Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণ ১

বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণ ১

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণ ১। যা বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ এর অন্তর্গত।

 

 

বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণ ১

উপন্যাসে বিন্যস্ত জীবন নির্দিষ্ট আর্থ-সামাজিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে বহমান। শ্রেণী বিভক্ত ও শোষণমূলক সমাজে আর্থ-উৎপাদন কাঠামোর নেতিবাচক রূপ মানুষকে করে দেয় উন্মলিত, নিরস্তিত্ব। এই নির্মম বাস্তবতা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে মানুষ ‘শ্রেণী চেতনা’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে অস্তিত্ববান হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায়। অগ্রসর হয়। ‘শ্রেণী চেতনা’ বিষয়টি মূলত অস্তিত্বের সংকট মোকবেলা, মানবিক মুক্তি ও নবতর জীবন প্রত্যয় অর্জনের লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়।

লক্ষ করলে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী প্রগতি আন্দোলন থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বিপর্যয়, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগ, ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ‘৬৯-এর গণ অভ্যুত্থান, ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ক্ষুধা, দারিদ্রা, শোষণ, নির্যাতন, যুদ্ধ, হত্যা, প্রভৃতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে যে সংকট, অস্থিরতা তা থেকে উত্তরণের প্রয়াসের মধ্যেই বাঙালি জাতিসত্তার শ্রেণী চেতনার পরিচয় প্রকাশিত।

তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য উপনিবেশ-শৃঙ্খলিত রাষ্ট্র অপেক্ষা পাকিস্তান-শাসিত বাংলাদেশের আর্থ-উৎপাদন কাঠামো ও জন-জীবনের রূপ ছিলো স্বতন্ত্র ধারায় বহমান। ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক বিকাশসূত্রে যে গুণগত পরিবর্তন বিভাগ পরবর্তী বাংলাদেশে প্রত্যাশিত ছিল, বাঙালি জীবনে তার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বাধাগ্রস্ত।

দাঙ্গা, মহামারী, দারিদ্রা, উদ্বাস্তু সমস্যা, নিপীড়ন, সংস্কৃতি বিলোপের চেষ্টা প্রভৃতি বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে নিক্ষেপ করেছিল এক গভীর সংকটাবর্তে। এ সংকট ছিল মূলত অস্তিত্বের সংকট। তাই রাষ্ট্র ও সমাজিক বিন্যাসের নতুন রূপ ও নবতর জিজ্ঞাসায় বিভাগোত্তর বাংলাদেশের বিষয় উৎসও হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র। কারণ সময়, সমাজ ও জীবনের অন্তঃসারকে আত্মস্থ করেই একজন ঔপন্যাসিক নির্মাণ করেন। তাঁর উপনাসের বিষয়। “চৈতন্যের প্রগতি এবং রাষ্ট্রীয় বিন্যাসের অধঃগতির দ্বন্দ্ব সংঘাতে সংবেদনশীল শিল্পীকে হতে হয় এক রক্তাক্ত জিজ্ঞাসার সম্মুখীণ।

নগরায়ণ ও শিল্পায়নের বিলম্বিত, মন্থর বিকাশে তখন বৃহত্তর গ্রামীণ জীবন হয়ে পড়ে ঔপন্যাসিকদের মুখ্য উপকরণ উৎস। যে গ্রাম যুদ্ধ, দাঙ্গা, মহামারী, সামন্তশোষণ, ধর্মশোষণ, স্বাধিকারহীন ‘স্বাধীনতা’র নির্মম অভিজ্ঞতায় ও দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে প্রতিনিয়ত অস্তিত্বের অগ্নিবলয়ের মুখোমুখি, সেই গ্রামীণ জীবনের সংঘাত ও শ্রেণী চেতনা আশ্রয়ী অস্তিত্ব অভীক্ষাকে তাঁরা উপন্যাসের বিষয় হিসাবে গ্রহণ করেন।”

আমাদের উপন্যাসে অঙ্কিত গ্রামজীবনের ছিন্নমূল, উন্মলিত মানুষ শুধুমাত্র জীবনযুদ্ধে বাঁচার তাগিদে নগরে আশ্রয় গ্রহণ করে। আর সেই সূত্রে তারা শহরের শ্রমজীবী মানুষের ভিড়ে নিজেদের ঠাঁই করে নেয়। উক্ত সংঘানী শ্রেণী অস্তিত্বের নগরবাসের ক্লেদ, হতাশা, শোষণ ও জীবনমানের বৈপরীত্যের ছবি তুলে ধরতে যেয়ে বিভাগোত্তর কালের ঔপন্যাসিকরা নব্য পুঁজিপতি, শোষণবাদ ও আধিপত্যবাদী বাণিজ্যিক নাগরিক জীবন ও সভ্যতাকে তাদের উপন্যাস শিল্পে রূপায়িত করেছেন।

এভাবেই মূলত গ্রামজীবন নির্ভর হয়ে অর্থাৎ গ্রামীণ জীবনের অনুষঙ্গেই বাংলাদেশের উপন্যাসে নগরজীবনের শ্রেণীগত বাস্তবতা ও শ্রেণী চেতনা রূপায়িত হয়েছে।

শওকত ওসমানের উপন্যাসে বাংলার গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র অভাবগ্রস্ত কৃষিজীবী পরিবার, সরদার জয়েন উদ্দীনের কৃষিজীবী পারিবারিক চিত্র এবং তাতে অসহায় নারীর অবস্থান; শহীদুল্লা কায়সারের কৃষিভিত্তিক গ্রামবাংলার ব্যাপক চিত্র ও গ্রামত্যাগী অভাবগ্রস্ত-জীবিকান্বেষী মানুষ, শামসুদ্দীন আবুল কালামের উপন্যাসে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও নতুন সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন এবং আবু ইসহাকের উপন্যাসের নিঃস্ব গ্রামীণ মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম প্রভৃতি বাংলাদেশের উপন্যাসের সূচনাকালে একটি সমাজ ও শ্রেণীসচেতন ধারা নির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা যায়।

 

 

সত্যেন সেন (১৯০৭-১৯৮১)

সময়, সমাজ ও রাজনীতির সুগভীর অঙ্গীকার থেকে সত্যেন সেন (১৯০৭-১৯৮১) উপন্যাস রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। শ্রেণীশোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার বৈপ্লবিক অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের উপন্যাসের বিষয়ভাবনায় তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেন।

রুশ বিপ্লবের উত্তরাধিকার ও মার্কসীয় তত্ত্বের আলোকে জাতীয় ও মানব পরিস্থিতির মূল্যায়ন এবং একটি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার নিগূঢ় আকাঙ্ক্ষার রূপায়ণে তিরিশ-চল্লিশের দশকের সচেতন ঔপন্যসিকেরা যে জীবনবোধের কেন্দ্রে লেখনী ধারণ করেন বাংলা উপন্যাসে সে গণচেতনা ও মার্কসীয় জীবনজিজ্ঞাসা বিভাগ পরবর্তীকালে সত্যেন সেনের হাতে এক নিরীক্ষা প্রবণ, নির্দ্বন্দ্ব স্বাতন্ত্র্য মাত্রা অর্জনে সক্ষম হয়। ধর্ম শোষণ, জাতি শোষণ ও শ্রেণী শোষণের ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত জাতিসত্তার অঙ্গীকার তাঁর উপন্যাসের বিষয় ভাবনায় অভিব্যক্ত হয়েছে।

বামপন্থী রাজনীতি সচেতন সাহিত্যকর্মী সত্যেন সেনের ১৫টি উপন্যাসের মধ্যে সবগুলোতেই কমবেশি শ্রেণী চেতনার প্রতিফলন রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হল: উত্তরণ, পদচিহ্ন, সাত নম্বর ওয়ার্ড, মা, সেয়ানা, অভিশপ্ত নগরী, পাপের সন্তান, কুমারজীব ও বিদ্রোহী কৈবর্ত ।

সত্যেন সেনের ‘পদচিহ্ন’ (১৩৭৫) উপন্যাস আত্মজৈবনিক ঘটনার প্রতিফলনজাত হলেও একটা বিশেষ কালের সমাজবাস্তবতা ও শ্রেণী চেতনার পরিচয় এতে প্রকাশিত। ‘পদচিহ্ন’ উপন্যাসে বিধৃত গ্রাম তিরিশ বা চল্লিশের দশকের গ্রাম নয়, বিভাগোত্তর কালের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকটের আবর্তে ক্ষতবিক্ষত গ্রাম।

বাংলা উপন্যাসে হিন্দু-মুসলিম সমস্যার চিত্রায়ণ বিভাগ-পূর্বকালে রচিত একাধিক উপন্যাসে বিন্যস্ত হয়েছে। কিন্তু বিভাগোত্তর কালের পাকিস্তানশাসিত বাংলাদেশে এই সমস্যার স্বরূপ ছিল স্বতন্ত্র। সত্যেন সেনের নির্মোহ সমাজ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলনে হিন্দু-মুসলিম উভয় শ্রেণী সংকট এ-উপন্যাসে যথার্থ স্বরূপ নিয়ে অভিব্যক্ত হয়েছে। জীবনের বহির্গত রূপ-বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের অন্তর্জীবনে যে পরিবর্তন ও সংকট অনিবার্য হয়ে ওঠে, ‘পদচিহ্ন’ উপন্যাসে লেখক তার রূপায়ণে অনেকাংশে সক্ষম হয়েছেন বলা চলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষারত দুই বন্ধু সুবিনয় ও আনিস। এঁদের বন্ধুত্ব কেবল মানবিক সম্পর্ক সূত্রেই নয়, প্রগতিশীল জীবনবোধ ও রাজনৈতিক মতাদর্শের অভিন্নতায় সে বন্ধুত্ব গভীর ও মেধানিয়ন্ত্রিত। অবশ্য লেখক সুস্পষ্টভাবে এই আদর্শবোধের প্রসঙ্গ উত্থাপন না করলেও, উপন্যাসে বিধৃত এঁদের আচরণ ও কর্মধারা থেকে তা-ই প্রমাণিত হয়।

কাহিনী অনুসারে নাগরিক জীবনে লালিত-বর্ধিত আনিস সুবিনয়ের গ্রামের বাড়ি যেতে ইচ্ছুক। তার এই আকাঙ্ক্ষার কারণ বৃহত্তর গ্রামজীবনকে প্রত্যক্ষভাবে অবলোকন করা। সুবিনয়ের নিজ গ্রাম শ্রীপুর ও তার পরিপার্শ্ব এ-উপন্যাসের পটভূমি।

শ্রীপুর গ্রামের পার্শ্ববর্তী জামালপুরের হাট, তার জনস্রোত; ঘাসির পুকুরপার গ্রাম ও তার অন্তবর্তী বিভিন্ন প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র উপস্থাপনের মাধ্যমে ‘পদচিহ্ন’ উপন্যাসের কাহিনী সুবিস্তৃত ও অধিকতর সমাজ- বাস্তবতাসংলগ্ন হয়েছে। শ্রীপুর যেমন ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু সমাজের সঙ্কট ও অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি, তেমনি জামালপুর বা ঘাসির পুকুরপার নব্যপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের অন্তর্গত মুসলিম জনশ্রেণীর সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতাকে ধারণ করে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের বিচিত্রমাত্রিক স্বরূপ সাত্তার-কাশেম প্রভৃতি চরিত্রের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয়েছে। সাত্তার যেমন আধুনিক শিক্ষা ও চিন্তা-চেতনাসমৃদ্ধ প্রগতিশীল মুসলিম তারুণ্যের প্রতীক, তেমনি কাশেম নবগঠিত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নেতিবাচক প্রবণতাজাত অস্বাভাবিক ও বিকৃতভাবে বেড়ে ওঠা সঙ্কীর্ণচিত্ত সুবিধাভোগী মুসলিম জনশ্রেণীর প্রতিনিধি। লেখক উপন্যাসে সমান্তরালভাবে দুটি শ্রেণীমানসকে বিন্যস্ত করেছেন।

মরণ কৈবর্তদাসের মাধ্যমে অন্ত্যজশ্রেণীর হিন্দুর জীবনসমগ্রতা হয়ে উঠেছে প্রত্যক্ষগোচর। একদিকে সমাজ-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যলালিত সংস্কার, অন্যদিকে অধীত জ্ঞান ও মানব প্রগতির সঙ্গে সম্পৃক্তি -দুটোর প্রভাবই ব্যক্তিমানুষের জীবনে অনিবার্য।

মরণ কৈবর্তদাস যখন পাকিস্তান, মুসলমান প্রভৃতি প্রসঙ্গে মনোভাব-অভিযোগ ব্যক্ত করে চলেছে, তখনই সুবিনয়ের প্রগতিশীল মানসগড়নের গভীরতর উৎস থেকে হিন্দুসংস্কার আকস্মিকভাবে হলেও মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। চরিত্রনিহিত এই শ্রেণীদ্বন্দ্বের স্বরূপ উদঘাটনে সত্যেন সেন সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন

“নিজের দেশ। মরণ ঠোঁঠ উলটে বলল, কি যে আপনি বলেন, আমি এর মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারি না। সমস্ত মানুষ এক কথা বলে, আর আপনার মুখে ঠিক তার উলটো কথা। এদেশ কি এখনো আমাদের আছে? সে যখন ছিল, তখন ছিল ।
চমকে উঠল সুবিনয়। যেই কথাটা সে এড়াতে চাইছিল, সেইটাই আবার কেমন করে ফিরে ফিরে আসছে। তার মনে মনে আফসোস হচ্ছিল, কেন সে প্রথমেই আনিসের পরিচয় দিয়ে দেয়নি।২.

সুবিনয়ের এই মানসিকতা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি আনিসের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া অন্যতর মনোভাবের জন্ম দিতে বাধ্য। আনিস সুবিনয়ের কথোপকথনে এ সত্যটাই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সুবিনয়ের চরিত্রের অভ্যন্তরস্থ দ্বন্দ্বকে অসঙ্গত মনে হয় না। উভয়ের কথোপকথনে যে স্বরূপ সত্য প্রকাশ পেয়েছে তা সমসাময়িক জীবনে শ্রেণীগত বাস্তবতার পরিচয় দেয়। ব্যক্তির মধ্য দিয়ে সমষ্টিগত জীবনের অন্তর্নিহিত সত্যই যেন অভিব্যক্ত হয়েছে। যেমন নিম্নোক্ত এই অংশটি –

“মরণ চলে গেল। রইল বাকি আনিস আর সুবিনয়। মরণের সঙ্গে দেখা হবার আগ পর্যন্ত শ্রীপুরের ইতিকথা নিয়ে দুজনে মুখর হয়ে উঠেছিল। এই নির্জন রিক্ত গ্রামের বুকে কত কথাই যে লুকিয়ে আছে সুবিনয় নিজেও অতটা ভেবে দেখে নি। বোবা শ্রীপুর যেন তারই কন্ঠস্বরের মধ্য দিয়ে তার হারিয়ে যাওয়া কাহিনীগুলো প্রকাশ করে চলেছিল। হঠাৎ এর মাঝখানে মরণ এসে কি এক ঘূর্ণি জাগিয়ে তুলল। বদলে গেল আবহাওয়াটা, বদলে গেল মানুষ দুটি। ওরা দু’জন কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দ হয়ে রইল।

 

 

হঠাৎ হেসে উঠল আনিস। সুবিনয় স্বপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকাল-

তোমার সঙ্গে গ্রাম দেখতে এসেছিলাম সুবিনয় । গ্রাম মানে প্রাকৃতিক গ্রাম নয় তার চেয়েও বেশি গ্রামের মানুষ। আমি শহরের ছেলে, আমি আমার স্বদেশের অন্তরাত্মার সঙ্গে পরিচিত হতে এসেছিলাম। আমার স্বদেশের প্রাণ গ্রামের মধ্যে, শহরে নয়, একথা অনেকবার তুমি আমায় বলেছ। এ কথা আমিও বুঝি। আর যেই মাত্র গ্রামের বুকে এসে পড়েছি, সে কথা আরো ভালোভাবে বুঝতে পারছি। তুমি আমাকে দেখাতে নিয়ে এসে, এখন সেই তুমিও আমার চোখের সামনে এমন করে পর্দা টেনে দিতে চাইছ কেন? যা সত্য, কেন তুমি তাকে আড়াল করে রাখতে চাইছ?

তার মানে? এসব বলছ কি তুমি? আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করল সুবিনয়। ঠিকই বলছি। মরণদাকে তুমি তার মনের কথাগুলি প্রকাশ করতে দিলে না। যেই মাত্র তার চাপা দেওয়া কথাগুলো বেরিয়ে পড়ল, অমনি কি এক ভারন্ত ও চঞ্চল হয়ে উঠলে তুমি!”

সুবিনয়ের অন্তরালে যে অবশিষ্ট হিন্দুমন’ প্রচ্ছন্ন হয়েছিল, আনিসের উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তার সারসত্যকেই কেবল তুলে ধরলেন না লেখক, শ্রেণীদ্বন্দ্বের একটা সমাধানপ্রবণ দৃষ্টিভঙ্গিকেও উপস্থাপন করলেন।

সুবিনয়ের বোন আরতির যে সঙ্কট তা ঠিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, সামাজিক শ্রেণীগত সঙ্কটেরই একটি গভীরতর রক্তক্ষত স্তর। তার শিক্ষা-দীক্ষা-অভিরুচির সঙ্গে বর্তমান পারিপার্শ্বিকতার অসামঞ্জস্য এই রক্তক্ষরণকে করেছে তীব্রতর। আরতি চরিত্রের মধ্য দিয়ে বিভাগ পরবর্তী বাংলাদেশের নারীর শ্রেণীগত অবস্থান ও চেতনাগত পরিচয়ও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ঘাসির পুকুরপার গ্রামের জীবন বিন্যাস শ্রীপুর থেকে স্বতন্ত্র। মুসলমান অধ্যুষিত এই গ্রামের বহির্বাস্তবতা ও অন্তর্বাস্তবতা অন্ধনে লেখকের অভিজ্ঞতার বিস্তার ও সূক্ষ্মতা গভীরতাস্পর্শী। দুইটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায়ের সমান্তরাল উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সত্যেন সেনের অনাসক্ত নির্মোহ জীবনদৃষ্টি বিস্ময়কর।

স্বদেশবিতাড়িত পশ্চিম বঙ্গীয় মুসলমান খুরশেদ আলমের মধ্য দিয়ে সমাজ-ইতিহাসের আরেকটি রক্তক্ষত দীর্ঘশ্বাস মূর্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর ব্যক্তিক ও পারিবারিক জীবনের সীমাহীন সঙ্কট ও ভাঙা-গড়ার ইতিবৃত্তের সঙ্গে সমান্ত রালভাবে উপস্থাপিত হয়েছে আশ্রয়দাতা নির্মল রায় ও তার পারিবারিক পরিচিতি।

একটা অসঙ্গত রাজনৈতিক বিভাজনের মর্মন্তদ প্রতিক্রিয়া কীভাবে মানুষকে স্ব-ভূমি ও আশৈশব লালিত প্রকৃতিজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, খুরশেদ আলম এবং রায় বাবুদের জীবনকথায় তাই অভিব্যক্ত হয়েছে। নিজের স্মৃতিচ্ছিন্ন অতীত জীবন স্মৃতিবিজড়িত রায়বাড়ির সমগ্রতা সমাজ-বাস্তবতার এক বেদনাঘন অধ্যায়।

বহু পুরুষের শ্রম ও সাধনায় নির্মিত ঐতিহ্যময় পারিবারিক জীবন কীভাবে একটা অসঙ্গত রাজনৈতিক মীমাংসার ফলে অবক্ষয়গ্রস্ত হয়ে পড়ে, খুরশেদ আলম বা রায় বাবুদের বিপর্যন্ত সংসারের মধ্য দিয়ে সে সত্যকেই উন্মোচন করেছেন লেখক। খুরশেদ আলমের বর্ণনায় সেই গার্হস্থ্য জীবনসত্য ও সেই জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মর্যদ্ভদ চিত্র প্রতিবিম্বিত ।

কলকাতার দাঙ্গা, বিভাগোত্তর কালের সামাজিক- সাংস্কৃতিক অবক্ষয়, স্বদেশত্যাগী মানুষের বিপন্ন অর্থনৈতিক-পারিবারিক জীবন প্রভৃতি প্রসঙ্গ খুরশেদ আলমের জীবনকথায় একটি সময়কালের জীবনচিত্র শ্রেণীসচেতন সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে উপস্থাপন করেছেন লেখক ।

সমাজদ্বন্দ্ব ও শ্রেণীদ্বন্দ্বপীড়িত জনজীবনের মধ্য থেকে যারা নতুন সম্ভাবনার লক্ষ্যে উজ্জীবিত, সেই বিকাশমান শ্রেণীর প্রতিনিধি আনিস, সুবিনয়, সাত্তার। হিন্দু বা মুসলমান নয়- একটা স্বতন্ত্র পরিচয়ে তারা উজ্জ্বল। সেই দ্বন্দ্বময় অথচ দ্বন্দ্বোত্তীর্ণ হবার সম্ভাবনায় জাগ্রত শ্রেণীচরিত্রের স্বরূপ আনিসের উক্তিতে প্রকাশ পেয়েছে

“—– আসল কথা কি জান, সুবিনয় হিন্দু আর আমি মুসলমান হলেও আমরা দু’জন অপর জাতের অন্তর্ভুক্ত। সেই জাতের নাম নিম্নমধ্যবিত্ত।

—–সাত্তার সকৌতুকে প্রশ্ন করল আর আমি? আমাকে কোন জাতের মধ্যে ফেলেছেন?

ফেলবার মালিক কি আর আমি? আনিস উত্তর দিল, পরিবেশ আর বৃত্তি ঠেলে নিয়ে চলেছে এ- জাত থেকে ও জাতে এ পংক্তি থেকে ও পংক্তিতে। তুমিও নিম্ন মধ্যবিত্তের দিকে পা বাড়িয়েছ।

কিন্তু এখনো তোমার গায়ে মুসলমান কৃষকের গন্ধ লেগে রয়েছে। —এই যে, আমি, সুবিনয় এবং আমাদের মত কেউ কেউ, এরা হচ্ছে নিম্ন মধ্যবিত্তের মধ্যে প্রগতিশীল নামক অংশ। আমরা আমাদের উপরতলার লোকদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রকাশ করি। আর আমাদের নিচে যারা আছে তাদের সাথে একাত্মতা অনুভব করতে চাই। কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রেই এই একাত্মতার জন্ম মস্তিষ্কে, তার শিকড় হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।

এই বিশ্লেষণ যে লেখকের সমাজ অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান-উৎসারিত, তা বলাই বাহুল্য। সুবিনয়ের আত্ম- বিশ্লেষণের মধ্যেই শ্রেণীদ্বন্দ্বের ইতিবাচক স্বরূপসত্য বিধৃত।

 

 

মদন ঢালী ও তার পারিপার্শ্বিক জীবন বর্ণনায় লেখক সমাজের অন্যতর স্বরূপ নির্দেশ করেছেন। যেখানে মানুষ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায় ছাড়াও অন্য একটি শ্রেণীর অন্তর্গত যা কেবলই নির্ধারিত হয় অর্থনৈতিক অবস্থানের দ্বারা। রফিকের মধ্য দিয়ে গ্রামজীবনের প্রতি যে বিতৃষ্ণা প্রকাশ পেয়েছে তা মূলত স্ব-সমাজের অস্বাভাবিক ও স্ফীতোদর সুবিধাভোগী শ্রেণীকে কেন্দ্র করেই। যাদের শ্রেণীচরিত্র ঠিক সাম্প্রদায়িকতার পর্যায়ভুক্ত নয়, তার চেয়েও মারাত্মক।

“ওয়াহেদ মল্লিক এতদিন হিন্দুদের সম্পত্তি ছলে বলে কৌশলে আত্মসাৎ করেছে আর আমাদের মুসলমান ভাইদের কেউ কেউ তার দালালি করেছে। —- —-কিন্তু ওয়াহেদ মোল্লা এসব ব্যাপারে সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক। হিন্দু আর মুসলমান খাদ্যাখাদ্যের বিচার নেই তার। হিন্দু ভাইদের সম্পর্কে যা করণীয় তা শেষ করে এখন মুসলমান ভাইদের পেছনে লেগেছে।৫

রফিকের উক্তিতে কৌতুকের মধ্য দিয়ে হলেও এখানে মুৎসুদ্দী বুর্জোয়া শ্রেণীর স্বরূপ সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এভাবেই ‘পদচিহ্ন’ উপন্যাসে বিভাগোত্তর একটি বিশেষ সময়কালের বাংলাদেশের শ্রেণী অস্তিত্ব, আত্মিক দ্বন্দ্ব ও শ্রেণী-চেতনার পরিচয় আনিসের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ, শ্রুতকাহিনীমালা- যামিনী মিত্র, সুবিনয়, আরবালি হাওলাদার, কুদ্দুস মিঞা, খুরশেদ আলম বর্ণিত অতীত-বর্তমান এবং সর্বোপরি লেখকের সর্বজ্ঞ দৃষ্টির অনাসক্ত প্রয়োগে বিন্যস্ত হয়েছে।

‘পদচিহ্ন’ উপন্যাসে স্পষ্ট করে সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদের প্রসঙ্গ উত্থাপিত না হলেও উপন্যাসের দুই প্রধান চরিত্র আনিস ও সুবিনয় দেশের অর্থনৈতিক অসাম্য ঘোচানোর জন্য শ্রেণীসচেতন দৃষ্টিকোণে সমাজতন্ত্রের পথকেই হিন্দু মুসলমান সকলের জীবনের সার্বিক মুক্তির পথ হিসেবে দেখতে পেয়েছে।

বলা যায়, ‘পদচিহ্ন’ উপন্যাসে প্রগতিশীল চেতনার আলোকে বিন্যস্ত জীবন লেখকের সর্বজ্ঞ দৃষ্টির অনাসক্ত প্রয়োগে এভাবেই শ্রেণী চেতনার পরিচয় সমর্থতা লাভ করেছে।

‘পদচিহ্ন’-এর পরে সেয়ানা (১৩৭৫), সাত নম্বর ওয়ার্ড (১৯৬৯), উত্তরণ (১৯৭০), মা (১৯৭০), একুল ভাঙ্গে ওকূল গড়ে (১৯৭১) উপন্যাসগুলো উল্লেখযোগ্য। উক্ত উপন্যাসগুলোতে কারাগার থেকে শুরু করে। গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের জীবন সমগ্রতা এমনকি, নীতি আইনের মানদণ্ডে অবজ্ঞাত ঘূর্ণিত ব্যক্তির কর্মকাণ্ড পর্যন্ত যে সমাজবাস্তবতার অনিবার্য সত্য সেই সমাজকেই সত্যেন সেন গভীর অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে অবলোকন করেছেন ।

সামাজিক উত্থান পতনের মধ্যে ব্যক্তিক ও সামূহিক অস্তিত্বের যে সঙ্কট, সেই সঙ্কট এবং তা থেকে উত্তরণের মানবীয় সাধনা তথা শ্রেণী চেতনার পরিচয় এসব উপন্যাসে সুস্পষ্ট। রাজনীতি ছিল সত্যেন সেনের জীবন ও শিল্পবোধের কেন্দ্রীয় প্রেরণা। সত্যেন সেনের পনেরটি উপন্যাসের মধ্যে তিনটি উপন্যাসের মুখ্য উপাদান রাজনীতি। উপন্যাস তিনটি হচ্ছে- ১. উত্তরণ, ২. সাত নম্বর ওয়ার্ড, ৩. “মা”। এই তিনটি উপন্যাসেই শ্রেণী চেতনা প্রাসঙ্গিকভাবে চিত্রিত হয়েছে।

রাজনৈতিক কর্মীসত্তার দায়িত্বজ্ঞান থেকে সাহিত্য সাধনাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করার ফলেই সত্যেন সেনের উপন্যাসে জীবন ও রাজনীতি তুল্যমূল্য হিসেবে প্রতিবিম্বিত।” বিভাগ পরবর্তী গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক কাঠামো বিন্যন্ত ষাটের দশকের সামরিক শাসন কবলিত বাংলাদেশের জনগণের সামাজিক, রাজনৈতিক অধিকারহীনতা যে মানবিক বিকাশের বহুবর্ণিল প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করে, শ্রেণী সচেতন দৃষ্টিতে তা সুস্পষ্ট উপলব্ধি করেছিলেন তিনি। এ কারণে সত্যেন সেনের রাজনীতি আশ্রয়ী উপন্যাসসমূহে প্রসঙ্গতই শ্রেণী চেতনার উজ্জ্বল উপস্থিতি বিদ্যমান।

সত্যেন সেনের অপর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘উত্তরণ’ (১৯৭০) -এ মধ্যবিত্তের চেয়ে শ্রমিক-কৃষক চরিত্রের জীবনসংগ্রাম তথা শ্রেণীসংগ্রাম প্রাধান্য পেয়েছে। আর এ গ্রন্থের মধ্য দিয়ে চরিত্রের সবাই শ্ৰেণীত্যাগী হয়ে স্বদেশবাসী শ্রমজীবী মানুষের তথা মানবমুক্তির লড়াইয়ে প্রত্যক্ষ অংশ নেয়নি সত্য, তবু তারাও প্রায় সবাই শ্রেণীসংগ্রামের কর্মীদেরকে উৎসাহিত করেছে। সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়াতে গিয়ে বিপদগ্রস্ত হয়েছে। ‘উত্তরণ’ উপন্যাসের রহমান, কয়েজ, হারুন ও মাসুদ প্রমুখ শ্রেণীত্যাগী মধ্যবিত্ত তারই দৃষ্টান্ত।

‘উত্তরণ’-এর পটভূমি দেশ বিভাগের আগের কলকাতা ও ঢাকার নাগরিক পরিবেশ। দু’টি দেশের ব্যবসায় শিল্পাঞ্চল এবং গ্রামীণ বাস্তব প্রতিবেশ স্থান পেয়েছে। বিত্তবান, মধ্যবিত্ত ও বিত্তহীনদের শ্রেণীগত দ্বন্দ্বের সত্যও এতে পরিস্ফুট। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রসঙ্গ বেশি গুরুত্ব না পেলেও দেখতে পাই, আলোচ্য উপন্যাসে শ্রমিক মজুরদের রাজনীতিতে সক্রিয় কর্মীদের সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গী প্রতিষ্ঠায় লেখক সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছেন।

তাই এ উপন্যাসে সম্প্রদায় নারী-পুরুষ ও শ্রেণী নির্বিশেষে সমাগত নায়ক মালেক, নায়িকা জুলেখা, রহমান, ফয়েজ, হারুন, ইয়াসীন, লতিফ, মাসুদ, দিল মোহাম্মদ, ফজলু মিয়া, ফরিদা, মনোজ আতর্থী, সিদ্দিক প্রমুখ সংগ্রামী পতাকা হাতে সম্মিলিত সংগ্রামে অবতীর্ণ। এদের বিরুদ্ধ পক্ষে অবস্থান নিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী সরকারের অনুগ্রহপুষ্ট কারখানা মালিক ছাড়াও ম্যানেজার গগন চৌধুরী, কন্ট্রাক্টর সুরুজ মিঞা, কদম সারেং এবং তাদেরই সহযোগী ডাঃ নুরুল ইসলাম প্রমুখ।

তাই শ্রেণীসংগ্রাম যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে এ উপন্যাসে। বন্ধন মুক্তির বিপ্লবী সংগ্রামে জুলেখা ফরিদার মতো পোড় খাওয়া নারীরাও পুরুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সমান শক্তি না হলেও সমান সাহস নিয়ে। এমনি প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গীর রূপায়ণে ‘উত্তরণ’ উপন্যাস বিশিষ্ট ।

এ গ্রন্থে শ্রেণীচেতনা বিষয়টি আমাদের বিস্তৃতকালের জীবনধারার সামগ্রিক সত্যরূপে নিম্নবিত্ত যুবক মালেকের জীবনসংগ্রামের সূত্রে রূপায়িত হয়ে উঠেছে। বাঙালির জাতীয় জীবনে রাজনীতির সূত্রপাত কৃষক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে, সমাজ বিকাশ ও তার আধুনিক শিল্পায়নের প্রক্রিয়ার সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনের উদ্ভবের প্রসঙ্গ জড়িত।

এই সচেতনবোধ থেকে সত্যেন সেন ‘উত্তরণ’ উপন্যাসে রহমান চরিত্রের অবতারণা করেছেন। নিম্নবিত্ত কৃষকের সন্তান রহমান কিভাবে কৃষক আন্দোলনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জীবন ও জীবিকার আকর্ষণে শ্রমিকে রূপান্তরিত হয়েছে এবং শ্রমজীবী মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে নিজ জীবনধারার সঙ্গে অভিন্ন করে ফেলেছে, তার পরিচয় আমরা দেখি ।

প্রকৃতপক্ষে আলোচ্য উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জাহাজের কর্মচারী মালেকের মানস বিকাশে ও আত্ম- আবিষ্কারের পথ-পরিক্রমায় এই রহমান চরিত্রটির ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মালেকের অন্তর্লোকে সমষ্টি চেতনার সূত্রপাত ঘটে শ্রেণী সচেতন রহমানের অনুভবলব্ধ উচ্চারণ থেকে “আমি তো মনে করি, আপনিও আমাদের এই হতভাগাদের মতোই একজন। কিন্তু তবু আমি একটা প্রশ্ন করতে চাই আপনাকে, এখানে যারা আমাদের দিন-রাত্রির সুখ-দুঃখের সাক্ষী, তাদের কারু সম্পর্কে কোনদিন কোন খোঁজ নিয়েছেন? কে কেমন আছে, কার দিন কিভাবে চলছে? এই কথাটুকু জানতে চেয়েছেন কোনদিন।”

তখন থেকেই অধিকার বিড়ম্বিত জাহাজী শ্রমিকদের কর্মধারা ও জীবন-প্রক্রিয়া সম্পর্কে সারেং সাহেবের ভাগ্নে মালেক গভীর আত্মদ্বন্দ্বে নিক্ষিপ্ত হয়। তার দ্বন্দ্ব ও আত্মানুসন্ধান ব্যক্তিক স্তরকে অতিক্রম করে শ্রমজীবী মানুষের সামগ্রিক অনুভবে পরিণতি লাভ করে।

সেভাবে, যদি সে ব্যক্তিস্বার্থকে চূড়ান্ত বলে গণ্য করে, তাহলে হয়ত শ্রেণী অবস্থানের রূপান্তর সাধন করে একসময় সে খালাসিতে উত্তীর্ণ হয়ে শোষকের পদে অধিষ্ঠিত হবে। মালেকের এমনি রকম উপলব্ধির মধ্যে একদিন দেখা যায় শ্রমিকদের অধিকারবোধ এবং প্রতিবাদের শাস্তিস্বরূপ রহমান ও আলমের আকস্মিক চাকরিচ্যুতি ঘটে।

রহমান ও আলমের আকস্মিক চাকরিচ্যুতি ও জোরপূর্বক নির্জন চরে তাদের নামিয়ে দেয়ার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করে মালেক জাহাজের চাকরি ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়। মালেকের এ আত্মসমীক্ষা উত্তরণমুখী শ্রেণী চেতনার পরিচয় বহন করে-

লোকে বলে মানুষ অবস্থার দাস, কি জানি, দেখতে দেখতে এ সমস্ত হয়ত একদিন আমার গা সওয়া হয়ে যাবে। তারপর আমাদের আর একজন টালি-সুকানী জলিল সাহেবের মত আমিও এই মাল চুরির কাজে শরীক হয়ে যাব। মামা ভরসা দিয়েছে, বছর কয়েক বাদেই আমাকে কোন একটা ফ্লাটের সাড়েং বানিয়ে দেবে। অসম্ভব নয়, উপরওয়ালের কাছে মামার সুপারিশের জোর আছে। তখন আমিও মামার মতই গরিব খালাসীদের রক্ত শুষে মোটা হয়ে চলব।

 

 

মায়ের উদ্দেশে উচ্চারিত মালেকের এই উক্তিতে তার শ্রেণীসচেতন দৃষ্টিভঙ্গীরই পরিচয় প্রতিফলিত।উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্বে মালেকের দীর্ঘায়িত, জটিল এবং কঠোর সংগ্রামময় জীবনের স্বরূপ রূপায়িত হয়েছে। জাহাজের চাকরি ছাড়ার পর কলকাতায় কৃষ্ণা কেমিক্যাল ওয়ার্কস-এ মালেকের চাকরি প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে সূচিত হয় তার জীবনের নতুন অধ্যায়। ঠিক শ্রমিক হিসেবে নয়, শ’খানেক শ্রমিকের সুপারভাইজার হিসেবে। কিন্তু মালেকের এই চাকরি জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

ভারত উপমহাদেশে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভেদ-বুদ্ধিতাড়িত শাসন-শোষণের প্রতিক্রিয়ায় ১৯৪৬-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৪৭-এর ভারত বিভক্তির ফলে দাঙ্গা, পাকিস্তান আন্দোলন, মুসলমান হিসেবে মালেকের দ্বন্দ্ব জীর্ণ পাকিস্তান সমর্থন প্রভৃতির উন্মোচন প্রসঙ্গে সত্যেন সেন সমকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থার একটা সামগ্রিক চিত্র অংকন করেছেন। এরই বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা যেমন-

“দাঙ্গা থেমে গেছে সত্য, কিন্তু মানুষের মনে বিদ্বেষের আগুন ধুইয়ে ধুইয়ে কলুসিত ও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। এখানে এখন মানুষ বলে কোন প্রাণী নেই, আছে একদল হিন্দু আর একদল মুসলমান ধর্মের পারে, সাম্প্রদায়িকতার পায়ে এরা মানুষ্যত্বকে বিসর্জন দিয়েছে। কাজে এবং চিন্তার কে কতদূর বর্বর হতে পারে, দু’দলের মধ্যে তাই নিয়ে চলছে প্রতিযোগিতা।”

যে দাঙ্গা সাম্প্রদায়িকতা মানুষের মনুষ্যত্ববোধকে তিলে তিলে দগ্ধ করেছে, তারই অনিবার্য প্রতিক্রিয়ায় কৃষ্ণা কেমিক্যাল ওয়ার্কস থেকে মালেকের চাকরি চলে যায়।

“চলে এল মালেক। তার সহকর্মী হিন্দু ভাইরা উদাসীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কেউ কোন কথা বলল না। সে যে মুসলমান, মালেক তার জীবনে এ কথাটা আর কখনো এমন প্রবলভাবে অনুভব করেনি। আবার পথে ভাসল মালেক।

এরপর নারায়ণগঞ্জ জুট কোম্পানিতে চাকরি গ্রহণের মধ্যদিয়ে সূচিত হয় মালেকের জীবনের পরিবর্তিত নতুন অধ্যায়, উপন্যাসের তৃতীয় পর্ব। পার্ট কোম্পানির চাকরির অভিজ্ঞতা সূত্রে মালেক বুঝতে সক্ষম হয় শোষক ও শোষিতের সত্যিকার ব্যবধান সীমাকে। বুর্জোয়া শোষনের মুনাফাকেন্দ্রিক প্রশাসন প্রক্রিয়ার চারিত্র রূপ।

সে বুঝতে পারে, হিন্দু অথবা মুসলমান অপেক্ষা মানুষের শ্রেণী অবস্থানই যে সবচেয়ে বড় কথা, এই মীমাংসিত সত্য শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে উপলব্ধি করে মালেক। শ্রমিক শ্রেণীর সংঘবদ্ধ অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করে রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত মালেকের আত্ম-উন্মোচনের মধ্যে অভিব্যক্ত হয়েছে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ; যেমন-

“আনন্দ আনন্দ এত আনন্দ মালেক তার জীবনে আর কখনো পায়নি। একটা প্রচণ্ড আঘাতের মধ্য দিয়ে বাইরের বাধা ভেতরের বাধা সবকিছুই অপসারিত হয়ে গেছে। এতদিনের সংকীর্ণ পরিবেশের বেষ্টনী ভেঙ্গে বিপুল জনতার মাঝখানে এসে পড়েছে। এর মধ্যেই তার মুক্তি। সকল আনন্দের বড় আনন্দ, সে আজ সেই আনন্দের স্বাদ পেয়েছে।

—— এরই মধ্যে এরই পাশাপাশি আর এক স্বপ্ন পেয়ে বসল তাকে। মৃত্যুর বুকে নবজন্মের মতো অন্ধকারের বুকে আলোক শিখার মতো ওই স্বপ্নের মধ্যে এক অনাগত নতুন দিনের আগমনী। রহমান ভাইয়ের চোখে, হারুনদের চোখে, এই স্বপ্নের ছায়া দেখে সে মুগ্ধ হয়েছিল। ১১

এভাবেই শ্রেণীশোষণমুক্ত মানবমুক্তির অন্বেষণ ও প্রত্যাশার রূপাঙ্কনে প্রকৃত অর্থেই ‘উত্তরণ’ উপন্যাস শ্রেণী চেতনার প্রোজ্জ্বল পরিচয়ে সফল একটি উপন্যাস হতে পেরেছে।

এরপর রাজনৈতিক উপন্যাস সাত নম্বর ওয়ার্ড (১৩৭৬ বঙ্গাব্দ) শ্রেণীশোষণ মুক্তির গণ-বৈপ্লবিক চেতনা এ উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু। আপাতদৃষ্টিতে ‘সাত নম্বর ওয়ার্ড’ ব্যাপক কোন রাজনৈতিক আলোড়নের পটভূমিতে রচিত উপন্যাস নয়। কিন্তু শ্ৰেণীচেতনার অংশ হিসেবে যে গণতান্ত্রিক অধিকার চেতনা রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, এ উপন্যাসের ঘটনাপুঞ্জের মূলে তাই ক্রিয়াশীল।

দিনাজপুরের পল্লীগ্রামের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সরলমনা এক সেবিকার ট্র্যাজেডি অংকনে, নারী শ্রমের মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ এবং অর্থনৈতিক বঞ্চনার স্বরূপকে বামপন্থী রাজনীতিক সত্যেন সেন শ্রেণীসচেতন দৃষ্টিতে গভীর মমতা নিয়ে রূপায়িত করেছেন। আর সেই বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাসকে এক সময়ে শক্তিতে পরিণত করে সংঘবদ্ধ আন্দোলনে রূপ দিয়েছেন।

অত্যাচার, অনাচার, বঞ্চনা এবং শ্রমশোষণের প্রতিবাদে হাসপাতালের নার্সরা সংঘবদ্ধ হয়। কিছুসংখ্যক যুক্তিসঙ্গত দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তারা ধর্মঘট করার প্রস্তুতি নেয়। এই শ্রেণীসংগ্রামের ফলে আন্দোলন একটি সর্বজনীন রূপ নিলে সম্ভ্রান্ত কর্তৃপক্ষ নার্সদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু নার্সদের দাবি স্বীকৃতি অর্জন করলেও কর্তৃপক্ষের আক্রোশ অসঙ্গতভাবে নিপতিত হয় ওয়ার্ডের চিকিৎসারত কলেজ ছাত্র রোগী আকমলের উপর।

মারাত্মক রোগী হওয়া সত্ত্বেও তাকে Discharge করা হয়। নার্সদের জয়লাভের মূল্য দিতে হয় সচেতন সংবেদনশীল রোগী আকমলকে। এভাবেই লেখক ‘সাত নম্বর ওয়ার্ড” উপন্যাসে মূলত ঔপনিবেশিক সমাজ কাঠামোর অন্তর্গত প্রশাসনিক অব্যবস্থাকে শ্রেণীসচেতন দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন।

সত্যেন সেন রচিত ‘সেয়ানা’ (ঢাকা, ১৩৭৫ বঙ্গাব্দ) শীর্ষক উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ঝড়ুও দশ বছর বয়সে মিঠুয়া নামক এক চালিয়াত পকেটমারের প্ররোচনায় সেয়ানা জীবনে হাতেখড়ি নেয়। তারপর থেকে ছাব্বিশ বছর বয়স পর্যন্ত একটানা অন্ধকার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে থেকে ঝড়ু বিচিত্র ও তিক্ত জীবন-অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে এবং শেষে এ ঘৃণ্যবৃত্তি ত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সিন্ধান্ত নেয়।

রংপুর জেলার এক অখ্যাত গ্রাম থেকে বেরিয়ে পড়া ঝড় সেয়ানা-জীবনের পথে কলকাতা, কাটিহার, আসাম প্রভৃতি শহরাঞ্চলের এবং পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পাকিস্তান আন্দোলন ও মধ্যবিত্ত- উচ্চমধ্যবিত্ত-বিত্তবানের নানা অসঙ্গতিতে ভরা জীবন-স্বরূপ, সাফল্য-ব্যর্থতা সকল অভিজ্ঞতাই সঞ্চয় করে।

আসামে ইংরেজ সৈন্যদেরকে নারী যোগানদারের কাজ করার সময় এবং আগে-পরে পতিতাসহ বিচিত্র-স্বভাবের নারীর সংস্পর্শে আসে ঝড়ু; অথচ বিয়ে করে লুসী নামের এক খ্রিস্টান মেয়েকে, ভালবাসে এক মারাঠী-কন্যাকে। স্ত্রীর আকস্মিক অকাল মৃত্যুতে ঝড়ুর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সংকল্প সাময়িকভাবে বানচাল হয়।

সে পুরুষ কর্তৃক নারী নির্যাতনের বিচিত্র করুণ বাস্তবতা অবলোকন করে। আবেগাপ্লুত হয়। ওস্তাদ মিঠুয়ার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী সখিনার বাধ্য হয়ে দেহ ব্যবসায় নামার ঘটনা ঝাড়ুর জীবনধারার মোড় ফেরায়। সৎ জীবনে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেবার পর ঝড়ু দেখে

“এতদিন মনে হয়েছিল, এই সেয়ানা জীবনের মধ্যে অবাধ মুক্তির সন্ধান পেয়েছে সে। আর আজ মনে হচ্ছে, এ যেন একটা জটিল ফাঁদ। ইঁদুরের কলের মতো এর মধ্যে ঢুকবার পথ আছে, কিন্তু বেরুবার পথ নেই।

সত্যেন সেন এর ‘সেয়ানা’ উপন্যাসে ঝড়ুর সেয়ানা জীবন পরিত্যাগের ব্যাপারটা তার শ্রেণী সচেতনতারই ফল। সে শ্রেণী সংগ্রামে অবতীর্ণ না হলেও তার ইঙ্গিত তুলে ধরে।

‘মা’ (১৩৭৭ বঙ্গাব্দ) সত্যেন সেনের রাজনৈতিক উপন্যাসের মধ্যে অন্যতম। এ উপন্যাসটিতে প্রাসঙ্গিকভাবেই শ্রেণী চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। সমাজতান্ত্রিক আদর্শকেন্দ্রিক নতুন রাজনৈতিক সংগঠন সৃষ্টির ইতিবৃত্ত রচনার অনুষঙ্গে সত্যেন সেন এ উপন্যাসে কংগ্রেসী রাজনীতির ইতিহাস পরম্পরা, সমাজপ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তার আদর্শ ও লক্ষ্যের পশ্চাৎপদতা, অন্তঃসারশূন্যতা, বিকৃতি প্রভৃতিকে রূপায়িত করেছেন।

 

 

কংগ্রেসের সংকীর্ণ নির্দেশে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রবাল কেবল বিভু ও বীথির কাছ থেকেই নয়, মায়ের বাড়ি থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়। এর ফলে তার রাজনৈতিক কর্মধারাও গতি এবং বিস্তৃতি পায়। আন্দোলনের কেন্দ্রীয় শক্তি শ্রমিকদের মধ্যেই সে নিজের আবাস রচনা করে। তার সাংগঠনিক তৎপরতায় সমাজতান্ত্রিক আদর্শবাদের অনুসারীদের সংখ্যাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে।

‘সন্ত্রাসবাদের ফাঁদ’ থেকে অনেকেই বেরিয়ে আসে যুগোপযোগী রাজনৈতিক মতাদর্শের জীবন্ময় ও প্রাণপ্রদীপ্ত আকর্ষণে। কেশরাম কটন মিলকে কেন্দ্র করে প্রবালের রাজনৈতিক সংঘশক্তি পূর্ণতর রূপ লাভ করে। মিলের শ্রমিকদের ওপর সামন্ত পদ্ধতিতে শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সে তিন মাসের মধ্যে শক্তিশালী শ্রমিক ইউনিয়ন সংগঠিত করে তোলে। ফলে একদিকে যেমন দ্বন্দ্ব-সংঘাত অনিবার্য রূপ ধারণ করে, অন্যদিকে তেমনি শ্রমিকদের ঐক্যও হয় সুদৃঢ়। প্রবালের প্রত্যাশিত শ্রেণীসংগ্রামের উজ্জ্বল সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথ এভাবেই প্রশস্ততর হতে থাকে।

উপন্যাসের অন্য চরিত্র সিবেন রায়ের উক্তির মধ্য দিয়ে লেখকের নীমাংসিত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানেরই যেন বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে-

“হ্যা, আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি। আমাদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদের সম্ভাবনা নিঃশেষিত হয়ে গেছে ।… আদর্শ হিসেবে সন্ত্রাসবাদের দিন গত হয়ে গেছে। যারা এতদিন এই আদর্শে বিশ্বাসী ছিল, তাদের আজ নতুন করে পথ নির্বাচন করতে হবে।”১৩

সেই নতুন পথ, প্রবালের সহযোগী মোবারক-উচ্চারিত শ্রেণীসংগ্রামের পথ। এই শ্রেণীসংগ্রাম যে অনিবার্য, তার কারণও শ্রমিক আন্দোলন রোধের প্রশ্নে কংগ্রেস-মুসলিম লীগের ঐক্য থেকেই প্রমাণিত হয়। শোষণ-বঞ্চনা ও নিপীড়নের পথ প্রশস্ত করে, সমাজ প্রগতিকে অবরুদ্ধ করার প্রশ্নে কংগ্রেস বা মুসলিম লীগের মধ্যে শ্রেণীচরিত্রগত ঐক্য ঔপনিবেশিক শাসনের শিক্ষা ও পরিচর্যারই অবদান। কিন্তু মুষ্টিমেয় শোষকের ঐক্য প্রবাল ও তার সহযোগীদের রক্তাক্ত করেও ব্যাপক আন্দোলনের গতিকে প্রতিহত করতে পারেনি, তা প্রকারান্তরে সংঘশক্তি থেকে জনশক্তিতে, জনশক্তি থেকে মিছিলে রূপান্তরিত হয়েছে। এভাবেই ‘মা’ উপন্যাসের তীব্র শ্রেণী চেতনা শ্রেণীসংগ্রামে উপনীত হয়েছে।

বামপন্থী রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ঔপন্যাসিক সত্যেন সেনের উপন্যাসে স্বাভাবিকভাবে শ্রেণী চেতনার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ আমরা লক্ষ করি। সত্যেন সেনের কয়েকটি মিথ ও ইতিহাস আশ্রয়ী উপন্যাসেও সমকালীন জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের ভাবধারার রূপায়ণে শ্রেণী বা সংঘচেতনার প্রতিফলন আমরা লক্ষ করি।

এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস অভিশপ্ত নগরী (১৯৬৮), পাপের সন্তান (১৯৬৯), বিদ্রোহী কৈবর্ত (১৩৭৬ বঙ্গাব্দ), পুরুষমেধ (১৯৬৯) উল্লেখযোগ্য।

বাইবেলিক মিথ-কথাকে ঔপন্যাসিক সমকালীন চেতনা শৃঙ্খলায় বিন্যস্ত করেন ‘অভিশপ্ত নগরী’ (১৯৬৮) ও ‘পাপের সন্তান’ (১৯৬৯) উপন্যাসে। ‘ওল্ড টেস্টামেন্টের যেরেমিয়া’ অধ্যায় থেকে তাঁর ‘অভিশপ্ত নগরী’ ও ‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসের কাহিনী নেয়া হয়েছে। ‘অভিশপ্ত নগরী’ উপন্যাসে জেরুজালেমের পতন দেখান হয়েছে।

“অভিশপ্ত নগরী’ উপন্যাসের নায়ককল্প পুরুষ যেরেমিয়া সমষ্টি অস্তিত্বের আকাঙ্ক্ষার রূপকার। তার মধ্য দিয়েই ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে শোষণ-বঞ্চনা-নিপীড়ন ও দাসত্বের বিরুদ্ধে মানবীয় ধর্ম। সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের ধারায় যেরেমিয়ার মত অসংখ্য প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত পুরুষের উপস্থিতি দেখা যায়, যারা নিজ নিজ আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় সমগ্র জনগোষ্ঠীর নায়ক পুরুষে পরিণত হয়েছেন।

… যেরেমিয়ার মধ্যে ঔপন্যাসিক মিথিক শক্তির ইতিবাচক তাৎপর্যকেই সন্ধান করেছেন। নবী যেরেমিয়া ছাড়াও এ উপন্যাসে অহিকম, জিল্লা, গোদালিয়া, নবী হানানিয়া, ক্রীতদাস, ইউসুফ প্রভৃতি শ্রেণীচরিত্র চমৎকারভাবে অংকিত হয়েছে।

অহিকম জেরুজালেমের ঘটনার স্রোতে জড়িয়ে যায় যেমন, তেমনি তার পুত্র গেদালিয়া ক্রীতদাসদের সঙ্গে সংগ্রামে অংশ নেয়। গেদালিয়ার শ্রেণীহীন সমাজচেতনার পেছনে সত্যেন সেনের শ্রেণীসচেতন মার্কসীয় দৃষ্টি কাজ করেছে। যদিও ক্রীতদাসী সারার সঙ্গে প্রেমই তার এই উত্তরণের পেছনে সক্রিয় ছিল, তবু একথা অনস্বীকার্য যে, সমাজ বিবর্তন ধারায় গেদালিয়ার চরিত্রটি প্রগতিশীল চিন্তাকে ব্যক্ত করেছে।

এ কারণে ‘অভিশপ্ত নগরী’ কেবল জেরুজালেম নগরী ধ্বংস বা ইহুদি জাতির পতনের কাহিনী মাত্র নয়, শ্রেণী চেতনার পরিচয়ে তথা সমাজ পরিবর্তনে প্রগতিশীল চেতনার অনতিক্রান্ত শব্দরূপও হতে পেরেছে।

‘অভিশপ্ত নগরী’ উপন্যাসের কাহিনী বিন্যাস, পটভূমি ও জীবনবোধের সঙ্গে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের মিল আবিষ্কার কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয়, প্রায় সমান্তরাল। আত্মদ্বন্দ্বে পরাজিত, নৈতিক দিক থেকে অধঃপতিত, চরিত্রহীন বাঙালি জাতির সঙ্গে জেরুজালেমের খ্রিস্টপূর্ব ইহুদি জাতির মিল খুবই নিকটবর্তী।

রাজশক্তি ও পুরোহিততন্ত্র ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত, ধর্মহীন, নীতিহীন, অত্যাচার, অনাচারে বিপর্যন্ত যেরেমিয়া যখন যিহোবার প্রত্যাদেশ প্রচার করে, তখন উভয় শক্তিই তাকে প্রতিপক্ষ মনে করে। রাজা এবং পুরোহিত যেরেমিয়ার সাবধান বাণী অনুধাবনে ব্যর্থ হয়। তার জন্য বিচারসভার আয়োজন করে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যেরেমিয়ার মুক্তি দাবি নিয়ে বাইরে জড়ো হয়।

অধ্যক্ষগণ যেরেমিয়াকে মুক্তি দেয়াই সঙ্গত মনে করে এবং জনতা তাকে নিয়ে আনন্দ প্রকাশে উদ্যোগী হয়। তখনই জনতার উল্লাস ধ্বনি স্তব্ধ হয়ে যায়। বাবিলের ক্যালনীয় সৈন্যরা জেরুজালেম আক্রমণ করে। অবরুদ্ধ ও লুণ্ঠিত হয় নগরী।

রাজা যিহোইয়ার্কীন তার মা বেহুশতা, তার পত্নীগণ, কুলপতিগণ আর নগরের যোদ্ধাদেরকে বন্দি করে বাবিলে পাঠানো হয়। ক্যালপীয়রা অভিজাত পরিবারের বাছা বাছা সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে করে নিয়ে গেল। যে মেয়েরা কখনো পায়ে হেঁটে পথ চলেনি, তাদের অনাবৃত সুকোমল মুখমণ্ডল প্রখর সূর্যের তাপে ফুলের মতোই শুকিয়ে উঠল। ভয়ার্ত হরিণীর মতোই ওরা কাঁপছিল আর ব্যাকুল চোখে চারদিকে তাকাচ্ছিল।

বিপুল ধন-সম্পদে সমৃদ্ধ বাংলা এভাবে বহিঃশক্তির আক্রমণের শিকার হয়েছে বারবার। লুণ্ঠিত হয়েছে এদেশের সম্পদ, ধর্ষিতা হয়েছে বাংলার কুলবধূ যুবতী। মিথকথার সঙ্গে সমকালীন সমাজ-ভাবনা ও জীবনচেতনাকে সম্পৃক্ত করে শ্রেণীসচেতন অঙ্গীকারে সত্যেন সেন আবিষ্কার করতে চেয়েছিল জাতিসত্তার নতুন সম্ভাবনা। অহিকমের পুত্র গেদালিয়ার ক্রীতদাস আন্দোলনে যোগদানের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের মৌলসত্য ও জীবনার্থ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

দাসপ্রেমিক গেদালিয়া জননী জিন্নার উদ্দেশ্যে পাঠানো পত্রে বলেছে-

“সেই দৃষ্টি নিয়েই আমি আমাদের এই ভাঙ্গাচোরা, জীর্ণ আর রক্তমাখা সমাজে বসে আর একটি অপরূপ সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখি। যে স্বপ্ন একদিন সত্য হয়ে উঠবে। এত দুঃখ, এত ব্যথা, এত অশ্রু তার মাঝখানে বসেও আমি আমার স্বপ্নলোকের স্বাদ-গন্ধ অনুভব করি।” (অভিশপ্ত নগরী, পরিচ্ছেদ। বাইশ)

সত্যেন সেন মূলত মার্কসীয় দর্শনজাত শ্রেণীহীন জীবনচেতনার স্বপ্নময় ভবিষ্যতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই তার উপন্যাসের মিথিক সম্ভাবনার মধ্যে সেই শ্রেণীসচেতন জীবনচেতনাই শিল্পিত হয়েছে। তাঁর পরবর্তী উপন্যাস ‘পাপের সন্তান’ (১৯৬৯)। এ উপন্যাসে ‘অভিশপ্ত নগরী’র ভাববস্তু, জীবন-কল্পনা ও চরিত্র-ভাবনা পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। ‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসে বাবিল সাম্রাজ্যের পতনের কাহিনীকে আশ্রয় করে শাসকদের নির্যাতন, ধর্মনেন্মাদনা, রক্ষণশীলতা ও পরজাতি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। যার মধ্যদিয়ে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ সত্য বিধৃত হয়েছে।

‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসের চরিত্র চিত্রণে ঔপন্যাসিক দৃষ্টিকোণ, জীবনবোধ, সময় ও সভ্যতার বিবর্তনশীল চেতনা, মানবীর অস্তিত্ব সংগ্রামের বহুমাত্রিক জিজ্ঞাসা নবতর তাৎপর্যে অভিষিক্ত। বাবিল রাজ নেবুকাডনাজার কেবল জেরুজালেমকে ধ্বংসস্তূপেই পরিণত করেনি, নগরীর ইহুদীদের বাবিলে নির্বাসিত করে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেন। নির্বাসিত ইহুদিদের সঙ্গে ক্যালদীয়দের রক্তের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসের নায়ক মিকা, বাবিলের জন্মজাত ইহুদির একজন। ক্রীতদাস হলেও সে অন্যান্য ক্রীতদাসের মত গ্লানিময় জীবন থেকে মুক্ত। প্রভু নারগেল সারজের স্নেহের আশ্রয়ে এবং প্রভুর কন্যা শব্দরার প্রণয় স্পর্শ তার দাসজীবনকে করেছে আনন্দময়। একটি ইহুদি মেয়ে ধর্ষণের ঘটনায় প্রতিবাদ করতে গিয়ে তার জীবন অন্যরকম হয়ে যায়।

স্বাজাত্যবোধ ও আত্মপরিচয় উজ্জীবিত মিকা উপলব্ধি করে ‘আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কথা এই যে, আমি একজন ইহুদি’ এই বোধ চেতনা থেকেই সে মূল্যবান পোশাক, স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন তুচ্ছ করে বাবিল ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়। ক্যালনীয়দের অত্যাচারে পীড়িত মিকার মন বিদ্রোহের আগুনে ভরে ওঠে। শ্রেণী চেতনা অড়িত মিকা আবাল্যের সাথী প্রিয়া শদরার উদ্দেশ্যে তাই বলে-

“শদরা, তোমরা প্রভু। আর আমরা তোমাদের ভারবাহী দাস্য, ভূমিদাস। ইহুদীর দল তাদের রক্ত জল করে ফসল ফলায়, কাঠ কাটে, বোঝা বয়, তাদের সেই মেহনতের উপরে তোমাদের বিলাস সৌধ গড়ে ওঠে। শব্দরা, তোমরা চাবুক মারো আর আমরা আর্তনাদ করে মরি, তোমাদের সঙ্গে এই তো আমাদের সম্বন্ধ। আমাদের ঘরের সুন্দরী মেয়েদের ক্যালনীয় প্রভুরা উচ্ছিষ্ট করে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। আমরা কথাটি বলতে পারি না। কার কাছে নালিশ জানাব।

আমাদের কথায় কেউ কান পাতে না, বরং তাতে বিপদ আরো বেড়ে ওঠে। আমরা শুধু আকাশের দিকে চেয়ে যিহোবার কাছে নালিশ জানাই আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি।” (পাপের সন্তান, পরিচ্ছেদ ॥ দুই)।

মিকা বাবিল ত্যাগ করে জেরুজালেম যাত্রাকালে প্রেমিকা শব্দরাও তার সঙ্গী হয়। কিন্তু জেরুজালেম এসে তার স্বপ্নভঙ্গ হয়। জেরুজালেম এসে মিকা গরিব ইহুদিদের দুঃখ লাঘবে প্রাচীর নির্মাণে সচেষ্ট হয়। স্বাজাত্যবোধ চেতনা হতে মিকার মধ্যে ক্রমশ জেগে ওঠে নিজের শ্রেণীভাবনা ও শ্রেণীসংগ্রামের আদর্শ।

‘মিকা হেলে বলল, –যখন বাবিল ছাড়ার সময় হল, মনে পড়ছে গরিব ইহুদি ভাইদের ডেকে বলেছিলাম চলো, চলো আমরা যিহোবার রাজ্যে যাই, সেখানে বড় নাই ছোট নাই, উঁচু নাই নীচু নাই, ধনী নাই নির্ধন নাই এমনি কত কথাই না বলেছিলাম, যারা জীবনে কোনদিন সুখের মুখ দেখেনি। আমার কথা শুনে তাদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু জেরুজালেমে এসে তারা কি দেখল? আর আমিই বা কি দেখলাম? আমার নিজের রচিত স্বপ্নে আমি ডুবেছিলাম। কিন্তু প্রবেশ করার প্রথম দিনেই গরিব ইহুদিদের পাড়ায় গিয়ে যখন ঢুকলাম, আমার স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল।

দেখলাম, গরিব ইহুদিদের প্রতি ভদ্র ইহুদিদের মনে কী অপরিসীম ঘৃণা! এরা তাদের কাছে অশুচি। তখন ভাবলাম, ক্যালদীয়েরা তাহলে আর কি এমন বেশি অপরাধ করেছিল।

আমার যেন আর সোজা হয়ে দাঁড়াবার ক্ষমতা রইল না, আমি হতাশ ও অবসাদে ভেঙ্গে পড়লাম।” (চব্বিশ পরিচ্ছেদ। পাপের সন্তান) গোষ্ঠী বিভেদ দূর হলেও শ্রেণী সংঘর্ষ যে কত ভয়াবহ, এখানে তারই পরিচয় প্রকাশিত।

অন্যদিকে ধর্মীয় প্রধান আচার্য ইষ্রার কাছে আসা শব্দরার বাবা নারগেল শারেজের পাঠানো খোলা চিঠি থেকে মিকা জানতে পারে যে, সে নারগেল দাসীর পুত্র অর্থাৎ মিকা ও শব্দরা একই পিতার সন্তান। নিজের এরকম জন্ম পরিচয় উদ্ঘাটিত হওয়ার পর বিচার সভার সামনে দাঁড়িয়ে নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ডের কথা জেনেও মিকা জেরুজালেম ছেড়ে পালাতে চায়নি।

জেরুজালেম ও ইহুদি সমাজ নিয়ে তার মনে ছিল স্বপ্ন। নারগেল সারেজের চিঠি পাওয়ার পর তার আত্মদ্বন্দ্ব ও সমাজ দ্বন্দ্বময় জীবনের সংগ্রাম আরো তীব্রতর হয়। যদিও ধর্মের অমোঘ বিধান ও আত্মপরিচয়ের গ্লানিকর পরিস্থিতি তাকে জেরুজালেম ত্যাগ করতে বাধ্য করে শেষ পর্যন্ত।

মিকা চরিত্রটি কর্মে উদ্দীপনায়, সংযমের প্রতিশ্রুতিতে মানবিকতা ও ভালবাসায় যেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, তেমনি ধর্মীয় বিধানের বিরুদ্ধে মানসিক দ্বন্দ্ব, শ্রেণীদ্বন্দ্বে এ চরিত্রটি বহুমাত্রিকতা লাভ করেছে। ‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসের মিকা চরিত্রের সঙ্গে সমকালীন বাঙালির সচেতনতাকে সমন্বিত করার মধ্যে ঔপন্যাসিক সত্যেন সেনের প্রজ্ঞাময় পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এছাড়া জেরুজালেমের প্রাচীর তৈরির সময় তাঁরশথ নেহেমিয়ার উৎসাহ ও ইহুদি ঐতিহ্যের প্রতি তার গৌরববোধের প্রেক্ষিতে প্রাচীর তৈরির কাজে নিয়োজিত একজন সাধারণ ইহুদির উক্তিতে শ্রেণী চেতনার তীব্র শ্লেষ ধরা পড়ে।

——আমাদের এই ভাঙ্গাচোরা ঘরগুলোর দিকে একবার তাকান, আর একবার তাকিয়ে দেখুন আমাদের এই কংকালসার বাচ্চাগুলোর দিকে। এদের দিকে তাকালে গর্ব আর গৌরবের কথাটা কি ঠাট্টার মতোই মনে হয় না?….

ঃ বলছি আমাদের সেই সব ধনী ইহুদি ভাইদের কথা, যারা এতদিন ধরে আমাদের হাড়-মাংস চিবিয়ে খেয়েছে, আবার খাচ্ছে।

ঃ আকালের সময় আমরা ওদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলাম, সেই ঋণ সুদসহ পর্বতপ্রমাণ হয়ে উঠেছে। আর তারই দায়ে আমাদের ভিটেমাটি জমি ওদের হাতে বাঁধা পড়েছে। আর আমাদের ছেলেমেয়েগুলো ওদের বাড়িতে দাসদাসী হয়ে গরু-ভেড়ার মতোই আটকে আছে।

ঃ হায় যিহোবা, আপনি কি তা-ও জানেন না! এই ঋণ শোধ করা আমাদের পক্ষে কোনদিনই সম্ভব হবে না। আমাদের ছেলেমেয়েদেরও আমরা আর ফেরত পাব না। পরজাতীয়দের বিরুদ্ধে আমরা কত কথা বলি, কিন্তু আমাদের এইসব ধনী ইহুদি ভাইরা কি তাদের চেয়ে কোন অংশে কম?” (আঠার পরিচ্ছেন। পাপের সন্তান)

পরজাতীয়দের থেকে স্বজাতীয় শ্রেণীবৈষম্যের এই নির্যাতন-নিষ্পেষণ, এই সংগ্রাম, দ্বন্দ্ব ও উত্তরণের অভিলাষ এমনিভাবে উচ্চকিত হয়ে আছে, ‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসের প্রায় সম্পূর্ণ আখ্যান জুড়েই।

 

 

প্রকৃতপক্ষে পাপের সন্তান উপন্যাসে ইহুদি সাধারণের প্রাণপাত প্রচেষ্টার ফলে নতুন জেরুজালেমের প্রাচীর গড়ে ওঠার পরও দেখা গেল ধর্ম-উন্মাদ ইহুদি সমাজপতিদের ধর্মের গোঁড়ামি, কঠিন রক্ষণশীল মনোভাব ও তীব্র পরজাতি বিদ্বেষ সমাজকে এক আত্মধ্বংসী আবর্তের দিকে ঠেলে নিয়ে গেল।

ধর্মপতিরা মানবীয় আবেগের বিরুদ্ধে গিয়ে ধর্মাদেশ প্রচার করল যে, যারা কানানীয়, হিট্টিয়, পারসীয়, যিষীয়, আর্মেনীয়, মোড়াবীয়, সিস্ত্রীয় ও ইমারীয় লোকদের ঘৃণ্য আচার-ব্যবহার ও রীতিনীতি পালন করে চলেছে। তারা নিজেদের পুত্রদের জন্য তাদের কন্যা গ্রহণ করেছে।

এভাবে ইহুদিদের পবিত্র রক্ত মিথ্যাদের তার পূজক কদাচারী, অশুচি ও পরজাতীয়দের দূষিত রক্তের সঙ্গে মিশ্রিত করেছে। কাজেই সেসব ইহুদিকে পরজাতীয় স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাগণকে পরিত্যাগ করতে হবে এবং এই পুত্র কন্যারা ‘পাপের সন্তান’ বলে আখ্যা পেল, এভাবেই ধর্মীয় অন্ধতার বেদীমূলে নিষ্পাপ, নিষ্কলঙ্ক পাপের সন্তানদের বলি। হতে হয়।

কিন্তু পরিশেষে বহু জাতি, বহু ধর্ম, বহু শ্রেণী, ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও শ্রেণীসংঘাত ডিঙ্গিয়ে মানবিক মুক্তি, আত্মার জাগরণ ও জয়কে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে শ্রেণী চেতনার সদর্থক ভূমিকা ‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসের রসনিষ্পত্তি ঘটিয়েছে।

এ কারণে উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে আমরা দেখি, ধর্ম-উন্মাদনা ছাপিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ এক মানবিক বোধের উজ্জীবন। আত্মবিনাশের পরিবর্তে এক সদর্থক মীমাংসায় উপনীত হয়ে পাপের সন্তানের বলি মিকা। উচ্চকিত হয়ে ওঠে মানবিক বোধের শুদ্ধ চেতনায়।

“আমার মন সুস্থ হয়ে উঠল, সাহসী হয়ে উঠল। নিষ্পাপ আমরা, নিষ্কলংক আমরা, আমরা কেন ওদের কাছে মাথা নত করে থাকবো? কে, কবে তার অসংযত প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার ফলে এক সন্তানের জন্ম দিয়েছিল তার দায়-দায়িত্ব কি আমাদের বয়ে নিয়ে চলতে হবে? বাইরের লোকের কাছে যাই হই না কেন আজ আমার নিজের মনের কোনই গ্লানি নেই।” (পরিচ্ছেদ ঊনত্রিশা পাপের সন্তান)

এভাবেই সত্যেন সেনের ‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসে বাবিল সাম্রাজ্যের পতনের কাহিনীকে আশ্রয় করে শাসকদের গণনির্যাতন, ধর্ম-উন্মাদনা, রক্ষণশীলতা ও পরজাতি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ বিধৃত হয়েছে।

‘বিদ্রোহী কৈবর্ত’ (১৩৭৬ বঙ্গাল) উপন্যাসে বাংলাদেশের এককালীন ধর্মযাজক, সামন্তপ্রভু ও সম্রাটের বিরুদ্ধে অত্যাচারিত কৈবর্তদের বিদ্রোহের কাহিনী রচনা করা হয়েছে। ইতিহাস অবলম্বী হলেও বিদ্রোহী কৈবর্ত উপন্যাসের শৃঙ্খলা রক্ষিত হয়নি। গৌড় রাজের সঙ্গে কৈবর্তদের দ্বন্দ্ব-সংঘাত রূপায়ণের প্রশ্নে সত্যেন সেন শোষণ-নিপীড়ন ও সংগ্রামের চিরায়ত কাঠামোকেই গ্রহণ করেছেন।

মানুষের সমগ্র সংগ্রামের মূলে শ্রেণী চেতনার উপস্থিতি যে অনিবার্য, কৈবর্তদের জাগরণের রূপ ও স্বরূপ অংকন করতে গিয়ে সে সত্যকে তিনি পরম বলে গ্রহণ করেছেন। জমির স্বত্বাধিকারের প্রশ্নে কৃষক কৈবর্তরা যখন উচ্চারণ করে : “জমির আবার কর কি? এ নিয়ম কোনকালে ছিল না? চাষী আর জমি কি আলাদা? এ মাটির স্বত্ব নিয়েই আমরা জন্মাই ।’- তখন তেভাগা আন্দোলনের ‘লাঙল যার জমি তার’ তত্ত্বের প্রতিধ্বনির মতই মনে হয়। সত্যেন সেনের অপর উপন্যাস ‘পুরুষমেধ’ (১৯৬৯)।

‘পুরুষমেধ’ উপন্যাসে শ্রেণীসংগ্রামের আধুনিক যুগসত্য ব্যক্ত করাই ছিল লেখকের উদ্দেশ্য। এতে শূদ্র শিশু খেতুর বলির পর যুগ-যুগান্তের শোষিত ও নির্যাতিত শূদ্রদের মধ্যে জাগরণ এবং রাজা বৃষকেতু ও প্রভু শ্রেণীর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিক্ষোভের কাহিনী সার্থকভাবে চিত্রিত হয়েছে। ধর্মান্ধতা ও শাস্ত্রানুগত্যের মানবতা বিরোধী প্রবণতার বিরুদ্ধে মানুষের সর্বকালের বিদ্রোহই এ উপন্যাসের কাহিনী পটে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ সত্যকে তুলে ধরে।

পরিশেষে বলব, সত্যেন সেনের সামাজিক, রাজনৈতিক, ইতিহাস ও মিথ আশ্রয়ী উপরে আলোচিত সব উপন্যাসের বিষয়-ভাবনায় ধর্ম শোষণ, জাতি শোষণ ও শ্রেণী শোষণের নিগড় থেকে মুক্তিলাভের অঙ্গীকার ও প্রত্যয় ধ্বনিত হয়েছে। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী বিশ্বদৃষ্টির সাহায্যে সামাজিক গতি এবং ব্যক্তির ক্রমবিকাশের পরস্পরিত জটিল অবস্থার রূপায়ণের মাধ্যমে সত্যেন সেন এভাবেই তাঁর উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ সত্যকে বিধৃত করেছেন।

 

 

শওকত ওসমান (১৯১৭-১৯৯৮)

শক্তিমান কথাশিল্পী শওকত ওসমান সামাজিকভাবে যথেষ্ট সচেতন। সমাজের পরিবর্তন ধারাটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তিনি অবলোকন ও অনুধাবন করেছেন। বিভাগোত্তর ও স্বাধীনতা-উত্তরকালের বাংলার সমকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন তার উপন্যাসে স্থান পেয়েছে।

প্রাসঙ্গিকভাবে শ্রেণী চেতনা বিষয়টিও তার উপন্যাসে গুরুত্ব পেয়েছে। ১৯৪৭-৭১ কালসীমায় তাঁর যে ক’টি উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ প্রকাশ পেয়েছে, সেগুলো হল: বনি আদম (১৯৪৩), জননী (১৯৬১) চৌরসন্ধি (১৯৬৮), রাজা উপাখ্যান (১৯৭০) এবং ক্রীতদাসের হাসি (১৯৬৩)।

শওকত ওসমানের প্রথম সামাজিক উপন্যাস ‘জননী’ (ঢাকা, ১৯৬১)। বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনধারার শ্রেণীগত সত্য ধরা পড়েছে উপন্যাসটিতে। ঘটনাস্থল পশ্চিমবঙ্গের মহেশডাঙ্গা এবং সময় ও সমাজপ্রবাহ বিভাগ পূর্ববর্তীকালের।

বাঙালি মুসলমানের স্বাতন্ত্র্যবাদী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত এ উপন্যাসের ঘটনাংশ বিস্তৃত। মুসলমান সমাজের শরিয়তী দ্বন্দ্ব (হানাফি ও লা মাজাহাবি) বিত্তবানের স্বার্থপরায়ণতা এবং স্বল্পবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর লোকদের পারস্পরিক সম্প্রীতিমূলক জীবনযাত্রা এ উপন্যাসে পরিস্ফুট।

উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র এককালের সম্ভ্রান্ত বংশ মর্যাদার দাবিদার পরিবারের সন্তান নিম্নবিত্ত আজহার এবং হিন্দু নিম্নবিত্ত চন্দ্র কোটাল পরিবারের সম্ভাব সম্প্রীতির পরিচয় পাওয়া যায়। আজহারের সর্বশেষ কর্মক্ষেত্রের শ্রমজীবীদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্ভাব-সম্প্রীতিমূলক জীবনচিত্রের পাশাপাশি বিশেষত চন্দ্ৰ কোটাল চরিত্রের মাধ্যমে বিত্তবানদের বিরুদ্ধে নির্বিত্তদের সচেতন ও সংগঠিত হবার ইঙ্গিতও লেখক তুলে ধরেন এ উপন্যাসে। ফলে শ্রেণী চেতনার নয় শুধু শ্রেণীসংগ্রামেরও উন্মেষ লক্ষ করা যায় এ গ্রন্থে।

নিম্নবিত্ত জীবনে দারিদ্র্য এবং ধর্মাচ্ছন্নতা উভয়ের নেপথ্য ভূমিকায় শ্রেণীশোষণ তীব্রতা পায় ‘জননী’ উপন্যাসে। তারই বহিঃপ্রকাশ আমরা লক্ষ করি। দারিদ্র্য এবং ধর্মের যোগাযোগ উপন্যাসটিতে ব্যঙ্গের আধারে উপস্থাপিত। মহেশডাঙ্গা গ্রামে হাতেম বখশ এবং রোহিনী চৌধুরী অধিক প্রতাপশালী।

হাতেম বখশ খা গ্রামবাসীকে জড়ো করে নিজের দল ভারি করতে চায়; উদ্দেশ্য রোহিনী চৌধুরীর সমকক্ষতা অর্জন। কিন্তু হাতেম বখ্শ গ্রামবাসীকে দলে টানে ধর্মের দোহাই দিয়ে। সাধারণ মানুষের ধর্মভাবকে প্রবল থেকে প্রবলতর করে সে এর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িতা ছড়িয়ে দেয় গ্রামে।

ধর্মাচ্ছন্ন দরিদ্র মানুষকে হীন স্বার্থে কাজে লাগানোর সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যে যে কাজ হয়, সেটাও দেখিয়েছেন শওকত ওসমান। আজহার এবং চন্দ্র কোটাল পরস্পরের প্রতিবেশী- উভয়েই দরিদ্র কৃষক। কিন্তু গ্রামের ধর্মকেন্দ্রিক উত্তেজনা তাদের মধ্যে সহজেই সৃষ্টি করে বিভেদের দেয়াল। ফলে আজহার চন্দ্র কোটালকে ঘৃণার চোখে দেখতে শুরু করে। দারিদ্র্যের পরিচয়ে তারা সমান অবস্থানে থাকলেও ধর্মের বিভিন্নতা তাদের মধ্যে আনে পৃথকতা। চন্দ্র কোটাল সমাজের ধর্মাশ্রিত সাম্প্রদায়িকতাকে আক্রমণ করে রূঢ় ভাষায়-

“ধর্মের নিকুচি। যতসব চালবাজি শালাদের ঝগড়া লাগানোর

শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িকতার পরিণতি হয় ভয়াবহ। দুই জমিদারের অধিকারাধীন ‘জলকর লইয়া দাঙ্গার সময়’ নিহত হয় দুই ধর্মের গরিব গ্রামবাসী। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা সমাজের যে কোন স্তরে উদ্ভূত হলেও তা যে নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনেই ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনে, ‘জননী’ উপন্যাসে আমরা তার পরিচয় পাই। শওকত ওসমান অবশ্য মর্মান্তিক পরিণতির মধ্য দিয়ে নতুন উপলব্ধির জাগরণকে চিহ্নিত করেছেন। তাই দেখি, প্রচণ্ড ধার্মিক আজহারের মধ্যেও এক সময়ে সূচিত হয় পরিবর্তনের আভাস। নির্মোক ঢাকা সত্য ক্রমশ আলোকিত হয়ে ওঠে তার মনে-

“বড় লোকে বড় লোকে দলাদলি, আমরা গরিবেরা কেন ওর মধ্যে?” শিশুপুত্র আমজাদের ‘ভগবান মানে আল্লা, না?’ প্রশ্নের জবাবে আজহার বলে ‘হ্যাঁ’। শওকত ওসমানের সমাজচিন্তা এখানে মানবিকতার বোধে উত্তীর্ণ। কঠিন জীবনসংগ্রামে অহর্নিশ-লিপ্ত সমাজের হতদরিদ্র মানুষদের মধ্যে তিনি শ্রেণীসচেতন স্বচ্ছ জীবনবোধের সন্ধান পান। সমাজের নেতিবাচক অবস্থার মধ্যে তিনি জাগিয়ে তোলেন আশার সম্ভাবনা।

অনিশ্চয়তাপূর্ণ-নিরাপত্তাহীন সমাজব্যবস্থার মধ্যে গ্রামীণ নিম্নবিত্ত মানুষের বেঁচে থাকার কঠিন জীবন- সংগ্রাম ‘জননী’ উপন্যাসে লক্ষ করার মতো। উপন্যাসের প্রতিটি শ্রেণীচরিত্র কোন না কোনভাবে প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করছে টিকে থাকার জন্য। খণ্ড খণ্ড চিত্রে এরকম বেশ ক’টি চরিত্র গড়ে উঠেছে, যারা সম্মিলিতভাবে এক অনিঃশেষ সংগ্রামকে তুলে ধরে। এখানে প্রত্যেকের সংগ্রামই গুরুত্বপূর্ণ এবং তা তাদের নিজস্ব অস্তিত্বের কাছে অর্থবহ।

আজহারের মতো চন্দ্র কোটালও নিত্য লড়াই করে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে। সে যখন সৃষ্টিকর্তার ওপর অনাস্থা প্রকাশ করে, তা কোন বিশেষ দর্শনজাত নয়; সেটা তার চোখে দেখা সমাজের বৈষম্যের বিরুদ্ধে তার নিজস্ব প্রতিবাদ। এসব চরিত্রের মধ্যে আজহার ও দরিয়ার জীবনসংগ্রাম আলাদাভাবে বিস্তৃত পরিসরে খানিকটা বড় জায়গা পায়। আজাহার সংগ্রামরত বাইরের জীবনের মধ্যে, আর দরিয়া ভেতরে তথা পরিবারের গণ্ডিতে।

গ্রামের কৃষি-জীবন এবং গ্রামের বাইরে মফস্বল শহরের শ্রমজীবনের টানাপোড়েনে ক্লান্ত চাষী আজহার। ভূমির স্বল্পতার কারণে বারংবার তাকে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র যেতে হয় বিকল্প পেশার খোঁজে। প্রতিবারই সে পুনরায় গ্রামে ফিরে আসে পরিবারের কাছে; আজহারের অনিশ্চয়তাপূর্ণ অবস্থার মধ্যে বাংলার শত-সহস্র কৃষিজীবী মানুষের জীবন-সত্যের প্রতিফলন ঘটেছে।

এমনকি আজহারের মৃত্যুর পরেও শেষ হয় না জীবনের লড়াই। সেটা অব্যাহত অন্য মাত্রায়। অন্তঃপুরবাসী দরিয়া পরিবারের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকলেও তার জীবনের কষ্ট-যন্ত্রণা, জঠরজ্বালা মেটানোর নিরন্তর প্রচেষ্টা এসব মোটেও ক্ষুদ্র নয়। আজহারের মৃত্যুর পরেই শুরু হয় তার পত্নী দরিয়ার অস্তিত্বের প্রকৃত পরীক্ষা।

আজহারের মৃত্যুতে বহির্জগতে সংগ্রামকারী এক লড়াকু ব্যক্তির জীবন-অধ্যায়ের যতিপাত; আর দরিয়ার জীবন-যুদ্ধ আজহারের মৃত্যুর পর হতে থাকে তীব্রতর। দরিয়া তার জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যায় অন্তঃপুরে থেকেই। কিন্তু সমাজের প্রকৃত অবয়বটা ঠিকই আমরা পেয়ে যাই দরিয়ার সূত্রে। দরিয়া চরিত্রের মহিমান্বিত পূর্ণতায় লেখকের সমাজমনস্কতা শ্রেণী চেতনা ও মানবিকতার বোধ সবকিছুর চূড়ান্ত বিকশিত রূপ ফুটে ওঠে।

দরিয়ার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা অপ্রসন্ন অবরুদ্ধ সমাজের মধ্যে। সমাজের বৈষম্যের কারণে যে কষ্ট তার জন্য অবধারিত, তাকে জয় করার চেষ্টা সে অব্যাহত রাখে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। গ্রামের স্বার্থান্বেষী মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী ইয়াকুব দরিয়ার দারিদ্র্যে সাহায্যের হাত প্রসারিত করে আত্মীয়তার সুযোগ নিয়ে। শোচনীয় অবস্থার মধ্যেও দরিয়া ইয়াকুবের দান হাত পেতে নিতে অস্বীকার করে, সেই দরিয়াই স্বামীর মৃত্যুর পর অসহায় অবস্থায় বাধ্য হয়েছে ইয়াকুবের দেয়া অর্থ নিতে।

 

 

ইয়াকুৰ সেই সাহায্যের সুবাদে এক পর্যায়ে তার লাম্পট্য চারিতার্থ করে। এর মধ্য দিয়ে দরিয়া বিবি চরন সামাজিক নিগ্রহের শিকার হয়। প্রচলিত সামাজিকতায় সমাজের ধিক্কার কুড়ায় নির্দোষ নারী দরিয়া বিবি। কিন্তু সত্যিকারের অপরাধীর নামটাও কেউ জানতে পারে না। তাই এক অবৈধ সন্তানের জন্ম দিয়ে এই বেদনার্ত জননী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয় তথাকথিত সমাজের সামনে নিজের সম্ভ্রমটুকু রক্ষার তাগিদে।

আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়ে দরিয়া হয়ে উঠেছে মহিয়সী জননী। নিজের গ্লানিকর অপমানজনক সত্তার সে বিনাশ ঘটায় আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে, কিন্তু গর্ভের সন্তানকে রেখে যায় পৃথিবীতে। দরিয়ার গর্ভের সন্তান ইয়াকুবের ব্যভিচারের ফল হলেও সে দরিয়ার করুণ কষ্টকর জীবনের স্মারক। যে সমাজ দরিয়ায় বাঁচার নিশ্চয়তা দেয়নি, সেখানে এক দরিদ্র অনাথ শিশু-সন্তানের কোনই মূল্য নেই।

তবু আমরা দেখতে পাই, বিত্ত-বৈভবহীন মানুষের স্তর থেকে ওঠে আসে সম্ভাবনার ইঙ্গিত। দরিয়ার প্রতিবেশী নিঃসন্তান হাসু বৌ নিজের কোলে আশ্রয় দেয় সদ্যোজাত শিশুটিকে। এক জননীর প্রস্থানের পটভূমিতে আবির্ভূত অন্য এক জননী। গ্রামবাংলার অবহেলিত দরিদ্র রমণীরা এভাবেই জননীর স্বরূপে লালন করে যায় দুঃখ-কষ্টের বোঝা। দরিয়ার আত্মহত্যা বৈষম্যমূলক সমাজের বিরুদ্ধে এক নারী এবং এক জননীর প্রতিবাদ ।

এভাবেই শ্রেণী চেতনা ‘জননী’ উপন্যাসের রূপায়িত হয়ে উঠেছে। সেই সাথে ঔপনিবেশিক সমাজ কাঠামোর পরিণতিতে গ্রামগুলোর ভাঙ্গন, মন্বন্তরের করাল গ্রাস, বিশ্ব যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বিশ্ব বাজারের যোগসূত্রে স্থানীয় বাজারের অগ্নিমূল্য, এসবের প্রেক্ষাপটে আজহার, চন্দ্র কোটাল প্রভৃতি ক্ষুদ্র কৃষকের সর্বগ্রাসী বিপর্যয়ে ‘জননী’র সমাজচিত্রণ হয়েছে অর্থপূর্ণ।

সামাজিক বৈষম্যের পীড়ন এসব চরিত্রের দুঃস্থ অবস্থা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষভাবে যখন দেখা যায়, আজহার এবং চন্দ্র কোটাল তাদের ক্ষুদ্র জমির ফলনে চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ এবং বিকল্প জীবিকার খোঁজে আজীবন অভ্যস্ত কৃষিকাজ ছেড়ে একজন ভাঁড়ের দলে এবং অন্যজন রাজমিস্ত্রির কাজে যোগ দেয়। সমাজের এসব টুকরো টুকরো নেতিবাচক চিত্রের মাঝখানে ভয়াবহ নেতির বাহক হয়ে আসে দরিয়ার আত্মহত্যা।

উপন্যাসের শুরু হয় মহেশডাঙ্গার এক সাধারণ চাষী পরিবারের কাহিনী বর্ণনা দিয়ে। উপন্যাস যখন শেষ হয়, ততক্ষণে সেই চাষী পরিবারটির জীবনের সমস্ত ছন্দ, সমস্ত স্বপ্ন ভেঙ্গেচুরে যায়। এমনকি পরিবারের যে সদস্যরা বেঁচে থাকে তারাও গ্রাম ছেড়ে যাবার জন্য প্রস্তুত ‘চেনা-অচেনা সড়কের দিকে। আত্মহত্যার মাধ্যমে দরিয়া যে সমাজ থেকে বিদায় নিয়েছে, অন্যেরা সে সমাজ থেকেই প্রস্থান করেছে অন্যভাবে গ্রাম ছেড়ে যাবার মধ্য দিয়ে। এভাবেই প্রচলিত সমাজের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে শ্রেণী চেতনা বিষয়টি ‘জননী’ উপন্যাসে রূপ পেয়েছে।

শওকত ওসমানের অপর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘বনি আদম’ (১৯৪৩)। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হারেস। তার পিতা ছিল তন্তুবায় সম্প্রদায়ের লোক। পিতৃ বিয়োগের পর পরজীবী ছিন্নমূল হারেস বেড়ে উঠেছিল মীরগা নামক গ্রামে সলিম মুনশীর আশ্রয়ে, সলিম মুনশীর একনিষ্ঠ খেদমতগার হিসেবে। সে একা নয়, তার মায়ের সাথে সে সলিম মুনশীর বাড়ি আশ্রয় পেয়েছিল।

মা ছিল বাড়ির পরিচারিকা, হারেসও তখন ফাই ফরমাস খাটত তার বাড়িতে। মাত্র আট বছর বয়সে নিরাশ্রয় হারেস মায়ের আশ্রয় বঞ্চিত হলেও জোতদারের আশ্রয়চ্যুত হয় না। প্রায় বিনা বেতনে কিছু খোরপোষের বিনিময়ে হারেস মুনশীর বাড়িতে থেকে যায়। হাবোগাবো গোবেচারী স্বভাবের জন্যও হারেসের প্রসিদ্ধি ছিল। কিন্তু এই হারেসের মধ্যেও তার নিজ শ্রেণী অবস্থান সম্পর্কে সচেতনতা ও অস্তিত্বের জাগরণ পরিলক্ষিত হয়। মূলত ‘বনি আদম’ উপন্যাসে হারেস চরিত্রের উত্তরণের মধ্য দিয়ে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ সত্য বিধৃত হয়েছে।

আশ্রয়দাতা মনিব সলিম মুনশী একদিন হারেসকে পাঠিয়েছিল এক আত্মীয়ের খোঁজ নিতে। সেখানে যাত্রাপথে এক মিটিং-এর বক্তৃতা শুনে হারেসের চেতনালোক আন্দোলিত হয়। সে শুনেছিল-

“মানুষ, মানুষের ওপর জুলুম করে কেন? জীবনে সে প্রথম নাড়া খেয়েছে। সে তো মনিবের গোলাম। মনিবের খেদমত করাই ছাওয়াব-পুণ্যের শামিল। সভার বক্তা এই ফাঁকিবাজির বিশদ বিবরণ দিয়েছিল, কিভাবে আরাম-আয়েশ লুটনেওয়ালারা নিজেদের দৈহিক সুখ বজায়ে সমাজের আদব-কায়দা নির্মাণ করে। সেই কাহিনী শোনার পর ধোঁয়াতে শুরু করেছিল সে। দাউ দাউ জ্বলে উঠতে আরো পাঁচ বছর লেগে যায়। ১৫

অতঃপর একদিন হাবাগোবা হারেসের চৈতন্যতল থেকে উত্থিত হয় জোতদার সলিম মুনশীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী উচ্চারণ-

“পনর বছর আপনার গোলাম। গোলামের মত মেহনত করেছি। তার কি কোন দাম নেই, বেতন নেই? এমন উচ্চারণ মনিবের কানে অবিশ্বাস্য। জন্মহারা কি করে এমন উচ্চারণ করতে পারে। ১৬

আর এখান থেকেই ছিন্নমূল, ভূমিহীন, পরজীবী হারেসের শ্রেণী সচেতন, অস্তিত্বশীল চেতনার সম্মুখ যাত্রা উপন্যাসে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। ক্রমশ পরজীবী হারেস পরিণত হয় শ্রেণী সচেতন শ্রমজীবী একজন মানুষে। সে বিয়ে করে সংসারীও হয়। অস্তিত্বশীল হারেস ক্রমান্বয়ে ঘরামি, রাজমিস্ত্রীর যোগালি, ঠোঙা বানিয়ে বিক্রি করার কাজে অথবা মাঝে মাঝে কাজবিহীন অবসরে জীবিকার অন্যতর অনুসন্ধানে ব্যস্ত হয়।

নগর জীবনে সে তার স্বাধীন সত্তার জাগরণকে খুঁজে পায়। আত্মোপলব্ধি করে জীবনের গন্তব্য সম্পর্কে ”

সে তন্তুবায় সম্প্রদায়ের লোক। মুসলমান ভাই ভাই হলেও সে জোলা’ শিরোনামে অবজ্ঞাত। তার সঙ্গে শরীক মুসলমানরা এক কাতারে খেতেই বসবে না। আজ কার তোয়াক্কা? শহরে গিয়ে তার এতটুকু প্রতায় বেড়েছে নিজের রুজি নিজে উপভোগ করো। কারো ভ্রুকুটির জায়গা সেখানে নেই। গায়ে এমন হটকারিতা অসম্ভব। হারেস তার হদিস করতে চায়। কিন্তু বুদ্ধিতে কুলায় না। পৃথিবীর বুকে যেমন নানা সম্পদ লুকিয়ে আছে, তেমনই সমাজের বুকে। খুঁড়ে বের করতে না জানলে মাথা ঠোকাই সার। নানা দুর্ভোগ তখন জমে থাকে মানুষের জন্য। অবশ্যি সব মানুষের জন্য নয় ।

এভাবে শ্রমজীবী হারেস তার শ্রেণীগত বাস্তবতা উপলব্ধি করে নিজের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করায় মনস্থির করে। নগরের ভাসমান উদ্বাস্তু জীবন ছেড়ে সে গ্রামে হালচাষের মাধ্যমে ভূমিহীন অবস্থান থেকে ভূমি আশ্রয়ী জীবনের প্রত্যয়ে গ্রামেই থেকে যাবার দৃঢ়প্রতায় ব্যক্ত করে। ‘বনি আদম’ উপন্যাসে ছিন্নমূল হারেসের এই আত্মোত্তরণের মধ্য দিয়ে শ্রেণী চেতনার পরিচয় সার্থকতার সাথে রূপায়িত হয়েছে।

পরবর্তী আলোচিত উপন্যাস ‘চৌরসন্ধি’ (১৯৬৮)। বিত্তহীন, নিম্নবিত্ত মানুষের কঠিন জীবন সংগ্রাম এবং সে সূত্রে প্রচলিত সামাজিক মানদণ্ডে তাদের কারো কারো অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত হওয়ার অনিবার্য শ্রেণীগত পরিণতি চৌরসন্ধি উপন্যাসের উপজীব্য বিষয়।

উপন্যাসটিতে চৌর্যবৃত্তি ও গুন্ডামি অবলম্বনে জীবিকা নির্বাহে লিপ্ত বিত্তহীনদের জীবনসংগ্রামের কাহিনী বর্ণনা প্রসঙ্গে মেঘরবস্তি, সাঁওতাল ডেরা থেকে শুরু করে ক্ষুদে ও মাঝারি হোটেল এবং মধ্যবিত্ত গৃহের অন্তরালবর্তী চিত্র উদ্ঘাটিত হয়েছে। উঠতি বিত্তবান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকদের অন্তঃসারশূন্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত জীবনযাত্রা ও তাদের আসল রূপ প্রাসঙ্গিকভাবে এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে।

এ ছাড়াও শ্রমজীবী বিত্তহীনদেরকে অর্থের লালসায় প্রলুব্ধ করে বিত্তবান পুঁজিপতিরা কিভাবে হীনউদ্দেশ্য চরিতার্থ করে সমকালীন নগরজীবনের এই অনুদঘাটিত দিকটি এ উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণ।

গ্রন্থের নায়ক কালুকে কায়িক শ্রমের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলে কায়েমী স্বার্থ-চক্র ক্রমশ তাকে চুরি, গুন্ডামি। ও ডাকাতিতে প্ররোচিত করে। কালু প্রথমে চোর, তারপর গুন্ডা ও ডাকাতদের সর্দার হয়ে মিল-মালিক ও রাজনৈতিক নেতাদের হাতিয়ারে পর্যবসিত হয়। কাল্লুর এ ধরনের পরিণতির বাস্তবোচিত আলেখ্য ‘চৌরসন্ধি’ উপন্যাস। এই বৃত্তির জোরে কান্তু ধীরে ধীরে মিল-মালিক, ইঞ্জিনিয়ার ও অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের রীতিমতো খাতিরের লোক হয়ে ‘তুই’ থেকে ‘আপনি’ সম্বোধনে আদৃত হয়েছে এবং সবশেষে একজন ব্যবসায়ী হয়ে বসেছে।

যখন সে চুরি বা ডাকাতি করত তখন বিত্তবান ও মধ্যবিত্ত ঘরের বিশেষত দাম্পত্য-জীবনের অশান্তি এবং নৈতিক স্খলনের বাস্তবতা লক্ষ্য করে। কাল্লুর ডাকাতি-গুন্ডামির জগতটিও অবশ্য সমস্যা-সংকট মুক্ত ছিল না। নিত্য নতুন উৎকণ্ঠা, পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয়, সহকর্মীর বিশ্বাসঘাতকতা, নতুন দলের সঙ্গে। প্রতিযোগিতার বিপদ, বেকারত্ব, অনাহার, রোগ-ব্যাধি এবং অনিশ্চয়তার ভয়াবহ সংকট তার জীবনযাত্রাকে মাঝে-মধ্যে অচল করে ফেলেছে।

শওকত ওসমান দেখিয়েছেন, নিতান্ত বাঁচার তাগিদেই কাল্লু, বেচু সর্দার ও গফুরের পেছনে সমাজের সহায়-সম্বলহীনদের দল জড়ো হয় এবং অপরাধ করে। প্রচলিত সামাজিক আইনে এরা যদি অপরাধী হয় তবে বড় বড় চোর-ডাকাতরূপী বিত্তবান মিল মালিক, রাজনীতিকরাই বা কেন অপরাধী বলে গণ্য হবে না? সমাজের কর্তাব্যক্তিরা এসব তথাকথিত অপরাধীদের চেয়ে মহৎ হয় কেমন করে? এ জ্বলন্ত প্রশ্নের আলোকেই লেখকের শ্রেণী-সচেতন জীবনবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচয় ‘চৌরসন্ধি’-তে প্রতিফলিত।

 

 

নির্যাতিত, শোষিত জনজীবনের মুক্তি ঐ শ্রেণীর সমষ্টি অস্তিত্বের জাগরণের মধ্য দিয়ে সম্ভব হতে পারে তারই প্রতীকী প্রকাশ ‘রাজা উপাখ্যান’ (১৯৭০) উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে। উপন্যাসটির ঘটনাংশ পরিকল্পিত হয়েছে মহাকবি ফেরদৌসীর ‘শাহানামা’ কাব্যের অসমাপ্ত কল্পিত অংশ অবলম্বনে। ব্যক্তিস্বার্থ অপেক্ষা সমষ্টি স্বার্থের মূল্যচেতনা এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় বিষয়।

উপন্যাসটির বর্ণিত ঘটনা লক্ষ করলে আমরা দেখি, অত্যাচারী-প্রজাপীড়ক রাজা জাহুক দৈববাণী কর্তৃক অভিশপ্ত হলে দু’টি বিষাক্ত কালো গোক্ষুর সাপ তাঁর গলদেশ বেষ্টন করে থাকে। এবং সাপ দু’টির প্রতিদিনের খাদ্য হিসেবে নির্দেশিত হয় বিশ থেকে পঁচিশ জন যুবক-যুবতী অথবা জ্ঞানী বৃদ্ধের মগজ। রাজা জাহুক যদি খাদ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাঁর মগজই হবে সাপ দু’টির খাদ্য। রাজার প্রাণ রক্ষার জন্য সিপাহি সাস্ত্রীরা নিরপরাধ যুবক-যুবতী এবং ইলমদার বৃদ্ধদের বন্দি করে আনে সাপের আহার্য হিসেবে।

প্রাণ উৎসর্গকারীদের কাছে অজ্ঞাত থেকে যায় তাদের অকাল ও মর্মান্তিক পরিণতির কার্যকারণ। অপরপক্ষে, মাতৃহীনা রাজকুমারী গুলশানের নিঃসঙ্গ জীবন ক্রমাগত অসহনীয় হয়ে উঠতে থাকে। পিতার জীবনরক্ষার জন্য প্রাণদানকারীদের প্রতি মমত্ববোধ থেকে সে বন্দিশালায় গমন করে এবং হরমুজ নামক এক সুদর্শন যুবকের প্রতি প্রণয়াসক্ত হয়। হরমুজকে সে বন্দিদশা থেকে মুক্তিদান করলে হরমুজ তা প্রত্যাখ্যান করে।

রাজদুহিতা গুলশানের নিকট থেকে শাপগ্রস্ত রাজা জাইকের কাহিনী শোনার পর নিরপরাধ দেশবাসীর জীবনরক্ষার জন্য ঝুঁকি নিয়ে সে রাজার শাপমুক্তির চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করে। তার তপস্যা সাফল্য অর্জন করে। রাজা জাহুক শাপমুক্ত হয়ে জীবন সংক্রান্ত এক নতুন বোধে উপনীত হন-

“আমি জাহুক বাদশা নই। আমি নতুন রাজ্য গড়ব, যেখানে মানুষের জন্য কোন মানুষকে জুলুম ভোগ করতে হবে না। যে সকলের গোলাম হতে পারবে সে-ই হবে সকলের বাদশা।”

এভাবেই এ উপন্যাসে রূপকের আশ্রয়ে ঔপন্যাসিক শোষিত, অবরুদ্ধ সমাজজীবনে ব্যক্তিস্বার্থ অপেক্ষা যে সামষ্টিক স্বার্থের জন্য মানুষের নিরন্তর সাধনা, তা-ই উপস্থাপিত করেছেন ‘রাজা উপাখ্যান’ উপন্যাসে। রাজা জালুকের বন্দিশালা ষাটের দশকের স্বৈরশাসন কবলিত পাকিস্তান শাসিত বাংলাদেশের রূপক হিসেবে চিত্রায়িত হয়েছে বলা যায়।

এ সময়ের আত্মবিবরকামী ও পলায়নপর সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সামনে হরমুজকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন লেখক। এ চরিত্রের মুখে উচ্চারিত হয়েছে শ্রেণীবিভক্ত ও শোষণমূলক সমাজে ব্যক্তিস্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থাপন করার নিয়মের বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ।

তাই অভিশপ্ত রাজা জাছকের শাপমুক্তি এবং নতুন জীবনোপলব্ধিতে উত্তরণের মধ্য দিয়ে এ উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার সদর্থক ইঙ্গিত প্রতিফলিত হয়েছে। এভাবে শোষণ, বঞ্চনা, অত্যাচার, শৃঙ্খল জর্জরিত সমাজের প্রতি প্রবল ঘৃণা এবং তা থেকে উত্তরণের প্রতীকী ইঙ্গিত ‘রাজা উপাখ্যান’ উপন্যাসের অনন্যতাকে উপস্থাপন করেছে।

ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসের বিষয় ভাবনায় পাকিস্তান আমলের আয়ূবী শাসনের গণতান্ত্রিক অধিকারবর্জিত এবং সর্বপ্রকার স্বাধীনতাবঞ্চিত জনজীবনের সমস্যা ও সংকট হারুনর রশীদের বাগদাদের মধ্যযুগীয় পটভূমিকে আশ্রয় করে রূপায়িত হয়েছে। এই রূপকাশ্রয়ী উপন্যাসটিতে শ্রেণী চেতনার অন্তর্গত বাণীর স্বাক্ষরও সুস্পষ্ট।

উপন্যাটিতে ব্যক্ত জীবনার্থের মূলে রয়েছে মানুষের ব্যক্তিসত্তার স্বাধীনতার স্বীকৃতি। সমাজে বিদ্যমান শ্রেণী অবস্থানের উঁচু-নিচু বিভেদ সত্ত্বেও নিপীড়িত মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতার চেতনাকে স্তব্ধ বা হরণ করা সম্ভব নয়- তারই প্রতীকী প্রকাশ উপন্যাসটিতে বিধৃত।

উপন্যাসটির কাহিনী পর্যালোচনায় দেখি, প্রজাপীড়ক খলিফা হারুনর রশীদ অজস্র অপকর্মের স্মৃতিভার থেকে মুক্তিলাভের জন্য শান্তি সন্ধান করে ফিরছেন। এমন অবস্থায় একদিন তিনি তার হাবসী ক্রীতদাস তাতারী ও আর্মানীয় বানী মেহেরজানের প্রণয়োচ্ছ্বল হাসির লহরী শুনে, সে হাসিতে সুখের স্পর্শ খুঁজে ঈর্ষাকাতর হয়ে ওঠেন। উপন্যাসে দেখি তারই আবেগোত্থিত বর্ণনা-

“স্মৃতিদংশিত, নিঃসঙ্গ মানসিক অবস্থায় শান্তিপিপাসু খলিফার শ্রুতিতে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে ক্রীতদাস তাতারী এবং বাদী মেহেরজানের প্রেমপূর্ণ মিলনের আবেগোচ্ছ্বল হাস্যধারা। উৎকর্ণ হয়ে কিছুক্ষণ শোনার পর খলিফা উপলব্ধি করেন। এ হাসি ঠোঁট থেকে উৎসারিত হয় না। এর উৎস সুখ-ডগমগ হৃদয়ের নিভৃত প্রদেশ।

ঝর্ণা যেমন নির্জন পাহাড়ের উৎসঙ্গ-দেশ থেকে বেরিয়ে আসে উপলবিনুনী পাশে ঠেলে ঠেলে- বিজন পথভ্রষ্ট তৃষ্ণার্ত পথিককে সংগীতে আমন্ত্রণ দিতে— এই হাসি তেমনই বক্ষঝর্ণা— উৎসারিত। কিন্তু কে এই সুখীজন, আমার হিংসা হয়, মশরুর। আমি বাগদাদ- অধীশ্বর সুখ-ভিক্ষুক। সে তো আমার তুলনায় বাগদাদের ভিক্ষুক, তবু সুখের অধীশ্বর। কে সে?

এই অনুভবের প্রতিক্রিয়া তাঁর মধ্যে জন্ম দেয় ঈর্ষা ও প্রতিহিংসা। ‘ওরা হাসবে, আমি হাসতে পারব না? না, তা হয় না।’ অথবা ‘আহ্, ঐ হাসি আমি হাসতে পারতাম!’- এই প্রতিক্রিয়ার ফলস্বরূপ খলিফা হাবসী ক্রীতদাস তাতারীকে বন্দিত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে বাগদাদের একটি বাগিচায় দাসদাসী ও বিপুল সম্পদের মালিক করে দেন। আর মেহেরজানকে বেগম হিসেবে গ্রহণ করেন।

মেহেরজান খলিফাকৃত ব্যবস্থা মেনে নিলেও তাতারী তা মেনে নিতে পারে না। তার হাসি স্তব্ধ হয়ে যায় চিরদিনের জন্য। ক্রীতদাসের উজ্জ্বল হাসি শোনার আকাঙ্ক্ষায় প্রথমে তাকে তুষ্ট করার পথ বেছে নেয় খলিফা। এ উদ্যোগ ব্যর্থ হলে নির্যাতনকে পন্থা হিসেবে গ্রহণ করেন। সম্পদ, ঐশ্বর্য এবং ক্ষমতা দিয়ে অনেক কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব, কিন্তু মুক্তপ্রাণের হাসি সৃষ্টি করা যায় না। মৃত্যুর প্রাক্কালে খলিফার উদ্দেশে তাতারীর উচ্চারণে এ সত্যই প্রতিবিম্বিত :

“শোন, হারুনর রশীদ। দীরহাম দৌলত দিয়ে ক্রীতদাস গোলাম কেনা চলে। বান্দী কেনা সম্ভব- কিন্তু কিন্তু ক্রীতদাসের হাসিনা-না-না-না-।২০

উপন্যাসটিতে বিশেষ করে ক্রীতদাস তাতারীর মুখ নিঃসৃত উক্ত বাণীর মধ্য দিয়ে লেখক আসলে সেই শ্রেণী সত্যকেই রূপায়িত করেছেন যে, ক্ষমতা, অর্থ ও শক্তিবলে নির্বিত্ত মানুষের সুখ-শান্তি হরণ করা যায় ঠিকই, কিন্তু তার সত্তার স্বাধীনতা-স্বাধীকার চেতনাকে শত নিপীড়নেও স্তব্ধ করা যায় না। হাবসী ক্রীতদাস তাতারী চরিত্রের উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক এভাবেই শ্রেণী চেতনায় উত্তরণের দিক- নির্দেশ করেছেন।

Exit mobile version