আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ এখানে এখন । যা সৈয়দ শামসুল হকের সামাজিক কাব্যনাটক এর অন্তর্গত।
এখানে এখন
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর সময়ের সমাজ-পরিপ্রেক্ষিত কাব্যনাট্যের মাধ্যমে রূপায়িত করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই রচিত হয়েছে সৈয়দ শামসুল হকের এখানে এখন (১৯৮১)। এটি সামাজিক সমস্যা অবলম্বনে রচিত নিরীক্ষাধর্মী উপন্যাস কালধর্ম (১৯৮৯)-এর কাহিনি অবলম্বনে রচিত হয়েছে।
বস্তুত, একই চরিত্র ও বিষয় নিয়ে সাহিত্যের দু-দুটি মাধ্যমে কাজ করার ইচ্ছা থেকে বোঝা যায় – সমকালীন বিপর্যস্ত সময়-সমাজ লেখক সৈয়দ শামসুল হকের বোধ ও চেতনায় কতখানি নাড়া দিয়েছিল।
পঁচাত্তরে জাতির জনকের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশের সর্বস্তরে যে নৈরাজ্য নেমে আসে, মূল্যবোধের অবক্ষয়, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস-নিপীড়ন, ছদ্ম-গণতান্ত্রিক শাসনপ্রক্রিয়া এবং আর্থ-সামাজিক নৈরাজ্য সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে, তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সাহিত্য- আঙ্গিকে সৈয়দ শামসুল হক সোচ্চার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। এ-সময়ে তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির প্রবণতা প্রত্যক্ষ করে জনৈক সমালোচক নিম্নরূপ মন্তব্য করেছিলেন :
আশির দশক কোনো মননজীবী আর লেখকের জন্য সুখের সময় ছিল না। লেখনী, বাক্ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা তখন খর্ব। এই সময়ে বাঙালিত্বের সাধনা, চর্চা, অসাম্প্রদায়িকতার কথা উচ্চকণ্ঠে বলা যেত না। বাঙালি সত্তায়ও আচ্ছাদন পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত ছাত্রসমাজের দুর্বিনীত কর্ম ও প্রবণতার ফলে জনজীবন ও গণতান্ত্রিক ছাত্রসমাজও বিপর্যন্ত হয়ে পড়েছিল। সৈয়দ হক সমালোচনায় অদম্য হয়ে উঠেছিলেন।’
স্বাধীনতার পূর্বে বিদেশি-বিজাতি-বিভাষী শাসককর্তৃক বাঙালি বার বার শাসিত ও শোষিত হয়েছে, স্বাধীনতার পরবর্তীকালে স্বজাতীয়রাই সে শোষণ-নিপীড়নের ধারা অব্যাহত রেখে সাধারণ জনগণকে নানা উপায়ে ব্যবহার করেছেন, প্রতারিত করেছেন। নাট্যকার আলোচ্য নাটকের মাধ্যমে বলতে চেয়েছেন শোষকের কোনো জাতপাত নেই, সর্বকালে, সর্বযুগে, সর্বসমাজে তাদের বৈশিষ্ট্য এক ও অভিন্ন। নাটকে তিনি বিভিন্ন শ্রেণি- চরিত্রের আচরণের মধ্যদিয়ে এই বিষয়টি জ্ঞাপন করতে চেয়েছেন। একজন সমালোচকের মন্তব্য প্রসঙ্গত স্মর্তব্য :
এখানে এখন কাব্যনাটকে সৈয়দ শামসুল হক স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক শ্রেণীবৈষম্য শৈল্পিক সুষমায় উপস্থাপন করেছেন। […] মূলত এ কাব্যনাটক সমকালীন সমাজ জীবনের প্রামাণ্যচিত্র। আধুনিক মানব জীবনের সমস্যাসংকুল বন্ধুর কণ্টকাকীর্ণ পথের বিভিন্ন বাঁকে বাঁকে যেসব ঘটনা ঘটে এখানে এখন কাব্যনাটকে তা উঠে এসেছে।
কাব্যনাটোর নামকরণ এখানে এখন থেকেই বোঝা যায়, লেখক এ-নাটকে সমকালীন বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতার ছবি আঁকতে চেয়েছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, সেই অস্থির সময়ে মানুষ বিবেকবুদ্ধি বিস্মৃত হয়ে উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে কীভাবে পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলছে, স্বার্থের টানে ভালো-মন্দ, উচিত- অনুচিতের বোধ বিসর্জন দিয়ে ক্রমাগত উপরে ওঠার চেষ্টা করছে। নাটকের ভূমিকাংশে তিনি স্বয়ং এ-প্রসঙ্গে বলেছেন :
এ নাটকের চাবি হচ্ছে একটি অতি পরিচিত শব্দ, চার অক্ষরের, অভিধানে শব্দটির যতগুলো অর্থ ও প্রয়োগক্ষেত্র লেখা আছে তা দিয়ে আজ এই বাংলাদেশে একে আর চেনা যাবে না; শব্দটির নতুন একটি অভিধা আমরা রচনা করে ফেলেছি স্বাধীনতার বৎসরকালের ভেতরেই; বড় ভয়াবহ, নির্মম ও সর্বগ্রাসী সেই শব্দ – ‘ব্যবহার’।
এই নাটকেরই একটি চরিত্র উচ্চারণ করবে, ‘ঈশ্বর, ডলার কিংবা প্রেম-ভালোবাসা, প্রসঙ্গটা যাই হোক / মানুষেরা ব্যবহার ব্যবহার করে আর ব্যবহৃত ব্যবহৃত হয়।’ বস্তুত কি তাই নয়? এখানে এখন? বস্তুত কি বাংলাদেশ এখন বিভক্ত নয় দুটি শ্রেণীতে? – ব্যবহর্তা আর ব্যবহৃত। এবং বস্তুত কি ব্যবহৃত মানুষেরাই প্রায় সমগ্র জনগোষ্ঠী নয়? এবং ব্যবহর্তা মাত্র কতিপয়? আমরা কি স্বাধীনতা এ কারণেই চেয়েছিলাম এবং এনেছিলাম, ভিন্ন দেশী ভিন্নভাষী ব্যবহতাকে সরিয়ে নিজেরাই তা হতে?
এই নাটকেরই সূচনায় থাকবে এ রকম একটি সংবাদ যে, মানুষকে মানুষের মুখ চিনতে হলে / অন্য কোনো আলোকের দরকার হয় / মানুষকে মানুষেরই স্বর শুনতে হলে / কোনো এক প্রলয়ের দরকার হয়।’ আমার আশা এই, রঙ্গমঞ্চ সেই আলোক সরবরাহ করবে এবং অভিনয় সেই প্রলয় ডেকে আনবে। এবং তখনি আমরা বিকটভাবে জেনে যাব এ নাটক রফিকের নয়, বা কালো সিগারেটসেবী নামহীন ব্যক্তিটি নয় ; এ নাটক আমাদেরই, আমরা যারা ‘ব্যবহার’ শব্দটির নতুন অভিধা এনেছি।’
এখানে এখন নাটকটি তাই হয়ে উঠেছে সমকালীন সমাজের প্রতিরূপ। নাটকের চরিত্র-পাত্রের গতিবিধি ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াসূত্রে যে বক্তব্যটি সত্যস্বরূপে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে সেটি হচ্ছে – সমকালীন সমাজে ব্যবহার – আর ব্যবহর্তার চক্রে সকলেই কম-বেশি জড়িত। ফলে নাটকের মূলসুরের সঙ্গে পাঠক-দর্শক অনায়াসেই নিজেকে মেলাতে পেরেছে। নাটকে সমকালীন সমস্যা ও সংকটকে উপস্থাপন করার এ আকাঙ্ক্ষা প্রত্যক্ষ করে কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন মন্তব্য করেছেন :
তিনি সময়কে ধরেছেন – সময়ের জীবনকে ক্যানভাসে এঁকেছেন সব্যসাচী লেখকের কলমে আশ্চর্য দক্ষতায় উঠে এসেছে সমকালের বাংলাদেশ। তাঁর উঠে আসার শিল্পমাধ্যম কাব্যনাটক।’
এখানে এখন কাব্যনাটকটির মূল কাহিনি খুব একটা বিস্তৃত পরিসরের নয়। নাটকটি সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে রচিত হলেও নাট্যকার কাব্যনাট্যের বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে সামাজিক সমস্যার বিস্তৃত বিবরণ এড়িয়ে গেছেন ; বরং নাট্যঘটনা ও চরিত্রের ক্রিয়াকলাপ ও সংলাপের মাধ্যমে পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশের সামাজিক অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক নির্মম বাস্তবতার নাট্যিক প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।
এ নাটকের প্রধান চারটি চরিত্র – রফিক, নাসিরুদ্দিন, সুলতানা ও মিনতির যাপিত জীবন, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, হতাশা-ব্যর্থতা, পরস্পরকে অতিক্রমের দুর্বার মোহ প্রভৃতির মধ্য দিয়ে মূলত সমকালীন বাংলাদেশের বিনষ্টপ্রায় সময় ও সমাজের চিত্রই উপস্থাপিত হয়েছে। নাটকে দেখা যায়, রফিক অবিবাহিত একজন উদীয়মান ব্যবসায়ী। ছাত্রজীবনের সহপাঠী সুলতানা ও তাঁর স্বামী গাফফারের ফ্ল্যাটে সাবলেট নিয়ে সে বসবাস করে। অপর চরিত্র নাসিরুদ্দিন সমাজজীবনে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত। আর্ন্তজাতিক পর্যায় পর্যন্ত তার ব্যবসা বিস্তৃত।
বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও সে অন্য নারীতে আসক্ত, মদ্যপ। রফিকের সঙ্গে সে বারবিলাসিনী মিনতিকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। রফিক ও নাসিরুদ্দিনের মধ্যে তুমুল ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও বাইরে তারা বন্ধুত্বের মুখোশ পরে থাকে। একদিকে যেমন তারা ব্যবসায়িক স্বার্থে সুদ, ঘুষ, কালোবাজারি, টেন্ডারবাজি করে, অপরদিকে সামাজিকভাবে ভালোমানুষির মুখোশ পরে গলায় ঝুলিয়ে রাখে কোরানের মিনিয়েচার সংবলিত লকেট, কথায় কথায় নাম নেয় খাজাবাবার।
তবে রফিক যেহেতু অপেক্ষাকৃত কমবয়সী উদীয়মান ব্যবসায়ী; তাই নাটকে তাই দেখা যায়, সে এখনো পুরোপুরি তার চরিত্র থেকে মানবুদ্ধি বিসর্জন দিতে পারেনি। কিন্তু ঝানু ব্যবসায়ী নাসিরুদ্দিনকে টেক্কা দিয়ে অবৈধপন্থায় মানিকগঞ্জ টু ঢাকা রেললাইনের টেন্ডার বাগিয়ে নেয়ার মাধ্যমে সে-ও আস্তে-সুস্থে অন্ধকারের দিকে ধাবিত হতে শুরু করেছে। ফলে নাট্যঘটনার শেষে দেখা যায়, সে নাসিরের মতো পুরোপুরি কালো পোশাকে আবৃত।
বস্তুত, রফিক চরিত্র বিবেক ও মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে কীভাবে বিনষ্টিকে আলিঙ্গন করেছে তা-ই এ-নাটকের কাহিনি; এর সমান্তরাল শাখা কাহিনি হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে মিনতির কাহিনি, যে দারিদ্র্যের কশাঘাতে বাধ্য হয়ে গ্রামীণজীবন ছেড়ে শহরে এসে স্বভাবস্বৈরিণী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, উচ্চমধ্যবিত্ত চরিত্র সুলতানা-গাফফারের অসফল দাম্পত্যের কাহিনি প্রমাণ করেছে শহুরে শিক্ষিত নারীও পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক বলয়ে কতটা অসহায়। নাট্যকার অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে এই তিনটি টুকরো টুকরো গল্পকে একইসূত্রে বদ্ধ করে সমকালীন বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতাকে উপস্থাপন করেছেন আলোচ্য নাটকে।
এখানে এখন নাটকে উপস্থাপিত সমকালীন সময় ও সমাজকে উপলব্ধি করতে হলে আমাদের আশির দশকের বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচনা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে যে, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকেই নবগঠিত দেশে অরাজকতা শুরু হয়। একাত্তরের দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি জান্তার হাত থেকে দেশ মুক্ত হতে না হতেই নতুন করে শুরু হয় লুটপাট, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই-রাহাজানি, কালোবাজারি-মজুতদারি, হত্যা-লুণ্ঠনের মতো ভয়াবহ ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি।
এক্ষেত্রে বরাবরের মতো সমাজের সুবিধাবাদী, স্বার্থান্বেষী রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী তো ছিলই; কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিত্রবাহিনী যেমন পালন করেছে বৈরী ভূমিকা, ঠিক তেমনি কিছু মুক্তিযোদ্ধাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে লুটপাটে, অনৈতিক সুবিধাবাদিতায়। এমন ঘটনার বিবরণ ড. আনিসুজ্জামান তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনায়ও লিপিবদ্ধ করেছেন :
খুলনায় নতুন জেলাপ্রশাসক কামাল সিদ্দিকীর সঙ্গে দেখা হলে দুটি অভিযোগ শুনতে পেলাম। একটি মেজর জলিল ও তাঁর মুষ্টিমেয় সহযোদ্ধার বিরুদ্ধে অবাঙালিদের সম্পত্তি লুটপাট ও অবাঙালি মেয়েদের প্রতি অত্যাচারের, অপরটি ভারতীয় সেনাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সম্পদ অপহরণের।
ফলে নতুন স্বপ্ন ও বিপুলতর সম্ভাবনার আশা নিয়ে স্বদেশ প্রত্যাগত বঙ্গবন্ধুকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের জবানিতে ড. আনিসুজ্জামান অস্থির এ সময়ের চিত্র তুলে ধরে আরও লিখেছেন :
দেশের সমস্যার বিপুলতা, পুনর্বাসন প্রয়াসের প্রাথমিক সাফল্য, বেআইনি অস্ত্রের ভয়, দেশের মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব অবস্থার বৈপরীত্য, প্রশাসন ও দলের মধ্যে তাঁর অনভিপ্রেত কাজ […] আমি নিজেই দেখলাম, অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে কতোজন, নবাবপুর ঠাঠারিবাজারে দোকানপাট লুট হচ্ছে – পুলিশের সাহায্য চেয়েও পাওয়া যাচ্ছে না।
অপরদিকে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নানান উন্নয়নমুখী উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও একাত্তর-পরবর্তী সময়ে বিশেষত, চুয়াত্তরের দিকে দেশের আর্থ-রাজনৈতিক অবস্থা চরমে পৌছায়। এসময়ে স্বার্থান্বেষী মহলের উচ্চাভিলাষ, নবগঠিত রাষ্ট্রের অনভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ব্যবসায়ীদের কালোবাজারি, মজুতদারী, সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র দেশকে করে তোলে সংকটগ্রস্ত, নিয়ে যায় দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে। দেশের এই পুরবস্থায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন জনগণের প্রতি উদারহস্ত ও সংবেদনশীল।
এক আলাপচারিতায় রাষ্ট্রপতি হয়েও সাধারণ জনগণের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা প্রসঙ্গে তিনি বলেন : ‘লোককে খেতে দিতে পারি না, পরতে দিতে পারি না, দেখাও যদি না দিতে পারি, তাহলে আমার আর থাকলো কী ? […] আমার চারপাশে চোর-ডাকাত ভিড় করে আছে। আস্থা রাখতে পারি এমন সৎ লোক চাই কাজের জন্য।
[…] চোরদের থেকে রেহাই পেতে চাই।” তৎকালীন সরকারের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কন্ঠেও বার বার ধ্বনিত হয়েছে এই অস্থির সময়ের অসহনীয় ও অসহায় আক্ষেপ। এই অপপরিস্থিতিতে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী হয়েও তিনি বিপন্ন বোধ করেছেন। ড. আনিসুজ্জামানের স্মৃতিকথায় এই বিষয়টি উপস্থাপিত হয়েছে নিম্নরূপে :
টেবিলের ওপরে রাখা একটা ফাইলের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, এটা তাঁর জন্যে এক উভয়-সংকট। বিদেশ থেকে সার আমদানি করতে হবে। নানা কারণে তাঁর মতে, অকারণেই – উদ্যোগ নিতে দেরি হয়ে গেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। এখন প্রস্তাব এসেছে, আর্ন্তজাতিক টেন্ডার আহবান না করেই, গত বছর যারা সার সরবরাহ করেছিল, সেই প্রতিষ্ঠানকেই কার্যাদেশ দেওয়া হোক।
তিনি বললেন, প্রস্তাবে সম্মত হওয়া মানে আমার পক্ষে নিয়মভঙ্গ করা, সম্ভবত দুর্নীতিতে সাহায্য করা; আর টেন্ডার আহ্বান করতে বলা মানে সময়মতো সার-সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়া। যেটাই করি, সেটাই অসংগত হবে। এইভাবে দেশ চালানো যায় না। […] বিভিন্ন দেশ ও বিশ্বব্যাংকের কাছে তিনি খাদ্য সাহায্য চেয়েছেন, বন্যা-নিয়ন্ত্রণে ও অধিকতর সার- উৎপাদনে অবকাঠামোর উন্নয়নের জন্যে তাদের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
এই মুহূর্তে খাদ্যপরিস্থিতি নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত। সরকারি লঙ্গরখানা খোলা হয়ে থাকলেও মানুষ অনাহারে মরছে। আইনশৃঙ্খলা-পরিস্থিতিও ভালো নয় । […] রাজনৈতিক সহনশীলতারও বড়ো অভাব।”
নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক এখানে এখন নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র রফিকের মুখ দিয়ে এমনই বিনষ্টির
বর্ণনা দিয়েছেন নিম্নরূপে
আসলে মানুষগুলো ভয়
পেয়ে মরে পড়ে আছে। স্বর্গ থেকে শকুন নেমেছে।
কোটি কোটি লাশ দেশ লোবানের ঘ্রাণে ভরে গেছে।
কান্নার আদলে কানে শোনা যাচ্ছে পবিত্র পঠন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২০০)
অন্যদিকে স্বার্থান্ধ, মুনাফাখোর, সমাজবিরোধী ব্যবসায়ীদের অনৈতিক সিন্ডিকেট তৈরির প্রসঙ্গ উঠে এসেছে রফিকের সঙ্গে কথোপকথনসূত্রে নাসিরের একটি সংলাপের মাধ্যমে :
মিয়া, ব্যবসাটা কত বড় ? কোন
দেশ মাল দিচ্ছে ? ডলার না দিরহাম ? কবে রেল
বসবে সেখানে ? বড় দাঁও মেরেছো, মাইরি দোস্ত,
জিন্দাবাদ তুমি । […] রহস্যটা এই, ঢাকা টু মানিকগঞ্জ,
রেলপথ, কোটি কোটি
টাকার প্রজেক্ট, যেমন আসবে কোটি, ঢালতেও
হবে আধাআধি, এবং অগ্রিম, বাবা, এত টাকা
ক্যাশ তুমি পেয়েছো কোথায় ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৬৭)
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে (১০/১/১৯৭২) জনসম্মুখে প্রথম যে ভাষণ প্রদান করেন, সেখানেই তিনি স্পষ্ট করে ঘোষণা দেন – এদেশের রাষ্ট্রীয় নীতি হবে তিনটি – – ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র।
পাকিস্তানি শাসনামলে মানুষের মধ্যে বিভেদ ও শোষণের প্রক্রিয়া হিসেবে কারণে অকারণে ধর্মকে ব্যবহার করা হতো। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বঙ্গবন্ধুর এমন ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ ছিল খুবই স্বাভাবিক বিষয়। ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন কমিটিকে বঙ্গবন্ধু অন্যান্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনার সঙ্গে বিশেষভাবে যে আদেশটি দিয়েছিলেন, সেটি হচ্ছে – রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক স্পষ্টত ছিন্ন করা। তা না হলে বিনষ্ট হতে পারে সামাজিক সংহতি ও সম্প্রীতি।
বলাবাহুল্য, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুপরবর্তী বাংলাদেশে তাঁর এ আশঙ্কাই সত্যি প্রমাণিত হয়েছিল। এসময়ে ধর্ম ব্যবহৃত হলো স্বার্থোদ্ধারের হাতিয়াররূপে। এখানে এখন নাটকে নাট্যকার ধর্মের এ অপব্যবহারের বাস্তবচিত্র চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। এ প্রসঙ্গে রফিক চরিত্রের একটি সংলাপ উল্লেখ্য :
এই যে দেখছো তুমি পরকালচর্চা বড় বেশি, এই যে সর্বদা শুধু ঊর্ধ্বলোকে চোখ, সারাক্ষণ অবনত বাস্তবিক এই যে মস্তক, এই যে মাজার ঘোরা, রাশিচক্র ফলাফল পড়া, আমিতো নিশ্চিত, এর পেছনেই আছে কারো গূঢ় রাজনৈতিক কারণ – কোনো এক শ্রেণী কিংবা শক্তি বিশেষের।
আমাদের দুর্বল, দৈবনির্ভর তারা করে দিতে চায়। […] আমরা মায়ের পেট থেকে পড়ে উত্তরাধিকার হিসেবে ধর্মটা পাই, তাই কেউ আর বড় বেশি তলিয়ে দেখি না, (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২০১-২০২ )
নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র রফিক স্বপ্নমাধ্যমে মানিকগঞ্জে রেল দেখেছে – একথা শুনে নাসিরুদ্দিন তাকে বিদ্রূপ করতে গিয়ে নবি ইব্রাহিমের স্বপ্নদর্শনের প্রসঙ্গ টেনে পরিহাস করে বলছে : ‘স্বপ্ন তো সাধুরা দ্যাখে, গরীবেরা দ্যাখে। / কোন দুঃখে তুমি ? […] নবী পয়গম্বর এঁরা তো স্বপ্নেই পান, / এমনকি ছেলেকে – কোরবান করবার আদেশ সে তো স্বপ্নেই এসেছিল হে।’ (কাব্যনাট্যসমগ্র: ১৬৭) । সে-নাসিরুদ্দিনই আবার রেলের ঠিকাদারি পাওয়ার স্বার্থে আজমির শরিফ, মাজার জেয়ারত, খাজাবাবার শরণাপন্ন হয়েছে :
কাম অন, কনফেস, শালা। […]
আর তোমার খরচে সেই নপুংসক গাফ্ফার
তোমারই শিরনি নিয়ে আজমীরে গেছে […]
খাজা বাবার দর্গায় ? – আহ, আহ, মাফ করো খাজা। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ১৬৮) ধর্মীয় লেবাস ধরতে ও অভিজাত্যবোধের প্রমাণ দিতে এরা গলায় পরে কোরানের বাণীসংবলিত সোনার লকেট। আবার পরক্ষণেই সে লকেট খুলে মদ খেয়ে হয় মাতাল। জৈবিক ক্ষুধা মেটাতে দ্বারস্থ হয় বারবনিতার। সমাজের এমন বিনষ্টির চিত্র নাট্যকার অত্যন্ত নিখুঁত বাস্তবতায় তুলে ধরেছেন মানুষ থেকে পশুতে পরিণত হওয়া নাসির চরিত্রের মাধ্যমে। নাসির চরিত্রটি রফিককে উদ্দেশ্য করে বলেছে :
কোরানের সোনার লকেট অবধি খুলে রেখে এসেছি এখানে,
তোমার বাসাটা খালি, মিনতিকে খবর দিয়েছি,
তুমি মনে করিয়ে দিলে তো খাজা বাবার কথা?
হাতে আমার গেলাশ, সামনে বোতল,
জানো মাল এসে যাচ্ছে, তুমি নিজে পর্যন্ত টানছো,
এর মধ্যে খাজা বাবার নাম তুমি উচ্চারণ করালে আমাকে?
তোমার ও ব্যবসা চলে যাবে অভিশাপে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৬৯)
স্বীয় স্বার্থ হাসিলের জন্যে এরা ধর্মপালন করে থাকে, কখনোই পরিপূর্ণ ভক্তি কিংবা আত্মশুদ্ধির জন্য নয়। তাই দেখা যায়, মানিকগঞ্জে রেলের কাজ পাওয়ার জন্য নাসির বলেছে :
আমিও শিরনি দেবো বাবার দরগায়,
মাজার ভাসিয়ে দেবো চোখের পানিতে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৭৫)
নাসিরের এ-উক্তির মাধ্যমে তৎকালীন মাজার সংস্কৃতির চিত্র সহজেই অনুমান করা যায়। ঢাকা শহরে নামে- বেনামে, সে-সময় গড়ে উঠেছিল মাজার-কেন্দ্রিক ব্যবসা। ধর্মের প্রকৃত সত্য থেকে সেখানে ভিড় করেছিল আচারসর্বস্ব ধর্মের মুখোশধারীরা। আশির দশকের স্বৈরশ্বাসক জেনারেল এরশাদ নিজেও ছিলেন একজন অন্ধ মাজার-পূজারী।
রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে এই অপধর্মচর্চা ও কুসংস্কার নাট্যকারকে ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। ফলে অসাম্প্রদায়িক মননের অধিকারী সৈয়দ শামসুল হক মনে-প্রাণে চেয়েছেন এই সমাজের অন্তর থেকে ধর্মান্ধতা অপসারিত হোক। তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন আচারস্বর্বস্ব ধর্মের এই ব্যবহার মানুষকে শোষণ ও পীড়ন করার জন্যে রাষ্ট্রযন্ত্রের এধরনের কৌশল।
পঞ্চাশের দশকের তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের অধিকাংশ ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ও প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সৈয়দ শামসুল হক কখনো প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে জড়িত করেননি। তবে তিনি ছিলেন একজন আদ্যোপান্ত রাজনীতি-সচেতন মানুষ। ফলে ধর্মের লেবাসে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত তিনি খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন :
মুক্তিযুদ্ধের সারকথা […] আমরা ধর্মান্ধতা থেকে মুক্তি চাই। ধর্মকে যে এই বদমাশগুলো, শয়তানগুলো ব্যবহার করেছে, আমরা তার বিরুদ্ধে, অবস্থান নিয়েছি […] এটা নিয়ে তো পঁচাত্তর সাল থেকে আমি কথা বলছি। তখনই শনাক্ত করেছি এ থেকে আমরা মুক্ত না হলে আমাদের প্রকৃত মুক্তি আসবে না।
ধর্মান্ধতা থেকে মুক্ত করতেই হবে বাংলাদেশকে। […] মানুষের ভেতরে চেতনা সৃষ্টি করতে হবে। আর মূল সংস্কৃতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য, সবগুলোর গোড়ায় তো রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের সংবিধানের পরিবর্তন আনতে হবে। সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।’ অন্যদিকে, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, নবগঠিত দেশের নবীন প্রজন্মকে সুশিক্ষিত ও অসাম্প্রদায়িক মননসম্পন্ন করে গড়ে তোলার প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধু দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন।
দেশের অভ্যন্তরে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনসহ বিদেশে সরকারি কাজে – সর্বত্র বাংলার ব্যবহারের সাহসী পদক্ষেপ তিনি নিয়েছিলেন। একাত্তর-পরবর্তী সময়ে তিনি এই ইচ্ছা ব্যক্ত করে বলেছিলেন : ‘আমি চাই বাংলায় অনেক কাজ হোক। আমাদের রাষ্ট্রদূতরা যেসব ক্রিডেনশিয়াল দেয় বিদেশে, আমি চাই, সেসব বাংলায় লেখা হবে।
তাছাড়া আরো অনেক কাগজপত্র বাংলায় হতে হবে।” কিন্তু বঙ্গবন্ধুর এই স্বপ্ন ও উদ্যোগ তাঁর মৃত্যুপরবর্তী সময়ে পাকিস্তানপন্থীদের অপকৌশলে বাস্তবতার মুখ দেখতে পায়নি। এসময়ে ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতি প্রচলনের পাশাপাশি বাংলাভাষার ব্যবহারের ওপরও খড়গ নেমে আসে; ব্যাপকভাকে চর্চা হতে থাকে বিদেশি ভাষা-সংস্কৃতির। এখানে এখন নাটকের বিভিন্ন চরিত্রের মুখের সংলাপে বিদেশি ভাষা-সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ করা যায়। রফিককে উদ্দেশ্য করে নাসিরের একটি সংলাপে এর উপস্থিতি লক্ষণীয় :
জলদি গেলাশ নিয়ে এসো। সোডা আছে ? নেই ? থাক । পানিতেই চলে যাবে। বরফ তো আছে ? চমৎকার বাড়িটি তোমার দোস্ত ; বিলকুল ফাঁকা ; সারারাত জোর হল্লা হবে। যদি চাও মহাদেশে তুমি আগে যাবে, ইটস এ ফেয়ার ডিল, ব্যাচেলর আগে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৬৪)
এখানে বারবণিতাকে তুলনা করা হয়েছে মহাদেশের সঙ্গে; এবং কে আগে পতিতাসম্ভোগে লিপ্ত হবে সেটি নিয়ে তারা ব্যাবসায়িক চুক্তি করছে। বিনষ্ট সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে মদ্যপান, বারবণিতাযোগ এগুলিই যেন তাদের বিনোদনের প্রধান উপায়; ধর্ম, নীতিবোধ মুখোশ মাত্র। বস্তুত, এরা মুখোশধারী। নাট্যকার পুরো নাটকজুড়েই এদের মুখোশ উন্মোচনের মাধ্যমে একটি বিপন্ন সময়ের চিত্র এঁকেছেন।
আলোচ্য নাটকে নাট্যকার সামাজিক বিনষ্টির চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিনষ্টির চিত্র তুলে ধরতে ভোলেননি । যেমন, এসময়ে রাজনীতি চলে গেছে নষ্ট মানুষদের হাতে। বাম রাজনীতির বহুব্যবহৃত ‘বিপ্লব’ শব্দও ছিনতাই হয়ে গেছে। ব্যক্তিস্বার্থে কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থে এ-শব্দের অপব্যবহার ঘটেছে । এমন কি জিয়াউর রহমান তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিকে নানান ইস্যুতে সমর্থন দিতে গিয়ে এই শব্দটি ব্যবহার করতেন।
এখানে এখন নাটকের চরিত্রপাত্রের সংলাপে বামপন্থী রাজনীতির আবশ্যকীয় শব্দ ‘বিপ্লব’-এর উল্লেখ আছে। যেমন, নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কে রফিকের মুখের একটি সংলাপের মাধ্যমে লেখক বিপ্লব শব্দের এই অনাবশ্যক ব্যবহারের সমালোচনা করেছেন :
আজকাল অবলীলাক্রমে যে-কেউ – সে-কেউ বলে
ফেলছে ‘বিপ্লব’। আমাদের যেমন জাতীয় ফুল
শাপলা, যেমন দোয়েল জাতীয় পাখি এ দেশের,
এখন জাতীয় শব্দে পরিণত ‘বিপ্লব’ শব্দটা।
এর প্রতি অধিকার সকলেরই এখন জন্মেছে। (কাব্যনাট্যসমগ্র 200 )
আবার, রফিক ও সুলতানার একান্ত ব্যক্তিগত আলাপেও এ প্রসঙ্গ উচ্চারিত হয়েছে। যেমন :
গাফফার বোকা নয়, আসলেই ভীতু। ভয় পায়।
দু’দিকের ভয়।
বিপ্লব করতে গেলে সবকিছু ভুলে যেতে হয়,
নিজের সমস্ত কিছু তুচ্ছ করে ঝাঁপ দিতে হয়, যুদ্ধে ঠিক ঝাঁপ দেয় যেমন সৈনিক। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২০১)
স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে বঙ্গবন্ধুর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মাথাচাড়া দিতে শুরু করে। এসময় ধর্মের অপব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রনীতির পরিবর্তে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ব্যাপক চর্চা শুরু হয়।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে পাকিস্তানি কায়দায় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের জিগির উঠতে থাকে। বঙ্গবন্ধু ও বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের বিরোধিতায় মুখর হয়ে ওঠে একশ্রেণির রাজনীতিবিদ। বঙ্গবন্ধুর জীবৎকালে আরব বিশ্বের যেসকল দেশ বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম দেশের স্বীকৃতি দিতে দ্বিধান্বিত ছিল, বঙ্গবন্ধুর নির্মম মৃত্যুর পর এদেশে নবউত্থিত পাকিস্তানি ভাবধারাকে সমর্থন জানাতে আরব দেশগুলোও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করে।
এমন কি বাংলাদেশের নানান উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অনুদান অথবা ঋণ সহায়তা দিতেও তারা কার্পণ্য করে না। এখানে এখন নাটকে প্রধান দুটি চরিত্রের মুখে প্রসঙ্গটি একাধিকবার উল্লেখিত হয়েছে। রফিকের স্বপ্নদৃশ্যে কালোবেশধারীর সংলাপেও আছে আরবের টাকায় এদেশের রেলপ্রকল্প বাস্তবায়নের কথা :
[…] আরব আরব ?
আরবের টাকায় প্রকল্প ?
মাংসখণ্ড মাঝখানে,
থাবা ভুলে আপনারা দু’দিকে দু’জন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৮৭)
আবার, দ্বিতীয় অঙ্কে রফিক ও সুলতানার একান্ত আলাপে আরবের টাকায় এদেশের বিভিন্ন প্রকল্প প্রসঙ্গ উপস্থাপিত হয়েছে :
আজ এক কাজ ও পেয়েছে
যেটার পেছনে আমি সাড়ে তিন মাস
লেগে আছি, জানতেও পারিনি যে
প্রতিদ্বন্দ্বী সে। যখন জানলাম,
কাজটা সে ততক্ষণে পেয়ে বসে আছে।
আরবের টাকায় প্রকল্প
কল্লোলিত তরল মোহর। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ১৯৫)
এখানে এখন নাটকে সৈয়দ শামসুল হক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শহিদ হবার দুঃখজনক ঘটনাকেও তুলে এনেছেন নিবিড় বাস্তবতায়।
সুলতানা যখন বিদ্যমান অস্থিতিশীল অবস্থার বর্ণনা করে গাফফারের ধর্মমুখী হবার কার্যকারণ নির্ণয় করে তখন স্বাভাবিক ভাবেই ঘাতকের হাতে বঙ্গবন্ধুর শহিদ হবার প্রসঙ্গটিও এসেছে :
রাষ্ট্রপতিকে যে দেশে ঘাতকের হাতে প্রাণ দিতে
হয়, প্রধানমন্ত্রীর ঘরে চুরি হয়, সেই দেশে
নাগরিক স্বাভাবিক সব ভাববে কিভাবে?
ক্ষমতা, বন্দুকবাজি, খুনী পেয়ে যায় পুরস্কার,
ডাকাত নির্বিঘ্নে হাটে, ঘরে সাধু চোর হয়ে থাকে,
মানুষ বাঁচতে পারে? – এই যদি হয় বর্তমান? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৯৯)
প্রকৃতপক্ষে সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন একজন মুজিব-অন্তঃপ্রাণ মানুষ। বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নির্মমভাবে শহিদ হবার ঘটনা নাট্যকারের মানসলোক তীব্রভাবে প্রভাবিত করেছে। সেকারণেই বঙ্গবন্ধুর ঘাতকের হাতে প্রাণ দেবার নির্মম ঘটনার উল্লেখ তিনি তাঁর একাধিক রচনায় প্রসঙ্গত উল্লেখ করেছেন।
সেই ধারাবাহিকতায় এখানে এখন কাব্যনাটকের একাধিক স্থানেও প্রসঙ্গটির উল্লেখ রয়েছে। যেমন, নাটকের শেষদিকে চমক হিসেবে অনামা ব্যাক্তি যখন রফিককে সুকৌশলে বন্ধু নাসিরের পূর্ব থেকে পাওয়া দরপত্রকে অপকৌশলে পুনরায় বাগিয়ে নেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে, তখন বিবেকের দংশনে দুলতে থাকা রফিককে উদ্দেশ্য করে অনামা ব্যক্তির সংলাপ উল্লেখ করা যেতে পারে :
নীতি-ফীতি রেখে দিন। বাংলাদেশে গুলি চলে, গুলি।
কথা যাকে মাথায় রাখার,
অবলীলাক্রমে তাঁকে মারেনি কি মানুষ বাংলার ? ( কাব্যনাট্যসমগ্র : 219 )
বঙ্গবন্ধুর নির্মম মৃত্যুর পর এদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি সুবিধাবাদীদের কবলে পড়ে যায়। রাজনীতি হয়ে যায় ব্যবসায়িক পণ্য। রাজনীতিতে লাভ লোকসানের হিসেব-নিকেশ হয়ে ওঠে প্রকট। দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদরা কোনঠাসা হতে শুরু করে, আর অনৈতিকভাবে গজে ওঠা ব্যবসায়ী শ্রেণি হয়ে উঠতে থাকে রাজনীতির নিয়ামক। রাজনীতি হয়ে ওঠে অর্থবিত্ত উৎস, পদ-পদবি আর বিলাসিতার যোগানদার। বিশাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই থাকে না। রফিকের একটি সংলাপে তৎকালীন বিবেকশূন্য হৃদয়হীন রাজনীতিবিদের বাস্তব চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে :
মন ছাড়া কত লোক দিব্যি বেঁচে থাকে,
খায় দায়, বাড়ি হয়, গাড়ি হয়, নেতা হয়, কোটি কোটি টাকা হয়,
জাতীয় দিবসে তারা সিলকের পতাকা ওড়ায়।
আমি কেন পারবো না তবে ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২২২-২২৩)
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে (Proclamination of Independence) সোনার বাংলা গঠনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’
কিন্তু পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে দেখা গেলো এই নীতি উবে গেছে, শুরু হয়ে গেছে শোষণের রাজনীতি, বিভাজনের রাজনীতি। সাধারণ মানুষ তাদের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারও তাদের নেই। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতেও তাদের জীবন বিপন্ন। এখানে এখন নাটকের অন্যতম প্রধান নারী চরিত্র সুলতানার একটি সংলাপে সমকালীন বাংলাদেশের নিপীড়ন বৈষম্যের চিত্র নিপুণতার সঙ্গে চিত্রিত হয়েছে :
স্বাধীনতা এসেছে থেকেই দ্যাখো
মানুষের মনে স্বস্তি নেই – এ স্বাধীনতা নিয়েই ।
চিনির ডেলায় তুমি কালো পিঁপড়ে ছাড়লে তো ফের
লাল পিঁপড়ে সারে সার দেখা দিচ্ছে পর মুহুর্তেই ।
সেটা তো আছেই; আর, মানুষের কথা ভেবে দ্যাখো –
জিনিসের দাম বেড়ে যাচ্ছে ধাঁ ধাঁ করে, বাড়ছেই,
বাড়ছেই, গিয়ে কোথায় ঠেকেছে।
কিন্তু রোজগার সেই হারে বাড়ছে না ;
তারপর নিরাপত্তা নেই, (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৯৮-১৯৯)
বস্তুত এখানে এখন কাব্যনাট্যে স্বাধীনতা-পরবর্তীকাল, বিশেষত, পঁচাত্তরের অনাকাঙ্ক্ষিত পট পরিবর্তনের পর বদলে যেতে থাকা আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা চিত্রিত হয়েছে। নাট্যকার সৈয়দ হক সমকালীন বাস্তবতা চিত্রাঙ্কনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের দায় যে অনেকাংশে পূরণ করতে পেরেছেন তা নির্দ্বিধায় বলা যায় ।

