জীবন: কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান পূর্ব

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ জীবন: কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান পূর্ব । যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

জীবন: কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান পূর্ব

 

জীবন: কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান পূর্ব

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯০৮ সালের ১৯শে মে দুমকার। দুমকা সাঁওতাল পরগনার রাজধানী। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় তখন সেখানকার সেটেলমেন্ট বিভাগের কানুনগো ছিলেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ঢাকা বিক্রমপুরের মালপদিয়া গ্রামে। তাঁদের পারিবারিক কর্ম ছিল বাযনিক ক্রিয়া।

বাল্যকালে হরিহর বন্দ্যেপাধ্যায়ও পুরোহিতগিরি করেছিলেন। তারপর তিনি নিদারুন অর্থকষ্টের মধ্যদিয়ে প্রথমে ঢাকা স্কুল ও ঢাকা কলেজ তারপর কলকাতা সিটি কলেজ এবং তারপর ১৮৯৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে বি.এ. পাশ করেন। সে সময় গ্রামে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত লোকের ছিল একান্ত অভাব। তাই হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় বি.এ. পাশ করার পর গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে লোকজন তাকে দেখতে এসেছিল।

যা নিক ক্রিয়া ছেড়ে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে চাকুরে হওয়ার মানসিকতার মধ্য দিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পূর্বপুরুষের বাঁধন ছেঁড়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়, যার মধ্যে নিহিত ছিল মানিকের জীবনের বাঁধন ছেঁড়ার বীজ। মানিকের মা নীরোদাসুন্দরী দেবী। তার পৈতৃক বাড়ি ছিল বিক্রমপুরের গাওদিয়া গ্রামে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথায়’ এই গাওদিয়া গ্রামের উল্লেখ আছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়রা চৌদ্দ ভাইবোন ছিলেন। তিনি পিতামাতার পঞ্চম পুত্র। তাঁর প্রকৃত নাম প্রবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছোটবেলা থেকেই দুরন্ত, নির্ভিক, আত্মপ্রত্যারী ছিলেন। সংসারে এবং সমাজ জীবনে ছিলেন অকুতোভয় । তিনি বলেছেন:

“আমিও ভয়ানক দুরন্ত আর দুঃসাহসী ছিলাম, অনেক অ্যাডভেঞ্চারের চিহ্ন সর্বাঙ্গে আছে।

একবার কুটনোকোটার প্রকাণ্ড বঁটির উপর পরে তার পেট কেটে নাড়ি-ভুড়ি দেখা যাচ্ছিল, ডাক্তার পঁচিশটি স্টিচ দিলেও তিনি কাঁদেন নি, এরপর উননের গরম কয়লা নিয়ে খেলতে গিয়ে তাঁর পা পুড়ে যায়, এতে তার পায়ে প্রায় এক ইঞ্চি গর্ত স্থায়ী হয়েছিল, আরেকবার গরম রসগোল্লা খেতে গিয়ে মুখ পুড়ে গেলে তাঁর মেজদা তাকে ব্যঙ্গ করে, এতে শিশু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আত্মসম্মানে আঘাত লাগে, সে আরো একটি রসগোল্লা মুখে পুরে দেয়।

টাঙ্গাইলে তাঁর ছোট ভাই দুটিকে নিয়ে বাজি বানাতে গিয়ে তিনজনের সর্বাঙ্গে কাঁচ ফুটলে সেই কাঁচ বের করার সময় তিনি একটুও কাঁদেন নি। ছোট ভাই দুজনের কাঁচ পরে বের করবে, কাঁদলে ওরা ভয় পাবে- সেই কর্তব্যবোধ থেকেই তিনি কাঁদেন নি। আবার তাঁর ছোট ভাই কুয়োতে পরে গেলে ছোট মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন, তিনি ভয় পেয়ে পালিয়ে না গিয়ে বাড়ির লোককে ডেকে এনে ছোটভাইকে উদ্ধার করেন।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতার বদলির চাকরির কারণে শিশু এবং কিশোর বয়সেই তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুড়েছেন। সঙ্গত কারণেই বিভিন্ন মানুষ দেখেছেন, বিভিন্ন পরিবেশ দেখেছেন আর সঞ্চয় করেছেন বিচিত্র অভিজ্ঞতা:

“সারা বাংলার ছড়ানো গোটা দশেক স্কুলে আর মফস্বল ও কলকাতার গোটা তিনেক কলেজে আমি পড়েছি।’

একদিকে বিচিত্র স্থান, বিচিত্র মানুষ, অন্যদিকে সাহিত্যপাঠ দুই মিলে তিনি সমৃদ্ধ হন। তিনি বলেছেন:

“স্কুলজীবনেই অনেক নভেল পড়েছি। বোধহয় ফোর্ড ক্লাস কিংবা থার্ড ক্লাস থেকে মানসী ও মর্মবাণী, ভারতবর্ষ এবং প্রবাসী প্রায় নিয়মিত পড়তাম।”

 

জীবন: কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান পূর্ব

 

বই পড়ে তার মর্মার্থ উদ্ধার এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পর্যালোচনা করতেন তিনি। সাহিত্যের বিচিত্র জীবন সম্পর্কে তাঁর বিভিন্ন বোধ তৈরি হতো, সাহিত্যের নরনারী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনে আলোড়ন তুলতো। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দিকের পর্যবেক্ষণ করতেন। তাদের জীবনের সঙ্গে একাকার হতেন। বাস্তব জগৎ আর সাহিত্য জগতের পার্থক্য ধরার চেষ্টা করতেন। তাঁর ভেতরে জন্ম নিতো নতুন একটি বোধ:

“বারো তেরো বছর বয়সের মধ্যে বিষবৃক্ষ, গোরা, চরিত্রহীন পড়া হয়ে গিয়েছে। আর সে কি পড়া। এরকম একখানা বই পড়তাম আর তার ধাক্কা সামলাতে তিনচার দিন মাঠে ঘাঠে, গাছে গাছে, নৌকায় নৌকায়, হাটবাজারে মেলায় ঘুরে আর হৈ চৈ মারামারি করে তবে সামলে উঠতাম ।”৮

এভাবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন শুরু হয়েছে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন কল্পনাপ্রবণ এবং দরদী। দরাজ গলায় গান গাইতেন এবং বাঁশি বাজাতেন চমৎকার।” জীবন ও জগতের প্রতিটি শ্রেণিকে দেখার প্রবল আগ্রহ কিশোর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যেই দেখা যায়।

“১৪/১৫ বৎসরের (বয়সটা ঠিক নয়, সম্ভবত ১৩/১৪ হবে- সরোজ মোহন মিত্র) ছেলে স্কুলের ছাত্র মানিককে দু-তিনদিন খুঁজে পাওয়া যায় না। যায় কোথায়। জননী কেদে কেটে অস্থির, খোঁজ নিয়ে জানা যায় টাঙ্গাইলের নদীর ধারে যে নৌকাগুলি নোঙ্গর করা থাকে, তাদের মাঝি মাল্লার সঙ্গে ভাব জমিয়ে তাদের মধ্যে সে দু- চারদিন থেকে আসে। নৌকার মধ্যে তাদের অন্ন খায় পরম তৃপ্তিতে।।… …. …]

মাঝে মাঝে তাকে ঘোড়ার গাড়ির গাড়োয়ানদের মধ্যেও দেখা যেত। তার মনে ছিল না ভয়-ভর, ছিল না পিতামাতার শাসন-ভীতি। গাড়োয়ানদের গল্প-গুজবে রাত বেশি হয়ে গেলে, একটি গাড়ির ভেতর ঢুকে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে থাকত, বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথাটিও মনে পড়ত না। তার কৈশোরের এই বেপরোয়াভাব নিজেকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা-শাসন শৃঙ্খলার গতীতে না আসা ছিল তার পরবর্তী জীবনের অদ্ভূত বৈশিষ্ট্য।”১০

টাঙ্গাইলে থাকার সময়েই ১৯২৮ সালের ২৮ শে মে ডবল নিমোনিয়ায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মা মারা যায়। মায়ের অভাব তিনি সারা জীবন বোধ করেছেন। তাঁর লেখায় ‘মা’ বিষয়টি বিভিন্নভাবে এসেছে। মা মারা যাওয়ার পর তাঁদের টাঙ্গাইলের বাস উঠে যায়। সকলে থাকে কাঁথিতে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেখানে ভর্তি করা হয়।

এ সময় তিনি কালাজ্বরে আক্রান্ত হন। তাই তাকে তাঁর বড়দির কাছে মেদেনীপুর পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তিনি জেলা স্কুল থেকে ১৯২৬ সালে ঐচ্ছিক গণিতে লেটার পেয়ে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাস করেন। তিনি নির্দ্বিধায় অন্ত্যজ শ্রেণির সঙ্গে মেলামেশা করতেন। অলৌকিক লৌকিকতা গল্পে তিনি বলেছেন:

“আমার স্বভাব ছিল ভারি মদ। একদিকে যেমন ভালোবাসতাম লাল ধূলোভরা শহরের নোংড়া পুরোনো ঘিঞ্জি লোকালয়, মোটেই হিসাব থাকত না যাদের সঙ্গে মিলছি-মিশছি, খেলাধূলো হৈচৈ করছি, তারা বয়সে বড় অথবা ছোট, সংসারের মাপকাঠিতে ভদ্র অথবা ছোটলোক তেমনি ভালোবাসতাম শহরের আশেপাশে শুধু কয়েকটা কুঁড়ে ঘর নিয়ে গড়া ছোট ছোট গ্রাম, বর্ষায় ভরা আর শীতের শুকনো নদী, ফাঁকা মাঠ আর বুনো গাছের জাম এবং ছড়ানো সবুজ শালের ঐ বন। ”

কলেজে ভর্তি হওয়ার পর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হোস্টেল জীবন শুরু হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পড়তেন বাঁকুড়া ওয়েসলিয়ন মিশন কলেজে আর থাকতেন রোনালডেসি হোস্টেলে। মায়ের মৃত্যু, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা তাকে মানসিকভাবে একা করে দেয়। তার মনে জেগে থাকে আপনজনের সঙ্গে বিচ্ছেদ বেদনা।

এ অবস্থায় তিনি প্রচুর পরিমাণে কাঁচি সিগারেট খেতে শুরু করেন। এই সময়েই তিনি ‘অনুশীলন পার্টিকে সমর্থন করেন এবং অল্প অল্প মদ্যপান করেন। তাঁর মধ্যে প্রখর ব্যক্তিত্ববোধ দেখা যায়। তিনি রিজার্ভ থাকতেন এবং একা থাকার চেষ্টা করতেন। তাঁর মধ্যে প্রবল ভাবপ্রবণতাও দেখা যায়। তিনি নিজের মতো থাকতে পছন্দ করতেন। বাঁধাধরা নিয়ম তার ভালো লাগত না। অধিকাংশ সময় তিনি নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটাতেন

“সন্ধ্যা সাতটার পর ছাত্রদের হোস্টেলের বাইরে থাকা ছিল অপরাধ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় খেয়ালী। একদিকে কুস্তি লড়েন। অন্যদিকে বাঁশী হাতে ঘন্টার পর ঘণ্টা রেল লাইনের ধারে বিরাট মাঠের একপাশে বসে বাজিয়ে যেতেন। ঘরে ফেরার কথা খেয়ালই থাকত না। ফলে প্রায়ই হত নিয়মভঙ্গ। ইংরেজ অধ্যাপকের কাছে তার জন্য কৈফিয়ৎ দিতে হত। রাতেও অনেক সময় তাঁর বাঁশীর আওয়াজ কানে যেত। ১২

 

জীবন: কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান পূর্ব

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনেক গল্প উপন্যাসে এই বাঁশী বাজানোর প্রসঙ্গ এসেছে। এ সময় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অধ্যাপক জ্যাকসনের কাছে বাইবেল পড়তেন সেন্ট জন অ্যাম্বুলেন্স কোরে ভর্তি হন এবং ডিপ্লোমা পান। তার মন থেকে ধর্ম বিষয়ক গোঁড়ামি দূর হয়ে যায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় স্মার্ট ছেলে হিসেবে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। লম্বায় ছ ফুটের বেশি চোখে কালো ফ্রেমের চশমা তাকে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তোলে।

ক্লাসের পড়ার প্রতি তাঁর একেবারেই আকর্ষণ ছিল না। তা সত্ত্বেও তিনি আই.এস.সি.তে প্রথম বিভাগ পান। তারপর তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে অঙ্কে অনার্সসহ বি.এস.সি.তে ভর্তি হন। বিজ্ঞান তাঁর প্রিয় বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হয়। তিনি বিজ্ঞানের প্রেমে পড়েন। এ সম্পর্কে ‘গল্প লেখার গল্প’তে বলেছেন:

“বাংলা তেরোশ’ পঁয়ত্রিশ সাল। কলেজে পড়ছি বি.এস.সি.। অনার্স নিয়েছি অঙ্কে। অঙ্কের মতো এমন আর কি আছে? এত জটিলতায় এমন চুল চেরা নিয়ম। রয়ায়ন ও পদার্থবিদ্যা তো অভিনব কাব্য-ছ্যাবলামি, নেকামি, হাল্কা ভাবপ্রবণতার চিহ্নও নেই। ক্লাসে বসে মুগ্ধ হয়ে লেকচার শুনি, লেবরেটারীতে মশগুল হয়ে এক্সপেরিমেন্ট করি। নতুন এক রহস্যময় জগতের হাজার নতুন প্রশ্নের ভারে মন টলমল করে।

ছেলেবেলা থেকে ‘কেন’ নামক মানসিক রোগে ভুগছি, ছোট বড় সব বিষয়ের মর্মভেদ করার অদম্য আগ্রহ যে রোগের প্রধান লক্ষণ। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জানা চাই। বিষয় তুচ্ছ হোক, জ্ঞান হিসাবে বিশেষ দাম না থাক, ছেলেমানুষেরও সেটা জানা থাক যতক্ষণ সেটিকে তুলো ধুনো করে না ঘাঁটছি, হজম করা খাদ্যকে রক্তে মাংসে পরিণত করার মতো পরিণত না করছি উপলব্ধিতে, আমার শাস্তি নেই। ক্লাশ এগিয়ে যায় বহুদূর, আমি মেতে থাকি দুমাস আগে পড়ানো বিদ্যুতের এক অদ্ভূত ব্যবহার নিয়ে।

স্বভাব আজও আমার যায় নি। একটু যা পড়ি আর একটু যা শুনি তাই নিয়েই ঘাঁটাঘাঁটি করে আমার সময় যায় রাশি রাশি পড়া আর শোনার রীতিমাফিক পড়াশোনা হয়ে ওঠে না।১৩

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন বিজ্ঞান মনস্ক। হৃদয়াবেগের চেয়ে যুক্তির উপর তাঁর নির্ভরশীলতা ছিল বেশি। তিনি জীবনের যে কোনো বিষয়কে পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ করে সূত্র আবিষ্কার করতে চাইতেন। এমন কি রেস খেলা নিয়েও তিনি সূত্র আবিষ্কারে উদ্যোগী হন।

এ বিষয়ে শ্রী পরিমল গোস্বামী ১৯৫৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় লিখেছেন। তিনি বলেছিলেন এ খেলা আর চালের খেলা থাকবে না। এর ভেতরে নিশ্চিয়ই একটা নিয়ম আছে, কার্য কারণ সম্পর্ক সব কিছুর মধ্যেই আছে, এ খেলাতেও থাকবে। অনেক বছরের খেলা তুলনামূলক আলোচনা করে তার মধ্য থেকে ‘ল’ আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত এর শেষ আবিষ্কার হয় নি।

‘কেন’ রোগের কারণে জীবনের বিভিন্ন জটিল দিকের উত্তর তিনি খুঁজে বেড়িয়েছেন- কোনো উত্তর পেয়েছেন, কোনোটি শুধু জিজ্ঞাসাই রয়ে গেছে। জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে পর্যবেক্ষণ তার শেষ হয় নি। পরবর্তীতে তাই তিনি তার সাহিত্যকর্মে জীবনের বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাত অঙ্কনে সাহসী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছেন। দেশী ও বিদেশী সাহিত্য পড়ে তিনি বিভিন্ন মতবাদ বিশেষ করে ফ্রয়েডীয়তত্ত্ব সম্পর্কে বেশি করে জানলেন।

তিনি বলেছেন ছোটবেলা থেকেই তাঁর অভিজ্ঞতা অনেকের চেয়ে বেশি। বাস্তব জ্ঞান এবং সাহিত্যের জ্ঞান তাঁকে বিশেষ জীবনদর্শন দান করতে সক্ষম হয়। তিনি বলেছেন:

“স্কুল থেকে শুরু করে কলেজে প্রথম এক বছর কি দু-বছর পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ – শরৎচন্দ্র প্রভাবিত সাহিত্যই ঘেঁটেছি এবং তারপর কতদিন খুব সোরগোলের সঙ্গে বাংলায় যে ‘আধুনিক’ সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছিল তার সঙ্গে এবং সেই সাথে হ্যামসুনের ‘হাঙ্গার’ থেকে শুরু করে শ-র নাটক পর্যন্ত বিদেশী সাহিত্য এবং ফ্রয়েড প্রভৃতির সঙ্গে পরিচিত হবার চেষ্টা করেছি । ১৪
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজ্ঞান বিশ্বাস করতেন। তাঁর কাছে মনে হয়েছিল ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব বিজ্ঞান, তাই তিনি এই তত্ত্বকে আঁকড়ে ধরেন।

এ সময় ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের আবিষ্কারের ফলে শিল্প-সাহিত্য ও মানবচিন্তায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে। পুরোনো মূল্যবোধ, যৌনচেতনা, নারী-পুরুষ সম্পর্কে প্রচলিত ধ্যান ধারণা, সংস্কার-বিশ্বাস সকল বিষয়ে ধারণার পরিবর্তন আসে। এ সময় ‘অবচেতনাই মানব মনের নিয়ামক’, ‘সেক্স ইজ দ্যা মেইন স্প্রিং অফ আওয়ার আনকনশাস্ লাইফ’ ইত্যাদি প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়।

 

জীবন: কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান পূর্ব

 

প্রথম দিকের, বিশেষ করে মার্কসবাদে যোগ দেওয়ার পূর্বে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফ্রয়েডীয় তত্ত্বকে বিজ্ঞানসম জ্ঞান করে একে জীবনবোধের অবলম্বন হিসেবে চিন্তা করেন। এছাড়া তাঁর নেশা ছিল বাস্তবজীবনের বিভিন্ন দিক অনুসন্ধান। তিনি অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন। ভদ্র ঘরে জন্ম নিয়েও অন্ত্যজ শ্রেণির প্রতি তাঁর টান ছিল বেশি।

মধ্যবিত্তের কৃত্রিমতা এবং নিম্নবিত্তের খোলসহীন নির্ভেজাল প্রকাশ্যতা তাঁর দৃষ্টিকে স্বচ্ছতা দান করেছিল। শহর এবং শহরতলীর সকল শ্রেণির মানুষকে তিনি সুক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাদের জীবনের গোপন অনুভূতি, আত্মিকবোধ আত্মস্থ করেছেন। শহর এবং শহরতলীর উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তের জীবনবোধের গভীরতা তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আবরণহীনভাবে প্রতীয়মান হয়েছে:

“ভদ্রজীবনের সীমা পেরিয়ে ঘনিষ্ঠতা জন্মাচ্ছিল নিচের স্তরের দরিদ্র-জীবনের সঙ্গে। উভয় স্তরের জীবনের অসামঞ্জস্য, উভয় স্তরের জীবন সম্পর্কে নানা জিজ্ঞাসাকে স্পষ্ট ও জোড়ালো করে তুলতো। ভদ্র জীবনে অনেক বাস্তবতা কৃত্রিমতার আড়ালে ঢাকা থাকে, গরীব অশিক্ষিত খাটুয়ে মানুষের সংস্পর্শে এসে ওই বাস্তবতা উলঙ্গ রূপে দেখতে পেতাম, কৃত্রিমতার আবরণটা আমার কাছে ধরা পরে যেতো। মধ্যবিত্ত সুখী পরিবারের শত শত আশা-আকাঙ্ক্ষা অতৃপ্ত থাকার, শত শত প্রয়োজন না মেটার রূপ দেখতে পেতাম নিচের তলার মানুষের দারিদ্য-পীড়িত জীবনে।”১৫

১৯২৮ সালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কলেজে বন্ধুদের সঙ্গে সাহিত্য আলোচনায় বাজি ধরে প্রথম গল্প ‘অতসীমামী’ লেখেন। পরবর্তীতে তিনি ‘গল্প লেখার গল্প’ তে বলেছেন:

“একদিন কলেজের কয়েকজন বন্ধু সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করছে। শৈলজানন্দ, প্রেমেন, নজরুল এদের নিয়ে সম্প্ৰতি হৈ চৈ পড়ে গিয়েছে বাংলার সাহিত্য ক্ষেত্রে- সাহিত্যের দুর্গরক্ষী সিপাইরা কাঠের বন্দুক উচিয়ে দুমদুম চীনা পটকা কাটিয়ে লড়াই শুরু করেছে। আলোচনা গড়াতে গড়াতে এসে ঠেকলো মাসিক পত্রের সম্পাদকদের বুদ্ধিহীনতা, পক্ষপাতিত্ব, দলাদলি প্রবণতা ও উদাসীনতায়।

নামকরা লেখক ছাড়া ওরা কারুর লেখা ছাপায় না। দলের লেখক হলে ছাপায় ব্যস। অন্যকেউ পাত্তা পাবে না ।

একজনের তিনটি লেখা মাসিকের আপিস থেকে ফেরত এসেছিল। সে সম্পাদকদের কুৎসিত একটা গাল দিলো-কলেজের ছেলেরা যা দেয় । ………….

বললাম, ‘কেন বাজে কথা বকছো? ভালো লেখা কি এত সপ্তা যে, হাতে পেয়েও সম্পাদকরা ফিরিয়ে দেবেন? সম্পাদকরা কি পাগল যে, ভালো গল্প ফিরিয়ে দিয়ে বাজে গল্প ছাপবে? ভালো দূরে থাক, চলনসই একটা গল্প পেলে সম্পাদকেরা নিশ্চয় সাগ্রহে সেটা ছেপে দেয়।…………] অনেক কথা কাটাকাটির পর বাজি রাখা হলো। I… ….. বাজি হলো এই। আমি একটি গল্প লিখে তিন মাসের মধ্যে ভারতবর্ষ, প্রবাসী বা বিচিত্রায় ছাপিয়ে দেবো। যদি না পারি- সে কথা আর কেন? [… … …]

ভাবতে লাগলাম কি নিয়ে গল্প লিখবো। প্রেমের গল্প? হ্যাঁ প্রেমের গল্পই লিখতে হবে। বাংলা মাসিকের প্রায় সব গল্পই একরকম প্রেম নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লেখা হয়। ….. ….] মন সায় দিলো না। মন বললো, প্রেমের গল্প লিখতে চাও লেখো, কিন্তু পচা দুর্গন্ধ ছ্যাবলামির গল্প লিখো না- বাংলার ছেলেমেয়েগুলো যে গোল্লায় গেল এরকম গল্প পড়ে পড়ে।
আবার বললো মন, কেন, প্রেম কি তুমি দেখোনি সংসারে? এত মেলামেশা করলে মানুষের সঙ্গে? যে প্রেম বাস্তব জগতে দেখেছো- তাকেই ফেনিয়ে ফাঁপিয়ে স্বপ্ন জগতের প্রেম করে দাও। তাও ভালো হবে ন্যাকামির চেয়ে।

তখন মনে পড়লো পূর্ববঙ্গের এক স্বামী-স্ত্রীর কথা। বাস্তব জীবনে নাটকীয় প্রেমের চরম অভিজ্ঞতা ওদের দেখেই আমি গেয়েছিলাম। স্বামী বাঁশি বাজাতেন। বাঁশের বাঁশি নয়, ক্ল্যারিওনেট। প্রায় পায়ে ধরে তাঁকে আসরে বাজাতে নিয়ে যেতে হতো- গিয়েও খুশি হলে বাজাতেন, নইলে বাজাতেন না। বাড়িতে বাজাতেন শুধু স্ত্রীকে শ্রোতা রেখে। বছরখানেক আমি শুনেছিলাম। বেশিক্ষণ বাজালে তাঁর গলা দিয়ে রক্ত পড়তো ।

এদের অবলম্বন করে এক ঘোড়ালো ট্র্যাজিক প্লট গড়ে তুলে গল্প লিখলাম। নাম দিলাম অতসী মামী। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গল্পটি লিখে বিচিত্রা’য় দিলেন এবং এই একটি গল্প লিখে তিনি রীতিমতো লেখক বনে গেলেন। পত্রিকার সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় স্বয়ং বাড়িতে এসে ‘অতসী মামী’ র জন্য পারিশ্রমিক নগদ টাকা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দিলেন এবং আরো একটি গল্প দাবি করলেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্য সফল হলো। সব ছেড়ে তিনি লেখার দিকে মনোযোগী হয়ে উঠলেন। তাঁর ‘অতসী মামী সম্পর্কে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত বলেছেন:

“একদিন দুপুরবেলা বসে আছি-বা, বলতে পারি, কাজ করছি-একটি দীর্ঘকায় ছেলে ঢুকল এসে বিচিত্রা আপিসে। দোতলায় সম্পাদকের ঘরে। উপেনবাবু তখনো আসেননি। আমিই উপনেতা। একটা গল্প এনেছি বিচিত্রার জন্যে হাতে একটি লেখা, ছেলেটি হাত বাড়ালো।

প্রখর একটা ক্ষিপ্রতা তার চোখে-মুখে, যেন বুদ্ধির সম্পীপ্তি। গল্প যেন সে এখুনি শেষ করেছে আর যদি কাল বিলম্ব না করে এখুনি ছেপে দেওয়া যায় তা হলেই যেন ভালো হয়। ‘এই রইল-‘

ভঙ্গিতে এতটুকু কুন্ঠা বা কাকুতি নেই। মনোনীত হবে কি না হবে সে সম্বন্ধে এতটুকু দ্বন্দ্ব নেই। আবার কবে আসবে ফলাফল জানতে কৌতূহল নেই একরতি। যেন এলুম, লিখলুম আর জয় করলুম-এমনি একটা দিব্য ভাব। ……… ……

লেখাটা অদ্ভূত ভালো লাগল। উপেনবাবুও পছন্দ করলেন। গল্প ছাপা হল “বিচিত্রা” য়। একটি লেখাতেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব অভ্যর্থিত হল। …

এরূপ আকস্মিকভাবে আবির্ভাব হয়েছিল মাইকেল মধুসুদন দত্তের ‘রত্নাবলী’ নাটক দেখে তিনি বাঙলায় ভালো নাটকের অভাববোধ করে গৌরদাসবাবুকে বলেছিলেন তিনি ভালো নাটক লিখে দেবেন। এবং কয়েকদিনের মধ্যে ‘শর্মিষ্ঠা’ লিখে দিয়েছিলেন। ছোট গল্পকার গী দ্য মোপাসাঁ একটি গল্প ‘ব্যুলে না সুইফ’ লিখে বিখ্যাত হয়েছিলেন। এছাড়া রাশিয়ান লেখক ম্যাকসিম গোর্কি কোনো প্রস্তুতি ছাড়া “মাকার চুন্দ্রা’ গল্পটি লিখেই খ্যাতি অর্জন করে তাঁর সাহিত্যজীবন শুরু করেছিলেন।

 

জীবন: কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান পূর্ব

 

প্রথম গল্প প্রকাশ হওয়ার ছয় মাস পর ১৯২৯ সালের জুন মাসে বিচিত্রায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় গল্প ‘নেকী’ প্রকাশিত হয়, এর দু মাস পর আগস্টে তৃতীয় গল্প ‘ব্যথার পূজা’ প্রকাশিত হয়। এ বছরই তিনি উপন্যাস রচনা শুরু করেন। এ সময় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ক্লাসের পড়ায় অমনোযোগী হয়ে ওঠেন। দেশী বিদেশী রাশি রাশি বই তাঁর পাঠ্য বিষয় হয়ে ওঠে।

সঙ্গত কারণে বি. এসসি. পাস করা তার হয় না। এ সময় তাঁর বড়দা কৈফিয়ৎ তলব করেন এবং অর্থ পাঠানো বন্ধ করে দেন। এমত অবস্থায় তাঁকে নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়তে হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ভেবেছিলেন ত্রিশ বছর বয়স হওয়ার পর নিশ্চিন্ত মনে সাহিত্যচর্চার বাস্তব ব্যবস্থা ঠিক করে তিনি সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করবেন।

কিন্তু ‘অতসী মামী’ প্রকাশ হওয়ার পর তাঁর সব উলোটপালট হয়ে গেলো। তাঁর বড়দা বলেছিলেন বি.এসসি. পাস করে তারপর যত খুশি লেখ। কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সে দিকে যাওয়ার আর সুযোগ নেই, তিনি লিখেই জীবন কাটাবেন বলে মনস্থির করেন। এ সময় তাঁকে তাঁর পিতার অনুরোধে তাঁর ছোট ভাই কিছু কিছু অর্থ সাহায্য করতেন।

১৯৩২(কেউ কেউ বলেন ১৯৩০ সাল থেকে, কিন্তু দুবার বিএসসি’র রেজাল্ট বের হওয়া পর্যন্ত ১৯৩২ সাল হওয়াই স্বাভাবিক।) সাল থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেস জীবন শুরু হয়। এ সময় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরো পরিবার মুঙ্গেরে চলে যায়। ১৯৩৪ সালে মুঙ্গেরে ভূমিকম্প হলে পুরো শহর বিধ্বস্ত হলে কাগজে খবর পড়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছুটে যান মুঙ্গেরে। সেখানে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খুঁজে ফেরেন পরিবারের আপনজনদের।

এর মধ্যদিয়ে পরিবারের প্রতি তাঁর দায়িত্বশীলতা এবং মমত্ববোধ প্রকাশ পায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবার আবার কলকাতায় ফিরে আসে এবং তাঁর দুঃসহ মেস জীবনের সমাপ্তি ঘটে। তবে সাহিত্য চর্চা করার কারণে তাঁর জীবন সুখের ছিল না কখনোই। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ব্যবহারে নম্র কিন্তু ব্যক্তিত্বে কঠোর। সকল বিষয়ে সজাগ, বুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টি এবং একটা রহস্যপুর্ণ সুদৃঢ়তা।

শিল্প সর্জন তার সহজাত ধর্ম এবং এ বিষয়ে তার দাম্ভিকতার বা আত্মপ্রেমের অস্বস্তিকর প্রকাশ নেই। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন মুখচোরা স্বভাবের, প্রশংসা গ্রহণে ছিল তার অপরিসীম কুণ্ঠা আর সলজ্জ ভঙ্গি। তাঁর সম্পর্কে ভবানী মুখোপাধ্যায় বলেছেন।

“দুঃসাহসী, বলিষ্ঠ, দুর্দম ইত্যাদি নানা বিশ্লেষণ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু এ কথাও মনে রাখতে হবে যে লোকটি সেই ‘অতসী মামী’র যুগের মুখচোরা কলেজের তরুণ ছাত্রই রয়ে গেছে। ১৮

ভবানী মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধে আরো পাওয়া যায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সে সময় কলকাতার যান্ত্রিক সভ্যতা সম্পর্কে অনেকটাই অজ্ঞ ছিলেন তাই অনেক সময় শিশুসুলভ প্রশ্ন করতেন আর সকলের অট্টহাসিতে ব্রিত হতেন। সকল সময় তাঁর মধ্যে একটি ব্যস্ততা লক্ষ্য করা যেত। হঠাৎ এসে তিনি আড্ডায় হাজির হতেন, আবার হঠাৎই চলে যেতেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাজি ধরার ধরন ছিল। বেপরোয়া। একবার বাজি ধরে তিনি লিখতে শুরু করলেন। এরকম ১৯৩৫ সালে সজনীকান্ত দাস, পরিমল গোস্বামীর সঙ্গে রাত জেগে টাকা বাজি রেখে তাস খেলেছিলেন কয়েকদিন। তিনি অসতর্কভাবে বেপরোয়া বাজি ধরতেন আর প্রতিদিন হেরে যেতেন।

১৯৩৫ সালে গ্রন্থাকারে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জননী’ উপন্যাস প্রকাশিত হয়। ‘জননী’ নিয়ে তাঁকে অনেক দিন ঘুরতে হয়েছিল। এ বছর তাঁর দুটি উপন্যাস ‘জননী’ ও ‘দিবারাত্রির কাব্য’ এবং একটি গল্পসংকলন ‘অতসী মামী’ প্রকাশিত হয়। এ বছরই তিনি মৃগী রোগে আক্রান্ত হন।

সাহিত্য সাধনার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম, শরীরের প্রতি অযত্ন-অবহেলা, আপনজনদের বিশেষ, মুঙ্গেরের ভূমিকম্পের ভয়াবহতা, দুটি ভাইঝির মৃত্যু—সবকিছু মিলে মানসিক চাপে তিনি মৃগী আক্রান্ত হন। বলে আশংকা করা হয়। এ রোগের হাত থেকে মুক্তির জন্য তিনি নিজেই ডাক্তারি বই ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করেন। এতে কোনো ফল না হওয়ায় ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে জোড়াতালি দেওয়া চিকিৎসা শুরু করেন।

বিশ্বসাহিত্যের আরেকজন লেখক ডল্টয়েভস্কি মুর্গী আক্রান্ত ছিলেন। ডল্টয়েভস্কি একে অতিলৌকিক, পবিত্র ব্যাধিরূপে আখ্যায়িত করেছেন। তবে মনে হয় এই অসুখের কাছে এই দুই শক্তিমান লেখকই ঋণী। এ অসুখ তাদের সাহিত্য জীবনে স্থিতি এনে দিয়েছে।

১৯৩৬ সালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিনটি উপন্যাস প্রকাশিত হয় ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘জীবনের জটিলতা’। সাহিত্য তাঁর জীবনীশক্তি। অসুখ সত্ত্বেও তিনি লেখনি চালিয়েছেন, কোনো আপোস করেন নি। ১৩৪২ সালের ২৭শে মাঘ জনৈক ভদ্রমহিলার কাছে চিঠিতে তিনি লিখেছেন:

“বই তো মলাট নয়, কাগজ নয়, সাজানো সীসার অক্ষরের ছাপ নয়, চিন্তা ভাব অনুভূতি আবেগ প্রভৃতির সমন্বয় করা একটা ডালি।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরাধ্য মানুষ। তিনি তাঁর দৃষ্টি দিয়ে মানুষের ভেতর-বাহির সম্পূর্ণ দেখে ফেলেন। এই চিঠিতে তিনি আরো বলেছেন মেয়ে পুরুষ অনেকের সঙ্গেই তাঁর পরিচয় হয় সকলকেই প্রায় তাঁর মনে হয় ছাঁচে ঢালা অবোধ, অগভীর, অনাবশ্যক, অর্থহীন, রক্তমাংসের বিকৃত যন্ত্র। তিনি প্রতিভার প্রতিষ্ঠা চেয়েছেন। শুধু নিজের ক্ষেত্রে নয়, অন্যের ক্ষেত্রেও তিনি সহমর্মী। ওই চিঠিতেই তিনি বলেছেন:

যদি অধিকার দেন আপনাকে আমি সাহিত্য ক্ষেত্রে টেনে আনব। আপনি শুধু লিখবেন বাকী ভার আমার। ২০

তবে এই ভদ্রমহিলা পরবর্তীতে কবি-লেখক কিছু হন নি। পরিবারের নিষ্ঠুরতার কারণে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৩৭ সালে বঙ্গশ্রী পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক পদে চাকরি গ্রহণ করেন। এখানেও তাঁর স্বতন্ত্র লক্ষ্য করা যায়। চাকরির আবেদন পত্রটি ছিল বাংলায়, যা সে সময় কেউ কল্পনাও করতে পারত না। আবার তিনি মানবিকভাবে দরখাস্তের সঙ্গে লিখেছিলেন।

 

জীবন: কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান পূর্ব

 

“পরিশেষে নিবেদন এই, আমি অবগত আছি শ্রী পরিমল গোস্বামী এই পদটির জন্য আবেদন করিবেন। আমার চেয়েও তাঁহার চাকুরির প্রয়োজন বেশি। মহাশয় যদি ইতিমধ্যে তাঁহার সম্বন্ধে অনুকূল বিবেচনা করিয়া থাকেন তবে অনুগ্রহপূর্বক আমার এই আবেদন প্রত্যাহার করা হইল বলিয়া ধরিয়া লইবেন। কারণ, শ্রী পরিমল গোস্বামী মহাশয়ের সহিত আমি প্রতিযোগিতা করিতে ইচ্ছুক নহি । ২১

এই দরখাস্তে তিনি আরো জানিয়েছেন, তিনি কয়েকমাস ‘নবারুণ’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। সুশীল রায় জানিয়েছেন এ সময় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বেশি সময় পত্রিকা অফিসে থাকতেন না। অল্প সময়ের জন্য এসে কাগজপত্র উল্টে দেখতেন, তারপর পত্রিকার মালিক সুশীল রায়ের নাদার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে চলে যেতেন।

সম্পাদকীয় গাম্ভীর্য নিয়ে সম্পাদকের কাজ করতে তাঁকে খুব একটা দেখা যেত না। ‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকায় তিনি দুবছর কাজ করেছেন। দশটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত প্রবোধ কুমার নামে বাধা চাকরি করে এ সময় তাঁর সাহিত্য চর্চা তেমন হয় নি। শুধু “অমৃতস্য পুত্রাঃ’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৩৮ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। চাকরি করার সময় তিনি মানুষকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ বেশি পান। অফিসে কেউ এলে কলম বন্ধ করে তিনি তাকে নিরীক্ষণ করতেন। পত্রিকার মালিক সচ্চিদানন্দবাবু এলেও এর ব্যতিক্রম হতো না।

পরবর্তীতে এই চরিত্র নিয়ে তিনি “শহরতলী’র সত্যপ্রিয় চরিত্রটি অংকন করেন। এ সময় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যুগী রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। জোড়াতালি দেওয়া চিকিৎসার পরিবর্তে ভালোভাবে চিকিৎসা করে রোগ সারানোর অভিপ্রায়ে বড়দাদার কাছে চিঠি লেখেন। অসুস্থ সারানোর জন্য তিনি এক বছর সময় ব্যয় করতে চান। তিনি তাঁর দাদাকে জানান International fame এর জন্য যখন নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন তখন এই অসুখ সব গোলমাল করে দিয়েছে। তিনি বলেন, এভাবে বেঁচে থাকতেও তাঁর ইচ্ছে নেই:

আশা করি আপনি ভাবিয়া দেখিবেন যে, আমার সমস্ত ভাবষ্যৎ এই অসুখ হইতে আরোগ্য লাভের উপর নির্ভর করিতেছে। আমার ইহা সাধারণ অসুখ নহে, ইহার প্রকৃত চিকিৎসার জন্য ডাক্তার ওষুধ প্রভৃতির খরচ ছাড়াও বহুবিধ খরচ দরকার। আপনার পক্ষে মাসিক একশত টাকা দেওয়া কিছুই নহে, কিন্তু ইহা আমার জীবন- মরণ সমস্যা। ২২

বলাবাহুল্য তাঁর বড়দাদা তাঁকে কোনো সাহায্য করেন নি। সচ্চিদানন্দবাবুর বাগান বাড়িতে সাহিত্য আলোচনায় সচ্চিদানন্দবাবুর প্রবন্ধের সমালোচনা করায় তার সঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোমালিন্য হয়। দুবছর চাকরি করে মানিক বন্দ্যেপাধ্যায় ‘বঙ্গশ্রী’র চাকরি ছেড়ে দেন। তাঁর মৃগী রোগ থেকে উপশমের জন্য ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় তাঁকে বিবাহের পরামর্শ দেন।

১৯৩৮ সালের ১১ই মে ময়মনসিংহের গভর্নমেন্ট শুরু ট্রেনিং বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের তৃতীয় কন্যা কমলাদেবীর সঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের পরও তাঁর এ রোগ সারে নি, হয়তো মানসিক চাপের পরিবর্তন হয় নি। যদিও ভয়েভস্কির দ্বিতীয় বিয়ের পর মৃগী রোগ ভালো হয়ে গিয়েছিল। মানিকের মানসিক চাপ পারিবারিক।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যৌথ পরিবারে সুখ-শান্তির অভাব ছিল। এর জন্য তিনি তাঁর বড়দাদাকে অনেকাংশে দায়ি করেছেন। ১৯৪৩ সালের ২৩শে নভেম্বর চিঠিতে তিনি এ বিষয়ে সাদাকে সরাসরি লিখেছেন। এই চিঠির মধ্য দিয়ে মানিকের ব্যক্তিমনের প্রতিফলন ঘটেছে।

“বড়ই দুঃখের বিষয় যে আপনি অনেক বড় বড় থিয়োরি জানেন এবং বড় বড় উদ্দেশ্য লইরা কাজ করেন কিন্তু সংসারের সহজ সরল সত্যগুলি সম্বন্ধে কিছুই জানেন না। ফল না খাইয়াও বাবা কিছুদিন বাঁচিতে পারিবেন কিন্তু এই বয়সে রাত্রে না ঘুমাইয়া বেশীদিন বাঁচিবেন না। [… …… চিঠিতে নেকামিপূর্ণ মন রাখা কথা লিখিয়া দশজনের কাছে আপনার নিন্দা করা কোন দিন আমার যারা হইয়া ওঠে নাই। আপনার সম্বন্ধে আমার কোন নালিশ থাকিলে সোজাসুজি আপনাকেই জানাইয়াছি। [… …] অবশ্য অর্থোপার্জনের দিকে আমি বিশেষ সুবিধা করিতে পারি নাই, কিন্তু গরীব হওয়াটা অপরাধ নয়।

তাছাড়া, আমার অসুখটা আমার অক্ষমতার জন্য হয় নাই। [… ….] আপনি সম্প্রতি বাবার কাছে যে দুইখানি পত্র লিখিয়াছেন, আমি … তাহা পড়িয়াছি। এই জন্যই আপনাকে স্পষ্টভাবে কয়েকটি কথা লিখিতেছি, নতুবা লিখিতাম না। অকারণে মানুষের মনে কষ্ট দেওয়া আমি পাপ মনে করি। …….. আপনি কোনদিন আমাদের ভাই বলিয়া কাছে টানেন নাই, স্নেহ করেন নাই, বরং ঘৃণা, অবজ্ঞা ও অবহেলা করিয়াছেন।

[… ….। আমরা সকলে গেঁয়ো ছিলাম, আপনি অনেক উঁচুতে উঠিয়া গিয়াছেন এবং আপনার শিক্ষা দীক্ষা এবং শিক্ষিত ও মার্জিত সমাজে নিশিতেছিলেন তাহার প্রভাব আপনাকে বদলাইয়া দিয়াছে। [… ….] ছেলেবেলা মেজদাদার (সন্তোষ) কাছে আমি যেরূপ শাসন ও মারধোর পাইয়াছি খুব (কম) ছেলেই তাহা পায়। আজ পর্যন্ত মেজদাদা বাবাকে বা আমাদেরকে কোনরূপ আর্থিক সাহায্য করিয়াছেন কি না সন্দেহ। [… […] কিন্তু আজ প্রয়োজন উপস্থিত হইলে তার জন্য আমি একটি হাত কাটিয়া দিতে পারি।

মেজদা একবার এখানে আসিলে বাড়ীতে আনন্দের সাড়া পড়িয়া যায়। ….. ….] আপনি যদি কোন দিন একটি পয়সা সাহায্য না করিয়া সকলকে একটু স্নেহ মমতা দিতেন আমাদের সংসারে এরূপ দারুণ অশান্তির সৃষ্টি হইত না। [… ….] মা’র ভাবপ্রবণ মাতৃস্নেহকে প্রশ্রয় না দিয়া তাঁকে কষ্ট দিবার কি অধিকার আপনার আছে? ……. …] আপনার কাছে সাহায্য লইতে হইয়াছে ভিক্ষুকের মত, ছোটভাই হিসাবে যে টাকার দাবী আছে আপনি কখনও তাহা স্বীকার করেন নাই।

প্রত্যেকের আত্মমর্যাদাজ্ঞান নষ্ট করিয়া দিয়াছেন। !… […] ভাল হোক মন্দ হোক খাঁটি বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত সংসারের নিয়মকানুন রীতিনীতি দিয়া সংসারটি অশুভাবে বাঁধা ছিল, সকলের সংস্কার এবং বিশ্বাসও তাহার উপযোগী ছিল। আপনিই প্রথম ইহা ভাঙ্গিতে আরম্ভ করেন। ২০

১৯৩৮ সাল থেকে তাঁর জীবন আরো জটিল হয়ে পরে। ১৯৩৮ সালের দুটি চিঠিতে পাওয়া যায় গল্পের জন্য তিনি পারিশ্রমিক বাড়িয়েছেন। তিনি একটি চিঠিতে লিখেছেন টাকা পাওয়ার পর তিনি গল্প পাঠিয়ে দেবেন। অন্য চিঠিতে লিখেছেন আজকাল গল্পের জন্য তিনি বেশি পারিশ্রমিক দাবি করেন। এ দুটি চিঠি ১৯৩৮ সালের ২০শে আগস্ট লেখা। তিনি ১৯৩৯ সালের ১লা জানুয়ারি ‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকার চাকরি ছেড়ে দেন এবং তিনি ও তাঁর ছোট ভাই সুবোধ বন্দ্যোপাধ্যায় দুজন মিলে ছাপাখানা ও পুস্তক ব্যবসার জন্য প্রেস স্থাপন করেন।

 

জীবন: কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান পূর্ব

 

মেশিন কেনার জন্য বড়দাদার কাছে ছয়শত টাকা ধার চাইলে তিনি দেন না। এ সময় তাঁর প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করে। এ বছরই তাঁর ‘শহরতলী’ প্রকাশিত হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গি রক্তগত তা ‘শহরতলী’তে স্পষ্ট হয়। শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং এর প্রভাবজাত সামাজিক অস্থিতিশীলতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। পরবর্তীতে তিনি ন্যাশনাল ওয়ার ফ্রন্টে বেঙ্গল দপ্তরে পাবলিসিটি অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে চাকরি পান।

এইখানে কাজ করতে করতে তাঁর মধ্যে কমিউনিজমের প্রতি আস্থা বেড়ে যায়। যুদ্ধের সময়ের প্রতিটি ঘটনা, মানুষের মূল্যবোধ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যবেক্ষণ করেন। এ প্রেক্ষিতে তাঁর ‘প্রতিবিম্ব’ প্রকাশিত হয়। ১৯৪২ সালের ৮ই মার্চ কমিউনিস্টকর্মী তরুণ লেখক সোমেন চন্দ ঢাকায় জাপান সমর্থকদের হাতে নিহত হন। এর বিরুদ্ধে কলকাতার সাহিত্যিকরা নিন্দায় সোচ্চার হয়ে ওঠেন। এ সময় জন্মলাভ করে ‘ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা বেতারের যুদ্ধবিষয়ক প্রচার ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন। কমিউনিস্টদের সমর্থনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প ‘হ্যাংলা’ প্রকাশিত হয়। ১৯৪৩ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘে যোগ দেন। এ বছরই ভয়াবহতম দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা এবং গ্রাম-গ্রামান্তর ঘুরে মন্বন্তরের ভয়াবহ অমানবিকরূপ প্রত্যক্ষ করেন।

এ বছরই তিনি ন্যাশনাল ওয়ার ফ্রন্টের চাকরি ছেড়ে দেন এবং সাহিত্যকর্মই তাঁর জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হয়। ১৯৪৪ সালে তিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দান করেন।

Leave a Comment