আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ অপেক্ষমাণ কাব্যনাটক । যা সৈয়দ শামসুল হকের সামাজিক কাব্যনাটক এর অন্তর্গত।

অপেক্ষমাণ কাব্যনাটক
সৈয়দ শামসুল হক এর (১৯৩৫-২০১৬) নিরীক্ষাধর্মী কাব্যনাটক অপেক্ষমাণ (২০০৯)। ‘ হেনরিক ইবসেন আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব ২০০৯-এ মঞ্চায়নের জন্য নাট্যপরিচালক আতাউর রহমানের বিশেষ অনুরোধে নাটকটি তিনি রচনা করেন।’ নাটকটিতে তিনি স্বরচিত কাব্যনাটক ঈর্ষা (১৯৯০) এবং নরওয়েজিয়ান নাট্যকার হেনরিক যোহান ইবসেন (১৮২৮-১৯০৬) রচিত নাটক এ ডলস হাউস (১৮৭৯) ও এন এনিমি অব দ্য পিপল (১৮৮২) নাটকের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ও চরিত্রের অসাধারণ সমন্বয় ঘটিয়েছেন।
তবে হেনরিকের বিশ্বখ্যাত নাট্যকর্ম থেকে উৎসরস আহরণ করলেও তিনি তাঁর মধ্যে নবপ্রাণরস সঞ্চার করে নাটকটিকে সম্পূর্ণ মৌলিক রচনা হিসেবে দাঁড় করাতে পেরেছেন। সৈয়দ শামসুল হকের এ ধরনের নিরীক্ষাধর্মী রচনার সফলতা নিয়ে একজন সমালোচকের মন্তব্য প্রসঙ্গত স্মরণ করা যেতে পারে :
কখনো কখনো মনে হয় একই লেখা দুইবার, তিনবার, চারবার লিখছেন একজন লেখক। সৈয়দ হক সম্পর্কে এই অভিযোগ তোলার কোনো অবকাশ নেই। কারণ একটা লেখার পরে তিনি সেই লেখার বিন্যাসের দিকে দ্বিতীয়বার ফিরে তাকাননি। তাঁর নতুন লেখা মানেই নতুন বিন্যাস।
বস্তুত, সৈয়দ শামসুল হক ঈর্ষার প্রৌঢ় চরিত্র এ ডলস হাউস-এর নোরা চরিত্র ও এন এনিমি অব দ্য পিপল নাটকের ডাক্তার চরিত্রকে একই মঞ্চে উপস্থাপন করে উনিশ শতকের পাশ্চাত্য সমাজ ও একবিংশ শতাব্দীর প্রাচ্যসমাজের মিল-অমিল ও ধারাবাহিক পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছেন।
তিনটি পৃথক সমাজের পৃথক চরিত্রকে একই মঞ্চে দাঁড় করিয়ে তিনি দেখাতে চেয়েছেন জীবনে সত্যের সম্মুখে দাঁড়ানোর মতো মহৎ আর – কিছুই নেই; নিজেকে আবিষ্কার করতে হলে মানুষকে নিজের মনের আয়নাতেই নিজেকে চিনে নিতে হয়।
শত বছর পূর্বে নাট্যকার ইবসেন আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতা ও সত্যের বিজয়ের যে কথা তাঁর নাটকে বলে গেছেন, শতবর্ষ পরে সৈয়দ শামসুল হক তেমনি একটি চরিত্র নির্মাণ করেছেন ঈর্ষা নাটকে যেখানে অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ এক প্রৌঢ়চরিত্র চরম একাকিত্বের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করছেন। অপেক্ষমাণ নাটকের কোরাসচরিত্র ব্রেকডান্সার দল নাচের তালে তালে নাটকের প্রারম্ভে এ কথাই বলে গেছে দর্শকের উদ্দেশ্যে :
হক আর ইবসেন […]
বলবেন – বলেছেন
একা হয়ে যেতে হয় সত্যের সমুখেই
শক্তিটা আছে শুধু সত্যেই – সত্যেই (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫০৩ ) ‘
মূলত, সৈয়দ শামসুল হক বরাবরই পাশ্চাত্য নাট্যসাহিত্যের বাস্তববাদী ধারার পথিকৃৎ, নওরেজিয়ান নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের অনুরাগী ছিলেন; তাঁর লেখনীতে নওরেজিয়ান এ-লেখকের প্রভাব নাটকের ভাবাদর্শ ও রচনারীতি উভয়দিক থেকেই প্রতীয়মান হয়।
বিশেষত রচনার ভাবাদর্শগত দিক বিচার করলে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে সৈয়দ শামসুল হকই হেনরিক ইবসেনের নাট্যাদর্শের যথার্থ উত্তরসাধক; কলুষমুক্ত, বৈষম্যমুক্ত, কুসংস্কারমুক্ত একটি সুসভ্য সমাজ নির্মাণ ও সুশিক্ষিত জাতিগঠনই ছিল উভয় লেখকেরর রচনার মৌল উদ্দেশ্য; তাঁরা উভয়েই সমাজে বিদ্যমান শ্রেণিবৈষম্য, লিঙ্গবৈষম্য, অপসংস্কৃতি, ধর্মের নামে অনাচার, রাজনীতির নামে স্বৈরাচার, রাষ্ট্রক্ষমতার স্বেচ্ছাচারী আচরণে ব্যথিত হয়েছেন এবং সমাজলগ্ন নাট্যরচনার মাধ্যমে সাধারণ জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সচেতন করে তুলতে চেয়েছেন।
ঊনবিংশ শতাব্দীর ভিক্টোরিয়ান সমাজে প্রচলিত বিশ্বাস ছিল – সমাজ সর্বদা একটি মহৎ প্রতিষ্ঠান, এবং সমাজ – প্রচলিত নিয়ম-নীতি যতই ভ্রান্ত হোক, মানুষের জন্য ক্ষতিকর হোক, তবু সেই ক্ষমতাকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার অধিকার কারো নেই। হেনরিক ইবসেন তাঁর অ্যান এনিমি অব দ্য পিপল নাটকে প্রচলিত এ ধারণা ও বিশ্বাসের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গলি প্রদর্শন করেছেন।
তিনি অদক্ষ সংঘশক্তির অসারতা দেখিয়ে বলেছেন – দশজন মিলে – একটি মিথ্যাকে সত্য বললেই সেটি সত্য হয়ে যায় না, বরং সেটি মিথ্যাই থাকে। আর সমাজে যদি এগারোতম ব্যক্তি একাই সে সত্য প্রকাশ করে তবে সেটি সত্যই। জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সবসময় কল্যাণ বয়ে আনে না। জনগণকে আগে প্রকৃত শিক্ষায় সুশিক্ষিত হয়ে উঠতে হয়, ভালো-মন্দ বিচারের জ্ঞান থাকতে হয়। মানুষ কেবল আকারে মানুষ হলেই হয় না, তাকে মনুষ্যত্ব অর্জন করে নিতে হয়। হেনরিক ইবসেন তাঁর এন এনিমি অব দ্য পিপল নাটকে সত্যান্বেষী নির্ভীক ডাক্তার চরিত্রটির জবানিতে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন :
‘জনগণ’-এর মতো জাদুশব্দ দিয়ে আর আমার মগজধোলাই করা যাবে না। না, আর না। একদল প্রাণী মনুষ্য-আকৃতির হলেই জনগণ হয়ে যায় না। জনগণের সঙ্গে সম্মান জড়িত এবং সে সম্মান নিজেদেরই অর্জন করতে হয়। […] আমি বিপ্লবী। সংখ্যাগরিষ্ঠ সবসময়ই সঠিক – যুগপ্রাচীন এই মিথ্যার বিরুদ্ধে আমি বিদ্রোহ – ঘোষণা করছি।
[…] যিশু যখন ক্রুশে চড়েছিলেন তখনও কি সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্ভুল ছিল ? পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে এ কথা বিশ্বাস না-করে সংখ্যাগরিষ্ঠ যখন গ্যালিলিও-কে কুকুরের মতো হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করে তখনো কি সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্ভুল ? সঠিক কী সেটা বুঝতেই সংখ্যাগরিষ্ঠের পঞ্চাশ বছর পার হয়ে যায়। নির্ভুল কাজটি যতক্ষণ পর্যন্ত না- করে ততক্ষণ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ সঠিক নয়। ( ২য় অঙ্ক, দৃশ্য ২, পৃ. ৮৩-৮৫) ‘
এন এনিমি অব দ্য পিপল নাটকের মূল কাহিনি আবর্তিত হয়েছে নরওয়ের ছোট্ট একটা শহরে নবনির্মিত পাবলিকবাথ প্রকল্পের পানি দূষণ নিয়ে। শহরের নাগরিকদের পানিসমস্যা দূরীকরণের জন্য সরকারি প্রকল্প হিসেবে এটি নগর মেয়রের তত্ত্বাবধায়নে নির্মাণ করা হয়েছে; কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার অভাব, অদূরদর্শিতা, দুর্নীতি প্রভৃতি কারণে পানিপ্রকল্পের সঠিক উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে।

ফলে ভগ্নস্বাস্থ্য ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশায় বিভিন্ন শহর থেকে আগত নাগরিকরা সুস্থ হবার বদলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এসময়ে সত্যান্বেষী ডাক্তার থমাস স্টকম্যান গবেষণা করে দেখেছেন পানিদূষণের মূলকারণ প্রকল্পের অদূরে অবস্থিত ট্যানারি কারখানা । তাই অতিদ্রুত বাথপ্রকল্পের স্থান সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন; তা না হলে এটি দীর্ঘমেয়াদে শহরের নাগরিকের স্বাস্থ্যহানির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
ডাক্তারের এই আবিষ্কারের কথা জানতে পেরে প্রথমে সাংবাদিক, সুশীলসমাজ তাকে সাধুবাদ দিলেও, নগরপিতা পিটার স্টকম্যান যখন স্বীয়স্বার্থে ডাক্তারের বিরোধিতা করেছেন, তখন তারাও ক্ষমতাকাঠামোর দম্ভে ভীত হয়ে দুর্নীতিবাজ মেয়রকে সম্মিলিতভাবে সমর্থন জানিয়েছেন। এঁদের কেউই সত্যের জন্য নিজেদের ব্যাক্তিস্বার্থ বিসর্জন দিতে কিংবা মেয়রের রোষানলে পড়তে চাননি।
মেয়র তাঁদের বুঝিয়েছেন এই পানিপ্রকল্প নগরবাসীর জীবনমানে পরিবর্তন এনেছে, শহরে পর্যটক আসছে, জনগণের উন্নতি হচ্ছে। অন্যদিকে ডাক্তারের কথায় পানিপ্রকল্প পুনর্নির্মাণ করতে গেলে নগরবাসীকে অতিরিক্ত কর দিতে হবে । ফলত, সুবিধাবাদী জনগণ তাদের দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কথা চিন্তা না করেই, আপাতপ্রাপ্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে গা ভাসাতে চাইছে।
কিন্তু ডাক্তার নিজের স্বার্থের কথা না ভেবেই একা শেষপর্যন্ত সত্যের পক্ষে লড়ে গেছেন। ফলস্বরূপ, তার পৌরসভার চাকুরি গেছে, মেয়ে স্কুলের চাকুরি হারিয়েছে, ছেলেরা স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে, এমনকি জনগণ উন্মত্ত হয়ে তাকে ‘জনতার শত্রু’ উপাধি দিয়ে ঘর-বাড়ি ঢিল ছুঁড়ে ভেঙে দিয়েছে।
এরকম বিরূপ পরিস্থিতিতে তিনি প্রথমে ভেবেছেন প্রিয় শহর পরিত্যাগ করে তিনি অন্যত্র চলে যাবেন; কিন্তু পরক্ষণেই সে সিদ্ধান্ত ত্যাগ করেছেন, এবং সত্যের পক্ষে সংগ্রাম করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছেন। তিনি অনুধাবন করেছেন প্রতিকূল পরিবেশে যে মানুষ সত্যকে অবলম্বন করে একা দাঁড়াতে পারে, পৃথিবীতে তার মতো শক্তিশালী আর কেউ নেই; এবং সত্যকে অবলম্বন করে একা সংখ্যাগরিষ্ঠ মিথ্যার সঙ্গে লড়াই করে যাওয়াই হওয়া উচিত মানবজীবনের ব্রত। ইবসেনের এমন নাটক লেখার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে খায়রুল আলম সবুজ নিম্নরূপ মন্তব্য করেছেন :
অর্গানাইজড লিবারেলদের প্রতি ইবসেন আগে থেকেই চটে ছিলেন। গোস্ট নাটকের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সেই আগুনে যেন ঘি ঢাললো। রাষ্ট্র ধারণাকেও তিনি এক সময় ব্যাক্তি-স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে মনে করেছেন। […] গণতন্ত্র অপরিহার্যভাবেই বহুদলীয় ব্যবস্থা এবং দুঃখজনকভাবে প্রায় সবসময়ই দল রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়ে যায়।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কব্জা করাই দলগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় এবং সেক্ষেত্রে যে যত মানুষ দলে টানতে পারবে লাভের আশা তার তত বেশি। দেশ ও দশের মঙ্গল চিন্তা তখন অন্তরালে চলে যায়। […] মানুষের মানসম্মত মূল্য সেখানে গৌণ হয়ে যায় – ভোটাভুটির ক্ষেত্রে সংখ্যাই সবশেষ কথা।
এমন – পরিস্থিতিতে ইবসেন বলেছেন, – The state is the curse of individual! ব্যক্তি সেখানে গুরুত্বহীন – হয়ে পড়ে। এই বিশ্বাসের কথাই তিনি তাঁর এন এনিমি অব দ্য পিপল-এ উপস্থাপন করেছেন। অর্গানাইজড লিবারেলদের প্রতি তার মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তথাকথিত লিবারেল সংবাদপত্রের প্রতি বিরক্তি।
সৈয়দ শামসুল হক তাঁর হেনরিক ইবসেন রচিত নাটকের এ বিষয়টি অক্ষুণ্ণ রেখেছেন এবং বাংলাদেশের আর্থ- সামাজিক-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে সংগতি রক্ষা করে অপেক্ষমাণ নাটকের ঘটনাংশ বিন্যস্ত করেছেন।
অন্যদিকে, ইবসেনের এ ডলস হাউস বিশ শতকের ইতিহাসে সবথেকে বেশিবার প্রদর্শিত নাটক। ১৮৭৯ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর কোপেনহেগেন থেকে প্রকাশিত এ-নাটকটি সারাবিশ্বে সাড়া-জাগানিয়া একটি দর্শকনন্দিত নাটক। নাটকটির বিষয়ও চমকপ্রদ। নাটকটির মূলভাব সম্পর্কে সমালোচক একটি চমৎকার মন্তব্য করেছেন :
নারীর দাসত্বের ওপরে যে সমাজের বুনিয়াদ গড়ে উঠেছে, নারীত্ব, সতীত্ব, কর্তব্যবোধ প্রভৃতি নীতির শ্লোগান আউড়িয়ে, নারীকে শৃঙ্খলিত করেছে যে সমাজ, সেই সমাজ ইবসেনের মতে কোনোদিনই সত্যিকার মনুষ্যত্ব- লাভের সহায়ক নয়। A Doll’s House- এর বাণী সত্যিই বিস্ফোরক – […] নারীকে নিয়ে আর পুতুলখেলা চলবে না’
বস্তুত, হেনরিক ইবসেন তাঁর এ ডলস হাউস নাটকে দেখিয়েছেন – পারিবারিক পরিসরে একজন নারী সাধারণ মানুষের মতো পরিচতি ও বিবেচিত হন না; তাঁর জন্য রয়েছে সমাজ নির্ধারিত পৃথক নিয়ম। এমনকি প্রচলিত ধর্মও নারীকে কেবল সমাজের প্রতি, স্বামীর প্রতি, পরিবারের প্রতি, সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালনের কথা বলে কিন্তু সমাজ বরাবরই তার প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শন করে। তাকে মানুষরূপেই গণ্য করে না।
আলোচ্য নাটকে সাধারণভাবে বিবেচনা করলে দেখা যাবে প্রধান দুই চরিত্র নোরা এবং হেলমার দাম্পত্য জীবনে বেশ সুখী। হেলমারের নতুন ব্যাংকে চাকুরির সুবাদে অতীতের সমস্ত দৈন্য কাটিয়ে সন্তান, সহকারী, স্ত্রী, বন্ধু পরিজন নিয়ে হেলমার উদযাপন করছে সুখী-সমৃদ্ধ পারিবারিক জীবন। এমন কি হেলমারের স্বামী হিসেবে স্ত্রী নোরার প্রতি ভালবাসারও কোনো কমতি নেই।
কিন্তু নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, আপাত সুখী এ- সংসারজীবনে কোথাও যেন একটি লুকায়িত দীর্ঘশ্বাস বিদ্যমান; এবং বলাবাহুল্য সেটি নোরার একজন মানুষ হিসেবে সংসারে বঞ্চিত হবার দীর্ঘশ্বাস। একজন নারী কেবল কন্যা, স্ত্রী, জননী হতে পৃথিবীতে আসেনি।
একজন মানুষ হিসেবে পুরুষের মতোই তার ভূমিকা রয়েছে সমাজে। অথচ সমাজ-সংসারে সে ক্রমাগত অবমূল্যায়িতই থাকে। পিতার সংসারে নোরার জীবন ছিল পুতুলের মতো। দাম্পত্যজীবনেও সে পুতুলের মতোই বিনোদনের অংশীদার। এমনকি সন্তান-সন্ততিও তার কাছে পুতুলতুল্য।
তাদের ভালোমন্দ নির্ধারণে কিংবা সংসারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার ভূমিকা নেই। ফলে তার হৃদয়ে ক্রমাগত অনুরণিত হয়েছে আক্ষেপ ও বিষাদের সুর। যেকারণে সে সংসার ছাড়ার মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে দেখিয়েছে – চাইলে একজন নারীও -জীবনের ব্যাপারে গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। নোরার এ আক্ষেপ অপেক্ষমাণ নাটকে সৈয়দ হক নিম্নোক্তভাবে উপস্থাপন করেছেন :
বাবা আমাকে আদর করে পুতলি ডাকতেন।
আমি যেমন পুতুল খেলা করতাম, তিনিও আমাকে নিয়ে পুতুলই
খেলতেন ।
তারপর যখন তোমার কাছে থাকতে এলাম – [ … ]
তুমি তোমার রুচি তোমার ভালো লাগা তোমার ইচ্ছে নিয়ে বাড়িতে,
আর আমি তোমার রুচি তোমার ভালো লাগা নিয়ে তোমার
ইচ্ছের পুতুল। […]
আজ পেছন ফিরে দেখে সব মনে হচ্ছে –
দাসীর জীবন ছিলো আমার। দাসীরই জীবন আমি কাটিয়ে গেছি।
তোমার সুঁতোর টানে নেচে গেছি শুধু। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫১১-৫১২)
এ ডলস হাউস নাটকের বিবৃত কাহিনি সৈয়দ শামসুল হক অপেক্ষমাণ নাটকে সংক্ষিপ্তরূপে প্রকাশ করেছেন। শুরু থেকে মূল কাহিনি না দেখিয়ে নোরা যখন সংসারত্যাগী হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অপেক্ষমাণ নাটকে তখন থেকেই নাট্যঘটনা নারী ও পুরুষ চরিত্রের সংলাপ-প্রতিসংলাপের মাধ্যমে দর্শকের সম্মুখে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আবার, নাট্যকার অপেক্ষমাণ নাটকে নোরা চরিত্রের দৃঢ়তা পুরোপুরি অক্ষুণ্ণ রাখলেও হেলমার ও নোরার বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ বদলে দিয়েছেন । যেমন এ ডলস হাউস নাটকে নোরা ক্রগসতাদের হুমকিতে ভীত হয়ে তাকে চাকুরিতে বহাল রাখার জন্য স্বামী হেলমারকে সুপারিশ করেছে; হেলমার সে শুপারিশ রাখেনি দেখে নোরা রুষ্ট হয়েছে।
কিন্তু অপেক্ষমাণ- নাটকে দেখা গেছে স্ত্রী চরিত্রটি বারবার নিষেধ সত্ত্বেও স্বামী কেবল তার ব্যক্তিস্বার্থে একটি নেতিবাচব চরিত্রকে ব্যাংকে চাকুরি দিয়েছে। এখানে স্ত্রীর অনুরোধ, ভালোবাসা, মর্যাদার থেকে বেশি হয়ে গেছে স্বামীর ব্যক্তিস্বার্থ।

আর এই ভালোবাসাহীনতার কষ্ট, সংসারে আত্মমর্যাদাহীন অবস্থানের যন্ত্রণা ভুলতেই স্ত্রী সংসার ছাড়তে চেয়েছে; নিজেকে শিক্ষাদীক্ষায় আত্মিক উন্নয়নে এমন শিখরে নিতে চেয়েছে, যেখানে পুরুষের অমর্যাদাকর প্রত্যক্ষণ কোনো ভূমিকাই রাখতে পারবে না। এ ডলস হাউসে এতদসংক্রান্ত সংলাপ নিম্নরূপ :
নোরা। আট বছর ধরে ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করেছিলাম আমি- কারণ, আমি জানতাম যে অলৌকিক ঘটনা রোজ ঘটে না। তারপরে, এই বিপদটা আমার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়লো। […] ক্রগসতাদের চিঠিটা যতক্ষণ ওই চিঠি-ফেলার বাক্সের মধ্যে পড়েনি ততক্ষণ আমি একমুহূর্তের জন্যেও ভাবতে পারিনি যে তার শর্তের কাছে তুমি মাথা নোয়াবে। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে তুমি তাকে বলবে : ‘আমিই অপরাধী।’ সে বিষয়ে আমার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। […]
হেলমার। নোরা, তোমার জন্যে দিনরাত আমি খুশী হয়ে কাজ করতে পারি – সহ্য করতে পারি দুঃখ আর – দারিদ্র্য।
কিন্তু যাকে মানুষ ভালবাসে তার জন্যে সে নিজের সম্মানকে জলাঞ্জলি দিতে পারে না ।
নোরা। লাখো লাখো নারী সে কাজ করছে।
হেলমার। মূর্খ শিশুর মতো কথা বলছো তুমি। (পুতুলের সংসার : ৮৭) ১
অন্যদিকে সৈয়দ শামসুল হক অপেক্ষমাণ নাটকে এ অংশকে নিম্নরূপে রূপান্তরিত করে নিয়েছেন :
স্ত্রী।
[…] আজ সন্ধ্যায় দেখলাম তুমি দেবতার স্থান থেকে নেমে এলে। […] যখন দেখলাম তুমি আমার কথা রাখলে না।
তুমি একটা ভণ্ড প্রতারককে – যে আমার বিরুদ্ধে এতকিছু করেছে,
তাকে তুমি ব্যাংকের চাকরির জন্যে সুপারিশ করলে, চাকরিটা পাইয়ে দিলে !
সে আমার চেয়ে বড় হয়ে গেলো তোমার কাছে, কারণ আমি
তো ঘরের নারী !
আর সে, ব্যাংকে কাজ পেলে তোমার ব্যবসাবাণিজ্যে, ব্যাংক
থেকে ঋণ টিন পেতে,
সে তোমার সাহায্যে লাগবে ।
যখন আমার ভালোবাসাকে পায়ের নিচে ফেলে তুমি তোমার
ব্যবসার স্বার্থটাকে বড় করে দেখলে, তখন আমার চোখ খুলে গেলো।
আমার চেয়ে ব্যবসাই তোমার বড়। ভালোবাসার চেয়ে
অর্থ-বিত্ত-সম্পদ !
তখনি আমি দেখতে পেলাম –
আমি যে মানুষটার সঙ্গে আটটা বছর ঘর করেছি, তাকে আমি একটুও চিনি না।
সে অজানা একটা মানুষ। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫১৭)
তবে অপেক্ষমাণ নাটকের মূল সমস্যা কেবলই নোৱা তথা নারীর অধিকার স্বীকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং এ সমস্যাটি সর্বজনীন, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার সমস্যা। নাট্যকার নাটকটির মাধ্যমে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, আধুনিক বিচ্ছিন্ন মানুষের উচিত – নিজের আমিত্ব বা অস্তিত্বকে প্রশ্ন করা, এবং মর্যাদারক্ষার লড়াইয়ে যাবতীয় সামাজিক পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন করে আত্মাকে মুক্ত করা ।
অন্যদিকে, সৈয়দ শামসুল হক ঈর্ষা নাটকটি রচনা করেছন প্রচলিত নাট্যধারার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে। তিনি এ নাটকে কোনো অঙ্ক বা দৃশ্যবিভাজনে না গিয়ে একই দৃশ্যে পুরো ঘটনাক্রিয়া সাজিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে কোনো পারিবারিক, সামাজিক বা ব্যাক্তিগত কাহিনি প্রদর্শন নয় বরং মানব-মানবীর প্রেমজনিত ঈর্ষার রূপ উদ্ঘাটনই ছিল তাঁর মৌল উদ্দেশ্য। আর এ কারণেই তিনি তিনটি চরিত্রের সাতটি মাত্র সংলাপে পুরো নাট্যঘটনা সাজিয়েছেন।
এই তিনটি নাটকের অন্তঃসার সমীকৃত করে সৈয়দ শামসুল হক রচনা করেছেন তাঁর অপেক্ষমাণ নাটক। বস্তুত অপেক্ষমাণ নাটকের তিনটি চরিত্রই তিনটি আদর্শকে ধারণ করে সংসার থেকে বেরিয়ে এসেছে। তিনটি চরিত্রই একাকিত্বকে সাদরে বরণ করে নিয়েছে। প্রৌঢ় চরিত্রটি ছাত্রীর মোহ কাটিয়ে, শরীরী প্রেম ভুলে প্রকৃতির মধ্যে শিল্পের শুদ্ধতা সন্ধানে উন্মুখ। নারী চরিত্রটি সংসারে, সমাজে নারীর আত্মমর্যাদাপূর্ণ অবস্থান প্রতিষ্ঠায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অন্যদিকে পুরুষ চরিত্রটি সমাজ থেকে মিথ্যের মুখোশ ছুঁড়ে ফেলে নিপাট সত্য প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়সংকল্প।
অপেক্ষমাণ নাটকের প্রধান অবলম্বন প্রচলিত সমাজ। এখানে নাট্যকার যে তিনটি নাটকের সমন্বয়সাধন করেছেন, তাতে ইবসেন রচিত নাটক দুটির মূল বিষয় ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজ ও মানুষের পশ্চাৎপদ মানসিকতার বিরুদ্ধে ব্যক্তির দ্রোহ। অন্যদিকে সৈয়দ শামসুল হকের নাটক ঈর্ষা নারী-পুরুষের একান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে হলেও তাতেও সমাজচিত্রের উপস্থাপনা রয়েছে।
নাট্যকার সেখানে সমাজ ও দেশের বিপন্ন পরিস্থিতিতে মানুষের মূল্যবোধ বদলে যাওয়ার বাস্তবচিত্র অংকন করেছেন। অপেক্ষমাণ নাটকে সৈয়দ হক নারী ও পুরুষ চরিত্রের মাধ্যমে ইবসেন বর্ণিত সময় ও সমাজকে নিজ দেশ-কালের প্রেক্ষাপটে ঢেলে সাজিয়েছেন। ফলে অপেক্ষমাণ হয়ে উঠেছে সমকালীন বাংলাদেশের সামাজিক জীবনচিত্র।
প্রচলিত সমাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তিমানুষ নিজের ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকে সমাজের কাছে বলি দেয়। সামাজিক মানুষের কাছে নিজের সুবিধা-অসুবিধার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় সমাজের ভাবনা। লোকে কী বলবে, লোকে কী ভাববে এটিই যেন হয়ে ওঠে মুখ্য বিষয়; তার নিজস্ব পছন্দ, নিজস্ব আনন্দ বা সুখ-সুবিধার সেখানে কোনো মূল্য নেই।
নাট্যকার সমাজের এই দিকটি অপেক্ষমাণ কাব্যনাটকে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সংলাপের মাধ্যমে চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। স্ত্রী যখন নিজের আত্মমর্যাদার প্রশ্নে সোচ্চার হয়ে গৃহত্যাগী হতে চাইছে, তখন স্ত্রীকে জীবনভর হারাবার চিন্তা থেকে স্বামীর একমাত্র ভাবনা হয়ে উঠেছে তার স্ত্রীর এহেন কর্মকাণ্ডে লোকে কী ভাববে! ফলে সে স্ত্রীকে মুক্তি দিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়ে নয়, সমাজ-নির্ধারিত কর্তব্যগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে।
যে সমাজে নারী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, সেখানেই তাকে প্রতিমুহূর্তে মূর্খতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় :
স্বামী।
সুস্থতা ? বাড়ি ছেড়ে যাওয়া ? স্বামী ছেড়ে যাওয়া ? বাচ্চাদের ফেলে যাওয়া ?
একবারও ভাবছো না লোকে কী বলবে?
স্ত্রী।
লোকের কথা ভুলো না। আমার কথা বলো। […]
স্বামী ।
মূর্খ মেয়েমানুষ । নিজের পবিত্র কর্তব্যের কথা ভুলে যাচ্ছো ?
[…] স্বামী, সন্তান তোমার কোনো দায়িত্ব
কর্তব্য কিছুই কি নেই?
স্ত্রী।
পবিত্র আরো অন্য দায়িত্বও তো থাকতে পারে। […]
আমার নিজের প্রতি কর্তব্য- পরিত্ব (কাব্যনাট্যসমগ্র ৫১৪ )

বস্তুত, স্ত্রী চরিত্রটি জেনে গেছে সমাজে মানুষ হয়ে বাঁচতে গেলে নারীকে প্রথম আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। সর্বক্ষেত্রে নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে, এবং তা পুরুষের সাহায্য ছাড়াই। কেননা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে হেয় করা, ছোট করে রাখাই যেখানে কাজ, সেখানে কেউ-ই চাইবে না একজন নারী আত্মনির্ভরশীল হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াক। আর এটা বুঝতে পেরে সে সংসার ছেড়েছে, এবং স্বামীর দেয়া কোনো কিছুই সঙ্গে নিয়ে যায়নি; কেননা সে অর্থনৈতিক ভাবে পুরোপুরি স্বাবলম্বী হতে চেয়েছে। যে কারণে স্বামী-কর্তৃক প্রতিমাসে অর্থপ্রেরণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সে বলেছে :
এখন আমাকেই যোগ্য করে তুলতে হবে আমাকে।
আমাকেই নিতে হবে পাঠ।
সে পাঠ দেবার যোগ্যতা তোমার নেই।
আজ আমিই আমাকে পাঠ দেবো। […]
আমাকে এখন থেকে একাই পথ চলতে হবে – (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫১৩)
প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ একজন নারীর প্রতি বরাবরই বৈষম্যমূলক আচরণ প্রদর্শন করে। শৈশব থেকেই নারী বুঝে যায়, প্রচলিত সমাজে পুরুষের সমতুল্য সে কিছুতেই নয়। অথচ নারীরও অধিকার রয়েছে এ সমাজে পূর্ণাঙ্গ মানুষের অধিকার নিয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচার। আর এ কারণে স্ত্রী চরিত্রটি চেয়েছে সমস্ত সীমাবদ্ধতা ও বাঁধা-বন্ধনের ঊর্ধ্বে উঠে পূর্ণাঙ্গ মানুষরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে। স্বামী চরিত্রটি যখন সমাজ-নির্ধারিত বিধান এবং স্বামী-সন্তানের প্রতি তার দায়িত্বের কথা বলে তাকে গণ্ডিবদ্ধ করতে চেয়েছে, তখনই নারী চরিত্রটি প্রতিবাদ করে বলেছে :
ওসব বড় বড় কথায় আর আমার বিশ্বাস নেই।
আমাকে মানুষের মতো বাঁচতে হবে,
যেমন তুমিও মানুষের মতোই বাঁচতে চাও।
আমাকে স্ত্রী নয়, মা নয়, মানুষ হয়ে উঠতে হবে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫১৪)
এরপর স্ত্রীকে গৃহপরিবেশে অবরুদ্ধ রাখার শেষ উপায় হিসেবে পুরুষ চরিত্রটি তাকে ধর্মীয় বিধি-বিধানের ভয় দেখিয়েছে। কিন্তু আত্মপ্রত্যয়ী নারীচরিত্রটি তখন প্রচলিত ধর্মকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে জানিয়েছে, ধর্ম তো আসলে পুরুষেরই রচনা, পুরুষেরই বর্ণনা; সেখানে নারীর মতামত, অধিকার পুরোপুরি উপেক্ষিত। ফলত নিজ কর্তব্য, নিজধর্ম সে নিজেই এখন বুঝে নিতে চায়
ধর্ম তো এই – মোল্লারা যা বলে, পাদ্রীরা যা বোঝায়, যা ব্যাখ্যা করে !
এবার আমাকে নিজের মতো করে বুঝতে হবে।
জীবনের পাঠ নিয়ে দেখতে হবে সত্যটা আছে কোথায়।
আমাকে জানতেই হবে মোল্লারা যা বলে তার কতখানি সত্য,
আর কতটা মনগড়া।
বা, ওরা যা বলে তা আমার বেলায় ঘাঁটে কিনা! (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫১৫)
বিদ্যমান সমাজে ভালো-মন্দ, উচিত-অনুচিতের মাপকাঠিও নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণ করেছে পুরুষ। ফলে সেখানে নারীর স্বার্থ বরাবরই উপেক্ষিত হয়েছে। সংসারে তাই নারীর স্বাধীন জীবনমান-আকাঙ্ক্ষা পুরুষের কাছে অনুচিত বলেই বিবেচিত হয়। বস্তুত, যে সমাজের বিধি-বিধান পুরুষ স্বীয় স্বার্থে তৈরি করেছে, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন কিংবা স্বাধীনচারী মনোবৃত্তি সেখানে অন্যায় ও অবান্তর। কিন্তু নারী আজ কেবল পুরুষের চোখে নয়, বরং নারীর চোখে সমাজকে দেখতে চাইছে :
নারীর কোনো নিজস্ব মত পথ নেই এ সমাজে।
একবার নারীর চোখ দিয়ে সমাজের দিকে তাকিয়ে
দেখো, দেখে বোলো – তোমরা যে চোখে দ্যাখো, সে চোখেই কি নারী দ্যাখে –
কোনটা তার জন্যে ভালো আর কোনটা মন্দ ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫১৬)
শিরদাঁড়া রুজু করে দীপ্রভঙ্গিতে তাই সে উচ্চারণ করেছে :
স্ত্রী।
শুনেছি কারো স্ত্রী যখন স্বামীর বাড়ি ছেড়ে যায়, যেমন আমি যাচ্ছি,
সমাজ বলে, তখন স্বামী সব দায়দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যায় ।
সমাজ পড়ে থাক, আজ আমিই তোমাকে মুক্ত করে দিয়ে যাচ্ছি।
আমাদের কারো কোনো দায় দায়িত্ব আর নেই কারো প্রতি ।
দুজনেরই এখন পূর্ণ স্বাধীনতা। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫১৮)
অপেক্ষমাণ নাটকে সৈয়দ শামসুল হক দেখিয়েছেন, ইবসেন রচিত নাটকের নোরার যাপিত জীবন ও সমাজব্যবস্থা এখন আর সেরকম নেই; সময়ের ব্যবধানে মানবভাবনায়ও অনেক পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু নারীসম্পর্কিত ভাবনার অনেক কিছুই এখনও বহাল রয়েছে। প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী এখনও অসহায়। পুরুষের পক্ষে যে-কাজটি স্বাভাবিক, নারীর জন্য তা এখনও অশোভন ও অকল্পনীয়। আলোচ্য নাটকেও দেখা যায়, গভীর রাতে জনমানবশূন্য রেলস্টেশনে নারীকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রৌঢ় চরিত্রটি বিস্মিত হয়েছে; তার নিরাপত্তা ভাবিত হয়েছে, এবং সম্ভাব্য সামাজিক পীড়ন ও প্রতিবন্ধকতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সতর্ক করে বলেছে :
প্রৌঢ়।
একা নারী । দিনের বেলাতেই পথে ঘাটে তাকে কত সামলে
চলতে হয় ।
আর রাতে ? পথে প্রান্তরে, শহরে বিরানে নারীর জন্যে ওঁৎ পেতে আছে ভয়।
আর সেই আপনি কিনা, দিনে নয়, রাতে, নিশুতি রাতে একা ?
একা বেরিয়ে পড়লেন ? একেবারে একা ! ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫২২)
নাটকের প্রারম্ভদৃশ্যেও নারীকে দেখে প্রৌঢ়ের বিস্ময়ের সীমা ছিল না। প্রৌঢ় চরিত্রটি অবাক চোখে ভেবে নিয়েছে এ হয়তো মানবী নয়; দেহাতি বা অশরীরী কিছু। কেননা আবহমান সামাজিক বিধিব্যবস্থা তার মাথায় প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে যে, একেলা নারীর পক্ষে রাতে বাইরে থাকা অশোভন ও অন্যায়। কিন্তু যখন সে নিশ্চিত হয় যে, এ একজন সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষ; তখনই তার মাথায় আসে এ নারী হয়তো সমাজবঞ্চিতা, গৃহহীন, অসহায় ! ফলে প্রথমেই সে কৌতূহল ও সমবেদনা নিয়েই নারীটির সঙ্গে আলাপে মগ্ন হয়েছে। এসময়ে নারীকে উদ্দেশ্য করে প্রৌঢ়ের যে উক্তি তা প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে :
ভেবেছিলাম দেহাতি কেউ। […]
আপনি যে পুরুষ নন, সেটাও চোখে পড়লো।
একটু অবাক হলাম । ভাবিনি আপনার মতো কেউ
এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন। […]
মানে, একা একজন মহিলা,
অন্ধকারে, নিশুতি রাতে, প্লাটফরমের বাইরে,
পুরুষ হয়ে কতক্ষণ চোখে দেখা যায় বলুন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫০৪ )
অপেক্ষমাণ নাটকের নারী চরিত্র সামাজিক এই বিধিব্যবস্থা সম্যক অবগত। তাই তার খেদোক্তি :
নারী।
নারী নেবে সিদ্ধান্ত ? নারীকে তো সিদ্ধান্ত দেয়া হবে !
আর নারী সেটা মেনে নেবে বিনা প্রশ্নে, বিনা তর্কে ! তাই না ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫০৮)

ইবসেন-রচিত নাটকে নোরার সশব্দে দরোজা বন্ধ করে স্বামীগৃহ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি সেকালের সমাজব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ছিল একান্তই বৈপ্লবিক। সংসারী নারী উপভৌগিক সমস্ত সুবিধা পেয়েও কেবল আত্মমর্যাদার প্রশ্নে এতটা দ্রোহী হতে পারে, সেটি ছিল সেকালের সামাজিক প্রেক্ষাপটে অকল্পনীয়।
বলাবাহুল্য, এরকম একটি নাটক লেখার জন্য হেনরিক ইবসেনকে কট্টরপন্থীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। আত্মমর্যাদাবোধে তাড়িত হয়ে নোরাই যে গৃহত্যাগের মতো দুঃসাহসী ভূমিকার মাধ্যমে সমাজে মেয়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে প্রথম পদক্ষেপ রেখেছিল, সেটি সৈয়দ শামসুল হক মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন।
তবে তিনি এও জানতেন এই ঘুণেধরা প্রাচীন প্রথার পরিবর্তন কোনো একক প্রয়াসে সম্ভবপর নয়। তবু নোরার এই ভূমিকা নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণাদায়ক। অপেক্ষমাণ নাটকে প্রৌঢ়ের মুখের সংলাপে নাট্যকারের এই মনোভাব সুস্পষ্ট হয়েছে। প্রৌঢ় এবং নারী চরিত্রের প্রাসঙ্গিক কথোপকথন উল্লেখ করা যেতে পারে :
প্রৌঢ় ।
আপনার ওই দরোজাটা !
নারী।
দরোজা !
প্রৌঢ়।
মানে – দরোজা বন্ধ করবার শব্দটা! […]
নারী।
দরোজাটা ভেঙেই ফেলেছি কিনা ?
প্রৌঢ়।
না, না। ভাঙা অত সহজ নয়।
এ তো আর আজকের দিনের হালকা পক্ষা দরোজা নয়। ওক কাঠের দরোজা, ঊনবিংশ শতাব্দীর কঠিন
নারী ।
সমাজটার মতোই!
প্রৌঢ়।
ঠিক বলেছেন। কঠিন ছিলো সমাজ। […]
কিন্তু এখন আর তেমনটা নেই।
ভাঙতে শুরু করেছে। বদলাতে শুরু করেছে। বদলাচ্ছে। […]
আপনার বেরিয়ে যাওয়া থেকেই শুরু হয় নতুন পথে চলা। […]
আপনার ওই বেরিয়ে আসাটা ছিলো বৈপ্লবিক।
দরোজা খুলে দড়াম করে বন্ধ করাটা ছিলো একটা প্রতীক । (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫২১)
সৈয়দ শামসুল হক অপেক্ষমাণ নাটকে ইবসেনের অনুগামী হয়ে নারীর প্রতি বিরূপ সমাজব্যবস্থার চিত্র যেমন উপস্থাপন করেছেন, তেমনিভাবে যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই স্বদেশ ও স্বসমাজের কপটচারী স্বভাবের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেছেন। যেমন, প্রৌঢ়চরিত্রের একটি সংলাপের মাধ্যমে এদেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশার কথা প্রকাশিত হয়েছে নিম্নরূপে :
লোকাল কখন আসবে ঠিক নেই।
ছোট্ট ইস্টিশান। মেল গাড়িগুলো দাঁড়ায় না।
আজকাল টাইম টেবলের যা অবস্থা।
স্টেশন মাস্টার বললেন, ঘন্টা দেড় দুই দেরী হবে।
তিনি কোয়ার্টারে চলে গেলেন।
তার সঙ্গে সঙ্গে টিকিট মাস্টার, কুলি, কেরানী সবাই। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫০৫ )
আবার, প্রৌঢ়চরিত্রটি নারীটির কাছে নিজের পরিচয় যখন তুলে ধরেছেন, তখন বাঙালিজাতির বাগাড়ম্বরতা ও মাতৃভাষার তুলনায় ইংরেজি ভাষাপ্রীতির হঠকারী মনোবৃত্তিও প্রকাশিত হয়েছে :
হ্যাঁ, আপনাকে বলা হয়নি। আমি ছবি আঁকি।
ছবি আঁকি বললে যেন হালকা শোনায়।
চিত্রকর বললে – ওরে বাবা! ভারী ভারিক্কি।
ইংরেজিটা বাংলায় খুব চলে।
আমরা নিজেরাও আসার ব্যবহার করি। পেইন্টার ! (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫০৬ )
অন্যদিকে, হেনরিক ইবসেনের এন এনিমি অব দ্য পিপল নাটকটি পুরোপুরি সামাজিক নাটক। সৈয়দ শামসুল হক এ নাটকের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাঙালি সমাজের অদ্ভুত মিল প্রত্যক্ষ করেছেন। যে কারণে তিনি যখন ইবসেন থেকে ভাষান্তর করে অপেক্ষমাণ নাটকের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তখন একবারের জন্যও মনে হয়নি যে, এটি ভিনদেশি কোনো নাট্যকারের রচিত শতবর্ষ অতীতের ঘটনা; বরং দর্শক এ কাহিনির সঙ্গে এতটাই আত্মিক টান অনুভব করেন, যেন মনে হয় – এ তো এদেশেরই ঘরের গল্প; এ যে বাংলাদেশের অস্থির ও মেরুদণ্ডহীন, সুবিধাবাদী রাজনীতির প্রতিচিত্র।
ইবসেনের নাটকে ঝরনা প্রকল্প নষ্ট হয়েছে ট্যানারির বর্জ্য দূষণে; স্বীয়স্বার্থে ও ক্ষমতার দম্ভে যেটিকে আড়াল করতে চেয়েছেন নগরের মেয়র পিটার। এর সঙ্গে রাজধানী ঢাকার হাজারিবাগের ট্যানারি শিল্প আর বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণচিত্র অনায়াসেই মেলানো যায়।
এদেশের অধিকাংশ সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানও এরকম দুর্নীতিতে আমূল আবদ্ধ। ঢাকার ওয়াসা (Water Suply And Sewarage Authority) ও নগর ভবনও (City corporetion) জনগণকে বিভ্রান্তমূলক তথ্য দিয়ে নিজেদের অপকর্মের পক্ষে নির্লজ্জ সাফাই গায়। ফলে ইবসেনের এ কাহিনি যেন বাংলাদেশ ও বাঙালি জীবনের কাহিনি ।
রক্ষণশীল পশ্চাৎপদ সমাজের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য এই যে, তারা প্রথাবিরোধী ও ভিন্নমত একেবারেই গ্রহণ করতে পারে না; হোক তা যতই অমূলক, অবৈজ্ঞানিক, যুক্তিহীন ক্ষতিকারক বিষয়, তবু জোটবদ্ধভাবে সেটাতেই পরে থাকা এদের বৈশিষ্ট্য। বস্তুত, রক্ষণশীল এই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে গুটিকয়েক স্বার্থপর শক্তিধর মানুষ; এরা নিজেদের স্বার্থেই জনগণকে অন্ধ করে রাখে; নিজেদের প্রয়োজনেই জনগণের সংখ্যগরিষ্ঠতার সুবিধা ব্যবহার করে।
এরা বাইরে শক্তির আধার হলেও অন্তরে এতটা হীনমন্যতায় ভোগে যে, সমাজের ভেতর থেকে হঠাৎ হঠাৎ কেউ জেগে উঠে যদি নির্মম সত্যিটা প্রকাশ করে দেয়, তবে তাকে সর্বদিক দিয়ে হেনস্তা করে বিপর্যস্ত করে দেয়াই এদের স্বভাব। কেননা একবার এসকল সত্যান্বেষী মানুষদ্বারা জনগণ প্রভাবিত হলে, এসব সুবিধাবাদী, স্বার্থাম্বেসী মানুষের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাবে।

অপেক্ষমাণ নাটকে পৌরপিতার চরিত্রের মাধ্যমে এটা সুস্পষ্ট হয়েছে। ডাক্তার যখন নদীদূষণের কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে, পৌরপিতা নিজের দোষ আড়াল করে জনমনে ডাক্তার সম্পর্কে সন্দেহ জাগিয়ে দিয়ে বলেছে :
পৌরপিতা।
আমি একটা ভিতরের কথা বলি। আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে –
এই ডাক্তার – একটা বাজে হুজ্জত তুলে – এই আমার ভাই –
আপনাদের মন খুশি করা কিছু কথা বলে –
আগামী নির্বাচনে শহরের পৌরপিতা হতে চায় আপনাদের ভোটে। (কাব্যনাট্যসমগ্র: 526 )
পৌরপিতার এই কূটকৌশলী ও দুরভিসন্ধিমূলক বক্তব্য সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দিয়ে নির্ভীক ডাক্তার তার মুখোশ উন্মোচন করে দিয়ে বলেছেন :
ডাক্তার।
ইতিহাস আরো একবার দেখছে,
কয়েকজন মুনাফাখোর লুটেরা সত্যকে কীভাবে বিকৃত করছে।
সত্যবাদীকে কীভাবে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে।
আর, বিত্ত আর সম্পদ আর ক্ষমতার লোভে
কীভাবে জনসাধারণকে মিথ্যা স্তোক দিয়ে দলে টানা হয়েছে। ধিক। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫২৬)
বস্তুত, সমাজে এমন কিছু দৃঢ়চেতা মানুষ থাকেন যারা জীবনের সবটুকু দিয়ে সত্যের জন্যে লড়াই করে যান। সৈয়দ শামসুল হকের অপেক্ষমাণ নাটকের পুরুষ চরিত্রটি এমনই একজন নির্ভীক ও সত্যান্বেষী মানুষ। একটি নির্ভেজাল সত্যকে উন্মোচনের তাগিদ থেকে তিনি নিজ এলাকার জনগণ, সুশীল সমাজ, রাজনীতিবিদ, সকলের সঙ্গে লড়াই করে বেরিয়ে এসেছেন সত্য উন্মোচনে। নাট্যকার ডাক্তার চরিত্রটির সমাজহিতৈষী মানসিকতা উপস্থাপন করেছেন নিম্নরূপে
আমি প্রাইভেট প্রাকটিসে যাইনি, আমি সামান্য বেতনে চাকরি
নিয়েছি পৌরসভার
যেন আপনাদের পাশে রোগেশোকে দাঁড়াতে পারি । […]
ডাক্তারের কাজ শুধু রোগের চিকিৎসা করা নয়,
ডাক্তারের প্রথম কাজ – আমার বিবেচনায় রোগের কারণ নির্মূল করা।
জনজীবনের নীরোগ স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। (কাব্যনাট্যসমগ্র ৫২৯ )
স্বার্থান্বেষী রাজনীতিবিদেরা নিজেদের স্বার্থে জনতাকে ব্যবহার করে। মুখে মুখে জনতাকে নিয়ে বড় বুলি আওড়ায়। কিন্তু নজর থাকে আত্মস্বার্থ চরিতার্থতার দিকে । কিন্তু রাজনীতিবিদদের এই কূটচাল ডাক্তার জনসম্মুখে প্রকাশ করে দিয়ে বলেছেন – জনতা পুতুলমাত্র। কেননা সত্যমিথ্যা যাচাই করার সক্ষমতা জনতার সবসময় থাকে না। ফলে সব ক্ষমতা থেকে যায় রাজনীতিবিদের হাতেই। ডাক্তার এবং পৌরপিতার সংলাপে সমাজ ও রাজনীতির এই গতিচিত্র উপস্থাপিত হয়েছে নিম্নরূপে :
পৌরপিতা।
তোমার উদ্দেশ্যটা কী বলো তো? আমাদের অপমান করা ?
আমরা জনতার নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছি ?
জনতাই হচ্ছে আসল শক্তি – শক্তির উৎসই হচ্ছে জনতা।
ডাক্তার ।
এর চেয়ে বড় মিথ্যে আর কিছু নেই। দড়ি তোমাদের হাতে।
জনতা পুতুল – তোমরা নাচাচ্ছো। যেমন নাচাও, তেমনি নাচে !
শক্তি তাদেরই হাতে যারা সত্যমিথ্যা বিচার করতে পারে,
ভালোমন্দ স্পষ্ট করে নির্ণয় করবার ক্ষমতা রাখে ।
আর, ভালোমন্দ বা সত্যমিথ্যা নির্ণয় করবার জন্যে চাই তথ্য –
পর্যাপ্ত শুধু নয়, সকল তথ্য, সব তথ্য,
আর সেই তথ্য বিশ্লেষণ করবার মতো মেধা।
জনতা তো একটা ধারণা মাত্র-
জনতার ভেতরে একটি একটি করে মানুষ।
সেই একটি একটি মানুষের সবারই কি আছে একই মাপের মেধা ! (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫৩১)
কিন্তু ডাক্তারের এ সংলাপের পরেও শোনা গেছে পৌরপিতার দাম্ভিক স্বৈরতান্ত্রিক স্বর :
পৌরপিতা।
আমাদের বিরুদ্ধে অপশাসনের অভিযোগ করছেন উনি !
এতবড় অভিযোগ এনে তুমি পার পাবে না ।
এ শহরে থেকে আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারবে না। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫৩২)
রাজনীতিবিদের এই অপকৌশল সম্পর্কে সৈয়দ শামসুল হক আমাদের সোচ্চার করেছেন নারী চরিত্রটির মাধ্যমে উচ্চারিত অপর একটি সংলাপে :
মিথ্যাচারের কথা বলুন।
তিক্ত সত্যকে মিথ্যার মিষ্টি মোড়কে গেলবার কথাও বলুন। […]
মিথ্যা গিলিয়ে জনসাধারণকে মৌতাতে ফেলে
সমাজকর্তাদের স্বার্থ রক্ষা করা !
আপনি তাদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫৩৪ )
আবার, আলোচ্য নাটকের প্রৌঢ় চরিত্রটির উক্তির মাধ্যমে ইবসেনের দুটি নাটকের সামাজিক বাস্তবতার মূলসার উঠে এসেছে নিম্নরূপে :
প্রৌঢ় ।
আপনি সংসারে নারী অবস্থান –
আসল তার রূপ কোটি কোটি সংসারে
সারা পৃথিবীতে, প্রতিটি সমাজে –
আপনার ব্যাক্তিগত জীবন থেকে উত্তীর্ণ হয়ে
সব নারীর হয়ে উপলব্ধি করেছেন। […]
আর আপনি – আপনি তো
একটা শহরের পরিস্থিতির ভেতরে উপলব্ধি করেছেন –
ক্ষমতা আর সম্পদের লোভে গুটিকয় মানুষ – ওপরতলার কিছু মানুষ –
কীভাবে জনসাধারণকে মিথ্যা স্তোক দিয়ে –
তাদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েও
কীভাবে ক্ষমতাধরেরা তাদের আসন পাকা করে –
সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে! (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫৩৬)
ঈর্ষা নাটকের প্রৌঢ় যখন মনে করেছে অপর দুই চরিত্রের সমাজঘনিষ্ঠ কাহিনির ভেতরে তারও কাহিনি নিছকই ব্যক্তিগত, তখন পুরুষ চরিত্রটি তাকে আশ্বস্ত করে বলেছে – ব্যক্তিও সমাজের অংশ। তাই তার জীবনবাস্তবতাও প্রকারান্তরে সামাজিক বাস্তবতা।
পুরুষ।
কে বলে মূল্য নেই! ব্যক্তি ব্যক্তি ব্যক্তি নিয়েই তো সমাজ ।
বিন্দু বিন্দু পানি নিয়েই তো সাগর ! একটি একটি ফুল নিয়েই উদ্যান! […]
জীবনের প্রতারণা যদি শিল্পে ছায়া ফেলে
শিল্প তো সমস্ত মানুষ – গোটা একটা সমাজ –
মানুষ আর সমাজের জন্যেই;
শিল্পে প্রতারণা থাকলে সমাজটাকেই তো প্রতারণা করা হয়। ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫৩৭ )

বস্তুত, সৈয়দ শামসুল হক আলোচ্য নাটকে ইবসেনের পথে হেঁটেই সমাজের যাবতীয় অসঙ্গতি, অন্যায়, অনাচার তুলে ধরেছেন। হেনরিক ইবসেন তাঁর বাস্তববাদী ধারার নাটকের মাধ্যমে যেমন সমাজের সকল প্রকার অন্ধ সংস্কার, যাজকশ্রেণির অন্যায় আচরণ ও ব্যাভিচারের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের কষাঘাত হেনেছিলেন; নারীর মধ্যে ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ জাগ্রত করে নারীকে পুরুষের সমমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন, মালিকশ্রেণির শোষণ ও নিষ্পেষণ থেকে শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন ঠিক তেমনিভাবেই সৈয়দ শামসুল হক তাঁর অপেক্ষমাণ নাটকে সমকালীন সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস তুলে ধরার মাধ্যমে জনগণের শুভচেতনা জাগ্রত করে সংস্কারমুক্ত পরিচ্ছন্ন একটি সমাজ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।