, গুন্ডা, অবশেষে যে এক বিশেষ গোষ্ঠীর কর্মি হয়ে জাহাজে যাত্রা করে।

আঞ্চলিক উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে ইসমাইলের কোনো পরিচয় ফুটে ওঠে না। এমনকি সে কোনো পেশার বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বর করে না। অথচ ঔপন্যাসিক তাকে শ্রমজীবী মানুষের প্রেক্ষাপটে চিত্রিত করেছেন। এছাড়াও ইসমাইল প্রথমে জুলির প্রতি আকৃষ্ট হলেও তার এ আকর্ষণ যেন সাময়িক, কাসালং বাঁশ কাটতে গিয়ে আবার রাঙামিলার প্রতিও আকর্ষণ অনুভব করে। তাকে জুলির ফিরিয়ে দেয়া আংটি দেয়, এমনকি তার বাড়িতে গিয়ে শাড়িও দিয়ে আসে।

রাঙামিলা তার প্রেমিকা চাকমা যুবক নীলমণির হাত ধরে বেরিয়ে যাওয়ার রাতে ইসমাইল হাতে ডেগার নিয়ে তাদের অনুসরণ করে, অন্যদিকে তাকেও অনুসরণ করে রমজান, ইতুগুড়া, হারগুন্ডা। দ্বন্দ্বযুদ্ধে নীলমণি সংজ্ঞা হারালে সে অবশ্য তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয় এবং তাকে কাঁধে করে রাঙামিলাসহ শহরে আসে। এখানে ইসমাইলের চরিত্রে মানবিকতার স্পর্শ দেখা যায়। কিন্তু বাড়ি ফিরে যখন শুনতে পায় জুলির বিয়ে হয়ে গেছে তখন আবার তার মধ্যে জিঘাংসা জেগে ওঠে। জুলিকে ডেকে এনে ঘরের লাইট নিভিয়ে নিয়ে তার পাশবিকতা চরিতার্থ করে।

অর্থাৎ নারীর প্রতি তার আকর্ষণ যতটুকু প্রেমের তার চেয়ে বেশি শারীরিক। যদি সেই জুলিকেই শেষ পর্যন্ত ইসমাইল বিয়ে করে কিন্তু তাকে প্রেমিক পুরুষ বলে মনে হয় না। ইসমাইলের চরিত্র চিত্রণে আলাউদ্দিন আল আজাদের এই অসতক বিশৃঙ্খলতা ‘কর্ণফুলী’ উপন্যাসের গঠনবিন্যাসকে দুর্বল করে ফেলেছে। উপন্যাসের অন্য চরিত্রগুলোর মধ্যে রমজান কর্ণফুলী পেপার মিলের বাঁশের ঠিকাদার।

শ্রেণীচরিত্র অনুযায়ী রমজান অর্থলোলুপ, নারীলোলুপ লম্পট। রাঙামিলাকে পাওয়ার জন্য সে তার পিতা লালচাকে মদ খাওয়ার টাকা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত ইতুগুন্ডা ও হাবাগুন্ডাকে নিয়ে নিজেই রাঙামিলা ও নীলমণির অনুসরণ করে। অর্থাৎ সে যথার্থই তার শ্রেণীচরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে। রাঙামিলা এবং জুলি দু’জন ইসমাইলের জীবনের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষার কারণ ছিলো। কিন্তু জুলির অভিমান যেমন ইসমাইলকে রাঙামিলার প্রতি আগ্রহী করেছে তেমনি আবার বিপদগামী করেছে। জুলি এবং রাঙামিলা এই দুই নারী চরিত্র ‘কর্ণফুলী’ উপন্যাসের স্বপ্নময় পরিবেশ তৈরি করেছে।

তবে তারে চরিত্র প্রেমের জন্য ত্যাগ কিংবা সংগ্রাম কোনো কিছুই লক্ষ করা যায় না। রাঙামিলা নীলমণিকে ভালোবেসে পথে নামে সত্য, কিন্তু তাদের পরিণাম ঔপন্যাসিকের যথার্থ পরিচর্যা থেকে বঞ্চিত। ঔপন্যাসিকের মূল আকর্ষণ ছিলো আঞ্চলিক জীবনের পরিবর্তনের প্রতি। ইসমাইলের দৃষ্টিতে সেই পরিবর্তনের রূপ ধরা পড়ে এভাবে :

ক. মিলের বাঁশ কাটার মেশিনটা আজব জিনিষ, যেন রূপকাহিনীর রাক্ষস, প্রচন্ড শব্দে কাজ করে চলেছে, বড় বড় বোন্দাগুলি নিমিষেই মিশসার। কাপ্তাইয়ের বিজলীঘর, ছোড়, দরওয়াজা, কলের এত শক্তি। এদের কাছে মানুষের মেহেনত তো কিছু নয় ? পাহাড়কে বদলাচ্ছে, মাটিকে বদলাচ্ছে, যাদুমন্ত্রের মতো। ১৮

খ. বছর খানেকের মধ্যে গ্রাম ছেড়ে দিয়ে এখানকার সকলকেই চলে যেতে হবে। কাপ্তাই-এর বিজলী-কারখানা চালু ভেসে যাবে এই এলাকাও । ”

অর্থাৎ বহির্বাস্তবতার আঘাতে, যন্ত্রায়ণ ও নগরায়ণের ফলে আঞ্চলিক জীবনকাঠামোর যে রূপান্তর সাধিত হচ্ছে, তার সঙ্গে স্থানীয় অধিবাসীদের জীবনপ্যাচানেরও পরিবর্তন হচ্ছে। উপন্যাসের পরিসমাপ্তিতে তাই দেখা যায়, কেন্দ্রীয় চরিত্র ইসমাইল ‘নলি’ বানিয়ে জাহাজে পাড়ি জমায়। উপন্যাস নির্মিতির সুদক্ষ স্বাক্ষর থাকা সত্ত্বের আলাউদ্দিন আল ‘আজাদের ‘কর্ণফুলী’ সীমাবদ্ধ অভিজ্ঞতার উপন্যাস বলে অনুমিত হয়।

শ্রমজীবী মানুষের প্রতি মমত্ববোধ থাকার কারণে আলাউদ্দিন আল আজাদ চরিত্র নির্বাচনে নিশ্রেণীর- কুলি, মজুর, ঠিকাদার চরিত্রকে প্রাধান্য দিলেও ‘কর্ণফুলী’ শ্রেণীচেতনার উপন্যাস নয়। কর্ণফুলী উপন্যাসের আস্তঃবিন্যাস রোমান্স আক্রন্ত, আঞ্চলিক গীতলতায় পরিপূর্ণ ।

 

কর্ণফুলী উপন্যাস

 

কর্ণফুলী উপন্যাসের ভাষা ব্যবহারে আলাউদ্দিন আল আজাদ চট্টগ্রামেরর আঞ্চলিক গান, প্রবাদ-প্রবচন, প্রয়োগ করে স্থানীয় জীবনধারাকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। সবক্ষেত্রে তিনি সফল হয়েছেন, এমন বলা যায় না। কারণ, আঞ্চলিক শব্দের অসতক প্রয়োগ, ও আঞ্চলিক উচ্চারণভঙ্গির ভুল বানান দৃষ্টি এড়ায় না ।

ইসমাইল একটি স্থির হয়ে চাঁদে আলোতে দেখে ওর পথের মতো মুখ, তারপর হাত ছাড়িয়ে একে আগলে বুকের কাছে ধীরে বলল ন ডরইও। চল জলদি। দোহরা পথ দিযখন পড়িব।’ (কর্ণফুলী / পৃ.৩৬)

এখানে সংলাপের মধ্যে ‘চল জলদি’-এর ‘চল’ স্থানীয় উচ্চারণ ‘চলঅ’ এবং ‘দিষগুন’ শব্দটি আঞ্চলিক উচ্চারনে হবে ‘দিশ হঅন’ অর্থাৎ সঠিকভাবে পাওয়া।

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ব্যবহার :

ক. রইস্যা বন্দু ছাড়ি গেলরে

শাদা দিলে দাগ লাগাই।

খ. নিডির তলি মারবহির

পসারি দুগান লবহিব

লাইবে এবারৎ ইলে

বাজি পারে নায় কোনদিন।

আঞ্চলিক প্রবাহ-প্রবচন :

যদি আছে দুই পাও, যেথা ইচ্ছা সেখা যাও

যদি হবে চার পাও, এই ব্যাটা কোথা যাও

যদি হবে ছয় পাও, আব্বাজান মিশ্রি দাও।

 

কর্ণফুলী উপন্যাস

 

আলাউদ্দিন আল আজাদ কর্ণফুলী উপন্যাসের লেখকের কথায় যদিও বলেছেন- ‘চিত্রী যেমন বিভিন্ন রং দিয়ে একটি সৃষ্টি সম্পূর্ণ করেন, তেমনিভাবে আমি বিভিন্ন ভাষার রং ব্যবহার করেছি, কর্ণফুলীর জীবনধারা, সবুজ প্রকৃতি, শ্যামল পাহাড় ও সাগর সঙ্গমে বয়ে চলা প্রবাহের মতই এভাষা অবিভাজ্য। কিন্তু আমাদের বিবেচনায় এ অবিভাজ্য ভাষা তিনি অকৃত্রিমবাবে প্রয়োগ করতে পারেন নি।

বিচ্ছিন্নভাবে প্রয়োগের ফলে ভাষার আঞ্চলিক রং পরিস্ফুট হয়নি। আঞ্চলিক জীবনধারার অকৃত্রিম ছবি আঁকতে গেলে অবশ্যই আঞ্চলিক অবিভাজ্য ভাষার অকৃত্রিম প্রয়োগ করতে হবে। তবু নদীকর্ণফুলীর তীরবর্তী জীবনধারা যে ছবি আলাউদ্দিন আল আজাদ আমাদের সাহিত্যে উপহার দিয়েছেন তা সর্বাংশে আঞ্চলিক সার্থকতায় পরিপূর্ণ না হলেও বাংলাদেশের উপন্যাসে সুনির্দিষ্ট ব্যতিক্রম।

Leave a Comment