Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

ঋতুভিত্তিক উৎসবের বিবর্তন

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ ঋতুভিত্তিক উৎসবের বিবর্তন। যা বাঙালির উৎসব : উদ্ভব ও বিকাশ এর অন্তর্গত।

 

 

ঋতুভিত্তিক উৎসবের বিবর্তন

বাঙালি সংস্কৃতিতে ঋতুভিত্তিক উৎসব উদযাপনের দিনটি যেন প্রাণপ্রাচুর্যে জেগে ওঠার আহ্বান। বহু কাঙ্ক্ষিত উৎসবের দিনটিকে কেন্দ্র করে তার উদ্‌যাপন রীতিতে নতুন নতুন ভাবনা, অনুষঙ্গ, বৈচিত্র্য যেমন যুক্ত হয়েছে, একই সাথে বেশ কিছু উৎসবে বিলুপ্ত হয়েছে অনেক রীতি-প্রথা আয়োজন। উৎসবের আদি রূপ ছাপিয়ে বিবর্তিত রূপ চলমান সমাজব্যবস্থার একটি খণ্ডচিত্র। যেখানে সামাজিক উত্থান-পতন প্রভাবিত করে সমাজ সংশ্লিষট সববিছুকে। উৎসবে ঘটনা নির্ভর তথ্যগুলো হয়ে ওঠে ইতিহাসের অংশ।

উৎসবের রূপ বদলের বিষয়ে সচেতন ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। তাঁর মতে, মৌলিক যে কোনো কিছু, কালের অনন্ত প্রবাহে যেমন তার কৌলিন্য মলিন করে, তেমনি উৎসবেও আসে পরিবর্তন, পরিবর্ধন। বিবর্তনের অবশ্বমারী স্রোতে উৎসবের বিকাশ অনেকক্ষেত্রে হয় সংকুচিত। তাই তিনি আশঙ্কা করেছেন

হায় এখন আমরা আমাদের উৎসবকে প্রতিদিন সংকীর্ণ করিয়া আনিতেছি। এতকালে যাহা বিনয়রসাপুর মাসলের ব্যাপার ছিল, এখন তাহা ঐশ্বর্যমদোদ্ধত আড়ম্বরে পরিণত হইয়াছে। এখন আমাদের ছলনা সংকুচিত, আমাদের দ্বার রুদ্ধ। এখন কেবল বন্ধুবান্ধন এবং ধনামানী ছাড়া মঙ্গলকর্মের দিনে আমাদেরর ঘরে আর কাহারও স্থান হয় না। আজ আমরা মানবসাধারণকে নূর করিয়া নিজেকে বিচ্ছিন্ন-ক্ষুদ্র করিয়া, ঈশ্বরের ব্যাবাহীন পবিত্র প্রকাশ হইতে বঞ্চিত করিয়া বড়ো হইলাম বলিয়া কল্পনা করি। রবীন্দ্রনাথ ১৯৬৭ ৩৯৮)

উৎসবের বিবর্তন হয় কেন

উৎসবের আদি রূপের পরিবর্তন কেন হয়, অর্থাৎ এর বিকাশ বিবর্তন প্রসঙ্গের উত্তর খুঁজেছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। তাঁদের ধারণা মতে, মানুষের সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতির পরিবর্তন অপ্রতিরোধ্য এবং অবশ্যম্ভাবী এক প্রক্রিয়া। মানব প্রজাতির বর্তমান রূপ যদি তার শত কোটি বছরের বিবর্তিত রূপ হয়ে থাকে, তবে সময়ের সাথে মনুষ্য উৎসবের আদিম রূপের পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক।

ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্ব প্রাণীজগতে বড় ভূমিকা রেখেছে। সেই সূত্রে বলা যেতে পারে, সময়ের সাথে প্রাণীজগতের অবস্থার পরিবর্তন তার আনুষঙ্গিক সব কিছুকেই প্রভাবিত ও পরিবর্তিত করবে। উৎসবও সময়ের সাথে প্রাকৃতিক নিয়মে পরিবর্তিত হবে, নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য ধারণ করবে, তার সফল বৈশিষ্ট্যগুলো টিকে থাকবে, দুর্বল অংশগুলো বিলুপ্ত হয়ে নতুন কাঠামো গঠন করবে।

আবুল কাসেম ফজলুল হক (২০১৮) জাতি ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে সংস্কৃতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধে লিখেছেন, মানুষ নিজের অজান্তেই নিজেকে সৃষ্টি করে চলে। এই সৃষ্টির মাঝে থাকে উন্নতির সচেতন চেষ্টা। মূলত মনোগত উন্নতি ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার উন্নতির যৌথ চেষ্টাতেই মানুষের সংস্কৃতি।

 

 

তিনি যোগ করেন, ডারউইনের অনুসরণে স্পেন্সার তাঁর ‘Evolution and Ethics” গ্রন্থে মানুষের নৈতিক আচরণের ও নৈতিক চেতনার ক্রমবিকাশের বিবরণ রচনা করেছেন। সেখানে উল্লেখ্য: ইতিহাসের ধারায় পরিবেশের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নীতিতে আছে অভিযোজন – গ্রহণ-বর্জন। তাই আবুল কাসেম মনে করেন, নৈতিক উন্নতির জন্য জ্ঞানগত ও চিন্তাগত উন্নতির সঙ্গে পরিবেশগত উন্নতি সাধনও অপরিহার্য।

মানুষ মাত্র সেই জৈবিক সামর্থ্যের অধিকারী, যার বলে সে ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার দ্বারা নিজের সংস্কৃতি পরিবর্তন, পরিবর্ধন করে নিজেদের সংস্কৃতির উন্নততর পরিচয় বহন করতে সমর্থ্য ।

উপর্যুক্ত আলোচনা-সূত্রে এ বিষয়টি সহজেই অনুধাবনীয় মানুষের পারিপার্শ্বিক প্রভাব তার উৎসবকেও প্রভাবিত ও পরিবর্তিত করে।

রূপান্তর উৎসবের এক প্রবল সহগামী লোকমানসের বৈচিত্রগ্রাহী প্রবণতা আর ধর্মের আধিপত্যে উৎসবের রূপান্তর ঘটে বলে মত দেন আতোয়ার রহমান (১৯৮৫ ৭৫-৭৬)। সেই সাথে তিনি আরও যোগ করেন মানব মনের পুরনো সংস্কারের নব সংযোজন প্রবণতা এবং নব নব আনন্দভোগের বাসনার বিষয়টি। উদাহর হিসেবে তিনি লিখেছেন :

লৌকিক ধর্মের সাথে অভিজাত ধর্মের বিরোধ মানবেতিহাসের এক পুরনো, দীর্ঘ কাহিনী। অভিজাত ধর্ম চেয়েছে টিকে থাকতে। এই বিরোধ ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের ক্ষেত্রেও। সত্যি, বিরোধে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরাজ্যা ঘটে লৌকিক উৎসবের। কিন্তু এটা লৌকিক ধর্মের সাথে তার আচার অনুষ্ঠান দমনে ব্যর্গকাম অভিজাত ধর্মের আপোষের নামান্তর। উৎসবের ক্ষেত্রে লৌকিক আর অভিজাত ধর্মের বিরোধের পরিণতিতে আপোষ অতি ব্যাপক আতোয়ার ১৯৮৫ঃ ৭৬ – ৭৭)

ধর্মের সাথে উৎসবের মতাদর্শগত জটিলতায় সামাজিক যে প্রভাব, সে বিষয়টি স্পষ্ট হয় ইতিহাসে দৃষ্টি ফেরালে। দেখা যায়, ইংরেজ ও বাঙালিদের মধ্যে একত্রীকরণের ফলে একটি ভিন্ন সভ্যতা থেকে রীতিনীতি গ্রহণের ধারা গড়ে ওঠে। যার ফল বাংলা সমাজে পশ্চিমা মতাদর্শ, ভাবভঙ্গি, অভ্যাস ও শিষ্টাচারের বর্ধিত প্রভাব। বিত্তবান হিন্দুদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার এবং একটি সুসংজ্ঞায়িত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশও এক সামাজিক পরিবর্তন। কে. এম. মোহসীন বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন এভাবে :

উনিশ শতকের প্রথম দশকের মধ্যে বাংলার হিন্দু সমাজ সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারের জন্য একটি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলো। মাতীদাহ প্রথা বিলোপ, বাল্যবিবাহ নিবারণ, বিবার বিবাহের প্রচলন, মহিলাদের জন্য শিক্ষা প্রভৃতি দাবিসমূহ পাশ্চাত্যের প্রভাবের ফলেই উত্থাপন করা সম্ভব হয়েছিলো।

মিশনারিদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণের প্রবাহকে ঘামা জন্য ধর্মীয় সংস্কারের ফলে কোলকাতায় ব্রাহ্মসমাজ (১৮২৮) গঠিত হয়। এ সংগঠন পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে বাংলার অন্যান্য এলাকায় বিস্তার লাভ করে। ইংরেজি শিক্ষা, খ্রিস্টান ধর্ম উদারনৈতিক, মানবতাবাদী ও গণতন্ত্রের ভাবধারার প্রভাবে সমাজে আধুনিকতার সূত্রপাত হয় যা বাঙালিদের কাছে রেনেসা বলে অভিহিত। (মোহসীন, ২০০৭ ৬৩ )

আধুনিক সেই সমাজ ব্যবস্থায় সময়ের প্রয়োজনে পালা বদল ঘটেছে অনেক কিছুর মতো উৎসবেরও। তবে, কিছু প্রাচীন উৎসব সমাজের বিবর্তন- পরিবর্তনের ঝড়-জলে মাথা বাঁচিয়ে কার্যত অকৃত্রিম রয়ে যাবার উদাহরণও দুষ্প্রাপ্য নয়। এ প্রসঙ্গে আতোয়ার রহমান ইউরোপে-আমেরিকার কৃষিজীবী সমাজের বসন্তকালীন ‘মে পোলের’ উৎসবের উদাহরণ তুলে ধরেন।

উৎসবের এই বিবর্তন প্রক্রিয়ায় বদলে গেছে ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলোর স্বরূপও। ঐতিহ্যবাহী উৎসবের আবেদন, আগের সেই প্রাণস্পন্দন, সেই উৎসাহে ভাটা পড়েছে অনেকটাই। নিয়ম মেনে অংশ নেয়ার বাইরে বাঙালির সব ধর্মের সব বর্ণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণের উচ্ছ্বাস, বিপুল আনন্দ আয়োজন যেন বিলীন হয়ে গেছে অনেকটাই। এই সময়ে প্রকৃত অন্তরতাগিদ কতটুকু ধাবিত করে বাঙালিকে, সে প্রশ্নই যেন মুখ্য হয়ে ওঠে।

নববর্ষের বিলুপ্ত ঐতিহ্য

সারা বাংলাদেশেই পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপনের রীতি এখন বিভ্রান্ত, পুরোটা না হলেও অন্তত অংশবিশেষ, এমন মত আতোয়ার রহমানের। নববর্ষ নিয়ে এখানে কোনো ঐতিহ্যের সন্ধান নেই, উপলক্ষ পালনে আনুষ্ঠানিকতাও নির্দিষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন

এক কালে সবই ছিল। এখনো যার যেনা মেলে জমিদারের সেরেস্তায় আর ব্যবসায়ীর গদিতে পাওনা নতুন খাতার উদ্বোধনে। পণ্ডিতদের অনুযোগ একেবারে বেরুনিয়াল নয়, নববর্ষ বা বর্ষবরণের উৎস একালের বাংলাভাষী অঞ্চলে ঐতিহ্যবর্জিত, কেবল পশ্চিমের অনুকরণে উদযাপিত এক সাংস্কৃতিক উৎসব। যার লক্ষ্য শুধুই আনন্দভোগ। হ্যাঁ, মহাব্রতর পরে এই-ই তার পরিণতি। (আতোয়ার, ১৯৮৫ : ৪৬)

 

আতোয়ার রহমানের (১৯৮৫ ৪৬) মতে, বাংলাদেশে এখন নববর্ষ এক বড় উৎসব এবং বেসরকারিভাবে জাতীয় উৎসব। এই উৎসব উদযাপনে আগ্রহী নয়, এমন সংস্থা, সমিতি বা প্রতিষ্ঠান আজ বিরল। গ্রাম- বাংলায় পহেলা শৈাখের অনুষ্ঠান যদিও অনেকাংশেই হালখাতায় সীমিত, শহরে এ-উৎসব বিপুল উৎসাহ আর আনন্দভোগের জন্য।

নববর্ষেও প্রভাতে কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আয়োজিত হয় তরুমূলে মাঙ্গলিক বা আবাহনমূলক গানের আসর, বাংলা একাডেমির মতো আধাসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মাঝে মাঝে তার সাথে আনন্দমেলা জাতীয় সমাবেশ, পাড়ায় পাড়ায় নৃত্যগীতের সম্রা, – বর্তমানে এই সবই উৎসবটির প্রধান ব্যাপার।

কিন্তু এদেশেরই মাটিতে ঐতিহ্য অবগাহনে নববর্ষের উৎসব উদ্যাপনের ইতিহাস বাঙালির আছে। সে-উৎসব আঞ্চলিক হয়েও জাতীয় এবং সর্বজনীন। যার প্রচলন এখনও দেখা যায় বাংলার পূর্বদক্ষিণ অঞ্চলে বৌদ্ধ এবং উপজাতি সমাজে এমন তথ্য উল্লেখ করেন আতোয়ার রহমান।

সময়ের সাথে হারিয়ে গেছে, প্রাণের সেই বৈশাখী মেলা – এমন আক্ষেপ করেছেন সৈয়দ হাসান ইমাম। তিনি এর কারণ হিসেবে মনে করেন। মেলার পণ্য মাটির পুতুল, কুমারের নিপুন হাতে তৈরি মাটির তৈজস, বাঁশ-বেতের গৃহস্থালি পণ্য, দশ গ্রামের দেখার মতো কৃষিপণ্য এসবকে হটিয়ে দিয়ে মেলায় এসেছে প্লাস্টিক, স্টিল কিংবা অন্য কোনো উপকরণের মেশিনে তৈরি পণ্য। পুতুল নাচের মঞ্চে পরিবেশিত হয় অর্ধনগ্ন পুতুল, যাত্রার বিবেকের পরিবর্তে নর্তকীর উদ্ভট নৃত্য, এসেছে ভিসিয়ার, জুয়া। মেলায় দেখা যাচ্ছে নেশার আয়োজন। তিনি যোগ করেন।

নদী, সন্ত্রাস আর মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের কারণে বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ইতিহাস সমৃদ্ধ বর্ষবরণ কিংবা বর্ষবিদায়ের অনেকগুলো মেলা দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল থেকে হারিয়ে গেছে। শত শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখার কোনো উদ্যোগ গ্রহন করা হয়নি। বর্তমান অস্থির সময়ের ডামাডোলে যেসব মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে তার ভিতর থেকে বাঙালির সংস্কৃতির মূল সুর উবে যাচ্ছে। অথচ একদিন এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-মৃত্যুর সংগ্রামের সব কিছুর নেপথ্যেই ছিল আড়ং চৈত্রসংক্রান্তি কিংবা কবি মেলা। (হাসান, ২০০১ : ৩১৭)

গ্রামীণ জনপদে সন্ত্রাসের বিষ ছড়িয়ে পড়ার কারণে, একইসঙ্গে মানুষের জীবনযাপনের কঠিন সংগ্রাম, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, সরকারী এনজিওর টাকায় সৃষ্ট গ্রামের নব্য ধনিক শ্রেণির কারণেও মেলার অকাল মৃত্যু ঘটেছে বলে উল্লেখ করেন হাসান ইমাম (২০০১ ৩১৮)।

এদিকে সময়, চাহিদা এবং মানুষের রুচিবোধ পরিবর্তনের সাথে সাথে বৈশাখী মেলার আদি চরিত্র ও চালচিত্র বেশ পালটিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে মিজানুর রহমান আফরোজ বলেন

“কাগজের চশমা এবং বায়স্কোপ বাক্স আজ আর ছেলে মেয়েদের আকর্ষণ করে না। সেদিনের বায়োে বাক্সের স্থান এখন দখল করেছে ভিসিআর ও ভিসিপি’র প্রদর্শিত রঙিন ছবি। পুতুল নাচ থাকলেও সার্কাসের আয়োজন খুব একটা নেই। এখনও আছে হস্ত চালিত নাগর দোলা। হয়তো আগামীতে তাও সম্পূর্ণ যন্ত্র চালিত হয়ে যাবে। (মিজানুর, ২০০১ ২৮৯)
শারদীয় দুর্গাপূজায় বিবর্তন।

বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের পূজামণ্ডপে সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। প্রতি বছর পূজার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি নব কলেবরে বৃদ্ধি পেয়েছে পূজা আয়োজনের প্রস্তুতি। একবিংশ শতকে প্রযুক্তির উৎকর্ষে আধুনিকারণ হয়েছে শিল্প। সেখানে পূজার প্রতিমা নির্মাণে সমসাময়িক বিষয়গুলোই লক্ষণীয়। শুধু তাই নয়, প্রতিমার পোশাক পরিকল্পনা অঙ্গনা, অলঙ্করণ, মঞ্চ কাঠামো, আলোক বিন্যাস বা তোরণ নির্মাণে যে অভূত পরিবর্তন, এমনটা আগে দেখা যেত না।

আগের দিনে পূজো মানে ঢাক-বাদ্যের শব্দ, এখন সেখানে এসেছে আধুনিক যন্ত্রানুষঙ্গ। এ বিষয়কে স্বাগত জানিয়ে শিপ্রা সরকার বলেন, প্রযুক্তির উৎকর্ষে এ পরিবর্তন স্বাভাবিক। এটা সমাজিক চাহিদা। তাই বলে ছোটবেলার আনন্দের জায়গাটা কখনই অমলিন হয় না।

একসময় কারুপণ্য শিল্পের সাথে যুক্ত হয়ে প্রতিমার গঠন নির্মাণ করা হতো, এখন সেখানে এসেছে নতুন আঙ্গিক। এখন দেশপ্রেম, মাতৃত্বের পরিচয় প্রতিমায় যুক্ত করে নির্মাণ শৈলীকে এবং প্রতিমা মণ্ডপকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা থাকে। এর মাধ্যমেই দেশীয় সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে বাঙালি। তবে এটুকু চেতনায় রাখা উচিত, বাঙালি যেন তার রুচি, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুত না হয়। (শিপ্রা সরকার, সাক্ষাৎকার ৪ )

সাতচল্লিশের দেশ ভাগের আগে পূর্ব বাংলা ও পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে আশির দশক পর্যন্ত দুর্গাপূজায় যাত্রা, কীর্তন, কবিয়াল, পালাগানের আসর বসতো। পূজার সপ্তমী থেকে নবমীতে সন্ধ্যা আরতীর পর আয়োজিত হতো এই আসর, এমন তথ্য পাওয়া যায়, রোর মিডিয়ায় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গা পূজার ইতিবৃত্ত’ নিবন্ধে।

সেখানে পাপিয়া দেবী লিখেছেন, বর্তমানে ঢাকেশ্বরী মন্দির, সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি, রামকৃষ্ণ মিশন, রমনা কালীবাড়ি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের পাশাপাশি কলাবাগান, উত্তরা ও বনানী পূজামণ্ডপে চোখে পড়ে বৈচিত্র, ঐতিহ্য আর নতুন ভাবনার প্রকাশ। কোথাও এক হাজার দুই হাত রয়েছে দেবী দুর্গার। কোথাও বা শুধুই হাজার। থিমের পূজায় কোথাও স্থান করে নিয়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা, কোথাও আবার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ওপর ঘটে চলা নৃশংসতার কথা উঠে এসেছে।

পাপিয়া যোগ করেন, মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাওয়ে একমাত্র লাল বর্ণের দুর্গা দেবীর পূজা হয়ে থাকে। প্রায় ৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই ঠাকুর দর্শনে দেশ বিদেশের দর্শনার্থীরা ভীড় জমান। পুরনো ঢাকার তাঁতিবাজার ও শাখারি বাজারে রাস্তাগুলো অপ্রশস্ত বিধায় রাস্তার ওপরই বেশ উঁচুতে নির্মিত হয় বাঁশ কাঠের নানা বৈচিত্রপূর্ণ অস্থায়ী মণ্ডপ। মণ্ডপের নিচে দর্শনার্থীদের হাঁটার পথ।

চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ গজ দূরত্বে একটার পর একটা পূজা, চারিদিকে ঢাক, ঢোল, মাইকে বিরামহীন গানের ছন্দ। উৎসব ঘিরে আয়োজিত হয় মেলা। ধর্ম বর্ণের ভেদ নেই দর্শনার্থীদের মাঝে। ‘বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গা পূজার ইতিবৃত্ত’ প্রবন্ধে আরও আছে

কোথাও মা দুর্গার বিভিন্ন রূপ কোথাও সামাজিক সমস্যা, কোনো কোনো পূজা মণ্ডপের থিম ‘গাছ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’ আবার কোথাও রয়েছে এই বিশ্বব্রহ্মাজের অপার রহস্যের গল্প। এভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা কিংবা গ্রামের পূজাগুলোয় এখন সাবেকী ঐতিহ্যের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক পূজার প্রচলনও শুরু হয়ে গেছে। পাপিয়া, ২০১৯)

 

 

মূলত আশির দশকের পর গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের ধারায় পরিবর্তন ঘটতে থাকে। পূজায় আয়োজিত যাত্রাপালা, পালাগান, কবিয়াল বা কীর্তনের মতো ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির বদলে স্থান করে নেয় বাংলা সিনেমার গান আর আধুনিক বাংলা গান, এমন তথ্যের উল্লেখ করে পাপিয়া লিখেছেন, এখন শহরে তো বটেই, এমনকি গ্রামাঞ্চলেও পূজামণ্ডপে হিন্দি, বাংলা রক আর ব্যান্ডের গান চারপাশ প্রকম্পিত করে।

দেবীর অধিষ্ঠান রাজপুরী থেকে জনারণ্য, বারোয়ারি মণ্ডপ থেকে ক্লাব, পাড়া, মহল্লা পর্যন্ত পরিব্যপ্ত হবার এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন অমিত রায় চৌধুরী (২০২০)। রাইজিংবিডি.কম-এ প্রকাশিত ‘সমাজ বিবর্তিত, উৎসব শাশ্বত’ নিবন্ধে তিনি তাঁর ভাবনা তুলে ধরে লিখেছেন, প্রযুক্তির উৎকর্ষে শিল্পের আধুনিক ও রুচিনি পূজামণ্ডপ কখনো অতীতাশ্রয়ী বাঙালিকে নস্টালজিয়ায় ভাসিয়ে নিয়ে যায় দূর অতীতে, মনোরম কোনো প্রাসাদ বা দেবালয়ে, কখনো সামসময়িক কোনো বিষয় ভাবনাকে ধারণ করে তিলে তিলে গড়ে তোলে আধুনিক শিল্পসুষমা।

আবার কখনো কেতাদুরন্ত আধুনিক স্বেচ্ছাসেবক জানান দিয়ে যা তাঁরা একবিংশ শতকের বাঙালি। সময়ের বিবর্তনে উৎসবের স্বরূপ বদলেছে। আধ্যাত্মিকতার আধিপতা ক্রমশ ফিকে হয়ে এসেছে, উৎসব হয়েছে প্রবল থেকে প্রবলতর। জীবনধারার পরিবর্তন পূজার আয়োজনে বৈচিত্র এনেছে, ঐতিহ্যনির্ভরতাকে ছাপিয়ে থিম বেইজড পূজা গোটা ব্যবস্থাপনায় রূপান্তর ঘটিয়েছে।

জৌলুস, প্রতিপত্তি, প্রদর্শনবাদী পুঁজির দাপট বাঙালির স্বকীয় শিল্পীসত্তায় আঁচড় কাটতে পারেনি। সেভাবেই সব অন্তরায় কাটিয়ে দুর্গাপূজার কালোত্তীর্ণ ধ্রুপদী সৌন্দর্য বাঙালি অন্তরকে বর্ণময় করে তোলে আর বাঙালি বছরজুড়ে প্রতীক্ষায় দিন গোনে, সুরে মেতে ওঠার তীব্র বাসনায়।

“সমাজ বিবর্তিত, উৎসব শাশ্বত প্রবন্ধে তিনি আরও লিখেছেন, ব্যক্তির বিত্ত ও বৈভবের জায়গায় এসেছে সমষ্টি, গোষ্ঠা ও শ্রেণির সামর্থ্য ও ঐশ্বর্য। ব্যবস্থাপনায় অভিনবত্বের দিক তুলে ধরে লেখেন, উৎসবে যুক্ত হয়েছে পূজাপরিষদ এবং পৃষ্ঠপোষকতায় স্বয়ং রাষ্ট্র।

শুধু তাই নয়, শিউলি, দোপাটি, গোলাপ, রঙ্গন ও গন্ধরাজের আগ্রাসী সৌরভ, বিচিত্রবর্ণের মনোহরা দ্যুতি, শ্রুতিশিগ্ধ ঢাকের বিরামহীন নিনাদ, আধুনিক বাংলা গানের মুগ্ধতা, চণ্ডীপাঠের মোহিনী আবেশ বাঙালি মননে সৃষ্টি করে এক অব্যক্ত চঞ্চলতা, নন্দনতত্তের অভিসারে মত্ত হয়ে ওঠে বাঙালি শিল্পীসত্তা, ফল্গুধারার মতো মুক্ত হতে থাকে গল্প, উপন্যাস ছড়া কবিতা; মঞ্চস্থ হতে থাকে যাত্রাপালা কবিগান।

দুর্গাপূজার প্রতিমা আর মণ্ডপের নবায়ণের মতো পহেলা বৈশাখে চারুকলা অনুষদ আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রাও বছর বছর নতুন ভাবনায় প্রাণিত হয়, নতুন বহর নিয়ে আলোচনা দৃষ্টে এ কথা বলা যায়, উৎসব তার কিছু আয়োজন অপরিবর্তিত রেখে কালের সাথে সমন্বয় সাধন করে এসেছে।

নবান্ন : বিমর্ষ এক লৌকিক পার্বণ

বর্তমানে কৃষি পর্যায়ে অনুষ্ঠিত নবান্ন উৎসবের মতো লৌকিক পার্বণগুলোর ব্যাপকতাও আগের মতো নেই। আনুষ্ঠানিকভাবে যেটুকু এখনো আছে, তা যেন গ্রামবাসী ও নগরবাসীর সাংস্কৃতিক চেতনাপ্রসূত। ‘রূপান্তর যদিও উৎসবের এক প্রবল সহগামী, কিছু প্রাচীন উৎসব সমাজের বিবর্তন-পরিবর্তনের ঝড়-জলে মাথা বাঁচিয়ে এখনো কার্যত অকৃত্রিম রয়ে গেছে আতোয়ার রহমান (১৯৮৫ ৭৫-৭৬) তাঁর এমন মতের সাথে আরও যোগ করেন, ‘কোনো কোনো উৎসব নিজের থেকেই অথবা পরিবেশের চাপে কালের সাথে – কিছুটা আপোষ করে।’

 

 

যখন ধানের ফসল উঠত বছরে একবার বা দুবার আউশ ও আমন: সে সময় মূলত আমন ধান ঘরে আসার – পর প্রচুর সময় মিলত নবান্ন করার, এমন তথ্যের অবতারণা করে মোমেন চৌধুরী (২০১৪ ৪২) বলেন, পৌষ-পার্বণে নানা আনুষ্ঠানিকতার সুযোগ ছিল। এর মূল উদ্দেশ্যই ছিল বিনোদন। এখন বছরব্যাপী ধান উৎপন্ন হওয়ায় কৃষিজীবীদের অবকাশ মেলে না আলাদা করে উৎসব পালনের।

মৃত্যুঞ্জয় রায় লিখেছেন (২০১০ : ১৯), নতুন ধান্যে হবে নবান্ন এ আশায় কিষাণ-কিষাণীরা সারা বছর বুক বেঁধে থাকত। ধান উঠলে ঢেঁকিতে চাল গুঁড়ো করে চলত নানা রকম পিঠে পায়েসের আয়োজন ও আত্মীয়স্বজনদের খাওয়ানো। এর লোকাচারের অনেক কিছুই আজ অতীতের স্মৃতি। কোনো কোনো পল্লিতে এখনো নবান্নের মতো সামান্য কিছু লোকাচার ও উৎসব ক্ষীণভাবে বহমান। হয়তো কাল তাও থাকবে না। এ প্রসঙ্গে Mokaram Hossain-এর নিম্নোক্ত কথাগুলো প্রণিধানযে

In the olden days husking rice was non-mechanized. A device called ‘Dheki” was used for this purpose. This device made a rhythmic noice whice is no mare heard. The poet of Ruposhi Bangla Jibonananda Das is engrossed by late autumn. Late autumn has been a recurring them in his poems. Nahanno is fairly an old festival in this part of our culture. This festival, however, has lost much of its old grandeur. Still, lete autumn comes following her turn and we tend to reminisce our old traditions. (Mokaram. 2012 60)

একসময় যে নবান্ন ছিল স্বচ্ছলতার দ্যোতক, প্রাচুর্যের প্ররিচয়বাহী: সময়ের বিবর্তনে বাঙালির পার্বণগুলোর মধ্যে আজ তা উপেক্ষিতা। বরুণকুমার চক্রবর্তী (২০১৪ : ৩২) মনে করেন, মানুষ যতই লক্ষ্মীহারা হয়েছে, ততই নবান্ন হারিয়েছে তার জৌলুস, হারিয়েছে তার প্রবল উপস্থিতিকে। আজ রয়ে গেছে তার স্মৃতিচারণজনিত দীর্ঘশ্বাসের অস্তিত্বটুকু।

হারিয়ে যাওয়া অতীতের স্মৃতিচারণ করে দীনেন্দ্রকুমার রায় বলেন : প্রাচীনগণ মনে করেন, নবান্ন না করিলে যথেষ্ট প্রভাবায় আছে। এমন কি, অনেক প্রবাসীও এই উপলক্ষে প্রবাস হইতে গৃহে সমাগত হইয়া আত্মীয়-স্বজনগণের সহিত মিলিয়া নবান্ন করিতেছেন — এ দৃশ্য পূর্ণো আমাদের পল্লী অঞ্চলে বিরল ছিল না। কিন্তু আজকাল ইংরাজী-শিক্ষার বিস্তারে আমাদের উৎসবানুরাগ অনেক পরিমানে শীতল হইয়া আসিয়াছে। আবার অনেকে ইচ্ছাসত্ত্বেও করবাহুল্যের আশঙ্কায় বহুদূরবর্তী প্রবাস হইতে মনুস্মৃতিমন্বিত পল্লীগ্রামের উৎসব-ভবনে উপস্থিত হইয়া নবান্নে যোগদান করিতে পারেন

সাধ আর সাধ্যের টানাপোড়েনে নবান্নের রং এখন অনেকটাই ফিকে। এর সম্ভাব্য কারণ খুঁজেছেন দীপককুমার বড় পণ্ডা

এখন অনেক কিছুই বদলেছে। আজ বিঘের পর বিঘে ধান চাষ করে আর লাভ পাচ্ছেন না চাষিরা। তাই চাষে তাঁদের আগ্রহ কমেছে। অনেকেই জমি শুধু নিজেদের জিম্মার রাখতে চাষ করেন। চাষ না করলে আমি অন্যের দ্বারা দখল হয়ে যাবে যে আবার কোনো ক্ষেত্রে চালের হেরফের হয়েছে। যেমন মানুষ শুধু আমন ধানের চাষের ওপর নির্ভরশীল নয়। বোরো ধানের চাষের ব্যাপকতাও বেড়েছে। বছরে তিন- ভারবার চাষ হচ্ছে। তবে কৃষিকেন্দ্রিক যেসব উৎসব আমাদের চালু আছে, সেগুলি সব কিছু আমন চাষকে কেন্দ্র করেই। (দীপককুমার, ২০১৪ : ৭৩)

বিজনকুমার মণ্ডল (২০১৪ঃ ৬০) বলেন, সমাজবিবর্তনের ধারায় এবং বিজ্ঞানের প্রযুক্তির প্রয়োগে কৃষিকাজের বিপুল পরিবর্তন ঘটেছে। একই কৃষির জমিতে বছরে একাধিকবার ফসল ফলানো হচ্ছে। তা সত্ত্বেও গ্রামীণ সমাজে আজও আমন ধানের চাষকে মূল চাষ বলে ধরা হয়। যেসব অঞ্চলে জলসেচের সুব্যবস্থা নেই, কেবল বৃষ্টির জলের ওপর নির্ভর করতে হয় সেখানে আমন চাষ একমাত্র ধান চাষ হয়ে থাকে। আমন ধানের ফসল অগ্রহায়ণ মাসে পরিপাটি করে খামারে বা বাড়িতে তোলা হয়।

কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নবান্ন উৎসব উদযাপনের আমেজকে ম্লান করে দিয়েছে এমন মত নাসরীন মুস্তাফির

কার্তিক আর মরা কার্তিক না অভাবের বেসুরো তানে, বলতে গেলে এখনকার হেমন্ত দুই মাসজুড়ে কখনই নিদারুন অভাবের ছবি নয়। আবার নবান্নের উৎসবের সেই আয়োজনও নেই আগের মতো। নিতানতুন প্রযুক্তির ব্যবহারে কাক এখন আর নতুন ধানের আশায় কোনো কাল বসে থাকে না, যে কোন সময় যদল তুলতে পারছে গোলাতে। … অভাব-অনটন নেই, এ শুভসংবাদের সঙ্গে এসেছে নবান্ন-সংস্কৃতির বিলুপ্তির দুঃসংবাদ, হেমন্ত এখন আর ফসলি কতু নয়। বরং ভাষা জেগেছে, গোটা হেমন্তই না বিলুপ্ত হয়ে যায়। (২০১৬ঃ৪২)

শামসুজ্জামান খানের ( ২০১৩ঃ ৫৮) মতে, উত্তরবাংলার আমানি বা হৈমন্তিক ঋতু আমন ধানের গন্ধে বিমোহিত কৃষিজীবী সমাজে নবান্নের উৎসব আর ঢাকার নবান্নের উৎসব অন্তঃসারে এক হলেও এর আঙ্গিক আলাদা। উত্তরবঙ্গে মঙ্গাপীড়িত মানুষের ঘরে নতুন ধান যে আশার আলো জাগায় তা-ই নবান্ন। এদিকে কর্মচঞ্চল নগরজীবনে নবান্ন উৎসব ঐতিহ্যের বিনির্মাণ এবং বাঙালি সংস্কৃতির শিকড়সংলগ্ন হওয়ার প্রয়াসজাত। মঙ্গা হলে উত্তরবাংলায় নবান্ন উৎসব হয় না। আর মঙ্গার দুঃসহ জ্বালাকে তীব্র বাস্তবতায় ফুটিয়ে তোলার জন্য আমরা ঢাকায় করি প্রতিবাদী নবান্ন উৎসব।’

প্রাচীন বাংলায় নবান্ন পার্বণ হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে পালিত হতো ব্যাপকভাবে। বর্তমানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও কমে গেছে নবান্ন উৎসব পালনের প্রবণতা। এ ক্ষেত্রে সৌমিত্র শেখর (২০১৪ : ভূমিকা) মনে করেন, হিন্দুদের বর্ণবাদও এই বিচ্ছিন্নতায় প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে শতবছর আগে মুসলিম পরিবারে নবান্ন উৎসব উদযাপনের স্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ধারণা করা হয় ফরায়েজি আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় মুসলিম সমাজে নবান্নর মতো পার্বণচর্চা ইসলাম বিরুদ্ধ বিবেচনায় বিলুপ্ত হয়। তিনি বিনয় ঘোষের বাংলা লোক সংস্কৃতির সমাজতত্ত্ব গ্রন্থের উদ্ধৃতি তুলে ধরেন, আধুনিক যুগের শ্রেণীগত দূরত্বের সঙ্গে এই জাতিবর্ণগত দূরত্ব মিলিত হয়ে এমন একটি কঠিন সমস্যার সৃষ্টি করেছে যা পাশ্চাত্য বা অন্য কোনো সমাজে বিরল বলা চলে।

 

 

এই বিরলতা বাঙালি সমাজের সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে বলেই মন্তব্য করেন সৌমিত্র। লোকসাহিত্য গবেষক মোমেন চৌধুরীর উদ্ধৃতি দিয়ে সৌমিত্র বলেন, নবান্নের সঙ্গে গ্রামবাংলার মুসলিম জনজীবনের দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছে। এখন নবান্নের সঙ্গে হিন্দু সংস্কৃতির যোগসূত্রকে প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন :

আসলে নবান্নের সঙ্গে কোনো ধর্ম বা ধর্মীয় কারণকে যুক্ত করার প্রয়োজন ছিল না। নবান্ন তো কোনো ধর্মের নিজস্ব উৎসব নয়, বাঙালি শস্যোৎসর এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান উৎসব। নবান্ন বৈচিত্রময় বাঙালি সংস্কৃতির উপাদান। এর অবলুপ্তি মানে জাতিগত পরিচয়ের খানিকটা আলো নিভে যাওয়া, অনেকটা আনন্দধারার বিলোপ (সৌমিত্র, ২০১৪ ১০৯-১১০)
এককালে নবান্ন ছিল যুথবদ্ধ সমাজজীবনের একতার রূপ, বাঙালির আত্মপরিচয়ের নির্ণায়ক। সময়ের সাথে, সামাজিক বিবর্তন আর সাংস্কৃতিক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে যেন ভাটা পড়েছে সেই স্বতঃস্ফূর্ততায়। এখন দুর্ভিক্ষ নেই, নেই ভাতের জন্য হাহাকার। কষ্টার্জিত ফসল ধান এখন আর ‘লক্ষ্মী’র মর্যাদা পায় না। তাই নবান্ন উৎসবেও নেই ফেলে আসা আকুলতা। সে কারণেই কর্মচঞ্চল রাজধানীতেও নবান্নোৎসবের আঁচ অনেকটাই ম্রিয়মান।

ঋতুভিত্তিক উৎসব বিবর্তনের সামাজিক প্রভাব

সময়ের সাথে সাথে উৎসবের বিবর্তন সমাজ পরিবর্তনের রূপটি পরিস্ফুট করে। উৎসব নতুন করে বাঁচার উদ্দীপনা যোগায়, সমৃদ্ধি আর দীর্ঘ জীবনের ইচ্ছাকে জোরালো করে। প্রাচীন এই ধারণাই হল সংস্কার এবং এই ধারণা কেবল মনেই থাকে না, প্রকাশের কিছু বাস্তব মাধ্যমও খুঁজে নেয় (আতোয়ার, ১৯৮৫ : ৪৭)। এভাবেই রচিত হয় ইতিহাস। তিনি আরও উল্লেখ করেন :

উৎসব নিয়ো লৌকিক আর অভিজাত ধর্মের বিরোধ সমাজবিজ্ঞানীকে নেয় সমাজ বিবর্তনের ধারায় এসব ধর্মের ভূমিকার ইঙ্গিত। একদিক থেকে তাঁর অবলোকন অবশ্যই মূল্যবান। বিশেষ করে, লৌকিক উৎসবে ধর্মীয় প্রভাবের পর্যালোচনায়। ধর্মবাদীরা যা-ই বলুন, লৌকিক উৎসবের অবদমন বা শুদ্ধিসাধন ধর্মীয় আধিপত্যবাদের সুপরিকল্পিত প্রসার (আতোয়ার ১৯৮৫ : ৮১)

প্রকৃতির জীবনচক্রে মানুষ এবং তার বিবর্তিত সমাজ ব্যবস্থা এক অপরের পরিপূরক। বাঙালির আবহমান মানবিক বৈশিষ্ট্য সবসময়ই সহিষ্ণু এবং সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশের পক্ষে। তাই প্রকৃতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রশ্রয়ে এবং বাঙালির নান্দনিক উৎকর্ষে বিবর্তিত হয়ে ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলো অভূতপূর্ব রূপ লাভ করে। বৈচিত্র্যের মাঝে ইসা প্রতিষ্ঠার এই সহনশীলতা আধুনিক বাঙালি জাতিকে করেছে প্রগতিশীল।

মানজারুল ইসলাম চৌধুরী সুইট (সাক্ষাৎকার ২) বলেন, আগে জন্ম, বিয়ে, অন্নপ্রাশন ইত্যাদির দিন ঠিক করা হতো লোকনাথের পঞ্জিকা দেখে। সেই সময়টার স্মৃতি বর্ণনায় মনে পড়ে, খেজুরের কাঁচা রসে নতুন চাল দিয়ে ক্ষীরের মতো পায়েস তৈরি হতো। তা ধর্মমতে মসজিদ, মাজার, মন্দির বা গীর্জায় বিতরণ করা হতো। বাড়িতে বাড়িতে লেগেই থাকতো পিঠাপুলির উৎসব হতো। সেটি এখন বিলীন প্রায় ।

ওই সময়টায় বাংলা সাল পালিত হয় রাষ্ট্রীয়ভাবে। বাংলা সালকে লোকনাথের সাথে মিলাতে গেলে দেখা যেতো পহেলা বৈশাখ কখনো ১৪ তারিখে, কখনো ১৫ তারিখে পড়ে। এই অসুবিধা দূর করতে বাংলা পরিকা সংস্কার করা হয়। যেখানে প্রথম ছয় মাসকে সংস্কার করে পরের ছয় মাসকে ঠিক রাখা হলো। ফলে দেখা গেল ২১ ফেব্রুয়ারি পড়ে যাচ্ছে ৮ই ফাল্গুনের বদলে ৯ই ফাল্গুন। ঐতিহাসিক ৮ই ফাল্গুন নিয়ে কবিতার ভাষাকে অসামঞ্জস্য মনে হলো। তারিখের ঝামেলা এড়াতে আবার সংস্কার করা হয় বাংলা পঞ্জিকা। প্রথম ছয় মাস ঠিক রেখে পরের ছয় মাস সংস্কার করা হয়।

কাজের সুবিধায় বাংলা পঞ্জিকা সংস্কারের মতো ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলোও খাপ খাইয়েছে সময়ের সাথে।

গোলাম কুদ্দুছ (সাক্ষাৎকার ১) বলেন, রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার উত্থানের ফলে উৎসবগুলো তার মৌলিকত্ব হারায়। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রাও কিছু উৎসব বিবর্তন বা বিলীন হবার কারণ। নগরায়ণের ফলে মানুষ শহরমুখী হলো, পেশার পরিবর্তন জীবনে আনলো রূপান্তর। ফলে গ্রাম গঞ্চে আয়োজিত লোক উৎসবের গুরুত্ব, ব্যাপকতা আর উপযোগিতাও ম্লান হয়ে গেল। যদিও গ্রামে উৎসবগুলো এখনও উদযাপিত হয় গ্রামীণ মানুষের সাধ্যানুসারে এবং শহরেও এর আয়োজন বন্ধ হয়ে যায়নি।

ছায়ানট রমনার বটমূলে বড় আকারে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু করলেও, রাজধানীতে বা অন্যান্য জেলা শহরগুলোয় তা উদযাপিত হতো যার যার মতো করে। সেই খবর আড়ম্বরে প্রচার না হলেও, তা উদযাপন হতো। পরবর্তীতে সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও তা আয়োজন করতে শুরু করে। এই উৎসব তার একক চরিত্র নিয়ে বড় আকারে আয়োজিত হতো। এখন সেভাবে হয়তো হয় না, ছোট ছোট আকারে হচ্ছে।

যেমন হালখাতা এখন আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় চলে এসেছে। যার প্রভাব পড়েছে সংস্কৃতির ওপর । রাজনীতিতে যখন ধর্মের প্রভাব পড়ল, তখন সংস্কৃতির সব অনুষঙ্গকে একটি মহল তার স্বার্থে ব্যবহার শুরু করলো। ধর্মকে উৎসবের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে এর অগ্রগতিকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। এমনকি মিথ্যাচার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে তুলল। ফলে পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে বলা হচ্ছে ধর্মবিরোধী, মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বলা হচ্ছে ধর্মবিরোধী।

এই প্রবণতার ফলে গ্রামীণ পর্যায়ে আয়োজিত কিছু উৎসব-অনুষ্ঠানও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে। এলাকা বিশেষে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হওয়ায়, আগের মতো নিঃশঙ্কচিত্তে উৎসব উদযাপন করতে মানুষ পিছপা হচ্ছে। সে মুহুর্তে ভালো-মন্দ সিদ্ধান্ত নেবার ভাবনাগুলোও হয়তো থমকে যায়, অপচিন্তা, আশঙ্কা দমীয়ে রাখা যায় না। এরপরও নানা অপপ্রচার, প্রতিবন্ধকতা পাশ কাটিয়ে মানুষ উৎসবে আসে নাড়ির টানে।

এখন শহরে বসন্তবরণ উৎসবের আয়োজন করা হয়। বসন্ত উৎসব নগরজীবনে একটি বড় অনুষঙ্গ, যাকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। অসতা, প্রগতিবিরোধী, মনুষ্যত্ববিরোধী, সংস্কৃতি বিরোধী শক্তি মনুষ্যশক্তির কাছে সবসময় পরাস্ত হয়। বাঁধা যেখানে, সেখানে চর্চা আরও বেশি হয়। বাঙালির জীবনের অংশ ঋতুভিত্তিক এই উৎসবগুলো তার আদি রূপ পরিবর্তন করেও, সময়ের সাথে নতুনভাবে সংস্কৃতিকে আলোকিত করে, সামাজিক বন্ধন তৈরির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

Exit mobile version