সৈয়দ শামসুল হকের এখানে এখনের শৈলিবিচার

এখানে এখনের শৈলিবিচার রচনাটি সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক : ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও শিল্প [পিএইচডি অভিসন্দর্ভ] এর অংশ। গবেষনাটির অথোর জান্নাত আরাসোহেলী। এই অভিসন্দর্ভের (পিএইচডি) বিষয় বাংলা নাটক – ইতিহাস ও সমালোচনা। প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাবর্ষ: ২০১৭-২০১৮। গবেষণাকর্মটি সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় আমরা সাহিত্য গুরুকুলে পুন-প্রকাশ করলাম।

এখানে এখনের শৈলিবিচার

এখানে এখনের শৈলিবিচার

এখানে এখন কাব্যনাট্যে স্বাধীনতা-পরবর্তীকাল, বিশেষত পঁচাত্তরের পরবর্তী পর্যায়ের পরিবর্তিত আর্থ- সামাজিক-রাজনৈতিক পট-পরিপ্রেক্ষিতের বাস্তব চিত্র অঙ্কন করেছেন সৈয়দ শামসুল হক। এ-নাটকের বিষয়বয়ন, চরিত্র নির্বাচন ও চরিত্রায়ণ কৌশলে যথেষ্ঠ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন নাট্যকার। নাগরিক মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চমধ্যবিত্তের সমস্যা ও সংকটের চিত্রই নাটকে ব্যাপকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। অবশ্য মিনতি চরিত্রের উপস্থিতির মাধ্যমে স্বল্প পরিসরে হলেও নাট্যকার নিম্নবিত্তের জীবনসংকটের চিত্রাঙ্কন করেছেন।

বস্তুত সমকালীন অস্থির সময় ও সমাজের নিপীড়িত, অবহেলিত নারীসম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হল মিনতি চরিত্রটি। ‘ব্যবহার’ যদি এ নাটকের প্রধান থিম হয়ে থাকে, তবে নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে এখানে এখন নাটকে নিকৃষ্টতম ব্যবহারের শিকার হয়েছে মিনতি। নাটকের শেষদিকে রফিকের একটি সংলাপে মিনতিই হয়ে উঠেছে পঁচাত্তর-উত্তর বাংলাদেশের নষ্ট সময় ও সমাজের প্রতিরূপ। প্রেমিকা সুলতানাকে প্রদত্ত কানের দুলের সূত্র ধরে মিনতির পরিচয় প্রদান প্রসঙ্গে রফিক মিনতির দুঃখজনক ঘটনার ইঙ্গিত টেনে বলেছে :

বেশ্যাই বলতে পারতাম

এখন সে বেশ্যা না আর ।

এখন আমরা কেউ বেশ্যা নাই আর ।

সবকিছু পুড়ে গেছে এসিডে কবেই। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২২৫)

মিনতি এ সমাজের চোখে পতিত চরিত্র, অথচ গোপনে সে অনেকের বাঞ্ছিত। সে উচ্চমধ্যবিত্ত চরিত্রের মনোরঞ্জনে ব্যবহৃত হয়েছে বারবার। সমাজের চোখে তার অবস্থান নিন্দনীয়। কিন্তু এ পেশায় সে সানন্দচিত্তে নয় বরং নিরুপায় হয়েই এসেছে। এজন্য দায়ী বিদ্যমান অস্থির আর্থ-রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতি, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, সর্বোপরি উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব।

বাবার মৃত্যুর পর একমাত্র ভাই বিয়ে করে দুবাই চলে যায়। এরপর তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফলে ভাগ্যান্বেষণে মিনতি গ্রাম ছেড়ে রাজধানী ঢাকায় স্থিত হবার চেষ্টা করে। কিন্তু মিনতি এ শহরে অভিভাবকহীন একলা নারী; তাই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের লালসার শিকার হয়ে সমাজের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য হয় সে। ভাগ্যান্বেষণে শহরে এসে সে টিকে থাকার প্রয়োজনে ‘কলগার্লে’র জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়। অথচ একদিন তার স্বপ্ন ছিল অন্যরকম :

প্রায় প্রতি পূর্ণিমার রাতে

নিজেকেই দেখতে পেলাম ঘন নীল কি সুন্দর শাড়ি পরে

মাঠের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি সবুজ ঘাসের ঢেউ ছুঁয়ে ছুঁয়ে ।

এখন তার রাত কাটে তীব্র ভয়ে, অজানা আশঙ্কায়। মানুষের অযাচিত ব্যবহারে সে ব্যথিত হয়; কিন্তু উপায়হীন বাস্তবতায় কিছু করার থাকে না। অবশ্য রফিকের সঙ্গে আলাপকালে সে নিজেকে কিছুটা মেলে ধরার সুযোগ পায়। মনে হয় রফিক তার স্বপ্নে দেখা প্রেমিক পুরুষের মতো। তাই রফিকের ‘আপনি’ সম্বোধনের উত্তরে সে
বলে :

আমাকে আপনি করে বলছেন কেন ?

[…] অনেকে তুইও বলে। কত কিছু বলে, সব

শুনে যেতে হয়। তবে আপনি আলাদা।

[…] একটি মানুষ – আমি তাকে প্রায় প্রতিদিন টের পাই খুব কাছে আছে;

যেমন গাছের গায়ে ঘ্রাণ পাওয়া যায়, […]

তার সাথে আমার সংসার, […]

মনে হচ্ছে, লোকটি যে আপনিই ছিলেন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৭৪)

বাস্তবতার রূঢ় ধাক্কায় মিনতি প্রতিনিয়ত বাস করেছে স্বপ্নলোকে। জীবনের আকাঙ্ক্ষিত বিষয়গুলোকে স্বপ্নের
ঘোরেই ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছে সে। অথচ বিরুদ্ধ পরিবেশে সে নিয়ত যুদ্ধ করে চলেছে এক অজানা ভয়ের সঙ্গে। রফিকও বাস করেছে ভয়ের মধ্যে। কিন্তু রফিকের ভয় আর মিনতির ভয়ের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা।

রফিকের ভয় মূলত তার পাপবোধ থেকে জাত; কিন্তু মিনতির ভয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হওয়ার, ব্যবহৃত হওয়ার। বিরুদ্ধ পরিবেশে, বিনষ্ট সমাজের প্রেক্ষাপটে সে প্রতি মুহূর্তে আতঙ্কিত বোধ করেছে, শঙ্কাতাড়িত হয়েছে সমকালীন অন্যান্য নির্যাতিত নারীর মতো; যারা এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে :

কখনো কখনো আমার কি ভয় করে,

কখন কোথায় এসিড কে মুখে মারে ;

যদি সত্যি হয়ে যায় কোনোদিন –

অন্তত তখন আর থাকবে না ভয়।

এসিড তো দ্রুত নষ্ট করে,

ভয় বড় ধীরে। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ১৭৯-১৮০ )

সমাজ এবং দেশের নির্মম বাস্তবতায় মিনতির এই দুঃস্বপ্নও একদিন সত্যি হয়ে ধরা দেয়। নাটকের সমাপ্তিতে দেখা যায় মিনতির এসিডে ঝলসানো মুখের বীভৎস ছবি। তাই এখন সে আর ব্যবহৃত হবার যোগ্য নয়। নাটকের শুরুর দিকে যে ভয় তাকে গ্রাস করেছিল, শেষপর্যন্ত সেই ভয়ই তার জীবনে সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে। নাটকের শেষে উন্মত্তের মতো খল খল করে হেসে ওঠা তার সেই পরিণতিকেই নির্দেশ করে। সে বলে :

এসিডে বিনষ্ট মুখ এখন আমার ।

এখন কিসের ভয় ?

আর কোনো ভয় নেই এখন আমার। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২২৩)

 

এখানে এখনের শৈলিবিচার

 

বস্তুত, এখানে এখন কাব্যনাটকের মিনতি ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নিম্নবর্গের অসহায় নারী সমাজের প্রতিনিধি। […] স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশে মিনতির মতো অনেক নারীই ক্ষুধার যন্ত্রণায় পতিতায় পরিণত হয়েছে। মূলত মিনতি চরিত্রের মধ্যদিয়ে নাট্যকার মানবতার বিপর্যয়কে তুলে ধরেছেন। সে অর্থে মিনতি হয়ে উঠেছে সেই কালের সমাজবাস্তবতার প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্র।

নাটকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র হল রফিকের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী – গাফফারের স্ত্রী সুলতানা। সুলতানা ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া শিক্ষিত মেয়ে; বিবাহিত ও আর্থিকভাবে সচ্ছল। কিন্তু সেও পরিবার ও সমাজে মিনতির মতোই ভালোবাসার অধিকার থেকে বঞ্চিত। একসময় সে সহপাঠী রফিককে পছন্দ করলেও স্বভাবসুলভ আড়ষ্টতায় তাকে কখনো তা বলতে পারেনি।

পরবর্তীকালে তার বিয়ে হয়ে যায় সরকারি চাকুরে, ধর্মপ্রাণ গাফফারের সঙ্গে। কিন্তু অন্তর্মুখী, পলায়নপর গাফফারের সঙ্গে তার দাম্পত্যজীবন কখনোই সুখের হয়ে ওঠেনি। গাফফার সুলতানাকে ব্যবহার করেছে সামাজিক মর্যাদা ধরে রাখতে এবং জৈবিক প্রয়োজন মেটানোর প্রয়োজনে। সুলতানার চাওয়া-পাওয়া, ভালোলাগা-ভালোবাসাকে সে কখনো সেভাবে মূল্যায়ন করেনি।

ফলে ক্রমাগত বঞ্চনা আর হতাশাই হয়ে উঠেছে তার দাম্পত্য জীবনের সম্বল; কাটাতে হয়েছে অসুখী জীবন। একই ফ্ল্যাটে বসবাসরত বন্ধু রফিকের সামনে সে খুলে দিয়েছে তার অপূর্ণ জীবনের অর্গল; রাগে-ক্ষোভে জানিয়েছে :

আজ বৃহস্পতিবার । […]

আজ ফিরবে না গাফফার।

বিধবার এ রাত আমার। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৯২-১৯৩)

মেয়েদের ‘স্বামীর মৃত্যুর কথা মুখে আনতে নেই’ – রফিকের মুখে এমন সামাজিক ট্যাবুর কথা শুনে দ্রোহে – ফেটে পড়ে সুলতানা। রফিককে কটাক্ষ করে সে জানায়, আকাঙ্ক্ষিত প্রেমিক যেখানে কথা রাখে না, স্বামী যেখানে শপথ পালন করে না, সেখানে শুধুমাত্র তার মুখের উচ্চারণে কী এসে যায়। মুখের কথায় মিথ্যে সত্যি হয়ে যায় না, কারো অসুখী জীবন সুখী হয়ে যায় না।

এ পর্যায়ে সে সম্পদের নেশায় উন্মত্ত রফিককেও কটাক্ষ করে বলে – ‘তোমার মন বলে কিছু আছে নাকি ?’ প্রকৃতপক্ষে সুলতানা জীবনের রসভোগ থেকে বঞ্চিত। অথচ মিনতির সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করলে তার সবকিছুই পাওয়ার যোগ্যতা ছিল কিংবা পাওয়ার কথা ছিল। কেননা, সে মিনতির মতো নিম্নবিত্ত অসহায় পরিবার থেকে উঠে আসা কোনো নারী নয়; সে শিক্ষিত ও উচ্চমধ্যবিত্ত নারীসমাজের প্রতিনিধি; অথচ সেও নির্মমভাবে ব্যবহৃত চরিত্র।

দুজন পুরুষ তার জীবনে এসেছে; অথচ দুজনেই তাকে প্রচণ্ডভাবে ব্যবহার করে প্রত্যাখ্যান করেছে। একদিকে প্রথম জীবনে প্রেমিক-বন্ধু রফিক অর্থের পেছনে ছুটতে গিয়ে সুলতানাকে উপেক্ষা করেছে; অন্যদিকে সামাজিকভাবে গাফফারকে বিয়ে করে সুলতানা আর দশজন সাধারণ বাঙালি নারীর মতোই স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখী হতে চেয়েছে, কিন্তু গাফফার তাকে না দিতে পেরেছে স্বামীসুখ, না দিতে পেরেছে সন্তান। সুলতানা অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে এ সংকটজনক অবস্থা বর্ণনা করে বলেছে :

থেকেও সে নেই যেন, ওজু নষ্ট হয়ে যাবে বলে

সারাক্ষণ কাঁটা হয়ে থাকে, যখন সে কাছে টানে

নিতান্তই প্রয়োজনে তার – নির্মম, সংক্ষিপ্ত, দ্রুত –

তারপর ছুঁড়ে ফ্যালে, যেন নষ্ট জামা তার বউ। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৯৬)

গাফফারের এই ক্রমাগত অবহেলা সুলতানাকে ভেতরে ভেতরে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। তবুও সুলতানা রফিকের সঙ্গে একই ছাদের নিচে থেকেও কখনো নিজস্ব পবিত্রতা বিসর্জন দেয়নি। এমনকি রফিকের সঙ্গে সারাজীবন কাটানোর অঙ্গীকার করেও তাৎক্ষণিক আবেগে ভেসে যায়নি সে; বরং রফিকের তীব্র জৈবিক আকর্ষণের মুখে দৃঢ় স্বরে বলেছে –

না রফিক, না এখন কিছুই না ।

তুমি আমাকে ছোঁবে না । এখনো যে গাফফার –

এখনো যে আমি তার – (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২১২)

সুলতানা সমাজ-রাজনীতি সচেতন নারী। একসময়ে তার জীবনে ছিল অপার সম্ভাবনা; কিন্তু প্রতিকূল সমাজের স্রোতে তাকেও ভেসে যেতে হয়েছে নিরুপায় হয়ে। কিন্তু এত এত বিপর্যয়ের মুখেও সে তার নৈতিকতাবোধ অক্ষুণ্ণ রেখেছে, রফিকের সঙ্গে দেশের ভালো-মন্দ নিয়ে আলাপ করেছে, সমাজের পঙ্কিলতার দিকে ইঙ্গিত করেছে।

আলোচ্য নাটকে সুলতানার সংলাপেই লেখক সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক-সামাজিক ঘটনাবলি উপস্থাপন করেছেন। এমনকি গাফফারের অতি ধার্মিকতাকেও সুলতানা ব্যাখ্যা করেছে নিজস্ব দার্শনিক বিচার- বুদ্ধি দিয়ে। তার মতে –

পালাতে চায় গাফফার, এটা তার পথ

পালাবার – এই অতি ভক্তি তার – এই বাড়াবাড়ি – এই অতি ধার্মিকতা।’ (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৯৮)

আবার, দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বর্ণনা করে গাফফারের এই পলায়নপর মানসিকতার কার্যকারণও নির্ণয় করেছে চমৎকার বিচার-বিবেচনার মাধ্যমে। সুলতানার মতে, যে দেশে রাষ্ট্রপ্রধানকে ঘাতকের বুলেটে প্রাণ দিতে হয়, যে দেশে প্রধানমন্ত্রীর ঘরে পর্যন্ত চুরি হয়, জিনিসপত্রের দামে যেখানে সাধারণ লোকের নাভিশ্বাস ওঠে, সেখানে মানুষ বাঁচতে পারে চোর-ছিনতাইকারী হয়ে, পঙ্কিলতায় গা ভাসিয়ে; যেমনটা রফিক-নাসিররা করছে।

এই বাঁচার উপায় হলো সমাজকে দূরে ঠেলে, বাস্তবতাকে এড়িয়ে পরকালের আশার বুকে আশ্রয় খুঁজে, যেমনটা সুলতানার স্বামী গাফফার করেছে। সুলতানার পর্যবেক্ষণশক্তি এতটাই তীক্ষ্ণ যে, নাসিরের কন্ট্রাক্ট পেয়ে যাওয়ার সংবাদে লোভমত্ত রফিকের ঈর্ষাকাতরতাও তার দৃষ্টি এড়ায়নি :

ভূমিত আপিস থেকে ফিরে এসে

সোজা শুয়ে পড়বার লোক নও মোটে।

চোখ টাটাচ্ছে, তাই না ? [ … ]

কি যে দুঃখ, আহা, নামলো না মোহরের ঝর্ণা মরুভূমিতে তোমার। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৯৫)

জীবনের প্রত্যেকটি বিষয়কে সে নিজস্ব দৃষ্টিতে বোঝার চেষ্টা করেছে। রফিকের সঙ্গে শেষপর্যন্ত সংসার করার সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্বে সে ধীরেসুস্থে পুরো বিষয়টি ঠাণ্ডা মাথায় বিচার বিশ্লেষণ করেছে; আবেগে ভেসে হুটহাট ভুল সিদ্ধান্ত নিতে চায়নি। রফিককেও সে ভাবার যথেষ্ট সময় দিয়েছে। এমনকি সামাজিক রীতি-নীতি তুলে ধরে রফিককে নিজস্ব বোঝাপড়ায় সাহায্য করেছে বন্ধুর মতো :

যখন বলবে লোকে, তারা বলবেই,

বলবে যে তুমি এক বন্ধুর বউকে

ছি-ছি ভাগিয়ে নিয়েছো; যখন বলবে,

তুমি বিশ্বাসঘাতক, তখন তোমার

খারাপ কি লাগবে না ? (কাব্যনাট্যসমগ্র: 212 )

সুলতানার একাধিক উক্তিতে সমাজে মেয়েদের অবস্থান সুস্পষ্ট হয়েছে। সুলতানা ধর্ম সম্পর্কেও সমান অবগত। ধর্মের বিধিনিষেধ তুলে তাই তাকে ঠকানোর প্রশ্নই আসে না। স্বামীকে মেয়েদের তালাক দেবার অধিকার প্রশ্নে তাই সামাজিক রীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ধর্মের প্রসঙ্গটি উদাহরণ দিয়ে বলেছে :

আমি জানি, অধিকাংশ লোকের ধারণা,

মেয়েরা তালাক দিতে পারে না, কেবল

পুরুষেরা পারে। যদি সেরকম কিছু

শুনে থাকো, তবে ভুল শুনেছো, জেনেছো

ইসলামে মেয়েরাও পারে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২০৮)

এক্ষেত্রে সুলতানা যেন লেখকের প্রথম কাব্যনাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়ের প্রধান নারী চরিত্র মাতবরের মেয়ের আধুনিক সংস্করণ। মাতবরের মেয়ে মুক্তিযুদ্ধকালে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে নির্যাতিত হয়ে পুরুষতন্ত্র, এবং পুরুষতন্ত্রসৃষ্ট আচারস্বর্বস্ব ধর্মের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট দ্রোহ জানিয়েছিল। কিন্তু সে সময়ের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে নিজের মুক্তির পথ করে নিয়েছে আত্মহননের মাধ্যমে। কিন্তু সুলতানা পরিণত, আধুনিক, শহুরে শিক্ষিত নারী।

আত্মহননেনর পথে না গিয়ে তাই সে গোটা পুরুষতন্ত্রকেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পেরেছে। একদিকে স্বামী কর্তৃক অবহেলা মেনে না নিয়ে যেমন তাকে তালাক দেবার সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে, তেমনি আবার মতিভ্রষ্ট, লম্পট প্রেমিককে ফিরিয়ে দিয়ে রক্ষা করতে পেরেছে আত্মমর্যাদা ও সম্ভ্রম। সমাজে তালাকপ্রাপ্ত একলা নারীদের অবস্থান, বিবাহিত নারীকে পুনরায় বিয়ে না করার সামাজিক ট্যাবু – সবকিছু সম্পর্কেই সে সচেতন। – সুলতানা তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে বলেছে :

তালাকের পর একা থাকা অসম্ভব নয়, তবে সেটা

অবাস্তব হতে পারে – একাকিনী মহিলাকে কে কবে ছেড়েছে ? ( কাব্যনাট্যসমগ্র: ২১১)

এভাবে রফিকের কাছে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে সে। সমাজে মেয়েদের অবস্থান সম্পর্কে সুলতানার একটি দীর্ঘ সংলাপ প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে :

আমরা সকলে, গরীব কি মধ্যবিত্ত

লেখাপড়া করেছি কি করিনি, সকলে

যতই বলি না কেন, তবু শেষ কথা –

কাটাতে পারিনি এই নির্ভরশীলতা,

মন কিংবা মর্যাদার কোনো ক্ষেত্রে নয় ।

যতই বড়াই করি – মেয়েরা স্বাধীন।

[…] আমিও নির্ভরশীল,

[…] তা আমি যতই হই এম.এ পাশ করা,

যতই যোগ্যতা থাক নিজেকে দেখার। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ২১০)

মেয়েদের এই পরনির্ভরশীলতা কিংবা পুরুষনির্ভরতাকে সুলতানা অন্যত্র ব্যাখ্যা করেছে চমৎকার একটি প্রবাদপ্রতিম বাক্য দিয়ে : ‘বন্ধনে অভ্যস্ত হলে উদ্যমের ধার ক্ষয়ে যায়।’ (কাব্যনাট্যসমগ্র: ১৯৬) বিরূপ পরিস্থিতির মুখেও সুলতানা শেষপর্যন্ত নিজেকে ধরে রাখতে সক্ষম হয় মদ্যপ, লম্পট রফিককে চরমভাবে প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে।

নাটকের শুরুতে রফিক চরিত্রটি ইতি-নেতির দোলায় দুলতে দুলতে শেষপর্যন্ত পরিপূর্ণরূপে নেতির দিতে ঝুঁকে পড়ে। অন্যদিকে, সুলতানা চরিত্রটি আপাতমুক্তির নেশায় ক্ষয়ে যেতে যেতে অতঃপর নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। সুলতানা চরিত্রটিই মূলত নাটকের একমাত্র ইতিবাচক চরিত্র, যার দৃঢ় ব্যক্তিত্ব আর শাণিত বুদ্ধির ঝলকে নাটকটি প্রাণময় হয়ে উঠেছে।

 

এখানে এখনের শৈলিবিচার

 

বস্তুত ‘এখানে এখন কাব্যনাট্যে সুলতানা আমাদের অসহায় নারী সমাজের প্রতিনিধি, যাদেরকে একশ্রেণীর পুরুষ ব্যবহার করে। তার স্বাভাবিক, সুস্থ সুন্দর মানবিক বোধ, জীবনবোধের কারণে সে বিশিষ্ট নারী চরিত্র হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে।” নাটকের আরেকটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র অনামা ব্যক্তি।

নাট্যকার খুব সচেতনভাবেই এই চরিত্রটির নামকরণ করেননি। অনামা ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে রফিকের অন্তর্গত দ্বিতীয় সত্তা। নাট্যকার শাদাবেশধারীদের সংলাপে এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন নিম্নরূপে :

নিজের দ্বিতীয় সত্তা নির্বিবাদে থাকে

নিজেরই ভেতরে,

বস্তি ও দালানগুলো পাশাপাশি থাকে ।

নিজের গলিত লাশ পাশে আছে পড়ে,

পচন, পচন

তবু সারাক্ষণ

নিজের ভেতর,

জানালা দরোজা

সমস্তই বোঁজা,

প্রয়োজনে ব্যবহৃত যখন যে ঘর। ( কাব্যনাট্যসমগ্র: ২০৪)

অনামা ব্যক্তি রফিকের সেই পচা গলিত লাশ কিংবা বস্তি-সত্তা। যেটি শেষপর্যন্ত রফিককে পুরোপুরি অন্ধকার জগতে টেনে নিয়ে যেতে পেরেছে। অনামা ব্যক্তি আলাপকালে নিজের পরিচয় প্রসঙ্গে একটি কথাই উল্লেখ করেছে কেবল – ‘কালো রঙ পছন্দ আমার।’ ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ২১৭) আর নাটকের শেষদৃশ্যে আমরা দেখি রফিককে তার স্বাভাবিক পোশাকের পরিবর্তে কালো ধান পরানো হয়েছে। নাট্যকার মঞ্চনির্দেশে উল্লেখ করেছেন :

কালো বেশধারীরা আসে। তাদের হাতে দীর্ঘ একপ্রস্থ কালো ধান। রফিককে তারা টেনে মাঝখানে এনে দাঁড় করায়। তারপর সেই কালো থান তার গায়ে জড়িয়ে দিতে থাকে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২২৬)

নাটকের শুরু থেকেই রফিক অন্তর্গত ইতি-নেতির দ্বন্দ্বে দুলতে থাকে। নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কে মসজিদ প্রাঙ্গণে উন্মোচিত হয়ে পড়ে তার নেতি-সত্তা। আর তখনই অনামা চরিত্রটি বাস্তবে আবির্ভূত হয়; এবং সে নানান অপকৌশলে মানিকগঞ্জের ট্রেনের কাজ নাসিরের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে রফিককে উৎসাহিত করে। রফিক তখন সবিস্ময়ে লক্ষ করে এই সেই ব্যক্তি যাকে সে এতদিন স্বপ্নে দেখেছিল। যে তাকে তার মুসলমানিত্ব সম্পর্কে সন্ধিন্ধ প্রশ্ন ছুঁড়েছিল :

এই সেই লোক স্বপ্নে,

মানিকগঞ্জের ট্রেনে, প্রশ্ন করেছিল। অবিকল সেই গলা,

উচ্চারণে অবিকল সেই লঘু দোলা। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ২১৭)

অর্থাৎ, অন্তরের যাবতীয় পঙ্কিল ইচ্ছা, যা রফিক ধর্মের আবড়ালে এতদিন গোপন করে রেখেছিল, তা মানিকগঞ্জের কাজ হারানোর পর পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে যায়। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে সে সেই কন্ট্রাক্ট বাগিয়ে নেবার নানান পথ খুঁজতে থাকে, যা অনামা ব্যক্তির সংলাপের মাধ্যমে জানা যায়।

রফিক মেনে নেয় – চেষ্টা করলেই – কেবল একটুখানি – ব্যাস,’ কেননা ‘ব্যবসায় শেষ কথা কিছু নেই ! / […] পথ শুধু রাজপথ নয়, / অলিগলি শর্টকাট আছে,’ (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২১৭)। তাই তার মন বলে – বিভিন্ন বড় বড় অফিসে উপযুক্ত উৎকোচ দিয়ে বন্ধুকে ‘আন্ডারকাট’ করা যেতেই পারে। এক্ষেত্রে তার ইতি-সত্তা যখনই তাকে নীতির কথা সামান্যতম মনে করাতে গেছে, সে তখন বিদ্যমান দেশের বিপর্যস্ত রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতি তুলে নিজেকে বোঝাতে চেয়েছে এই বলে যে :

নীতি-ফীতি রেখে দিন। বাংলাদেশে গুলি চলে গুলি

কথা যাকে মাথায় রাখা,

অবলীলাক্রমে তাঁকে মারেনি কি মানুষ বাংলার ? ( কাব্যনাট্যসমগ্র: 219 )

অতএব, অনামা ব্যাক্তির ছদ্মবেশে তাকে তার দ্বিতীয় সত্তা বোঝাতে সক্ষম হয়, উপরে উঠতে গেলে প্রকৃত ধার্মিক হয়ে লাভ নেই, বরং তাকে তার ভোল পাল্টিয়ে ধার্মিক হবার ভান করতে হবে। যেহেতু আরব দেশের টাকায় কাজ, তাই পোশাকে, চলনে-বলনে তাকেও আরব্য সংস্কৃতি লালন করতে হবে।

ধর্মকে ব্যবহার করতে হবে স্বীয় স্বার্থ সিদ্ধির প্রয়োজনে। মূলত রফিকের অন্তরের এই দোলাচলের কারণেই নাটকের শুরুতে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল – রফিক কতখানি ধার্মিক। কেবল ধর্ম পালন নয় আরব বিশ্বের কাজ পেতে হজকেও ব্যবহার – করা হয়েছে, ধর্মীয় পোশাককেও স্বীয় স্বার্থে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। অনামা ব্যক্তি রফিককে পরামর্শ দিয়েছে

এখন কি হজ্জেবর মৌসুম নয় ?

হ্যাঁ, আপনি হয়, হজ্ব করতে যাবেন।

এবং ফেরার পথে কাজ সেরে নিয়ে মাথায় রুমাল বেঁধে দেশে নামবেন ।

ওদের রুমালে কিন্তু আপনাকে জবর দেখাবে। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ২২১)

অর্থাৎ, রফিক নিজেই সর্বতোভাবে নিজেকে বদলে নিতে চেয়েছে। অনামা ব্যক্তি তাকে তার দ্বিধা ভুলিয়ে, পাপের প্রতিক্রিয়াজনিত ভয় থেকে মুক্ত করে শেষপর্যন্ত পরিণত করেছে পশুতে। বন্ধু নাসিরকে ঠকানো, এসিড আক্রান্ত মিনতির প্রতি সংবেদনহীনতা, সুলতানাকে ভোগের চেষ্টা – ইত্যাদি এর প্রমাণ। জনৈক সমালোচক – অনামা চরিত্রটির সঙ্গে এলিয়টের The Elder Statesman (1959) কাব্যনাটকের মিল খুঁজে পেয়েছেন :

এ চরিত্রটি দেখে আমাদের TS Eliot এর The Elder Statesman (1959) নাটকের কথা মনে পড়ে। ওই নাটকের অন্যতম চরিত্র Lord Cleverton এর জীবনের অতীত সময়ের ভিন্ন অংশের প্রভাব নিয়ে Eliot, Ghost চরিত্রটি অংকন করেছেন। সেটা আসলে কোনো স্বতন্ত্র চরিত্র নয়। Lord Cleverton এর চারিত্রিক স্খলনের প্রতীকী রূপমাত্র।’

আমাদের বিচারে অনামা চরিত্রটির সঙ্গে স্কটিশ লেখক রবার্ট লুইস স্টিভেনসন (১৮৫০-১৮৯৪) রচিত রহস্য- উপন্যাস স্ট্রেঞ্জ কেস অব ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড (১৮৮৬)- এর চরিত্র – এডওয়ার্ড হাইডের সাযুজ্য রয়েছে। উপন্যাসে হাইড যেমন ডক্টর জেকিলের দ্বিতীয় ও অশুভ সত্তা, আলোচ্য নাটকে অনামা চরিত্রটিও তেমন।

নাটকের শাদাবেশধারী ও কালোবেশধারী চরিত্রগুলি মূলত দলীয় চরিত্র। তবে তাদের ভূমিকা ঠিক গ্রিক ক্লাসিক নাটকের দলীয় চরিত্র – কোরাসের মতো নয়। এরা মূলত ইতিবোধ-নেতিবোধের প্রতীক। যে কারণে এদের – চরিত্রায়ণে সূক্ষ্ম একটি পার্থক্য লক্ষ করা গেছে। শাদাবেশধারী ও কালোবেশধারী সম্পর্কে নাটকের প্রারম্ভে নাট্যকার যে পরিচিতি দিয়েছেন, তা থেকে এদের আলোচ্য নাটকে ব্যবহারের প্রাসঙ্গিকতা জানা যায় :

শাদাবেশধারী । দু’জন পুরুষ। মধ্যবয়সী। এদের পরনে দীর্ঘ শাদা থান, কাফনের মতো শরীরে জড়ানো। মুখে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি শাদা রঙ, যেন মুখোশ পরে আছে। এদের দু’জন আয়নায় প্রতিফলিত একই ব্যক্তির মতো হাঁটে, দাঁড়ায়, তাকায়, বসে। নাটকে এদের সংলাপ আলাদা করে দেখানো নেই, পরিচালক দু’জনের ভেতর ভাগ করে নেবেন।

কালোবেশধারী। দু’জন পুরুষ। মধ্যবয়সী। এদের পরনে দীর্ঘ কালো থান, কাফনের মতো শরীরে জড়ানো। এদের মুখেও অতিরিক্ত শাদা রঙ। তবে শাদাবেশধারীদের মতো এদের আচরণ আয়নায় প্রতিফলিত ব্যক্তির মতো নয়। এদের সংলাপ একটানা আছে, পরিচালক ভাগ করে নেবেন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৫৫)

বস্তুত, আলোচ্য নাটকে এরা দ্বৈত-ভূমিকা পালন করেছে। কখনো তারা দর্শকের সামনে কাহিনি বর্ণনা করেছে, আবার, কখনো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে চরিত্রের মনোভাবনা প্রকাশে সাহায্য করেছে।

এরা নাটকের চরিত্রগুলির নেপথ্যে থেকে যেমন কাজ করেছে, তেমনিভাবে নাটকের নানান ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় সরব চরিত্র হিসেবে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছে। যেমন : প্রথম অঙ্কে রফিকের টেলিফোনে আলাপকালে পাশ থেকে তাকে রাতের স্বপ্নের কথা মনে করিয়ে দেয়া, নাসিরকে টেনে পঙ্কময় পুকুরে গোসল করানোর সময় সরাসরি রফিকের সঙ্গে সংলাপ বিনিময়, দ্বিতীয় অঙ্কে রফিকের পোশাক বদলানো-সহ অনেক ক্ষেত্রেই নাটকে প্রত্যক্ষ চরিত্রের মতো অংশগ্রহণ করেছে তারা।

আবার, কখনো কখনো নাটকের মূলবক্তব্য বা নাট্যকারের দার্শনিক বোধ-বুদ্ধি এদের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে। যেমন, দ্বিতীয় অঙ্কের শুরুতে শাদাবেশধারী চরিত্র মানব-চরিত্র ও মানব-মনস্তত্ত্ব নিয়ে যে দার্শনিক উক্তি করেছে, তা যেন নাটকের মূলভাব সম্পর্কে ভূমিকায় বলা নাট্যকারের বক্তব্যেরই অনুরণন। নাট্যকার নাটকের মূলভাব সম্পর্কে ভূমিকায় বলেছেন :

এই নাটকের চাবি হচ্ছে একটি অতি পরিচিত শব্দ, চার অক্ষরের […] বড় ভয়াবহ, নির্মম ও সর্বগ্রাসী সেই শব্দ – ‘ব্যবহার’ […] এখানে এখন ? বস্তুত কি বাংলাদেশ এখন বিভক্ত নয় দুটি শ্রেণীতে ? ব্যবহর্তা আর ব্যবহৃত। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৫৩)

অন্যদিকে, দ্বিতীয় অঙ্কের প্রারম্ভে শাদাবেশধারী সুলতানা ও রফিকের পারস্পরিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে সমগ্র মানবজাতির স্বভাব নিয়ে মন্তব্য করেছে নিম্নরূপ :

মানুষেরা অবিরাম ব্যবহৃত হয়ে থাকে কতিপয় মানুষেরই

হাতে। […]

চক্রাকারে সকলেই সকলের কশেরুতে দিয়ে আছি রস-টানা সুঁচ। বস্তুত [ … ]

মানুষেরা ব্যবহার ব্যবহার করে আর ব্যবহৃত হয় । ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৯১)

এমনকি নাটকের শেষ সংলাপও উচ্চারিত হয়েছে শাদাবেশধারী চরিত্রের সংলাপে :

এইভাবে অভিনীত হয়

[…] এইভাবে অবিরাম অভিনীত হয়।

এবং নির্ণয় করে নিতে হয়, বাস্তব ? না অভিনয় ? ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ২২৬)

 

এখানে এখনের শৈলিবিচার

 

অর্থাৎ এখানে এখন নাটকে শাদা-কালোবেশধারী চরিত্রগুলি প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত চরিত্র, যারা নাটকের অভ্যন্তরে নাট্যকারের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করেছে। বস্তুত, আধুনিক কাব্যনাটকে এ ধরনের চরিত্রের মাধ্যমে মূল চরিত্রের অন্তরহস্য উন্মোচন করার একটি অভিনব মাত্রা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কাব্যনাটকে এরা নাট্যকারের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য তথা চরিত্রের অন্তর্গত রহস্য উদ্ঘাটনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। […] শাদা ও কালো বেশধারীরা এখানে এখন কাব্যনাটকে বিভিন্ন চরিত্রের মুখোশ উন্মোচন করে অন্তরস্থ ভণ্ডামির স্বরূপ উপলব্ধিতে নাট্যদর্শককে সহযোগিতা করেছে।

নাটকের উল্লেখযোগ্য আরেকটি চরিত্র সুলতানার স্বামী গাফফার। মূলত, গাফফার চরিত্রটি নেপথ্য বা পরোক্ষ চরিত্র। তাকে কখনো মঞ্চে সরাসরি দেখা যায়নি। অন্য সক্রিয় চরিত্রগুলোর বক্তব্যে আমরা এ চরিত্রটি সম্পর্কে ধারণা পাই। গাফফার সরকারি চাকুরিজীবী, অর্ন্তমুখী এবং ধর্মভীরু চরিত্র।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে বিপর্যস্ত রাজনীতি-অর্থনীতি, ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ, বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর নব্যপাকিস্তানবাদের উত্থানের প্রেক্ষাপটে আচার- স্বর্বস্ব ধর্মাচারী গোষ্ঠির উপযুক্ত প্রতিনিধি এই গাফফার চরিত্র। সুলতানা-গাফ্ফার দম্পতির সন্তান না হওয়ার কারণ হিসেবে পাফারকেই দায়ী করে নাসির, এবং সে গাফ্ফারকে নপুংসক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

তবে সে সত্যিকার অর্থে নপুংসক কি না সেটি স্পষ্ট না হলেও, সে যে দাম্পত্যজীবনে সুলতানাকে সুখী করতে পারেনি, সেটি সুলতানার একাধিক বক্তব্যে সুস্পষ্ট। রফিক ও নাসির যেমন সম্পদের নেশায় নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে উন্মাদপ্রায় হয়ে গেছে, তেমনি গাফ্ফার জাগতিক দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে পরকালের পুণ্যের আশায় উন্মত্ত হয়ে হারিয়েছে কর্তব্যবোধ, ঔচিত্যজ্ঞান।

সংসারে তার মন নেই, স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ভুলে গিয়ে তাকে নিতান্তই নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে। আবার সন্তান না হওয়াতে উপযুক্ত ডাক্তারের শরণাপন্ন না হয়ে তাকে নিয়ে গেছে মাজারে ধন্না দিতে। গাফফার নিজস্ব অক্ষমতাকে আড়াল করতে আশ্রয় নিয়েছে ধর্মীয় আচারের কাছে। সামাজিক হুজুকে আক্রান্ত হয়ে সে পরিবারকে উপেক্ষা করে সারারাত পড়ে থাকে এবাদতখানায়। সুলতানার আক্ষেপ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য :

আমার স্বামীটি

আল্লাহর খাতায় তার সোয়াবের সেভিংস খুলেছে। […]

পাশের মানুষটিকে যে-মানুষ অবহেলা করে,

ভালোবাসে আল্লা সে কি করে ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৯৬)

গাফফারের এই পলায়নবাদী, নির্লিপ্ত মানসিকতা ক্রমশ বিষিয়ে তুলেছে সুলতানার জীবন। বস্তুত, সুলতানার প্রতি গাফ্ফারের এই অবহেলাপূর্ণ আচরণ আমাদের আধুনিক শিক্ষিত সমাজের স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক মানবচৈতন্যকেই মনে করিয়ে দেয়। তবে গাফফারের এহেন আচরণের পেছনের কারণ সুলতানার জবানিতে নাট্যকার চমৎকার করে ব্যাখ্যা করেছেন।

বস্তুত, জাগতিক পঙ্কিলতায় অতিষ্ঠ হয়েই গাফ্ফার নির্লিপ্ত হয়ে গেছে। বিদ্যমান সমাজে ধর্মীয় আচার পালনের হুজুকও এক্ষেত্রে কিছুটা দায়ী। মানুষ আল্লাহকে পাবার জন্য নয়, আত্মশুদ্ধির জন্য নয়, আত্মতৃপ্তি কিংবা স্বীয় স্বার্থেই ধর্মকে প্রধান ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। গাফফারের এই অতিরিক্ত ধর্মপালন সম্পর্কে সুলতানা বলেছে :

আমি তো নিশ্চিত এটা তার পালাবার পথ মাত্র,

আর কিছু নয়। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ১৯৯)

অপরদিকে, নাটকের অন্যতম মীমাংসিত চরিত্র নাসির। তার কোনো আত্মদ্বন্দ্ব নেই, বিবেকের দহন নেই, অনুশোচনা নেই। আগাগোড়া পুরোটাই পাপে মোড়ানো সে। এ কারণে নাটকে তার চরিত্রের খুব বেশি উত্থান- পতন পরিলক্ষিত হয় না। নাটকের প্রারম্ভ পর্যায়ে তাকে যেমন দেখা যায় মদ্যপ অবস্থায় বারবনিতার সান্নিধ্যে, ঠিক তেমনি শেষদৃশ্যেও তাকে দেখা যায় আগাগোড়া কালো পোশাকে মুড়ে সদ্য কালোবেশধারী রফিককে নিজের কালোজগতে স্বাগত জানাতে। নাট্যকার ‘কুশীলব’ অংশে এই চরিত্রটির পরিচয় দিয়েছে নিম্নরূপ :

বয়স চল্লিশ পার হয়ে গেছে। বিবাহিত। রফিকুল ইসলামের মতোই আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, তবে আরো প্রতিষ্ঠিত এবং ধনবান। পরনে সাফারি সুট। গলায় সোনার চেন, মিনিয়েচার কোরানের লকেটসহ। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৫৫)

লেখকের এই বর্ণনা নাসিরের প্রতারণার দুটি দিক সুস্পষ্ট করেছে। এক. সে বিবাহিত হয়েও বারবনিতার সান্নিধ্যে গিয়ে নিজের হীনচরিত্র প্রমাণ করেছে; দুই. মদ্যপ, লম্পট ও দুর্নীতিবাজ হয়েও পবিত্র কোরানের লকেট পরে বক-ধার্মিক সেজে ধর্মকে নিজস্বার্থে ব্যবহার করেছে। নাসিরের জীবনে কোনো আলো নেই, পুরোটাই অন্ধকার।

যে-কোনো উপায়ে অর্থোপার্জন এবং উদ্দাম জীবনোপভোগই তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণ তত্ত্বানুসারে তার বিবেকবুদ্ধি পুরোটাই ইদম (Id) দ্বারা চালিত। দৈহিক ক্ষুধা আর জৈবিক ক্ষুধার বাইরে তার মধ্যে আর কোনো সুকুমার বোধ কাজ করে না।

নাটকের শুরু থেকেই সে নেতিচেতনায় আক্রান্ত। প্রত্যেকটি ইতির মধ্যে সে নেতি খুঁজে বের করেছে। যে কারণে রফিকের ফোন কেটে দেয়া ব্যক্তিকে সাধারণ কেউ না ভেবে, ভেবে বসেছে সুলতানার প্রেমিক। অর্থাৎ নিজের মন্দ চরিত্রের মতো সে সুলতানার চরিত্রে কালিমা দিতে একমুহূর্তও দ্বিধা করেনি। আবার, বন্ধু রফিকের মুখে সামান্য স্বপ্নের বর্ণনা শুনে ধূর্ত শেয়ালের মতো নেশা কাটিয়ে, সজাগ হয়ে তার মধ্যে অন্য অর্থ বের করার চেষ্টা করেছে।

নাট্যকার চমৎকার একটি প্রতীকের মাধ্যমে তার এই হীন ও ধূর্ত স্বভাবকে প্রকাশ করেছেন নিম্নরূপে :

যদিও সে আজ রাতে চেয়েছিল খুব

সুরার তুষার নদী, যুবতীর অশ্লীল আগুন,

[…] এখন সে ভুলে গেছে শরীরের ব্যবহারগুলো

অজস্র মুনিয়া পাখি অকস্মাৎ দেখে,

কুটিল দু’চোখে

পাখি-ধরা জাল সে দেখতে পায় রফিকের হাতে।

ক্রমে তার জেদ, ঈর্ষা কৌতূহল হয় –

তবে কি মানিকগঞ্জে সরকার বসাবেন রেল? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৬৪)

নাসিরের এই স্বভাবের সঙ্গে মানানসই করে নাট্যকার তার সংলাপও নির্মাণ করেছেন। একদিকে নাসির যেমন উচ্চবিত্ত, সম্পদশালী ব্যক্তির মতো ইংরেজির ফোয়ারা ছোটায়, তেমনি তার অন্তরের হীন ও কদর্যদিকের পরিচয় পাওয়া যায় সংলাপ বিনিময়কালে নানান অপভাষিক শব্দচয়নে। যেমন বন্ধু রফিককে উদ্দেশ্য করে উচ্চারিত সংলাপের ভাষায় সে ব্যবহার করেছে ‘সেয়ানা পোলা’, ‘বাপধন’, ‘মাইরি দোস্ত’, ‘ধানাই পানাই’, *শালা’, প্রভৃতি শব্দ। এমনকি উপমা চয়নেও রয়েছে অশ্লীলতার ইঙ্গিত। অল্প নেশাতেই রফিক মাতাল হলে সে বলেছে :

আজ কি নতুন আমি

দুলামিয়া, উঠতে না উঠতেই সব সয়লাব ?

লুংগি খাৱাব। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ১৬৬)

নাসিরের চোখে নারী শুধুই ভোগ্যবস্তু। যে কারণে সুলতানার চরিত্র নিয়ে সে অশ্লীল ইঙ্গিত করেছে। মিনতি তার চোখে নারী নয়, ‘নতুন মাল’। গাফ্ফারকে বলেছে নপুংসক। মূলত, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যারা দুর্নীতি করে, কালোবাজারি করে সম্পদের পাহাড় গড়েছে, এবং ধর্মকে যারা নিজস্বার্থে ব্যবহার করেছে, সেই লম্পট, ভণ্ড কপটশ্রেণির সার্থক প্রতিনিধি নাসির চরিত্র।

প্রকৃতপক্ষে, ‘কাব্যনাট্যে নাসিরের অবস্থান সংক্ষিপ্ত। কারণ, সে নিরেট চরিত্র। গোড়া থেকে সে স্থির। তার কোনো চিত্তবৈকল্য নেই। যা করে তার জন্য কোনো অনুতাপ নেই। বরং রফিককে নাসির-এ পরিণত করার জন্য নাট্যকার নাসিরের উপস্থিতি যতটুকু প্রযোজন, ততটুকু রেখেছেন।

এখানে এখন নাটকের প্রধান চরিত্র রফিক। রফিকের অন্তর্গত ইতি-নেতির দ্বন্দ্ব, টানপড়েন, ব্যবসায়িক উত্থান- পতন, তার প্রেম-ভালোবাসার রূপ-রূপান্তরই এ নাটকের মূল আখ্যান। সে অর্থে নাট্যঘটনার বিভিন্ন বাঁকে রফিকের সম্পৃক্ততাই অধিক। রফিক চরিত্রের দুটি দিক রয়েছে : সে নাসির চরিত্রটির মতো আদ্যস্ত অন্ধকারের বাসিন্দা নয়। তার হৃদয়ের অলিগলিতে বরাবরই রয়ে গেছে কিছু আলো-আঁধারি খেলা। যে কারণে মিনতিকে সে কিছুটা মানবতা দেখাতে পেরেছে, ছাত্রজীবনের কাঙ্ক্ষিত প্রেমাস্পদ সুলতানাকে একান্তে কাছে পেয়েও ভোগের নেশায় উন্মত্ত হয়ে ওঠেনি।

যদিও জীবনে উন্নতি আর অর্থ-খ্যাতির অদম্য লিপ্সা তাকে শেষপর্যন্ত বিবেকহীন করে দিয়েেেছ । নাটকের শুরুতে রফিক দ্বৈতসত্তা দ্বারা পরিচালিত। রফিকের এই দ্বিমুখী চরিত্রের আভাস নাট্যকার তার পোশাক বর্ণনার মাধ্যমেই দিয়েছেন। তার বাইরেটা সাফারি স্যুটের আড়ালে ঢাকা থাকলেও সে কুর্তা-শেলোয়ারেই সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। নাট্যকার এ প্রসঙ্গে লিখেছেন :

রফিকুল ইসলাম। বয়স পঁয়ত্রিশ। অবিবাহিত। ঠিকাদার মুৎসুদ্দি গোত্রীয় আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী। ঘরে সে কুর্তা শেলোয়ার পরে, বাইরে সাফারি সুট। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৫৫ )

রফিকের অন্তর্জাগতিক দ্বিধা নাটকের শুরু থেকেই সুস্পষ্ট। নাটকের প্রথম অঙ্কে শাদাবেশধারী তার পরিচয় জানিয়ে বলেছে – রফিকের ব্যবসার নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নেই। একদা-সহপাঠী সুলতানা-গাফফার দম্পতির – ফ্ল্যাটে সে সাবলেট থাকে। তার মরহুম পিতার ইচ্ছানুযায়ী দুপুরে ভাতঘুমের ইচ্ছে ছিলনা তার, কেননা ‘দুপুরে ঘুমায় শুধু শয়তান –’ তবু কোনো অসাবধান মুহূর্তে সে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েছিল।

শাদাবেশধারীদের এ সংলাপে বোঝা যায় রফিক কখনো শয়তান হতে চায়নি। কিন্তু ইতিচেতনায় সে জেগে থাকলেও নেতির প্রভাবে ঘুমিয়ে পড়েছে। অর্থাৎ শুভবোধকে লালন করতে চাইলেও বিদ্যমান অস্থির সমাজব্যবস্থা, অস্থিতিশীল রাজনৈতিক কাঠামো তাকে মোহান্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু এই অশুভ পরিস্থিতি তার মন তখনো পুরোপুরি মেনে নিতে পারছে না। ফলে এবসার্ড এই পরিস্থিতিতে সে অন্ধকার নয় আলোকই আকাঙ্ক্ষা করছে :

আজ শুক্রবার।

অন্ধকার, তবু ঘরে আলো নেই কেন ?

এভাবে এখন কেন তার কাছে মনে হয় সব কিছু ভীষণ ভঙ্গুর –

টেবিল, চেয়ার, টেলিফোন, দরোজা, দেয়াল,

এমনকি ক্যালেন্ডারের দিনের তারিখ ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৫৯)

বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে রফিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা মুখে বললেও তার সহপাঠী সুলতানা সে- কথা মেনে নিতে পারেনি। তাই স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশে যখন বিপ্লবের জোয়ার বইছে তখন রফিক সময়ের সাথে, পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে বিপ্লবের বড় বড় বুলি আওড়ালেও সুলতানার কাছে ‘ষোলো বছরের জানাশোনা রফিকের রাজনীতি-সংশ্লিষ্টতার প্রলাপ কপটতা মনে হয়েছে। রফিক যখনি তাকে বিপ্লবের প্রসঙ্গ টেনে ছাত্রজীবনে রাজনীতি করার কথা বলেছে, তখনি সুলতানা সন্দেহ নিয়ে তাকে স্পষ্ট জানিয়েছে :

না, ছাত্রজীবনে তুমি রাজনীতি করেছো বলে তো

মনে পড়ছে না, আজকাল গোপনে করছো নাকি ?

টপ করে উচ্চারণ করলে ‘বিপ্লব’। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ২০০ )

সুলতানার এ-মন্তব্যে সহজেই বোঝা যাচ্ছে, রাজনীতির এই ব্যবহার সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অপকৌশলমাত্র; যার সূচনা হয়েছে স্বাধীনতা-উত্তরকালে, বিশেষত পঁচাত্তরের পরবর্তী পর্যায়ে। সেই স্রোতের জোয়ারেই ছাত্রজীবনে গা বাঁচিয়ে চলা রফিক হঠাৎ করেই রাজনীতি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে, এবং সে-প্রসঙ্গ টেনে নানান ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করছে সুলতানার সঙ্গে একান্ত আলাপেও।

 

এখানে এখনের শৈলিবিচার

 

অথচ এই রফিক দেশের ক্রান্তিলগ্নে দেশের জন্য যুদ্ধ না করে পার্শ্ববর্তী দেশে সময় পার করেছে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হবার পর ভোল পাল্টে বনে গেছে দেশপ্রেমিক। নেতাদের সঙ্গে ওঠাবসা করে ব্যবসায়ী বন্ধু নাসিরের সহায়তায় হয়ে উঠেছে পাকা-পোক্ত আর্ন্তজাতিক ব্যবসায়ী।

নাটকার এর আগে তাঁর পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়ের পাইক চরিত্রটির মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন কীভাবে রাজাকার চরিত্রগুলি সময় ও পরিস্থিতি বদলের সঙ্গে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মিলেমিশে দেশপ্রেমিক সেজেছে। তেমনি এখানে এখন নাটকের রফিক চরিত্রটির মাধ্যমেও তিনি দেখিয়েছেন, একসময়ের রাজনীতিবিমুখ মানুষও কীভাবে স্বার্থের তাড়নায় রাজনীতিতে সরব হয় ; একটা সময় স্বপ্ন দেখে বড় নেতা হয়ে বিশাল জনসভায় বক্তৃতা দেবার :

আমি দেখলাম

মানিকগঞ্জের কাছে কোনো এক মফঃস্বলে গেছি,

কিসের বক্তৃতা আছে, কোনো এক সম্মেলনে,

আমি যেন প্রধান অতিথি। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ১৬২-১৬৩ )

রফিক চরিত্রটির আত্মিক দ্বন্দ্ব প্রকাশিত হয়েছে মূলত তার স্বপ্নদৃশ্যগুলোতে, কখনো কখনো পরাবাস্তবতার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন বেশধারী চরিত্রগুলির সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে। কিন্তু রফিক চরিত্রের অন্তর্গত স্বভাব সবথেকে বেশি প্রকাশিত হয়েছে ‘কলগার্ল’ মিনতির কাছে, যা সুলতানা কিংবা ব্যবসায়িক বন্ধু নাসিরের সঙ্গে হয়নি। প্রেমিকার সঙ্গে নয়, বন্ধুর সঙ্গে নয়, রফিককে তার হৃদয়ের অর্গল খুলে দিতে হচ্ছে এক সামান্য বারবনিতার কাছে।

মানুষের নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতাবোধের এর চেয়ে বড় দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে! নিজের দেখা অদ্ভুত স্বপ্নের মানে রফিক মিনতির কাছে জানতে চেয়েছে। তার অজানা ভীতি, নিদ্রাহীন ভয়ার্ত রজনীর রহস্য কেবল সে মিনতির কাছেই প্রকাশ করেছে :

বাস্তবের ভেতরে স্বপ্ন কতখানি প্রসারিত,

আর এই যে বাস্তব – কতটুকু স্বপ্নে তা প্রোথিত।

আসলে সমস্যা এই, স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে

কোনো স্পষ্ট সীমারেখা আছে কিনা ? যদি তা থাকেই,

তাহলে ভয়ের কি আছে ? কেন চোখ দেখবে ঘাতক ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৭৬)

দ্বিতীয় অঙ্কে অনামা ব্যাক্তির সঙ্গে আলাপের পর চরম উদ্ভ্রান্ত মুহূর্তেও সে আশ্রয় খুঁজতে গেছে মিনতির কাছে। কোনোরকম ভোগের আগ্রহ প্রকাশ না করে বরং বন্ধুর মতো, আপনজনের মতো নিজের স্বপ্ন আর বাস্তবের সেই পুরোনো আলাপ তুলেছে তার সঙ্গে।

আকুল কণ্ঠে আহবান জানিয়েছে : ‘মিনতি মিনতি তুমি বাড়ি আছো? বাড়িতেই আছো ?’ (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২২২) মিনতির কাছেই সে জানিয়েছে – মন তার দরকার নেই, দরকার নেই ভালবাসারও; বরং মনকে মাটিচাপা দিয়ে সে পোশাকি উন্নতি চায়। এই খ্যাতির পেছনে ছুটতে ছুটতে যাবতীয় ন্যায়বোধ যে সে ভাগাড়ে বিসর্জন দিয়েছে তা মিনতির কাছেই অবলীলায় প্রকাশ করেছে :

মন আমি গলা টিপে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি ভাগাড়ে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২২৩)

অবশ্য ততদিনে মিনতির অন্তরলালিত ভয় সত্যি হয়ে গেছে। সে তখন এসিড আক্রান্ত। রফিকের এই রূপান্তরসূত্রে সহজেই অনুমান করা যায়, গণবিচ্ছিন্ন রাজনীতি কীভাবে সাধারণ মানুষের মূল্যবোধ হরণ করে ধীরে ধীরে তাকে পশুতে পরিণত করে। এখানে এখন নাটক মূলত মূল্যবোধ হারানো সেই মানুষগুলোর বাস্তবচিত্র – যারা মানুষকে ব্যবহার করে নানা ভাবে, আর যাদের দ্বারা ব্যবহৃত হয় অন্যমানুষ। সমকালীন এই জীবনবাস্তবতা ধারণ করেই রফিক হয়ে উঠেছে এ নাটকের সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ উজ্জ্বল চরিত্র।

আধুনিক নাগরিক মানুষের একাকীত্ব, হতাশা, আত্মদ্বন্দ্ব কাব্যনাট্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়বস্তু। ব্যক্তিহৃদয়ের আত্মদ্বন্দ্ব সার্থক কাব্যরসে জারিত করে উপস্থাপন করাই কাব্যনাট্য রচনার প্রকৃষ্টতম কৌশল। এখানে এখন কাব্যনাটক সে বিবেচনায় চমৎকার ভাবে উৎরে গেছে। এখানে রফিকের মনোজগতে পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকা ইতি-নেতিবোধের দ্বন্দ্ব চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রতিনিয়ত ক্ষয়ে যেতে থাকা রফিক, দুর্নীতিতে তলিয়ে যেতে থাকা রফিক, মুসলিম হয়েও ইসলামের মূলনীতি থেকে সরে আসা রফিক, অর্থসম্পদের মোহে কাতর রফিক, প্রেমাস্পদকে ভালবেসে, তার পাশে থেকেও না পাওয়ার দ্বন্দ্বে প্রতিনিয়ত ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে রফিকের হৃদয়। আর এই দ্বন্দ্বই ধরা পড়েছে স্বপ্নে দেখা নানান দৃশ্যে, শাদা- কালো বেশধারী কিংবা অনামা ব্যক্তির সংলাপে।

রফিক প্রতিনিয়ত এক অজানা আতঙ্কে জীবন কাটিয়েছে। তার হৃদয়ে আত্মদ্বন্দ্ব ছিল দেখেই সে শুরু থেকে ভয়ের সঙ্গে বাস করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যে সুলতানা ছিল তার আরাধ্য, তাকে কাছে পেয়েও সম্ভোগের চিন্তা করেনি সে, পতিতা মিনতির সঙ্গে যথেষ্ঠ সংবেদনশীলতার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ করেছে। নাসির চরিত্র এই দ্বন্দ্বে ভোগেনি। তার কাঁটা প্রথম থেকেই নেতির দিকে হেলানো ছিল।

শেষপর্যন্ত রফিক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজের অন্তর্গত পসত্তাকে পরাজিত করতে পারেনি। যার ফলে সে বন্ধু নাসিরকে টেক্কা দিয়ে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে আরবের প্রজেক্ট থেকে সরিয়ে দিয়েছে, সুলতানার সঙ্গেও অসংযম আচরণ করেছে। তবুও পুরো নাটক জুড়ে তার আত্মদ্বন্দ্বই ক্রিয়াশীল থেকেছে।

সুলতানার আত্মদ্বন্দ্ব ও ক্ষরণ এ নাটকের অন্যতম আরেকটি দিক। প্রতিনিয়ত স্বামী গাফফারের অবহেলা তাকে কাঁটার মতো বিদ্ধ করেছে, তার নারীত্বের অহমকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে, কিন্তু সামাজিক চাপে পড়ে তাকে ছেড়ে যেতে না পারার কষ্ট, কিংবা সুলতানার ভাষায় ‘বন্ধনে অভ্যস্ত হলে মুক্তির উদ্যম কমে যায়’ তত্ত্বে স্বামীকে সহ্য করার দহনে ও মানসিক পীড়নে আলোচ্য কাব্যনাটকটি হয়ে উঠেছে রসঘন ।

সৈয়দ শামসুল হকের এ-কাব্যনাট্যে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি জীবনানন্দ দাশের (১৮৯৯-১৯৫৪) কবিতার প্রভাব লক্ষ করা যায়। যেমন, প্রথম অঙ্কে শাদাবেশধারীর একটি সংলাপে মানবচরিত্র সম্পর্কে প্রসঙ্গক্রমে বলা হয়েছে :

কে হায়, সভায় এসে নগ্ন হতে চায় ? (কাব্যনাট্যসমগ্র: ১৫৯)

আলোচ্য সংলাপের সঙ্গে স্পষ্টতই সাযুজ্য লক্ষ করা যায় জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন কাব্যের ‘হায় চিল’ নামক কবিতার ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে !” পক্তির সঙ্গে। আবার, যুদ্ধোত্তর সময়ে বাংলাদেশের বেহাল অবস্থা বোঝাতে তিনি জীবনানন্দের প্রিয় বেহুলা ও লখিন্দরের ভেলায় করে অনিশ্চিতের উদ্দেশ্যে যাত্রার (বেহুলাও একদিন গাঙুড়ের জলে ভেলা নিয়ে/কৃষ্ণা দ্বাদশীর জ্যোৎস্না যখন মরিয়া গেছে নদীর চড়ায়-)’ প্রত্নপ্রতিমা ব্যবহার করে লিখেছেন :

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গ মাইলের মতো এ বিশাল

মানচিত্রে নদীগুলো লাল রঙে এঁকে দিয়ে গেছে,

অথচ কোমল নীলে একদিন বোঝা যেত নদী;

উজ্জ্বল সবুজ রঙে সমতল পরিচিত ছিল,

এখন সেখানে কেউ ধূসরতা লেপে দিয়ে গেছে

এত মৃত্যু তারপর ভিন্নতর আরো মৃত্যু আছে ; […]

জননী ও জন্মভূমি মরা গাঙে ভেলা ভাসিয়েছে,

অবেলায় সে ভেলায় তার কোটি ছেলে শুয়ে আছে।

শিয়রে জননী জাগে, লাশ ভেসে যায় ইতিহাসে। (কাব্যনাট্যসমগ্র: 200-20১)

তবে কাব্যনাটকের মূলসুরে সৈয়দ শামসুল হক যেন অবচেতন সত্তায় ব্যবহার করেছেন জীবনান্দ দাশের মহাপৃথিবী (১৯৪৪) নামক কাব্যের ‘আদিম দেবতারা’ নামক কবিতার কয়েকটি পঙক্তিমালা। জীবনানন্দ দাশ বিশ্বযুদ্ধোত্তর বাস্তবতায় আধুনিক নাগরিক মানসের হতাশা, বিচ্ছিন্নতাবোধ ও সংকটের চিত্রায়ণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে ‘ব্যবহার’ শব্দের প্রয়োগ করেছিলেন আলোচ্য কবিতায়। কবিতাটির কিছু উল্লেখযোগ্য অংশ নিম্নরূপ :

আগুন বাতাস জল : আদিম দেবতারা তাদের সর্পিল পরিহাসে

তোমাকে দিলো রূপ –

[…] স্থূল হাতে ব্যবহৃত হ’য়ে তবু

তুমি মাটির পৃথিবীতে হারিয়ে যাচ্ছো;

আমি হারিয়ে যাচ্ছি সুদূর দ্বীপের নক্ষত্রের ছায়ার ভিতর।

[…] অবাক হ’য়ে ভাবি, আজ রাতে কোথায় তুমি ?

রূপ কেন নির্জন দেবদারু-দ্বীপের নক্ষত্রের ছায়া চেনে না –

পৃথিবীর সেই মানুষীর রূপ ?

স্থূল হাতে ব্যবহৃত হ’য়ে ব্যবহৃত ব্যবহৃত ব্যবহৃত ব্যবহৃত হ’য়ে

ব্যবহৃত ব্যবহৃত-

[…] ব্যবহৃত – ব্যবহৃত হয়ে শুয়োরের মাংস হয়ে যায় ?

 

এখানে এখনের শৈলিবিচার

 

জীবনানন্দ দাশ এখানে ভালবাসার গাঢ়তার পরিবর্তে স্কুলহাতের পরিহাসমূলক পৌনঃপুনিক ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন, যা নগরমানসের একধরনের বিকৃতিমাত্র। জীবনানন্দের এই বোধের সঙ্গে সৈয়দ শামুসুল হকের নাটকের মূল সুরের সাজুয্য পরিলক্ষিত হলেও আমাদের বিচারে সৈয়দ হকের ব্যবহার আরও বেশি ব্যাপক ও বিস্তৃত।

সৈয়দ হক কেবল ব্যবহৃত যে হয় তার ছবি আঁকেননি, বরং ব্যবহর্তার ছবিও এঁকেছেন সমান দক্ষতায়। এবং বলাবাহুল্য এখানে এখন নাটকের ব্যবহার কেবল নারী আর তার ভালোবাসা প্রসঙ্গে আটকে থাকেনি, এই ব্যবহার সর্বত্র : নারী পুরুষের ওপর, পুরুষ নারীর ওপর, দুর্বল সবলের ওপর, জনগণ রাষ্ট্রের ওপর, রাষ্ট্র জনগণের ওপর। যে কারণে সৈয়দ শামসুল হক সুস্পষ্ট ভাবেই বলেছেন :

এ কাহিনী আতংক অথবা প্রেমের ?

স্বাস্থ্যের ? অসুস্থতার ? এমনকি বলা যায়

তখনই তো বাধা থাকবে না বুঝে নিতে

যে কেবল রফিকের নয়

অথবা এ কাহিনীটা আমাদের অনেকেরই কিনা ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৫৯) বস্তুত, ‘সামাজিক জীবনের পটভূমিতে স্বার্থান্ধ, অধঃপতিত হাজারো মানুষের দু’ একজনকে উপলক্ষ করে এ কাব্যনাট্যের বিষয়বস্তু নির্দিষ্ট করা হয়েছে। প্রতিদিনের জীবনের সংঘাত, জ্বালা যন্ত্রণা, এবং সামাজিক মানুষের ব্যাক্তি উপলব্ধি নিয়ে এ কাব্যনাট্য। […] এখানে এখন কাব্যনাটক সমাজ সমস্যার আলোকে ব্যাক্তি মানুষের আত্মিক ব্যবচ্ছেদের নাটক। […] স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে ক্রমশ ধনলিপ্সুতার কারণে যে শ্রেণি বেড়ে উঠেছে তারা, এবং তাদের দ্বারা ব্যবহৃত নর-নারীকে নিয়েই এ নাটক।’

এখানে এখন নাটকটি দুটি বৃহৎ অঙ্কে বিভক্ত; এবং প্রচলিত গ্রিক নাটকের ফর্মের মতো কোনো দৃশ্যবিভাজন নেই। তবে নাটকের কাহিনির সূচনা- বিকাশ-পরিণতি রয়েছে ; যদিও এরিস্টটলের নাটকের রীতি অনুসারে নাটকের পঞ্চসূত্র এখানে অনুসরণ করা হয়নি। আবার, এখানে এখন নাটকে অসাধারণ কিছু নাট্যমুহূর্ত সৃষ্টিতে পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন নাট্যকার।যেমন : মুখোশধারীদের আগমনমুহূর্ত, নাসিরকে প্রতীকী গোসল করানোর সময়, অনামা ব্যক্তির আগমনকাল, সুলতানার প্রতি রফিকের আকস্মিক মনোভাব বদল, রহস্যজনকভাবে মিনতির মুখ এসিডে ঝলসে যাওয়া প্রভৃতি।

এগুলোর প্রত্যেকটি ঘটনাই দর্শককে টানটান উত্তেজনার মধ্যে ধরে রেখেছে। তবে নাটকের ফর্মে অভিনবত্ব থাকার কারণে এবং নাট্যঘটনা বর্ণনাধর্মী না হয়ে ইঙ্গিতপ্রধান হওয়ায় এ নাটকটি সর্বসাধারণের জন্য কিছুটা দুরূহ মনে হতে পারে। আমাদের বিবেচনায় বিদগ্ধজনের জন্য নির্মিত উচ্চমার্গীয় নাটক বলা যেতে পারে একে। তবে এখানে এখন নাটকটির পুরো প্রেক্ষাপটই বর্তমান বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে । তাই এখানে এখন নামকরণটিও অত্যন্ত সার্থক, শিল্পসফল ও বাস্তবসম্মত হয়েছে।

এখানে এখন নাটকে নাট্যকার তাঁর পূর্বতন কাব্যনাটকদুটির তুলনায় বেশি মঞ্চনির্দেশ ব্যবহার করেছেন। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, কিংবা নূরলদীনের সারাজীবনে যেখানে তিনি খোলা মঞ্চ ব্যবহারের কথা বলে একান্তই টুকটাক কিছু প্রয়োজনীয় নির্দেশনাবলি প্রদান করে নাট্য-উপস্থাপনের জন্য পুরোটাই ছেড়ে দিয়েছেন নাট্য পরিচালকের উপর, সেখানে এখানে এখন নাটকে সুস্পষ্ট করে প্রায় প্রতিটি দৃশ্যেই মঞ্চনিৰ্দেশনা সংযোজন করেছেন।

এ নাটকটি তিনি খোলা মঞ্চ নয় বরং প্রচলিত তিনদিকে আবৃত রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করার কথা বলেছেন। নাটকের প্রারম্ভে নাটকের সেট কেমন হবে তার একটি সুস্পষ্ট ধারণা তিনি ‘মঞ্চনির্দেশ” অংশে সংযোজন করেছে। এখানে এখন নাটকটির ফরমেট পাশ্চাত্য-নাটকঘেঁষা। লেখক তাঁর প্রবাসজীবনকালে লন্ডন থিয়েটোরে নানান আঙ্গিকের নাটক দেখার অভিজ্ঞতা হয়ত এক্ষেত্রে কাজে লাগাতে সচেষ্ট হয়েছেন।

সদ্য স্বাধীন দেশে নবগঠিত মঞ্চ ও মঞ্চকর্তারা কিছুটা পাশ্চত্যধাতের এ নাটকটির ফর্ম যেন ঠিকঠাক ধরতে পারে, সে কারণেই হয়তো লেখক এত গভীরে গিয়ে আলোচ্য নাটকের মঞ্চ নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি নাটকে আলোর নান্দনিক ব্যবহার, শব্দের সুষম ব্যবহারের উপর যেমন গুরুত্ব দিয়েছেন, তেমনি চরিত্রের প্রতিমুহূর্তের ক্রিয়াবলি, চরিত্রের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অভিব্যক্তি পর্যন্ত নিখুঁতভাবে মঞ্চ নির্দেশনায় সংযোজন করেছেন। যেমন : প্রথম অংকে রফিকুল ইসলামের অভিব্যক্তি কেমন হবে তা জানিয়ে লিখেছেন :

দূরে, বিছানায় রফিকুল ইসলাম হঠাৎ আর্তনাদ করে ঘুম ভেঙে উঠে বসে। খাটেই সে বসে থাকে। ভীত, সন্ত্রস্ত। মূর্তির মতো স্থির। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৫৮)

এখানে এখন নাটকটির মঞ্চ-নির্দেশ দিয়েছেন কুশলী নাট্যপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন। প্রযোজনা সংস্থা ছিল থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠী। মূলত সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম কাব্যনাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় মঞ্চে এনে থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠী সর্বমহলে দারুণ জনপ্রিয় এবং প্রশংসিত হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় তাঁরা দ্বিগুণ উৎসাহী হয়ে সৈয়দ শামসুল হকের আলোচ্য কাব্যনাটকটি মঞ্চে আনতে সচেষ্ট হয়। নাটকটির মূল ভাবনা প্রসঙ্গে নাটকটির প্রযোজক ও থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠীর পরিচালক নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার থিয়েটার পত্রিকার স্মরণিকায় নিম্নরূপ মন্তব্য করেছিলেন :

বাংলাদেশ আজ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। এক শ্রেণী ব্যবহার করে আর অপর শ্রেণী ব্যবহৃত হয়। বস্তুত ব্যবহৃত মানুষরাই প্রায় সমগ্র জনগোষ্ঠী। কিন্তু আমরা কি এ কারণেই স্বাধীনতা এনেছিলাম ভিন্নদেশী ভিন্নভাষী ব্যবহতাকে সরিয়ে নিজেরাই তা হতে ? এ প্রশ্নকে দর্শক মনে আন্দোলিত করার জন্যেই এ নাটক।’

দীর্ঘ অনুশীলনের পর ১৯৮২ সালের ৩০ ডিম্মেবর বাংলাদেশ মহিলা সমিতি মঞ্চে নাটকটির প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিল। এ প্রদর্শনীতে দর্শকসংখ্যা ছিল প্রায় দুশো থেকে আড়াইশো। এবং নাটকের টিকেটমূল্য ছিল আসনভেদে ত্রিশ ও পঞ্চাশ টাকা। তবে অনেক নাট্যবোদ্ধারা মনে করেন নাটকটির সময়ের চেয়ে অগ্রসর থিম এবং নাট্য পরিকল্পনার কারণে এ নাটকটি মঞ্চে ততটা সফল হয়ে উঠতে পারেনি। প্রথম মঞ্চায়নের পর ১৯৯৭ সাল অব্দি নাটকটির মাত্র ২৮ টি উপস্থাপনা ঘটেছিল।’ ফলে নাটকটিকে থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠীর মতো জনপ্রিয় নাট্যগোষ্ঠীর এক প্রকার ব্যর্থতাই বলা যেতে পারে। যেটি পরবর্তীকালে নাটকটির প্রযোজক রামেন্দু মজুমদার এক সাক্ষাৎকারে স্বীকারও করে নিয়েছিলেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন :

এখানে এখন ভিন্ন ধরনের কাব্যনাটক যা নাগরিক জীবনের নতুন দিক উন্মোচন করে। এ নাটকটি পড়ে আমাদের খুব ভালো লেগেছিল। নাটকটির মধ্য দিয়ে আমরা ঠিক দর্শকদের সাথে কম্যুনিকেট করতে পারিনি। এটা হয়তো থিমের কারণে দর্শকদের মাথার উপর দিয়ে গেছে বা আমাদেরও ব্যর্থতা হতে পারে যে, প্রযোজনায় দর্শকের কাছে সেটাকে আরো সহজ করে তুলতে পারিনি। কোনো-না- কোনো কারণে কম্যুনিকেশন হয়নি। যার ফলে যত বেশি অভিনয় হওয়া উচিত ছিল ততোটা হয়নি।

তবে নাট্যজন আতাউর রহমান সৈয়দ শামসুল হকের এখানে এখন নাটকটিকে একটি সুলিখিত কাব্যনাটক বলে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর মতে এখানে এখন নাটকটি আশানুরূপ মঞ্চসফল না হবার পশ্চাতে নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হকের কোনো ব্যর্থতা নেই; বরং ব্যর্থতা যদি থেকে থাকে, তবে সেটি থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠীর প্রযোজনায়, হতে পারে সেটি নির্দেশকের সীমাবদ্ধতা, কিংবা নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সু-অভিনয়ের ব্যর্থতা। এ প্রসঙ্গে এক আলোচনায় তিনি বলেন :

এখানে এখন খুব সুলিখিত একটি নাটক; কিন্তু থিয়েটার-এ নাটকটি নির্দেশনায় হোক, অভিনয়ে হোক যে কোনোভাবে হয়তো অবহেলা, অবজ্ঞার কারণে ঠিকমতো হ্যাণ্ডেল করতে না পারার কারণে কোনো জায়গায় দাঁড়ায় নি কিন্তু নাটকটি রচনার মধ্যে একটি গুণ ছিল।

থিয়েটার প্রযোজিত এখানে এখন নাটকের প্রথমদিকে মঞ্চপরিবেশনায় দেশের বিশিষ্টজন অভিনেতা-অভিনেত্রী অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন – মোহাম্মদ জাকারিয়া, তারিক আনাম খান, ফেরদৌসী মজুমদার, আব্দুল্লাহ আল মামুন, রামেন্দু মজুমদার, খায়রুল আলম সবুজ, শাওন ইমতিয়াজ, সমর দেব, ঝুঝুনা চৌধুরী, তোফা হাসান, আবরার মহম্মদ শাহীন, আসাদুজ্জামান নূর, ভাস্কর চক্রবর্তী, আবদুর রহিম দুলাল, জোবয়ের জার্সিস, হাফিজুর রহমান সুরুজ।

মঞ্চের পেছনে কলাকুশলী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন – নির্দেশনা : আবদুল্লাহ আল মামুন, মঞ্চ পরিকল্পনা, আলোক সম্পাত ও পোশাক পরিকল্পনা তারিক আনাম খান, প্রযোজনা : রামেন্দু মজুমদার। থিয়েটার প্রযোজিত এখানে এখন নাটক বাস্তবে মঞ্চে দেখার অভিজ্ঞতা নাট্যজন শফি আহমেদ এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এ নাটকটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন :

এখানে এখন বেশ সাহসী প্রযোজনা। এতে নাটকীয়তা ছিল না, দ্বন্দ্বের ব্যাপারটা ছিল না। তবে সংলাপ খুব ভালো ছিল। এ নাটকে আবদুল কাদের ভালো অভিনয় করেছিলেন। নাটকটি থিয়েটার হ্যাণ্ডেল করতে পারেনি । যেভাবে সংলাপগুলো একর পর এক এসেছে তাতে সম্ভাবনাও ছিল না। ২

এখানে এখন কাব্যনাটকটি মূলত লেখকের আশির দশকের বিখ্যাত উপন্যাস কালধর্ম (১৯৮৯)-এর কাব্যনাট্যরূপ। আর, যেকারণে উপন্যাসের সঙ্গে নাটকের চরিত্রের নাম, মূলকাহিনি এমনকি লেখনী প্যাটার্ন অনেক কিছুতেই সাযুজ্য পরিলক্ষিত হয়। তবে উপন্যাসের আঙ্গিক অনেক বেশি বিস্তৃত হবার কারণে সেখানে ডিটেইলসে সবকিছু বর্ণনা কারর সুযোগ পেয়েছেন লেখক।

 

এখানে এখনের শৈলিবিচার

 

অপরদিকে, কাব্যনাট্যকে অনেককিছুই ইঙ্গিত, সংকেত কিংবা রূপকী অর্থে প্রকাশিত হয়েছে । যারা লেখকের উভয় রচনার মনোযোগী পাঠক তারা লেখকের এই প্রচেষ্টা সহজেই ধরতে পারবেন। কিন্তু উভয় রচনার ঘটনায় খুব বেশি পার্থক্য না থাকায় পাঠকের কাছে এক রচনাশৈলীর চমক অনুধাবন ভিন্ন একঘেয়ে অনুভূত হবার যথেষ্ট সুযোগ থেকে যায়। অবশ্য নাটকে যে কথা পরিষ্কার উল্লেখ নেই সেটির বিস্তারিত জানার জন্য, চরিত্রের মনোকথন, উত্থান, পতন, কার্যকারণের প্রাক-ইতিহাস বিস্তারিত জানতে উপন্যাসটি প্রভূত সাহায্য করে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এখানে এখন নাটকের অস্তে আরবের কাজের কন্ট্রাক শেষপর্যন্ত কে পেল তা পরিস্কার করে বলা নেই। অনামা ব্যাক্তির সঙ্গে রফিকের আলাপে কেবল উল্লেখ আছে নানান অপকৌশল প্রয়োগ করলে রফিক কাজটি পেয়ে যেতে পারে। কিন্তু উপন্যাসে সুস্পষ্ট করে লেখক বর্ননা করেছেন কাজটি রফিক পেয়ে গেছে। প্রসঙ্গত উপন্যাসের কিছু এলাকা উপস্থাপন করা হল :

আহ, রফিকুল ইসলাম, […] তুমি কি মনে করেছ ব্যবসা তোমার হাতে ইতোমধ্যেই এসে গেছে, আর সেই জয়ের আনন্দে সুলতানাকে এখন তোমার অংশীদার করে নেওয়া দরকার ?

আবার, গাফফারের সঙ্গে সুলতানার তালাক হতে পারে নাটকে এমন একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন নাট্যকার। এবং দেখিয়েছেন সে তালাক হবার আগেই মদ্যপ রফিক সুলতানাকে ভোগ করার চেষ্টা করেছে।

কিন্তু উপন্যাসে বিস্তারিত ভাবে লিখেছেন গাফফারকে সুলতানা তালাক দেয়ায় সে ফ্লাট ছেড়ে গেছে। রফিককে সুলতানা চলে যেতে বলায় সেও বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। ফলে ফ্লাটে সুলতানা একা। এমনসময়ে মদ্যপ অবস্থায় রফিক তাকে ভোগ করতে চায়। কিন্তু তালাকের নিয়মানুসারে ইদ্দত পালনের আগে একনিষ্ঠ পবিত্র সুলতানা কোনোক্রমেই রফিক কতৃর্ক ব্যবহৃত হতে চায় না। উপন্যাসে নাট্যকার এ বিষয়গুলি পরিপূর্ণভাবে উল্লেখ করেছেন :

তালাক হয়ে যাবার পর গাফ্ফার এ ফ্লাট ছেড়ে দিয়েছে, সেই সঙ্গে রফিকুল ইসলামও। সুলতানা বলেছে, তার ইজ্জত পুরো না হওয়া পর্যন্ত রফিকুল ইসলাম যেন এ ফ্ল্যাটে বাস না করে।

কাব্যনাটক এখানে এখন এবং উপন্যাস কালধর্মের কাহিনি, চরিত্র ও উপস্থাপনের পাশাপাশি এ দুটি রচনার ভাষাগত মিলও উল্লেখযোগ্য। যেমন কাব্যনাটকের শুরুতে শাদাবেশধারীদের সংলাপে লেখক গল্প এগিয়ে নিয়ে গেছেন নিম্নোক্তভাবে :

আমরা এখন এই কাহিনীর অত্যন্ত গভীরে

যেতে চাই । কাহিনী খোলশ মাত্র, সে খোলশ ছিঁড়ে

ভেতরের দিকে দৃষ্টি দিতে চাই। যদি

তা সম্ভব হয় – আমাদের শংকা হয়, প্রবল চেষ্টাও

হয়ত বা ব্যর্থ হবে – (কাব্যনাট্যসমগ্র: ১৫৯)

অন্যদিকে, কালধর্ম উপন্যাসের সূচনাতে লেখক সৈয়দ শামসুল হক লেখকের সর্বজ্ঞদৃষ্টিকোণ থেকে লিখেছেন : আমরা এখন এই কাহিনীর গভীরে প্রবেশ করতে চাই, কাহিনী বস্তুত একটি খোলশ মাত্র, আমরা সেই খোলশ ছিঁড়ে ভেতরের দিকে দৃষ্টিপাত করতে চাই; যদি তা সম্ভব হয় – ব্যক্তিগতভাবে আমি আশংঙ্কা করি, আমাদের প্রবলতম চেষ্টাও ব্যর্থ হবে

আবার, উপন্যাসটি শেষ করেছেন লেখক কিছু জ্ঞিাসার মাধ্যমে। যে প্রশ্নগুলোর উত্তরের জন্য তিনি পাঠককে উপন্যাসের সঙ্গে একইসূত্রে গেঁথে ফেলেছেন। পাঠক এই প্রশ্নগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে উৎসাহী হয়ে উঠেছে। যেমন :

আমরাই কি শেষপর্যন্ত জানতে পারি যে এ কাহিনী প্রেমের অথবা আতঙ্কের, স্বাস্থ্যের অথবা অসুস্থতার ? ব্যক্তি বিশেষের অথবা সকলের ?

কাব্যনাটকে আমরা শাদাবেশধারীদের সংলাপে নাটকের প্রারম্ভেই এই প্রশ্নগুলো জানতে পারি। এখানে লেখক নাটকের শুরুতেই এই প্রশ্নগুলো করে দর্শককে একধরণের কৌতূহলে বেঁধে রেখে নাটকে মনোনিবেশী করে তুলেছেন, উপন্যানের সমাপ্তিতে তিনি যেটি অন্যত্র করেছেন। শাদাবেশধারীদের সংলাপে এই প্রশ্নগুলো উপস্থাপিত হয়েছে নিম্নোক্তভাবে :

[…] এ কাহিনী আতংকের অথবা প্রেমের ?

স্বাস্থ্যের ? অসুস্থতার ? এমনকি বলা যায়

তখনই তো বাঁধা থাকবে না বুঝে নিতে

যে কেবল রফিকের নয়

এ কাহিনী আমাদের অনেকেরই কিনা। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৫৯)

সৈয়দ হকের অন্যান্য নাটকের ভাষাশৈলীর মতো এ নাটকের সংলাপ ও ভাষাবিন্যাসে অসাধারণ কবিত্ব প্রত্যক্ষ করা যায়। অবশ্য একজন সফল কবির রচিত নাটকের ভাষা যে এমন হবে, সেটিই স্বাভাবিক। আবার, এ নাটকের প্রেক্ষাপট যেহেতু শহুরে, সে-কারণে নাট্যসংলাপ রচিত হয়েছে প্রমিত উচ্চারণে, তবে চরিত্রের মুখের সংলাপ যেন কৃত্রিম না হয়ে পড়ে, সেদিকে লক্ষ রেখে সংলাপের মধ্যে কথ্য ঢং ব্যবহার করেছেন নাট্যকার । নাসিরের বিভিন্ন সংলাপে সেটি সুস্পষ্ট। যেমন :

তুমি তো সেয়ানা পোলা, কথাটা কি মিছামিছি কবে ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৬৩)

আবার, বিভিন্ন স্থানের নাম কিংবা নির্দিষ্ট বিষয়কে সরাসরি না লিখে বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য অথবা রূপকাধারে প্রকাশ করে তা আরও মাধুর্যমণ্ডিত ও রহস্যময় করে তুলেছেন। যেমন বারবনিতার সঙ্গে সঙ্গমকে বলেছেন ‘মহাদেশ বিজয়, আরব্য টাকার টেন্ডার পাওয়াকে লিখেছেন ‘আরবি ঘোড়ার বাজিমাত’, আরব্যদেশের নাম সরাসরি না লিখে লিখেছেন ‘পেট্রো-ডিজেলের দেশ’, মতিঝিলকে লিখেছেন ‘বাণিজ্যিক এলাকা’ (বাণিজ্যিক এলাকার কোলে স্টেডিয়াম) ফুটবল খেলাকে লিখেছেন ‘ চামড়ার বল নিয়ে বাইশ জনের /মার-লাথি মার-ছুট ড্রিবল ফাউল পাস’ ইত্যাদি ।

নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক তাঁর এখানে এখন কাব্যনাটকের চরিত্রগুলোর সংলাপে বিদেশি শব্দ বিশেষত, ইংরেজি, ফার্সি, উর্দু শব্দের প্রয়োগ অত্যন্ত সচেতনভাবে করেছেন, যাতে ভাষিক দিক দিয়েও তৎকালীন সমাজ-রাষ্ট্রের পরিস্থিতি অনায়াসেই বোঝা যায়; যেমন উচ্চবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নাসিরের একটি সংলাপে একদিকে যেমন সমাজে বিদ্যমান উচ্চবিত্তশ্রেণির ভোগ-বিলাসিতার চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে, তেমনি এই চিত্রের বাস্তবরূপ দিতে নাট্যকার মিশ্রভাষার সংলাপ প্রয়োগ করেছেন।

সংলাপে স্বাভাবিকতা আনয়নের প্রয়োজনে তিনি অনেক শব্দের কথ্য উচ্চারণ-রূপ বজায় রেখেছেন সচেতনভাবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গ্লাসকে বলেছেন ‘গেলাশ। আলোচ্য নাটকের প্রাসঙ্গিক এলাকা উল্লেখ করা যেতে পারে :

জলদি গেলাশ নিয়ে এসো। সোডা আছে? নেই? থাক ।

পানিতেই চলে যাবে। বরফ তো আছে?

চমৎকার বাড়িটি তোমার, দোস্ত, বিলকুল ফাঁকা,

সারারাত জোর হল্লা হবে। যদি চাও

মহাদেশে তুমি আগে যাবে, ইটস এ ফেয়ার ডিল,

ব্যাচেলর আগে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৬৪)

অপরদিকে, অনামা ব্যক্তি রফিকের সঙ্গে আরবদেশের টাকায় পাওয়া কাজের টেন্ডার নিয়ে আলাপ করার সময় আরবি ভাষার শব্দ প্রযুক্ত হয়েছে :

আহলান সাহলান – আরবিতে স্বাগতম। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২২১)

কাব্যনাট্যের অনেক স্থানে নিম্নশ্রেণির মুখের ভাষা প্রয়োগ করে তিনি বুঝিয়েছেন, স্বাধীনতা-উত্তরকালে নবরাষ্ট্র বাংলাদেশে হঠাৎ করেই ফুলে-ফেঁপে ওঠা ধনিক শ্রেণি অর্থ অর্জন করেছে বটে, কিন্তু রুচিমান হয়নি। তারা নারীকে বলছে ‘মাল’, কন্ট্রাক্ট পাওয়াকে বলছে ‘দাঁও মারা’, আবার ইতর শব্দ ‘মাইরি’, ‘শালা’ প্রভৃতি বলতেও দ্বিধা করছে না। যেমন, রফিকের রেল বিষয়ক স্বপ্নের ভিন্ন অর্থ করে নাসির উতলা হয়ে তাকে বলছে :

বন্ধু হলে অবশ্যই তুমি

আমাকে বলতে, মিয়া, ব্যাবসাটা কত বড় ? কোন

দেশ মাল দিচ্ছে? ডলার না দিরহাম ? কবে রেল

বসবে সেখানে ? বড় দাঁও মেরেছো, মাইরি দোস্ত,

জিন্দাবাদ তুমি। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৬৫)

আলোচ্য কাব্যনাটকের প্রেক্ষাপট শহরে হওয়ায় এর ভাষা যেমন আঞ্চলিকতাবর্জিত, ঠিক তেমনি পূর্বতন নাটকগুলির মতো অজস্র উপমা অলংকার ব্যবহার করেননি লেখক। তবু গদ্যকবিতার ঢঙে লেখা সংলাপে যেটুকু অলঙ্কার প্রয়োগ করেছেন, নান্দনিকতার বিচারে তা শিল্পোত্তীর্ণ ও সফল। নিম্নে এমন কিছু উপমা, রূপক, অলঙ্কারের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হল :

উপমা

১. সংজ্ঞাগুলো মানবিক ঘুঙুরের মতো

যার পায়ে থাকে তারই নর্তনের তালে তালে রুনু ঝুনু বাজে। (কাব্যনাট্যসম : ২১৪)

২. একটি মানুষ – আমি তাকে প্রায় প্রতিদিন টের পাই খুব কাছে আছে;

যেমন গাছের গায়ে ঘ্রাণ পাওয়া যায়, (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৭৪)

উৎপ্রেক্ষা :

১. হঠাৎ বাতাসে নদী যেভাবে কুঁচকে যায়, স্তব্ধতাও যেন

ঠিক সেই ভাবে তখন কুঞ্চিত হয়ে গিয়েছিল। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৬০ )

২. কণ্ঠে তার পরিহাস ছিল,

যেন পাতলা ছুরি দিয়ে বাজারে কসাই

মাংসের গোলাপি মেদ পরীক্ষা করছে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৭৮)

৩. যখন সে কাছে টানে

নিতান্তই প্রয়োজনে তার – নির্মম, সংক্ষিপ্ত দ্রুত –

তারপর ছুঁড়ে ফ্যালে, যেন নষ্ট জামা তার বউ। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৯৬)

রূপক:

নিজের দ্বিতীয় সত্তা নির্বিবাদে থাকে

নিজেরই ভেতরে,

বস্তি ও দালানগুলো পাশাপাশি থাকে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২০৪)।

 

এখানে এখনের শৈলিবিচার

 

পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় কিংবা নূরলদীনের সারাজীবন কাব্যনাটকের গ্রামীণ প্রেক্ষাপট কাটিয়ে নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক এখানে এখন নাটকে পুরোপুরি নাগরিক লেখক। যে-কারণে রূপক, উৎপ্রেক্ষা, উপমায় বাস্তবে দেখা নাগরিক অনুষঙ্গ কিংবা বাস্তবতা যুক্ত করেছেন তিনি। ঢাকা শহরের দালান ও বস্তির সমান্তরাল অবস্থান খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এবং নির্মম বাস্তবতা। আমেরিকার প্রাক্তন ফার্স্টলেডি হিলারি বিল ক্লিনটনকেও যা বিস্মিত করেছিল । এ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর লিভিং হিস্ট্রি (২০০৩) গ্রন্থে লিখেছেন :

বাংলাদেশ হলো এই ধরণীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সম্পদ ও দারিদ্র্যের উলঙ্গতম চিত্র আমি দেখেছি। ঢাকার হোটেল রুমের জানালা দিয়ে তাকিয়ে আমি দেখতে পেয়েছিলাম, একটি বাঁশের বেড়া চলে গেছে, যার একদিকে রয়েছে ঝুপড়ি আর আবর্জনার স্তূপ, আর আরেকদিকে রয়েছে সুইমিংপুল ও ক্যাবানা যেখানে আমার মতো অতিথিরা – পানীয় উপভোগ করতে পারে ও সাঁতার কাটতে পারে। এটা যেনো পৃথিবীর অর্থনীতির ঠিক দুইপ্রান্তকে একসাথে দেখা যেখানে এসে তারা মিশে গেছে’

চিত্রকল্প

প্রায় প্রতি পূর্ণিমার রাতে

১. নিজেকেই দেখতে পেতাম ঘন নীল কি সুন্দর শাড়ি পরে

মাঠের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি কতদূর দিগন্তের দিকে,

হাঁটছি না ভেসে যাচ্ছি সবুজ ঘাসের ঢেউ ছুঁয়ে ছুঁয়ে । (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৭২)

২. আমার এ আঙুলের ফাঁক দিয়ে বড় দ্রুতবেগে

দৃশ্যের অতীত আর দৃশ্যমান যাবতীয় অবিরল ঝরে যাচ্ছে, যায়,

কি শীতল হয়ে যাচ্ছে, নিভে যাচ্ছে, মরে যাচ্ছে, যায়

পৃথিবীর সমস্ত আগুন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৮৩)

৩. বড় দীর্ঘ সেই সাঁকো দাঁড়িয়ে রয়েছে।

আমি তার পরে লম্বমান

চারিদিকে নীল, তীব্র বিষ নীল

গলগল অবিরল গড়িয়ে পড়ছে,

পড়ছে পড়ছে

শুধু পতন পতন। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ২০৪)

প্রবাদ/ প্রবাদপ্রতিম বাক্য :

১. বন্ধনে অভ্যস্ত হলে উদ্যমের ধার ক্ষয়ে যায়। ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৯৬

২. জানেন তো কাতলের হা ছোট হয় না কখনো। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ২১৯)

৩. পুণ্যবান ছোঁয়ালেই পা চন্দন হয়ে যায় কাদা

পবিত্রের স্পর্শে সব হয়ে যায় অমল উত্তল। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ১৮৬)

এখানে এখন কাব্যনাটক স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের বিপযর্ন্ত সমাজ আর বিপন্ন মানবিক মূল্যবোধের অবিকল ছবি এঁকেছেন নাট্যকার। নাটকের নামকরণ থেকেই অনুধাবন করা যায় সমকালকে ধরার তীব্র ইচ্ছা তাঁর ছিল। আর তাকে বাস্তবিক করে উপস্থাপন করার নিমিত্তে আশ্রয় নিয়েছেন নিরীক্ষাধর্মী নাট্য-প্রকৌশলের। সবমিলিয়ে সৈয়দ হকের এখানে এখন কাব্যনাটকটি হয়ে উঠেছে যুদ্ধপরবর্তী সমাজব্যবস্থার শিল্পিত দলিল।

Leave a Comment