আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ ১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র পর্ব ২। যা বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের এর অন্তর্গত।

১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র পর্ব ২
জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ‘প্লাবনভূমি’ গ্রন্থের অধিকাংশ গল্পই গ্রামীণ পটভূমিতেই রচিত। গ্রন্থটির প্রথম গল্প ‘শূন্যগগন বিহারী’ এক নারীর প্রেম ও বঞ্চনার কাহিনী। গ্রামের এক গৃহস্থ কন্যা ভালবেসে বিয়ে করে ভিনগ্রাম থেকে কাজ করতে আসা এক মুনীথকে। কপর্দকশূন্য এ মুনীর আগেও দুটি বিয়ে করেছে। সব জেনেও মেয়েটি পিতার আপত্তির মুখে বিয়ে করে মুনীষটিকে। সে গৃহস্থের বাড়িতে ঘরজামাই থাকতে শুরু করল। সে সংসারের প্রতি চরম উদাসিন। হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে গেল লোকটি। চারদিকে খোঁজ করেও কোন খবর পাওয়া গেল না।
কয়েক মাস পর হঠাৎ একদিন সে ফিরে এলো। কিন্তু কিছুদিন পরই আবার সে নিরুদ্দেশ। এবার ফিরল বছরখানেক পর। সে কোথায় যায় জিজ্ঞেস করলেও কোন সদুত্তর মেলে না। এবার গৃহস্থকন্যা খুব সতর্ক থাকল এবং তৃতীয়বার নিরুদ্দিষ্ট হবার সময় সে স্বামীর সঙ্গ নিল। শহরের এক বস্তিতে তারা কাটিয়ে বর্ষার মুখে গ্রামে ফিরল। মেয়েটি তখন সন্তানসম্ভবা।
তাই এবার সংসারের প্রতি মনোযোগী হওয়ার জন্য স্বামীকে অনুরোধ করল। কিন্তু লোকটি নির্বিকার। স্ত্রী তাকে ঘরে আবদ্ধ করে রাখল। কিন্তু অবাধ্য আত্মা বেশ মানে না কিছুতেই। তার দেহটি মৃত পড়ে থাকে শুধু আত্মাটি নিঃসীম শূন্যে হারিয়ে যায় চিরকালের জন্য ।
“দিকচিহ্নহীন’ গল্পটির নায়ক জীবনসংগ্রামে জয়ী-প্রত্যয়ী এক পুরুষ। কৈশোরে সহায়হীন আশ্রয়হীন জীবনকে সংগ্রামের অস্ত্রে পরাজিত করে সচ্ছলতা ও সম্মানে সুপ্রতিষ্ঠিত গল্পের নায়ক প্রৌঢ় বয়সে একবার স্মৃতি হাতড়াতে ফিরে যায় ফেলে আসা গ্রামে। কিন্তু সময় সবচিহ্নকে মুছে দিয়ে যায়। তাই তিনি খুঁজে পান না পরিচিত কোন দৃশ্যই- “ধূসর ছায়াচ্ছন্ন পথে এইখানে এক নদী ছিল।
নিশ্চিত বিশ্বাস তার এক তীরে গাছ, দিন শেষে ঘরে ফেরা পাখি, গৃহস্থলের কুটির কি শস্যক্ষেত্র…… কিন্তু এখন সেই নদী খুঁজে পায় না সে। সরু খালের বুকে কোনো খেয়াঘাটের চিহ্ন নেই। খুঁজে যাওয়া খালের দু’মাথায় শস্যের চাষাবাদ। একটু ঘুরে স্বচ্ছন্দে পার হওয়া যায় পায়ে হেঁটেই।” গল্পটি এক অনাথ গ্রাম্যকিশোরের কঠোর জীবন সংগামে প্রতিষ্ঠিত হবার কাহিনী- কাহিনীর প্রয়োজনেই গ্রামীণ প্রকৃতির বর্ণনা পাওয়া যায়।
“গ্রাম ও শহর উন্নয়নের গল্প আমাদের দেশের কিছু অযোগ্য ও সুযোগসন্ধানী লোক যে রাজনীতিকে অর্থশালী হয়ে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে, তার চিত্র। গ্রামের সম্পন্ন গৃহস্থের পুত্র আফাজ গ্রাম ছেড়ে শহরের পথে পাড়ি জমায় ভাগ্য পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে এবং তার উদ্দেশ্য সফল হয়। তাই অষ্টম শ্রেণী পাস। আফাজউদ্দিন শিকদার “মেম্বর থেকে চেয়ারম্যান, তখন এমপি, হবে বুঝি কখনও মন্ত্রী।”
বৈদেশিক সাহায্য ও সরকারিভাবে বরাদ্দ অর্থ যা বস্তুতঃ জনগণের প্রাপ্য উন্নয়নের জন্য, সেই অর্থ আত্মসাৎ করে রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের অর্থশালী হয়ে ওঠার একটি বাস্তব বর্ণনা পাওয়া যায় গল্পটিতে। অর্থেই গড়ে ওঠে আফাজের বিড়ির ফ্যাক্টরি, সিনেমা হল। গ্রামের মানুষ ও গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থ ব্যবহৃত হয় আফাজের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক উন্নয়নে।
শ্রমশক্তি বিক্রি করে প্রচুর অর্থ উপার্জনের নেশায় এ দেশের অনেক গ্রামের অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত যুবক পাড়ি দেয় গ্রামের ছোট্ট কুটির ছেড়ে ভিন দেশে। নামহীন ফিরিবে যে নীল জ্যোৎস্নায়’ গল্পটি এমনই এক যুবকের কাহিনী যে এই প্রলোভনে নিরুদ্দিষ্ট হয়েছিল, দীর্ঘদিন পর ফিরে এসে দেখল শূন্যডিটা, বাবা-মা নিরুদ্দিষ্ট সন্তানের শোকে গত হয়েছেন। এরপর যুবকটির জীবন সংগ্রাম ও প্রতিষ্ঠার কাহিনী।
যুবকটি নানারকম পেশা অবলম্বন করে বহু কষ্টে জীবিকা উপার্জন ও উচ্চশিক্ষা অর্জন করে। এরপর সে এক নামী বিদেশী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার আসনে আসীন হয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে প্রবাসে। গল্পের কাহিনীর প্রয়োজনের পাওয়া যায় গ্রামের একটি নিপুন বর্ণনা পাওয়া যায়।

গ্রাম থেকে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় শহরে আসা এক ভাগ্যাহত নারীর জীবনে বিপর্যয়ের ঘটনা ‘হিমজীবন’। গ্রামে রেখে আসা রুগ্ণ স্বামী, পুত্র-কন্যা ও দারিদ্র্যের স্মৃতিচারণার মধ্যদিয়ে গ্রামীণ জীবন দারিদ্র্যের স্বরূপ প্রকাশ পায়- “অন্যের বাড়িতে ধানভানা কি বইভাজা-জাতীয় কাজ অনেক করেছে কিন্তু সর্বদা সারা বছর ক্ষুধা মেটে না তাতে সকলের ফসল শেষ বর্ষার দিনগুলিতে তো নয় কখনই।
ঘর দু’টির চারপাশে কয়েক হাত জামির লাউ-মরিচের মাচা নিজেদের দায়ই মেটায় না। তবুও নিয়ে যেতে হয় ডালায় করে হাটে- দু’মুঠি চাল তো চাই-ই। শুধু ভারী বর্ষায় নয়, শেষ বর্ষায়, শরৎ শীতে নদী থেকে মাঠে উঠে আসা কি মাঠ ছেড়ে নদীতে নেমে যাওয়ার মুখে বানের ডাল তার সম্ভার তুলে দেয় সকলের হাতে।
নয়নজুলি ফুলে ওঠার মুখে ধানক্ষেতের আইল বরাবর নালা দিয়ে নেমে যাওয়ার মুখে যদি পাতা থাকে নানা কোঠার শক্ত বাঁশের খাঁচা বা ভইর’ তাহলে কয়েক দিনের জীবন ঢুকবে সেই প্রকোষ্ঠের খোলা পথে। রাত্রি শেষে রূপালী ফসলে ভরে যাবে খলুই। কয়েকজনের কয়েকদিনের জীবন।”
গ্রামের কিছু বিবেকহীন অর্থশালীদের যৌনলালসা ও অমানবিক আচরণের শিকার এক অসহায় নারীর গল্প ‘দুঃখিনী কমলা’ সুনালী চোরকে জেলে পাঠিয়ে গ্রামের বিত্তবান ব্যক্তিরা তার বাড়িটি দখল করে নেয়। সুনালীর যুবতী স্ত্রী চৈতীর আপত্তি সত্ত্বেও তাকে বাদল মিয়ার বাড়িতে থাকতে দেয়া হয়। সে বাদল মিয়ার বাড়িতে গৃহকর্ম করে এবং ঢেঁকিশালে রাতে ঘুমায়।
রাতের বিভিন্ন প্রহরে পরিবারের পুরুষেরা তাদের যৌনআকাঙ্ক্ষা তৃপ্ত করে চৈতীর শরীরের অবৈধ ভোগদখল করে। অসহায় নারীর প্রতিবাদের ভাষা জানা নেই। নীরবে সহ্য করা ছাড়া তার দ্বিতীয় কোন উপায় নেই। গল্পটিতে স্বাধীনতাপরবর্তীকালের দেশের কিছু সুযোগসন্ধানী লোকদের স্বরূপ এবং তাদের সৃষ্ট সামাজিক অবক্ষয় চিহ্নিত হয়েছে।
“ইমান আলীর মৃত্যু” গল্পে গ্রামজীবনের একটি সার্বিক চিত্র ফুটে উঠেছে। কিশোরগঞ্জ জেলার গ্রামাঞ্চলকে পটভূমি করে গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, গার্হস্থজীবন, স্নেহ-মমতা, হিংসা-ক্ষোভ, উৎসব-আনন্দ, রিরংসা, বিশ্বাস, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সমস্তই সূক্ষ্ম উপস্থাপনায় চিত্রিত হয়েছে। জাওয়ার গাঁও-এর সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি ইমান আলীর পরিবারকে কেন্দ্র করে গল্পের ধারা প্রবাহিত।
গল্পের শুরুতে বৃদ্ধ ইমান আলী অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়ে, গ্রামের ডাক্তার নগেন বলে যায় ভোর হবার আগেই হয়তো ইমান আলী মারা যাবে। ইমান আলীর তিন পুত্র এবং কন্যার শোকে বিহ্বল কান্না আর চিৎকার গ্রামের বাতাসকে ভারী করে তোলে। তবে ইমান আলী মারা যায় না। সে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে এবং তার পুত্রেরা আনন্দে আত্মহারা হয়- পিতার প্রিয় খাবার ওলাং মাছের ঝোল রান্না করা হয়, পিতা ও পুত্রেরা একত্রে বসে খায়।
এ ঘটনা উপলক্ষ্যে তার দুই পুত্রের মধ্যকার পূর্বতন বিবাদ মিটে যায়। খাওয়া-দাওয়ার ইমান আলী অতীত দিনের স্মৃতি মন্থন করে । জমিদারের পেয়াদার বংশধর ইমান আলীর তিন পুত্র পিতামহের কৃতিত্বের কাহিনী শুনে গর্বিত হয়ে ওঠে। গল্প-গুজবের মধ্যে সামান্য রসিকতা হাস্য পরিহাসেও পরিবারের সদস্যরা মেতে ওঠে। এভাবেই জীবন কাটতে থাকে।
বর্ষাকালে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। ইমান আলীর পুরো পরিবারকে মাঁচা বেঁধে সেখানে আশ্রয় নিতে হয়। এই ভয়াল প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবাই একই মাচায় আশ্রয় নিলেও সেখানেও স্বার্থপরতা দেখা দেয়। বড়পুত্র কিছু সচ্ছল, তার মজুদ করা চাল-ডাল-আলুতে সে অন্যদের ভাগ বসাতে দিতে চায় না। তাই খুবই সন্তপর্ণে সে ও তার স্ত্রী সেগুলো গোপন করে।
অন্যদিকে মেজপুত্রের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ক্ষুধায় কাঁদতে থাকে। পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় মেজপুত্রের একমাত্র মেয়েটির। গল্পটি বন্যায় মানুষের দুর্ভোগের একটি নিপুন বর্ণনা পাওয়া খায়। এর মধ্যেই মানুষের নীচতা, হীনতা, ও রিরংসার বিষয়টিও গল্পকার ফুটিয়ে তুলেছেন। ইমান আলীর মানবেতর মৃত্যুর মধ্যদিয়ে গল্পটি শেষ হয়। দীর্ঘ অনাহারে পর্যুদস্ত ইমান আলীর পুত্রত্রয় পনের- বিশ মাইল দূরের জেলা শহরের লঙ্গরখানায় হেঁটে রওনা দেয়।
অন্ধ অসুস্থ বৃদ্ধ ইমান আলী চলৎশক্তি রহিত হয়ে পড়ে। অসহনীয় ক্ষুধার তাড়না তাদেরকে অমানবিক করে তোলে। তারা পথেই স্নেহময় পিতাকে ফেলে চলে যায়। সেখানেই ইমান আলীর মৃত্যু হয়। গল্পটির শুরুতে যে স্নেহমমতায় ভরপুর জীবনচিত্র দেখা যায়। গল্পের শেষের এই অমানবিক চিত্রটি ক্ষুধায় দিকভ্রান্ত মানুষকে উপস্থাপন করে।
গল্পটিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে মানুষের উপর্যুপরি দুর্নীতির চিত্রটি দেয়া হয়েছে- “শুরুতে দু’চার দিন পরে হলেও দুই এক সের চাল আটা রিলিফে পাওয়া যেত। শেষের দিকে রিলিফে চাল আটা দেওয়াও প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। কত তরারে দিয়ামরে রাক্ষসের দল?” ডেউয়ার বাপ মেম্বর একদিন নেকবর ভূঞাকে ধমক মেরে বলল।
নেকবর ভূঞা কাঁদকাঁদ হয়ে বলল, ‘তে কাজী, আমরা কি মরতাম?’ এভাবে রিলিফের চাল আটা বন্ধ করে দেওয়ায় দুঃখটাও আস্তে ধীরে কমে এল। চঙের ওপর বসে বিক্রি হয়ে গেল গেরামের বহু জমি-জমা। পানির দরেই বিক্রি হল। গেরামের মানুষের দুঃখ সইতে না পেরে সেই জমি কিনল নাথপাড়ার সুরেন্দ্র, ভূঞাপাড়ার জব্বার আর ডেউয়ার বাপ মেম্বর।
বন্যার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ফায়দা করে গ্রামের এক শ্রেণীর মানুষ রিলিফের সামগ্রী আত্মসাৎ করে। ক্ষুসাকাতর মানুষের বিপদের সুযোগে নামমাত্র মূল্যে ভামি কিনে ধনের পাহাড় তৈরি করে। অন্যদিকে, গ্রামের সাধারণ মানুষ সর্বস্বান্ত হয়। ইমানসালীর মৃত্যু’ গল্পে এ চিত্রটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। গল্পে সংলাপ রচনা লেখক আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের পাশাপাশি গ্রাম্য কখন ঢঙ দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন।
বর্তমান নগর সভ্যতা ও প্রযুক্তির আগ্রাসনে গ্রাম-বাংলার অতীত ঐতিহ্যের অনেক কিছু হারিয়ে যাচ্ছে-এমনি এক হারিয়ে যাওয়া পেশা হচ্ছে ঢাকা-ঢুলীদের কর্মক্ষেত্র। মাহমুদুল হকের ‘হৈরব ও ভৈরব’ (১৯৭৮)-এ হৈরব ঢাকীর সংলাপে এ চিত্রটি ফুটে উঠেছে-“কয়কীর্তনের ঢাকীদের কি দাপটটাই না ছিল একসময় পালা- পার্বনের আগে সারা দেশ থেকে বায়না করতে আসতো মানুষজন।
বনেদি বাবুদের বাড়ি না হলে তারা বায়না ফিরিয়ে দিয়েছে কতোবার, সেই তারাই এখন ঋষি দাসদের সঙ্গে বাঁশ আর বেতের ঝুড়ি বুনে কোনমতে নিজেদের পেট চালায়, চুরি-ডাকাতি করে বেড়ায়।” হৈরব ঢাকী একসময় খুব নামডাকওয়ালা ছিল- কিন্তু এখন ক্ষুধার দাবি মেটাতে তাকে সুদে ঋণ নিতে হয় মহাজন গনি মিয়ার কাছ থেকে। ঋণ শোধের জন্যও উপার্জন প্রয়োজন।
হৈরবের পুত্র ভরত স্ত্রীকে নিয়ে ভারতে পাড়ি জমিয়েছে, সেখানে প্লাস্টিকের ফুলের কারখানায় কাজ করে, বাবা-মায়ের খবর সে নেয় না। অপর ছেলে ভৈরব সংসারটিকে আগলে রাখতে চায়। কোন নির্দিষ্ট পেশা নেই তার, কখনও কাঠ কাটে, কখনও অন্যের জমি চষে। কিন্তু তাতে সংসার চলে না।
হৈরবের বিধবা বোন দয়ার প্রতি গনি মিয়ার দৃষ্টি পড়ে তার যৌনাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ হলে সে হৈরবের প্রতি দাক্ষিণ্য দেখাতে প্রস্তুত। হৈরবকে সে এই প্রস্তাব দেয় ‘সধবার কেউ নয়, বিধবার বন্ধু”। গল্পটির সংঘাত এখানেই। হৈরব পলায়নপর। গনিমিয়া যখন টাকার তাগাদা দিতে আসে, তখন সে ঝাঁথার নিচে আত্মগোপন করতে চায়। কিন্তু নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি ভৈরব পিতার মত পলায়নপর নয়। সে রুখে দাঁড়ায়।
সে চূর্ণ- বিচূর্ণ করে দিতে চায় শোষককে ধুপধাপ করে নেচে ওঠে ভৈরব। পায়ের চাপে চাপড়া চাপড়া মাটি খসে যায়। ভৈরবের চোখ থেকে আগুন ঠিকরে বের হয়। ফিরান দিয়া বহেন, ফিরান দিয়া বহেন, দশখুশি বাজাই দ্যাহেন ক্যামনে, মাইনশের চামড়ার ছানিতে ল্যাহেন কেমন বাজে …………. সরোধে সে বাঁশের কাচা চালায়।
প্রাণভয়ে ভীত হতচকিত গনিমিয়া ক্ষেতের ওপর গড়ান খেয়ে খেয়ে ততোক্ষণে বেশি খানিকটা দূরে সরে গিয়েছে, তার কানের ভেতরে তখন তুবড়ি বাঁশির চিৎকার; দানবীয় উল্লাসে মূর্তিমান ভৈরব তখনো কাচার মাথায় আগুনের ফুলকি ছোটাচ্ছে।”
গল্পটিতে লেখকের ভাষার কারুকার্য চমৎকার। গাঁয়ের ঢুলী হৈরবের দার্শনিক চিন্তার প্রবাহমানতা এবং তার চরিত্র ও চিন্তার প্রকাশে আঞ্চলিক ভাষায় দার্শনিক সংলাপ নির্মাণে অসামান্য শিল্পদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন- মন অন্নময়, কি বুঝছস, অন্ন নাই তো মনই নাই; শ্যাষম্যাষ হ্যা অস্ত্রেই ধরছে টান তো মন পাম কই- ” যোগমায়া ও দয়ার সংলাপে গ্রামীণ নারীর কথনভঙ্গির যথাযথ উপস্থাপনাটিও দৃষ্টি আকর্ষক।

গ্রামের খেটে খাওয়া দরিদ্র জনগণকে কেন্দ্র করে চলে নানান প্রকার শোষণ। এ শোষণ চলে স্তরে স্তরে। এ শোষকশ্রেণীর মধ্যেই থাকে নেতা-পাতিনেতা। জেলে সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নিকারী সম্প্রদায়। হত দরিদ্র জেলেদেরকে তারা নৌকা, জাল ভাড়া দেয়। এছাড়াও আছে ঘাটের সর্দার, সর্বহারা গ্রামে শোষণের নানা রূপ। হলধর নিকারী’র একদিন গল্পে হলধরের একদিনের ঘটনা বর্ণনার মধ্যদিয়ে গল্পের সুন্দর বাঁধুনিতে গল্পকার দেখিয়েছেন কিভাবে হত দরিদ্রদেরকে দরিদ্র রাখারই ষড়যন্ত্রে মেতে থাকে স্বার্থান্বেষী চক্র।
হলধর নিকারী ও দাদন মুনসি সরকারের দেয়া নাইলনের সুতো আত্মসাৎ করে, জেলেরা যাতে মাছ ধরার জালের মালিকানা না পায় এবং তাদের পরিশ্রমের সিংহভাগ নিকারী সম্প্রদায় ভোগ করতে পারে জাল ও নৌকা ভাড়া দেয়ার বিনিময়ে। এছাড়া শোষক শ্রেণী নিজেদের প্রতিপত্তি বজায় রাখতে পরস্পর লিপ্ত থাকে ষড়যন্ত্রে— “এমন একটা দুরমুশ পার্টি হাতে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার, বুদ্ধি থাকলে খেলানো যায়; রাত্রির মধ্যে বয়ড়াগদির কেশবের ধড় ও মুত্তুর কোন হদিশ থাকবে না, রফা দু হাজারে।
দাদন মুনশির ডাই করা নাইলনের সুতোর গুপ্ত খবরও সে সর্বহারাদের কাছে ফাঁস করে দিয়েছে মওকা পেয়ে। এখন সে তাদের নিজেদের দলের মানুষ; মাসে মাসে কেবল হাতের ময়লা কিছু সাফ করতে হবে, সামান্য এইটুকুই।” গল্পে গঙ্গা ও ভগি চরিত্রকে কেন্দ্র করে হলধরের লিবিডো চেতনা প্রকাশ পায়। গ্রামের অসহায় নারীদের সম্মানহীন জীবনের করুণ চিত্র পাওয়া যায় গঙ্গা ও মেনকা চরিত্রে।
১৯৭৭ সালে রচিত ‘বুড়ো ওবাদের জমা-খরচ’ গল্পটি। গল্পটির পটভূমি মুক্তিযুদ্ধ। তিন বছর আগে গ্রাম ছেড়ে যাওয়া ওবাদ গ্রামে ফিরে এসেছে। কারণ ঢাকা শহরে চলছে পাক মিলিটারিদের দানবীয় তাণ্ডব। তিন বছর আগে গ্রাম ত্যগ করে জীবিকার সন্ধানে সে শহরে গিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের ডামাডোলে গ্রামে ফিরতে হয়েছে আরও অসংখ্যা মানুষের সাথে- “মাঠঘাট সবই এখন হাঁটাপথ।…… প্রাণের ভয়ে পোঁটলা-পুটিলি সম্বল করে কেউবা একেবারে নাঙ্গা হাতে বনবাদাড় ভেঙে খেতখামার ডিঙ্গিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে হন্যে হয়ে ছুটে চলেছে।
শহরে শহরে খুনখারাবি, হুলস্থুল মিলিটারির ভয়ে কিছুটা দিকভ্রান্তের মতো গ্রামে গ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ছে মানুষ।” গ্রামে এসে ক্ষুধার তাগিদে তাগিদে সে কালু ছৈয়ালের চোরাই মাল আনা-নেয়ার কাজ নেয়। প্রাণভয়ে পলায়নরত মানুষ গোরস্থানে পুঁতে রেখে যায় তাদের সম্পদ। সেগুলোই ওবাদ তুলে নিয়ে আসে কালু ছৈয়ালের নির্দেশে। প্রাণ বাঁচানোর জন্য শহর ছেড়ে গ্রামে এসেছে মানুষ। কিন্তু সেখানেও তারা বাঁচতে পারেনি।
এখানেও নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। বুড়ো ওবাদ তার সাক্ষী হয়, সে প্রাণে বেঁচে যায়, কিন্তু তার কানে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে এক মায়ের আর্তনাদ- “বাবারা বাচ্চাগুলোরে রেহাই দাও, অগো তো কুনো কসুর নাই।” কিন্তু শিশুরা রেহাই পায় না। ওবাদ তাদের রক্ষা করতে পারে না, কিন্তু পরম মমতায় কবরস্থ করে ঐ মৃত শিশুদেরকে।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকবাহিনীর আক্রমণের পাশাপাশি দেশীয় রাজাকারদের দৌরাত্ম্যের ন্যাক্কারজনক কাহিনী ‘গরু ছাগলের গল্প’। গ্রামের সংখ্যালঘু বাঙালী হিন্দু সম্প্রদায়ের চরম নিরাপত্তাহীনতার কথা গল্পটির প্রতিপাদ্য। বাঙালী হয়ে বাঙালী হত্যারই পথ প্রদর্শক রাজাকারেরা। গল্পে তরুণ তপা ঘোষ চরিত্রটির সংলাপে এই বেদনাদায়ক বিষয়টি উক্ত হয়েছে।
প্রত্যন্ত পল্লীর গার্হস্থ্যজীবন ও মানুষের এক অপূর্ব গল্প বুলবুল চৌধুরীর টুকা কাহিনী”। কারও ক্ষেতে কামলা খেটে, কিংবা মাছ ধরে হাটে বেঁচে, এক টুকরা জমিতে সবজি ফলিয়ে কোনরকমে জীবনধারাণ করে টুকা, আইনুল, একুব, মায়মুনা এবং এদের মত আরও অনেকে। “মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, পেটা ফোল-ফাঁপা, তেল কুচকুচে কালো টুকা কামলা খাটে বাড়ি বাড়ি, কান্দা কয়েক জমি আছে, শিমটা, কুমড়োটা ফলায়। বাঁশ ঝাড়টায় বছরে বিক্রি ওঠায় একবার। ঘর আছে, ঘর আগলাবার মানুষ নেই।”
নিতান্ত সহজ-সরল, সাদাসিধে এদের জীবন। দূর গ্রামে কামলা খাটতে যাবার আগে তার শিমের মাচাটি যেন গরু-ছাগল নষ্ট না করে, তা লক্ষ্য করার জন্য ভ্রাতৃবধুকে বারবার অনুরোধ করে টুকা। স্বামীর হাতে মারধোর খেয়েও হাসিমুখে ঘরকন্না করে মায়মুনা— স্বামীর প্রতি প্রগাঢ় মমত্ব তার হৃদয়ে, তাই স্বামীর অসুস্থতায় অধীর হয়ে ওঠে সে। কাজের ফাঁকে সুহৃদ টুকাকে কখনও কখনও গজার, কইচ্ছা মাছ উপহার দিয়ে দরিদ্রতার মধ্যেও মমত্ব ও বন্ধুত্বের প্রকাশ ঘটায় আইনুল।
টুকার আত্মসম্মানবোধ প্রবল, তাই স্ত্রীকে চুরি করতে দেখে ভীষণ রেগে যায় এবং গায়ে হাত তোলে। টুকার মনের আক্রোশ, ক্ষোভ ও প্রতিশোধ পরায়ণতার পরিচয় পাওয়া যায়। নায়েবের ঘোড়াকে কোঁচ দিয়ে বিদ্ধ করে টুকা। নায়েবের প্রতি টুকার এই বিরূপ মনোভাবের কারণ, সেই-ই টুকার মা ও বাবার মধ্যকার বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। মায়মুনা ও টুকার মায়ের চরিত্রটি উল্লেখ করে লেখক গ্রামের নির্যাতিত নারীদের একটি ছবি এঁকেছেন।
‘মাছ’ গল্পটিতে বর্ষার আগমনে চারদিকে পানি থই থই মাহের তখন প্রাচুর্য আর তখনই ইদ্রিস ও সিরাজ মাঝরাতে কোঁচ হাতে বেরিয়ে পড়ে মাছ ধরতে। দু’জনেই ভিন্ন দু’টি কারণে স্ত্রীর সঙ্গ বঞ্চিত। ইদ্রিসের স্ত্রী আটমাসের গর্ভবর্তী ও সিরাজের বউ গিয়েছে তার বাপের বাড়ি। মাছ ধরার ফাঁকে ফাঁকে দু’জনেই বউয়ের কথা ভাবতে থাকে তাদের জন্য ব্যকুলতা অনুভব করে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধুর বন্ধনটি গল্পে লক্ষ্যণীয়।
মানব-মানবীর আদিম ও চিরন্তন সম্পর্কের একটি দার্শনিক চেতনা থেকে উদ্ভূত ‘নিরবধিকাল’ গল্পটি গর্ভবতী চন্দ্রভানু তার স্বামী আসঙ্গের আনন্দ, গর্ভধারণের আনন্দ, গর্ভধারণের কষ্ট প্রকাশ করে বাল্যসখী আয়েশার কাছে। আয়েশার মনে তা গভীর প্রভাব ফেলে। গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত এ গল্পটির মূল সুর দার্শনিক।
“জীবে দয়া করে যে জন’ গল্পে এজনের অভাবের সংসার। এজন মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। তার মা গ্রামের এ বাড়ি ও বাড়ি ধাত্রীর কাজ বা মৃতদেহ গোসল দেয়ার কাজ করে- তাতে কখনও মনখানেক চাল, কখনও বা নতুন কাপড় পায় । এজনের বউ ছায়রা বদমেজাজী, অভাব তাকে আরও রুক্ষ ও রুঢ় করে তোলে । বিড়াল রান্নাঘরে রাখা মাছ খেয়ে নেয়ায় ছায়রা বিড়ালটিকে পিঁড়ি ছুঁড়ে মারে।
অবলা প্রাণীটির প্রতি এই নিষ্ঠুর আচরণের প্রতিবাদে এজনের মা সে রাতে ভাত খায় না। বৃদ্ধা মা অভুক্ত আছে এতে এজন মনঃকষ্টে ভোগে । কিন্তু বউকে শাসন করার সাহস তার নেই। গভীর রাতে হঠাৎ বিড়ালের ‘ম্যাও’ ডাকে এজন এবং হায়রার ঘুম ভাঙে। তারা বিছানা ছেড়ে উঠে দেখে এজনের মা পরম মমতায় বিড়ালটির ক্ষতস্থানে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে এবং নিজের জন্য বরাদ্দ খাবারটুকু বিড়ালটিকে খাওয়াচ্ছে। শত অভাবের মধ্যেও মানুষের স্নেহ-মমতার কোমল অনুভূতি জাগ্রত থাকতে পারে।
এ গল্পে মনুষ্যত্ববোধের এই অনুভূতির জয়গান গাওয়া হয়েছে। গল্পটির কাহিনীর মধ্য দিয়ে মাতৃস্নেহের চিরন্তনতার প্রকাশ করেছেন গল্পকার- “এদিকে মায়ের এই রূপটুকুও তার কাছে নতুন। পাশেই স্ত্রীর হাতে লাঠি, আশ্চর্য সেটা খসে পড়ার আওয়াজ পায় সে। রহস্য রাগে, ঐ ঘরে শুয়ে থাকা মায়ের গর্ভে জন্ম তার। মায়েরই দুধে তার বাঁচা। বড় হয়ে এই প্রথম মায়ের জন্য কান্নার আস্বাদন পায় এজন ।”
“সংসার” গল্পটির ক্ষেত্র একটি গ্রাম্যমেলা। মেলার রং-বেরঙের আয়োজন ও নানান মানুষের ভিড়ের রূপক অবলম্বন করে বৃহত্তর আঙ্গিকে বিশ্বসংসারে একেক মানুষের জীবনের বৈচিত্র্যময় ঘটনার সাথে সাদৃশ্য দেখিয়েছেন লেখক। উত্তম পুরুষের ভাষ্যে রচিত গল্পে কথক তার বন্ধুকে বেড়াতে নিয়ে যান মেলায়। বন্ধুটির সম্প্রতি স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদ ঘটেছে, সাথে সাথে সন্তানের সাথেও; তাই গ্রামের মেলাটিতে ঘুরতে আসেন নিজা জীবনের দুঃখ কিছুক্ষণের জন্য ভুলে থাকার ইচ্ছায়।
মেলায় দেখা হয় পতিতা হায়রার সাথে সে মেলায় এসেছে মাজারে তার ছেলের জন্য মানত করতে, যে সন্তানকে তার কাছ থেকে তার স্বামী ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। এক গ্রাম্য মেলায় শহরের শিক্ষিত প্রকৌশলীর সাথে অশিক্ষিত পতিতার জীবনের অদ্ভূত মিল পায় তারা। লেখকের দার্শনিক উক্তি “জীবন আসলে মহাগল্প গল্পটি মূলতঃ লেখকের জীবন সম্পর্কিত দার্শনিক চেতনার ফসল। গল্পটিতে গ্রাম্য মেলার যে চিত্র পাওয়া যায় তা বাস্তবানুগ । প্রতি বছর বেলতলীর মেলাটি বসে লেংটা ফকিরের মাজারকে কেন্দ্র করে- “কতরকম মুখ চারপাশে।

এক দঙ্গল কিশোরীর ভীড় চুড়ির দোকানে। সবদিকে ওদের খুবই চঞ্চল চলাফেরা। ঘোরে পাগল-পাগলিনী। আবার কত রকম সরল চাউনি খুঁজলে পাওয়া যায়। জায়গায় জায়গায় জটলা, গাঁজারই মূলতঃ । গান গায় কত না বাউল। আসরে আসরে চলে পাগলপারা সব নাচ। সামনে লেংটার মাজার। ওদিক থেকে জিকিরের শব্দ ভেসে আসে, গান হয় বিভিন্ন আসরে। বাজে খোল-করতাল, খঞ্জনি, এরকতারা, ঢোল কত কি বাদ্য। মাইকে ভেসে আসে সার্কাসের ঘোষণা।”
‘দ্বিতীয় উদ্ধার’ ছায়েদ ও সুজনির অবমাননাকর জীবন থেকে উত্তরণের আশায় সিক্ত কাহিনী। চৈত্রের খরায় বোরো ধানের ফলন হল না, আষাঢ়ী ঢলের বন্যায় আমন ধান ডুবল; ছায়েদ ঘরে ফসল তুলতে পারে না। রাতের অন্ধকারে টাকার বিনিময়ে বউ সুজনিকে কফিলার বাহুবন্ধনে সঁপে দেয় সে। সুজনি শোকে স্তব্ধ ।
কড়ু কৈর্বতের ফলানো সবজি পানির দরে নিয়ে যায় ব্যাপারি, অথচ বাজারে জিনিসের দাম আকাশ ছোঁয়া। অভাব ও হতাশার মধ্যেও কড়ু কৈবর্ত বিস্মিত হয়ে ভাবে উপার্জনের কোন উপায় ছাড়াই ছায়েদের সংসারে দানাপানি আসে কোথা থেকে। শীত আসে।
ছায়েদ হেনিতে ধার দেয়, খেজুর গাছ কাটে, রসের জন্য হাঁড়ি বাঁধে আর আশায় বুক বাঁধে এবার হয়তো বা অভাব ও কফিলার হাত থেকে নিস্তার পাবে সে ও সুজনি – “গাছ লইছি অনেকটি, গুড় পামু। হেই পয়সায় পুরা বছর নিমু দেহিস। ভয় কি অহন? কফিলারে ঘরে আইতে দিলে না? সে আশা সঞ্চারিত হয় সুজনির মধ্যেও পাথর ভেঙে কান্নার ঢল নামে তার দু চোখে।
‘খরা’ গল্পে বৃদ্ধ ভিখারীর চোখে গ্রামে খরার চিত্র ফুটে উঠেছে।
‘দংশন’ গল্প গ্রামের জোতদার-মহাজন-চেয়ারম্যান তথা বিত্তবান প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিকৃত যৌন-লালসার চিত্র। গ্রাম সমাজে অনেক ধনী ব্যক্তিই তাদের অসুস্থ যৌনলালসার শিকারে পরিণত করে দরিদ্র নারীদের। বৃদ্ধ মৃধা সন্তান জন্মদানে অক্ষম। ঘরে তার দ্বিতীয় তরুণী বধু; বধুটির বয়স সতোরো-আঠারো।
তবুও মৃধা স্ত্রীকে ঘরে রেখে প্রায়ই সন্ধ্যার পরে বেরিয়ে পড়ে রিরংসা চরিতার্থের তাড়নায়। তার যৌন লালসার শিকার হয় গ্রামের কোন না কোন হত দরিদ্র গরীব বধু বা কন্যা। গল্পের শেষে সাপের দংশনে মৃধার মৃত্যুর মধ্যদিয়ে গল্পকার পাপের শাস্তি কামনা করছেন।
‘পরমানুষ’ গল্পটি গ্রামীণ পটভূমিতে একটি প্রেমের গল্প। যুবক আরমান পতিতা কইতরীকে ভালবাসে। তার প্রেম বিশুদ্ধ। কিন্তু কইতরী তাতে সাড়া দিতে পারে না। কেননা, সে অপেক্ষায় আছে অন্য কারো। পতিতার প্রেম সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই সে পায় না তার ভালোবাসার মানুষকে। কইতরী পঙ্কিল পথে চলতে চায় না। কিন্তু ফেরার রাস্তাও তার জন্য বন্ধ। কইতরীর করুণ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গল্পটি শেষ হয়।
স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সেলিনা হোসেনের ‘খোল-করতাল’ (১৯৭৫), পরজন্ম (১৯৮৬), মানুষটি (১৯৯৩), মতিজানের মেয়েরা (১৯৯৫) প্রভৃতি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। নিজ রচনা সম্পর্কে সেলিনা হোসেন বলেছেন জীবনের খণ্ড অনুভব বলে যে কেছু আছে আমি তা মনে করি না। কারণ এইসব টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতার অনুভব জীবনের ধারাবহিকতার স্রোত। এই স্রোতকে খন্ডিত কররে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় চলমানতা, তাই গল্প এই চলমানতার অংশ। একে লেখকের জীবনের সঙ্গে এক করে দেখা সঙ্গত।”
গ্রাম্য যুবতী জামিলার চিন্তামগ্নতা, উপলব্ধি ও অভিনব প্রতিশোধের গলপ ‘নতুন জলের শব্দ’। মাতৃহীন জমিলা তার পিতা মকবুল পাটারীর সাথে আসে চরধূমানীতে। নীলাক্ষী নদীর বুকে জেগে ওঠা নতুন চরের দখল নিতে আলীমুদ্দীন জোতদার ভূমিহীন কৃষক মকবুলসহ আর ছয়জনকে চরধূমানীতে পাঠিয়েছে। তারা চলে এসে সপরিবারে বসবাস শুরু করে এবং এর মাটিতে ধান চাষ শুরু করে। কিন্তু তারা জানে হাড় ভাঙা পরিশ্রম ও পরম যত্নে ফলানো এ ধান তাদের অভাব মেটাবে না। সব ফসলই উঠব আলিমুদ্দীনের গোলায়।
তাদের পরিশ্রমের প্রাপ্য দিয়ে তারা পেট ভরে খেতেও পাবে না। তবুও মকবুল নিষ্ঠার সাথে তার দায়িত্ব পালন করে যায়। আলিমুদ্দীন জোতদারের প্রতিদ্বন্দ্বী তাহের আলী। সেও চরের দখল চায়। কৃষককন্যা জমিলা উপলব্ধি করে আলিমুদ্দীন বা তাহের আলী দু’জনই এ সকল খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি সমান অত্যাচারী। অথচ নিজেদের রক্তজল করে এই ক্ষুধার্ত দরিদ্র মানুষেরা দিনের পর দিন রক্ষা করে বিত্তবানের সম্পন্ন- “তাই কিছুতেই ভাবতে ইচ্ছে করে না যে এ ধানের মালিক শুধু আলীমুদ্দীন।
এ জমি চাষ করেছে ওর বুড়ো বাপ, ধান লাগিয়েছে- আগাছা সাফ করেছে বুকের মমতা দিয়ে পাহারা দিচ্ছে। অথচ সে যখন এ ধানের অধিকারী নয় তখন ওর কাছে আলীমুদ্দীনও যা তাহের আলীও তা। এ ধান তাহের আলীর গোলায় গেলেই বা কি ক্ষতিবৃদ্ধি।” একদিন তাহের আলীর যুবকপুত্র কালাম গোপনে খবর নিতে আসে চরমানীতে। ঘটনাক্রমে জমিলার সাথে তার পরিচয় হয় এবং তাকে সে প্রণয় আহ্বান জানায়। উনিশ বছরের যুবতী জমিলা যৌবনের দাবী এড়াতে পারে না। তাই সে কালামের আহ্বানে সাড়া দেয়। এরপর ফসল কাটার মওসুম আসে।
ফসল কাটার শেষদিনে শঙ্কিত চিত্তে চরধূমানীর মানুষ অপেক্ষা করে ধান নির্বিঘ্নে আলীমুদ্দীনের গোলায় উঠবে না, তাহের আলী তা ছিনিয়ে নেবে। শেষ মুহূর্তে তাহের আলীর লোকেরা ধান লুটপাট করে নিতে আসে। সোরগোল শুনে কৃষকবধূ ও কন্যাদের সাথে জমিলাও ছুটে যায় মাঠের দিকে। তার চোখের সামনেই কালামের লাঠির আঘাতে মকবুল পাটারী নিহত হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনা জমিলার মনে সঞ্চিত ক্ষোভকে মুহূর্তে প্রজ্জ্বলিত করে। জমিলা বিনা দ্বিধায় পাকা ধানের স্তূপে হাতে ধরা কুপির আগুন ধরিয়ে দেয়।
‘খোয়াই নদীর বাঁক বদল’ গল্পে এক জোতদার ভূস্বামীর অন্ধ সম্পদ-লোড এবং প্রাকৃতিক নিয়মেই এ লোডের মর্মান্তিক পরিণতি দেখানো হয়েছে। জমিবৃদ্ধির লালসা জোতদার স্বামীদেরকে কত হীন, কত নিষ্ঠুর করতে পারে এ গল্পে তার একটি চিত্র গল্পকার এঁকেছেন। মনুমিয়ার পিতা হত দরিদ্র অবস্থা থেকে নিজ পরিশ্রমে উঠে এসেছিল। “বাবা অনেক কষ্টে বিঘা দশেক করেছেন। মনুমিয়া বাপকা বেটা। সেটা বাড়িয়ে বিঘা পঞ্চাশেক করেছে। আরো চাই।”
এই সীমাহীন চাহিদা পূরণের জন্য মনুমিয়া হীন উপায় অবলম্বন করে “যেমন করে হাছন রাজা মিয়া, মনসুরের জমি নিয়েছে তেমন করে হাতেম মুন্সীর জমিও ওর মুঠোয় চলে আসবে। এ পর্যন্ত হাতেম মুন্সী পাঁচশ টাকা ধার নিয়েছে। আসছে বর্ষায় আরো তিনশ’ দিয়ে খাতায় হিসাব দেখাবে এক হাজার। তার পরই হাতেম মুন্সী জামটা লিখে দিতে বাধ্য হবে।
অবশ্য শর্ত থাকবে কোন দিন টাকা দিতে পারলে জমি ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু সে সুযোগ ওরা কোনো দিনই পায় না। যেমন পায়নি হাছন, বাজা মিয়া বা মনসুর। ফাঁকের অভাব নেই মনুমিয়ার। যে সব ফাঁকে ওদের গলাটা ফেলে দিতে একটুও অসুবিধা হয় না ওর।” এই জমি ও অর্থের নেশায় মনুমিয়া বৃদ্ধ বাবাকে ধুঁকে মরতে দেখেও চিকিৎসা করায় না। স্বামী পরিত্যক্ত-বন্ধ্যা মেয়ে নফিজার অন্যত্র বিয়ে দেয় না, ছেলেদের পড়ার খরচ দিতে রাজী হয় না।
সম্পদ-লালসা তাকে অমানুষ করে তোলে। কিন্তু একদিন সরকারী লোক এসে জানায়, থোয়াই নদীর বন্যায় গ্রামের যে বিস্তর ক্ষতি হয়, তা রোধ করার জন্য খাল কেটে নদীর গতি বদল করা হবে। তাহলে বর্ষায় বন্যার সম্ভবনা কমে যাবে। এরই সাথে সরকারী লোক তাকে আরও জানায়, নদীর এই গতি বদল হবে মনুমিয়ার জমির উপর দিয়েই।
‘পরজন গ্রন্থে’র ‘ভিটেমাটি’ গল্পটি মুক্তিযুদ্ধোত্তর দেশের পরিস্থিতি ও একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পিতার গল্প। হাফিজ মিয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা লতিফের পিতা। পুত্রশোক পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বোঝা হয়ে তার বুকে চেপে বসে আছে। এর সাথে তার অন্তর্জালা বৃদ্ধি পায় যখন সে দেখে রাজাকার জগলু, যার গুলিতে লতিক শহীদ হয়েছে, সে “বাজারে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে।
নামীদামী জগলুর নাগাল পাওয়া হাফিজ মিয়ার কর্ম না।” অথচ শহীদ লতিফের নামফলক মেরামতের অভাবে পড়ে থাকে রাস্তায়, অথবা “বাবলু ঘুঘুডাঙা ফ্রন্টের একগাদা পাকিস্তানী সৈন্য খতম করেও বাপের চায়ের দোকানের বাইরে। যেতে পারেনি।” গল্পের শেষে জগলু নৃশংসভাবে খুন হয়। স্বাধীন দেশের মাটি রাজাকারের এই প্রাপ্য শাস্তি পেতে দেখে শহীদ লতিফের পিতা হাফিজ মিয়া কিছুটা সান্ত্বনা খুঁজে পায়।
‘ঋণশোধ’ গল্পটিতে দেখা যায় দারিদ্র্যের ভয়াবহতা ও মানুষের নির্মমতা একটি চিত্র। মেহের আলী গ্রামের পোষ্ট অফিসের পিয়ন। ঘরে তার অসুস্থ স্ত্রী ও বিবাহযোগ্য কন্যা নূরী এবং নিদারুণ অভাব। আয়ক্ষম পুত্র বিয়ে করে বাবা-মায়ের থেকে আলাদা হয়ে গিয়ে সংসার করছে। তার কাছ থেকে কোন অর্থ-সহায়তা পাওয়া যায় না। এদিকে পোস্ট মাস্টার ক্ষমতার দাপটে তার অধিনস্ত মেহের আলীর সাথে অকথ্য দুর্ব্যবহার করে।

অসহনীয় অভাব ও পরিস্থিতির চাপে মেহের আলী হয়ে ওঠে রুক্ষ ও বদমেজাজী। ঘরে অসুস্থ স্ত্রী যে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর প্রহর গুনছে; যুবতী কন্যা যাকে একটি সুপাত্রে সম্প্রদান করার সামর্থ্য মেহের আলীর নেই। সামাজিক বাস্তবতা তাকে রুঢ় ও কঠিন করে তোলে। কোমল মানবিক অনুভূতি হারিয়ে যায় একসময়। তাই স্ত্রীর উপেক্ষা করে যে বলতে পারে “এ্যাই নুরী আঁরে ভাত দে”।
এরপর পরিস্থিতি আরও সঙ্গীন হয়ে ওঠে। মেহের আলী হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়। সরকারী কর্মচারী হয়েও পেনশন পায় না। অফিস থেকে জানায় তার কাগজপত্র হারিয়ে গেছে। কিন্তু তবুও মেহের আলী তার আত্ম-অহমিকাকে বিসর্জন দেয় না। কন্যা নূরী অন্যের বাড়িতে ধান ভেনে চাল আনতে চায়। কিন্তু মেহের আলী নিজের উপার্জনেই বাঁচতে চায়। তাই পঙ্গু মেহের আলী এক সময় বেছে নেয় ভিক্ষাবৃত্তি।
এক সংগ্রামী নারীকে মূর্ত করে তুলেছেন সেলিনা হোসেন তাঁর ‘জলহাওয়া” গল্পে। হাওড় অঞ্চলের এক অজপাড়া গাঁ খুরশিমুলের কসিরন বেওয়া। একমাত্র ছেলে মনসুরকে সে উচ্চশিক্ষিত করে তুলতে চায়। নিজে কোনদিন গ্রামের সীমানা অতিক্রম না করলেও ছেলেকে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠায়। কসিরন বেওয়ার স্বামী আক্কাস আলী বদমেজাজী ও সংসারের প্রতি উদাসীন। সে গাঁজার নেশায় আসক্ত।
এজন্য কসিরনকে গৃহস্থালী কাজ ছাড়াও সংসারের উপার্জনের দিকটির প্রতিও দৃষ্টি দিতে হয়। এর উপর ছেলেকে শহরে পড়তে পাঠিয়ে তার খরচও বৃদ্ধি পেয়েছ। তবু গ্রামের এই নিরক্ষর নারীর অন্তরের সাহস ও উদ্যমের অভাব হয় না । বদমেজাজী স্বামীর প্রতিও সে মমতাময়ী।
সমস্ত কষ্টই কসিরন সহ্য করে নেয় আশায় বুক বেঁধে “ও লেখাপড়া শেষে ফিরে এলে কসিরনে স্বপ্ন সফল হবে”। কিন্তু একদিন মনসুর ফিরে আসে লাশ হয়ে। সরকার বিরোধী আন্দোলনে শরিক হয়ে মিছিলে নেতৃত্ব দেবার সময় পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছে সে। অভাবনীয় মর্মান্তি-ক ঘটনাটি স্তব্ধ করে দেয় উদ্যমী নারী কসিরনকে।
“দাঁড় কাক গল্পে এক ভূমিহীন চাষীর দৈনন্দিন জীবন ও সে জীবন থেকে উত্তরনের আকাঙ্ক্ষার চিত্র দেখা যায়। “তেতাল্লিশ বছর বয়সে লোকটির শখ হয়েছে জীবনকে অন্যভাবে গড়তে। কিছু স্বপ্ন ওকে তাড়িত করছে। ও অন্যের জমি চাষ কর জীবনধারনের মতো পরগাছা বৃত্তি ত্যাগ করতে চায় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সম্ভ গানের পিতা হওয়ার দায়ভার থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চায়।”
ভূমিহীন চাষী আবদুল মান্নান অনুভব করে যে তার জীবন সম্মানহীন এবং স্বপ্নহীন। নিজের এই ব্যর্থতাকে লুকিয়ে রাখতে চায়। তাই বাইরে পাওয়া অসম্মানের শোধ নেয় ক্ষুধাকাতর স্ত্রী সায়দাকে মারধোর করে। সায়দা জীবনটাকে এভাবেই মেনে নিতে বাধ্য হয়। তাই স্বামীর হাতে মার খেয়েও দুঃখ করার সময় তার নেই। অভুক্ত সন্তানগুলির জন্য খাবার ব্যবস্থা করার চিন্তাতেই তার মন আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। তবুও তার ফাঁকেই হয় তো হৃদয় নিংড়ে একটি দীর্ঘশ্বাস বের হয়।
“এই লোকটির সঙ্গে এমন করেই ঘর করলো। না পেলো পেট করে ভাত, না পেলো আদর সোহাগ।” হঠাৎ একদিন ভাগা পরিবর্তনের সুযোগ আসে ভূমিহীন চাষী মান্নানের । ধীরে ধীরে সে কিছুটা দারিদ্র কাটিয়ে ওঠে। কিন্তু তখন সে আর সর্বংসহা স্ত্রী সায়দা ও সন্তানদের দিকে ফিরে তাকায় না। নিজের দায়িত্ববোধকে উপেক্ষা করে সে নতুন সংসার পাতে হালিমাকে নিয়ে। গল্পটি দরিদ্র অসহায় নারীদের জীবনচিত্র।
‘পারুলের মা হওয়া’ সমাজের একচোষা নীতি ও মানুষের নীতিহীনতার বিরুদ্ধে এক সাহসী নারীর নীরব প্রতিবাদের গল্প। পারুলের দিনমজুর স্বামী বিয়ের দেড় বছরের মাথায় হঠাৎ একদিন পারুলকে ফেলে উধাও হয়ে গেল। স্বামীর প্রতিক্ষায় ব্যাকুল পারুল হঠাৎ একদিন খবর পায় সে তার স্বামী অন্য গ্রামে বিয়ে করে সংসার পেতেছে। এ সংবাদটি পারুলের নারীত্বকে চরম অপমানিত করে।
দরিদ্র স্বামীর সংসারে পারুল কেবল ভালবাসা ছাড়া কিছুই আশা করেনি। কিন্তু তবু তার স্বামী তার সাথে এই প্রতারণা করল। পারুল একাকী জীবন যাপন করতে থাকে। কারও বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করে না। হঠাৎ একদিন গ্রামের মানুষেরা কোন অভিযোগ করে না। হঠাৎ একদিন গ্রামের মানুষেরা লক্ষ্য করল যে, পারুল অন্তঃসত্ত্বা। সমাজ তার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে তাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করতে চাইল। কিন্তু পারুল সমাজের এই রক্তচক্ষুকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করল। সে কারও কাছে সন্তানের পিতৃত্বে দাবী নিয়ে গেল না।
বরং সে দৃঢ়তার সাথে ঘোষনা করল, সন্তানের লালন-পালন ও ভরণ-পোষণ সেই করতে সক্ষম। তার সন্তানের জন্মদাতার পরিচয়ের প্রয়োজন নেই। কেন না জন্মদাতা হলেই পিতা হওয়া যায় না। পারুল চরিত্রটি বাস্তব না হলেও সমাজের একটি বাস্তব সমস্যা নির্দেশ ও আত্মপ্রত্যয়ী অভিমানী পারুল চরিত্র অঙ্কন শিল্পসফল ও জীবনসংলগ্ন ।
“জলের রেখা’ গল্পে চা বাগানের শ্রমিক জীবনের দুর্দশার চিত্র ফুটে উঠেছে। এক শতবর্ষীয় বৃদ্ধের স্মৃতিচারণ ও বর্তমান আত্মগত চিন্তার মধ্য দিয়ে গল্পের কাহিনী এগিয়েছে। এরই সাথে চা বাগান গড়ে তোলা ও চা- বাগানের শ্রমিকদের বঞ্চনা ও অভাবের প্রসঙ্গ এসেছে।
‘মতিজানের মেয়েরা’ যৌতুকের কারণে নির্যাতিত গ্রামের গৃহবধূ মতিজানের গল্প। তবে গল্পকার চোখের পানিতে সিক্ত মতিজানের কাহিনী রচনা করেননি। ধীরে ধীরে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি সঞ্চয় করে মতিজান। অসহায় নারীর থেকে এক শক্তিময়ী আত্মপ্রত্যয়ী নারীতে রূপান্তরিত হয় সে। সে শুধু নিজেকেই রক্ষা করে না, পক্ষীমাতার মত সকল অবিচার-অত্যাচার থেকে নিজ কন্যাদেরও রক্ষা করার দৃঢ়তা অর্জন করে।
‘ইজ্জত’, ‘মেয়েলোকটা’ প্রভৃতি গল্প গ্রামের নির্যাতিত গৃহবধূর কাহিনী।
কায়েস আহমেদের ‘অন্ধ তীরন্দাজ’ গল্পটির উপজীব্য গ্রাম্য পলিটিক্স। গল্পে দেখা যায় গ্রামের বিত্তশালী নেতারা নিজেদের প্রতিপত্তি টিকিয়ে রাখতে নোংরা ষড়যন্ত্র করে। এসব ষড়যন্ত্রকে বাস্তবায়ন করতে হাতিয়ার করে গ্রামের অভুক্ত অশিক্ষিত মানুষকে। এই দরিদ্র মানুষ পেটের দায়ে পাপের পথে নিজেদেরকে বিলিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর মাঝামাঝি অবস্থিত দোহার এলাকার এক জেলেপল্লীকে পটভূমি করে রচিত হয়েছে কায়েস আহমেদের ‘পরাণ’ গল্পটি। এ গল্পে উঠে এসেছে জেলেপল্লীর দৈনন্দিন জীবন, তাদের উৎসব-পার্বণ, তাদের সৌহার্দ্য, এর সাথেই দেখা যায় তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দলাদলি, নিরাপত্তাহীনতা।

জেলে মেঘলাল রাজবংশী মৌসুমের নতুন জাল ফেলবে নদীতে, তাকে উপলক্ষ্য করে সে নিজ বাড়িতে নামকীর্তণ ও কিছু খানাপিনার আয়োজন করে। সন্ধ্যার পর উৎসব শুরু হয়। জেলেপল্লীর মানুষেরা সমবেত হয় নাককীর্তনের আসরে। মগ্ন হয়ে তারা গান শোনে এর মধ্যেই হঠাৎ তাদের কোন্দল বাধে, মিটমাট হয়ে যায়। সবাই একত্রে ভক্তিভরে যগ্ন হয় নামকীর্তনের সুরে। কিন্তু হঠাৎ আসর ছত্রভঙ্গ হয়, জেলেরা সপরিবারে ঘরবাড়ি ছেড়ে ছুটে পালাতে থাকে। কারণ জেলেপল্লীতে ডাকাতের আক্রমণ হয়েছে।
ডাকাতদের হাতে জেলে পদ্মচরণের মেয়ে আলোরাণীর সম্ভ্রমহানির মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যদিয়ে গল্পটি শেষ হয়েছে। গল্পটির পটভূমি মুক্তিযুদ্ধের কিছু পরের সময়। যুদ্ধোত্তর দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এবং মানুষের আশাভঙ্গ ও দুর্ভোগের স্বরূপ গল্পটিতে ফুটে উঠেছে। জেলে পেশাজীবীদের পেশাগত সমস্যা এবং যথাযথ নীতিনির্ধারণ ও উদ্যোগের অভাবও এ গল্পে এলাচিত হয়েছে- “নিতাই হুঁকোটা মুখ থেকে নামাতে নামাতে বলে, “আমাগো কপালে অনেক দুঃখ আছে। বাইরের মানুষের চোখ পড়ছে নদীতে তার কি ওইবো ঠিক নাই, খালি হালায় নিজেগো মইদ্যে দলাদলি, খালি নিজেগো মইদ্যে দলাদলি।
‘ছারান দে, ফনি চরাৎ করে নোনতা জলের মত থুতু ফেলে, ‘সাতশ জাউল্যার একখান সমিতি, তার আবার হাজার গণ্ডা, মাতববর, বুজাইবো নে, জাল বাঙন জন্মের মতন ভুলাইয়া দিবো, জালই নামাইতে দিবো না।”
পশ্চিমবঙ্গের পল্লী ও পল্লীর অন্ত্যজ জীবনকে কেন্দ্র করে কায়েস আহমেদ লিখেছেন ‘দুই গায়কের গল্প’, “নিয়ামত আলীর জাগরণ’, ‘লাশকাটা ঘর’ ইত্যাদি গল্প। ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৈত্রিক ভিটে ও মালপদিয়ার রমণী মুখুচ্ছে’ গল্পটি বস্তুতঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রামের বাড়ির পৈতৃক ভিটে দর্শনের ঘটনা।
তবে এতে অঙ্কিত চরিত্রগুলি জীবন্ত। গ্রামের মানুষের কুপমণ্ডূকতা, অতিথিয়েতা, আগন্তুকের প্রতি কৌতূহল, সন্দেহপ্রবণতা ইত্যাদি সমস্ত ভাল-মন্দ বৈশিষ্ট্যের রূপায়নটি বাস্তব। বিক্রমপুরের সেই গ্রাম যার নাম মালপদিয়া সেখানকার অশিক্ষিত মানুষরা জানে না বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রাণপুরুষের শিকড় তাদেরই গ্রামে।
তাই লেখকের অনুভূতি তারা উপলব্ধি করতে পারে না- “মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নামে খুব বড় একজন লেখক, তাঁর পৈত্রিক ভিটে আপনাদের এই গ্রামে, সেই ভিটে দেখতে এসেছি। ভিটে মানে জায়গা জমি। বড় গোলমেলে জিনিস, বিশেষতঃ বাঙলাদেশে। কে জানে, কার জমি বেদখল করার মতলবে এরা এসেছে না কি কে বলবে।” গ্রামে পৌঁছানোর রাস্তার যে দুর্গমতা গল্পে বর্ণিত হয়েছে তা বাস্তবানুগ ।
“নিরাশ্রিত অগ্নি’ গল্পটি আবর্তিত হয়েছে হতদরিদ্র ফজর আলীর মনোভাবনাকে কেন্দ্র করে। ফজর আলীর সংসার স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে; তাদের বসবাস পরিদ্রসীমার নীচে। কোন নির্দিষ্ট কাজ নেই তার- কখনও ঘরামির কাজ, অথবা বাঁশের চুপড়ি বোনা, কখনও অন্যের জমিতে নিড়ানী দেওয়া, কখনওবা ধান কাটে। এভাবেই তারা পুরুষপরম্পরায় উপার্জন করছে এবং আধপেটা খেয়ে না খেয়ে তাদের বংশও প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে আছে।
এটাই তার কাছে স্বাভাবিক- “এভাবেই তো বাঁচতে হয়- বাপ এভাবেই কাল কাটিয়ে গেছে, তার বাপেরও বাবাও এমন কোন রাজা-মহারাজা ছিলো না; যত দূর বোঝে, তার দাদার বাবাও না; জন্মের পর থেকেই ফজর আলী দেখে আসছে দাদাকালি আমলের এবড়োখেবড়ো নোনা লাগা দু’কামরা মাটির ঘর। ডোঙা খোলার চাল, এক ফোটা উঠোন, উঠোনের পাসে আগাছার জঙ্গল, বাড়ির পেছনে অনন্ত সার বাঁশবাগান আগে যেমন বাড়িটার ওপর ঝুঁকে খুপড়ীর মত ঘর দুটোকে দিনের বেলায়ও অন্ধকার করে রাখতো, আজও তেমনি।”
গল্পকার অন্তত সা’র বাঁশ ঝাড়ের বিরাট ছায়ায় অন্ধকার হয়ে থাকা ঘরের বর্ণনার মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে চলতে থাকা শ্রেণী শোষণকে একটি চমৎকার রূপকে প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
আতা সরকারের ‘আগুন-জ্বলা দেশ গাঁও’ গল্পটিতে আইয়ুব সরকারের স্বৈরশাসন ও স্বৈরশাসনের পনতকে একটি গ্রামের পটভূমিতে প্রতীকের মধ্যদিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বড়বাড়ির পরিবারের সদস্যরা ও তাদের দোসর চেয়ারম্যান, ইউসির কয়েকজন মেম্বারের অনাচার ও কুকীর্তির কথা গ্রামের সবাই জানে। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলে না।
গ্রামের আত্মীয়-পরিজনহীন বিধবা খুম্ভী বুড়ির বেড়ার ঘর ভেঙে একরাতে তার যৎসামান্য সম্বল চুরি হয়ে গেল। তার হাহাকার ভারী হয়ে গেল গ্রামের বাতাস। বড়বাড়ির বড়কর্তা সমবেদনা জানাল- “আহারে! মাইনষের দিলে অহোম নাই। এই অচল বুড়ির ঘরেও ডাহাইতি করন লাগে। কাইন্দ্যা কি করবা। তুমারে তো আমি কইছিলাম ভিটাডা আমার হেফাজতে দিয়া তুমি এই ঘরে আইয়্যা ওডো। তুমার ভর-পোষ খরচপাতি আমিই চালামু।” কিন্তু বৃদ্ধা স্বামীর ভিটা ত্যাগ করতে নারাজ।
গ্রামের অনেকেই অনুমান করতে পারে এই সহায়হীন বৃদ্ধাকে ভিটাছাড়া করে জমিটুকু দখল নেয়ার উদ্দেশ্যে এই কুকীর্তি হয়তো বা বড়বাড়িরই সমর্থনপুষ্ট মিরধা চোরের। এ সময় বিষয়টি চাপা পড়ে যায় শহর থেকে আসা একটি খবরে রাজধানীসহ সারাদেশে তখন স্বৈরসরকার পতনের জন্য তুমুল আন্দোলন চলছে। গ্রামটিতেও তার ঢেউ লেগেছে। গ্রামের কয়েকজন তরুণ যারা ঢাকাতে কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গিয়েছে, তারা গ্রামে এসে হাইস্কুলের ছাত্রদের মধ্যে আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে।
আইয়ূবীয় স্বৈর সরকার পতনের আন্দোলনের সাথে গ্রামের বড়বাড়ির অবিচার ও অত্যচারের পতন ঘটানোর আকাঙ্ক্ষা যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে উঠেছে গ্রামবাসীর মনে। ঢাকা থেকে খবর আসে পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত হয়েছে ছাত্র আসাদ। প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে ছাত্র-জনতা। গ্রামেও এই বিক্ষোভ সংক্রমিত হল এবং ভয়ঙ্কর রূপ নিল। বড়কর্তা তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শহরে পালিয়ে গেল।
চেয়ারম্যান-মেম্বর- আত্মগোপন করল। মিরধা চোর উত্তেজিত জনতার মুখ থেকে পালিয়ে এসে বড়বাড়িতে আশ্রয় নিল। সেখানে পাহারারত ছিল বড়কর্তার পুত্র রতন। তার সহায় দোনলা বন্দুক। সে মিরধা চোরকে তাদের ভাড়ার ঘরে আশ্রয় দিল। তারপর দোনলা বন্দুকটি তাক করল উত্তেজিত জনতার দিকে। বড় বাড়িতে কাজ করতে কিশোর ছোট গেল্লা। সে বড়বাড়ির বহু নির্যাতনের স্বাক্ষী। ছোট গেল্লা তার সর্বশক্তি দিয়ে রতনকে বাধা দিল।
গ্রামবাসী ঢুকে পড়ল বড়বাড়ির ভাড়ার ঘরে যেখানে মিরধা চোর আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে তারা খুক্তি বুড়ির চুরি যাওয়া জিনিসগুলো পেল এবং সেই সাথে আরও কিছু চোরাই মালও পাওয়া গেল। বড়বাড়ির ছেলে রতনের পুকুরে পেতে রাখা শখের বড়শি থেকে একটি মাছ চুরি করার অপরাধে গেলাকে নির্মমভাবে মারধর করেছিল রতন।
অথচ বড়বাড়ির ভাড়ার ঘর ভরে আছে তাদেরই নির্দেশে চুরি করা চোরাইমালে। বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী প্রচণ্ড ক্ষোভে জালিয়ে দিল বড়বাড়ি এবং চোর মিরধাকে ছুঁড়ে দিল সেই আগুনের কুণ্ডুলীতে। এভাবেই দীর্ঘদিনের ক্ষোভে গ্রামবাসী বড়বাড়ির স্বৈরাশাসনের পতন ঘটাল।
স্বাধীনতাউত্তরকালে দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক চিত্রের উপস্থাপন লক্ষ্য করা যায় ‘কৃষ্ণপক্ষ’ গল্পটিতে। দেশ স্বাধীন হবার পর সাধারণ মানুষ তাদের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তি পায়নি, উপরন্তু পাকবাহিনীর দোসর রাজাকারদের দৌরাত্ম্য তখনও বলবৎ ছিল। এই হতাশাকে বুকে নিয়ে অনেক মুক্তিযোদ্ধা তরুণই স্বাধীনতার পর পরই আবার সমাজতান্ত্রিক বিপব ঘটাতে উদ্যোগী হয়।

অন্যদিকে কিছু মুক্তিযোদ্ধা ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও বিভক্তি দেখা দেয়। এই সুযোগে রাজাকারেরা স্বাধীন দেশেও মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। গল্পটিতে মাজেদুল হক ও সিরাজুল ইসলাম একই গ্রামের ছেলে, স্কুল জীবন থেকেই তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দু’জনই মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু স্বাধীন দেশে মাজেদুল হক দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটাতে সমাজতান্ত্রিক দলের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
অন্যদিকে সিরাজুল ইসলাম ক্ষমতাসীন দলের সদস্য হওয়ায় দুর্দান্ত প্রতাপশালী হয়ে ওঠে। দু’জনের দ্বন্দ্ব একসময় চরমে ওঠে এবং মাজেদুল গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়। নিষিদ্ধ রাজনীতি করার কারণে সে বহুদিন আত্মগোপন করে থাকে। দশবছর পর সে গ্রামে ফিরে আসে সিরাজুলের মুখোমুখি হওয়ার জন্য। কিন্তু আমে ফিরে সে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় তা ছিল তার কাছে অকল্পনীয়।
গ্রামে সে দেখল, রাজাকার তবারক সরকার চেয়ারম্যান হয়েছে। তারই চক্রান্তে খুন হয়েছে সিরাজুল এবং মাজেদুলকেও সে পরোক্ষভাবে হুমকি দিল। নিজবাড়িতে ফিরে যেতে যেতে মাজেদুল কামনা করে সিরাজুল এবং তার মিলিত শক্তি দিয়ে অপশক্তি তবারক সরকারকে আবার পরাস্ত করতে, যেমন তারা করেছিল একাত্তরে।
“যুদ্ধ-জীবন” গল্পটি স্বাধীনতাত্তোর এক সমাজতান্ত্রিক-বিপবী আবদুর রহীমের জীবনের গল্প ও রোজনামচা। বিপুল আশায় বুক বেঁধে জীবনের মায়া তুচ্ছ করে মুক্তিযোদ্ধারা যে স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে এনেছে, সে স্বাধীনতা দেশ সার্বভৌমত্ব দিয়েছে কিন্তু দেশের মানুষকে দেয়নি ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি। স্বাধীন দেশের মানুষের অসহায় কান্না মেনে নিতে অনেক তরুণই পারেনি। এমনই এক তরুণ আবদুর রহীম।
গ্রামের খুব সাধারণ একটি ছেলে। দেশের প্রতি ভালবাসা থেকে সে মুক্তিযুদ্ধে যায়, দেশ স্বাধীন করে। কিন্তু স্বাধীন দেশেও অনিয়ম-অনাচার-দারিদ্র্য তাকে বিষণ্ণ ও ক্ষুব্ধ করে। সে পরিবর্তনের আশায় যোগ দেয় সমাজতান্ত্রিক বিপরী দলে। তার শেষ পরিণতি হয় চরমপন্থী আখ্যা এবং অপমৃত্যু।
‘সুবেদ বুড়োর সাক্ষাৎকার’ গল্পটিতে এক অজপাড়া গাঁয়ের দরিদ্র বৃদ্ধের শানিত প্রতিবাদকে গল্পকার উপস্থাপন করেছেন। গল্পে একটি দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টার ও ফটোগ্রাফার বকসীগঞ্জ নামে শত মাইল উজানে এই অজগাঁয়ে আসে একটি রিপোর্ট তৈরি করতে। গ্রামের বর্তমান চেয়ারম্যান সাবেক চেয়ারম্যানকে ষড়যন্ত্র করে খুন করেছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বর্তমান চেয়ারম্যানের পিতা এলাকার শান্তিকমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন এবং সাবেক চেয়ারম্যান একজন মুক্তিযোদ্ধা। গ্রামের মানুষেরা খুনের বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ। ফলে কোন তথ্যসংগ্রহ সেই সাংবাদিকের পক্ষে সম্ভব হয় না। ফিরতি পথে খেয়াঘাটে তাদের পরিচয় হয় সুবেদ নামক বৃদ্ধের সাথে।
সে অপেক্ষা করছে তার পুত্রের জন্য যে জমি বেচার টাকা নিয়ে নদীর ওপারের হাটে গিয়েছে হালের বলদ কিনতে। কিন্তু ওপারে চেয়ারম্যান জুয়ার আসর বসিয়েছে। এই আসরে সর্বস্বান্ত হয় অনেকেই। কিন্তু পরে বৃদ্ধের আশঙ্কা সত্য প্রমাণ হয়। তার পুত্র ফিরে আসে খালি হাতে। প্রচণ্ড ক্ষোভে সুবেদ বুড়ে ছুটে যায় নদীর ধারেই তার কুটিরটিতে এবং বল্লম হাতে বেরিয়ে আসে- অ চেয়ারম্যানের জুয়ায় আড্ডাত সব থুয়ায়ে আছিস। হারামজাদা, তগর হগল জুয়াবাজ আর চেয়ারম্যানরে দেখাইতেছি।” বৃদ্ধ সুবেদের সংলাপে গ্রাম্য রাজনীতির একটি বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে-
: কে খুন করতে পারে বলে আপনার ধারণা?
: ক্যাডা আবার খুন করব। নিজেরাই খুনাখুনি কইরা মরছে। বদমাইশগুলা অমন কইরাই মরে।
: কেন এই খুনাখুনি? আপনার কি মনে হয়?
: মাগীর লাইগ্যা। পয়সা-কড়ির লাইগ্যা। ক্ষমতার লাইগ্যা। আগের চেরম্যান, এহনকর চেরম্যান কবলাকবলি খাবলাখাবলি করে। হারা জনমই দেখ্যা আইতাছি।
: চেয়ারম্যান হিসেবে আপনি কাকে ভোট দিয়েছেন।
: কাউরে না। পয়লা পয়লা দিতাম। …….. পরে দেহি, সব ফক্কা। এই লাইগ্যা ভুটভাট দেই না।………….
আশির দশকে রচিত ‘বনপুলকের গন্ধ’ গল্পটি জাফর তালুকদারের ‘অন্নদাস’ গ্রন্থের অন্তর্গত। গল্পটিতে কথকের স্বগত বর্ণনার মধ্যদিয়ে অতীতদিনের গ্রামবাংলার সমৃদ্ধ একটি চিত্র পাওয়া যায়। পাশাপাশি ক্রমান্বয়ে নগরমুখী মানুষদের গ্রামের প্রতি অবহেলা ও অবজ্ঞাপূর্ণ মানসিকতার কথক রাজধানীতে প্রতিষ্ঠিত একজন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট। তার জন্ম গ্রামে, সেখানেই তিনি বেড়ে উঠেছেন। জন্মভূমি গ্রামটিকে ভালবাসেন তিনি। কিন্তু তাঁর স্ত্রী এবং সন্তানেরা গ্রামের জীবনযাত্রা ও মানুষের প্রতি অবজ্ঞার ভাব পোষণ করে। এ কারণেই তাদের দীর্ঘদিন গ্রামে যাওয়া হয় না।
হঠাৎই একদিন কথক ঝোঁকের মাথায় উপস্থিত হলেন গ্রামে। গ্রামের পথ ধরে চলতে চলতে তার ভাবনা অতীত ও বর্তমানের গ্রামকে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে গল্পে। গল্পে স্মৃতিচারণমূলকভাবে পাওয়া যায় অতীত সমৃদ্ধ একান্নবর্তী পরিবারের আনন্দ-দৃশ্য- তবে যাই বলো, আমাদের সেই সময়টাই ছিলো আলাদা।
মা, ফুফু, কাকীরা রাত জেগে চাল কুটে পিঠে বানাতেন। সকালে যাত্রা দেখে এসে হাঁসের তেলে তেলে মাংস দিয়ে সেই পিঠে যখন গরম-গরম.. ।” গল্পটিতে গ্রামের শিক্ষাব্যবস্থার অনুন্নত চিত্র পাওয়া যায়। গ্রামের স্কুলগুলোতে বিরাজমান নানান রকম সঙ্কট এবং এসব সঙ্কট সমাধানে অর্থনৈতিক সহায়তার অভাবের বাস্তব বর্ণনা পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে শহরে সুবিধাভোগী মানুষের গ্রামের প্রতি অবজ্ঞাপূর্ণ মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়- “তার কথা হল, দেশ-গাঁয়ের জন্য চিন্তা করার মানে হয় না। তাছাড়া, গ্রামের সঙ্গে তার যখন কোনো যোগাযোগই নেই তখন খামোখা এসব সেন্টিমেন্টের কোনো ভ্যালু নেই।”
‘বনপুলকের গন্ধ’ গল্পটিতে একটি আঞ্চলিক বর্ণনা পাওয়া যায়- “হাওলাদার বাড়ির উঠোনে বেশ বড় কয়েকটা ধানের ঢিবি। কয়েকজন লোক একদিকে বসে রান্না-বান্নার আগুনে হাত সেঁকছিলো। এরা হল পরবাসী। মাদারীপুর গোপালগঞ্জ থেকে অগ্রহায়ণ-পৌস মাসে ধান কাটতে চলে আসে দক্ষিণ খুলনায়। মাস তিনেকের মধ্যে কাটা শেষ হয়ে গেলে ওদের ভাগ নিয়ে ফিরে যায় আবার।”
এসকল পরবাসী বা মুনীদের কয়েকমাসের রসদ নিয়ে দল বেধে আসা, বাঁশের চাটাই দিয়ে অস্থায়ী কুড়ে ঘর তৈরি করে থাকা, নিজের হাতে রান্না করে খাওয়া, প্রচুর মরিচ দিয়ে ভাত খাওয়ার দৃশ্য, তাদেরকে ঘিরে গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের উচ্ছ্বাস ও কৌতুহল সবকিছুরই একটি সূক্ষ্ম ও বাস্তব বর্ণনা পাওয়া যায়। নাগরিক জীবনের কলুষতা ও হতাশাকে পিছনে ফেলে গাঁয়ে ফিরে যাওয়ার একটি আকুতিই গল্পটির মূল প্রাণরসকে ধারণ করেছে।
মুচি বেনিয়ার ক্ষুধা কাতর রোগগ্রস্ত জীবনের হতাশা ও অচরিতার্থ আকাঙ্ক্ষার চিত্র ‘শিকার’। বেনিয়া হাঁপানী ও পিত্তশূলে আক্রান্ত। তার সারা শরীরের ঘা দিয়ে দিয়ে কস গড়াচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসার ব্যবস্থা বলতে নগেন কবিরাজের মাদুলী। বেনিয়ার স্ত্রী হরিদাসী যুবতী, স্বাস্থ্যবতী; রাতে তার ঘরে বাছার পাড়র নলিনী আসে। বেনিয়া বাঁধা দিতে পারে না- “এর আগের ক’টা দিন কী যে উপোস গেছে। সেই সাথে পেত্তশূলের ব্যামেটাও চলছিল খুব।
বেনিয়া বাইরের চ্যাট চ্যাটে হোগলায় শুয়ে অবিরাম কাঁদছিল শিশুর মত। উলে আমি একন মলে যাবানে। আমাল পেড়ে কিছু নাই; একটা রোটি হামালে দে, তোল দুইটো পা দলে কই এতডু বাতি দে। অ হলিদাসী তোকে আল কিছু আমি করনানে, তুর নাং একন থিকে আমাল মা-বাপ।” পেশায় মুচি বেনিয়া সাগ্রহে অপেক্ষায় থাকে নদীতে ভেসে আসা গবাদি পশুর লাশের জন্য, অথবা অনুসরণ করে শকুনের গতিবিধি-যেখানে গৃহস্থের বাড়িতে হয়তো কোন গরু-গাভী মরেছে। গবাদিপশুর মড়ক লাগলে যেন তার সুদিন।
নদীর বাঁকে বাঁকে মুচিরা অপেক্ষা করে পানিতে ভেসে আসা গরু-ছাগলের লাশের জন্য। পরে তার চামড়া ছাড়িয়ে লবণ মাখিয়ে রোদে শুকাতে দেয়। অতি সাধারণ তাদের বসতকুটির- “ছোট উঠানের এধারে মাটিতে আধ-পোতা প্রকাণ্ড চাড়ি, তার ওপরে বাঁশের খুঁটির আড়, ছন ও সুন্দরী কাঠের বাকল, লবণ ইত্যাদি। উত্তরে পোঁতায় এক চালা ছোট কুঁড়ে ঘর। চাল হেলে গেছে।
কোণের দোরগোড়ার কাছে একটা উঁচু বেদির মত জায়গায় তুলসী গাছ একটা। খানা-খন্দ, ইটখোলা, অড়হড় ক্ষেত। সমস্ত গল্পটিতে সুন্দরবন এলাকার অন্ত্যজজীবনের একটি ছবি পাওয়া যায় এবং বেনিয়ার নিরুপায় অবস্থা ও স্ত্রীসঙ্গ বঞ্চিত বেনিয়ার অচরিতার্থ যৌনাকাঙ্ক্ষা এক বিকৃতরূপে প্রকাশ পায় গল্পের শেষে।
“রাজেন সাধুর পাঁচালী’ গল্পেও গ্রামের পটভূমিতে সামাজিক অবক্ষয়, অভাব ও পরিস্থিতির চাপে মানসিক বিকৃতির চিত্র। গ্রাম্য চৌকিদার রাজেন সাধুই গল্পের নায়ক। দরিদ্র চৌকিদার রাজেন সাধুর রোগগ্রস্ত শরীরে মানসিকবিকার সৃষ্টি হয়। সুন্দরবন অঞ্চলের গ্রামপ্রকৃতির একটি স্পষ্ট বর্ণনা গল্পটিতে পাওয়া যায়— “বিলের কাছে তখন একখানা চেহারা পেয়েছে বটে। ভর জোয়ারের পানি আঁটো হয়ে রয়েছে।
মাঝে-মাঝে ইতস্ততঃ দাঁড়ানো গাছ-গাছালি, ঢিবি, দক্ষিণ বাংলার মাটির গড়নই এমন। সাগর থেকে নোনা পানি উঠে টইটুম্বর ভরে রাখে। চৈত্র মাসে এই পানি মরে হেজে মাটিতে চুইয়ে যায়। বর্ষা পেলে কিছুটা আবার ধুয়েমুছে যায় বটে, কিন্তু ফসলের সর্বনাশ হতে আর ছাড়ে না। এই মাটি দেখতে কালো। বড়খড়ে যাকে বলে। তবে পানির রঙ কিছুটা গুবরে মত, নল-খাগড়া, শ্যাওলা, কাটাকুচি এইসব ছড়িয়ে বিছিয়ে রয়েছে।”
‘অন্নদাস’ গল্পে গল্পের ছিদেম ও পেঁচি এক মেঘলা বিকেলে তাদের ছোট্ট নৌকাটি নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে রওনা হয়। পেঁচি সাতমাসের গর্ভবর্তী। জঙ্গলের মাটি খুঁড়ে পেঁচি কেঁচো সংগ্রহ করে, বড়শিতে গাঁথে। ছিদে সেগুলো নদীতে পেতে রাখে। তারপর তারা তাদের ছোট্ট নৌকাটিতে অপেক্ষা করতে থাকে। পরদিন সকালে বড়শিতে মাছ গাঁথলে সেগুলো বিক্রি করে তাদের অন্নসংস্থান হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি শুরু হল।
নদীর পানিতে তুমুল আলোড়ন তুলল। ছিদেম ও পেঁচি পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ব্যাকুল হয়ে তাদের ছিপগুলো খুঁজতে শুরু করল। বাতাস তখন তেড়ে উঠেছে আরো। দেখতে দেখতে পানিটাও কেমন ফুলে- ফেঁপে গেল। সারা মাঠ জুড়ে নেচে বেড়াচ্ছে বৃষ্টি। বাজ পড়ছে ঝমঝমিয়ে, একটা বিশাল দোঁয়ার কুণ্ডলী আস্তে -আস্তে সমস্ত এলাকাটাই গ্রাস করে ফেলল। কিন্তু দু’জন ক্ষুধাতুর মানব-মানবী প্রকৃতির এই তাবৎ শাসন উপেক্ষা করে তখনও জীবনের চেয়ে প্রিয় বড়শিগুলো বুকে হেঁটে খুঁজছে। কেননা, এই মাছ বিক্রি করেই কাল সকালে তাদের ভাত খাবার কথা ছিল।”
দারিদ্রসীমার সর্বনিম্নস্তরে বসবাসরত নর-নারীর প্রেস ভালবাসার গল্প ‘সম্পর্ক’। নয়ান রাখাল হুন্নছাড়া প্রকৃতির মানুষ। গ্রামের শেষ প্রান্তে এক পরিত্যক্ত ভিটেয় তার বাস। আত্মীয়-সহায়হীন রাখালের একমাত্র সার্বক্ষণিক সঙ্গী একটি গাভী-রাপ্তী। নয়ান একদিন ভালবাসল ডোমপাড়ার কালীকে। দু’জনে ঘর বাঁধবে সিদ্ধান্ত নেয়।
অর্থের প্রয়োজনে নয়ান রাঙীকে বিক্রি করে দেয়। একদিকে মানবীর প্রেমের আকর্ষণ, অন্যদিকে সংসারের একমাত্র নিজস্ব এই অবলা প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধ এই দ্বিবিধ টানাপোড়েনে দগ্ধ হয় নয়ান। গ্রামীণ পটভূমিকায় মনস্তাত্ত্বিক একটি চমৎকার গল্প ‘নয়ান’।
সরকার গ্রাম উন্নয়নে নানান কর্মসূচী প্রণয়ন করেন। কিন্তু এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্মচারীদের দেশপ্রেমহীন মানসিকতা, সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মে এসব কর্মসূচী কখনও বাস্তবায়ন হয় না এবং সে খবরও দায়িত্বহীন সরকারের অগোচরেই থেকে যায়। গ্রামগুলো যুগ যুগ ধরে থেকে যায় অনুন্নত, আর গ্রামের জনগণ ক্ষুধাকাতর, দুর্বল। ‘হাউই’ গল্পে এ বিষয়টিই উপজীব্য হয়েছে।
কোন এক অজপাড়া গাঁয়ের স্বনির্ভরতা কর্মসূচীর বাস্তবায়নের কতদূর অগ্রসরতা স্বচক্ষে দেখতে সরকার প্রধান সেখানে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, লেখক গ্রামের বর্ণনা দিয়েছেন- প্রাগৈতাহাসিককাল থেকে নিস্পন্দ পড়ে থাকা এই এক টুকরো গাঁও— যেখানে সভ্যতার কোনো ছোঁয়াই পড়েনি এখনও; পৃথিবীর প্রথম বয়সের মত শ্যাওলা লাভায় জড়ানো পাথুরে ইতিহাস, তবে লজ্জা নিবারণের জন্য এইসব আদিম গেঁয়ো লোকজন পোশাকাদি পরতে শিখেছে বলে জন্তু-জানোয়ারের বদলে এখন মানুষ হিসেবে বিবেচিত হয়।”

সেই গ্রামটিতেই হঠাৎ হৈচৈ ও উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হল। শহর থেকে শিক্ষিত সাহেবরা এসে তাঁবু গাড়ল, গ্রামের হাড় জিরজিরে নারী- পুরুষদের লাগিয়ে দিল মাটি কাটার কাজে। পানা পুকুর পরিষ্কার করে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়া হল “নাইলোটিকা চাষ। শহর থেকে লঞ্চে ঝুড়ি বোঝাই করে আনা হাঁস-মুরগি এনে পল্লীবাসীকে শেখানো হল “নেতা জিজ্ঞেস করলে বলবে তোমরা খেটে-খুটে নিজেরাই করেছ। আরে শালা তোদের উদ্যোগেই হয়েছে বুঝলিনে।” এসব হাঁস-মুরগী থেকেই চলল শহুরে সাহেবদের ভূড়িভোজ।
ভোজের আয়োজনে গ্রামের অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পুকুরের রুই-কাতলাও জুটলো। অন্যদিকে স্বনির্ভরতার (1) শিকার ক্ষুধাকাতর পল্লীবাসী সারাদিন মাটি কেটে পেল মাত্র এক সের গম। ভাতের ফ্যান খেয়ে তারা দেশ নেতার বক্তৃতা শুনতে আসল। দেশনেতা গ্রামে এসে নারী-পুরুষের মিলিত মাটিকাটার কাজ দেখে খুশি হলেন কারণ দেশের মানুষ এখন স্বনির্ভর। অন্যদিকে একটা ভারী ঝুড়ি বহন করতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেল ক্ষুধার্ত আতরজান । সে ছিল গর্ভবর্তী, সুনিপুন কৌশলে তা দেশনেতার দৃষ্টির আড়াল করা হল।
তিনি সব দেখে শুনে হৃষ্টচিত্তে গ্রামের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিলেন- এই গ্রামের উন্নয়ন স্বচক্ষে দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছে। আপনার নিজের হাতে কাজ করে যেভাবে আপনাদের ভাগ্য বদলে ফেলেছেন, তাতে আমরা বিস্মিত না হয়ে পারি না। এখন থেকে আপনাদের কোন অভাব থাকবে না।
হাঁস-মুরগি, মাছ এখন আপনাদের হাতের মুঠোয়। আপনাদের সমস্ত অভাব ঘুচিয়ে ফেলতে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ …….।” বক্তৃতা শেষে দেশনেতা হেলিকপ্টারে উড়ে চলে যান। আরও কিছু গ্রামের স্বনির্ভরতা অর্জন তিনি নিজ চোখে দেখবেন। দেশনেতার গ্রাম ত্যাগের পর তার অনুচরেরাও মুরগি, মাছ চাষের সাইনবোর্ডও মহাজন জোতদারদের দেয়া কিছু উপঢৌকন লঞ্চে উঠিয়ে নিয়ে গ্রাম ত্যাগ করল।
ক্ষুধা ও দারিদ্র্যে নিষ্পেষিত জীবনেও মানুষ স্বপ্ন দেখে। তাই জেলে রজব আলী স্বপ্ন দেখে তার জীবনে একদিন সাচ্ছলতা আসবে, সে মায়মুনাকে বিয়ে করে সংসার পাতবে। কিন্তু পরমুহূর্তেই স্বপ্নভঙ্গ হয়, সে সম্মুখীন হয় বাস্তবতার। যে রূঢ় বাস্তবে আছে ক্ষুধাকাতর রোগগ্রস্ত পিতার করুন আর্তনাদ। স্রোত’ গল্পে এ বিষয়টিই উপজীব্য।
পুরুষশাসিত সমাজে নারীর নিরাপত্তা বেষ্টনী তার স্বামী। স্বামীর বাম পাঁজরের হাড় দিয়েই স্ত্রী সৃষ্টি হয়েছে, মুসলিম ধর্মমতে তাই বলা হয়। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় এই হাড়ের জোরেই যেন নারী বলীয়ান হয়। কিন্তু কোথাও তারা না সেই সুখ-স্বর্গ সংসার, স্বামীর বিশ্বস্ততা। ‘বাম পাঁজরের হাড়’ গল্পে সবেতন খুঁজে বেড়ায় তার সেই সুখের স্বর্গ, কিন্তু পায় না কোথাও। সাবালিকা হবার আগেই তার বিয়ে হয়েছিল হাচু মিয়ার সাথে। কিন্তু মৃগী রোগী হাচুমিয়া দুর্ঘটনায় কোমড় ভেঙে শয্যাশায়ী হয়। সবেতন ও হাচুমিয়ার তখন দুটি সন্তান।
পুত্রটি সংসারের অনটনের কারণে অতি অল্প বয়সেই বড়বাড়িতে কাজ নিতে বাধ্য হয়। মেয়েটি জন্ম থেকেই পঙ্গু। একদিন সবেতনকেও জীবিকার সন্ধানে কাজে নামতে হয়। কিন্তু এত কষ্ট করেও তার সংসার করা হল না। এ হঠাৎ তার স্বামী মারা গেল। তার কিছুদিন পর ছেলেটিরও হাঁপানি রোগে মৃত্যু হল। পঙ্গু মেয়েটি মারা গেল সবশেষে। স্বামী-সন্তানদের মৃত্যুতে প্রায় উন্মাদ হয়ে যায়। কিন্তু ক্ষুধা তাকে ফিরিয়ে আনে বাস্তবতায় ।
বড়বাড়িতে সে কাজ নেয়। কিন্তু বিধবা সবেতনের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি পড়ে অনেকেরই। নিজেকে রক্ষা করতে সে দ্বিতীয়বার বিয়ে করল পাগল মোকসেদকে। মোকসেদের আগের স্ত্রীর ছ’টি সন্তানকে ফেলে অন্য পুরুষের হাত ধরে নিরুদ্দেশ হয়েছে। তাই সে সচেতনকে তার সন্তানদের নতুন মা হিসেবে ঘরে আনে।
সে সবেতনকে কিছু জমি লিখে দেবে আশ্বাস দেয়। কিন্তু বিয়ের পর সবেতনের আশাভঙ্গ হয়। মোকসেদ পাগলের সংসার ও সন্তানদের বুক দিয়ে আগলে রেখে নতুন স্বর্গ গড়ার যে স্বপ্ন সে দেখেছিল, তা সম্ভব হল না। মোকসেদ মাত্রারিক্ত অত্যাচারী। একদিন সে সবেতনকে নির্মমভাবে মারধর করল। দ্বিতীয় স্বামীর ঘর ছাড়তে বাধ্য হল সচেতন।
তৃতীয়বারের মত সচেতন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় হরমুজের সাথে। হরমুজ জাল বুনে সংসার চালায়। বসন্ত রোগে তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। হরমুজ নির্বিবাদী মানুষ। এখানে এসে সবেতন তার মনের মত সংসার গোছানোতে মন দেয় আবার “সবেতন ঘরদোর সাফসুতরো করে দু’দিনেই লোকটার মুখে হাসি ফুটিয়ে দেয়।
দুটো রাজহাঁসের বাচ্চা সে চেয়ে নিয়ে এসেছে বড়মার কাছ থেকে। তার জন্য থাকার জায়গা করেছে একটা ডাঙা খলুইয়ের ভেতর। সামনের ছোট্ট উঠোনে মাটি কুপিয়ে পুঁতেছে কটা কুমড়ো, আর ধঞ্চের বিচি। দুটো মরিচ আর বেগুনের চারাও এতে পুঁতেছে জোয়াদার বাড়ি থেকে। দাম কম দেখে একটা পা-ভাঙ্গা ছাগলও এনেছে কিনে। বড়মার কাছে চেয়ে রেখেছে এক গণ্ডা মুরগির বাচ্চা। লোকটাকে ডাটা বুঝিয়ে সুঝিয়ে রোজ পাঠায় কুচো মাছ বেচতে। নিজে এসময়টা জাল বোনে। হরমুজ নতুন বউর বুদ্ধি দেখে খুশি হয়। ভোরের আলোর মত সংসারটা হেসে উঠেছে।”
কিন্তু এই সুখ-স্বর্গ তৈরির স্বপ্ন সমাপ্ত করা আর হয়ে ওঠে না সবেতনের। বিগত জীবনের অত্যাচার অনিয়ম রোগ-ব্যাধি তার পিছু ছাড়ে না। তাই সুখ স্বর্গ ফেলে তাকে চলে যেতে হয় মৃত্যুর দেশে ।
১৯৮৪ সালে প্রকাশিত মুস্তাফা পান্নার ‘লোকসকল’ গ্রন্থটি সম্পর্কে ডঃ রফিকউল্লাহ খান মন্তব্য করেছেনঃ “…. ৭১’ এর স্বাধীনতা-উত্তর পর্যায়ে আমাদের গল্পে এ জাতীয় বিষয়ের বিন্যাস কোন কোন ক্ষেত্রে সাধিত হলেও, মুস্তাফা পান্নাই সম্ভবতঃ সমগ্র গ্রন্থে বিষয়, জীবনাদর্শ ও শিল্প প্রকরণ-নির্মাণে স্বয়ংস্বতন্ত্র ও সামগ্রিক মনোবৈশিষ্ট্যের স্বরূপ উম্মোচনে সক্ষম হয়েছেন। “০৬ এ গ্রন্থের গল্পসমূহ গ্রামীন লোকজজীবন ও অন্ত্যজ শ্রেনীর পরিধিতে রচিত।
লোকসকল গ্রন্থের ‘প্রাকৃতিক’ গল্পে বাংলাদেশের প্রকৃতি নির্ভর শোষণ জর্জর দরিদ্র কৃষকের জীবন চিত্র। বংশপরম্পরায় তারা যেন মানবেতর জীবন যাপনে অভ্যস্ত। জীবন প্রবাহ ও মৃত্যু আসে প্রকৃতিগতভাবে। রূঢ় দারিদ্র্যের কঠিন বর্মে তারা বন্দি। কৃষক ময়জদ্দির দৈনন্দিন জীবন, প্রতাশা প্রাপ্তি, হতাশা-যন্ত্রণা নিয়েই গল্পটি রচিত।
ময়জদ্দির জীবন দারিদ্রের ভয়াবহ ভারে বিধ্বস্ত–শ্বাসরুদ্ধ। তার স্ত্রী সাবনু যার “দেহ বলতে কঙ্কালের ওপর মেদহীন চামড়ার আবরণ।” বাহ্যিকতার সাথে সাথে দারিদ্র্যের নিষ্পেষণ সাবনুরের মনকে তিক্ততার ভরপুর করে তোলে। তাই সে রুক্ষ, বদমেজাজী। প্রকৃতির নিয়মেই তাদের সংসারে সন্তান আসে, অপুষ্ট মায়ের অপুষ্ট সন্তানের মৃত্যু হয়।
সারাদিন জল-কাদায় কাজ করে ময়জদ্দির পায়ে ঘা হয়, কিন্তু তাতে কখনই মেলে না প্রয়োজনীয় ঔষধ ” বৈশাখের শুরুতে দিনকতক জলখাদায় খাটাখাটি করলে পর এদের পায়ের আঙুলের সন্ধিতে পাঁকে খাওয়ার ফলে থকথকে সাদা ঘা হয়। তাতে আঁশটে বমি পাওয়া গন্ধ। প্রত্যুষে ঘুম থেকে জাগার পর মাটিতে পায়ের পাতায় ভর দিলেই ক্ষতস্থান রক্তমুখী হয়।
এই ঘরের ঔষুধ তুঁতে, তেনা- পোড়া। আর হেমন্তের শুরুতে মাঠের কাজ শেষ হলে, ক’দিন শুকনোয় থাকলে, বিশ্রাম পেলে এমতিতেই সেরে যায়। হালের বলদ ও মোষের কাঁধে ঘা যেমন জোয়াল বহনের সাক্ষ্য, এই ক্ষত-গর্ত ও মেহেদি রঙও এরা যে মাঠের মানুষ তার প্রতীক ঘোষণা।
‘অতিক্রম’ গল্পটিতে শোষিত শ্রেনীর প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠার চিত্র। হত দরিদ্র এন্তাজ নির্যাতিতের জীবনকে ধিক্কার দিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়, কেন না তার দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।
এস্তাজ ও ছলিমনের বঞ্চিত-লাঞ্ছিত জীবন যেন সমগ্র বঞ্চিত-লাঞ্ছিত মানুষের জীবনকে একটি কেন্দ্র বিন্দুতে এনেছে যেখানে এস্তাজের মধ্যে জেগে ওঠে সংগ্রামী জীবন চৈতন্য। তাই সে উঠোনে পরে থাকা লেজা সরকি দিয়ে হামেজ মিয়ার বুক বরাবর আঘাত হানে।
আশির দশকে রচিত ঝর্ণা রহমানের ‘ক্ষণজনা’ গল্পটিতে গ্রামের মানুষের অশিক্ষা, অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও একে কেন্দ্র করে স্বার্থান্বেষী মানুষের অর্থ উপার্জনের চিত্র আঁকা হয়েছে। গল্পটিতে পীর-ফকিরের গজিয়ে ওঠা ও ভণ্ডামীর স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। গল্পের নায়ক খলির পীরবংশের ছেলে। গ্রামে কথিত আছে, খলিলের দাদা ‘জিন্দাপীর ছিলেন এবং তিনি মরা গাছকে জীবন্দ করে তুলতে পারতেন।
খলিলের পিতাও অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ছিল। কিন্তু বলিলের ধর্মে বিশ্বাস নেই। তার মতে তার বাপ-দাদারা ধর্মের প্রতি অতি মনোযোগী হবার কারণে, বাস্তব দুনিয়া থেকে দূরে অবস্থান করতেন। এটাই খলিলদের চরম দারিদ্র্যের কারণ। এ ধারণাটিই তাকে ধর্মের প্রতি উদাসীন করে তোলে। অন্যদিকে, খলিলের স্ত্রী আয়েশা ধর্মপ্রাণ নারী। সে সরল ও কোমল প্রকৃতির।
খলিলের ধর্মাচরণের প্রতি অবজ্ঞা ও ঔদাসিন্য তাকে দুঃখ দেয়। ধরিল ও আয়েশার দুটি কন্যা সম্ভ গান, কিন্তু বড় মেয়েটির ঠোঁটকাটা শিশু হয়ে জন্ম নেয়, ছোট মেয়েটি বোবা, আয়েশা তৃতীয়ভারের মত গর্ভধারণ করে এবং মনে মনে প্রার্থনা করে একটি নিখুঁত পুত্র সন্তানের জন্য। কিন্তু তৃতীয় সন্তান পুত্র হলেও, সে ঘনলোম ও দাঁত নিয়ে জন্মায়। গ্রামের মানুষ বিদ্রুপ করে এবং নানারকম জল্পনা-কল্পনা করতে থাকে শিশুটিকে নিয়ে।

তৃতীয়বারের মত একটি অসুস্থ শিশু জন্ম দেওয়ার জন্য খলিল আয়েশার প্রতি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে। কারণ ডাক্তার শিশুটির সম্পর্কে মন্তব্য করে- এটি এক প্রকার রোগ এবং ভবিষ্যতে একারণে ভোগান্তি হতে পারে। কিন্তু হঠাৎ আয়েশা লক্ষ্য করে তার সন্তানটি জন্ম নেয়ার পর তার লাগানো একটি মরা কামিনী গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে।
এ কারণেই সে ধরে নেয় জন্মগতভাবে দাঁত ও ঘনলোম নিয়ে জন্ম নেয়া শিশুটি আসলে জিন্দাপীর। মুহূর্তে গ্রামে রটে যায় কথাটি। গ্রামের মানুষেরা এই শিল্পীরের নখ চুঁইয়ে পানি নিয়ে যায় মোক্ষ লাভের আশায়। গ্রামের মাস্তান জিকরুল বিষয়টিকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জনের পরিকল্পনা নেয়। সে খলিলকে বলে, “খাইল্যা ভাই চেইতেন না। ইচ্ছা করলে তো অহন আপনে দালান উঠাইতে পারেন। আমারে লগে লন। ঠিকঠাক কইরা দিমু।”
সে খলিলের বাড়িতে এতে একটি লাল গামছা পেতে দর্শনার্থীদেরকে বলে কিছু ‘নজর’ বা সেলামী না দিয়ে পীরের মুখ দর্শন করলে অকল্যাণ হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার বিছিয়ে দেয়া গামছাটি সিকি-আধুলিতে ভরে ওঠে। দারিদ্র্যে দীর্ণ-জীর্ণ খলিল কিছুদিন আগে শিশুটির ভবিষ্যৎ ভোগান্তির কথা চিন্তা করে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, সেই শিশুটিই এখন তাকে ভবিষ্যতের সচ্ছল জীবনের স্বপ্ন দেখায়।
মনীশ রায়ের ‘ঘেউ’ গল্পটিতে একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি লক্ষ্য করা যায়। হিন্দু কবিরাজ যামিনী বসাকের কাছে মুসলিম ঘরের অনাথ রহিমুদ্দি পুত্রবৎ পালিত হয়। পঁচিশ বছর ধরে রহিমুদ্দি যামিনী বসাক ও তার পরিবারের সাথে মিলেমিশে আছে। যে যার ধর্ম বিশ্বাসে অটল এবং ধর্মীয় আচরণও পালন করে যে যার নিয়ম অনুযায়ী- কিন্তু এতে পারস্পারিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় না। বরং রহিমুদ্দিনের প্রতি অপত্য স্নেহ অনুভব করে যামিনী কবিরাজ ।
পিতৃ-মাতৃ-স্ত্রী-পুত্রহীন রহিমুদ্দিনও বন্ধন বলতে এই বসাক পরিবার। এদের সুখ-দুঃখের সাথেই মিশে আছে তার সুখ-দুঃখ। কবিরাজের একসময় খ্যাতি ও পসার ছিল- দূর-দূরান্তের গ্রামের লোকেরা তার কাছে রোগী নিয়ে আসত। তখন তার পরিবারে সচ্ছলতা ছিল। কিন্তু বর্তমান অবস্থা অন্যরকম। আধুনিক এ্যালোপথি চিকিৎসার প্রসার ও প্রভাব এখন। সংসার চালাতে বেগ পেতে হয় তাকে।
কবিরাজের কোন পুত্র সন্তান নেই; ছয়টি কন্যা সন্তান- ছয়জনই বিবাহযোগ্য। কিন্তু পড়তি অবস্থার বৃদ্ধ কবিরাজ কন্যাদের জন্য সুপাত্র যোগাড় জন্য ব্যস্ত; গল্পে দেখা যায়, বৃদ্ধ কবিরাজ অস্থির চিত্তে অপেক্ষা করছে পাত্রপক্ষের জন্য, ঘটক আশ্বাস দিয়েছে যে, ছেলেটি অতি সুপাত্র এবং পাত্রী পছন্দ হলে তাদের কোন অর্থকড়ি বা অন্য কোন দাবিদাওয়া নেই। শঙ্কিত চিত্তে অপেক্ষমান যামিনী কবিরাজের মানসিক অস্থিরতার ফাঁকে ফাঁকে বর্ণিত হয়েছে বিগত দিনের সচ্ছল জীবন।
একসময় ভোজনবিলাসী কবিরাজ বাজারে বড় মাছটি কিনে আনত, এখন সামান্য কিসমিশ কেনার সামর্থ্যই তার নেই। কবিরাজের স্ত্রী একসময় পরিপাটি সাজগোজে থাকতেন এখন সে কাগজে ঠোঙা তৈরি বা ছোটখাট সেলাই-ফোঁড়াই করে কিছু উপার্জনের চেষ্টা করে। আগের সেই সাজসজ্জা বা পারিপার্ট আর নেই। কবিরাজের পালিত একান্ত অনুগত রহিমুদ্দি এক সময় বড় কবিরাজ হওয়ার স্বপ্ন দেখত এখ সে স্বপ্নহীন।
গল্পের শেষে পাত্রপক্ষ আসে না, তারা অন্যস্থানে পাত্রী পছন্দ করেছে সেই খবর নিয়ে ঘটক আসে। এ খবরে হতাশা এক নিষ্ফল ক্রোধ নেয় কবিরাজের মনে। গল্পকার একটি প্রতীকি ব্যঞ্জনায় বিষয়টি তুলে ধরেন যামিনী বসাকের পোষা কুকুর মালতীর মধ্য দিয়ে- “ঠিক তখনি ঘেউ ঘেউ করতে করতে রোয়া উঠা পোকা পড়া মালীত ভেতর বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। পাগলা কুকুরের মত রাস্তার এ মাথা ও মাথা ছোটাছুটি করতে থাকে। আর তীব্র আক্রোশে থেকে থেকে ঘেউ ঘেউ করে চলে। ঘেউ ঘেউ ঘেউ । ”
গল্পটিতে রহিমুদ্দি ও কবিরাজ যামিনী বসাকের পারস্পারিক হৃদ্যতা গল্পটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। দেশ বিভাগের পর হিন্দুসম্প্রদায়ের অনেকেই চলে যায় ভারতে। কিন্তু যারা নাড়ীর টানে দেশ ছাড়তে পারে না তারা থেকে যায় এদেশে। দেশের অবস্থার পরিবর্তনে তাদের অনেকেই দুরবস্থার জীবনযাপন করে। তাদের একটি চিত্র পাওয়া যায় গল্পের ঘটক চিন্তামনি চক্রবর্তীর বর্ণনা থেকে।
গ্রামের সামগ্রিক অবস্থার পরিবর্তনের একটি চিত্র গল্পে উঠে এসেছে- “এই গ্রামটায় একসময় গিজগিজ করতো হিন্দু। সন্ধ্যে হলে উলুধ্বনি, আর ঘণ্টা-কাঁসরের শব্দে যেন প্রাণ পেতো জায়গাটা। ধুতি-পাঞ্জাবি, আর শাল-চাদর পরা বাবুদের দাপট ছিল একচেটিয়া। ক্যাশবাক্স আঁকড়ে ধরে, ভূড়ি বাগিয়ে মহাজনী করেছে গোপাল সাহা। রমরমা তেজারতি ব্যবসা বাগিয়ে ফেলেছে উত্তরপাড়ার মধুসুদন পাল।
আবার হাইস্কুলের হেডমাস্টার বিনোদবিহারী বসু সারাজীবন অকৃতদার থেকে ছাত্রদের শিক্ষা দিচ্ছে, ছাত্রানং তপঃ। বড় বড় বাড়িগুলো, যেগুলো একসময় দুর্গাপূজো, কালীপূজোয় গমগম করত, এখন সেগুলোর ইট খসে খসে নোনা ধরেছে কিংবা কোন মুসলমান ভদ্রলোক তা কিনে নিয়ে আরও সুন্দর আরও আধুনিক করে গড়ে তুলেছে। যে দিঘিগুলোয় একসময় যোগেশ মণ্ডল, গোপাল সাহা, মধুসূদন পালের পরিবার ছাড়া আর কারও গোসল করা, মাছ ধরার অধিকার ছিলো না সেগুলো এখন হাত বদলে চলে গেছে অন্য কারও হাতে। কোনটা হাজামজা ডোবায় পরিণত হয়েছে। আবার কোনটা কাকচুক্ষুর মত টলটলে পানিতে স্পষ্ট দেখা যায় মাছের আনাগোনা।”
মনীশ রায়ের ‘টমেটো-বাবা গল্পে পাওয়া যায় গ্রামের এক নির্বোধ নির্বিরোধী মানুষ হোসেন। সে ঘরে স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও গ্রামের স্বামী-পরিত্যক্তা কমলাকে বিয়ে করতে চায়। গ্রামের শেষ প্রান্তে শহরের যাবার রাস্তার পাশে টমেটো-বাবার আখড়া। কথিত আছে, টমেটো বাবার কালে-ভদ্রে কারও গায়ে টমেটো ছুঁড়ে মারে, তখন সে রাজা হয়। টমেটো-বাবা একদিন হঠাৎ হোসেনের গায়ে টমেটো ছুঁড়ে মারল।
এই অভাবনীয় সৌভাগ্যে হোসেন যেন উদভ্রান্ত- দিশেহারা হয়ে গেল- “ওর এখন কিস্যু ভাল লাগছে না। সে শুধু দেখতে চায়-মানুষ কেমন করে রাজা হয়, একজন না-খাওয়া মানুষ কিভাবে বাবার দয়ায় দুনিয়ার তাবৎ ঐশ্বর্যের মালিক হয়ে যায়। কিভাবে।” গ্রামের মাস্তান আলম হোসেনের উপর আক্রমন চালায় টমেটো-বাবার ছুঁড়ে দেয়া টমেটো নেয়ার জন্য। কারণ আলমের ধারণা ঐ টমেটোর একটু অংশ খেলে সেও রাজা হতে পারবে।
হোসেনের উপর সে চাপ সৃষ্টি করে টমেটো দেয়ার জন্য। “বাইর কর কইতাছি টমেটো। বমি কইরা অইলেও টমেটো বাইর করতে অইব।” দলবলস আলম হোসেনকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। হোসেন মৃত্যুর আগে রাজা হওয়া দেখে যেতে পারে না, দেখ যায় পৃথিবীর নৃশংসতা ।
গ্রাম উন্নয়ন নামক প্রহসনের আরেকটি চিত্র মহীবুল আজিজের ‘গ্রাম উন্নয়ন কমপ্লেক্স ও নবিতুনের ভাগ্যচাঁদ’। নিমপুর গ্রামের নবিতুনের পুত্র আক্কেল আলী মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছে। নবিতুনের স্বামী কলেরা রোগে মারা গিয়েছে। স্বামী-পুত্রহীন এই বৃদ্ধার বাস গ্রামের শেষ প্রান্তে।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মা হলেও সেই সম্মান কোনদিন উপভোগ করেনি নবিতুন। দেশ স্বাধীন হবার বছর খানেক পর একদিন তিনজন যুবক এসে তাকে বলল, একজন শহীদের মা হিসেবে এখন থেকে তার সমস্ত দায়িত্ব সরকারের। তাই নবিতুনের যে অল্পবিস্তর জমি আছে, তা সরকার লোক দিয়ে চাষ করিয়ে ফসল তুলে দিবে নবিতুনের ঘরে। এর জন্য কেবল জরিম দলিলে নবিতুনের টিপসই প্রয়োজন।
নবিতুনের টিপসই নিয়ে সেই যুবকত্রয় চলে যায়। এরপর ফসল তোলার দিন আসে, কিন্তু নবিতুনের ঘরে ফসল ওঠে না। সরকারের প্রতিনিধি ইউনিয়ন মেম্বর মগরেব আলীর কাছে খোঁজ নিয়ে নবিতুন জানতে পারেন যে, সে জমিটি বিক্রয়ের দলিলে টিপসই দিয়েছে। এরপর কষ্টে-সৃষ্টে নবিতুনের দিন যেতে থাকে। সরকার পরিবর্তন হয়। নতুন সরকার আসে। নতুন সরকার গ্রামের উন্নয়নের জন্য তৎপর হয় এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এরজন্য গ্রামে নতুন দফতর স্থাপিত হয়।
নতুন ঝকঝকে পাকা বিল্ডিংয়ে নতুন দফতর স্থাপন করা হয়। তবে এর কার্যক্রম শুরু করার আগে সাড়ম্বর উদ্বোধন প্রয়োজন। উদ্বোধন করানো হবে নবিতুনের হাতে। কেননা সে বীর মুক্তিযোদ্ধার মা। তার সন্তান দেশকে স্বাধীন করার জন্য প্রাণ দিয়েছে। তাই তার হাতেই উদ্বোধন হবে গ্রাম উন্নয়ন কমপ্লেক্সের। যথাসময়ে মেম্বর মগবের আলী একটি নতুন শাড়ি তাকে গিয়ে শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়ে যায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। নতুন শাড়ি পড়ে নবিতুন গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে এক আসনে উপবিষ্ট হয়।
মঞ্চে তার ডাক পড়ে বক্তৃতা দেবার জন্য। কিন্তু মঞ্চে উঠে সে মেম্বর মগরেব আলীর লিখিয়ে দেয়া বক্তব্য ভুলে যায়। সে তার নিজস্ব বক্তব্যই বলে, সরকার বলেছিল আমার জমিতে ফসল হবে। আমার ভাত-কাপড় হবে। আমার জমি বেদখল হল। এক কণা ফসল পালাম না। অহন পেটের জ্বালায় আমি মরতিছি। আমি জমি ফেরত চাই। আমি বাঁইচবার চাই।” সে আর বলতে পারে না।
কান্নায় তার কণ্ঠরুদ্ধ হয়। ঘোষক তাকে বিনীতভাবে মঞ্চ থেকে সরিয়ে নেয়। সভায় উপস্থিত সরকার প্রতিনিধি এবং শহর থেকে আসা অন্যান্য ব্যক্তিরা বিরক্ত হয়। তাদের মতে, সংগ্রামের মানুষেরা সুযোগ পেলেই কেবল নিজেদের অভাবের কথা বলতে শুরু করে। নবিতুন গ্রাম উন্নয়ন সম্পর্কে কিছু না বলে নিজের জমিবেদখল অভাব প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আসাতে সরকার প্রতিনিধি ক্ষুব্ধ হয়।

সরকার প্রতিনিধি নিজের ভাষণে গ্রামের মানুষের নৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে জোর দিলেন। সভার শেষে নবিতুন লাল ফিতা কেটে গ্রাম-উন্নয়ন কমপ্লেক্সের অফিসভবন উন্মোচন করল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে গ্রামবাসীদের জন্য ভবনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল, কেননা ভিতরে শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জন্য ভূরিভোজের আয়োজন আছে।
প্রধান অতিতি হিসেবে নবিতুন এই ভোজসভার শরিক হবার সৌভাগ্য অর্জন করল এবং দামী বাবুর্চির রান্না করা নানান উপাদেয় বাবার খেল। সবশেষে সরকারী গাড়িতে মেম্বর তাকে বাড়ি পৌঁছে দিল। কিন্তু বহুদিনের অর্ধভুক্ত ‘শুকনো অস্ত্রপথ’ গুরুপাক খাবার ধারণ করতে পারল না। নবিতুনের বমি শুরু হল। তারপর রক্ত যেতে শুরু করল বমির সাথে। পরদিনের নতুন সকাল নবিতুনের দেখা হল না। পরদিন সকাল বেলা সবাই দেখতে পেল নবিতন ঘরে আছে নতন শাড়ি পড়ে।
মানুষের হীন যৌন অভিরুচির গল্প মহীবুল আজিজের ‘মাছের মা’। গল্পে যুবক আখলাকের যৌন লালসার শিকার হয় ছয় বছরের বালিকা নিপা। গল্পটির পটভূমি গ্রামীণ। গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে লজিং মাস্টার থেকে জীবিকা উপার্জন করে দরিদ্র ভূমিহীন কৃষকের ছেলে আখলাক। আখলাকের স্বপ্ন সে একদিন বিদেশে যাবে এবং শ্রম বিক্রি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করবে- “পনি মিঞা একজন দরিদ্র কৃষক। তার নিজের জমি ছিল, এখন নেই।
তাই সে শ্রম খাটায় অন্যের জমিতে। তার ছেলে আখলাক নিতান্ত দায়ে পড়ে গৃহশিক্ষকতার পেশা নিলেও বিশ্বাস করে এবং স্বপ্ন দেখে একদিন নদী-সমুদ্র পাড়ি দেবে। তারপর লক্ষ লক্ষ টাকা পকেটে ভরে দেশে ফিরবে এবং একর একর জমি কিনে দেবে তার বাপকে। তখন তার বাপ গাছের ছায়ায় বসে-বসে দেখবে, হাজার হাজার চাষী চাষ করেছে জমিদার গনি মিঞার জমিতে। ”
আখলাক তার ছয় বছরের ছাত্রী নিপার মাকে বোঝায় এ বয়স থেকেই সাঁতার শিখতে হবে এবং নদীর দেশে সাঁতার শেখা অত্যন্ত জরুরী। তাই শিক্ষকের গুরু দায়িত্ব পালন করতে নীপাকে নিয়ে যায় পুকুরে সাঁতার শেখাতে এবং সেখানেই নীপার সাথে সে যৌনমিলন ঘটায়। সমাজের অনেকের এই বিকৃত ও হীন মানসিকতার স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে গল্পটিতে।
মোস্তফা হোসেইনের ‘দিগন্ত অনন্ত’ গল্পে এক গ্রামের এক দিন মজুর যুবকের প্রেমের গল্পের পটভূমিতে জোতদারদের নিপীড়নের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। রহমত উম্মতিকে ভালবাসে, তাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু উম্মতির বাবা এতে সম্মত না। গোপনে উম্মতির সাথে মিলনের সময় রহমত ধরা পড়ে জমির শেখের হাতে। “জমির শেখ কামলার পয়সা দেয় না। জমির শেখ গোটা গ্রামের মাতব্বর। সে বিচারে বসে যার পক্ষ নিবে তার কোনদিন হার হয় না।”
একেকটি সালিশ-এর পর তার তিন বিবির শাড়ি গয়না জুটে। এমনকি তার তিন নম্বর বিয়েটাও সমাধা হয়েছে একটি মার্ডার-এর সালিস শেষে। তবে এ গুণটি তার আছে, কাউকে কথা দিলে সে তার কাজ করবেই। জমির শেখ রহমতকে কথা দেয় সে এই মৌসুমে তার ক্ষেতে রহমত বেগার কামলার কাজ করলে সে উম্মতির বাবাকে সম্মত করাবে। এ আশায় রহমত শত অপমান, শত কষ্ট সহ্য করে জমির শেখের ক্ষেতে কাজ করে যায়।
‘কাঠুরে ও দাঁড়কাক’ গল্পে শহীদুল জহির পটভূমি হিসেবে গ্রাম ও শহর উভয়ই ব্যবহার করেছেন। সিরাজগঞ্জ শহরের অদূরবর্তী গ্রাম বৈকুণ্ঠপুরে বাস আকালু ও তার স্ত্রী টেপির আকালু ভূমিহীন, সে কাঠ কেটে সংসার চালায়। তার স্ত্রী টেপি পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং নানাপ্রকার অসুখ তার শরীরকে আশ্রয় করেছে। কিন্তু এতে যুবক আকালু ও যুবতী টেপির প্রেমের ঘাটতি হয় না।
একদিন গাছ কাটতে গিয়ে আকালু গাছের গুঁড়ির মধ্যে একটি কাপড়ে জড়ানো অনেক টাকা পায়। টাকাটি সে বাড়িতে নিয়ে আসে। কিন্তু এত টাকা খরচের সঠিক উপায় নির্বাচন করতে নিরক্ষর ও সরলমতি কালু শহরে উকিলের সন্ধানে যায়। উকিলের সন্ধানদাতা শহরের এক দোকানদার এবং উকিল দুজনই টাকার অংশ দাবি করে। আকালু তাদেরকে বাড়িতে এনে টাকা কোথায় রাখা আছে তা দেখায় এবং টাকার ভাগ দেয়। তখন উকিল এক বছরের মধ্যে এই টাকা খরচ না করার পরামর্শ দিয়ে চলে যায়।
রাতের অন্ধকারে আকালু ও টেপিকে বেঁধে রেখে বাকি টাকাটা তারা নিয়ে যায়। পরদিন গ্রামের মানুষ এসে উদ্ধার করে এবং বিষয়টি পুলিশকে অবগত করতে চায়। পুলিশ কুড়িয়ে পাওয়া টাকার কথা জানলে আকালুদের ভোগান্তি আরও বাড়বে একথা তারা বুঝতে পারে। তাই আকালু ও টেপি ঢাকায় পালিয়ে আসে।
গল্পের শেষ অংশে তাদের ঢাকা শহরে জীবনযাপন সম্পর্কিত ঘটনার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। গল্পটির বর্ণনা ভঙ্গি রূপকথার ধাঁচে বর্ণিত হয়েছে। গল্পটিতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের শোষণ, লালসা ও নীচতার স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে।