আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়: অভিশপ্ত নগরী। এটি বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার এর মিথ ইতিহাস ঐতিহ্যের নবমূল্যায়নধর্মী নতুন শিল্পশৈলীর উপন্যাস এর অন্তর্গত।

অভিশপ্ত নগরী
মানবেতিহাস তথা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আকর উপাদান গুলোর অন্যতম সম্পদ হচ্ছে মিথ (Myth)। আদিম মানুষের কাছে মিথ ছিলো সামগ্রিক জ্ঞানের ভাঙার অস্তিত্বের স্বরুপ নিরূপনের ক্রিয়াক্ষেত্র। মিথ ধারণ করে ঈশ্বর ও সৃষ্টি সম্পৃক্ত ভাবনাবলি, অতিপ্রাকৃত ঘটনাবলি কিংবা অতিমানবদের অস্তিত্ব। কোনো জাতির আদি ইতিহাস সম্পৃক্ত বিশ্বাস বা ধারণার পুরাণকথাকে মিথ বলা হয়।
মিথ শুধু আদিম সংস্কৃতি নয়, বিংশ শতাব্দীর এই যন্ত্রযুগের জটিল মানসক্রিয়ার সংস্কৃতিতে মিথের উপস্থিতি উজ্জ্বল এবং সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ মিথে ভেতর এমন এক শক্তি সঞ্চিত যে, যেকোনো সভ্যতার সময় সংকটে তা অস্তিত্বের নতুন জীবনাবেগ সঞ্চার করতে সক্ষম। মিথ ঐতিহ্যের নবনির্মাণ তাই আধুনিক উপন্যাসের এক মননশীল শিল্পশৈলী।
বিভাগ উত্তর বাংলাদেশের অবরুদ্ধ সমাজ ও বৈরী রাষ্ট্র পরিস্থিতির কারণে ঔপন্যাসিকরা মিথ ঐতিহ্যের নবমূল্যাশ্রয়ী মননশীল শিল্পাঙ্গিকের প্রতি মনোযোগী হন। মিথ-নির্ভর উপন্যাসের ফর্ম নির্মাণে আমাদের সাহিত্যে
সত্যেন সেন (১৯০৭-১৯৮১) ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। The old testament-এর ঘটনাংশকে তিনি চিরায়ত মানবীয় সংগ্রামের সাথে প্রতিন্যাস করেছেন ‘অভিশপ্ত নগরী’ (১৯৬৮) এবং “পাপের সন্তান’ (১৯৬৯) উপন্যাসে।
মিথের নবরূপায়ণে, গদ্যশৈলীর ধ্রুপদীবিন্যাসে এবং বক্তব্যের সমকালীন সংকট বিবেচনায় এদুটি উপন্যাস বাংলাদেশের উপন্যাসে স্বতন্ত্র, অনতিক্রান্ত সত্যেন সেনই বাংলাসাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক, যিনি বাইবেলের কাহিনী নিয়ে শিল্প সফল উপন্যাস রচনা করেছেন।

‘ওড় টেস্টামেন্ট’ এর ‘বুক অব দ্য প্রফেট যেরেমিয়া খন্ড’ থেকে তিনি ‘অভিশপ্ত নগরী’ এবং ‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসদ্বয়ের কাহিনী উপাদান গ্রহণ করেন। স্বাধীনতাকামী সমকালীন জীবনাকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষাপটে বাইবেলের মিথিক উপাদান মানুষের চিরায়ত সংবেদনার শিল্পরূপ হয়ে উঠেছে। ‘ব্যক্তিগতজীবনের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে অধিত জ্ঞানের সমন্বয় সাধনে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।
মার্কসীয় বিশ্বদৃষ্টি ও শ্রেণী সংগ্রামের আবহমান ইতিহাসবোধ তাঁর সৃষ্টিশলি চেতনাকে করেছে নবমাত্রিক ও স্বতন্ত্র । val উপন্যাসে বাঙালি জাতির রাজনৈতিক সংগ্রামের গৌরবময় অতীত ও বর্তমানকে তিনি বিশ্বজনীন চেতনা প্রবাহরে সঙ্গে সমন্বিত করেছেন।
বর্তমানের জীবনচৈতন্যকে ইতিহাসের আশ্রয়ে রূপদান করার ক্ষেত্রে স্তাঁদাল, স্কট কিংবা বালজাকের যে প্রয়াস, সত্যেন সেন তার-ই বিশ শতকীয় প্রতিনিধি তাঁর জীবনসন্ধানের গতি-প্রকৃতি ইতিহসা- পুরাণের সেই সব উৎসকে কেন্দ্র করে কল্লোলিত যার মধ্যে শিল্পীচৈতন্য মানব-ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক ও সংগ্রামশীল ক্রমযাত্রার চিরায়ত স্বরূপ অনুভবে উজ্জ্বল ও প্রাণময়।”
উপন্যাসের বিষয় নির্বাচন, কাহিনী বিন্যাস, চরিত্র চিত্রণ, ভাষা, জীবনদৃষ্টি ও শিল্পশৈলী সর্ব ক্ষেত্রে সত্যেন সেনের কৃতিত্ব অপরিসীম। বাইবেলের মিথিক কাহিনীকে তিনি প্রায় অবিকৃত রেখেছেন কিন্তু অভিশপ্ত নগরী’ ও ‘পাপের সন্তান’ কেবল ইতিহাসমাত্র নয়, তা ইতিহাস ও মিথের নব- রূপায়ণ। উপন্যাসের ঘটনাংশ নিম্নরূপ :
যেরেমিয়া নবী, সে বর্তমান যিরুশালেম থেকে যিহোবার আদেশে তাঁর মত প্রচার করছেন। যেরেমিয়ার বিশ্বাস তিনি নিজে কিছুই বলছেন না, পবিত্র যিহোবা তাঁর মুখ থেকে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করছেন। তিনি দেখতে পাচ্ছেন যিরুশালেমের রাজা, সামন্ত প্রভুগণ, লোকপ্রধান, মন্দিরের পুরোহিতগণ সমাজের উপর যে অত্যাচার করছেন, ধর্মের নামে পবিত্র যিহোবার আদেশ লঙ্ঘন করছেন, তাতে কারোই মুক্তি নেই, যিহোবা তাদের ধ্বংস করে দেবেন, পাপীদের শাস্তি প্রদান করবেন।
যেরেমিয়া তার ভক্ত রেহুমের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে এসব বাণী প্রচার করছিলেন, এমন সময় রাজরক্ষিরা তাকে ধরতে এল, লোকপ্রধান অহিকস তাঁকে উদ্ধার করে নিজের বাড়ি এনে স্ত্রী জিন্নার তত্ত্বাবধানে রাখেন। যৌবনে যেরেমিয়াকে ভালোবেসেছিল জিন্না, যেরেমিয়া বিয়েতে সম্মত হয়নি, নবী হয়ে যিহোবার বাণী প্রচার করতে লাগলেন।
রাজা যিহোয়াকীম ও মন্দিরের পুরোহিত আচার্য পশহর উভয়ের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে চলছে তীব্র মানসিক দ্বন্দ্ব। কিন্তু তারা উভয়ে চায় যেরোমিয়াকে কারারুদ্ধ করতে। রাজার একান্ত ইচ্ছা যে, গুপ্তচরেরা যেন যেরেমিয়া, খুঁজে বের করে আনতে পারে এবং প্রকাশ্যে বিচারের পূর্বে রাজা, যেরিমিয়ার সঙ্গে গোপনে বৈঠক করতে পারে।

রাজা কিছুতেই ভেবে পান না যে, নবী যেরেমিয়া কি করে বারবার য়িহুদী জাতির আসন্ন পতনের কথা ঘোষণা করছেন, কেন-ই বলছেন য়িহুদী জাতির প্রতি যিহোবার আর কোনো ভালোবাসা নেই, যিরুশালেম নগরীকে ধ্বংস স্তুপে পরিণত করে ফেলবেন, বাবিলের অপ্রতিরোধ্য সৈন্যরা এসে নগরী দখল করে নেবে।
যেরেমিয়ার কাছে শর্তের আর মাত্র দু’দিন বাকী। লোকপ্রধান অহিকম বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দেখলেন, সাধারণ মানুষ যেরেমিয়ার পক্ষে এবং তার প্রতি আস্থাশীল। রাজার বিরুদ্ধে, পুরোহীত আচার্য পশহর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ক্ষেপে আছে। অন্যদিকে হুসুফে নেতৃত্বে ক্রীতদাসরা তাদের মুক্তির দাবিতে সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করে। অহিকমের পুত্র গে, মিয়া ক্রীতদাসদের সঙ্গের যোগ দেয়।
একসময় যেরেমিয়ার বিরুদ্ধে প্রকাশে বিচার সভা বসে, কিন্তু অহিকমের বাগ্মিতায় ও সময় ঘুসুফের নেতৃত্বে হাজার হাজার ক্রীতদাস ও সাধারণলোক বিচার সভা ঘিরে ফেলে। তারা যেরেমিয়াকে মুক্ত করে তাকে নিয়ে নগরীতে মিছিল করে। এমন সময় শিঙার আওয়াজ ও হুঁশিয়ারী বাঁশী বেজে ওঠে। অর্থাৎ বাবিল রাজ্যের ক্যালদীয় সেনারা নগরী দখল করে। যিরুশালেম অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
কালদীয় সৈন্যদের হাত থেকে বাঁচার জন্য মন্দিরে পূজা, পশু বলি দিয়েও কেউ রক্ষা পায় না। ক্যালদীয় সৈন্যরা নগরীতে ঢুকে নানা সম্পদ লুটপাট করে এবং রাজা যিহোয়াকীমকে বন্দী করে, তার পুত্র যিহোয়াকীমকে রাজপদে অধিষ্ঠিত করে যায়।
“স্বর্ণময়ী সুন্দরী যিরুশালেমকে একবার ধর্ষণ করেই বাবিলরাজ নেতৃকাডনাজারের স্বর্ণ-কামনার পরিতৃপ্তি হয়নি।
কিছুদিন পর আবার যিরুশালেন নগরী বাবিলরাজের হাতে আক্রান্ত হয়। ন্যৈদের হাতে বিধ্বস্ত হয়ে নগরীর রাজা যিহোয়াকীমকে, তার মা নেইশতা, এবং স্ত্রীদের বন্দী করে বাবিলে নিয়ে যায়। বাবিলরাজ যিরুশালের উপর অধিক কর আরোপ করে।
রাজা যেদেকিয়া, মন্দিরের পুরোহিত, গোপনে মিশরের রাজার কাছে সাহায্য চেয়ে দূত পাঠায়। এদিকে নবী যেরেমিয়া তার ভবিষ্যত বাণী প্রচার করতে থাকেন, বাবিলে নির্বাসিতদের কাছেও চিঠি যায়। রাজা যেদেকিয়ার দুর্বলতার সুযোগে নগরীতে নতুন নবীর আবির্ভাব ঘটে। তার নাম হানানিয়া রাজার আদেশে অহিকম ও নবী যেরেমিয়া কারারুদ্ধ হলে ক্রীতদাস এবেদমালেকের প্রচেষ্টায় তাঁরা প্রাণে বাঁচেন।
ক্যালদীয় সৈন্যদের আক্রমণে নাগরী ধ্বংস হলে যেরেমিয়া বেরিয়ে আসেন কিন্তু নগরীর বিধ্বস্ত রূপ যেন সে মেনে নিতে পারে না। যদিও এতদিন সে এ ধ্বংসের সতর্কবানী প্রচার করেছে। নেবুকাডনাজার তাকে পুরস্কার দিতে চাইলে, সে প্রত্যাখ্যান করে। নবী যারেমিয়া বুঝতে পারেন, তার সান্নিধ্যই যেন অভিশাপ, তাই স্বামী-পুত্রহারা জিল্লা থেকে সে দূরে চলে যেতে চায়। জিহ্বা এবং যেরেমিয়ার সংলাপে উপন্যাসের শেষ হয় :
: কে কে তোমার সেই একান্ত প্রিয়জন যেরেমিয়া
: তুমি কি তা জানো না
: হয়তো জানি, হয়তো জানি না। আমি তোমার মুখ থেকেই সে কথা শুনতে চাই।
: তুমি আমাকে এমন করে প্রলুদ্ধ করো না। আমি যাই, জিল্লা যাই ।
: যেরেমিয়া, শোনো, আমার কথা শোনো
: না না না।”

বাইবেলের বুক অব দ্য প্রোফেট: যেরেমিয়া খন্ড’ বেশ জটিল। এখানে বর্ণিত হয়েছে যিহুদী জাতির পতনের কাহিনী। কিন্তু ঔপন্যাসিক সত্যেন সেন বাইবেলের এই জটিল মিথ কাহিনীকে খুব সহজ করে উপস্থাপন করেছেন এবং য়িহুদী জাতির তৎকালী সমাজব্যবস্থা ধর্ম বিশ্বাস, রাজতন্ত্র ও পুরোহিতের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সংস্কার, বাবিলের ক্যালদীয় সৈন্যদের হাতে যিরুশালেমের ধ্বংসহাব কিছু।
সমকালীন যিরুশালেনের ধর্ম ও নীতিহীনতাকেই নবী যেরেমিয়া অভিশাপ দিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু উপন্যাসের শেষে দেখা যায়, নগরীরর ধ্বংস স্তূপ দেখে যেরেমিয়া নিজেই মেনে নিতে পারেনা, সে দুঃখে আকুল হয়েছে। নিজের অভিশাপের সত্য নগ্নরূপ দেখে নিজেই দুঃখিত হয়। যেরেমিয়া শুধু এ উপন্যাসে যিরুশালেমের ভবিষ্যৎ বক্তা নয়, তাকে যৌবনের প্রারাও একজন প্রেমিক পুরুষ হিসেবেও দেখা যায়।
“নবী যেরেমিয়ার ঐতিহাসিক কাল খ্রিষ্টপূর্ব ৬২৬-৫৮৬। আর নেবুকাডনাজারের হাতে জেরুজালেমের পতন ঘটে ৫৮৬ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে। ….. এ উপন্যাসের নায়ককল্প পুরুষ যেরেমিয়া সমষ্টি অস্তিত্বের আকাঙ্ক্ষার রূপকার। তার মধ্য দিয়েই ধ্বনিত-প্রতধ্বনিত হয়েছে শোষণ-বঞ্চনা-নিপীড়ন ও দাসত্বের বিরুদ্ধে মানবীয় প্রতিবাদ।
মার্কসীয় বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদে বিশ্বাসী কোনো শিল্পীর চৈতনো অলৌকিক পুরুষ চরিত্রের স্বাকৃতির পেছনে মিথভাবনার আধুনিকায়নের প্রসঙ্গ গুরত্বপূর্ণ। ধর্ম, সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের ধারায় এ জাতীয় অসংখ্য প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত পুরুষের উপস্থিতি দেখা যায়।
যাঁরা নিজ নিজ আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় সমগ্র জনগোষ্ঠীয় নায়ক পুরুষে পরিণত হয়েছেন।….. যেরেমিয়ার মধ্যে ঔপন্যাসিক মিথিক শক্তির এই ইতিবাচক তাৎপর্যকেই সন্ধান করেছেন। ২০ নবী যেরেমিয়া ছাড়াও এ উপন্যাসে অহিকম, জিন্না, গেদেথিয়া নবী হানানিয়া, ক্রীতদাস ঘুসফ চরিত্র চমৎকারভাবে অঙ্কিত হয়েছে। অহিকম যিরুশালেমের ঘটনাস্রোতে জড়িয়ে যায় যেমন, তেমনি তার পুত্র গেদেমিয়াও ক্রীতদাসদের সংশে সংগ্রামে অংশ নেয়।
গেদেমিয়ার শ্রেণীহীন সমাজচেতানর পেছনো সত্যেন সেনের মার্কসীয় দৃষ্টি কাজ করেছে। যদিও ক্রীতদাসী সারার সঙ্গে প্রেমই তার এই উত্তরণের পেছনে স্বক্রিয়াছিল, তবু একথা অনস্বীকার্য যে, সমাজ বিবর্তন ধারায় গেদেমিয়ার চরিত্রটি প্রগতিশীল চিন্তাকে ব্যক্ত করেছে। তাই বলা যায়, ‘অভিশপ্ত নগরী’ কেবল য়েরুজালেম নগরী ধ্বংস বা ইহুদীজাতির পতনের কাহিনীমাত্র নয়, সমাজ পরিবর্তনে প্রগতিশীল চেতনারও অনতিক্রান্ত শব্দরূপ ।
২.
‘অভিশপ্ত নগরী’ উপন্যাসের কাহিনী বিন্যাস, পটভূমি ও জীবনবেদের সঙ্গে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের মিল আবিষ্কার কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়, প্রায় সামান্তরাল। আত্মদ্বন্দ্বে পরাজিত, নৈতিক দিক থেকে অধঃপতিত, চরিত্রহীন বাঙালি জাতির সঙ্গে জেরুজালেম খ্রিষ্ট-পূর্ব ইহুদী জাতির মিল খুবই নিকটবর্তী।
রাজশক্তি ও পুরোহিততন্ত্র ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত, ধর্মহীন, নীতিহীন, অত্যাচার, অনাচারে বিপর্যস্ত নবী যেরেমিয়া যখন যিহোবার প্রত্যাদেশ প্রচার করে তখন উভয় শক্তিই তাকে প্রতিপক্ষ মনে করে। রাজা এবং পুরোহিত যেরেমিয়ার সাবধানবাণী অনুধরানে ব্যর্থ হয়, তার বিচার সভার আয়োজন করে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যেরেমিয়ার মুক্তি দাবি নিয়ে বাইরে জড়ো হয়, অধ্যক্ষগণ যেরেমিয়াকে মুক্তি দেওয়াই সঙ্গত মনে করে এবং জনতা তাকে নিয়ে আনন্দ প্রকাশে উদোগী হয়। তখনই জনতার উল্লাসধ্বনি স্তব্ধ হয়ে যায়। বাবিলের ক্যালদার সৈন্যরা জেরুজালেম আক্রমণ করে। অবরুদ্ধ ও লুষ্ঠিত হয় নগরী :
“শুধু কি তাই? রাজা যিহোইযাকীন, তাঁর মা বেহুশতা, তাঁর পত্নীগণ, কুলপতিগণ আর নগরের যোদ্ধাগণকে বন্ধী করে বাবিলে পাঠানো হোল ।.. .. আভিজাত পরিবারের বাছা বাছা সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে করে নিয়ে গেল ওরা। যে মেয়েরা কখনও পায়ে হেঁটে পথ চলেনতাদের অনাবৃত সুকোমল মুখমণ্ডল প্রখর সূর্যের তাপে ফুলের মতই শুকিয়ে উঠল ভয়ার্ত হারিনীর মতই ওরা কাঁপছিল আর ব্যাকুল চোখে চারিদিকে চাইছিল ।
বিপুল ধন-সম্পদে সমৃদ্ধ বাঙলা এভাবে বর্হিশক্তির আক্রমণের শিকার হয়েছে বারবার। লুণ্ঠিত হয়েছে এদেশের সম্পদ, ধর্ষিতা হয়েছে বাঙলার কুলবধূ, যুবর্তী। মিথকথার সঙ্গে সমকালীন সমাজ ভাবনা ও জীবনচেতনাকে সম্পৃক্ত করে সত্যেন সেন আবিষ্কার করতে চেয়েছিন জাতিসত্তার নতুন সম্ভাবনা।
অহিকমের পুত্র গেদেমিয়ার ক্রীতদাস আন্দোলনে যোগদানের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের মৌল সত্য ও জীবনার্থ স্পষ্ট জিল্লাহ উদ্দেশ্যে প্রেরিত পত্রে গেদেমিয়া বলেছে-“আমি আমাদের এই ভাংগাচোরা, জীর্ণ আর রক্তমাখা সমাজে বসে আর একটি অপরূপ সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখি, যে-স্বপ্ন একদিন সত্য হয়ে উঠবে। ২২ সত্যেন সেন মূলত মার্কসীয় দর্শন ও শ্রেণীহীন জীবনচেতনার স্বপ্নময় ভবিষ্যতের বিশ্বাসী ছিলেন। তাই তাঁর উপন্যাসের মিথিক সম্ভবনা মধ্যের সেই জীবনচেতনাই শিল্পিত হয়েছে ।
‘অভিশপ্ত নগরী’ উপন্যাসের ভাষার ধ্রুপদী বিন্যাস লক্ষণীয়। বাইবেলের মত একটি ক্লাসিক গ্রন্থ থেকে ঔপন্যাসিক বিষয় ও উপাদান গ্রহণ করেছেন। ফলত উপন্যাসের গদ্যভঙ্গি ও ভাষাশৈলী নিরতিশয় বক্তব্যে অনুগামী :
“বাবিল সেনাপতি, আপনাদের নির্ভরতার তুলনা নেই। পৃথিবীর সমস্ত জাতির বিস্ময় ও আতঙ্কে অস্থিত হয়ে আপনাদের এই বিভীষিকাময়ী রক্তাক্ত মূর্তির দিকে তাকিয়ে আছে। আপনারা যিরুশালেমের বুকের মণি আমাদের প্রভুর মন্দিরকে তন্মসাৎ করেছেন, তার প্রাচীরকে ধ্বংস করে দিয়ে নগরীকে শুন্যতায় নিক্ষেপ ক েছেন, নির্দোষ ও অসহায় নাগরকিদের হত্যা করে আপনাদের রক্ত পিপাসা চরিতার্থ করেছেন, আর যারা বেঁচে আছে সেই হতভাগ্যদের তাদের মাতৃভূমির বুক থেকে টাচ্ছন্ন করে পশুর মত দলে দলে বেঁধে নিয়ে গেছে। আর আপনাদের মহামহিম বাবলি রাজ নেবুকাডনাজাদের নিজের দর্শন সুখের জন্য হতভাগ্য রাজা যেনেকিয়ার দুই চক্ষু উৎপাটিত করেছেন।

উদ্ধৃতাংশে বাক্য জটিলতামুক্ত কিন্তু গুরুগম্ভীর, শব্দ ও ক্রিয়াপদে সাধুভঙ্গির কারণে ভাষায় ওজস্বিতা এসেছে। যেমন- বিস্ময়(অবাক) স্তম্ভিত (থেমে যাওয়া) পিপাসা (তৃষ্ণা) চরিতার্থ (কৃতকার্য হওয়া) উচ্ছন্ন (উ মূলিত হওয়া) ইত্যাদি শব্দ। শব্দ ব্যবহারে এই সচেতনাতা সত্যেন সেনকে ধ্রুপদী শিল্পীর মর্যাদায় অভিসিক্ত করেছে। বিষয় বস্তুর ক্লাসিক আবহ রক্ষা করার জন্য তিনি উপন্যাসে ভাষাশৈলীতে সৃষ্টি করেছেন মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা :
এক. চাষীর হাতে ধারালো কাজে যেমন করে ফসল কেটে চলে, ওদের হাতের তরোয়ালও তেমনিভাবে যে পথ দিচ্ছে যাবে সব সাফ করে দিয়ে যাবে।
দুই. উৎসুক দৃষ্টিতে সবাই মিশরের দিকে তাকিয়ে আছে, যেমন করে ব্যাকুল কৃষক উষ্ণমুখী হয়ে তাকিয়ে থাকে বর্ষণহীন মেঘের দিকে।
উপমার এই সারল্য এবং প্রসারতা ক্লাসিক ভাষাশৈলী বৈশিষ্ট্য।