Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

ঈর্ষা কাব্যনাটক

ঈর্ষা কাব্যনাটক

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ ঈর্ষা কাব্যনাটক । যা সৈয়দ শামসুল হকের সামাজিক কাব্যনাটক এর অন্তর্গত।

 

 

ঈর্ষা কাব্যনাটক

সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) রচিত ঈর্ষা (১৯৯০) নাটকটি বাংলা কাব্যনাটকের ইতিহাসে বিষয়ের অনন্যতায় ও নির্মাণশৈলীর স্বতন্ত্রতায় এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। বলা যায় ‘রাজনীতি-তাড়িত কাব্যনাট্যের বাইরে শিল্পকলাকে ভিত্তিভূমে রেখে সৈয়দ শামসুল হকের উচ্চাভিলাষী নাট্যকর্ম ঈর্ষা ও মানব মনস্তত্ত্বনির্ভর এ নাটকটি রচনার সময় নাট্যকারের ভাবনালোকে ছিল উইলিয়াম শেকস্পিয়রের (১৫৬৪-১৬১৬) কালজয়ী নাটক ওথেলো ( ১৬০৩)। তবে ওথেলো থেকে অনুপ্রাণিত হলেও তাঁর নাট্যভাবনা এখানে ভিন্নমাত্রিকতায় উপস্থাপিত হয়েছে। ঈর্ষা নাটকের প্রারম্ভে তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন :

ঈর্ষা আমি দীর্ঘকাল অবলোকন করেছি, দীর্ঘদিন এর সঙ্গে ঘরবাস করেছি; জীবনের সকল প্রসঙ্গের ভেতরে প্রেম ও দেহ-সংসর্গে স্থাপিত ঈর্ষাই আমার কাছে একমাত্র গ্রাহ্য হয়েছে। শিল্পে আমি ঈর্ষাকে যখন স্মরণ করি, অনিবার্যভাবে মনে পড়ে যায়, এবং আমার মতো অনেকেরই নিশ্চয়, শেকসপীয়রের ‘অথেলো’- ঈর্ষার নির্যাস নিয়ে এর চেয়ে অক্ষয় রচনা আমার জানা নেই। কিন্তু সেখানেও একদিন আমি আবিস্কার করি যে, ‘অথেলো’র ঈর্ষা এমন ঈর্ষা নয় যা সম্পূর্ণ মানবিক, সৎ অর্থে ‘পশু’ শব্দটি ব্যবহার করে বলতে পারি পশুদের ভেতরেও মোটা দাগে ‘অথেলো’-র প্রায় অনুরূপ ঈর্ষা এবং পরিণামে হত্যা সংঘটন দুর্লক্ষ নয়। অচিরেই আমার এ সিদ্ধান্তের সূত্র ধরে আমি অগ্রসর হই এবং অনুসন্ধান করতে থাকি ঈর্ষার এমন কোন রূপ আছে যা কেবল মানবের ভেতরেই প্রকাশিত হওয়া সম্ভব।

অতঃপর, প্রবাসে কোনো এক হোটেলে শীতাক্রান্ত কক্ষে নাট্যকার মুগ্ধ বিস্ময়ে আবিষ্কার করতে সক্ষম হন – মানৰ মনস্তত্ত্বে এমন একটি অনুভূতি আছে যেটি মানুষকে পশুসতা থেকে পৃথক করেছে। এবং সেটি হলো “ব্যক্তি নিজেই যখন নিজের প্রতি ঈর্ষান্বিত, ব্যক্তি নিজেই যখন নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী। […] প্রাণী জগতে একমাত্র মানুষই পারে তার নিজের ভেতরে একাধিক ব্যক্তিত্ব অনুভব করতে।’ সৈয়দ শামসুল হক নিজের আবিষ্কৃত একান্ত এই বোধ ও বিশ্বাসের রূপায়ণ ঘটিয়েছেন তাঁর ঈর্ষা নাটকের প্রৌঢ় চরিত্রের মাধমে। সমালোচকের মতে :

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় নানা ধরনের উচ্চকিত ঘোষণায় বিভিন্ন সময় সোচ্চার হয়েছে, মঞ্চে ঘোষিত আদর্শের বাহক হিসেবে শিল্পসফল একাধিক নাটকের সাক্ষাৎ আমরা পেয়েছি কিন্তু একটি বড় ঘাটতি সবসময় রয়ে গেছে। তা হল মানুষের বর্হিজগতের মতো করে অর্ন্তজগতের ওপর জোর দেওয়া হয়নি।

অথচ বর্হিজগৎ এবং অর্ন্তজগৎ দুই-ই সমানভাবে তাৎপর্যময়। বহুকালের এই অভাব পূরণে এগিয়ে এলেন আমাদের প্রধান নাট্যরচয়িতা সৈয়দ শামসুল হক, তাঁর একটি মৌলিক নাটক ঈর্ষা রচনার মধ্যদিয়ে। […] নর-নারীর প্রেম সঞ্জাত ঈর্ষা এ নাটকের উপজীব্য বিষয় হিসেবে খুব নতুনত্বের দাবিদার নয়, তবে সৈয়দ হক বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টি থেকে অবলোকন করেছেন।

নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের হাত ধরে এ নাটকটি মঞ্চে এলেও বর্তমানে প্রাঙ্গণেমোর নাট্যদলের প্রযোজনায় দেশ- বিদেশে ঈর্ষা নাটকটি নিয়মিত মঞ্চস্থ হচ্ছে ; এবং বলাবাহুল্য নাটকটির জনপ্রিয়তা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। বস্তুত, ‘সৈয়দ হকের মুন্সিয়ানা শুধু লেখার নয়, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ তিনি করেছেন। বিদেশি নাটকের ধাঁচ রপ্ত করে তিনি দেশীয় উপাদানে নাটক সমৃদ্ধ করতে পেরেছেন দক্ষতার সঙ্গে। তার একটি প্রমাণ ঈর্ষা।” ঈর্ষা নাটকটির প্রথম পরিচালক – নাট্যজন আতাউর রহমান নাটকটি প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন :

আমার নির্দেশক জীবনের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল ঈর্ষা নাটকের মঞ্চায়ন। যখন বাংলাদেশের মানুষরা বলাবলি করছিল, এই নাটকটি কেবল শ্রুতি নাটক হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে, আমি তখন এই নাটকটি নিয়মিতভাবে মঞ্চায়নে প্রণোদিত হই এবং এই নাটকের মঞ্চায়ন আমার নাট্য-নির্দেশক জীবনে বড় ধরনের সাফল্য নিয়ে আসে।

 

 

[…] সমগ্র নাটকজুড়ে আছে অনাস্বাদিত রূপকল্প, চিত্রকল্প ও উপমার সমাহার, যা নাট্য- সংলাপকে দিয়েছে অভাবিত অনন্যতা। আমি বিশ্বাস করি ঈর্ষা নাটকটি মঞ্চায়নের জন্যে আর কখনো পেছন ফিরে তাকাতে হবে না। এই নাটক দর্শক ও পাঠকের হৃদয় জয় করবে নিশ্চয়।

সৈয়দ শামসুল হকের ঈর্ষা নাটকের ঘটনাবস্তু অতি সংক্ষিপ্ত। প্রেম, প্রতারণা ও ঈর্ষাকে ঘিরেই এর নাট্যকাহিনি আবর্তিত হয়েছে। এ কাব্যনাটকটির মূল ঘটনাংশ হচ্ছে – আর্ট কলেজের এক ছাত্রীর প্রতি জনৈক প্রবীণ শিক্ষকের জৈবিক প্রেমাকর্ষণ। ছাত্রীটি তার অপরিণত বয়সের আবেগ-সংবেদনশীলতায় কিংবা শিল্পের প্রতি মুগ্ধতার কারণে যাবতীয় আড়ষ্টতা অতিক্রম করে প্রবীণ শিল্পীর নিকট নিজেকে নিবেদন করেছে। কিন্তু একটি পর্যায়ে সে অনুভব করতে পেরেছে যে তার শিক্ষক তার প্রতি সকাম প্রেমে জাগ্রত।

এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্যে সে বিয়ে করে ফেলে নিজেরই সহপাঠী বন্ধুকে। বলাবাহুল্য, এই যুবকটি তার প্রতি বরাবরই নিষ্কাম প্রেমবোধে জাগ্রত ছিল, এবং সহজাত মানবিক বোধ ও ভালোবাসায় তাকে জয় করতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রবীণ শিল্পীই যেহেতু মেয়েটির প্রথম প্রেমিক, সেহেতু সে চেয়েছে তার কাছ থেকে সুন্দর বোঝাপড়ার মাধ্যমে সরে আসতে। এই উপলব্ধি থেকে মেয়েটি প্রবীণ শিল্পীর কাছে বিদায় নিতে আসলে তিনি তাকে পরিত্যাগে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন, এবং তার সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।

এখান থেকেই মূলত ঈর্ষা নাটকের ঘটনাবস্তু শুরু। একদিকে প্রবীণ শিল্পীকর্তৃক যুবতী ছাত্রীকে যেতে না দেবার পেছনে নানান যুক্তি উপস্থাপন, অতীতের ভালবাসাপূর্ণ দিনের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে তাকে আবেগে বেঁধে ফেলার বাসনা; অন্যদিকে প্রবীণ শিল্পীর উপর মেয়েটির পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, প্রতারিত হবার ইতিহাস, তার মোহভঙ্গের কারণ যখন পারস্পরিক সংলাপে বর্ণিত ও ঘনীভূত হতে শুরু করেছে, তখন উপযুক্ত নাট্যচমক সৃষ্টি করে মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে যুবক চরিত্রটির দেখা যায় তার হৃদয়ও আকস্মিক প্রতারণার ধাক্কায় ক্ষতবিক্ষত।

কেননা আজই যে মেয়েটির সঙ্গে সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে, সে এতদিন তার অজান্তে প্রবীণ শিক্ষকের সঙ্গে একটি অনৈতিক সম্পর্ক চালিয়ে গেছে, এমনকি প্রৌঢ় শিল্পীর ন্যুড ছবির মডেল হতেও দ্বিধা করেনি। যুবকটি একজন মুক্তিযোদ্ধা। একদিন বঙ্গবন্ধুর ডাকে সে হাতে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র, দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে সে দেশ স্বাধীন করেছিল আকাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে। কিন্তু অচিরেই তার সে স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।

বিদ্যমান সমাজ ও রাষ্ট্রকর্তৃত প্রতারিত এই যুবক যখন এই নারীকে ভালোবেসে নতুন সুখী-সুন্দর জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখেছে, তখনও সে হয়েছে প্রতারণার শিকার। এমতাবস্থায় সে নিজেকে নারী ও ও প্রবীণ শিক্ষক – উভয়ের নিকট থেকে স্বেচ্ছায় সরিয়ে নিয়ে গেছে দূরে। আবার, যুবকটি যেমন নিজেকে প্রতারিত ভাবছে, মেয়েটিও ঠিক তেমনি ভাবেই প্রতারিত হয়েছে। আশৈশব শিল্পের প্রতি মেয়েটির ছিল দুর্বার আকর্ষণ।

সে একজন প্রকৃত শিল্পী হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই একদিন এই শহরে পা রেখেছিল। এমনকি প্রবীণ শিল্পীর সান্নিধ্যেও সে এসেছে শিল্পের প্রতি মমত্ববোধের কারণেই। কিন্তু দেখা গেল সে কেবলই ব্যবহৃত হয়েছে।

ছাত্রীর সঙ্গে আপত্তিকর সম্পর্কের কারণে প্রৌঢ় শিক্ষক তীব্রভাবে সমালোচিত হন। তাঁর শিক্ষার্থীরা তাঁর প্রতি তীব্র বিরূপতা প্রকাশ করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রৌঢ় শিল্পী অনুশোচনায় দগ্ধ হতে থাকেন। ক্ষয়ে পড়ে তাঁর অটল ব্যক্তিত্ব, ধসে পড়ে তার অহমবোধ; এবং উন্মোচিত হয় তারও প্রতারিত হওয়ার ইতিহাস।

জানা যায়, সে ছিল দরিদ্র পরিবারের সন্তান। শিল্পের প্রতি মুগ্ধতার কারণে, এবং শিল্পী হওয়ার দুর্মর তাড়না নিয়েই সে এই শহরে এসেছিল। কিন্তু এই শহরে যে তিনজন নারী তার জীবনে এসেছে, তাদের সবাই তাকে ব্যবহার করেছে কিন্তু প্রেম দেয়নি। তাদের কারো কাছে সে বঞ্চিত হয়েছে দরিদ্রতার কারণে, আবার কেউবা তাদের অসুখী দাম্পত্য জীবনে সাময়িক সুখপ্রাপ্তির প্রত্যাশায় তাকে বিনোদনের উপায় হিসেবে ব্যবহার করেছে। ফলে বঞ্চনাই হয়ে উঠেছে তার বিধিলিপি ।

 

 

মূলত, , ঈর্ষা নাটকে তিনটি চরিত্রেরই পৃথক পৃথক জীবন-কাহিনি রয়েছে ; তারা প্রত্যেকেরই প্রেমাকাঙ্ক্ষা ছিল। সবাই চেয়েছিল প্রেম-ভালোবাসায় পরিতৃপ্ত হতে। কিন্তু কারো জীবনেই প্রেম আসেনি। তাদের প্রত্যেকের যুক্তিবোধ পৃথক, জীবনবোধ আলাদা, প্রত্যাশার ধরনও ভিন্ন।

নাটকের শেষদৃশ্য অনেকটা রহস্যমণ্ডিত। শেষদৃশ্যে নারীর প্রৌঢ় বয়সের মঞ্চ-উপস্থিতি বাস্তব নাকি আত্মদ্বন্দ্বে পরাজিত বিকারগ্রস্ত শিল্পীর মনের কল্পনা, সে বিষয়টি সুষ্পষ্ট নয়। হয়তো লেখক নাট্যসমাপ্তি কিছুটা রহস্যাবৃত রেখে পুরোটাই ছেড়ে দিতে চেয়েছেন পাঠক-দর্শকের ভাবনা চিন্তার উপর। এ প্রসঙ্গে জনৈক সমালোচক নিম্নরূপ মন্তব্য করেছেন :

নাট্যকাহিনীর শেষ মুহূর্তে দেখা যায়, শিল্পীর কাঁধে যুবতী হাত রাখে – প্রৌঢ়শিল্পীর এই মহৎ উপলব্ধিতে যুবতী তাঁর প্রতি করুণা বোধ করেছে। অথবা প্রকৃতার্থে প্রৌঢ়শিল্পীকে ভালোবাসে যুবতী, তাই শিল্পীকে সে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছে। যুবতীকে এই ভালোবাসার পথ বয়সের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অর্জন করতে হয়েছে।

এজন্য নাট্যঘটনার শেষে যুবতী যখন প্রৌঢ়ের কাঁধে হাত রেখেছে তখন দেখা যায়, তার চুলেও সাদা পাকার মিশ্রণ। নাট্যকার যুবতীর চুলে পাক ধরিয়ে অবশ্যই তাকে প্রৌঢ়শিল্পীর বয়সী অভিজ্ঞতার সমান করে তুলতে চেয়েছেন। প্রৌঢ়ের ন্যায় যুবতীও বয়সের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই ভালোবাসার উপলব্ধির সাথে একাত্ম হতে সক্ষম হয়েছে।

আবার, অন্য আরেকজন সমালোচক বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন নিম্নরূপে : একজন শিল্পী তো শেষপর্যন্ত রক্তমাংসের মানুষ। নিজের হাহাকার প্রকাশ করার শেষে দেখা যায় যুবতী প্রৌঢ়ের কাঁধে হাত রেখেছে। প্রৌঢ় মুখ তুলে দেখে। কিন্তু তখন তার চুলে পাক ধরেছে। প্রৌঢ়ের শেষ সংলাপ এবং যুবতী বৃদ্ধাতে পরিণত হওয়া পর্যন্ত সময়ের ব্যাখ্যা এ নাটকে মেলে না। প্রচলিত নাটকের ক্ষেত্রে হয়তো নাট্যকার অন্য কোনো ব্যাখ্যা দিতেন। কোনো ঘোষক হয়তো বলত সময়ের হিসেব। এক্ষেত্রে দর্শকের উপর সব দায়িত্ব পড়েছে।

নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক পরবর্তীকালে তাঁর অপেক্ষমাণ (২০০৯) কাব্যনাটকে প্রৌঢ় চরিত্রের যে রূপ অংকন করেছেন, সেখানে নাটকের পরিসমাপ্তিতে কোথাও নারীর সঙ্গে প্রৌঢ় শিল্পীর মিলনের দৃশ্য নেই। বরং তিনি দেখিয়েছেন প্রৌঢ় শিল্পী শেষপর্যন্ত ব্যক্তিগত কামনা বাসনার উর্ধ্বে উঠে শিল্পের বিষয়তম সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করেছে।

স্টুডিওর আলো-আঁধারি কক্ষে বসে কোনো তন্বী নারীর ন্যুড শিল্পকলা নয়, বরং কোনো খরায় উজাড় হয়ে যাওয়া প্রান্তরে কীভাবে আশার সূর্য ওঠে – সেটিই তখন তার আরাধ্য বিষয়।  অতএব, ধরে নেয়া যায়, ঈর্ষা নাটকের শেষে প্রৌঢ় নারীর প্রবীণ শিল্পীর কাঁধে হাত রাখার দৃশ্য শুধুমাত্র বিরহকাতর প্রেমিকের কল্পনা; বাস্তবতা নয়। আবার বয়সের হিসেবেও সেটি অবাস্তবই। কেননা, প্রৌঢ় শিল্পী অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষক।

অন্যদিকে তন্বী নারীটি প্রৌঢ় অবস্থায় পৌঁছানো পর্যন্ত প্রবীণ শিল্পীর আয়ুষ্কাল অক্ষয় থাকার কথা নয়। এমনকি অনন্ত হীরার নির্দেশনায় প্রাঙ্গণেমোর নাট্যদল তাদের প্রযোজিত ঈর্ষা নাটকের অস্তিম দৃশ্যে প্রৌঢ় শিক্ষকের সঙ্গে সাদা-পাকা চুলের বয়স্ক ছাত্রীর মিলন দেখাননি। বরং তারা বেশ শিল্পিত উপায়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তুমি কি কেবলি ছবি’ গানটি ব্যবহার করেছেন।

বিশেষ করে প্রৌঢ়ব্যক্তির ছাত্রীটিকে নতুন করে ব্যক্তিজীবনে ফিরে পাবার মৌন আকুতির মুহূর্তটি আরও আবেগাত্মক হয়ে ওঠে যখন নেপথ্যে রবীন্দ্রনাথের এই গানের ‘নয়নসমুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই’ লাইনদুটো শোনা যায়। অর্থাৎ নাটকের অন্তিম দৃশ্যের পুরোটাই যে প্রৌঢ়শিল্পীর একান্ত ভঙ্গুর মুহূর্তের আবেগাত্মক কল্পনা – তা অনুধাবন করা যায়।

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিয়ম, আমলাতান্ত্রিক বিশৃংখলা, অবক্ষয়িত মুল্যবোধ, মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম, দ্বন্দ্ব, বেদনা, হতাশা প্রভৃতি নিয়ে অনেক নাটক রচিত হয়েছে। সমকালীন বাংলাদেশর সমাজজীবনের নানা ছবি উদ্ভাসিত হয়ে আছে এসব নাটকে। সৈয়দ শামসুল হক বিরচিত ঈর্ষা নাটকও তার ব্যতিক্রম নয়। ‘নর নারীর প্রেমসঞ্জাত ঈর্ষা নাটকের বিষয়বস্তু হলেও এতে আছে স্বদেশ প্রেম, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ।’ আবার ‘৮২ থেকে ৯০ পর্যন্ত দেশে অনেক স্বৈরাচার-বিরোধী মঞ্চনাটক রচিত হয়েছে যা নিয়মিত প্রদর্শনীর মধ্যদিয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছে।

[…] বাংলাদেশের নাট্যকর্মীরা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করতে গিয়ে একটি বিষয়ে স্পষ্টভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছে যে – স্বৈরাচার যেমন একটি ব্যক্তি, তেমনি স্বৈরাচার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও বটে। তাই ব্যক্তি স্বৈরাচারকে যেমন উৎখাত করা প্রয়োজন তেমনি স্বৈরাচারী যে ব্যবস্থা রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে বিদ্যমান তারও সমূলে উৎপাটন করা প্রয়োজন। ২ সৈয়দ শামসুল হক তাঁর আলোচ্য নাটকে এমনই এক স্বৈরাচার শিক্ষকের ছবি এঁকেছেন; যে ক্ষমতার দম্ভে নিজ শিক্ষার্থীদের পথভ্রষ্ট করেছে, নিজ মতাদর্শে পরিচালিত করতে চেয়েছে।

সৈয়দ শামসুল হক দেখিয়েছেন ভিন্ন মত, ভিন্ন পথ এদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় গ্রহণযোগ্য নয়। খ্যাতিমান শিক্ষক চান, কেবল তাঁর দেখানো পথেই ছাত্রকে চলতে হবে। তাঁকে অনুসরণ করেই ছাত্র এগিয়ে যাবে সম্মুখ পানে। কিন্তু এর বিপরীতে যেই যাবে সেই হবে শিক্ষকের বিরাগভাজন, সেখানে ছাত্রের যুক্তি ও দর্শন মূল্যবান হলেও সেটি গুরুত্ব পাবে না; বরং তার ভাগ্যাকাশে নেমে আসবে বিপর্যয়। নাটকে প্রৌঢ়শিল্পীর অঙ্কনের ক্ষেত্র বিমূর্ত চিত্রকলা। এটি চর্চা বা অনুশীলন করেই তিনি দক্ষিণ এশিয়ার নামকরা শিক্ষকে পরিণত হয়েছেন।

 

 

কিন্তু তরুণ ছাত্রটি বস্তুর ছবি হুবহু আকঁতে পছন্দ করে। যে কারণে সে শিক্ষকের বিমূর্ত ছবির পথ অনুসরণ না করে বেছে নিয়েছে মূর্ত ছবির পথ। ফলত, তাকে শিক্ষকের ক্রোধের মুখে পতিত হতে হয়েছে। কেননা বিমূর্ত ছবির শিক্ষক মূর্ত ছবিকে আর্ট হিসেবে বিবেচনা করেন না, তিনি মনে করেন এটি ক্যামেরার চোখে আঁকা, যা রং তুলির ব্যবহার বিচারে নগণ্য।

শিক্ষক এখানে ছাত্রের আগ্রহ ও পছন্দের মূল্য দেননি, স্বৈরনায়কের মতো তিনিও চেয়েছেন কেবল তার মতকেই প্রতিষ্ঠা করতে। ছাত্রকে বাগে আনতে ব্যর্থ হয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন প্রতিশোধপ্রবণ। ফলে ছাত্রটি পরীক্ষায় আকাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনে ব্যর্থ হয়। এ প্রসঙ্গে শিক্ষকের উদ্দেশে ছাত্রের বক্তব্যের প্রাসঙ্গিক এলাকা নিম্নে উপস্থাপন করা হলো :
আমি নিজে গাছ, বাড়ি, মানুষ ঠিক অবিকল করে আঁকতে ভালোবাসি।

কতদিন বলেছেন, ‘রঙ ছেড়ে, ব্রাশ ফেলে, তুমি কি আঁকতে চাও ক্যামেরার চোখ দিয়ে ?’ শেষবর্ষে আমি যে রেজাল্ট খারাপ করি, সে আমার আঁকবার দোষে নয়, আপনার কারণে, […]

নিজস্ব পথে চলে কুড়িয়েছি তাঁর নিষ্ঠুর বিরাগ, পরীক্ষায় খারাপ করেছি। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩২৯) যে শিক্ষক নিজের মত ও পথের সামান্যতম বিরোধ সহ্য করতে পারেননি, তিনিই আবার নির্জনে ছাত্রীকে ভালোবাসার মিথ্যে ছলনায় ভুলিয়ে, শিল্পের প্রতি তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন।

পিতার বয়সী একজন শিক্ষক শিল্প-সন্দর্শনের অজুহাতে ছাত্রীকে নিয়ে গেছেন বিভিন্ন স্থানে, নদী দেখার নাম করে পথে বেরিয়ে পড়েছেন, নৌকার সংকীর্ণ পরিসরের সুবিধা নিয়ে ছাত্রীর নিবিড় সান্নিধ্যে আসতে চাইছেন – এসব নিশ্চয়ই একজন সৎ শিক্ষকের পরিচয় বহন করে না। দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কার পাওয়া এমন একজন গুণী শিল্পীর এসব আচরণ প্রকৃতপক্ষে একটি অসুস্থ সমাজকেই প্রকটিত করে। বাস্তবে বর্তমান সমাজব্যবস্থায়ও এমন মুখোশধারী শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিকের অভাব নেই।

সৈয়দ শামসুল হক যখন তাঁর ঈর্ষা নাটক রচনা করেন তখন বাংলাদেশে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকারের শাসনামল চলছে। ‘এই আমল সাধারণ ভাবে স্বৈরাচারী আমল বলে পরিচিত। আমাদের বিবেচনায় স্বৈরাচার, পুরুষতন্ত্রেরই একটি বর্ধিত রূপ – অবশ্য এর সঙ্গে অন্যান্য অনেক উপাদান যুক্ত হয় […] এই ধরনের রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় সমাজ থাকে অস্থিতিশীল।

 

 

নারী-পুরুষভেদে সবাই থাকে নিরাপত্তাহীন। এক ধরনের ভয়- ভীতি আক্রান্ত সংস্কৃতির ভিতর বসবাস করতে হয় জনগণকে। এমনই একটি সমাজের চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে আলোচ্য নাটকে। যুবক যেমন নিজ প্রেয়সীকে শিক্ষকের কাছে নিরাপদ ভেবেছিল, কিন্তু তারই অজ্ঞাতে শিক্ষক ছাত্রীকে অনৈতিকতায় প্রলুব্ধ করেছে, লিবিডোতাত্ত্বিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করেছে, ধ্বংস করেছে সামাজিক মূল্যবোধ।

এ যেন বিদ্যমান অস্থির সামাজিক অবস্থারই প্রতিরূপ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করেছিল আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক মুক্তির প্রত্যয়ে। কিন্তু স্বাধীনতার পরও তাদের সে কাঙ্ক্ষিত মুক্তি অর্জিত হয়নি। ১৯৭৫ সালে জাতির জনকের নির্মম হত্যার পর এদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সামরিক শাসন।

সামরিক বাহিনী শাসনব্যবস্থাকে পোক্ত করবার জন্য অনৈতিক পন্থার আশ্রয় নিয়েছে, রাজনীতিকে করেছে কলুষিত, সুবিধাবাদীদের দিয়েছে মদদ। এর ফলে নৈতিকতা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে; মানুষ মত প্রকাশের স্বাধীনতা হারিয়েছে, জীবন হয়ে গেছে নিরাপত্তাহীন। যে সমাজে মানুষের নিরাপত্তা নেই, যে সমাজে চলে জবরদস্তি শাসনপ্রক্রিয়া, সে সমাজে ভালোবাসাও হয়ে পড়ে বিপন্ন।

এমন একটি সমাজব্যবস্থার প্রতীকী রূপ স্পষ্টতা পেয়েছে এ-নাটকে। এখানে দেখা যায়, প্রেমিকা ভালোবাসার নামে প্রেমিকের সঙ্গে ছলনা করছে: শিক্ষক তার দায়িত্ব বিস্মৃত হয়ে তাঁর ছাত্র-ছাত্রীর সঙ্গে প্রতারণা করছেন। এসব যে অবৈধ স্বৈরশাসনের ফল তা যুবক ছাত্রের সংলাপে চমৎকারভাবে অভিব্যক্ত হয়েছে :

কাদা, কাদাই তো সব

কালো কাদা, ময়লা কাদা হয়ে যায় আমাদের যা কিছু শ্রেষ্ঠ আর

ব্যক্তিগত মার্বেল সম্ভবত এই স্বৈরশাসনের কালে।

গৃহস্থ ঘুমোতে গেছে নিশ্চিন্ত হয়ে

আশা করছে আজ সে একটি ভালো স্বপ্ন দেখতে পাবে,

জেগে উঠে দ্যাখে নিঃশব্দে কখন ট্যাংক রাতের আঁধারে এসে

অবরোধ করে বসে আছে। কৃষক ফসল কাটতে গিয়ে দ্যাখে লুট হয়ে গেছে,

মাঠে শুধু পশুভোজ্য খড় পড়ে আছে – আল জুড়ে অসংখ্য পায়ের ছাপ –

অদূরেই আড়াআড়ি জোগালির লাশ পড়ে আছে।

এ কেমন কাল আজ বাংলাদেশে,

প্রত্যেকের দু’পায়ে শেকল কিন্তু চোখে দেখা যাচ্ছে না,

কান পাতলে শেকলের শব্দ শোনা যেতো কিন্তু হায়,

অধিকাংশ ব্যক্তিই বধির: […]

আজ সব মূল্যবোধ নির্বাসিত – প্রেমিকার হাতে আজ কালসাপ,

বন্ধুর ছদ্মবেশে আততায়ী পথে, কঠিন মুখোশে আটা জননীর মুখ,

এবং শিক্ষক আজ বিদ্যাদানের বদলে উদগ্রীব বিদ্যা চুরি করে নিতে, […]

এই হচ্ছে দেশ, আর এই হচ্ছে মানুষ, আর এই হচ্ছে সময় ; (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৩০)

অথচ যুবক একদিন রঙ তুলির জগৎ ছেড়ে এদেশকে ঘাতকের হাত থেকে মুক্ত করতে, দেশের জনগণের সুখ- শাস্তি-সমৃদ্ধি ফিরিয়ে দিতে হাতে রাইফেল আর গ্রেনেড তুলে নিয়েছিল; সে-সব স্মৃতি তর্পন করে যুবক ছাত্র বলছে : আপনার অজানা নয় আমার বয়স আর আমি কোন কালের সন্তান।

এ হাতে এখন তুলি, একদিন গ্রেনেড ছিল এই হাতে;

[…] আমি সেই বাংলার ছেলে যে বাংলা একদিন

রক্তে স্নান করে উঠেছিল, ধর্ষিত হয়েছিল, লুণ্ঠিত হয়েছিল।

যে বাংলা একদিন মুক্তিসেনা গেরিলার জন্ম দিয়েছিল।

আমি সেই মায়ের সন্তান যে মা রক্তাক্ত আঁচল ছিঁড়ে একদিন রাইফেলে

বেঁধে দিয়ে বলেছিল –

“তুই না ফিরিস তাতে দুঃখ নেই, দিন যেন ফেরে।’ (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৩১)

যে স্বপ্নাকাঙ্ক্ষাকে বুকে নিয়ে লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে সেও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, সে-স্বপ্ন আজ বিপন্নপ্রায়। এদেশের অগুনতি মানুষের বেদনার সঙ্গে সেও তাই হয়ে গেছে একাকার। অপ্রাপ্তি আর বেদনা- বঞ্চনাই এখন তার সম্বল।

স্বাধীনতা, বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু প্রশ্নে সৈয়দ শামসুল হক বরবরই স্থিরপ্রতিজ্ঞ ও সংবেদনশীল। কোটি মানুষের মতোই তিনি স্বপ্ন দেখেছেন – একদিন জাতির পিতার নেতৃত্বে এদেশের প্রকৃত মুক্তি অর্জিত হবে শ্রেণিভেদ, অর্থনৈতিক অসাম্য থাকবে না; প্রতিষ্ঠিত হবে গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র; যাবতীয় শোষণের পথ বন্ধ হবে। কিন্তু স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে ঘাতকের নির্মম বুলেটে মারা গেলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অতঃপর দেশেগণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার পরিবর্তে জেঁকে বসে সামরিক শাসন; দেশজুড়ে শুরু হয়ে যায় অত্যাচার, শোষণ, বৈষম্য, নিপীড়ন।

 

 

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থার এ- পরিবর্তন মেনে নিতে পারেননি সৈয়দ হক। জনগণের নির্বিকার অবস্থাসূত্রে তিনি তাই হয়ে উঠেছেন প্রশ্নমুখর

বলবেন, এখনতো দুঃসময়, বলবেন, একদিন মুক্তিযুদ্ধ করেছিলে,

সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলে, শোষণের শেষ হবে বলেছিলে,

শোষণ এখনো চলছে, গরীবি এখনো আছে,

আছে শুধু তাইই নয়, মৌলিক অধিকারও গেছে,

বাংলার চারিদিকে এখন কান্নার শব্দ, বাগান গোরস্তান,

গাছে গাছে শকুনের পাল বসে আছে; কই, কি করছো তোমরা ?

বসে আছো পিতার নিঃসাড় লাশ সামনে করে নিশ্চুপ উঠানে ?

কি হলো অস্ত্রের আর কি হলো যুদ্ধের ? আবার ঝাঁপিয়ে কেন পড়তে পারছো না ?

আবার বাংলায় কেন গেরিলার দল গড়ে তুলতে পারছো না ? – (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৩৩ )

বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যার ঘটনা নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হকের মস্তিস্কে এতটা তীব্র আলোড়ন তুলেছিল যে, তিনি পঁচাত্তর-পরবর্তী সাহিত্যকর্মে যখনই সুযোগ পেয়েছেন এই হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে পিতৃহত্যার বিচার চাইতে জাতিকে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করেছেন। নূরলদীনের সারাজীবন, এখানে এখন, গণনায়ক প্রত্যেকটি নাটকে বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে এ-বিষয়টি উল্লেখ করেছেন তিনি।

এমনকি তাঁর আশিতম জন্মদিন উপলক্ষ্যে বাংলা একাডেমি আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে আরো কর্তব্য সম্পাদনের আশায় নিজের দীর্ঘায়ু কামনা করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় ব্যক্তিক সম্পর্কের টানপোড়েন নিয়ে রচিত ঈর্ষা নাটকেও তিনি ‘বসে আছো পিতার নিঃসাড় লাশ সামনে করে নিশ্চুপ উঠানে’ বাক্যটি দিয়ে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকে নীরবে মেনে নেওয়া জাতিকে ধিক্কার জানিয়েছেন। আবার অন্যত্র যুবকের জবানিতে বাংলার এই নিষ্ঠুরতম ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন নিম্নরূপে :

যখন প্রস্তুত আমি ব্রাশের ডগায়

স্বাধীন বাংলার, সোনার বাংলার […] ছবিগুলো ক্যানভাসে নামাতে,

ঠিক তক্ষুণি শকুন আবার এসে হানা দিলো;

দগদগে ঘন কালো রঙে ক্যানভাস ঢেকে দিলো আমার ক্যানভাস […]

জাতির পিতার রক্তে ভিজে গেল বাংলার আঁচল।

যুদ্ধশেষে পিতার কি বিশাল করুণায় যারা ক্ষমা পেয়েছিল,

নিষ্করুণ হাতে তারা কেড়ে নিলো স্বপ্নের সমস্ত অর্জন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৩৬)

বঙ্গবন্ধুর ডাকে একদিন এদেশের আপামর জনগণ তাদের সর্বশক্তি দিয়ে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ঈর্ষা নাটকের যুবকও তেমনি হাতের রং-তুলি-ব্রাশ ফেলে গেরিলাযোদ্ধা হিসেবে ট্রেনিং করে ঢাকা শহরেই একধিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। যুবক হয়তো পালিয়ে থাকতে পারত, নয়তো বিদেশে পাড়ি জমাতে পারতো সমকালীন অন্য অনেকের মতো; কিন্তু সে নিজের কর্তব্যে, বিবেকের কাছে পরিচ্ছন্ন থাকতে বেছে নিয়েছে যুদ্ধের পথ।

কেননা, তার মতে বাড়িতে ডাকাত এলে বেহালা বাদককেও হাতে বল্লম তুলে নিতে হয়। যুবক সর্বশক্তি দিয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে দেশের হয়ে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু যুদ্ধশেষে ফিরে এসে দেখতে পেয়েছে তার জন্মভূমিতে এখনো নতুন সূর্য উদয় হয়নি, বরং দেশজুড়ে নেমে এসেছে অমানিশার অন্ধকার

যুদ্ধশেষে ফিরলাম; ঘরে পৌঁছে দেখি, গ্রাম এক বিরান গোরস্তান,

বাংলাঘরে বাবা বসে পাথরের মূর্তির মতো,

রাজাকার ও আর্মির হাতে তিনভাই নিহত, ভাবীদের দু’জন ধর্ষিতা –

একজন আত্মহত্যা করেছে এবং আরেকজন হয়ে গেছে বদ্ধ পাগল; (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৩৫)

এ অবস্থায়ও যুবক ছাত্র ভগ্নহৃদয়কে সম্বল করে নব উৎসাহে রঙ তুলিতে রূপসী বাংলার ছবি আঁকতে আর্ট কলেজে ভর্তি হয়েছে। প্রবীণ-শিল্পী ও শিক্ষক তাকে সম্ভাষণ জানিয়ে বলেছিলেন : ‘আমাদের গর্ব তুমি, যেমন যুদ্ধে তুমি, আশাকরি শিল্পের প্রাঙ্গণেও জয়ী হবে’। কিন্তু অচিরেই যুবকের স্বপ্ন আরও একবার বাধাগ্রস্ত হয়। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে বাংলার আকাশে শকুনের আবির্ভাব হয় আবারো।

 

 

এবার একাত্তরের পরাজিত শক্তি যেন নতুন করে প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরপরই তারা রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবার নিধনের মিশনে নেমে পড়ে। ফলে এই আক্রমণ থেকে বাদ যায় না যুবকের পরিবারও । এমনিতে মুক্তিযুদ্ধের সময় সবাইকে হারিয়ে কেবল মৃতপ্রায় বৃদ্ধ পিতা আর মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত বোনকে নিয়ে টিকেছিল যুবকের পরিবার। কিন্তু এবার তারাও বাদ পড়ে না অত্যাচারীদের হাত থেকে।

পুত্র মুক্তিযোদ্ধা – এই অভিযোগে পিতার চোখ উপড়ে ফেলে তারা। যুদ্ধকালে পানাপুকুরে ডুবে থেকে যুবকের যে বোন নিজ সম্ভ্রম বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিল, এবার স্বাধীন বাংলায় সে বোন আর নিজেকে বাঁচাতে পারল না। ধর্ষণের শিকার হয়ে লজ্জায় ও কষ্টে সে আত্নহত্যা করে। এসব দেখে-শুনে আত্মদহনে যুবকের মা হয়ে যান রুদ্ধবাক :

পরাজিত শত্রুর দালাল আর নব্য রাজাকার

একদিন আমার বাবার চোখ উপড়ে তুলে নিলো। অপরাধ ? –

তার ছেলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। অপরাধ ? –

মানুষের মৌলিক অধিকার চেয়ে হাতে অস্ত্র ধরেছিল।

অপরাধ ? – তাঁর মেয়ে সুন্দরী যুবতী হয়ে উঠেছিল।

এবার বাংলার জলজ সবুজ পানা রক্ষা তাকে করতে পারে নি ; […]

ফসলের মাঠে তার নারীর গোপন রত্ন লুঠ হয়ে যায়,

সে আর ফেরেনি, ঈশানের বটগাছে কুমারীর শাড়িতে সে ফাঁসি নেয়।

সেই শোকে আজ অবধি মা আমার বোবা। – (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৩৬)

মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের কারণে যুবক ছাত্র ও তার পরিবার দেশদ্রোহীদের হাতে নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়েছে, তার পিতার চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে, বোনকে ঠেলে দেয়া হয়েছে আত্মহত্যার দিকে, আর ভাবির সম্ভ্রম হয়েছে লুণ্ঠিত। অন্যদিকে শিল্পকলার প্রবীণ শিক্ষক প্রেমের নামে তার প্রেমিকাকে কৌশলে শয্যাসঙ্গী করেছে। তাই যুবকের কণ্ঠে শিক্ষকের প্রতি ঝরে পড়েছে শ্লেষ :

এভাবে ওরা যা করেছে,

অন্যভাবে আপনিও তাই করেছেন –

আমার ক্যানভাসে আপনি কালো রঙ ঢেলে দিয়েছেন,

আমার দু’চোখ আপনি উপড়ে নিয়েছেন,

[…] আপনি তো বাংলারই লোক, আপনি বাংলায়ই বর্তমানে বাস করেছেন।

বর্তমানের রীতি যা চলেছে, আপনি তাইই করেছেন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৩৭)

যুবকের বিচারে বর্তমান সমাজে সবাই মুখোশের আড়ালে নিজেদের প্রকৃত স্বরূপ আড়াল করে চলেছে। শিক্ষকও খ্যাতিমান আদর্শ শিল্পীর মুখোশের আড়ালে নিজের অবদমিত কামনা-বাসনা চরিতার্থ করতে নারীসঙ্গ বেছে নিয়েছে, তার কামনাবহ্নি থেকে রেহাই পায়নি কন্যাতুল্য ছাত্রীও। যুবতী মেয়েটিও উপরিতলে যুবকের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে, কিন্তু গোপনে সাধনা করেছে প্রৌঢ় শিল্পীকে।

নিজের গোপন বাক্সে তার ছবি অতি সযতনে লুকিয়ে রেখেছে, এমনকি যুবকের সঙ্গে বিয়ের দিনই জরুরি কাজের অজুহাতে শিক্ষকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা তরুণ যুবকটি এই দ্বিচারিতা মেনে নিতে পারেনি। সে গ্রামের সরল-সুন্দর পরিবেশ থেকে উঠে আসা সত্যবান যুবক; কিছুতেই অভ্যস্ত হতে পারছেনা শহুরে মেকি সংস্কৃতির সঙ্গে।

যুবক অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এ পর্যায়ে গ্রামের সরলতার তুলনায় শহুরে অন্তঃসারশূন্য সমাজব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে বলেছে ‘আমি গ্রাম থেকে উঠে আসা লোক, / কাঁধের গামছা ছেড়েছি, কিন্তু এখনো রুমালে অভ্যস্ত নই; (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৪৯) কেননা এখন সমগ্র দেশ জুড়ে চলছে মিথ্যের রাজত্ব। রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ · সর্বত্রই মিথ্যাচার, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচার, মিথ্যার বেসাতি। সবাই মুখোশধারী । সমকালীন এই সমাজচিত্র যুবকের ভাষায় নিম্নরূপে বর্ণিত হয়েছে এভাবে :

সত্যের ভানে ভরা মানুষের মিথ্যের মুখোশ, […]

সে মুখোশ বৈশাখের মেলায় ওঠে না;

সে মুখোশ দেখতে হলে আয়নার সমুখে গিয়ে দাঁড়ালেই হয়। […]

মিথ্যেরই রাজত্ব এখন – প্রেম, শিল্প, রাষ্ট্র, সমাজ সব মিথ্যের মুখোশ পরে

কেমন মিছিল করে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ওপর দিয়ে পা টেনে চলেছে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৪৮)

গ্রামীণ পরিবেশে জন্ম-নেয়া ও বেড়ে ওঠা যুবকের পরিচয়প্রদানসূত্রে এ-নাটকে বিচ্ছিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে হাজার বছরের গ্রামীণ সমাজ-সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠানের রূপচিত্র। নাট্যকার এখানে একটি দুটি পঙক্তির ছোট ছোট কোলাজে যেমন করে বর্ণনা করেছেন, তা কেবলই বর্ণ ও শব্দে গঠিত বাক্যবিশেষ নয়, বরং শতরঙ আর তুলির মিশেলে শিল্পীর হাতের বাস্তব ছবি।

 

 

একটি গ্রামীণ ছবির প্রতিটি ডিটেইলস যেমন বর্ণনা করে থাকেন একজন শিল্পী জিজ্ঞাসু দর্শকের কাছে, নাট্যকার যুবকের সংলাপের মাধ্যমে ঠিক তেমন করেই গ্রামীণ সৌন্দর্য, সরলতার পাশাপাশি নির্মম বাস্তবতার ছবি এঁকেছেন। যেমন –

জানেন তো, গ্রামের গর্ভে আমার জন্ম, চেঁচিয়ে কথা বলা আমার অভ্যেস –

যেন আল পেরিয়ে দূরের পথিকের কাছে পৌঁছোয় আমার গলা ।

[…] মাঝরাতে উঠোনের মাঝখানে দুই সতীনের চুলোচুলি,

আর মরা জোছনার ভেতরে দাওয়ায় দাঁড়িয়ে স্বামীটি নির্বিকার চুলকোচ্ছে উরু।

কিন্তু আমি এও দেখেছি, লাল ডুরে শাড়ি পরা ছোট্ট মেয়ে

আঙিনার এককোণে একমনে সারাবেলা পুতুলের বিয়ে দিচ্ছে

জোনাকজ্বলা আঁধারে বাঁশী বাজাচ্ছে কেউ আর ঘরের

ভেতরে জালবন্দী মাছের মতো ঘাই দিচ্ছে কারো ভালবাসা। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৫৪ )

যুবকের সংলাপে নাট্যকার যখনই সুযোগ পেয়েছেন, বাংলার গ্রামীণ সমাজপ্রকৃতি বর্ণনা করেছেন। প্রৌঢ় শিল্পী ছবি আকেঁন বিমূর্ত, যেখানে বস্তুর অবিকল ছবি নয়, বস্তুর মৌলিক রং আর ফ্রেম মিলেমিশে একাকার হয়ে অদ্ভুত ভিন্ন এক রূপপ্রকৃতি লাভ করে। কিন্তু গ্রাম থেকে উঠে আসা যুবক শিল্পী গ্রামের মাঠ, প্রকৃতি, জীবন আর নিসর্গের রূপ ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে ভালবাসে। তবে কেবল কোমল প্রকৃতি নয়, গ্রামের দুর্দশা, দুর্ভিক্ষ ও তাকে সমানভাবে আকৃষ্ট করে। যুবকের এই ছবি আঁকার বিষয়সূত্রে নাটকের মধ্যে নাট্যকার গ্রামীণ নিসর্গের রূপচিত্রণের পাশাপশি অভাব অভিযোগের বাস্তবচিত্রও ফুটিয়ে তুলেছেন। যেমন :

আমি বাংলাদেশের দূর খর-উত্তরের,

মরে যাওয়া করতোয়া জন্ম থেকে দেখে আসছি, দেখে আসছি

বাংলার দুঃসহ বৈশাখের খরায় পুড়ে যাওয়া মাঠ, ভেঙে পড়া বাড়িঘর,

অনাহারী মানুষের লাশ আর মুমূর্ষু গাভীর বাঁট, উৎসন্ন হয়ে যাওয়া গ্রাম;

নির্মমভাবে সব প্রকাশিত (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৩৫ )

নাটকে শহুরে সমাজব্যবস্থার চিত্রও উপস্থাপিত হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে। এক্ষেত্রে প্রৌঢ় শিল্পীর সংলাপে তার প্রাক্তন উচ্চবিত্ত প্রেমিকার বাড়ির গৃহসজ্জা ও আচার-আপ্যায়নের যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে আশির দশকের বাংলাদেশের নবউত্থিত ধনিক শ্রেণির রুচি-সংস্কৃতির পরিচয় স্পষ্ট হয়েছে। প্রবীণ শিল্পী তার প্রথম প্রেমের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন :

কি সুন্দর সাজানো বাড়ি, বসবার ঘরে আর্টের ওপরে সব দামী বই,

বেয়ারার হাতে চা, অজানা নাশতায় ভরা ঢাকাওয়ালা ট্রে –

আমার চেয়েও খুব পরিস্কার ধবধবে জামা বেয়ারার। (কাব্যনাট্যসমগ্র ; ৩৪৪)

বস্তুত, নাট্যকার ‘প্রত্যক্ষে, পরোক্ষে এভাবেই এই নাটকে যুগাধিক কালের সামরিক শাসনে দেশের সামাজিক- অর্থনৈতিক জীর্ণতা, সমাজ-সাম্যের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ইত্যাদি অনুষঙ্গের পাশাপশি, উত্তরকালের বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার এ বিষয়টিরও স্পষ্ট উল্লেখ রেখেছেন যে বুর্জোয়া ঘরানার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনুকূলতায় স্বাভাবিক নিয়মেই দেশীয় এমন একটি বিত্তের উত্থান- আবির্ভাব ইতোমধ্যে ঘটে গেছে, যাৱা আত্মসমৃদ্ধির চূড়ান্ত স্বার্থাভিজ্ঞানে কুণ্ডলিত, দেশাত্মবোধের চেতনাস্খলিত।”

আবার, ‘যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের ক্যানভাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই যে চিত্র তাতে ধ্বংস, হত্যা, ধর্ষণ, বঞ্চনা এবং অভাব এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে আমাদের সকলের হৃদয়ে তখন। সেই ক্ষত থেকে চুইয়ে পড়া যে অপ্রাপ্তির আহাজারি, তা আমাদের শিল্প-সাহিত্যকে প্রভাবিত করবে এই তো স্বাভাবিক।” সৈয়দ শামসুল হক সমকালীন প্রাসঙ্গিকতাকে আত্তীকৃত করে এভাবেই কাব্যনাট্যের চিত্রায়ণ করেছেন।

মূলত, ‘আমাদের মুক্তি সংগ্রাম আমাদের দেশের মানুষের জীবনকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। আমাদের মানুষকে সাহসী হবার প্রেরণা দিয়েছে। এই চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে স্বাধীনতা-উত্তরকালের জীবনে, সংস্কৃতিতে। ফলে নাটকেও এলো হঠাৎ একটা পরিবর্তন। […] দর্শক নাটকের মাঝে নিজেদের জীবনকে খুঁজে পেতে চায়। নাটকে নিজেদের হতাশা-বেদনা- আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে চায়।” ঈর্ষা নাটকে সমকালীন বাংলাদেশের সেই রূপছবিই দৃশ্যায়িত হয়েছে।

Exit mobile version