ঈর্ষার শৈলিবিচার রচনাটি সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক : ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও শিল্প [পিএইচডি অভিসন্দর্ভ] এর অংশ। গবেষনাটির অথোর জান্নাত আরাসোহেলী। এই অভিসন্দর্ভের (পিএইচডি) বিষয় বাংলা নাটক – ইতিহাস ও সমালোচনা। প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাবর্ষ: ২০১৭-২০১৮। গবেষণাকর্মটি সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় আমরা সাহিত্য গুরুকুলে পুন-প্রকাশ করলাম।

ঈর্ষার শৈলিবিচার
সৈয়দ শামসুল হক মানুষের অন্তর্মুখী সত্তা ও হৃদয়জাত ঈর্ষার নান্দনিক রূপায়ণ ঘটিয়েছেন ঈর্ষা নাটকে। এ নাটকে মনুষ্য-স্বভাবের এমন একটি বিশেষ বৈশিষ্ট চিত্রায়িত হয়েছে, যা প্রাণিকুলের আর কারও মধ্যে নেই; এবং তা হচ্ছে মানবীয় ঈর্ষা।
‘ঈর্ষা সব অর্থে সৈয়দ শামসুল হকের সর্বাধুনিক নাট্য রচনা। বক্তব্য বিন্যাস, আঙ্গিক, চরিত্র-চিত্রণ ও ভাষার ব্যবহারে এ নাটকটির সাথে আর দশটি নাটকের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি সৈয়দ হকের আগের নাট্য রচনার সাথেও এর অনৈক্য চোখে পড়ে। ধমনীর ভেতরে এক ভিন্নতর শোণিত প্রবাহ থেকে উৎসারিত এ রচনা।
ঈর্ষা নাটকের প্রধান চরিত্র তিনটি; এবং তিনটি চরিত্রই নামহীন। চরিত্রগুলো প্রৌঢ়, যুবতী ও যুবক নামে নাটকে উপস্থাপিত হয়েছে। মুখ্যচরিত্র তিনটি হলেও এই তিনটি চরিত্রের সাতটি সংলাপের মাঝে অসংখ্য ছোট ছোট চরিত্রের নেপথ্য উপস্থিতি নাটকটিকে করে তুলেছে উপভোগ্য ও আকর্ষণীয়।
এ সকল নেপথ্য চরিত্র মূলত প্রধান তিনটি চরিত্রের স্মৃতির ক্যানভাসে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দুর মতো উপস্থিত হয়েই মিলিয়ে গেছে। কিন্তু তাদের এই উপস্থিতি নাটকটিকে শৈল্পিক ও রসঘন করে তুলতে পালন করেছে অসামান্য ভূমিকা । ঈর্ষা নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র প্রবীণ শিল্পী। প্রকৃতপক্ষে ‘ঈর্ষা নামক প্রবৃত্তির নতুন মাত্রিকতা আবিষ্কার করতে গিয়ে নাট্যকার মূলত প্রৌঢ় শিল্পীর আপন জীবন-সত্তার জটিল ব্যুহ ভেদ করেছেন। […] প্রথমদিকে তাকে নিছক কামাসক্ত পুরুষ বলে মনে হলেও শেষপর্যন্ত মানবিক দোষে-গুণে, দুর্বলতায় তাকে আমরা উজ্জ্বল চরিত্র হিসেবে দেখি।
সৈয়দ শামসুল হক নাটকে এই প্রৌঢ় ব্যক্তির সংলাপের মাধ্যমে দর্শকদের নাট্যঘটনার মধ্যে প্রবেশ করিয়েছেন। এই প্রৌঢ় ব্যক্তি একজন প্রবীণ শিল্পী। তাঁর কাছে বিদায় নিতে এসেছে এক তন্বী তরুণী, যে এখন বিবাহিত, এবং যার সঙ্গে এই প্রবীণ শিল্পীর ছিল প্রণয়ঘন সম্পর্ক। কিন্তু প্রবীণ শিল্পী অনাকাঙ্ক্ষিত এই বিদায় মেনে নিতে পারছেন না। তিনি বরং শিল্পানুরাগী এই মেয়েটিকে তাঁর জীবনের সঙ্গে লগ্ন করে রাখার প্রয়োজনে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অতীতের আবেগায়িত মুহূর্তগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছেন, তার ন্যুড ছবি জনসম্মুখে প্রকাশ করে দেবার হুমকি দিচ্ছেন।
একপর্যায়ে তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের প্রেমিকার জন্য আকুতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুশয্যায় বৌঠান কাদম্বরী দেবীকে স্মরণ প্রভৃতি বিষয় উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মেয়েটিকে আবেগায়িত করে তার প্রতি দুর্বল করে দিতে চাইছেন। নিজেকে জয়নুল এবং মেয়েটিকে জয়নুলের আকা গ্রামীণ নারীর প্রতিরূপে উপস্থাপন করে তিনি বলেছেন :
জয়নুল আর নেই, জয়নুলের বদলে আমি, আর সেই নারীটির বদলে তুমি,
বিশ্বে আর কেউ নেই, সকলেই চুপে সরে গেছে যেন আমাদের জন্যে সেই
জয়নুলের নদীতীর থেকে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩১৫)
কিন্তু এসবেও যখন মেয়েটির হৃদয় বিগলিত হয় না, তখন প্রকটভাবে প্রকাশ পায় প্রৌঢ়ের কুৎসিত চেহারা। অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে তিনি জানান – মেয়েটির এই বিয়ে, এই স্বামী কিছুই তিনি মানেন না। কেননা যেহেতু তাঁর সাথে মেয়েটির দৈহিক সম্পর্ক ছিল, সেহেতু তিনিই একমাত্র তার অধিকারভোগী।
এরপরেও যদি মেয়েটি তাকে ফেলে চলে যায়, তবে তিনি মেয়েটির গোপন ছবি জনসম্মুখে প্রকাশ করে শোধ নেবেন। যে যুবক ছেলেটির সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, তার কাছে পরাজিত হওয়ার প্রচণ্ড ক্ষোভ থেকে তিনি উচ্চারণ করেন :
সে সব গোপন ছবি আছে স্টুডিওতে,
কোনোদিন প্রদর্শনী করিনি সে চিত্রমালার; আজ আমি প্রতিশোধ নিতে পারি
আগামী সপ্তাহেই শিল্পকলা একাডেমি গ্যালারিতে চমকানো প্রদর্শনী করে (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩১৭)
এরপর যুবতী যখন যুক্তির পর যুক্তি তুলে ধরে প্রবীণ শিল্পীর ভোগী পুরুষ সত্তাটিকে টেনে হিচড়ে বের করে নিয়ে আসতে চায়, তখনি মঞ্চে প্রবেশ করে মেয়েটির সদ্যবিবাহিত স্বামী; প্রবীণ শিল্পীর যুবক ছাত্র। প্রবীণ শিল্পীর সঙ্গে তরুণীর গোপন সম্পর্কের তথ্য অবগত হয়ে সে স্তম্ভিত হয়ে যায়।
মুক্তিযোদ্ধা এই তরুণটি শিল্পীর এই পতিত অবস্থাকে দেশ ও সমাজের পতিত অবস্থার সঙ্গে তুলনা করে নিজেই এই অন্ধকারের পথ থেকে সরে যাওয়ার সংকল্প করে।। প্রৌঢ় ব্যক্তিটি এ পর্যায়ে কিছুটা মানবিক সত্তায় উন্নীত হয়ে যুবককে থামানোর চেষ্টা করে বলেন যে – মেয়েটির কোনো দোষ নেই। অতঃপর তাঁর বক্তব্যসূত্রে জানা যায়, মেয়েটির সঙ্গে তাঁর – অতীত প্রেমের ইতিহাস। এ পর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন যে, নারীর প্রতি আসলে তার কোনো প্রেমজ আকর্ষণ কাজ করেনি, হৃদয়ের কোনো টানও তিনি অনুভব করেননি :
আমার ভেতরে কোনো প্রেম ছিল না, ছিল নারীর প্রতি ঘৃণা,
ছিল নারীর কাছে বারবার পরাজিত হয়ে নারীকেই নষ্ট করার ক্রোধ। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৪৬ )

প্রকৃতপ্রস্তাবে প্রৌঢ়ের জীবনেও যৌবনের প্রারম্ভে ভালোবাসা ছিল। কিন্তু বিত্তগত অসমতার কারণে সে প্রেম- ভালোবাসা কখনো পূর্ণতা পায়নি। তিনি ছিলেন গরীব ঘরের মেধাবী সন্তান। কিন্তু সহপাঠী যে মেয়েটিকে তিনি ভালবেসেছিলেন, সে ছিল সমাজে উচ্চবিত্ত শ্রেণি থেকে আসা। ফলে দুজনের হৃদয়সৃষ্ট সেই ভালোবাসা আর পূর্ণরূপে বিকশিত হতে পারেনি। অচিরেই মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায় ‘সোনালি চশমা চোখে এক উঠতি সি-এস- পি’র সঙ্গে’।
শিল্পীর মনে এই দুঃখবোধ অত্যন্ত গভীর ও স্থায়ী হয়েছিল। এ যেন লুট হয়ে গেল গরীবের একমুঠো চাল।’ এই ঘটনার আঘাতেই শিল্পী প্রথম বিমূর্ত ছবির জগতে প্রবেশ করেন। এরপর তার জীবনে আরও নারী এসেছে। ছাত্রাবস্থায় বন্ধুর সঙ্গে পতিতালয়ে নারীর ন্যুড আকঁতে গিয়ে প্রথম তার শারীরিক সম্পর্কের অভিজ্ঞতা হয়েছে। আবার ধনী ঘর থেকে উঠে আসা এক আমলার স্ত্রী তার মধ্যেই খুঁজে নিতে চেয়েছে বঞ্চিত দাম্পত্য সুখ। শিল্পী যেটিকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন :
বেশি সুখে মানুষ অসুখী হয় – প্রথম দেখলাম ।
আরো দেখলাম, আমার না যত প্রয়োজন – ভ্যানিটি ব্যাগের আরো একটি ফুল চাই তাঁর।
(কাৰ্যনাট্যসমগ্র : ৩৪৫ )
এরপর, অচিরেই শিল্পী পেয়ে গেছেন তাঁর নতুন শিকার – শহীদ মুক্তিযোদ্ধার এক বিধবা স্ত্রী। এই নারীটির – হৃদয়ে ছিল তাঁর প্রাক্তন স্বামীর প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু নিজের নিঃসঙ্গ সময়গুলো ভাগ করে নিতেই শিল্পীর সান্নিধ্যে তিনি এসেছেন।
ফলে এখানেও দেহজ সম্পর্কের ঊর্ধ্বে কোনো হৃদয়জাত সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। কিন্তু হরিণের খাঁচার সম্মুখে প্রথম দেখা তরুণী ছাত্রীটি, তাঁর প্রৌঢ় জীবনে নতুন করে মোহের ঝড় তোলে। বিমূর্ত শিল্পের ভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে এই তরুণীকে নিয়ে তিনি চেয়েছেন মূর্ত শিল্পের ভুবনে ফিরে আসতে। এ পর্যায়ে তার অনুভূতি ছিল নিম্নরূপ :
তোমাকে দেখলাম। একজন মানুষকে দেখলাম।
এক নারীকে দেখলাম । মনে হলো, এই নারীটিকে ক্যানভাসে যদি ধরতে পারি।
তাহলে নারীকেই যে একদিন নষ্ট করেছি সজ্ঞানে, তার একটা প্রায়শ্চিত্ত হয়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৪৭ )
কিন্তু নিজেকে শুদ্ধ করার নামে তিনি যে রঙের খেলা শুরু করেন, তা অচিরেই আবার তার ভোগী সত্তাকে উস্কে দেয়। শিল্পের ঊর্ধ্বে গিয়ে সে তখন হয়ে ওঠে কামনা-বাসনাপূর্ণ রক্তমাংসের মানুষ। কিন্তু যুবতী দেহমুখী প্রেম নয়, দেহাতীত প্রেমই আকাঙ্ক্ষা করে প্রবীণ শিল্পীর কাছে। কিন্তু আকাঙ্ক্ষিত প্রেম অর্জনে ব্যর্থ হয়ে সে অতিদ্রুত বিয়ে করে ফেলে তারই প্রেমপ্রার্থী মূর্ত শিল্পের সন্ধানী মুক্তিযোদ্ধা যুবকটিকে। কিন্তু প্রবীণ শিল্পী তার এই চলে যাওয়া মানতে পারছেন না।
শিল্পাঙ্গনে যদিও তিনি অনেক খ্যাতিমান, অর্থ, যশ, প্রতাপ কিছুই আর এখন তার জীবনে অধরা নয়, তবুও ভেতরে ভেতরে বড়ো বেশি নিঃসঙ্গ। মেয়েটির সঙ্গে সম্পর্ককালে যে ভালোবাসা তিনি বোধ করেননি, সে চলে যাবার পর সেই হৃদয়জাত ভালোবাসা তিনি অনুভব করছেন প্রবলভাবে। আবেগায়িত চিত্তে মেয়েটিকে স্মরণ করে তিনি তাই বলেছেন :
হ্যাঁ, আমি একদিন ভালোবেসেছিলাম তাকে –
যেন আদিম, অরণ্যচারী, সবুজভুক এক গোত্রের জননী সে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৬৪ )
এ পর্যায়ে তিনি বুঝতে পেরেছেন যুবক ছাত্রটি নয়, তার মুক্তির প্রতিবন্ধক তিনি নিজেই; নিজেই তিনি এখন নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী। আবিষ্কার করতে পেরেছেন তিনি তাঁর মধ্যে দুটি সত্তা একসঙ্গে বাস করে ক্রমাগত – পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে :
আমিই আমার প্রতিদ্বন্দ্বী, তোমাকে ভালবেসে আমি একই সঙ্গে
জয়ী এবং পরজিত, পূর্ণ এবং শূন্য, ধনী এবং নিঃস্ব। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৬৬)
অবশেষে প্রবীণ শিল্পী তাঁর শিল্পিসত্তাকে পাশে ফেলে মেয়েটিকে ফিরে পাবার জন্য যে মানবিক আকুতি প্রকাশ করেছেন, তার মধ্যদিয়ে এ নাটকের সমাপ্তি হয়েছে। তবে এ চরিত্রটির যে বিকাশ ও পরিণতি নাট্যকার তার পরের কাব্যনাটক অপেক্ষমাণে দেখিয়েছেন, সেখানে দেখা যায়, প্রকৃতির সৌন্দর্য রঙ-তুলির মাধ্যমে ক্যানভাসে ধরার আগ্রহের মধ্যদিয়ে প্রৌঢ় শিল্পী তাঁর শিল্পিসত্তাকেই বিজয়ী করে তুলেছেন।
ঈর্ষা নাটকের যুবতী চরিত্রটি উন্মূল ও অনিকেত একটি চরিত্র। শিল্পের প্রতি তীব্র ভালোবাসা নিয়ে শিল্পের জগতে এসে মেয়েটির ঘটেছে সর্বনাশা বিপর্যয়। একদিকে খ্যাতিমান শিল্পীর কাছে শিল্পের পাঠ নিতে এসে সে ব্যবহৃত হয়েছে, অন্যদিকে তার প্রেমপ্রার্থী সদ্য বিবাহিত যুবক-শিল্পী তাকে ত্যাগ করেছে প্রবীণ শিল্পীর সঙ্গে প্রেমের তথ্যগোপনের অপরাধে।
কিন্তু নাট্যকার এই মেয়েটিকে বিপন্ন করে আঁকেননি। মেয়েটি চলার পথে বাধার শিকার হলেও, নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবার প্রত্যয় ছিল চোখে মুখে। প্রবীণ শিল্পীর শত আহবানে সে আর পেছন ফিরে তাকায়নি । নিজের মতো করে সে বাঁচতে চেয়েছে। বিদায় বেলার শেষ সংলাপে তার এই দৃঢ়চেতা মনের পরিচয় মেলে :
আমি প্রেম চেয়েছি জীবনে, আমি প্রেম চেয়েছি শিল্পে;
এতদিন মনে করতাম, প্রেম এসে যায়; আজ আমি জানলাম
যে কোনো প্রেমই কিন্তু আমাদের অর্জন করে নিতে হয়। […]
খুঁজলে কি আমিও পাবো না ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৬৩)
যুবতী ছাত্রী একদিন শিল্পী হওয়ার প্রত্যাশায় বাবার সঙ্গে ট্রেনে চেপে এই শহরে এসেছিল। তার শিশুমনে একদিন রঙের প্রভাব সঞ্চারিত করেছিলেন শিল্পী কামরুল হাসান। শিল্পের ভুবনকে তখন রূপকথার মতোই মনে হয়েছিল। আর এই ভালোলাগা থেকেই সে এসেছিল খ্যাতিমান প্রবীণ শিল্পীর সংস্পর্শে।
এরপর, বয়সের অনভিজ্ঞতায়, প্রবীণ শিল্পীর আকর্ষণকে হৃদয়জাত ভালোবাসা ভেবে তার সম্মুখে নিজেকে উন্মুক্ত করে দিতে সে দ্বিধা করেনি। কিন্তু একটা পর্যায়ে সে বুঝতে পেরেছে তার প্রতি শিল্পীর আকর্ষণ হৃদয়জাত নয়; শিল্পচর্চার মোড়কে কেবলই দেহসম্ভোগ। সে বুঝতে পারে :
আমি বিষয় ছিলাম, ব্যক্তি নই, আপনার কাছে।
আমাকে সন্ধান নয়, সন্ধান করেছেন আমার ভেতরে আপনি আঁকার বস্তুকে –
[…] আমার হৃদয় নয়, আমার শরীরে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩২৮)
এ অবস্থায় শিল্পীর প্রতি যুবতীর যাবতীয় মোহ কেটে যায়। কিন্তু অতঃপর যে যুবককে ভালোবেসে সে প্রৌঢ় শিল্পীকে ছেড়েছে, সেই পুরুষটিও কিছুতেই মেয়েটির প্রাক্তন প্রেমসম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি। মানবিক ঈর্ষা আর অহমবোধে তাড়িত হয়ে সে সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে পরিত্যাগ করেছে।
অতএব, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতারিত ও লাঞ্ছিত মেয়েটি পরিশেষে চিনে নিতে চেয়েছে নিজেই নিজের পথ। মেয়েটি এখানে ব্যবহৃত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সে সেখানেই স্থাণুর মতো বসে থাকেনি। ঈর্ষা নাটকে নারী চরিত্রের দৃঢ়তা প্রসঙ্গে সমালোচকের একটি মন্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে :
এই যুবতী ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এর কোনো গ্রাম্য বালিকা নয়, মিনতির মতো দেহজীবী নয়, এমনকি একদা রাজনীতি করা বর্তমানে পবিত্রতার রক্ষী – গৃহিণী সুলতানা নয়। এই যুবতী অনেক বেশি আত্মশক্তিসম্পন্ন, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও আধুনিকা। তাই তার শিক্ষকের ব্ল্যাকমেইলের জবাবে বলতে পারেন ‘যদি ইচ্ছে হয় করুন প্রদর্শনী আমার সিটিং থেকে আঁকা আপনার / নগ্নিকা সিরিজ দিয়ে। যাব আমি, আমার স্বামীটিও যাবে উদ্বোধনী দিনে। / এবং সে ছবিগুলো থেকে মানুষেরা নেবে, না আমাকে নয়, আপনাকে চিনে।
যুবক চরিত্রটি এ নাটকের অন্যতম চমক সৃষ্টিকারী একটি চরিত্র। যুবকের উপস্থিতিই এ নাটকে নাট্য-আকষর্ণ টানটান করে ধরে রেখেছে শেষপর্যন্ত। এছাড়া যুবক চরিত্রটির মধ্যদিয়ে কেবল ব্যক্তিক প্রেমের সম্পর্ক নয়, সমকালীন সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতির নিরেট বাস্তবতা অত্যন্ত নিপুণভাবে উঠে এসেছে; সামাজিক বিনষ্টি কী করে ব্যক্তি চরিত্রের ওপর প্রভাব ফেলে, তা জানা গেছে এই যুবক চরিত্রটির সংলাপের মাধ্যমেই। দেখতে গেলে – যুবক চরিত্রটিও সর্বপ্রতারণার শিকার।
দেশের মুক্তির জন্য যে একদা প্রাণপণ লড়াই করেছে, সেই – দেশ আজ স্বৈরশাসকের কবলে অবরুদ্ধ, মত প্রকাশের স্বাধীনতাটুকু নেই সেখানে। এরপর সমাজ ভুলে সে যখন ব্যক্তিপ্রেমে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চেয়েছে, তখনই ধরা পড়েছে পিতৃতুল্য শিক্ষকের লাম্পট্যের নগ্নচিত্র; আর সদ্যবিবাহিত স্ত্রীর তার অগোচরে অন্যপুরুষের সঙ্গে দেহজ সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার মতো প্রতারণার ঘটনা। এই প্রতারণা, এই ছদ্মবেশ একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সে মেনে নিতে পারেনি। ফলে নীরবে সরে গেছে। স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে সে বলেছে :
আমি এই মুহূর্তে সরল হৃদয়ে অধিকার ত্যাগ করলাম ।
তুমি থাকো প্রেম নিয়ে, প্রেমহীন আমি চললাম। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৩৮)
একজন প্রকৃত যোদ্ধার মতোই যুক্তি দাঁড় করিয়েছে সে, স্বৈরশ্বাসনের কালে আর কাদা ঘেঁটে লাভ নেই। দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপটে সামরিক বুটের ভয়ে প্রত্যেকের পায়ে যখন অদৃশ্য শেকল, এই দেশ যখন অমাবস্যার ঘন দুর্যোগে আচ্ছন্ন, তখন ব্যক্তির চারিত্রিক পতন অনিবার্য। রাষ্ট্রের বিপদে পথে নামা যায়, মিছিল করা যায়, কিন্তু একান্ত ব্যক্তিগত প্রপঞ্চনার কষ্ট নীরবেই হৃদয়ে রক্তক্ষরণ সৃষ্টি করে। যুবকের মতে :
এই হচ্ছে দেশ, আর এই হচ্ছে মানুষ, আর এই হচ্ছে সময় ;
তাই আমি অবাক বা দুঃখিত বা ক্রুদ্ধ নই। […]
যদি নষ্ট হয়ে যায় নিজের ফসলের মাঠ, কি তবে কর্তব্য হয় ? –
মিছিল কি নামানো যায় ? শ্লোগান কি দেয়া যায় ? – (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৩০ )
যুবকটি একটি পর্যায়ে প্রৌঢ় শিল্পীকে জানায় – সে যদি বুঝতে পারতো একটি মুহূর্তের জন্য হলেও প্রবীণ শিল্পী ভোগের ঊর্ধ্বে উঠে ছাত্রীটির হৃদয়কে ভালবেসেছে, তবে হয়তো সে তাকে শ্রদ্ধা করতো; কিন্তু যেখানে সুস্পষ্ট যে, এ মিলন কেবল দেহজ সংসর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, প্রাণের আকুতি নেই সেখানে, ফলত শিক্ষক ও ছাত্রী – – উভয়ের প্রতিই তার কেবল ঘৃণা অবশিষ্ট আছে।
একদিন রাজাকার-আলবদর যেমন তার মুক্তিকামী সত্তার বিরোধিতা করেছিল, স্বৈরশাসকের অপশাসন যেমন তার স্বপ্ন লুট করেছে, তেমনি প্রবীণ শিক্ষকও আজ তার অগোচরে প্রেমকে লুট করে নিয়ে গেছে।
অন্যদিকে সে বুঝতে পেরেছে, এই নারীটির গোপন এই সম্পর্ক জানার পরও তার পক্ষে সম্ভব হবে না তার সাথে সংসার করা, কেননা সে গ্রাম থেকে উঠে আসা যুবক, ‘গামছা ছেড়েছে কিন্তু রুমালে অভ্যস্ত নয়’। তাই সেও শেষপর্যন্ত আশ্রয় নিতে চেয়েছে শিল্পের ছোঁয়ায়। সেটি একান্তই তার ব্যক্তিনির্মিত জগৎ ; সেখানে স্থান নেই কোনো ভ্রষ্ট প্রেমিকা কিংবা লুটেরা শিক্ষকের।

এছাড়া নাটকে নেপথ্য চরিত্র হিসেবে এসেছেন জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানের মতো মহৎশিল্পীরা। জয়নুল আবেদিন বর্ণিত হয়েছেন প্রৌঢ় শিল্পীর স্মৃতিকথায়। আর কামরুল হাসান উপস্থাপিত হয়েছেন যুবতীর জবানিতে। নাটকে এদের আলাদা কোনো উপস্থিতি না থাকলেও প্রধান চরিত্রগুলোর বিকাশে এঁরা নেপথ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
অন্যদিকে প্রৌঢ় শিল্পীর প্রাক্তন প্রেমিকাদের স্বল্পমুহূর্তের উপস্থিতি ঘটেছে প্রৌঢ়ের জবানিতে। শিল্পীর সংলাপে জানা গেছে তাদের জীবনের ছোটো ছোটো গল্প। প্রথম প্রেমিকা শিল্পীর প্রতি অনুরক্ত হয়েও শুধুমাত্র সামাজিক বৈষম্যের কারণে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে সরকারি বড় অফিসারকে। দ্বিতীয় প্রেমিকা ছিল এক সরকারি আমলার স্ত্রী। অথচ দাম্পত্য জীবনে সে ছিল প্রচণ্ড অসুখী। যে কারণে সে শিল্পীর সাহচর্যে এসে সুখ খুঁজে নিতে চেয়েছে। প্রথম প্রেমিকা শিল্পীকে ছেড়ে বিত্তবান আমলাকে বিয়ে করেছে। আর দ্বিতীয় প্রেমিকা অর্থ-বিত্তে থেকেও সুখী হতে পারেনি। সমাজের এ এক নিদারুণ চিত্র।
প্রাঙ্গণেমোর নাট্যদল প্রযোজিত ঈর্ষা নাটকে – নেপথ্যে একটি প্রজেক্টরের নান্দনিক ব্যবহারের কথা না বললেই নয়। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর নাটকে তিনটিমাত্র চরিত্রের সমাবেশে আলোচ্য নাটকের নাট্যক্রিয়া রচনা করেছেন, কিন্তু অনন্ত হিরা তাঁর নির্দেশনায় মঞ্চে একটি প্রজেক্টর ব্যবহার করে তাকে চতুর্থ চরিত্র করে তুলেছেন।
এই প্রজেক্টর ব্যবহৃত হয়েছে বহুমাত্রিকতায়। কখনো সেটি মঞ্চসজ্জার অঙ্গ হিসেবে স্টুডিও ও বসার ঘরের বিভাজক দেয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, আবার কখনো সেখানে চিত্রিত হয়েছে মঞ্চে উপবিষ্ট চরিত্রগুলোর মনোছবি। যেমন, নারী চরিত্রটি যখন তার গ্রামের তিস্তা নদীর কথা বর্ণনা করেছে, তখন পেছনের প্রজেক্টরে তিস্তা নদীর চমৎকার চিত্র ভেসে উঠে পুরো মঞ্চটিকে সংলাপের আবহ-উপযোগী করে তুলেছে।
আবার বিমূর্ত চিত্রকলা, নারীর ন্যুড চিত্রাবলি ধারাবাহিকভাবে সংলাপানুসারে উপস্থাপিত হয়েছে সেখানে। এমনকি যুবক চরিত্রটি যখন মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছে তখন প্রজেক্টরে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ কিংবা উপর থেকে নিচে প্রবাহিত তরল লাল রক্তস্রোত চমৎকার এক বেদনামিশ্রিত অনুভূতি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ প্রজেক্টরটিও পরিপ্রেক্ষিতের চরিত্র হয়ে যেন কথা বলে উঠেছে। সফল নির্দেশকের হাতে একটি নিরীক্ষামূলক নাটক যে কতটা নান্দনিক ও বাস্তব হয়ে ওঠে তার প্রমাণ প্রাঙ্গণেমোর পরিবেশিত ঈর্ষা নাটক।
সৈয়দ শামসুল হক নাটকে সংলাপের শুরুতে ও শেষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চনির্দেশনা যুক্ত করেছেন। এর ফলে পরবর্তীকালে নাটকটির সফল মঞ্চায়নে নাট্যপরিচালকের সুবিধা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আতাউর রহমান মন্তব্য করেন :
ঈর্ষা নাটকের মঞ্চ সাফল্যের ব্যাপারে নাট্যকার নিজে এবং আমি নির্দেশক হিসেবে সন্দিহান ছিলাম।
প্রায় ২০ মিনিটের দীর্ঘ সাতটি সংলাপের এই নাটক নিয়ে দুরুদুরু বক্ষে নাট্যকার ও নির্দেশক অপেক্ষা করছিলাম। নাটকটি বাংলাদেশের মঞ্চ জয় তো করলই, কলকাতায় প্রজ্ঞাবান ও সাধারণ দর্শকেরা নাটকটির প্রযোজনা দেখে মাথা অবনত করল। বাংলা থিয়েটারের প্রবাদপুরুষ শ্রী শম্ভু মিত্র নাটকটি দেখে সৈয়দ হককে বলেছিলেন, আপনার মাথায় কি শেকসপিয়ার ও রবীন্দ্রনাথের ছন্দের জোড় একসঙ্গে খেলা করে ?
প্রায় চার মাসব্যাপী দীর্ঘ অনুশীলনের পর ১৯৯১ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ মহিলা সমিতি মঞ্চে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের ব্যানারে সৈয়দ শামসুল হকের ঈর্ষা নাটকটির শিল্পসফল মঞ্চায়ন সম্ভবপর হয়। শাটফটির প্রথম প্রদর্শনীতে দর্শক সংখ্যা ছিল প্রায় তিনশো জন। টিকিটের মূল্য ছিল বিশ, ত্রিশ ও পঞ্চাশ টাকা।
নাটকের প্রৌঢ় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জামালউদ্দিন হোসেন, তরুণ ছাত্রের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন নন্দিত অভিনেতা খালেদ খান। এবং তরুনী ছাত্রীটির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সারা যাকের। বলাবাহুল্য বাংলাদেশের অভিনয়জগতের গুণী এই তিন শিল্পীর অনন্য অভিনয় দক্ষতাতেই নাটকটি বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে উঠে এসে মঞ্চে জীবন্ত হয়ে ধরা দিতে পেরেছিল। এ প্রসঙ্গে নাট্যসমালোচক মফিদুল হক এক লেখনীতে উল্লেখ করেছিলেন :
ঈর্ষা দুরূহ নাটক, কিন্তু উঁচুমানের অভিনয় ও পরিকল্পনা আমাদের এমন এক নাট্যাভিজ্ঞতার সম্মুখীন করে যা দীর্ঘকাল মনে গেঁথে থাকবে। অভিনয়ে খালেদ খান অপূর্ব কৃতিত্বের পরিচয় রেখেছেন, তাঁর স্বর প্রক্ষেপণ ও বাচনিক দক্ষতা চরিত্রের গভীরতা ফুটিয়ে তুলতে সহায়ক হয়েছে। সারা যাকের চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে মানানসই করে নিতে পেরেছেন।
কেবল দু’একটি ক্ষেত্রে তার স্বরের বিলম্বিত লয় ভুল জায়গায় প্রযুক্ত হয়েছে বলে মনে হয়। জামালউদ্দিন হোসেন প্রৌঢ় শিল্পীর বেদনার ভাব প্রকাশে যতটা না সফল তার চেয়ে বেশি সার্থক হয়েছেন শিল্পীর অন্তর্দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তুলতে। তবে দাপটের সঙ্গেই দীর্ঘ একক সংলাপের জটিল নাটক, তিন গুণী শিল্পী মূর্ত করে তুলেছেন মঞ্চে।
অন্যদিকে প্রৌঢ় চরিত্রে রূপদানকারী অভিনেতা জামালউদ্দিন হোসেন এ-নাটকে তাঁর অভিনয়-অভিজ্ঞতা সম্পর্কে এক লেখনীতে বলেছেন :
একটি সংলাপের দৈর্ঘ্য দেখে আমরা, অভিনেতারা বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। … একি মুখস্ত করা সম্ভব! হক ভাই বললেন যে, তিনি পরীক্ষা করে দেখতে চান যে আমাদের দেশে মঞ্চনাটকের অভিনেতা অভিনেত্রীদের stamina ও tenacity কতটুকু। এটা একটা challenge! তাঁর আশ্চর্য কাব্যময় সংলাপের গুণে চ্যালেঞ্জটা আমরা নিতে পেরেছিলাম। *
অন্যদিকে, সেময়কার প্রযোজনায় মঞ্চের নেপথ্যে যারা কারিগর হিসেবে ছিলেন তারা হলেন :
নির্দেশনা : আতাউর রহমান, মঞ্চ পরিকল্পনা : মনসুর আহমদ, আলো পরিকল্পনা : দিলীপ ঘোষ, আলোক পরিকল্পনা সহকারী ও নিয়ন্ত্রণ : নাসিরুল হক, আলোক প্রক্ষেপণ : সিরাজ আহমদ, আবহ সঙ্গীত পরিকল্পনা : কে. বি. আল-আজাদ, পরিচ্ছদ পরিকল্পনা : টুটুল আহমেদ, রূপসজ্জা : বঙ্গজিৎ দত্ত, তপন দাস, মিলনায়তন অধিকর্তা : ফারুক আহমেদ।’
বর্তমানে প্রাঙ্গণেমোর নাট্যদলের প্রযোজনায় ঈর্ষা নাটকটি দেশে বিদেশে মঞ্চস্থ হচ্ছে।
প্রাঙ্গণেমোর নাট্যদলের অষ্টম প্রযোজনা সৈয়দ শামসুল হকের ঈর্ষা কাব্যনাটক। এ-সময় প্রৌঢ় চরিত্রে অভিনয় করছেন তরুণ অভিনেতা রামিজ রাজু, যুবক ছাত্রের ভূমিকায় অভিনয় করছেন অনন্ত হিরা এবং তরুণী ছাত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করছেন নূনা আফরোজ। নাটকটির নির্দেশনা দিচ্ছেন অনন্ত হিরা, মঞ্চপরিকল্পনা : শাহীনুর রহমান, আলোক পরিকল্পনা : জিল্লুর রহমান, সঙ্গীত : রামিজ রাজু এবং পোশাক পরিকল্পনা করছেন নূনা আফরোজ।
ঈর্ষা নাটকটিকে দীর্ঘদিন পর আবারো নতুন করে মঞ্চে আনার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রাঙ্গণেমোরের প্রতিষ্ঠাতা অনন্ত হীরা এ নাটকটির ভূয়সী প্রশংসা করে এ নাটকের প্রাসঙ্গিকতা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন :
ঈর্ষা নিঃসন্দেহে এ কালে তো বটেই আগামীকালেও নিরীক্ষাধর্মী কাব্যনাট্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রযোজনায় আতাউর রহমানের নির্দেশনায় ও দুঃসাহসিক নিরীক্ষার সঙ্গে খালেদ খান, সারা যাকের আর জামালউদ্দিন হোসেনের অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা ও সৈয়দ হকের কাব্যের জাদুতে হলভর্তি দর্শক বুঁদ হয়ে থেকেছে ওই নাটকের প্রতিটি প্রদর্শনীতে। ওই প্রযোজনা ২১ বছর পরেও আবার নতুন করে মঞ্চে যে এসেছে তা কেবল এ জন্যই ঈর্ষা নাটকটি যে কোনো চ্যালেঞ্জ আর নিরীক্ষাপিয়াসী নির্দেশক, অভিনেত্রী আর অভিনেতাকে যেন প্রেমিকার মতো করে আহ্বান জানাতে থাকে আর বলতে থাকে আমাকেও নাও, তোমার কর্মমুখর শিল্পজীবনে যুক্ত করো এবং নিজেকে নির্দেশক, অভিনেতা বা অভিনেত্রী হিসেবে অগ্নিপরীক্ষায় অবতীর্ণ করো, প্রমাণ করো নিজেকে মঞ্চতীর্থে।
সাতটি দীর্ঘ সংলাপের মাধ্যমে ঈর্ষা নাটকের আখ্যান রচিত হয়েছে। এখানে প্রৌঢ় চরিত্রের তিনটি সংলাপ ও যুবতী ও যুবক চরিত্রের দুটি করে সংলাপ রয়েছে। প্রৌঢ় চরিত্রের তিনটি সংলাপের পক্তি সংখ্যা যথাক্রমে ২৫১, ২৪২ ও ১৭১।
যুবতী চরিত্রের দুটি সংলাপের পক্তি সংখ্যা ২৬৮ ও ২৮৪। অন্যদিকে যুবক চরিত্রের সংলাপে পক্তি সংখ্যা ৩৪৮ ও ২৪৬। প্রচলিত নাটকের ফর্মকে অনুসরণ না করে মৌলিক চিন্তনে এরকম নতুন নাট্যফরমেটে নাট্যউপস্থাপন সমকালে নাট্যবোদ্ধা ও নাট্যদর্শকদের মধ্যে দারুণ চমকসৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল।

সকলেই ভেবেছিলেন পাশ্চাত্ত্য নাটকের কোনো প্রভাবে হয়তো সৈয়দ শামসুল হক এদেশের প্রেক্ষাপটে নাটকের ফর্ম নিয়ে নিরীক্ষা করেছেন। কিন্তু নাট্যকার এই বিষয়টি উপলব্ধি করে নাটকের প্রারম্ভেই জানিয়েছেন, চমক সৃষ্টির জন্য নয় বরং বিষয়বস্তুর সঠিক উপস্থাপনাকে গুরুত্ব দিতেই তিনি সংক্ষিপ্ত চরিত্র এবং অঙ্ক-দৃশ্য বিভাজনবিহীন নাট্যকাঠামো গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন :
তিনটি চরিত্র আর তাদের দীর্ঘ সাতটি সংলাপে বয়ন করা হয়েছে এই নাটকের বস্ত্র; প্রচল বহির্ভূত এই করণ, বিষয়টির তুলনায় বেশি কৌতূহলের বলে মনে হতে পারে, এমনকি এর পাণ্ডুলিপিকালে কারো কারো মনে হয়েছে, তাই এখানেই বলে রাখা দরকার যে, কোনো চমক সৃষ্টির জন্যে নাটকের এ হেন রূপ আমি নির্মাণ করিনি; ঈর্ষার বিশুদ্ধ একটি মানবিক পরিস্থিতিই আমাকে ঠেলে দিয়েছে চরিত্র-সংখ্যা অন্তিম অবধি কমিয়ে রাখবার এবং অন্তর্মুখী দীর্ঘ সংলাপ বাঁধবার দিকে।
তিনটি চরিত্রই যেহেতু শিক্ষিত আধুনিক সমাজের প্রতিনিধি, নাট্যকার তাই এদের মুখের সংলাপে আধুনিক, মার্জিত চলিতভাষা প্রয়োগ করেছেন। তবে নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা যাবে তিনটি চরিত্রেরই বাক্যালাপে স্বতন্ত্র ঢং রয়েছে; উপমা-উৎপ্রেক্ষা-চিত্রকল্প চয়নে কিংবা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ শব্দপ্রয়োগে তারা হয়ে উঠেছে স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। প্রৌঢ় চরিত্রটি দেশের একজন নামকরা চিত্রশিল্পী।
খ্যাতি, অর্থ, বিত্ত সবকিছুতেই তিনি অন্য দুটি চরিত্র থেকে অপেক্ষাকৃত উঁচু অবস্থানে। তাই তাঁর বলা সংলাপের ভাষা দাম্ভিকতাপূর্ণ, গাম্ভীর্যমণ্ডিত। অন্যদিকে মেয়ে চরিত্রটি গ্রাম থেকে উঠে আসা একজন সাধারণ শিক্ষার্থী। যে-কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে হয়তো তার কথায় শ্লেষের উপস্থিতি আছে, তির্যক ভঙ্গিমা আছে কিন্তু তার মধ্যেও রোপিত হয়েছে ফেলে আসা গ্রামীণ চিত্রপট, ফেলে আসা ভালোবাসার নদী তিস্তার জন্য হাহাকার।
সে মূলত এ-কাব্যনাটকে ব্যবহৃত চরিত্র। তাই নিরুপায় অসহায়ত্ব তার সংলাপে অধিক স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে যুবক চরিত্রটিও গ্রাম থেকে উঠে আসা আর্টের শিক্ষার্থী। কিন্তু সে একাধারে মুক্তিযোদ্ধা। দেশের ক্রান্তিলগ্নে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যদিয়ে তার জীবন অতিবাহিত হয়েছে।
তাই তার ভাষায় যেমন দ্রোহ আছে, তেমনি দেশকে নিয়ে স্বপ্নও রয়েছে। সে-ও প্রৌঢ় ব্যক্তির সরাসরি ছাত্র, কিন্তু তার প্রতি হওয়া অন্যায়ের বিরোধিতা করতে গিয়ে সে ন প্রৌঢ় ব্যক্তিকেও ছেড়ে কথা বলেনি। বরং বিভিন্ন অনিয়ম ও বঞ্চনার কথা তুলে সে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবে তাঁদের সংলাপের ভাষায় একটি সাধারণ মিল সহজেই চোখে পড়েছে। সেটি হলো রঙের তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবহার। তাঁরা তিনজনই যেহেতু শিল্পের সঙ্গে জড়িত, তাই একজন নিপুণ দক্ষ শিল্পীর মতোই তাদের কথোপকথনে আর্টের নানান কৌশল ও রঙের উল্লেখ রয়েছে। যেমন :
ক. প্রৌঢ় শিল্পী :
আমি গাল থেকে রঙ মুছে, ঘষে তুলে, পানি দিয়ে ধুয়ে দিলাম, / ঐ, তোমার ওখানে সিঁদুরের লাল হয়ে গেল, অপরূপ ভারমিলিয়ন, / যেন সদ্য টিউব থেকে সরাসরি বাঁ গালে তোমার। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩২০)
খ. যুবতী :
বর্ষায় পাগল নদী, কালীগঙ্গা যদিও তিস্তার মতো খরস্রোতা নয়, / তিস্তার মতো তার ইয়োলো আকার নেই বর্ষার দু’কূল ভাসানো জলে, / সেই প্রথম দেখলাম, / স্যাপ গ্রীন কে যেন পানিতে বড় হালকা করে মিশিয়ে দিয়েছে – (কাব্যনাট্যসমগ্র: 323)
গ. যুবক
আহ্ যদি পারতাম রঙ তুলে নিতে, সব রঙ। প্রেমের কেমন রঙ? / আগুনের অরেঞ্জ? – নাকি প্রুসিয়ান ব্লু- ক্যাডমিয়াম ইয়োলো অথবা? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৩২)
অন্যদিকে, সৈয়দ শামসুল হক প্রমিত চলিত ভাষায় সংলাপগুলো সাজালেও প্রয়োজন অনুসারে সংলাপে ভাষার কথ্যরূপ সংযোজন করে ভাষাকে আরও নাট্যিক ও বাস্তব করে তুলেছেন। যেমন, প্রৌঢ় ব্যক্তির জবানিতে যখনই শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের স্মৃতিচারণমূলক কোনো সংলাপ বলিয়েছেন, তখনই নাট্যকার প্রমিত ভাষা ছেড়ে সংযুক্ত করেছেন ভাষার কথ্যরূপ।
ফলে প্রৌঢ় ব্যক্তির প্রমিত ভাষার একটানা কাব্যিক সংলাপের মাঝে হঠাৎ করে এমন আঞ্চলিক সংলাপ যেমন নাটকীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, তেমনিভাবে এই আঞ্চলিক সংলাপের মাধ্যমেই বিমূর্ত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন হঠাৎ করে আমাদের মাঝে মূর্ত ও জীবন্ত হয়ে উঠেছেন।

এই সংলাপ ব্যবহারের অভিনবত্বের কারণেই পাঠক-দর্শক যেন ফিরে গেছেন অসুস্থ জয়নুলের শয়নকক্ষে। এখানেই মূলত সৈয়দ শামসুল হকের সংলাপ নির্মাণের সার্থকতা। এরকম একটি সংলাপ দৃষ্টান্ত হিসেবে নিম্নে উপস্থাপন করা হলো :
তিনি বিদায়ের আগে, হাসপাতালের কেবিনে,
ক্যানসারে আক্রান্ত তাঁর কন্ঠস্বর, কর্কশ ও ফিসফিস, শোনা যায় কি যায় না,
জীবনে দ্বিতীয়বার আবার আমার কাঁধ এবার খামচে ধরে বললেন,
‘আমারে নি নিয়ে যাইতে পারো একবার সেই দুফর বেলায় ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে,
তারে আমি দ্যাখতাম।’- ‘কারে, স্যার ?’ – ‘আহ, কিচ্ছু বোঝো না।’ […]
‘তারে আমি আবার আকঁতাম,
আবার পাইলে তারে বিয়া করতাম।’ (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩১৫)
উল্লেখ্য যে, উপরিউক্ত সংলাপে প্রমিত ভাষার সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষার নিপুণ প্রয়োগের পাশাপাশি চরিত্রের উচ্চারিত একটানা সংলাপের মাঝে অদৃশ্য চরিত্রের সঙ্গে সংলাপ বিনিময়ের দৃষ্টান্তও রয়েছে। জয়নুল আবেদীনের ‘তারে আমি দ্যাখতাম’ সংলাপের পর প্রৌঢ় চরিত্রের সংলাপ ‘কারে স্যার?’ এর উত্তরে আবার জয়নুলের সংলাপ ‘আহ, কিচ্ছু বোঝোনা’ এখানে চমৎকার নাটকীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
পুরো কাব্যনাটকে চরিত্রের বহমান সংলাপের মাঝে মাঝে এরকম সংলাপ বিনিময়ে নাটকীয়তা নির্মাণের আরও বেশ কিছু উদাহরণ রয়েছে। যেমন – প্রৌঢ়শিল্পীর সঙ্গে যখন হরিণের খাঁচার সম্মুখে ছাত্রী মেয়েটির প্রথম সাক্ষাৎ হয়, – তখনও এরকম পারস্পরিক সংলাপ বিনিময়ে নাটকের আখ্যানভাগ অগ্রসর হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে দৃশ্যটি উপস্থাপন করা যেতে পারে :
একদিন মনে আছে – ভাস্কর্য বিভাগের দিকে যাচ্ছি,
তুমি হরিণের খাঁচার সমুখে, কোমল ও ছোট্ট দাঁতে কুচ কুচ করে ঘাস
ছিড়ে খাচ্ছে সে, আর তুমি বড় ঝুঁকে হরিণ দেখছো,
আমাকে দেখেই হাত তুলে থতমত খেয়ে বললে, ‘ভালো, স্যার?’
আমি বললাম, ‘কোন ইয়ার ? ‘প্রি-ডিগ্রি সেকেণ্ড, স্যার। স্যার?
অস্বীকার করবো না আজ, সেদিন প্রথম মনে হয়েছিল বুড়ো হয়ে গেছি, (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩১৯)
এখানে হরিণের খাঁচায় হরিণের কুচকুচ করে ঘাস খাওয়ার দৃশ্যও প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। পরবর্তীকালে যেটি বাস্তবরূপ লাভ করেছিল প্রৌঢ়ের মোহের খাঁচায় শিল্পচর্চার নামে হরিণীসম কুমারী ছাত্রীর অসহায় বন্দিদশা, এবং তাকে কুচ কুচ করে প্রৌঢ় শিক্ষককর্তৃক গ্রাস করার ঘটনাংশ।
এরকম সংলাপ বিনিময় ছাড়াও একটি চরিত্রের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সূত্রে অন্য আরেকটি চরিত্রের উচ্চারিত সংলাপ নাটকটিকে একক চরিত্রের দীর্ঘসংলাপের ক্লান্তি থেকে মুক্ত করে নাটকীয় পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। যেমন, নাটকের প্রথম সংলাপে প্রৌঢ় যখন এককভাবে সংলাপ বলে যাচ্ছেন নির্দিষ্ট কোনো প্রসঙ্গ নিয়ে, তখন হঠাৎ করেই তিনি একটি সংলাপ উচ্চারণ করেন, যা দ্বারা অপর নারীর চরিত্রের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সুষ্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যুবতীকে যখন প্রৌঢ় তার সাবেক প্রেমের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ করেই বলে ওঠেন :
– বাহ্, তবে স্পর্শেরও অধিকার নেই আর ? আঙুল ফেরালে ?
এত ঘৃণা ? অসহ্য এতই ? এতই দূরত্ব আজ ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩২০)
এই সংলাপে স্পষ্ট ভাবেই বোঝাগেছে সংলাপ বলার ফাঁকে প্রৌঢ় আবেগের আতিশয্যে যুবতীকে স্পর্শ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যুবতী তীব্রভাবে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে তার আঙুল সরিয়ে দিয়েছে। নাটকের সাতটি সংলাপের মাঝে মাঝে এমন অসংখ্য ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার শিল্পিত উপস্থাপন করেছেন নাট্যকার। আলোচ্য কাব্যনাট্যে সৈয়দ হকের তাৎপর্যপূর্ণ ভাষা ও ছন্দের গাঁথুনি সম্পর্কে জনৈক সমালোচকের একটি মন্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে :
ঈর্ষা কাব্যনাটকে সৈয়দ শামসুল হক দক্ষতার সাথে আধুনিক কবিতার ঢঙ ব্যবহার করেছেন। আধুনিক কালের কবিতায় ব্যবহৃত গদ্যছন্দের যে ব্যবহার দেখা যায়, তার যথাযথ ব্যবহার ঈর্ষা কাব্যনাটকে নাট্যকার দক্ষ হাতে করেছেন। শুধু গদ্যছন্দের দোলায় নাট্যসংলাপ দোলায়িত হয়নি, মাঝেমধ্যে নাট্যসংলাপে অক্ষরবৃত্তের ব্যবহারও লক্ষণীয়।
নাট্যসংলাপের আলংকারিক সৌন্দর্য রচনায় কবির ভাষা সংহত, মার্জিত। […] তাঁর কাব্যনাটকের সংলাপে অনায়াসে উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, চিত্রকল্প, অনুপ্রাস প্রভৃতির সন্ধান মেলে। যদিও অধিক পরিমাণে কাব্যিকতার ব্যবহারে কাব্যনাটকের নাট্যগুণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তথাপি সৈয়দ শামসুল হক দক্ষ হাতে তাঁর নাট্যসংলাপে কবিতার মাধুর্য মিশিয়ে দেন।
শিল্প বিষয়ে কবির ব্যবহৃত শব্দসমূহ শিল্পের ব্যবহারিক তাৎপর্য চিত্রশিল্পের প্রায়োগিক ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এ কাব্যনাটকের বিশিষ্টতা। ‘ ঈর্ষা কাব্যনাটকের কয়েকটি নান্দনিক কাব্যালংকারের উদাহরণ নিম্নে উপস্থাপন করা যেতে পারে :
উপমা
১. সমুখেই নিজস্ব করে নিজের কুটির আছে / সোনার ডাঁটার মতো খড় দিয়ে ছাওয়া (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩২৫)
২. আমি ফুলদানিটার মোড়ক খুলেছি কি খুলিনি তখনো, / ঠিক কালীগঙ্গার মতো আপনি চুমো হয়ে জড়িয়ে ধরলেন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩২৬)
৩. সিন্দাবাদের কাঁধে নাছোড় বৃদ্ধের মতো নিঃসঙ্গতার ভূত / কত দীর্ঘদিন আমি টেনে টেনে বয়ে বেড়িয়েছি, (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৪৩ )
৪. তারপর তাকে ঘিরে, নিবিষ্ট তাঁতীর মতো স্বপ্নের শাড়ি বুনলাম। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৪৪ )
৫. আপনার নির্জন ঘরে গোলাপি চাদরে শোয়া এমন একটা শরীর, / সরোদের মতো মাজা গা থেকে পিছলে পড়ছে আলো; (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৩৪৯ )
উৎপ্রেক্ষা :
১. তোমার সঙ্গে একটি জীবন গেছে, / যেন গেছে একটি মুহূর্তের মধ্যে শত শত শতাব্দীর কোটি কোটি দু’জনার প্রেম। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩১৩)
২. নীল, নীল নীল, কি ভীষণ নীল, যেন বিশাল চিলের ডানায় মোড়া পৃথিবীটা (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩১৩) –
৩. ভজলের কি অবিরাম চাপড় নৌকোয়, বেন আমাদের যুগলকে দেখে / করতালি দিয়ে চলেহে আনন্সে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩১৪ )
৪. কি আশ্চর্য আভা ছিল তোমার শরীরে, জগতের সমস্ত সিঁদুর যেন উপুড় / ঢেলেছে কেউ, (কাব্যনাট্যসমগ্র = 316)
৫. কোমল বৃক্ষের যেন ছোট দু’টি ডাল, তোমার পা, (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩১৬)

রূপক / প্রতীক :
১. ফেরে পাখি, পাখিরাই ফিরে আসে / সারাদিন পরে সন্ধ্যায় (৩১৩) [ প্রবীণ শিল্পী তার বাঞ্চিতা ছাত্রীকে প্রেমের বাঁধনে ফিরে আসার আহবান প্রসঙ্গে আলোচ্য পাখির নীড়ে ফিরে আসা প্রতীকের আশ্রয় নিয়েছেন
২. সেদিন প্রথম আমি এই মুখ, এই ফুল, জীবনের আশ্চর্য গোলাপটিকে / ক্যানভাসে আঁকতে চেয়েছি। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩১৮) | প্রবীণ শিল্পী তাঁর বিমূর্ত চিত্রজগৎ ভুলে ইঙ্গিত ছাত্রীর মোহে ভুলে তাঁর ন্যুড ছবি আকঁতে চেয়েছেন, আর এ প্রসঙ্গেই তিনি গোলাপ ফুলের রূপকের আশ্রয় নিয়েছেন।]
৩. যেখানে আমার প্রেম শাড়ি-জামা খুলে শুয়ে আছে, বসে আছে, উজ্জ্বল তেল রঙে দুঃসহ শোক হয়ে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৩১) (স্ত্রী এবং প্রেমিকার ন্যুড টিত্রকর্মকে যুবক দুঃসহ শোকের প্রতীকে বর্ণনা করেছে এখানে।]
৪. আমি গ্রাম থেকে উঠে আসা লোক, / কাঁধের গামছা ছেড়েছি, কিন্তু এখনো কমালে অভ্যন্ত নই; (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৪৯) [ যুবকের মধ্যে এখনও গ্রামীণ মৌলিক সংস্কৃতি অক্ষুণ্ণ রয়ে গেছে, যে কারনে সে শিল্পের দোহাই দিয়ে নিজ সদ্যবিবাহিতা স্ত্রীর অতীতে প্রৌঢ় শিল্পীর ন্যুড ছবির মডেল হবার বিষয়টি কেবল আধুনিক শিল্পের জন্য উদারতা হিসেবে মেনে নিতে পারছে না । এখানে গ্রাম্য সংস্কৃতি ফুটে উঠেছে গামছা প্রতীকে, আর শহুরে সংস্কৃতির প্রতীক রুমাল ব্যবহার ।]
৫. কি দোষ আপনাকে দেবো ? তন্দুর নিভু নিভু হয়ে এলে / সকলেই নতুন কাঠের জন্য বাজারে বেরোয়। আর তুমি সেই কাঠ। তুমি সেই তন্দুরের নির্বাক খোরাক। / যাক তবে কবরের গর্ভে যাক ভালোবাসা, /কাবিনের কাগজে ঠোঙা অন্ধবুড়ি এখন বানাক। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৫৫) [ এখানে প্রৌঢ় শিল্পীর নারী-লোলুপতার সঙ্গে অগ্নিগর্ভ তন্দুরের প্রতীকায়ন করা হয়েছে, এবং তার স্ত্রী বিনাবাক্যে সেখানে জ্বালাময়ী কাষ্ঠ হিসেবে ব্যবহৃত হযেছে। যে কারণে প্রতারিত যুবকের কাছে এখন মেয়েটির সঙ্গে বিয়ের কাবিন গুরুত্বহীন। সেটি এখন অন্ধ বুড়ির ঠোঙা বানানোর কাগজের মতোই তুচ্ছ, গুরুত্বহীন মামুলি কাগজমাত্র ।]
চিত্রকল্প
দেখেছি তিস্তাকে; বর্ষায় বিপুল বিস্তার, অরণ্য উপড়ে নিয়ে / প্রবল ঘূর্ণিতে তিস্তা ইয়োলো আকার বুকে হা হা করে দক্ষিণের দিকে/ ধেয়ে যায় দুই পাড় অবিরাম ভেঙে। আবার শীতের দিনে, / স্বচ্ছ শীর্ণ তিস্তা তার গতিহীন বুকে নীল জলরঙ নিয়ে চুপ,/তীরে মাছরাঙাটির মতো যেন একপায়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩২১ )
সমাসোক্তি :
১. সময়টা বিকেল ছিল, আকাশের নীল ছিড়ে মেঘেরা খাচ্ছিল, আমার ভেতরে / একটা ভীষণ ভীতু হরিণ খাচ্ছিল গোপন সবুজ ঘাস ছিড়ে ছিঁড়ে শব্দহীনভাবে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩১৯)
২. বাতাস নিঃশ্বাস হয়ে টের পাই সর্বাঙ্গে আমার কি যেন বলতে চায়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩২৪)
৩. চারিদিকে ছুটে ছুটে ক্লান্ত হয়ে / শেষ অবধি আমাকেই প্রতিধ্বনি বরফের কম্বল হয়ে জড়িয়ে ধরেছে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৪৩ )
৪. শীতের মৌসুম ছিল। হিমালয় থেকে শীত উড়ে আসছে বিশাল পাখায় … (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৫৬)

প্রবাদ / প্রবাদপ্রতিম বাক্য :
১. মানুষ দুর্বল তার অভ্যাসের কাছে। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৩৪১)
২. খ্যাতি বলে বিশ্বে কিছু নেই, আছে শুধু স্তুতি, আছে মিথ্যা প্রশংসার স্তূপ। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৪২)
৩. অটুট কিছুই নয়, সমস্তই হবে ক্ষয় ; / ক্ষয় থেকে পূর্ণিমার আবার উদয়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৫৬)
৪. বাড়িতে ডাকাত যদি পড়ে, বেহালা যে বাজায় তাকেও বল্লম হাতে নিতে হয়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৩৫)
আলোচ্য নাটকে সৈয়দ শামসুল হকের সংলাপ শব্দমাধুর্যে, ছন্দের লালিত্যে, উপমা-চিত্রকল্প-অলঙ্কারের সুষমবিন্যাসে অনন্য হয়ে ধরা দিয়েছে। নাটকটি মঞ্চে প্রদর্শিত হবার পর সকলেই এর ভাষামাধুর্য নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। তবে কোনো কোনো সমালোচকের কাছে কিছু সংলাপ বাহুলাদোষে দুষ্ট ও আরোপিত মনে হয়েছে। যেমন নাটকটির নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় পরিবেশিত মঞ্চপ্রদর্শনী উপভোগের পর নাট্যবোদ্ধা মফিদুল হক এ প্রসঙ্গে নিম্নরূপ মন্তব্য করেছিলেন :
নাটকে আরেক সাধুবাদ অভিনেতাদের প্রাপ্য। তারা কাব্যনাটকের সংলাপকে মুখের কথার কাছাকাছি নিয়ে এসছেন, ফলে সংলাপের ব্যল্পনা আরো তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে, এবং বাস্তবোচিত অভিনয় দীর্ঘ একক সংলাপের নাটকে যে একঘেয়েমি ও অভিনয়হীনতা, বিশেষত মঞ্চস্থিত অন্যান্য নীরব পাত্র পাত্রীর ক্ষেত্রে, তা অনেকটাই পরিহারে সক্ষম হয়েছে নাগরিকের প্রযোজনা।
এ ক্ষেত্রে নাট্যকারের অবদানও অনস্বীকার্য, তার চমৎকার স্বাদু সংলাপ প্রায় সর্বক্ষণ, বাংকার ভুলে চলে মঞ্চে। যদিও মাঝে মাঝে একবারে নিরেট রক্তবা সংলাপে মাথাচাড়া দিয়ে যে ওঠে না তা নয়, শুরুতেই যেমন আমরা শুনি ‘একবার চৌকাঠ পেরুলে আমাদের সমস্ত চৌকাঠ পাহাড় হয়ে বাধা দেয়। নাটকের শেষে প্রবীণ শিল্পীর শেষ সংলাপেও এসে যায় বাহুল্য বক্তব্য, অভিনেতা জামালউদ্দিন হোসেনও যেভাবে মঞ্চের অস্তিত্বের পার্থক্য বোঝাতে থাকেন সেখানে মূর্তিমান রসভঙ্গই ঘটে।
রসভঙ্গের আরো কিছু বিক্ষিপ্ত উদাহরণও রয়েছে। একটি ক্ষেত্রে অন্তত নাট্যকারকে অভিযুক্ত করতে হয়। যুবক শিল্পীর মুক্তিযুদ্ধকালীন অতীত চরিত্রে মাত্রা যুক্ত করলেও পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিজীন ও সামাজিক জীবন তোলপাড় হয়ে যাওয়ার যেসব বয়ান তা অভিভাষণ এবং আরোপিতও বটে। অনেকটাই মেঠো রাজনৈতিক ডেমাগোগিরি মতো এইসব প্রক্ষিপ্ত সংলাপ কোনো যুক্তি পরম্পরা বহন করে না।
আলোচ্য নাটকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) অপরিহার্যভাবে ব্যবহৃত হয়েছেন। নাট্যকার উপযুক্ত ভাবপ্রকাশে যেমন, তেমনি চরিত্রের অন্তর্গত বোধ প্রকাশেও রবীন্দ্র-সংগীত আবহ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নাটকটির প্রারম্ভে লেখক যে মঞ্চনিদের্শনা দিয়েছেন, সেখানে রবীন্দ্রনাথের একটি বিশেষ গানের কথা আবহ হিসেবে ব্যবহারের জন্য বলেছেন
দর্শক সমাগমের শুরু থেকেই মঞ্চ উন্মুক্ত এবং আলোকিত। একটি গানের সুর- রবীন্দ্রনাথের না বুঝে কারে তুমি ভাসালে আঁখি জলে – কেবল একটি বা দুটি যন্ত্রে বাদিত। ( কাব্যনাট্যসমগ্র: ৩১৩)
আবার প্রৌঢ় যখন তার অতীত জীবনের প্রেমিকাদের স্মৃতি স্মরণ করছিলেন, তখন তার তৃতীয় প্রেমিকা মুক্তিযোদ্ধার বিধবা স্ত্রীর সংগীতপ্রেম প্রসঙ্গে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে ব্যবহার করেছেন রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি সংগীত। প্রৌঢ়ের উক্তিতে নাট্যকার লিখেছেন :
আমাকে সান্ত্বনা দিতে একজন এলেন; নিঃসন্তান বিধবা মহিলা –
বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিল স্বামী; […]
কিছু কিছু গাইতেও পারতেন – গান শোনাতেন।
সেদিন দু’জনে দুলেছিনু বনে ফুলডোরে বাঁধা ঝুল না।’ (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৪৬)
এখানে রবীন্দ্রনাথের এই সংগীতটির ব্যবহার তাৎপর্যপূর্ণ একারণে যে, মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী বর্তমানে প্রবীণ শিল্পীর সাহচর্যে থাকা সত্ত্বেও এখনও যে তার শহীদ স্বামীর স্মৃতি ভুলতে পারেনি, তা স্পষ্ট করা। এর মাধ্যমে বর্তমান প্রেমিক শিল্পীর অন্তরে জন্ম নিয়েছে ঈর্ষাবোধ ।
আবার, , জীবনানন্দ দাশের মতো করে এ-নাটকে সৈয়দ হক রং ও প্রকৃতির ব্যবহার করেছেন। নাটকের বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপে যখনই গাছ, পাখি, নদী আর গ্রামীণ প্রকৃতির চিত্র বর্ণিত হয়েছে, তার মধ্যে কোনো না কোনো ভাবে জীবনানন্দ দাশ উকি ঝুকি দিয়েছেন। প্রেমে আবিষ্ট প্রৌঢ়ের চোখে যখন দুপুরের নিস্তব্ধতা ফুটিয়ে তুলেছেন নাট্যকার তখন ‘চিল’, ‘চিলের ডানা’র চিত্রকল্প প্রয়োগ করে লিখেছেন :
মনে পড়ে? একদিন দুপুর বেলায়, যে-রকম দুপুর বেলাকে আশ্চর্য নীল রঙ
বলে মনে হয় ; নীল নীল কি ভীষণ নীল, যেন বিশাল চিলের ডানায় মোড়া
পৃথিবীটা – স্বচ্ছ ডানা, ডানার ভেতর দিয়ে আলোর প্রবেশ। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩১৪)
চিলের প্রতীক জীবনানন্দ দাশের কবিতায় অসংখ্যবার ব্যবহৃত হয়েছে। এমন কি তাঁর বনলতা সেন কাব্যেও ‘হায় চিল’ নামক একটি কবিতা রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, মাত্র তিনটি চরিত্রের সাতটি সংলাপে রচিত সৈয়দ হকের ঈর্ষা কাব্যনাটক, বাংলাকাব্যনাটকের ইতিহাসে অভিনব সংযোজন। বিষয় বস্তুর অভিনবত্বে, সংলাপের লালিত্যে, চরিত্রের বলিষ্ঠ উপস্থাপনে নাটকটি শিল্পগুণে অনন্য হয়ে উঠেছে।