আজকে আমরা আবু ইসহাকের কথাসাহিত্যে প্রতিফলিত জীবন ও তার শিল্পরূপের সূচি আলোচনা করবো।

আবু ইসহাকের কথাসাহিত্যে প্রতিফলিত জীবন ও তার শিল্পরূপের সূচি
আমার এম. ফিল. অভিসন্দর্ভের শিরোনাম ‘আবু ইসহাকের উপন্যাসে প্রতিফলিত জীবন ও তার শিল্পরূপ’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ-এর তত্ত্বাবধানে আমি এম. ফিল. কোর্সের নিবন্ধন লাভ করি ২০০১-২০০২ শিক্ষাবর্ষে এবং বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড.রফিকউল্লাহ খান ও ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ-এর নিকট এম. ফিল. প্রথম পর্বের কোর্সসমূহ অধ্যয়ন করি।
বর্তমান অভিসন্দর্ভের সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও রূপরেখা নির্মাণে আমার গবেষণা- তত্ত্বাবধায়ক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ-এর নিরন্তর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা আমি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি। তাঁর আন্তরিকতা, সুচিন্তিত পরামর্শ ও প্রাজ্ঞ নির্দেশনা আমার গবেষণাকর্মকে সহজসাধ্য করেছে। তাঁর কাছে আমি ঋণী।
গবেষণাকালে নানা পর্যায়ে প্রাজ্ঞ পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়েছেন আমার শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন, অধ্যাপক বেগম আকতার কামাল এবং অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ। বই দিয়ে সহায়তা করেছেন অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক ও মোহাম্মদ আজম। এঁদের কাছে আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। আন্তরিক সহযোগিতা এবং নিরন্তর উৎসাহ লাভ করেছি আমার প্রাক্তন সহকর্মী শিল্প-সমালোচক মঈনুদ্দীন খালেদ, অধ্যাপক কাজলেন্দু দে ও গল্পকার পারভীন সুলতানার কাছ থেকে।
গবেষণাকালে আমি প্রধানত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার এবং ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি ব্যবহার করেছি। এ-সূত্রে গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারিবৃন্দকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

সূচি
আবু ইসহাকের কথাসাহিত্যের অবতরণিকা
প্রথম অধ্যায় :
কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাক ও তাঁর জীবনবোধ
দ্বিতীয় অধ্যায়: আবু ইসহাকের উপন্যাস: জীবন ও তার শিল্পরূপ
প্রথম পরিচ্ছেদ: সূর্য দীঘল বাড়ী
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: পদ্মার পলিদ্বীপ
তৃতীয় পরিচ্ছেদ: আবু ইসহাকের উপন্যাস জাল

তৃতীয় অধ্যায়: আবু ইসহাকের ছোটগল্প: জীবন ও তার শিল্পরূপ
প্রথম পরিচ্ছেদ: আবু ইসহাকের ছোটগল্প হারেম
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: আবু ইসহাকের ছোটগল্প মহাপতঙ্গ
তৃতীয় পরিচ্ছেদ: আবু ইসহাকের ছোটগল্প স্মৃতিবিচিত্রা
উপসংহার
১৯৪৭-এর পরবর্তী বাংলাদেশের উপন্যাসের ধারা মুখ্যত গ্রাম-কেন্দ্রিক। প্রায় দুইশ’ বছর ইংরেজ শাসনাধীন থাকলেও পূর্ব বাংলার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ইংরেজ বা ইউরোপীয় ভাবধারায় স্নাত হয়ে ক্রমশ নাগরিক হয়ে ওঠেনি। এ কারণে বৃহত্তর গ্রামীণ পরিবেশ এবং এ পরিবেশে ক্ষুধা-দারিদ্র্য- শোষণ-বৈষম্য প্রভৃতি প্রতিকূলতার সহযাত্রী হয়ে নিম্নবর্গীয় মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামই বাংলাদেশের অধিকাংশ উপন্যাসের মূল উপজীব্য।
নাগরিক যুগ-যন্ত্রণা, একাকিত্ব বা হতাশা নয় • গ্রাম সমাজে শোষক ও শোষিতের অবস্থান, নানা – কুসংস্কার, ধর্মীয় প্রভাব কিংবা চিরায়ত গ্রামীণ সমাজে নারীর অবস্থান প্রভৃতির শিল্প-সত্য রচনাই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ থেকে শুরু করে আবু ইসহাক পর্যন্ত বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের বিষয় হয়ে এসেছে।

পূর্ববর্তীদের ধারা অনুসরণ করে আবু ইসহাকও গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা, নানা অনাচার, বৈষম্যের ছবি এঁকেছেন তাঁর অধিকাংশ গল্প-উপন্যাসে। তবে যেহেতু শিল্পী মাত্রই স্বতন্ত্র, সেহেতু প্রচলিত ধারার অনুসরণেও তাঁর কথাসাহিত্যে স্বাতন্ত্র্য সমুজ্জ্বল। একজন দুর্ভিক্ষ পীড়িত অসহায় নারীর উনুলিত জীবন-সংগ্রামকে রূপায়িত করতে গিয়ে তিনি চিরায়ত গ্রাম-বাংলার রূপ ধারণ করেছেন একটিমাত্র উপন্যাসে।
আবার কখনও কেবল একটি বিশেষ অঞ্চলের জীবন-বর্ণনা করেছেন পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষভাবে। অন্যদিকে আরব্য রজনীর কাহিনী পরিপাট্য বা ‘স্টোরিটাইপ’ ব্যবহার করে লেখক একনায়কতন্ত্রের গল্প বলেছেন রূপকাঙ্গিকে। সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কারাচ্ছন্নতার খোলস ছাড়িয়ে নিরেট বাস্তবতা বা কিছু ধূর্ত মানুষের কারসাজিকে আবু ইসহাক পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন গল্প ও উপন্যাসের শিল্পাঙ্গিকে।
কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাক তাঁর সমগ্র জীবনব্যাপী সমাজ ও মানুষকে পর্যবেক্ষণ করেছেন গভীর অনুসন্ধিৎসা ও বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিতে। পূর্ব বাংলার মানুষ যখন দুর্ভিক্ষের তাড়নায়, ধর্মের প্রাবল্যে এবং অশিক্ষার অন্ধকারে অমানবিক জীবনযাপনরত, তখন সংকীর্ণতা-বিরোধী ও উদার মানবতাবাদী আবু ইসহাক তাঁর কথাসাহিত্যের মাধ্যমে দূর করার চেষ্টা করেছেন সকল তমসা। বিষয়স্বাতন্ত্র্য ও শিল্পবৈশিষ্ট্যের বিচারে বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।