আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ সমকাল : অন্যান্য ঔপন্যাসিক ও তাঁদের রচিত উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর বাংলা উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত রূপরেখার অন্তর্ভুক্ত।

সমকাল : অন্যান্য ঔপন্যাসিক ও তাঁদের রচিত উপন্যাস
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনকাল ১৯০৮ থেকে ১৯৫৬ সাল। তিনি ১৯২৮ সালে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে প্রথম গল্প ‘অতসীমামী’ লেখেন। ১৯৩৫ সালে তাঁর উপন্যাস ও গল্পসংকলন গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
এ সময় বাংলা সাহিত্যে অনেক ঔপন্যাসিকের আবির্ভাব ঘটে। সরো বন্দ্যোপাধ্যায় তিরিশের যুগকে বলেছেন, বাংলা উপন্যাস সাবালকের দ্বিধামুক্তি অর্জনের সময়। এ সময় বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রে একাধিক শক্তিমানের সমাবেশ ঘটেছে। তিরিশের কালে বাঙালি মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী বিজ্ঞাননিষ্ঠ চিন্তা আরম্ভ করে, এর একদিকে বিশ্ববীক্ষা, স্বদেশকে বিশ্বের অংশ হিসেবে উপলব্ধি করা, অন্যদিকে পরিবেশ ও মনোজগৎ সম্পর্কে নানা জটিল প্রশ্ন। তাই এ সময়ের সাহিত্যে যুগ সংকট স্পষ্ট।
এই সংকটকালে মানুষের একমাত্র অবলম্বন বন্ধনমুক্তির সংগ্রাম। তাই তিরিশের লেখকদের লেখায় ভাবপ্রবণ নায়ক অপেক্ষা চিন্তাশীল নায়কের সংখ্যা বেশি। এ সময়ের উপন্যাসে সমগ্রসন্ধানী দৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়। এই সময়কালের ঔপন্যাসিকদের মানসিক বিকাশ ঘটে প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর চেতনায়। তিরিশের ঔপন্যাসিকদের হৃদয়প্রধান লেখক এবং বুদ্ধিপ্রধান লেখকে বিভক্ত করা যায়। হৃদয়প্রধান ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ।
মানিক এবং সমসাময়িক লেখকদের যাত্রা পথে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা বৈচিত্র্যময়। তারাশঙ্করসহ অনেকের যাত্রা স্বদেশিকতার প্রারম্ভ এবং রাখীবন্ধনের দিন থেকে।
এরপর বিপ্লববাদী আন্দোলন (১৯০৭-১০), অসহযোগ আন্দোলন (১৯২৯), সাম্যবাদী আন্দোলনের সূচনা (১৯২৭-২৮), আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩১), জাপানি আক্রমণ (১৯৪১), অগাস্ট আন্দোলন ও মেদিনীপুরের বিধ্বংসী বন্যা (১৯৪২), পঞ্চাশের মনস্তর (১৯৪৩), দক্ষিণপূর্ব এশীয় রণাঙ্গণে সমরায়োজনের মঞ্চরূপে কলকাতা ও বঙ্গদেশকে ব্যবহার (১৯৪১-৪৫), রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা (১৯৪৬), স্বাধীনতা ও দেশবিভাগ (১৯৪৭), উদ্বাস্তুসমস্যা (১৯৪৭-১৯৫০), পূর্বপাকিস্তানের ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), পাকিস্তানির বিরুদ্ধে বাঙালির বিদ্রোহ (১৯৪৮-৭০), রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা (১৯৭১)।
এক রুধিরস্রোতের মধ্যদিয়ে বাঙালি পা ফেলে চলেছে, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে এ সময়ের ঔপন্যাসিকরা তাঁদের লেখনীতে মানব-চিত্র অংকন করেছেন।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১) এই অস্থির সংশয়-বিক্ষুব্ধ কালের কথাশিল্পী। তিনি তাঁর লেখায় শ্রেণি সংকট দেখিয়েছেন। তিনি নাগরিক লেখক নন, মাটি ও মানুষের লেখক।
উপন্যাসের উপাদান তিনি খুঁজে বেড়ান নি, তিনি যে গ্রামে বড় হয়েছেন, তার মানুষ ও প্রকৃতিকে নিয়েই উপন্যাস লিখেছেন। তিনি আত্মশক্তিনির্ভর জীবননিষ্ঠ। তিনি মাটির প্রতি, মানুষের প্রতি, ভারতের ঐতিহ্যের প্রতি, ধর্মবিশ্বাসের প্রতি, রাঢ় জনপদের বিভিন্ন শ্রেণির হিন্দু ও আদিবাসীদের প্রতি মমত্বশীল ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে বলা যায়:
“শিল্পকারখানার বিস্তারের ফলে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে তা মানুষের যুগ যুগের বিশ্বাস, সংস্কার ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকেও কীভাবে রূপান্তরিত করেছে তার অন্তরঙ্গ আখ্যান রচনায় তারাশঙ্কর সার্থকতা দেখিয়েছেন। h কলকাতায় বাস করলেও তিনি গ্রাম-জনপদের রূপকার।
তাঁর চৈতালী ঘূর্ণি’ (১৯৩১), ‘ধাত্রীদেবতা’ (১৯৩৯), ‘কালিন্দী’ (১৯৪০), ‘গণদেবতা’ (১৯৪২), ‘পঞ্চগ্রাম’ (১৯৫৩), ‘পঞ্চপুত্তলী’ (১৯৫৬), ‘রাধা’ (১৯৫৭) উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। তাঁর সময়ের সংশয়, অবিশ্বাস অশ্রদ্ধাকে তিনি বড় করে দেখেন নি, ভারতবর্ষে সুপ্রাচীনকাল থেকে যে সব সামাজিক রাজনীতিক, আর্থনীতিক পরিবর্তনের ফলে অচলায়তন সমাজ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে, সেই পরিবর্তনকে তিনি তাঁর সাহিত্যে তুলে ধরেছেন। তিনি ‘আমার কালের কথা’ (১৯৫১) ও ‘আমার সাহিত্য জীবন’ (দুই খণ্ড-১৯৫৩, ১৯৬২) গ্রন্থে স্মৃতিচারণায় তাঁর সময়ের পরিচিতি দিয়েছেন।
তারাশঙ্কর তাঁর উপন্যাসে একদিকে দেখিয়েছেন জমিদার শ্রেণি, প্রাচীনকালের শিক্ষা ও অভিজাত পরিবার, কয়লার ব্যবসায়ে প্রচুর অর্ধসম্পন্ন ধনী পরিবার, অন্যদিকে শ্রমিকদের অতৃপ্ত, অশান্ত ক্ষুব্ধ বিদ্রোহোন্মুখ চিত্র। তারাশঙ্কর নিজে জমিদার বংশের সন্তান। তিনি কৈশোর-যৌবনে দেখেছেন জমিদার শ্রেণির পরাভব ও ব্যবসায়ী শ্রেণির বিজয়, গ্রামীণ কৃষিনির্ভর অর্থনীতির বিপর্যয় ও শিল্পকেন্দ্রিক শহুরে অর্থনীতির প্রতিষ্ঠা। তাঁর উপন্যাসে এই দুই শ্রেণির দ্বন্দ্ব ও পরিণাম চিত্রিত হয়েছে। তাঁর ‘ধাত্রীদেবতা’ (১৯৩৯), ‘কালিন্দী’ (১৯৪০), ‘পঞ্চগ্রাম’ (১৯৪৪) এর এর পরিচয় মেলে।
জমিদার শ্রেণির প্রতি তাঁর মমত্ব প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর নায়কেরা প্রাচীন বাংলা কাহিনী-কাব্যের নায়কের মত ধীরোদাত্ত, রূপবান, গুণবান, অক্রোধী, দৃঢ়চেতা এবং মেধাবী, তাঁর মধ্যবিত্ত নায়কেরা অভিজাত বংশোদ্ভূত। ‘গণদেবতা’ (১৯৪০) বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের একটি যুগ-পরিচায়ক উপন্যাস। ‘গণদেবতা’ ও ‘পঞ্চগ্রাম’ উপন্যাসের পটভূমি ব্যাপাক। এই উপন্যাস দুটির নায়ক দেবু ঘোষ, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পরিবর্তনশীল গ্রামীণ সমাজই এর নায়ক।
‘একদিকে সরল-বিনীত, অন্যদিকে নৃশংস ভয়ংকর কঠিন রাঢ়-জনপদবাসীদের তিনি সাহিত্যক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। উপন্যাস দুটিতে বিচিত্র চরিত্রের সমাহার। ব্রাহ্মণত্বের প্রতিনিধি মহামহোপাধ্যায় শিবশেখরেশ্বর ন্যায়রত্ন, মহিমাত্রষ্ট কিন্তু আত্মমর্যাদাসম্পন্ন প্রাক্তন জমিদার দ্বারিক চৌধুরী, নিষ্ঠুর হিরু, শাসন-বিরোধী অনিরুদ্ধ কামার, অন্যায় বিরোধী স্বৈরিণী দুর্গা মুচিনী, অনিরুদ্ধের স্ত্রী পদ্ম কামারনী, রাজবন্দী যতীন, ধর্মী মুসলমান চাষী দৌলত শেখ, আদর্শবাদী দেবু ঘোষ, বিশ্বনাথ, ইরসাদ, রহম চাচা, জোসেফ নগেন্দ্র রায় সকলেই স্বকীয় বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিয়েছে।
রুক্ষ রায়ভূমি, শ্যামল ধানক্ষেত, ময়ূরাক্ষীর আকস্মিক বান, ঘেঁটুর গান, নবান্ন উৎসবের ঢাকের শব্দ, ঘন আঁধারে ডাকাতের সংকেত ধ্বনি-সকল মিলে এক অভিনব পরিবেশ। আমাদের গ্রাম্য সমাজের সামাজিক ও আর্থনীতিক পরিবর্তনের ফলে গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তন তারাশঙ্করই প্রথম দেখিয়েছেন:
“সমাজের ভাঙন, শতাব্দী-সঞ্চিত শাসন ও বিনয়ের অবসান, ব্যক্তির বিদ্রোহ, গ্রাম্যসমাজে ধনের প্রাধান্য, উচ্চবর্ণের মহিমার বিলুপ্তি, আর্থনীতিক স্বনির্ভরতার স্থানে কল-কারখানার শস্তা জিনিসের প্রাবল্যে গ্রাম্য শিল্পীর অসহায়তা ও বিদ্রোহ, জমিদার ধনী চাষীর সঙ্গে গরীব চাষীর লড়াই, করবৃদ্ধির বিরুদ্ধে পঞ্চগ্রামের চাষীদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ সঙ্কল্প ও সে সঙ্গে বিচ্যুতি, প্রবলের কাছে গরীবের আত্মসমর্পণ, আদর্শবাদী নায়ক দেবু ঘোষের নেতৃত্বের প্রতি গরীব চাষীর অনাস্থা, ময়ূরাক্ষীর বানের মুখে অসহায় গ্রামবাসীর প্রতিক্রিয়া, সব মিলিয়ে গোটা গ্রাম জীবনের সামাজিক ও আর্থনীতিক বিপর্যয়, তারই মাঝে গোটা মানুষের অভ্যুদয় বাংলা উপন্যাসের প্রতিমায় নতুন করে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করল।
“চৈতালী ঘূর্ণি’, হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’, ‘ধাত্রীদেবতা’, ‘কালিন্দী’ তে যন্ত্রসভ্যতা ও কৃষি সভ্যতার বিরোধ, গ্রামীণ সমাজ ও ইনডোসট্রিয়াল সমাজের বিরোধ, কৃষি নির্ভর অর্থনীতি ও বৃহৎ শিল্পনীতির অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জমিদার ও ব্যবসায়ীর বিরোধ, গ্রামীণ সমাজের শাসন, সংস্কার ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে ব্যক্তির বিদ্রোহ দেখিয়েছেন।

মানিকের সমসাময়িক রোমান্স ঔপন্যাসিকদের মধ্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪- ১৯৫০) শ্রেষ্ঠ। তিনি রবীন্দ্র-শরৎশাসিত বাংলা কথাসাহিত্য ক্ষেত্রে প্রথম আবির্ভাবেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। তাঁর ব্যক্তিজীবন যেমন সাধারণ, তেমনি উপন্যাসের বিষয়বস্তুও সাধারণ। তিনি “১৩টি উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর উপন্যাসের বিষয় ছিল প্রকৃতি, মানুষ, ঈশ্বর ও দারিদ্র। ‘পথের পাঁচালী’ (১৯২৯), ‘অপরাজিত’ (১৯৩২), ‘দৃষ্টিপ্রদীপ’ (১৯৩৫) রচনা ও প্রকাশের সময় তাঁর যে সহযাত্রী লেখক ছিলেন তাঁরা কেউ-ই বিভূতিভূষণের সহমর্মী লেখক ছিলেন না।
ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি একক পথের যাত্রী। নিজস্ব নিস্তব্ধ ক্ষেত্রে তিনি দৃঢ়, যুগবিক্ষোভ দ্বারা বিচলিত হন নি (ব্যতিক্রম, অশনিসংকেত)। রাজনৈতিক বা আর্থনীতিক বক্তব্যে তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না। ঈশ্বরসন্ধান ও প্রকৃতিসম্ভোগ তাঁর বিচরণস্থান। তাঁর সরলতা, সততা, প্রকৃতিপ্রেমের সঙ্গে মিশে আছে নিম্নবিত্তদের প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু তিনি শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গরিবকে প্ররোচিত করেন নি “তিনি দারিদ্র্যের ছবি দেখিয়েছেন, কিন্তু তা নিয়ে বিদ্রোহের সুর তোলেন নি, বরং দারিদ্র তাঁর কাছে উপভোগ্য বলে মনে হয়েছে। ৩
‘পথের পাঁচালী’ ও ‘অপরাজিত’ বিভূতিভূষণের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। এখানে অপু আর বিভূতিভূষণ এক। অপু গঙ্গানন্দপুর যাওয়ার সময় ভেবেছে:
“ভারী মজা হয় যদি বাবা তাহাকে বলে-খোকা তুমি শুধু পথে পথে বেড়িয়ে বেড়াও- তাহা হইলে এই রকম বনফুল-ঝুলানো ছায়াচ্ছন্ন-ঝোপের তলা দিয়া ঘুঘু ডাকা দূর বনের দিকে চোখ রাখিয়া এই রকম মাটির পথটি বাহিয়া শুধুই হাঁটে শুধুই হাঁটে। ….. …… মাঝে মাঝে হয়তো বাঁশবনে কঞ্চির ডালে ডালে শব্ শব্ শব্দ, বৈকালের রোদে সোনার সিঁদুর ছড়ানো আর নানা রং-বেরঙের পাখীর গান। বিভূতিভূষণ তাঁর দিনলিপিতে লিখেছেন:
“তাই এইমাত্র অন্ধকারে কাহারীর পথ দিয়ে বেড়াতে বেড়াতে ভাবছিলাম, ভগবান আমি তোমার অন্য স্বর্গ চাই না- তোমার দেবলোক পিতৃলোক বিষ্ণুলোক- তোমার বিশাল পৃথিবীতে আমাকে নিয়ে এস, এই ফুলফল, এই সুখদুঃখের স্মৃতি, এই মুগ্ধ শৈশবের মায়াজগতের মধ্যে দিয়ে বারবার যেন আসা-যাওয়ার পথ তোমার আশীর্বাদে অক্ষয় হয়।
শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন:
“অপুর ন্যায় জীবন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে চিত্রিত চরিত্র বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে আর দ্বিতীয় নাই।”৩৪
অপুর জীবনে প্রকৃতি পরিচয় ঘটেছে দুর্গার হাত ধরে। কাশীযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে তার জীবনে শৈশব-অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং কৈশোরেরর আরম্ভ। তার পিতার মৃত্যু তাকে বাস্তব জগতে টেনে এনেছে। বড়লোকের বাড়িতে ঐশ্বর্য তাকে সন্ত্রস্ত করেছে, বড়বাবুর বেত্রাঘাত তাকে গ্লানিকর যন্ত্রণার সঙ্গে পরিচিত করিয়েছে। মনসাপোতার জীবনে সে নিজের ভবিষ্যৎ স্থির করেছে।
সংসারের বিভিন্ন গ্লানিকর অধ্যায় শেষে সন্তান কাজলকে নিয়ে নিশ্চিন্তপুরে প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে লেখক মাটির প্রতি মমত্বকে, শিকরের প্রতি টানকে অঙ্কন করেছেন। নিশ্চিন্তপুর অপুকে বাল্যজীবনে কবি করেছিল, প্রৌঢ় বয়সে তাকে দার্শনিক ও যোগীর ধ্যান দৃষ্টি উপহার দিয়েছে। অপুর জীবন বৃহৎ হতে বৃহত্তর পরিধিতে প্রসারিত, পারিবারিক বন্ধন, দাম্পত্যপ্রেম, অপত্যস্নেহ কিছুই তার গতি রোধ করতে পারে নি। সে একনিষ্ঠভাবেই বন্ধনহীন।
‘দৃষ্টি-প্রদীপ’ (১৯৩৫) এর জিতুও প্রকৃতিকে দেখে মুগ্ধ হয়েছে, কিন্তু তার প্রকৃতি দর্শনে হৃদয়ের চেয়ে চোখের তৃপ্তিই- ই বেশি। জিতু অপুর মতো উদার অনাসক্ত নয়, সে দেশে দেশে ভ্রমণ করেছে ঠিকই, কিন্তু অন্তরে গৃহী। বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’ (১৯৩৯) উপন্যাস আরেকটি বিস্ময়। এ উপন্যাসে প্রকৃতি মুখ্য, মানুষ গৌণ :
“সীমাহীন আরণ্য প্রকৃতি লেখকের মন ও কল্পনাকে পূর্ণভাবে অধিকার করিয়াছে। ইহার প্রতি ঋতুতে, দিবা-রাত্রির প্রহরে প্রহরে, জ্যোত্স্না-অন্ধকারের বিভিন্ন পটভূমিকায়, পরিবর্তনশীল রূপ ও সূক্ষ্ম আবেদন আশ্চর্যরূপ বস্তুনিষ্ঠা ও কাব্যব্যঞ্জনার সহিত বর্ণিত হইয়াছে। সর্বোপরি ইহার সমস্ত পরিবর্তনশীলতার মধ্যে এক সুগভীর, অপরিমেয় রহস্যবোধ অবিচল কেন্দ্রবিন্দুর ন্যায় স্থির হইয়া আছে। ”
কলকাতার খুবক সত্যচরণ পূর্ণিয়া জেলার জঙ্গল মহালে ত্রিশ হাজার বিঘা জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে যায়। কর্মজীবনের শুরুতে তার মনে হয়েছিল কলকাতায় ফিরে যেতে হবে। কিন্তু তিন বছর পর তার উপলব্ধি হয় বিপরীতমুখী:
“নির্জনতার মোহ, নক্ষত্ররা উদার আকাশের মোহ আমাকে এমন পাইয়া বসিয়াছে যে, মধ্যে একবার কয়েকদিনের জন্য পাটনায় গিয়া ছটফট করিতে লাগিলাম কবে পিচ-ঢালা বাঁধা-ধরা রাস্তার গতি এড়াইয়া চলিয়া যাইবে লবটুলিয়া বইহারে, পেয়ালার মত উপুড় করা নীল আকাশের তলে মাঠের পর মাঠ, অরণ্যের পর অরণ্য, যেখানে তৈরি রাজপথ নাই, ইটের ঘরবাড়ী নাই, মোটরহর্নের আওয়াজ নাই, ঘন ঘুমের ফাঁকে যেখানে কেবল দূর অন্ধকার বনে শেয়ালের দলের প্রহর ঘোষণা শোনা যায়, নয়তো ধাবমান নীল গাইয়ের দলের সম্মিলিত পদধ্বনি, নয়তো বন্য মহিষের গম্ভীর আওয়াজ।
কিন্তু সত্যচরণের দায়িত্ব হলো প্রকৃতির এই লীলাক্ষেত্র ধ্বংস করে টাকা নিয়ে প্রজা বসানো। আধুনিক সভ্যতার এই ধ্বংস থেকে পরিত্রাণ নেই। এইটিই ‘আরণ্যকের’ মূল কথা। বিভূতিভূষণের মানস বৈশিষ্ট্যই প্রকৃতি। এ সম্পর্কে সমালোচক মন্তব্য করেছেন:
“প্রকৃতির সহিত মানব মনের এমন অন্তরঙ্গ সম্পর্কের কাহিনী বাংলা উপন্যাসে নাই- ই; ইউরোপীয় উপন্যাসেও এরূপ দৃষ্টান্ত সুলভ নহে।
‘আদর্শ হিন্দু হোস্টেল’ (১৯৪০) -এ নাগরিক চাতুর্য ও কারবারি মারপ্যাচ বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে তিনি ঘন বাঁশবন ও আগাছার জঙ্গলের আড়ালে পল্লীজীবনের সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিভূতিভূষণ নর-নারীর প্রেমকে খুব একটা প্রাধান্য দেন নি। তবে ‘বিপিনের সংসারে’ (১৯৪১) তিনি কল্যাণকামনার পথে নারীপ্রেমের উত্তরণ ঘটিয়েছেন।

“আধুনিক মনুষের জীবনের মতোই সাহিত্য হবে জটিল, দশহেদা গ্রন্থিজালে আবদ্ধ, বুদ্ধি আর যুক্তির অসংখ্য পাকের আবর্তে দিশেহারা এই ধারণার প্রবল বলিষ্ট প্রতিবাদ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রকৃতিপ্রেম, জীবনের প্রতি অনুরাগ, ঈশ্বরপ্রেম-তিন মিলে সৃষ্টি হয়েছে ‘ইছামতী’ (১৯৫০)। প্রকৃতিপ্রেমিক, দরিদ্র সংসারপ্রেমিক, ঈশ্বরবিশ্বাসী বিভূতিভূষণের পরিচয় ‘ইছামতিতে’ পাওয়া যায়। সাধারণ গরিব মানুষের সুখ-দুঃখের অলিখিত ইতিহাস তিনি লিখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মৃত্যুতে তা খণ্ডিত হয়ে যায়।
নির্জনতম লেখক বিভুতিভূষণ সমকালের চিত্র এঁকেছেন ‘অনুবর্তন’ (১৯৪২) ও ‘অশনিসংকেত” (১৯৫৯, মৃত্যুর পরে প্রকাশিত) উপন্যাসে। ‘অনুবর্তনে’ তিনি লিখেছেন, বোমাতগ্রস্ত কলকাতা, বার্মা ও সিঙ্গাপুরের পতন, ব্রিটিশের পশ্চাদপসরণ, কলকাতায় জাপানি বোমার ভয়ে কলকাতাবাসীদের ঊর্ধ্বশ্বাসে পলায়ন। ‘অশনিসংকেত’ উপন্যাসের পটভূমি ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর। জয়নুল আবেদিন ও চিত্তপ্রসাদের চিত্রকর্মে দুর্ভিক্ষের যে ভয়াবহতা ও বীভৎসতা অঙ্কিত হয়েছে, বিভূতিভূষণের দুর্ভিক্ষের শব্দচিত্রের ব্যঞ্জনা আরো গভীর।
এ উপন্যাসে বিভিন্ন সমসাময়িক ঘটনার উল্লেখ করেছেন লেখক। জাপানি বোমার আতঙ্ক ও আক্রমণ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দুর্ভেদ্য দুর্গ-বন্দর সিঙ্গাপুর রেঙ্গুনের পতন, ঊর্ধ্বশ্বাসে কলকাতাবাসীর পলায়ন, সরকারি আনুকূল্যে জোর করে শস্য সংগ্রহের ফলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, জাপানি আক্রমণের আশংকায় ‘পোড়ামাটি-নীতি’ ও জলপথ স্থলপথের সব রকম শস্য পরিবহনের ধ্বংস এবং সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে ভাঙন ও নৈতিক অধঃপতন।
এ সময়ে বিভূতিভূষণ গ্রাম-বাংলার সর্বনাশ প্রত্যক্ষ করেছেন-এ উপন্যাস তাঁর-ই প্রতিচ্ছবি। বিভূতিভূষণের সমসাময়িক সাহিত্যিকরা দুর্ভিক্ষের শহরাশ্রয়ী ছবি এঁকেছেন। কিন্তু বিভূতিভূষণ গ্রামীণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার ছবি এঁকেছেন।
আধুনিক সমাজের গোলক ধাঁধায় পথহারা মানুষ উদ্ভান্তভাবে ছোটাছুটি করছে। তাদের পলায়ণ পরায়ণতা, আত্মগোপন ও আত্মরক্ষার চেষ্টা, মুহুর্মুহু বিপর্যয়ের মধ্যে স্থির হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা আধুনিক উপন্যাসের উপজীব্য।
এই জীবনের অন্যতম রূপকার বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় বা বনফুল (১৮৯৯-১৯৭৯)। ব্যক্তিজীবনে তিনি চিকিৎসক। ডাক্তারি নিস্পৃহতা, নির্মমতা, তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণদৃষ্টি লেখক বলাইচাদকে সাহায্য করেছে। বিহারের গ্রামাঞ্চল ও চিকিৎসাবিদ্যা-এ দুই মিলে তাঁর মানস জগৎ গড়ে উঠেছে।
‘তৃণখণ্ড’ (১৯৩৫) থেকে ‘হরিশচন্দ্র’ (১৯৭৯) চল্লিশটি উপন্যাস লিখেছেন। উপন্যাসগুলিতে তাঁর উদ্ভাবনীশক্তি, জীবন-অভিজ্ঞতা ও প্রকরণ বৈচিত্র্যের সন্ধান পাওয়া যায়। বহু মানুষের সংস্পর্শে তিনি এসেছেন। তাঁর দুঃসাহসিক কল্পনা মানুষকে নানা অসাধারণ অবস্থার মধ্যে ফেলে নতুন উপলব্ধি জাগ্রত করতে সাহায্য করেছে। তিনি আঙ্গিক বা রূপরীতির মধ্যেও নতুনত্বের প্রবর্তন করেছেন। এই রচনারীতি সম্পর্কে বলা যায়:
“তাঁহার রচনায় আদিম যুগের বিকলাঙ্গ বস্তুসমাবেশ ও আধুনিক যুগের সর্বত্রচারী, অতিমাত্রায় নব-নব-পরীক্ষা-প্রবণ, পথিকৃৎ মানসিকতার এক আশ্চর্য ও খানিকটা বিসদৃশ্য সমন্বয় ঘটিয়াছে। একদিকে যেমন তাঁহার শিল্পীমন নুতন সৌন্দর্যের আকর্ষণ অনুভব করিয়াছে, অন্যদিকে তাঁহার ডাক্তারী ছুরি উপন্যাসের অঙ্গ- ব্যবচ্ছেদের দ্বারা উহার বিভিন্ন জাতীয় উপাদানগুলিকে পৃথক করিয়া নিজ বৈজ্ঞানিক কৌতূহল মিটাইতে চাহিয়াছে।
বনফুলের সৌন্দর্য ভাবনা ও জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর উপন্যাসের সমৃদ্ধি ও বৈচিত্র্য আনয়ণ করেছে। তিনি জীবনের সামগ্রিক ঐক্যে বিশ্বাসী ছিলেন। বাস্তব ও স্বপ্ন, প্রত্যক্ষ জগৎ ও কল্পনা জগৎ-দুয়ের মধ্যে কোনো বাঁধা তিনি স্বীকার করেন নি। পরিমল গোস্বামী বলেছেন:
“মানুষের জীবনকে তিনি চলচ্চিত্রের মতো দেখেছেন। MBD তাঁর মতে সাহিত্য সামগ্রিকতার প্রকাশ। তাঁর ‘বাস্তব-অবাস্তব’ গল্পে তিনি সাহিত্যের বাস্তবতা এবং সম্প্রতা সম্পর্কে বলেছেন:
আমি গোটা মানুষটাকে দেখাতে চাই। তাই কিছু গোপন করিনি-
কিন্তু এ সম্পর্কে তাঁর বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি আছে। তিনি এ গল্পেই ‘মহাকালের দূত’ য়ের মাধ্যমে পরবর্তী সংলাপে বলিয়েছেন:
“আপনি তো বিজ্ঞানী নন, আপনি রসস্রষ্টা। তাছাড়া গোটা মানুষটাকেও তো আপনি দেখান নি। মানুষের ঘাম হয়, ঘামের কেমন গন্ধ, ঘামে কি কি উপকরণ আছে, প্রভাতে সন্ধ্যায় শৌচকর্ম করবার সময় প্রত্যেক নর-নারী যা যা করে এ সবের বর্ণনাও তো আপনার পুস্তকে নেই। কেবল ওই যৌন ব্যাপারটা নিয়েই আপনি মাতামাতি করেছেন। প্রত্যেক মানুষের একটা রহস্যময় দিক থাকে। সে সম্বন্ধেও আপনি নীরব। আপনি গোটা মানুষ তো দেখাতে পারেন নি। আপনার প্রবণতা কেবল যৌন ব্যাপারের দিকে, আর অভব্যতার দিকে। এর কারণ কি?..
বনফুল তাঁর গল্পে দেখালেন, এ ধরনের একটি বই, বাজারে যার দশম সংস্করণ চলছে সেটি অদৃশ্য হাত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে। অন্যদিকে, তাঁর সৌন্দর্য্যভাবনাও স্বকীয়। তিনি বলেছেন প্রকৃতির সৌন্দর্য্য উপভোগের জন্য আমাদের অভিধান বা অধ্যাপকের প্রয়োজন হয় না। তাই তিনি বিভিন্ন ফর্ম নিয়ে পরীক্ষা করেছেন, প্রথা বা রীতি ভেঙেছেন, অনেক সময় দুই ফর্মকে মিশিয়েছেন। তাঁর মনোভাব সর্বদাই নিরপেক্ষ। কোনো হৃদয় জটিলতার ফাঁকে তিনি ধরা দেন নি। মানুষের অন্তরের জটিলতা নয়, সমাজ ব্যবস্থার দুর্বোধ্য ও দুরাতিক্রম্য প্রভাব তাঁর রচনায় রেখাপাত করেছে।
বনফুলের উপন্যাসের কলেবর যেমন বড়, তাঁর বিচরণ ক্ষেত্রও তেমনি বিশাল। সমকাল জীবনের বিচিত্র শোভাযাত্রা, মানব সভ্যতার আদিপর্বের কাহিনী, মানবজীবন ও প্রকৃতির সমন্বয় সাধন, ডাক্তার চরিত্রের মাধ্যমে জীবনের বিভিন্ন বোধকে উপলব্ধি, স্বপ্ন ও সত্য কিংবা বস্তুজগৎ ও কল্পনাজগতের সমন্বয়, ইতিহাসভিত্তিক পটভূমি, সিপাহী বিদ্রোহ, দেশবিভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা, বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ ইত্যাদি তাঁর উপন্যাসের বিষয় হয়েছে। আবার তিনি ইংরেজি উপন্যাসের রূপান্তরও করেছেন। তিনি বিজ্ঞান ও কাব্যকে উপন্যাসের কাহিনীর সঙ্গে মিলিয়েছেন।
“তাঁহার বহু-অনুশীলিত, কুতুহলী মন, তাঁহার পরীক্ষাপ্রবণ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী, তাঁহার জীবনের প্রতিবেশ ও বহিরঙ্গবিন্যাস সম্বন্ধে মানস আগ্রহ, তাঁহার নূতন নূতন পরিকল্পনার চমকপ্রদ আবেদন ও সমস্ত মিলাইয়া বুদ্ধির দ্রুতগামী ক্ষিপ্রতা তাঁহাকে আধুনিক যুগের ঔপন্যাসিক গোষ্ঠীর মধ্যে একটি বিশিষ্ট আসন দিয়াছে। ২
সতীনাথ ভাদুড়ী (১৯০৬-১৯৬৫) লেখকদের লেখক। তিনি রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। কংগ্রেস কর্মীরূপে তিনবার জেলে গিয়েছিলেন। তিনি বনফুলের মতোই বিহারের গ্রাম জীবন ও মানুষকে সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। তাঁর রচনা স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের দাবীদার:
“সতীনাথ ভাদুড়ী আর্থনীতিক ব্যবস্থাকে অগ্রাহ্য করেন নি, কিন্তু তাকেই একমাত্র নিরিখ বলে ধরেন নি। মনোগহনের জটিল আঁধার পথে, চোরাগলিতে তিনি সন্ধানী আলো নিক্ষেপ করেছেন।”৪৩

তাঁর ‘জাগরী’ ( ১৯৪৫) উপন্যাস বাংলা রাজনৈতিক উপন্যাস ধারার শ্রেষ্ঠ। এখানে তিনি দেখিয়েছেন, রাজনীতির চেয়ে জীবন বড়, মতবাদের চেয়ে মানবতা বড় পার্টির চেয়ে মানুষ বড়। এ উপন্যাসে কংগ্রেস, কংগ্রেস সোস্যালিস্ট ও কমিউনিস্ট পার্টিকে দেখিয়েছেন। পরবর্তী উপন্যাসে তিনি ইনার রিয়ালিটির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন।
‘ঢোড়াই চরিত মানস’ (১৩৫৬, ১৩৫৮) তাঁর সার্থক উপন্যাস। একে আঞ্চলিক উপন্যাসও বলা যায়। তাঁর উপন্যাস ত্রয়ীতে দেখিয়েছেন, চেতনলোক থেকে অবচেতনলোকে চরিত্রের নিঃসঙ্গ যাত্রা, বিচ্ছিন্নতাবোধ, অন্তঃসংলাপ, জীবনের অসামজস্য ও অসঙ্গতি। তাঁর সব উপন্যাসেই বিহারের শহর এবং গ্রামের জীবন। বাঙালি চরিত্রকে নিয়ে আস্তরলোকের কাহিনী।
শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে অতি আধুনিক ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্নদাশঙ্কর রায়, বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত উল্লেখযোগ্য। অন্নদাশঙ্কর রায় ব্যক্তিজীবন বিশ্লেষণের সঙ্গে পৃথিবীব্যাপী জটিল চিন্তাধারা ও সমস্যাসঙ্কুলতাকে দেখিয়েছেন। তাঁর মননশক্তি তীক্ষ্ণ, তিনি অতি সহজ, সরল কথায় দুরূহ আলোচনা করেছেন।
তাছাড়া তাঁর ‘সত্যাসত্য’ উপন্যাসের নর- নারীরা আত্মকেন্দ্রিক জীবনে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাপী বিক্ষোভ ও আন্দোলন তাদের বক্ষস্পন্দনকে দ্রুততর করে ব্যক্তি জীবনকে সমৃদ্ধ করে, পৃথিবীকে নতুন করে গড়ার আকাঙ্ক্ষা জাগে। অন্নদাশঙ্করের প্রাথমিক রচনাগুলি নিষিদ্ধপ্রেম ও বিলাত-প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা। এ গুলি প্রায় প্রহসনের মতো।
পুরাতনের সীমা-রেখা ভেঙে উপন্যাসকে নতুন আকার ও নতুন পথে পরিচালিত করার কৃতিত্ব বন্ধদেব বসু ও অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত সমান অংশীদার। পূর্ববর্তী ঔপন্যাসিকদের চেয়ে তাদের পরিকল্পনা ও রচনাভঙ্গি মৌলিক। এঁরা উপন্যাসের ভবিষ্যৎ পরিণতির নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন। এঁরা কাব্যধর্মী উপন্যাস লিখেছেন।
সামাজিক প্রয়োজনের দ্বারা খণ্ডিত জীবন, আত্মার নগ্নরূপ, বিশেষ মানসিক অবস্থা, বা কোন বিশেষ ঋতু বা সময়ের নিগুঢ় সাংকেতিকতা প্রকাশে এঁদের কৃতিত্ব সীমাহীন। বুদ্ধদেব বসুর ‘বাসরঘর’ উপন্যাসে কুন্তলা ও পরাশরের বিয়েতে আপত্তি ছিল। সামাজিক অনুমোদনে তাদের প্রেমের অবমাননা।
কাব্যের আতিশয্য বিষয়ে বুদ্ধদেব বসু ও অচিত্র্যকুমারের সম্পূর্ণ বিপরীত প্রেমেন্দ্র মিত্র। শুষ্ক, আবেগহীন, বুদ্ধিপ্রধান জীবন সমালোচনা, ভাবপ্রবণতা বর্জন তাঁর প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। করুণরস সৃষ্টির বিরুদ্ধেও তাঁর মানসপ্রবণতা ছিল।
১৯৩৯ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে ভারতবর্ষের যুগান্তরের কাল। এই পর্যায়ে সময়ের গতি দ্রুত, পরিবেশ অস্থির ও নিয়ত পরিবর্তিত, ধ্বংস আর অবক্ষয়ের পাশাপাশি সংগ্রামের শপথ আর নবজীবনের স্বপ্নবাণী উচ্চারিত হচ্ছে, চারদিকে বারুদের গন্ধ, মরার গন্ধ, রক্তের গন্ধ,- যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা। এই অস্থির সময়ে উপন্যাস রচনা করেছেন সমরেশ বসু, নবেন্দু ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, রমাপদ চৌধুরী, বিমল কর, সন্তোষকুমার ঘোষ, শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, বারীন্দ্রনাথ দাশ। এই সময়ের ভয়াবহতাকে সন্তোষকুমার ঘোষ তুলে ধরেছেন:
[…] দলে দলে পুরুষ ভিখারী, দলে দলে নারীর পিছনে নিছক লোভাতুর শরীর-শিকারী। বাংলা তখন আপনাকে বাঁচাতে পারছে না। প্রাণ রাখতে গিয়ে আত্মা বিকিয়ে যাচ্ছে। মনুষ্যত্ব আর টাকার দাম পড়ছিল হু-হু করে, পাল্লা দিয়ে, সেই সঙ্গে যতেক মূল্যবোধ, রাস্তার পাশে শব পড়ে থাকতে দেখলে বেওয়ারিশ লাশ বলে পাশ কাটিয়ে যাই …… …]।
সম-সুখদুঃখভাক্ সমাজের বদলে তৈরী হয়ে যাচ্ছিল উচ্চাবচ অশেষ স্তর, ফাঁপাই টাকার প্রসাদে ঠিকেদার-সাপ্লায়ার ইত্যাদি বিবিধ কত বৃত্তি। প্রাচুর্যের উদ্গারের পাশাপাশি ক্লিন্ন, কুণ্ঠ জীবনের গ্লানি, বঞ্চনার অভিশাপ আর চিৎকার। [………..] গোটা বাঙালী জাতি দাম দিয়েছে, ভিতর-বাহিরের সর্বস্ব নিংড়ে দিয়ে। ইজ্জত, ইমান আর বুকের রক্ত সেই দামের নাম। ….. ….. ইতিমধ্যে … আরও একটা সর্বনাশ ঘটে গিয়েছিল কিনা। প্রথমে দাঙ্গা, পরে পার্টিশন। [………… আর সেই রাশি রাশি উন্মুল জীবন? ! …. …] মাটির শিকড় যাদের ছিঁড়ে গেছে তাদের বুকে ভালবাসা বিশেষ অবশিষ্ট থাকে না।
বিশেষ, যাদের সম্মান গেছে, সম্পদ গেছে, তারা ক্ষমাহীন তিরস্কারে ভরা চোখে চেয়ে থাকে। এই ভারসাম্যহীনতার যুগে, মূল্যবোধহীনতার যুগে, যখন অবক্ষয়, বিপর্যয় প্রাণ পেয়েছে তখন এই লেখকরা তাঁদের লেখনী ধারণ করেছেন। তবে বারুদের গন্ধের পাশেই থাকে ফুলের গন্ধ এ সত্য তাঁরা ভোলেন নি।
পূর্ববর্তী লেখকদেরকেও তাঁরা অনুসরণ করেছেন। তারাশঙ্করের প্রভাব নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, রমাপদ চৌধুরীর উপন্যাসে এবং মানিকের প্রভাব নরেন্দ্রনাথ মিত্র, সন্তোষকুমার ঘোষ, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, বিমল করের উপন্যাসে লক্ষ্য করা যায়।
জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী (১৯১২-১৯৮২) নাগরিক লেখক। তাঁর মানস বৈশিষ্ট্য হলো- মানুষের উত্তরণ হয় শুদ্ধতায়। তাঁর উপন্যাসের প্রথম পর্বে আছে নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের অবক্ষয়ের বিশ্লেষণ, দ্বিতীয় পর্বে আছে দৈহিক আকর্ষণ, জ্বালা-যন্ত্রণা, শরীরের অমোঘ সীমাবদ্ধতা থেকে শরীর- উত্তর আকর্ষণে উত্তরণ, তৃতীয় পর্বে আছে টাকা গহনা মেয়েমানুষ খুনের লোভ।

সন্তোষকুমার ঘোষ (১৯২০-১৯৮৪) কনফেশ্যন, ডিটেকশ্যন ও সেলফ প্রোজেকশান পদ্ধতিতে আত্মজৈবনিক ঢঙে জীবন সত্য অন্বেষণ করেছেন। তিনি দশটি উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর প্রথম পর্বের উপন্যাসে কলকাতার জীবন, দ্বিতীয় পর্বে বাইরের জগৎ থেকে অন্তর্লোকে উত্তরণ, তৃতীয় পর্বে বিপর্যয় থেকে পরিত্রাণের অন্বেষা লক্ষ্য করা যায়।
নরেন্দ্রনাথ মিত্র (১৯১৬-১৯৭৫) গ্রামীণ উপন্যাস ও নাগরিক উপন্যাস দুই-ই লিখেছেন। তিনি চেনা জীবনের রূপকার। বাঙালি মধ্যবিত্তের চিত্র তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে। জীবনের অন্তর্দেশের জটিলতা ও বস্ত্রলোকের কাঠিণ্য তাঁর লেখায় পাওয়া যায়। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পরিচিত জগতেরই নতুন রূপ লেখক তুলে ধরেছেন।
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের (১৯১৮-১৯৭১) ইতিহাসবোধ জাগ্রত, বর্ণনারীতি জীবন্ত, ভাষা বলিষ্ঠ, তাঁর রাজনৈতিক চেতনা উজ্জ্বল। কিন্তু জীবনের সঙ্গে পরিপূর্ণ বোঝাপড়া তাঁর রচনায় নেই। তবে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘উপনিবেশ’ (১৯৪৩) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। বিষয়ের নবীনতায়, ইতিহাস চেতনায়, জীবনবোধে এ উপন্যাস বিশিষ্ট। তাঁর শেষের দিকের উপন্যাস গুলি স্বীকারোক্তিমূলক। ব্যক্তির অসহায়তা ও পরাজয়ের বেদনা এইসব স্বীকারোক্তিমূলক উপন্যাসে প্রাধান্য পেয়েছে।
এই সময়ে আরও যাঁরা উপন্যাস লিখেছেন- নবেন্দু ঘোষ, স্বরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রাণতোষ ঘটক, শাস্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, গোলাম কুদ্দুস, শেখর সেন। এঁদের সকলের উপন্যাসে ১৯৪১ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সময়ের অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা, বিপর্যয় এবং অবক্ষয় উঠে এসেছে।
আমাদের আলোচিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তিরিশের দশকের অন্যতম প্রধান ঔপন্যাসিক। তিনি তাঁর সমকালীন লেখকদের থেকে স্বতন্ত্র, পূর্বকালীন লেখকদের ঐতিহ্য ধারণ করে অনন্য। এই অনন্যতা ও স্বাতন্ত্র্য্য মিলে নির্মিত হয়েছে বাংলা উপন্যাসের এক ভিন্ন প্রেক্ষাপট ।