Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

উৎসবে প্রত্যাশা ও আমাদের দায়

উৎসবে প্রত্যাশা ও আমাদের দায়

আজকে আমরা উৎসবে প্রত্যাশা ও আমাদের দায় আলোচনা করবো। যা সর্বজনীন উৎসব এর অন্তর্গত।

 

উৎসবে প্রত্যাশা ও আমাদের দায়

উৎসবকে বলা হয়েছে আনন্দের সহযাত্রী। যে দিনটি বছরের অন্য দিনগুলো থেকে বিশেষ। উৎসব শুধু মানব জীবনেই নয়, আছে প্রকৃতিতেও। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, হেমন্তের সূর্য কিরণে অগ্রহায়ণের পর শস্যসমুদ্রেও হিল্লোলিত হয় সোনার উৎসব। প্রকৃতির সেই রূপ লাবণো আন্দোলিত হয় মানব মনও। উৎসবের দিনে মানুষ সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে তার মনুষ্যত্বের শক্তি বিশেষভাবে উপলব্ধি করে বলেই উৎসব খুব কাঙ্ক্ষিত। উৎসব এক সামাজিক উৎকর্ষ, যা পরিশুদ্ধ করে আত্মসংস্কৃতি, দূর করে শ্রেণিবৈষম্য, শাণিত করে জাতির ঐক্যবোধ।

এত কিছুর পর এবং এতটা সময় পেরিয়ে এই প্রশ্ন থেকেই যায়, বারো মাসে তের পার্বণের দেশ বাংলাদেশে উৎসবপ্রিয় বান্ধালির উৎসবগুলো সত্যিকার অর্থে কতটা স্বস্তির। উৎসব প্রাঙ্গণে একে অন্যের আনন্দের সহযাত্রী কি হয়ে উঠতে পারে। কিংবা উৎসব ঘিরে কেন সহিংসতা চলে।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঘিরে পূজামণ্ডপে ধর্ম অবমাননার সূত্র ধরে তাণ্ডব চলেছে। আবার রমনার বটমূলে বোমা হামলা থেকে শুরু করে মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদের দিনে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ সংলগ্ন এলাকার জঙ্গি হামলা, অমর একুশে গ্রন্থমেলার উৎসব চত্বরে প্রবাসী লেখককে কুপিয়ে হত্যা, নববর্ষের সন্ধ্যায় ভূজেলা বাজিয়ে নারীর ওপর হিংস্রতা- এ রকম ঘটনা অনেক ঘটেছে।

অনেকের মনে হবে এসব ঘটনা উৎসব সংশ্লিষ্ট না, হয়তো বিচ্ছিন্ন। কিন্তু একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশে কোনো আনন্দ উপলক্ষ্যে এই দিনগুলো দেখতে হবে, এটা খুবই বেদনার ও অপ্রত্যাশিত। এসব ঘটনা জাতি হিসেবে আমাদের মর্যাদাটুকু বিনষ্ট করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের অর্থই এখানে অর্থহীন। উৎসবের কল্যাণ চিন্তার স্ফূরণ ঘটেনি বলেই বৃহত্তর কল্যাণের পথ অবরুদ্ধ।

 

 

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, প্রেমই উৎসবের দেবতা – মিলন তাহার সজীব সচেতন মন্দির। তাহলে প্রেমময় সেই মিলনমেলায় প্রাণের উৎসব কেন কলঙ্কিত হয়েছে বারবার। উৎসবের আলোকে ম্লান করে দেয়া মানুষরূপী বিভীষিকারা কবে মানবিক হবে? হবে পরমত সহিষ্ণু, সংস্কৃতিবান?

উৎসবে সহিংসতা বা নারীনিগ্রহের ঘটনায় ধৃত ব্যক্তিরা দুর্ধর্ষ অপরাধী, উল্লেখ করে হাসান মামুন (২০১৫) লিখেছেন, উৎসবের কাঁটা হয়ে যারা এসব ঘটাচ্ছে বা ঘটিয়েছে তাদের অন্তত ক’জনকে প্রকাশ্যে কোনো দত্ত দেওয়া যায় কিনা। যদিও বাংলাদেশের সংবিধানে ‘লাঞ্ছনাকর দত্ত’ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু জাতির মুখ মলিন করে দেওয়া নানা ঘটনাদৃষ্টে তিনি মনে করেন, কিছু দৃষ্টান্তমূলক’ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং সরকার ও প্রশাসনকে যুক্ত হতে হবে।

অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্তই পরবর্তী অপরাধে সাহস যোগায় উল্লেখ করে আলমগীর শাহরিয়ার, (২০২১) ‘সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, সহিংসতা ও বর্বরতার শেষ কোথায়?’ প্রবন্ধে লিখেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের চোখ দিয়ে দেখলে সংখ্যালঘুর মন বোঝা যায় না। বিপরীত দিক থেকে ভাবলেই কিছুটা আন্দাজ করা যায়।

যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ তারা যদি ভাবতেন যে তাদের ধর্মীয় উৎসবে শহরজুড়ে পাহারা দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কারণ কিছু ধর্মোন্যাদ মানুষ একটা হুজুগ তুলে যে কোনো সময় হামলা করতে পারে, তবে সেটা নিশ্চয়ই খুব স্বস্তির হতো না। সশস্ত্র পাহারা দিয়ে হয়তো সাময়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, কিন্তু আনন্দের স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশ তৈরি করা যায় না।

যতদিন পর্যন্ত মানুষ শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি চিন্তা চেতনায়ও যৌক্তিক আচরণ করার মতো বোধ-বুদ্ধির অধিকারী না হবে, ততদিন অতীতের মতো ভবিষ্যতেও অনেক ধর্মীয় ইস্যুকে রাজনীতির মোক্ষম হাতিয়ার করা হবে এমন আশঙ্কা করেন আলমগীর শাহরিয়ার। তাই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে, নিবিড় পরিচর্যায় এ গভীর ক্ষত দ্রুত সারানো জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

অসাধু, দুর্বল শ্রেণির কর্মফলের ভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণির ওপর বর্তাবে, তা কখনই কাম্য নয়। উৎসব এই শেখায়, বিপ্লবের রণসঙ্গীতকে পরিবর্তন করতে হবে সাম্যের গণসঙ্গীতে। শোষণ, সন্ত্রাসবাদ, অবিশ্বাস আর বৈষম্য মুছে ফেলে অন্তর্নিহিত শৃঙ্খলা, সাম্য আর কর্মপ্রচেষ্টার মতো গুপ্ত শক্তিগুলোকে জাগ্রত করবে অসাম্প্রদায়িক উৎসব।

উৎসবে প্রত্যাশা

উৎসবের দিন আমাদের প্রতিদিনের নিরানন্দ চিত্তটা আনন্দময়ের কাছে প্রার্থনা করে সকল দীনতা, কৃপণতার ঊর্ধ্বে উঠে ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হবার (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬৭ ৫০০)। রবীন্দ্রনাথের এই বাণীর রেষ ধরে বলা যায়, উৎসবের শিক্ষা মানুষকে মহানুভব করে। উৎসব জাতীয় জীবনের অধিকার আদায়ে জাতিকে সংগঠিত ও অগ্রসর হবার এক প্রেরণা। ঐতিহ্যকে লালন করা এবং আত্মসংস্কৃতিতে শ্রদ্ধাশীল জাতি তৈরি করা উৎসবের সার্থকতা।

বাঙালির সাংস্কৃতিক উৎসবের ইতিহাসে দেখা যায়, সমস্ত উচ্ছৃঙ্খলতাকে সংযত করতে এবং সুস্থ ধারার সংস্কৃতিকে বিকশিত করতে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়েও লক্ষ্য অর্জনের চালিকাশক্তি হিসেবে অগ্রগামী ছিল জাতীয় ও রাজনৈতিক উৎসবগুলো। তাই উৎসবের কাছে রবীন্দ্রনাথের (১৯৬৭ : ৩৩৮) প্রত্যাশা বিশ্বজগতে প্রাচুর্য, ঐশ্বর্যে ও সৌন্দর্যে যিনি অমৃতরূপে বিরাজমান তাঁর সেই শক্তিই যেন বিরাজ করে উৎসবে। আর সেই উপলব্ধিতে মানবিক দৈন্য দূর করার আহ্বান জানান তিনি : –

এই দিনে সে অনুভব করিবে, সে ক্ষুদ্র নহে, সে বিচ্ছিন্ন নহে, বিশ্বই তাহার নিকেতন, সত্যই তাহার আশ্রয়, প্রেম তাহার চরম গতি, সকলেই তাহার আপন ক্ষমা তাহার পক্ষে স্বাভাবিক, ত্যাগ তাহার পক্ষে সহজ, মৃত্যু তাহার পক্ষে নাই। (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬৭ : ৩৩৯ )

 

 

বাঙালির জীবনচর্যার মৌলভূমে লোক-উৎসবের তেমন কোনো দীনতা কোনোকালে ছিল না। বাঙালির যে সংস্কৃতি, তার উৎসভূমিতে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, তার জীবন-জীবিকা-দর্শনের কেন্দ্রে আছে নিজস্বতা। সেখানে জীবন উপোভোগের জন্য উৎসব, আনন্দস্মৃতি রোমন্থনের জন্য উৎসব।

শেখ মাসুম কামাল (২০০৯ : ১০০), লিখেছেন বাঙালির সব আয়োজন অনুষ্ঠানের কেন্দ্রে ধর্ম যেমন প্রভাব বিস্তার করেছে, তেমনি কিছু অনুষ্ঠান রোমান্টিক যার আত্মিক তাৎপর্য বেশ নান্দনিক :

প্রাচীন উৎসবে নরবলি পাঠাবলি কুমড়োবলি দিয়ে জীবনব্যপী উল্লাসে মত্ত হয়ে জীবনকে উপভোগের সন্ধান যেমন বিরল নয়, আবার অপার্থিব সুখস্মৃতির চরণামৃত পানের মধ্য দিয়ে দেব-দেবীর সুখ উৎপন্ন করতে নৃত্যগীত পটীয়সী সেবাদাসীর অন্তরে ঠাকুরের দান গ্রহণের বিষয়ও অন্তঃসলিলা হয়ে আছে সমাজে। নাচ -গান অনাবিল আনন্দ জুগিয়ে চলেছে বাঙালির মনে অনাদিকাল থেকে। বিমিশ্র সে ধারার অবশেষাংশ সময়ের দুরত্বকাল পর্যন্ত জীবন্ত। (মাসুম, ২০০৯ : ১০০)

শুধু তাই নয়, একটা সময় ছিল যখন বাঙালির উৎসবের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণও ছিল কষ্টসাধ্য। যদিও কালের প্রবাহে অনেক উৎসবের সাথে জনমানুষের সংযোগ নেই, অনেক উৎসব বিলুপ্ত, কোনোটা ক্ষয়িষ্ণু। তারপরও, কিছু উৎসব সর্বজনীনভাবে বা জাতীয় পর্যায়ে উদযাপিত হয়, আর কিছু উৎসব টিকে আছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রেরণাতেই। উৎসব স্বপ্ন আর কল্পনার জগৎকে ক্ষণিকের জন্য হলেও ধরায় নামিয়ে আনে। মাসুম কামাল উদাহরণও তুলে ধরেন

বাঙালির জীবনে বর্তমান কাল অবধি যে সকল লোক-উৎসব পরিদৃশ্যমান, তা পেলাম বিবর্তনের ধারায় বিচিত্র সম্ভারে, সর্বজনীনরূপে। যে কারণে দেখি সত্যনারায়ণের অপর নাম সত্যপীর, বনমার অপর নাম বনবিবি, গাজি পীরের সম্মোহনী শক্তির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেল গাজি ঠাকুর। এমনকি ঝুলন উৎসব, চড়ক উৎসব, গাজন উৎসব, ভাসান উৎসব প্রভৃতি উৎসব প্রায় একশ বছর আগেও সর্বজনীন উৎসব হিসেবে গণ্য হতো গ্রামে গ্রামে। এসকল উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল স্বপ্ন ও কল্পনার জগতে প্রাণ পাওয়া যাত্রাপালা এবং নাচ-গান। (মাসুম, ২০০৯ ১০১ )

সুস্থ ধারার উৎসব সুস্থ সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করে; আর সুস্থ ধারার সংস্কৃতি ভিতরে ভিতরে কাজ করে, গভীর প্রভাব বিস্তার করে। সংস্কৃতির সেবকরা সেই চেষ্টাতেই ভরসা নিয়ে পথ চলা অব্যাহত রাখেন; উল্লেখ করে সনজিদা খাতুন বলেন, ‘বাংলাদেশের বাঙালি এখন বাংলা উচ্চারণ, বানান, সাহিত্য, ঐতিহ্যসম্মত সংগীত, চিত্রকলা, ভাস্কর্যের উৎকর্ষ সাধনে নিবেদিত।’ (সনজীদা, ২০১৬ : ৫১২ )

বাংলার লোক-উৎসবের অতলান্তে যেমন রয়েছে দ্রোহের সুর, অপরদিকে রয়েছে সুনির্মল জীবনের প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশা পূরণের সাধই উৎসবকে কাঙ্ক্ষিত করে।

বাঙালির সামাজিক জীবনে যে উৎসবগুলো স্মৃতিপটে ভাস্বর, যে উৎসব মিশে আছে জীবনের বাঁকে, সেগুলো বিপুল প্রণোদনারও উৎস এবং এর মধ্য দিয়ে সংহত সামাজিক জীবনের নানা ব্যঞ্জনাও ফুটে ওঠে। জনপদে বিমলানন্দে প্রাণের স্রোত বইয়ে দিয়ে যায় উৎসব। উৎসবে সমষ্টির আবেগের যে প্রকাশ তা যেন ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে বেজে ওঠে প্রার্থনাসঙ্গীতের সুরে। মানবতার জয়গানে সুপ্রাচীন এই সুর যুগে যুগে বিরাজমান থাকুক- এমন প্রার্থনায় মাসুম কামাল আরও লিখেছেন :

শত শত বছরের প্রাচীন এসকল উৎসব সব ধর্মের দর্শনের মিশ্রণে গড়া একটি ছাঁচের মধ্য থেকে উৎপন্ন হয়ে যে সমন্বিত রূপ ধারণ করেছে, এ দাবি যুক্তিনিষ্ঠ। যে কারণে মনসার ভাসান, বেরা ভাসান, গাজীর গান, জাগগান, সত্যপীরের পাঁচালী, পৌষ সংক্রান্তি, রাস উৎসব, রথ যাত্রা, লোক যাত্রা, কবিগান, আলকাপ এসকল বিচিত্র ধারার লোক উৎসবের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক এমনকি সমন্বয়ধর্মী মানবীয় চেতনার যে সৌধ রচিত হয়েছে তার মূলে রয়েছে সর্বজনীন অথচ সুপ্রাচীন একটি রূপ। (মাসুম, ২০০৯ 100 )

 

 

উৎসবে সাম্প্রদায়িক চেতনা বা জাতিভেদের ঊর্ধ্বে ওঠার আকাঙ্ক্ষা স্বত্ত্বেও, বাঙালির বিভ্রান্ত হবার সুযোগ রয়ে যায়। কারণ, হাজার বছর ধরে বাঙালি জাতি – বিজাতি, বিভাষী, বিদেশিদের দ্বারা শুধু পীড়িতই – হয়নি, বরং ভিনদেশী সংস্কৃতিকে ধারণ করার অপচেষ্টা করে, তার সজাত্যবোধ নিয়ে প্রবঞ্চনা করেছে, সজ্ঞানে এক মিথ্যা পরিচয় বহন চলেছে। এই মনোভাব তার সংস্কৃতি বিকাশের পথ অবরুদ্ধ করছে; উল্লেখ করে আহমদ শরীফ বলেন, ইতিহাসের চেতনা দিয়ে উদ্বুদ্ধ হতে হলে আমাদের ভিত সম্বন্ধে সচেতন হতে হবে:

আমাদের উপলব্ধি করতে হবে হাড়ি-ডোম-মুচি মেথর বাগদিরাই আমাদের স্বগোত্র, স্বজাতি আমাদের – ভাই। আমাদের দেহে তাদেরই রক্তের ধারা বহমান। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, সাঁওতাল, কোচ, গারো, খাসিয়া, চাকমা আমাদের ভাই। আমরা যারা আমাদের গোত্র পরিচয় মুছে দিয়ে, আমাদের জাতি পরিচয় লুকিয়ে বিদেশী-বিভাষী-বিজাতি শাসকশ্রেণিতে মিশে যেতে চেয়েছি, শাসকের সংস্কৃতি অন্ধ অনুকরণ করেছি, শাসকের পরিচয়ে আত্মপরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করেছি, তারা ভুল করেছি, আত্মপ্রবঞ্চনা করেছি তার জন্য আমাদের দুর্দশা ভোগ করতে হয়েছে, আজও হচ্ছে। (আহমদ শরীফ, ২০১৬ : ৪৬)

এই দুর্দশা ও আত্মপ্রবঞ্চনার কবল থেকে পরিত্রাণ মিলতে পারে আত্মোপলব্ধিতে, স্বকীয় সংস্কৃতির সুস্থ ধারার চর্চায়।

উৎসব সমাজকে, সমাজের মানুষকে যেমন প্রভাবিত ও পরিচালিত করেছে, তেমনি উৎসবের মধ্য দিয়ে মানুষ সমকালীন জীবনে প্রবেশ করেছে। উৎসব সমাজকে ন্যায়-অন্যায় বোধে উজ্জীবিত করেছে যুগে যুগে। বাঙালি গণমানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে, বিদ্রোহ করেছে।

পরাজয়কে ভূলুন্ঠিত করে অন্তর্নিহিত শক্তির প্রমাণ দিয়েছে। দুর্দমনীয় মনোভাব বাঙালিকে দেখিয়েছে সফলতা। কিন্তু এই বাঙালির বিদ্রোহের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে যারা বিজাতি-বিভাষী-বিদেশীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, তারাই বাঙালির সর্বনাশ করেছে বলে মনে করেন আহমদ শরীফ।

তিনি (২০১৬ : ৪৬) বলেন, শক্তি দিয়ে যারা মানায়, তাদের শক্তি পশুশক্তি। পশ্বাচার মানুষের কাম্য হতে পারে না। আড়াই হাজার বছরের পরাধীনতা এবং দাসত্বের মনোভাব পরিবর্তন জরুরি। যে শৃঙ্খলিত, পরাধীনতার মনোভাব যার প্রতিপদক্ষেপে, সে কখনো প্রকৃত মানুষ হতে পারে না। এজন্য আত্মসম্মানবোধ এবং স্বাধীন মানুষের চেতনা অর্জন করার বিকল্প নেই। তাঁর মতে :

বাঙালির চাই চরিত্রবল, চাই মনুষ্যত্ব, চাই মহত্ত্ব, চাই আদর্শপরায়ণতা, চাই মহৎ ও সুন্দরের জন্য সাধনা ও সংগ্রাম। এসব অর্জনের চেষ্টা করলে বাঙালির সুপ্ত শক্তি, অবদমিত শক্তি, আড়াই হাজার বছরের অবদমিত শক্তি জেগে উঠবে। বাঙালি পৃথিবীর বুকে মানুষ হয়ে দাঁড়াবে প্রকৃত আত্মপরিচয় ঘোষণা করবে। (আহমদ শরীফ ২০১৬ ৪৬-৪৭ )

উপর্যুক্ত কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে বিজাতীয় প্রভাব থাকলেও, সেখান থেকে ভালোটুকু গ্রহণ করার শিক্ষা অর্জন করা যেন সময়ের দাবি। ব্যক্তি হিসেবে প্রত্যেকে আদর্শপরায়ণ মনোভাবে এবং কল্যাণের সাধনায় নিয়োজিত হলে এর প্রভাব ছড়িয়ে যাবে সমাজে এবং সামাজিক উৎসবেও।

আহমদ শরীফ মনে করেন, জাতির জন্মপরিচয় তাকে সংকুচিত করে না, বরং আরোপিত পরিচয় তার অক্ষমতা প্রমাণ করে। জন্ম দৈবিক, কিন্তু কর্ম তার অর্জন। এজন্য একনিষ্ঠভাবে নিজেকে গড়ে তোলার উপযোগিতা তুলে ধরেন তিনি :

‘জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভালো এই মনোভাব থাকতে হয়। ঐতিহ্য দিয়ে কি হয়? চোরের ছেলে চোর না হয়ে ভালো মানুষও হয়। আবার মহাপুরুষের ছেলেও কাপুরুষ অমানুষ হয়। ঐতিহ্য কি করে? মহাপুরুষের বংশধরদের চিরকাল মহাপুরুষ করে তুলতে পারে না কেন ঐতিহ্য? এ প্রশ্নের উত্তর নেই। উত্তরের দরকারও নেই। আমাদের শুধু দরকার এই মনোভাব যে, আমাদের বাঙালিদের বড় হবার সম্ভাবনা ছাড়া কিছুই নেই – সব আমাদের করে নিতে হবে এবং আমরা সব করে নেব। (আহমদ শরীফ, ২০১৬ -৪৯)

সব কিছু করে নেয়া বা গড়ে নেয়ার জন্য যে সঙ্ঘশক্তির প্রয়োজন, সে সংঘশক্তির জন্য দরকার আত্ম- উপলব্ধির নবায়ন। ইতিহাস-ঐতিহ্য-উৎসব যদি সেই বোধ জাগ্রত করে, সেটাই হবে জাতির জন্য গৌরবের। তাই উৎসবের কাছে জাতির প্রত্যাশা মিথ্যা আস্ফালন আর বিশেষ দিনে বাঙালি হবার অহংকার ছাপিয়ে, সাজাত্যবোধ ও সততার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যাবার অনুপ্রেরণা দেবে উৎসব।

উৎসবের ঐতিহ্যকে লালন করার জন্য মানুষের ধর্মচিন্তা, আচার-অনুষ্ঠান, আধ্যাত্মিকতার আদি উৎস খুঁজে দেখা সময়ের প্রয়োজন হয়ে উঠেছে। সে উৎসই জাতি ভেদের ঊর্ধ্বে উঠে উৎসব উদযাপনে সুচিন্তিত পথ দেখাবে। সর্বজনীন উৎসব অসাম্প্রদায়িকভাবে, নব পরিচয়ে পৃথিবীর বুকে বাঙালির অবস্থান দৃঢ় করবে, পৃথিবীকে দেবে নতুন বার্তা।

 

 

কিন্তু সে সময়ে পৌঁছানোর প্রহর শেষ হবে কবে, বা আদৌ তার পরিসমাপ্তি আছে কি না, এই প্রশ্ন রবীন্দ্রনাথ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬৭ : ৩৩৯-৩৪০) রেখে গেছেন অনেক আগেই। বাঙালির অপরাজেয় ইচ্ছাশক্তিতে ভরসা রেখেছেন রবীন্দ্রনাথ। তাই ঋতুভিত্তিক অনেক উৎসবেই দেখা যায় স্বতঃস্ফূর্ত মহামিলন। বাঙালি চাইলে পারে, এ কথার প্রমাণ সে যুগে যুগে রেখেছে তার শিল্পে, সাহিত্যে, সৃজনকলায় ।

বাঙালির শৈল্পিক দক্ষতা তাকে জাতি হিসেবে যেভাবে অলংকৃত করেছে, সে অহংকার যে কোনো ভাবেই ধরে রাখা উচিত মনে করে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন :

বাঙালির মতো শিল্পী জাতি দুনিয়ায় নাই প্রমাণ, বাঙালি পটুয়ার পট, বাঙালি ছুভারের কাঠ খোদাই, – মধ্য-যুগের বাংলার ইটে-কোটা মন্দিরের নক্শা: বাঙালির নাচ অপূর্ব-প্রমাণ, বাঙালির মল্ল-নৃত্য, রায়- বেশে নাচ, বাংলার কোনো কোনো জেলার মেয়েদের মধ্যে বিলোপশীল ব্রত-নৃত্য। আমাদের দেশের গ্রাম-শিল্পকে আমরা প্রাণ দিয়া ভালবাসিব, যতটা সাধ্য তাহাকে রক্ষা করিব; এই শিল্প আমাদের গ্রামীণ জীবনের একটি মনোহর অভিব্যক্তি। (সুনীতিকুমার, ২০১৬ : ৪৭০)

পৃথিবীর অন্যান্য সভ্য জাতির মতোই বাঙালি হিসেবে আমাদের ভাবনা আছে, শিল্পবোধ আছে, আছে মেধা, সৃষ্টিশীলতা। সভ্যতার ভান্ডারে বাঙালির অবদান তলাবিহীন ঝুড়ি নয় উল্লেখ করে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় আরও লিখেছেন :

আমাদের সাহিত্য, আমাদের সঙ্গীত, আমাদের বিদ্যা, গবেষণা ও আবিষ্কার আমাদের হিন্দু যুগের ও মধ্যযুগের মন্দির-শিল্প ও ভাস্কর্য, পট ও ইটে খোদাই, এসব গর্ব করিবার বস্তু, ভারতের সংস্কৃতির এক বিশিষ্ট প্রকাশ-স্বরূপ এগুলি বিশ্বজন-সমাজে দেখাইবার যোগ্য; এবং আমাদের সাংস্কৃতিক কৃতিত্ব কোনও- কোনও বিষয়ে বিশ্বজনও আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করিয়াছে ও করিবে; এইখানেই আমাদের পূর্ণ সার্থকতা।

আমরা অনুচিত গর্ব করিতে চাহি না; তবে যে কোনও অবস্থায় আমরা যে অকৃতকার্য হইব না, আমরা পূর্ব কৃতিত্ব আলোচনা করিয়া সেইটুকু আত্মবিশ্বাস আমরা আমাদের প্রত্যেকের মনে আনিতে চাহি। (সুনীতিকুমার, ২০১৬ 870891 )

বহির্বিশ্বে বাঙালি ঐতিহ্যকে তুলে ধরবার এত সম্ভাবনার মাঝে প্রত্যেক চিন্তাশীল বাঙালির উচিত তার সংস্কৃতির সুষ্ঠু বিকাশে সহায়ক হওয়া। সেই সাথে অনুচিৎ আস্ফালন বা আড়ম্বর ত্যাগ করে তার ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করতে সচেষ্ট হওয়া।

কারণ, কৃতিত্ব অর্জন এবং রক্ষা করা সাধনার বিষয়। যার অভাবে শৈল্পিক, মানবিক এমনকি সাংগঠনিক উৎকর্ষও বিলোপ হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগে লোকজ শিল্পের উপযোগিতায় রুচি, শিল্প ও সৌন্দর্যের সমন্বয় ঘটতে দেখা যেত। সময়ের সাথে বাংলার সভ্যতা-সংস্কৃতির পরিবর্তনে, সেই লোকজ- সংস্কৃতির নানা ধরনের প্রকাশ হয়ে গেছে বিলুপ্ত। যা বিলুপ্ত হয়নি তা বিকৃত বা পরিবর্তিত হয়েছে।

এমন তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায় হাসান আজিজুল হকের লেখায় একটা সময় ছিল যখন চর্যাপদের কবিতাগুলো দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সাথে পরিবেশিত হতো। কয়েক যুগ আগেও যাত্রা, পালাগান, কবিগান, গম্ভীরা, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মারফতি, মুর্শিদি গান মুখরিত হতো মানুষের মুখে মুখে। রাঢ় অঞ্চলে গৃহস্থ বাড়িতে আয়োজিত বৈষ্ণবকীর্তন এখন লুপ্তপ্রায়।

বীরভূম-বর্ধমানের বাউল গান, যা ২০০৮ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়, সে গানগুলোও যেন শ্রোতা টানতে বদলে গেছে আধুনিক সুরের সাথে। কুষ্টিয়ার ছেউরিয়ায় লালনের মাজারে যে লালনগীতি এখন পরিবেশিত হয়, তার সাথে লালন সাঁইয়ের যোগ কতটুকু, তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। সাপুরে নৃত্য, জেলে নৃত্য, পুতুলনাচের মতো আরও অনেক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কালপ্রবাহে হারাতে বসেছে। (হাসান আজিজুল, ২০১৬ : ৫১৪)

আজ লোকজশিল্প স্থান করে নিয়েছে সৌখিন মানুষদের অন্দরমহলে। মৃৎশিল্প, কাঁসাশিল্প, বাঁশ ও বেত শিল্প, শোলাশিল্প, বয়নশিল্প আর কাঠ খোদাই শিল্পের কারিগররা বেঁচে থাকার তাগিদে, তাদের শিল্পকে পরিবর্তন করে নিয়েছেন যুগের সাথে। যদিও, সিলেটের শীতল পাটি বুননশিল্প ২০১৭ সালে এবং জামদানি বয়নশিল্প ২০১৩ সালে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃতি পেয়েছে। এরপরও এই শিল্পীদের জীবনযাত্রার মান এতটাই করুণ যে, তারা কখনই তাদের কাজের ভার পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে হস্তান্তর করে যেতে চান না।

সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, বাঙালি লোকসংস্কৃতির নানা প্রকাশ পরিবর্তিত হতে হতে হয়ে গেছে প্রতীকী। ঠিক যেমন প্রতীকী বাংলা বছরের প্রথম দিন আধুনিক জীবনে অভ্যস্ত বাঙালির সযত্নে বর্ষবরণ উৎসব উদযাপন প্রক্রিয়া। হাসান আজিজুল হক (২০১৬ : ৫১৩) মনে করেন, বেশিরভাগ জিনিসই পুরনো হয়ে গেলে প্রতীকী হয়ে পড়ে, দুষ্প্রাপ্য বা দুর্মূল্য হলেও প্রতীকী হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। বাঙালি সংস্কৃতিও প্রতীকী মর্যাদা অর্জন করেছে, অন্তত বিলুপ্ত হয়ে যায়নি; সময়ের সাথে এর রূপবদল প্রাকৃতিক বলেও উল্লেখ করে তিনি।

তারপরও, সংস্কৃতি-ক্ষেত্রে শিল্পের যে বিবর্তিত ও আরোপিত রূপ দৃশ্যমান, সেই রূপ যুগের বিচারে কতটুকু সহনীয়, এই প্রশ্ন রয়েছে। অবক্ষয় আর হতাশার ঘূর্ণাবর্তে পাক খেয়ে সে ব্যর্থতার দায়ভার কার ওপর বর্তাবে, সেটিও আরেক প্রশ্ন। বাঙালি সংস্কৃতির বিপরীতশক্তিকে প্রতিরোধ করার সাংস্কৃতিক বলয় কতটুকু সংগঠিত, রয়েছে এই প্রশ্নও।

 

 

আদিকাল থেকে শুরু করে আজকের এই বিশ্ব মানবসমাজে; যুগের সংকট, দুর্যোগ, জটিলতা উত্তরণে করণীয় বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অন্তহীন ভাবনা আছে, অপকর্মের প্রতিবাদ আছে, তেমনি অনেক সুবচনও নির্বাসিত হয়েছে। তবে মঙ্গলকামনায় যে অসাম্প্রদায়িক উৎসব, তার উপযোগিতা যুগে যুগে ধারণ করেছে জাতি।

উৎসবের মূল কথা সামাজিক উৎকর্ষ। তাই উৎসবের চেতনা যেন জাতির ঐক্য বোধকে শাণিত করে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে গৌরবোজ্জ্বল করে, ন্যায় যুদ্ধের বিজয়োল্লাসকে তাৎপর্যমণ্ডিত করে। কল্পনার আশ্রয়ী হয়ে বিশ্বব্যবস্থাকে আত্মোন্নয়নের অবলম্বন না করে, নিজেকে ভাগ্যের হাতে সঁপে না দিয়ে, উৎসবের ভূমিকা যেন সংস্কৃতির সুস্থ ধারায় মানসগঠনে সহায়ক হয়। উৎসবের কাছে প্রত্যাশা – তা চিন্তাজগতে অনুরণন জাগাক। চিত্তবিনোদন, কর্মস্পৃহা, স্বতঃস্ফূর্ততার মতো উৎসাহের আগুনে সজীব প্রাণে বয়ে আনুক রসধারা। উৎসবের শক্তি যেন জাতির মূল্যবোধ ও মাত্রাবোধ তৈরিতে সহায়ক হয়।

এমনি বহুবিধ প্রত্যাশার সাথে সচেতন ব্যক্তিমাত্রই কিছু দায়বোধে আবদ্ধ হয়ে ওঠেন। বাঙালির প্রাণের উৎসবকে তাৎপর্যমণ্ডিত করতে তাকে সম্প্রীতি প্রয়াসী সমাজ-সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয় কখনো কখনো।

আমাদের দায়

অনেক সময় আমরা উৎসব করে ফতুর হয়ে যাই। ঋণশোধ করতেই দিন বয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, অল্পসম্বল ব্যক্তি যদি একদিনের জন্যে রাজা হওয়ার শখ মেটাতে যায় তবে তার দশদিনকে সে দেউলে করে দেয়। সেইজন্যে উৎসবের পরদিন আমাদের কাছে বড় ম্লান। সেদিন আকাশের আলোর উজ্জলতাকে মনে হয় ফিকে, হিসেবের কথাটা মনে পড়ে অবসাদে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, পেতে হয় না তাকে যে প্রতিদিনই কিছু কিছু সম্বল জমিয়ে নিয়মিত উৎসবের আয়োজন করে। তাঁর সচেতন ভাবনা :

আমাদের উৎসবকে হঠাৎ এক দিনেই সাঙ্গ করে দেব না প্রতিদিনের তুচ্ছতা এবং আত্মবিস্মৃতির মাঝেও – অন্তত একবার জগতের নিত্য উৎসবের ঐশ্বর্যকে উপলব্ধি করবো। অনুভব করবো আমাদের – প্রত্যেকদিনই মহিমান্বিত, ঐশ্বর্যময় – আমাদের জীবনের তুচ্ছতা তাকে লেশমাত্র মলিন করেনি। প্রতিদিনই সে নবীন, সে উজ্জ্বল, সে পরমাশ্চর্য…। (রবীন্দ্রনাথ ১৯৬৭: 501 )

তবে কালের প্রবাহে, উৎসবের শিক্ষা-মনুষ্যত্ব, স্বাধীনতা ও পরমতে শ্রদ্ধাশীলতার মতো মানবিক গুণাবলীগুলো যেন হারিয়ে গেছে। শিল্প, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানুষের চিরস্থায়ী যোগাযোগ নেই, এমন আক্ষেপ করে বিনয় ঘোষ প্রশ্ন রেখেছেন :

হঠাৎ মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি মানুষের এই বৈরাগ্যের কারণ কি? যে সভ্যতার এক একটি স্তম্ভ মানুষ যুগে যুগে নিজের সমস্ত শক্তি ও বুদ্ধি ব্যয় করে তৈরী করেছে, তাতে আজ কেন সেই মানুষই অটহাস্যে তাসের ঘরের মতো ধূলিসাৎ করে দিয়ে শাস্তি পেতে চায়? এতদিন মানুষের কণ্ঠ থেকে বেঁচে থাকার যে রুদ্র সুর ধ্বনিত হয়েছে, আজ কেন সেখান থেকে মৃত্যুর করুণ রাগিণী, নীড়হারা পাখির বিলাপের মতো উৎসারিত হচ্ছে। আজ জীবন মিথ্যা, সভ্যতা মিথ্যা, শিল্প মিথ্যা, সংস্কৃতি মিথ্যা, জগৎ মিথ্যা সত্য শুধু মৃত্যু সত্য শুধু অন্যায়, অবিচার, গর্বোদ্ধত স্বেচ্ছাচারিতা, পাশবিকতা। (বিনয় ঘোষ ১৯৪০: ১২১ )

পাশাপাশি আশার বাণী শুনিয়েছেন তিনি। যে অশুভ সংকটকাল ভয়ংকররূপে সভ্যতাকে গ্রাস করছে, সেই সংকটের পেছনে রয়েছে চিরপ্রবহমান ইতিহাসের জয়জয়কার। এ প্রসঙ্গে বিনয় ঘোষের (১৯৪০: ১৪৭ ) মত, সেই ঐতিহাসিক ধারার প্রবাহপথে যে ঝড়ো হাওয়া, তা সাময়িক। তাই পথভ্রষ্ট না হয়ে সেই ঐতিহাসের দিকেই দৃষ্টি ফেরাতে হবে। গতিশীল ঐতিহাসিক ধারাকে সম্যকরূপে উপলব্ধি করাই আজ মানুষের নৈতিক কর্তব্য উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, আজ জীবনের সেই স্পন্দমান প্রাণশক্তিগুলিকে (Elemental Forces of Life) উপলব্ধি করতে চেষ্টা করাই হবে আমাদের অবশ্যপালনীয় সর্বশ্রেষ্ঠ কর্তব্য। (বিনয়, ১৯৪০ : ১৪৭ )

সচেতন মানুষমাত্রই অনুধাবন করেন অশনিসংকেত। ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতি তার পক্ষাবর্ত হতে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তায়, ব্যর্থ প্রমাণিত প্রচলিত আর্থ-সামাজিক কাঠামো ভেঙে যখন নতুন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত হয়েছে, তখন নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক বুর্জোয়া শ্রেণি প্রতিবন্ধক হয়ে পথ রোধ করেছে, এমন প্রসঙ্গ উঠে আসে আবু জাফর শামসুদ্দীনের লেখায় :

এটা বিশ্বাস ঘাতকতার নামান্তর। কিন্তু বিশ্বাস ঘাতকতা করে পার পাওয়ার শক্তি তারা পাচ্ছে কোথায়? তা’হলে কি এই সিদ্ধান্তেই আসতে হয় না যে, শোষিত নিপীড়িত জনগণের শ্রেণি-চেতনা এখনও দুর্বল। শ্রেণিত্যাগী বুদ্ধিজীবী শেণির উদ্ভব এখনও হয়নি। অথবা হলেও জনগণকে নেতৃত্ব দেয়ার মতো শক্তি এখনও তারা অর্জন করতে পারে নি। তা ছাড়া, সকল শ্রেণির প্রতিবিপ্লবী যখন ঐক্যবদ্ধ তখন তারা বিভক্ত। সময় সময় যে গণবিদ্রোহ দেখা যায় সেটা কি উত্তেজনার মুহুর্তে Crowd এর আচরণ? এ প্রশ্নটিও মনে জাগে। (আবু জাফর, ১৯৮৮ ৮১)

কেবল দুর্বলচিত্ত, ভীরু এবং অলসেরাই জীর্ণ, অন্ধভাবনায় আটকে থেকে কূলকিনারা না পেয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হয়। বিধ্বস্ত মনে ফিরে তাকায় যুগের উপর দিয়ে প্রবাহিত কালস্রোতে, আশ্রয় খোঁজে ফেলে আসা বুর্জোয়া জীবনের নৈতিকতায়। বিনয় ঘোষ (১৯৪০: ১৫১-১৫২) লেনিনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, লেনিনের মতো ‘Master of action’ যাঁরা যুগধারার সঙ্গে তাঁরা নিজেদের এক ভাবেন, এবং সেজন্য এর অন্তর্লীন চিরজীবন্ত প্রাণশক্তিকে উপলব্ধি করে ভবিষ্যতের পথ সুগম করেন। তাঁর মতে :

আমাদের কর্তব্য হচ্ছে সমাজের ও মানুষের এই ‘elemental force’ গুলিকে উপলব্ধি করে সুনির্দিষ্ট পথে পরিচালনা করা। সামাজিক সমস্যাগুলির বাহ্যিক রূপই আসল রূপ নয়, সেই বাহ্যিক রূপের অন্তরালে যে প্রাণশক্তি আছে, স্পন্দমান প্রাণের যে গতিশীল জীবন্ত রূপ আছে, তাই হচ্ছে আসল রূপ, বাস্তব তাকে বলে, তাকে সত্য বলে।

ভাসমান সমস্যার মর্মস্থলে প্রবেশ করে সেই প্রাণশক্তির সন্ধান করা, এবং তাকে অন্তরে নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করে রূপায়িত করাই শিল্পীর কর্তব্য। সেই রূপায়ণকে বলে বাস্তব-সৃষ্টি, সত্য- সৃষ্টি, এবং শিল্পী হচ্ছেন সেই বাস্তব ও সত্যের স্রষ্টা। (বিনয়, ১৯৪০ ১৫২-১৫৩)

প্রাচীন সংস্কার ও ধর্মান্ধতাকে ছিন্ন করে সমাজের অন্তরে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করতে পারে উৎসব। সামাজিক জীবনের শৃঙ্খলা বাস্তবায়ন করা হবে এ-যুগের যোদ্ধা, শিল্পী-সাধকদের করণীয়। তবে, প্রচলিত আর্থ-সামাজিক পদ্ধতি যখন অধিকাংশ মানুষের কল্যাণ করতে ব্যর্থ হয়, পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে ওঠে, ইতিহাসের সেই ক্রান্তিকালেও শাসক শ্রেণি তার কায়েমী স্বার্থ সংরক্ষণার্থে জরাজীর্ণ পদ্ধতির মাধ্যমেই সমাধান খুঁজে বেড়ায় বলে উল্লেখ করে আবু জাফর শামসুদ্দীন লিখেছেন :

প্রত্যাসন্ন আর্থ-সামাজিক বিপ্লবের আশঙ্কায় তারা তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ভাবাবেগ জাগ্রত করে তাদিগকে বিভ্রান্ত ও বিপথে চালিত করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়। নিজেরা যে বিধি পালন করে না, পালন করা সম্ভবও মনে করে না, এমন কি এসব বিধিবিধানে আস্থাশীলও নয়, জনসাধারণের জন্যে তারা ঠিক ঐগুলোই ব্যবস্থাপত্র রূপে বিতরণ করে। (আবু জাফর, ১৯৮৮ ১১১-১১২)

এমন ক্ষেত্রে উৎসবগুলোই বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তা ছাপিয়ে মূল্যবোধ এবং প্রত্যাশা পৌঁছে দেয় নতুন প্রজন্মের কাছে।

বিনয় ঘোষ (১৯৪০ : ১৫৩) বলেন, সাম্য, স্বাধীনতা, বিশ্বাস, নিরাপত্তা, শান্তি, শৃঙ্খলার বিষয়গুলো বর্তমান সমাজের ‘elemental force’. মানবজীবনে এ গুণগুলোর সমন্বয়হীনতাই আধুনিক শিল্পীদের নৈরাশ্য ও অবিশ্বাসের কারণ। এমন পরিস্থিতিতে উৎসবগুলো জীবনকে পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করার আশা জাগায়। নিরাপত্তা, শান্তি, সৌন্দর্য, স্বাধীনতা, বিশ্বাস বাঁচিয়ে রাখতে মানুষের যে প্রাণপণ সংগ্রাম, সেই সুপ্ত প্রাণশক্তিকে ক্রিয়াশীল করে উৎসব।

উৎসবের যুথবদ্ধ প্রেরণায় বৃহত্তর মানবগোষ্ঠী শক্তি অর্জন করে সম্মিলিতর অধিকার। সকলের মিলিত অংশগ্রহণই শুধু নয়, উত্তরাধিকারসূত্রে অনার্য ও আর্য পূর্বপুরুষ থেকে বাঙালি জাতি জন্মসূত্রে যে মনোভাব অর্জন করেছে তার নিন্দা পরিহার করতে হবে। বাঙালির নৈসর্গিক ও পারিপার্শ্বিক ঐতিহ্যকে সম্বল করে যে অবস্থান সেটাকে ভিত্তি করে এগিয়ে চলার পরামর্শ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের :

আমাদের সমস্ত জ্ঞান ও কর্ম দিয়া তাহাকে প্রবর্ধমান করিয়া তুলিতে হইবে। উপস্থিত আমাদের মানস প্রকৃতিতে কল্পনা ও ভাবুকতা এবং রসানন্দের দিকে ঝোঁক না দিয়া, আত্মরক্ষার জন্য আমাদের জ্ঞান ও কর্মের দিকেই বেশী করিয়া ঝোঁক দিতে হইবে ইহাই আমার নিবেদন। ( সুনীতিকুমার, ২০১৬ : ৪৭১ )

 

যা নেই তার জন্য দুঃখ করে, নিজের অর্জনকে দুর্বল করে ফেলায় কৃতিত্ব নেই। বরং যা আছে বা সংস্কৃতির অঙ্গনে যা দেখা দিচ্ছে, প্রকাশ পাচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে তার মধ্যে যদি বিকার, নৈরাজ্য পর-সংস্কৃতির জন্য অক্ষম লোলুপতা ছাড়া আর কিছুই প্রকাশ না পায় তখন নিজের অবলম্বন, নিজের খুঁটি ধরে নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য পিছনে ফেলে আসা সামগ্রীগুলোর দিকে চোখ ফেরাতেই হবে, এমন মনে করেন হাসান আজিজুল হক :

অবলুপ্তি পরিবর্তন রূপান্তরের বহমান স্রোতের মধ্যে বহু নিত্য শিল্প রয়ে গেছে যাকে সময় প্রহার করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা জীবনের চিরন্তনতা ও সৃষ্টিশীলতা প্রকাশে আজো আয়ুষ্মান। এই আয়ুষ্মানতার দীপ থেকে বর্তমানের নিভয় প্রদীপগুলো জ্বালিয়ে নেওয়া আমাদের কাজ। (হাসান আজিজুন, ২০১৬ : ৫১৬)

প্রবলদের থেকে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি দেখা দিলে জনগণের দিক থেকে তার মোকাবেলা করার আহ্বান জানান আবুল কাসেম ফজলুল হক। ‘জাতি ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে সংস্কৃতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ (২০১৮) শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, দুর্বলরা জেগে উঠলে প্রবাদের মধ্যেও আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মসমালোচনা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সম্প্রীতি ও প্রগতির মনোভাব দেখা দেবে।

এর জন্য দুর্বলদের Eternal vigilance-এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি আরও মনে করেন, দুর্বলরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের থেকে নিজেদের কল্যাণে নেতৃত্ব সৃষ্টি করে শক্তিশালী হতে পারে; আর সংস্কৃতি অবলম্বন করে মানুষের সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক শান্তিপূর্ণ, সহযোগিতামূলক ও সম্প্রীতিময় করতে পারে।

অতীতে, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক হামলার মাধ্যমে নানা অপশক্তি সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করতে সচেষ্ট ছিল। জাতীকে নৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিতে, দুশমনের নানা সাংস্কৃতিক চক্রান্ত মোকাবেলার পরিকল্পিত এবং কার্যকর পদ্ধতি ভাবতে হবে। সংস্কৃতি চর্চাকে প্রয়োজনে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের হাতিয়ার করে তুলতে সক্ষম হলে মানবতাকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব বলে মনে করেন আসাদ বিন হাফিজ। তাঁর পরামর্শ:

যারা সমাজপতি বা নেতৃত্বের আসনে থাকবেন সমাজ দেহের সুস্থতা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব তাদেরই বহন করতে হবে।সমাজের প্রতিটি অঙ্গনকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও তাদেরই। রাজনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক তৎপরতা বৃদ্ধির গুরুভার বহনে তারা যত বেশি পারঙ্গম হবেন সমাজে তত দ্রুত সুস্থতা ফিরে আসবে। শিল্পীরা শিল্প চর্চা করেন কিন্তু তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে সমাজপতিরা, রাষ্ট্রনায়করা। এ জন্য সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা বাড়াতে হলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। (আসাদ, ২০০৪ : ২৩৩-২৩৪)

সংকট সংগ্রামের দ্বারা জেয় হলেও মুর্খ শ্রমজীবীদের দ্বারা মুক্তি সম্ভব নয়, উল্লেখ করে বিনয় ঘোষ লিখেছেন, ‘বুর্জোয়াশ্রেণীর সঙ্গে শ্রমজীবী শ্রেণির যে সংগ্রাম সেই সংগ্রামের জয়ে যে নূতন সমন্বিত সভ্যতার সৃষ্টি হবে তার মধ্যে মানুষ আবার নূতন মুক্ত জীবনের আস্বাদ পাবে। (বিনয় ঘোষ ১৯৪০ : ১৩৬ )

সেই আশার প্রদীপ তুলে ধরেই অন্ধকার ভেদ করতে সচেষ্ট হন আশাবাদীরা। তাদের উচিত হবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ধারক ও বাহক হওয়া। উৎসবের আনন্দ ও সুখের মাঝেই আছে সম্প্রীতির সে- সুযোগ। এ বিষয়ে আধুনিক রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার পাশাপাশি, কিছু পরামর্শও দিয়েছেন মাসুদ রানা :

রাষ্ট্র যতই ধর্মনরপেক্ষ হোক না কেন, জনগণের মধ্যে আদিতে ধর্মকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা উৎসব সেভাবে তার ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়েছে, তা হঠাৎ করে বাদ দেয়া যায় না এবং উচিতও নয়। জোর করে বাদ দিলে সে আবার জোর করেই ফিরে আসে। তাই সম্প্রীতি প্রয়াসী সমাজ সংস্কারকদের উচিত হবে মানুষকে নিরানন্দ শূণ্যের মধ্যে ফেলে না দিয়ে প্রচলিত উৎসবগুলোকেই সর্বজনীন করার প্রকৌশল গ্রহণ করা। সামাজিক প্রকৌশলীরা স্থানীয়ভাবে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের লোকদের একে অন্যের উৎসবে সহযোগিতা ও অংশিদারিত্ব দেবার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। (মাসুদ রানা, ২০১৬)

উদাহরণস্বরূপ তিনি লিখেছেন, মুসলমানের ঈদের জামাতে কিংবা কুরবানিতে অন্য ধর্মাবলম্বীদের অংশগ্রহণ যেমন সম্ভব নয়, তেমনি পুজোপাঠে কিংবা আরতিতেও সব ধর্মের মানুষের যোগদান সম্ভব নয়। কিন্তু একের উৎসবে অন্যকে শুভেচ্ছা জানানো, উপহার দেওয়া, আনন্দ সম্মিলনীতে মিলিত হওয়া, নিজস্ব উৎসবী পোশাক পরিধান ও অনিষিদ্ধ উৎসরী খাবার খাওয়া যেতেই পারে।

তবে, তিনি এও মনে করেন, বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে সংখ্যালঘুরা সংখ্যাগুরুর তুলনায় অতি ক্ষুদ্র, সেখানে পারস্পরিক সম্মতির পদ্ধতি চাপ হিসেবেও অনুভূত হতে পরে। সংখ্যাগুরু দায়পদ্ধতিতে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দিকে এগিয়ে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতির প্রয়োগ করতে হলে সম্প্রীতি প্রয়াসীদের উচিত হবে সংখ্যাগুরু মুসলমানদেরকে হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দিকে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করা।

মানুষের পক্ষেই এটা সম্ভব কারণ, মানুষ যেমন অপরাজেয় মনোবলে বিরুদ্ধ প্রকৃতিকে জয় করেছে, তেমনি জীবনযুদ্ধে জয়ী হবার অস্ত্র সৌহার্দ, যার অনুপ্রেরণা পাওয়া যায় উৎসবের মিলনে। তাই জাতি – ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সুস্থ পরিচর্যা ও বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বৈচিত্র্যের মাঝেও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে ঐক্য। সমাজের সকল সম্প্রদায় তার বিশেষত্ব নিয়েই পরস্পরের সম্পূরক। সংস্কৃতির সংঘর্ষ ও নির্মাণের ভাঙা-গড়ার খেলায় শিষ্টাচার, ললিতকলা, চারুকলার উৎসব নির্মাণ করবে সুস্থ ধারার সংস্কৃতি। ঋতু উৎসবকে যাঁরা বাঁচিয়ে রেখেছেন, এই উৎসব যাদের জীবনে অপরিহার্য, তারা যেদিন আনন্দ করতে পারবেন, সেদিনই সত্যিকার অর্থে উৎসব উদযাপনের সার্থকতা। নইলে তা খেটে খাওয়া মানুষের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতারই নামান্তর হবে। তবেই অর্থবহ হবে নতুন বছর বরণের আনন্দ ।

Exit mobile version