আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ আলোচ্যকালের অব্যবহিত পূর্ববর্তী পরিস্থিতি । যা বাংলাদেশের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার বাংলাদেশের উপন্যাসের অর্থনৈতিক সামাজিক রাষ্ট্রিক পটভূমি ও নৈতিক বাস্তবতা ১৯৭২-৯২ এর অন্তর্গত।

আলোচ্যকালের অব্যবহিত পূর্ববর্তী পরিস্থিতি
সমাজ-সংস্কারক জেরেমি বেনথাম (১৭৪৮-১৮৩২), ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে ইউনিভার্সিটি পার্লামেন্টারি ইলেকশন এ ভোট দেয়ার জন্য যখন অক্সফোর্ডে ফিরে আসেন তখন তিনি কুইনস্ কলেজের নিকটবর্তী কফি হাউস সংলগ্ন একটি বাড়িতে পড়ার জন্য বই ধার দেয়া গ্রন্থাগারে যোসেফ প্রিস্টলির Essay on Government নামক একটি নতুন বাঁধাইহীন পুস্তিকা দেখতে পান। আর এই পুস্তিকায় তিনি সর্বাধিক সংখ্যকের জন্য সর্বাধিক পরিমাণ সুখ কথাটি দেখতে পেয়ে কথাটিকে নৈতিকতার মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করলেন।
তাঁর মতে শুভ, কল্যাণ বা মঙ্গলকর ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত নৈতিক কর্মপন্থাই হওয়া উচিত সকলের নৈতিক চিন্তার ক্ষেত্র। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে নৈয়ায়িক জেরেমি বেনথামের ‘সর্বাধিক সংখ্যকের জন্য সর্বাধিক পরিমাণ সুখ’ থিওরি কার্যকর না হয়ে তা রয়েছে অনেকটাই অনুপস্থিত। আমাদের রাজনীতিতে সুনীতি, যোগ্য নেতা ও ভালো নেতৃত্বের অভাব মিটলেই গণতান্ত্রিক অধিকার পুনর্গঠনে সহায়তা পাবে।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় আকস্মিক কোন ঘটনা নয়। নয়মাস ব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। স্বাধীকার লাভে অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ-নির্যাতন-নিপীড়ন এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতি হয়ে উঠেছে আত্মসচেতন।
নিজের প্রাণ তুচ্ছ ও বিপন্নজ্ঞানে লক্ষ লক্ষ বাঙালি যুদ্ধ করেছে দেশ স্বাধীন করার জন্য। বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক, জনতা সর্বশ্রেণীর মানুষ নিজেকে নিয়োজিত করেছে পাকিস্তানী শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য।
যে নবতর, উন্নততম আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি প্রত্যাশিত ছিল তা যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যাত্রালগ্নেই নিক্ষিপ্ত হয় বহুমুখী সংকটে। শুধুমাত্র নৈতিকতার অভাববোধ থেকে বাংলাদেশের অস্থিতিশীল ও অসংগঠিত পরিবেশের সৃষ্টি হয় বললে অত্যুক্তি হয় না।
বৃটিশ শাসিত ভারতে স্বাধীনতা ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। সে সময় জাতি ও রাষ্ট্র সম্বন্ধে স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন ধারণার দরকার হয়। বৃটিশ থাকাকালীন অবস্থায়, বাঙালি জাতিকে সে ধারণা দেয়া হয়নি। দল ও পরিচ্ছন্ন ধারণার দরকার হয়। বৃটিশ থাকাকালীন অবস্থায়, বাঙালি জাতিকে সে ধারণা দেয়া হয়নি। দল হচ্ছে দুটি মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস। ইসলাম ও মুসলমান চেতনায় বৃটিশ শাসিত ভারত বিভক্ত হয়ে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সমগ্র দেশের মানুষের জন্য সুষম উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা, একটি কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থার গোড়াপত্তন প্রভৃতির কোনটিই করা সম্ভব হয়নি। বস্তুত মুসলিম লীগ, নেতৃত্বে আধুনিক জীবনবোধ, দর্শনের অভাব, ধর্মান্ধতা, মধ্যযুগীয় ভাবনার প্রাধান্য থাকায় একদিকে নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নস্যাৎ হয়ে যায়, অন্যদিকে নতুন রাষ্ট্রকে পথ নির্দেশনা প্রদানে ব্যর্থ হয়। ২
বাঙালি জাতি যখন ধর্মনিরপেক্ষ আত্মজিজ্ঞাসা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রে নির্ভরতায় মানবতাবাদী স্বাধীন চিন্তা চেতনায় সাতচল্লিশ এ সদ্যস্বাধীন পাকিস্তান গড়ায় মনোনিবেশ করছে; তখনই দেখা গেল পশ্চিম পাকিস্তান দ্বারা রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক দিক ছাড়াও ভাষা, ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, জাতীয়তা, শিক্ষা, চাকুরি সকল ক্ষেত্রে পূর্ববাঙলাকে শোষিত ও বঞ্চিত করা হচ্ছে।
পাকিস্তানী শাসক চক্রের সঙ্গে পূর্ববাঙলার জনগণের বিরোধের প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে রাষ্ট্র ভাষার প্রশ্নে ১৯৪৮ সনে যার ইতিহাস প্রায় সকলের জানা। ৩
ইংরেজ অপসারণের পর মুসলিম জনগণ চায়নি আর হিন্দু রাজত্বের অধীনস্থ হতে, হিন্দু জনগণও চায়নি মুসলমানদের আধিপত্য। দুই প্রদেশের অধিবাসীরাই ভেবেছে দেশ ভাগে আর্থ সামাজিক রাষ্ট্রিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না করে ধর্ম নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে উঠবে।

স্বাধীন যুক্ত বাংলা রাষ্ট্র গঠন করার দাবি তাই মেনে নেয়নি।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই আন্দোলন দুই অঞ্চলের মুসলমান জাতির একত্রীকরণ ছাড়া কোন ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না। সুতরাং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায়, দুটি ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত পাকিস্তান খণ্ডিত হওয়ার পেছনে অনেকগুলো কারণ ছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পূর্বে ১৯৪০ সালের দিকে মুসলিম লীগ নেতৃত্বে ভাঙন শুরু হয়। এর ফলে একটি দল সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে, ধর্মান্ধতার পরিবেশে আচ্ছন্ন থাকে, এবং অপর দলটি আধুনিক চিন্তাধারায় বিকশিত প্রগতিশীল মানসিকতায় বিশ্বাসী ছিল।
আবুল হাশিম সমর্থিত গ্রুপটি ১৯৪৪ সালে, বঙ্গীয় মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পূর্ব বাঙলায় জনপ্রিয়তা অর্জন করে । পরে মুসলিম লীগের এই গ্রুপটি থেকেই মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে রাজনৈতিক দল গঠন করা হল। তা ১৯৪৯ সালে পূর্ব বাঙলার আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে পরিচিত। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রীমনা রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগে রূপান্তিরিত হয়।
১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সংখ্যক ছাত্র এবং শিক্ষকের উদ্যোগে ‘তমদ্দুন মজলিস’ থেকে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়।
সেই পুস্তিকায় তাঁরা বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন, আদালতের ভাষা, অফিসের ভাষা ও পাকিস্ত ানের কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষা করার কথা বলেন।৫
বাংলা ভাষাকে যাঁরা রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেছেন তাঁদের উদ্দেশ্যে
১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন উৎসবে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম গভর্ণর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোন ভাষা নয়’।
এ সময় থেকেই ভাষার প্রশ্নকে সাংগঠনিক রূপ দেয়ার উদ্দেশ্যে পূর্ব বাঙলার বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রম গৃহীত হয়। ১৯৪৯-৫০ সাল পাকিস্তানবাদীদের ইসলামী ধ্যান ধারণা ও জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষায় বাংলা বর্ণমালা সংস্কারের উদ্দেশ্যে তথা বাংলা ভাষার বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কাজেই ব্যয় হয়েছে।
সরকারী কার্যক্রম পরিষদের চাকুরিজীবীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়, ইংরেজী বা উর্দুভাষা ব্যবহার করার জন্য। পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এ কথার প্রতিবাদ জানান। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কেবল পরিষদের বাঙালি সদস্যদের উপর উর্দু চাপিয়ে দেবার সিদ্ধান্তেরই প্রতিবাদ করেন নি, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৬.৪০ শতাংশ) নাগরিকদের মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ বলে ঘোষণার জন্যও বলিষ্ঠ যুক্তি উপস্থাপন করেন। উল্লেখ্য, উর্দু ছিল পাকিস্তানের সমগ্র জনসংখ্যার মাত্র ৩.৩ শতাংশের মাতৃভাষা ।
বাংলা ভাষার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বহু ছাত্র হতাহতের জন্য একটি স্মরণীয় দিন হয়ে যায়। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে শাসন, নির্যাতন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে পূর্ব বাঙলায় সংগ্রাম সংগঠিত হতে থাকে। এরই উপর ভিত্তি করে ১৯৫৩ সালের ১৪ নভেম্বর চারটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে, আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়। যুক্তফ্রন্ট থেকে একটি মেনিফেস্টো প্রণয়ন করা হয়। তাতে ২১ দফা কর্মসূচী এবং আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দাবি করা হয় পূর্ব বাঙলার জন্য।
২১ দফা কর্মসূচীতে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক বিষয় এবং মুদ্রা রেখে অন্যান্য বিষয় পূর্বাঞ্চলের হাতে ছেড়ে দেয়ার অঙ্গীকার করা হয়।
এই কর্মসূচীর মধ্যে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দান, রাজবন্দীদের মুক্তি, নূরুল আমিনের সরকারি বাসভবন বর্ধমান হাউসকে ‘বাংলা একাডেমী’ ডে রূপান্তর এবং ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পুলিশের গুলিতে যে স্থানে ছাত্ররা শহীদ হন সেখানে “শহীদ মিনার’ নির্মাণ, ২১ ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা, ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আই.এল.ও) বিধান অনুযায়ী শিল্প শ্রমিকদের জন্য আর্থিক ও সামাজিক অধিকারের স্বীকৃতি, পাটশিল্প জাতীয়করণ ও উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্যের নিশ্চয়তা এবং সমবায় ও ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য সরকারি সাহায্য প্রদান ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে আইন সভার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়। এ সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অন্যান্য লেখকের সাহিত্যকর্মকে ইসলামের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় বলে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হয় । ইসলাম, মুসলমান, পাকিস্তান বলে বলে তাদের রাজনৈতিক শক্তি হয়ে যায় অসংগঠিত। মুসলিম লীগ সম্বন্ধে জনগণের ধারণা দাঁড়ায় দুর্নীতিপরায়ণ, গণতন্ত্রবিরোধী, অনৈতিক এবং তাদের শাসনতন্ত্র পাকিস্তানকে নিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসের কাছাকাছি।
পূর্ব বাঙলার জনগণের এই সংগ্রাম, আন্দোলন ও আপোসহীন মনোভাবের ফলেই ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের যে শাসনতন্ত্র প্রণীত হয় তাতে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। শাসনতন্ত্রে উল্লেখ ছিল বিশ বছরের প্রস্তুতির পরে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে কার্যকর করা হবে।
উপনিবেশপূর্ব কালের বাঙলার সীমারেখা সম্পর্কে এ দেশের সাধারণ মানুষের ধারণা অস্পষ্ট ছিল।
এ কারণে তারা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের প্রতি যতোটা আগ্রহী ছিল, তার চেয়ে বেশি আগ্রহী ছিল ধর্মের প্রতি 1 ইহলৌকিক জীবনযাত্রায় ধর্মকে কেন্দ্র করে বিরোধের অবকাশও ছিল কম। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে বস্তুগত পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে হিন্দু মুসলমান প্রাক্তন ধর্মীয় বৈষম্য শুধু প্রকটই হয়নি, নতুন আর্থ, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার চাপে সেই বৈষম্য ক্রমশ স্ফীত ও বিরোধমূলক হয়ে উঠে।”

ইংরেজ রাজত্বে মুসলমানগণ নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য ধর্মীয় ভীতিবোধে ও মুসলিম রীতিনীতি রক্ষার্থে সামাজিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনকেই বুঝাতো।
মুসলমান শাসকদের আমলে শাসকগণ সাহিত্যের সমৃদ্ধিতে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেন নি। তাঁরা তাঁদের মাননকার্য পরিচালনার জন্য উচ্চপদে নিয়োগ দিয়েছিলেন হিন্দু ব্যক্তিবর্গকে। সাহিত্যে আসছে আল্লাহ, রাসূল, ঈশ্বর, কালী, শ্রীকৃষ্ণ, কোরান, পুরাণ সবই। উনিশ এবং বিশ শতকে জাতীয়তা রক্ষার্থে হিন্দু লেখকেরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে লিখে সাম্প্রদায়িকতা প্রচার করেন। যেমন
কেউ কেউ মুঘল শাসককে ‘বিদেশী’ এবং শিবাজী কে ‘হিন্দুর জাতীয় বীর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দয়ানন্দ সরস্বতীর (১৮২৪-১৮৮৩) ‘আর্য সমাজ আন্দোলনও ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নামে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নামান্তর। এই ভাবে হিন্দু জাগরণের সময় ভারতীয় জাতীয়তাবাদ হিন্দুদের কাছে হিন্দু জাতীয়তাবাদ হিসেবেই প্রতিভাত হয় এবং ভারতে মুসলমানদের মনে করা হয় বহিরাগত। ১১
এর উপর ভিত্তি করে উনিশ শতকের শেষ দিকে মুসলমানগণও হিন্দুয়ানী প্রভাব মুক্ত করার জন্য সাহিত্যে অতীত কাহিনী, নবী, রাসূল ও ধর্মভিত্তিক জীবনচরিত প্রণয়ন শুরু করলেন।
মুসলমানগণ ধর্মীয় পরিচয়, ঐতিহ্য এবং তাদের আভিজাত্য সচেতন হওয়ায় যুগের সাথে মানিয়ে চলতে পারেন নি। তাঁদের ধারণা লর্ড কর্ণওয়ালিসের ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তজাত আর্থিক সংকটের দরুণ ইংরেজি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
বিশ শতকের গোড়ার দিকে মুসলমান বাঙালি ইংরেজি শিক্ষিত হয়ে স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ হওয়ায় ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ নিরঙ্কুশ সমর্থন পায়। কিন্তু আজাদী লাভের পর তাঁদের মোহ ভাঙে। বাঙালির চিত্ত লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসিত বাঙলাকেই চেয়েছিল।
জিন্নাহর প্রখর চাতুর্য বুদ্ধির কাছে রাজনৈতিক মার খেয়ে তারা চব্বিশ বছরের সংগ্রামের পরে ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশ স্বাধীন করলো ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে তখন নীতিবোধের পরিচয়ই তারা দিল। বাঙালি তখনকার সাহিত্য সমাজে এই সুনীতি প্রতিষ্ঠিত করেছিল যে তারা ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন দেশ গড়বে। তাই এক বিরাট বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। ‘বাঙালি’ আত্মপরিচয়ে তারা সুসংহত হলো।
শুধু হিন্দু বা শুধু মুসলমানই নয়। সে যে ধর্মেরই হোক না কেন বাঙালি পরিচয় হলো সকল বাংলাদেশীর। কিন্তু নৈতিকতার এই দর্শনেও বুঝি ভুল থেকে যায়। অবাঙালি উপজাতিসমূকে জোর করে বাঙালি করাতে তাদের নৈতিক বিচারে এটা হলো অনৈতিক।
ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের পূর্বকালে মুসলমান জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সচেতনতা যদিও বাহাত ধর্মীয় ভাবাবেগ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল, তবু তার শেকড় প্রোথিত ছিল তাদের অর্থনৈতিক অভাব অভিযোগের মধ্যে ১
পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সামাজিক-সাংস্কৃতিক শিল্পবিকাশ যেমন ব্যাহত হয়েছে, তেমনি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শোষণ এবং দুর্নীতির জন্য সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি।
দুই প্রদেশের বৈষম্য এতই প্রকট ছিল যে, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা ও চাকুরির উপর ভিত্তি করে জনগণের জীবনযাত্রা ছিল দু’ধরণের। ১৯৪৭ সালে করাচীতে প্রথম পাকিস্তানের রাজধানী স্থাপিত হয়। তারপর আরও দুইবার রাজধানীর স্থান পরিবর্তন করে ইসলামাবাদে স্থায়ী রাজধানী করা হয়। এর ফলে বিরাট অর্থ ব্যয় হয়।
সেই অর্থের বিরাট অংশ বহন করতে হয় পূর্ব বাঙলাকে । অথচ ঢাকায় দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপনের জন্য যে অর্থবরাদ্দ করা হয়েছিল তা ছিল এতই নগণ্য যে, প্রায় ধর্তব্যের বাইরে।
আর একটি লক্ষ্য করবার বিষয় এই যে, পাকিস্তানের মোট বার্ষিক আয়ের প্রথমে শতকরা ৭৫ ভাগ, পরে ৬০ ভাগ ব্যয়িত হয়েছে প্রতিরক্ষায় এবং মোট প্রতিরক্ষা ব্যয়ের শতকরা ৮০ ভাগই গিয়েছে সামরিক কন্ট্রাকটারদের ও সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের পকেটে যাদের মধ্যে বাঙালি ছিল না । ১০
পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলমান অবাঙালি এবং পূর্ব বাঙলার মুসলমান বাঙালি মিলে যদিও একটি জাতির দাবি করেছে
তথাপি কিছুদিন পরেই দেখা গেল ধর্মীয় ভাষা, স্বায়ত্তশাসন, রাষ্ট্রিক, অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাতে দুই পাকিস্তানবাসী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
পাকিস্তানী আমলা, সেনাবাহিনী সরকারী চাকুরীজীবী সবই অবাঙালি যদিও পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগ বাস করতো পূর্ব বাঙলায়, তবু রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে অসম বন্টনের চিত্র পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস ও সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের নগণ্য অবস্থানের দৃষ্টান্তে স্পষ্ট হয়ে উঠে। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৮৯৪ জন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র ১৪ জন ছিলেন বাঙালি। ১৪

চিকিৎসা, শিক্ষা ও চাকুরির ক্ষেত্র, বিজ্ঞান প্রযুক্তি, গবেষণা প্রত্যেক ব্যবস্থার বেলায় অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য। ১৯৪৭-৪৮ সালের দিকে পূর্ব বাঙলায় শিক্ষার হার বেশি ছিল। অথচ ১৯৬০ দশকের দিকেই দেখা গেল শিক্ষার হার পশ্চিম পাকিস্তানে বেশি। পূর্ব বাঙলায় যে হারে শোষণ করা হত, সে হারে তার বিকাশ ঘটানো হয়নি।
পাকিস্তান সৃষ্টির প্রারম্ভে পূর্ব বাঙলায় শিল্প কারখানা ছিল না। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পরে তাদের আর্থিক সুবিধার জন্য বিশেষ করে কাঁচামাল, চা, পাট, চামড়া, ধান প্রক্রিয়াকরণের জন্য কতিপয় শিল্প প্রতিষ্ঠা করা হয় বটে তবে তার উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি বণিকদের লাভবান করা।
১৯৫৬ সনের শাসনতন্ত্র ছিল একটি লিখিত, দুষ্পরিবর্তনীয় ইসলামী শাসনতন্ত্র। আওয়ামী লীগ দ্বিখণ্ডিত করে ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে মাওলানা ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নামে নতুন দল গঠন করেন। আইয়ুব সরকার ১৯৫৮ সালের ৬ই অক্টোবর সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান।
১৯৫৯ সালে নির্বাচনের আগেই সামরিক সরকার ক্ষমতা কুক্ষিগত করলেন। কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক উভয় ক্ষেত্রেই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতার লড়াইয়ে ছিল দেশ অস্থিতিশীল। এ সময় দেশে মৌলিক গণতন্ত্রী আদেশ বিরাজমান থাকে।
১৯৬১ সালে পূর্ব বাঙলায় ছাত্র রাজনীতি প্রকট হতে থাকে। পূর্ব বাঙলার বৈষম্য দূরীকরণে আইয়ুব সরকার ১৯৬২ সালে অধিকতর স্বায়ত্তশাসন প্রদানের অঙ্গীকার করেন। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেল লার বৈষম্য দূরীকরণে আইয়ুব সরকার ১৯৬২ সালে অধিকতর স্বায়ত্তশাসন প্রদানের অঙ্গীকার করেন। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেল জাতীয় ঐক্য, সংহতি, দেশের নিরাপত্তা বিধানে স্বৈরশাসকের পক্ষে পূর্ব বাঙলার গভর্ণর মোনায়েম খান কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থার এক দ্বৈতনীতি গ্রহণ করে।
১৯৬২ সালের স্বায়ত্তশাসন নীতির অনুসরণে ১৯৬৪-৬৫ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং আইয়ুব সরকার জয়ী হয়। আইয়ুব খান সমর্থিত জনগণ পূর্ব বাঙলার বিরোধী ধারার কর্মী ও জনগণকে ভারতের দালাল, ইসলাম বিরোধী বলে ভারত বিদ্বেষী প্ররোচনায় ঐক্যবদ্ধ হয়। এর এক পর্যায়ে ১৯৬৫ সালে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে লিপ্ত হয়।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময়ে পূর্ব বাঙলার জনগণের নিরাপত্তার অভাব দেখা দেয়। তখন পূর্ব পাকিস্ত গানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা, অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক দীনতা প্রভৃতি সকল প্রসঙ্গ বাঙালির সামনে চলে আসে। এ বিষয়ে বিতর্ক চলে এবং বাঙালি সমাজের প্রচুর নেতা কর্মী এ সময় গ্রেফতার ও অত্যাচারিত হয়। ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকা বিশেষ করে পূর্ব বাঙলার মুখপত্র বন্ধ হয়ে যায়।
সরকারী নীতিমালা অনুযায়ী দুই প্রদেশের জন্য নীতি প্রণয়ন ছিল দ্বিবিধ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৬ সালে আওয়ামী প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা কর্মসূচী ঘোষণা করেন। উল্লেখ্য এ সময় পূর্ব বাঙলার প্রধান রাজনৈতিক দল এবং স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের নেতৃত্বদানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আওয়ামী লীগ। ৬ দফা কর্মসূচী ছিল
পাকিস্তানী রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ দাবি। পূর্ব ও পশ্চিমের এই বিরোধ ছাড়াও সামরিক বনাম বেসামরিক শাসনের বিষয় ছিল দেশের আর একটি মূল রাজনৈতিক বিতর্ক। এই শেষোক্ত বিতর্কের জের হিসেবে ১৯৬৮ সালের অক্টোবরে পশ্চিম পাকিস্তানে আইয়ুবের ১০ বছর স্থায়ী স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণআন্দোলন শুরু হয়। তার কিছু পরে পূর্ব পাকিস্তানে যখন এই আন্দোলনের ঢেউ এসে লাগে তখন গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক স্বাধীকারের দাবি সম্বলিত ৬ দফা কর্মসূচী ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে ।১৫
যেহেতু মুসলিম লীগ ছিল ভূস্বামী, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর রাজনৈতিক দল। অন্যদিকে যুক্তফ্রন্ট ছিল কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক সাধারণ জনমানুষের রাজনীতি। যুক্তফ্রন্টের প্রধান দুটি দলই হচ্ছে আওয়ামী লীগ এবং কৃষক শ্রমিক পার্টি। ৬ দফার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পূর্ব বাঙলার ৭০-৮০ ভাগ মানুষের মন জয় করে নেয়।
আওয়ামী লীগ ছাড়াও বামপন্থী রাজনীতির সাংগঠনিক ভূমিকা ও স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদান রাখে। ১৯৬৮-৬৯ সালের দিকে খণ্ড খণ্ড কতকগুলো বামপন্থী দল সৃষ্টি হয়। এঁদের আহ্বান ছিল ‘সশস্ত্র বিপ্লব’ এর। ১৯৬৯ সাল হয়েছে গণ অভ্যুত্থানের বছর। গণ অভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত পূর্ব বাঙলায় বিরাজ করে এক বিভীষিকাময় অবস্থা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিশেষ করে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ডাকসু মিলে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি গঠন করে। ছাত্ররাজনীতি এসময় জাতীয় আন্দোলনে ১১ দফা কর্মসূচী প্রণয়ন করে।
এই কর্মসূচীতে শুধু স্বায়ত্তশাসনের দাবি সম্বলিত ছয় দফা অন্তর্ভুক্ত ছিল না, এর মাধ্যমে একটি সমাজতান্ত্রিক মঞ্চও গড়ে উঠছিল, যার দাবি ছিল ব্যাংক, বীমা কোম্পনী ও বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ (৫দফা)। এছাড়া কৃষকদের করভার লাঘব (৬লকা) শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি প্রদান (৭ দফা) এবং সেন্টো ও সিয়াটো চুক্তি প্রত্যাহার (১০ লক্ষা) সহ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের নাবি ও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল । ১৬
১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র নেতা আসাদ পুলিশের গুলিতে নিহত হলে ছাত্র জনতা ১১ দফা দাবি আদায়ের শপথে ২৪ জানুয়ারি ‘গণঅভ্যুত্থান দিবস’ পালন করে। ১৫ই ফেব্রুয়ারি জেলখানায় বন্দী অবস্থায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িত সার্জেন্ট জহুরুল হক নিহত হন।
১৮ই ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডঃ শামসুজ্জোহা নিহত হন। এ সমস্ত ঘটনায় ছাত্ররা সারা দেশ আন্দোলনমুখর করে রাখে। ছাত্রদের নির্দেশে পূর্ব বাঙলার জনগণ, অফিস আদালতের কর্মচারীরা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে গড়ে তোলেন। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের শ্লোগান হচ্ছে
“জয় বাংলা”, “তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা”, ঢাকা না পিণ্ডি, ঢাকা, ঢাকা”, “পাঞ্জাব না বাংলা, বাংলা”, “আমার দেশ তোমার দেশ, বাংলাদেশ”। এসব শ্লোগানে একটি ভাষা ভিত্তিক ও আঞ্চলিক জাতীয়তার দাবিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তাই পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদের বন্ধনে তাদেরকে আবদ্ধ রাখা সম্ভব ছিল না। বাঙালিদের এ বৈপ্লবিক জাতীয়তাবাদের মর্মবাণী ধ্বনিত হয় শ্লোগানে, “বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।
আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়ার অন্তর্গত মেহেরপুরে ঘোষিত স্বাধীন বাংলাদেশের একটি অস্থায়ী সরকার গঠন করেন। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের নতুন নাম হয় মুজিবনগর।
১৭ এপ্রিলে নির্বাচিত পরিষদ সদস্যদের পক্ষ থেকে প্রচারিত পূর্ববর্তী তারিখযুক্ত (১০ এপ্রিল) স্বাধীনতা আদেশ ঘোষণায়” শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা, প্রধান সেনাপতির ক্ষমতা, এমনকি প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভার সদস্য নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি অথবা তাঁর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির হাতে অর্পণ করা হয় এবং এই স্বাধীনতা আদেশটি ২৬ মার্চ থেকে কার্যকারিতা লাভ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়। ১
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেয়া হয় উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের উপর এবং প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দিন আহমদ। মেহেরপুরের নতুন নাম হয় মুজিবনগর। এর পর দীর্ঘ ৯ মাস বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের পরিণতিতে লাভ করে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশ ।
স্বাধীনতা পরবর্তী কালে বাংলাদেশে একের পর এক শাসক এসেছে। দেশকে ভালবেসে, জনগণের কল্যাণে, আর্থ-সামাজিক রাষ্ট্রিক পরিস্থিতির অস্থিতিশীলতা ঘোচাবার অনুপ্রেরণায় অনেক রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধান এসেছে। ১৯৭২ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত শাসকদের দর্শন এবং বিভিন্ন সময়ের সমাজচিত্র পর্যায়ক্রমে আমাদের ঔপন্যাসিকদের উপন্যাসে উঠে এসেছে।

নৈতিক পচন, আবার বিশুদ্ধ নীতিবোধ, স্খলন, সুষ্ঠ বিকশিত মানসিকতা, ন্যায়-নীতির দ্বান্দ্বিকতা তাঁদের রচনার বিষয় হয়েছে। সময়কাল নির্ণয়ে আমাদের ঔপন্যাসিকগণও সীমা অতিক্রম করেননি। ইতিহাস ঐতিহ্য চেতনা ও সমাজসত্য সন্ধানী মনোভাব নিয়েই তাঁরা লেখনী ধারণ করেছেন। এক একজন লেখক এক এক সময়ের শাসক ও বিভিন্ন রকম নৈতিকতার দর্শন প্রচার করেছেন।
তাঁদের উপন্যাস সমূহের চরিত্রদের সংলাপের মধ্য দিয়ে। নারী চরিত্রগুলো যেমন নারী শিক্ষা, স্বনির্ভরতা, অর্থনৈতিক মুক্তি ও জৈবিক জীবনের জটিল চিন্তা-ভাবনায় নতুন মাত্রা সংযোগ করেছে, তেমনি পুরুষ চরিত্রগুলো নারী-ভাবনা, প্রেম-বিবাহ এবং বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নৈতিকতার প্রশ্নাবলীতে সংযুক্ত করেছে কালোপযোগী নতুন নতুন মাত্রা ও ভাবনা ।
শেখ মুজিবের শাসনামলের প্রারম্ভেই দেখা যাবে স্বাধীন দেশের জনগণের জন্য অপেক্ষা করেছিল অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। জীবন সংগ্রামে স্বপ্নভঙ্গ এ কালের সাহিত্যক চরিত্ররা ১৯৭২-৭৫ সময় পর্যন্ত, দুর্ভিক্ষ, ক্ষরা, অনিয়ন্ত্রিত বাঁধ ভাঙা, বন্যা কবলিত মানুষ শুধু বেঁচে থাকার অধিকারটুকুই দাবি করছে। গণতান্ত্রিক অবরুদ্ধতা নিয়ে সকল প্রকার আশাহীন জীবনাতিবাহিত করেছে একালের গল্প উপন্যাসের চরিত্ররা
১৯৭৫ এর পরও মানুষের উপযোগী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ভীষণভাবে বিপর্যন্ত হতে লাগল । পরিণামে পাকিস্তান আমলের সামরিকীকরণ পুনরুজ্জীবিত করা হয়। এ সময়ে শাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান অত্যন্ত বিশৃঙ্খল পরিবেশ এবং কয়েক দফা রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রিক পট পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে তিনি এলেন। কিন্তু তাঁর শাসনামলে জনগণের মানবিক চাহিদা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু দুঃখের বিষয় জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় শাসনব্যবস্থায় অব্যাহত রাখা হল সেনাতান্ত্রিক মূল্যবোধ ।
সামরিক একনায়কতন্ত্রের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে অধিকতর মানবিক মূল্যবোধের নামে এলো। নৈতিক পচন এবং মানসিক ক্ষরণ তরান্বিত করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত হলেন জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি তাঁর দল এবং শাসনতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করার অজুহাতে প্রশাসন যন্ত্রকে করে তুললেন সন্ত্রাসীদের রাজত্ব। তাঁর দলের ছত্রচ্ছায়ায় আশ্রয় পেল অগণতান্ত্রিক প্রগতিবিমুখ সাংগঠনকি নেতৃত্ব।
এরশাদ সরকারের স্বেচ্ছানীতি পতনের পর রাজনেতিক পটভূমি অন্যদিকে মোড় নেয়। ১৯৯১ এর নির্বাচনে জনসাধারণ আবার নতুন করে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হয়। হতাশায় ব্যর্থতায় নিমজ্জিত বাঙালি জাতি আবার নতুন ভাবে স্মৃতি তরঙ্গিত বীজমন্ত্রে আন্দোলিত হচ্ছে এ সময়।
এই দীর্ঘ সময় পরিসরে আমাদের ঔপন্যাসিকগণও অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার দিগন্ত বিস্তৃত করেছেন। তাঁদের উপন্যাস স্থান পেয়েছে কখনও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবদীপ্ত চেতনাস্রোত, কখনও যুদ্ধস্মৃতি জড়িত ক্ষতবিক্ষত বেদনার আস্ফালন, হতাশার পূর্ণ রক্তিম আত্মযন্ত্রণা কখনওবা সমাজচৈতন্য চেতনাপূঞ্জে অন্ত গত স্বপ্নভঙ্গজনিত মর্মন্তদ পরিণতি। তাই আমাদের ঔপন্যাসিকগণের আত্মসন্ধান ও স্বজাতসন্ধানকে চেতনাস্পর্শী জীবন সংগ্রাম গ্রহণ করতে হয়েছে শৈল্পিক ও নৈতিক অনুভূতির বর্ণনায়।