আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ ঋতুভিত্তিক উৎসবের ঐতিহ্য : বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। যা বাঙালির উৎসব এর অন্তর্গত।
ঋতুভিত্তিক উৎসবের ঐতিহ্য : বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী
গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশ মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার ধারক। এ দেশে বছরে ছয়টি ঋতুর আমেজ অনুভব করা যায়। প্রকৃতির পালাবদলের যে সৌন্দর্য তা মূলত গ্রামাঞ্চলে দৃশ্যমান হলেও, শহুরে জীবনে তার ক্ষণিক প্রভাব রীতিমতো সাড়া ফেলে। তাই ঋতু পরিক্রমার সাথে এক আকর্ষণ তৈরি হয় উৎসবের। এই উৎসব একেবারে লৌকিক এবং অনেকটাই প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ।
ঋতুভিত্তিক উৎসব ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে বাঙালির দ্বিধাহীন এক মহামিলনের উৎসব। এ উৎসব জাতির অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে সম্পর্কিত, অনাদিকালের বহু প্রতীক্ষিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ঋতুভিত্তিক উৎসবের সৃষ্টিশীলতা মনস্তাত্ত্বিকভাবে বাঙালিকে ঐতিহ্য নির্মাণে দিকনির্দেশনা দিয়েছে, সামাজিক মিলনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে, জাগিয়েছে দেশবোধ ও বিশ্ববোধ। ধর্মের সীমানা পেরিয়ে ব্যক্তি, পরিবার, স্থান, কাল আর জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে ঋতুউৎসব পেয়েছে সর্বজনীনতা। বৈচিত্রময় আচার-অনুষ্ঠান আর লৌকিক সংস্কারে উদযাপিত ঋতুভিত্তিক উৎসব বাঙালির কাছে হয়ে উঠেছে ‘মঙ্গলসূচক।
Festivals of Bangladesh গ্রন্থের ভূমিকায় আনিসুজ্জামান লিখেছেন : Festivals tell us a lot about a nation- its history and tradition, religious beliefs and cultural patterns, ways of life and aesthetic development. Bangladesh is a new country but an old land. It has been a part of a changing whole known as Bengal. Its history goes back to over three millenia. It is home to Muslims, Hindus, Buddhists, Christians and followers of other faihs. Peoples of various ethnic origins live here. It is no wonder, therefore, that the festivals of Bangladesh should reflect this diversity. (Anisuzzaman, Foreword)
সংস্কৃতির আদান প্রদান আর উৎসবের ঐতিহ্যবাহী অনুষঙ্গ উৎসব আয়োজনকে যেমন স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত করেছে, তেমনি এ উৎসব যুথবদ্ধ সমাজজীবনে মানুষকে করেছে মানবিক, সহমর্মী, সহনশীল ও একাত্ম; দূর করেছে জাতিগত বিভেদচিহ্ন। স্বাধীনতা-উত্তর কাল থেকে ঋতু উৎসবগুলো পর্যায়ক্রমে বাঙালির মননে প্রথিত হয়ে পরিণত হয়েছে প্রাণের উৎসবে। সময়ের সাথে উৎসবের আঙ্গিকগত বিবর্তন হলেও, বাঙালির আত্মপরিচয়ের সূত্র অনুসন্ধানে এই উৎসবের ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এক অর্থে পারস্পরিক সংস্কৃতিগত ভিন্নতার রূপ তুলে ধরে তাকে উপায়, উপকরণ ও বোধের সাথে যুক্ত করে। তাই একে শ্রদ্ধা করা সকল দেশেরই দ্বায়িত্ব, বলে মনে করেন ওমর বিশ্বাস। এ প্রসঙ্গে তিনি (২০০৪ : ৩১৬) Goals of Culture and Art থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন, ‘Cultural heritage is a key to understanding how each culture has its own principles of knowledge organization interpretation and expression.’
এখানে আরও বলা হয়েছে, জানা, দেখা ও বোঝার মাধ্যমে এবং নিপুণতার সাথে অনুশীলনের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক এই উপলব্ধি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সংস্কৃতির সাথে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলে। ওমর বিশ্বাসের মতে, বাঙালি যেহেতু বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তার ঐতিহ্যের প্রতিনিধি, তাই স্বাতন্ত্র্যবোধ তার বজায় রাখা উচিত।
ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি ধারণার মূল প্রবক্তা এস এরিকসনের (S. Erixon) মতে, সকল সংস্কৃতির মধ্যে ঐতিহ্যিক উপাদান রয়েছে এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য লোকসংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যসূচক অনুষঙ্গ, এমন তথ্য পাওয়া যায় ফিরোজ মাহমুদের (২০০৭ ৪৮৪-৪৮৫) লেখায়। এরিকসনের উদ্ধৃতি এভাবে ব্যাখ্যা করেন ফিরোজ সমাজের সকল স্তরেই এমন কিছু প্রথাগত সংস্কৃতি রয়েছে যা ঐতিহ্যগত হিসেবে বিবেচিত।
সুতরাং ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি দীর্ঘদিন ধরে একই আঙ্গিকে এবং প্রকাশ ভঙ্গিতে প্রচলিত হয়ে আসছে। যে সংস্কৃতির ভিত্তি যত বেশি মজবুত, সে সংস্কৃতি তত বেশি ঐতিহ্যনির্ভর। দৃষ্টান্তস্বরূপ আধুনিক সংস্কৃতির তুলনায় লোকসংস্কৃতি গভীরভাবে ঐতিহ্যনির্ভর বলেও উল্লেখ করা হয়।
তবে, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি হচ্ছে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত আচার-আচরণ, বিশ্বাস-সংস্কার, শিল্প, প্রাতিষ্ঠানিকতা এবং মানুষের যাবতীয় কর্মের ও সৃষ্টিশীলতার সামগ্রিক প্রকাশ। সংস্কৃতির সেই ধারায় বাংলা বারো মাস এবং ছয় ঋতুর উৎসবগুলো তার ঐতিহ্য ধারণ করে স্বমহিমায় উজ্জ্বল।
ক. ঋতুভিত্তিক উৎসবের ঐতিহ্য : বাঙালি
বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে বছরের প্রথম ঋতু গ্রীষ্ম। আর বৈশাখ ও জৈষ্ঠ্য মাস নিয়ে গ্রীষ্মকালীন ঋতু উৎসবমুখর হয় পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণের বর্ণাঢ্য আয়োজনে। বাঙালির প্রধান উৎসবের তালিকায় পহেলা বৈশাখে ঐতিহ্যবাহী আয়োজনে বাংলা বর্ষবরণসহ অন্যান্য ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলো নিঃসন্দেহে অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক উৎসবের অংশ।
পহেলা বৈশাখ
ঋতু বৈচিত্র্যের এই বাংলাদেশে মানুষের জীবনে যে বর্ষপরিক্রমা, তার শেকড় প্রোথিত এই বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখে। তাই নববর্ষের এই আয়োজন কেবলই বাঙালি জাতির মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার নয়, তা বাঙালি জাতির মানবিক মূল্যবোধ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা চর্চার পথ প্রদর্শক। যা যুগে যুগে মানুষকে জীবন বোধে উজ্জীবিত করেছে। তাই কাঙ্ক্ষিত এই ক্ষণকে আপন আলোয় বরণ করতে দেখা যায় নানা আয়োজন।
অনাদিকাল থেকে বৈশাখের প্রথম দিনটি পালিত হয়ে আসছে বাংলা নববর্ষ বরণের দিন হিসেবে। এ দিনটি এলে একটি নতুন আনন্দ মানবজীবনকে ঘিরে রাখে। নতুন একটি বছরের আগমন, জাতিগত উপলব্ধিতে বয়ে আনে নতুন আশা, খুলে দেয় সম্ভাবনার দ্বার। জীবনের আকাঙ্ক্ষা, প্রাপ্তি আর অর্জনের হিসেবের পাশে, সমৃদ্ধ অতীতের অভিজ্ঞতাপুষ্ট জাতি, আগত বছরটিকে প্রত্যাশিত করে তুলতে চায় অভিন্ন উদযাপনের মাধ্যমে। বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ ক্ষণিকের জন্য হলেও তৈরি করে তেমনি এক মিলনক্ষেত্র।
চৈত্র-অবসানে বর্ষবিদায়ের সাথে শুরু হয় নববর্ষের সূচনা। আর এই নববর্ষকে বরণ করে নেয়ার আয়োজনই হলো পহেলা বৈশাখ । অনাগত ভবিষ্যতের শুভ কামনা জানানোই নববর্ষের প্রধান শিক্ষা; এমনটাই মনে করেন মোহম্মদ আব্দুল কাইউম :
এক অর্থে নববর্ষের দিন হচ্ছে হিসেব মেলানোর দিন। চাষী হিসেব করে তার ফসলের জমিদার হিসেব করে তার খাজনার আয়-ব্যায়ের, আর দোকানদার করে তার লাভ-লোকসানের হিসেব। সাধারণ মানু এর ব্যতিক্রম নয়, তাদের জন্যও নববর্ষ হিসেব মেলানোর দিন। জীবনের সফলতা-ব্যর্থতার অঙ্ক কষে তার নতুন আশা-আনন্দে, হাসিমুখে নববর্ষকে আহ্বান জানায়। (কাইউম, ২০০১ : ৩৩৩ )
এভাবেই ‘অতীতের সাফল্য এবং ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে বাঙালি প্রার্থনা জানায় নতুন বছরের সূর্যোদয়ে আর একটি পরিপূর্ণ সফল বছরকে প্রত্যক্ষ করার আশায়। তাই তো বিভিন্ন উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে তারা বরণ করে নেয় নতুন বছরকে (শামসুল হুদা, ২০০১: ১৬২)। এই কথার সূত্র ধরে বলা যায়, বাংলা নববর্ষের এই উৎসব-ঐতিহ্য প্রাচীন হলেও সময়ের সাথে এর সংস্কার, উদযাপনের বিশেষত্ব, সৃষ্টিশীল আয়োজন আর জাতিগত সম্মিলনের আবহে পহেলা বৈশাখ যুগে যুগে ধরা দেয় নতুন রূপে ।
নববর্ষের প্রথম দিন শুচিতা, শুদ্ধতা ও পূর্ণতার পথে জীবনের প্রত্যাশিত স্বপ্ন ও শপথ নবায়নের দিন। একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর সম্মিলন প্রয়াসের সফল প্রকাশ নববর্ষ এমন মত দিয়ে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম (২০০১ – : ৬৬-৬৭) বাঙালির বর্ষবরণ উৎসবকে তার জাতিসত্তাগত স্বাতন্ত্র্য এবং অখণ্ডতা উদযাপনের উৎসব বলে সংজ্ঞায়িত করেন।
বাংলা নববর্ষকে ‘পৃথিবীর এক বিরল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উৎসব’ হিসেবে বিশেষায়িত করে, মুনতাসির মামুন (২০০১ : ৯৬) একে একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ অনুষ্ঠান এবং খাঁটি বাঙালি উৎসব বলে মত দেন। তৃণমূল থেকে শহরের সব পর্যায়ে নববর্ষ পালিত হয় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে। এর বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে মুনতাসির বলেন, “মুসলিম অধ্যুষিত একটি ভুখণ্ডের উৎসব সত্ত্বেও তা বিষাদময় নয়; রাষ্ট্র অন্যান্য ক্ষেত্রে সফল হলেও এ ক্ষেত্রে পারেনি ধর্মজ উপাদান যোগ করতে। শুধু তাই নয়, এখনও এ নববর্ষ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও যোগ করে নতুন মাত্রা।’ (মুনতাসির, ২০০১ : ৯৬)
নববর্ষ পালনের প্রাচীন ও আধুনিক রীতিনীতির প্রতি বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যায়, গোড়ায় নববর্ষ ছিল মানুষের ‘আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব। ফজল খান (২০০১ : ৩২৬) এ প্রসঙ্গে বলেন, ঋতুধর্মী বলে কৃষির সাথেও এর সম্বন্ধ ছিল অতি ঘনিষ্ঠ ।
নববর্ষের তাৎপর্য সমাজৈতিহাসিক এবং সে কারণেই এর ব্যঞ্জনা অনেক গভীর। এই মতের সাথে শফিক আহমেদ যুক্ত করেন, নবান্ন বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিত উৎসবের সুগন্ধ। সেই কাল থেকে নববর্ষ আমাদের জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। সমাজতান্ত্রিক বা নৃতাত্ত্বিক অর্থে একে বলে ঐতিহ্য বা উত্তরাধিকার; আচরণের, সংস্কৃতির, মানবিক ও সামাজিক সম্পর্কের। নববর্ষ ছিল সকলের, কৃষকের, দিনমজুরের, দোকানদারের জমিদারের কবিয়ালের ভিক্ষুকের এবং দাতার। (শফি, ২০০১ ২১৭ )
তবে, পহেলা বৈশাখ উদযাপনের একটি লক্ষ্য থাকা উচিৎ বলে মনে করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, যে লক্ষ্য বাঙালিকে দেবে তার শেকড়ের সন্ধান :
লক্ষ্যটা কেবল যে অনুভব তা নয়, সে একটা আকাঙ্ক্ষাও বটে। আকাঙ্ক্ষার জন্যই সে তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা চাই নতুন বছর পুরাতন বছর থেকে ভিন্ন হবে। নতুন বছরে সুখ আসবে উন্নতি দেখা দেবে। আমরা এগুতে পারব নতুন একটি সমাজের দিকে। সেখানে আনন্দ থাকবে একদিনের নয়। প্রতিদিনের। আর সেই সুখের অন্তরে থাকবে আত্মপরিচয়ের গৌরব ও আশ্রয় লাভের স্বস্তি এবং তা পূর্ণ হবে ঐক্যে। কেবল মিলন নয়। ঐক্যও। অন্যসব বাঙালির সঙ্গে স্থায়ীভাবে মিলবো আমরা ঐক্যবদ্ধ হবো প্রকৃতি এবং পরিবেশের সঙ্গেও। (সিরাজুল, ২০০১৩৪৭)
ঋতুচক্রের আবর্তনে প্রতিবছর নববর্ষ উদযাপনের সময়টায় প্রকৃতির বৈরী আবহাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির আশঙ্কা থেকে যায়। ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে নববর্ষকে নবরূপে বরণ করা অনেকটাই দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। তারপরও থেমে থাকে না নাগরিক জীবনে বর্ষ আবাহন। এ বিষয়ে হাবিবুর রহমান বলেন, ‘পুরাতনের মধ্যে যে জীর্ণতা আছে তা তো ধ্বংস হবেই, তাই বলে পুরাতনের মধ্যে যে চিরনবীনতা রয়েছে তাকে কেন আমরা আমন্ত্রণ জানাব না।’ (হাবিবুর, ২০০১: ৬২)
ঐতিহ্যগতভাবেই বেশ কিছু বর্ণাঢ্য আয়োজনে মিশে আছে নববর্ষের আমেজ। সময়ের সাথে এর অনেক কিছু বিলুপ্ত বা বিবর্তিত হলেও, পহেলা বৈশাখের স্বাতন্ত্র্য বলতে এখনও গুরুত্ব বহন করে বর্ণিল, আনন্দমুখর আয়োজন।
পুণ্যাহ
বাংলা বছরের প্রথম দিনটি পুণ্যাহ নামে প্রচলিত ছিল। মূলত পুণ্য দিন বা পুণ্য কর্ম দ্বারা উদযাপনীয় বিধায় এ দিনটিকে বলা হত পুণ্যাহ ।
পুণ্যাহর উদ্ভব সম্পর্কে তেমনভাবে জানা না গেলেও, মুনতাসীর মামুন মনে করেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিলুপ্তির পূর্ব পর্যন্ত তা ছিল এবং পুণ্যাহ যুক্ত ছিল নববর্ষের সাথে। ওইদিন প্রজারা ভালো পোশাক-আশাক পরে জমিদারির কাছারিতে যেতেন খাজনা-নজরানা দিতে, যেন পুণ্য কাজ করতে যাচ্ছেন। পুণ্য থেকেই পুণ্যাহ। (মুনতাসীর, ১৯৯৪ : ৯৬)
পুণ্যাহের অনুষ্ঠানে বকেয়া খাজনাও আদায় করা হত কঠোরভাবে। এর প্রক্রিয়া ছিল দুই ধরনের একটি সেলামি বা নমস্কারি অংশ, অপরটি বকেয়া বা হালনাগাদ খাজনা আদায় অংশ। এমনি নানা আনুষ্ঠানিকতার উল্লেখ করে করুণাময় গোস্বামী লিখেছেন :
কাছারি মূল অনুষ্ঠানগৃহের প্রধান দরজার সামনে একটি বিশালাকার পেতলের বা তামার থালা থাকত। তাতে প্রজারা এক টাকা, দু টাকা পাঁচ টাকা করে রেখে আসত। এটাকে বলা হতো সেলামি বা নমস্কারি এর সঙ্গে মূল খাজনা শোধের কোনো সম্পর্ক নেই। সেরেস্তায় বা খাজনা আদায়ের নির্ধারিত অফিস ঘরে নায়েব-তহসিলদাররা খাজনা রেখে রসিদ দিতেন। জমিদারি গৃহ সাজানো হত, গান-বাজনা হত, যাত্রা নাটক হত, বড়ো জমিদাররা পুণ্যাহতে বাইজি নাচের আয়োজন করতেন। আনন্দ ছিল, আপ্যায়ন ছিল, লোক সমাগমও ছিল প্রচুর। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য ছিল বকেয়া ও হালনাগাদ খাজনা আদায়। সেই আনন্দ ও আপ্যায়নের মধ্যেই সেরেস্তা ঘর ভারি হয়ে উঠত দরিদ্র কৃষকের লাঞ্ছনায়, খাজনা দিতে না পারার অপরাধে। (করুণাম ২০০১ ৬৮)
এই আনুষ্ঠানিকতা প্রসঙ্গে সমীররঞ্জন শীল (২০০১: ১৯০) যোগ করেন, পুণ্যাহতে জমিদারকে একটি রূপার কাঁচা টাকা দেয়ার বিনিময়ে মিলত একজোড়া ছানা সন্দেশ। প্রজাদের মনোরঞ্জনের জন্য স্থানীয় লাঠিয়ালদের লাঠি খেলা দেখানো হত। তাদের ঢাল, সড়কি ও লাঠির সঙ্গে ছিল আক্রমণাত্মক অঙ্গভঙ্গি ও বজ্রকন্ঠের হাঁক-ডাক।
জমিদারি প্রথা যতদিন চালু ছিল ততদিন বাংলা নববর্ষ অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ পুণ্যাহ হিসেবে পালিত হত। জমিদারি প্রথাবিলোপ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই আনুষ্ঠানিকতা বিলোপ হলেও, এর কিছু রেষ রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান (২০০১ ৬২)। যার নিদর্শন, এখনও পহেলা বৈশাখ থেকে সরকারি জমিজমার ইজারা পত্তন শুরুর বিষয়টি।
প্রচীন বাংলায় পুণ্যাহ ছিল প্রজা কর্তৃক জমিদারকে আনুগত্য, নিয়মানুবর্তীতা ও সহনশীলতা প্রদর্শনের মাধ্যম। সামন্তবাদী ভূমিব্যবস্থায় এই আয়োজন কার্যকর ছিল সর্বতোভাবে।
হালখাতা
অতীতে বাংলা বছরের প্রথম দিন হিন্দু ব্যবসায়ীরা লেনদেনের জন্য পুরোনো খাতা পরিবর্তন করে নতুন খাতা খুলতেন, যেটা হালখাতা নামে পরিচিত ছিল।
হালখাতা অবশ্য এখনও অটুট উল্লেখ করে মুনতাসীর মামুন (১৯৯৪ : ৯৬) লিখেছেন, প্রধানত ব্যবসায়ী মহল এটি পালন করে। নববর্ষের দিন, ব্যবসায়ীরা পুরনো বছরের হিসাব-নিকাশ সারে। এজন্য অনেক ক্ষেত্রে লাল কাপড়ের মলাটের এক বিশেষ খাতা ব্যবহার করে, যাকে খেরো খাতা বলা হয়। সেদিন দোকানে কেউ গেলেই মিষ্টি খাওয়ানো হয়। শুধু তাই নয়, ঢাকা শহরের অনেক মধ্যবিত্ত আজকাল নববর্ষ উপলক্ষে মিষ্টি কেনেন, ভালো খাবারের আয়োজন করেন।
দোকানদার-মহাজনদের বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে হালখাতা অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য, খরিদদারদের কাছ থেকে প্রাপ্তি উসুল করে মিষ্টিমুখ করানো। স্বার্থবুদ্ধির আড়ালে এই আনুষ্ঠানিকতা পাওনা আদায়ের নামান্তর – এমন অভিমত ব্যাক্ত করে করুণাময় গোস্বামী (২০০১ : ৬৯) বলেন, জমিদারদের পুণ্যাহ বা দোকানদারদের হালখাতা যে নামেই নামকরণ হোক, উভয়েরই লক্ষ ছিল বকেয়া উসুল করা।
অনেকে মনে করেন নতুন বছরের প্রথম দিনটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসবের দিন। এমন ধারণার বিরোধীতা করে সৈয়দ আলী আহসান (২০০১ : ৩০-৩১) বলেন, এক সময় হিন্দু-মুসলিম উভয় জমিদাররাই বাংলা শাসন করেছেন। হিন্দু জমিদারদের সংখ্যাধিক্য থাকায়, তাঁরা ঘটা করে নববর্ষ পালন করতেন।
যদিও এই আনুষ্ঠানিকতার সাথে সনাতন ধর্ম বা সেই অনুসারী লোকদের সামাজিক ব্যবস্থার কোনো সম্পর্ক নেই। উনিশ শতক থেকে ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যন্ত যে কোনো লেনদেন, ব্যবসা এবং নানা প্রকার আড়তদারিতে হিন্দুদের অধিকার ছিল একচেটিয়া। তাই নববর্ষ উদযাপনের ক্ষেত্রেও মুসলমানদের চেয়ে তাদের তৎপরতা ছিল লক্ষণীয়।
বাংলা বছরের প্রথম দিন হিন্দু ব্যবসায়ীদের নতুন খাতা খোলার যে রীতি প্রচলিত ছিল, এখন ঐতিহ্য হিসেবে সে রীতি পালন করছেন মুসলমান ব্যবসায়ীরাও। এদিন ব্যবসায়ী মহলে বন্ধুদের আপ্যায়ণ করানোর রেওয়াজ বরাবরের মতোই প্রচলিত আছে। বর্তমানে ঢাকার চকবাজার, ইসলামপুর, বাদামতলী বা চুড়িহাট্টা মহল্লায় মুসলমান ব্যবসায়ীরা সেই নিয়ম ধরে রেখেছেন।
নববর্ষের আয়োজন যে শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝেই নয়, তৎকালীন মুসলমানদের আনুষ্ঠানিকতায়ও ছিল, এর স্বপক্ষে বলেছেন ওবায়দুল হক সরকারও। তিনি বলেন, ৩০ চৈত্র বাড়ির বাইরের কাছারি ঘর সাজাতে হত। রঙিন কাগজ কেটে লাগানো হত, কলাগাছ দিয়ে গেট সাজানো হত। গদি লাগানো হত খাটে। উপরে চাদোয়া টাঙাত। সেখানে পয়লা বৈশাখ ভোরে রূপার একটা বাক্স বসানো হত। সেই বাক্সে হাল খাতার টাকা পয়সা জমা হত তিন দিনব্যাপী। হালখাতা শুরুর আগে মিলাদ মাহফিল হত। ভোরে মসজিদে বিশেষ দোয়া চাওয়া হত। (ওবায়দুল, ২০০১ ৪৩ 88 )
তবে, পহেলা বৈশাখের সর্বজনীন স্বীকৃতি লাভ ও উদ্যাপর রীতি কোনো ধর্মীয় চেতনাকে বিঘ্নিত করেনি। সমীররঞ্জন শীল বলেন; হালখাতার নিমন্ত্রণ পত্রে শ্রী শ্রী সিদ্ধিদাতা গণেশায় নমঃ’ যেমন লেখা থাকত তেমনি থাকত ‘হাবিব সহায়’। ধর্মকে যারা এর সঙ্গে যুক্ত করেছে তারা তাদের হালখাতাসহ দৈনন্দিন জীবনের অনুষ্ঠানমালা অক্ষুন্ন রেখেও মেলার অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। (সমীর, ২০০১: ১৯)
মূলত, সর্বজনীন নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে হালখাতায় বাঙালির সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক এবং স্বাজাত্যবোধের মহান চেতনা প্রতীয়মান হয়।
নববর্ষের আঞ্চলিক অনুষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখ্য চাঁটগা শহরের জব্বারের বলী খেলা বা কুস্তি এমন তথ্য উল্লেখ করে মুনতাসীর মামুন (১৯৯৪ : ৯৭) জানাচ্ছেন, চাটগা শহরে এটি এখনও প্রবল উৎসাহ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে। রাজশাহীর গম্ভীরাও এমনি একটি অনুষ্ঠান। আরও প্রচলিত ছিল ঢাকার মুন্সীগঞ্জে গরুর দৌড় প্রতিযোগিতা।
চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখী মেলা
নতুন বছরকে বরণ করার জন্য গ্রামের মানুষের একটি প্রাচীন এবং আকর্ষণীয় আনন্দ উৎসব বৈশাখী মেলা। মধ্যরাত্রির উন্মাদনার মধ্য দিয়ে নয়, সূর্যোদয় লগ্নে, প্রভাতের স্নিগ্ধতায় শুরু বাঙালির নতুন বছর পহেলা বৈশাখ এ কথার সাথে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী (২০০১ : ৯১-৯২) আরও যোগ করেন, চৈত্র সংক্রান্তির মেলা ছিল সেই বর্ষবিদায়ের স্মারক।
নববর্ষের মৌলিক সত্তার প্রকাশ ঘটে বৈশাখী মেলার আয়োজনে। মেলার মূল আকর্ষণ বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান। এখানে ধর্ম-বর্ণ, সম্প্রদায়, পেশা নির্বিশেষে মানুষের ঢল নামে।
বৈশাখ এবং পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান মেলা। এক হিসাবে জানা যায়, সারা বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখে এবং বৈশাখের প্রথম সপ্তাহে প্রায় দুশো মেলা অনুষ্ঠিত হয় (মুনতাসীর, ১৯৯৪ ৯৭)। আমাদের দেশের ‘নববর্ষের’ মেলাগুলোও এদেশের প্রাচীনতম ‘আর্তব উৎসব’ ও ‘কৃষ্যৎসব’ প্রভৃতির বিবর্তিত রূপ ব্যতীত আর কিছুই নয়, এমন কথা বলেছেন মুনতাসীর মামুন (১৯৯৪ ৯৭)।
বৈশাখী মেলার একটি বৈশিষ্ট্য : অন্যান্য মেলায় ধর্মের উপাদান প্রবেশ করলেও বাংলাদেশের মেলায় তা হয়নি। এখনও তা কুটিরজাত পণ্যাদির বেচাকেনার মেলা। ঢাকা শহরের বা শহরাঞ্চলে আয়োজিত মেলায় মাটির ও কুটিরজাত পণ্যের সঙ্গে সঙ্গে গ্রন্থমেলারও আয়োজন করা হয়। এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠান নববর্ষের শুভেচ্ছা হিসেবে মক্কেলদের উপহার হিসেবে প্রেরণ করে বই।
গ্রামবাংলায় চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষের দিনে বটগাছের নিচে, নদীর পাড়ে বা খোলা মাঠে মেলা বসত বলে উল্লেখ করেন আ. ন. ম. নুরুল হক (২০০১ ১২২)। সরবয়সী মানুষের জন্যই দারুণ আকর্ষণীয় এ মেলায় বিক্রি হত ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খাবার মুড়কি, খই-বাতাসা, কদমা-মুরালি। চিনি দিয়ে ছাঁচে তৈরি হত নকশাদার মিঠাই, শিশুদের জন্য ছুতোরের তৈরি কাঠের খেলাঘর। মেলার বাড়তি আকর্ষণ ছিল নাগরদোলা: যা ছাড়া মেলার রূপই খলত না, বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পহেলা বৈশাখে মূলত চৈত্র সংক্রান্তির মেলার জাঁকজমকটা ছিল পুরনো ঢাকাতেই। কাইয়ুম চৌধুরী (২০০১ : ৩১২) তাঁর স্মৃতি বর্ণনায় যুক্ত করেন, রমনার রেসকোর্সে ঘোড়দৌড় হত এবং ঘুড়ি ওড়ানোটা তখন একটা সামাজিক উৎসব ছিল। পহেলা বৈশাখে কদমা, নুকুলদানা, বাঁশি, ঢোল ইত্যাদি জিনিস তরুণদের আকৃষ্ট করত।
সেকালে নববর্ষ উপলক্ষে আকর্ষণীয় খেলাধুলার মধ্যে ঘোড়দৌড় ছাড়াও ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, কুষ্টি, লাঠি খেলা, তলোয়ার খেলা, নৌকাবাইচ আরও অনেক রকম খেলাধুলার উল্লেখ পাওয়া যায়। গরুর দৌড় প্রতিযোগিতাও হত। এর পাশাপাশি কিছু লোকবিশ্বাস ও লোকক্রিয়ার প্রচলন ছিল বলে উল্লেখ করেন আ. ন. ম. নুরুল হক :
জোয়ালে একজোড়া করে গরু বেঁধে তার পিছনে মই বেঁধে দেয়া হত। মইয়ের উপর বসতেন গরুর মালিক। পুরনো ঢাকায় হত পায়রা উড়ানো প্রতিযোগিতা। গিরিবাজ পায়রাদের উড়াউড়ির প্রতিযোগিতা দেখার জন্য লোকজনের ভিড় জমে যেত। নববর্ষে অনেক স্থানেই ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতা হত। চৈত্রসংক্রান্তির রাতে পাট কাঠিতে আগুন জ্বেলে কিশোর ও তরুণেরা গ্রাম প্রদক্ষিণ করতো, যাতে নতুন বছরে গ্রামটিতে কোনো রোগবালাই না থাকে। (নূরুল, ২০০১ ১22)
চৈত্র সংক্রান্তির মেলা ও গ্রামের মেলা: পহেলা বৈশাখের বৈচিত্রপূর্ণ দুটি আকর্ষণীয় দিক বলে উল্লেখ করেন – সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (২০০১ : ৩১৫-৩১৬)। উভয় মেলাতেই যাদু প্রদর্শনী, গভীর রাতে যাত্রার আসর, কলের গান, চড়কি, ঘূর্ণির আনন্দ আয়োজনে ঘটনাহীন গ্রাম্যজীবন হয়ে উঠত ঘটনাবহুল – স্মৃতিচারণে – এমনটাই জানান তিনি।
বৈশাখী মেলায় গ্রামাঞ্চলে উৎপাদিত সকল প্রকার কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য, কারুপণ্য, মৃত্তিকাপণ্য, বাঁশ-বেতের পণ্যের সমাহারের কথা উল্লেখ করেন ওবায়দুল হক সরকার (২০০১ : ৪)। শিশুদের মনোরঞ্জনে বাঁশি, পুতুল, মেয়েদের চুড়ি, আলতা, সৌখিন সাজের উপকরণ থেকে গৃহস্থালির নিত্য ব্যবহার্য অনুষঙ্গ মিলত মেলায়। চিত্তবিনোদনের জন্য চড়ক, লটারি খেলার পাশাপাশি, খোলা মাঠে চালা তুলে হ্যাজাক বাতি জ্বালিয়ে বসত গানের আসর বা কবির লড়াই। রাতভর উপোভোগ্য মেলা শেষ হত সপ্তাহান্তে।
মেলার আরেক আকর্ষণ ছিল গ্রামীণ কুটির শিল্পের প্রদর্শনী ও তার বেচাকেনা (আনিসুজ্জামান, 2001 ৩১৫)। তালপাতা থেকে শুরু করে নকশা করা মাটির সরাই, সবকিছুর চাহিদা ছিল তুঙ্গে। যার কিছুটা প্রয়োজনে, কিছু সৌন্দর্যে মনোরঞ্জনে।
মেলাকে কেন্দ্র করে পুতুল নাচ আর বাক্সের ভেতর সিনেমা দেখানো ছাড়াও বহুরূপীর প্রচলনের কথা উল্লেখ করেন সৈয়দ হাসান ইমাম (২০০১ : ৩১৭)। কখনো বাঘ সেজে, কখনো ভালুক নেচে মেলাকে উপোভোগ্য করে তুলতো বহুরূপী।
বৈশাখী মেলার আয়োজনে তেমন নিয়মতান্ত্রিকতা বা ব্যবস্থাপনা কমিটির আয়োজন না থাকলেও, আবহমান বাংলার কুটির শিল্প এবং সংস্কৃতিকে লালন ও প্রকাশের জন্য মেলা এক অভূতপূর্ব সুযোগ বয়ে আনত শিল্পী- অংশগ্রহণকারী ও দর্শনার্থীদের জন্য – এমন প্রসঙ্গ তুলে ধরেন শামসুল হুদা চৌধুরী (২০০১ : ১৬৪)। এগুলোর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দ মেলা, রাজশাহীর খেতুরের মেলা, চট্টগ্রামের জব্বার আলীর বলী খেলা এবং সীতাকুণ্ডের মেলার উল্লেখ করেন তিনি।
গ্রামের মেলাগুলোতে সরকারী বা প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলেও বৈশাখী মেলার স্বকীয়তা একেবারে হারিয়ে যায়নি। যদিও, সময়ের সাথে মেলার পরিসর বেড়েছে, পরিবর্তন পরিবর্ধনে মেলার রূপের খানিকটা বিবর্তন ঘটেছে। তবে স্বীকার করতে হবে, বৈশাখী মেলার সাথে মিশে আছে মাটির যোগ। গ্রামবাংলার আদি ঐতিহ্য এই বৈশাখী মেলা এক বাৎসরিক আনন্দ উৎসব এবং প্রয়োজনের সামগ্রীর বিকিকিনি, ব্যবসায়ীক লেনদেন ও কৃষিভিত্তিক সমাজে পণ্য প্রবাহের ধারা বজায় রাখার বার্ষিক মিলন মেলা।
বর্ষবরণ
১৯৬৫ সাল থেকে ছায়ানট রমনার বটমূলে আয়োজন করে আসছে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। এমন তথ্য পাওয়া যায় সরকার আবদুল মান্নানের ( ২০০৮ ৩৪৩ ৩৪৪) লেখায়। প্রভাতি আয়োজনের অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতাগুলো যোগ করে তিনি লিখেছেন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগমনী গান ‘এসো হে বৈশাখ এসো, এসো পরিবেশনের মাধ্যমে সূর্যোদয়ের সময় বর্ষবরণ করে ছায়ানট। আইয়ুব সরকারের আমলে রবীন্দ্রসংগীত ও বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার বিরোধিতার প্রতিবাদস্বরূপ ছায়ানট বৈশাখের প্রথম দিনে যে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেখান থেকেই শুরু হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের রাজনৈতিক চারিত্র্য লাভ। স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মন্ত্র উচ্চারিত হয়েছে তার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
ফলে অনিবার্যভাবেই বাঙালি সংস্কৃতি চর্চায় বাঙালি সংস্কৃতির মহিমা ও মাধুর্য বিকাশে এবং এর অনন্য সৌন্দর্য ঊর্ধ্বে তুলে ধরার ক্ষেত্রে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে এসেছে। এখন বর্ষবরণ অনুষ্ঠান অবিতর্কিত ও অনিবার্য এক জাতীয় উৎসবের নাম। (আবদুল মান্নান, ২০০৮: ৩৪৩-388)
সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসবের সার্থকতা এখানেই যে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে অন্য ধর্মের মানুষেরা অতিথির মতো আসে। এখানে সারা বাঙালির কেউ অতিথি থাকে না। (হাসান, ২০০১: ৩১৬)
আধুনিক বাঙালি নাগরিক সমাজে পহেলা বৈশাখকে উৎসবে পরিণত করার কৃতিত্ব অনেকটাই ছায়ানটের। বাঙালি নিজের সত্তাকে খুঁজে ফেরে এই বাঁধভাঙার উৎসবে। ছোটো ছোটো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে, এখন বিরাট এক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতি অনুষ্ঠান।
মঙ্গল শোভাযাত্রা
নববর্ষের বর্ণিল নানা আনুষ্ঠানিকতায়, পহেলা বৈশাখের আরেক অনুষঙ্গ – চারুকলা অনুষদ আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রা। মাঠ পর্যায়ের সংগৃহীত তথ্য (সাক্ষাৎকার নং ৫) থেকে জানা যায়, বৈশাখের অন্যতম আকর্ষণ মঙ্গল শোভাযাত্রায় বিভিন্ন প্রতীককে বাহন করে সবার মঙ্গল কামনায় শুরু হয় যাত্রা। এতে অংশ নেন চারুকলা অনুষদের শিক্ষক- শিক্ষার্থীরা এবং রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নানা বয়সী ও শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বিভিন্ন লোকজ ফর্মে সংগৃহীত নমুনা থেকে রঙিন মুখোশ, বিভিন্ন প্রাণির প্রতিলিপির মাঝে প্রধান হয়ে ওঠে রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে মুক্তির আহ্বান। সমগ্র জাতির মঙ্গল কামনায় বর্ষবরণে লোকজ ধারার এই নাগরিক উপস্থাপন, বাঙালির বর্ষবরণের ঐতিহ্যবাহী এক আয়োজনে পরিণত হয়েছে।
ছাত্ররা মনে করেন, এটা একটা বিরাট ব্যাপার যে এদেশে প্রতিবছর এমন একটা উৎসব অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই উৎসব পালন করছে। নিজেদের তৈরি জিনিষ নিয়ে শোভাযাত্রায় অংশ নেয়া এবং অন্যকেও এর সাথে যুক্ত করার অনুভূতিটা আলাদা এক উদ্দীপনা তৈরি করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিল্পীদের অক্লান্ত ও আনন্দিত পরিশ্রমে প্রতি বছর আয়োজিত হয় নয়ন-মনোহর বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। সরকার আবদুল মান্নান ( ২০০৮ ৩৪৩) লিখেছেন, সেই শোভাযাত্রার মধ্যে ধরা দেয় বাঙালি জীবনের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কার-সংস্কৃতি। সকল শ্রেণির মানুষ এই শোভাযাত্রাকে উপভোগ করে গভীর এক অর্থব্যঞ্জনায়।
এছাড়া বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন, নজরুল একাডেমি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, নজরুল ইন্সটিটিউটসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান তাদের নিজ নিজ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আমাদের জাতিগত ঐতিহ্যের বিভিন্ন স্বরূপকে মূর্ত করে তোলে আর সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত হয় বিচিত্র প্রবন্ধ-নিবন্ধসমেত ক্রোড়পত্র। বর্তমানে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুধু সাংস্কৃতিক আন্দোলনমাত্র নয়- রাজনৈতিক আন্দোলনও বটে।
‘মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে একটি বার্তা দেয়ার চেষ্টা করা হয়, তা হলো অশুভকে তাড়িত করে এক শুভাগমন ঘটানো’ – এই উদ্ধৃতির উল্লেখ পাওয়া যায় শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের পরিচালক চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামানের বয়ানে। (বিবিসি বাংলা, ১৩ এপ্রিল ২০১৭)
বাঙালির ঐতিহ্য থেকে উপাদান নিয়ে, দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় শিল্পী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। ইউনেস্কো স্বীকৃতির পর মঙ্গল শোভাযাত্রা ব্যাপকভাবে পালনের তাগিদ ও প্রত্যাশা থাকলেও, অনুষ্ঠানটির ধরণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক এরকম মত দিয়ে বাধ সাধে কিছু ধর্মভিত্তিক সংগঠন- এমনটাও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
সর্বজনীন উৎসবে ধর্মীয় অনুভূতি প্রসঙ্গে শফি আহমেদের (২০০১ ২১৮) মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য পয়লা বৈশাখের নানা ইউনিফর্ম পরা শত্রু আছে, ঐক্যবদ্ধ জাতি যাদের কাম্য নয়। এই ঐক্য যে ধর্মকে, বিভেদকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। অথচ বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারলে একুশ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয়দীপ্ত ডিসেম্বর সবই নববর্ষের চেতনার দিকেই বহমান হবে, বিভেদ না থাকলে দেশ বিক্রির, সংস্কৃতি-যুদ্ধের বাজারও নষ্ট হয়ে যাবে।
সরকার আবদুল মান্নান লিখেছেন, এছাড়াও এক সময় বৃষ্টি-প্রার্থনাও ছিল বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের বিশেষ অংশ। কেননা কৃষি নির্ভর বাংলাদেশে বৃষ্টির জলই ছিল চাষাবাদের একমাত্র প্রকৃতিগত সেচ ব্যবস্থা। চৈত্র মাসে যতই বৃষ্টি হোক না কেন কৃষক জমিতে লাঙল দিত বৈশাখে। তাই বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা সেও ছিল বোখের শুরুতে নববর্ষে। এখন কৃষিতে বেশ কিছু বিজ্ঞানসম্মত চাষবাসের বিষয় আসায় বৃষ্টির প্রতি নির্ভরতা কিছুটা কমেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও গ্রামীণ জীবনে এখনো নববর্ষ উদযাপনের সঙ্গে প্রথাগত বৃষ্টি প্রত্যাশার বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। (মান্নান, ২০০৮ ৩৪০ )
আনুষঙ্গিকতায় ঐতিহ্যের নববর্ষ
বাঙালির নববর্ষ উদযাপনে বিষয় হিসেবে বরাবরই এসেছে লোকজ সংস্কৃতি। যার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় বাঙালি জাতির হাজার বছরের ঐতিহ্য ও গৌরব। তবে সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন, পহেলা বৈশাখ আধুনিক সময়ের সৃষ্টি – উনিশ শতকে এই উৎসব নাগরিকতা পেয়েছে। তাঁর মতে, নাগরিকতা পেলেও জাতে ওঠেনি। কেননা, তখন কলিকাতা শহরে ইংরেজদের খুব দাপট ছিল। ইংরেজদের দেখাদেখি সামাজিক কৌলিন্যের দাবিদার হিন্দুরা ইংরেজি নববর্ষ পালনে বিপুলভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠে। (আলী আহসান, ২০০১:৩১ )
চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে শুরু হত নতুন বছরকে স্বাগত জানাবার প্রস্তুতি। সে সময়ের নানা আয়োজনের উল্লেখ পাওয়া যায়, নুরুল হকের লেখায় :
গাঁয়ের বউঝিরা লেপে মুছে পরিষ্কার করতো ঘরদোর। নববর্ষের দিন আটপৌরে জামাকাপড় ছেড়ে সবাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জামাকাপড় পরতো। বাড়ির গরু বাছুরকেও গোসল করানো হত সেদিন। নববর্ষের দিন কেউ কারো সাথে ঝগড়া-ঝাঁটি করতো না। সবাই ভাবতো বছরের প্রথম দিনটা ভালো গেলে সারা বৎসরটাই তাদের ভালো যাবে। (নুরু, 2001 123 )
জমিদার বাড়িতে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের স্মৃতিচারণ করে সৈয়দ আলী আহসান ফিরে যান তাঁর শৈশবে ‘আমাদের গ্রামের বাড়িতে পহেলা বৈশাখ যখন আসত তখন আমরা ঠিক পেতাম আমাদের জমিদারির নায়েব নিশিকান্ত চক্রবর্তীর সামাজিক ব্যবস্থাপনা এবং আচরণের মধ্য দিয়ে। তিনি আমাদের কাচারি ঘর নিজ হাতে পরিষ্কার করতেন। প্রবেশ পথের চৌকাঠে পানি ছিটাতেন এবং ধুপের পাত্র হাতে নিয়ে ঘরে ধুপের ধোঁয়া দিতেন।
খেরো খাতা বদলাতেন এবং সকল শ্রেণীর কর্মচারীদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করতেন। … প্রজারা নববর্ষের দিনে বাড়ির ভেতরে যাবার অনুমতি পেত এবং উঠোনে যে শীতল পাটি বিছানো থাকতো সেখানে জমিদারকে দেয় দ্রব্যাদি রাখত। …. . তারা পাটির ওপর রূপোর টাকা রাখতো’ (আলী আহসান, ২০০১: ৩১)। তৎকালীন সমাজজীবনে এই উৎসবের সঙ্গে অর্থনৈতিক একটা সম্পর্ক ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পূরবী বসু তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন, ‘মনে পড়ে ছোট বেলায় চৈত্র মাসের সংক্রান্তিতে কী ঘটা করে উৎসব চলত। পুরনো বছরের সমস্ত আবর্জনা দূর করার জন্যে সেদিন গ্রামের ঘরে ঘরে, বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের ভেতর বাড়িঘর হাঁড়িপাতিল কাপড়জামা ধোয়ার ধুম পড়ে যেত। ব্যবহৃত সব মাটির হাঁড়িপাতিল ফেলে দেয়া হত সেদিন।
প্রতিটি ঘর ঝাড়মোছ করে ঝুল ঝেড়ে, বিছানা চাদর কাপড় জামা সব সাবান সোডা দিয়ে পরিষ্কার করে রোদে শুকোতে হত। লেপ তোষক কাঁথাও সূর্যসেঁকা করতে হত। মাটির ঘর হলে ভালো করে মেঝে, রোয়াক ও উঠোন লেপে নিতে হত। সেদিন বাড়ির মেয়েরা ঘরবাড়ি পরিষ্কারে এতটা ব্যস্ত থাকতো যে রান্না হত খুব সংক্ষিপ্ত। দিনের বেলা বেশিরভাগ বাড়িতে দই, চিড়া, মুড়ি খেয়েই কাটত।
রাতে নিরামিষ, বিশেষ করে তেতো ডাল, টক ডাল রান্না হত। সেদিন স্নানের আগে দু’পায়ের ভেতর দিয়ে পেছন দিকে ছাতু ছিটিয়ে প্রতীকী শত্রু নিধন হত অর্থাৎ শত্রুর মুখে ছাই দেয়া হত।’ (পূরবী, ২০০১: ২৩৩)
তবে অতীতের নববর্ষ উদযাপন, এর সর্বজনীন আনন্দ-আয়োজন আর ঐতিহ্য ঘিরে কতটা সমৃদ্ধ ছিল, সেই প্রশ্ন ছাপিয়ে, বর্তমান নববর্ষ উদযাপনকে সময়ের সাথে কতটা অর্থবহ করে তোলা যায়, সে লক্ষেই অগ্রসর হওয়া যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানী এবং ইতিহসিবিদগণ।
মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োজনে জীবনকে যাপন যোগ্য করার জন্য নতুনত্ব অপরিহার্য। তাই নববর্ষের গুরুত্ব অপরিসীম উল্লেখ করে সৈয়দ আনোয়ার হোসেন (২০০১ ১০১-১০২) বলেন, জীবনের গ্লানি, পরাজয় আঘাত প্রতিহত করার মাধ্যমে মানুষ নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে যায়। এজন্য নববর্ষের সূচনা বলে একটি ক্ষণকে শনাক্ত করা হয়। যার মর্মমূলে আছে অর্জনের প্রণোদনা।
বাংলাদেশে উৎসব বা ধর্মীয় উৎসবের মাঝে ‘বাংলা নববর্ষ’ এই একটি উৎসবই ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা একে অন্যের উৎসবে অংশ নিলেও, তা সর্বব্যাপী নয়। এই একটি উৎসব- বাঙালি তুলে রেখেছে সবার জন্য, এমন মন্তব্য করে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে প্রধান ধর্মীয় উৎসবের কমতি নেই। কিন্তু সেগুলো সঙ্গত কারণেই সর্বজনীন নয় বিধায় ধর্মীয় উৎসবগুলোতে সংকীর্ণতার স্পর্শ লেগে থাকে। এমনকি হিন্দু জমিদারদের শাসনামলে হিন্দু ধর্মের অনেক উৎসবেও গোত্র, শ্রেণি, বর্ণ নির্বিশেষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অংশগ্রহণ উন্মুক্ত ছিল না। শুধু বাংলা নববর্ষ ছিল এর ব্যতিক্রম। (মনজুরুল, ২০০১: ৬৫)
বাংলাদেশের মানুষ নববর্ষকে কেন্দ্র করে তাদের সাংস্কৃতিক, জাতিগত ও রাজনৈতিক পরিচয়গুলি সংহত করেছে আদায় করে নিয়েছে বিশ্বের চোখে তার জাতিসত্তাগত স্বাতন্ত্র্য।
এটি সম্ভব হওয়ার কারণ হিসেবে মনজুরুল ইসলাম মনে করেন (২০০১ ৬৭), যখন কিছু অঞ্চলভিত্তিক প্রথা ও আচার সর্বদেশিক একটি কর্মকাণ্ডে পরিণত হল, সে হিসেব রাখা কষ্টকর হলেও বোঝা যায়, বাঙালির নববর্ষ তার জাতিসত্তাগত স্বাতন্ত্র্য এবং অখণ্ডতা উদযাপনের উৎসব। তবে শিক্ষার অভাব দেশের দরিদ্রতার জন্য দায়ী, যদিও সাংস্কৃতিক রুচি ও প্রজ্ঞার অভাব বাঙালির কখনই ছিল না। এর বলেই ঐক্য, দিক নির্দেশনা আর মূল্যবোধ দ্বারা চালিত হয়েছে বাঙালি।
পহেলা বৈশাখ আমাদের চিন্তা-চেতনার-আবেগের মধ্যে চিরকালের জন্য ধরা পড়েছে। সৈয়দ আলী আহসান (২০০১ : ৩১) বলেন, বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত উৎসব পহেলা বৈশাখে উদযাপনের নানা আনুষ্ঠানিকতায় ধর্মীয় নিষ্ঠার কিছু নিদর্শন পাওয়া গেলেও হিন্দুদের হাতে থেকে তা যেমন হিন্দুদের অনুষ্ঠান হয়নি, তেমনি সময় পরিক্রমায় মুসলমানদের হাতে এসে এটা মুসলমানদের অনুষ্ঠান হয়ে যায়নি। এখানেই এর বিশেষত্ব।
নববর্ষের উৎসব ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উদযাপিত হয়। গ্রামে এ দিনটি কীভাবে উদযাপিত হয়, তা সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের বর্ণনায় পাওয়া যায় :
আমি দেখেছি, একজন কৃষকও দিনটিকে স্মরণে রাখে, এ দিনটিতে তার ঘরে সামান্য একটু বাড়তি খাবারের আয়োজন হয়। এই দিনে জামা-কাপড় কেনার বাধ্যবাধকতা নেই, যেমন ঈদে বা পূজোয় আছে, কাজেই কৃষক মাকে ভারমুক্ত। (সৈয়দ মনজু ২০০১ ২৫)
বাঙালি অন্তরে ধারণ করা, লালন করা এই বর্ষবরণ উৎসবে অংশগ্রহণে সম্প্রদায় বা ধর্মের ভিন্নতা কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। মৈত্রী-সম্প্রীতির উদার মিলন ক্ষেত্র এই উৎসবে আছে মাটি ও প্রকৃতির সম্পর্ক। অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, বাংলা নববর্ষকে জাতীয় উৎসব হিসেবে পালনের মধ্য দিয়ে পহেলা বৈশাখ আজ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বের ভাষা-সংস্কৃতি সমৃদ্ধ দেশগুলোর পাশে, সবচেয়ে বড় সর্বজনীন উৎসব হিসেবে।
বর্ষামঙ্গল উৎসব
তপ্ত গ্রীষ্মের বিদায়ে বর্ষার বারিধারা সবার কাছেই মহা সমারোহের। বর্ষায় বাঙালির হৃদয় যেন সরস প্রকৃতির সাথে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। মন হয় মেঘের সঙ্গী। নবীন বর্ষার একখণ্ড মেঘও কবির কল্পনায় প্রাণ সঞ্চার করে। মহাকবি কালিদাসের অনন্য সৃষ্টি মেঘদূত কাব্যে মেঘ হয়ে উঠেছে বিরহীর বার্তাবাহক, জীবন্ত দূত।
সিলেট অঞ্চলের কিংবদন্তী শিল্পী প্রয়াত বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের গানে আছে, ‘বর্ষা যখন হইতো, গাজির গান আইতো, রঙে ঢঙে গাইতো, আনন্দ পাইতাম। বর্ষায় প্রবল আনন্দে উৎসবে মেতে ওঠে বাঙালি। শুধু তাই নয়, বর্ষার সাথে মিশে আছে বাংলার লৌকিক সংস্কৃতি এবং ইতিহাস।
নৌকাবাইচ
আষাঢ়-শ্রাবণ মাস নিয়ে বর্ষার পুরোটা সময় জুড়ে নৌকা বাইচের আয়োজন হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ ভাটি অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হয় এই উৎসব। নীরু শামসুন্নাহার (২০২০) উল্লেখ করেন, নৌকাবাইচ উৎসবে ভিন্ন ধরণের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নৌকার যেমন দেখা মেলে, তেমনি নৌকাগুলোকে রঙিন কাগজের সাহায্যে লোকশিল্পের নকশায় সজ্জিত করা হয়।
বাইচের সওয়ারীদের চমকপ্রদ সাজসজ্জার সঙ্গে মূল গায়েনের রূপসজ্জাও আকর্ষণীয়। কাঁধে গেরুয়া উত্তরীয়, হাতে রুমাল ও পায়ে ঘুঙুর পরে নৌকার মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে মূল গায়েন উৎসাহমূলক লোকগীতি গাইতে থাকেন। নৌকার গতি ত্বরান্বিত করতে এই সঙ্গীতকৌশল। এর সাথে নৌকার গতিতে তাল মিলিয়ে ছুটতে থাকে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিশু-কিশোরের দল ।
প্রতি বর্ষায় সিলেটের সুরমা নদী এবং সুনামগঞ্জের কালনী নদীতে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয় উল্লেখ করে ফয়সাল খলিলুর রহমান (২০১৬) লেখেন, সিলেট অঞ্চলে বাইচের জন্য ১৫০-২০০ ফুট লম্বা ও ৫-৬ ফুট প্রস্থের সারেঙ্গী নৌকা ব্যবহার করা হয়। পানি থেকে ২-৩ ফুট উঁচু এ নৌকাগুলোর নামও বেশ আকর্ষণীয়; ঝড়ের পাখি, পঙ্খিরাজ, সাইমুন, তুফান মেল, ময়ূরপঙ্খি, অগ্রদূত, দীপরাজ, সোনার তরী ইত্যাদি । নৌকার বৈশিষ্ট্য : এর সম্মুখ ও পশ্চাৎভাগ হংসমুখী আকৃতির। নৌকাবাইচ শুরুর আগে, সৃষ্টিকর্তা ও প্রকৃতির কৃপা প্রার্থনা করে প্রতিযোগিরা এক সুরে গান ধরেন।
নকশিকাঁথা বুনন
গ্রামের নারীদের সৃজনশীলতা প্রকাশের একটা সুযোগ মেলে বর্ষাকালে। বর্ষার ঝুম বৃষ্টিতে ঘরবন্দী বধূরা নকশীকাঁথা বুনতেন। শামসুন্নাহার ( ২০২০ ) নিবন্ধে উল্লেখ করেন, ঘনঘোর বরিষায় সহজে ঘর থেকে বাইরে গিয়ে দৈনন্দিন কাজগুলো করা যায় না বলে ঘরের মা-মেয়েরা মিলে বর্ষায় সেলাই করবেন বলে সিকেয় তুলে রাখা গত বর্ষায় শুরু করা নকশিকাথা সেলাই করতে বসেন। এটিও সারা বাংলার ঘরে ঘরে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ রচনা করে। সেলাইয়ের ফোঁড়ে ফোঁড়ে পুরনো কাপড়ের পরতে পরতে উঠে আসতো জীবনের কথকতা।
ধামাইল
সিলেট অঞ্চলে বেশির ভাগ বিয়ের অনুষ্ঠান হয় বর্ষাকালে। আর বিয়ে মানেই ধামাইল গান। লোকসংস্কৃতি গবেষক সুমন কুমার দাশের উদ্ধৃতি এবং ভারতের শিলচর-করিমগঞ্জ অঞ্চলের জনশ্রুতি তুলে ধরে ফয়সাল খলিলুর রহমান (২০১৬) লিখেছেন, দেশবিভাগের পূর্বে তৎকালীন সিলেট অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে বর্ষাকালে অবসর সময়ে মহিলারা একত্র হয়ে গল্পগুজবে মশগুল হয়ে উঠতেন। এ মুহুর্তটাকে বলা হতো “ধুম্বইল’।
হাসিঠাট্টার চরম পর্যায়ে দেহভঙ্গিমা রূপ নিতো নৃত্যভঙ্গিমায়। এই ধুম্বইল থেকেই এসেছে ধামাইল। ফয়সাল (২০১৬) আরও উল্লেখ করেন, ধামাইল নাচের বিশেষত্ব হলো একটি বিশেষ সম্পর্কের ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নাচ পরিবেশিত হয়, তাই এ নাচে শ্যালিকা, বৌদি, দাদি-নানি সম্পর্কের মহিলারাই। অংশ নেন। ঘরের ভেতরে, আঙিনায় বা সামান্য খোলা যায়গায় ১০-১৫ জন মহিলা মিলে এই গান পরিবেশন করেন।
বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ধামাইল নাচ-গানের প্রচলন খালেও, সিলেট অঞ্চলে হিন্দু সম্প্রদায়ে বিয়েতে আয়োজিত ধামাইল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। ধামাইল আসরের পাশাপাশি থাকে কিসসা পালা, লোকনৃত্য, গাজীর গীত, সিমিস্যা গান, পুঁথি পাঠের আসর।
পালা পরিবেশন
বর্ষাকালে অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হয়। ভাটি অঞ্চলের পানিবন্দী মানুষেরা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে আয়োজন করে যাত্রা গানের। ফয়সাল খলিলুর রহমানের (২০১৬) লেখায় পাওয়া যায়, কয়েক গ্রামের মানুষ মিলে আয়োজিত যাত্রাপালায় পরিবেশিত হয় সিরাজদ্দৌলা, সোহরাব রুস্তম, বেহুলা লক্ষ্মীন্দর, রূপবান ইত্যাদি। যে গ্রামে পালার আয়োজন হয়, সেখানে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উৎসাহের সাথে পালা দেখতে আসেন অন্য গ্রামবাসী। নির্ঘুম কখনো আধোঘুম চোখে রাতভোর পালা উপোভোগ করেন শ্রোতা- দর্শক।
মনসার ভাসান
নীরু শামসুন্নাহার ( ২০২০ ) উল্লেখ করেন, বর্ষা উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ মনসার ভাসান। এখনো ভাটি অঞ্চলে কোনো কোনো কৃষক বাড়িতে মধ্যযুগের মনসা মঙ্গল কাব্যের চর্চা আছে। সেখানে রাতের বেলা বাড়ির আঙিনায় মনসার ভাসান নিয়ে গানের আসর বসে বর্ষাকালে। বাংলায় বর্ষাকালীন উৎসব-পরবের মধ্যে মনসাপূজা গুরুত্বপূর্ণ – এমন তথ্য পাওয়া যায় অতনু সিংহের (২০১৯) লেখাতেও।
রথযাত্রা
বর্ষাকালীন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব রথযাত্রা। অতনু সিংহ (২০১৯) বলেন, ঢাকার ধামরাই উপজেলায় অনেক আগে থেকে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সাভার, পুরান ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, যশোরসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রথযাত্রা এক বিরাট উৎসব।
বৃষ্টি নামানোর গান
বৃষ্টি নামানোর গান, ব্যাঙের বিয়ে দেয়ার মতো প্রকৃতি সম্পর্কিত মজার লোক আয়োজন রয়েছে বর্ষার নানা পরবে। এমন মত অতনু সিংহের। রাজিউল ইসলাম (২০২১) ‘বৃষ্টি নামাতে ব্যাঙ্গা ব্যাঙ্গির বিয়ে’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলেন, এই লোকাচারের বিজ্ঞান ভিত্তিক কোনো ব্যাখ্যা না থাকলেও, সনাতন ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র জাতি সত্ত্বার মানুষের মধ্যে এমন আয়োজন, বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে যুগ যুগ ধরে সমৃদ্ধ করে রেখেছে।
বর্ষার বিশেষ খাবার
বৃষ্টির দিনে বিশেষ কিছু খাবার, সময়কে করে তোলে উৎসবমুখর। মুখরোচক খাবার আয়োজন হিসেবে, শামসুন্নাহার (২০২০) যোগ করেন, সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চালের ভুনাখিচুড়ির সাথে বর্ষার ইলিশের জুড়ি মেলা ভার। কলাপাতায় মোড়ানো পদ্মার ভাপা ইলিশ বা সরষে ইলিশ, কাঁচা তেঁতুলে রান্না করা বর্ষাকালীন মাছ চেলা বা পাবদার ঝোল, শেষ পাতে পায়েস কিংবা চন্দ্রপুলি পিঠার আয়োজন মেঘমেদুর বৃষ্টির দিনটিকে করে তোলে উপভোগ্য।
শরৎ উৎসব
শরতের স্নিগ্ধ পরিবেশ উৎসবের আমেজ নিয়ে আসে বাঙালির ঘরে ঘরে। উৎসবের রঙ ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি ঘরে ঘরে। শরৎ মানেই শিশির সিক্ত প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্য। শরৎ মানেই ভোরের আলোয় মিষ্টি শীতের হাতছানি। এই শরতেই আছে অভিমানী মেঘের ঘনঘটা। বিশাল আকাশের নীচে, দিগন্ত প্রসারিত কাশ বনে মন ছুটে যা মেঘের সাথে ভাবনাহীন। শরতে শেষ বিকেলের সূর্যটাও বিদায় নেয় গোধুলি আকাশ রাঙিয়ে।
শরৎকাল বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে বেশ কিছু সাক্ষাৎকারে (সাক্ষাৎকার ৬) বক্তারা বলেন, প্রত্যেকটা ঋতুর আলাদা আলাদা রং আছে। যদিও এই সময়ে ষড়ঋতুর আসল রূপটি খুঁজে পাওয়া যায় না। তারপরও সেই রূপ যেন বাংলার রূপ। শরৎকালে প্রতীক্ষায় থাকেন সবাই। কারণ, শরৎকালে চারপাশ যেমন সুন্দর তেমনি চমৎকার আবহাওয়া চারপাশে। এ সময়টা না শীত, না গরম। তাই উৎসব আয়োজনের জন্য এই সময়টাই উপযুক্ত সর্বতোভাবে। এই সময়টাতেই শুরু হয় শারদীয় দুর্গাপূজা।
এছাড়াও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পকলা একাডেমি, ছায়ানটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আয়োজন করা হয় শরৎ উৎসব। যেখানে নাচ, গান, আবৃত্তি, পাঠ ও যন্ত্রসঙ্গীতে সময়টা হয়ে ওঠে উপোভোগ্য।
শারদীয় উৎসব : দুর্গাপূজা
ঢাকের বাদ্য আর প্রতিমা গড়ার মধ্য দিয়ে বাঙালি সভ্যতার ইতিহাস-ঐতিহ্য মিশে আছে দুর্গাপূজার সাথে। সমাজতাত্ত্বিকরা মনে করেন, দুর্গাপূজা প্রচীন অনুষ্ঠানগুলোর একটি। বিভিন্ন অঞ্চলের আচার-রীতি, উদযাপন প্রথা এর সাথে মিশে শারদীয় দুর্গোৎসব বহুবর্ণিল এক ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হলেও, এর আকর্ষণ ছুঁয়ে যায় সব সম্প্রদায়ের মানুষকে। প্রাচীনকালে দুর্গাপূজার প্রকৃতি ও রূপ ভিন্ন থাকলেও বর্তমানে ভোগ, থিয়েটার, ঢপ, সংকীর্তন, যাত্রায় তা প্রবল উৎসবে পরিণত এক আয়োজন। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এই তিনদিন দুর্গাপূজা: বিজয়া দশমীতে বিসর্জন।
মুনতাসীর মামুন লিখেছেন :
আশ্বিনের পূর্ণিমা তিথিতে দুর্গার বড় মেয়ে লক্ষ্মীর পূজা। কার্তিক মাসের সংক্রান্তিতে দুর্গার পুত্র কার্তিকের পূজা। মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে দুর্গার ছোট মেয়ে সরস্বতীর পূজা। আশ্বিনে দুর্গাপূজা দিয়ে যার শুরু, মাঘে সরস্বতি পূজা দিয়েই তার শেষ। (মুনতাসীর, ১৯৯৪ : ৮৩)
শরতের ফসল তোলার সময় আরাধনা করা হতো মা দুর্গার। সেই থেকেই তিনি মিশে আছেন ফসল, মাটি, উর্বরতা আর আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে।
নবান্ন উৎসব
নিস্তরঙ্গ গাঁয়ের কৃষিজীবী সমাজ প্রাণ-কোলাহলে মুখর ওঠে নবান্ন উৎসবে। এই উৎসব বছরব্যাপী ধানের জন্য হাহাকার মোচনের উৎসব। সভ্যতার সৃষ্টিলগ্ন থেকে মানুষ প্রকৃতির কাছেই পেয়েছে ক্ষুধা মেটানোর উপকরণ। কৃষি-পদ্ধতি আবিষ্কারের পর থেকে কষ্টার্জিত শস্য ছিল কৃষিজীবী মানুষের অভাব মোচনের উৎস। নিজেদের শ্রমের বিনিময়ে উৎপাদিত ফসলকে ঘটা করে বরণ করতে আয়োজিত শস্যোৎসবই নবান্ন উৎসব।
মানবসভ্যতার খাদ্য আহরণের ইতিহাস কখনো অরণ্য থেকে সংগ্রহভিত্তিক, কখনো শিকারভিত্তিক। কষ্টার্জিত এই খাবারকে সে দেবতার আশীর্বাদ বলে মনে করত। তাই সর্বপ্রাণবাদে বিশ্বাসী মানুষ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ প্রথম সেই খাবার নিবেদন করেছে খাদ্যদাতা অদৃশ্য শক্তির উদ্দেশ্যে।
কৃষিভিত্তিক সভ্যতার ক্রমবিকাশে বীজবপন থেকে ফসল ফলানো এবং ফসল কেটে ঘরে তোলা, কৃষিপদ্ধতির পরিণত এই আয়োজন হয়ে উঠেছে নবান্ন উৎসব। তাই ‘নবান্ন’ ফসল প্রাপ্তির উৎসব। এই উৎসব স্বতন্ত্রা উৎবের গণ্ডি ছাপিয়ে বছরব্যাপী ব্রতপার্বণের পরিণতি এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিশীলিত রূপ বলে মনে করেন মাধুরী সরকার (২০১৪ ৭৫-৭৬)।
‘গ্রামবাংলার সর্বত্র নতুন ধান ওঠার পরই আনন্দ উৎসবের বন্যা বয়ে যায়। পরিশ্রমের ফল লাভ, সাফল্যের আনন্দ, অন্যদিকে অস্তিত্ব রক্ষার নিশ্চয়তা রক্ষাকবচের অধিকারী হওয়া এই দ্বিবিধ কারণ সজ্জাত উৎসব হলো ‘নবান্ন’; উল্লেখ করে বরুণকুমার চক্রবর্তী (২০১৪ : ৩৩) লিখেছেন, শুভ দিনে, পবিত্র দিনে নতুন সংগৃহীত ধান থেকে প্রস্তুত ধান প্রথম ব্যবহার উপলক্ষে অনুষ্ঠিত যে উৎসব তাই নবান্ন। দীনেন্দ্রকুমার রায় (২০১৪ : ৫) নবান্নকে ‘বঙ্গের অধিকাংশ পল্লীতেই অগ্রহায়ণের একটি আনন্দপূর্ণ মঙ্গলসূচক গার্হস্থ্য উৎসব’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সভ্যতার বিকাশে নবান্ন উৎসব ফসল উৎপাদন ও একে খাদ্যরূপে গ্রহণের আনন্দোৎসব’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন ফরাসি নৃবিজ্ঞানী লেভিস্ট্রস। তাঁর এমন উক্তিকে সমর্থন করে শামসুজ্জামান খান লিখেছেন :
অনেকে বলেন, নবান্ন রঞ্জনের উৎসব। রন্ধনকলা কোনো জাতির সাংস্কৃতিক ঋদ্ধির পরিচায়ক। তাই নবান্নকে ফসল উৎপাদনের সংস্কৃতি থেকে রন্ধনকলায় বিকশিত করার একটা প্রক্রিয়া হিসেবেও চিহ্নিত করা যায়। … নবান্ন বাঙালি কৃষকের খাদ্যোৎসব। হতদরিদ্র কৃষকের জীবনে সমবেত উৎসবের আনন্দে মেতে উঠবার দিন। (শামসুজ্জামান, ২০১৩ ৫৯)
পশ্চিমবঙ্গের লোকসংস্কৃতি গবেষক প্রদ্যোত কুমার মাইতি (২০১৪ : ৪৩) নবান্নর দিনটিকে পল্লিবাঙালির জীবনে বড় আকাঙ্ক্ষিত পুণ্যের দিন’ এবং ‘ঐকাবহ’ বলে উল্লেখ করেন। এই অর্থে যে, বাঙালির প্রধান কৃষিদ্রব্য ধানের বীজ বপন থেকে ফসল তোলা এবং ধানের চাল রন্ধনপূর্ব পর্যন্ত নানা আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উৎসবে মেতে ওঠে বাঙালি। বিভিন্ন সমাজব্যবস্থায় এই লোকাচারে বৈচিত্র্য থাকলেও সার্বিকভাবে এর মধ্যে ঐক্যের দিকটিই মুখ্য।
সৌমিত্র শেখর (২০১৪ : ১০২) নবান্ন উৎসবকে শস্যোৎসব’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং একে ধান্যোৎসব’ হিসেবে বিশেষায়িত করে বলেন, বাঙালির ঘরে নতুন ধান ওঠার পর সেই ধানের খাদ্য গ্রহণ করার জন্য যে আনন্দঘন আচার-আয়োজন, সেটাই নবান্ন। তিনি যোগ করেন, বাঙালির ঘরে নতুন ধান উঠত একাধিকবার। কিন্তু বছরের সূচনা-ধানেই উৎসব হতো নবান্নের।
নবান্ন উৎসবের এই আনন্দমুখরতায় যেমন মিশে থাকে ভালো লাগা, তেমনি আকুলতা থাকে গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে হওয়া এই উৎসবকে সামর্থ অনুযায়ী উদযাপন করার। অনেক অভাবের মাঝেও বছরের নির্দিষ্ট সময়ে উৎসব আয়োজন বছরজুড়ে ক্ষুধার অন্ন যোগানোর এক ঐতিহাসিক মহোৎসব।
ধান কাটার উৎসব
লোকায়ত বাংলার কৃষিনির্ভর সমাজে কার্তিক মাসের আগমন মানেই অবসরহীন দিনলিপি। ধানকাটার এই মৌসুমে বদলে যেত গ্রামবাসীর দৈনন্দিন কর্মযজ্ঞ। বর্ষার আগাছা জন্মানো পরিত্যাক্ত খামার বাড়ি, ঘরদোর, উঠান আর ঢেঁকিশালের চারপাশ গোবর মাটিতে লেপে প্রস্তুত করা, কাস্তে ধামা-কুলা পরিচ্ছন্ন করে রাখার ব্যস্ততা ছিল গৃহস্থ বাড়িগুলোর সহজাত দৃশ্য। তারপর ফসল কেটে আনার জন্য একটি শুভ দিনের অপেক্ষা তিতাশ চৌধুরী লিখেছেন
এদিনে কৃষক কেবল একগুচ্ছ পাকা ধান কেটে মাথায় করে বাড়ি নিয়ে আসে। … ধান কেটে ঘরে ফেরার সময় কারো সাথে কথা বলাও নিষিদ্ধ। এইদিন পাড়া-প্রতিবেশী কাউকে কিছু দেয়ারও নিয়ম নেই এবং এসবই সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হয়।
এই একগুচ্ছ ধান ঘরে এনে কৃষক তা পালার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখে। এটাই বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলের নিয়ম। কোনো কোনো এলাকায় ফসল কাটার আগে বিজোড় সংখ্যক ধানে ছড়া কেটে নিয়ে ঘরের চালে বেঁধে রাখা হয়। বাকি অংশ চাল করে নতুন চালের পায়েস রান্না করা হয়। নতুন চালের এই পায়েসকেই নবান্ন বলা হয়। (তিতাশ, ২০১৪ : ৪৯)
তিতাশ চৌধুরী আরও জানান (২০১৪ ৫০-৫১) দেশের অনেক অঞ্চলেই হেমন্তের ফসল কাটার শেষ দিন থেকে শুরু করে গোলায় ধান ওঠানো পর্যন্ত আঙিনায় সার্বক্ষণিক একটি বাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়। এর সঙ্গে কিছু সুপারি ও ধান-দূর্বাও থাকে। ‘ধান-ওঠা’ নামক এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই কৃষকের ছোট ছোট আঙিনা- গৃহ এবং গোলা সোনার ধানে ভরে ওঠে।
তবে ধানের গুচ্ছ বাড়িতে ঝুলিয়ে রাখার এই নিয়মগুলো লোকসংস্কার, যার সাথে নবান্নের কোনো সম্পর্ক নেই; উল্লেখ করে সৌমিত্র শেখর ( ২০১৪ : ১০৬) বলেন, মূলত অবস্থাসম্পন্ন কৃষকেরা এই সংস্কার পালন করেন। কিন্তু নবান্ন উৎসবে সামিল হয় সব শ্রেণি পেশার মানুষ।
মাঠের ধান কেটে নেয়ার পর পরিত্যাক্ত জমিতে পড়ে থাকা ধানের ছড়া কুড়িয়ে নিত পাড়ার মেয়েরা। কখনো ইঁদুরের গর্তে হানা দিয়েও তারা কুড়িয়ে আনত পাকা ধানের ছড়া। কুড়ানো এই ধান শুরু করে বিনিময় যুগের। এ প্রসঙ্গে তিতাশ চৌধুরী লিখেছেন :
ভিনগাঁ থেকে ফেরিঅলা আসে, মুড়িঅলা আসে, পাতিলআলা আসে, কখনো মাছআলা আসে। আর এসব ধানের বিনিময়েই কেউ মুড়কি মুড়ি, কেউ রান্নার জন্যে নতুন হাঁড়ি-পাতিল, কেউ এটা সেটা আবার কেউ ধানের বিনিময়ে মাছ রাখে। এ সিস্টেম আবহমানকাল থেকেই বোধহয় গ্রামীণ কৃষক সমাজে প্রচলিত আছে যাকে আমরা এ যুগে বাটার সিস্টেম বলি। বলতেই হয় গ্রামের কৃষক সমাজের বিনিময় যুগ শেষ হবার নয় আজো। (তিতাশ ২০১৪ : ৪৯-৫০)
নতুন ফসল প্রাপ্তির এই উন্মাদনার পেছনে নির্মল আনন্দতো ছিলই, ছিল আর্থসামাজিক কারণ। বিগত বছরের গোলার ধান ফুরিয়ে গেলে, পরবর্তী ধান কাটা পর্যন্ত চলত গাঁয়ের মানুষের হাপিত্যেশ। তাই কষ্টার্জিত ফসলের প্রাচুর্য, অন্নের সংস্থান তাকে দিত অনাগত দিনের কিছুটা সময়ের জন্য অনিশ্চয়তা মুক্তির আশ্বাস।
নতুন ধানে নবান্ন
উঠান জুড়ে নতুন ধানের সমারোহ। সেই ধানের প্রথম রান্নাকে উপলক্ষ করে উৎসব। আয়োজনটা বেশ আগে থেকে শুরু হলেও নবান্নের পূর্ব রাত্রে থেকেই পড়ে যেত সাজ সাজ রব :
সূর্যের আলো ফুটবার আগেই ঘর-দোর ঝেড়ে লেপে শান সমাপন করে নেয় তারা। তারপর পুজোর আয়োজন। যে যেটা করে লক্ষ্মী বা নারায়ণ। পুজোর স্থানে নতুন ধানের চাল গুঁড়ো করে যতোটা পারা যায়, আল্পনা দেয় নারীরা। পুরোহিত আসেন যথা সময়ে। … পুজো শেষে পরলোকগত পিতৃপুরুষের উদ্দেশে পিণ্ডদানের জন্য পুজোস্থানের নির্দিষ্ট আসনে বসে বাড়ির বড় পুত্রসন্তান। পরিবারের পক্ষে সে-ই পিতৃপুরুষের উদ্দেশে পিণ্ডদানের জন্য উত্তরাধিকার প্রাপ্ত। তার অনুপস্থিতিতে বাড়ির কনিষ্ঠ পুত্রসন্তান সে অধিকার পায়। (সৌমিত্র, ২০১৪ ১০৭ )
সৌমিত্র বলেন, পুজো ও পিণ্ড দুটো ক্ষেত্রেই নতুন চালের আয়োজন থাকে। আর থাকে নতুন চালের নৈবেদ্য, অন্ন, মিষ্টান্ন, পিঠার সমাহার। .
প্রাচীন লোকসমাজে অগ্রহায়ণ বা আঘন মাসকে লক্ষ্মীর মাসও মনে করা হতো। তাই নবান্ন আর লক্ষ্মীপূজার আয়োজন হতো অগ্রহায়ণেই। লক্ষ্মীপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব হলেও এক সময় ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মীর সন্তুষ্টির জন্য মুসলমানেরাও এ সময় লক্ষ্মীপূজা করত বলে উল্লেখ করেন সুজন বড়ুয়া ( ২০১৪ : ২৬) এবং সিরাজুল ইসলাম (২০০৭ : ৩৪৪)।
আগে পৌষ সংক্রান্তিতেও গৃহদেবতাকে নবান্ন নিবেদন করার প্রধা প্রচলিত ছিল। হিন্দুশাস্ত্রে নবান্ন উদযাপনের করণীয় সম্বন্ধে বিধান নির্দিষ্ট করা থাকলেও বরুণকুমার চক্রবর্তী (২০১৪ : ৩৭) মনে করেন, নবান্ন শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠান নয়। এই অনুষ্ঠানে যেমন ব্রাহ্মণ-পুরোহিতের ভূমিকা আবশ্যিক নয়, তেমনি কোনো নির্দিষ্ট দিনে নবান্ন আয়োজিত হয় না। অগ্রহায়ণ মাসের যে কোনো একটি শুভ দিনই এ জন্য নির্বাচিত হয়।
সারা হেমন্তকাল ধরেই চলে নবান্ন উৎসবের আয়োজন। অনেক সময় পৌষ মাসেও নবান্ন উৎসব হয়। মূলত
এটি ঋতু নির্ভর। ফসল পাকতে বা তুলতে দেরি হলে উৎসবও অঞ্চল ভেদে দেরিতে হয় (শামস, ২০১৪ : ৯৮)। মাধুরী সরকার বলেন, ‘নবান্নর বিশেষ দিন অগ্রহায়ণের পয়লা তারিখ ধরলে তা শ্রেষ্ঠ। না হলে পঞ্জিকা মতে করতে হয়।’ (মাধুরী, ২০১৪ : ৮৯)
নবান্ন কৃষি-কেন্দ্রিক উৎসব হলেও, কিছু নিয়মনীতির মধ্য দিয়ে প্রধান খাদ্যশস্য বাড়িতে তোলা, পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা, ধর্মীয় রীতি মেনে সাধ্যমতো উৎসব উদযাপন করা এর একটি উল্লেখযোগ্য দিক। ত্যাগ করে ভোগ করাই বাঙালির আদর্শ; নবান্ন এর ব্যতিক্রম নয়।
সর্বজনীন এই উৎসবের আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্যে ধর্মীয় অনুশাসন কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। পারিবারিক আনন্দ, সামাজিকতায় সম্প্রীতির এক উদার মিলনক্ষেত্র নবান্ন উৎসব। শাশ্বত ঐতিহ্যের নিদর্শন এই উৎসবে একাত্ম হয় গ্রামের মানুষ। অসাম্প্রদায়িক, নির্মল এক উৎসবানন্দে মুখর হয়ে ওঠে গ্রামবাংলার প্রতিটি আঙিনা। নিয়মতান্ত্রিকতা আর উদযাপনে বৈচিত্র্য থাকলেও নতুন ধান বরণের এই উৎসবে আগ্রহটা অভিন্ন।
নবান্ন উদযাপনে বিশেষত্ব
নবান্নের আনুষ্ঠানিকতার পেছনে আর্থ-সামাজিক কারণই ছিল মুখ্য। তাই নবান্ন উৎসব উদযাপনের ব্যাপকতা ছিল চোখে পড়ার মতো। এর উল্লেখ পাওয়া যায় দীনেন্দ্রকুমার রায়ের ( ২০১৪ ১৭) লেখায় আজ সকল বাড়িতেই আহারাদির বিশেষ আয়োজন; পাঁচ তরকারী ঘিভাত, ভাজা, বড়া, দুই তিন রকম ডাল, ভাল মাছ, গুড়-অম্বল, দৈ, পায়েস, কোন উপকরণই আজ বাদ পরিবার যো নাই।’ তিনি আরও লিখেছেন :
এই উৎসবের দিন পাঠশালা বন্ধ, গাঁয়ের রাখাল আর কৃষকদেরও মাঠে যেতে হয় না এদিন। বাড়ি বাড়ি থাকে তাদের নিমন্ত্রণ। চাকরি স্থান থেকে নবান্ন উদযাপনের জন্য বাড়ি আসেন গৃহস্থরা। নবান্নের দিন ছেলেরা কলাপাতে অল্পপরিমান নবান্ন নিয়ে কাক, শালিক প্রভৃতি পাখিদের জন্য রেখে আসে। কেউ ঢেঁকির ঘরে ইঁদুরের গর্তে দেয়, কেউ নদীতে যায়া মাছকে খাওয়াতে, বাদ যায় না গরু বাছুরদের ভাগও।
শিয়ালের জন্য অল্প চাল দুই খানা শাঁকালু আর এক টুকরা কলা নিয়ে বাশবন বা শ্যাওড়ার বনে ফেলে আসার উদাহরণও আছে। … বাড়ির গৃহস্থদের নবান্ন হয়ে গেলে, ভিখারিগণও সেই রসাস্বাদনে বঞ্চিত হয় না। এমনকি বাড়িতে জ্বর-প্লীহায় আক্রান্ত ছেলে মেয়েরাও খাবারের বিধি ভেঙে নবান্ন মুখে দিয়ে নিয়ম রক্ষা করে। (দীনেন্দ্রকুমার ২০১৪ ১১-১২, ১৬-১৭)
প্রত্যেক বাড়িতেই সাধ্যানুসারে বিভিন্ন রান্নার আয়োজন থাকে এবং গৃহস্থরা আগে নিজ বাড়িতে নবান্নের স্বাদ গ্রহণ করে তারপর অন্য বাড়িতে নবান্ন আহার গ্রহণ করতেন এমন কথা উল্লেখ করেছেন মোহাম্মদ – সিরাজুল ইসলাম (২০০৭: ৩৪৪) এবং মোমেন চৌধুরী ( ২০১৪ : ৪০)। প্রত্যেক পরিবারে অন্ততপক্ষে কুড়ি থেকে চব্বিশ রকমের রান্না হতো।
কয়েক প্রকারের তরকারির সাথে ‘আলু কচুর শাক ও শোল মূলা’ এবং চন্দ্রকাইট’ নামক এ প্রকারের পিঠাও এর অন্তর্ভুক্ত হতো। নবান্নে মাছ-মাংস আহার করা হতো। তবে রাতের নবান্ন নিজ বাড়িতেই করতে হতো। পরদিন সকালেও নবান্নের রেশ লেগে থাকত। একে বলা হতো ‘বাস- ‘নবান্ন’ বা ‘বাসি নবান্ন।’ (মোমেন, ২০১৪:৪০ )
সৌমিত্র শেখর (২০১৪ : ১০৮) বলেন, সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিবেশীর বাড়িতে পাঠানো হতো নবান্ন প্রসাদ বা অন্ন প্রসাদ। শীতকালীন যাবতীয় শাকসবজির সাথে বেগুন ভাজা, করলা ভাজা, বুটের ডাল থাকলেও রসুন বা পেঁয়াজের কোনো কিছু এবং মসুরির ডাল এই আয়োজনে চলে না।
বাংলাদেশে অঞ্চল বিশেষে নবান্ন উৎসবের বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। কোনো কোনো অঞ্চলে ফসল তোলার পরদিনই নতুন চালের ফিরনি-পায়েস অথবা ক্ষীর তৈরি করে আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের ঘরে ঘরে বিতরণ করা হয়। কোনো কোনো অঞ্চলে ধনাঢ্য কৃষক পরিবার গরু-মহিষ জবাই করে জেয়াফতের মতো অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনেক মুসলিম পরিবারে মিলাদ আর হিন্দু পরিবারে লক্ষ্মীদেবীর পূজার আয়োজন হয়। উঠানে, ঘর-দোরে বিচিত্র রকম আলপনা আঁকা, নতুন জামাইকে নিমন্ত্রণ করা বা মেয়েকে বাপের বাড়ি নায়র আনার মতো বিষয়গুলো বাঙালি সংস্কৃতির অখণ্ড রূপ বলে উল্লেখ করেন তিতাশ চৌধুরী (২০১৪ : ৫৩)।
বহু কাঙ্ক্ষিত নবান্নের দিনটি যেন বিদায় জানাত সকল কর্মব্যস্ততাকে। সেই সমাজচিত্রই তুলে ধরেন দীনেন্দ্রকুমার রায় :
গ্রামস্থ বৃদ্ধেরা হুঁকা টানিতে টানিতে দাবা ও পাশা খেলিতে বসিয়া গিয়াছেন, গড় গড় করিয়া হুঁকা ডাকিতেছে. বিসুবিয়াসের ধুম- উদিগরণের ন্যায় কুণ্ডলীকৃত ধুম উঠিতেছে; “কিন্তুী!” “কচেবারো!’ প্রভৃতি শব্দের নিরা । যুবক দল একটু আড়ালে নসিয়া সশব্দে ভাস সিটিতেছে।
ছেলেরা সমস্ত পুরা বাড়ির বারান্দায়, চিলেকোটার হাতে অন্দরের বাগানে গোয়াল ঘরের অন্তরালে, লুকোচুরী খেলা শেষ করিয়া বৈকালে দলে দলে দত্তবাগানে গিয়া জুটিল। … নদীতীরবর্তী সুবৃহৎ ষষ্ঠীগাছের ছায়ায় আজ গ্রামস্থ রাখাল, কৃষাণ ও মজুরেরা সমবেত হইয়াছে, বর্ষব্যাপী কঠোর পরিশ্রমের পর আজ তাহাদের বিশ্রামের দিন। আজ কেহ কাজে যায় নাই। একদল সেখানে ‘মালামো’ করিতেছে, কেহ কেহ লাঠি খেলিতেছে, তিন চারিজন বাজি রাখিয়া সর্ব্বাগ্রে লক্ষ্যস্থানে উপস্থিত হইবার আশায় প্রাণপণে ছুটিতেছে। (দীনেন্দ্রকুমার, ২০১৪ : ১৭-১৮)
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের কোনো কোনো অঞ্চলে পাড়ায় পাড়ায় মানুষ দল বেঁধে নবান্নের আয়োজন করত বলে উল্লেখ করেন সৌমিত্র শেখর। সন্ধ্যার পর পাড়ার উৎসাহী তরুণেরা গায়েন দল নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান গেয়ে ধান সংগ্রহ করতো। নতুন এই ধান দিয়েই পাড়াসুদ্ধ মানুষ একত্রে নবান্ন করত। নতুন চালের ভাত নানা ব্যঞ্জনে মুখে দেয়া নিয়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। সেই আয়োজনের দিনে উচ্ছ্বসিত আনন্দে মশগুল থাকত গ্রামের মানুষেরা। (সৌমিত্র, ২০১৪ ১০৮-১০৯ )
অনাগত দিনে ভালো ফসল প্রাপ্তির কামনায় ছোট ছোট নানা আনুষ্ঠানিকতায় একটি পূর্ণাঙ্গ উৎসব নবান্ন, যার রেষ থাকে পৌষ-পার্বণের নানা আয়োজনে এমন মত পোষণ করেন মোমেন চৌধুরী (২০১৪ : ৪০- ৪১)। তিনি বরিশালে আয়োজিত নবান্নে লক্ষ্মীপূজা, পিতৃশ্রাদ্ধ, ‘বীরবাশ’, ‘কাকবলি’, নবান্ন ভোজন, রাতের নবান্ন এবং বাসি নবান্নর আনুষ্ঠানিকতায় নবান্ন উৎসবের চিত্র তুলে ধরেন। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, বীরবাশ- এর ‘বীর’ শব্দটি ‘ব্রীহি’ থেকে আসতে পারে।
বীরবাঁশের কঞ্চিগুলোতে ধানের ছড়া বেঁধে দিয়ে অনাগত বছরে ফসলের প্রাচুর্য কামনা করা হতো। কৃষিজীবী সমাজে জ্যান্ত কই মাছ, দুধ, বাঁশ এবং ধানের ছড়া সবগুলোই উর্বরতাসূচক উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। সেই অর্থে বীরবাশ তাৎপর্যবাহী। প্রোথিত লম্বা বাঁশ তেল দিয়ে পিচ্ছিল করে, বাঁশের মাথায় মিষ্টির হাঁড়ি ঝুলিয়ে দেয়া হয়। পিচ্ছিল বাঁশ বেয়ে মিষ্টান্নের হাঁড়ি নামিয়ে আনতে পারা ব্যাক্তিই ‘বীর’ বলে আখ্যায়িত হতো। ‘বীরবাশ’ নামক এই খেলা প্রচলিত ছিল ময়মনসিংহ, রংপুর, রাঙামাটিতেও।
কালের বিবর্তনে এখনো গ্রামীণসমাজে অগ্রহায়ণ মাসে সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো রান্না, খাওয়া, নতুন পোশাক পরিধান এবং আনুষ্ঠানিকতা পালনের রেওয়াজ আছে। নিয়মতান্ত্রিকতা আর উদযাপন ভিন্নতার কারণে মনে হতে পারে, নবান্ন প্রকৃতপক্ষেই অসাম্প্রদায়িক উৎসব কিনা। তবে নিঃসন্দেহে অগ্রহায়ণ মাসজুড়ে গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে নতুন ধান বরণের এ এক সহজাত আয়োজন, ঐতিহ্যের উৎসব।
প্রাসঙ্গিকতায় নবান্ন অনেক প্রতিকূলতার পরও, বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ বাংলাদেশে, বাঙালির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে ঐতিহ্যের নবান্ন উৎসব উদযাপনের প্রাসঙ্গিকতা কখনই শেষ হবার নয়। এ প্রসঙ্গে দীপককুমার পণ্ডা মনে
করেন (২০১৪ : ৭৩), আমন ধানের চাষে এখন গুরুত্ব না থাকলেও এই নবান্ন উৎসবে গ্রামবাসীর আগ্রহ কমে নি। তাই গ্রামের মানুষের কণ্ঠে থাকে নবান্ন ঘিরে উচ্ছ্বাস। এই আবেগ কিংবা নস্টালজিয়া সমস্ত বাঙালির।’
বিজনকুমার (২০১৪ : ৬৩) বলেন, গ্রামীণ সংস্কৃতিতে সমগ্র গ্রাম যে একটি যৌথ পরিবার; তার প্রমাণ মেলে এই নবান্ন উৎসবে।
গ্রামবাংলার সবচেয়ে বড় শস্যোৎসব নবান্নর মধুর স্মৃতি সঞ্জিবনী শক্তি হিসেবে ধরা দেয় যুগে যুগে। যার একটা আবহ মিশে আছে অঘ্রাণের গাঁয়ে :
নবান্ন না করিলে প্রত্যবায় থাক না থাক দীর্ঘকাল পরে বালক বালিকাগণের কলকণ্ঠকভারে মুখরিত দেহাচ্ছন্ন পল্লীগৃহে পিতা মাতা ভাতা ভগিনী ও আত্মীয়-স্বজনগণে পরিবেষ্টিত হইয়া নূতন আমনের চাউলের অন্নগ্রহণের মধ্যে এমন কোমল মাধুর্য্য ও প্রীতিকর ভাব আছে যাহা গৃহচ্যুত প্রবাসীর বিরহবিষাদব্যধিত একক জীবনের পক্ষে একান্ত আকাঙ্ক্ষণীয়। এই মধুর পুণ্যস্মৃতিটুকুকে বৈচিত্রহীন জীবন- পথের সম্বল করিয়া বিরহী পথিক দীর্ঘকালের জন্য প্রবাসযাত্রা করিতে পারে। (দীনেন্দ্রকুমার, ২০১৪ : ৫)
নবান্ন ঘিরে গ্রামের মানুষের উচ্ছ্বাস, আবেগ কিংবা নস্টালজিয়া, এ যেন সমস্ত বাঙালির। এই আবেগ, মানসিকভাবে একাত্ম করেছে বাঙালিকে। ‘নতুন ধান মানেই নিশ্চিন্ত, নির্ভার এক সময়। সারা বছরের খাদ্যাভাব মোচনের চিন্তাই শুধু নয়, গ্রামীণ সমাজের সম্বৎসরের আনন্দ-ফুর্তি, লৌকিকতা, চিকিৎসা, বিয়ে সবকিছুর ভরসা – – এই ধান। মানসিক এই পরিতৃপ্তি থেকেই সর্বত্র তৈরি হতো একটা উৎসবের মেজাজ । তাই কৃষি বা শস্যোৎসবের ব্যাপকতা ছাপিয়ে নবান্ন উৎসব শিথিল করতো জাতিগত বিভাজনের বেড়াজাল। (দীপককুমার ২০১৪ ৬৬ ৭৩-৭৪)
‘নবান্ন’ নানা কারণেই অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ অতীব তাৎপর্যপূর্ণ মণ্ডিত। বরুণকুমার চক্রবর্তী (২০১৪ : 32 ) বলেন, ‘এক কথায় নবান্ন এক বহুমাত্রিক পার্বণ। ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার মতই তা স্নিগ্ধ ও পরম উপভোগ্য, রমণীয়, আস্বাদ্য, মধুর। পার্বণের সংসারে নবান্নকে এখন আমরা যত উপেক্ষিতই দেখি, একটা সময় ছিল যখন কৃষি অর্থাৎ শসা ছিল অর্থনৈতিক চালিকার মূল শক্তি, তখন নবান্ন সগৌরবে তার অস্তিত্বের জানান দিত। সারা বছরে এই দিনটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত বাঙালি
নতুন ফসলের সঙ্গে গ্রামীণ মানুষের অবিচ্ছেদ্য যোগ, তাদের আগ্রহের আতিশয্যে গ্রাম্য জীবন মুখরিত হয়ে উঠত। গ্রামীণ জীবনে দেখা দিত প্রাণের স্পন্দন। নবান্ন উৎসব তার প্রতিভূ হিসেবে প্রতিফলিত হতো। (দীপককুমার, ২০১৪ঃ৬৬)
১৯৩৫ সালে ‘বিশ্বভারতী নিউজ’-এর ডিসেম্বর সংখ্যার উদ্ধৃতি দিয়ে দীপককুমার লেখেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পল্লিবাংলার ধান-চাল ঘিরে নানা উৎসবকে গুরুত্ব দিতেন। নবান্নর উচ্ছসিত প্রসংশায় মুখর হতেন তিনি। শুধু তাই নয়, বিশ্বভারতীতে নবান্ন উৎসব আয়োজিত হতো সাড়ম্বরে। (দীপককুমার ২০১৪ ৬৬)
লোক-উৎসবের উপযোগিতাকে ধর্মের অনুশাসনে ব্যাখ্যা করা অনুচিৎ – এমন মন্তব্য করে সৌমিত্র শেখর – (২০১৪ : ১১০) বলেন, বাঙালি হিসেবে তার সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে ভালোবাসা উচিত। সংস্কৃতির সাথে ধর্মকে, ধর্মান্ধতাকে এক করে ফেলা সমীচিন নয়। ধর্ম সংস্কৃতির একটি উপাদান মাত্র। সংস্কৃতিকে পাশ কাটিয়ে শুধুই ধর্মে স্থিতি নেয়া ‘বৃক্ষের অধিকার ছেড়ে শাখা-প্রশাখায় আশ্রয় গ্রহণের নামান্তর’ বলেই মত দেন তিনি।
মূলত, বাঙালি জাতিসত্ত্বার সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক ইতিহাসও নবান্ন উৎসব দ্বারা প্রভাবিত ছিল। পাশ্চাত্য চেতনার প্রভাব আর সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের কঠোরতায় ম্লান হয়ে গেলেও, এই উৎসব মানুষের সাথে মানুষের হৃদয়ের বন্ধনকে দৃঢ় করেছে, তাকে সহমর্মী করেছে, যুক্তিবাদী ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হয়েছে। নবান্ন উৎসব মানুষকে সকল সংকীর্ণ চেতনার উর্ধে উঠে তাকে ঋন্ধ হতে, সংস্কৃতিবান হতে সর্বোপরি মানবীয় হতে সহায়তা করেছে।
মানবীয় শক্তিতে বলীয়ান হতে উত্তরপ্রজন্ম তার পূর্বসূরীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অন্তরে ধারণ করবে, নবান্ন উৎসবকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করবে এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত হয়েছে উল্লিখিত মনীষীদের ভাবনায়। স্বাধীন জাতি হিসেবে বাঙালি একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতির দাবিদার। নবান্ন উৎসব তেমনি সমৃদ্ধ ইহলৌকিক এক ধারণা এবং সামাজিকতা। নবান্ন উৎসব মানুষকে জাতিগত অনুভূতিতে একাত্ম করে।
এই অনুভূতি মহৎ উদ্দীপক-প্ৰশংসাৰ্য্যগুক। বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক অবলম্বন হিসেবে এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করার প্রয়োজনে এই উৎসব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। নবান্ন উৎসব বাঙালি সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, যা মানবতাবাদী চিন্তা-চেতনার ধারাকে শাণিত করে, যে চেতনায় আছে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তির প্রত্যাশা। আর এখানেই নিহিত উৎসবের অন্তর্নিহিত শক্তি।
বিশ্বসভ্যতার হাতছানি রুখতে বাঙালি সংস্কৃতি কতটুকু সহায়ক, তার মূল্যায়ন করবে নবান্নর মতো লোকউৎসবগুলো। কেউ কেউ নবান্ন উৎসবকে নির্দিষ্ট ধর্ম সম্প্রদায়ের বলে, জাতিগত বিচ্ছিন্নতা তৈরির চেষ্টা করলেও, বাঙালির আত্মপরিচয়ের উপলব্ধিই পারে সংস্কৃতিকে এই সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করতে।
বাঙালি সংস্কৃতি ও এর উপাদানের বাহন ও ঐতিহ্যের ধারা যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে বিরাজমান থাকে এবং সমাদৃত হয় সে বিষয়ে উদ্যোগী হতে হবে সবাইকে। তরুণ প্রজন্ম তার শিকড়হীনতার অপবাদ থেকে মুক্তি পেতে ফিরে আসতে পারে আপন সংস্কৃতির ঐতিহ্যে। নবান্নের মতো ঐতিহ্যবাহী উৎসব ধরে রাখতে পারে ভবিষ্যতের বাঙালির পরিচয় তাকে গৌরবান্বিত করতে পারে ঐতিহ্যগত চেতনায়।
শীত উৎসব
প্রকৃতিতে শীতকাল আসে হিমের পরশ নিয়ে। প্রকৃতির তপ্ত আবহাওয়া মানুষকে বিচ্ছিন্ন করলেও, শীত যূথবদ্ধ করে মানুষকে আর যুথবদ্ধতা মানেই উৎসব। শীতের কুয়াশামাখা ভোরে একটু উষ্ণতার আশায় রাস্তার ধারে বা মাঠে খড়কুটো জ্বালিয়ে তাপ পোহানোর দৃশ্য গ্রামাঞ্চলে হরহামেশা দেখা যায়। স্বকৃত নোমান (২০১৭) লিখেছেন, মিষ্টি রোদের ওম নিতে বাড়ির আঙিনায়, চায়ের দোকানে, পুকুর পাড়ে জমে ওঠে আড্ডা। শীতের দিনটা এভাবেই শুরু হয় ছোটখাটো উৎসব আনন্দের মধ্য দিয়ে উল্লেখ করে তিনি আরও লেখেন:
যতই কাজ থাকুক, বাড়ির বউ-ঝি, এমনকি পুরুষরাও গোসল করতে পুকুরে নামার আগে কিছুক্ষণ পুকুর পাড়ে বসে আড্ডা দেবেই। আবার গোসল শেষেও সেই একই আড্ডা। আড্ডার যেন আর শেষ হতে চায় না। সন্ধ্যায় এসে উৎসবটা পায় আরেক মাত্রা। গ্রামাঞ্চলে সাঁঝের বেলায় খড়কুটো, নাড়া, লতাপাতা জ্বালিয়ে বা লাকড়ির গ্রুপ বানিয়ে সবাই গোল হয়ে আগুন পোহাতে বসাটা শীত উৎসবের আরেক পর্ব। শীতের মাত্রাটা একটু বেশি হলে শহরেও এমন চিত্র দেখা যায়। (স্বকৃত নোমান ২০১৭ )
শীতকালে দিনের বেলাটা কর্মোদ্দীপনায় মুখর আর বৈপরীত্য এর রাতে। নির্জনতা আর স্তব্ধতার কাছে সমর্পণ করা সময় শীতের রাত, উল্লেখ করে নোমান লিখেছেন, শীতের রাত বিচ্ছিন্ন মানুষগুলোকেও যুথবদ্ধ করে এক লেপ, কম্বল আর কাঁথার নিচে। এভাবে ঘুমানোর মধ্য দিয়ে শিশির মাখা দীর্ঘ রাতও হয়ে ওঠে। উদ্যাপনযোগ্য।
শীতের সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবের সংযোগ রয়েছে। গ্রামবাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির যত আয়োজন আছে, সবই আয়োজিত হয় শীতের রাতে। স্বকৃত নোমান (২০১৭) লিখেছেন, এ সময় গ্রামের সাধারণ মানুষদের উদ্যোগে নানা নাটগীতের আয়োজনে মুখর থাকে গ্রামবাংলা। এর মধ্যে কবিগান, জারিপালা, মুর্শিদিগান, গাজীর গীত, মানিক পীরের গান, মাদার পীরের গান, পুতুলনাচ, মাইজভাণ্ডারি গান, যাত্রপালা উল্লেখযোগ্য। কুয়াশার রাতে কনকনে ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে পেশাদার শিল্পীদের পরিবেশনায় সময় হয়ে ওঠে উপভোগ্য।
শীতের সময়ে প্রতিটি গৃহস্থ বাড়িতে থাকে হেমন্তের নতুন ধান। আর নতুন ধানের সাথে পিঠাপুলির সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। শীত জমে উঠলেও, পিঠা ছাড়া শীতের সকালটা জমে না একেবারেই। খেজুর গাছের মাথায় সুদৃশ্য মাটির হাঁড়ি, কাকডাকা ভোরে খেজুরের রস তৈরির আমেজ বয়ে আনে শীতের বার্তা। স্বকৃত নোমান লিখেছেন :
সকালের কুয়াশা কিংবা সন্ধ্যার হিমেল বাতাসে ভাপা পিঠার গরম আর সুগন্ধি ধোঁয়ায় মন আনচান করে। ওঠে। সরষে বা ধনেপাতা বাটা অথবা শুটকির ভর্তা মাখিয়ে চিতই পিঠা মুখে দিলে ঝালে কান গরম হয়ে শীত পালায়। সকাল হলে গাঁয়ে পিঠা উৎসব দেখা দেয়। এই পিঠাপুলির উৎসবে যোগ দিতে শীতকালে বাড়িতে বেড়াতে আসে মেয়ে, জামাই আর নতুন কুটুম।
মেয়েজামাইয়ের বাড়িতে মা-বাবারা পিঠা বানিয়ে পাঠিয়ে দেন শীতকালে। … রাতে চিতই পিঠা তৈরী করে খেজুরের রসে ভিজিয়ে সকালে খাওয়াটা একমাত্র শীতকালেই সম্ভব। আর খেজুরের রস থেকে তৈরী ‘রাব’ এর তুলনাই হয় না। এ সময় আখের রস থেকে গুড় তৈরীর ধুম পড়ে যায়। গরম গরম গুড় খাওয়ার স্বাদই আলাদা। এটাও শীত উৎসবের আরেকটি অনুষঙ্গ। (স্বকৃত নোমান, ২০১৭)
পৌষ-পার্বণ
বারো মাসে তেরো পার্বণের বাংলাদেশে ‘নবান্ন’ পার্বণ থেকে হয়ে উঠেছে উৎসব। একালে উৎসব বলতে যা বোঝায়, আয়োজন ও উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতায় প্রথম দিকে নবান্নকে সে সংজ্ঞায় ফেলা যেতো না- এমন মত প্রকাশ করেন সৌমিত্র শেখর। তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থ লোক-উৎসব নবান্নর ভূমিকা অংশ ‘নবান্ন : পার্বণ থেকে উৎসব’-এ বলেন, পার্বণের সঙ্গে ভালো দিন বা তিথি-নক্ষত্রের সংযুক্তি বিচার হতো।
সেই শ্রেণিবিচারে নবান্ন ছিল পার্বণ। পরবর্তী সময়ে নবান্নের দিন নির্ধারণ করা হতো ধান ওঠার সাথে সঙ্গতি রেখে সুবিধা মতো যে কোনো দিন। এ কারণেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্যতার বিচারে ‘নবান্ন’ পার্বণ থেকে হয়ে উঠেছে উৎসব। সূচনার বিচারে নবান্ন পার্বণ আর গ্রহণযোগ্যতার বিচারে নবান্ন উৎসব। যদিও ‘নবান্ন’ লোকউৎসব নামেই স্বীকৃত।
মধ্য হেমন্তে, অগ্রহায়ণ মাসে সাধারণত এই নবান্ন হয়। পঞ্জিকাতে এর শুভক্ষণের উল্লেখ থাকলেও তিথি- নক্ষত্রের কারণে কখনো কখনো এই দিনটি অগ্রহায়ণের বদলে পৌষ মাসেও পড়ে যায়। তবে এর কারণে আচার-অনুষ্ঠানের কোনো পার্থক্য হয় না। কারণ নবান্ন কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এমন উল্লেখ করে সৌমিত্র শেখর (২০১৪ : ১০৫) বলেন, হিন্দুসমাজ যে কোনো আচার-অনুষ্ঠানই শুভক্ষণ দেখে করে থাকে, নবান্নের সময়ও তারা পঞ্জিকার আশ্রয় নেয়।
বেশিরভাগ সময়ই নবান্ন অগ্রহায়ণ মাসে হবার কারণ – এ সময় গ্রামের সব মানুষের কাছেহ কম-বেশি ধান থাকে। বাজারে ধানের দামও তখন কম। পঞ্জিকাতে বিভিন্ন মাস সূচনাকালে ‘দ্রব্যমূল্যজ্ঞান’ শিরোনামে দ্রব্যমূল্য সম্পর্কিত পূর্ব-ধারণা লিপিবন্ধ থাকতে দেখা যায়। পঞ্জিকায় আছে অগ্রহায়ণ মাসে চাল, কাগজ, কাপড় সরিষা সুলভ হয়।
‘নবান্ন’ আঞ্চলিক ও পারিবারিক উভয় ধারার লোকজ উৎসব হয়েও কখনও কখনও তা ধর্মীয় আচারের পর্যায়ভুক্ত, এমন মত আমিনুর রহমান সুলতানের ( ২০১৪ : ৫৬)। কেননা, একটি পরিবারে নবান্নকে যেভাবে গ্রহণ করা হয় তার জন্য পরিবার-কেন্দ্রিক আমেজেরই প্রকাশ ঘটে অধিক। এটি মুসলিম কৃষক পরিবারের ক্ষেত্রেই ঘটে। তবে সামাজিক উৎসব হয়ে ওঠে তখনই যখন পরিবারের নিজেরাই শুধু নয়, প্রতিবেশীদের খাইয়ে কিংবা জুমার দিনে (শুক্রবার) ক্ষীর-পায়েস তৈরি করে জুমার নামাজে অংশগ্রহণকারীদের খাওয়ানোর আয়োজনের মধ্য দিয়ে।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে অগ্রহায়ণের নবান্ন উৎসব পৌষেও বিস্তারিত হয়। আর পৌষপার্বণ মানেই পিঠাপুলি খাওয়ার সুযোগ। পৌষপার্বণে মেলা ও পিঠাউৎসব যেন নবান্ন উৎসবের সম্প্রসারিত রূপ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে নানা আঙ্গিকে পৌষমেলা উদযাপন করতেন, যা এখনও প্রচলিত আছে বলে উল্লেখ করেন শামসুজ্জামান খান (২০১৩ : ৫৯)।
এখনও দুই বঙ্গেই কিছু ভিন্ন আঙ্গিকে পৌষমেলা হয়। বাংলাদেশে নেত্রকোণার পৌষমেলা, চট্টগ্রামের ডিসি হিলে পৌষের পিঠা উৎসব, ঢাকার নানা সংস্থার পিঠা উৎসব এর সম্প্রসারিত রূপ বলে মনে করেন তিনি।
ঋতু বা জলবায়ু ভেদে আমাদের দেশে প্রায় ছয়শ রূপ ধানের উল্লেখ আছে প্রাচীন সাহিত্য শিবমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, মনসামঙ্গলসহ শত শত পুথিতে এমন তথ্যের অবতারণা করে আশরাফ সিদ্দিকী লেখেন, “ধানের নামই যেখানে শতাধিক, তাহলে নবান্ন উৎসবের পিঠের নাম কিরূপ হতে পারে? প্রাচীন সাহিত্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে শতাধিক প্রকার পিঠে ছিল। এ পিঠে কি শুধু উদর পূরণের? এ যে নয়নভরে দেখারও এ যে উপলব্ধি করারও। এ সময় ঢেঁকিঘরে চলে গানের বন্যা।’ (আশরাফ, ২০১৪ ২১-২২)
নতুন ধানের নতুন চালের রকমারি পিঠার গন্ধে সেসময় ভরে উঠত গ্রামবাংলার আঙিনা। বৈচিত্র্যময় নামধারী নানান সব পিঠার নাম উল্লেখ করেন তিতাশ চৌধুরী। এর মধ্যে রয়েছে পোয়া পিঠা, দুই বিরানি, চিতল পিঠা, পাক্কন পিঠা, চুকা পিঠা, মেরা পিঠা, তিলের পিঠা, তালের পিঠা, চটা পিঠা, ভাপা পিঠা, গুড়ের পিঠা, পাটিসাপটা, রুটি পিঠা, চিকন পিঠা, চানা পিঠা, সেমাই পিঠা, খান্দেশ পিঠা, পুলি পিঠা, হাফরি পিঠা, খোলা পিঠা এবং আরও নানা রকম ছাঁচের পিঠা। তিতাশ চৌধুরী লিখেছেন
দুই বিরানি ও চিকন পিঠায় নানা রকম চিত্র ও নকশার কারুকাজ লক্ষ করা যায়। এগুলির মধ্যে রয়েছে ফুল, পাখি, লতা-পাতা, সরতা, কুলা এবং বিচিত্র রকম গ্রার্হস্থ্য চিত্র। … এক একটি পিঠার গায়ে কুল- বধূর স্বপ্ন আর্তি ও প্রেম ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে। লুকিয়ে থাকে জীবনের বিচিত্র ঘটনা ও কাহিনি সর্বোপরি জীবনগাথা। নবান্ন উৎসবের অংশ হিসেবে এইসব পিঠা আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-পড়শির বাড়ি বাড়ি পাঠানো হয়। (তিতাশ, ২০১৪ ৫২-৫৩ )
নবান্ন উপলক্ষে বিভিন্ন বটতলায়, হাটে-বাজারে জমে উঠতো নবান্নের মেলা। বিজনকুমার মণ্ডল বলেছেন (২০১৪ : ৬৩) রাঢ় অঞ্চলের অধিকাংশ জেলায় এই উৎসবকে কেন্দ্র করে মেলা বসত। সমগ্র বাংলার লোকমেলার ওপর ১৯২১ সালে তদানীন্তন ব্রিটিশ বাংলার জনস্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক মি. টেন্টলি লিখিত ফেয়ারস অ্যান্ড ফেন্সিভ্যাল ইন বেঙ্গল গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে আশরাফ সিদ্দিকী (২০১৪ : ২৩) লিখেছেন, কোনো কোনো মেলায় পাঁচশ থেকে পাঁচ লক্ষ পর্যন্ত লোকের সমাবেশ হতো।
রংপুরের দ্বারোয়ানীর মেলায় হাতি-ঘোড়াও বিক্রি হতো। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সে মেলায় আঞ্চলিক শিল্পীদের পরিবেশনায় যাত্রা- জারি-বাউল-মারফতি ও মুর্শিদি গানের আয়োজন যেমন থাকত, তেমনি মিলত সাংবাৎসরিক হাঁড়ি-পাতিল, লাঙল-জোয়াল, আগত বছরের জন্য বিভিন্ন তরকারীর বীজ, ফসল ইত্যাদি।
মৌসুমের সময় অপেক্ষাকৃত কম দামে ফসল পাওয়া যেত বলে, দেশি-বিদেশি পাইকারগণ ধান-সরিষা বিভিন্ন প্রকার চাল ফসল তরিতরকারি সংগ্রহে গ্রামের হাটে হাটে ভিড় জমাতো। এসব দ্রব্য চালান হতো বড় বড় শহরে। এমনকি সমুদ্রপথে বিদেশেও। মেলায় মিলত শাড়ি-জামা-চুড়ি-সৌখিন গহনা ও আনুষঙ্গিক, যা গ্রামে বউঝিদের বহুকাঙ্ক্ষিত। ধান ওঠার মৌসুমে অক্লান্ত শ্রমের দাবীদার হিসেবে একটি নতুন শাড়ি গৃহস্থ বউদের ভাসিয়ে – দিও বিপুল আনন্দে। (আশরাফ ২০১৪ : 25 )
বাঙালির ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ হলেও বছরের সবসময় উৎসবের একই রকম ঘনঘটা দেখা যায় না। উৎসবের বান ডাকে ধান ঘরে তোলার পরের মাসগুলোতে। এমনকি বিয়েশাদির জন্য পছন্দের সময়ও এই মাস। (সুমহান, ২০১৪ : ৯২)
হেমন্তের প্রাণ যেন নবান্ন উৎসব। সাধ আর সাধ্যের সমন্বয়ে হাজার বছরের এই উৎসবটি পালিত হয়ে আসছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। তাই অগ্রহায়ণে গ্রামেতো বটেই, শেকড়ের টানে এই উৎসবে মিলিত হতে চান শহরবাসীরাও।
পৌষ-পার্বণ উৎসব আগের মতো জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও, এখনও বাংলার গ্রামীণ জীবনে আনন্দের বার্তা বয়ে আনে, এমন বার্তা দিয়ে খোন্দকার রিয়াজুল হক লিখেছেন :
পৌষ মাসে পৌষ-পার্বণ ছাড়াও কৃষিকে কেন্দ্র করে আরো কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়ে থাকে। পার্বণ উপলক্ষে নগ্রামের ছেলে মেয়েরা মাগনের গান গায়। বাড়ি বাড়ি যেয়ে এ গান গেয়ে কিছু কিছু চাল-পয়সা তারা মেগে নিয়ে থাকে। পৌষ মাসের সাতদিন থাকতে কোনো কোনো গ্রামে এখনো বোইল’ গানের দল বের হয়।
আট-দশ জন গ্রাম্য বালক সমন্বরে এই বোইল গান গেয়ে বাড়ি বাড়ি পিরের গান শুনিয়ে চাল ও পয়সা গ্রহণ করে। ‘বোইল’ গানের দলের এবং মানিক পিরের গানের দলের লোকেরা পৌষ সংক্রান্তির দিন পৃথক পৃথক জায়গায় ঐ চাল এবং তার সাথে শুড় দিয়ে ক্ষীর পাকিয়ে শিরণী করে। … বোয়াইল গান ও মানিক পিরের গান ছাড়াও কোনো কোনো গ্রামে ‘সোনারায়ের দল’ গঠিত হয়। (রিয়াজুল, ১৯৯৫ : ৪১- 82)
পৌষ-পার্বণ উপলক্ষে কোনো কোনো এলাকায় ‘ভারবোল’ বা ‘হরবোল’ নামে এক ধরনের ছড়া গান এবং ‘বাঘাইর বয়াত’ নামেও ছড়াগানের প্রচলন আছে বলে উল্লেখ করে খোন্দকার রিয়াজুল হক জানান, এই উৎসবগুলো জোরদারভাবে পালিত না হলেও, বাংলাদেশের অনেক গ্রামাঞ্চলে এই উৎসব দুর্বলভাবে টিকে আছে।
পৌষালী বা পৌষপার্বন অন্যতম শস্য উৎসব। এর মধ্যে নতুন শস্য সমাগমের আনন্দ উৎসবের ইঙ্গিত অত্যন্ত সুষ্পষ্ট উল্লেখ করে প্রদ্যোত কুমার (১৯৮৮ : ১৩০) লিখেছেন, পৌষপার্বণ মূলত কৃষকদেরই উৎসব এবং এটি সঞ্চয়ের পরিপূর্ণতার উৎসব। পৌষের সংক্রান্তিতে এই উৎসব উদযাপিত হয়। পিঠে খাওয়া এ পর্বের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এককালে নানান ধরণের পিঠে তৈরি হত; যেমন- চিতই, রসপুলি, পুলি, সরুচাকলি, সোকুল, মোহন বাঁশি, ক্ষীরমুরলি, পাটিসাপটা ইত্যাদি। পিঠে তৈয়ারী ছিল বাঙালীয় পল্লিবধূদের এক বিশেষ ধরনের শিল্প। বঙ্গসংস্কৃতির এই পিষ্ঠক শিল্প আজ অনেকখানি অনাদৃত বললে চলে।
প্রদ্যোত কুমার (১৯৮৮: ১৩০ ) যোগ করেন, পৌষ মাস, লক্ষ্মী মাস। এই লক্ষ্মীমাসকে পল্লীনারীরা আঁকড়ে রাখতে চায় নানান ভাবে। কোথাও কোথাও পৌষের শেষ দিনের ভোরে কৃষাণ পত্নী মাঘের ঊষার উদয়ের পূর্বে শুদ্ধাচারিণী হয়ে কন্যা সন্তানদের সাথে নিয়ে খামারে যায়। আতপ চালের গুঁড়ার বেড়া দেয় পৌষমাসের গতি রোধ করতে।
পৌষ সংক্রান্তি
শীত উৎসবের একটি বিশেষ অনুষঙ্গ পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি। দেশের সব অঞ্চলে এটি পালিত না হলেও, বিশেষ কিছু এলাকায় পৌষ মাসের শেষ দিন পিঠা খাওয়া, ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যায় পটকা ফুটিয়ে, ফানুস উড়িয়ে পৌষ সংক্রান্তির সমাপ্তি করা হয়। খোন্দকার রিয়াজুল হক (১৯৯৫ : ৪৩) জানান, ঘুড়ি উড়ানো উৎসবটি উদযাপন করে পুরনো ঢাকাবাসীরা। এ সময়টায় পুরনো ঢাকার পাড়া- মহল্লার সব বাড়ির ছাদে নাটাই ও ঘুড়ি হাতে শিশু কিশোরদের উৎসব জমে ওঠে। নানা রং-আকৃতির বৈচিত্র্যময়, আকর্ষণীয় সব ঘুড়ি উড়তে থাকে আকাশে। এসময় ঘুড়ি কাটাকাটির প্রতিযোগিতা আনন্দ বাড়িয়ে তোলে বহুগুণ।
ভ্রমণ
মেঘমুক্ত আকাশ আর শঙ্কাহীন ঝড়বাদলের আশ্বাসে, ভ্রমণ পিয়াসীদের জন্যও উপযুক্ত সময় শীতকাল। কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন, নিঝুমদ্বীপ, সুন্দরবনসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে শীতকালে যে পরিমাণ পর্যটক ভ্রমণে যায়, অন্য কোনো ঋতুতে সে পরিমাণ নগণ্য ।
বসন্ত উৎসব
ফাল্গুনের প্রথম দিন সকালে চারুকলা অনুষদের বকুল তলায় আয়োজন করা হয় বসন্তবরণ অনুষ্ঠান। উত্তরীয় হাওয়ায় ঝরা পাতাকে বিদায় জানিয়ে প্রকৃতিতে আসে ঋতুরাজ বসন্ত। যদিও সে সময়টায় শীত পুরোপুরি বিদায় নেয় না। গাছের ডালে ফুলে, ফলে, পাতার আড়ালে চলে বসন্তের অভিষেক। গাছে গাছে কোকিলে ডাক জানান দেয় বসন্তের আগমনী বার্তা। বনানী জুড়ে নতুন কুঁড়ি সিদ্ধ করে তোলে রিক্ত বৃক্ষকে। ফুলে ফুলে সেজে ওঠে প্রকৃতি।
নিজেকে যেন প্রকৃতির সাথে বিলিয়ে দেবার ব্যকুলতায় উচ্ছ্বল তরুণ-তরুণীরা সমবেত হয় বসন্ত বরণে। নগর জীবনের সেই দোলায় জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষৎসহ নানা শিল্প- সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আয়োজন করে প্রাণের উৎসব বসন্ত বরণ উৎসব।
নব জাগরণের চেতনায় নৃত্য, গীত, কবিতা, কথনে বসন্তকে বরণ করে ফাগুনপ্রেমীরা। এক সাক্ষাৎকারে (সাক্ষাৎকার ৫) বক্তারা বলেন, এ দিনটি যেন সমস্ত কলুষতা দূর করে সুন্দরকে বরণ করার দিন। সুন্দরভাবে জীবন যাপন করার অদম্য আকাঙ্ক্ষায় প্রতিবছর মনের তাগিদে সবাই এ উৎসবে মিলিত হন, বলেও জানান বক্তারা। এভাবেই এক অভিন্ন হৃদয়াবেগে উচ্ছসিত মানুষ একাত্মা হন বসন্ত বরণ উৎসবে।
ঋতুভিত্তিক অন্যান্য উৎসব
ওপরে যা বর্ণনা করা হলো, এর বাইরেও ঋতুভিত্তিক আরও কিছু উৎসব পালিত হয়ে থাকে। এগুলো নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো।
প্রবারণা উৎসব
ঋতুবিশেষে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষেরা পালন করেন তাঁদের ধর্মীয় উৎসবও। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব প্রবারণা উৎসব অনুষ্ঠিত হয় শরৎকালে।
খোন্দকার রিয়াজুল হক (১৯৯৫ : ২৬-২৭) উল্লেখ করেন, আশ্বিনী পূর্ণিমাকে প্রবারণা পূর্ণিমা বলা হয়, কারণ এ তিথিতেই প্রবারণা উৎসব শুরু হয়। প্রবারণা কথার অর্থ বিশেষভাবে বারণ বা নিবারণ করা, “নৈতিক স্খলন নির্দেশ” করার জন্যে অনুরোধ জানানো। প্রবারণায় একজন শিষ্য নিজের দোষ দেখিয়ে দেবার জন্য অপরকে অনুরোধ করেন এবং অপর ব্যক্তি শিষ্যকে তার দোষ দেখিয়ে দেন। এটাই উৎসবের মূল তত্ত্ব। এ দিনে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সকল হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, একে অন্যের সাথে আলিঙ্গন করেন এবং নিজের জ্ঞাত বা অজ্ঞাত ত্রুটিপূর্ণ আচরণের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী হন।
রিয়াজুল হক (১৯৯৫ : ২৬-২৭) আরও যোগ করেন, আশ্বিনী পূর্ণিমায় প্রবারণা উৎসব অনুষ্ঠিত হবার আগে আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র এই তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুরা একটি স্থায়ী আবাসে থেকে ধ্যান ও কঠিন সাধনা করেন। সারা বর্ষাকালব্যাপী এই অবস্থানকে বলা হয় বর্ষাবাস। প্রবারণা বা আশ্বিনী পূর্ণিমায় সেই সাধনার সমাপ্তি হয়। এ দিন ভিক্ষুদের দোষ স্বীকারের পর দোষ দূরীভূত করা হয় এবং বিহারে আয়োজিত ধর্মের আলোচনায় যুক্ত হওয়া, উপদেশের কথা শোনা ও পুণ্যকাজ করা কর্তব্যের অংশ হিসেবে পড়ে।
এই উৎসবের দিন থেকেই শুরু হয় মাসব্যাপী কঠিন চীবর দান উৎসব। যেখানে বাংলাদেশের প্রতিটি বৌদ্ধ গ্রামে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিক্ষুগণকে চীবর বা গৈরিক কাপড় দান করা হয়। সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবকল্যাণের ব্রত নিয়ে, অনুষ্ঠিত বৌদ্ধধর্মীয় উৎসব প্রবারণা ও কঠিন চীবর দান উৎসব, বাংলা ঋতুভিত্তিক আয়োজিত উৎসব।
চৈতপূজা বা চড়কপূজা উৎসব
প্রতি বছর চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহে পালিত হয় চৈতপূজার উৎসব, যার অন্য নাম চড়কপূজার উৎসব, এমন তথ্যের অবতারণা করে খোন্দকার রিয়াজুল হক (১৯৯৫ ১৮-১৯) লিখেছেন, চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহের প্রথমে উৎসব শুরু হয়ে সমাপ্তি ঘটে চৈত্র-সংক্রান্তির শেষ দিন।
চৈত্র মাসে হয় বলে এ উৎসবকে চৈত্রপয়ম বা চৈত্র-বুৎসবও বলা হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবাই এ উৎসবে যোগ দেন, তবে ‘বালা’ নামক এক শ্রেণির হিন্দু চড়ক পূজার প্রধান আচার আচরণ পালন করে থাকেন। গ্রামের মধ্যবর্তী কোনো ঘরে, মন্দিরে বা কখনো গ্রামের শেষপ্রান্তে বড় গাছের নিচে উৎসবের স্থান নির্ধারণ করা হয়, যাকে বলা হয় ‘খান’। ওই খানে বা মন্দিরে একটি চিত্রিত কাঠের আসন পেতে, মাঝে একটি ত্রিশূল গেঁথে, আসনের চারপাশে লোহার পেরেক ঠুকে রাখা হয়।
পরবর্তীকালে নানা আনুষ্ঠানিকতায় আসনটি পানি, দুধ, তেল ও ঘি দিয়ে ধুয়ে, তেল-সিঁদুর মাখিয়ে চৈত্র মাসের পনেরো তারিখের মধ্যে পূজারিরা আসনটিকে খানে বা মন্দিরে স্থাপন করেন। অঞ্চল বিশেষে এই আসনকে পাট বা সিংহাসনও বলা হয়।
রিয়াজুল হক উল্লেখ করেন, উৎসব চলাকালে প্রতিদিন পাট-ভক্তরা আসনটি মাথায় নিয়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে, বাড়ির মাঝ দুয়ারে পাটটি নামিয়ে রাখেন এবং ঢাক, ডোল, কাঁসর সহযোগে পাটের চারপাশে ঘুরে ঘুরে নাচ গানে মেতে ওঠেন। আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে গৃহকর্তা পাটটিতে তেল সিঁদুর মাখিয়ে গায়কদের ধামায় চাল-ডাল দান করেন।
এভাবে বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি ঘুরে কখনো পনেরো দিন, কখনো সাত দিন অতিবাহিত হবার পর চৈত্রসংক্রান্তির দিন মূল থানে প্রধান নগুরুর পরিচালনায় নানা রকম আচার পালনের মধ্য দিয়ে সংগৃহিত চাল-ডালে খিচুরি রান্না করে ভক্তদের প্রসাদ দেয়া হয়।
চৈতপূজার উৎসবে অংশগ্রহণকারী বালা ও শুরু উৎসব চলাকালীন পক্ষকালব্যাপী বিশেষ নিয়ম পালন করেন। বাংলাদেশে এ উৎসব বিলুপ্তির পথে হলেও, একেবারে বিলুপ্ত হয়নি বলে উল্লেখ করেন রিয়াজুল হক।
ঋতুভিত্তিক উৎসবের ঐতিহ্য : ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী
আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করা সহজ নয়। সমাজবিজ্ঞানী বা নৃতাত্ত্বিকদের কাছে প্রত্যয়টির বিশ্লেষণাত্মক পরিচয় রয়েছে; কিন্তু এর আভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যজ্ঞাপন স্পর্শকাতর ও নাজুক বিষয়। তারিক মনজুর (২০০৫) লিখেছেন:
আদিবাসী বা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী নিজেদের জীবনাচরণ, রীতিনীতি, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে যথাযথ অনুসরণের জন্য প্রবলভাবে সচেষ্ট থাকে। …. স্বীয় কৃষ্টি-কালচারের প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং অপরাপর জাতিগোষ্ঠীর থেকে পৃথকীকরণ বৈশিষ্ট্য এদেরকে সহজেই আলাদা করে চিনিয়ে দেয়। অধিকন্তু জাতিসত্তার বাইরে বিবাহরীতি না থাকায় বংশপরম্পরায় এদের দৈহিক কাঠামোর তেমন রদবদল হয় না। সামাজিকভাবে আদিবাসীরা মূলত দলবদ্ধ থাকে এবং এদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি লক্ষ করা যায়। (তারিক মনজুর, ২০০৫)
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পালিত বিভিন্ন উৎসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত উৎসব হলো বর্ষবরণের উৎসব। নিজস্ব সংস্কৃতি ও কৃষ্টির চর্চা ও লালনে, পহেলা বৈশাখ একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ বাংলাদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের কাছে। জাতিভেদে এ উৎসব পালনের ক্ষেত্রে কিছু ভিন্নতা থাকলেও, বাংলাদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ নতুন বছর পহেলা বৈশাখকে বরণ করে থাকে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মাঝে।
বাংলা নববর্ষ ও চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে পাহাড়িরা বৈসাবি উৎসব পালন করে থাকে। সঞ্জীব দ্রং (২০০১ : ৩৯৯) উল্লেখ করেন, ত্রিপুরাদের বৈসুক, মারমাদের সাংগ্রাই, চাকমাদের বিজু – এই নিয়েই বৈসাবি। বৈসারি তিনটি ভাগে পালন করা হয়। ত্রিপুরাদের হাড়ি বৈসুক, বৈসুক মা ও আতাদং। মারমাদের পোইংছোয়াই, আক্যা বা আক্যাই ও আতাদা বা আপ্যাইং। আর চাকমাদের ফুল বিজু, মূল বিজু ও গজ্যাপজ্যা দিন।
হাড়ি বৈসুক, পোইং ছোয়াই
ফুল বিজু, পোইংছোয়াই বা হাড়ি বৈসুক বৈসাবির প্রথম দিন পালিত হয় বলে জানান সঞ্জীব দ্রং (২০০১ ৩৯৯)। চৈত্রমাসের শেষের তারিখের আগের দিন এ উৎসব শুরু হয়। সেদিন খুব ভোরবেলা পাহাড়িরা ফুল সংগ্রহ করে বাড়িঘর ফুল দিয়ে সাজায়। পাহাড়ি কৃষকেরা পাড়ার আঙ্গিনায়, জুম ক্ষেতে হাঁস-মুরগির জন্য শস্যদানা ও বীজ ছিটিয়ে দেয় এবং গবাদি পশুকে ফুল দিয়ে সাজায়। এদিন ত্রিপুরারা বিশেষ এক প্রকার গাছের পাতার রস আর হলুদের রস মিশিয়ে গোসল করে। তারপর নিজেদের শুদ্ধ করে পাহাড়ি জনগণ ক্যাং বা মন্দিরে গিয়ে ভগবান বুদ্ধের পুষ্প পূজা করে।
পুরনো বছরের অমঙ্গল, পাপ, কালিমা ধুয়ে মুছে নিজেদের পূতপবিত্র করে তোলাই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য। এর পর দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তির জন্য পিঠা, পাঁজন তরকারি ও অন্যান্য সুখাদ্য তৈরির আয়োজন চলে ঘরে ঘরে।
বৈসুক মা, আক্যা বা মূল বিজু
চৈত্রের শেষ দিনে এ অনুষ্ঠান পালিত হয় উল্লেখ করে সঞ্জীব (২০০১ ৪০০-৪০১) বলেন, বৈসাবির মূল অনুষ্ঠান হয় এ দিনেই। চৈত্র সংক্রান্তির দিন অতিথি আপ্যায়নসহ ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও নাচ-গানের আয়োজন করা হয়। একই দিনে মারমা যুবক-যুবতীরা একে অপরকে রঙিন পানি ছিটিয়ে আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করে।
মনে করা হয়- এর মাধ্যমে পুরাতন বছরের সমস্ত দুঃখ, গ্লানি, হতাশা রঙিন পানিতে ধুয়ে মুছে যায় এবং নতুন বছরে নব উদ্যমে জীবনের কর্ম সম্পাদন করা যায়। চৈত্র সংক্রান্তির এই দিনেই ত্রিপুরাদের গরাইয়া নৃত্য পরিবেশিত হয়।
নতুন বছর যেন শুভ হয়, মঙ্গল বয়ে আনে মানুষের জীবনে, পাহাড়ে, জুম ক্ষেতে যেন ভালো ফসল হয়, বন্যপশুর হাতে কোন জীবন বিপন্ন না হয়, রোগবালাই যেন গ্রামে প্রবেশ করতে না পারে- এ রকম বহুবিধ উদ্দেশ্য নিয়েই ত্রিপুরারা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে (ছেলেরা ধুতি, জামা, কোমর বন্ধনী, হাতে গামছা, মাথায় কাপড় এবং মেয়েরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক রিনাই, রিসা ও কোমর বন্ধনী পরিহিতা) দেবতা ‘গরয়ার” উদ্দেশ্যে এই নৃত্যগীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
গড়াইয়া নৃত্যানুষ্ঠান কতদিন চলবে তা ঠিক করে দেন ত্রিপুরা ‘আচাই’ পুরোহিত। নৃত্যগীত শেষে ত্রিপুরা গৃহস্থরা দেবতার উদ্দেশ্যে মুরগি, চাল ও টাকাপয়সা দান করে।
চাকমাদের জীবনে সর্ববৃহৎ অনুষ্ঠান বিজু বলে জানান সঞ্জীব ( ২০০১ ৪০২)। তিনি উল্লেখ করেন, চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষের সময় এ উৎসব পালন করা হয়। অতীতে এউৎসবের সময় চাকমা যুবক-যুবতীরা বুদ্ধ মহামুনির মেলায় মানত করতো, ভগবানকে পূজা দিত। লোকশ্রুতি আছে অতীতে এখান থেকেই তারা তাদের জীবন সঙ্গী বেছে নিত। পাশাপাশি, তঞ্চঙ্গ্যা আদিবাসীরাও চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখের দিন। উৎসব পালন করে (সঞ্জীব, ২০০১ ৪০২)। তাদের জাদি পৈ’ উৎসবে মন্দিরের চারদিকে নৃত্যগীতের মাধ্যমে সুখী জীবনের প্রার্থনা করা হয় এদিনে।
আতাদং, আপ্যাইং বা গজ্যা পজ্যা দিন
চৈত্র সংক্রান্তির শেষ লগ্নে পুরাতন বছরের বিদায় বেলা ঘনিয়ে আসে, পহেলা বৈশাখ জানান দেয় তার শুভ আগমনী। নববর্ষের দিনে পালন করা হয় আতাদং, আপ্যাইং বা গজ্যা পজ্যা উৎসব, এমন তথ্য দেন সঞ্জীব। আগের দুর্দিনের অনুষ্ঠান শেষে এদিন পাহাড়ি গৃহস্থরা নিজ বাড়িতে বিশ্রাম নেন।
অনেকে ভিক্ষুদের নিমন্ত্রণ করে এনে মঙ্গল সূত্র শ্রবণ করেন। তাদের বিশ্বাস এতে আগামী দিনের সব অমঙ্গল থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। পহেলা বৈশাখের দিনেই পাহাড়ি জনগণ জগতের সকল মানব জাতির সুখ, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের জন্য প্রতিটি মন্দিরে, ক্যাং ঘরে হাজার বাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেন। (সঞ্জীব, ২০০১ ৪০২ )
রাখাইন সম্প্রদায় তাদের সামাজিক উৎসব সমূহের মধ্যে এই ‘সাংগ্রেং পোয়ে’ বা সংক্রান্তি (চৈত্র সংক্রান্তি) উৎসব বা বর্ষবরণ উৎসবকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে পালন করে থাকে। এই উৎসব অন্যান্য সম্প্রদায়ের কাছে খুবই উপোভোগ্য বলে উল্লেখ করেন মুহম্মদ নূরউল ইসলাম (২০০১ : ৪০৩-৪০৭)। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, রাখাইন সম্প্রদায় রাখাইন বর্ষের শেষে ও নববর্ষের শুরুতে ৩-৪ দিনব্যাপী নববর্ষ উৎসব পালন করে থাকে।
রাখাইন সম্প্রদায়ের সর্বস্তরের লোকজন নিজেদের উজাড় করে দিয়ে বর্ষবরণ উৎসব করে থাকে। চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী বা অন্য পেশাজীবী লোকেরা বর্ষবরণ করার জন্য নিজের শহর বা গ্রামে ফিরে আসে এবং পরিবারের সাথে মিলিতভাবে বর্ষবরণ উৎসবে মেতে ওঠে।
এ উপলক্ষে কেউ যোগাড় করে পিঠা বানানোর উপকরণ, কেউ তৈরি করে নতুন পোশাক-পরিচ্ছদ। সকলেই নিজেদের আবাসস্থল সাধ্যমত পরিচ্ছন্ন ও আকর্ষণীয় করে তোলে, বলে উল্লেখ করেন নূরউল ইসলাম। নূরউল ইসলাম (২০০১ ৪০ 8 ) লিখেছেন, বৌদ্ধ ধর্মীয় ভিক্ষু (পুরোহিত) এবং জ্যোতিষীরা গ্রহ-নক্ষত্র বিচার করে সাংগ্রেং এর দিন নির্ধারণ করেন। এই সাংগ্রেং পোয়ে বা সংক্রান্তি উৎসবের প্রধান তিনটি দিকের উল্লেখ করা হয়: ১. ধর্মীয় আচারাদি পালন ২. আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ ও উপোভোগ এবং ৩. রাখাইন সংস্কৃতির বিকাশ ও তা পালন করা।
রাখাইন সম্প্রদায় বছর শেষের তিনদিন পূর্ব হতে সপ্তাহব্যাপী এই উৎসব পালন করে থাকে। প্রথমদিন বৌদ্ধ মন্দিরের উদ্দেশ্যে ধর্মীয় শোভাযাত্রা এবং বুদ্ধের স্নান উৎসবে সাংগ্রেং পোয়ে এর শুরু। পরের দুদিন শীল গ্রহণ, উপবাস ব্রত পালন ও ধর্মীয় আচারে দিনটি উদযাপিত হয়।
মূলত চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ দিনগুলো বহু প্রতিক্ষিত। যে দিনগুলোয় চলে ‘রিলং পোয়ে’ বা জলকেলি বা পানিখেলা উৎসব। এই জলকেলি উৎসবের একটি উপোভোগ্য অংশ ‘ছেংগাই’ নামে গান, যা রাখাইন সমাজের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলাকে শুধরে নিয়ে, নিজেদের সংস্কৃতিকে ধরে রাখার আহ্বান জানানো গান। (নূরউল ২০০১ 800 806)
মূলত ফেলে আসা দিনের সমস্ত কালীমা ধুয়ে মুছে অনাগত দিনের প্রসন্নতার জন্য জলের এই বিচ্ছুরণ, তরুণ-তরুণীদের প্রাণের এই উচ্ছাস। এ উৎসবে হিংসা বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে, আত্মীয়-অনাত্মীয় সবাই সুখ, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের জন্য একই প্রার্থনাস্থলে মিলিত হয়।
একসময় সাংগ্রেং উৎসবের অংশ হিসেবে কক্সবাজরের বিভিন্ন গ্রামে নৌকা বাইচ, কৃত্তি প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন আনন্দ উৎসবের আয়োজন করা হতো, উল্লেখ করে নূরউল ইসলাম (২০০১ : ৪০৭) বলেন, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, নৃগোষ্ঠীদের সংখ্যা লঘু থেকে লঘুতর হয়ে যাবার কারণ আর পরিবেশের নববৈরীতায় এই উৎসবের রং অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছে ।
সাঁওতাল
সাঁওতাল বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ নৃগোষ্ঠী। তাদের বাসস্থান মূলত উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তর রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়া জেলায়। নৃতাত্ত্বিকদের মতে, সাঁওতালরা বহুকাল যাবত বসবাস করে আসলেও অস্ট্রিকভাষী এই জনগোষ্ঠী উত্তর-পূর্ব ভারতীয় অঞ্চলে কখন কীভাবে সাঁওতাল নামে পরিচিত হয় এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতান্তর আছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি মাযহারুল ইসলাম (২০০৭: ১৪, ১৫) লিখেছেন, সাঁওতাল কথাটির উদ্ভব ঘটেছে সুতার (Soontar) থেকে। কারো মতে, তারা দীর্ঘকাল ষাঁওত’ বা সমভূমিতে বাস করার ফলে তাদের প্রচলিত নাম হয়ে পড়ে সাঁওতাল। আবার অনেকে সাঁওতালদের পূর্ব জাতিগত পরিচয় ‘খেরওয়ার’ বলেও অভিহিত করে থাকেন। এ সম্প্রদায়ের লোকেরা নিজেদের সাঁওতালের পরিবর্তে ‘সানতাল’ বলতে পছন্দ করে।
যা অপভ্রংশ হয়ে সান্দান’ উচ্চারিত হয়। ধারণা অনুযায়ী সাঁওতালরা পাক-ভারতের প্রাচীনতম আর্যদের অনেক আগে থেকেই এদেশে বাস করছে। তবে ঠিক কখন এবং কোথা থেকে এদের আবির্ভাব তা নিয়ে পণ্ডিতদের মতদ্বৈততা সত্ত্বেও বলা যায়, তারা অস্ট্রিক ভাষাভাষী আদি- অস্ট্রেলিয় (প্রোটে অস্ট্রালয়েড) জনগোষ্ঠীর বংশধর।
সাঁওতালরা অত্যন্ত আমোদপ্রিয় (মাযহার, ২০০৭ ২৭)। জীবনঘনিষ্ঠ উৎসব বলতে যা বোঝায় তা সাঁওতালী সংস্কৃতিতে বিদ্যমান। তাদের নৃত্য, গীত, কোমর জড়াজড়ি করে সম্মিলিত নাচ, ঢোল, মাদল, বাঁশির সুর সবই যেন জীবনের মূর্ত প্রতীক। জীবন থেকে উঠে আসা এই সংস্কৃতি আজও অমলিন, উল্লেখ করে মাযহারুল ইসলাম তরু লিখেছেন :
ফাল্গুন মাস থেকে তাদের সাওতালদের।
বছর গণনা শুরু হয় এবং মাঘ মাস পর্যন্ত তাদের উল্লেখযোগ্য পূজা-পার্বন ছাড়াও অনেকগুলো এত উদযাপিত হয়ে থাকে। তাদের উল্লেখযোগ্য পূজা পার্বণের মধ্যে ফাল্গুন মাসে বাহা উৎসব, চৈত্র মাসে বোঙ্গাবুঙ্গি উৎসব, বৈশাখ মাসে হোম, জ্যৈষ্ঠ মাসে এরোরা সার্দার, আষাঢ় মাসে হাড়িওয়া, ভাদ্র মাসে ছাড়া, আশ্বিন মাসে দিবি, কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে নওয়াই এবং পৌষ মাসে সোহরাই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। (মাযহারুল ২০০৭ ৩৫)
সোহরাই
সাঁওতালদের সর্ববৃহৎ উৎসব, যা পৌষ ও মাঘ মাসে উদযাপিত হয়। সোহরাই ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও আনন্দের উৎসব। এ উৎসব তিনদিন থেকে সাতদিন বা তার বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠিত হতে পারে। আমন ধান ঘরে তোলার পর দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই উৎসব, উল্লেখ করে মাযহারুল আরও লিখেছেন :
সোহরাই উৎসবে সাতদিন ধরে চলে পূজা, নাচ-গান, ভোজসভা, পচানি বা হাড়িয়া খাওয়া ইত্যাদি। যুবক-যুবতীরা বিচিত্র সাজে মেয়েরা শাড়ি পরে, খোঁপায় শিমুল বা মহুয়া ফুল গুঁজে বাড়ি বাড়ি ঘুরে নাচ গান করে। উৎসবের সময় তাদের আনন্দের সীমা থাকে না। সাঁওতাল সমাজের মাঝি, জামাঝি পারাণিক, নাইকে ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা এ সময় শোভাযাত্রা বের করে এবং ঘরে ঘরে পিঠা-পুলি তৈরি না। বিভিন্ন পশু, মুরগী, কবুতর বলি দেয়া হয় এবং তার মাংস রান্না করে সকলকে খাওয়ানো হয়। (মাযহারুন, ২০০৩)
সোহরাই উৎসবের পঞ্চম ও ষষ্ঠ দিনে পর্যায়ক্রমে মাছধরা, প্রতিবেশির বাড়িতে আহার করার আনুষ্ঠানিকতা, দলবেঁধে শিকার, নানা লোকখেলার আয়োজন এবং ভোজ এই উৎসবের অংশ। সোহরাই উৎসবের প্রধান পূজো প্রথম দিনেই হয়, যে পূজো দেখা সাঁওতাল মেয়েদের নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করেন মাযহার।
বাহা উৎসব
সাঁওতাল সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসবগুলোর আরেকটি বাহা উৎসব। সাঁওতালী ভাষায় এ শব্দের অর্থ ফুল। ফাল্গুন মাসে অনুষ্ঠিত হয় বিধায় অনেকে এ উৎসবকে বসন্ত উৎসব বা পুষ্প উৎসব বলেও অভিহিত করেন। বাহা উৎসবের পর থেকে সাঁওতাল মেয়েরা তাদের খোঁপায় ফুল পরতে পারেন, উৎসবের আগে ফুলের ব্যবহার করা যায় না বলে উল্লেখ পাওয়া যায় মাযহারুল ইসলামের (২০০৭ : ৩৭) লেখায়। অতি আড়ম্বড়ে উদযাপিত তিনদিনের এ উৎসবে পূজা, শিকার যাত্রা, নাচগান, ভোজপর্ব ও হ্যাড়িয়া পানের প্রাচুর্য উল্লেখযোগ্য।
এরো উৎসব
আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে ফসলের বীজ বোনা উপলক্ষে সাঁওতাল সম্প্রদায় এরো উৎসব পালন করে থাকে। ভালো ফসলের কামনায় সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে কলা, বাতাসা, মুড়ি ইত্যাদি দিয়ে এই পূজা সম্পন্ন হয়। পূজা শেষে ফসলের গান গাওয়া এরো উৎসবের বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেন মাযহার (২০০৭ : ৩৮)।
ওরাওঁ
বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চল তথা উত্তরাঞ্চলের এক উল্লেখযোগ্য জনজাতি ওরাওঁ। নৃতাত্ত্বিকদের মতে, ওরাওঁ জনগোষ্ঠী বহুকাল যাবত এ অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। মাযহারুল ইসলাম (২০০৭ ৪৪) জানান, বিগত অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ওরাওঁ বসবাস না করলেও বর্তমানে তাদের সংখ্যা লক্ষাধিক। ওরাওঁদের মূল পেশা কৃষিকাজ হলেও, তারা চা বাগানেই তারা দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত। আচার-আচরণ, রীতি-নীতি ও নিজস্ব ঐতিহ্যে তারা উজ্জ্বল। ওরাওঁ সমাজে পার্বণিক উৎসব মূলত চারটি : ১ সারহুল, ২. কারাম, ৩. পশু উৎসব, ৪. খারিয়ানি, ৫. ফাওয়া, ৬. সোহরায়।
সারহুল উৎসব
সারহুল পার্বণের মূল তাৎপর্য সূর্যের সঙ্গে পৃথিবীর বিয়ে। এই উৎসব সাধারণত চৈত্র মাসে উদযাপন করা হয়। মাযহারুল ইসলামের (২০০৭ ৬৪) লেখায় পাওয়া যায়, শীতে ঝরা পাতার বিদায়ের পর চৈত্র মাসে নতুন পাতায় ছেয়ে যায় বন। অনেক গাছের পাতা ওরাওঁরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। উৎসবে পূজা-অর্চনার মাধ্যমে তারা গ্রাম রক্ষাকারী আত্মাকে স্মরণ করে। পার্বণে প্রতিটি পরিবার তাদের পূর্ব পুরুষদের কথা স্মরণ করে এবং পরিবারের সদস্যদের সুস্থতা কামনায় নিজ গৃহে পূজার আয়োজন করে। আয়োজনে খাদ্য ভোগ, মোরগ বলি দেয়া এবং নাচগান ওরাওঁ সংস্কৃতির অঙ্গ।
কারাম উৎসব
ভাদ্রমাসে ওরাওঁরা তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব কারাম উদযাপন করে। মাযহারুল ইসলাম (২০০৭ : ৬৫) লিখেছেন: বিশ্বাস মতে কারাম বৃক্ষ হল রক্ষাকর্তা। কথিত আছে, একসময় শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ওরাওঁরা জঙ্গলে পালিয়ে কারাম বৃক্ষের নিচে আশ্রয় নেয়। সে সময় কারাম বৃক্ষ যেন তাদের শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেছিল।
এমন ঘটনা স্মরণে উৎসবের সময়, কারায় গাছের ডাল কেটে ঘরের উঠানে পোঁতা হয় এবং উৎসব শেষে তা জলাভূমিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। কারাম মিলন ও আনন্দের উৎসব কারণ উৎসবে নাচ, গান ও কাহিনীভিত্তিক পালাগান মঞ্চস্থ হয়। উৎসব রীতিতে অবিবাহিত যুবক যুবতীরা উপবাস করে আর বিবাহিত মেয়েরা শ্বশুর বাড়ি থেকে ফল-মূল, কাপড় ও উপঢৌকনসহ বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসে।
সোহরাই উৎসব বা পশু উৎসব
কারাম উৎসবের পরপরই কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে ওরাওঁরা সোহরাই উৎসব পালন করে। তিনদিনের সেই উৎসবে কৃষিকাজের যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করা, গৃহপালিত পশুকে স্নান করানো, ঘরদোর পরিচ্ছন্ন করা, সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্জ্বলন এবং মোরগ বলি দেওয়ার রীতি প্রচলিত আছে। এই তথ্যের সাথে মাযহারুল ইসলাম (২০০৭ ৬৫-৬৬) যোগ করেন, ‘গবাদি পশু, কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যেই মূলত এই উৎসব পালন করা হয়।
খারিয়ানি উৎসব
অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান ওঠার পর ধান মাড়াইয়ের জায়গাকে পবিত্র করার জন্য ওরা এঁরা এ উৎসব পালন করে থাকে, বলে উল্লেখ করেন মাযহারুল ইসলাম (২০০৭ ৬৬)।
ফাগুয়া
ফল্গুনী পূর্ণিমায় ওরা ওঁরা নববর্ষ ‘ফাগুয়া’ উদযাপন করে। এই উৎসবে প্রচুর ফাগ বা আবির ব্যবহৃত হয়- উল্লেখ করে মাযহারুল ইসলাম (২০০৭ ৬৬-৬৭) জানান, উৎসবের নানা আনুষ্ঠানিকতায় পাহান বা পুরোহিত এক সাথে শিমুল, ভেরেন্ডা ও জিগা গাছের শাখা কেটে, এর সাথে খড়কুটা জড়ো করে আগুন জ্বালায়।
এ সময় তারা প্রার্থনা জানায় বিগত বছরের অকল্যাণ বিদায়ের সাথে সাথে নতুন বছরের অশুভ যন্ত্রণাও দূর হয়ে যাবার। সেই সাথে রোগ, শোক থেকে মুক্তি পেতে তারা খড়ের ছাই শরীরে মাখে। এমনি উৎসবের মধ্য দিয়ে পূর্ণিমা রজনী অতিক্রান্ত হয়।
এছাড়া, নতুন ঘর তুললে, গরু-মহিষ ক্রয় করলে, সন্তানের জন্ম হলে বা বড় উৎসবের আগে মঙ্গল কামনায় ‘ওরাওঁরা ‘ডানডা কাটনা’ উৎসব করে থাকে।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নবান্ন উৎসব
বাংলাদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের মধ্যে আয়োজিত নবান্ন হলো আনন্দের উৎসব। অতি প্রাচীনকাল থেকে নবান্ন উৎসব আমাদের দেশে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এ অনুমান ভুল নয়, এমন প্রসঙ্গের অবতারণা করে প্রদ্যোত কুমার মাইতি বলেন (২০১৪ : ৪৫), নবান্ন উৎসব বাংলাদেশের বর্ণ হিন্দুদের মধ্যেই যে সীমাবদ্ধ তা নয়; অন্যান্য উপজাতিদের মধ্যেও তা লক্ষ করা যায়।
মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রাম অঞ্চলের এবং বাঁকুড়া জেলার রাণীবাঁধ থানার অন্তর্গত কাসকেন্দ গ্রামের সাঁওতালরা অগ্রহায়ণ মাসে ঘরে ঘরে নতুন ধানের পূজার আয়োজন করে। ‘নাওয়াই’ উৎসব নামে পরিচিত এই অনুষ্ঠানে সাঁওতাল পরিবারের কর্তারা নিজ নিজ জমি থেকে কিছু পরিমাণ ধান কেটে গ্রাম্য থানে (জাহের থান) দেবদেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে। মূলত পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ কামনার উদ্দেশ্যেই নতুন ফসল নিবেদন বলে মনে করা হয়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও নবান্ন উৎসবের রূপান্তর দেখা যায়। উত্তরবঙ্গের মেচ বা বোড়ো সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত নবান্ন উৎসবের নাম ‘আংখাম গীলে জানায়’। মূলত অগ্রহায়ণ মাসেই প্রথম দিন বা সে মাসের যে-কোনো শুভ দিনে অনুষ্ঠানটি হয়ে থাকে। … তাদের বিশ্বাস, এই উৎসবে রান্না ভালো হলে সারা বছরই রান্না ভালো হবে। রাঙা জনগোষ্ঠীর মধ্যে নবান্নকে বলা হয় ‘মায় পিদান বানি’।
এ উপলক্ষে নতুন ধানের চাল দিয়ে রস্তুক’ দেবীর ঘট পূর্ণ করে দেবীকে উৎসর্গ করার রীতি প্রচলিত। নাগেশিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে নবান্ন উৎসবের নাম ‘নাওয়া’। অসুর কিংবা ওরাওদের নবান্ন উৎসবের নাম নাওয়াখানি। আর কিসান সম্প্রদায়ের লোকেরা একে বলে নাওয়াখালি। খোন্দ সমাজের জনপ্রিয় উৎসব নবানন্দ, যা নবান্ন উৎসব হিসেবেই প্রচলিত। (বিজনকুমার, ২০১৪ : ৬৩)
এই উৎসবের মধ্য দিয়ে শস্য-দেবীকে তুষ্ট করার প্রয়াস যেমন থাকে, তেমনি নতুন শস্য প্রাপ্তির আনন্দ প্রকাশ পায়। কৃষিজীবী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা নতুন ধান তোলার পর আনন্দে মেতে ওঠেন সমবেতভাবে।
দেশের সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তাকে একটি দূরবর্তী সতন্ত্রসত্তা হিসেবে দেখা হয়। তাদের নিজস্ব ভাষা ও ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি বিকশিত হলে অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি ভাগ্যোন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করা যায়।
