আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ অর্থনৈতিক সমস্যা। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ এর অন্তর্গত।

অর্থনৈতিক সমস্যা
অধিকাংশ সামাজিক সমস্যার মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক সমস্যা। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্নভাবে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সমস্যার সম্মুখীন। সকল কালেই কবি-সাহিত্যিকরা অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত। তাদেরকে সকলে বাঁকা চোখে দেখে-টিপ্পনী কাটে। বিমল কবি, তার কর্মসংস্থান নেই, বেকার।
পরিবারের লোকেরা তাকে সুনজরে দেখে না। সমাজ বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বেকার কবিকে লালন-পালন করার লোকের অভাব। আর নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য তা রীতিমতো বিলাসিতা। ‘কোথায় টো টো কোম্পানি করে এলেন?’- শাস্তার প্রশ্নের জবাবে প্রমীলা তাই বিমলকে উদ্দেশ্য করে বলেছে:
“সম্পাদকের বাড়ি বোধহয়।” (২খ, পৃ.-১০৪)
কবিদের সম্পর্কে শাস্তার একটি ধারণা আছে কবিদের কোনো জাত-বিচার নেই, কেউ টাকা দিলে নির্দ্বিধায় নিতে পারে। তাই বিমলের প্ররোজনের সময় শান্তা তাকে টাকা দিতে চাইলে বিমল অস্বীকার করলে শান্তা বলে
“আপনি কবি নন, কবি হলে নিতেন। (২খ, পৃ. 108 )
বেকারত্ব মানবজীবনের অভিযাপ। ‘জননী’ উপন্যাসে বেকার সমস্যা প্রকট নয়। বিধান বেশ স্বচ্ছন্দেই একটা চাকরি পায়। শীতল নিজের কর্মদোষে বেকার থাকে, তারপর রুগ্ন অবস্থায়ও তার জন্য একটি চাকরি জোগাড় হয়। জীবনের জটিলতা’ উপন্যাসে বেকারত্বকে একটি বড় সমস্যা হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন লেখক।

“উপার্জনের পথ পাইলে তো সে উপার্জন করিবে? আকাশে টাকা নাই, হাত বাড়াইলে দুই হাতের অঞ্জলি টাকার ভরিয়া যায় না। পাঁচটা টাকার জন্য সারাটা বিকাল ঘুরিয়া বেড়াইলেও একটা টাকার জোগাড় হইয়া ওঠে না।” ( ২খ, পৃ. ১০৩)
বেকার সমস্যাটি এতোই প্রকট। বেকার জীবনে কারো কাছে গেলে সে ঝঞ্ঝাটও কম নয়। মানিক এর যথার্থতা দৃঢ়ভাবে দেখিয়েছেন। এ কথা সত্য যে
“জীবন সত্যের গভীরতম উপলব্ধি থেকেই সাহিত্যের জন্ম। ১১
নগেনের সুপারিশের চিঠি আনতে গিয়ে বিমলকে তাই কাকিমাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিজে থেকেই কাঁধে নিতে হয়েছিল। আবার চিঠি নিয়ে হেডউড সাহেবের কাছে গেলে এক ঘণ্টা তাকে বাগানে থাকতে হয়, সাহেবের কুকুর চারদিকে ঘোরে, কোনো মানুষের সন্ধান সে পায় না।
আবার মুরুব্বির জোরে বিমল চাকরি পেলে, সেই পদের নবনিযুক্ত যুবকটি পুনরায় বেকার হয়ে পড়ল। তার যন্ত্রণা আরো গভীর, মন ক্ষতবিক্ষত। সে এম এ পাস করে চাকরির জন্য ঘুরছিল, একটি চাকরি পেয়েওছিল কিন্তু মুরুব্বির জোরে বিমল সেই চাকরিটি পেল আর যুবক চাকরি হারালো। বুবক বিমলকে বলে
“কাল বাড়িতে পাঁচসিকের হরিলুট হয়ে গেছে। কতকাল পরে কাল বউ হাসি মুখে কথা বলেছিল। কাল দুবেলা ভাতের সঙ্গে কী পেয়েছি জানেন? দুধ। আর বিকেলে লুচি জলখাবার।” (২খ, পৃ.-১৩৩)
এরপর যুবক দ্রুতগামী বাসের সামনে দাঁড়িয়ে আত্মহত্যা করল। সে কাকে শাস্তি দিল কেউ জানে না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন:
“না মরিবার লাখ লাখ সুযোগের একটা গ্রহণ করিয়াও আত্মরক্ষা করে নাই।” (২খ, পৃ.-১৩৩)
বেকারত্বের অভিশাপে একটি প্রাণ এভাবে ঝরে গেলো। এরপর নগেনের সুপারিশে পাওয়া চাকরি ছেড়ে বিমল আবার বেকার হয়। সদাগরি অফিস, মাসিকের অফিস, খবরের কাগজের অফিস কোথাও ঘুরতে সে বাকি রাখে না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার প্রায় সব উপন্যাসে বেকারত্বের অভিশাপ দেখিয়েছেন।
‘শহরতলী’ উপন্যাসে বেকার সমস্যাকে প্রকটভাবে দেখানো হয়েছে। মঞ্জুরদের চাকরিকেই মূলত এখানে বড় করে দেখানো হয়েছে। তা ছাড়া নন্দর বেকারত্ব ঘোচাতে গিয়ে যশোদা নিঃস্ব হয়ে যায়। এখানে বেকারত্বের কারণে মঞ্জুরদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে নি যশোদার মহানুভবতার কারণে। যশোদা কাজ জুটিয়ে দেয়, কিংবা যতদিন কাজ না হয়, তাদের ততদিন ভরণ-পোষণ করে।

অন্যদিকে, ‘সোনার চেয়ে দামী প্রথম খণ্ডের নাম বেকার। বেকার রাখাল তার পরিবার নিয়ে কষ্টে দিন কাটায়। রাখালের স্ত্রী সাধনার খালি গলার দিকে সকলে ডাকার বলে সে ব্রিত হয়। টাকার অভাবে হার মেরামত করা যায় না। ঘরে খাবারের অভাব:
রাখাল পাড়ার একটি স্কুলের ছাত্রকে সকালে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত পড়ায়। পড়িয়ে সটান চলে যায় মাইলখানেক দূরে আরেকটি কলেজের ছাত্রকে পড়াতে। বাড়ি ফিরে মেয়ে খেয়ে বের হয়। সারাদিন ঘোরে চাকরি এবং রোজগারের চেষ্টায় আরো কিসের ধান্দায় সাধননা জানে না। সন্ধ্যায় রাখাল একটি ছাত্রীকে পড়ায় দুঘণ্টা। এই টিশনিটাই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। মাসান্তে কটা টাকা পাওয়া যায় বলেই নয়, রোজ এখানে সে চা আর কিছু খাবার পায় অন্তত দুখানা বিস্কুট।” (৭খ, পৃ.-১১৬)
কর্মস্থলের চিত্র উপন্যাসের অন্যতম বিষয়। এর মাধ্যমে শ্রেণিবৈষম্যও দেখা যায়, আবার সমাজের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির স্বভাবও বোঝা যায়। কমল প্রেসে শীতল মাঝে মাঝে দশ টাকার পাওনাকে আট টাকায় নামিয়ে দুই টাকা নিজে নেয়। আবার অনেক কোম্পানির কর্মচারী ফর্মা পিছু আট টাকা দিয়ে প্রেসের দশ টাকার বিল দাবি করে নিজের কোম্পানি থেকে দুই টাকা অর্জনের জন্য। শহরতলীতে সত্যপ্রিয়র মিলের চিত্র চিত্রিত হয়েছে।
সত্যপ্রিয়র ভয়ে মিলে সকলে তটস্থ থাকে। কেরানিরা, কেরানিদের কয়েক ধাপ ওপরওয়ালারা সকলে কাজে ব্যস্ত থাকে। ওপরওয়ালাদের কড়াকড়িতে কেরানিরা ঘাড় পর্যন্ত ঘোরাতে পারে না। সত্যপ্রিয়র পিতার বার্ষিক শ্রাদ্ধের দিন অফিসের সকলের নিমন্ত্রণ আছে, তারা রাতে নিমন্ত্রণ খেতে যাবে। এই দিন সত্যপ্রিয়র অফিসে আসার কোনো সম্ভবনা নেই জেনে সকলেই কম বেশি গা এলিয়ে দেয়:
“কেবল একজনের কড়াকড়িতে যেখানে নিয়মতান্ত্রিকতা জেলখানার অত্যাচার হইয়া দাঁড়ায়, একটি মাত্র ক্রু অটি থাকিলে যেখানে সংগঠন খাড়া থাকে, সেই একজনের অভাবে ভ্রুতে ঢিল পড়িলেই নিয়ম শিথিল হয়, সংগঠনে আলগা পড়ে। অন্যদিন সত্যপ্রিয় না আসিলেও কিছু আসিয়া যায় না, তার আসিবার সম্ভবনাতেই যথারীতি কাজ চলিতে থাকে।” (৩খ, পৃ.-১৫৩)
সুযোগ পেয়ে তাই কেরানিদের ধমক দেওয়ার পরিশ্রমটুকুও উপরওয়ালারা করে না। দারোয়ানকে দিয়ে দারোয়ানের শিলনোড়াতে সিদ্ধি বাটাচ্ছে অনাথ ও আরও তিনজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী। আরেক ঘরে উপরওয়ালাদের আরেকটি দল গোপন মিটিং বসিয়েছে, দুটি কেরানি বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। অফিসে একটি উৎসবের আমেজ শুরু হয়:
“কর্মব্যস্ততার গুঞ্জন ধ্বনির বদলে আজ আপিস জুড়িয়া উঠিয়াছে গল্পগুজবের চাপা কলরব।” (৩খ, পৃ. ১৫৪ )
বৃদ্ধ কর্মচারীরা চোখ বন্ধ করে ঝিমাচ্ছে, আর কেষ্টবাবু পাঁচুকে যথারীতি সতর্ক না করে টেবিলে পা তুলে ঘুমাচ্ছে। এরই মধ্যে সত্যপ্রিয়র গাড়ি নিঃশব্দে এসে উপস্থিত হয়। কেরানি দুজন সিগারেট ফেলে হাতে কলম তুলে নেয়, চওড়া কাগজের তলে চাপা পড়ে শিলনোড়া, বৃদ্ধ কর্মচারী ক’জন চমকে সজাগ হয়ে ওঠে, কোঁচার খুঁটে চোখ মুছে কেষ্টবাবু হিসাবের খাতা দেখতে থাকে। পুরো অফিস স্তব্ধ হয়ে যায়।
অফিস-আদালত কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সকল ক্ষেত্রেই মালিকেরা কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে এবং নিজেরা টিতে থাকে। সত্যপ্রিয় কৌশলী মানুষ। ব্যবসার জন্য এবং ব্যক্তিজীবন সকল ক্ষেত্রেই সে কৌশল প্রয়োগ করে লাভবান হয়। যশোদাকে পুলিশ ধরলে মঞ্জুরদের অবস্থা কেমন হবে সে কথা সত্যপ্রিয় জানে। কাশীবাবু যশোদাকে পুলিশে দিলে তাই সে নিজে গিয়ে যশোদাকে ছাড়িয়ে আনে এবং যশোদার সামনে কাশীবাবুর কাছে হাতজোড় করে বলে:
“আমায় না জানিয়ে দয়া করে কিছু আপনি করতে যাবেন না। দুদিন একটু ব্যস্ত আছি, দাঙ্গা বাধিয়ে, পুলিশ ডেকে এক কাণ্ড বাধিয়ে আপনি বসে আছেন। ” ( ৩খ, (পৃ. ১৯১)

তারপর যশোদার কাছে তিন মাস সময় চেয়ে নেয়। কৌশলী সত্যপ্রিয়র কৌশল যশোদা বুঝতে পারে না। সে সরল বিশ্বাস করে সত্যপ্রিয়কে। এই তিন মাসের মধ্যে সে নন্দকে চাকরি দেয় এবং মজুরদের মধ্যে রটিয়ে দেয় যশোদা মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। শ্রমিকরা যশোদাকে ভুল বুঝে তাকে ত্যাগ করে। যশোদা নিঃস্ব হয়ে পড়ে। অন্যদিকে শ্রমিকদের কোনো দাবি পূরণ হয় না
“অস্পষ্টভাবে হলেও মানিক শহরতলী’তে শ্রমজীবী মানুষেরা সম্মিলিত শক্তির সম্ভাবনা ও সেই শক্তির শত্রুকে চিহ্নিত করবার চেষ্টা করেছেন।”
অপরাজিতা অসুস্থ হলে সত্যপ্রিয় জ্যোতির্ময়কে ছুটি নিতে বলে। কিন্তু এও সত্যপ্রিয়র একটি কৌশল। কাজ সত্যপ্রিয় ভাগ করে দিয়েছে। যার যতটুকু কাজ তাকে ততটুকু করতেই হবে। কোনো কৈফিয়ত সত্যপ্রিয় নবে না:
“যার যতক্ষণ ইচ্ছা কাজ করুক না, সত্যপ্রিয়র কী আসিয়া যায়, তার কাজ হইলেই হইল।” ( ৩খ, পৃ.-১৯৯)
তাই জ্যোতির্ময় ছুটি নেয় না। সত্যপ্রিয়র মতে মালিক হয়ে সে যে কর্মচারীদের সুখ-দুঃখের কথা শোনে এই তাদের জন্য অনেক বড়, উপরন্তু ছুটি নিলে সেটা সুযোগ নেওয়া হয়। এই সুযোগ কেউ নিলে সত্যপ্রিয় তার ওপর মনঃক্ষুণ্ণ হয় এবং এর প্রতিশোধ তোলে, অনেক সময় চাকরির ক্ষতি হয়। জ্যোতিময় ছুটি না নিলে সত্যপ্রিয় তাকে টাকা দিতে চায়। এ তার আরেক কৌশল। সে কাউকে টাকা দান করে না। প্রত্যেক ক্ষেত্রে টাকা তার কাছে ফিরে আসে। হয় কাজে, নয় বাধ্যবাধকতার প্রয়োজনীয় সম্পর্ক বজায় থাকায় কিংবা প্রতিহিংসায় । তাই জ্যোতির্ময় ছুটি বা টাকা কোনোটাই নেয় না। শুধু সত্যপ্রিয় কৌশল করে উদার মালিক হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করে।
মালিকপক্ষের রাজনীতির শেষ নেই। মতির গালে আলকাতরা মাখার বিষয় নিয়ে সুধীর যে মারামারির সুত্রপাত করে তার জের হিসেবে মালিকপক্ষ দশজন শ্রমিককে বরখাস্ত করে। এদের মধ্যে পাঁচজন মারামারির ধারের কাছেও ছিল না। কিন্তু এর আগের বার মিলে ধর্মঘট হওয়ার উপক্রমের সময় মালিকপক্ষের কাছে আটজনের নাম ছিল।
রাজনৈতিক কারণে তারা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। এই মারামারির সুযোগে ওই আটজনকে বরখান্ত করে দিলো। যশোদার কাছে তিন মাসের সময় নিয়ে সত্যপ্রিয় কূটকৌশল আঁটতে থাকে। নন্দকে একটা ভালো চাকরি দিয়েছে-ষাট টাকা বেতন। যশোদা বুঝতে পারে, এই চাকরি দিয়ে সত্যপ্রিয় যশোদাকে বাঁধতে চায়, যেন সময় পার হয়ে গেলেও যশোদা কিছু বলতে না পারে, আর যশোদা চুপ করে থাকলে শ্রমিকরাও চুপ করে থাকবে।
তাই যশোদা নন্দকে চাকরি করতে নিষেধ করে। কিন্তু নন্দ যশোদার কথা শোনে না। আর যশোদা শ্রমিকদের কাছে অবিশ্বাসী হয়ে যায়। যশোদার দুটি বাড়ি শূন্য হয়ে যায়। যশোদার একটি বাড়িতে থাকে বুড়ো মতি এবং পঙ্গু ধনঞ্জয় আর অন্য বাড়িতে থাকে বেকার নদেরচাঁদ আর সুধীর। সুধীর সত্যপ্রিয়র মিলে কাজ করে না, সে কাজ করে রেলের ইয়ার্ডে। সমালোচক মন্তব্য করেছেন।
মানিক রাজনৈতিক আন্দোলন পর্যালোচনা করে উপন্যাসে দেখিয়েছেন যে, প্রচলিত মধ্যবিত্ত আন্দোলনগুলি শ্রেণীস্বার্থ আদায়েরই আন্দোলন। যদি কখনো আন্দোলন গণমুখী হয়ে উঠতে চেয়েছে সাম্রাজ্যবাদী প্রভু সে আন্দোলনকে মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের সহায়তায় হয় থামিয়ে দিয়েছে, নতুবা মধ্যবিত্তের শ্রেণীস্বার্থ সংরক্ষণের আন্দোলনে পর্যবসিত করেছে।
আবহমান বাংলার রীতি অনুযায়ী নারীর কর্মক্ষেত্র ঘরেই সীমাবদ্ধ। নারী জনগোষ্ঠীর অর্ধেক হলেও সামাজিক সংকীর্ণতায় তাকে অবহেলিত করে ঘরে থাকতে বাধ্য করা হয়। ‘জন উপন্যাসে শ্যামাকে দেখি ঘরকন্নার কাজ করতে।
শ্যামা, মন্দা, সুপ্রভা, বিষ্ণুপ্রিয়া সকলেই গৃহিণী। কেবল সরযুকে দেখা যায় সে নার্স এবং তার মেয়ে বিভা গানের স্কুলের শিক্ষক। তবে সকল ক্ষেত্রে নারীর প্রথম এবং প্রধানতম কর্মক্ষেত্র হিসেবে সংসারের কাজই বিবেচনা করা হয়েছে। শীতল জেলে গেলে শ্যামা অসহায় হয়ে পড়ে, কিন্তু সে কোনো কর্মে যোগদান করতে পারে না।
মন্দার সংসারে আশ্রিত হয়ে যাওয়ার পরও সংসারের কাজে পরিশ্রম করাই তার একমাত্র কাজ। এ ছাড়া অন্য কোনো কাজে তাকে জড়ানো হয় নি। বকুলকে লেখাপড়া করানো হয়েছে ভালো বিয়ে দেওয়ার জন্য, চাকরি করার জন্য নয়। আবার ‘জীবনের জটিলতার’ দেখা যায় নগেনের উপযোগী হওয়ার জন্য প্রমীলা ইংরেজি বই পড়ছে। অথচ টানাটানির সংসারে প্রমীলাও চাকরির চেষ্টা করতে পারতো।
এমনও হতে পারতো যে বিমলের নয়, প্রেমীলারই চাকরি হচ্ছে। অন্যদিকে উচ্চবিত্ত অতি আধুনিক লাবণ্যকেও আমরা কোনো চাকরি বা ব্যবসা করতে দেখি না। তার স্বল্প আয়তনের উপস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসে যে বিয়ের পর সেও ঘরকন্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। বাঙালি সমাজের বোধ-ই এ রকম।
‘শহরতলী’তে যশোদা কাজ জুটিয়ে দিতে ওস্তাদ। কারখানার ম্যানেজার থেকে সর্দার-কুলি পর্যন্ত সকলেই তাকে চেনে। এ রকম একজন নারী কুলি-মজুরদের ভাত রান্না করে জীবন কাটিয়ে দিতে চায়।

নিমন্ত্রণ খেতে গেলেও তাকে রান্না করে দিয়ে যেতে হয়। লেখক যশোদাকে বাঙালি নারীর চিরন্তনরূপে স্থাপন করেছেন। সেই স্থানে থেকে সে সত্যপ্রিয়র মতো ধনী ব্যবসায়ীর সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে। যশোদা অন্য বাড়ির ভাড়াটে মেয়েদের কাজের দৃশ্য এভাবে চিত্রায়িত হয়েছে:
“চার-পাঁচজন ছাই দিয়া প্রাণপণে বাসন মাজিতেছে, একজন কলসিতে জল ভরিতেছে, দুজন দাঁড়াইয়া আছে স্থান খালি হইবার প্রতীক্ষায়।” ( ৩থ, পৃ.-১৩৮)
‘অহিংসা’ উপন্যাসে কারো সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মের কথা উল্লেখ করা হয় নি। মহেশ কী করে, তার সংসার চালানোর উপায় কী, কিছুই স্পষ্ট নয়। তবে মহেশের স্ত্রী এবং শশধরের স্ত্রী ঘরকন্নার কাজে, পরিবারের সদস্যদের সেবা-যত্নের কাজে তারা নিয়োজিত। শশধরের বউকে অন্য কোনো সময় জনসম্মুখে দেখা যায় না, কিন্তু যে কোনো কাজের সময় সে আগে আসে।
‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে সরসী আধুনিক মেয়ে। সে চটপটে এবং কর্মঠ। সভা-সমিতি নিয়ে সারাক্ষণ ছুটোছুটি করে। তার ঘরে মন বসে না, সারা দিন এ সব কাজে ঘুরে বেড়ায়। তবে তাকে অর্থ উপার্জনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট কাজ করতে দেখা যায় না। মালতী লেখাপড়া করছে। রিণি অতি আধুনিক মেয়ে, গান গায়। কোনো চাকরি বা ব্যবসা সে করে না। মনোরমা গৃহিনী-ঘরকন্নার কাজেই তার দিন কাটে। কালী ঘরের কাজ করে, বাইরের জগৎ সম্পর্কে তার ধারণা কম।
নারী অর্থ উপার্জন না করে ঘর এবং তার শৌখিন দু-একটি সামাজিক কাজেই নিয়োজিত থাকে । সামাজিক এ রীতির প্রতি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করেছেন।