বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস : উপমা চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহারের সূচিপত্র

আজকে আমরা বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস : উপমা চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহারের সূচিপত্র সম্পর্কে আলোচনা করবো।

 

বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস : উপমা চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহারের সূচিপত্র

 

বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস : উপমা চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহারের সূচিপত্র

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর ভীষ্মদেব চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে ‘বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস : উপমা-চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহার শিরোনামায় বর্তমান অভিসন্দর্ভ প্রণীত হয়েছে। ২০০২ সনের ফেব্রুয়ারি মাসে আমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তিপ্রাপ্ত গবেষক হিসেবে এম ফিল কার্যক্রমে যোগদান করি।

নানাবিধ প্রতিবন্ধকতায় বিলম্বিত হওয়া সত্ত্বেও এই গবেষণা-অভিসন্দর্ভ শেষ পর্যন্ত যে পূর্ণরূপ লাভ করেছে তা মূলত আমার তত্ত্বাবধায়কের নিরন্তর অনুপ্রেরণা ও সহৃদয় সহযোগিতার ফল। অভিসন্দর্ভের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে তাঁর সুচিন্তিত অভিমত ও নির্দেশনা। তাঁর প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা।

এম ফিল গবেষণায় আমাকে উৎসাহী ও আগ্রহী করে তোলেন আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আকরম হোসেন। অভিসন্দর্ভের বিষয় নির্ধারণসহ গবেষণার প্রস্তুতিমূলক প্রক্রিয়া সম্পাদনে তাঁর মূল্যবান উপদেশনা আমার জীবনের এক গৌরবময় অর্জন।

গবেষণাকালে আমি মুখ্যত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, বাংলা বিভাগের সেমিনার ও ভাষাতত্ত্ব বিভাগের সেমিনার ব্যবহার করেছি। এই সুযোগে গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারিবৃন্দকে জানাই ধন্যবাদ ।

বর্তমান অভিসন্দর্ভের প্রতিপাদ্য প্রমাণের জন্য নন্দনতত্ত্ব, চিহ্নবিজ্ঞান ও শৈলীবিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্বের সহায়তা গ্রহণ করা হয়েছে। চিহ্নবিজ্ঞান বিষয়ে আমাকে প্রথম আগ্রহী করে তোলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জনাব হাকিম আরিফ। তাকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ।

একইসঙ্গে, স্মরণ করি ভাষাতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জীনাত ইমতিয়াজ আলী-সহ আমার সকল সহকর্মীর অকৃত্রিম শুভেচ্ছা। ও সহযোগিতা।

গবেষণা সংক্রান্ত নানা পরামর্শের জন্য কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর বেগম আকতার কামাল, ডক্টর বিশ্বজিৎ ঘোষ, ডক্টর সৈয়দ আজিজুল হক এবং সহযোগী অধ্যাপক ডক্টর সিরাজুল ইসলামকে। অভিসন্দর্ভের মুদ্রণ পরিকল্পনার নানাবিধ সূক্ষ্ম বিষয়ে সহযোগিতা করেছে আবাল্য সুহৃদ আলাউদ্দিন আহমেদ।

গবেষণার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাবা-মা ও বড় বোনের পরম আশীর্বাদ আমাকে বিশেষভাবে উজ্জীবিত করেছে। স্বেচ্ছায় নির্বাসনতুল্য জীবন বেছে নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন গবেষণার সুযোগ করে দিয়েছে হৃদয়মিতা সাজেদা হক।

সবশেষে শিশুকন্যা অমিয়ার জন্য রইল অফুরান স্নেহাশিস, যার অবুঝ হাসিমাখা মুখ এই গবেষণা কাজে জুগিয়েছে নিরন্তর উদ্যম আর প্রেরণা।

 

বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস : উপমা চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহারের সূচিপত্র

 

সূচিপত্র

প্রথম অধ্যায় :

ঔপন্যাসিক গদ্যে উপমা চিত্রকল্প ও প্রতীক চিহ্নের নন্দনতত্ত্ব

দ্বিতীয় অধ্যায় :

বঙ্কিম উপন্যাসে উপমা চিত্রকল্প ও প্রতীক

প্রথম পরিচ্ছেদ : উপমা চিত্রকল্প

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : বঙ্কিম উপন্যাসে প্রতীক

তৃতীয় অধ্যায় :

রবীন্দ্র উপন্যাসে উপমা চিত্রকল্প ও প্রতীক

প্রথম পরিচ্ছেদ : উপমা চিত্রকল্প

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : রবীন্দ্র উপন্যাসে প্রতীক

চতুর্থ অধ্যায় :

উপমা চিত্রকল্প ও প্রতীকের চিহ্নায়ন : বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ

 

বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস : উপমা চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহারের সূচিপত্র

 

উপসংহার

উনিশ শতকের বাংলা উপন্যাস-সাহিত্য একান্তভাবেই বঙ্কিমশাসিত। দুর্গেশনন্দিনী থেকে সীতারাম- এ দীর্ঘ উপন্যাস পরিক্রমায় উপমা-চিত্রকল্প ও প্রতীকের নন্দনতত্ত্বে তাঁর স্বোপার্জিত শিল্পীব্যক্তিত্ব পূর্বাপর সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল। উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যচর্চায় বঙ্কিমচন্দ্র সঞ্চার করেছেন নতুনত্বের স্বাদ; তাঁর উপন্যাসে সুগভীর অভিব্যক্তি আর ভাষার চারুত্বে সম্প্রসারিত হয়েছে শিল্পভাষার ভিন্নতর বিন্যাস।

এই স্বাতন্ত্রকামী প্রচেষ্টা তাঁকে নিরবচ্ছিন্ন সফলতা প্রদান না করলেও আমৃত্যু নান্দনিকতায় উদ্দীপিত করেছে। ইতিহাস আর রোমান্সের সীমার মধ্যে থেকেই তাঁর প্রতিনিধিত্বশীল সামাজিক ও অন্যান্য উপন্যাস নিজস্ব চিহ্নায়ন ও শৈলীগত বিশেষত্বকে রেখেছে অক্ষুণ্ণ । এ-সকল রচনার সংরূপকে আত্মস্থ করে এক সামগ্রিক নন্দনচেতনার রূপায়ণে বঙ্কিমচন্দ্র সবসময় সচেষ্ট থেকেছেন।

বিশেষত, আনন্দমঠ, দেবীচৌধুরাণী কিংবা সীতারামের মতো উদ্দেশ্যমূলক উপন্যাসের ক্ষেত্রেও এই মন্তব্য সত্য। বস্তুত, শিল্পীস্বভাবে সচেতনভাবে যে উপযোগিতাবাদী মনোভঙ্গিকে বঙ্কিমচন্দ্র লালন করেছেন, বিভিন্ন উপন্যাসের সামগ্রিক রসপরিণতিকে বাধাগ্রস্ত করলেও তা সংশ্লিষ্ট পাঠকৃতির উপমা-চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহারকে আহত করেনি।

 

বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস : উপমা চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহারের সূচিপত্র

 

ভিন্ন কথায় বলা যায় যে, উপমা-চিত্রকল্প ও প্রতীক সৃজনের সুযোগ ও যোগ্যতা, সকলপ্রকার সাহিত্যনীতির অচলায়তন ভেদ করে তাঁকে দিয়েছে শিল্পমুক্তির শক্তি। একদিকে সচেতন নীতিবোধ অপরদিকে অপ্রতিরোধ্য সৃষ্টি-প্রেরণা জৈবসমসত্ত্বে জারিত হয়ে বঙ্কিম- উপন্যাসের উপমা-চিত্রকল্প ও প্রতীকের নান্দনিকতাকে সংজ্ঞাপিত করেছে। তাই বঙ্কিম-উপন্যাসের উপমা-চিত্রকল্প ও প্রতীকের জগৎ হয়ে উঠেছে নীতিপ্রচ্ছাদিত জীবন ও সমাজবোধ অতিক্রমী ঔপন্যাসিকের শিল্প অভীলার স্মারক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনাদর্শ এবং তাঁর উপন্যাসে বিধৃত মানবজীবন বঙ্কিমচন্দ্রের শিল্পপন্থাকে আশ্রয় করে নয় বরং ভিন্নতর প্রতীতি এবং পর্যবেক্ষণে বিশ্বমানস্পর্শী দার্শনিকতায় সুচিহ্নিত।

রবীন্দ্রনাথ যেহেতু প্রধানত রোমান্টিক কবি, সেহেতু তাঁর উপন্যাসের কেন্দ্রীয় ভাববিশ্ব কখনোই বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যমূলকতায় আচ্ছন্ন হয় না, কিংবা তাঁর নান্দনিক শিল্পপ্রাণতা ক্ষণিক ভাবাদর্শ বিস্তার করেই ফুরিয়ে যায় না। বরং কোনো বিশেষ তত্ত্ব কিংবা মতবাদ প্রতিষ্ঠার সচেতন তাগিদ সত্ত্বেও রবীন্দ্র উপন্যাসে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এক গভীর শিল্পোজ্জ্বল দার্শনিকতা যা চিরায়ত হয়েও বিশেষ দেশকালসমাজের প্রবণতাকে ধারণ করে; আধুনিক মানব-মনস্তত্ত্বকে অনন্য জীবনবোধ এবং শিল্পজিজ্ঞাসায় প্রাণিত করে তোলে।

 

বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস : উপমা চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহারের সূচিপত্র

 

বলা চলে, উপন্যাসের পাঠকৃতি নিয়ত নিরীক্ষাপ্রিয় রবীন্দ্রনাথের কাঙ্ক্ষিত শিল্পান্বষেণক্ষেত্র। তিনি কখনোই তাঁর কবিসত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উপন্যাস রচনায় সচেষ্ট হননি, হওয়া সম্ভবও নয়। বস্তুত, রোমান্টিক কবিতায় অনির্দেশ্য ভুবনের প্রতি একান্ত আকাঙ্ক্ষা কবির বাস্তব জীবনবোধকে আচ্ছন্ন করতে তৎপর থাকে; যা থেকে মুক্ত হয়ে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস-আশ্রয়ী বাস্তবকে প্রায়শ কবির উপলব্ধিতে ধারণ করতে চেয়েছেন।

অলোকসামান্য কবিপ্রতিভার শ্রেষ্ঠত্বে তিনি তাই উপন্যাসের কাঠামোতেই সঞ্চার করেন কাব্যময় জীবনস্বরূপ। ফলে, তাঁর উপন্যাস ও কবিতা প্রায়শই বোধে সমধর্মী, প্রকাশে পৃথক।

কবিপ্রাণ বঙ্কিমচন্দ্র এবং অবিসংবাদিত কবি রবীন্দ্রনাথের মানস গঠনে যে মৌলিক ব্যবধান শনাক্তকৃত, তা তাঁদের উপন্যাসের উপমা-চিত্রকল্প ও প্রতীকের সংগঠনেও সমভাবে লক্ষণীয়। তাঁদের উপমা-চিত্রকল্প ও প্রতীকের জগৎ মূলত ব্যঞ্জনা সঞ্চারে স্বতন্ত্র, চিহ্নায়নে ব্যতিক্রমচিহ্নিত, শৈলীগত মানদণ্ডে ভিন্ন। বলা যায় যে, উভয় শিল্পীর উপমা-চিত্রকল্প ও প্রতীকের জগৎ তাঁদের স্বোপার্জিত নান্দনিকবোধ ও সার্বভৌম চিহ্নায়ন কুশলতাকেই নির্দেশ করে।

 

বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস : উপমা চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহারের সূচিপত্র

 

তাঁদের বিভিন্ন উপন্যাসের বিচিত্র শিল্প- উপকরণে চিরায়ত মানবের বহুলাঙ্গ মনোসম্পর্ক সুবিন্যস্ত। বঙ্কিমচন্দ্র কিংবা রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস যতখানি সত্তাভিমুখী ছিল ততখানি পঙ্কিলতায় আবর্তিত মানুষের সংকটাভিমুখী ছিল না। বঙ্কিমচন্দ্রের উপমা, চিত্রকল্প কিংবা প্রতীকের জগৎ ইতিহাস সমাজ আর আরোপিত বিশ্বাস লালিত মানবহৃদয়কে স্পর্শ করেই পূর্ণতা পায়।

অপরদিকে, রবীন্দ্রনাথ, মানবের অতলান্ত হৃদয়ানুভূতিকে সকল নান্দনিক উপকরণের আশ্রয়ে গ্রথিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবুও তাঁদের সৃষ্টি ত্রিশের ঔপন্যাসিকদের লেখনীকে আধুনিক মানুষের যাপিত জীবনের আলো-অন্ধকারের রূপায়ণে বিশেষ প্রেরণা জুগিয়েছিল। সুতরাং বঙ্কিমচন্দ্র এবং রবীন্দ্রনাথের উপমা চিত্রকল্প ও প্রতীক তাই কালিক-শক্তিতেই ঋদ্ধ নয়, কালাতিক্রমণের সামর্থ্যেও চির-উজ্জ্বল।

Leave a Comment