আজকে আমরা বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশে ঋতুভিত্তিক উৎসব : বিবর্তনের রূপরেখা সূচিপত্র আলোচনা করবো।

বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশে ঋতুভিত্তিক উৎসব : বিবর্তনের রূপরেখা সূচিপত্র
বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনেক পুরানো। সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারার মধ্যে সহজ সংমিশ্রণ এবং তার লৌকিক রূপের যে বৈচিত্রগ্রাহী প্রবণতা, তা বাঙালির সংস্কৃতি-চেতনারই এক বিশিষ্ট রূপ। এর আদিমতম, ঐতিহাসিক এবং প্রধান দিক ঋতু উৎসব। অসাম্প্রদায়িক এবং প্রগতিশীল সকল শক্তির সম্মিলন এবং একাত্মতা এই উৎসবেরই কার্যকারণ। ঋতুভিত্তিক উৎসব বাঙালি সংস্কৃতিতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সর্বজনীন এক আনন্দযোগ। উৎসব জাতি ভেদে সংস্কৃতির সৌহার্দ বিনিময়ের মাধ্যম।
একটা সময় ছিল যখন লোকসমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক, মিথস্ক্রিয়া, নেতৃত্ব, শ্রমবিভাজন বা সামাজিক স্তরবিন্যাস সব ক্ষেত্রেই মূলত ঋতুভিত্তিক উৎসবের অস্তিত্ব দৃশ্যমান হতো। সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থায় অমঙ্গল থেকে পরিত্রাণ লাভের আশা, বিভিন্ন রীতি-প্রথা, আচার-সংস্কারে বিশ্বাসী মানুষ পার্থিব কল্যাণ কামনায় আয়োজন করত উৎসব। তাই অগণিত মানুষের স্বেচ্ছা অংশগ্রহণে জীবনঘনিষ্ঠ উৎসব রূপ নেয় সমাজঘনিষ্ঠ উৎসবে। ঋতু-উৎসবের আর্থ-সমাজিক প্রেক্ষপটে আবর্তিত হয় খেটে খাওয়া মানুষের অর্থনৈতিক জীবন ও জীবিকা।
সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে যাযাবর মানুষের নিস্তরঙ্গ জীবনে উৎসব ছিল এক আশীর্বাদ, যার আবির্ভাব প্রকৃতি কেন্দ্রিক – শিকারে প্রাপ্ত খাদ্য সংগ্রহ বা শস্য উৎপাদনকে কেন্দ্র করে। সেই ধারায় ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অপরিহার্য অনুষঙ্গরূপে ঋতুভিত্তিক উৎসবের বিকাশ।
মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য, সৌন্দর্য ও মঙ্গল সাধনার ব্রত নিয়ে বিজ্ঞানের যে জয়যাত্রা, তাতে সভ্যতার উৎকর্ষ যেমন হয়েছে, তেমনি বিজ্ঞানের প্রভাবে জীবনের অমৃতসম সংস্কৃতিও প্রভাবিত হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির অপ্রতিহত অগ্রযাত্রায় এবং সহজলভাতায় মানুষ হয়ে উঠছে আন্তরিকতাশূন্য, আত্মকেন্দ্রিক ও উদাসীন। বিজ্ঞান ও শিল্পের মাঝে অনিবার্যভাবে তৈরি হয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয়।

ফলে, অনেকটা দ্রুতচালে প্রভাবিত ও পরিবর্তিত হচ্ছে জাতিগত সংস্কৃতি। সংস্কৃতির বিবর্তন আর বৈষম্যের অনির্ধারিত ও অনিয়ন্ত্রিত প্রভাবে মানসিক স্বাস্থ্যের উপযোগী প্রতিবেশ সৃষ্টি ব্যাহত হচ্ছে, দেখা দিচ্ছে উচ্ছৃঙ্খলতা, নিস্পৃহতা, নিরাশা, অবিশ্বাস, মৃত্যুচিন্তার মতো অনিষ্ট ধারণা। বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত রূপ ও চেতনায় বিকৃতি ঘটছে; সংকট তৈরি হচ্ছে জাতিগত সংস্কৃতির অনন্য কাঠামোয়।
বিশ্বজুড়ে প্রভাবিত সংস্কৃতির আগ্রাসী তাণ্ডবে যেন ধ্বংসোন্মুখ বাঙালি কৃষ্টি-স্বকীয়তা। ফলে গণতান্ত্রিক বিরোধ ও সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের অসহায় শিকার মানুষ। বহুমুখী সংস্কৃতির প্রবল স্রোতে প্রজনন্মগত দূরত্ব আর বিচ্ছিন্নতা বোধের হতাশা সাধারণ এক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।
তবে আশার কথা নিচ্ছি মুনি যেন সুপ্তভাবে প্রোসিত হয়ে আছে বাঙালির মননে। তাই জাতীয় অনুষ্ঠানের মর্যাদা না করা ভিত্তিক উত্তাবগুলো পর্যাক্রমে দেশের মানুষের কাছে যে প্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে, তা সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কখনোই সম্ভবপর ছিল না।
মা তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত না মোক একাত্ম হোক এর ধারার সঙ্গে সক অপশরিনা বিরুদ্ধে রুখে ভত্তিক উৎসব এমন আকার সঙ্গে প্রত্যাশা পূরণে চেষ্টায়া এই গবেষণা ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশক नক উৎসব নিয়ে লিখেছেন অনেক। কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশে ঋতুভিত্তিক উৎসব দেখা বিষয়ে এখন পর্যন্ত গত পরিকল্পনা নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাজ বা কোনো গবেষণা হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
বৃহৎ পরিসরে ঋতুভিত্তিক উৎসব এবং এর ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র নিয়ে খুব বেশি কাজ হয়নি। যদিও লোকসংস্কৃতিবিদরা পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণ বা নবার মতো ঋতু উৎসবের ওপর কিছু বিবরণমূলক কাজ করেছেন। তবে, বর্ষা, শরৎ, শীত দন্তর প্রানে সেখানে অনুপস্থিত।
বৃহৎ পরিসরে বাংলাদেশের ঋতু ভিত্তিক সৌন্দর্য, উৎসবের বিকাশ, ঐতিহ্য সংরক্ষ, উৎসরে আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ মানুষের সংযোগ সম্পর্ক চর্চা ও মেলবন্ধন এই গবেষণার উদ্দেশ্য। কানের বিবর্তনে বাংলার ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলো কোন আঙ্গিকে এসে পৌঁছেছে এর মূল্যায়ন করা এবং একইসঙ্গে উদ্্যাপিত ঋতুভিত্তিক উৎসবের প্রাসদিকতা তুলে ধরা এই গবেষণাকর্মের লক্ষ্য।
বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশে ঋতুভিত্তিক উৎসব বিবর্তনের রূপরেখা গবেষণা পাণ্ডুলিপির তিনটি অধ্যায়ের সাতটি পরিচ্ছেদে সাদাক্রমে সংস্কৃতি এবং বাঙালি সংস্কৃতির সংকট, তুভিত্তিক উৎসবের উত্তর- বিকাশ বিবর্তন, একই সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশে বভিত্তিক উত্সনের উপযোগিতা নিয়ে আলোকপাত করা ।
প্রথম অধ্যায়ে সংস্কৃতি, এর স্বরূপ-বৈশিষ্ট্য, বাঙালি কে বা কারা বাঙালি সংস্কৃতির সংকট ও সম্ভাবনা বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, একটি সম্প্রদায়ভুক্ত মানবগোষ্ঠীর স জীবনযাপন গানি, জীবনের দৃশ্যমান ও অনুভবযোগ্য অভিব্যক্তির বহিপ্রকাশকে তা বলে।

এই সংস্কৃতিকে পরিপুষ্ট করে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের ধারা এবং সমঝোতার মাধ্যমে উন্নততর জীবন যাপনের আকাঙ্ক্ষাও। সময়ের আবর্তনে প্রতিটি জাতির সংস্কৃতিচিন্তার ও মননে বিদ্ধ সৃষ্টিকারী, সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশের পরিপন্থী যে কোনো কাজ না অপসংস্কৃতি। আধুনিকতার নামে স্বজাত্যবোধ, চেতনা বিশ্বাসকে বিলিয়ে দেয়া অপসংস্কৃতির নামান্তর।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে উৎসব ও তুভিত্তিক উৎসবের আঙ্গিক, বৈশিষ্ট্য, উৎসবের উৎস অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি উৎসনের ঐতিহ্য বর্ণনায় এসেছে বাঙালি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের উৎসব। সমাজবিজ্ঞানীরা উৎসৰ উদ্ভবের ইতিহাস খুঁজে বের করা দুরূহ বলে মনে করলেও, এই মতে পৌঁছেছেন, মানুষের উৎসব আর উৎসব-প্রীতির ইতিহাস সমসাময়িক সময়ের সাথে উৎসবের বিলুপ্তপ্রায় বা বিবর্তিত রূপটিও খুঁজে দেখার চেষ্টা করা হয় দ্বিতীয় অধ্যায়ের গবেষণায়।
পারিবারিক আঙিনায় সীমিত ব্যক্তিগত আনন্দ আয়োজন যেমন উৎসব, তেমনি সমাজিকভাবে আয়োজিত নির্দিষ্ট গোত্রের বা সর্বজনীন অনুষ্ঠানও উৎসব। উৎসবের বিশেষ সেই ধারায় কালক্রমে গড়ে ওঠে জীবিকার – উৎসব, ধর্মীয় উৎসব, সাংস্কৃতিক উৎসব, ঐতিহাসিক বা স্মরণ উৎসব, রাজনৈতিক উৎসব, সামাজিক- পারিবারিক উৎসব, দেশাত্মবোধক উৎসব, জাতীয় উৎসব, দেশীয় ঐতিহ্যবাহী উৎসব, স্থানীয় পর্যায়ে আয়োজিত উৎসব। এই উৎসবগুলো বহন করে বাঙালি জাতিসত্তার সংহত পরিচয়।
মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রচেষ্টায় উপমহাদেশে বর্ষামঙ্গল, শরৎ উৎসব, পৌষমেলা, বসন্তবরণের মতো ঋতু-উৎসবের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। এর আগে বাংলা সনের সংস্কারক হিসেবে সম্রাট আকবরের নাম উঠে আসে। পুণ্যাহ, হালখাতা, চৈত্রসংক্রান্তী ও বৈশাখী মেলা, নৌকাবাইচ, নবান্ন, পিঠা উৎসবের মতো বর্ণাঢ্য আয়োজনগুলো সময়কে রাঙিয়ে তুলেছে নানাভাবে। স্বাধীনতা-উত্তর কাল থেকে ঋতু উৎসবগুলো পর্যায়ক্রমে বাঙালির জীবনঘনিষ্ঠ হয়ে পরিণত হয়েছে প্রাণের উৎসবে।
তৃতীয় অধ্যায়ে বাঙালির প্রগতিশীল সংস্কৃতি বিকাশে সজনীন ঋতুউৎসবগুলো কীভাবে সভ্যতাকে প্রভাবিত করেছে, এ নিয়ে আলোচনা আছে। তাছাড়া, এখানে দেখানো হয়েছে, ঋতুভিত্তিক উৎসবের মাহাত্মা মনস্তাত্ত্বিকভাবে বাঙালির সামাজিক মিলনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে, জাগিয়েছে স্বজাত্যবোধ, বিশ্ব- ভ্রাতৃত্ববোধ।
উৎসব মানুষকে করেছে মানবিক ও সহনশীল, দূর করেছে জাতিগত সীমা অসাম্প্রদায়িক এই ঋতু-উৎসব মানুষকে নতুন মানুষে রূপান্তরিত করে, ক্ষুদ্রতা, দীনতা থেকে মুক্ত করে চিত্তশুদ্ধি ঘটায়, নতুন প্রাণশক্তিতে বলীয়ান করে তোলে। বাঙালির প্রকৃত পরিচয়ে তার ঋতুভিত্তিক উৎসব সার্থক হয় সমষ্টি চেতনায়, নিঃসার্থ শ্রমে, বিনিময়ের উৎকর্ষে।
একটু সতর্ক ও সযত্ন হলেই বাঙালি তার লালিত ঐশ্বর্য দিয়ে বিশ্ব জয় করতে পারে, এমন প্রমাণ সে রেখেছে। বাঙালি ঐতিহ্যের গৌরবময় এই সাংস্কৃতিক চেতনাকে গুরুত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে অনুধাবন করে জাতীয় স্বার্থে এই উৎসবের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা উচিত আমাদের।
গবেষণা কর্মপ্রক্রিয়ার পুরোটা সময় জুড়ে বিভিন্ন বই, জার্নাল এবং অনলাইন পত্রপত্রিকার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। বেশ কিছু জায়গায় বিশেষ করে বর্ষা, শরৎ, শীত ও বসন্ত ঋতু উৎসবের উৎস অনুসন্ধানে তথ্যপ্রমাণ ও লিখিত গ্রন্থপঞ্জির অভাব অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে জটিলতর করে তোলে। সে ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যা উত্তরণের চেষ্টা করা হয়েছে। সেই সাথে কর্মসূত্রে মাঠপর্যায়ে কিছু কাজ সহায়ক হিসেবে এসেছে। সেখান থেকেও তথ্য-উপাত্ত নেওয়া হয়েছে।
ঐতিহাসিক ধারায় মাটি ও মানুষের কাছাকাছি থাকার প্রবণতা বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী ধারার বিশেষ দিক। সত্যিকার অর্থে সংস্কৃতির সুফল ভোগ করতে জনগণের সংগ্রামী চেতনার মধ্য দিয়ে বাঙালির সম্পদ ও সম্ভাবনাগুলোকে আঁকড়ে ধরতে হবে। অনুভব করতে হবে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান-মনন সংস্কৃতির অনুকরণীয় Dhaka University Institutional Repository.

দিকের ব্যাপকতা ও গভীরতা। তবেই জাতি হিসেবে বাঙালির অবস্থান সমৃদ্ধ হবে, এমন আশা করা যায়। ধর্ম-গোত্র ছাপিয়ে মানুষের পরিচয় হোক সে মানুষ। ‘মানুষ’ পরিচয়ে ধর্মীয় উৎসবের বাইরে অসাম্প্রদায়িক উৎসবগুলো মহিমামণ্ডিত হয়ে উঠবে। এই জীবন-দর্শন বাঙালির জাতিগত ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি, তার প্রাণপ্রবাহের ধারা। সংস্কৃতিবান মানুষের এই চেতনাকে উজ্জীবিত করাই বর্তমান গবেষণার মৌল প্রেরণা।
বৃহত্তর জীবনের সঙ্গে সংযোগহীন সংস্কৃতি জীবনকে আত্মকেন্দ্রীক, সংকুচিত ছবির করে দেয়। এর প্রভাবমুক্ত হতে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও দরকার। উৎসবের উপযোগিতা স্বীকার করে, তা বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব আজ সময়ের দাবি।
এতে আপাত প্রতীয়মান প্রতিবন্ধকতা দূরে সরে যাবে বলে আশা করা যায়। বাঙালির প্রগতিশীল সংস্কৃতি বিকাশে ঋতুভিত্তিক উৎসবের শিক্ষা বৈষম্যহীন এক সমাজ। তা – বাস্তবায়নে নাগরিক সমাজের কিছু দায় থেকেই যায়। যে দায়িত্বের সফল বাস্তবায়ন পথ দেখাবে পরবর্তী প্রজন্মকে। যারা হয়ে উঠবে সুস্থ সংস্কৃতিকে বেগবান করার চালিকাশক্তি।

সূচিপত্র
বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশে ঋতুভিত্তিক উৎসবের ভূমিকা
প্রথম অধ্যায় :
সংস্কৃতি ও বাঙালি সংস্কৃতি
প্রথম পরিচ্ছেদ : বাঙালির সংস্কৃতি : সংস্কৃতির প্রাসঙ্গিক পরিচিতি
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : বাঙালি সংস্কৃতি : স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য
দ্বিতীয় অধ্যায় :
বাঙালির উৎসব : উদ্ভব ও বিকাশ
প্রথম পরিচ্ছেদ : বাংলায় ষড়ঋতুর উৎসব : উৎস সন্ধান
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : ঋতুভিত্তিক উৎসবের ঐতিহ্য : বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী
তৃতীয় পরিচ্ছেদ : ঋতুভিত্তিক উৎসবের বিবর্তন
তৃতীয় অধ্যায় :
সর্বজনীন উৎসব
প্রথম পরিচ্ছেদ : বাঙালির প্রগতিশীল সংস্কৃতি বিকাশে ঋতুভিত্তিক উৎসবের ভূমিকা
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : উৎসবে প্রত্যাশা ও আমাদের দায়
উপসংহার
মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য, সৌন্দর্য ও মঙ্গল সাধনার ব্রত নিয়ে বিজ্ঞানের যে জয়যাত্রা, তাতে সভ্যতার উৎকর্ষ যেমন হয়েছে তেমনি বিজ্ঞানের প্রভাবে জীবনের অমৃতসম সংস্কৃতিও প্রভাবিত হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির অপ্রতিহত সহজলভ্যতায় মানুষ হয়ে উঠছে আন্তরিকতাশূন্য, আত্মকেন্দ্রীক ও উদাসীন।
বিজ্ঞান ও শিল্পের মাঝে অনিবার্যভাবে তৈরি হয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয়। ফলে, অনেকটা দ্রুতচালে প্রভাবিত ও পরিবর্তিত হচ্ছে জাতিগত সংস্কৃতি। সংস্কৃতির বিবর্তন আর বৈষম্যের অনির্ধারিত ও অনিয়ন্ত্রিত প্রভাবে মানসিক স্বাস্থ্যের উপযোগী প্রতিবেশ সৃষ্টি ব্যাহত হচ্ছে; দেখা দিচ্ছে উচ্ছৃঙ্খলতা, নিস্পৃহতা, নিরাশা, অবিশ্বাস, মৃত্যুচিন্তার মতো অনিষ্ট ধারণা।
বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত রূপ ও চেতনায় বিকৃতি ঘটছে; সংকট তৈরি হচ্ছে জাতিগত সংস্কৃতির অনন্য কাঠামোয়। আগামী দশকগুলোয় সংস্কৃতির রূপান্তর, সংযোজন এবং অনুপ্রবেশে বাংলার ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলোর পরিবর্তন আরও ব্যাপক হবে এমন ধারণা নিশ্চিতভাবেই করা যায়। তবে এই রূপ চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতির আদি রূপ নয়।
একটা সময় ছিল যখন লোকসমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক, মিথষ্ক্রিয়া, নেতৃত্ব, শ্রমবিভাজন বা সামাজিক স্তরবিন্যাস সব ক্ষেত্রেই ঋতুভিত্তিক উৎসবের অস্তিত্ব দৃশ্যমান হতো। সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থায় অমঙ্গল থেকে পরিত্রাণ, উৎসবের মাধ্যমে পার্থিব কল্যাণ কামনা আর অগণিত মানুষের স্বেচ্ছা অংশগ্রহণে জীবন ঘনিষ্ঠ উৎসব রূপ নেয় সমাজ ঘনিষ্ঠ উৎসবে। ঋতু উৎসবের আর্থ সমাজিক প্রেক্ষপটে আবর্তীত হয় খেটে খাওয়া মানুষের অর্থনৈতিক জীবন জীবিকা।
বাঙালির বৈচিত্র্য-পিয়াসী মন এবং এর সঙ্গে তার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস সমন্বিত হয়ে ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলো নিজ নিজ অবয়ব ও রূপ লাভ করেছে। উৎসবের উদ্ভব ভিন্ন ভিন্ন কারণে হলেও, জীবনের প্রয়োজনে তা বাঙালির স্নেহপুষ্ট হয়ে তাৎপর্যমণ্ডিত হয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত এসব উৎসব সর্বজন-নন্দিত এবং সর্বজনীন আনন্দের উপলক্ষ।
‘বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশে ঋতুভিত্তিক উৎসব : বিবর্তনের রূপরেখা’ গবেষণা পাণ্ডুলিপির তিনটি অধ্যায়ের ৭টি পরিচ্ছেদে সজ্জাক্রমে সংস্কৃতি এবং বাঙালি সংস্কৃতির স্বরূপ ও সংকট, ঋতুভিত্তিক উৎসবের উদ্ভব-বিকাশ- বিবর্তন, একই সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশে ঋতুভিত্তিক উৎসবের উপযোগিতা বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

প্রথম অধ্যায়ে সংস্কৃতি, সংস্কৃতির স্বরূপ-বৈশিষ্ট্য, বাঙালি কে বা কারা, বাঙালি সংস্কৃতির সংকট ও সম্ভাবনা বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। সেই গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যমতে বলা যায়, একটি সম্প্রদায়ভুক্ত মানব গোষ্ঠীর সম্পদ এবং তার নিত্য জীবনযাপন প্রণালি, জীবনের দৃশ্যমান ও অনুভবযোগ্য অভিব্যক্তির যে বহিঃপ্রকাশ তার সব কিছুই সংস্কৃতি। আরও বিশদভাবে মানুষের জীবন ব্যবস্থায় দৃশ্যমান সম্পদ, তার ভাষা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সেই সাথে ঐতিহ্য, রীতি, প্রবণতা, চিন্তা, কর্ম, সৃষ্টি এক কথায় মানব জাতির সজ্ঞানে মিশে থাকা এক সামগ্রীকতার রূপ-সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিকে পরিপুষ্ট করে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের ধারা এবং সমঝোতার মাধ্যমে উন্নততর জীবন যাপনের আকাঙ্ক্ষাও।
সংস্কৃতি সৃষ্টিশীল এবং সঞ্চারণশীল এক প্রক্রিয়া; তবে এর অনুকরণজাত চর্চা জাতির অস্তিত্ব সংকটের কারণ। এক অর্থে তা আত্মপ্রবঞ্চনার নামান্তর।
সময়ের আবর্তনে প্রতিটি জাতির সংস্কৃতিচিন্তায় প্রগতিশীল, রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল ধারা লক্ষ্য করা যায়। সেই ধারায় জীবন, চেতনা ও মননে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী, সুস্থ বিকাশের পরিপন্থী যে কোনো কাজ বা আচরণ অপসংস্কৃতি। আধুনিকতার নামে স্বজাত্যবোধ, চেতনা ও বিশ্বাসকে বিলিয়ে দেয়াও অপসংস্কৃতির নামান্তর। বাঙালি সংস্কৃতির প্রবহমান ধারা, স্বার্থচিন্তা ছাপিয়ে যুক্তিবাদ দ্বারা পরিচালিত না হলে, সেখানে ভর করে কুসংস্কার। সেখান থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে যুক্তিগ্রাহ্য ও মানবিক হবার বিকল্প নেই।
সময়ের সাথে পারিপার্শ্বিক প্রভাব ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির বিবর্তন ঘটে। আজকের সংস্কৃতি শুধু দেশীয় সাংস্কৃতিক প্রবণতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চলমানতাই মানব-প্রকৃতির প্রবণতা। যেখানে প্রভাব ফেলে আত্মচিন্তা বা আত্মপ্রসারে উন্মুখ থাকার প্রবণতা। সেই সূত্রে জীবন-জীবিকার রূপান্তর প্রক্রিয়ায় ঘটে সামাজিক রূপান্তর, প্রভাবিত হয় সংস্কৃতি।
অতীতের শিল্পনৈপুণ্য আর সম্পদশালী ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে সংস্কৃতির বদল কাম্য নয়। ঐতিহাসিক ধারায় মৃত্তিকা সংলগ্নতা, মাটি ও মানুষের কাছাকাছি থাকার প্রবণতা বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী ধারার বিশেষ দিক। সত্যিকার অর্থে সংস্কৃতির সুফল ভোগ করতে জনগণের সংগ্রামী চেতনার মধ্য দিয়ে বাঙালির সম্পদ ও সম্ভাবনাগুলোকে আঁকড়ে ধরতে হবে। অনুভব করতে হবে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান-মনন সংস্কৃতির অনুকরণীয় দিকের ব্যাপকতা ও গভীরতা। তবেই জাতি হিসেবে বাঙালির অবস্থান সমৃদ্ধ হবে, এমন আশা করা যায়।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে উৎসব ও ঋতুভিত্তিক উৎসবের আঙ্গিক, বৈশিষ্ট্য, উৎসবের উৎস অনুসন্ধানের চেষ্টার পাশাপাশি, উৎসবের ঐতিহ্য বর্ণনায় এসেছে বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের উৎসব। সময়ের সাথে উৎসবের বিলুপ্তপ্রায় বা বিবর্তিত রূপটিও খুঁজে দেখার চেষ্টা করা হয় দ্বিতীয় অধ্যায়ের গবেষণায়।
উৎসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক এক অনুষঙ্গ, যার মৌল উপাদানের অন্তর্গত আনন্দময়তা, ঐতিহ্যে অংশ নেওয়া এবং সামাজিক ও ব্যক্তিগত সংযোগ-সংহতি। সমাজবিজ্ঞানীরা উৎসব উদ্ভবের ইতিহাস খুঁজে বের করা দূরূহ বলে মনে করলেও, এই মতে পৌঁছেন, মানুষের উৎসব আর উৎসব প্রীতির ইতিহাস সামসময়িক।
পারিবারিক আঙিনায় সীমিত ব্যক্তিগত আনন্দায়োজন যেমন উৎসব, তেমনি সমাজিকভাবে আয়োজিত নির্দিষ্ট গোত্রের বা সর্বজনীন অনুষ্ঠানও উৎসব। মূলত সামাজিক, সাম্প্রদায়িক বা পারিবারিক সমাবেশে মানুষে মানুষে বিরোধমুক্ত ও সংস্কারমুক্ত উৎসব আয়োজনে মিশে থাকে মানুষে মানুষে সম্পর্কের উত্তম দিকগুলো।
নৃতাত্ত্বিক তথ্য মতে, সভ্যতা পূর্ব-সময়ে, বলা যায় ভাষা সৃষ্টিরও আগে, গুহাবাসী মানুষ আনন্দ প্রকাশের জন্য নৃত্য বা দেহভঙ্গীর প্রকাশ ঘটিয়ে, হাতে-মুখে বিশেষ ধরনের শব্দ সৃষ্টি করে আনন্দের আমেজ তৈরি করত, যা ছিল উৎসবের আদি আয়োজন। পরবর্তীকালে প্রকৃতির কৃপাপ্রার্থী অসহায় মানুষের আশ্রয় হয়ে ওঠে জাদুবিশ্বাস, অতিপ্রকৃতে বিশ্বাস, ধর্মীয় উপাদান, সংস্কার-আচারসহ নানা বিষয় ।
আদিম যুগে শিকার কেন্দ্রিক খাদ্য সংগ্রহের অনুকরণ যখন কিছুটা উপস্থাপনা নির্ভর অভিনয়ে রূপ নেয় তখন সেই অনুকরণ প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে তার মনোরঞ্জনের খোরাক। সেগুলো স্থুল বা অমার্জিত হলেও, ক্লান্তিকর একঘেঁয়ে জীবনে, দিন যাপনের গ্লানি অপনোদনে সেই আনন্দ আয়োজন তার কাছে আনন্দের। শিকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে গিয়ে শিকারি নিজেই কিছু শুভ আর অশুভ অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্ব কল্পনা করে। কালক্রমে এই শক্তিগুলিই বিশ্বাসের সাথে পরিণত হয় শিকারের দেবদেবীতে। ইতিহাসদৃষ্টে এভাবেই হয়তো উদ্ধব ঘটে সাড়ম্বর পূজা বা উৎসবের।
অপরদিকে, গোত্রের যুথবদ্ধ জীবনে অবশ্য পালনীয় রীতি-প্রথা, যুথে মানব শিশুর জন্ম, প্রকৃতিতে ফল ফসলের প্রাচুর্য বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে জীবন রক্ষা পাবার কৃতজ্ঞতায় মানুষ অদৃশ্য শক্তির উপাসনা করে, তাকে সন্তুষ্ট করতে আচার সর্বস্ব উৎসবের আয়োজন করে। উৎসবের বিশেষ সেই ধারায় কালক্রমে গড়ে ওঠে • জীবিকার উৎসব, ধর্মীয় উৎসব, সাংস্কৃতিক উৎসব, ঐতিহাসিক বা স্মরণ উৎসব, রাজনৈতিক উৎসব, সামাজিক-পারিবারিক উৎসব, দেশাত্মবোধক উৎসব, জাতীয় উৎসব, দেশীয় ঐতিহ্যবাহী উৎসব, স্থানীয় পর্যায়ে আয়োজিত উৎসব।
এই উৎসবের সাথে অবশ্বম্ভাবীভাবে মিশে আছে এর বিবর্তন বা রূপান্তর প্রক্রিয়া। যদিও পৃথিবীর ইতিহাসে প্রাচীন কিছু উৎসব বা আচার, সমাজের বিবর্তন ঠেকিয়ে এখনো অকৃত্রিম-এমন উদাহরণ বিরল নয়। তবে বেশিরভাগ উৎসব সামাজিক, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির সাথে আপোষ করে।
এই গবেষণায় আলোচ্য ঋতুভিত্তিক উৎসব অনাদিকালের বহু প্রতীক্ষিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে বাঙালির এক মহামিলনের উৎসব। ধর্মের সীমানার ঊর্ধ্বে ব্যক্তি, পরিবার, স্থান, কাল আর জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে ঋতুউৎসব সর্বজনীন। সেই সাথে লৌকিক সংস্কারে উদযাপিত ঋতুভিত্তিক উৎসব বাঙালির কাছে মঙ্গলের বার্তা বাহক।
মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রচেষ্টায় উপমহাদেশে বর্ষামঙ্গল, শরৎ উৎসব, পৌষমেলা, বসন্তবরণের মতো ঋতু-উৎসবের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। এর আগে বর্ষবরণ উৎসবের সূচনাকাল সঠিকভাবে জানা না গেলেও, বাংলা সনের সংস্কারক হিসেবে সম্রাট আকবরের নাম উঠে আসে সবার আগে। পুণ্যাহ, হালখাতা, চৈত্রসংক্রান্তী ও বৈশাখী মেলা, নৌকাবাইচ, নবান্ন, পিঠা উৎসবের মতো বর্ণাঢ্য আয়োজনগুলো সময়কে রাঙিয়ে তুলেছে নানাভাবে।

এদিকে, বাংলাদেশে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে ছায়ানটের আয়োজনেও উদযাপিত হয় বর্ষবরণসহ ঋতুভিত্তিক অনেক উৎসব। পরবর্তীকালে উদীচী এবং বর্তমানে সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীসহ এই প্রজন্মের প্রগতিশীল শিল্পীদের প্রচেষ্টায় টিকে আছে উৎসবগুলো।
বাঙালি জাতিসত্ত্বার সংহত পরিচয় বহন করে ঋতুভিত্তিক উৎসব। মূলত গ্রাম কেন্দ্রিক কৃষিসমাজের প্রয়োজন-উপযোগ থেকে শুরু করে উৎসব-পার্বণ বা জীবন-জীবিকার কিছু জড়িয়ে আছে ঋতুভিত্তিক উৎসবের মর্মমূলে। তাই এই উৎসবগুলো নবজাগরণের এক উৎসাহব্যঞ্জক অনুভূতি।
বাঙালির লোক জীবনের সুসংসহ জীবন ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি যেন হালখাতা, পুণ্যাহ, লোকপার্বণ, লোকবিনোদন, সর্বোপরি চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখী মেলা। শ্রমক্লান্ত নগরবাসী থেকে শুরু করে দারিদ্র-বঞ্চনায় পীড়িত গ্রামবাসী অতীতের হতাশা ভুলে জেগে ওঠে নতুন উদ্দীপনায়-উৎসবের অমলিন আনন্দে। হয়তো এটাই ঋতুভিত্তিক উৎসবের সার্থকতা, হয়তো এভাবেই আগামীর শুরু।
একটু সতর্ক ও সযত্ন হলেই বাঙালি তার লালিত ঐশ্বর্য দিয়ে বিশ্ব জয় করতে পারে, এমন প্রমাণ সে রেখেছে। এটুকু স্মরণ রাখার, বাঙালি অনুকরণে সিদ্ধহস্ত হবে না, অজস্র শৈল্পিক প্রদানে সিদ্ধি লাভ করবে।
ঋতুভিত্তিক উৎসবের উপযোগীতা মনস্তাত্ত্বিকভাবে বাঙালির সামাজিক মিলনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে, জাগিয়েছে স্বজাত্যবোধ, বিশ্ব-ভ্রাতৃত্ববোধ। উৎসব মানুষকে করেছে মানবিক ও সহনশীল, দূর করেছে জাতিগত সীমা। স্বাধীনতা-উত্তর কাল থেকে ঋতু উৎসবগুলো পর্যায়ক্রমে বাঙালির জীবন ঘনিষ্ঠ হয়ে পরিণত হয়েছে প্রাণের উৎসবে।
এই উৎসবকে কেন্দ্র করে নানা সৃজনশীলতার প্রকাশ যেমন ঘটে, তেমনি দেখা দেয় নব কর্মপ্রেরণা। উৎসবের ব্যয়ে শ্রমিক সরবরাহ বাড়ে, সুযোগ তৈরি হয় নানামূখী কর্মসংস্থানের। সেই সাথে মুদ্রা সরবরাহে গতিশীলতা দেশীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে।
আলোচনার একটি অংশ জুড়ে আছে বাংলাদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ও গৌরবময় সংস্কৃতির দিকগুলোও। ত্রিপুরা, মারমা, চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের প্রকৃতি কেন্দ্রীক ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ উৎসব ‘বৈসাবীর’ মতো মূলত ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলো, সেই সাথে নানা সাংস্কৃতিক আচার ও উপাদানগুলো আলোচনায় এসেছে বর্ণাঢ্য উপাদান হয়ে। মর্যাদা, মঙ্গল ও শান্তির প্রত্যাশায় উদযাপিত এই ঋতুভিত্তিক উৎসব বাঙালি সংস্কৃতিকে যেমন ঋদ্ধ করেছে, তেমনি সমৃদ্ধ করেছে গবেষণাকে।
শেষ অংশ তৃতীয় অধ্যায়ে, সর্বজনীন উৎসব কী, সর্বজনীন উৎসবের উপযোগিতা, বাঙালির প্রগতিশীল সংস্কৃতি বিকাশে উৎসব এবং ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলো কতটুকু সহায়ক, তা অনুধাবনের চেষ্টা করা হয়েছে।
চৈত্রসংক্রান্তি থেকে শুরু করে বর্ষবরণ, বর্ষামঙ্গল উৎসব, শরৎ বন্দনা, নতুন ধান ঘরে তোলার নবান্ন উৎসব, পৌষসংক্রান্তি, পিঠা উৎসব বা বসন্তবরণের মতো ঋতুভিত্তিক উৎসব – এ যাবৎকাল পর্যন্ত সার্থকতার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। তবে, তা উদযাপিত হয়েছে ঔপনিবেশিক অনুকরণজাত প্রভাবে বা অভ্যাসে নয়; বরং প্রাণের তাগিদে সব মানুষের অংশগ্রহণে এবং অধিকারকে সমতায় রূপান্তরিত করার মধ্য দিয়ে। যদিও কারো কারো মতে, সর্বজনীন উৎসব আয়োজনে শুধু রক্ষণশীলতা নেই, যা আছে তা হল প্রতিক্রিয়াশীলতা আর অপচয়।

এ ক্ষেত্রে বলা যায়, স্বজাত্যবোধ উন্মুক্ত করে বৃহত্তর জীবনবোধকে। তাই বাঙালি সংস্কৃতিকে লালন করার, একত্রে উদ্যাপন করার এই তাগিদকে ভুলে গেলে চলবে না। বৃহত্তর জীবনের সঙ্গে সংযোগহীন সংস্কৃতি জীবনকে আত্মকেন্দ্রীক, সংকুচিত, স্থবির করে দেয়। এর প্রভাবমুক্ত হতে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও দরকার। উৎসবের উপযোগিতা স্বীকার করে, তা বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব আজ সময়ের দাবি। এতে আপাত-প্রতীয়মান প্রতিবন্ধকতা দূরে সরে যাবে বলে আশা করা যায়।
বাঙালির শ্রেণিবৈষম্যময়, শোষিত-সামন্ত সমাজব্যবস্থায় ‘স্বাধীন জাতি’ শব্দটি বুর্জোয়া-স্বাধীনতার স্বরূপ; যা এক অর্থে দাসত্বের নামান্তর। অপরদিকে, ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় অসাম্প্রদায়িক শক্তির মেলবন্ধনের আকাঙ্ক্ষা, আত্মপ্রত্যয় আর উদ্যোগের সমন্বয় ব্যক্তি ও সমাজের মুক্তি ঘটায়।
আদিকাল থেকেই সমাজে চলমান শ্রেণিদ্বন্দ্ব ঋতুভিত্তিক উৎসবকে সহনশীল, সহগামী হতে দেয়নি। শ্রেণিদ্বন্দ্ব উৎসবের মাহাত্ম্য খর্ব করেছে। কদাচিৎ নির্যাতিত শ্রেণি এর প্রতিবাদ মুখর হওয়ায়, এখন পর্যন্ত সার্থকভাবে আলোর মুখ দেখছে কিছু উৎসব।
বাঙালির প্রগতিশীল সংস্কৃতি বিকাশে ঋতুভিত্তিক উৎসবের শিক্ষা – বৈষম্যহীন এক সমাজ। তা বাস্তবায়নে নাগরিক সমাজের কিছু দায় থেকেই যায়। যে দায়িত্বের সফল বাস্তবায়ন পথ দেখাবে পরবর্তী প্রজন্মকে। যারা হয়ে উঠবে সুস্থ সংস্কৃতিকে বেগবান করার চালিকা শক্তি।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাই ঋতুভিত্তিক উৎসবের উপযোগিতা কেবল বিবেচনার বিষয় নয়, তাদের উপলদ্ধির সঙ্গে উৎসব শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
‘বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশে ঋতুভিত্তিক উৎসব : বিবর্তনের রূপরেখা” বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বেশ কিছু জায়গায় তথ্যপ্রমাণ ও লিখিত গ্রন্থপঞ্জির অভাব অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে জটিলতর করে তোলে। সে ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যা উত্তরণের চেষ্টা করা হয়েছে। সেই সাথে কর্মসূত্রে মাঠ পর্যায়ে কিছু কাজ সহায়ক হিসেবে এসেছে। সেখান থেকেও তথ্য-উপাত্ত নেওয়া হয়েছে।
আশা করা যায়, ঋতুভিত্তিক উৎসব বিষয়ে ভবিষ্যতে যেসব গবেষক আগ্রহী হবেন, তাঁরা এই গবেষণার অসম্পূর্ণতা গুলোকে সমৃদ্ধ করবেন। উৎসব নিয়ে গবেষণার জন্য দৃষ্টিভঙ্গি স্বচ্ছ ও উদার থাকা দরকার।