মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমৃতস্য পুত্রাঃ উপন্যাস

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমৃতস্য পুত্রাঃ উপন্যাস । যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমৃতস্য পুত্রাঃ উপন্যাস

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমৃতস্য পুত্রাঃ উপন্যাস

বাস্তবতা এবং আবেগের সহাবস্থানমূলক উপন্যাস অমৃতস্য পুত্রাঃ (১৯৩৮)। উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন একটি ছেলের কীভাবে আদর্শচ্যুতি ঘটে। অনুপম আর শঙ্করের কলেজ যাওয়ায় উপন্যাস শুরু, শঙ্কর আর অনুপম পরস্পরের মুখের দিকে নীরবে চেয়ে থাকায় উপন্যাস শেষ হয়েছে। এরা দুজন খুড়তোতো ভাই, বীরেশ্বরের নাতি।

ধনাঢ্য বীরেশ্বর দ্বিতীয় বিয়ে করলে তার প্রথম বউ একমাত্র ছেলে শ্যামলালকে নিয়ে চলে আসে। শ্যামলালও বাবার সাথে কোনো যোগাযোগ রাখেনি, মারা যাওয়ার সময় স্ত্রী সাধনাকে বলে যায় বাবার কাছে যাওয়ার চেয়ে বেশ্যাবৃত্তি করতে। তাই সাধনা ছেলে অনুপমকে স্বামীর আদর্শেই বড় করছে। বীরেশ্বরের সাথে হঠাৎ করেই অনুপমের পরিচয় হয়। তারপর প্রায় এক বছর চলে গেছে। উপন্যাসের শুরু হয়েছে এখানে।

অনুপম বাসে করে কলেজে যাচ্ছিল, আর বীরেশ্বর শঙ্করকে নিয়ে নিে গাড়িতে একই কলেজে যাচ্ছে। বীরেশ্বর অনুপমকে দেখে গাড়িতে তুলে নেয়। শঙ্করের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় অনুপমের। এ উপন্যাসে লেখক দেখিয়েছেন আদর্শের জয় এবং পরাজয়কে। বীরেশ্বর কলেজে না গিয়ে বাড়ি নিয়ে আসে শঙ্কর আর অনুপমকে। সীতাপিসি এসে শ্যামলালের কথা জিজ্ঞাসা করলে অনুপম জানায় এক বছর ধরে শ্যামলাল মারা গেছে।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমৃতস্য পুত্রাঃ উপন্যাস

 

খবরটা শুনে বীরেশ্বর স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে, সীতাপিসি কাঁদতে থাকে, একে একে বাড়ির সকলে শোক করে। অনুপম চিন্তা করে এদের শোক করার কি আছে এ বাড়ির অর্গ্যানটা বিক্রি করলে তার বাবার চিকিৎসার খরচ হতো। লেখক এখানে ধনী-দরিদ্রের পার্থক্যটা স্পষ্ট করেছেন।

শ্যামলালের মাতৃভক্তির কথা বলেছেন, শ্যামলালের আদর্শ আর ত্যাগের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। বীরেশ্বর এই দিনই সতু আর শঙ্করকে নিয়ে অনুপমদের বাড়ি আসে। সাধনাকে অভিযোগ করে খরবটা তাদের না দেওয়ার জন্য। শুরু হয় দুই পরিবারের মধ্যে যাতায়াত। কিন্তু সাধনা স্বামীর কথায় অন্যথা করে না, সে তার নিজের সংগ্রাম চালিয়ে যায়। অনুপমদের বাড়িতে থাকে তরঙ্গ।

তরঙ্গ অনুপমের দূর সম্পর্কের মৃত কাকার বিধবা মেয়ে। তরঙ্গের বাবা এবং স্বামী দুজনই ছিলো অধ্যাপক। তাই তার ব্যক্তিত্ব খুব দৃঢ় বলে গর্ব করে তরঙ্গ। শঙ্কর তরঙ্গের প্রেমে পড়ে। কিন্তু তরঙ্গ তপস্যা করছে সংযমের এবং নিজেকে তৈরি করছে নারী মুক্তি এবং দেশের কাজে লাগানোর। তরঙ্গের অবহেলা শঙ্করকে উদ্ভ্রান্ত করে দেয়। শব্দর বক্তৃতা মঞ্চে অনাহুত বক্তৃতা দিতে ওঠে, হোটেলে গিয়ে মদ খায়, দূর গ্রামে পিকেটিং করে একুশ দিনের জন্য জেলে যায়। অন্যদিকে তরঙ্গ অনুপমের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমৃতস্য পুত্রাঃ উপন্যাস

 

গভীর রাতে অনুপমের সাথে বাইরে হাঁটতে যেতে চায়। সাধনা বাধা দেয়। তরঙ্গ রাগ করে বীরেশ্বরের বাড়ি গিয়ে ওঠে এবং দুমাস পরে অনুপমের কাছে বড় একটি চিঠি লিখে ফাঁসি নেয়। অনুপম কলেজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এখানে পরিচয় হয় আশালতার সঙ্গে। এরপর প্রেম হয় এবং আশালতাকে অনুপম বিয়ে করে। আশালতা অনুপমকে রাজি করে বীরেশ্বরের কাছে থেকে টাকা নিয়ে দুজন বিলেত যাবে। এ কথা শুনে সাধনা একটি বাক্স নিয়ে গ্রামে স্বামীর ভিটায় চলে যায়। সাধনার মানসিক অবস্থা লেখক দেখিয়েছেন এভাবে:

“সাধনা মরার মতো বিছানায় গিয়া শুইয়া পড়িলেন। পরদিন সকালে ছোট একটি
বাক্স সঙ্গে করিয়া চলিয়া গেলেন দেশে। একা।” (২খ, পৃ-৩১৮)

বীরেশ্বরের বাড়ির সবাই আসে অনুপমের কাছে আসল বিষয় জানতে। আশালতা তাদের জানায় অনুপমের বাবা শ্যামলালের টাকাই বীরেশ্বরের কাছে চেয়েছে এবং বীরেশ্বর তা দেবে। সবাই শুনে চলে যায়। শব্দর আসে সবার শেষে। আশালতা শঙ্করকে সব বলে সরবত বানাতে চলে যায়। অনুপম আর শঙ্কর একে অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকে। লেখক এ উপন্যাসে দেখিয়েছেন অনেক দিনের লালন করা আদর্শ সময়ের প্রয়োজনে মিথ্যে হয়ে যায়।

Leave a Comment