আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদায়ের ইতিহাস উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদায়ের ইতিহাস উপন্যাস
‘আদায়ের ‘ইতিহাস’ (১৯৪৭) উপন্যাসটি মধ্যবিত্ত যুবক মিঠুপের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কাহিনী। লেখক ত্রিটুপের মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের দিশেহারা যুবকদের মানসিক অস্থিরতা ফুটিয়ে তুলেছেন। উপন্যাসের শুরু হয়েছে ত্রিটুপের হতাশা দিয়ে। হাব্বিশ বছর বয়সে তার মনে হলো:
“এ পর্যন্ত জীবনে সে পাওয়ার মতো কিছুই পায় নাই।” (৬খ,পৃ-১৩) রাতে সে স্বপ্ন দেখেছে তার ছেলে মারা গেছে, সে কাঁদছে, আত্মীয়স্বজন তাকে টিটকারি দিচ্ছে। ঘুম ভাঙার পর অসংলগ্ন আচরণ করা শুরু করলো। ঘুম থেকে ডাকার অপরাধে আদরের ভাগ্নিকে চর দিলো।
সকালে উঠেই মনে হলো সে বড় কিছু করতে চায়, তাই বাবার অফিসে পঁচাত্তর টাকার চাকরিতে যোগ দেয়া বাতিল করে দিলো। মা-বাবাকে এ কথা জানিয়ে সে মোড়ের চায়ের দোকানে গেলো। চায়ের দোকানে দেখা হলো মনীশের সঙ্গে। মনীশ তাকে চাকরিতে কিছুদিনের জন্য ঢুকতে বললো। তাকে বললো:
“নিজের জন্য চাকরি দেবে, বড় কিছু করার অঙ্গ হিসেবে চাকরি নেবে।” (৬খ, পৃ- ১৮)

মনীশের কথামতো ত্রিষ্টুপ বাড়ি এসে বাবার সঙ্গে অফিসে গেলো। অফিস থেকে ফেরার পথে চায়ের দোকানে আবার দেখা হলো মনীশের সঙ্গে। মনীশ তাকে নিজের বাড়ি নিয়ে গেলো। সেখানে ত্রিটুপের পরিচয় হলো মনীশের বোন কুন্তলার সঙ্গে। ত্রিটুপের মনে হলো মনীশ কুন্ত লাকে ত্রিটুপের সঙ্গে বিয়ে দিতে চায়। কিছুদিন পর মনীশদের বাড়ি এলো কুন্তলার বড় বোন রমলা তার স্বামী ধীরেন এবং দুই মেয়ে।
ত্রিষ্টুপ দেখলো তিরাশি টাকা বেতনে ধীরেন আর রমলা খুব সুখী। সে অনুধাবন করলো সুখটা আসলে মনে। তারপরও ত্রিষ্টুপ তার লক্ষ্য স্থির করতে পারে না, শুধু অস্থিরতায় ভোগে। একদিন বেতন পেয়ে অফিসের বন্ধুদের সঙ্গে তাদের অনুরোধে গেলো এক মেয়ের বাড়ি।
মদ খেয়ে বাড়ি ফিরলো রাত একটায়। মা-বাবা আতকে উঠলো। পরদিন বাড়িতে তার বিয়ের কথা উঠলো। ত্রিষ্টুপ এবার ভাবলো অনেক বড় কিছু করার আগে সে কুন্তলাকে বিয়ে করবে। মনীশকে প্রস্তাব দিলে সে রাজি হলো না। আবার কুন্তলাও রাজি হলো না।
ত্রিষ্টুপ ভেবেছিলো কুন্তলাকে বিয়ে করাটা তার ইচ্ছে, ও পক্ষ রাজি হয়েই আছে। কিন্তু জীবন সম্পর্কে তার ধারণা একেবারে পাল্টে গেলো, যখন দেখলো মনীশ বলছে কুন্তলাকে তার সঙ্গেই বিয়ে দেবে যার সঙ্গে সে সুখি হবে। ত্রিষ্টুপ এবার ক্ষেপে গেলো কুন্তলাকে বিয়ে করতে।

কুন্তলার ওপর জোড় খাটাতে তার বন্ধুর ফাঁকা বাড়িতে কুন্তলাকে নিয়ে এলো, কিন্তু কুন্তলা আর মনীশের ব্যক্তিত্ব আর নিজের বিবেকের কাছে সে থেমে গেলো। এবার সে কুগুলার কাছে মিনতি করলো। কুন্তলা তাকে বুঝিয়ে দিলো তারা শোষিতের দলে। কিন্তু ত্রিষ্টুপ শোষক হতে চায়। তার চাওয়ার শেষ নেই। শোষকের হাতে মনীশ বোন বিয়ে দেবে না।
ত্রিষ্টুপ সব বুঝে নিজেকে শুধরে শোষিতের আদর্শে আনার প্রতিশ্রুতি দিলো। তখন কুন্তলা রাজি হলো। উপন্যাসটি শেষ হয়েছে অস্থিরমতি একগুঁয়ে ত্রিষ্টুপের স্বাভাবিক এবং আদর্শময় জীবনে উত্তরণের ইঙ্গিতে।
“মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত সুপ্রভাবে অবাস্তব চিন্তা-কল্পনার অন্তঃসারশূন্যতার স্বরূপকে উন্মোচন করেন ত্রিটুপের মাধ্যমে। ১০
সমাজের কিছু স্বপ্নবিলাসী মানুষের অকারণ অস্থিরতা লেখক দেখিয়েছেন।