আমরা সেদিন গেলাম এক ভদ্রলোকের কাছে চাঁদা চাইতে!
পুরনো দাতাদের মুখে আলাদা একটা ছাপ থাকে—যেন মুখই বলে দেয় কী ঘটতে চলেছে। বসতেই বুঝলাম, এ মানুষটি দেবেন না। আর তিনিও সম্ভবত ধরে ফেললেন, আমরা টলকে যাব। আসলে, চাঁদা চাওয়া আর দেওয়ার লোকেরা একে অপরকে অদ্ভুতভাবে চিনে ফেলে। শরীরের গন্ধ পর্যন্ত ফাঁস করে দেয়—কে দেবে, কে দেবে না। চাওয়া লোক বুঝে যায়—“এ দেবে না।” আর দেওয়া লোকও বুঝে নেয়—“এটাকে খালি হাতে ফেরানো যাবে।”
তবুও সামাজিক নিয়ম তো আছেই—আমাদের চাইতেই হবে, আর তাঁরও ফিরিয়ে দিতে হবে। তাই আমরা ভদ্রভাবে চাঁদা প্রার্থনা করলাম। তখন তিনি মুখ বাঁকিয়ে বললেন—
“আপনারা চাঁদার দুশ্চিন্তা করছেন, আমরা তো ট্যাক্সের চাপে মরে যাচ্ছি!”
আমি হতভম্ব। ট্যাক্সে আবার মানুষ মরে? নিউমোনিয়া, কলেরা, ক্যান্সার—এসব রোগে যে মানুষ মরে, তা জানি। কিন্তু ট্যাক্সের অসুখে মৃত্যু! অথচ ভদ্রলোক দিব্যি হাসিখুশি, একেবারে চাঙ্গা। তবে কি এই অসুখে মরার মধ্যেই আলাদা আনন্দ আছে? যে অসুখ মানুষকে আরও টগবগে করে তোলে? কী জানি, এই রোগে মরতে কেমন লাগে!
এ এক অদ্ভুত রোগ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর কোনো ওষুধ নেই। ডাক্তারদের কাছে নিয়ে যান, বলুন—“এই লোক ট্যাক্সে মরছে, ওঁর প্রাণটা বাঁচান।” ডাক্তার ঠান্ডা গলায় বলবে—“মাফ করবেন, এ রোগের চিকিৎসা আমাদের কাছে নেই।” তবে আশ্চর্যের বিষয়, এ রোগের চিকিৎসক আছেন, কিন্তু তাঁরা অ্যালোপ্যাথি বা হোমিওপ্যাথি পড়েননি। এ রোগের আলাদা চিকিৎসাশাস্ত্র আছে।
এই দেশে কিছু মানুষ মরছে ট্যাক্সের অসুখে, আর অনেক বেশি মানুষ মরছে ক্ষুধায়।
ট্যাক্সের অসুখের মজার ব্যাপার হলো—যার গায়ে লাগে, সে হাহাকার করে বলে,
“আহা! আমরা তো ট্যাক্সে মরে যাচ্ছি।”
আর যার গায়ে লাগে না, সেও হাহাকার করে,
“আহা! আমাদের তো ট্যাক্সের রোগই ধরল না।”
কত মানুষ আছেন যাঁদের মহা বাসনা—ট্যাক্সের অসুখে মরবেন। অথচ নিয়তি এমন যে, তাঁরা মরে যান নিউমোনিয়ায়! তাঁদের জন্য সত্যিই আমাদের মায়া হলো। মনে মনে ভাবলাম—“বললেই হয়, এই অসুখটা সম্পত্তিসহ আমাদের দিয়ে দিন।” কিন্তু তা নয়। এই কমবখ্ত অসুখই এমন যে একবার কারও গায়ে ধরলে, সে আর তা ছাড়তে চায় না। বরং রোগটাই তার প্রিয় হয়ে ওঠে।
আমার মনেও তখন এক অদ্ভুত হিংসা জাগল। আহা, আমিও যদি তাঁদের মতোই এই অসুখে আক্রান্ত হতে পারতাম! তাঁদের মতোই মরতে পারতাম! কতই না ভালো লাগত যদি খবরের কাগজে শোকসংবাদ বের হতো—
“অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানানো যাচ্ছে যে হিন্দি ব্যঙ্গকার হরিশংকর পরসাই ট্যাক্সের অসুখে মারা গেছেন। তিনি হিন্দির প্রথম লেখক, যিনি এই দুর্লভ রোগে প্রাণ হারালেন। সমগ্র হিন্দি সাহিত্যজগৎ গর্বিত। আশা করা যায়, ভবিষ্যতেও আরও লেখক এই অসুখে প্রাণ হারাবেন।”
কিন্তু হায়, আমাদের ভাগ্যে কোথায় তা! আমাদের জন্য লেখা আছে—মরা হবে কোনো তুচ্ছ, মামুলি রোগে।
তাঁর দুঃখ দেখে আমার মনে হলো—আসলে দুঃখও কত রকমের হয়! কারও দুঃখ একরকম, আবার অন্যের দুঃখ একেবারেই ভিন্ন। তাঁর দুঃখ—ট্যাক্স তাঁকে মেরে ফেলছে। আর আমার দুঃখ—আমার কোনো সম্পত্তি নেই, তাই আমিও ট্যাক্সের অসুখে মরে যাওয়ার সৌভাগ্য পাই না। আমাদের দুঃখ তো আরও মামুলি—পঞ্চাশ টাকা চাঁদা না পাওয়ার যন্ত্রণায় আমরা মরে যাচ্ছিলাম।
আমার কাছে এক ভদ্রলোক প্রায়ই আসতেন, যিনি অন্যের অসততার রোগে ভুগতেন। আশ্চর্য ব্যাপার হলো, নিজের অসততা প্রাণঘাতী নয়; বরং সংযমের সঙ্গে চর্চা করলে তা নাকি শরীরের পক্ষেই ভালো। যেমন, অনেক সতী–স্ত্রী অন্য নারীদের চরিত্রহীনতায় ভোগেন—যেন সে–ই তাঁদের অসুখ। এই ভদ্রলোক ছিলেন এক আদর্শবাদী মানুষ। গান্ধীর নামে চালিত এক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। ঘন্টার পর ঘন্টা বসে বলতেন, সেখানে কী ভয়ংকর অসততা চলছে।
বলতেন, “যৌবনে আমি সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিলাম। কী আশায় এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম আর এখন কী দেখছি!”
আমি মুচকি হেসে উত্তর দিতাম, “ভাই, যৌবনে যারা নিজেদের বিসর্জন দিয়েছে তারা সবাই আজ কাঁদছে। তবে তুমি আদর্শ কাঁধে নিয়ে গেলে কেন? গান্ধীজি তো মৃত্যুশয্যায় বসে কোনো দোকান খোলার নির্দেশ দিয়ে যাননি!”
তখন আমি বুঝতে পারলাম তাঁর যন্ত্রণা। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গান্ধীর নাম জড়িয়ে থাকায় তিনি নিজে অসততা করতে পারছিলেন না, অথচ অন্যদের অসততা তাঁকে অসুস্থ করে তুলছিল। যদি প্রতিষ্ঠানের নাম অন্য কিছু হতো, তবে তিনিও বাকিদের মতো করতেন আর দিব্যি সুস্থ থাকতেন। কিন্তু গান্ধীজি তাঁর জীবন বরবাদ করলেন। যেমন তিনি বিনোবার মতো অনেকের জীবন বরবাদ করেছিলেন।
আহা, কী ভয়ংকর দুঃখ মানুষের জীবনে!
আমি তখন বসে আছি, সঙ্গে দুই–তিনজন বন্ধু। আমি নিজেও দুঃখী। আর আমার দুঃখটা হলো—আমাকে চল্লিশ টাকার বিদ্যুতের বিল জমা দিতে হবে, অথচ আমার হাতে এক টাকাও নেই।
ঠিক তখনই এক বন্ধু নিজের দুঃখের কাহিনি শুরু করলেন। বললেন—তিনি নাকি আট ঘরের বাড়ি করার পরিকল্পনা করেছিলেন। ছয়টি ঘর তৈরি হয়েছে, কিন্তু বাকি দুটির জন্য টাকা জুটছে না। মুখে গভীর বিষাদের ছাপ—তিনি ভীষণ দুঃখী। বাড়িটা আট ঘরের বদলে ছয় ঘরে আটকে যাবে, এটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা। আমার কি দুঃখী হওয়া উচিত ছিল না? হওয়া উচিতই ছিল। কিন্তু হচ্ছিল না। আমার মাথায় তখন শুধু বাজছিল চল্লিশ টাকার বিদ্যুতের বিল।
এরপর আরেক বন্ধু, যিনি বইয়ের ব্যবসা করেন, তিনিও নিজের দুঃখ শোনাতে লাগলেন। বললেন—গত বছর তিনি পঞ্চাশ হাজার টাকার বই বিক্রি করেছিলেন লাইব্রেরিগুলিতে। আর এ বছর হয়েছে মাত্র চল্লিশ হাজার। কাতর গলায় বললেন—“এভাবে কি সংসার চলে? মাত্র চল্লিশ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে এ বছর! খুবই বিপদ!” তিনি আশা করেছিলেন আমি তাঁর দুঃখে দুঃখী হবো। কিন্তু হলো না।
কারণ, আমি তো জানি—আমি আমার একশো বই তাঁর কাছে বিক্রির জন্য রেখেছিলাম, সেগুলো বিক্রিও হয়ে গেছে। কিন্তু যখন টাকা চাইতে গেছি, তিনি এমনভাবে হেসেছেন যেন আমি মজা করছি, কৌতুক করছি! আহা, ব্যঙ্গকারের কী দুরবস্থা! নিজের পাওনা চাইতে গেলেও, সেটাকে ব্যঙ্গ–রসের অংশ মনে করে ফেলা হয়। তাই তাঁর দুঃখ শুনেও আমি দুঃখী হতে পারিনি।
আমার মাথায় তখনও ঘুরছে—বিদ্যুৎ কেটে যাবে, চল্লিশ টাকার বিল বাকি! এমন সময় তৃতীয় বন্ধু তাঁর দুঃখ শোনালেন। বললেন—রোটারি মেশিন তো এনেছেন, কিন্তু এখন মনো মেশিন আনার মতো সামর্থ্য নেই। তাঁর মুখে গাম্ভীর্য, কণ্ঠে দুঃখের সুর। কিন্তু আশ্চর্য! আমি তাতেও দুঃখী হতে পারলাম না।
শেষমেশ নিজের মনে ধমক দিলাম—“শুধু নিজের বিদ্যুতের বিলের কথা ভেবে বসে থাকা কি ঠিক হচ্ছে? অন্তত বন্ধুদের দুঃখে সঙ্গ দিতে হবে।” তাই আমি গম্ভীর মুখে বললাম—
“আহা, মানবজীবনের কী দারুণ ট্র্যাজেডি! ভাবুন তো, বাড়ি আট ঘরের বদলে ছয় ঘরে আটকে যায়। কী নিষ্ঠুর এই পৃথিবী, বছরে মাত্র চল্লিশ হাজার টাকার বই কিনছে! আর কী ভয়ংকর সময় এসেছে—মনো মেশিনটাও আসছে না!”
আমার কথা শুনে তিন বন্ধু আনন্দে ভরে গেলেন। তাঁদের চোখেমুখে তৃপ্তি—অবশেষে আমি তাঁদের দুঃখে দুঃখী হতে পেরেছি।
আসলে দুঃখও একেকজনের একেক রকম। কোথাও টিকে থাকার সংগ্রাম, কোথাও আবার সম্পদ ধরে রাখার যুদ্ধ। কারও দুঃখ—ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান জোগাড় করতে না পারা, আবার কারও দুঃখ—অঢেল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ‘যথেষ্ট’ সমৃদ্ধি না পাওয়া। এ অবস্থায় কেউ–ই আর নিজের মামুলি দুঃখ নিয়ে বসতে পারে না।
তবুও আমার মনে তখনও সেই পুরনো বাসনা—আহা, যদি ওই ভদ্রলোক তাঁর সম্পত্তিসহ ট্যাক্সের অসুখটা আমাকে দিয়ে দিতেন! আমি তাতেই মরতাম, গর্বে মরতাম! কিন্তু জানি, তিনি কখনও আমাকে এ সুযোগ দেবেন না। না সম্পত্তি ছাড়বেন, না অসুখ। আর আমাকেও শেষ পর্যন্ত মরতে হবে কোনো তুচ্ছ, মামুলি রোগেই।